এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...

এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে
এই আমি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
এই আমি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

জন্মদিনের আত্মজিজ্ঞাসা

গতকাল ছিল আমার আটাশতম জন্মদিন। অর্থাৎ, সাতাশ বছরের জীবন কাটিয়ে দিয়েছি পৃথিবীর আলো বাতাসে।
সাতাশ বছর মোটেও কম সময় নয়। যদি এভাবে ভাবি- আজ থেকে সাতাশ বছর আগে যারা একইদিনে জন্মেছিলো, তারা সবাই কি আজও বেঁচে আছে? নেই। এমনকি আরো পরে যাদের জন্ম, তারাও অনেকেই বেঁচে নেই।

আল্লাহর ইচ্ছায় আমি বেঁচে আছি। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে ফিরে এসে আজও বেঁচে আছি। তার মানে, আমি অনেক মানুষের তুলনায় অলরেডি এক দীর্ঘ জীবন পেয়েছি।

বয়স হলো সাতাশ। সাত বছর বাদ দিতে হয়, কারণ সাত বছর বয়সের আগে আসলেই কিছু বোঝার মত বয়স ছিলনা। তবু বিশ বছরেই এত এত ভিন্ন মাত্রার অভিজ্ঞতা হয়েছে যে, মাঝে মাঝে নিজেই আশ্চর্য হয়ে যাই। শরীরের বয়স যাই হোক, আপেক্ষিকতার সূত্র অনুযায়ী মনের বয়স যে কত হয়েছে ঠাওর করতে পারিনা।
আমি জন্মদিন উদযাপন করিনা। ছুটির দিন থাকে, ঘুমিয়েই কাটাই। প্রশ্ন হলো- জন্মদিন কি আসলে আনন্দের সাথে উদযাপন করার বিষয়? নাকি এই ভেবে কষ্ট পাওয়া উচিৎ যে- নির্দিষ্ট হায়াতের হিসাব থেকে আরো একটি বছর কমে গেল! মহাকালের মহাশুন্যতায় অন্তর্ধানের দিকে আরো অনেকটা এগিয়ে গেলাম!!

জন্মদিনে অনেকেই আমাকে শুভেচ্ছা জানান। আমিও জানাই। যেকোন শিশুর জন্মই আনন্দের উপলক্ষ্য। হয়তো আমারটাও তাই। কিন্তু সেই শিশু যখন বড় হয়- তখন সে আর সবার জন্য আনন্দের কারণ থাকে না।

জন্মদিনের সবচেয়ে বড় আত্মজিজ্ঞাসা হলোঃ যখন শিশু ছিলাম, তখন হয়তো স্বাভাবিকভাবেই মানুষের জন্য আনন্দের কারণ ছিলাম। এখন এই পরিণত বয়সেও আমি কি সত্যিই মানুষের জন্য আনন্দের উৎস হতে পেরেছি?

মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

টাকার মেশিন

সরদার জয়েনউদ্দিনের একটা গল্প ছোটবেলায় পড়েছিলাম । গল্পটা ছিল কিছুটা রম্য ধাঁচের । কিন্তু সেই রম্য ধাঁচের গল্পটাই দিনে দিনে আমার চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করেছে ভয়ংকরভাবে ।
গল্পের নাম ‘টাকার মেশিন’ । এক কৌতুহলী কিশোরের গল্প । ছেলেটা শুনেছিল যে আমেরিকায় নাকি অনেক ধনী লোকেরা থাকে । তাদের অনেক টাকা । এত টাকা যে গুনে শেষ করা যায়না । কিন্তু কোনদিন সেরকম ধনী কাউকে দেখেনি বালক । হঠাত একদিন খবর পেল, বিদেশ থেকে একজন ধনী মানুষ এসেছেন সার্কিট হাউজে । শুনে পরি কি মরি করে দৌড় । তারপর প্রহরীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কোনভাবে সে ঢুকে পড়ে ভেতরে । অনেকগুলো ঘরের কোনটাতে যে সেই ধনী লোকটা আছে তা তো জানা নেই । ভয়ে ভয়ে একটা ঘরের দরজায় উঁকি দেয় সে । ঘরটাতে একজন হাল্কাপাতলা মানুষ বসে ছিলেন । লোকটা দেখতে পেয়ে কিশোর  ছেলেটাকে ডাক দেন ।
-‘বাবু, কাউকে খুঁজছো ?’
-‘হ্যা,আংকেল । শুনলাম আমেরিকা থেকে খুব ধনী একজন মানুষ এসেছেন । তাঁকে খুজছিলাম । বলতে পারেন, তিনি কোথায় আছেন ?’ ভয়ে ভয়ে জবাব দেয় কিশোর।
মুচকি হেসে লোকটা বললেন, ‘এসো ভেতরে এসো । আমিই সেই লোক’ ।
কিশোর তো বিস্ময়ে হতবাক । সে বলে, ‘আপনি সেই লোক ? নাহ । আপনি নিশ্চয়ই মিথ্যা বলছেন । বলুন না তিনি কোথায় আছেন ! আমি শুধু একবার তাঁকে দেখেই চলে যাবো । একদম ডিস্টার্ব করবো না’ ।
লোকটাও অবাক হয়ে বলেন- ‘কেন, তোমার বিশ্বাস হয় না আমিই সেই লোক?’
কিশোর বলে- ‘আপনি সেই লোক হলে দেখিতো আপনার হাত কয়টা ?’
‘আমার হাততো তোমার মতই দুইটি’ । হাত দুটি দেখান ধনী ভদ্রলোক ।
অবিশ্বাস বেড়ে যায় কিশোরের ।
আচ্ছা বলুনতো, আপনি কী খান ? প্রশ্ন করে সে  ।
ধনী বলেন- আসলে বাপু আমার তো ডায়াবেটিস, তেমন কিছু খাইনা । এই ধরো সকালে ও রাতে দুই পিস রুটি, দুপুরে কিছু ফলমূল । এই ।
কিশোর অবিশ্বাস নিয়ে বলে, 'না না । আপনি তাহলে সেইলোক হতেই পারেন না । যার এত টাকা, তার শরীর হবে কয়েকটি হাতির সমান, তার নিশ্চয়ই কমছে কম দশটি হাত থাকবে, সেই দশহাত দিয়ে সারাদিন শুধু খাবে খাবে আর খাবে । কিন্তু আপনি তো কিছুই খান না । আমার চেয়েও কম খান !'
'আচ্ছা আপনি যদি সেই লোক হন, তাহলে সত্যি করে বলুন তো অত টাকা দিয়ে আপনি কী করেন ?'
ধনী লোক বলেন, আর বলোনা বাপু- খুব সংকটে আছি । শুনেছি আফ্রিকায় একটা তেলের খনি আবিস্কৃত হয়েছে । সেটা কিনতে চাইছি । কিন্তু কয়েকশত কোটি টাকা ঘাটতি হয়ে যাচ্ছে ।
-সেই খনি কিনে কী করবেন ?
-বলো কী ? তেল উত্তোলন করে বিক্রি করবো । অনেক লাভ হবে ।
-সেই টাকা দিয়ে কী করবেন ?
-কেন, আরেকটি খনি কিনবো । তোমাদের দেশে নাকি কয়লার খনি আছে । সেগুলোও কিনতে পারি ।
-তাতে কী হবে ?
-কেন, আরো টাকা আসবে !
-আরো টাকা দিয়ে কী করবেন ?
-আরো ফ্যাক্টরি দিব ।
-আরো ফ্যাক্টরি দিয়ে কী হবে ?
-কেন, আরো টাকা আসবে !
-ওটা দিয়ে কী হবে ?
-আরো টাকা আসবে ।
-আরো টাকা দিয়ে কী হবে ?
-আরো টাকা আসবে...
কিছুক্ষণ ভেবে কিশোর বললো, আসলে আংকেল, আপনি তো মানুষ না ! আপনি তো আস্ত একটা ‘টাকার মেশিন !’

২।
সেইসময় গল্পটা আমার কাছে ছিল স্রেফ একটা মজার গল্প । আমাদের মত গ্রামীণ মধ্যবিত্ত পরিবারের একটা কিশোরের পক্ষে টাকার মেশিন চেনাটা সহজ ছিলনা । আমরা চাহিবামাত্র কিছু পেতাম না, অপেক্ষা করতে হত বাবার বেতনের। আমাদের বাবাকে এখান সেখান থেকে টাকা জোগাড় করে বড় প্রয়োজন মেটাতে হত । তারপর বড় হতে হতে ধীরে ধীরে টাকার মেশিনের সাথে পরিচয় ঘটতে লাগলো আমার । তারাও আমাদের মত মানুষ, কিন্তু জীবনটা বন্দী টাকার খাঁচায় । বেশি বেশি টাকা উপার্জনই তাদের একমাত্র লক্ষ্য । ডাক্তারদের মধ্যেও এই সংখ্যাটা কম নয় । এদের কাউকে যদি জীবনের শেষ প্রান্তে জিজ্ঞেস করা হয়, আপনি সারাজীবন কী করেছেন ? হয়তো উত্তর হবে- ভালো উপার্জনের জন্য বেশি লেখাপড়া করেছেন, ভালো চাকরি-ব্যবসা করেছেন, টাকা কামিয়েছেন, সেই টাকা খেয়েছেন, হজম করেছেন, বিয়ে করেছেন, বউ-বাচ্চার জন্যে টাকা খরচ করেছেন । এইতো জীবন !

এই ধরণের মানুষের কথা চিন্তা করি আর সেই অবোধ কিশোরের মত আমিও নিজেকে প্রশ্ন করি- একজন মানুষের খাওয়ার জন্য কতটুকু খাবার প্রয়োজন ? একজন মানুষের থাকার জন্য কতটুকু জায়গা প্রয়োজন ? একজন মানুষের শরীর ঢাকার জন্য কতগুলো কাপড় প্রয়োজন ?

মন চায় টাকার পেছনে অন্ধের মত ছুটে চলা মানুষদের ধরে ধরে নকুলের গান শোনাই ।

কষ্ট করে দিনে রাইতে
কত টাকা করছো কামাই
অত টাকা কেমনে নিবা
কাফনের তো পকেট নাই...
বাড়ি গাড়ি আহামরি সোনাদানা ভরিভরি
টিভি ফ্রিজ চেন ঘড়ি
নেতাগিরি বাহাদুরি উমিদারি জমিদারি পড়ে রইবো
কিচ্ছা খতম হইবো...
কিচ্ছা খত...ম হই...বো ।


খোদার কাছে এই ফরিয়াদ, প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকার পেছনে যেন কখনো না ছুটি । সামান্য রিযিকের ব্যবস্থা হলে বাকি সময়টা যেন কাজ করতে পারি মানুষের কল্যাণে । মানুষকে যেন ডাকতে পারি হকের পথে। কখনো যেন না হই টাকার মেশিন ।

আদম সন্তানের যদি দুটি উপত্যকাপূর্ণ ধনসম্পদ থাকে তবুও সে তৃতীয়টার আকাঙ্ক্ষা করবে। আর মাটি ছাড়া লোভী আদম সন্তানের পেট ভরবে না। অবশ্য যে ব্যক্তি তওবা করবে, আল্লাহ তা'আলা তার তওবা কবুল করবেন। (আল হাদীস)

বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

স্বপ্নের মত মনে পড়ে

একহাতে রঙের কৌটা, পকেটে ব্রাশ, রঙতুলি  
মুষ্টিবদ্ধ আরেকটি হাত  
বুকের ভেতর টগবগে রক্ত, 'আল্লাহু আকবার' বলে  
হৃদপিন্ড হতে বেরিয়ে আসে মিনিটে সত্তরবার ।
তারপর  
অদ্ভুত উত্তাপ ছড়িয়ে দেয় সমগ্র শরীরে । 
নিঃশব্দ পায়ে হেঁটে চলে তিনজন মানুষের কাফেলা  
চোখে মুখে মিশে আছে এক- মহান বিপ্লবের নেশা-  
নিপীড়িত মানুষের মুক্তির প্রয়োজনে ।    
.
স্বপ্নের মত মনে পড়ে  
মধ্যরাতের আলো আঁধারিতে  
দেয়াল পেরিয়ে দেয়ালে দেয়ালে  
রক্তের অক্ষরে লিখে আসা দৃপ্ত শ্লোগান । শাসকের  
অন্যায় জুলুম আর শোষণের বিপরীতে 
একজন প্রতিবাদী কিশোরের লিখে আসা সেইসব  
নির্বাক প্রতিবাদলিপি     
.
আজো 
স্বপ্নের মত মনে পড়ে ।  

আপনি মুহসিন ভাই ?

বহুদিন থেকে দেশের রাজনীতি নিয়ে তেমন একটা মন্তব্য করিনা । মনে হয়, এইদেশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলা মানে সময়ের নিদারুণ অপচয় । কিন্তু এখন ক্ষান্ত দিলেও একসময় তো ফেসবুকেই অনেক গুরুগম্ভীর লেখা লিখেছি । বিভিন্ন থিওরি বা মতবাদের পক্ষে বিপক্ষে তাত্ত্বিক আলোচনা সমালোচনা করেছি । সমসাময়িক রাজনীতির ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ লিখেছি । সেকারণে অপরিচিত অনেকেই সম্ভবত আমাকে একজন মোটাসোটা বয়স্ক মানুষ , নিদেনপক্ষে একজন পরিপূর্ণ দাঁড়িগোঁফওয়ালা যুবক মনে করে রাখেন ! ইদানিং সেটা হাঁড়ে হাঁড়ে টের পাচ্ছি । নিভৃতে থাকতে চাইলেও কারো না কারো সাথে তো দেখা হয়ই । বিভিন্ন উপলক্ষে পথেঘাটে অনেকের সাথে দেখা হচ্ছে যারা ফেসবুকে শুধু একটা নাম হিসেবে ছিলেন । কোনদিন না দেখেও কেউ আমাকে ভালোবাসে জেনে আসলেই অনেক ভালো লাগে । হঠাৎ যখন কারো সাথে পরিচয় হয়, আমার এই ফাস্টিয়ার(First Year) মার্কা চেহারা দেখে- 'আপনি মুহসিন ভাই?' বলে কেমন একটা হতাশ চেহারা নিয়ে তাকায় । ভাইদের চোখে হতাশা দেখে আমিও হতাশ হই । মনে হয়, আহা ! মানুষের আশাভঙ্গ করাটা কতবড় পাপ কে জানে ! ক্যান যে একটা মোটাসোটা বয়স্ক মানুষ হইলাম না !

শুক্রবার, ৭ মার্চ, ২০১৪

Near Death Experience

Near death experience একটা সত্যিকারের অসাধারণ ব্যাপার । ১০-১৫ জন মানুষ আপনাকে ছুরি চাপাতি রামদা দিয়ে কোপাচ্ছে , আর আপনি কোন ব্যাথাই পাচ্ছেন না ! আপনার অন্যরকম অব্যাখাত এক ধরণের শান্তি লাগছে । অন্যরা ভাবছে আপনি মরে গেছেন, আপনি নিজেও অবচেতন ভাবে জানেন (?) আপনি মারা গেছেন , ব্যাপারটা অদ্ভুত না ? আল্লাহর ইচ্ছায় সেই অভিজ্ঞতাটা আমার হয়েছিল । পৃথিবীতে খুব বেশি মানুষের Near Death Experience হয়নি । সেজন্যেই মাঝে মাঝে ভাবি- এই ক্ষুদ্র জীবনে অভিজ্ঞতা কম তো হলো না !

নিজের মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখার সেই অভিজ্ঞতা আমাকে সবসময় সাহস জোগায় । আমাকে দুঃখ কষ্ট সহ্য করতে শেখায় । মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে আসার সেই অভিজ্ঞতা আমাকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়- ‘তোমার হায়াত হয়তো অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে । এখন যে সময়টা কাটাচ্ছ এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে দেয়া অতিরিক্ত সময়’ ।

হাঁটতে কষ্ট হলে – থেমে নিজেকে বলি- এই পা তো পঙ্গু হবার কথা ছিল । পা-টা যে আজও আছে সেটাই তো আল্লাহর অশেষ রহমত । হাতে ব্যথা পেলে , কনুইয়ের কাটা দাগে হাত বুলাই । বলি- আরে এই হাত তো এখানে থাকারই কথা ছিলনা । This was not supposed to be still here. বিলের পানিতে ডুবে পচে যাওয়ার কথা ছিল । আরো সুন্দর করে কথা বলা দরকার ? চোয়ালে হাত রাখি । এ চোয়াল যে এখনো আছে সেটাই তো আশ্চর্য ব্যাপার । কোন বিষয় নিয়ে মাথা গরম ? ঝাঁকড়া চুলে ঢাকা মাথার দাগগুলোয় হাত দিয়ে দেখি । এই মাথাটাই তো আজ এখানে থাকার কথা ছিলনা । কবেই পঁচে যেত মাটির নিচে !

কেন আল্লাহ্‌ আমাকে অতিরিক্ত সময় দিলেন ? আমাকে দিয়ে আল্লাহ্‌ তায়ালা কী কাজ করাতে চান ? হায়াতের অতিরিক্ত সময়টা আমি কীভাবে কাটাচ্ছি ? মাঝে মাঝে এইসব প্রশ্ন করি নিজেকে । উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করি ।
ভাগ্য আমাকে কোন নির্দিষ্ট দিকেই নিয়ে যাচ্ছে, তাই বুঝি জীবনের এত বাঁক পরিবর্তন ? কোন সে কাজ যা আমাকে করতে হবে ? ভাগ্য আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ?

https://www.facebook.com/muhsin.abdullahmu/posts/10201015688548304?comment_id=5067278

বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

কবিতা পড়ার প্রহর

মানুষের ভাষা যখন সমৃদ্ধ হতে শুরু করলো, তখন মানুষ তার মনের ভাব আরো সুন্দরভাবে প্রকাশ করতে চাইলো । সে থেকেই কবিতার উৎপত্তি । ঠিক কবে , কোথায় কবিতার শুরু সেটা বলা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয় । কারণ, কবিতা শুরুর দিকে নিশ্চিতভাবেই লিখিত ছিলনা । ছিল মুখে মুখে রচিত, কানে কানে শ্রুত এবং এভাবেই সেগুলো হয়তো কবির মৃত্যুর সাথে সাথে হারিয়ে গেছে । লিখিত আকারে কবিতা প্রথম কবে কোথায় লেখা হয়েছিল তাও বলা সম্ভব নয় । হয়তো প্রথম কবিতাটি লেখা হয়েছিল আঙ্গুল দিয়ে, ধুলোর ওপর । দখিনা হাওয়ায় নাকি পুবালী  মিলিয়ে গেছে সে কবিতা , তাও বলবার জো নেই ।
যেকোন ভাষাতেই সাহিত্যের শুরু হয়েছে কাব্য দিয়ে । বাংলা ভাষায় যেমনটা ‘চর্যাপদ’কে মনে করা হয় । এরপর সাহিত্যের অন্যান্য দিক- অর্থাৎ গদ্যরুপ বিকশিত হয়েছে । লেখা হয়েছে গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমনকাহিনী, জীবনী ইত্যাদি ।

আজকাল নাকি কেউ কবিতা পড়েনা । শুধু গান শোনে- ‘কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে রাতের নির্জনে’ । কিন্তু আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি – মানুষ আগামীতে উপন্যাস-গল্পের দিকে না তাকিয়ে কবিতার দিকে ঝুঁকে পড়বে । কবিতার সাথে গল্প-উপন্যাসের মূল যে পার্থক্যটা সেটা হলো , কবিতায় অনেক অনেক গভীর ভাব, তত্বকথা, জীবনবোধ ফুটিয়ে তোলা হয় অল্প কিছু শব্দে । পাঠকের ভেতর জাগিয়ে তোলা হয় ‘অনুভূতি’টাকে । মানুষের একটা অনন্য অসাধারণ ব্যাপার আছে যাকে মানুষ নাম দিয়েছে ‘অনুভূতি’ । অন্য প্রাণীদেরও হয়তো অনুভূতি আছে , কিন্তু মানুষেরটা সত্যিই অন্যরকম অনন্য । এই অনুভূতিকে আরো অনবদ্য করে তোলে কবিতা । আর পরিবেশটাকে পাঠক কল্পনায় সাজিয়ে নিতে পারেন নিজের মত করে ।
গল্প-উপন্যাসে অনেক অনেক শব্দের মাধ্যমে বোঝানো হয় ছোট্ট একটি মর্মার্থকে । পাঠককে খাইয়ে দেয়া হয় । গল্প-উপন্যাস পড়তে পাঠকের নিজেকে কোন চিন্তাভাবনার দরকার হয়না , গল্পের সাথে , বর্ণনার স্রোতে গা ভাসিয়ে দিলেই চলে যায় সময়, ভাটির টানে ।
মানুষ দিনদিন খুব বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ছে । ফলে যেটা হবার সম্ভাবনা আমি দেখছি- মানুষ বিশাল উপন্যাস-গল্প পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে । তারা চাইবে অল্প কথায় কীভাবে পাওয়া যায় সাহিত্যের আনন্দ, আন্তরিক সুখ । আর সেটা সবচেয়ে বেশি সম্ভব কবিতার মাধ্যমে ।
কবিতা পড়ার আগে একজনকে মানসিকভাবে তৈরি হতে হয়- এখন আমি একটি কবিতা পড়বো । কিন্তু গল্পের আগে সেটা করার প্রয়োজন নেই । কবিতার পাঠককে থাকতে হয় –সচেতন । কবি কোন শব্দটি ব্যবহার করছেন, কোন উপমাটি টেনে আনছেন , নিজের জীবনের সাথে এর কী মিল বা অমিল আছে । একটা নিরস কবিতার পুরোটা হঠাৎ করেই অসাধারণ অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে সামান্য ক’টি শব্দে । সাধারণ কিছু কথা হঠাৎ করেই অসাধারণ হয়ে ওঠে দু-একটি শব্দের কারণে ।

কবিরা কবিতা কেন লিখেন ? কবিতা কি ইচ্ছে করলেই লেখা যায় ? আমার ধারণা, কবিদের মাথায় আগে কবিতা আসে, তারপর তারা সেটা লিখেন । খাতা কলম নিয়ে বসে কবিতা হয়না । জানিনা , আমার ধারণা কতটুকু ঠিক । আমি তো কবি নই ।
মাঝে মাঝে আমিও যে কিছু লিখিনা তা নয় । কিন্তু সেগুলোকে আমি কবিতা বলিনা । আমি লিখি আমার ‘মনের কথা’ । কেউ যদি আমাকে কবি বলেন , আমি প্রত্যুত্তরে বলি –‘ওহে ভ্রাতঃ, নহি আমি কবি । যাহা আসে মনে , তাই শুধু লিখে যাই’ । এবং যতদূর সম্ভব সরল ভাষায় । ভাষাকে সহজ করতে হবে , সরল করতে হবে । যেন একজন মানুষ- যিনি শুধু বানান করে করে পড়তে পারেন , তিনিও যেন বুঝতে পারেন কী বলা হচ্ছে ।
গল্পের প্লট মাথায় আসে । কিন্তু গল্প-উপন্যাস লেখাটা আসলে অনেক সময় সাপেক্ষ ব্যাপার । এত সময় কই ?
কেউ পড়ছে কিনা সেটাও খুব একটা ভাবার বিষয় নয় । কোন লেখকই সেটা খুব বেশি ভাবেন বলে আমার মনে হয় না । আমার মনের কথা, আমার উপলব্ধি, আমার অনুভূতি আমি লিখে গেলাম । কেউ পড়লেই কি , আর না পড়লেই কী ? তবে হ্যা , যদি কোনদিন বিয়ে করি , যদি কেউ আসে আমার উত্তরাধিকার– আমি তাদের বলবো- পড় । এই তোমার পিতার চিন্তাধারা । পড়, এই তোমার পিতামহের চিন্তাধারা । সেসময় আমরা এভাবেই ভাবতাম !  ভাষা নয়, শব্দের গাঁথুনি নয়- বোঝার চেষ্টা করো, আমি কী বলতে চেয়েছিলাম ।

বুধবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

সেইযে আমার লাল টুকটুক শিমুলরঙ্গা দিনগুলি...

ফাল্গুন মানে আমার চোখে লাল লাল শিমুলের ফুল । আর ভোরবেলা কোকিলের কুহু ডাক । উত্তরবঙ্গে ফাগুন মাসেও শীতের আমেজ থেকে যায় । ফযরের নামাজ শেষে কেডস পায়ে আমরা ছোটরা দৌড়াদৌড়ি করতাম । বাড়ির পেছনেই প্রকান্ড শিমুল গাছ । আঙ্গিনায় দাঁড়ালেই চোখে আসে সুর্যের আলোয় চকচক করছে লাল টুকটুকে অগুণতি শিমুল ফুল । গাছতলায় ঝরে পড়া শিমুল ফুল কুড়িয়ে মালা গাঁথার প্রতিযোগিতা হত আমাদের ভেতর । কার মালা কত বড় হয় ! দিনশেষে সে মালা হয়তো গরুর খাদ্য হত অথবা গরুর গলায় ঝুলতো ! তবু পরদিন আবারো মহা উৎসাহে ফুল কুড়িয়ে মালা গাঁথার অকারণ প্রতিযোগিতায় নামতাম আমরা ।

ফেব্রুয়ারির শুরু । গ্রামের স্কুলে তখনো পুরোপুরি ক্লাস শুরু হয়না । পড়ার চাপও নেই বললেই চলে । বাঁশের কঞ্চির একাংশ সূঁচালো করে সেখানে বিঁধে নিতাম শিমুল ফল । আমরা বলতাম মোচা । তারপর চলতো মোচা নিক্ষেপের প্রতিযোগিতা । কারটা কত দূরে গিয়ে পড়ে ! মার্বেল আর ডাংগুলি খেলার বাইরে এ ছিল এক মজার খেলা ।

ছোটবেলার বসন্ত মানেই তাই আমার কাছে শিমুল ফুলের মালা । গাছের ডালে  দোয়েল-শালিকের ওড়াউড়ি । মধ্য দুপুরে ঘুঘুর অন্তরভেদী ডাক ।

চৈত্র মাসে তৈরি হয় আরেক অসাধারণ দৃশ্যের । শিমুলের মোচা ফেটে সাদা সাদা তুলা উড়ে বেড়ায় আকাশে । আমাদের বাড়ির আকাশে সবসময় ঘুরে বেড়াত তুলোর মেঘ !
মাঝে মাঝে আমরা ছোটরা বাতাসে ভেসে বেড়ানো তুলা ধরবার চেষ্টা করতাম । ধরতে ধরতে ছোট হাতের ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে যেত তুলোর টুকরা । হাতে নিলে  সদ্য ডিম ফোটা মুরগীর বাচ্চার মত লাগতো সাদা পেজা তুলো !



এরই মাঝে কখন যেন আম গাছে মুকুল আসা শুরু হয় । আমের মুকুলের গন্ধে এক অন্যরকম মাদকতা । বাড়ির চারপাশ ঘিরে আমের গাছ , চোখে আমের মুকুলের নয়নাভিরাম দৃশ্য , নাকে আমের সুগন্ধ ! কী যে ভালো লাগতো !

বাড়ির সামনে খোলা জায়গা । ওখানে এক বিঘা জমিতে সরিষার ক্ষেত । দিগন্তজোড়া না হলেও সে দৃশ্যটাও ছিল অসাধারণ ।

মেডিকেল কলেজে আমার হোস্টেলে , ঠিক আমার রুমের পেছনেই কৃষ্ণচূড়ার গাছ ছিল । আমার জানালায় কৃষ্ণচূড়ার ফুল জানিয়ে দিত ফাগুনের আগমন বার্তা । বিকাল হলে গল্পের বই হাতে ছাদের ওপর কৃষ্ণচূড়ার ফুলের মাঝে বসে কত বই পড়েছি !

নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হয় । কৃত্রিম উচ্ছ্বাসে নয় - সত্যিকারের ফাল্গুন, সত্যিকারের বসন্ত পেরিয়ে এসেছি জীবনে ।

দিন গেছে । হয়ে গেছি যান্ত্রিক । আজও এসেছে ফাগুন । এসেছে বসন্ত । আজ আমার কৃষ্ণচূড়াও নেই , শিমুল ফুলের মালাও নেই । স্মৃতির মাঝে শুধু আছে- সেইযে আমার লাল টুকটুক শিমুলরঙ্গা দিনগুলি...

শনিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

শাট ইওর মাউথ !

আমরা অনেকসময়েই অন্য কারো সম্পর্কে হুট করে মন্তব্য করে বসি । এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই- বিরুপ মন্তব্য করার দিকেই আমাদের ঝোঁক বেশি ।
কোন মানুষের ব্যাপারে মন্তব্য করতে গেলে তার সম্পর্কে জানতে হয় । কিন্তু একজন মানুষ সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানতে পারি ? বন্ধু বান্ধব কিংবা পরিচিতজনের সম্পর্কেই বা কতটুকু জানি আমরা ?
এমনকি বাবা মাও তার সন্তানের ব্যাপারে পুরোটা জানেন না । বড় হতে হতে প্রত্যেক মানুষের একটা নিজস্ব জগত তৈরি হয় , নিজস্ব চিন্তাধারা গড়ে ওঠে যেটা বাবা – মাও যার পুরোটা বুঝতে পারেন না ।
কোন একজনের ক্ষেত্রে কোনটা সঠিক আর কোনটা বেঠিক বলা মুশকিল । আমার অবস্থান থেকে যেটা ভুল , তার অবস্থান থেকে হয়তো আর কোন বিকল্প নেই !

কোনটা ভুল আর কোনটা ঠিক , আসলে পুরোটাই আপেক্ষিক । যার যার ভুল শুদ্ধের হিসাব তার তার কাছে , আরেকজনকে বিচার করার দায়িত্বটা আমাকে কে দিয়েছে ?

মুখ বন্ধ রাখার অভ্যাসটা বেশ ভালোই আয়ত্ব করেছি । (একসময় কথা বলে বলে সবাইকে বিরক্ত করে ফেলতাম, দমিয়ে না রাখলে এখনো কম বকোয়াজ নই ।) কিন্তু এখন হয়তো দিনের পর দিন কোন কথা না বলেই কাটিয়ে দিতে পারবো । তবু যা বলি , পরে মনে হয় - এটা না বললেও তো চলতো !
মুখের কথা নিক্ষিপ্ত তীরের মত । যা একবার ছুটে যায়, তা আর ফেরানো যায়না । তাই মাঝে মাঝে নিজেকেই বলি -শাট ইওর মাউথ !

সোমবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

ঝগড়া করবো বলে ...

ছোটবেলা থেকেই আমি একটু ‘প্রতিবাদী’ । কারো কোন কথা পছন্দ না হলে অথবা আমার বিরুদ্ধে গেলে প্রতিবাদ করতাম । ছোটবেলার প্রতিবাদগুলো ঠিক প্রতিবাদ ছিলনা । সেগুলো হয়ে উঠত ‘ঝগড়া’ । জীবনে সবচেয়ে বেশি ঝগড়া করেছি আমার দুবছরের বড় ভাই এর সাথে ।

বড় ভাইয়ের সাথে ঝগড়াগুলো বেশিরভাগ সময়েই শেষ হয়েছে হাতাহাতিতে । রাতদুপুরে অন্ধকারে ঘুষাঘুষি কম হয়নি । একসময় বড় ভাইয়ের সাথে কথা বলা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেলো । সে এক কঠিন জেদ । অভিমান । অনেকদিন চলেছিল কথা বন্ধ অবস্থা । একসময় হাদীসে পড়লাম নিকটাত্মীয়দের সাথে তিনদিনের বেশি কথা না বলে থাকার ব্যাপারে কঠোর হুশিয়ারি । তারপর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করে ফেললাম । খুব কষ্ট হয়েছে জেদ ভেঙ্গে নতুন করে কথা শুরু করতে ।  স্বাভাবিক হতে সময়ও লেগেছে দীর্ঘদিন ।

এসএসসি পাস করে বাড়ি ছাড়লাম । তারপর থেকে ‘ঝগড়া’ বলতে যা বোঝায় তা আর হয়নি । অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছি  । কিন্তু সেগুলো আসলে ছিল সত্যিকারের ‘প্রতিবাদ’ , ‘ঝগড়া’ নয় ।

আজ মেজাজ খারাপ ছিল । অনেকদিন পর দুই বন্ধু দেখা করতে এসেছে, অকারণে তাঁদের ওপর ঝাড়লাম । কিন্তু ঝগড়া হলো না । ঝগড়া করার বয়স নাই ।

মাঝে মাঝে মনে হয় ‘ঝগড়া’ করাটা সবসময় খারাপ না ! ইচ্ছা হয় কারো সাথে ‘ঝগড়া’ করি  !  ঝগড়াটা হবে খুব তুচ্ছ একটা ব্যাপার নিয়ে । ঝগড়ায় খুব চেঁচামেচি হবে ! মারামারি হবে !   কেউ কাউকে ছাড় দেবো না । ঝগড়াটা শেষ হবে অমীমাংসিত অবস্থায় । আর 'ঝগড়া' শেষ করার পর হঠাৎ চোখে পানি চলে আসবে । খুব অনুতপ্ত হবো । বারবার শুধু মনে হবে ‘ইস ! সামান্য একটা ব্যাপার নিয়ে কেন এত বাড়াবাড়ি করতে গেলাম ?’ 

বুধবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৩

জন্মদিনের ছড়া

শত শত উইশ এসেছে
ইনবক্স আর ওয়ালে
উইশ করেছে রুই কাতলা
এবং রাঘব বোয়ালে !

বলবো কি আর দুঃখের কথা
যাচ্ছে বয়স বেড়ে
আজরাইলও হচ্ছে রেডি
আসবে কখন তেড়ে !

তোমরা তবু বলছো সবাই
‘শুভ জন্মদিন’
কেমনে বলো শুধবো এত
ভালোবাসার ঋণ ?

রবিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

ভালোবাসার চাষাবাদ


বহুদিনের সুসম্পর্ক, বন্ধুতা , ভালোবাসার বন্ধনগুলি কেন হঠাৎ ভেঙ্গে যায় ? হয়ে পড়ে শিথিল , হয়ে যায় তিক্ত !

আমরা একজন মানুষকে তাঁর কোন একটা কাজ দিয়ে সমগ্রটা বিচার করতে চাই । মানুষের জীবন একটা কাজের জন্য নয় । অসংখ্য ছোট বড় কাজের সমষ্টি হলো জীবন । একজন বন্ধু অথবা একজন ভাই একটা কাজ ভুল করলেন, অথবা একটা দরকারি কাজ করলেন না , তার মানে কি তার সমগ্র জীবন ব্যর্থ হয়ে গেল ? তিনি জীবনে কত ভালো কাজ করেছেন – হঠাৎ করেই যেন আমরা সবকিছু ভুলে যাই । দূরে ঠেলে দেই । ভেঙ্গে ফেলি সম্পর্ক ।  

আমি কাউকে তাঁর একটা কাজ দিয়ে তাঁর সমগ্র জীবনকে বিচার করিনা । মূল্যায়ন করিনা । একজন ভাই একটি ভুল কাজ করলেন, আমি তাঁর ঐ কাজটির সমালোচনা করি । সংশোধনী দেই । তবে একই সাথে তাঁর কৃত আগের ভালো কাজগুলির জন্য আমার ভালোবাসা, শ্রদ্ধা বজায় থাকে । কেউ যদি ক্রমাগত ভুল কিংবা খারাপ কাজ করতেই থাকে তাহলে ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধাও ধীরে ধীরে কমতে থাকে , একদিনে নয় । কিন্তু যদি ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়, কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করে থাকলে তাঁর কাছে মাফ চায়- ক্ষতিপুরণ দেবার চেষ্টা করে তাহলে ভালোবাসা থেকে যায় আগের মতই ।

মানুষ সবাই নিজের ভালো চায় , কষ্ট থেকে মুক্তি চায় । নানান রকম বিরুপ পরিস্থিতিতে পড়ে মানুষ ভুল করে বসে । কখনো কখনো নীতিচ্যুত হয় । দিনের পর দিন অনাহারে থাকলে দরবেশও চুরি করতে পারে । হযরত ওমর রাঃ এর শাসনামলে একবার দুর্ভিক্ষ হলে তিনি চোরের হাতকাটার শাস্তি স্থগিত করেছিলেন । তেমনিভাবে কোন ভাই, বন্ধু যদি ভুল করে বসেন কিংবা নীতিচ্যুত কাজ করেন – প্রথমে দেখতে হবে তিনি কোন পরিস্থিতিতে পড়ে , কী অবস্থায় ভুল করে ফেলেছিলেন । নিজেকে একবার তাঁর অবস্থায় রেখে চিন্তা করতে হবে – ঐ অবস্থায় থাকলে আমি কী করতাম ? তাহলে হঠাৎ করেই ভালোবাসাটা শুন্যের কোঠায় গিয়ে ঠেকবে না ।

দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা নেতৃত্বের একটি ভুল একটি সংগঠনের জন্য , একটি সমাজের জন্য অনেক বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে । সেজন্য দায়িত্বশীলের ভুলকে চেপে যাওয়া নয়, আনতে হয় কঠোর জবাবদিহীতা, কঠোর সমালোচনার আওতায় । যেখানে নেতার চেয়ে কর্মীর জবাবদিহীতা বেশি হয়ে যায়- সেখানে ধ্বংস এগিয়ে আসতে থাকে হামাগুড়ি দিয়ে ।

নেতার ভুলকে কীভাবে বিচার করবো ? যদি সেটা হয়ে থাকে বিশ্বাসঘাতকতামূলক কিংবা কর্মীবাহিনী-জনগনের সাথে প্রতারণামূলক, তাহলে ক্ষমা নয়- কঠোর সমালোচনা ও শাস্তির আওতায় আনতে হবে । কিন্তু যদি হয় নিছক ‘অক্ষমতা’ , তাহলে নীরবে মেনে নিতে হবে ।

এটিও স্মরণ রাখা দরকার যে, একটি ভুলই একজন নেতাকে নিঃশেষ করে দেয় না । স্বতস্ফূর্ত নেতৃত্বের গুণাবলী থাকলে ভুল শুধরে এসে আবারো নেতৃত্বের সুযোগ থাকতে হবে ।

সমস্যাটা দাঁড়ায় উল্টোদিক থেকে । আমি যখন আমার একজন প্রিয় ভাইয়ের, বন্ধুর, দায়িত্বশীল নেতার সমালোচনা করি – কখনো কখনো তা করি বেশ নির্দয়ভাবেই । আমি জানি যে আমি শুধু তাঁর নির্দিষ্ট একটি কাজের সমালোচনা করছি – কিন্তু তাঁর করে আসা আরো অনেক ভালো কাজ আছে সেগুলোর দাম, সেগুলোর পরিমাণ এই একটি ভুলের চেয়েও অনেক বেশি । আমি জানি  আমার এই নির্দয় সমালোচনার শেষেও আমি তাঁকে ভালোবাসি, ভাই এবং বন্ধু ভাবি ।

কিন্তু উল্টোপাশে কী হয় ? যে ভাইয়ের সমালোচনা করলাম , ভুল ধরলাম তিনি মনে করে বসেন - বোধহয় তাঁর প্রতি আমার আর ভালোবাসা নেই । দেখা যায় , আমি আছি- কিন্তু তিনি সরে গেছেন দূরে । সম্পর্ক হয়ে গেছে ফিকে ।

যাহোক , দিনশেষে আমি আমার সান্তনাটুকু অনুভব করি । আমি তো ভুল বুঝিনি , কেউ যদি ভুল বুঝে থাকে একদিন হয়তো তারা বুঝবে । কিংবা বুঝবে না । কিন্তু আমি এভাবেই করে যাব সম্পর্কের আবাদ । ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার চাষ ।

........................

সোমবার, ১০ জুন, ২০১৩

সৌভাগ্যবান আমি

অতীতের দিকে তাকালে আমার নিজেকে একজন সৌভাগ্যবান বলেই মনে হয় । এই ক্ষুদ্র জীবনে অনেক কিছুই দেখা হয়ে গেলো । অভিজ্ঞতার ঝুলি যথেষ্ট ভারী হলো । প্রাইমারী স্কুল পড়েছি গ্রামে । দেড় কিলোমিটার দূরে স্কুল । রাস্তার পাশে নদী । স্কুলের বিশাল মাঠ । মাঠের একপাশে জঙ্গল । একপাশে নদী । একপাশে ঈদগাহ মাঠ । সাথেই লাগোয়া আলিয়া মাদ্রাসা, হাফেজিয়া মাদ্রাসা । শৈশবে যেমন প্রয়োজন, ঠিক তেমনি একটি স্কুল । চিরায়ত গ্রামের স্কুল । স্যার, ম্যাডামদের আদর পেয়েছি সবচেয়ে বেশি । আম গাছের নিচে সবুজ ঘাসের ওপর বসে আম পাতা জোড়া জোড়া পড়েছি । স্যার ঘুমিয়ে গেছেন চেয়ারে । সেই দৃশ্যটাকে যেন স্বর্গীয়, নৈসর্গিক, অপার্থিব যেকোন বিশেষণে বিশেষিত করা যায় ।
হাইস্কুল ছিল মফস্বল থানা শহরে । বাড়ি থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে । সাইকেলে সকালে স্কুলে যেতাম , সন্ধ্যায় ফিরতাম । সকাল সন্ধ্যা স্বাধীনতা । শত বছরের পুরনো স্কুল । স্কুলের সবুজ মাঠ । শতবর্ষী তেতুল গাছের নিচে বাধানো । তেঁতুল তলায় পন্ডিত স্যারের ব্যাকরণ ক্লাসটা এখনো যেন চোখে ভাসছে ।

কলেজ পড়লাম প্রায়-বিভাগীয় শহরে । বিশ্ববিদ্যালয় পড়লাম বিভাগীয় শহরে , বানিজ্যিক রাজধানীতে । সবগুলো স্টেজে সর্বোচ্চ ভালো ফলাফলই পেলাম । এরপর যাব মেগাসিটি রাজধানীতে । তারপর হয়তো বিদেশ । বয়সের সাথে সাথে এগিয়ে চলেছে জীবন । ঠিক যেন –যখন যেমন প্রয়োজন ।

বাবা মধ্যবিত্ত স্কুল-শিক্ষক । আমার মনে হয়- জীবনকে চেনার জন্য , জীবনের সুখ-দুঃখ গুলো কাছে থেকে উপলব্ধি করার জন্য এরকম মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ অনিবার্য প্রয়োজন । একটু অভাব , একটু স্বচ্ছলতা । কখনো না চাইতেই পাওয়া, কখনো কান্নাকাটি করেও না পাওয়া । এভাবেই অনুভূতিগুলো যেন একটা শক্ত কাঠামোর ওপর দিয়ে গড়ে উঠেছে ।

জাহেলিয়াতের খপ্পরে পড়ার আগেই পেয়েছি জান্নাতি সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের দেখা । সংগঠনের সকল স্তরে – সব ধরণের শাখায় কাজ করার সুযোগ হল । মহানগর/সদস্য শাখা, শহর শাখা , জেলা শাখা, থানা শাখা, সাথী শাখা, সাংগঠনিক থানা শাখা , উপশাখা, আবাসিক ওয়ার্ড, স্কুল, কলেজ, সংস্কৃতি বিভাগ......আলহামদুলিল্লাহ্‌ । শত শত ছাত্রকে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার সুযোগ পেলাম । সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে এসএসসির পরের সময়টুকুর কথা । আমার থানা থেকে আমি প্রথম এ প্লাস পেয়েছিলাম । থানার স্কুলে স্কুলে দাওয়াতী টিম নিয়ে ঘুরে ঘুরে দাওয়াতী কাজ করাটা সত্যিই এক অসাধারণ স্বর্গীয় অনুভূতি । আমি কথা বলতাম , সবাই চুপচাপ শুনতো । প্রশ্ন করতো , উত্তর দিতাম । সে একটা নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তখন ।

ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি করতে হলো ছাত্রদল, ছাত্রলীগ, ছাত্রইউনিয়ন সবার সাথে । বেস্ট থেকে অর্স্ট সব পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে । অনেক সম্মান, অনেক নির্যাতন । জেনেছি সবার রুপ, কর্মপদ্ধতি, ইসলাম ও জাহেলিয়াতের পার্থক্য । আলহামদুলিল্লাহ্‌ ।
ছোটবেলায় কিশোর কন্ঠ , ইয়ুথ ওয়েভ এর এজেন্ট ছিলাম । লেখা পাঠাতাম , ছাপাত । নির্মল আনন্দ পেতাম । নিজেকে অনেক বড় কিছু মনে হত । বড় হয়ে বছর দুয়েক জাতীয় পত্রিকায় সাংবাদিকতাও করেছি ।

এখন বয়স ২৪ । 

আলহামদুলিল্লাহ্‌ । এই সময়টুকুর কথা যখন চিন্তা করি, মনে হয় অনেক অনেক বেশি দিয়েছেন মহান রাব্বুল আলামীন । সব ধরণের মানুষের সাথে মিশতে পেরেছি । অসংখ্য বই পড়ে আর নানান অভিজ্ঞতায় ইচড়ে পাকা হয়েছি ।

২৫ থেকে ৪০ আরেকটা পিরিয়ড । এই সময়টা নিজেকে গঠন করতে হবে । কাচামাল যোগাড় হয়েছে, এখন সেগুলোকে পোক্ত করতে হবে । ভুলত্রুটিগুলো খুঁজে বের করতে হবে । চিন্তাচেতনায় ঢালাই করতে হবে । পরিপক্ক করতে হবে মন-মানস । তারপর আল্লাহ বাচিয়ে রাখলে ৪০ থেকে ৬০ এই ২০ বছর এক কঠিন সংগ্রামে নেমে পড়তে হবে । মানুষের জন্য, সত্যের জন্য , আল্লাহর দ্বীনের জন্য । দেখা যাক আমার প্রভু সামনে আমার জন্য কী রেখেছেন । আল্লাহ তুমি তাওফিক দিও ভালো থাকার, ভালো কাজ করার । আমীন ।



10-06-2013

শনিবার, ৮ জুন, ২০১৩

অনলাইন ডাকাতের কবলে

২০০৮ সালে ছাত্র নামের ডাকাতরা আমার সবকিছু পুড়িয়ে দিলে আমার সবচেয়ে প্রিয় দশটি ফুলের মত সুন্দর ডায়েরি পোড়া গিয়েছিল । আমার ছোটবেলা থেকে লেখা কচি হাতের কাঁচা লেখাগুলি সেদিন ছাই হয়ে গিয়েছিল । ছড়া, কবিতা,ছোটগল্প । আর আত্মজীবনী ! ভেবেছিলাম, জীবনে আমি অনেক বড় হবো, তাই আমার আত্মজীবনীটা লিখে রাখা দরকার ! সেই ডায়েরিগুলো নষ্ট হওয়ায় খুব খারাপ লেগেছিল ।

আজ অনলাইন ডাকাতরা আমার ফেসবুকের ওয়াল থেকে অসংখ্য স্ট্যাটাস গায়েব করে দিয়েছে । ঠিক সেদিনের মত কষ্ট আজও পেলাম । ডায়েরিতে আর লেখা হয়নি । ২০০৯ সাল থেকে ব্যস্ত জীবনের অনুভূতি আর চিন্তাভাবনা গুলো লিখতাম স্ট্যাটাসে । আজ সেগুলো হারিয়ে গেল । সাম্প্রতিক কিছু স্ট্যাটাসের ব্যাকআপ আছে, কিন্তু পুরনো স্ট্যাটাসগুলোর ব্যাকআপ নেই । সেগুলো আর কোনদিন ফিরে পাওয়া যাবে না ।
পুরনো যেসব স্ট্যাটাস ব্যাকআপে রয়েছে মাঝে মাঝে সেগুলো রিআপলোড করবো । দয়া করে কেউ বিরক্ত হবেন না ।
আসুন এইসব অনলাইন ডাকাতদের প্রতি ধিক্কার জানাই ।




০৮-০৬-২০১৩ 

বৃহস্পতিবার, ১৬ মে, ২০১৩

আম কুড়ানোর দিনগুলি

কালবৈশাখীর ভয়ংকর রুপের কথা বইয়ে পড়েছি, বাস্তবেও দেখেছি । কিন্তু কেন যেন ঝড় উঠলেই আমার মনটাও নেচে উঠতো । একটা কারণ বলা যায় – আম কুড়ানো । ঝড়ের সময় সে এক প্রতিযোগিতা ছিল,  ভাইবোনদের সাথে পাল্লা দিয়ে আম কুড়ানো । একদিনে এক বস্তা আমও কুড়িয়েছি কোন কোন সময় । হাফপ্যান্টের দুই পকেটে আম নিয়ে খেয়েছি সারাদিন । নিজেদের গাছের আম, না কুড়ালেও চলে । কিন্তু শো শো বাতাস, মেঘের কড়কড় গর্জন, আর বিজলী চমকের মাঝে আম কুড়ানো - সে এক অপার্থিব আনন্দ !  

নয় বছর হলো বাড়ি ছেড়েছি । পুরনো বড় বড় আমের গাছগুলিও আর নেই । সেই বয়সও আর নেই । আমিও দিনদিন হয়ে উঠছি শহুরে একজন ।  তবু মনটা হাহাকার করে । এ জীবনে আর কখনো আম কুড়ানো হবেনা হয়তো । প্রচন্ড ঝড়ের সময় আম্মার সাথে বসে শতশত বার আয়াতুল কুরসী পড়া হবেনা হয়তো আর কোনদিন । জসীমউদ্দিনের সেই ছড়াটিও এখন পাঠ্য বইয়ে আছে কিনা জানিনা –

ঝড়ের দিনে মামার দেশে
আম কুড়াতে সুখ
পাকা জামের মধুর রসে
রঙ্গিন করি মুখ ।

গাছে উঠে নিজে হাতে পেড়ে আনা কিংবা কুড়ানো আমের রসে এখন আর মুখ রঙ্গিন করা হয়না । তাই মলিন মুখে হৃদয় নিংড়ে আসে -

দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায়
রইলো না , রইলো না
সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি ......

রবিবার, ১০ জুলাই, ২০১১

শম্বুকের জন্য উপদেশ (নিজেকে শামুক ভেবে )

হে শম্বুক -
তুমি এগিয়ে চলো তোমার দুর্বার গতিতে ।
তোমার চেয়ে দ্রুতগতিতে হয়তো অনেকেই চলে
তাতে তোমার কী ?
তোমার সাথে
তুলনা হবে শুধু তোমারই ।
জেনে রেখো ,
প্রত্যেকেই কারো না কারো পিছনেই থাকে ।
হে শম্বুক -
এগিয়ে চলো অবিরাম সময়ের সাথে
যেখানে গিয়ে সমাপ্ত হবে পথ
ভেবে নিও
সেটাই তোমার গন্তব্যের সীমানা ।
হে শম্বুক -
চলার পথের সকল ভাঙ্গা সেতু
যতোটা পারো চেষ্টা করো পেরোবার
ফিরে দ্যাখো পেছনে
ভয় নেই - অনেকেই আছে , থাকবেও ।
মন খারাপ করো না । সাধ্যের অতিরিক্ত
কিছুই করার
প্রয়োজন নেই তোমার ।



 রবিবার, জুলাই 10, 2011

মঙ্গলবার, ২৪ মে, ২০১১

কষ্ট ও জীবন

মাঝে মাঝে কষ্টগুলো বুকের ছোট্ট খালে আটকে থাকে না । উপচে পড়ে গলা পেরিয়ে চোখের কোণ দিয়ে । সিক্ত করে শুষ্ক মুখের কপোল জমিন । সুর্যের আলো পড়লে হয়তো চিকচিক করতো । শিশিরকণার মত । তা অবশ্য হয় না ।কারণ ,যখন খাল উপচে পড়ে তখন সুর্যের আলো কিংবা অন্য কোন চোখ সেখানে পৌঁছতে পারে না । ওরা সংগোপনেই মিশে যেতে চায় । উপচে পড়া কষ্টগুলি শুকিয়ে গেলে চোখটা টনটন করে ওঠে । ঘুম বেচারা আসতে সাহস করে না । ঘুম আসলে ভীতুর ডিম । যখন চোখ থাকে শান্ত ,তখন সে ঠিকমতই আসে । অশান্ত চোখের আঙিনায় তার দেখা মিলবে না । সময় গড়িয়ে যায় । এলোমেলো ভাবনার মাঝে স্তিমিত হয়ে জিরোয় ক্লান্ত কষ্টেরা । এই ফাঁকে জীবনের চাকায় টান পড়ে । গরুর গাড়ির মত নিশ্চিন্ত গতিতে হয়তো কিছুটা সামনে এগোয় । চোখের কোণ দিয়ে যেটুকু কষ্ট উপচে পড়েছিল , খালি হয়ে যাওয়া সেই অংশটুকু প্রতীক্ষা করে পুর্ণ হবার । হয়েও যায় একসময় । তখন আবার পুরনো চক্রে আটকে যায় জীবনের কাটা । এরপর ....
(আবার শুরু থেকে )



মঙ্গলবার, মে 24, 2011

নিশাচর ও আধখানা চাঁদ

মধ্যরাত । চার তলা হোস্টেলের বিস্তীর্ণ ছাদ । নিস্তব্ধ গাছের নিচে একা আমি । মৃদু হিমেল হাওয়ায় কাঁপছে গাছের পাতা । আকাশে ক্ষয়ে যাওয়া আধখানা চাঁদ । নিশ্চুপ । সাদাকালো মেঘের আনাগোনা বেড়েছে । অনেক নিচ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে মেঘগুলি । চাঁদের সাথে ওদের কানাকানি খুব গোপনে হচ্ছে যেন । পাশের পাহাড় থেকে শেয়ালের আর একপাল কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে । ওরা নিশাচর । চাঁদটাও নিশাচর । ওই মেঘগুলিও নিশাচর । আজ আমিও নিশাচর হতে দোষ কি ? বহুরাত হলো নিশাচর পেঁচার হুতুম ডাক কানে আসে না । আজও মনে হয় পেঁচার দেখা পাব না । ছেলেবেলার কচি হৃদয়ে পেচাও দাগ কেটে গিয়েছিলো । আর দোয়েল ,শালিক , ঘুঘু । ওরা নিশাচর নয় । আজ রাতে ওদের কথা খুব মনে পড়লেও উপায় নেই । ওদের দেখা পেতে হলে আমাকে বাড়ি যেতে হবে । বাঁশবাগানের পাশের কাঠাল গাছটার নিচে তপ্ত দুপুরে স্নিগ্ধ ছাঁয়ায় শুয়ে থাকতে হবে মাদুর পেতে । আগে যেমন থাকতাম । রাস্তা দিয়ে একটা গাড়ি তীব্র বেগে ছুটে গেলো । আমার খুব ইচ্ছে , রাতের শহরে অনেক বেশি স্পিডে বাইক চালাবো । কিন্তু উত্‍সাহে ভাটা পড়ে যেখানে সেখানে স্পিডব্রেকারের আধিক্য আর ছিনতাইকারীর ভয়ে । ছিনতাইকারি রাও নিশাচর । রাতের নিস্তব্ধতাকে ওরা করে তোলে ভীতিকর । ওদের চেয়ে ভুত অনেক ভালো । ভুতও নিশাচর । ভুত শুধু ভয় দেখায় ,
আর ছিনতাইকারিরা সবকিছু ছিনিয়ে নেয় । কখনোবা পেটে ছুরি মেরে দেয় । নিশাচর প্রেমিকরা আজ মনে হয় তাদের রাতের আলাপন শেষ করে ফেলেছে । সাধারনত রাতে সিড়ির গোড়ায় , ছাদের বিভিন্ন প্রান্তে এইসব বিদঘুটে নিশাচরের দেখা মেলে । লম্বা ইউক্যালিপ্টাস গাছটা দুলছে । গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ক্ষয়ে যাওয়া অর্ধেক চাঁদটা অতিপ্রাকৃতিক লাগছে । রাস্তায় একজন রিক্সাওয়ালা খালি রিক্সা নিয়ে দরাজ গলায় গান গাইতে গাইতে পুব দিকে যাচ্ছে । মানুষের জীবন বড়ই বিচিত্র । এখন রাত তিনটা বেজে পনেরো মিনিট । কেউ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমে নরম ফোমে গভীর ভাবে ঘুমাচ্ছে । আর ওই রিক্সাওয়ালা ভাই এখনও রাস্তায় । ক্ষয়ে যাওয়া অর্ধেক চাঁদটাকে একটা কালো মেঘ ঢেকে দিচ্ছে । জীবনের সাথে কী মিল ! আমাদের জীবনও ক্ষয়ে যাচ্ছে । কখন যে সমাপ্তির কালো মেঘ সবকিছু ঢেকে দেবে আল্লাহই জানেন !


 মঙ্গলবার, মে 24, 2011

বুধবার, ৯ মার্চ, ২০১১

দিনযাপন

ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখি অনেক কাজ ।ভাবি ,কিভাবে করবো এগুলো ।ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত হয়ে যাই ।চোখ মুদে আসে ধীরে ধীরে ।সময়ের স্রোত বয়ে যায় ,পাল্টে যায় মানুষ ।পাল্টে যায় পরিবেশ ,মন্চের পর্দা উঠে আসে নতুন দৃশ্য ।
আবার নতুন করে সাজাই সবকিছু ।দিন দিন বাড়ে কাজের বোঝা ।বাড়ে আমার ক্লান্তি ।ঘিরে ধরে হতাশা ।তবুও টানতে হয় জীবনের ঘানি ।তাই টেনে যাই -কখনো কচ্ছপের মত ,কখনো নির্বাক গাধার মত । সমাপ্তির নেশায় ।



বুধবার, মার্চ 9, 2011

শনিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০১১

গদ্য ও পদ্য

গদ্য লেখায় আমার একদম হাত নেই ।হয়তো শুরুটা করতে পারি ,কিন্তু কিছুদুর গিয়েই শেষ ।কি লিখব খুঁজে পাইনা ।মুখে যেমন আমি কম কথা বলি ,লেখার বেলায়ও সেই একই রকম ।কথার পিঠে কোলে ঘাড়ে কথার স্তুপ চাপিয়ে বিশাল গদ্য লেখাটা আমার ধাতেই নেই ।আমার অনেক লেখক এবং চাপাবিশিষ্ট বন্ধু একবাব বলতে বা লিখতে শুরু করলে আর রক্ষে নেই ।সে এক ভয়াবহ অবস্থা ।গদ্য বেচারা মনে হয় ক্লান্ত হয়ে যায় তাদের হাতে পড়ে। পড়েছি মোগলের হাতে জাতীয় অবস্থা আর কি ! অবশ্য মানুষ এখন গদ্যই ভালোবাসে ।কারন এতে সাধারন ও সংক্ষিপ্ত কথাকে অনেক মধু খাইয়ে ,বাহারি রং দিয়ে সুখাদ্য করে তোলা হয় ।আর এটা যারা করতে পারেন তারাও নিশ্চয়ই চরম ধৈর্যশীল ।ওদিকে হতচ্ছাড়া পদ্য !বিশাল ভাবসম্পন্ন কিছুকে এত ছোটকথায় নিয়ে আসে ,অনেক সময় তার গোষ্ঠী উদ্ধার করা অসাধ্য হয়ে ওঠে ।আর পড়তেও হয় অনেক মনোযোগ দিয়ে ধৈর্য ধরে ।এত টাইম আছে নাকি আজকাল !
হায় হায় আমি আবার এইসব কি আজাইরা প্যাচাল শুরু করলাম ।আহা !আপনাদের জন্য আমার খুব দুঃখ হচ্ছে ।ঠিক আছে ,আমি দুঃখিত ।মাফ করে দিবেন ।

শনিবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০১০

রোদ পোহানোর দিন

কনকনে ঠান্ডায় ফজরের নামাজ পড়ে আবারো কম্বলের নিচে ঢুকলাম ।উম-ম ।আবারো ঘুম ।বন্ধের দিন, ক্লাসে যাওয়ার তাড়া নেই ।ঘুম থেকে জেগে দেখি বয়স বেড়েছে পৃথিবীর ।সাড়ে নয়টা বাজে ।দাত ব্রাশ করে নাস্তা করতে বের হলাম ।হোস্টেলের করিডোরেই একঝলক মিষ্টি আলো আদর বুলিয়ে দিলো আমার ঠান্ডা মুখে ।দু মিনিট দাঁড়ালাম ।এই রোদ আমাকে ভেদ করে ঢুকে গেলো সময়ের গভীরে ।যেখানে শীতের আমেজে সকালের স্নিগ্ধ রোদে বসে আমি পড়ছিলাম আম পাতা জোড়া জোড়া ।আমাদের উঠানের সামনে নিমগাছগুলোর ফাঁক দিয়ে আসা ঝিরিঝিরি রোদ আমার হাফপ্যান্ট পরা পায়ে খোলা শুভ্র উরুতে চিকচিক করতো ।মাদুরে বড় ভাইকে অংক কষাতেন আব্বা ,আর আমি নতুন 'আমার বই' প্রথম ভাগ পড়তাম মাথা দুলিয়ে ।পিচ্চি ছোটবোনটা আমার বই ,স্লেট ,চক ,কলম নিয়ে টানাটানি করত ।
একটু পরেই আসতো পিঠা ভাজা আর মুড়ি ।খাঁটি সরিষার তেলের সেই ঝাঁঝ ।তারপর নয়টার পরে সবাই উঠে যেতাম আমরা ।গরম ভাত খেয়ে যে যার কাজে ।
মনে পড়ে ।খুব মনে পড়ে ।নীরবে হাহাকার করে মন ।
সেইযে আমার রোদ পোহানোর দিনগুলি....




 শনিবার, ডিসেম্বর 25, 2010