এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...

এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে
গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২৭ আগস্ট, ২০১৭

দান

আজকে সকালে অফিসে এসে খবরটা শুনে মনটা ভালো হয়ে গেলো মাসুদ সাহেবের। তার কোম্পানি বন্যা দুর্গতদের জন্য মোটা অংকের সাহায্য করছে। পাঁচ লাখ টাকা।
মাসুদ সাহেব একটা বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। বেতন যা পান, তা দিয়ে মোটামুটি চলে যায়। তবে কোনোমাসে বাড়তি খরচ থাকলে বেশ টানাটানি পড়ে যায়। এই যেমন গতমাসে হঠাৎ ছেলেটা অসুস্থ হয়ে পড়লো। সবার হচ্ছে চিকনগুনিয়া, কিন্তু ছেলের হলো টাইফয়েড জ্বর। অবস্থা বেশ খারাপের দিকে ছিল। সাতদিন হাসপাতালে ভর্তি থেকে দামী ইঞ্জেকশন দিতে হলো।
সব মিলে এ মাসে বেশ টানাটানি করেই চলতে হবে। বেশ কিছু ধারদেনাও হয়ে গেছে এরমধ্যে।
পত্রিকায় টিভিতে বন্যার খবর দেখে মাসুদ সাহেবের অনেক খারাপ লাগে। মন চায় কিছু হলেও সাহায্য করতে। কিন্তু এইমাসে অনেক টানাটানি। সম্ভব হবে না। এনিয়ে মনে মনে খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন তিনি। মানুষের এমন দুর্দিনে কিছুই করতে পারলেন না ভেবে অস্থির বোধ করছিলেন। কিন্তু আজকে খবরটা শুনে মনের ভার কিছুটা হলেও লাঘব হলো। কোম্পানি থেকে সাহায্য করা হচ্ছে। কোম্পানির সাহায্য মানে তো তারই সাহায্য করা। কোম্পানিতে তার একটা অংশ আছে না! আর কোম্পানির চেয়ারম্যান লোকটাকে যতটা খারাপ ভেবেছিলেন, লোকটা বোধহয় আসলে অতটা খারাপ না। লোকটার প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে গেলো মাসুদ সাহেবের।
২.
এক তারিখে বেতন তুলতে গিয়ে অবাক হলেন মাসুদ সাহেব। দেখলেন, তার একাউন্টে বেতন থেকে ১ হাজার টাকা কেটে নেয়া হয়েছে। কারণ জিজ্ঞেস করায় তাকে দেখিয়ে দেয়া হলো, একাউন্টস সেকশনের সামনে চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তি ঝুলছে, 'বন্যার্তদের সাহায্যের জন্য সব কর্মচারীর এক দিনের বেতন কেটে নেয়া হলো'।
কোম্পানির কর্মচারীর সংখ্যা ৫ শতাধিক। বেতন থেকে কাটা হয়েছে ন্যুনতম এক হাজার টাকা করে। আর ওদিকে সাহায্য দেয়া হয়েছে ৫ লাখ। হিসাবটা তার সামনে দিনের আলোর মত পরিস্কার হয়ে গেলো। আর মনের পর্দায় ভেসে উঠলো কোম্পানি চেয়ারম্যানের ত্রাণ সাহায্য প্রদানরত ছবিটা। কে দান করে কার পকেটের টাকা?

শুক্রবার, ২৮ এপ্রিল, ২০১৭

মহামানবের গল্প

টেবিলের ওপর খামটা রেখে সামনের চেয়ারে বসে আছে ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের প্রতিনিধি। বেশ ফুলে ফেঁপে আছে খামটা। ভেতরে কত টাকা আছে, এখনো জিজ্ঞেস করেননি ডাঃ রফিক। কিন্তু এমাউন্টটা যে একেবারে নগন্য নয়, সেটা আন্দাজ করতে অসুবিধা হয় না।

এর আগে অনেকবার এরকম খামের প্রলোভন নিঃসংকোচে প্রত্যাখ্যান করেছেন ডাঃ রফিক। কিন্তু আজ প্রত্যাখ্যান করতে পারছেন না সহজে। গত কয়েকদিনে যে অভিজ্ঞতা তাঁর হয়েছে, তাতে একা একা এই সততার অহংকার নিয়ে কতদিন চলতে পারবেন তা নিয়ে আজ তিনি বড্ড সন্দিহান।

কয়েকদিন আগে পাসপোর্ট অফিসে গিয়েছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী সব কাগজপত্রই রেডি করে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে মনে হলো, তিনি বোধহয় পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্তও পড়েন নাই। এটা এভাবে কেন লিখেছেন, এখানে আরেকটা সিল লাগবে, কাল আসেন। বারবার নানা ঝামেলা করতে লাগলো তারা। দারোয়ান কানে কানে বললো, স্যার এত ঝামেলা করতেছেন কেন? দুই হাজার টাকা দেন। আপনের আর কিছু করতে হবে না। 

বাবার পেনশন আটকে আছে বহুদিন। গত সপ্তাহে গিয়েছিলেন অবসর বোর্ডে। সেখানেও তাকে যথেষ্ট পরিমাণে ঘুষ দিতে হয়েছে। ঘুষ না দিয়ে বহুদিন অপেক্ষা করেছেন। বাবারও বয়স বাড়ছে। টাকাটা হাতে পেলে বাবা তার ইচ্ছামত কিছু খরচ দান খয়রাত করতে পারতেন। কিন্তু এভাবে চললে হয়তো বাবা আর টাকাটা দেখে যেতে পারবেন না। বাধ্য হয়ে বখশিষের নামে ঘুষ দিতে হলো সেখানে।

ভেবেছিলেন নিজের এলাকায় নিজেই একটা ছোট হাসপাতাল করবেন। এত টাকা কোথায় পাবেন? এক বন্ধুর পরামর্শে ঋণের জন্য একদিন গেলেন ব্যাংকে। ব্যাংকের ম্যানেজার ঋণ দিতে রাজী হয়েছিলেন। কিন্তু একটা শর্তঃ ঋণের ২% টাকা তাকে দিতে হবে।
হাসপাতালের স্বপ্নটা সেদিন সেখানেই ফেলে আসেন ডাঃ রফিক।

ছোট ভাই বিসিএস দিয়ে নিয়োগের জন্য সুপারিশ পেয়েছে। গত পরশু পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য থানা থেকে একজন এসআই এসেছিলেন। অন্য একটি গোয়েন্দা সংস্থা থেকে এসেছিলেন আরেকজন। দু'জনই বেশ মোটা অংকের টাকা দাবি করে গেছেন। এবার দিতেই হবে। নইলে তারা রিপোর্ট লিখে দিবেন মনের মত করে। এতবছর পড়াশোনা করে অর্জন করা একটা সরকারি চাকরি আটকে যাবে তথাকথিত নিরাপত্তা যাচাইয়ের নামে।
কয়েক বছর আগে নিজের বেলায় 'ঘুষ দেবেন না' বলে জেদ ধরেছিলেন ডাঃ রফিক। কিন্তু সেই জেদের ফলাফল ভালো হয়নি। ঘুষ না দেয়ায় তার ব্যাপারে রিপোর্ট দেয়া হয়েছিল- "রাষ্ট্রবিরোধি কর্মকান্ডে জড়িত'। তিনি বাদ পড়েছিলেন নিয়োগের সেই তালিকা থেকে।

এভাবে গত কয়েক বছরে প্রায় সবখানেই অতিরিক্ত টাকা গুনতে হয়েছে তাঁকে। যখনই কোন প্রয়োজনে কোথাও যান, কেউ না কেউ দাঁত কেলিয়ে বলে 'আরে ভাই আপনারা ডাক্তার মানুষ, আপনাদের কি টাকার অভাব আছে? ডাঃ রফিকের মেজাজ বিগড়ে ওঠে। মনে হয়- খেতা পুরি সততার। টাকা আসবে কোত্থেকে? সব শালাই আছে টাকার ধান্দায়, এইবার আমিও নিমু সামনে যা আসে।
কিন্ত শেষমেষ পারেন না। প্রতিবারই তার হাত ফিরে আসে।
আজও পারলেন না।

যদি সমাজের পিশাচ কুলাঙ্গার দূর্নীতিবাজদের টাকা আলাদাভাবে নেয়া যেত, তাহলে তিনি অবশ্যই নিতেন। কিন্তু, হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এইসব টাকায় যে সেই কৃষকের টাকাটাও আছে, যার শেষ সম্বল ছিল গতকাল বিক্রি করা গরুটা।

পরিশিষ্টঃ
পুরো সমাজ যখন দূর্নীতিতে আকন্ঠ ডুবে আছে, তখন ডাক্তার একা সৎ থাকবে এইটা আশা করা বোকামী । তবুও তুলনামূলকভাবে সৎ ডাক্তারের সংখ্যাই বেশি। এ দেশে সবাই সবাইকে শোষণ করছে। এ যেন এক মহা শোষণচক্র। দিনরাত এতসব শোষণ বঞ্চনা হতাশা আর প্রলোভনের মাঝে দাঁড়িয়েও যেসব ডাক্তার কোনভাবেই কমিশন নেন না, কোনরকম অবৈধ আয় করেন না, তাদেরকে আমার মানুষ মনে হয় না। তারা প্রত্যেকেই আসলে একেকজন সত্যিকারের 'মহামানব'।

রবিবার, ১৬ অক্টোবর, ২০১৬

অন্যরকম চাঁদের আলো

রাত প্রায় দু'টা বেজে গেছে। ডিউটি আওয়ার শেষ হতে আরো ছয় ঘন্টা বাকি। মুনীর এখন আছে সরকারী হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে।
আজকে এই ওয়ার্ডে এডমিশন নেই, মানে নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে অন্য ওয়ার্ডে। সেজন্য কিছুটা রিলাক্স হয়ে বসার সুযোগ পাওয়া গেল এতক্ষণ পর হলেও। এডমিশন নাইট হলেতো এক মুহূর্ত বসার সুযোগ হত না।
ফেসবুকে লগ ইন করতেই মুনীরের চোখে এলো অনেক রোমান্টিক স্ট্যাটাস -আজকে পূর্ণিমা রাত। বাহিরের আকাশে নাকি অসাধারণ আলো ছড়াচ্ছে পূর্ণ চাঁদ।
মুনীর কোথায় যেন পড়েছে, কবিরা নাকি খুব সৌন্দর্যপিপাসু হয়। চা-খোর যেমন মজা করে চা খায়, কবিরা নাকি সেরকম একটু একটু করে সবকিছুর সৌন্দর্য চিবিয়ে চিবিয়ে উপভোগ করে। মুনীর কবি নয়, কিন্তু সেও সৌন্দর্য পিয়াসীদের একজন। এই মুহূর্তে মুনীরের মনে পড়ে, হোস্টেলের ছাঁদে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে কত রাত কাটিয়ে দিয়েছে সে। কৃষ্ণচূড়া গাছটার পাতার ফাঁকে দেখেছে চাঁদের লুকোচুরি। পশ্চিমের চাঁদ একসময় ঢলে গেছে পূবের আকাশে, পূবের চাঁদ পশ্চিমে। একেকটা মুহূর্তের একেকরকম সৌন্দর্য। অমাবশ্যার রাতে যখন পেঁচারা উড়ে যায়, তারও একটা অন্যরকম সৌন্দর্য আছে।
"স্যার একটু আইবেন?"
চিন্তায় ছেদ পড়ে মুনীরের। দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে এক পিচ্চি মেয়ে। বয়স সাত কি আট হবে হয়তো।
"কী হয়েছে বাবু?" নরম কন্ঠে জিজ্ঞেস করে মুনীর।
"স্যার আমার মায়ের শ্বাসকষ্ট। মায় আপনারে ডাকতে কইছে।"
স্টেথোস্কোপ গলায় ঝুলিয়ে দ্রুত উঠে পড়ে মুনীর। চলো চলো চলো, পিচ্চিটাকে তাগাদা দিয়ে নিয়ে চলে নির্দিষ্ট বেডের দিকে। যাওয়ার সময় নার্সকেও একটা হাঁক দিয়ে যায়। সিস্টার তেইশ নাম্বারে আসেন।
রোগীর ডায়াগনোসিস একিউট সিভিয়ার এজমা। গতকাল ভর্তি হয়েছে প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট নিয়ে। পাক্কা দুই ঘন্টা চেষ্টার পর তার অবস্থা স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়েছিল।
শ্বাসের কষ্ট খুব খারাপ। জীবন সংশয়ের কথা বাদ দিলেও, একজন মানুষ নিঃশ্বাস নিতে পারছেনা, এটা কি যা-তা কথা? মুনীর ভাবে, আল্লাহ তায়ালা আমাদের কত আরামে রেখেছেন। তবু মানুষ কত অকৃতজ্ঞ। মুনীরের মনে হয়, একজন মানুষের যদি কিছুই না থাকে, সে যদি শুধু নিশ্চিন্তে শ্বাস নিতে পারে- তাতেই তার মস্তক অবনত করে স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত। দুনিয়ায় কিছু কিছু মানুষকে শ্বাসকষ্টের রোগ দিয়ে আল্লাহ হয়তো সকল মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেন তাঁর অশেষ নেয়ামতের কথা।
মুনীর রোগীর পাশে বসে অনেকক্ষণ কাটিয়ে দিলো। শুধু ওষুধ দিয়ে ক্ষান্ত নয়, মুনীর সবসময় চেষ্টা করে রোগীকে পাশে দাঁড়িয়ে মানসিক শক্তি যোগানোর। যদিও সবসময় তা সম্ভব হয়ে ওঠে না। মুনীরের অবজার্ভেশান হলো, ওষুধের পাশাপাশি মানসিক শক্তি যোগালে রোগীর উন্নতি ত্বরান্বিত হয়। একবার এমন হলো, বয়স্ক এক রোগী হাত ধরে বলে, বাবা আপনি আমার পাশে থাকেন, আপনি গেলে আমি বাঁচবো না। সত্যিই দেখা গেলো, মুনীর সেই রোগীর কাছে থাকলে তার শ্বাসকষ্ট কমে যায়, আবার দূরে গেলে বাড়ে। সাইকোলজিকাল ব্যাপার স্যাপার।
ঘড়ির কাঁটায় তিনটা অতিক্রম করে গেছে। হেঁটে হেঁটে রোগীদের অবস্থা দেখছে মুনীর। রাতের এই প্রহরে প্রায় সব রোগীই ঘুমিয়ে পড়েছে। হাঁটতে হাঁটতে মুনীর আবার এসে দাঁড়ায় তেইশ নাম্বার বেডের পাশে। এক বেডেই মা মেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। একটু আগে কী কষ্টই না পাচ্ছিলো মা-টা। আর বাচ্চাটার মুখে ফুটে উঠেছিল কী সীমাহীন উৎকন্ঠা!
আজ বাইরের পূর্নিমা চাঁদ দেখা হয়নি মুনীরের। কিন্ত এই মুহূর্তে হাসপাতালের এই ওয়ার্ডে ঘুমন্ত রোগীদের মুখ যেন একেকটা চাঁদ হয়ে ধরা দেয় মুনীরের চোখে। ভরা পূর্ণিমার চাঁদের আলো এই প্রশান্তির কাছে ম্লান হয়ে যায়।

সোমবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

কৃতজ্ঞতা

এই ভিড়ের মধ্যেও মেয়েটা এক প্রকার জোর করেই বাসে উঠে পড়লো । নারীদের জন্য নির্ধারিত কোন সিট খালি ছিল না । দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই । কিন্তু তার সম্ভবত খুব জরুরি কোন কাজ আছে, যার কাছে এইসব ভিড়ভাট্টা কোন ব্যাপার না ।
সারাদিন নানান কাজে দৌড়াদৌড়ি করে বেশ কাহিল হয়ে পড়েছিল মুনির । বাসে উঠে কোনমতে একটা সিট পাওয়ায় আরামে চোখ বুজে আসছিল তার । কিন্তু একটা মেয়ে মানুষকে এই ধাক্কাধাক্কির মধ্যে দাঁড় করিয়ে রেখে আর বসে থাকা সম্ভব নয় । সুতরাং সিটটা ছাড়তেই হলো তাকে । ‘এই যে আপু এখানে বসেন’ বলে উঠে দাঁড়ালো সে ।
মেয়েটাও কিছু না বলে টুপ করে বসে পড়লো ।

পেছন থেকে অবশ্য কেউ একজন মন্তব্য ছুঁড়তে ছাড়লো না । ‘বইবো ক্যান? মাইয়ারা না সমানাধিকার চায়? অরাও দাড়ায়া যাইবো, এইডাই সমানাধিকার’!
ভাই ভিত্রে যান, পেছনে খালি আছে । কন্ডাকটরের ক্রমাগত আহ্বান আর মানুষের ঠেলাঠেলিতে ধীরে ধীরে বাসের একেবারে পেছনে ঠাঁই হয়েছিল মুনিরের । সারাটা পথ দাঁড়িয়েই ছিল । তার ছেড়ে দেওয়া সিটটাও আর পুনর্দখল করার সুযোগ হয়নি । কখন যে ওটা খালি হয়েছিল সে খেয়ালও রাখা হয়নি ।
বাসায় ফিরেই ব্যাগসহ বিছানায় লুটিয়ে পড়লো মুনির ।
মুনিরের মত একজন পুরোদস্তুর ব্যাচেলরের জীবনে এরকম সময়ে ফেসবুক একটা গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী । পকেট থেকে মোবাইল বের করে ফেসবুকে লগইন করলো সে । আনমনে হোমপেজ স্ক্রল করতে করতে একজনের শেয়ার করা একটা পোস্টে চোখ আটকে গেল তার । নামটা অপরিচিত, আগে কখনো চোখে পড়েছে বলে মনে হয় না । তবুও ক্লিক করে পড়তে লাগলো।
''নীল নয়না
1 hour ago
‘হঠাৎ খবর পেলাম দাদুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে । দাদু স্ট্রোক করেছেন । কোনকিছু মাথায় আসছিল না । রাস্তায় নেমে দুএকটা সিএনজি ডাকলাম, কিন্তু কেউ যাবে না । সব নবাবের পুত ।
প্রথম বাসটাতেই উঠে পড়লাম । খুব ভিড় ছিল, কিন্তু এছাড়া আর উপায় কী? কেউ একজন আমাকে তার সিটটা ছেড়ে দিল । অজানা সেই মানুষটাকে একটা ধন্যবাদও দেয়া হয়নি । হয়তো কোনদিন হবেও না । লোকটা হয়তো আমাকে অকৃতজ্ঞ ভাবতে পারে । আমার নিজেরও কেমন অকৃতজ্ঞ বোধ হচ্ছে । ফেসবুকে একটা ধন্যবাদ লিখে দিলে কি কিছুটা হালকা বোধ হবে? হতে পারে। তখনই কৃতজ্ঞতা না জানানোটা ভুল হয়ে গেছে । ভালো কাজের অনুপ্রেরণা জোগানোর জন্য মানুষকে কৃতজ্ঞতা জানাতে হয়’।
Odvut prithibi and 11 others like this''

বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০১৬

আউটডোর

সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেললো হেলাল মিয়া । আজ হাসপাতালে যেতেই হবে । বেশ কিছুদিন ধরেই শরীরটা কেমন ম্যাজ ম্যাজ করছিলো । আজকাল খুব দুর্বল লাগে তার । দু’একটা খেপ দিলেই হাঁপিয়ে উঠতে হয়। তবু কোনমতে চালিয়ে নিচ্ছিল এতদিন । কিন্তু আজ আর কোনভাবেই রিকশা নিয়ে বের হওয়া সম্ভব না । এই শরীরে রিকশা নিয়ে বেরুলে আর ঘরে ফেরা হবে কিনা সন্দেহ । কোথায় মাথা ঘুরে পড়ে থাকবে কে জানে !
-‘কইগো হেনার মা, দেহ দেহি রফিক্যা আছে নি বাড়িত । আমারে এট্টু ডাহা মেডিকেলত দিয়া আসবার ক-তো । আইজকা যাইতেই অইবো, এইবাভে আর থাহন যায়না’ ।
মেঝেতে চট বিছিয়ে মেয়েকে পাশে বসিয়ে সরিষার তেল মাখা গরম ভাত খায় হেলাল মিয়া । প্লেটের ওপর কাঁচামরিচ ও আলুভর্তা । আলুভর্তাটা ভালোই বানায় হেনার মা । খেতে খেতে মেয়েকে আদর করে হেলাল । এরইমধ্যে রফিক মিয়ার কন্ঠ শোনা যায় ।
-‘হেলাল বাই, রেডি অইছো নি? তাড়াতাড়ি খাইয়া লও । দেরি অইয়া যাইতাছে’।
এই বস্তির অনেকেই রিকশা চালায় । রফিক মিয়াও তাদের একজন । হেলাল মিয়ার পাশের ঘরেই থাকে ।
ঢাকা মেডিকেলের আউটডোর বিভাগের সামনে এসে নামে হেলাল মিয়া । রফিক তার রিকশা নিয়ে চলে যায় অন্য দিকে । হেলাল মিয়া ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় ‘বহিঃবিভাগ’ গেটের দিকে ।
জীবনে কোনদিন এই হাসপাতালে আসেনি হেলাল মিয়া । সে বুঝতে পারেনা কী করবে । আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো অনেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে টিকেট কিনছে । ‘এইহানেও টিকিট লাগে?’ ভাবতে ভাবতে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ে সে । ‘বাই, টিহিট কত?’ সামনের জনকে জিজ্ঞেস করে হেলাল । ‘দশ টেহা’ । ঝাঁঝালো জবাব পায় সে । এই প্রশ্নের উত্তরে এত ঝাঁঝ দেখানোর কী আছে ভেবে পায়না হেলাল ।
দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মাথা ঝিম ঝিম করে হেলালের । যখন সে কাউন্টারের সামনে এসে পৌঁছে, ততক্ষণে আধা ঘন্টার বেশি পার হয়ে গেছে । সময়টা হয়তো আরও বেশিই হবে, কিন্তু হেলাল মিয়ার হাতে যেহেতু কোন ঘড়ি নেই, তাই আন্দাজ করা আর ছাড়া কোন উপায় নেই তার ।
-‘টেহা বাইর করো মিয়া । সমুস্যাডা কী?’
বেশ ধমকের স্বরেই জানতে চায় কাউন্টারে বসা লোকটি । মিনমিন করে হেলাল জানায়- তার ‘শইল্যে ব্যথা’, ‘মাথা গুরে’, ‘বুক দরফর করে’ । একটা ছোট্ট কাগজে নাম ও নম্বর লিখে হেলালের হাতে দেয় লোকটি । বলে- ‘যাও, মেডিসিন আউটডোরে চইল্যা যাও’ ।
-‘ঐ মিয়া, এত সুমায় লাগে ক্যা?’ তাড়া দেয় হেলালের পেছনে দাঁড়ানো মধ্যবয়স্ক লোকটিও ।
হেলাল মিয়া দুএকজনকে জিজ্ঞেস করে মেডিসিন আউটডোর চিনে নেয় । সেখানেও লাইনে দাঁড়াতে হয় তাকে । প্রায় ঘন্টাখানেক অপেক্ষার পর সে ডাক্তারের সামনে গিয়ে পৌঁছে । এর মধ্যে গেটে দাঁড়ানো লোকটি তাকে দু’তিনবার ধমকায়। ডাক্তার সাহেব অবশ্য ভালো করেই দেখেন হেলালকে । তিনি কিছু ঔষধ লিখে দেন । আর বুকের এক্সরে, রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করাতে বলেন । ডাক্তারের রুম হতে বেরুতে বেরুতে হেলালের কানে আসে শ্লেষমাখা কন্ঠ- ‘ঐ মিয়া কী হইছে তুমার? এত সুমায় লাগাইলা ক্যান? আর হেই ডাক্তারে কিছু জানে নি? অতক্ষণ লাগে একজন রুগি দেইখতে?’
সেই কাগজ নিয়ে হেলালকে যেতে হয় অন্য একটি রুমে । সেখানে তার নাম এবং স্লিপ নম্বর লিখে নতুন কয়েকটি কাগজ ধরিয়ে দেয় একজন নার্স । তারপর ঐসব কাগজ নিয়ে একে ওকে জিজ্ঞেস করে অলিগলি পেরিয়ে ‘নিউ বিল্ডিং’ এ পৌঁছায় হেলাল । সেখানে আবার লাইনে দাঁড়িয়ে ‘টাকা জমা’ দেয় সে । টাকা জমার স্লিপ নিয়ে সে একে একে এক্সরে বিভাগে গিয়ে ‘বুকের ছবি’ ওঠায়, রক্তের নমুনা দেয় অন্য আরেকটি রুমে, সেখান থেকে বেরিয়ে অন্য একটি রুমে গিয়ে প্রস্রাবের নমুনা দেয় । প্রতিবারই তাকে গড়ে আধাঘন্টা থেকে একঘন্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় । দারোয়ান ও টেকনিশিয়ানদের ধমক শুনতে হয় । সবখান থেকেই একদিন পরে এসে রিপোর্ট সংগ্রহ করতে বলা হয় হেলালকে ।
হেলাল খেয়াল করে, রিপোর্ট সংগ্রহের লাইনটাও অত ছোট না ।
‘যুহর কি হইয়া আইলো নাকি?’ আকাশের দিকে তাকায় হেলাল । কিন্তু তার চোখ কংক্রিটের ছাদে বাধা পেয়ে ফিরে আসে ।
দুর্বল শরীর নিয়ে গেটে ফিরে আসে হেলাল মিয়া । রফিককে বলা আছে, যোহরের সময় সে গেটে থাকবে । হেলালকে বাড়িতে পৌঁছে দেবে ।
এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে পা ব্যথা হয়ে গেছে হেলালের । ডাক্তারের সামনে কয়েক মিনিট ছাড়া আর কোথাও বসার সুযোগ হয়নি তার । এখন মনে হয় ‘মাথাটাও ঘুরছে’।
কোনরকমে গেটে পৌঁছে ফুটপাতের ওপর দাঁড়ায় হেলাল । তার চোখ খুঁজে ফেরে রফিক মিয়াকে । ‘ঐ তো , ঐতো রফিক আইছে’। মনে মনে খুশি হয় হেলাল মিয়া । কিন্তু রফিকের উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই হঠাৎ চোখ অন্ধকার হয়ে আসে তার। জ্ঞান হারানোর আগে একবার রফিকের কন্ঠ কানে আসে- হেলাল বাই, কী অইছে হেলাল বাই? এমুন করতাছ ক্যান? হেলাল বাই, এমুন করতাছ ক্যান?

মঙ্গলবার, ১ ডিসেম্বর, ২০১৫

ভিক্ষুক

'ভাইজান, কয়ডা টাহা দ্যান। সকাল থাইকা কিছু খাই নাই। বাচ্চা দুইডারেও কিছু খাওয়াইতে পারি নাই।'
আজিজ সুপার মার্কেটের সামনে মোড় ঘুরতেই এক মহিলার কন্ঠ কানে আসে নাবিলের। মহিলার সাথে অল্প বয়সের দুটি বাচ্চা।
নাবিল দাঁড়াতেই মহিলা মুখ কাঁচুমাচু করে এগিয়ে আসে। বয়স ত্রিশের কোঠায় হবে বলে মনে হয়। রোগা নয়, শক্তসমর্থই।
-কেন, খাননি কেন? আপনার স্বামী নেই? আপনি কোন কাজ করেন না? প্রশ্ন করে নাবিল।
-ভাইজান, হবিগঞ্জ থাইকা ঢাকা আসছি কাজকামের খোঁজে। কোন কাম জোগাড় করবার পারি নাই। অহন ফিরা যামু তারও কোন ব্যবস্থা নাই। একটা টেহা নাই হাতে।

নামকরা রেস্টুরেন্টে বন্ধুদের সাথে বুফে ডিনার সেরে বাসায় ফিরছিল নাবিল। কোন কোন আইটেম অসাম লেগেছে আর কোনটা একটু খারাপ হয়েছে তা নিয়েই ভাবছিল সে। এমন সময়ে এরকম অনাহারি মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে অপরাধী মনে হলো তার । আবেগে আপ্লুত হয়ে গেল সে। আহা! আমি একবেলা খাবারের জন্য হাজার টাকা খরচ করলাম! কত কিছু খেলাম। অথচ এই মহিলা সকাল থেকে না খেয়ে আছে! আর বাচ্চা দুটো! আহা! না খেয়ে কী কষ্টই না হয়েছে বাচ্চা দুটির।
'আসেন মা, আমার সাথে আসেন। আমি আপনাদের খাওয়াবো। তারপর বাস স্ট্যান্ডে নিয়ে যাবো। আমি নিজে টিকেট কেটে হবিগঞ্জের গাড়িতে উঠিয়ে দেবো'।
মহিলাকে তার পেছন পেছন আসতে বলে হাঁটতে শুরু করে নাবিল। ভালো রেস্টুরেন্টেই খাওয়াবে সে ওদেরকে। মহিলা অবশ্য একবার বলেছিল, ভাইজান, কিছু টাকা দেন। আমরা খাইয়া নিমু। কিন্তু নাবিল আজকে অল্প কিছু টাকা দিয়েই তার দায় সারতে চায় না। সে নিজে সাথে থেকে তাদেরকে খাওয়াতে চায়, নিরাপদে বাড়ি ফিরে যাবার সুব্যবস্থা করে দিতে চায়।
আনমনা হয়ে হাঁটতে থাকে নাবিল । শাহবাগ মোড়ে ভালো কোন খাবার দোকান নেই। কাঁটাবন বা হাতিরপুল এলাকায় দুএকটা ভালো রেস্তোরাঁ আছে। মিনিট পাঁচেক হাটলে কোন একটায় পৌঁছানো যাবে।
ধীরেই হাটছিল সে। রাস্তায় ভীড়ও তেমন নেই এখন। হাটতে হাটতে দেশের গরীব দুঃখী মানুষের জন্য কাজ করার পরিকল্পনা করতে থাকে । এভাবে একজন দুজনকে একবেলা দুবেলা খাইয়ে কিছু হবে না। দারিদ্র্যের মূলে কুঠারাঘাত করতে হবে। বৈষম্য রোধ করার ব্যবস্থা করতে হবে। ধনীদের সম্পদ থেকে গরীবের হক আদায় করে নিতে হবে।
ভাবতে ভাবতে 'চায়না কিচেন' রেস্তোরাঁর সামনে এসে দাঁড়ায় নাবিল । সবাইকে নিয়ে ভেতরে ঢোকার জন্য পেছন ফিরে তাকায় সে। কিন্তু একী? কোথায় গেল মহিলা? এদিক ওদিক ভালো করে নজর বুলায় সে । নাহ, কোথাও নেই। ওরা কি পেছনে রয়ে গেল?
কাঁটাবন মোড় পর্যন্ত ফিরে এসে ভালো করে খুঁজলো সে। কিন্তু কোথাও তাদের আর কোন হদিস পাওয়া গেলনা।
বাসায় ফিরতে ফিরতে একটা প্রশ্ন চকিতে উদয় হলো নাবিলের মনে- মহিলা কি তাহলে মিথ্যা বলেছিল? আসলে সে একজন পেশাদার ভিক্ষুক?

বুধবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৫

সান্ত্বনা

‘বাবা একটু আসবেন, রোগীর খুব শ্বাসকষ্ট হইতাছে’ ।
চোখ তুলে তাকালো মুনির । দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ । বেড নাম্বার তেত্রিশ, মনে পড়লো মুনিরের । ঐ রোগীরই শ্বাসকষ্ট হবার কথা ।
হাসপাতালে নাইট ডিউটিতে আছে ডাঃ মুনির । কয়েক মিনিট হলো, সবগুলো রোগী দেখা শেষ করে ডক্টরস রুমে এসে বসেছে । এরই মধ্যে বৃদ্ধ চলে এসেছেন ডক্টরস রুমের দরজায় ।
বৃদ্ধের স্ত্রীই তেত্রিশ নম্বর বেডের রোগী । মায়মুনা বেগম । অনেকক্ষণ ধরেই শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল তাঁর । মুনির এসে কিছু জরুরি ব্যবস্থা নেয়ায় শ্বাসকষ্ট কমেছিল কিছুটা । কিন্তু এরই মধ্যে আবার বেড়ে গেছে । রোগীর যা অবস্থা, শেষমেষ হয়তো তাকে বাঁচানো যাবেনা । বাঁচানোর জন্য আরো কিছু চেষ্টা করা যায়, কিন্তু সেটা এইখানে, সরকারি হাসপাতালের এই জেনারেল ওয়ার্ডে সম্ভব নয় ।

বৃদ্ধের সাথে আবারো রোগীর কাছে গেল মুনির । আরো একবার পরীক্ষা করে দেখে দায়িত্বরত নার্সকে নতুন কিছু নির্দেশনা দিল । তারপর বৃদ্ধকে একপাশে ডেকে নিলো সে।
‘বাবা, আপনাকে তো আমি আগেও বলেছি, আপনার রোগীর অবস্থা খুব খারাপ । তাঁর কিডনিতে সমস্যা আছে, কিডনি ঠিকমত কাজ করছে না । ফুসফুসে জীবাণু সংক্রমণ হয়েছে, পানি জমে গেছে । সেকারণে ঠিকমত শ্বাস নিতে পারছেন না । শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে । হার্টের ওপর চাপ বাড়ছে । যেকোন সময় হার্ট এটাক হতে পারে । যেকোন কিছু ঘটে যেতে পারে । আইসিইউ তে নিতে পারলে শেষ চেষ্টা করা যেতে পারে । কিন্তু এই হাসপাতালের আইসিইউ তে এই মুহূর্তে কোন বেড খালি নাই । আপনি কি অন্য কোথাও নিতে পারবেন?’
বৃদ্ধ কোন জবাব দিলেন না।
মুনির খেয়াল করলো, বৃদ্ধের চোখ ছলছল করছে । অদ্ভুত শুন্যতা সেখানে । মুখে বলার প্রয়োজন নেই, কখনো কখনো চোখের ভাষাই সব বলে দেয় । বুঝে ফেললো মুনির, এখানেই যা হবার হবে, এর চেয়ে বেশি কিছু করার সামর্থ বৃদ্ধের নেই ।
সুযোগ-সামর্থের মধ্যে যা করার আছে, সবকিছু করে ডিউটি রুমের দিকে পা বাড়ালো মুনির । একবার পেছন ফিরে দেখলো, বৃদ্ধ গিয়ে বসেছেন স্ত্রীর বিছানায় ।
আবেগের একটা তরঙ্গ যেন ছুঁয়ে গেল মুনিরকেও । 'বৃদ্ধ' ! আমরা কত সহজেই শব্দটা উচ্চারণ করি! অথচ একদিনে কেউ বৃদ্ধ হয়না, হওয়া যায়না। বৃদ্ধ হতে হলে পৃথিবীর মাটিতে একটা সম্পূর্ণ জীবন কাটিয়ে দিতে হয়।
তেত্রিশ নম্বর বেডে বসে থাকা এই দু’জন মানুষ কতবছর একসাথে কাটিয়েছেন কে জানে ! কয়েক যুগ তো হবেই । অথচ কী অদ্ভুত! আজ রাতেই হয়তো চিরবিচ্ছেদ হয়ে যাবে দু’জনের মধ্যে । একজন চিরতরে হারিয়ে যাবে পৃথিবী থেকে, আরেকজন অপেক্ষা করবে এমনই কোন দিনের । এমনই কোন রাতের । আর কখনো এই দুজনের দেখা হবে কিনা, কেউ জানে না ।
মুনির ভাবলো, এই মুহূর্তে বৃদ্ধের যে অনুভূতি, পৃথিবীর কোন কবি কিংবা কোন ঔপন্যাসিক কি কখনো তা বর্ণনায় তুলে আনতে পারবে?
বুক থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো মুনিরের । এরকম সময়ে নিজেকে খুব অসহায় লাগে তার । নিজেকে পরাজিত মনে হয়, ব্যর্থ মনে হয়।
মানুষের 'ডেথ সার্টিফিকেট' লেখা কোন সহজ কাজ নয়। কিন্তু এটাও সত্য, মানুষ অমর নয়। মৃত্যুকে ঠেকানো যায় না। প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।
ডক্টরস রুমের পুরনো কাঠের চেয়ারটিতে বসে নিজেকে সান্ত্বনা দেয় মুনির- ‘আমরা রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারি; মৃত্যু নয়’।

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৫

দ্বিমুখ !

মহাবিরক্ত হয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন রহমত সাহেব । ব্যাংকের কাজ শেষ করে বের হতে আজ আটটা পেরিয়ে গেছে । ব্যাংকারদের জীবনের এই দিকটা রহমত সাহেবের কাছে এখন অসহ্য লাগে । সকাল হতে সন্ধ্যা, বলা চলে রাত পর্যন্ত একটা জায়গায় প্রতিদিন একই কাজ করে যেতে হয় । দিনের আলো চোখে দেখা হয়না ।
এই যেমন আজ সাড়ে আটটা বেজে গেল অফিস থেকে বের হতে হতে । তারপরও শান্তি নেই । বাসায় ফেরা মানে আরেক যুদ্ধ । কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, কোনো বাসে উঠতে পারছেন না । দুএকবার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু বাসের দরজার হ্যান্ডেল ধরারও সুযোগ হয়নি । মানুষজনের ওপর তিনি ক্ষুব্ধ । একটু চেপেটেপে দাঁড়ানো যায়না? তাহলে তো আরো দু-একজন উঠতে পারে !
বিরক্তির শেষ সীমায় পৌঁছে শেষমেষ একটা বাসে উঠতে পারলেন রহমত সাহেব । যথারীতি কন্ডাকটরের চিৎকার কানে আসতে লাগলো। ‘মামা একটু চাইপা খাড়ান, পেছনে খালি আছে । এ ভাই চাইপা খাড়ান না ক্যান?’
এমনিতেই তিরিক্ষি হয়ে ছিল, কিন্তু এবার মেজাজটা একেবারে বিগড়ে গেল রহমত সাহেবের । তিনি গলা চড়িয়ে বললেন- ‘ঐ ব্যাটা, তোগো পেট ভরে না? এত মানুষ তুলছস বাসের ভিত্রে, আর একটা লোকও তুলবি না কইলাম!’ নানা কথায় আরো কিছুক্ষণ গজরাতে থাকলেন তিনি ।
[পরিশিষ্টঃ ঠিক সেই মুহূর্তে বাসের দরজায় ঠাঁই না পেয়ে ফিরে গেলেন আরো একজন ক্লান্ত মানুষ । হয়তো তিনিও একজন অফিস ফেরত রহমত আলী...।]
‪

মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০১৫

দত্তক

জাতীয় পর্যায়ের একটি এবং স্থানীয় দুইটি পত্রিকার সাংবাদিক এসেছে শামীমের সাক্ষাত্‍কার নিতে ।
-আপনি বাচ্চাটাকে কোথায় পেলেন?
-আমি নিয়মিত মর্নিং ওয়াকে বের হই । আজও তেমনি বের হয়েছিলাম ।
শামীম গুছিয়ে বলার চেষ্টা করে । পত্রিকায় শামিমের ছবিসহ ছাপা হবে । শিরোনাম হয়তো থাকবে 'একজন শামীমের মহানুভবতা' বা এরকম কিছু । সুতরাং যতটা সম্ভব গুছিয়ে সুন্দর করে বলতে হবে ঘটনাটা । যেন মানুষের হৃদয় স্পর্শ করে যায় ।
গলা খাকারি দিয়ে শামীম বলে যায়,
-আমি যখন বের হয়েছিলাম তখন ভোর ছয়টা । দুএকজন মর্নিং ওয়াক করা লোক ছাড়া রাস্তায় কেউই ছিলনা । মেডিকেল কলেজ মাঠের পাশে যে পায়ে চলার পথটা গিয়েছে , ওটা দিয়ে হাঁটছিলাম । হঠাত্‍ কানে এলো শিশুর কান্নার মত একটা অস্ফূট শব্দ । আমি থমকে দাঁড়ালাম । একবার মনে হলো , হ্যালুসিনেশন হবে হয়তো । কিন্তু তবু কৌতুহল দমন করতে পারলাম না । ভালো করে কান পেতে আবার শোনার চেষ্টা করলাম । আবার শোনা গেল শব্দটা । বোঝার চেষ্টা করলাম কোনদিক থেকে শব্দটা আসছে । আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম , কিছুই নেই । তারপর খেয়াল করে দেখলাম, কয়েক গজ দূরে একটা ছোট ঢিবির মত মাটির স্তুপ । আবার কান্নার শব্দ এলে মোটামুটি নিশ্চিত হলাম শব্দটা ঐ ঢিবির কাছে থেকেই আসছে ।
সতর্ক পায়ে ঢিবির দিকে এগিয়ে গেলাম । তখনই চোখে পড়লো চটের বস্তাটা । বাচ্চাটার পুরো শরীর চটের বস্তার ভেতরে ছিল , শুধু মাথাটা ছিল বাইরে । আমি ওভাবেই তুলে নিয়ে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে চলে এসেছি ।
-এই মুহুর্তে আপনার অনুভূতি কী?
-আমি খুবই খুশি যে আমি একটা জীবন রক্ষার জন্য কাজ করতে পেরেছি । সেই সাথে আমি অনেক দুঃখ পেয়েছি , মানুষ কীভাবে এতটা নিষ্ঠুর হয়? এমন একটা ফুটফুটে শিশুকে কীকরে এভাবে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে ফেলে যায়? এরা কি মানুষ?
-এখন কী অবস্থা শিশুটির ?
-আমি ডাক্তারের সাথে কথা বলেছি , বাচ্চার অবস্থা এখন অনেক ভালো । ডাক্তাররা অনেক হেল্প করছেন । ইন্টার্ণ ডাক্তাররা নিজেদের টাকায় সম্পূর্ণ বিনাখরচে শিশুটির চিকিত্‍সার ব্যবস্থা করেছেন । আর তাছাড়া আমি সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি । কোনকিছুর প্রয়োজন হলে আমি তত্‍ক্ষনাত্‍ সেটার ব্যবস্থা করছি । শিশুর জন্য যা লাগে আমি সবকিছু করবো ।
-হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ করলে বাচ্চাকে নিয়ে কী করবেন?
-সেটা এখনো ভাবিনি । তবে ভালো কোন দম্পতির কাছে দত্তক দেব ।
-আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ ।
-আপনাকেও ধন্যবাদ ।

********
হোস্টেলে ফিরে অগোছালো বিছানাতে শরীর এলিয়ে দিল শামীম । সারাদিন বেশ ধকল গেল বলা চলে । তবে বাইরের চেয়ে ভেতরের ধকলটাই ছিল বেশি । বানানো কাহিনীটা ভালোই বিশ্বাসযোগ্য করে বলতে পেরেছে সে । বিকেলের দিকে এক নিঃসন্তান দম্পতি যোগাযোগ করেছিল শামীমের সাথে । দুজনেই শিক্ষক । তাঁরা বাচ্চাটিকে দত্তক নিতে চান ।
শামীম রাজি হয়েছে । এমন দম্পতির কাছে হয়তো ভালো থাকবে বাচ্চাটি । হয়তো একদিন সে মানুষের মত মানুষ হবে ।
দত্তকের কথা পাকা হবার পর থেকে বুকটা খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগছে শামীমের ।
সবাইকে মিথ্যা কাহিনী শুনিয়েছে বটে, কিন্তু এ যে তার নিজের সন্তান ! যে ভুল সে করে ফেলেছে তার জন্য হয়তো দুনিয়া আখেরাতে শাস্তি পেতে হবে । অথবা তওবা করে ক্ষমা চাইতে থাকলে আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীন মাফ করেও দিতে পারেন । কিন্তু 'ভুলের' ফসল কিংবা 'অবৈধ' যাই হোক, নিজের সন্তানকে মেরে ফেলার মত অতটা পাষাণ এখনো হতে পারেনি শামীম । ফেলে দেয়ার পরেও তাই আবার কুড়িয়ে নিয়ে এসেছে ।
দত্তকের ধারণাটা হঠাৎ করেই মাথায় আসে শামীমের । অন্তত এটুকু সান্ত্বনা থাকলো- নিজের কাছে না থাকুক, অন্য কোথাও হলেও তার সন্তান বেঁচে থাকবে পৃথিবীর বুকে ।

বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০১৫

আবদার

-এই রিকশা যাইবা?
-যামু ।
-কত?
-রোযা রমজানের মাস, ঈদের বাজার, ন্যায্য ভাড়া দিয়েন ।
-পরে আবার ক্যাচাল করবানাতো?
-না ভাই, আপনেরা আমারে ঠকাইবেন না, হেই বিশ্বাস আমার আছে ।
ঈদে কিছু বাড়তি ইনকামের আশায় ঢাকায় এসেছে আব্বাস । পথঘাট সব যে ভালো চেনে তা নয় । যদিও গতবছরও এসেছিল সে । দিন পনেরো রিক্সা চালিয়ে কিছু টাকা নিয়ে ঈদের আগের দিন বাড়ি ফিরে গিয়েছিল । নিউমার্কেট থেকে দেখে শুনে বড় ছেলেটা আর কোলের মেয়েটার জন্য জামাকাপড় নিয়ে গিয়েছিল ।
এবারও সেই আশাতেই ঢাকায় আসা আব্বাসের । কয়েকটা দিন একটু বেশি কষ্ট হলেও বাচ্চাগুলো আর বউটার মুখে ঈদের দিন যদি একটু হাসি ফোটাতে পারে, সেটাই আব্বাসের জন্য চরম আনন্দ ।
আব্বাস গ্রামেও রিক্সা চালায় । কিন্তু গ্রামে রিক্সা চালিয়ে যা ইনকাম তা দিয়ে কোনরকম দিন গুজরান করা যায়, ঈদে-বরাতে বাড়তি খরচ করা যায় না । সেজন্যেই ঈদের আগে শহরে চলে আসে সে । ভাড়া নিয়ে সে কারো সাথে কোন ক্যাচালে যায় না । আব্বাস দেখেছে, যারা যাত্রীদের সাথে ক্যাচাল বাঁধায় তারা যে ভাড়া বেশি পায় তা নয় । বরং যাত্রীদের সাথে ভালো ব্যবহার করলেই ভাড়া বেশি পাওয়া যায় । খুশি হয়ে অনেকে ভাংতি টাকা ফেরত নেয় না । কোন যাত্রী যদি অযথা মেজাজ গরম করে, আব্বাস নরম গলায় বিনয়ের সাথে বলে- স্যার আপনারা দুই চার টাকা বেশি না দিলে আমরা কই যামু?
আব্বাসের বিশ্বাস, ভদ্রলোকেরা তাঁকে ঠকাবেন না । আর কেউ যদি ঠকায় তাহলে আল্লাহ তায়ালাই তার শাস্তি দিবেন । আল্লাহ চাইলে অন্য কোন ভাবে আব্বাসকে সেই ক্ষতি পুষিয়ে দেবেন । বাস্তবেও আব্বাস অনেকবার এর প্রমাণ পেয়েছে ।
রিকশা চালিয়ে যাচ্ছে আব্বাস । রিকশায় বসে আছে এক ভদ্রলোক আর তার পাঁচ ছয় বছর বয়সের ছেলে । টুকটুক করে কথা বলছে তারা । খুব মনোযোগ দিয়ে সেসব কথা শুনছে আব্বাস । বাড়ির কথা মনে পড়ে যায় আব্বাসের । বাড়িতে তার ছেলেটা এখন কী করছে? নিশ্চয়ই মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করছে । আব্বাসের ছেলের বয়স দশ বছর । আবির । গ্রামের স্কুলে ক্লাস ফাইভে উঠেছে এবার । খুবই ভালো ছেলে । সবসময় আব্বাসের কথা শোনে । কোন কথার অবাধ্য হয় না । এমন লক্ষ্মী ছেলে পেয়ে নিজেকে খুবই ভাগ্যবান মনে হয় আব্বাসের। প্রতিদিন সে ছেলেকে রিক্সায় করে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসে । ছেলে রিক্সায় বসে এদিক ওদিক তাকায়, আব্বাসের সাথে টুকটুক করে কথা বলে, কী যে ভালো লাগে তখন ! ছেলেটা এবার একটা ঘড়ি কিনে চেয়েছে আব্বাসের কাছে । অনেক দিন ধরেই বায়না করছিল, কিন্তু আব্বাসের উপায় ছিলনা । অভাবের সংসার, ঠিকমত ভাত কাপড়ই জোটেনা । সেখানে ঘড়ি কেনার টাকা কোথায় পাবে? নানা কথায় বুঝ দিয়ে রেখেছিল ছেলেকে । ঈদে কিনে দেবে বলে আশ্বাস দিয়ে রেখেছিল । ঈদ এসেই গেল প্রায়, আর তাছাড়া সামনে আবিরের বৃত্তি পরীক্ষা । ঘড়ি না হলে পরীক্ষার সময়ের হিসাব ঠিক রাখা কঠিন হয়ে যায় । যত কষ্টই হোক, এবার ঘড়ি কিনে দিতেই হবে ।
ঢাকায় এসে আব্বাস একদিন গিয়েছিল ঘড়ির দোকানে । দাম দস্তুর কেমন জানতে । ঘড়ির দোকানদার কেমন যেন তুচ্ছতাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল । আব্বাস অবশ্য তেমন কিছু মনে করেনি । লুঙ্গি গেঞ্জি পরা, গলায় গামছা বাঁধা একজন লোক যদি ঘড়ির দোকানে গিয়ে দাম জিজ্ঞেস করে, তারা অবাক হতেই পারে । কিন্তু কারও অবজ্ঞাকে পাত্তা দেয়না আব্বাস । একদিন পরেই ঈদ । চাঁদ রাতে বাড়ির পথ ধরবে সে। ছেলেটার জন্য একটা ঘড়ি কিনে নিয়ে যেতে হবে, এটাই শেষ কথা ।
*********
ঈদের ভোর । ধীর পায়ে বাড়ির দিকে হেঁটে চলেছে আব্বাস । মনটা ভীষণ খারাপ । কাঁধের ব্যাগটা যেন পাহাড়সমান । যতই বাড়ির নিকটবর্তী হচ্ছে ততই হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছে আব্বাসের ।
সারারাত বাসে কাটিয়েছে । ক্লান্ত দেহে বাসের সিটে বসে ঘুমিয়েই পড়েছিল । আবিরের জন্য কেনা ঘড়িটা পাঞ্জাবির পকেটে রেখেছিল আব্বাস । সকালে যখন বাসের কন্ডাকটর ডেকে বললো যে তারা পৌঁছে গেছে, পকেটে হাত দিয়েই ছ্যাত করে উঠেছিল আব্বাসের বুক ।
ঘড়ি নেই পকেটে !
সিটের নিচে খোঁজাখুঁজি করেছিলো কিছুক্ষণ । কিন্তু পাওয়া যায়নি আবিরের জন্য কেনা ঘড়ি ।
আব্বাসের পাশের যাত্রী আগেই নেমে গিয়েছিল । যে দুএকজন তখনো নামেনি, তাদেরকে জিজ্ঞেস করেও কোন লাভ হলোনা । কেউ কিছুই বলতে পারলো না । আব্বাসের বুক খা খা করছে । ছেলেটা একটা আবদার করেছিল, সেটা পুরণ করতে পারলো না সে ! কী জবাব দেবে সে আবিরকে? ঐটুকু ছেলে, ঘড়ি হারিয়ে গেছে বললে বিশ্বাস করবে তো? বাবাকে মিথ্যাবাদী ভেবে বসবে নাতো?
ব্যাগের ভেতর নিজের একটা নতুন লুঙ্গি, বউয়ের জন্য একটা শাড়ি আছে । কিন্তু ছেলের জন্য কেনা ঘড়ি হারিয়ে ঐ দুটোকে এখন অনেক বড় বোঝা মনে হচ্ছে তার । ছোট ব্যাগটার ওজন যেন হয়ে দাঁড়িয়েছে কয়েক হাজার টন ।
পা দুটোও খুব ভারী মনে হচ্ছে আব্বাসের । হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে তার । কষ্টের একটা দলা পাকানো স্তুপ যেন আটকে আছে গলার কাছে । এ এক অন্যরকম কষ্ট, কাউকে বোঝানো যাবে না ।
একজন 'পিতা'ই শুধু বোঝে, সন্তানের সামান্য আবদার মেটাতে না পারার কষ্ট ।

সোমবার, ২৯ জুন, ২০১৫

মেডি গল্পঃ 'ভুল'

‘সদ্যোজাত সন্তানকে গলা টিপে হত্যা করলো পাষণ্ড মা !’ খবরের কাগজ পড়তে গিয়ে সেদিন ‘মফস্বল’ পাতায় হঠাৎ আমার চোখ আটকে গিয়েছিল এই শিরোনামে ।
প্রতিদিন সকালবেলা পত্রিকা পড়ার সময় আমি চেষ্টা করি আমার জেলার কোন খবর থাকলে সেটাতে চোখ বুলিয়ে নিতে । দূরে থাকি, তবু নিজের জন্মভূমির প্রতি একটা আন্তরিক টান সবসময়ই অনুভব করি । দেখলাম, এই সংবাদ পাঠিয়েছে আমার জেলার সংবাদদাতা । তাছাড়া বেশ চাঞ্চল্যকর সংবাদও বটে । আগ্রহ নিয়ে পুরো সংবাদ পড়ে তো আমি একদম ‘থ’ ! এ যে রফিক ! আমাদের গ্রামের রফিক ! রফিকের নাকি ছেলে সন্তান হয়েছিল । সেই সন্তানকে জন্মের এক সপ্তাহ পরে হঠাৎ করেই গলা টিপে মেরে ফেলেছে রফিকের বউ সালমা !
ব্যস্ততার কারণে তখন রফিককে ফোন করা হয় নি । পরে ভুলেই গিয়েছিলাম । কিন্তু তার কয়েকদিন পরেই খবর পেলাম, রফিকের বউও মারা গেছে ।
রফিককে সেদিন ফোন করেছিলাম । সান্তনা দিয়েছিলাম । যা হবার হয়ে গেছে ভেবে তখন আর রফিককে বেশি কিছু জিজ্ঞেস করিনি । তাছাড়া ঐ অবস্থায় বেশি কিছু জিজ্ঞেস করাটাও ভালো দেখায় না ।
তারপর মাসখানেক কেটে গেছে । গতকাল হঠাৎ রফিকের ফোন পেলাম । জানালো, সে নাকি ব্যবসার কাজে ঢাকা এসেছে । কয়েকদিন থাকবে ।
রাতে সময় করে আমার চেম্বারে একবার আসতে বলেছিলাম রফিককে । রফিক এলো রাত দশটার দিকে । ততক্ষণে আমার আজকের সব রোগী দেখা শেষ হয়ে গেছে । কেন যেন রোগীর চাপও অনেকটা কম ছিল আজ । সহকারীকেও বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছি ।
রফিকের কাছে ধীরে ধীরে পুরো ঘটনা শুনলাম ।
বছর তিন আগে সালমার সাথে বিয়ে হয় রফিকের । সালমা চেয়েছিল প্রথম বছরেই বাচ্চা নিতে । রফিকের অনিচ্ছাতেই কিছুটা দেরি । কিন্তু সালমা প্রতিদিন একবার হলেও বাচ্চার প্রসংগ তুলতো । কত পরিকল্পনা ! বাচ্চার নাম কী রাখবে, বাচ্চাকে কী খাওয়াবে, কীভাবে মানুষ করবে সারাদিন যেন এইসব নিয়েই ভাবতো সালমা ।
অথচ সেই সালমার কী হয়ে গেল ! ডেলিভারির কয়েকদিন পর থেকে সালমার মেজাজ অল্পতেই চটে যেতে লাগলো । দেখা গেল, বাচ্চার দিকেও তার অতটা নজর নেই তার । ঠিকমত বুকের দুধ খাওয়ায় না । বাচ্চা কান্নাকাটি করলেও ভ্রুক্ষেপ করেনা । আচার ব্যবহারেও নাকি অনেক পরিবর্তন এসেছিল । সবার সাথে খারাপ ব্যবহার করছিল । কখনো কখনো নিজে নিজে কথা বলতেও দেখা গেছে । মুরুব্বিরা বললেন, খারাপ বাতাস লেগেছে । এত সুন্দর ফুটফুটে বাচ্চা ! আর সালমাও তো কম সুন্দরী নয় !
কবিরাজ ডেকে তাবিজ নেয়া হলো । ‘পানিপরা’ ছিটিয়ে দেয়া হলো সারা বাড়িতে । কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না । সেদিন সকালবেলা হঠাৎ কী হতে কী হয়ে গেল, ফুটফুটে বাচ্চাটার গলা টিপে ধরে মেরে ফেললো সালমা ডাইনিটা ! তারপর মাটিতে শুইয়ে রেখে কীরকম ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকলো বাচ্চার লাশের দিকে ! ডাইনিটা যেন বুঝে উঠতে পারছিলনা, কী ভয়ংকর ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে সে !
এরপর সালমা একদম চুপচাপ হয়ে যায় । কয়েকদিন পরে এক রাতে মারা যায় সালমাও । সবাই ভেবেছিল, জ্বিনের আছরেই মারা গেছে সে ।
আরো কিছু প্রশ্ন করে সবকিছু জেনে নিলাম আমি । ঘটনার সবটুকু শুনে আমি বললাম, রফিক- তোর বউ সালমার কোন দোষ ছিলনারে । সে ডাইনি ছিলনা । খারাপ বাতাসও লাগেনি । ওর অসুখ করেছিলো, তোরা বুঝতে পারিসনি ।
রফিক আমার দিকে অবিশ্বাস নিয়ে তাকালো । বললো- ডাইনি ছাড়া কেউ নিজের জন্ম দেয়া এরকম ফুটফুটে একটা বাচ্চাকে গলা টিপে মারতে পারে?
বুঝিয়ে বললাম রফিককে, এটা ছিল এক ধরনের মানসিক রোগ । বাচ্চা ডেলিভারির পর ৬ সপ্তাহের মধ্যে মায়ের এরকম মানসিক বৈকল্য হতে পারে । একে বলা হয় পোস্ট পার্টাম সাইকোসিস । প্রতি পাঁচশ জনে এক জন মায়ের এই রোগ হতে পারে । এইসময় মায়ের হুশ জ্ঞান ঠিক থাকেনা । এমনকি বাচ্চার ক্ষতিও করতে পারে । সেজন্য প্রয়োজনে বাচ্চাকে সরিয়ে রাখতে হয় । আর চিকিৎসা করলে এই রোগ ভালো হয়ে যায় ।
আমার কথা শুনে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকলো রফিক । তারপর হঠাৎ টেবিলে মাথা রেখে হু হু করে কেঁদে ফেললো সে । আমার হাত জড়িয়ে ধরে ডুকরে উঠলো - ‘এ আমি কী করেছি রে দোস্ত’ । সালমা তো মরেনি রে । আমার বাচ্চাকে মেরেছে বলে সালমাকে আমিই গলা টিপে মেরে ফেলেছিরে । এ আমি কী করেছি দোস্ত...
চমকে উঠলাম আমি । রফিক ওর বউকে খুন করেছে !! সালমার মৃত্যু তাহলে স্বাভাবিক মৃত্যু ছিলনা ! বিষয়টা বুঝে উঠতে যেন কয়েক মুহূর্ত সময় লাগলো আমার ।
যাহোক,বুঝলাম বটে । কিন্তু এই মুহূর্তে ক্রন্দনরত রফিকের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আমার আর কিছুই করার থাকলো না ।

মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৪

রহস্য

-‘আপনি? আপনি কে?’
-‘আমি নেছার । নেছার উদ্দিন ভুইয়া । বারো ভুঁইয়ার ত্রয়োদশ উত্তরপুরুষ’ ।
-‘ও তাই ? তা আপনি এরকম শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছেন কেন ? ছ’মিলে ঢুকিয়ে কেউ এমন করেছে বুঝি ? আহারে !’
হাসতে শুরু করে মুনির এবং নেছার । নেছার মুনিরের দুই বছরের সিনিয়র । কিন্তু তবু ওদের সম্পর্কটা সিনিয়র জুনিয়রের গন্ডিতে আটকে নেই । যদিও সিনিয়র জুনিয়রের মধ্যেকার স্বাভাবিক স্নেহ ও শ্রদ্ধাবোধেরও ঘাটতি নেই দুজনের মধ্যে । ওদের সম্পর্কটাকে ভাই ভাই সম্পর্ক বললেও পুরোটা স্পষ্ট হয়না । এটাকে বরং ভাই ভাই ও সিনিয়র জুনিয়র সম্পর্কের একটা মিশেল অথবা তার চেয়ে বেশি কিছু বলা যায় ।
সিনিয়র হিসেবে নেছারকে মুনির আপনি করে বলবে এটা স্বাভাবিক, কিন্তু কীভাবে কীভাবে যেন নেছারও মুনিরকে আপনি করে সম্বোধন করাটাকে স্বাভাবিক করে নিয়েছে । চেহারায় দুইজন বলা চলে দুই প্রান্তের । মুনিরকে ঠিক শুকনা বলা চলেনা, তবে স্বাস্থ্যবানও বলা যায় না । মোটামুটি গোলগাল চেহারা । ওদিকে নেছার মেডিকেল কলেজের পুরো ক্যাম্পাসে দৈর্ঘ্যে প্রস্থে অদ্বিতীয় না হলেও ওজনে সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছে দুবছর আগেই । এজন্য অবশ্য বেশ কসরতও করতে হয়েছে তাঁকে । তখন ওর ওজন ছিল পচানব্বই । সেঞ্চুরির এত কাছে এসে ফিরে যাওয়ার কোন মানে হয় ? নেছার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে একশ কেজির মাইলফলক ছোঁবার । সেজন্য তাকে প্রায়ই দেখা যেতে লাগলো মেরিডিয়ানের বুফে ডিনারে । তারপর বছর ঘুরতেই ওজন গিয়ে দাঁড়ালো একশ পাঁচে । নেছারের চোখে তখন অন্যরকম তৃপ্তির আভা ফুটে উঠল । এই বিশেষ সংবাদ সবাইকে জানানোর জন্য একদিন একটা ঘরোয়া পার্টির আয়োজন করে ফেললো নেছার ।

মুনিরের খুব ভালো লাগে নেছারকে । এই ভালো লাগাটাকে মুনির তুলনা করে সমূদ্রভ্রমনের সাথে ।
সমূদ্রের তীরে দাঁড়ালে আমাদের কেন ভালো লাগে ? কেন দুঃখ কষ্টগুলোকে তুচ্ছ মনে হয় ? কেন সঞ্জীব গেয়ে ওঠেন- ‘ও পোড়া চোখ সমূদ্রে যাও !’
কারণ, সমুদ্র বিশাল ।
নেছারের শরীরটাই যে শুধু বিশাল তা নয়, মনটাও বিশাল ।
সেজন্যই, ভালো লাগে । বড় মনের মানুষের সাথে কথা বলতেই ভালো লাগে, নিজেকেও বড় বড় মনে হয় ।

এবার অনেকদিন পর দেখা হলো দুজনের । নেছারের ওজন কমে গেছে । দেখতে অনেক শুকনো লাগছে । কী ব্যাপার ? কোন সমস্যা নয়তো ?
ব্যাপারটা বেশ ভাবিয়ে তুললো মুনিরকে । কোন অসুখের কথাতো কানে আসেনি । কোন ব্যাপারে কি খুব দুশ্চিন্তা করছেন নেছার ভাই ? খাওয়া দাওয়ায় অনিয়ম করছেন ? খাওয়ার ব্যাপারে তো সহজে আপোষ করার কথা না নেছার ভাই !
নেছার ভাই নিজেকে ভোজন বিলাসী নয়, ভোজন রসিক বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন । বেশি খাওয়ার ব্যাপারে তাঁর হাতে আছে মোক্ষম যুক্তি। ‘আমার বডি সারফেস এরিয়া বেশি, মেটাবলিজম বেশি, আমার ক্যালোরি রিকোয়ারমেন্টও বেশি’ । ‘সুতরাং আমাকে বেশি করে খেতে হবে ! আর খাবই যখন, মজাদার এবং ভালো খাবারই খাবো !’
এটা কোনভাবেই বিলাসিতা নয় নেছার ভাইয়ের কাছে, এটা হলো ‘ভোজনরসিকতা’ !
অবশ্য নেছার ভাইয়ের দুশ্চিন্তা করার কারণ আছে । নেছার ভাই পরিবারের একমাত্র ছেলে । কিছুদিন আগে হঠাৎ করেই মারা যান নেছার ভাইয়ের বাবা । এখন পুরো পরিবারের দায় দায়িত্ব বলতে গেলে নেছার ভাইয়ের কাঁধে । বাবা মারা যাওয়ার ব্যাপারটা মুনিরের কাছে মনে হয়, চরম ঝড় জলোচ্ছাসে একটা ছাতা অথবা আশ্রয়কেন্দ্র উড়ে যাওয়ার মত । এরপর থেকে যত ঝড়ো বাতাস, শিলাবৃষ্টি, খড়কুটো বিদ্যুৎ চমক সবকিছু সরাসরি গায়ে এসে লাগে । শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যায়না । যদিও নেছার ভাই শুধু শারিরীকভাবেই নয়, মানসিকভাবেও অনেক শক্ত একটা ছেলে, কিন্তু তবুও হঠাৎ করে এতটা চাপ হয়তো তাকেও কষ্টে ফেলে দিয়েছে ।
নেছারের সাথে একান্তে আলাপ করার প্রয়োজন বোধ করে মুনির ।

-‘ভাই, এতদিন পরে এলাম । চট্টগ্রামবাসীর পক্ষ থেকে কীভাবে আপ্যায়ন করা হবে জানতে পারি কি?’ কৌতুকের স্বরে জিজ্ঞেস করে মুনির ।
-‘আপনি যা বলবেন তাই হবে’ । তাৎক্ষণিক জবাব দেয় নেছার ।
-‘হুম । তাহলে আজকের ডিনারটা আনলিমিটেড হয়ে যাক ! চলেন, কারো লস করে দিয়ে আসি !’

আটটার দিকে জিইসি মোড়ের দিকে চলে যায় মুনির ও নেছার । বাফে ডিনার খাওয়ার ব্যাপারে ওদের স্পেশাল সিস্টেম আছে । সাধারণত সবাই গিয়ে প্রথমে সুপ, ভেজিটেবল খায় । নেছার ও মুনির ওসবের ধারেকাছে ভিড়বে না । নো সুপ, নো রাইস । ডাইরেক্ট এটাক অন চিকেন ফ্রাই, রোস্ট, বিফ, মাটন, প্রন, আইসক্রিম এন্ড ফ্রুটস । এছাড়া অন্য কোন ভালো আইটেম থাকলে চেখে দেখা যেতে পারে ।
হিসেব করলে আল্টিমেটলি অন্তত এই দুজনের ক্ষেত্রে রেস্টুরেন্টের লসই হয়ে যায় ।

খেতে খেতে মুনির প্রশ্ন করে-
-‘নেছার ভাই, এখন কত ?’
-‘নাইন্টি এইট’ ।
-‘এনিথিং রং ?’
-‘নো’ ।
-‘কী করছেন ? খাওয়া কমিয়েছেন নাকি ব্যায়াম করছেন ?’
-‘আরে খাওয়া কমাবো কেন? এই যে এখন খাচ্ছি না ! খাওয়া কমালে কি আর এই পথে পা মাড়াই ?’
-‘তাহলে ?’
-‘প্রতিদিন সকালে প্যারেড মাঠে দৌড়াচ্ছি’ ।
কিছুটা উদাস হয়ে যায় মুনির । একসময় প্যারেড মাঠে মুনিরও দৌড়াতো । নেছার ভাইয়ের সাথে অনেকবার ম্যারাথনে অংশ নিয়েছে । হাউ মাচ স্ট্যামিনা ইউ হ্যাভ । প্যারেড মাঠের কিনার ধরে একটানা দৌড়ে কতবার মাঠ প্রদক্ষিণ করা যায় এই নিয়ে প্রতিযোগিতা হত দুজনের । মুনির হাল্কা পাতলা, দুইবার তো সে অনায়াসেই পারে । কিন্তু নেছার এতটা ওজনদার মানুষ হয়েও কম যায়না । প্যারেড কর্নার দুইবার চক্কর দেয়া মানে প্রায় চার কিলোমিটার । নেছারও দুইবার চক্কর দেয় মুনিরের সাথে । নেছারের স্ট্যামিনা সম্পর্কে আগে ঠাট্টা করলেও এর পরে আর সেটা করার সুযোগ থাকে না মুনিরের ।
-‘নেছার ভাই, মোক্ষম প্রশ্নটা কী জানেন?’
অনেক ক্ষণ পরে নাটকীয় ভাবে আবার কথা শুরু করে মুনির । নাটকীয়তা জিনিসটা ওর ভেতর ভালোমতই আছে । নাটকীয়ভাবে বিভিন্ন প্রসঙ্গে কথা শুরু করতে সে ওস্তাদ । নেছারের সাথে এত ভালো সম্পর্কের এটাও হয়তো একটা কারন । দুজনে একসাথে হলে দেশ বিদেশ আকাশ পাতাল সাহিত্য রাজনীতি ধর্ম ইতিহাস ভূগোল কোনটাই বাদ পড়েনা আলোচনা থেকে । নানারকম থিওরি নিয়ে ওদের আলোচনা চলতেই থাকে । বাংলাদেশ থেকে আমেরিকা, মিশর চীন এন্টার্কটিকা । দোয়েল কোকিল থেকে এমু পেঙ্গুইন । জীবনানন্দ থেকে গুন্টার গ্রাস । এরশাদ থেকে গাদ্দাফি । কোনকিছুই বাদ পড়েনা সে আলোচনায় । জাকির নায়েকের উত্থানের কারণ ও ফলাফল কী, ঈমাম মাহাদী কখন কীভাবে আসবেন, বিশ্বের পরিবর্তন কীভাবে হচ্ছে এসব বিষয়ে নেছারের ইউনিক থিওরি আছে । কতরাত যে ওরা শুধু এইসব আলোচনা করে পার করেছে তার ইয়ত্তা নাই । আজও হয়তো আলোচনা সেদিকেই এগোবে ।

-‘কোন্‌ প্রশ্নটা যে মোক্ষম সেটা আমি কীভাবে বুঝবো ?’ চোখ নাচিয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেয় নেছার ।
-‘প্রশ্নটা হচ্ছে, এইযে প্যারেড মাঠ চক্কর দিচ্ছেন, তা হঠাৎ ওজন স্তরে ফাটল ধরানোর কারণ কী ?’
মুচকি হেসে নেয় নেছার ।
-‘আমি জানতাম এই প্রশ্নটা আজকে আমাকে বিদ্ধ করবেই । সেজন্য মোকাবেলা করার প্রস্তুতি নিয়েই এসেছি !’
পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে নেছার । সুন্দর করে একটা নাম লেখা তাতে । নামটা পড়ে কিছু একটা আন্দাজ করে মুনির । তবুও অবুঝের মত প্রশ্ন করে সে । যদি আন্দাজ সঠিক হয়, তাহলে সে বিষয়ে নাদানের মত প্রশ্ন করাই যায় !

-‘এটা কী? কার নাম? আপনার বোনের?’
-‘আরে নাহ ! আমার বোনেরা যাকে পছন্দ করেছে তাঁর !’
লজ্জার আভা ছড়িয়ে পড়ে নেছারের চোখে মুখে । মুনির তবুও না বোঝার ভান করে । এইসব ব্যাপারে সহজে ছেড়ে দিতে নেই !
-‘কেন কেন? আপনার বোনেরা পছন্দ করেছে কেন? কে ইনি? আর কার জন্যেই বা পছন্দ করলো?’

নেছার এবার পকেট থেকে একটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি বের করে । বলে, ‘ইনিই সেই ব্যক্তি !’
এক পলক দেখে ছবিটা ফিরিয়ে দেয় মুনির । এক বিংশাদশীর ছবি ! দ্বাবিংশও হতে পারে !

নেছার লজ্জামিশ্রিত কন্ঠে বলে- ‘গত মাসে দেখাদেখি হয়েছে । সবকিছু ওকে হয়ে আছে । তবে...’
-‘তবে কী?’
-‘উনি বলেছেন, ওজন কমিয়ে নব্বইয়ের নিচে নামাতে হবে । সময় তিন মাস !’
-‘এই তাহলে ওজোন স্তরে ফাটল ধরার রহস্য?’ ...

হাসতে শুরু করে মুনির এবং নেছার দুজনেই ।
‘বিফ শেষ হয়ে গেছে’ বলে উঠে খাবার আনতে যায় নেছার । এটা যে লজ্জা ঢাকার উছিলা সেটা না বোঝার কোন কারণই আর অবশিষ্ট থাকেনা মুনিরের কাছে । ঐতো, কিঞ্চিৎ আরক্ত মুখটা পেছন থেকেও বেশ দেখা যাচ্ছে !

শুক্রবার, ৩ অক্টোবর, ২০১৪

গুলি

-স্যার, দশটারে গাড়িতে উঠাইছি ।
-ঠিক আছে, থানায় নিয়া যাও । বিস্ফোরক আইনে একটা মামলা রেডি করো । আর কেউ যোগাযোগ করতে আসলে কী করতে হবে বুঝাইয়া বইলো । আমার যেন  কিছু বলতে না হয় ।
-দুইজনের গুলি লাগছে স্যার, একজনের পেটে আরেকজনের পায়ে । এদের কী করুম স্যার ?
-আচ্ছা আগে থানায় লও । তারপর দেখা যাইবো ।
-স্যার এদের বয়স কম, অবস্থাও ভালো না ।
-আচ্ছা ঠিকাছে, ঐ দুইটারে হাসপাতালে পাঠাও ।
-জ্বি স্যার ।


***
জরি, আরেক কাপ চা দে ।

সকাল আটটা বাজতে বাজতে তিন কাপ চা খেয়ে ফেলেছেন আরিফ সাহেব ।  ইদানিং চা খাওয়া বেশি হয়ে যাচ্ছে । অবশ্য স্ট্রেস কিছুটা বেশি যাচ্ছে এখন । কিন্ত তাই বলে এত চা খাওয়া ঠিক না । ঘন ঘন প্রস্রাব হয় আজকাল, ডায়াবেটিস হয়ে গেল কিনা কে জানে ! চা খাওয়ার কারণেও হতে পারে, কিন্তু তারপরেও একবার সুগারটা চেক করে নেয়া দরকার । বাবা মা দুজনেরই ডায়াবেটিস ছিল, সেজন্যে ভয়টা বেশি ।

আরিফ সাহেব কোতোয়ালী থানার ওসি । পুলিশে যোগ দিয়েছিলেন একরকম  ক্ষোভের বশে । যুবক বয়সে একবার বিনা কারণে পুলিশের হাতে পড়েছিলেন । বাবা  গিয়ে ছাড়িয়ে আনার আগেই বেশ কিছু লাঠির আঘাত সইতে হয়েছিল তাকে । তারপর মাথায় জেদ চেপে গেল । আরো বিভিন্ন জায়গায় দেখেছেন, ডান্ডার ক্ষমতা ভালোই । বাঙালি ডাণ্ডাকেই একমাত্র ভয় করে । সিভিল পোষাকে একজন  ম্যাজিস্ট্রেট আর হাতে লাঠি নিয়ে একজন কন্সটেবল যদি পাশাপাশি হেঁটে যায়,  মানুষ কন্সটেবলকেই সালাম দিবে । ডান্ডা মানেই পাওয়ার । নানা কিছু ভেবে  শেষমেশ পুলিশেই জয়েন করেন তিনি ।

পুলিশে জয়েন করেই বুঝতে পারেন, জায়গাটা অত সোজা না । সবাইকে ডিল  করতে হয় । চোর বাটপার ছিনতাইকারী ডাকাত নেশাখোর চোরাচালান এইসব  নিয়ে কারবার । সারাক্ষণ এইসব নিয়ে থাকতে ভালো লাগে না । নিজের  মেজাজটাও কেমন খিটখিটে হয়ে গেছে আজকাল । বুঝতে পারেন, কিন্তু বেশিক্ষণ  ঠিক রাখতে পারেন না । থানার সবার সাথে সবসময় অর্ডার দিয়ে কথা বলতে হয়, আর উপরের অর্ডার স্যার স্যার করে শুনতে হয় । অর্ডার শোনা আর অর্ডার পালন  করা- এই হয়ে দাঁড়িয়েছে জীবন ।

কেউ অনুরোধ করে, কেউ টাকা সাধে, কেউ উপরের লেভেল থেকে ফোন করায় । প্রথম প্রথম একটা ইচ্ছা ছিল মনে- সমাজ থেকে অন্যায় দূর করবেন । দূর্নীতি  করবেন না । আসল অপরাধীদের চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা করবেন । কিন্তু এখন আর বলতে গেলে এর কোনটাই অবশিষ্ট নেই । ছিঁচকে অপরাধী ধরা যায়, বড়দের ধরা যায় না । দুএকজনকে ধরে খুশি হয়েছিলেন, ভেবেছিলেন সবাই প্রশংসা করবে  । প্রশংসা করেছিলও বটে । কিন্তু মাস না পেরোতেই হাতে এসেছিল বদলির অর্ডার । কখনো কখনো এমপি মন্ত্রীদের গালি শুনতে হয়েছে । থানা থেকেই ছেড়ে দিতে হয়েছে বড় বড় সন্ত্রাসীকে ।

প্রথম প্রথম টাকা নিতে পারতেন না । কিন্তু দিনে দিনে সব সয়ে এলো । একা টাকা না নিলে কী হবে, উপরে নিচে ঠিকই লেনদেন চলছে । ঐসব বন্ধ করার সামর্থ তার  নেই । দেখা গেল- তার নাম ভাঙ্গিয়ে টাকা নিচ্ছে এসআই-রা । তার চেয়ে অনেক ভালো অবস্থায় আছে এসআই দের পরিবার । ব্যাংকে বউয়ের নামে বিরাট অংকের টাকা, ছেলেমেয়েদের নামিদামি স্কুল কলেজে লেখাপড়া । একসময় তিনিও ঢুকে গেলেন সিস্টেমে । কাউকে কিছু বলতে হয় না । কীভাবে কীভাবে যেন এখানে একটা সিস্টেম দাঁড়িয়ে গেছে । দিনশেষে তার ড্রয়ারে কয়েকটা হলুদ খাম জমা হয়ে থাকে । বাসায় যাওয়ার সময় উনি শুধু সেগুলো ব্যাগে ঢুকিয়ে নেন । ব্যাস ।

আগে চোর ডাকাত ধরার একটা আগ্রহ উদ্দীপনা ছিল, ইদানিং সেটাও আর নেই তেমন । সরকারের নির্দেশ হলো- সরকার বিরোধী কোন কার্যক্রম সেটা রাজনৈতিক হোক কি অরাজনৈতিক- হতে দেয়া যাবে না । ফলে সবসময়ই থাকতে হয় সেই কাজে । আর আরিফ সাহেবের থানাটা হলো শহরের মূল থানা । যতসব পলিটিকাল মিটিং মিছিল সমাবেশ ভাংচুর হাঙ্গামা এই থানার এরিয়াতেই হয় । সব সময় খোঁজ রাখতে হয় কোথায় কখন মিটিং হচ্ছে, কোথায় মিছিল হচ্ছে এইসব । বিরোধী দলও এখন বেশ চালাক হয়ে গেছে । এরা অসময়ে মিছিল মিটিং করে । দুপুরে খাওয়ার পর একটু রেস্ট নেয়ারও সুযোগ পাওয়া যায় না । হঠাৎ খবর আসে- অমুক জায়গায় মিছিল শুরু করেছে ! সরকারী দলের লোকেরাই খবর দেয় । সকালে মিছিল করে, রাতে মিছিল করে । যখন তখন ফোর্স নিয়ে যেতে হয় । বেশিরভাগ সময়ই আসল মিছিলকারী কাউকে পাওয়া যায়না । পথচারী হোক আর যাই হোক ঘটনাস্থলের আশপাশ থেকে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয় । আর অসময়ে কষ্ট দেয়ার রাগ ঝাড়া হয় তাঁদের ওপর । এটা অবশ্য খারাপ না । বেশ কাঁচা টাকা পয়সা আসে ।
বিশেষ করে পাজামা পাঞ্জাবী পরা থাকলে বা মুখে দাড়ি থাকলে সুবিধা হয় ।

চা খেতে খেতে টিভিতে খবর দেখছিলেন আরিফ সাহেব ।  একটু পরেই বের হতে হবে । আজকের দিনটাও মনে হয় হাঙ্গামায় যাবে । সরকারের এক মন্ত্রী মুখ ফসকে বেফাঁস কথা বলে ফেলেছে । ইসলাম ধর্মের নামে উল্টাপাল্টা কথা বলেছেন । নবীর নামে উল্টাপাল্টা কথা বলেছেন । তার প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিলের ডাক দিয়েছে ধর্মীয় দলগুলি ।

বিরক্তি লাগছে আরিফ সাহেবের । তিনি নিজেও সরকারের সমর্থক । কিন্তু মন্ত্রী এমপিরা মাঝে মাঝে এমন এমন কথা বলে, মেজাজ খারাপ হয়ে যায় । ক্ষমতায় আছে পুলিশের ঘাড়ে পা দিয়ে, আবার বড় বড় কথা বলে । তাও আবার ধর্ম নিয়া । কোন মানে হয় ? এখন সামলাও ঠেলা । এইদেশের মানুষ এমনিতেই ধর্মকর্ম নিয়ে চিন্তিত না । কিন্তু আল্লাহ–রসুল–কোরআন–হাদীস নিয়া উল্টাপাল্টা কথা বললে মাথা গরম হয়ে যায় । আরিফ সাহেব নিজেও তেমন একটা নামাজ রোযা করেন না, কিন্তু ধর্ম নিয়া উল্টাপাল্টা কিছু বললে তারও আসলে ভালো লাগে না ।

থানা থেকে গাড়ি চলে আসবে কিছুক্ষণের মধ্যেই । ছেলেমেয়ে দুটাকে ওদের কলেজে-স্কুলে নামিয়ে দিয়ে অফিসে যেতে হবে । উপর থেকে অর্ডার এসেছে কোনরকম মিছিল মিটিং হতে দেয়া যাবেনা । প্রয়োজনে গুলি করতে হবে ।

আরিফ সাহেবের এক ছেলে এক মেয়ে । আরমান ও আনিতা । আরমান কলেজে উঠেছে , ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে । যথেষ্ট ভদ্র হয়েছে । মাঝে মাঝে নামাজও পড়তে যায় মসজিদে । ওর মায়ের কিছুটা পেয়েছে বোধহয় । লেখাপড়ায়ও ভালো ।  এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়েছে ।
মেয়েটা ছোট । ক্লাস ফাইভে উঠেছে এবার ।

‘বাবা আটটা বাজে । নয়টায় ক্লাস আছে আমার’ । তাগাদা দিয়ে গেল আরমান ।

সত্যিই আর দেরি করা যায় না । ডাইনিং এ খেতে বসলেন আরিফ সাহেব । ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খবর নিলেন । এই সময়টায় সবার সাথে একসাথে দেখা হয় । রাতে কখন আসতে পারেন তার কোন ঠিক নেই ।

গাড়ি চলে এসেছে । পোষাক পরে নিলেন আরিফ সাহেব । আরমান ও আনিতাকে নামিয়ে দিয়ে অফিসে যাবেন ।


***
-‘স্যার, স্যার । জ্বী স্যার । স্যার । কোন সমস্যা হবেনা স্যার’ ।

কমিশনার সাহেবের ফোন । আরিফ সাহেব শুধু শুনে গেলেন । এটাই নিয়ম । স্পষ্ট নির্দেশ, কোনরকম মিটিং শোভাযাত্রা হতে দেয়া যাবে না ।

ফোর্স রেডি করে বেরিয়ে পড়লেন আরিফ সাহেব । খবর এসেছে, পূর্বঘোষিত স্থানে জড়ো হতে শুরু করেছে মানুষ । কিছুক্ষণের মধ্যেই মিছিল শুরু করবে ।

ফোর্স সহ গিয়ে প্রথমে মাইকে ঘোষণা দিলেন জনতাকে ছত্রভঙ্গ হয়ে চলে যাবার জন্য । কিন্তু দেরি না করে তখনই মিছিল শুরু করে দিলো তারা ।
শুরু হলো লাঠিচার্জ । টিয়ার শেল ছুড়তে হলো । কিন্তু কোনভাবেই নিবৃত করা যাচ্ছেনা জনতাকে । বরং ওরাও ইট পাটকেল মারা শুরু করলো ।

এরপরই গুলি করার নির্দেশ দিলেন আরিফ সাহেব ।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল মানুষ । যে যেদিকে পারলো পালিয়ে গেলো ।

গ্রেপ্তারকৃতদের থানায় পাঠিয়ে নিজেও অফিসে চলে এলেন আরিফ সাহেব । এসেই শুনলেন আহত দুজনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে । বাকিদেরকে হাজতে রাখা হয়েছে ।

অফিসে বসে টিভিটা অন করলেন তিনি । কিছুক্ষণের মধ্যেই সাংবাদিকরা চলে আসবে মতামত নেয়ার জন্য । তার আগে একবার দেখা দরকার স্ক্রলিং এ ওরা কী দিয়েছে ।

রিমোট হাতে একের পর এক চ্যানেল চেঞ্জ করতে লাগলেন আরিফ সাহেব । অনেকগুলো স্যাটেলাইট চ্যানেল এখন । চ্যানেলগুলোতে সারা দেশের বিভিন্ন স্থানের সংঘাতের খবর দেখাচ্ছে । একটা চ্যানেলের পর্দায় চোখ পড়তেই সারা শরীরে একটা শীতল হাওয়া বয়ে গেল আরিফ সাহেবের। লাইভ দেখাচ্ছে, তাঁর এরিয়ায় তাঁর অধীনস্ত ফোর্সের গুলিতে আহত হওয়া দুইজনের একজন তাঁরই ছেলে আরমান । ভুলেই গিয়েছিলেন, ঐ পথ দিয়েই তো কলেজ থেকে ফেরার কথা আরমানের । স্পষ্ট দেখলেন তিনি, স্ট্রেচারের ওপর আরমানের নিথর দেহটা পড়ে আছে হাসপাতাল এমার্জেন্সির ভেতর । এমনও কি হতে পারে, আরমানও প্রতিবাদ মিছিলে গিয়েছিল ?

মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো আরিফ সাহেবের । ঝড়ের বেগে বেড়িয়ে গেলেন তিনি হাসপাতালের উদ্দেশ্যে ।

মঙ্গলবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

ছিন্নমুকুল

এতটুকু একটা বাচ্চা, এতটুকু শরীর । কতটুকুই বা বুকের খাঁচা ? ঠিকমত আঙুল বসানোর উপায় নেই । তবু বৃদ্ধাঙ্গুলি দুটি বুকের মাঝখানে দুইপাশে রেখে চাপ দেয়া শুরু করলো নোমান ।

রাত প্রায় তিনটা । ঘুমঘুম চোখে ডক্টরস রুমে বসে ছিল নোমান । দরজার পর্দাটা উড়ছিল ফ্যানের বাতাসে । মাঝে মাঝে শিশুর কান্না ভেসে আসছিল ।

নোমান একজন ডাক্তার । ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষা শেষ করার পরে একবছর ইন্টার্ণশিপ ট্রেনিং নিতে হয় । নোমান এখন ইন্টার্নশিপ করছে । গতকালই জয়েন করেছে হাসপাতালের এই ওয়ার্ডে । পেডিয়াট্রিকস ওয়ার্ড । এই ওয়ার্ডে এসে অনেকটাই মন খারাপ হয়ে গেছে নোমানের । ছোট ছোট বাচ্চাগুলি কতরকম কষ্টে ভুগছে , দেখতে ভালো লাগে না । ফুটফুটে পরীর বাচ্চার মত একটা শিশু, অথচ তার হার্ট ঠিকমত কাজ করছে না । কেউ কেউ ঠিকমত নিঃশ্বাস নিতে পারছে না ।

এতদিন মেডিসিন ওয়ার্ডে কাজ করেছে নোমান । কিন্তু তখন এতটা খারাপ লাগেনি । বড় মানুষেরা তাদের ব্যথার কথা বলতে পারে, শিশুরা পারেনা । তাদের কষ্ট থেকে যায় অব্যক্ত । এক কান্নার আওয়াজে কতটুকু বোঝানো যায় ? আর এই ব্যাপারটাই বেশি করে কষ্ট দেয় নোমানকে । শিশুর মা ছুটে আসে,  কেউ বলে ভাইয়া আমার বাবুটাকে একটু দেখেন – খুব কান্নাকাটি করছে । কেউ বলে, বাবা আমার নাতিডারে একটু দেইখা যাও । আমার ভালা ঠেকতাছে না । বুকটা ধ্বক করে ওঠে নোমানের । ইচ্ছে করে কোন এক জাদুর কাঠি বুলিয়ে সব বাচ্চার সব কষ্ট নিমেষেই দূর করে দেয় । ইচ্ছে হয় ; রুপকথার মত যদি বিপদ আপদে ঘেরা কোন এক অচিন পাহাড়ের চূড়ায়ও এমন কোন ওষুধ পাওয়া যেত, যা দিয়ে এইসব শিশুর কষ্ট দূর করা যায়- সব ছেড়েছুড়ে তার সন্ধানে বেরিয়ে পড়তো নোমান । কিন্তু সেরকম কিছু তো নেই । চিকিৎসাবিজ্ঞান সত্যি অনেকদূর এগিয়েছে । তবুও রয়ে গেছে অনেক সীমাবদ্ধতা । আর আমাদের দেশের মত তৃতীয় বিশ্বের একটি গরীব দেশে সেই সীমাবদ্ধতার কোন সীমা নেই ।

মাঝে মাঝে স্রষ্টার প্রতি অভিযোগ করতে ইচ্ছা হয় । খোদা যত কষ্ট দাও বড়দের । এই শিশুদের কষ্টে না রাখলেই কি নয় ?
কিন্তু তা করা যায়না । কারণ, স্রষ্টার জ্ঞান অসীম, স্রষ্টা নিজেই অসীম । তাঁকে প্রশ্ন করা চলে না । তাঁর ইচ্ছা তিনিই ভালো জানেন । মানুষকে যতটুকু জানানো হয়েছে এর বেশি জানতে পারবে না । বরং যতটুকু সামর্থ আছে তা দিয়ে মানুষকে ভালোর জন্য চেষ্টা করে যেতে হবে ।

একটা অবুঝ শিশুর জন্য বাবা মায়ের কতটা ভালোবাসা থাকে এই দু’দিনেই বুঝতে পেরেছে নোমান । সবাই যখন বারবার এটাসেটা জিজ্ঞেস করতে আসে, হয়তো কিছু কিছু কথা অপ্রাসংগিক – তবু সে বিরক্ত হয়না । বিরক্তি যে আসেনা তা নয় , কিন্তু যখনই ভাবে- ঐ শিশুটি হয়তো সারা পৃথিবীর কয়েকশত কোটি শিশুর একজন, হয়তো ওর কিছু হয়ে গেলে পৃথিবীর কিছু আসে যায়না – কিন্তু ঐ তরুণী মা’টির বুক শূন্য হয়ে যায় । তাঁর তো ঐ একটিই নাড়ী ছেড়া ধন ।

মায়েদের স্বার্থপরতা নিয়েও ভেবেছে নোমান । এখানে ডাক্তারের কাছে সব শিশুই তো রোগী, ডাক্তার রোগের গুরুত্ব ও জটিলতা অনুযায়ী গুরুত্ব দেবেন এটাই স্বাভাবিক । কিন্তু প্রতিটি মায়ের কাছে মনে হয়, তাঁর শিশুটিই সবচেয়ে কষ্টে আছে । তাঁর বাচ্চাটাকেই আগে দেখতে হবে । শুধু ডাক্তারের কাছেই যে দাবি করে তা নয়, এ নিয়ে নিজেরা নিজেদের ভেতর ঝগড়াও বাঁধায় তারা মাঝে মাঝে ।
নোমান এসব দেখে আর ভাবে , আহারে ভালোবাসা ! ভালোবাসা মানুষকে এরকম  স্বার্থপর বানায় !

একটা তরুণী মায়ের প্রথম সন্তানের প্রতি কতটা ভালোবাসা থাকে এখন সেটা বোঝার চেষ্টা করে নোমান । নিজে সে কিছুটা কাঠখোট্টা বলেই মনে করে নিজেকে । বড়বোন যখন ভাগ্নে ভাগ্নিদের জন্য খেটে মরে, প্রায়ই সে বলে – এত আহ্লাদের কী আছে আপা । বাচ্চাগুলাকে নিজের মত করে বড় হতে দাও ।
আপা বলেন, এখন তো বুঝবি না । নিজের হলে বুঝবি ।
নিজের কবে কী হবে সে তো অনেক পরের কথা , তবে এখানে এসে কিছুটা বুঝতে পারছে সে ।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক মেডিসিন বিভাগের সাথেই লাগোয়া  স্পেশালাইজড নিওনেটাল কেয়ার ইউনিট । সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নবজাতক  শিশুদের স্থান হয় এখানে । পুরো হাসপাতালের মধ্যে এইটা একটা ভয়ংকর জায়গা মনে হয় নোমানের । একজন বয়স্ক মানুষ মারা গেলে তবু হয়তো মেনে নেয়া যায়, কিন্তু একটা শিশুর মৃত্যু মেনে নেয়া যেন আরো কঠিন । অথচ প্রতিদিনই কত শিশুর মৃত্যু হচ্ছে ।

কার্ডিওলজির সিসিইউ কে দ্বিতীয় ভয়ংকর জায়গা মনে হয় ওর । মৃত্যু কীভাবে যে আসে যায়, ওখানে সেটা খুব ভালো করে বোঝা যায় । জ্বলজ্যান্ত মানুষ নিজের হাতের ওপর কীভাবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে সেই অভিজ্ঞতা নোমানের হয়েছিল সিসিইউ তে । হার্ট ফেইলুরের একজন রোগীকে সিপিআর (কার্ডিও রেসপিরেটরি রিসাসিটেশন) দিয়েছিল নোমান । বড় বড় চোখে নোমানের চোখের দিকে তাকিয়ে ছিল সে । তারপর সেভাবেই চলে যায় পরপারে । চোখ দুটো বুজে দিয়ে একজন পরাজিত মানুষের মত ফিরে এসে ডেথ সার্টিফিকেট লিখতে হয়েছিল নোমানকে ।

মেডিসিন ওয়ার্ডের একটা কিশোরের কথাও খুব মনে পড়ে । একদিন আগে সে বলেছিল- স্যার আমি বাচুম না, আমারে বাচান ।
কী আশ্চর্য, পরদিন সকালে গিয়ে নোমান দেখে ঐ বেডে অন্য রোগী । রাতেই মারা গিয়েছিল ছেলেটি ।
হাসপাতালে প্রতিদিনই চোখের সামনে দিয়ে কত লাশ পার হয়ে যায়, তবু কারো কারো মৃত্যু ভোলা যায় না ।

নিওনেটাল আইসিইউ তে প্রতি রাতে কয়েকটি শিশু মারা যায় । এখানে আজই প্রথম নাইট ডিউটি পড়েছে নোমানের । আজ যে কী হবে ভেবে হাত জমে যাচ্ছে ওর । কীকরে এই ফুলের মত ফেরেশতাগুলোর ডেথ সার্টিফিকেট লিখবে সে ?

এলোমেলোভাবে এসব কিছুই ভাবছিলো নোমান । এরই মাঝে ওয়ার্ড বয় এসে ডাক দিলো । স্যার, চার নম্বর বেবিটা নিঃশ্বাস নিতেছে না ।
চার নম্বর বেডে একটা মেয়েশিশু ভর্তি । প্রিম্যাচিউর বেবি উইথ ভেরি লো বার্থ ওয়েট । বারবার এপনিক (নিঃশ্বাস আটকে যাওয়া) হয়ে যাচ্ছে । কতক্ষণ টিকবে বলা মুশকিল ।

দৌড়ে গেল নোমান । এতটুকু একটা বাচ্চা, এতটুকু শরীর । কতটুকুই বা বুকের খাঁচা ? ঠিকমত আঙুল বসানোর উপায় নেই । তবু বৃদ্ধাঙ্গুলি দুটি বুকের মাঝখানে দুইপাশে রেখে চাপ দেয়া শুরু করলো নোমান । একজন নার্সকে লাগিয়ে দিল আম্বু ব্যাগ টিপতে । এই মুহূর্তে কেন জানি মনে পড়ে গেল ওর সেই ছোটবোনটির কথা যার কথা এখন আর মনে পড়ে না ।

নোমানের বয়স যখন চার কী পাঁচ তখন ওর একটি বোন হয়েছিল । এক সপ্তাহের মাথায় সেই বোনটি মারা যায় । সেই পিচ্চির মুখটা কেমন ছিল ? মনে পড়ে না নোমানের ।  মনের জানালা ধরে উঁকি দিয়ে গেছে, যার চোখ তাকে আর, মনে পড়ে না । শুধু মনে পড়ে মা খুব কেঁদেছিলেন সেদিন । পিচ্চিটাকে বাড়ির পেছনের গোরস্তানে একটা ছোট্ট কবরে রাখা হয়েছিল । সবার পেছনে পেছনে গুটিগুটি পায়ে নোমানও গিয়েছিল । এখন আর সে কবরটাকেও আলাদা করে চেনা যায় না । ভাইবোনেরাও কেউ ওর কথা স্মরণ করেনা । মা নিশ্চয়ই ওকে ভোলেননি , কিন্তু মা-ও আর কখনো ওর প্রসংগ তোলেননা ।

সে যেন চলে গেছে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘ছিন্নমুকুল’ এর মত-

সব-চেয়ে যে ছোট কাপড়গুলি
সেগুলি কেউ দেয় না মেলে ছাদে,
যে শয্যাটি সবার চেয়ে ছোট
আজকে সেটি শূন্য পড়ে কাঁদে,
সব-চেয়ে যে শেষে এসেছিলো
সে গিয়েছে সবার আগে সরে
ছোট্ট যে জন ছিলো রে সব চেয়ে
সে দিয়েছে সকল শূন্য করে।

নোমানের হঠাৎ মনে হতে লাগলো, আচ্ছা ওর মুখটা কি এই বেবিটার মত ছিল ?
এখানে অন্য সময় সব বাচ্চাকে একই রকম লাগে । সেজন্য কারো চেহারার দিকে ঠিক আলাদা করে খেয়াল করা হয়না । সিপিআর দিতে দিতে নতুন করে বেবিটার মুখের দিকে তাকালো নোমান । নীল হয়ে আছে ছোট্ট মুখটা । একটু দূরেই বেবিটার মা দাঁড়িয়ে আছে মুখে আঁচল দিয়ে । হতভম্ব, কিংকর্তব্যবিমূঢ় । এই মুহূর্তে তাঁর অনুভূতি কেমন, পৃথিবীর কেউ হয়তো তা বুঝতে পারবে না ।

বেবিটার অতটুকু বুকে চাপ দিতে দিতে নোমানের মনে হতে লাগলো, যেন সে ওর সেই নাম না জানা , মুখ না চেনা , হারিয়ে যাওয়া বোনটিকেই বাঁচানোর জন্য  সংগ্রাম করছে ।

[ফুটনোটঃ সত্যিই আমার একটি ছোট বোন জন্মের কয়েকদিনের মাথায় মারা গিয়েছিল । ওর কোন নাম ছিলনা । তখন ছোট ছিলাম । এখন আর সত্যি সত্যি শত চেষ্টা করেও আমি ওর মুখের ছবিটা মনের পটে  আঁকতে পারিনা ।]

রবিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

যদি কানে কানে কিছু বলে বঁধূয়া...

যদি কানে কানে কিছু বলে বঁধূয়া
সবই শুনে শুনে যেতে হবে...
যদি আসি আসি করে দেরি করে সে
দিন গুনে গুনে যেতে হবে...

বিছানায় বসে গুনগুনিয়ে গাইছিলো রতন । সামনেই ‘একজন’ আয়নার সামনে  দাঁড়িয়ে সাজগোজ করছে মনোযোগ দিয়ে । রতন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেদিকে । হঠাৎ করে সাজগোজে মগ্ন ‘একজনের’ খেয়াল হলো ব্যাপারটা । আয়নার দিক থেকে না মুখ ঘুরিয়েই বললো- এইভাবে তাকায় না থেকে এইবার একটু পলক ফেলা যায়না রাজামশায়?
রতন নিচুস্বরে জবাব দিলো-
-'আমার কী দোষ ? কবিই তো বলেছেন- তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি, সেকি মোর অপরাধ ? আর তাছাড়া রাণীর সাজগোজ দেখাটাও তো সৌভাগ্যের ব্যাপার !'
-বসে বসে গান গাওয়া হচ্ছে কেন সেটা তো আমরা বুঝি ! এহ, শখ কত ! মুখে বলার তো সাহস নাই । গান গেয়ে ইঙ্গিত দেয় !
যেভাবে সে সাজাবে , সাজবো যে সেভাবে, সুখ দুঃখ সবই মেনে নিতে হবে !
ওয়ার্ড রোব থেকে নীল শাড়িটা বের করতে করতে বিদ্রুপাত্মক সুরে পরের কয়েকটি কলি গায় অবনী ।

নীল শাড়ি রতনের পছন্দের । বিশেষ বিশেষ দিনে নীল শাড়ি পড়াটা এই দম্পতির নিয়ম । অবনীরও পছন্দ, কিন্তু সেটা সে মুখ ফুটে কখনো বলে না । রতনকে বলে, 'দেখো- আমি কিন্তু শুধু তোমার কথা চিন্তা করেই নীল শাড়ি পড়েছি !' এটা একধরণের ছলনা কিনা কে জানে ! কিন্তু অবনীর মনে হয়, ভালোবাসার প্রয়োজনে কিছুটা ছলনা করাই যায় !

আজকের দিনটায় একটু মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে দুজনের ভেতরেই । কিছুটা আনন্দ । কিছুটা বিষাদ । কালই ঢাকা ছাড়তে হবে অবনীকে । রতন এবং অবনী দুজনেই ডাক্তার । এবার অবনীর বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে নিয়োগ হয়েছে । আগামীকালই জয়েন করতে হবে । পোস্টিং দিয়েছে গ্রামে । অবশ্য নিজেরই গ্রাম । নিজের বাড়িতে থেকেই অফিস করতে পারবে । এদিকে রতন পোস্ট গ্রাজুয়েশন ট্রেনিং করছে ঢাকা মেডিকেলে । ট্রেনিং গ্যাপ দেয়া যাবেনা । সুতরাং বলতে গেলে আপাতত বিচ্ছেদ ।  রতন মাঝে মাঝে ছুটি পেলেই চলে যাবে । কিন্তু... প্রতিদিনতো আর দেখা হবে না । সকাল বিকাল ঝগড়া করা হবেনা । ঝগড়া করতে না পারাটাও যে মন খারাপের কারণ হতে পারে, এর আগে কখনো মনে হয়নি রতনের ।

প্ল্যান করেছে আজ বিকালটা ওরা রিক্সায় করে ঘুরবে । যান্ত্রিক শহর হলেও ঢাকার প্রতি কেমন একটা মায়া জন্মে গেছে অবনীর । অথচ বিয়ের আগে সে একপ্রকার শর্ত দিয়ে বসেছিল, আর যেখানেই হোক, ঢাকায় থাকা চলবে না । ধুলোবালি জ্যাম যান্ত্রিকতার শহরে থাকতে কোনভাবেই ইচ্ছুক ছিলনা অবনী । বিয়ের পর কিছুদিন গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে ছিল । তারপর রতন ঢাকায় নিয়ে আসে । বলেছিল, ‘কিছুদিন থাকো । যদি ভালো না লাগে তখন নাহয় অন্য ব্যবস্থা করবো’ । কিন্তু সেইযে ঢাকায় এলো, এরপর কীভাবে কীভাবে যে কয়েকটা বছর চলে গেল । ঢাকা শহরটা এখন আর খারাপ লাগে না । বরং গ্রামে গেলেই কেমন যেন খালি খালি লাগে । সবখানেই একটা নাই নাই ভাব । কেমন যেন হাহাকার ।

কিন্তু এখন যেতে হচ্ছে । প্রথমে ভেবেছিল জয়েন করবে না । কেমন লাগবে কে জানে ! কিন্তু রতন সাহস দেয়, ‘আপাতত জয়েন করে দেখো । ভালো না লাগলে পরে দেখা যাবে!’
অবনীও ভেবেছে, নিজের উপজেলা , নিজের গ্রাম । হয়তো খারাপ লাগবে না ।  যদিও ভাইবোনেরা কেউ বাড়িতে নেই । লেখাপড়া , চাকরির প্রয়োজনে সবাই বিভিন্ন জায়গায় । বাবা মা তো আছেন । বাবা মায়ের সাথে থাকা হবে এটাই বা কম কিসে ? এখন যদি একটু সেবাযত্ন করতে পারে সেটাতো সৌভাগ্যের ব্যাপার । ক’টা মেয়ের ভাগ্য হয় শেষ বয়সে বাবা মায়ের সেবা করার ? আর তাছাড়া নিজের গ্রামের মানুষদের চিকিৎসা দিতে পারবে । এইসব ভেবে অবশেষে জয়েন করার সিদ্ধান্তই নিয়েছে অবনী ।
আজ বিকেলটা একসাথে ঘুরে ফিরে রাতের বাসে রওনা দেবে গ্রামের উদ্দেশ্যে । সাথে লাগেজপত্র থাকবে না বেশি । কিছু কাপড় চোপড় , এই ।

আধাঘন্টা পরে ওরা  বাসা থেকে বের হলো । একটা রিক্সা ডেকে উঠে পড়লো । রিক্সাওয়ালা বয়স্ক মানুষ । অবশ্য বয়স্ক মানুষ দেখেই তার রিক্সায় উঠেছে ওরা । বয়স্ক একজন মানুষ রিক্সা চালাচ্ছে, নিশ্চয়ই নিরুপায় হয়েই । কেমন চুপচাপ ধরণের লোকটা । হয়তো ছেলেপুলে নেই । অথবা থাকলেও বৃদ্ধ বাবার ভরনপোষণ দেয় না ।

অবনীকে দেখে কয়েকটা চ্যাংড়া রিক্সাওয়ালা জিজ্ঞেস করেছিল- আপা কই যাইবেন ? এইটা এদের একটা বদভ্যাস । অথবা বলা যেতে পারে বাঙ্গাল চরিত্র । যদি দেখে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে বা রিক্সা খুঁজছে, এরা যেচে এসে সাধবে- আপা কই যাইবেন ? অথচ পুরুষ মানুষ যদি জিজ্ঞেস করে, যাইবা ? এরা ঘেট হয়ে বসে থাকবে । যামুনা ।

একদিন তো এক রিক্সাওয়ালাকে হাতে নাতে লজ্জা দিয়েছিল রতন । ব্যাটা ধানমন্ডি যাবেই না । একটু পর অবনী গিয়ে ওকে জিজ্ঞেস করে- যাবেন ? এইবার তো রিক্সাওয়ালা রাজী ! অবনী রিক্সায় উঠে বসলে আড়াল থেকে রতনও এসে সেই রিক্সায় উঠে পড়ে । বলে- মামা চলেন !
সেদিন বেচারা রিক্সাওয়ালার মুখটা হয়েছিল দেখার মত!

বয়স্ক রিক্সাওয়ালা জিজ্ঞেস করলেন, বাবা কই যামু ?
রতন বললো, চাচা চলেন আপনের যেইখানে ইচ্ছা !

এটাও একধরণের খেলা । একসাথে বের হলে মাঝে মাঝেই ওরা এই খেলা খেলে । কোথায় যাবে কিছু মনস্থির না করেই রিক্সায় উঠে পড়ে । তারপর সিদ্ধান্তের ভার ছেড়ে দেয় রিক্সাওয়ালার ওপর । বেচারি রিকশাওয়ালা পড়ে মহা ফ্যাসাদে । ‘কোথায় যাবো ?’ এই সিদ্ধান্ত নেয়াটা আসলে সহজ কাজ না । আসলে কোন সিদ্ধান্ত নেয়াই সহজ কাজ না ।  বেশিরভাগ সময়েই দেখা যায় রিক্সাওয়ালা হার মেনে যায় । আজকের রিক্সাওয়ালাও হার মানলো । অবশ্য এই লোকের হার মানারই কথা । জীবনযুদ্ধে হারতে হারতেই তো এতদূর চলে এসেছেন ।
রিক্সাওয়ালা চাচা বললেন, বাবা কইয়া দেন কই যামু ।
রতন সহজ সমাধান দেয় , যান চাচা। সামনের দিকে যান । যেদিকে দেখবেন রাস্তা খালি, জ্যাম নাই- সেইদিকে যাইবেন ।

রিক্সায় উঠে হঠাৎ কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছে দু’জনই । সাময়িক বিচ্ছেদ, এটুকুও মানতে চায়না মন । মনে তোলপাড়, কত কথার তুফান ছুটছে । অথচ মুখে আসছে না কিছুই ।
রতন পড়েছে সাদার ওপর নীল স্ট্রাইপের শার্ট । রিকশার বাম পাশের সিটে বসেছে সে, ডান পাশে অবনী । অবনীর কোলের ওপর ওর লাল ভ্যানিটি ব্যাগ ।
-‘কী হলো ? কিছু বলছো না যে ?’ অধৈর্য হয়ে কাতর কন্ঠে জিজ্ঞেস করে রতন । এটা রতনের কথা শুরু করার স্টাইল । বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায় রতন নীরবতা ভাঙ্গে এই কথার মাধ্যমে ।
অবনী বলে ,
-কী বলবো ? আমার কিছু বলার নাই ।
-আরে কী তাজ্জব ! কিছু বলার নাই মানে ? কেমন লাগছে অন্তত সেটা বলো ।
-বলার কী আছে ? আমার কেমন লাগছে সেটা তোমার অজানা না ।

এই এক সমস্যা । মেঘপিয়নের ব্যাগের ভেতর মন খারাপের দিস্তা । মন খারাপ হলে কুয়াশা হয়, ব্যাকুল হলে তিস্তা । এখন অবনীর মন খারাপ । আকাশ বাতাস কুয়াশাচ্ছন্ন । বেশি কথা বলা যাবে না । তিস্তা হয়ে যেতে পারে । রাস্তার মাঝখানে রিক্সায় বসে একটা মেয়ে কাঁদছে ব্যাপারটা নিশ্চয়ই ভালো দেখাবে না ।
স্রষ্টা যে এঁদের মনে কেন এত আবেগ দিয়েছেন তিনিই ভালো জানেন । সেই এসএসসির পর থেকেই তো রতন বাড়ির বাইরে । প্রতিবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে ক্যাম্পাসে ফেরার সময় সে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে একমনে হেঁটে চলে যেত । কারণ, ফিরে তাকালেই দেখা যেত, আঁচলে মুখ ঢেকে মা কাঁদছেন । গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছোটবোনটা কাঁদছে । সত্যি বলতে- রতনের বুকটাও যে গুমরে উঠতো না তা নয় । একবার তো ভুলে পেছন ফিরে তাকিয়ে সেও কেঁদে ফেলেছিল । সেবার আর যাওয়া হয়নি । বাসের টিকেট ক্যান্সেল করে পরে আরেকদিন যেতে হয়েছিল ।

এই মুহূর্তে রাস্তাটা বেশ ফাঁকা । মাঝে মাঝে দুএকটা প্রাইভেট কার হুসহাস করে চলে যাচ্ছে । পকেট থেকে মোবাইল বের করে রতন । হেডফোনের একটা এয়ারপিস জুড়ে দেয় অবনীর বাম কানে , নিজের ডান কানে আরেকটা ।
তারপর প্লে করে ওর খুব পছন্দের একটা গান । এই গানটা শুনলে অবনীরও মন ভালো হয়ে যায় ।

'যদি হিমালয় আল্পসের সমস্ত জমাট বরফ, একদিন, গলেও যায় । তবুও তুমি আমার । যদি নায়াগ্রা জলপ্রপাত,  একদিন, সাহারার কাছে চলেও যায়... যদি প্রশান্ত মহাসাগরের, একফোঁটা, জল আর নাও থাকে । যদি গঙ্গা ভলগা হোয়াংহো, নিজেদের শুকিয়েও রাখে...যদি ভিসুভিয়াস ফুজিয়ামা, একদিন, জ্বলতে জ্বলতে জ্বলেও যায়...তবুও তুমি আমার । যদি পৃথিবীকে ধ্বংস করতে একদিন তৃতীয় মহাযুদ্ধ বাঁধে , যদি নিভেও যায় কোনদিন, যতটুকু আলো আছে, ওই সূর্য আর চাঁদে...'

তন্ময় হয়ে গান শুনছিল দুজনেই । হঠাৎ আর্তচিৎকার করে উঠলো অবনী । একটা প্রাইভেট কারের জানালা দিয়ে ওর ভ্যানিটি ব্যাগ ধরে টান দিয়েছে ছিনতাই কারী ।  কিছু বুঝে ওঠার আগেই রতন দেখলো অবনী রিক্সা থেকে পড়ে যাচ্ছে । একটা হাত ধরার চেষ্টা করে রতন, কিন্তু শেষ রক্ষা হলোনা । অবনীর মাথাটা গিয়ে ঠেকলো পিচঢালা রাস্তায় । আর ঠিক তখনি পেছন হতে বেপরোয়া আরেকটি কারের ধাক্কা লাগলো অবনীর শরীরে । কয়েক ফোঁটা রক্ত ছিটকে এসে পড়লো রতনের সাদা শার্টে ।

[উৎসর্গঃ ডাঃ সানজানা জেরিন । চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে আমার দুই ব্যাচ সিনিয়র এই আপু কিছুদিন আগেই এমনি এক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।  এখনো স্বাভাবিক হয়নি তাঁর জীবন । যদিও আমার সাথে কখনো পরিচয় হয়নি, তবুও তাঁর এই দূর্ঘটনার কথা আমি ভুলতে পারিনা ।]

সোমবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

চুরি



গাড়ি জ্যামে আটকে আছে কতক্ষণ ধরে । এই সময়টায় বাচ্চাদের স্কুল ছুটি হয় , আর ধানমন্ডির এই রাস্তাটাতে ধুন্দুমার জ্যাম লেগে যায় । জ্যামে বসে থেকে বিরক্ত হতে হতে এখন সে অনুভূতিটাও কেমন থিতু হয়ে এসেছে । ভালো স্কুল মানেই কি স্কুলের সামনে জ্যাম থাকতে হবে ?
             
তবু রক্ষা যে আজকের দিনটার আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা । আকাশে কিছু সাদা মেঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে । মেঘ ছাড়া বাকিটা ঝকঝকে নীল আকাশ । জ্যামে বসে আকাশ দেখা ! কী আর করা , তাও ভালো !
জানালাটা খুলে দেয় রেখা । রুনুটা এতক্ষণ মোবাইল নিয়ে খেলছিল , গাড়ির জানালা খুলতে দেখে মোবাইল রেখে বাইরে তাকালো । আর এমন সময়ই কোত্থেকে যেন এলো লোকটা । হাতে কয়েকটা পুতুল । এমন পুতুল সত্যিই আগে কখনো চোখে পড়েনি রেখারও । রুনু চেঁচিয়ে উঠলো, এই আংকেল – একটা পুতুল আমাকে দেবে ?

রুনু ক্লাস ওয়ানে পড়ছে । পুতুল যে খুব একটা ভালোবাসে তা না । এখনকার বাচ্চারা ছোটবেলা থেকেই মোবাইল, টিভি, কম্পিউটার এইসবে আসক্ত হয়ে পড়ছে । ওদেরও বা উপায় কী ? স্কুলের সময়টা ছাড়া সারাটা দিনই তো বাসায় একপ্রকার বন্দী । খেলার মাঠ কোথায় ? খেলার সাথীই বা কোথায় ? সেই জায়গাটা দখল করছে ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতি ।   
রেখা ভেবেছিল লোকটা হয়তো তার নিজের বাচ্চার জন্য কোথাও থেকে কিনেছে পুতুলগুলি । লোকটাকে জিজ্ঞেস করে জানবে, কোথায় পাওয়া যায় । কিন্তু লোকটা এসে জানালো এগুলো বিক্রি করার জন্যই ফেরি করছে সে । লাল আর নীলের কম্বিনেশনে একটা পুতুল পছন্দ করে রুনু ।
সেই থেকে পুতুলটা ছিল রুনুর সর্বক্ষণের সঙ্গী । তুলতুলে নরম শরীর, মাথায় কী সুন্দর চুল । লাল টুকটুকে একটা ফ্রক পড়া । আর নীল রঙের চোখ দুটো কী মায়াবী ! যেন জীবন্ত বাচ্চার চোখ ।
পুতুলটা সুন্দর ছড়া আবৃত্তি করতে পারতো ! টুইংকেল টুইংকেল লিটল স্টার , কানা বগির ছাঁ, টেডি বিয়ার, আয় আয় চাঁদ মামা, ঝুমকো জবা বনের ফুল । রেকর্ড সেট করা ছিল ভেতরে, পুতুলটার কানমলা দিলে এই ছড়াগুলো আবৃত্তি করতো । ওর একটা নামও দিয়েছিল রুনু । নিজের নামের সাথে মিল রেখে পুতুলের নাম রেখেছিল ‘ঝুনু’ । যেখানেই যায় ঝুনুকে কোলে করে নিয়ে যায় । শুধু স্কুলে যাওয়ার সময় বিছানায় শুইয়ে রেখে যায় ঝুনুকে ।

এসবই একমাস আগের কথা । আপার কাছে রুনুর পুতুল কেনার কথা আগেই শুনেছিলাম । একটু আগেই ওদের বাসায় চুরির খবরটা পেলাম । বাসার সব কিছু ঠিক আছে । শুধু আপার গয়নাগুলো নেই ! আর একটা জিনিস নেই , সেটা হলো রুনুর পুতুলটা । অবাক কান্ড !
রুনুর জন্য কষ্ট বেশি হচ্ছে । পুতুলটা রুনুর খুব পছন্দের ছিল । গত মাসেই কিনেছিল । রুনুর কাছে পুতুলটার কথা কত শুনেছি । দুইমিনিট কথা বললে তার এক মিনিট রুনু কথা বলতো ওর পুতুলটাকে নিয়ে । পুতুলটাকে দেখার আমারও খুব ইচ্ছে ছিল ।
আজ রেখা আপা স্কুল থেকে রুনুকে নিয়ে বাসায় ফিরে দেখে রুনুর পুতুল নেই । সবগুলো ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোথাও না পেয়ে কিছুটা অবাকই হয় আমার বড় বোন রেখা । কানের দুল খুলে রাখতে গিয়ে টের পায় আলমারির ড্রয়ারে বাকি গয়নাগুলোও নেই । তারপরই আমাকে ফোন করে ।


আমি হলাম ওর সার্বক্ষণিক উপদেষ্টা । যেকোন সমস্যায় সে আমাকে ফোন করবেই । আর আমি যা সমাধান দেবো সেটাই করবে । আমার ওপর ওর এতটা বিশ্বাস দেখে অবাক হয়ে যাই । মাঝে মাঝে একটু ধমকও দেই, ‘তুমি নিজে একটুও চিন্তা করোনা কেন ? তোমার মাথাটা একটু খাটাতে পারোনা ?’
আবার মনে হয়, হয়তো এটাই ওর ভালোবাসা । এটা সেটার ছলে আমার সাথে কথা বলে । মা বলেন, আমি যখন ছোট ছিলাম, আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝতো না রেখা আপা । ভাইই ছিল ওর সব । বড় হয়ে আমি যখন মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে বাসা ছাড়লাম, সেকি কান্না ওর ।

আজ বেচারির সব গয়না চোরে নিয়ে গেছে । গয়নার প্রতি ওর আকর্ষণটা ছিল অদ্ভুত । সব মেয়েরই নাকি গয়নার প্রতি আকর্ষণ থাকে, কিন্তু ওরটা আমার কাছে কেমন যেন বেশি বেশি মনে হত । কে জানে, নিজের বোন বলেই হয়তোবা ! যাহোক, ওর জন্যে খারাপই লাগছে আমার ।

একটু আগে আমাকে ফোন করেই সেকি ভেউ ভেউ করে কান্না । দুলাভাইও আমাকে ফোন করে বললেন, তুমি তাড়াতাড়ি গিয়ে ওদেরকে সামলাও । কী হয়েছে দেখো । আমি শহরের বাইরে । সন্ধ্যার আগে ফিরতে পারবো না ।

কী আর করা । যাচ্ছি এখন বোনের বাসায় । রুনুও ফোনে অনেক কান্নাকাটি করলো । আহা, ওর প্রিয় পুতুলটা চোরে নিয়ে গেছে । চোরটা কীরকম বেরসিক, একটা বাচ্চার খেলনা পুতুলটাও নিয়ে গেলো !

২।
নাস্তা করছি । আপার স্পেশাল রেসিপি । চুরির ঘটনার পর গতকাল অনেক স্বান্তনা দিয়ে অবশেষে কিছুটা শান্ত করতে পেরেছি । যা হবার হয়ে গেছে, এখন কান্নাকাটি করলে কি গয়না ফেরত পাওয়া যাবে ?
রুনুর আজকে স্কুল ছুটি । আজ রুনু আমার সাথে সাপ লুডু খেলবে ।
খাচ্ছি আপার বানানো বিশেষ রেসিপির নাস্তা । এই খাবারের নাম আমি জানিনা । তবে একটু পরেই জানতে পারবো ।
আপা মনোযোগ দিয়ে টিভিতে রান্নার অনুষ্ঠান দেখে । বাজারে রেসিপির বই পেলেই কিনে নিয়ে আসে । আর ওর সব নতুন নতুন রেসিপি টেস্ট করায় আমাকে দিয়ে । ফুড ক্রিটিক হিসেবে আমি আমার মূল্যবান বক্তব্য পেশ করি । পেশ করি মানে শুধু যে মুখে বলি তাই নয়, আপার একটা ডায়েরি আছে । সেখানে ও লিখে রাখে কোনদিন কী নতুন রেসিপি রান্না করেছে ! আর তার নিচে নীল কালির একটা কলম দিয়ে খাদকদের মন্তব্য লিখতে হয় ! আপা নিজের মন্তব্য লেখে । দুলাভাইর কাছ থেকে মন্তব্য লিখে নেয় । রুনুর মন্তব্যও নেয় । আর স্পেশাল ফুড ক্রিটিক হিসেবে আমার মন্তব্য ।

খাবার যেমনই হোক, আমি সবসময় লিখি ‘অসাধারণ খাবার ! এমন সুস্বাদু খাবার আমি জীবনে খাইনি !’ তারপর নিচে একটানে আমার বিখ্যাত বাঁকা তেড়া সাইন করে দিই ।
গতরাতে সেই ‘খাদ্যবিলাস’ খাতাটা নিয়ে দেখেছি, বিগত বেশকিছু মন্তব্যে আমি এই একই কথা লিখেছি । এবার একটু হলেও নতুন কিছু লিখতে হবে ।

কী লিখবো ভাবছিলাম , এমন সময় আমার কানে এলো রেখা আপার উত্তেজিত কন্ঠ । ‘বলেন কী ভাবি ?’ আপনাকে তো জানানোই হয়নি , কাল আমারও সব গয়না চুরি হয়ে গেছে । আর রুনুর পুতুলটা ।
বলেন কী ? রিমিরও পুতুল নিয়ে গেছে ?
না না , সবকিছুই তো ঠিকই ছিল । চোর দরজা খুলেছে মাস্টার কী দিয়ে । কোনকিছুতে হাত দেয়নি ভাবি, শুধু গয়নাগুলো আর পুতুলটা । হ্যা হ্যা । ...

আরো কীসব কথা বলতে লাগলো ও । আমি চুপচাপ খেয়ে হাত ধুয়ে ফেললাম । ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে । রুনু এখন ওর রুমে একা একা সাপ-লুডু খেলছে । রুনুর কাছে গিয়ে আমি রুনুকে জিজ্ঞেস করলাম- রুনু, রিমি কে রে ? রুনু বললো – রিমি ? রিমি আমার ক্লাসের বন্ধু । মামা জানো রিমি না...’
‘রিমিরও কি তোমার মত পুতুল আছে ?’ আমি রুনুকে থামিয়ে দেই । প্রশ্নটা আমার জন্যে গুরুত্বপুর্ণ ।

আপাকে বললাম- আপা কার বাসায় চুরি হয়েছে ? আপার কাছে সব শুনে আমি  বলে দিলাম রিমি ও রিমির মাকে বাসায় দাওয়াত করতে ।

৩।
রিমি ও রিমির মা এসেছে । রিমি যে শুধু রুনুর ক্লাসমেট বান্ধবী তাই নয়, রিমির মায়ের সাথেও রেখা আপার সম্পর্ক গলায় গলায় । এখন বাচ্চাদের স্কুল গুলো শুধু বাচ্চাদের স্কুল নয়, অভিভাবকদেরও স্কুল ! বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে মায়েরা গার্ডিয়ান টেন্টে অপেক্ষা করে । পরস্পরের সাথে পরিচিত হয় । গল্প গুজব করে । অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে- বাচ্চার স্কুল বন্ধ থাকলে বাচ্চা খুশি হয়, কিন্তু মন খারাপ হয় মায়েদের !
‘আচ্ছা রিমির পুতুলটা কেমন ছিল ?’
খুটিয়ে খুটিয়ে প্রশ্ন করে বর্ণনাটা শুনলাম আমি । হুবহু রুনুর পুতুলটার মতই । আর কেনার ঘটনাটাও একই রকম । একটা হ্যাংলা পাতলা মানুষের কাছে রাস্তায় কিনেছিল । চুরি হবার ঘটনাটাও শুনলাম । আমার সন্দেহটা আরো পাকাপোক্ত হলো ।
‘আচ্ছা এরকম পুতুল কি আর কারো কাছে আছে ? মানে আর কেউ কি কিনেছিল ?’  সবার উদ্দেশ্যে প্রশ্নটা করলাম আমি ।
কিন্তু ঐ মুহূর্তে খেয়াল করতে পারলো না কেউই । 
বিকালে রুনুর সাথে কথা বলতে বলতে রুনুর বন্ধুদের কথা শুনছিলাম । তখনই রুনু জানালো যে ওর আরেক বন্ধু সিমিও একটা পুতুল কিনেছে গতমাসে । আমি রুনুকে দিয়ে ফোন করালাম সিমিদের বাসায় । আমরা আসছি । পুতুলটা যেন হাতের কাছেই রাখে ।

আমার বন্ধু আরিফকে ফোন করে সংক্ষিপ্ত ঘটনা বললাম । আমার সন্দেহের কথাও জানালাম । প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিয়ে ঘন্টাখানেকের মধ্যে হাজির হলো আরিফ । ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতির ব্যাপারে আরিফের অনেক দক্ষতা । রেখা আপা, রুনু, আমি আর আরিফ বিকাল পাঁচটা নাগাদ পৌঁছলাম সিমিদের বাসায় । রুনু আর রেখা আপাকে পুতুলটার কাছ থেকে দূরে থাকতে বললাম । পুতুলটাকে নিয়ে একটা রুমে ঢুকে আমরা ছিটকিনি লাগিয়ে বসলাম । আরিফ ওর যন্ত্রপাতি দিয়ে পুতুলটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখলো । সাবধানে খুলেও দেখলো । এই পুরো সময়টাতে পুতুলটার চোখদুটো একটা কালো কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখা হল ।

হালকা নাস্তা খেয়ে আমরা সিমিদের বাসা থেকে বিদায় নিলাম । আপার বাসায় আর গেলাম না । ‘জরুরী কাজ আছে , পরে আসছি’ বলে আরিফের সাথে চলে এলাম আমি । অন্য সময় হলে আপা চিল্লাচিল্লি করতো, কিন্তু আরিফ সাথে থাকায় শুধু একটু বিরক্তি আর প্রশ্নবোধক চোখে তাকিয়ে বাসায় চলে গেল । আমি আর আরিফ চলে গেলাম র‍্যাবের অফিসে ।
র‍্যাব কমান্ডারকে আমাদের পরিচয় দিয়ে সব কথা খুলে বললাম । অপরাধী চক্রের অবস্থান সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা আরিফ করেছিল , সেটা কনফার্ম করা হলো র‍্যাবের হাতে থাকা উন্নত যন্ত্রপাতি দিয়ে । ঠিক হলো রাত নয়টায় অপারেশন চালানো হবে । আমরা সাথে থাকার আগ্রহ দেখালাম , কিন্তু আমাদেরকে সাথে নিতে চাইলোনা র‍্যাব । কমান্ডার বললেন , ‘এরা কতবড় গ্যাং সে ব্যাপারে যেহেতু আমাদের কোন ধারণা নাই সেজন্য আপনাদের নিতে পারছি না । আর তাছাড়া কী পরিস্থিতি হবে সে ব্যাপারেও নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না’ ।

উপায় না দেখে আরিফকে বিদায় করে আমি আপার বাসায় ফিরে এলাম ।

৪।  
খেয়েদেয়ে ঘুমিয়েই পড়েছিলাম । রেখা আপার চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল । ঘড়িতে দেখি রাত ১২টা বাজে ।
‘এই ওঠ ওঠ । এই দেখ খবরে কী দেখাচ্ছে ।

চোখ ডলতে ডলতে ড্রয়িং রুমে এলাম ।
টিভিতে নিউজ দেখাচ্ছে- ব্রেকিং নিউজ ! চোরচক্রের আস্তানায় র‍্যাবের হামলা , সাতজন আটক । চুরি হওয়া বিপুল পরিমাণ স্বর্নালংকার উদ্ধার । অভিনব কায়দায় চুরি করে যাচ্ছিল এই অপরাধীচক্র । তারা অভিজাত এলাকার স্কুলের আশেপাশে বিশেষ ধরণের পুতুল বিক্রি করতো । ঐ পুতুলগুলোর চোখে সেট করা ছিল বিশেষ ধরণের সিসি ক্যামেরা । সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে ঘরের ভেতরের চিত্রধারণ করে বিশেষ ধরণের মোবাইল প্রযুক্তি ব্যবহার করে দূর থেকেই ভেতরের অবস্থা দেখে চুরির পরিকল্পনা নিত এই অপরাধীরা । গত তিনদিনে এই পদ্ধতিতে তারা দুটি বাসায় বড় ধরণের চুরি করে । গোপন তথ্যের ভিত্তিতে আজ তাদের আস্তানায় অভিযান চালায় র‍্যাব । এসময় র‍্যাবের সাথে সন্ত্রাসীদের বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি বিনিময় হয় । র‍্যাব ঘটনাস্থল থেকে সাত জনকে গ্রেপ্তার করেছে । এছাড়া স্বর্ণালংকার সহ চুরি করা মূল্যবান জিনিসপত্রের সাথে কয়েকটি কম্পিউটার ও বিভিন্ন ধরণের প্রযুক্তিপন্য উদ্ধার করা হয় । অপরাধীচক্রের আস্তানা থেকে জব্দকৃত কম্পিউটারে থাকা সকল ভিডিও নষ্ট করে ফেলা হয়েছে । উদ্ধারকৃত অলংকারসমূহ অতি শীঘ্রই মালিকের কাছে হস্তান্তর করা হবে ।

‘হায় আল্লাহ্‌ ! রুনুর পুতুলের চোখে সিসি ক্যামেরা ছিল ?’ আর্তনাদ করে উঠলো রেখা আপা ।
আপার আর্তনাদকে পাত্তা না দিয়ে আমি বললাম , ‘কাল সকালে তো তোমার গয়না পেয়ে যাচ্ছ । এখন নতুন কী রেসিপি রেঁধে গুণধর ভাইয়ের উদরপূর্তি করবে সেই চিন্তা করো আপা । সকালে ডাক দিও, আমি ঘুমাতে গেলাম’ !