এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...

এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে
বিবাহ কথন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বিবাহ কথন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২০

বিয়ের ক্ষেত্রে বংশ কিংবা চেহারা কতটা ইম্পর্ট্যান্ট?

সেসময় মদিনায় একজন উচ্চবংশীয়, ধনীর দুলালী, সুন্দরী মেয়ে ছিল। সে ছিল তৎকালীন মদিনার অন্যতম Most wanted, most eligible পাত্রী। তাঁকে বিয়ে করার জন্য আগ্রহী ছিল অনেকেই। 


একদিন মহানবী (সাঃ) সেই মেয়ের বাবার কাছে গেলেন। জানালেন যে তিনি তাঁর মেয়ের জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন। মেয়ের বাবা খুব খুশি হলেন। তিনি ভেবেছিলেন, রাসুল (সাঃ) বোধহয় নিজের জন্যই প্রস্তাব করছেন। কিন্তু রাসুল (সাঃ) জানালেন যে, তিনি প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন জুলাইবিব (রাঃ) এর জন্য। 


জুলাইবিব (রাঃ) ছিলেন এমন একজন সাহাবী, যার চেহারা একদম ভালো ছিলো না। তিনি ছিলেন খাটো, সেই সাথে দেখতে যথেষ্টই কুৎসিত। লোকেরাই তার নাম দিয়েছিল জুলাইবিব। জুলাইবিব শব্দের অর্থই হলো বেঁটে/খারাপ চেহারার লোক। আমাদের দেশে যেমন কেউ কালো হলে কাইল্যা বলে ডাকে (যা অনুচিত), আবার খাটো হলে বলা হয় বাইট্যা, তেমনি জুলাইবিব নামের আড়ালে হারিয়ে গিয়েছিল তাঁর আসল নাম। 


তাঁর বাবা-মা পরিবার সম্পর্কেও কেউ জানতোনা। কারণ, তিনি মক্কা বা মদিনার লোক ছিলেন না। হয়তো দূরের কোন গোত্রের লোক ছিলেন, কিন্তু কেউ তা জানতো না। ফলে মদিনায় তিনি ছিলেন নাম-পরিচয়-গোত্রহীন, বেঁটে খাটো আর কুৎসিত চেহারার একজন নগন্য মানুষ। 


জুলাইবিবের খারাপ চেহারার জন্য কেউ তাকে ভালোবাসতোনা। মদিনার কোন লোক তার সাথে মেয়ের বিয়ে দিতে চাইতোনা। 


কিন্তু রাসুল (সাঃ) এর কাছে মানুষের চেহারা ইম্পর্ট্যান্ট ছিলনা। তিনি জুলাইবিবকে খুব ভালোবাসতেন। 


কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে মেয়ের বাবা বিষয়টি নিয়ে স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করতে গেলেন। প্রস্তাব শুনে মেয়ের মা উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তিনি চিৎকার চেঁচামেচি করে রাসুলুল্লাহর (সাঃ) এই অনাকাঙখিত প্রস্তাব নাকচ করে দিতে বলেন। 


বিষয়টি জানতে পেরে মেয়ে নিজেই এগিয়ে এসে তার বাবা-মাকে জানায়, সে এই প্রস্তাবে রাজি। কারণ, এই প্রস্তাব এসেছে আল্লাহ্‌র রাসুলের (সাঃ) তরফ থেকে। নিশ্চয়ই এর মধ্যেই নিহিত আছে সত্যিকার কল্যাণ। 


এভাবে পরম সুন্দরী, ধনীর দুলালী, 'মিস মদিনা'র সাথে বিয়ে হলো বংশপরিচয় হীন বেঁটে খাটো কুৎসিত দর্শন এবং অত্যন্ত গরীব সাহাবী জুলাইবিব (রাঃ) এর। 


ওহুদের যুদ্ধে শহীদ হয়ে যান এই সাহাবী। রাসুল (সাঃ) নিজে তাঁকে খুঁজে বের করেন, নিজ হাতে তাঁর লাশ দাফন করেন। 


তিনি শহীদ হবার আগ পর্যন্ত সুখে শান্তিতে সংসার করেন অসাধারণ এই দম্পতি। 


***** 

বিয়ের ক্ষেত্রে বংশ কিংবা চেহারা কতটা ইম্পর্ট্যান্ট? এটা এখন একটা প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন। একটা সময় বংশকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হতো। ভালো বংশের ছেলে/মেয়ে ভালোই হবে- এই ছিল সবার সুনির্দিষ্ট (Pre-fixed) ধারণা। আর এটার যথেষ্ট বাস্তবতাও ছিল। 


কিন্তু বর্তমান সময়ে এই বাস্তবতা আগের মত নাই। শিক্ষার প্রসার, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, মানুষে মানুষে সহজ যোগাযোগ, এই সবকিছুর কারণে যেকেউ যেকোন রকম হয়ে যেতে পারে। পরিবারের শিক্ষা এখন কাউকে ভালো বা খারাপ করার জন্য যথেষ্ট নয়। ভালো বংশের যেকোন ছেলে বা মেয়ে হয়ে যেতে পারে খারাপ চরিত্রের, আবার কারো কারো বংশ তেমন উল্লেখযোগ্য না হলেও তিনিই হতে পারেন সোনার মানুষ। 


শুধু জুলাইবিবই (রাঃ) নন, রাসুল (সাঃ) তাঁর দাস (পরে মুক্ত এবং পালকপুত্র হিসেবে গৃহীত)  যায়েদের (রাঃ) সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন কুরাইশ বংশের মেয়ে জয়নব (রাঃ) কে। আবার আফ্রিকান নিগ্রো বেলাল (রাঃ) র সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন তৎকালীন আরবের অন্যতম শীর্ষ ধনী আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) এর বোনকে। 


এভাবে বংশের অহংকার আর বর্ণবাদী মানসিকতার মূলে কুঠারাঘাত করেছিলেন রাসুল (সাঃ)। সবকিছুকে ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। 


বিদায় হজ্বের ভাষণে রাসুল (সাঃ) বলেন- মনে রেখো, কোন অনারবের ওপর কোনো আরবের প্রাধান্য নেই, এবং প্রাধান্য নেই কালোর ওপর কোনো সাদার। আর তোমাদের মধ্যে সে-ই সবচেয়ে বেশি সম্মানিত, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়া অবলম্বন করে। 


বংশকে গুরুত্ব দেয়াতে দোষের কিছু নেই, কিন্তু তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে ব্যক্তির আচার ব্যবহার, চরিত্র এবং ধার্মিকতাকে। 


দু'জন মানুষের জীবনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য যখন এক হয়ে যায়, তখন দেশ জাতি বর্ণ বংশ চেহারা সবকিছুই তাদের কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়।


(বিবাহ কথন 

বুধবার, ১১ অক্টোবর, ২০১৭

বিয়ের মাধ্যমে আল্লাহর তায়ালার ইচ্ছা বাস্তবায়ন হয়

 "বিয়ের মাধ্যমে দ্বীনের অর্ধেক পূরণ হয়", নানান প্রচার প্রচারণার ফলে হাদিসের এই বক্তব্যটুকুর যথেষ্টই প্রচলন হয়েছে। কিন্তু যে কথাটা কেউ বলে না বা প্রচলিত হয় নাই তা হলোঃ বিয়ের মাধ্যমে আসলে আল্লাহর তায়ালার ইচ্ছাই বাস্তবায়ন হয়। 


আদম (আঃ) কে সৃষ্টির আগে আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের ডেকে বলেনঃ আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি বানাতে যাচ্ছি। তখন ফেরেশতাগণ বললেন, আপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যে দাঙ্গা-হাঙ্গামার সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরা নিয়ত আপনার গুণকীর্তন করছি এবং আপনার পবিত্র সত্তাকে স্মরণ করছি। তিনি বললেন, নিঃসন্দেহে আমি জানি, যা তোমরা জান না। 

(সুরা বাকারাঃ৩০) 


এভাবে পৃথিবীতে প্রতিনিধি পাঠানোর উদ্দেশ্য নিয়ে আল্লাহ তায়ালা একজন মানুষ সৃষ্টি করলেন। তারপর তার থেকেই তৈরি করলেন তাঁর সঙ্গী হাওয়াকে। আর এই দু'জন হতে সৃষ্টি করলেন সমগ্র মানব জাতিকে। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সকল মানুষকে আল্লাহ তায়ালা দু'জন মানুষ থেকেই সৃষ্টি করেছেন এবং করবেন। 


আল্লাহ তায়ালা কিন্তু এখন আর মানুষ সৃষ্টি করে সরাসরি পাঠাচ্ছেন না, বরং আল্লাহ মানুষ পাঠাচ্ছেন মানুষেরই মাধ্যমে। আর এই মাধ্যমটাই হলো বিয়ে। দু'জন মানুষ বিয়ের মাধ্যমে এক হলে তাদের মাধ্যমেই আল্লাহ তায়ালা তাঁর মানুষ প্রেরণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখছেন। 


"তিনিই সে সত্তা যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন একটি মাত্র সত্তা থেকে; আর তার থেকেই তৈরী করেছেন তার জোড়া, যাতে তার কাছে স্বস্তি পেতে পারে।" (সুরা আরাফঃ১৮৯)


"হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দু’জন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী।" (সুরা নিসাঃ১)


এর অর্থ স্পষ্টত এটাই দাঁড়ায় যে, বিয়ে করাটা শুধু রাসুলের সুন্নাতই নয়, এর মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহরই ইচ্ছা পূরণ হয়। আর এজন্যই আল্লাহ তায়ালা দিয়েছেন বিয়ের মাধ্যমে পরিবার গঠনের চিরায়ত সিস্টেম। নিষিদ্ধ করেছেন নারী পুরুষের বিয়ে বহির্ভূত সবধরণের শারীরিক সম্পর্ক। 

সোমবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

মানুষ কেন বিয়ে করে?

মানুষ কেন বিয়ে করে? প্রশ্নের উত্তরটা এক কথায় দেয়া মুশকিল। কারণ, এখানে জৈবিক প্রয়োজনের চেয়েও বেশি কিছু আছে।
আদম (আঃ) এর জীবন থেকেই এর উত্তরটা আমরা সহজে পেয়ে যাই। ভালোই ছিলেন তিনি, জান্নাতের অফুরন্ত অভাবনীয় সব প্রাচুর্যের ভেতর সময় কাটছিল তাঁর। বলা হয়- জান্নাতে কোনকিছুরই অভাব নেই, একমাত্র যে বিষয়টা সেখানে অনুপস্থিত, তাহলো 'অভাব'। অথচ সেই জান্নাতে থেকেও কিসের যেন 'অভাব' বোধ করছিলেন আদম (আঃ)।
তিনি চরম নিঃসঙ্গ বোধ করছিলেন। বলা হয়, তার নিঃসঙ্গতা দূর করার জন্য আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি করেন হাওয়া (Eve) কে।
মানুষ কিছু সময়ের জন্য একা থাকতে ভালোবাসে, কিন্তু দীর্ঘ সময় সে একা থাকতে পারেনা। তার একজন সঙ্গী দরকার হয়। মানুষ এমন এক প্রাণী, যে কথা না বলে থাকতে পারেনা, কথা না শুনে থাকতে পারেনা। কিছু কিছু কথা থাকে, কাউকে বলতে না পারলে যেন দম আটকে আসে।
একটা মেয়ের বয়স যখন ১৮-২০ পার হয়, তখন থেকেই সে একে একে তার বান্ধবীদের হারাতে থাকে। অনেকের বিয়ে হয়ে যায়, অনেকেই দূরে চলে যায়। কারো সাথে বছরে দু'বছরে একবার দেখা হয়, কারো সাথে তাও হয় না। ধীরে ধীরে সে নিজেকে আবিস্কার করে নিঃসঙ্গ জগতে।
ছেলেদের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। বয়স যতই বাড়তে থাকে, ততই বাড়তে থাকে একাকীত্ব, বাড়তে থাকে নিঃসঙ্গতা। পড়ালেখা শেষে বন্ধুরা কেউ বিয়ে করে পর হয়, কেউ চাকরি নিয়ে দূরে চলে যায়। কাছে থাকলেও ব্যস্ততার কারণে চাইলেই যখন তখন আর আগের মত টি-স্টলে বা কফিশপে আড্ডা দেয়া হয়ে ওঠে না।
কর্মস্থলে কলিগেরা থাকে, কিন্তু কলিগ কলিগই। কলিগের সাথে আন্তরিক বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে কম। কারণ, সেখানে কিছুনা কিছু স্বার্থের দ্বন্দ্ব থেকেই যায়।
অনেক কিছু ঘটে যায় প্রতিদিনকার জীবনে, কাউকে বলা যায় না। অনেক কথা জমে থাকে। কাউকেই বলা হয় না।
এসময় খুব বেশি করে এমন একজনের অভাব বোধ হতে থাকে, যাকে সবকিছু নিশ্চিন্তে বলা যায়। যার সবকিছু শোনা যায়।
সবসময় দরকারী কথা শুনতে মানুষের ভালো লাগেনা, কখনো কখনো তার একদম অদরকারী, নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় কথা শুনতে ইচ্ছে হয়। শুনতে ভালো লাগে। বলতে ইচ্ছে হয়। বলতে ভালো লাগে।
যে ছেলেটা মেসে থাকতে বিয়ের নামও মুখে নিতোনা, চাকরি নিয়ে দূরে চলে যাওয়ার ক'মাসের মধ্যে তার বিয়ের খবর শোনা যায়। যে ছেলেটা ছিল খুব সৌন্দর্যপ্রবণ, সুন্দরী মেয়ে ছাড়া যে বিয়েই করবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিল, দেখা যায় নিঃসঙ্গতার আঘাতে সব পণ ভেঙ্গে গেছে তার। কারণ, সৌন্দর্যের চেয়েও বেশি প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছিল একজন কথা বলার সঙ্গীর, একজন সমব্যথী মানুষের। সেটা খুঁজে পেলেই ঘটনা খতম হয়ে যায়।
জীবনের নানান সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে খুব কনফিডেন্ট ছেলেটাও একটা সময় কেমন যেন দ্বিধাদ্বন্দে ভোগে। সে চায়, কেউ অন্তত একজন তাকে সাহস যোগাক- কেউ একজন মন থেকে বলুকঃ 'তুমি ঠিক পথে আছো'। অথবা, কেউ একজন তাকে বলুক, ও কাজ করোনা। আমার মন বলছে- ওটা তোমার জন্য ভালো হবে না।
নির্মলেন্দু গুণের 'তোমার চোখ এত লাল কেন?' কবিতায় উঠে এসেছে এই আকাঙখার কাব্যিক রুপ।
"আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে , আমি চাই
কেউ একজন আমার জন্য অপেক্ষা করুক,
শুধু ঘরের ভেতর থেকে দরোজা খুলে দেবার জন্য।
বাইরে থেকে দরোজা খুলতে খুলতে আমি এখন ক্লান্ত।
আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ আমাকে খেতে দিক। আমি হাতপাখা নিয়ে
কাউকে আমার পাশে বসে থাকতে বলছি না,
আমি জানি, এই ইলেকট্রিকের যুগ
নারীকে মুক্তি দিয়েছে স্বামী -সেবার দায় থেকে।
আমি চাই কেউ একজন জিজ্ঞেস করুকঃ
আমার জল লাগবে কি না, নুন লাগবে কি না,
পাটশাক ভাজার সঙ্গে আরও একটা
তেলে ভাজা শুকনো মরিচ লাগবে কিনা।
এঁটো বাসন, গেঞ্জি-রুমাল আমি নিজেই ধুতে পারি।
আমি বলছি না ভলোবাসতেই হবে, আমি চাই
কেউ একজন ভিতর থেকে আমার ঘরের দরোজা
খুলে দিক। কেউ আমাকে কিছু খেতে বলুক।
কেউ অন্তত আমাকে
জিজ্ঞেস করুকঃ 'তোমার চোখ এতো লাল কেন?'
(বিবাহ কথন-৩৫)

বুধবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

পাত্র পছন্দের ক্ষেত্রে কোন বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া উচিত?

পাত্রী নিয়ে যত কথা বলা হয়, পাত্র নিয়ে তত কথা বলা হয় না। কারণটা পুরুষের সামাজিক আধিপত্য। সবসময় ছেলেরাই পাত্রী পছন্দ করে, পাত্র পছন্দের ক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ ছিলনা বললেই চলে। যদিও এটা ধর্মীয়ভাবে স্বীকৃত এবং অত্যাবশ্যক।
পাত্র পছন্দের ক্ষেত্রে কোন বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া উচিত? এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা তিন-চারটি বিয়ের ঘটনা উল্লেখ করবো। দেখা যাক, ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানুষেরা কীভাবে পাত্র পছন্দ করেছেন।
১.
মুসলিম নারীদের মধ্যে অন্যতম সম্মানিত নারী হলেন খাদিজা (রাঃ)। তিনি সম্মানিত রাসুলের স্ত্রী হিসেবে, সেই সাথে তার নিজের মহান কর্মকান্ডের কারণে। মজার ব্যাপার হলো, মুহাম্মাদ (সাঃ) তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেননি। তিনিই মুহাম্মাদ (সাঃ) কে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
তিনি যখন রাসুল (সাঃ) কে বিয়ের প্রস্তাব দেন তখন তাঁর বয়স ৪০। ইতোপূর্বে তার দু'বার বিয়ে হয়েছিল। তিনি ছিলেন বড় মাপের ব্যবসায়ী ও ধনী মহিলা।
বয়স ও অভিজ্ঞতায় তিনি ছিলেন পরিপক্ক। সুতরাং খাদিজা অল্পবয়সী কিশোরী তরুণিদের মত আবেগে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলার সুযোগ আমাদের হাতে থাকছে না। এছাড়া, তার ছিল সংসার করার অভিজ্ঞতা। এর আগে তার দু'বার বিয়ে হয়েছিল। একজন স্বামী মারা যান, আরেকজনের সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।
অতএব তিনি জানতেন, সংসার করার জন্য কেমন পুরুষ দরকার। সেজন্য তার বিবেচনাকে অগ্রাহ্য করার কোন সুযোগ আমাদের হাতে নাই।
মক্কায় সেসময় অনেক ধনাঢ্য লোক ছিল। বড় ব্যবসায়ী ছিল। অনেক গোত্রপতি ছিল। খাদিজাকে বিয়ে করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল অনেকেই।
অপরদিকে মুহাম্মাদ (সাঃ) ছিলেন এতিম। চাচা আঃ মুত্তালিবের আশ্রয়ে লালিত। ২৫ বছর বয়সে তিনি নিজে তেমন একটা ধনীও ছিলেন না। মুহাম্মাদ (সা) এর চাচা আবু তালিবের আর্থিক অবস্থাও সেসময় ভালো ছিলনা।
তবু কী কারণে তাঁকে পছন্দ করেছিলেন খাদিজা?
উত্তরটা হলোঃ তিনি পছন্দ করেছিলেন মুহাম্মাদের সততা, বিশ্বস্ততা এবং উত্তম চরিত্র।
মুহাম্মাদ (সাঃ) এর বয়স যখন পঁচিশ বছর, তখন চাচা আবু তালিব একদিন তাঁকে ডেকে বললেনঃ ভাতিজা, আমি একজন বিত্তহীন মানুষ। সময়টাও আমাদের জন্য খুব সঙ্কটজনক। আমরা মারাত্মক অভাবের মধ্যে আছি। আমাদের কোন ব্যবসা বা অন্য কোন উপায়-উপকরণ নেই। তোমার গোত্রের একটি বাণিজ্য কাফেলা সিরিয়ায় যাচ্ছে। খাদিজা তার পণ্যের সাথে পাঠানোর জন্য কিছু লোকের খোঁজ করছে। তুমি যদি তার কাছে যেতে, হযতো তোমাকে সে নির্বাচন করতো। তোমার চারিত্রিক নিস্কলুষতা তার জানা আছে। যদিও তোমার সিরিয়া যাওয়া আমি পছন্দ করিনা এবং ইহুদীদের পক্ষ থেকে তোমার জীবনের আশঙ্কা করি, তবুও এমনটি না করে উপায় নেই।
সেবছর মুহাম্মাদ (সাঃ) মজুরির বিনিময়ে খাদিজার বাণিজ্য কাফেলার দায়িত্ব নেন। এই সফরের সঙ্গীরা খাদিজার কাছে মুহাম্মাদের ব্যবহার ও চরিত্রের ভূয়সী প্রশংসা করেন। যদিও আগে থেকেই জানতেন, এবার খাদিজা মুহাম্মাদকে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি তার একজন দূতের মাধ্যমে মুহাম্মাদ (সাঃ)কে বলেনঃ হে আমার চাচাতো ভাই! আপনার বিশ্বস্ততা, সততা ও উন্নত নৈতিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছে।
খাদিজার প্রতিনিধি নাফিসা বিনতে মুনইয়া'র ভাষায়ঃ মুহাম্মদ সিরিয়া থেকে ফেরার পর তাঁর মনোভাব জানার জন্য খাদিজা আমাকে পাঠালেন। আমি তাঁকে বললামঃ মুহাম্মদ! আপনি বিয়ে করছেন না কেন? তিনি বললেন, বিয়ে করার মতো অর্থ তো আমার হাতে নেই। বললামঃ যদি আপনাকে একটি সুন্দর প্রস্তাবের প্রতি আহবান জানানো হয়, অর্থ-বিত্ত, মর্যাদা ও অভিজাত বংশের প্রস্তাব দেওয়া হয়, রাজি হবেন? বললেনঃ কে তিনি? বললামঃ খাদিজা। বললেনঃ এ আমার জন্য কিভাবে সম্ভব হতে পারে? বললামঃ সে দায়িত্ব আমার।
তিনি রাজি হয়ে গেলেন।
পরে খাদিজা (রাঃ) নিজেই মুহাম্মাদ (সাঃ) এর সাথে কথা বলেন এবং তাঁর পিতার নিকট প্রস্তাবটি উত্থাপনের জন্য মুহাম্মাদকে (সাঃ) অনুরোধ করেন। কিন্তু মুহাম্মাদ (সাঃ) এই বলে অস্বীকৃতি জানান যে, দারিদ্র‍্যের কারণে হয়তো খাদিজার বাবা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করবেন। অবশেষে খাদিজা নিজেই বিষয়টি তাঁর পিতার কাছে উত্থাপন করেন।
খাদিজা(রাঃ)র বাবা এই প্রস্তাবে রাজি ছিলেন না। তিনি বলেছিলেনঃ তোমাকে আমি আবু তালিবের এই এতিমের সাথে বিয়ে দিব? আমার জীবনের শপথ! কক্ষণও তা হবে না। কুরাইশ বংশের শ্রেষ্ঠ সন্তানরা তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে, আর মুহাম্মদের সাথে আমি তোমাকে বিয়ে দেবো?
পরে খাদিজা কৌশলে বাবার সম্মতি আদায় করেন, এবং বিয়ে সম্পন্ন হয়।
খাদিজা (রাঃ) নিজেই উভয় পক্ষের যাবতীয় খরচ বহন করেছিলেন। তিনি দুই উকিয়া সোনা ও রুপা মুহাম্মাদ (সাঃ) এর কাছে পাঠান এবং তা দিয়ে উভয়ের পোশাক ও ওয়ালিমার ব্যবস্থা করতে বলেন। (তথ্যসূত্রঃ আসহাবে রাসুলের জীবন কথা)
চলবে...
(বিবাহ কথন- ৩২) 

২. 
নির্যাতনের শিকার নিজ গোত্রের একজন মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে নির্যাতনকারী ব্যক্তিকে আঘাত করে বসেন মুসা (আঃ)। এতে ঐ লোক মারা যায়। অনাকাংখিত এই দুর্ঘটনায় মুসা (আঃ) খুব কষ্ট পান। পরে তার কাছে খবর আসে যে তাঁকে হত্যার জন্য ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। শুভাকাঙ্ক্ষীদের পরামর্শে মিশর ছেড়ে মাদিয়ানে (জর্ডান) চলে যান মুসা (আঃ)।
মাদিয়ানে প্রবেশ করে তিনি একটা কূপের কাছে পৌঁছলেন। দেখলেন, সেখান থেকে সবাই পানি নিচ্ছে, কিন্তু দু’টি মেয়ে তাদের তৃষ্ণার্ত পশুগুলি সহ অসহায়ভাবে দূরে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ তাদের দিকে ভ্রুক্ষেপ করছে না। তারাও পানি নিতে পারছে না।
মুসা (আঃ) মেয়ে দু’টির দিকে এগিয়ে গেলেন। তিনি তাদের সমস্যার কথা জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, ‘আমরা আমাদের পশুগুলিকে পানি পান করাতে পারি না, যতক্ষণ না রাখালরা তাদের পশুগুলিকে পানি পান করিয়ে চলে যায়। আর আমাদের পিতা খুবই বৃদ্ধ’ (যিনি ঘরে বসে আমাদের অপেক্ষায় উদগ্রীব হয়ে আছেন)।
মুসা (আঃ) তাদের পশুগুলোকে পানি পান করালেন’ (তারপর মেয়ে দু’টি পশুগুলি নিয়ে বাড়ী চলে গেল)।
তারপর মুসা একটি গাছের ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন, ‘হে আমার পালনকর্তা! তুমি আমার উপর যে অনুগ্রহ নাযিল করবে, আমি তারই মুখাপেক্ষী’।
কিছুক্ষণ পর ঐ দুজন মেয়ের একজন সলজ্জ পদক্ষেপে তাঁর কাছে এগিয়ে এলো। মেয়েটি এসে লজ্জাজড়িত কণ্ঠে মুসাকে বলল, ‘আমার পিতা আপনাকে ডেকেছেন, যাতে আপনি যে আমাদের পশুগুলোকে পানি পান করিয়েছেন, তার বিনিময় স্বরূপ আপনাকে পুরস্কার দিতে পারেন’।
এই মেয়েদের বাবা ছিলেন মাদিয়ানবাসীদের কাছে প্রেরিত নবী হযরত শুআইব (আঃ)। মুসা (আঃ) ইতোপূর্বে কখনো তাঁর নাম শোনেননি বা তাঁকে চিনতেন না। তাঁর কাছে পৌঁছে মুসা (আঃ) সব বৃত্তান্ত বর্ণনা করলেন। শুআইব (আঃ) সবকিছু শুনে বললেন, ‘ভয় করো না। তুমি যালেম সম্প্রদায়ের কবল থেকে মুক্তি পেয়েছ’।
এমন সময় দুই মেয়ের একজন বলল, আব্বাজান! তাকে আমাদের বাড়িতে চাকরি দিয়ে নিয়োগ দিন। আপনার সাহায্যকারী হিসাবে এমন একজনই উত্তম হবে, যে শক্তিশালী এবং বিশ্বস্ত।
শুয়াইব (আঃ) ছিলেন একজন নবী ও বুদ্ধিমান মানুষ। তিনি মেয়ের মনের কথা বুঝতে পারলেন। তিনি মুসা (আঃ) কে বললেন, আমি আমার মেয়েদের একজনকে তোমার সাথে বিয়ে দিতে চাই।
মুসা রাজী হলেন। তারপর, আট থেকে দশ বছর তাঁদের সাথে থাকার শর্ত দিয়ে শুয়াইব (আঃ) তাঁর মেয়েকে মুসা (আঃ) এর সাথে বিয়ে দিলেন।
এভাবে শুয়াইব (আঃ) ও তাঁর মেয়ে এমন একজন যুবককে পাত্র হিসেবে বাছাই করলেন, ঐ বিদেশ বিভূঁইয়ে যিনি ছিলেন একজন নিঃস্ব, সহায়-সম্বলহীন মানুষ। খুনের দায়ে পলাতক এক ফেরারি যুবক।
সাহস, পরোপকারিতা আর বিশ্বস্ততাই ছিল শুয়াইব (আঃ) ও তার মেয়ের চোখে মুসা (আঃ) এর আসল গুণ, যেকারণে শুয়াইব (আঃ) এর মেয়ে তাঁকে নিজের স্বামী হিসেবে বাছাই করেছিলেন।
(তথ্যসূত্রঃ সুরা কাসাস, ২৩-২৮)
(বিবাহ কথন- ৩৩) চলবে... 

৩. ফাতেমা (রাঃ) কে বিয়ের জন্য রাসুল (সাঃ) এর কাছে আরো অনেকের মত প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন হযরত আবু বকর এবং ওমরও (রাঃ)। কিন্তু রাসুল (সাঃ) বিনয়ের সাথে, ভদ্রোচিতভাবে তাদের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন।
দারিদ্র‍্যের কারণে রাসুল (সাঃ) এর কাছে ফাতিমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে সাহস করতে পারছিলেন না হযরত আলী (রাঃ)। তখন অনেকেই আলী (রাঃ) কে উৎসাহিত করেন রাসুলের কাছে ফাতিমার ব্যাপারে প্রস্তাব নিয়ে যাওয়ার জন্য।
অনেকের প্ররোচনা ও উৎসাহে একদিন তিনি সাহস সঞ্চয় করে এগিয়ে গেলেন।
তাঁর ভাষায়ঃ অবশেষে আমি একদিন রাসুলুল্লাহর (সাঃ) নিকট গেলাম। তাঁর সামনে বসার পর আমি যেন বোবা হয়ে গেলাম। তাঁর মহত্ত্ব ও তাঁর মধ্যে বিরাজমান গাম্ভীর্য ও ভীতির ভাবের কারণে আমি কোন কথাই বলতে পারলাম না। এক সময় তিনিই আমাকে প্রশ্ন করলেনঃ কী জন্য এসেছো? কোন প্রয়োজন আছে কি? আমি চুপ করে থাকলাম। রাসুল (সাঃ) বললেনঃ নিশ্চয় ফাতিমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে এসেছো?
আমি বললামঃ হ্যা। তিনি বললেনঃ তোমার কাছে এমন কিছু আছে কি, যা দ্বারা তুমি তাকে হালাল করবে? বললামঃ আল্লাহর কসম, ইয়া রাসুলুল্লাহ! নেই। তিনি বললেনঃ যে বর্মটি আমি তোমাকে দিয়েছিলাম সেটা কী করেছো?
বললামঃ সেটা আমার কাছে আছে। আলীর জীবন যে সত্তার হাতে- তাঁর কসম, সেটা তো একটি “হুতামী” বর্ম। তার দাম চার দিরহামও হবে না।
রাসুল (সাঃ) বললেনঃ আমি তারই বিনিময়ে ফাতিমাকে তোমার সাথে বিয়ে দিলাম। সেটা তার কাছে পাঠিয়ে দাও এবং তা দ্বারাই তাকে হালাল করে নাও।
আলী (রাঃ) খুব দ্রুত বাড়ি গিয়ে বর্মটি নিয়ে আসেন। কনের সাজগোজের জিনিসপত্র কেনার জন্য রাসুল (সাঃ) সেটি বিক্রি করতে বলেন।
বর্মটি উসমান ইবন আফফান (রাঃ) চারশ সত্তর দিরহাম দিয়ে কিনে নেন। এই অর্থ রাসূলুল্লাহর (সাঃ) হাতে দেয়া হয়। তিনি তা বিলালের (রাঃ) হাতে দিয়ে কিছু আতর-সুগন্ধি কিনতে বলেন, আর বাকি যা থাকে উম্মু সালামার (রাঃ) হাতে দিতে বলেন। যাতে তিনি তা দিয়ে কনের সাজগোজের জিনিস কিনতে পারেন।
সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে গেলে রাসুল (সাঃ) সাহাবীদের ডেকে পাঠান। তাঁরা উপস্থিত হলে তিনি ঘোষণা দেন যে, তিনি তাঁর মেয়ে ফাতিমাকে চারশ মিছকাল রূপার বিনিময়ে আলী(রাঃ)র সাথে বিয়ে দিয়েছেন। তারপর আরবের প্রথা অনুযায়ী কনের পক্ষ থেকে রাসুল (সাঃ) ও বর আলী (রাঃ) নিজে সংক্ষিপ্ত খুতবা দান করেন। তারপর উপস্থিত অতিথি সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে খোরমা ভর্তি একটা পাত্র উপস্থাপন করা হয়।
এভাবে অতি সাধারণ ও সাদাসিধে ভাবে আলীর সাথে নবী দুহিতা ফাতিমাতুয যাহরার বিয়ে সম্পন্ন হয়। স্থাপিত হয় ইসলামের ইতিহাসে একটি মহান গৌরবময় বৈবাহিক সম্পর্ক।
হিজরী দ্বিতীয় সনে, বদর যুদ্ধের পর আলী (রা) তাঁর স্ত্রীকে উঠিয়ে নেয়ার জন্য একটি ঘর ভাড়া করতে সক্ষম হন। সে ঘর ছিল অতি সাধারণ মানের। বিত্ত-বৈভবের কোন স্পর্শ সেখানে ছিল না। ছিলনা কোন মূল্যবান আসবাব পত্র, খাট-পালঙ্ক, জাজিম, গদি, কোনোকিছুই। ‘
আলীর (রাঃ) ছিল কেবল একটি ভেড়ার চামড়া, সেটি বিছিয়ে তিনি রাতে ঘুমাতেন আর দিনে সেটি মশকের কাজে ব্যবহার হতো। কোন চাকর-বাকরও ছিল না। আসমা বিনত উমাইস (রাঃ), যিনি আলী-ফাতিমার (রাঃ) বিয়ে ও তাঁদের বাসর ঘরের সাজ-সজ্জা প্রত্যক্ষ করেছিলেন, বলেছেন, খেজুর গাছের ছাল ভর্তি বালিশ-বিছানা ছাড়া তাঁদের আর কিছুই ছিল না।
আলী (রাঃ) তাঁর একটি বর্ম এক ইহুদীর কাছে বন্ধক রেখে কিছু যব আনেন। তা দিয়েই তৈরি হয়েছিল তাঁদের বাসর রাতের খাবার, সম্পন্ন হয়েছিল সাদাসিধে ওয়ালিমা।
****
কেন ফাতিমার জন্য আরো অনেক প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে নিঃস্ব আলীকে বাছাই করেছিলেন মহানবী (সাঃ)? উত্তরটা তিনিই দিয়ে গেছেন ফাতিমাকে।
আলীর প্রস্তাব সম্পর্কে ফাতিমাকে জানাতে গিয়ে তিনি বলেছিলেনঃ ফাতিমা! আমি তোমাকে সবচেয়ে বড় জ্ঞানী, সবচেয়ে বেশী বিচক্ষণ এবং প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী ব্যক্তির সাথে বিয়ে দিচ্ছি।
বিয়ের পর বিদায় নেয়ার সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ফাতিমা (রাঃ)। তাঁর কান্নায় আবেগাপ্লুত হন রাসুল(সাঃ) নিজেও।
আবেগাক্রান্ত রাসুল (সাঃ) ফাতিমাকে বলেনঃ আমি তোমাকে সবচেয়ে শক্ত ঈমানের অধিকারী, সবচেয়ে বড় জ্ঞানী, সবচেয়ে ভালো নৈতিকতা আর উন্নত মন-মানসের অধিকারী ব্যক্তির নিকট গচ্ছিত রেখে যাচ্ছি।
(তথ্যসূত্রঃ আসহাবে রাসুলের জীবন কথা)
(বিবাহ কথন-৩৪) 

মঙ্গলবার, ২৯ আগস্ট, ২০১৭

যা করার হুটহাট করে ফেলেন...

'হুট করেই বিয়েটা হয়ে গেলো গতকাল। সবকিছু এত দ্রুত করতে হয়েছে, কাউকে জানাতে পারিনি বলে দুঃখিত। সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন।'
বিয়ের ঘটনাগুলো আমরা এখন বেশিরভাগ সময় এভাবেই জানতে পারি। এইটা হল ফেসবুক যুগের ট্রেন্ড। এবং সত্যি বলতে কী, I like this..
আমার পরিচিত ভাই বেরাদরদের আমি সবসময় বলি- ভাই, যা করার হুটহাট করে ফেলেন। নিকটাত্মীয়দের নিয়ে কম খরচে সাদাসিধা আর ঘরোয়াভাবে করে ফেলেন। তারপর ফেসবুকে লিখে দিবেন, হুট করে সব হয়ে গেছে, কাউকে জানাতে পারিনি বলে দুঃখিত।
আমরা দাওয়াত চাই না, শুধু সংবাদটা চাই। Esophagus পর্যন্ত খাওয়া হোক বা নাহোক, শুভেচ্ছা জানাতে আর দোয়া করতে কোনরকম কার্পণ্য করা হবে না।
কিছুদিন আগে ফেসবুকে একটা লেখা খুব ঘুরছিল- কুটিকুটি টাকার ব্যাকআপ ছাড়া নাকি বিয়া করা যায় না।
ইনভাইটেশন কার্ড, পার্লার, দামী দামী সব কাপড়চোপর, স্বর্ণের অলংকার, বিরাট অনুষ্ঠান, কনভেনশন সেন্টারের ভাড়া, হাজারো মানুষের খাওয়া দাওয়া...
এক কথায়- টাকা উড়ানোর যত ধরণের উপায় বের করা সম্ভব, কোনোটাই যেন বাদ দেয়া যাবে না।
তো টাকা আসবে কোত্থেকে? দেশের গুটিকয়েক ধনকুবের পরিবারকে আমরা আমাদের আলোচনার বাইরে রাখছি। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর বাবা মায়েরা কিছু টাকা জমিয়ে রাখেন বটে, তবে সেটা মেয়ের বিয়ের জন্যে। ছেলের জন্যে না। মেয়ের বিয়ে দেয়ার পর ছেলের জন্যে আর তেমন একটা জমানো টাকা থাকেনা। তাছাড়া মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন বাবার পক্ষেই বা কী করে সম্ভব দুই তিনটা ছেলের প্রত্যেকের বিয়েতে পাঁচ ছয় লাখ করে টাকা খরচ করা!
সুতরাং ভংচং যত খরচই হোক, সেগুলো যোগাড় করতে হবে ছেলেকেই। একটা ছেলে তার লেখাপড়া শেষ করে কর্মজীবনের শুরুতে কীভাবে লাখ লাখ টাকা খরচ করবে? চাকরির বাজারও মন্দা, চাকরি পেতেও দিতে হয় লাখ লাখ টাকার ঘুষ। কখনো জমানো টাকাটা সেখানেই চলে যায়। কখনো কখনো ঋণ নিয়ে ঘুষের যোগান দিতে হয়।
তো এইসব ছেলেরা বিয়ের জন্য কীকরে টাকা জমাবে? কতদিন জমাবে? ঋণ করা ছাড়া তার উপায় কী? আর আলতু ফালতু খরচের জন্য কেন তাকে ঋণ করতে হবে?
সুতরাং যতসব ফালতু ট্রেন্ড বন্ধ করে নতুন ট্রেন্ড চালু করতে হবে।
গতবছর পত্রিকায় খবর বেরিয়েছিল, ভারতে এক তরুণী তার বিয়ের মোহরানা হিসেবে বরের হাতে একগাদা বইয়ের লিস্ট ধরিয়ে দিয়েছিলেন। কয়েকদিন আগে বাংলাদেশের এক তরুণী তার বিয়ের দিন দাদীর শাদা শাড়ি পরে বিয়ে করেন। দামী শাড়ি, গয়না আর পার্লারি সাজগোজের বিপরীতে এটা ছিল নীরব প্রতিবাদ। আউট অব ট্রেন্ড। তার এই ঘটনাটিও অনলাইনে ব্যাপক আলোচিত হয়েছে।
এগুলো ভালো ট্রেন্ড। এরকম ভালো ট্রেন্ড শুরু হোক। বেশি বেশি প্রচলন ঘটুক। প্রথা এবং ঐতিহ্যের শুধু সেটুকুই আমাদের চালু রাখতে হবে- যেটুকু সহজ, স্বাভাবিক এবং কল্যাণকর।
বিয়েগুলো হোক মসজিদে। কিংবা একদম ঘরোয়াভাবে। বারান্দায় হোক, ড্রয়িংরুমে হোক। অসুবিধা কোথায়? জমকালো ইনভাইটেশন কার্ডের বদলে চালু হোক হাতে লেখা 'নিমন্ত্রণ পত্র'! ওয়ালিমা হোক বাড়ির উঠানে, কিংবা মসজিদের বারান্দায়। বিরিয়ানি রোস্টের বদলে একটা ওয়ালিমা হোকনা ডাল ভাত ভর্তার! সবকিছু হোক সহজ স্বাভাবিক।
বিয়েবাড়ির খরচ কমিয়ে হানিমুনেই নাহয় বেশি করে খরচ করুন, তাও ভালো।
(ঠিক করেছি, বিয়ের পর আমার বউকে 'গরুর গাড়িতে' করে তার শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যাবো। এই সময়ের জন্য আউট অব ট্রেন্ড অবশ্যই। সমস্যা হলো, গরুর গাড়ির খরচটা মোটরগাড়ির তুলনায় আদৌ কম হবে কিনা সে বিষয়ে আমি এখনো নিশ্চিত হতে পারিনি।  

বুধবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৭

বিয়ের ক্ষেত্রে 'সৌন্দর্য' বিবেচনা

বিয়ের ক্ষেত্রে 'সৌন্দর্য' বিবেচনা নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার। ছেলেরা বরাবরই সুন্দরী বউ চায়, ছেলে যে একাই চায় তাও নয়। ছেলের বাপ মা ভাই বোন তারাও চায়। কখনো কখনো তারাই বেশি করে চায়। যে মা নিজেই শ্যামলা, তিনিও তার ছেলের জন্যে একটা ফর্সা সুন্দরী বউ চান। যে বাবার নিজেরও শ্যামলা মেয়ে আছে (শ্যামলা বলছি কারণ, এই উপমহাদেশে সত্যিকার কালো মানুষ নেই। পিওর ব্ল্যাক বলা যায় শুধু আফ্রিকার মানুষকে), তিনিও ছেলের জন্য ফর্সা মেয়ে চান। সুন্দরী মেয়ে চান।
আর ছেলে তো বই পুস্তক নাটক উপন্যাস বিজ্ঞাপন সবখান থেকে একটাই উদ্দীপনা পেয়ে বড় হয়- তার একটা 'সুন্দরী বউ' লাগবেই লাগবে। ইদানীং মেয়েরাও যুক্ত হয়েছে এই ক্যাটাগরিতে। তারা কম যাবে কেন? তারাও লম্বা, 'ড্যাশিং', 'হ্যান্ডসাম' ছেলে চায়।
যাহোক, চাওয়ায় দোষ নেই। বন্ধুত্ব যদি হতে হয় পাতানো, তাহলে সুন্দরী বা হ্যান্ডসাম দেখা হতেই পারে। দোষ তখনই, যখন সৌন্দর্য হয়ে ওঠে অন্যান্য যোগ্যতার ওপরে প্রধান মাপকাঠি। সুন্দরী চাইবেন, আবার অন্যসব যোগ্যতাও চাইবেন, তাইলে আপনার পথটা কঠিন। আমি ছেলেদের বলি, সৌন্দর্য দেখুন, তবে তার চেয়ে অন্য দিকগুলো বেশি গুরুত্ব দেয়াটাই ভালো। শিক্ষা দীক্ষা আচার আচরণ। আপনি যদি সুন্দরীই চান, করুন না- অশিক্ষিত কোন সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করুন। তা কি করবেন?
সুন্দর একটা কাপড় কিনলেন, কিন্ত তা যদি গায়ে দিলেই শরীর চুলকায়, ফুসকুড়ি উঠে যায়, তাহলে সেই সুন্দর পোষাকের মূল্য কী? খুব সুন্দর কোন জিনিস যদি দুমাসেই রংচটা হয়ে যায়, ছিদ্র হয়ে যায়, তখন মেজাজটা ঠিক থাকবে?
কথায় আছে, চকচক করলেই সোনা হয় না।
আমি আরেকটু বাড়িয়ে বলি- ঘরে সোনা না থাকলেও জীবন ব্যর্থ হয়ে যায় না। সোনা সিন্দুকে রাখার জন্য ভালো, প্রতিদিনকার জীবনের উত্থান পতনে তার ভূমিকা নিতান্তই নগন্য। সোনা নয়, মানুষের জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন 'মানুষ'কেই। 

শনিবার, ১২ আগস্ট, ২০১৭

টাইমিং টা ইম্পর্ট্যান্ট...

বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেছে ৪০ লাখ সৌদি তরুণী। তারা এখনো রয়ে গেছে অবিবাহিত। খবর সৌদি গেজেটের।
ধারণা করি, তরুণদের সংখ্যাটাও সেখানে বোধহয় কম হবে না। তার মানে, বিয়ে সংক্রান্ত সমস্যাটা আসলে মুসলিম বিশ্বের একটা কমন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সৌদি আরবের মোট জনসংখ্যা মাত্র তিন কোটির কিছু বেশি। তার মধ্যে যদি নারীর সংখ্যা অর্ধেক ধরি, তাহলে দেড় কোটি হয়। এর মধ্যে আছে শিশু, আছেন মধ্যবয়সী থেকে বয়স্কা নারীরা। অর্থাৎ বিয়ের বয়সী তরুণীর সংখ্যা যদি ৬০ লাখ হয়, তার মধ্যে ৪০ লাখেরই বয়স ত্রিশের উপরে হয়ে গেছে। অথচ তাদের বিয়ে হয়নি।
অবস্থাটা কি স্বাভাবিক মনে হয়? নাহ, এটাকে স্বাভাবিক মনে করার কোন সুযোগ নেই।
কেন এই অবস্থা? অতিরিক্ত মোহরানা দাবী, যোগ্য পাত্র পাওয়ার পরও আরো ভালোর জন্য অপেক্ষা, এসবই কারণ বলে আমার মনে হয়।
আজ মনে পড়ে হযরত ওমরের সময়কার কথা। যখন কিছু যুবক হযরত ওমরের কাছে এসে অভিযোগ করেছিলেন যে, নারীরা অত্যধিক মোহরানা দাবি করার কারণে বিয়ে কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ওমর (রাঃ) অবস্থার গুরুত্ব উপলব্ধি করে জুমার খুতবায় বক্তব্য দিয়েছিলেন। তিনি মোহরানার পরিমাণ সর্বোচ্চ চারশ দিরহামে সীমাবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এতে নারীর অধিকার ক্ষুন্ন হয় বলে পরে তিনি তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছিলেন।
মোহরানা নারীর প্রাপ্য অধিকার। কিন্তু ব্যাপারটা হলো- কোন ন্যায্য অধিকারেরও যদি অপব্যবহার করা হয়, তাহলে তা ক্ষতির কারণ হয়। সৌদি আরবে সেটাই হয়েছে।
বাংলাদেশে কী অবস্থা? এনিয়ে কোন জরিপ হয়েছে কিনা আমার জানা নাই। তবে ধারণা করি, বাংলাদেশের অবস্থাও সুবিধাজনক না।
এর জন্য প্রধানত দায়ী অভিভাবকরা। সহজ একটা উদাহরণ দিচ্ছি। সুন্দরী না হওয়াটা বাংলাদেশের অনেক মেয়ের বিয়ের ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা। কিন্তু খেয়াল করবেন, ৩০ বছর বয়সে যে মেয়েকে দেখতে খুব একটা সুন্দর মনে হয় না, ১৫-২০ বছর বয়সে সেই মেয়েকেও দেখে অনেকেরই পছন্দ হবে। তার মানে, টাইমিং টা ইম্পর্ট্যান্ট। এইটা গার্জিয়ানদের খেয়াল রাখতে হবে।
আবার যারা একটু বেশি সুন্দরী, তাদের গার্জিয়ানদের পা মাটিতে থাকে না। তারা সব চান। যোগ্য পাত্র পেলেও তারা নানান ছুতো নাতায় দেরি করেন। 'আরো ভালো' পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন।
বাংলাদেশের অবস্থা সম্ভবত এখনো অতটা খারাপ হয়নি। কিন্তু হচ্ছে। আয়্যাম নট শিওর, তবে কয়েক বছর পরে যদি বাংলাদেশে এই বিষয়ে জরিপ করা হয়, খবরটা হয়তো এরকম বেরোবেঃ 'বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেছে ১ কোটি বাংলাদেশি তরুণীর'।

শুক্রবার, ২৩ জুন, ২০১৭

মেকাপের সং সেজে লাভ কী?

বিয়ের অনুষ্ঠানে গেলে সবাই একবার 'বৌ' দেখার চেষ্টা করে। খাওয়া দাওয়ার পর অনেকেরই মনে হয় 'বউডা দেইখ্যা যাই'!
আমার এ বদভ্যাস নেই, সচেতনভাবেই আমি এরকম কিছু থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করি। পর্দার ব্যাপারে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা আছে। তাছাড়া, একজন মানুষ সেজেগুজে বসে আছে, আর চেনা অচেনা সবাই তাকে দেখতে আসছে, নিচুস্বরে কমেন্ট করছে, বিষয়টা আমার কাছে রুচিকর মনে হয় না। যে 'বৌ' দেখার জন্য লোকজন ভীড় করে, তার মানসিক অবস্থাটাই বা কেমন থাকে? কে চায় প্রদর্শনীর বস্তু হতে? একের পর এক চেনা অচেনা লোকেরা আমার 'চেহারা' দেখতে আসছে, ভাবলেই তো শরীর গুলিয়ে আসে।
যাহোক, বিষয় সেটা না। বিষয় হলো, সেদিন এক বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে কণের সামনে পরে গেলাম। বর-কণে দুজনেই সেজেগুজে বসে আছে, খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থাও সেখানেই। তাছাড়া বর যথেষ্ট নিকটজন, তার সাথে কুশল বিনিময় করতেই হলো। পাশেই যেহেতু 'বৌ' বসা, সুতরাং এইবার চোখ রক্ষা করা গেলো না। তবে, খুশির(!) খবর হলো, মুখোমুখি হলেও এবারও কণের মুখ দেখতে হলো না। কারণ, মুখে এত পরিমাণ ময়দা মেখেছে যে স্কিনের ওপর একটা আলাদা স্তর হয়ে আছে। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিলো। এ যেন মুখ নয়, ময়দার মুখোশ।
এইভাবে মেকাপ দিলে কারোই আসল চেহারা বোঝা সম্ভব না। আমি নিশ্চিত, এই মেয়েকে পরে কখনো দেখলেও চিনতে পারবো না।
আশ্চর্য হলাম এই ভেবেঃ মেয়ে তো যথেষ্টই উচ্চশিক্ষিত; কিন্তু তার মানসিক উন্নতি এখনো ময়দার লেভেল অতিক্রম করে নাই।
(বৌ-দর্শকদের আমি খুব একটা দোষ দিচ্ছি না। কারণ, আপনি যদি সঙ সেজে বসে থাকেন, তাহলে কৌতূহলী দর্শক ও সমালোচকের অভাব কখনোই হবে না। ইহা বাঙালির মজ্জাগত অভ্যাস। সামান্য বানরের নাচও বাঙালি উপেক্ষা করতে পারে না।)
২.
বিয়ের মেকাপের নামে সঙ সাজাটা কীভাবে কীভাবে যে বিয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে, কে জানে!!! পুরুষের কথাই ধরি। তারা সাধারণ পোষাক বাদ দিয়ে এক ধরণের মোটা কাপড় পরে, যার নাম দেয়া হয়েছে 'শেরওয়ানি'। যতদূর জানি, শের মানে বাঘ। তার মানে কি শেরওয়ানি পরে বিয়ের দিনে বাঘ হবার চেষ্টা? শোনেন পুরুষ ভাই, মনে বিড়াল হলে বাঘের চামড়ায়ও কিছু আসে যায় না। শেরওয়ানি কোনছাড়!!!
শেরওয়ানির দামও কম না। দশ হাজার থেকে শুরু করে চল্লিশ পঞ্চাশ হাজার টাকাও আছে। আরো বেশিও থাকতে পারে। (আমি গরীব মানুষ, এতকিছুর খবর জানি না।)
তো, আমার কাছে এগুলো স্রেফ ভড়ং মনে হয়। পুরোটাই অপচয়। এই শেরওয়ানি আর কোনদিন গায়ে দিয়ে কোথাও যেতে পারবেন? শেরওয়ানি পরে বাসায় ঘুমাতে পারবেন? অফিস করতে পারবেন?
নো ইউজ। আসলে তো আপনি বিড়াল, তাহলে কেন এই শের হবার ভড়ং? মনে বাঘ হলে ছুড়ে ফেলে দিন অহেতুক অপচয়ের এই সংস্কৃতি। মেয়ে যেমন ময়দা মেখে সঙ সেজেছে, আপনিও শেরওয়ানি গায়ে একধরণের সঙ সেজেছেন।
বিয়ের অনুষ্ঠানের দিন এইভাবে ময়দার প্রলেপ মেখে আর শেরওয়ানি গায়ে দিয়ে সঙ না সাজলে কি চলে না? কেন, সাধারণ শার্ট প্যান্ট বা পাজামা পাঞ্জাবিতে সমস্যা কী?
বিয়ে তো হয়েই গেল, মেকাপের মেকি রুপ দিয়ে আপনি আর কাকে ভোলাতে চান?
(বিবাহ কথন-২৮) চলবে...

শুক্রবার, ১৬ জুন, ২০১৭

ডাক্তারদের বিয়েঃ দিন বদলাচ্ছে দ্রুতই...

একটা সময় ছিল যখন একজন ডাক্তারের পরিবার মানে ধরেই নেয়া হত- স্বামী স্ত্রী দুজনেই ডাক্তার। ডাক্তার বিয়ে করবে ডাক্তারকে... এটা যেন হয়ে উঠেছিল স্বতঃসিদ্ধ ব্যাপার। কিন্তু দিন পাল্টাচ্ছে। এখন ডাক্তাররা-- বিশেষ করে ডাক্তার ছেলেরা অনেকেই অন্য পেশার/সাবজেক্টের মেয়ে বিয়ে করছে। অনেকেই পাত্রীর ক্রাইটেরিয়া থেকে বাদ দিচ্ছে 'ডাক্তার'কে। কখনো ডাক্তার মেয়ে এবং তাদের গার্জিয়ানদের প্রতি বিরক্ত হয়ে, কখনো জীবনকে সহজ করার ইচ্ছায়।
তার মানে, ডাক্তার পাত্রদের মূল্য অনেকটা অপরিবর্তিত থাকলেও পাত্রী হিসেবে ডাক্তার মেয়েদের দাম কমেছে। অন্তত ডাক্তার ছেলেদের কাছে।
আর এই ট্রেন্ডটা এখনো ধরতে না পারায়, নিজেকে 'অমূল্য' ভেবে বসে থেকে থেকে অনেক ডাক্তার মেয়েই শেষ পর্যন্ত এখন আর খুঁজে পাচ্ছেন না তাদের কাঙখিত 'ডাক্তার' পাত্র। বয়স হয়েছে, কিন্তু অবিবাহিত- এমন ডাক্তার মেয়ের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। একজন ভাই জানালেন, সম্প্রতি তার কাছে ৭-৮ টি বিয়ের প্রস্তাব এসেছে যেখানে সবক্ষেত্রেই মেয়েরা তার চেয়ে দুই তিন ব্যাচ সিনিয়র!!
ছেলের বাপ-মায়েরা ছেলেকে মেডিকেলে পড়ায় পেশা বা জীবিকার প্রয়োজনে। আর (দুষ্ট লোকেরা বলে) মেয়েদের নাকি পড়ানো হয় ভালো পাত্র পাবার জন্যে। (চিকিৎসা ক্ষেত্রে প্রচুর মেয়ে দরকার সেটা অস্বীকার করছি না, আমি শুধু প্রচলিত মানসিকতাটা তুলে ধরছি।) তো, একটা মেয়ে যখন মেডিকেল স্টুডেন্ট, তখন গার্জিয়ানরা ভাবেন- এখন আবার বিয়ের কথা কেন? ডাক্তার হোক, তখন আমার মেয়ের 'দাম' আরো বাড়বে!! এরপর যখন মেয়ে সত্যি সত্যি ডাক্তার হয়ে যায়, তখন গার্জিয়ানরা ভাবেন- আরে আমার মেয়ে তো 'ডাক্তার'!! এখন আমার মেয়ের জন্যে কত প্রস্তাব আসবে!! প্রধানমন্ত্রীর ছেলে, প্রেসিডেন্টের নাতি!!
কোটিপতি বাবার একমাত্র ছেলে, সুদর্শন, নামাজী, ভদ্র, ডাক্তার ছাড়া মেয়ের বিয়া দিমু না। মেয়ে কি গাঙ্গের জলে ভাইস্যা আইছে? (এইটা সম্ভবত সর্বাধিক উচ্চারিত সংলাপ) আরে আমার মেয়ে তো 'ডাক্তার'!!!
কোন কোন মেয়ে নিজেও হয়তো একইরকম স্বপ্ন দেখে থাকে।
কিন্তু বাস্তবতা সেরকম হয় না। কারণ, ডাক্তার ছেলেদের শুরুটা হয় মারাত্মক স্ট্রাগলিং। পাশ করা মাত্রই তারা চেম্বারে বসে লাখ লাখ টাকা কামায় না। এমবিবিএস পাশ করে তাকে আবার নাক ডুবিয়ে পড়তে হয়। বিনা পয়সায় ট্রেনিং করতে হয়। আর নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর জন্য একটা চাকরি করতে হয়, যেটার বেতন তার পরিশ্রমের তুলনায় খুবই নগন্য, এবং তার সমপর্যায়ের অন্য যেকোন অফিসের কর্মচারীর তুলনায় কম।
আমার কাছের একজন ভাই, সে ধনী বাবার ছেলে, ডাক্তার, এমডি কোর্সেও ঢুকেছে। মেয়ের গার্জিয়ানরা নাকি তাকে রিজেক্ট করেছে- 'বিসিএস নাই' বলে!!! আবার আরেক বন্ধু, সে ডাক্তার, বিসিএস ক্যাডারও। তাকে নাকি রিজেক্ট করা হয়েছে 'বড় ডিগ্রী নাই' বলে!!! অদ্ভুত বটে। আরেকজন ছোটভাই, সম্প্রতি ইন্টার্নশিপ শেষ করেছে। এখনো বিসিএস বা ডিগ্রী কোনটাই হয়নি। তাকে বিয়ের আলাপের শুরুতেই-- বলা চলে 'স্ক্রিনিং টেস্টেই' আউট করে দেয়া হচ্ছে।
তারা সব চায়, সব। পরে হলে হবে না, এখনি থাকতে হবে। ছেলের বয়স হতে হবে তিরিশ, ডেজিগনেশন হবে 'প্রফেসর', ব্যাংকে থাকবে কোটি টাকার ব্যালেন্স!!! (ওয়াল্ট ডিজনীর এনিমেশন ছাড়া এরকম ক্যারেক্টার বানানো সম্ভব কিনা আমার জানা নাই।)
আমার কাছে এখন ডাক্তার ভাই বন্ধু জুনিয়ররা কেউ পরামর্শ চাইলে বলি- ভাই, গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে আসো। ডাক্তার পাত্রী দেখতে পারো, তবে নিজেকে এই গন্ডিতে আটকে রাখার দরকার নাই। নিজের পরিধি বাড়াও। মেয়ে যে সাবজেক্টেই পড়াশোনা করুক- চরিত্র ও অন্যান্য দিক ঠিক থাকলে এগিয়ে যাও। তোমার ক্যারিয়ারে তো কোন সমস্যা হবেই না, হয়তো সংসারটা হবে আরো অনেক বেশি গোছানো। আমার ভাই বন্ধু পরিচিত যারা নন-ডাক্তার বিয়ে করেছে- As far I know, they are not unhappy...
একজন ডাক্তার মেয়ের জন্য অন্য পেশার হাজব্যান্ডের সাথে খাপ খাওয়ানো যতটা কঠিন, ডাক্তার ছেলের জন্য মোটেও সেরকম না। বউ সপ্তাহে তিনদিন নাইট ডিউটি করবে, নন ডাক্তার কোন হাজব্যান্ড সেটা কখনোই 'খুশিমনে' মেনে নেয়ার কথা না। সেক্ষেত্রে একজন ডাক্তার মেয়ের ক্যারিয়ারটা হয়তোবা আর সেভাবে এগিয়ে নেয়া সম্ভব না।
ডাক্তার ছেলেদের ক্ষেত্রে এরকম কোন সমস্যা নেই।
সো, ডিয়ার ডক্টর ভাই-বেরাদরস, ডাক্তার পাত্রীর গার্জিয়ানদের এত তেলানোর কিছু নাই। তারা অপেক্ষা করতে থাকুক। তোমরা তোমাদের মত এগিয়ে যাও।
আর হ্যা, সিনিয়র ডাক্তার পাত্রী বিয়ে করতে চাইলে- করতে পারো। আমি নিশ্চিত, এতদিনে তাদের চাহিদা আকাশ থেকে মাটির কাছাকাছি নেমে এসেছে।

মঙ্গলবার, ১৬ মে, ২০১৭

বিয়েঃ মেয়ের মতামতটাই শুধু উপেক্ষিত

সেদিন একটা বিয়েতে গেলাম। মসজিদে আকদ হলো। বিয়ে পড়ানোর আগে ঈমাম সাহেব তার খুতবা দেয়ার সময় মেয়ের বাবা উপস্থিত আছেন কিনা খুঁজে নিলেন। তারপর সেই হাদিসের উল্লেখ করলেনঃ পিতার অমতে মেয়ের বিয়ে হলে সে বিয়ে বাতিল। (যদিও এর প্রয়োগ নিয়ে আলেমদের মাঝে মতবিরোধ আছে। হানাফি আলেমদের মতে, এটা শুধু নাবালিকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।)

ঈমাম সাহেব বেশ সময় নিয়ে খুতবা দিলেন। কিন্তু একবারও জানতে চাইলেন না যে, এই বিয়েতে মেয়ের সম্মতি আছে কিনা? তিনি তার খুতবায় একথার উল্লেখও করলেন না যে, মেয়েরও সম্মতি ছাড়া কোন বিয়ে হতে পারে না। সেটাও বাতিল বলে গন্য হবে। অথচ সেই বিষয়েও হাদিসে স্পষ্ট নির্দেশ দেয়া আছে। 

আরো অনেক বিয়েতে উপস্থিত থেকেছি। কোথাও ইমামদেরকে এই বিষয়ে জোর দিয়ে বলতে শুনিনি যে, মেয়ের অমতে বিয়ে দেয়া যাবে না। সবসময়ই তারা এটাকে এড়িয়ে যান। আলোচনার প্রয়োজন মনে করেন না। তারা হয়তো মনে করেন- এতে মেয়েরা লাই পেয়ে যাবে!! মেয়ে মানুষকে নাকি বেশি লাই দিতে নাই!!!

মেয়ের বাপ উপস্থিত, তার মানে তিনি রাজী এবং আগ্রহীও। বোঝাই যায়। কিন্তু মেয়ে কি স্বতস্ফূর্তভাবে রাজী হয়েছে? নাকি তাকে বাধ্য করা হয়েছে? ইমামের কি বিয়ের আগে এটাও নিশ্চিত হওয়া উচিত না? বাপ মায়ের পছন্দের পাত্রের সাথে জোর করে মেয়েকে বিয়ে দেয়ার ঘটনা তো এই সমাজে বিরল নয়। তবু কেন ধর্মীয় নেতাদের এই উদাসিনতা?

মেয়ের পছন্দ অপছন্দকে উপেক্ষা করে, তাদের মতামতকে অগ্রাহ্য করে বিয়ে দিলে ভবিষ্যতে পরকীয়ার রাস্তা খুলে যায়। তাছাড়া সে বিয়েই বৈধ হবে না। একটা বিয়ের বৈধতার সব শর্ত পূরণ হচ্ছে কিনা তা কি ঈমাম সাহেব জেনে নিচ্ছেন? নিচ্ছেন না। অন্যসব খবর হয়তো নিচ্ছেন, শুধু মেয়ের মতামতটাই সবসময় উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। পরকীয়াসহ পারিবারিক ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার পেছনে এটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ কার্যকারণ।

আমি মনে করি, একটা মেয়ের অসম্মতিতে কোথাও বিয়ে দেয়ার চেয়ে তার অবিবাহিত থাকাও ভালো।

একজন মেয়ের অমতে, তার অপছন্দের জায়গায় বিয়ে দেয়া যে কতটা ভয়ংকর ব্যাপার, আমি যখন নিজেকে একটা মেয়ের জায়গায় রেখে চিন্তা করি- ভয়ে আতকে উঠি।

একটা মেয়ে, সে যতই শিক্ষিত আর মডার্ন হোক, নিজের অজান্তেই হাজব্যান্ডকে সুপেরিওর হিসেবে মেনে নেয়। সংসারের অথরিটি হিসেবে মেনে নেয়।

যাকে সে পছন্দ করেনা, যাকে তার ভালো লাগেনা, এমন একজনের সব আদেশ নিষেধ মেনে চলা, এমন একজনের সাথে কথা বলা, এমন একজনকে সার্ভ করা কীভাবে সম্ভব?

সামাজিক পারিবারিক চাপে বাধ্য হয়ে বিয়ে করা, মানে কি আবেগ অনুভূতিহীন শারীরিক সম্পর্কের চুক্তি মাত্র? নারীবাদীরা এটাকে ধর্ষণের সমতুল্য মনে করে। আমি অতটা বলবো না, কিন্তু এটা যে একটা ভয়ংকর ব্যাপার তা বলতে আমার আপত্তি নাই। একজন নারীর জন্য এটা কত বড় মানসিক আঘাত, আমাদের পক্ষে বোধহয় তা কল্পনা করা সম্ভব না।

আমাদের নবী (সাঃ) কতটা আধুনিক চিন্তার মানুষ ছিলেন সেটা ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়। দেড় হাজার বছর আগে তিনি যেরকম চিন্তা করে গেছেন, যেরকম আচরণ দেখিয়ে গেছেন, আজকের আধুনিক যুগে আধুনিক দাবিদার পুরুষরাও সেরকম উদার চিন্তা করতে পারেন না।

(বিবাহ কথন-২৬) চলবে...

রবিবার, ১৪ মে, ২০১৭

জামাই আদর?

আমাদের সমাজে জামাই আদর নামে একটা কথা খুব প্রচলিত আছে। কোথাও খাওয়া দাওয়া একটু ভালো হলেই অথবা এটা সেটা খাবারের আইটেম বেশি থাকলেই সেটাকে বলা হয় 'জামাই আদর'।
কিন্তু ঠাট্টাচ্ছলে বলা হলেও এইটার সাইকো-সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট হয়েছে বহুমাত্রিক।

বিয়ের সময় 'জামাই আদরে'র ভিক্টিম হতে হয়েছে অনেক মেয়েকে। এমন ঘটনা অহরহ ঘটেছে যে, 'মেয়ের মা বেঁচে নেই' এই কারণ দেখিয়ে মেয়েকে অপছন্দ করা হয়েছে। বিয়ের প্রস্তাব বাতিল করা হয়েছে। কারণ, যে মেয়ের মা নেই, সেখানে বিয়ে হলে ছেলের নাকি 'জামাই আদর' হবে না!!!

কী অদ্ভুত যুক্তি!! মা মারা গেছেন, সেটাতে মেয়ের কী দোষ? অথচ এমন ভাব করা হয় যে, মেয়ের বিয়ের আগে মা মারা গেছেন, এ যেন তার বিরাট অপরাধ!!

আপনি নিজেই কখন মারা যাবেন তার কোন ঠিকঠিকানা আছে? ভবিষ্যতে আপনার ছেলে মেয়েরাও যে বাপহারা মাহারা হবে না তার কোন নিশ্চয়তা আছে?

যার মা নেই, এমনিতেই তার মনে অনেক কষ্ট। তার ওপর যখন তাকে নাম দেয়া হয় 'মা মরা মেয়ে' তখন সেই মেয়ে কতটা কষ্ট পায় তা শুধু তারাই জানে। আর এই অজুহাতে যদি বিয়ে ভেঙ্গে দেয়া হয়, সেটাকে আমি পৈশাচিকতা ছাড়া অন্য কিছু বলতে পারি না।

বিয়ের পরের জীবনেও এর এডভার্স ইফেক্ট আছে। জামাই বাবু (যদিও জামাই মানেই বাবু হতে হবে বিষয়টা তেমন না) মনে মনে একটা ধারণা বদ্ধমূল করে বসে থাকে যে, শ্বশুর বাড়িতে গেলেই তাকে হুলস্থুল করে খাওয়া দাওয়া করানো হবে! তাই যখনই শ্বশুর বাড়িতে কবজি ডুবিয়ে খাওয়া হয় না, তখনই তার মন খারাপ হয়। আর এর প্রভাব পড়ে অন্যখানে। সুযোগ পেলেই বউকে খোটা দেয়, তোমার বাপের বাড়িতে কী খাওয়াইলো শুনি!!!!

এই 'জামাই আদরে'র প্রথা শ্বশুরবাড়িতেও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। জামাই এলেই অনেক কিছু রান্না করে খাওয়াতে হবে- এই সামাজিক চাপে শ্বশুর শাশুড়িকে প্রায়শই কষ্টে পড়তে হয়। জামাই কী মনে করবে, শ্বশুরবাড়িতে মেয়েটার বদনাম হবে, কটু কথা শুনতে হবে, এই আশঙ্কায় অনেক কষ্ট হলেও তাঁরা জামাই আদরের ব্যবস্থা করেন। হাতে টাকা না থাকলে ধার করে হলেও জামাইয়ের জন্য মোঘলাই ধাঁচের খানাপিনার ব্যবস্থা করেন শ্বশুর শাশুড়ি।

***
এই যুগটাকে বলা হয় উত্তরাধুনিক যুগ। মানে, আধুনিকতার চরম মাত্রায় এসে পৌঁছেছে পৃথিবী। এই সময়ে এসেও যদি কেউ 'মেয়ের মা নেই' শুনে বিয়ে করতে না চায়, শ্বশুর বাড়িতে জম্পেশ খাওয়া না হলে বউকে খোটা দেয়, বউকে যদি শ্বাশুড়ি ননদের কাছে কটু কথা শুনতে হয়, তাহলে বলতে হবে- সে বা তারা মন-মানসিকতায় এখনো আদিম যুগেই রয়ে গেছে। তাদের চেতনায় আধুনিকতার বিন্দুমাত্র আলোক ছটা প্রবেশ করে নাই।

ডাল ভাত খেয়ে যদি কেউ শ্বশুরবাড়ির প্রশংসা না করতে পারে, বুঝতে হবে শ্বশুরবাড়ির সাথে তার সম্পর্কটা আন্তরিক হয়ে ওঠেনি। বউয়ের প্রতি তার ভালোবাসায়ও যথেষ্ট ঘাটতি আছে। নিজের ঘরে কচুপাতা খেলেও কেউ কি মায়ের ওপর অসন্তুষ্ট হয় বা বদনাম করে?

আমি ডাক্তার মানুষ। জামাই আদরের স্বাস্থ্যগত দিকটা না বললে বোধহয় নিজের নামের প্রতি অবিচার হবে :) তাই বর্তমান ও ভবিষ্যত জামাইদের বলি- বেরাদর, জামাই আদরের নামে যা খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলবেন বলে ভাবছেন- তাতে সাময়িক রসনা বিলাস হলেও শরীরের ক্ষতি কিন্তু কম হবে না! পেট খারাপ থেকে শুরু করে ভবিষ্যতে হাইপারটেনশন ডায়াবেটিস সবই হতে পারে। চর্বি জমতে জমতে দিনে দিনে শরীরটা যেমন নাদুশনুদুশ হবে, তেমনি ভুঁড়িটাও হতে পারে দেখার মতন :P :D
 
সুতরাং, আসুন আধুনিক হই। অবসান ঘটাই জামাই আদরের নামে প্রচলিত অদ্ভুত প্রথার। এই আধুনিক যুগে- ডাল ভাত ভর্তা আর ডিমভাজিই হোক জামাই আদরের আধুনিক রীতি।

(বিবাহ কথন-২৫) চলবে....

রবিবার, ৭ মে, ২০১৭

কাঁচায় না নোয়ালে বাশ...

এইসময়ের গার্জিয়ানদের মাঝে ছেলেমেয়েদের বিয়ের ব্যাপারে এক অদ্ভুত রকমের উদাসীনতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এইটা যে শুধু কোন নির্দিষ্ট অংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ তাও নয়। কী উচ্চবিত্ত, কী নিম্নবিত্ত, কী মধ্যবিত্ত- সবার মাঝেই এই প্রবণতা প্রায় সমান। কেবল প্রান্তিক পর্যায়ের নিম্নবিত্তদের মাঝে কিছুটা কম বলা যায়।

আমি আমার নিকটাত্মীয়দের মধ্যেও দেখেছি, মেয়ের বয়স ২৫-২৬ হয়ে গেলেও তাদের বিয়ের ব্যাপারে কোন পেরেশানি নাই। ছেলের ক্ষেত্রে নাহয় এস্টাবলিশমেন্টের একটা ব্যাপার থাকে, কিন্তু মেয়েদের ব্যাপারে কেন এই উদাসীনতা তা আমার বুঝে আসে না। মেয়েকে অনার্স মাস্টার্স শেষ করতে হবে, চাকরি বাকরি করতে হবে, তারপরে বিয়ের কথা শুরু করতে হবে! কেন? অদ্ভুত এই মানসিকতার শুরু হয়েছে খুব সম্প্রতি। ৮-১০ বছর আগেও এই প্রবণতা এতটা প্রকট ছিল বলে আমার মনে হয় না। 

এর ফলে বিরাট সংখ্যক মেয়ের বিয়ে হচ্ছে লেট টুয়েন্টিতে। ২৭-২৮ এ। কেউ কেউ ৩০ পার করে দিচ্ছে।
প্রশ্ন হলো- ২৭-২৮ এ যদি মেয়ের বিয়ে হয়, বাচ্চা নিবে কবে? ৩০ এর আগে নিশ্চয়ই নয়! আর এইখানেই সমস্যার শুরু।

গবেষণায় এটা প্রমাণিত যে, বেশি বয়সে বাচ্চা নিতে চাইলেও বাচ্চা না হবার সম্ভাবনা বেশি। ইনফার্টিলিটি আজকের দিনে একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর মেয়েদের দেরিতে বিয়ে হলো এর একটা প্রধান কারণ।
আমি আশেপাশের অনেকের কথাই জানি, যারা তাদের ৩০-৩২ বছর বয়সে এসে বাচ্চা নিতে চাইছেন। কিন্তু এখন তাদের প্রতিনিয়ত গাইনোকলজিস্টের চেম্বার আর ইনিফার্টিলিটি সেন্টারে যাতায়াত করতে হচ্ছে।

মেয়েদের বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে সন্তানধারণের সম্ভাবনা কমতে থাকে। বলা হয়, Age is the single most important factor affecting fertility and chances of having a child.

ত্রিশ এর আগে যদি সম্ভাবনা থাকে ২০%, ত্রিশ এর পর তা নেমে দাঁড়ায় ৫% এ। ৩৫ বছর বয়সে সন্তান ধারণে অক্ষম হবার সম্ভাবনা ২৫ বছর বয়সের তুলনায় কমপক্ষে তিনগুন বেশি। আর ৪০ এ এই সম্ভাবনা নেমে যায় অর্ধেকে।
বেশি বয়সে যাদের প্রথম বাচ্চা হয়, তাদের ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, ওভারিয়ান সিস্ট, ফাইব্রয়েড ইউটেরাস, গর্ভের শিশুর বিকলাঙ্গতা, গর্ভাবস্থায় শিশুর মৃত্যু, মিসক্যারেজ, প্রসবকালীন ও প্রসব পরবর্তী ঝুঁকি এবং সিজারিয়ান অপারেশনের সম্ভাবনা কয়েকগুন বেড়ে যায়।

তাছাড়া বয়স যত বাড়ে, জীবিত বাচ্চার চেয়ে মৃত বাচ্চা জন্মের সম্ভাবনাও তত বাড়ে।

এমনকি বাচ্চার জন্মের পরেও তার মৃত্যু ঝুঁকি বেশি বয়সের মায়েদের ক্ষেত্রে বেশি থাকে।

আজকে যারা গার্জিয়ান তাঁদের বেশিরভাগের বিয়ে হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে। তখন ছেলের বয়স থাকতো ২৫ এর মধ্যে আর মেয়ের বয়স ২০ এর মধ্যে। তখনো যৌথ পরিবার পদ্ধতি এস্টাবলিশড ছিল, সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন ভালো ছিল। সে কারণে এই অভিভাবকেরা বোঝেন না যে, এই সময়ে এসে ২৫ এর পর ছেলেমেয়েরা কীরকম নিঃসঙ্গতায় ভোগে। আর বেশি বয়সে বিয়ের ফলে ইনিফার্টিলিটি সহ অন্যান্য স্বাস্থ্যগত ক্ষতির দিক নিয়েও তাদের চিন্তা পরিস্কার নয়।

সুতরাং, আমার মনে হয়, আধুনিক ও সচেতন মেয়েরা যদি কেউ নিঃসন্তান জীবনের ঝুঁকি নিতে না চান, তাহলে লাজ লজ্জার মাথা খেয়ে উদাসীন বাপ মাকে নিজেই নিজের বিয়ের কথা বলার সময় এসেছে।

কথায় আছেঃ
কাঁচায় না নোয়ালে বাশ,
পাকলে করে ঠাশ ঠাশ।
(বিবাহ কথন-২৪) চলবে...

রবিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০১৭

বিয়ের প্রস্তাবঃ খুঁত ধরার মহোৎসব?

বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যখন আলাপ আলোচনা শুরু হয়, তখন ছেলে এবং মেয়ে উভয় পরিবারেরই কিছু মানুষ অন্য পরিবারের নানারকম দোষ ত্রুটি উদ্ধারের গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।
যারা ছেলেপক্ষের, তাদের একমাত্র কাজ হয়ে পড়ে যেকোনভাবে মেয়ের এবং মেয়ের ফ্যামিলির খুঁত বের করা। একইভাবে মেয়ের ফ্যামিলির লোকজনের একমাত্র কাজ হয়ে ওঠে ছেলের ও ছেলের ফ্যামিলির খুঁত বের করা।
এক ফ্যামিলির লোকজনের টার্গেট থাকে কীভাবে অন্য ফ্যামিলিকে তাদের চেয়ে ছোট করা যায়। দেখিয়ে দেয়া যায় যে- "আমরা ওদের চেয়ে ভালো বংশ, ভালো ফ্যামিলি!!!" নানান ছোটখাটো বিষয় নিয়ে পরস্পরকে অপদস্থ করার সুযোগ খুঁজতে থাকে কেউ কেউ। 

এইসব কাজে অগ্রণী ভূমিকায় থাকেন ফুপু, খালা মামীরা। কখনো কখনো হবু ননদ ভাবী বা সম্বন্ধীরা। আর এই ডামাডোলে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন বাবা মায়েরা। কখনো কখনো তারাও যুক্ত হন গড্ডালিকা প্রবাহে।
কাছের মানুষ হিসেবে দাবী করা দুয়েকজন প্রতিবেশীও এই কাজে তাদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের অপরিহার্যতা জানান দেন। তারা যে কতটা শুভাকাঙ্ক্ষী তার প্রমাণ পেশ করেন।

তাদের বক্তব্যটা থাকে এরকম- আহা!! আমরা বেঁচে থাকতে কীকরে আমাদের মেয়ে/ছেলে কে ঐরকম একটা ছোট বংশের, ফকিরা, বেলেহাজ পরিবারে বিয়ে দিতে পারি? মান সম্মান বলে কিছু একটা তো আছে নাকি?
বিয়ের মাধ্যমে একটা নতুন আত্মীয়তার বন্ধন তৈরির চাইতে বিয়েকে প্রতিরোধ করাই যেন থাকে তাদের টার্গেট। 'হ্যা' দিয়ে নয়, তাদের সবকিছু শুরুই হয় 'না' দিয়ে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিয়ের প্রস্তাবকে কথার মারপ্যাচে মারাত্মক রকম তিতা বানিয়ে ফেলা হয়। এমনকি শেষমেষ 'তরকারিতে ঝোলের পরিমাণ' নিয়ে কলহ করে বিয়ে ভেঙ্গে দেয়ার ঘটনাও দুর্লভ নয়।
শেষমেষ কোথাও না কোথাও বিয়ে তো হয়, কিন্তু তা যেন নেহায়েত বাধ্য হয়ে। আর তাতেও থাকে তিক্ততার নানা অভিজ্ঞতা।

এমনিতেই মানুষের খুঁত ধরার প্রবণতা ভালো নয়। বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্র পাত্রীর কোন ত্রুটি থাকলে সেটা জেনে নেয়া ভালো। কিন্তু সেটা নিয়ে বিরুপ মন্তব্য করা কোন সুস্থ মস্তিষ্কের কাজ নয়। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে অহেতুক তিক্ততা সৃষ্টি করার কোন সুযোগ কাউকে দেয়া যাবে না।

মানুষের খুঁত থাকে, কিন্তু না খুঁজলে অনেক খুঁত সারাজীবনই থেকে যায় চোখের আড়ালে। মানুষকে ভালোবাসতে হলে তার খুঁত যত কম জানা যায় ততই ভালো। জেনেশুনে মানুষের দোষ অগ্রাহ্য করার মত মন ক'জনের থাকে?
মনে রাখতে হবে, বিয়ে হলে কিন্তু দুই পরিবার পরস্পরের আত্মীয় হবেন। আপনার আত্মীয়ের অপমান কি আপনার অপমান নয়? যেসব তিক্ত মন্তব্য করে আজ পৈশাচিক আনন্দ পাচ্ছেন, সেই তিক্ততার কিছুটা কি পাত্র-পাত্রীদের মনেও বিরুপ প্রভাব ফেলছে না? সেটা কি ভবিষ্যতে তাদের মধ্যে গভীর আন্তরিক সম্পর্ক সৃষ্টিতে প্রতিবন্ধক হবে না?
সবচেয়ে বড় কথা, একটা স্থায়ী বন্ধন কি কোনোভাবেই তিক্ততা দিয়ে শুরু করা উচিত?

(বিবাহ কথন-২৩) চলবে........

শুক্রবার, ২১ এপ্রিল, ২০১৭

বিয়েঃ যেন জীবন্ত পোষাক কেনা

বিয়ে করাকে একটা শার্ট কেনার সাথে তুলনা করা যায়। কারণ, আমাদের স্রষ্টা পবিত্র কুরআনে বলেছেন- হুন্না লিবাসুল্লাকুম ওয়া আনতুম লিবাসুন লাহুন্না। তোমরা (স্বামী-স্ত্রী) পরস্পর পরস্পরের পোষাক স্বরুপ।
এই আয়াতের ব্যাখ্যা দিয়ে পুরো সংসার জীবনকে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু আমরা আজ শুধু ব্যাচেলর জীবনে এর প্রয়োগ নিয়ে কথা বলবো।
আমরা কাপড় কিনি আমাদের শরীরকে ঢাকার জন্য। শরীর খোলা রাখা হলো জংলীপনা, আদিমতা, অসভ্যতা, এবং পাশবিকতা, নির্লজ্বতা।
বিয়ের মাধ্যমে আপনি একটা জীবন্ত পোষাক খুঁজে নিতে যাচ্ছেন। এর উদ্দেশ্যও একই। আপনি আরো বেশি সভ্য হবেন, মানবিক হবেন, লজ্জাশীল হবেন, সব ধরণের নির্লজ্জ্বতা ও অশ্লীলতা থেকে নিজেকে রক্ষা করবেন।
পোষাক যেমন আমাদের বাইরের ধুলাবালি থেকে রক্ষা করে। স্বামী/স্ত্রী হয়ে আপনিও তেমনি একজন আরেকজনকে জীবনের সকল ঝড়ঝাপ্টা ধুলোবালি থেকে রক্ষা করবেন।
আপনি যখন বাজারে শার্ট বা প্যান্ট কিনতে যান, কী করেন? কীভাবে কেনেন? বিয়ের ক্ষেত্রেও সেভাবে চিন্তা করতে হবে।
** আপনি যখন কাপড় কিনতে যান, তখন প্রথমেই আপনাকে ঠিক করতে হয় আপনার বাজেট। আপনার সামর্থ। কারণ, বাজারে অনেক দামী কাপড় যেমন আছে, কমদামীও আছে। আপনার দরকার সেইটা, যেটা আপনার বাজেটে কুলোবে। আপনাকে যেতে হবে সেই দোকানে, যেখানে আপনার বাজেটের আওতায় কাপড় পাওয়া যাবে। দামী কাপড়ের দোকানে ঢুকে তো আপনার লাভ নেই, কিনতে পারবেন না। শুধু শুধু মন খারাপ হবে। যদি ভুল করে দামী কাপড়ের দোকানে ঢুকেও পড়েন, আপনাকে বেরিয়ে যেতে হবে। ওখানে আপনার সময় নষ্ট করার কোন মানে হয় না।
বিয়ের ক্ষেত্রেও আপনাকে আপনার লেভেলের পাত্র বা পাত্রীর খোঁজ করতে হবে। প্রস্তাব দিতে হবে। অন্যথায় শুধু কষ্টই বাড়বে। আপনি আপনার পছন্দমত পাত্রী/পাত্র পেলেও বিয়ে করতে পারবেন না।
** আপনার বাজেটের মধ্যে আপনি কোন কাপড়টা কিনবেন? আপনি প্রথমেই দেখবেন কাপড়টা আপনাকে মানায় কিনা!! ভালো লাগে কিনা!! তারপর দেখেন যে সেটা আপনার সাইজের কিনা। খুব সুন্দর প্যান্ট, কিন্তু কোমড় তিন ইঞ্চি বড়, নিবেন? খুব সুন্দর শার্ট, দুই সাইজ ছোট, নিবেন? নিবেন না।
অর্থাৎ আপনাকে আপনার শরীরে ফিট হয় এমন কাপড়ই নিতে হবে। নইলে আপনি সেটা পরে আরাম পাবেন না। স্বস্তি পাবেন না। বেশিদিন পরতে পারবেন না।
ইসলামে এইটাকে বলে কুফু। অর্থাৎ দামে, এবং সাইজে পোষাককে আপনার সাথে মানানসই হতে হবে।
এইটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনাকে অবশ্যই এমন কাউকে বিয়ে কিরতে হবে যার সাথে আপনার মনের মিল হবে। চিন্তাধারার মিল থাকবে।
আপনি যদি হুজুর হন, ডিস্কো মেয়ে বিয়ে করে সংসার করতে পারবেন না। আপনি যদি ডিস্কো হন, নামাজী পর্দাশীল মেয়ে বিয়ে করে আপনি সুখী হবেন না। দু'জনের চিন্তাধারা দুরকম। একজনের কাজ আরেকজনের কাছে বিরক্তিকর মনে হবে। অতিষ্ঠ হয়ে যাবেন। বংশ, সম্পদ, সৌন্দর্য সবকিছুর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানসিকতার মিল।
খুব সুন্দর শার্ট, সাইজে না মিললে কিনবেন? কিনে পরতে পারবেন? দামী শার্ট, সাইজে না মিললে পরবেন? না।
বংশের কুফু সম্পর্কে অনেকে জয়নব (রাঃ) এবং জায়েদ (রাঃ)এর বিবাহ বিচ্ছেদের উদাহরণ দেন। বলেন যে, বংশের সমতা খুব প্রয়োজনীয়। তাদের জন্য পাল্টা উদাহরণ হলোঃ হযরত বেলালের (রাঃ) স্ত্রী ছিলেন আব্দুর রহমান ইবনে আওফের বোন। আর এটাতো সবারই জানা যে আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রাঃ) ছিলেন কুরাইশ বংশের ধনাঢ্য ব্যক্তি। তার বোন কী করে বেলালের (রাঃ) মত কালো হাবশি (প্রাক্তন) গোলামের সাথে সংসার করে? এটাই হলো সেই মনের মিল, চিন্তাধারার মিল, যার কথা আমি বারবার বলতে চাইছি। জায়েদের সাথে জয়নবের বিচ্ছেদের কারণ বংশমর্যাদার পার্থক্য নয়, ছিল মানসিকতার অমিল। আর তাছাড়া এই ক্ষেত্রে আল্লাহর ইচ্ছাই ছিল ভিন্ন।
** বাজারে তো অনেকে কাপড় আছে। সব কাপড় কি আপনার ভালো লাগে? না। আপনি সেটাই কেনেন যেটা আপনার মনে ধরে। যেটা আপনার ভালো লাগে। হয়তো অন্য কারো চোখে সেটা সুন্দর না। অন্যদিকে যেসব শার্ট আপনি পছন্দ করেন নি, সেগুলোও কিন্তু অবিক্রিত থাকবে না। আপনার চোখে যেটা সুন্দর ছিল না, অন্য একজনের চোখে সেটাই হবে অনেক সুন্দর। যে শার্টটা আপনাকে ফ্রি দিলেও নিতেন না, সেটাই অন্য কেউ কিনে নিয়ে যাবে যথাযোগ্য দামে, অনেক খুশিমনে। তার মানে আপনি কাউকে অপছন্দ করলেন মানেই এইনা যে তিনি খারাপ। কিংবা আপনাকে কেউ অপছন্দ করলেই তার অর্থ এই না যে আপনি খারাপ। বরং বিষয়টা আসলে ম্যাচিং এর। কেউ আপনাকে পছন্দ করেনি বা আপনি কাউকে পছন্দ করেননি মানে তার সাথে আপনার ম্যাচিং হয়নি। নাথিং এলস। একজনের চোখে আপনি সুন্দর নন, কিন্তু অন্য একজনের চোখে হয়তো আপনিই সবচেয়ে সুন্দর। অন্য একজন আপনাকে গ্রহণ করবে আপনার যথাযোগ্য দামেই, যথাযোগ্য মর্যাদায়।
** এক মার্কেটে আপনার পছন্দের বা মাপের শার্ট না পেলে আপনি কী করেন? অন্য মার্কেটে যান না? সেইম হেয়ার। একজনের সাথে ম্যাচিং হচ্ছে না, আরেকজনের খোঁজ করুন। হয়তো ম্যাচিং হবে। হবেই হবে।
বাজারে সবচেয়ে হ্যাংলা মানুষটার জন্য যেমন শার্ট আছে, সবচেয়ে মোটা মানুষটার জন্যেও শার্ট আছে। আল্লাহ সবকিছু সৃষ্টি করেছেন জোড়ায় জোড়ায়। আপনার ম্যাচিং এর জন্য শার্ট আল্লাহ তৈরি করে রেখেছেন, নো ডাউট।
** ধরুন আপনি একটা শার্ট খুব পছন্দ করলেন, কিন্তু দোকানদার আপনার কাছে বিক্রি করবে না। সে অনেক বেশি দাম চেয়ে বসলো। আপনি কী করবেন? কিছু করার নেই। দোকানদার না দিলে কী করার আছে? মুভ ফরোয়ার্ড।
আপনি আপনার সাধ্যে যা কুলায় সেই দামটা বলে দিন, দোকানদার যদি না দেয়, রিকুয়েস্ট করতে পারেন। তবুও না দিলে মনে করুন ওটা আপনার জন্য নয়। আপনি নিশ্চয় ছিনতাই করবেন না, কারণ আপনি একজন ভদ্র মানুষ। ছিনতাইকারি নন।
এক দোকানে পছন্দ হয়েছে মানে এই নয় যে অন্য দোকানে অন্য কোন শার্ট আপনার পছন্দ হবে না। এগিয়ে যান, খুঁজুন, পেয়ে যাবেন।
*** শার্ট কেনা সম্পর্কে বলার আছে আরো অনেক কিছুই। কিন্তু সব কথা এখন বলা যাবে না। এখন বললে ছোট মুখে বড় কথা হয়ে যাবে। আর তাছাড়া এমন অনেক কথা আছে যা বললে বিবাহিত সমাজের ভাইয়া আপুরা আমার পিঠের চামড়া আস্ত রাখবে না। যা-ই বলেন না কেন, বিয়ের আগেই আমি আমার পিঠের চামড়া হারাতে চাই না :P :P :D
(বিবাহ কথন-২২)

শুক্রবার, ১৪ এপ্রিল, ২০১৭

না না চাইনা, না না চাইনা, কোনো রম্ভা উর্বশী...

এইটুকুই তো দাবি আমার এইটুকু দাবি
বউতো হবে লক্ষ্মীমন্ত লাখ টাকার চাবি..
না না চাইনা, না না চাইনা, কোনো রম্ভা উর্বশী...
শুধু মেয়ের বাবার ব্যাংক ব্যালেন্সটা হতে হবে বেশি..

নচিকেতার গানে উঠে এসেছিলো বিয়েকে কেন্দ্র করে এই উপমহাদেশের একশ্রেণীর মানুষের অর্থলিপ্সা। এইযে সবাই লক্ষ্মী বউ চায়, এইটার পেছনেও সেই অর্থলিপ্সাই প্রধান, কারণ হিন্দু ধর্ম মতে লক্ষ্মী হলো সম্পদের দেবতা। লক্ষ্মী বউ শব্দটাও সেখান থেকেই এসেছে।

এই অর্থলিপ্সাকে আবার কেউ কেউ উৎসাহ ও বৈধতা দিতে চায়। তারা বলে- "If your Father is Poor, it's not your Fault... But if your Father in Law is Poor, it's definitely your Fault...!!!

অর্থলিপ্সা আর কূপমন্ডুকতার কারণে আজও বাংলাদেশের বেশিরভাগ জায়গায় টিকে আছে অভিশপ্ত পণ প্রথা। কেউ কেউ সরাসরি যৌতুক চায়, কেউ চায় আকারে ইঙ্গিতে।

কোথাও কোথাও মেয়ের বাপ মা দাবির মুখে যৌতুক দিতে বাধ্য হয়, কোথাও বাধ্য হয় 'খুশি হয়ে' দিতে। কারণ, মেয়ের বাপে 'খুশি হয়ে' মেয়েজামাইকে কিছু না দিলে সেই মেয়েকে শ্বশুর বাড়িতে নিজের বাপ মা সম্পর্কে প্রতিনিয়ত নানান অপমানজনক কথাবার্তা হজম করতে হয়।

আর তাই, মেয়ের বিয়ে নিয়ে বাবা মাকে চিন্তিত থাকতে হয় মেয়ের জন্মের পর থেকেই! কেউ কেউ মেয়ের জন্মের পরেই ব্যাংকে ডিপিএস একাউন্ট খোলেন, কেউ গাছ লাগান, কেউ স্বর্ণ কিনে রাখেন। কেউ মনে মনে ঠিক করেন, কোন জমিটা বিক্রি করবেন। কারণ মেয়ের বিয়ে দিতে গেলেই লাগবে লক্ষ লক্ষ টাকা। কীভাবে মেয়ের বিয়ে দেবেন সেই চিন্তায় অনেক বাবারই অর্ধেক চুলে পাক ধরে যায় অকালেই।
নিজের মেয়ের বিয়েতে যৌতুক দিচ্ছে, আবার ছেলের বিয়েতে যৌতুক নিচ্ছে। নিজের বিয়েতে নিচ্ছে, আবার বোনের বিয়েতে দিচ্ছে। এ এক ভয়ংকর অভিশপ্ত দুষ্টচক্র। আর এই দুষ্টচক্রের পার্ট শুধু অশিক্ষিতরা নয়, তথাকথিত শিক্ষিত জনগোষ্ঠিও।
এই অবস্থার পরিবর্তন করতেই হবে। সেজন্য এগিয়ে আসতে হবে এই প্রজন্মের ব্যাচেলরদের। এই কুপ্রথাকে যারা চ্যালেঞ্জ করতে চান, বিয়েকে যারা সহজ করতে চান, আমি তাদেরকে সাহসী হবার আহবান জানাই। বিয়েকে কঠিন করা হয়েছে বলে যারা গার্জিয়ানদের ওপর ক্ষুব্ধ, তাদের জন্যেও একই কথা। শুধু গার্জিয়ানদের দোষারোপ করলে হবে না, নিজেকেও বদলাতে হবে। কমিয়ে আনতে হবে চাহিদা ও প্রত্যাশা। ধনীর দুলালী নয়, আপনার নিজের ফ্যামিলির চেয়ে তুলনামূলক দরিদ্র পরিবারে বিয়ে করুন। বিয়েও অনেক সহজ হবে, নিজেও সম্মানিত হবেন।

কোনভাবেই যৌতুক নেবেন না। শ্বশুরের কষ্ট হয়- এমন কোনকিছু 'খুশি হবার' নাম করে দিলেও নেবেন না।
কী হবে কিছু টাকার যৌতুক না নিলে? কেন নিজেকে আজীবনের জন্য ছোট করবেন? নাহয় এখন একটা ফ্রিজ নাই থাকলো আপনার নতুন সংসারে! এক বছর টাকা জমান। নিজেই কিনতে পারবেন। একটা ৪৮ ইঞ্চি ফ্ল্যাট টিভি নাইবা থাকলো! কিছুদিন অপেক্ষা করুন। একদিন নিজেই কিনতে পারবেন। দামী ব্র‍্যান্ডের ড্রেসিং টেবিল নাইবা থাকলো! নিজের ঘাম ঝরানো টাকায় একটা আয়না কিনে আনুন না! সেই আয়নার পেছনেই হয়তো আছে ক্রনিকলস অব নার্নিয়ার মত সুখের সাগর।

নতুন টাইলস লাগানো ঝকমকে ফ্ল্যাট বাসা ভাড়ায় কুলাতে পারছেন না, একটা টিনশেড বাসাই নাহয় খুঁজে বের করুন। কিংবা, দুইহাজার স্কয়ার ফিটের বাসা না হোক, দুটো খুপরি ঘর তো পাবেন!
আর সেই ঘরের বারান্দায় বসে, খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে, বউয়ের হাতে হাত রেখে গলা ছেড়ে গেয়ে উঠুন হেমন্তের পুরনো গান-

নীড় ছোট... ক্ষতি নেই...
আকাশ তো বড়ো...
হে মন বলাকা মোর, অজানার আহবানে..
চঞ্চলও পাখা মেলে ধরো...
দেখবেন, সুখ এসে খেলা করছে আপনাদের চোখের তারায়।
(বিবাহ কথন-২১)

সোমবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৭

গার্জিয়ানস হিপোক্রেসি

* ছেলের বয়স যদিও ৩৫, মেয়ের বয়সটা কিন্তু হওয়া চাই ১৯!!! যদি কোনভাবে মেয়ের বয়সটা ২৫ পার হয়, তাহলেই ছেলের গার্জিয়ানদের মাঝে কানাঘুষা!! আ আ মেয়ের বয়সটা বেশি হয়ে যায় না মতির বাপ?
--
* ছেলে/মেয়ে নিজেই পাত্র/পাত্রী পছন্দ করেছে? যতই যোগ্য হোক সেই ছেলে/মেয়ে একটা পঁচা। তার দোষ বর্ণনা করতে গেলে একটা মহাকাব্যে কুলোবে না।
* বন্ধুর ছেলে? বান্ধবীর মেয়ে? আহা! এমন ছেলে সাত আসমানে আর নাই! আহা! এমন মেয়ে সারা দুনিয়া খুঁজে আনো দেখি একটা, হু!! দেখতে হবে না! আমার বোনের মেয়ে যে!!
--
* যখন মেয়ের বাপঃ ছেলেরা তো আমাদের চেয়ে গরীব। গরীবের ঘরে মেয়ের বিয়া দিমু না।
* যখন ছেলের বাপঃ মেয়েরা তো আমাদের চেয়ে গরীব। গরীবের ঘরে ছেলের বিয়া দিমুনা।
(উহাদের কে বুঝাইবে, এই দুনিয়ার প্রত্যেকেই তো কারো না কারো চেয়ে গরীব!!)
--
* যখন মেয়ের বাপঃ কালা ছেলের সাথে মেয়ের বিয়া দিমু না। ছেলের নাক বোঁচা। বিয়া দিমু না।
* যখন ছেলের বাপঃ পুরুষ মানুষের আবার চেহারা কী?
--
* যখন মেয়ের গার্ডিয়ানঃ ফকিরের গোষ্ঠী বিয়া করতে আসছে ক্যান? মোহরানা বিশ লাখের নিচে এক পয়সা কম হইতে পারবো না। মাইয়া কি গাঙের জলে ভাইস্যা আসছে??
(মনে হয় পোলায় গাঙের জলে ভাইস্যা আসছে!)
* যখন ছেলের গার্ডিয়ানঃ বউমা তো আমার মা ফাতেমা। আহা! আসেন বেয়াই, আমরা মোহরে ফাতেমীর ব্যবস্থা করি!!!
(বউমা নাহয় মা ফাতেমা হইলো, কিন্তু পুত্রধন যে হযরত আলী না, সেইটা আর খেয়াল নাই)
--
* নিজের ছেলের বিয়াঃ বেশি খরচ করন যাইবো না। হাদীছে আছে- যে বিয়ার খরচ কম হয়, সেই বিয়ায় বরকত বেশি।
* অন্যের ছেলের বিয়াঃ মকবুল সাব কী কিপ্টার কিপটা দেখছেন! ছেলের বিয়া দিলো, একটু ধুমধামও করলো না!!
--
বিয়ার পরঃ
* মেয়ের বাপ-মাঃ জামাইটা কত্ত ভালা, আহা! আমার মেয়ের কথার বাইরে কোন কাজই করেনা।
* ছেলের বাপ-মাঃ ছেলেটা আর মানুষ হইলোনা! খালি বউয়ের কথায় ওঠে আর বসে!! আগে জানলে বিয়াই দিতাম না। বউটা আমার ছেলের মাথাটা খাইয়া ফেলাইছে গো খাইয়া ফেলাইছে....!!!! :v :v 

(বিবাহ কথন-২০)  

শুক্রবার, ৩১ মার্চ, ২০১৭

বিয়ে করতে কত টাকা লাগে?

বিয়ে করতে আসলে কত টাকা লাগে? বিবাহ কথন সিরিজের এই পর্যায়ে এটাই এখন আমাদের সামনে গুরুতর প্রশ্ন।
তবে এই প্রশ্নে নিজের মন্তব্য দেয়ার আগে আমি দুটি কেস হিস্ট্রি তুলে ধরবো। একতরফা না। একজন ছেলের, আর একজন মেয়ের।

কেস হিস্ট্রি-১:
আমাদের দেশে ছাত্রাবস্থায় বিয়ে করতে চাওয়াটাকে এক ধরণের অপরাধ হিসেবেই ধরা হয়। আমার বাসায়ও ভয় পেয়ে গেল। আমাকে অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে বললো, "কোনমতে জাস্ট পাসটা কর, তারপরই বিয়ে দিয়ে দিব; চাকুরিও পাবার দরকার নাই। এখন বিয়ে করলে মানুষ কি বলবে? মান-সম্মান থাকবে?"

আমিও বুঝলাম। পাস করে বের হবার পর বেকার ছিলাম প্রায় ৯ মাস। তখন তো বিয়ের কথা মুখে আনা প্রায় অসম্ভবই। এরপর মোটামাটি আয়-রোজগারের একটা ব্যবস্থা হলো (মাসে ১৮ হাজার টাকার মত)। এর কিছুদিন পর বাসায় আবার বললাম বিয়ে করার কথা। আব্বা বললেন - এই টাকায় ফ্যামিলি চালাতে পারবি? ঢাকা শহরে তো বাড়িভাড়াই হবেনা এই টাকায়। আমি কিন্তু ১ টাকাও দিতে পারব না। You have to be at your own! ভেবে দেখ।
সাত-পাঁচ ভেবে পিছিয়ে আসলাম। ঠিকই তো! এই টাকায় চলব কিভাবে? এভাবে আরও কিছুদিন গেল। আবার বললাম। আবার একই উত্তর। আবার পিছালাম। এভাবেই চললো কিছুদিন।

শেষমেষ ঠিক করলাম। দরকার হলে রিস্কই নিব। আমার পরিচিত অনেকে তো মাসে ৮ হাজার টাকা স্যালারি পেয়েও ২-৩ জন ছেলেমেয়ে নিয়ে সুন্দর সংসার চালাচ্ছে, তাঁরা পারলে আমি পারবোনা কেন? লাইফ-স্ট্যান্ডার্ড নিচে নামিয়ে আনতে হবে? আনবো। দরকার হলে বস্তিতে থাকবো।

এরপর বিয়েটা করেই ফেললাম (জুন, ২০১৩)। আমার ২ ফ্রেন্ডের কাছে ২০ হাজার ও ৩০ হাজার করে মোট ৫০ হাজার টাকা ধার করলাম। হবু বউকে আগেই জানিয়ে দিলাম আমি গরিব মানুষ। পুঁজি বলতে আমার এই ৫০ হাজার টাকাই। এর বেশি মোহরানা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না, আর পুরোটাই নগদ দিতে চাই। সে রাজি হলো।
কিভাবে জানি আরও ১০ হাজার টাকা ম্যানেজ হলো। বিয়ের দিন কি কি সব খরচে দেখি ২ হাজার টাকা শর্ট! দৌড়ায়ে গেলাম ছোট ভাইয়ের কাছে। বিভিন্ন সময়ে সে আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে পাওয়া ১০০, ২০০ টাকা মিলিয়ে যে ২-৩ হাজার টাকা জমিয়েছিল তা থেকে ২ হাজার টাকা ধার দিল। বিয়ে হয়ে গেল।

বিয়ের আগেই একটা বাসা ভাড়া নিয়ে রেখেছিলাম। ভাড়া ৭ হাজার টাকা প্রতি মাসে। বিয়ের ৩-৪ দিন পরই ঢাকায় চলে আসলাম নতুন বাসায়। ফার্নিচার বলতে মেসে থাকার জন্য কেনা ১ হাজার টাকা দামের একটা চৌকি আর ৫০০ টাকা দামের একটা টেবিল আর মেসে মিশুকের ফেলে রেখে যাওয়া একটা প্লাস্টিকের চেয়ার।

সংসার চালানোর জন্য যত খরচ হবে ভেবেছিলাম, দেখলাম বাস্তবে খরচ তার তুলনায় কমই। খরচ বেড়েছে বলতে বাসা ভাড়া ৪ হাজার টাকা (আগে ৩ হাজার লাগত আর তখন ৭ হাজার), খাওয়ার খরচ প্রায় অপরিবর্তিতই আছে (যেহেতু রান্না-বান্না কাজের লোক না রেখে নিজেরাই করি)। তবে আগে যেমন হাতখুলে খরচ করতাম, তখন সেটা মোটামুটি নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসতে হলো। পার্থক্য এটুকুই। সেই খরচেই সুন্দর চলে যেতে লাগলো।

কয়েকমাস পর বউ বললো একটা ফ্রিজ কেনা দরকার। টাকা জমাতে হবে। কয়েকমাস টাকা জমিয়ে ২০ হাজার টাকার মত হলো। ফ্রিজের দোকানে গেলাম। বউ পছন্দ করলো প্রায় ৩০ হাজার টাকা দামের একটা ফ্রিজ। আমি আনইজি ফিল করা শুরু করলাম। আমার কাছে তো এত টাকা নাই। সব মিলিয়ে বাইশ হাজার টাকা হতে পারে। বউ দেখি হাসে। এই কয়দিনে বউও প্রায় ৮ হাজার টাকার মতো জমিয়ে ফেলেছে সংসারের খরচ সেভ করে।

এখনো মাঝে মাঝে অবাক লাগে। আগে টাকার ভয়ে বিয়ে করতে পারিনি আমি। বিয়ের আগে প্রায় এক-দেড় বছর যে আয় ছিল, বিয়ের প্রায় বছরখানেক পর পর্যন্তও আয় ছিল একই। বিয়ের আগের প্রায় এক বছরে সেভিংস ছিল শূন্য টাকা। বিয়ের পরের এক বছরেও সেভিংস শূন্য, কিন্তু ২ জনের একটা সংসার চালিয়েও ফ্রিজসহ আরও অনেক কিছু কেনা হয়ে গেছে!

বিয়ে করলে আসলেই আয়ে বরকত আসে। রিজিকের মালিক আল্লাহ- এটা নতুন করে অনুভব করেছিলাম তখন। যারা টাকার ভয়ে বিয়ে করতে পারছেন না, সাহস করে বিয়েটা করেই ফেলুন। ইনশাল্লাহ, আয়ে বরকত আসবে। রিজিকের মালিক তো আল্লাহই।

ফুটনোটঃ বিয়ের জন্য যে দুই ফ্রেন্ডের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছিলাম, ধার শোধ করে তাঁদের বিয়ের সময়ও সেই একই পরিমান টাকা ধার দিতে পারার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। মাঝে মাঝে এই ৫০ হাজার টাকাকে খুব বরকতময় মনে হয়! কি সুন্দর এই হাত থেকে ঐ হাতে যাবার অছিলায় ৩ জনের বিয়ে সুন্দরভাবে হয়ে গেল! (রনি পারভেজ)

(বিবাহ কথন-১৭)

****

বিয়ে করতে কত টাকা লাগে? এই প্রশ্নে আমি একটা অদ্ভুত উত্তর দেবো, তবে তা আগামী পর্বে। নিজের মন্তব্য দেয়ার আগে যে দুটো কেস হিস্ট্রি উল্লেখ করতে চেয়েছিলাম, আজ থাকছে তার দ্বিতীয়টি।

কেস হিস্ট্রি-২:
আমার বিয়ের শাড়িটির দাম চার হাজার আট'শ টাকা। যেখানে আমারই বোন কিংবা কাজিনদের বিয়ের শাড়ির দাম পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত। আর্থিক সংকটের কারণে যে আমি কম দাম দিয়ে বিয়ের শাড়ি কিনেছি, এমন নয়। আসলে আমার মনে হয়েছে, কী দরকার, একদিনের জন্য এত বেশি টাকা নষ্ট করে! হাতে টাকা পেলে আমি পোশাক কেনার চেয়ে বই কেনায় বেশি মনোযোগ দেই। সে যাক, যার যার রুচির ব্যাপার। তবে এটা বলতে পারি, এক লক্ষ টাকার শাড়ি গায়ে জড়ানো বোনটির চেয়ে আমি মোটেও খারাপ নেই। ভালো থাকা যার যার মানসিকতার ওপর নির্ভর করে। আপনি যদি মনে করেন, আপনি ভালো আছেন, তাহলেই আপনি ভালো থাকবেন।

আমার যখন বিয়ে হয়, আমরা দুজনই স্টুডেন্ট। আমার একুশ, আতিকের তেইশ। আতিক কম বেতনের একটা চাকরি করে, আমার তেমন কোনো আয়-ইনকাম নেই। তবু আমার পরিবার বিয়েতে অমত করেনি। বিয়ের পরে আমরা একরূম সাবলেট নিয়ে উঠেছি। সস্তার আসবাবপত্রের দোকান থেকে কেনা দুই হাজার টাকার একটি খাট, একটি আলনা আর কম্পিউটার ছাড়া আর কিছুই ছিল না আমাদের ঘরে। দীর্ঘদিন আমরা দুইজন কোনো দামী ফোন ব্যবহার করিনি। মনে আছে, দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর আমি কোনো নতুন জামা, জুতো, ব্যাগ কিনিনি। আগের যা ছিল, তাই দিয়েই চালিয়ে নিয়েছি।

এক কেজি গরুর মাংস চার ভাগ করে রান্না করেছি। দিনের পর দিন শুধু সবজি দিয়েই ভাত খেয়েছি। এত যে কষ্ট করেছি, তবু একজনের বিরুদ্ধে আরেকজন কখনো অভিযোগ করিনি। আমাদের পরিবারকেও কখনো বলতে যাইনি, যে আমরা কষ্ট করছি। তারা জানতো, আমরা ভালো আছি। সত্যিই আমরা ভালো আছি। প্রয়োজন ছিল কিছুটা সময় ধৈর্য ধরার। আমরা তা করেছি, তাই দেখতে দেখতে দৃশ্য বদলে গেল, যে জীবন আমরা শুরু করেছিলাম, তার সঙ্গে বর্তমান জীবনের কোনো মিলই নেই! ভাগ্য বদলের জন্য তো প্রচেষ্টা থাকতে হবে, তাই না?

আরেকজনের সাজানো-গোছানো জীবনে প্রবেশ করার চেয়ে দুজন মিলে সাজিয়ে নিলে, সেই জীবনটা আরো বেশি সুন্দর হয়ে উঠতে পারে। (হাবিবা নাসরিন)

(বিবাহ কথন-১৮)

****

এর আগে দুটি কেস স্টাডি দিয়ে আমি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি- বিয়ে করতে খুব বেশি টাকার দরকার নেই। যদি নিয়ত ঠিক থাকে, যদি উভয়ের মেনে নেয়ার মানসিকতা থাকে- তাহলে থাকার জন্য দালানের দরকার হয় না, মাটির ঘরই যথেষ্ট হয়। লাখ লাখ টাকা মোহরানা লাগে না, কোরআনের কয়েকটি সুরাও যথেষ্ট হয়। লাখ টাকার শাড়ি গহনা পাগড়ী শেরোয়ানি লাগে না, লুঙ্গি ফতুয়া আর সাধারণ একটা শাড়ি হলেই চলে। কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করে হাজার মানুষ খাওয়ানো ওয়ালিমা দরকার হয়না, এক প্যাকেট খেজুরের ওয়ালিমাই বরকতপূর্ণ হয়।

এইযে এত জাঁকজমকের আয়োজন, এত আনুষ্ঠানিকতা, এত দর-কষাকষি, এইসব কেন করা হয়? করা হয় শুধুমাত্র তথাকথিত এই সমাজের চোখে, সমাজের মানুষের চোখে বড় সাজার জন্য। মানুষের চোখে প্রশংসা পাওয়ার জন্য। মানুষ কী বলবে- এই তাড়না থেকেই শুরু হয় শো-অফ এর যতসব অসুস্থ প্রতিযোগিতা।

কিন্তু বাস্তবে বিয়ের উদ্দেশ্য যে একটা সুন্দর পরিবার গঠন, সেইখানে এতসব খানাদানা জাঁকজমকের একপয়সার মূল্য নেই। দিনশেষে এই তথাকথিত সমাজ আর সমাজের মানুষেরা শুধু নিন্দাই করে, শুধুই পরশ্রীকাতর হয়, শুধু হিংসাই করে, শুধু সমস্যাই বাড়ায়।

সবকিছু মোকাবেলা করতে হয় শুধু দুজনকেই, পরিবারটাকে টেনে নিতে হয় মাত্র দুজনকেই।
বিয়ে করতে কত টাকা দরকার? আমার উত্তর হলোঃ বিয়ে করতে তত টাকাই দরকার, যতটাকা হলে একটা লুঙ্গি কেনা যায়!! অদ্ভুত শোনাচ্ছে? হাদীস থেকে বাস্তব প্রমাণ দিচ্ছিঃ

সাহল ইবনু সা‘দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক মহিলা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার জীবনকে আপনার হাতে সমর্পণ করতে এসেছি। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাঁকালেন এবং সতর্ক দৃষ্টিতে তার আপাদমস্তক লক্ষ্য করলেন। তারপর তিনি মাথা নিচু করলেন। যখন মহিলাটি দেখল, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সম্পর্কে কোন ফয়সালা দিচ্ছেন না, তখন সে বসে পড়ল। এরপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীদের মধ্যে একজন দাঁড়ালেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! যদি আপনার বিয়ের প্রয়োজন না থাকে, তবে আমার সঙ্গে এর বিয়ে দিয়ে দিন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে কিছু আছে কি? সে উত্তর করলো- না, আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার কাছে কিছুই নেই। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তোমার পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে গিয়ে দেখ, কিছু পাও কিনা। এরপর লোকটি চলে গেল। ফিরে এসে বলল, আল্লাহর কসম! আমি কিছুই পাইনি। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আবার দেখ, লোহার একটি আংটিও যদি পাও। তারপর লোকটি আবার ফিরে গেল। এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! তাও পেলাম না, কিন্তু এই আমার লুঙ্গি (শুধু এটাই আছে)। লোকটি এর অর্ধেক তাকে দিতে চাইল। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে তোমার লুঙ্গি দিয়ে কী করবে? তুমি যদি পরিধান কর, তাহলে তার কোন কাজে আসবে না, আর সে যদি পরিধান করে, তবে তোমার কোন কাজে আসবে না। বেশ কিছুক্ষণ লোকটি নীরবে বসে থাকল। তারপর উঠে দাঁড়াল। সে যেতে উদ্যত হলে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডেকে আনলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কী পরিমাণ কুরআন মাজীদ মুখস্থ আছে? সে বলল, আমার অমুক অমুক সূরা মুখস্থ আছে এবং সে গণনা করল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, এগুলো কি তোমার মুখস্থ আছে? সে বলল, হাঁ। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে পরিমাণ কুরআন তোমার মুখস্থ আছে তার বিনিময়ে এ মেয়েটিকে তোমার অধীনস্থ করে (বিয়ে) দিলাম।
(সহীহ বুখারী)

আপনার যা আছে বিয়ে করার জন্য তা-ই যথেষ্ট। শুধু আপনাকে হতে হবে আরো একটু বেশি কষ্টসহিষ্ণু, টেনে ধরতে হবে আপনার উচ্চাভিলাষের লাগাম, সাময়িকভাবে হয়তো কমিয়ে আনতে হবে জীবনযাত্রার মান। আর হ্যা, খুঁজে বের করতে হবে এমন একজনকে- যিনি আপনার এইটুকু নিয়েই সন্তুষ্টচিত্তে সংসার করতে রাজী আছেন।
(বিবাহ কথন-১৯) 

রবিবার, ১৯ মার্চ, ২০১৭

ফিফটি ফিফটি চান্স

বিয়ের আলাপ যদি সফল না হয়, অর্থাৎ আলাপ যখন আত্মীয়তায় পরিণত না হয়, তখন কোন না কোন একটা পক্ষকে মনোক্ষুন্ন হতেই হয়। পাত্রপক্ষ অথবা পাত্রীপক্ষ। কারণ, শেষ পর্যন্ত তো কোন এক পক্ষ অপর পক্ষকে অপছন্দ করেই বসে। প্রস্তাব বাতিল হয়। হতে পারে এক ফ্যামিলি অন্য ফ্যামিলিকে অথবা ছেলে বা মেয়ে একজন আরেকজনকে অপছন্দ করে। হয়তো মেয়ে পাত্রকে পছন্দ করলো, কিন্তু ছেলে কিংবা ছেলের ফ্যামিলি মেয়েকে অপছন্দ করলো। হয়তো ছেলে পাত্রী পছন্দ করলো, কিন্তু ছেলের পরিবার অপছন্দ করলো মেয়ের পরিবারকে।

প্রথম প্রস্তাবেই বিয়ে হয় এমনটা খুব কমই ঘটে। সাধারণত প্রত্যেক ছেলে বা মেয়েকেই বিয়ের আগে গড়ে চার পাঁচবার এই দেখাদেখি পর্বের মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিটা ক্ষেত্রেই ছেলে কিংবা মেয়ে কাউকে না কাউকে হতাশ হতে হয়। কারো না কারো মন ভেঙ্গে যায়। কাউকে না কাউকে কষ্ট পেতে হয়। প্রত্যাখ্যানের কিংবা স্বপ্নভঙ্গের কষ্ট। 

এই অবস্থা বেশি মোকাবেলা করতে হয় মেয়েদেরকে। বিশেষ করে মেয়ে যদি তথাকথিত প্রচলিত মানদন্ডে একটু কালো হয়, শ্যামলা হয়, বেঁটে হয়। তাই বিয়ের আলাপ শুরুর আগেই গার্ডিয়ানদের উচিত ছেলে এবং মেয়ে উভয়কে মানসিকভাবে তৈরি করা। তাদেরকে জানিয়ে দেয়া, বুঝিয়ে দেয়া উচিত যে- প্রতিটা প্রস্তাব ফিফটি ফিফটি চান্স। যেকোনটাই হতে পারে। যাই হোক, বিশেষ করে নেগেটিভ হলে মনে কষ্ট পাওয়া যাবে না। কেউ যদি তোমাকে অপছন্দ করে তো সেটা তার সমস্যা, তোমার নয়। কোন মানুষই সবার কাছে পছন্দের হয় না। সবার চোখে সুন্দর হয় না। সবচেয়ে যে সুন্দর মেয়েটা বা ছেলেটা, তাকেও কেউ না কেউ অপছন্দ করে। সবচেয়ে যে ভদ্র নম্র মানুষটা, তাকেও অনেকেই পছন্দ করেনা। আর খুব কম মানুষই আছে যারা অন্য কারো ইনার পটেনিশিয়ালিটি উপলব্ধি করার ক্ষমতা রাখে।

পাত্র পাত্রীদের বুঝতে হবে, কেউ যদি আপনাকে অপছন্দ করে, তাহলে আপনার মন খারাপ করার কিছু নেই। কারণ, যে আপনাকে পছন্দ করে না সে কোনভাবেই আপনার জন্য নয়। আপনাকে যার পছন্দ নয়, যার চোখে আপনি সুন্দর নন, তার সাথে বিয়ে হলে আপনি কি সুখী হবেন? আপনাকে খুশি করার জন্য সে কি কখনো কিছু করবে? আপনার জন্য কোন স্যাক্রিফাইস করবে? নিশ্চয় না।

তাহলে কেন আপনি কষ্ট পাবেন? বরং এমন কারো জন্য অপেক্ষা করুন, যে আপনাকে আপনার অবস্থানেই পছন্দ করবে, আপনার যা আছে তাতেই সন্তুষ্ট হবে।

(বিবাহ কথন-১৬)  

মঙ্গলবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

'স্বামীগিরি'র দিন আর নাই...

আহা কেউ যদি মশারিটা টাঙিয়ে দিত!! আলোচ্য বাক্যাংশটুকু মশার কামড়ে অতিষ্ঠ অলস ছেলেদের স্বগতোক্তি হইতে চয়ন করা হইয়াছে। ইহা ব্যাচেলর ছেলেদের বিবাহের ইচ্ছা প্রকাশের একটি মার্জিত রুপ।

তবে ঠাট্টাচ্ছলে বলা হলেও কথাটা এমনি এমনি আসেনি। এর একটা ঐতিহাসিক পটভূমি আছে। তিরিশ চল্লিশ বছর আগেও বাংলাদেশের গরীব, নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং গ্রামীণ মধ্যবিত্ত পরিবারে স্ত্রীদের একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল স্বামীর পা টিপে দেয়া। স্বামী মানে স্বামীই, সংসারের সত্যিকার রাজা। তাঁর একমাত্র কাজ উপার্জন করা আর সংসারের খরচ জোগানো। আর স্ত্রীর কাজ স্বামীর সেবা করা। মশারি টাঙানো সেখানে স্ত্রীর আরেকটি রুটিন কাজ মাত্র। এমন অনেক পুরুষ তাদের সারাটা জীবন পার করে দিয়েছেন, একদিনও নিজে মশারি টাঙান নি। তাদের সব কাজ করে দিয়েছে ছোটবেলায় মা, বিয়ের পরে বউ। উচ্চবিত্তদের ক্ষেত্রে এই কাজগুলো করার জন্য আলাদা পরিচারিকা থাকতো।
আহা, কেউ যদি মশারিটা টাঙিয়ে দিত! আজও পুরুষের মনে এই ভাবনাটা তাই সেই চিরাচরিত 'স্বামী'সুলভ চেতনা থেকেই উঠে আসে।

এটা হয়তো ক্ষতিকর কিছু নয়। কিন্তু এই চিন্তার অর্থ যদি এই হয় যে পুরুষ তার সংসারে কোন সাংসারিক কাজই করবেন না, সব কাজ সবসময় স্ত্রীকেই করতে হবে, সেটাকে নিশ্চয়ই ঠিক বলা চলে না।

ডিয়ার ব্যাচেলরস টু বি ডেড, দিন বদলাইছে। 'স্বামীগিরি'র দিন আর নাই। বিয়ে করলেই মশারি এখন আর আপনা-আপনি জায়গামত উঠে যাবে না। এই যে আপনি ইচ্ছে করলে মশারি ছাড়াই ঘুমিয়ে পড়েন, দেখার কেউ নাই। সম্ভাবনা প্রবল যে বিয়ের পর এই সুযোগটাও হারাবেন। সময়মতই মশারি টাঙাতে হবে :P :P এবং তা হয়তো আপনাকেই :P ইহার কোনরুপ ব্যতিক্রম হইলে তাহা হইবে আপনার নেহায়েৎ সৌভাগ্য মাত্র :D :D
ডোন্ট বি আপসেট ম্যান। একদিন দুদিন মশারি টাঙালে পুরুষের মান ইজ্জত চলে যায়না!! পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ, মহানবী মুহাম্মাদ(সাঃ) ও নিজের অনেক কাজ নিজেই করতেন। আর তাছাড়া, ইউ নো, মানীর মান জুতা দিয়ে পিটালেও যায় না :D :D
(বিবাহ কথন-১৫)

শনিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

তোমায় নিয়া ঘর বান্ধিবো গহীন বালুর চর....!!

বিয়ের আগে নানান অলীক কল্পনায় ভোগে ব্যাচেলর সমিতির সদস্যরা। তারা মনে করে- বিয়ে করলেই জীবনের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে!! জীবনে আর কোন দুঃখ থাকবে না!! কোনমতে বিয়েটা করলেই কেল্লা ফতেহ!! এরপর শুধু সুখ আর সুখ।

মন্তু মিয়ার গান তাদের জাতীয় সঙ্গীত হয়ে যায়।
"আশা ছিল মনে মনে
প্রেম করিবো তোমার সনে
তোমায় নিয়া ঘর বান্ধিবো গহীন বালুর চর...."


বাস্তবে গহীন বালুর চরে কারোই ঘর বাঁধা হয়না। কিছুদিন এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করে শেষে ঘর বাঁধতে হয় ইট কাঠের শহরে। যেখানে বাসা ভাড়া যোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়। যেখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। অফিসে কাজের চাপ, বসের ঝাড়ি, ব্যবসায় টেনশন, সিটি বাসে বাঁদুড় ঝোলা।
আবার ঘরে ফিরে ব্যাগ হাতে বাজারে যাওয়া। এই দাম কত? দশ টাকা কম নাও। গত সপ্তাহেই তো বিশ টাকায় কিনলাম!!

এই নাই সেই নাই, এই করতে হবে, সেই করতে হবে- শুনে শুনে কান ঝালাপালা হয়ে যায়।

বলা হয়, বিয়ের পর প্রথম ছয় মাস থেকে এক বছর সবাই মহাকাশে উড়তে থাকে :P । মাটিতে তাদের পা পড়ে না। তারপর ধীরে ধীরে মহাকাশযান মহাশুন্য থেকে প্রথমে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে, তারও পরে পৃথিবীর মাটিতে :p অবতরণ করে। এতে নাকি আনুমানিক দেড় থেকে দু'বছর সময় লাগে। :D
 
তারপর জীবন স্বাভাবিক হয়ে আসে, জীবন একঘেয়ে হয়ে আসে। সেই প্রাগৈতিহাসিক সাংসারিক জীবন। আগে থেকে মানসিকভাবে তৈরি না থাকলে ইউফোরিক মুডে ব্যাঘাত ঘটে এমন সবকিছুই তখন বিরক্তিকর লাগে। হঠাৎ মনে হয়- নাহ, আগেই বোধহয় ভালো ছিলাম!! মানসিকভাবে তৈরি না থাকায় নতুন যেকোন সমস্যায় বিগড়ে যায় মন। সংসারে লেগে যায় অশান্তি। ফেসবুকে দেখা যায় নতুন আপডেট- গিবনে কী প্লাম?? :D
 
ব্যাচেলর সমিতির সদস্যদের এইসব অলীক কল্পনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বুঝতে হবে- বিয়ে মানেই সুখের সাগর নয়। বরং বিয়ে করা মানে জীবনের সকল কাঠিন্যের বিপরীতে নিজেকে দায়িত্ববান পুরুষ হিসেবে ঘোষণা করা। বিয়ে মানে সমস্যাসংকুল পৃথিবীর সব বাধা মোকাবেলায় একজন যোগ্য সঙ্গী খুঁজে নেয়া।

বিয়ের পরে একজন পুরুষ কিংবা নারীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলোঃ হাজারটা সমস্যার ভেতরেও একটা হাসিমুখ, আর একটা সবুজ মন বাঁচিয়ে রাখা। সত্যিকার একটা সুখী সংসারের জন্য এইটাই বোধহয় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
(বিবাহ কথন-১৪)