এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...

এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে
ডাক্তার লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ডাক্তার লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

আজকে ঈদের দিন

-কী রুবেল মিয়া, মন খারাপ করে বসে আছো ক্যান?
-আইজকা ঈদের দিন ছার, বাড়িত যাইতে পারলাম না।
-তো কী হইছে, আমিও তো আছি, না?
-আপনে তো ছার ব্যাচেলার মানুষ। আপনার চিন্তা কী! বাচ্চাডায় খুব কানতেছিলো ছার। ইচ্ছা হইতাছিল চাকরি বাকরি ছাইড়া চইলা যাই। 
চোখ ছলছল করে ওঠে হাসপাতালের ওয়ার্ডবয় রুবেল মিয়ার। মনটা আনচান করে ওঠে ডাঃ মুনীরেরও।
-রুবেল মিয়া, যাও সবার জন্যে চা নিয়া আসো। আর সবাইকে আমার রুমে আসতে বলো।
ঈদের দিনেও যাদের ছুটি হয় না তাদের একটা বড় অংশ হলেন এরা। হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স, আয়া, ওয়ার্ডবয়, দারোয়ান, হাসপাতালের অন্যান্য স্টাফ। কী সরকারি হাসপাতাল, কী বেসরকারি। ঈদের সময়কার ডিউটির জন্য নেই অতিরিক্ত এলাউয়েন্স। মনটা অনেকেরই খারাপ থাকে। সকাল থেকেই তাই কর্মচারীদের দিকে খেয়াল রাখছিলেন ডাঃ মুনীর। অনেকেরই বিমর্ষ মুখ চোখে পড়ে তার। 
সবাই চলে এসেছে ডক্টরস রুমে। সবার হাতে চায়ের কাপ। এই ক্ষুদ্র পরিসরে কিছু সময়ের জন্যে হলেও সবার ভেতর যেন একটা সাম্যের অনুভূতি তৈরি হয়। 
ডাঃ মুনীর চায়ে চুমুক দিয়ে কথা শুরু করেন। আজকে ঈদের দিন। আপনারা যারা আজ এখানে ডিউটি করছেন, আমি খেয়াল করেছি, অনেকেরই মন খারাপ। আমার অনুরোধ, আপনারা মন খারাপ করবেন না। আপনারা যে কত বড় একটা কাজ করছেন, সেটা হয়তো এখন উপলব্ধি করতে পারছেন না। আমি শুধু এটুকু বলবো, এই হাসপাতালে যে শত শত রোগী ভর্তি আছেন, তাদের কথা একবার চিন্তা করুন তো! তারা, তাদের পরিবার, কতটা কষ্টে আছে! আজ এমনও তো হতে পারতো, হাসপাতালের বেডে এরকম অবস্থায় আপনি বা আমিও থাকতে পারতাম! কিংবা আমাদেরই কোন নিকটাত্মীয়! কিন্তু তা না হয়ে আমরা এই অসুস্থ মানুষগুলোর সাথে আছি। এটাকি আল্লাহর রহমত না?
আজ হয়তো ভালো আছি, কিন্তু অন্যকোন ঈদে, পূজায়, কোন ছুটির দিনে, আমরা অসুস্থ হয়ে যেতে পারিনা! আজ যদি আমরা কষ্ট স্বীকার না করি, সেদিন আমাদের জন্য কে কষ্ট করবে? 
মন খারাপ করবেন না। সবকিছুর প্রতিদান আল্লাহ সরাসরি দেন না। আবার সবকিছুর প্রতিদান এই দুনিয়ায় পাওয়া যায় না। শুধু এইটুকু মনে রাখবেন, কোন ভালো কাজই শেষ পর্যন্ত আনপেইড থাকে না। দুনিয়ায় এবং আখেরাতেও, যেকোন ভালো কাজের প্রতিদান আল্লাহ তায়ালা অনেকগুণ বেশি করে ফিরিয়ে দেন। 
কথা বলতে বলতে রুবেল মিয়াকে খেয়াল করেন ডাঃ মুনীর। বেদনার কালো মেঘ সরে গিয়ে ধীরে ধীরে তার মুখে ফিরে আসছে স্বাভাবিক সূর্যের আলো। 

বুধবার, ৯ আগস্ট, ২০১৭

ছার, রুগীরে কলা খাওয়ান যাইবো নি?

ছার, রুগীরে কলা খাওয়ান যাইবো নি? আপেল? কমলা?
হাসপাতালে এলেই রোগীদের কেন যেন আপেল কমলা খাওয়ার হিড়িক পড়ে যায়। যারা বছরের কোন একটা দিনও আপেল কমলা খেয়েছে কিনা সন্দেহ, তারাও হঠাৎ করে আপেল কমলার নিয়মিত খাদক হয়ে যায়।
GIT প্যাথলজি পড়ানোর সময় জিল্লুর রহমান স্যার সবার আগে বোর্ডে একটা সিলিন্ডার আঁকতেন। সিলিন্ডারের উপরে এঁকে দিতেন মুখ, আর নিচে দিতেন .... 
বলতেন, এইটাই হলো মানুষ। সিলিন্ডারের একপাশ দিয়ে খায়, আর অন্যপাশ দিয়ে বের করে...
তারপর স্যার সিলিন্ডারের দুইপাশে টান দিয়ে হাত পা বানিয়ে দিতেন। মানুষের খাওয়ার জন্যই নাকি এই হাত পা গুলো দরকার!!
হাসপাতালে ডিউটির সময় স্যারের কথা প্রায়ই জাজ্জ্বল্যমান সত্য হয়ে ধরা দেয়। একজন ডাক্তারকে প্রতিদিন যতবার রোগীর খাদ্য গ্রহণ, বর্জন ও ত্যাগ বিষয়ক বয়ান দিতে হয়, মূল রোগ সম্পর্কে সম্ভবত অতবার কথা বলতে হয়না। রোগ নিয়ে কেউ চিন্তিত নয়, সবাই চিন্তিত থাকে রোগীর খাওয়া আর ত্যাগ নিয়ে।
মণিষীরা বলে গেছেনঃ ভোগে নয়, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ। আসলে কিসে প্রকৃত সুখ? ভোগে, নাকি ত্যাগে? রোগীর এটেন্ড্যান্টদের খাদ্য বিষয়ক উৎকণ্ঠা দেখে এবিষয়ে আমি প্রায়শই ধন্দে পড়ে যাই।

শনিবার, ২৭ মে, ২০১৭

অধ্যাপক স্যারদের প্রতি নিবেদন....

ডাঃ এবিএম আব্দুল্লাহ স্যার ৩০০ টাকা ভিজিটে রোগী দেখেন। আরো অনেক প্রফেসর এরকমভাবে খুবই কম ভিজিট রাখেন। ব্যক্তিগত পর্যায়ে এটাকে তাঁদের মহানুভবতা বলা যায়। কিন্ত সমগ্র চিকিৎসক সমাজের জন্য এইটা কোন ভালো ব্যাপার না। চিকিৎসা পেশার জন্য এটা ক্ষতিকর, অপমানজনক।
আমি সবসময় প্রফেসরদের কম ভিজিটে রোগী দেখার বিপক্ষে। প্রফেসর যখন ৩০০ টাকায় রোগী দেখেন, তখন লোকেরা ভাবে- ডাক্তারের ভিজিট ৩০০ টাকার বেশি হওয়া উচিত না। একবার যখন কেউ প্রফেসরকে ৩০০ টাকায় দেখায়, এরপর অন্যকেউ চারশ বা পাঁচশ টাকা ভিজিট নিতে চাইলেই তাকে অর্থলিপ্সু মনে হয়। কারণ, তার স্ট্যান্ডার্ডটা ঠেকে আছে সেই ৩০০ টাকায়।
এভাবে প্রকারান্তরে নিজেদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। কেউ যখন ৩০০ টাকায় প্রফেসরের কনসালটেন্সি পাচ্ছে, তখন সে কেন একজন এমবিবিএস, একজন রেজিস্ট্রার বা সহকারী অধ্যাপককে দেখাতে যাবে? আর যদি প্রফেসরের সিরিয়াল না পেয়ে এসিস্ট্যান্ট প্রফেসরকেও দেখায়, তবু তার মনে একটা অসন্তুষ্টি থেকে যায় না? আহ, ৩০০ টাকা দিয়া তো অধ্যাপককেই দেখাতে পারতাম!!
গরীবকে ফ্রি চিকিৎসা দিন। কম নিন। কিন্তু যার টাকা আছে, তার কাছে কেন কম নেয়া হবে? তাকে তো দয়া দেখানোর কোন দরকার নেই। যার একবেলার নাস্তার বিল ১০০০ টাকা, সেলুনে গিয়ে যে দুইহাজার টাকা খরচ করে আসে, পার্লারে গিয়ে যে পাঁচহাজার টাকায় ফেসিয়াল করে আসে, তাকে কেন আপনারা ৩০০ টাকায় কনসালটেন্সি দিবেন? বলুন স্যার!
৩০০ টাকা যদি হয় প্রফেসরের ফি, তাহলে অন্যদের ফি কত হওয়া উচিত? পঞ্চাশ টাকা?
২.
শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক স্যার, জুনিয়র ডক্টর রেফার না করলে সে রোগী দেখবেন না প্লিজ। অনুগ্রহ করে ফি বাড়ান। ৩০০ টাকায় ৫০-৬০ জন রোগী না দেখে দুইহাজার টাকা ফি নিয়ে ১০ জন জটিল রোগী দেখুন। দেশের ১৬ কোটি মানুষকে তো একা সেবা দিতে পারবেন না।
কিন্তু আপনারা নির্বিচারে সব রোগী দেখাতে সত্যিকারের জটিল রোগীরাই আপনার কন্সালটেশন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক স্যার, আমি আপনাদেরকে চেম্বারে রোগী না দেখে ছাত্রদের শেখানোয় বেশি সময় দেয়ার অনুরোধ করছি। আপনি হয়তো নিজে ১০০ জন রোগীর ভালো চিকিৎসা দিচ্ছেন, কিন্তু আপনি আমাদের ১০০ জন ছাত্রকে আরো সময় দিলে, আরো ভালো করে শেখালে, আমরা হাজার হাজার মানুষকে ভালো চিকিৎসা দেবো।
শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক স্যার, রাত দুইটা পর্যন্ত রোগী দেখবেন না প্লিজ। রাত ২ টায় রোগী দেখে ঘরে ফিরলে, পরদিন সকাল বেলায় এসে ছাত্রদের শেখানোর ব্যাপারে কতটুকু আগ্রহ অবশিষ্ট থাকে? মাথা কতটুকু ঠান্ডা থাকে? প্রতিষ্ঠানে আপনাদের বেশিরভাগ সময় কাটে রাউন্ড দেয়া আর নানান প্রশাসনিক মিটিং এ। ছাত্ররা একটু ভুল করলেই মাথা গরম হয়ে যাওয়া কি স্বাভাবিক না? প্রিয় স্যার, আপনারা যখন রেগে যান, তখন আমরা শেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলি।
শ্রদ্ধেয় স্যার, ভেবেছেন কি- আপনারা আপনাদের মেধা ও জ্ঞান ছাত্রদের চেয়ে চেম্বারে রোগীদের পেছনে বেশি ব্যয় করছেন!!! তাও আবার ৩০০ টাকায়??? আর তার প্রতিদানে আজ কিনা আদালতের বারান্দায় গিয়ে বসতে হচ্ছে!! পলাতক আসামী হতে হচ্ছে!! আফসোস!! বড় আফসোস!!! কী নিদারুণ প্রতিদান দিচ্ছে আপনাদের রোগীরা!!
শ্রদ্ধেয় প্রফেসর স্যারদের কাছে আমার বিনম্র অনুরোধ, সারাজীবনের অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা যতবেশি সম্ভব আপনার ছাত্রদের দিয়ে যান। যত বেশি সময় সম্ভব ছাত্রদের পড়ান। হাতে কলমে শেখান।
সকালে শেখান। বিকালে শেখান। রাতে শেখান।
আমরা ছাত্ররা শেখার জন্য বুভুক্ষু হয়ে আছি। তৃষ্ণার্ত হয়ে আছি। রাত ১২ টা পর্যন্ত চেম্বারে রোগী না দেখে আমাদেরকে শেখান। নতুন নতুন বই লিখুন। আপনাদের কথাগুলো বইয়ের পাতায় রেখে যান প্লিজ।
প্রিয় স্যার, আপনারা বেঁচে থাকবেন ছাত্রদের মাঝে। রোগীর মাঝে নয়। রোগী আপনাকে ফি দেবে, কিন্তু ছাত্ররা আপনাকে যা দেবে তা আপনারা টাকায় মাপতে পারবেন না।

বুধবার, ২৪ মে, ২০১৭

ভুল চিকিৎসার অভিযোগ: বিল ফাঁকি দেয়াই উদ্দেশ্য

রাগ বা ক্ষোভ নয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তোলা বা হাসপাতালে হামলা করার প্রধান উদ্দেশ্য হলো- হাসপাতালের বিল ফাকি দেয়া। এবং সম্ভব হলে হাসপাতালের মালিক পক্ষের কাছ থেকে বাড়তি কিছু আদায় করা। এতদিন ধরে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ বা হামলার যত ঘটনার কথা শুনেছি এবং দেখেছি, সবখানেই ছিল একই চিত্র। এই উদ্দেশ্যে অনেক সময় মাস্তান ও সাংবাদিক ভাড়াও করা হয়।
গত বছরের ঘটনা। এক বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ তে ডিউটি করছিলাম। পোস্ট অপারেটিভ রুম থেকে একজন রোগীকে আনা হলো। ব্লাড প্রেসার নন রেকর্ডেবল, গাস্পিং রেস্পিরেশন। Intubation, Ventilation, inotropes... কিছুক্ষণের মধ্যে Cardiac arrest. রোগীকে বাঁচানো গেলনা। ডায়াগনোসিসও করা গেলনা। ধারণা করা হলো ম্যাসিভ পালমোনারী এমবলিজম।
রোগীর লোকজনকে সব বুঝিয়ে বলা হলো। কিন্তু তারা ঘন্টাখানেক পরে কিছু মাস্তান এবং সাথে সাংবাদিক নিয়ে এলেন। রাত দুইটায় সাংবাদিকদের সাথে আমাদের ভালোরকম বচসা হয়ে গেল। তাদের নাম ধাম জেনে নিয়ে বললাম, অভিযোগ তুলেছেন ভালো কথা, কিন্তু তদন্ত কমিটির মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণিত হবার আগে নিউজ করলে আপনাদের নামে মামলা হবে।
কিছুক্ষণ পরেই রোগীর পার্টি লাশ নিয়ে গেলো। জানলাম, তারা কোন বিল পরিশোধ করেনি।
২.
দেশের স্বাস্থ্যখাতকে বিতর্কিত করতে একটা প্রচেষ্টা যে চলছে, সেটা স্পষ্টই বোঝা যায়। আর এই চেষ্টার মূল ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করছে সংবাদমাধ্যম আর কিছু অবুঝ সাংবাদিক। কেউ অভিযোগ তুললেই তারা হেডলাইন দেয়ঃ ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু। যেন ভুল চিকিৎসার ব্যাপারে তারা শতভাগ নিশ্চিত।
তো এরকম শিরোনাম দিনের পর দিন দেখলে যে কারো মনে একটা বদ্ধমূল ধারণা জন্মাবে যে- দেশে প্রচুর ভুল চিকিৎসা হচ্ছে। ভুল চিকিৎসায় প্রচুর মানুষ মারা যাচ্ছে। এরপর কেউ মারা গেলেই প্রথম যে কথাটা মনে আসে- ভুল চিকিৎসা হলো নাতো! এখান থেকেই উগ্রতার উদ্ভব।
সুতরাং, এই অসহিষ্ণু পরিস্থিতির পেছনে সাংবাদিকদের দায় সিংহভাগ।
সংবাদ প্রকাশের ব্যাপারে স্পষ্ট আইন করা এখন জরুরী হয়ে পড়েছে। মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করলে সাংবাদিকের/সম্পাদকের শাস্তির ব্যবস্থা করে আইন করতে হবে। হাসপাতাল ভাংচুর, ডাক্তারের ওপর হামলা মামলায় যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর যোগ দেন, তখন অবস্থার ভয়াবহতা আমলে না নিয়ে উপায় নেই।
সাংবাদিক ভাইদের উপলব্ধি করতে হবে- মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে মিথ্যা প্রকাশের স্বাধীনতা নয়।
৩.
ডাক্তারদের কেউ কেউ পর্যাপ্ত কাউন্সেলিং করতেন না, এটা ঠিক। তবে দিন পাল্টেছে। এখন সবাই কাউন্সেলিং করে। আমার আহবান, যে ডাক্তার কাউন্সেলিং করেন না, তাদের কাছে কেউ চিকিৎসা নিতে যাবেন না। কেউ রোগী পাঠাবেন না।
কিন্তু একজন রোগীর জন্য প্রতিদিন ১৫-২০ জন লোক আলাদাভাবে ঘন্টায় ঘন্টায় জানতে আসবেন- 'রোগীর কী অবস্থা" সেটাও কারো পক্ষে সামাল দেয়া সম্ভব না।
অবস্থা যা দাঁড়াচ্ছে, তাতে করে এখন আর শুধু কাউন্সেলিং করলেই হবে না, অপারেশনের আগে যেভাবে Informed written Consent নেয়া হয়, কাউন্সেলিং এর পরও সেইভাবে কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে রাখতে হবে। প্রমাণ রাখতে হবে।
এতে করে উটকো লোকদেরকে অতিরিক্ত কাউন্সেলিং এর চাপ যেমন কমবে, প্রফেশনাল নেগলিজেন্সির অভিযোগ উঠলেও এই ডকুমেন্ট কাজে লাগবে।

রবিবার, ২১ মে, ২০১৭

হাসপাতালে হামলাকারীরা কাপুরুষ

হাসপাতালে যারা হামলা করে, সবগুলা নপুংসক কাপুরুষ। ঢাকা ভার্সিটির পোলাপান যারা হাসপাতালে হামলাইতে গেছিলো সেগুলাও কাপুরুষ। এরা হইলো রিকশাওয়ালাকে চড় মারা বীর। এরা হইলো টোকাইকে থাপ্পড় মারা বীর।
যেখানে মরণাপন্ন রোগীরা ভর্তি, যেখানে গুটিকয়েক ডাক্তার আর নার্স কাজে ব্যস্ত, এরা যায় সেখানে হামলা করতে। আচ্ছা, দেশে পুলিশ হেফাজতে মানুষ মারা যায়- এরা কখনো যাইতে পারবে থানায় হামলা করতে?
বিনা অপরাধে ঢাকা ভার্সিটির এক ছাত্রের পায়ে গুলি করেছিলো পুলিশ, এরা কি থানায় হামলা করতে গেছিলো?
আমি কাউকে কোথাও হামলা করতে বলছি না, আমি শুধু দেখাতে চাইছি এই নপুংসক গুলার কাপুরুষতা।
এই কাপুরুষদের জন্যে ডান্ডার ব্যবস্থা হাসপাতালগুলোকেই নিতে হবে। বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে এখন আনসার বাহিনী আছে, কোথাও কোথাও পুলিশের ক্যাম্পও আছে। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দেয়া পুলিশের পক্ষে সম্ভব না।
সুতরাং প্রত্যেক হাসপাতালকে নিজস্ব প্রশিক্ষিত নিরাপত্তারক্ষী বাহিনী নিয়োগ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। একটা হাসপাতালে দশজন প্রশিক্ষিত নিরাপত্তারক্ষী থাকলেই দেখবেন, কাপুরুষগুলা আর হাসপাতালের দিকে আসবে না। তারা তখন নিজের লেজের উকুন বাছতে ব্যস্ত থাকবে।
নিরাপত্তারক্ষীদের বেতন অবশ্যই রোগীর চিকিৎসা খরচ থেকে আসবে। রোগীর চিকিৎসা ব্যয় বাড়বে, কিছু করার নাই।
গুটিকয়েক দুষ্কৃতিকারীকে প্রতিরোধ করার জন্য আমরা আমাদের ট্যাক্সের টাকায় বিভিন্ন বাহিনী তৈরি করেছি না? বিদেশী আগ্রাসন প্রতিহত করার জন্য আমরা আমাদের টাকায় সেনাবাহিনী পুষছি না? একইভাবে, আমাদের নিরাপত্তার স্বার্থে, জনগনের চিকিৎসা প্রাপ্তি নির্বিঘ্ন করার স্বার্থেই এই অতিরিক্ত ব্যয় জনগনকে করতে হবে।
কথা পরিস্কার। মুগুরের ব্যবস্থা না করলে কুকুরদের উৎপাত বন্ধ করা যাবে না।

শনিবার, ২০ মে, ২০১৭

কুল্লু নাফসিন যায়েকাতুল মউত...

ভালো মানুষ নিয়া আইছিলাম হাসপাতালে... অহন লাশ নিয়া যাইতাছি... ভুল চিকিৎসা হইছে...ও আল্লাগো... এইখানে কোনো চিকিৎসা নাই... ডাক্তারে আমার রুগী মাইরা ফালাইছে গো...
কমন ডায়লগ। কোথাও ঝামেলা হলেই এই ডায়লগ শোনা যায়। সবাই মনে করে হাসপাতাল মানেই জাদুর বাক্সো। রোগী যে অবস্থাতেই আসুক, হাসতে হাসতে বাড়ি চলে যাবে।
কথা হলো, ভালো মানুষরে কেউ হাসপাতালে আনে? আনে না। অসুস্থ মানুষকেই হাসপাতালে আনা হয়। আর ভালো মানুষকে কি ডাক্তাররা হাসপাতালে ভর্তি করে?
আপনি হয়তো মাথা ব্যথা নিয়ে আসলেন। ডাক্তার আপনাকে ব্রেনের সিটি স্ক্যান করতে দিলো। আপনি ক্ষ্যাপা। সামান্য মাথা ব্যথায় সিটি স্ক্যান?
হয়তো সিটি স্ক্যান নরমাল আসলো। আপনি আরো ক্ষ্যাপা। বেহুদা সিটি স্ক্যান করাইলো। কিছু তো আইলো না। আসলে কমিশন খাওয়ার ধান্দা।
কিন্তু আপনি যখন মাথা ব্যথা নিয়ে চিন্তিত, ডাক্তার তো তখন মাথা ব্যথার কারণ নিয়ে চিন্তিত। সেটা হতে পারে স্ট্রোক, হতে পারে ব্রেন টিউমারও।
আচ্ছা, যদি ডাক্তার সিটি স্ক্যান না করায়, আর আপনার সত্যিই ব্রেন টিউমার থেকে থাকে তাহলে? হয়তো সেটা আরো পরে একেবারে শেষ পর্যায়ে ধরা পড়লো। আপনি কি খুশি হবেন? আপনি কি তখন ডাক্তারকে দোষ দিবেন না, যে কেন প্রথমেই সিটি স্ক্যান করানো হলো না?
আপনি সামান্য জ্বর নিয়ে আসলেন। আপনার জ্বরের অসংখ্য কারণ থাকতে পারে। জ্বর তো কোন অসুখ না, এইটা অসুখের একটা লক্ষণ মাত্র। হইতে পারে ইনফেকশান, হইতে পারে অন্য কিছু। হইতে পারে ব্লাড ক্যান্সারও। একসাথে একাধিক রোগও হইতে পারে।
এখন আসল যে রোগ, সেই রোগের চিকিৎসা দেয়া সত্ত্বেও তা আরো খারাপের দিকে যেতে পারে। এমনকি চিকিৎসা বা ওষুধ কাজ না করলে রোগী মারাও যেতে পারেন। আপনি যখন এনেছেন তখন তো রোগের আক্রমণ কেবল শুরু হইছে। ড্যামেজ হয় শুরু হইছে অথবা অলরেডি অনেকটা হয়া গেছে। চিকিৎসায় বা ঔষধে ঠেকাইতে পারলে ভালো।
না পারলেই আপনার মনে করবেন- আনলাম ভালো মানুষ, কথা কইলো, ভাত খাইলো। আর অহন লাশ নিয়া যাইতাছি.. এইখানে কোন চিকিৎসা হয় নাই... আল্লাগো তোমার কাছে বিচার দিলাম...
যে রোগী হাসপাতালে মারা যায়, সেই রোগী বাসায় থাকলেও মারা যেত।
পৃথিবীর ইতিহাস কত মিলিয়ন বছরের, তা নিয়ে আজো বিতর্ক আছে। কিন্তু তা যত কোটিই হোক, একজন মানুষও আজ পর্যন্ত চিকিৎসা করে অমর হইতে পারে নাই। শেষ পর্যন্ত সবাইকেই মরতে হইছে...
পৃথিবীর কোথাও গ্যারান্টি দিয়া চিকিৎসা হয় না.. ভবিষ্যতেও হবে না...
কুল্লু নাফসিন যায়েকাতুল মউত।

শুক্রবার, ২৮ এপ্রিল, ২০১৭

মহামানবের গল্প

টেবিলের ওপর খামটা রেখে সামনের চেয়ারে বসে আছে ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের প্রতিনিধি। বেশ ফুলে ফেঁপে আছে খামটা। ভেতরে কত টাকা আছে, এখনো জিজ্ঞেস করেননি ডাঃ রফিক। কিন্তু এমাউন্টটা যে একেবারে নগন্য নয়, সেটা আন্দাজ করতে অসুবিধা হয় না।

এর আগে অনেকবার এরকম খামের প্রলোভন নিঃসংকোচে প্রত্যাখ্যান করেছেন ডাঃ রফিক। কিন্তু আজ প্রত্যাখ্যান করতে পারছেন না সহজে। গত কয়েকদিনে যে অভিজ্ঞতা তাঁর হয়েছে, তাতে একা একা এই সততার অহংকার নিয়ে কতদিন চলতে পারবেন তা নিয়ে আজ তিনি বড্ড সন্দিহান।

কয়েকদিন আগে পাসপোর্ট অফিসে গিয়েছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী সব কাগজপত্রই রেডি করে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে মনে হলো, তিনি বোধহয় পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্তও পড়েন নাই। এটা এভাবে কেন লিখেছেন, এখানে আরেকটা সিল লাগবে, কাল আসেন। বারবার নানা ঝামেলা করতে লাগলো তারা। দারোয়ান কানে কানে বললো, স্যার এত ঝামেলা করতেছেন কেন? দুই হাজার টাকা দেন। আপনের আর কিছু করতে হবে না। 

বাবার পেনশন আটকে আছে বহুদিন। গত সপ্তাহে গিয়েছিলেন অবসর বোর্ডে। সেখানেও তাকে যথেষ্ট পরিমাণে ঘুষ দিতে হয়েছে। ঘুষ না দিয়ে বহুদিন অপেক্ষা করেছেন। বাবারও বয়স বাড়ছে। টাকাটা হাতে পেলে বাবা তার ইচ্ছামত কিছু খরচ দান খয়রাত করতে পারতেন। কিন্তু এভাবে চললে হয়তো বাবা আর টাকাটা দেখে যেতে পারবেন না। বাধ্য হয়ে বখশিষের নামে ঘুষ দিতে হলো সেখানে।

ভেবেছিলেন নিজের এলাকায় নিজেই একটা ছোট হাসপাতাল করবেন। এত টাকা কোথায় পাবেন? এক বন্ধুর পরামর্শে ঋণের জন্য একদিন গেলেন ব্যাংকে। ব্যাংকের ম্যানেজার ঋণ দিতে রাজী হয়েছিলেন। কিন্তু একটা শর্তঃ ঋণের ২% টাকা তাকে দিতে হবে।
হাসপাতালের স্বপ্নটা সেদিন সেখানেই ফেলে আসেন ডাঃ রফিক।

ছোট ভাই বিসিএস দিয়ে নিয়োগের জন্য সুপারিশ পেয়েছে। গত পরশু পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য থানা থেকে একজন এসআই এসেছিলেন। অন্য একটি গোয়েন্দা সংস্থা থেকে এসেছিলেন আরেকজন। দু'জনই বেশ মোটা অংকের টাকা দাবি করে গেছেন। এবার দিতেই হবে। নইলে তারা রিপোর্ট লিখে দিবেন মনের মত করে। এতবছর পড়াশোনা করে অর্জন করা একটা সরকারি চাকরি আটকে যাবে তথাকথিত নিরাপত্তা যাচাইয়ের নামে।
কয়েক বছর আগে নিজের বেলায় 'ঘুষ দেবেন না' বলে জেদ ধরেছিলেন ডাঃ রফিক। কিন্তু সেই জেদের ফলাফল ভালো হয়নি। ঘুষ না দেয়ায় তার ব্যাপারে রিপোর্ট দেয়া হয়েছিল- "রাষ্ট্রবিরোধি কর্মকান্ডে জড়িত'। তিনি বাদ পড়েছিলেন নিয়োগের সেই তালিকা থেকে।

এভাবে গত কয়েক বছরে প্রায় সবখানেই অতিরিক্ত টাকা গুনতে হয়েছে তাঁকে। যখনই কোন প্রয়োজনে কোথাও যান, কেউ না কেউ দাঁত কেলিয়ে বলে 'আরে ভাই আপনারা ডাক্তার মানুষ, আপনাদের কি টাকার অভাব আছে? ডাঃ রফিকের মেজাজ বিগড়ে ওঠে। মনে হয়- খেতা পুরি সততার। টাকা আসবে কোত্থেকে? সব শালাই আছে টাকার ধান্দায়, এইবার আমিও নিমু সামনে যা আসে।
কিন্ত শেষমেষ পারেন না। প্রতিবারই তার হাত ফিরে আসে।
আজও পারলেন না।

যদি সমাজের পিশাচ কুলাঙ্গার দূর্নীতিবাজদের টাকা আলাদাভাবে নেয়া যেত, তাহলে তিনি অবশ্যই নিতেন। কিন্তু, হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এইসব টাকায় যে সেই কৃষকের টাকাটাও আছে, যার শেষ সম্বল ছিল গতকাল বিক্রি করা গরুটা।

পরিশিষ্টঃ
পুরো সমাজ যখন দূর্নীতিতে আকন্ঠ ডুবে আছে, তখন ডাক্তার একা সৎ থাকবে এইটা আশা করা বোকামী । তবুও তুলনামূলকভাবে সৎ ডাক্তারের সংখ্যাই বেশি। এ দেশে সবাই সবাইকে শোষণ করছে। এ যেন এক মহা শোষণচক্র। দিনরাত এতসব শোষণ বঞ্চনা হতাশা আর প্রলোভনের মাঝে দাঁড়িয়েও যেসব ডাক্তার কোনভাবেই কমিশন নেন না, কোনরকম অবৈধ আয় করেন না, তাদেরকে আমার মানুষ মনে হয় না। তারা প্রত্যেকেই আসলে একেকজন সত্যিকারের 'মহামানব'।

শনিবার, ২৫ মার্চ, ২০১৭

'ফ্রি হেলথ ক্যাম্পে'র নামে 'জাতীয় মশকরা'

আগামীকাল মহান স্বাধীনতা দিবস। এই দিনে সারাদেশে 'ফ্রি হেলথ ক্যাম্পে'র নামে জনগনের সাথে 'জাতীয় মশকরা'য় লিপ্ত হবেন শতশত চিকিৎসক।
রাজনৈতিক নেতা-পাতিনেতা আর বিভিন্ন ক্লিনিক-ডায়াগনোস্টিক গুলো তাদের নিজস্ব প্রচার প্রচারণার উদ্দেশ্যে আয়োজন করবে এইসব তথাকথিত 'ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প' নামক তামাশার। আর তাতে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হবেন বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসকবৃন্দ।
আচ্ছা স্বাধীনতা দিবসে আইনজীবিরা কি 'ফ্রি আইন ক্যাম্প' করেন? ইঞ্জিনিয়াররা কি 'ফ্রি নকশা' করে দেন? কৃষিবিদরা কি 'ফ্রি কৃষি পরামর্শ' ক্যাম্প করবেন? শিক্ষকগন কি 'ফ্রি টিউশনি ক্যাম্প' করবেন? ব্যবসায়ীরা কি 'ফ্রি চাল-ডাল বিতরণ' করবেন? ঔষধ ব্যবসায়ী কি 'ফ্রি ঔষধ বিতরন' করবেন?
না। তাহলে আপনি কেন ছুটির দিনটাতে পরিবার পরিজনকে বঞ্চিত করে এইসব ভাওতাবাজি ক্যাম্পিং করবেন? কেন নেতা-পাতিনেতা বা ক্লিনিক-ডায়াগনোস্টিকের প্রচারণার সামগ্রী হবেন? আপনি তো ভালো করেই জানেন, এইসব ক্যাম্প ট্যাম্প দিয়ে জনগনের কোন উপকার হয়না।
যার দরকার সে ঠিকই কমিউনিটি ক্লিনিকে যাবে, উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে যাবে, সদর হাসপাতালে যাবে, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাবে, ক্লিনিকে যাবে। আর সেখানে এই ছুটির দিনেও আপনার ভাইবোনেরা কেউ না কেউ বসে আছেন চিকিৎসা দেয়ার জন্য।
ডাক্তার ভাই বেরাদরগন, যারা ছুটির দিন পেয়েছেন, পরিবারের সাথে, বন্ধু বান্ধবদের সাথে সময় কাটান। তাদের সুখ দুঃখের অংশীদার হোন। কিছুই না করতে চাইলে সারাদিন ঘুমান। তবুও নিজেদেরকে আর নিচে নামাবেন না। অন্যদের খেলার সামগ্রী বানাবেন না। ফেরিওয়ালা সাজবেন না। ফেরি করে চিকিৎসা দেয়া যায় না।
মানবসেবার কথা বলে আবেগ দিয়ে যদি কেউ আপনাকে ব্ল্যাকমেইল করতে আসে, তাকে স্পষ্ট করে বলে দিন- মানবসেবার দায় আপনার একার নয়।

শুক্রবার, ২৪ মার্চ, ২০১৭

হায় কান্ডজ্ঞান!

ভোর পাঁচটা। সরকারী হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে রাত্রীকালীন দায়িত্বে আছেন ডাঃ মুনীর। ভোরের এই সময়ে বহির্বিভাগীয় রোগীর চাপ একটু কমেছে। এখন তিনি ঘুরে ঘুরে ভর্তি রোগীদের অবস্থা দেখছেন। খেয়াল করলেন, একজন ভদ্রলোক দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে এদিক সেদিক তাঁকিয়ে শেষে এসে দাঁড়ালেন ডেস্কের সামনে। বেশ উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে তাকে।

কোন রোগীর এটেন্ড্যান্ট? পোস্ট সিসিইউ বা পোস্ট ক্যাথের কোন রোগীর সমস্যা? নাকি অন্য ওয়ার্ড থেকে রেফারেল? ভাবতে ভাবতে ডেস্কে ফিরে নিজের চেয়ারে বসলেন ডাঃ মুনীর। জিজ্ঞাসু চোখে তাঁকালেন আগত ভদ্রলোকের চোখে। আংকেল, বলুন কী সমস্যা?
ভদ্রলোকের চোখে আরো উদ্বেগ ফুটে উঠলো। তিনি অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন- আচ্ছা, 'তিন তলার ৩২ নম্বর বেডটা কোনদিকে?'

মেজাজটা প্রায় বিগড়েই যেতে বসেছিল ডাঃ মুনীরের। তবু অনেক কষ্টে মেজাজের লাগাম টেনে ধরে সুন্দর ভাবে উত্তর দিলেন। চাচা, এই ওয়ার্ডে তো ৩২ নম্বর বেড নাই। অমুক অমুক ওয়ার্ডে আছে। ওইখানে গিয়ে একটু খোঁজ করুন। পেয়ে যাবেন।

ভদ্রলোক চলে গেলেন। আর পেছন থেকে তার দিকে তাঁকিয়ে রইলেন ডাঃ মুনীর। অদ্ভুত ব্যাপার! নিচতলায় দুজন দারোয়ান, এই ওয়ার্ডের প্রবেশপথে দারোয়ান, নার্সেস ডেস্কে কয়েকজন নার্স, টুলে বসে থাকা ওয়ার্ডবয়, আয়া- বলা চলে চার স্তরের মানুষকে পেরিয়ে ইনি কিনা ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করতে এসেছিলেন- ৩২ নম্বর বেডটা কোনদিকে? হায় কান্ডজ্ঞান!! এঁদের ধারণা, হাসপাতালের সবকিছু সম্পর্কে ডাক্তারকেই জিজ্ঞেস করতে হবে!!

লোকটা চলে যেতেই ডাঃ মুনীরের মনে পড়লো- একটা ভুল হয়ে গেছে। মনে কষ্ট পেতে পারে ভেবে তাকে বলা হয়নি যে এটা জিজ্ঞেস করার জন্য ডাক্তারের কাছে যাওয়ার দরকার নেই। হায়! কে জানে- এতক্ষণে হয়তো ভদ্রলোক অন্য ওয়ার্ডে গিয়ে কর্তব্যরত ডাক্তারকে খুঁজছেন। আর পেলেই জিজ্ঞেস করে বসবেন তার সেই মোক্ষম প্রশ্নটিঃ আচ্ছা, তিনতলার ৩২ নম্বর বেডটা কোনদিকে?

মঙ্গলবার, ১৪ মার্চ, ২০১৭

শুধুই কমিশন খাওয়ার ধান্দা?

১.
ডাক্তারের চেম্বারে এসেছেন রহমত সাহেব। দুমাস ধরেই খেয়াল করছেন একটু একটু জ্বর, শরীরটাও দুর্বল হয়ে আসছে। ওজন কমে যাচ্ছে। খাওয়ার রুচিও আগের মত নাই। ইদানিং অফিসের কাজও ঠিকঠাক করতে পারেন না। খুব ক্লান্ত লাগে।
ডাক্তার তার সবকথা শুনে ফুসফুসের ক্যান্সার মনে করলেন। তিনি বললেন FNAC করতে হবে। রোগীকে পরামর্শ দিলেন- পরীক্ষা অমুক ল্যাব থেকে করাবেন।
রহমত সাহেব কিছু বলতে গিয়েও বললেন না। কিন্তু চেম্বার থেকে বেরিয়ে তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। কথাটা বলেই ফেললেন তিনি। ঐ নির্দিষ্ট ল্যাবেই করাতে হবে কেন? আসলে সবই হইলো গিয়া এদের কমিশন খাওয়ার ধান্দা!!

২.
কিছুদিন ধরেই মাথা ঘুরায় খলিল সাহেবের। পেশায় সাংবাদিক তিনি। মাথা খাটিয়েই কাজ করতে হয়। ভেবেছিলেন ডাক্তারের কাছে যাবেন না। না খেয়ে মরুক ডাক্তারগুলা। এদেশের ডাক্তারে কিছু জানে নাকি?
কিন্তু কয়েকদিন হলো মাথাব্যথাটা বাড়ছে। শেষমেষ তিনি বাধ্য হয়েই একজন মেডিসিন স্পেশালিস্টের শরণাপন্ন হলেন। মেডিসিনের স্বনামধন্য প্রফেসর। খলিল সাহেব ভেবেছিলেন, এতবড় প্রফেসর, নিশ্চয় চেহারা দেখেই রোগ ধরে ফেলবেন। কিন্তু না, ডাক্তার ধরিয়ে দিলেন এমআরআই অব ব্রেইন। আর বললেন- অমুক ইমেজিং সেন্টার থেকে করাবেন।
যা বোঝার বুঝে ফেললেন সাংবাদিক খলিল সাহেব। কচি খোকা তো নন! চেম্বার থেকে বেরোতে বেরোতে মনে মনে একটা নিউজও গুছিয়ে ফেললেন তিনি। একেবারে হাতে নাতে প্রমাণ!! এভাবেই তাহলে কমিশন খাওয়ার ধান্দায় নির্দিষ্ট ডায়াগনোস্টিকে পাঠায় ডাক্তাররা!!

৩.
বুকের ব্যথাটা অনেকদিন থেকেই আছে কবির সাহেবের। প্রথমে এলাকার ফার্মেসি থেকে বিভিন্ন সময় ওষুধ কিনে খেয়েছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। শেষমেষ বাধ্য হয়ে গতকাল গিয়েছিলেন একজন এমবিবিএস ডাক্তারের চেম্বারে। সিম্পল এমবিবিএস আরকি। ছোকরা ডাক্তার ইসিজি করিয়ে বললো হার্টে কিছু সমস্যা আছে। এতক্ষণ পর্যন্ত ঠিকই ছিল, কিন্তু এর পরেই বের হলো ছোকরা ডাক্তারের আসল চেহারা!! বলে কিনা- ইকোকার্ডিওগ্রাম করাতে হবে। কোথায় করাতে হবে তাও বলে দিলো!! অমুক সেন্টারে গিয়ে অমুক ডাক্তারের হাতে করাবেন।
কবির সাহেব তখনই সব বুঝেছেন। নিজের বয়স তো আর কম হলো না। ঐ ছোকরা ভেবেছে কি, তিনি কিছুই বোঝেন না? সোনালি ফার্মেসির ছেলেটার কথাই ঠিক। ইকো টিকো কিছুনা, সব ঐ ছোকরা ডাক্তারের কমিশন খাওয়ার ধান্দা আরকি!! ছোকরার অভ্যাস এখনই খারাপ হয়ে গেছে। বড় হলে তো নির্ঘাত কসাই হবে!!

****

আপনি অমুক জায়গা থেকে টেস্ট করাবেন। ডাক্তার এরকম কিছু বললেই অনেকের মনে খচ খচ করে ওঠে, নিশ্চয়ই কমিশন খাওয়ার ধান্দা আছে।
কমিশন কমিশন করে এমন শোরগোল তোলা হয়েছে, রোগীরা এখন সাধারণ পরীক্ষা নিরীক্ষা করতেও সন্দেহ করে- কমিশনের লোভে অপ্রয়োজনীয় টেস্ট দিলো না তো?

কিন্তু বাস্তবতা কী? আমার জানা মতে, কমিশনখোর ডাক্তারের সংখ্যা খুবই নগন্য। আর কমিশনখোররাও সহজে অপ্রয়োজনীয় টেস্ট দেয়না। যেমন পুলিশ বা সরকারি অফিসের কোন কোন কর্মচারী ঘুষ নেয়, সেটা খারাপ। কিন্তু ঘুষ নিয়ে কাজ করবেনা এতটা বেঈমান তারা এখনো হয়নি। কমিশনখোররাও হলো সেরকম। কমিশন খায় সেটা খারাপ। তাই বলে অপ্রয়োজনীয় টেস্ট দিয়ে কমিশন খাবে এতটা বেঈমান বোধহয় তারাও এখনো হয়নি।
নির্দিষ্ট ল্যাবে টেস্ট করাতে বললেই কমিশন খাওয়ার ধান্দা না। কিছু কিছু টেস্ট আছে - যার জন্য এক্সপার্টদের কাছ থেকেই রিপোর্ট নিতে হয়। যেমন FNAC, Histopathology, MRI, Echocardiogram, Endoscopy, Bronchoscopy ইত্যাদি। আর এক্সপার্টরা তো রাস্তাঘাটে ফুটপাতে বসেন না। তারা থাকেন বিশেষ কিছু সেন্টারে।
সুতরাং, কেউ আপনাকে নির্দিষ্ট ল্যাবে পাঠালেই কমিশন খাওয়ার ধান্দা মনে করে বসবেন না।
বিশ্বাস রাখুন, আমাদের সমাজটা সামগ্রিকভাবে পঁচে গেলেও ভালো মানুষের সংখ্যা এখনো অনেক বেশি।

রবিবার, ১২ মার্চ, ২০১৭

তরুণ ডাক্তারদের পেশা বদলের পরামর্শ !!

বিশেষায়িত ডিগ্রীধারীরা ঝুঁকছেন অন্য পেশায়। খবর বণিক বার্তার, (লিংক কমেন্টে)। নিউজে কয়েকজন ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার ও কৃষিবিদের কেস স্টাডি দেয়া হয়েছে যারা সবাই নিজ পেশা ছেড়ে বিসিএস পুলিশে যোগ দিয়েছেন।
খুব স্বাভাবিক। বাংলাদেশের ক্যাডার সার্ভিসের ভেতরে সাধারণ এবং পেশাগত ক্যাডারের যে বৈষম্য তাতে করে পেশাগত ক্যাডারে থাকা মানে নিজেকে অপমান করা। সুযোগ সুবিধা সব কেন্দ্রীভুত করা হয়েছে দুয়েকটি ক্যাডারে। ইঞ্জিনিয়াররা বহু আগে থেকেই পেশা পরিবর্তন অথবা দেশত্যাগ এই দুটির একটি পথ বেছে নিচ্ছেন। ডাক্তাররাই শুধু মানবিকতা, দায়বদ্ধতা, দেশপ্রেম এইসব ফাঁকাবুলিতে আটকে ছিলেন। কিন্তু কিল ঘুষি খেয়ে এখন তাদেরও চোখ খুলছে। তারাও এখন পুলিশ এবং প্রশাসন ক্যাডারে ঢুকছেন। পুলিশ এবং প্রশাসন ক্যাডার আইন প্রয়োগ করে জনগনের ওপর, আর জনগন আইন (!) প্রয়োগ করে ডাক্তারদের ওপর। একই বিসিএস এ নিয়োগ পেয়ে কেউ পায় গাড়ি, বাড়ি, বডিগার্ড। আর কেউ পায় ইউনিয়ন সাবসেন্টারে ভাঙা চেয়ার। গাড়ি তো কল্পনার বাইরে, নৌকা, ঠেলা, ভ্যান, রিক্সায় করে যাওয়া আসার খরচটাও নিজের পকেট থেকে ব্যয় করতে হয়। পেশাগত ক্যাডার মানেই অবহেলিত ক্যাডার। নখদন্তবিহীন ক্যাডার। সবার প্রমোশন হয় বয়স ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে, ডাক্তারের দরকার অতিরিক্ত ডিগ্রী। পুলিশের কনস্টেবল হয় 'স্যার', আর এমবিবিএস এফসিপিএস শেষ করে হতে হয় 'ডাক্তার সাব'। 

স্কুল কলেজ ভার্সিটি সব পরীক্ষায় যারা ছিল সামনের সারিতে, কর্মক্ষেত্রে নেমে তারা এখন নিজেকে দেখছে সবার পেছনের সারিতে। কারও দয়ায় তো বিসিএস পার হচ্ছে না, তাহলে কেন শুধু শুধু নিজেকে খাটো করা? প্রশাসন আর পুলিশ ক্যাডারই যদি হয় রাষ্ট্রের কাছে একমাত্র আদরের 'অফিসার', তাহলে হোক। তাই হোক।

আমার একজন সিনিয়র, ডাঃ রিফায়েত, আসন্ন ৩৮ তম বিসিএস নিয়ে লিখেছেন, "স্বাস্থ্য ক্যাডারে সহকারী সার্জনের পদ ২২০টি, সহকারী ডেন্টাল সার্জনের পদ ৫ টি! প্রশাসন ক্যাডারে সহকারী কমিশনার পদ ৩০০ আর পুলিশে ১০০। লড়াই যেহেতু হবে, শুধু হেলথ ক্যাডার কেন?? পাশাপাশি জেনারেল ক্যাডারেও হোক।"

ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার যারা আগামীতে বিসিএস দিবেন, তাদের সবার জন্য আমারও একই পরামর্শ। প্রশাসন আর পুলিশ ক্যাডারই যদি হয় দেশসেবার একমাত্র উপায়, তবে তাই হোক। রাষ্ট্র যদি তার ক্যাডারদের মধ্যে রাজা প্রজা বিভাজন করে, যোগ্য হয়েও কেন আপনি জেনেশুনে প্রজাই হবেন?

শুক্রবার, ৩ মার্চ, ২০১৭

নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই নিশ্চিত করতে হবে

বগুড়া মেডিকেলের ঘটনা সহজে ছেড়ে দেবার সুযোগ নাই। রাষ্ট্র যখন আপনাকে নিরাপত্তা দেবে না, তখন নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই নিশ্চিত করতে হবে। ফাতরা লোকজন হাসপাতালে এসে রসিয়ে রসিয়ে মহিলা ডাক্তারকে 'মাল' বলবে, ফ্যান কোনদিকে, টয়লেট কোনদিকে জিজ্ঞেস করবে, আর পোলারা বসে বসে দেখবে? সালাম করবে?
কুলাঙ্গারগুলাকে শুধু কান ধরে উঠবোস করানো মোটেই যথেষ্ট হয় নাই।

এতদিনে ভালো করে বোঝা হয়ে গেছে, ডাক্তারের নিরাপত্তা আমাদের রাষ্ট্র দেবে না। নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদেরকেই দিতে হবে। বগুড়া মেডিকেলে ইন্টার্নরা, দে হ্যাভ শোন দেয়ার গাটস। সকল ডাক্তারকে এই শিক্ষা নিতে হবে। প্রতিদিন একতরফাভাবে 'ডাক্তার লাঞ্চিত' হবার খবর আর শুনতে চাই না। 

রাষ্ট্র তার নাগরিকদের চাহিদা না মিটিয়ে ডাক্তারকে গিনিপিগ বানাতে চায়। হাসপাতালে সিট নাই, আছে ডাক্তার। ঔষধ সরবরাহ নাই- আছে ডাক্তার। পরীক্ষা নিরীক্ষার ব্যবস্থা নাই- আছে ডাক্তার। চুরি করবে থার্ড ক্লাস ফোর্থ ক্লাসরা, দোষ হবে ডাক্তারের।

রাষ্ট্র নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা দেবে না, দোষ হবে ডাক্তারের। রাষ্ট্র এবং মিডিয়া ডাক্তারদেরকে জনগনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। মৌলিক চাহিদা পূরণে রাষ্ট্রের ব্যর্থতার দায়, আর জনগনের ক্ষোভ তারা ডাক্তারদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে পাশ কাটাতে চায়।

কিসের ভিত্তিতে মন্ত্রী ইন্টার্নদের বরখাস্ত করেন? কোন আইন তাকে এই অধিকার দিয়েছে? হাসপাতালের ওয়ার্ডে এইসব লোক ঢুকলো কী করে, কেন? মন্ত্রীকে আগে সেই জবাব দিতে হবে। ঢাকা মেডিকেলে ডাঃ ফারহানাকে যখন আহত করা হয়, কোথায় ছিলেন মন্ত্রী মহোদয়? কোথায় ছিলেন তিনি, যখন বহিরাগত সন্ত্রাসীরা ঢাকা মেডিকেলে এসে ভাঙচুর চালায়? কী ব্যবস্থা নিয়েছেন তিনি?

আর পদলোভী বিএমএ নেতাদেরকে অভিভাবক হিসেবে অস্বীকার করার সময় এসেছে। যে অভিভাবক তার সন্তানের নিরাপত্তা দিতে পারেনা, যে অভিভাবক তার সন্তানকে জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে ঘুমায়, তারা অভিভাবক হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। তাদেরকে অস্বীকার না করলে আগামীতেও কোন অধিকার আদায় হবেনা।

শুক্রবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

ভাই পেটে ব্যথা, কী ঔষধ খাবো?

ভাই পেটে ব্যথা, কী ঔষধ খাবো?????? ভাই মাথা ব্যথা, কী ঔষধ খাবো?????? বুকটা ব্যথা করছে, কী ঔষধ খাবো???? আপনার ভাবীর কেমন কেমন লাগছে। কী ঔষধ খাওয়াবো??????

Every doctors have to answer these questions everyday.... অত্যন্ত নিরীহ প্রশ্ন। প্রশ্নকর্তাদের দোষ দেয়ার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্নগুলো অতীব সাদাসিধা হলেও উত্তর দিতে গিয়ে ডাক্তারদের ঘাম ছুটে যায়।
অনেকেরই ধারণা, ডাক্তারিবিদ্যা মানে রোগের লক্ষণ অনুযায়ী কিছু ওষুধের নাম মুখস্ত করা। তারপর এই সমস্যায় এই ওষুধ, ঐ সমস্যায় ঐ ওষুধ দুই বা তিনবেলা খাওয়ার উপদেশ দেয়া। জ্বর হলে একটা এন্টিবায়োটিক দেয়া। ব্যথা হলে ব্যথার ওষুধ। এই তো, ডাক্তারিতে আর কী এমন আছে??? 

এইরকম ধারণার বশবর্তী হয়ে ঔষধের দোকানদাররাও প্রেসক্রিপশন পড়ে পড়ে ডাক্তার হয়ে যায়। জনগন ভাবেন- রোগীর দুইদিনের জ্বর, একটা এন্টিবায়োটিক দিলেই হয়ে যায়। কিন্তু তা না, যাওয়ামাত্রই দিলো একগাদা পরীক্ষা নিরীক্ষা। বললাম তলপেটে একটু ব্যথা করছে। একটু পেটে চাপ দিয়ে দেখলো। আবার এটা ওটা পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে বললো। কেনরে ভাই, খালি কমিশন খাওয়ার ধান্দা ক্যান। ব্যথার ঔষধ দিলেই তো হয়। এত পরীক্ষা নিরীক্ষার দরকার কী??

সমস্যাটা হলো- পেটে ব্যথার অসংখ্য কারণ আছে। বুকে ব্যথার অসংখ্য কারণ আছে। মাথা ব্যথারও অনেক কারণ আছে। কিছু কারণ খুব ছোটখাটো, কিন্তু কিছু কারণ খুব ভয়াবহ। পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয় সঠিক কারণটা খোঁজার জন্য। খারাপ কিছু নেই এটা কনফার্ম হওয়ার জন্য। থাকলেও যেন ডায়াগনোসিস মিস না হয় সেজন্য। সো, আপনি যদি একজন সচেতন নাগরিক হোন- ডাক্তারকে কম পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য না বলে ডায়াগনোস্টিক সেন্টারগুলোকে বলুন ফি কমাতে। সরকারকে বলুন পরীক্ষা নিরীক্ষার ফি কন্ট্রোল করতে। যাতে আপনি কম টাকায় পরীক্ষাগুলো করাতে পারেন। যতবেশি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাবেন তত ভালো ডায়াগনোসিস হবে। তত ভালো চিকিৎসা পাবেন। বিকজ, ডায়াগনোসিস ইজ দা কী ফর ট্রিটমেন্ট।

মঙ্গলবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

ডাক্তার ছাড়া সবাই লাটসাহেব!

'আমার রোগীর স্যালাইন চলে না!' হাসপাতালে ডাক্তারদের কানে আসা একটা কমন এবং বলা চলে 'বিরক্তি উদ্রেককারী' সংলাপ।
কারণ, স্যালাইন চলছে কিনা তা দেখার জন্য নার্সরা আছেন। হয়তো নার্স সামনেই আছে, অথবা বেডের পাশ থেকে একটু আগে হেঁটে এসেছে। কিন্তু তবুও এই সমস্যার কথা নার্সকে না বলে ডাক্তারকেই বলতে হবে কেন?

প্রথমত, হাসপাতালে এসে যদি কারো কাছে ভালো করে একটু কথা বলার আশা থাকে তা একমাত্র ডাক্তার। দারোয়ান, ওয়ার্ড বয়, এমনকি নার্সদেরও একটা অংশ নানাভাবে রোগীর স্বজনদের সাথে খবরদারি ও দুর্ব্যবহার করেন। ফলে কথা বলার জায়গাটা থাকে একমাত্র ডাক্তারের কাছেই।

সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার ছাড়া সবাই যেন লাটসাহেব! 


দ্বিতীয় কারণ, কার কী দায়িত্ব সে সম্পর্কে কোন ধারণাই রাখেন না বেশিরভাগ মানুষ। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার জন্য যে অ-ডাক্তার প্রশাসন আছে সে খবর বলতে গেলে কেউই রাখে না।
হাসপাতালের অপরিচ্ছন্নতা কিংবা অব্যবস্থাপনার জন্য যতজন কুমন্তব্য করেছেন, তাদের মধ্যে একজনও কোনদিন হাসপাতালের পরিচালকের দপ্তরে অভিযোগ করেছেন বলে আমি শুনি নাই।

তৃতীয়ত, ডাক্তার বলতে আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষের মনে ভেসে ওঠে তাদের গ্রামের 'মোখলেছ ডাক্তারে'র চেহারা। যিনি আদতে একজন প্যারামেডিক। রাত বিরাতে রোগীর বাড়িতে যান, নিজেই ঔষধ সরবরাহ করেন, নিজেই ইঞ্জেকশান পুশ করেন। সেকারণেই বড় হাসপাতালে এসেও মানুষ আশা করে, ডাক্তারই ঝুলিয়ে দেবে স্যালাইন , ডাক্তারই পুশ করে দেবে ইঞ্জেকশান।

মঙ্গলবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৭

'চিকিৎসা সেবা আইন, ২০১৬' - খসড়া পর্যালোচনা

স্বাস্থ্যখাতে, বিশেষ করে বেসরকারি খাতে চিকিৎসা ব্যবস্থায় শৃংখলা প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার এ সংক্রান্ত নতুন আইন করতে যাচ্ছে । 'চিকিৎসা সেবা আইন, ২০১৬' নামে আইনটির একটি খসড়া প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় । আইনটিতে বেশ কিছু ভালো দিক আছে । তবে কিছু বিষয়ে এখনো রয়ে গেছে অস্পষ্টতা । কিছু বিষয় অগ্রহণযোগ্য।
প্রথমেই নজর দেয়া যাক ধারা ৯ এর ১ (খ) তে । এতে বলা হয়েছে ‘সরকারি বা কোন সংবিধিবদ্ধ সংস্থায় চাকুরিরত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি’ নির্ধারিত অফিস সময়ের বাইরে ও ছুটির দিনে ‘স্ব স্ব কর্মস্থলের জেলার বাহিরে’ ‘নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের লিখিত পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে’ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা চেম্বারে চিকিৎসা সেবা দিতে পারবেন।
সরকারি চাকরিরত ডাক্তার/নার্স গন যারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও সেবা প্রদান করেন তারা মূলত নিজ কর্মস্থলের আশেপাশেই তা করে থাকেন । নিজ কর্মস্থলের জেলার বাহিরে গিয়ে বেসরকারি সেবা প্রদান আদতে অসম্ভব প্রায় । সেক্ষেত্রে এই আইন বলবত হলে বাস্তবে অনেকেই আর বেসরকারিভাবে চিকিৎসা সেবা কার্যক্রমে যুক্ত থাকতে পারবেন না । আবার অনেকেই সরকারি চাকরি ত্যাগ করতে বাধ্য হবেন ।
এই ধারাটি সংশোধন করা দরকার । অন্যথায় বিশৃংখলা সৃষ্টির আশংকা থেকে যায় ।
ধারা ১৮ তে বিদেশী চিকিৎসা সেবা প্রদানকারীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে – ‘সরকারের পূর্বানুমতি গ্রহণ সাপেক্ষে সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানে বিদেশী চিকিৎসা সেবা প্রদানকারী নিয়োগ করা যাইবে ।
এখানে সরকারের অনুমতির পাশাপাশি বিদেশী সেবাদানকারীদের বাংলাদেশে চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য লাইসেন্সিং পরীক্ষা পাশ ও নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা রাখা দরকার ।
ধারা ৬ (১) অনুযায়ী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন, প্রবেশ, তল্লাশি ও জব্দ করার ক্ষমতা সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ ‘সরকার বা সরকার কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ বা তৎকর্তৃক নিযুক্ত কোন কর্মকর্তা বা কমিটি কোন চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানে যেকোন সময়ে প্রবেশ, পরিদর্শন, রেজিস্টার ও চিকিৎসা সেবা সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি বা নমুনা বা কাগজপত্র পরীক্ষা এবং জব্দ করতে পারবে।
এখানে পরিদর্শক টিমে অন্তত একজন সরকারি ডাক্তারের অন্তর্ভুক্তি আবশ্যক করা উচিৎ ।
ধারা ২০ (১) এ বলা হয়েছে- স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক এই আইনের অধীনে পেশাগত দায়িত্ব পালনে বা চিকিৎসা প্রদানে অবহেলা অপরাধ হিসেবে গন্য হইবে ।
২(২) ধারা অনুযায়ী অবহেলাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে- স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সেবা গ্রহীতার প্রাপ্য সেবা প্রদান না করা যাহা তাহার পক্ষে ‘বাস্তব অবস্থায় ও মানবিকভাবে’ পালন করা সম্ভব ছিল ।
আগেকার খসড়া আইনে পেশাগত অবহেলাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল এভাবেঃ 'ভুল চিকিৎসা' যা দ্বারা 'রোগ মুক্তি ঘটে না' বা 'বিলম্বিত হয়'।
সে তুলনায় এবারের সংজ্ঞায়ন ভালো হয়েছে । তবে আরো স্পেসিফিক করা যায় কিনা তা নিয়ে ভাবা যেতে পারে ।
খসড়া এই আইনের কিছু ভালো দিক হলোঃ
ধারা ২১(১) –এ চিকিৎসা সংক্রান্ত অভিযোগ আদালতে আমলে নেয়ার আগে ন্যুনতম দুইজন চিকিৎসক সহ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন আবশ্যক করা হয়েছে । কমিটিতে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অন্তর্ভুক্তি আবশ্যক করা হয়েছে।
২১(৪) ধারায় বলা হয়েছে - আদালতের নির্দেশনা ব্যতিত কোন স্বাস্থ্যসেবা প্রদনকারী ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা যাইবে না ।
ধারা ২০ (২) এ বলা হয়েছেঃ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তির প্রতি হুমকি প্রদান , ভীতি প্রদর্শন, দায়িত্ব পালনে বাধাদান, আঘাত করা সহ যেকোন ধরণের অনিষ্ট সাধন বা স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কোন সম্পত্তির ক্ষতিসাধন, বিনষ্ট, ধ্বংস বা উক্তরুপ সম্পত্তি নিজ দখলে গ্রহণ অপরাধ বলিয়া গন্য হইবে।
ধারা ২১(৫) অনুযায়ী ২০(২) এ উল্লেখিত অপরাধ হবে আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য।
এগুলো এই আইনের ভালো দিক ।
তবে ধারা ২২(২) অনুযায়ী ২০(২) এ উল্লেখিত অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে অনধিক পাঁচ লক্ষ টাকা অর্থদন্ড বা তিন বছর কারাদন্ড বা উভয় দন্ড।
শাস্তির পরিমাণ কম হয়েছে । শাস্তির মাত্রাকে আরো সংজ্ঞায়িত করা দরকার । ক্ষতির পরিমাণ বা আঘাতের প্রকৃতি অনুযায়ী অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ হওয়া উচিৎ। ২০ লক্ষ টাকা ক্ষতিসাধন করলে অনধিক পাঁচ লক্ষ টাকা অর্থদন্ড কি গ্রহণযোগ্য? অথবা শারীরিকভাবে গুরুতর আঘাত করা হলে তিন বছর কারাদন্ড কি যথেষ্ট হবে? বিভিন্ন দেশে এইরুপ অপরাধের শাস্তি আরো বেশি ।
এখানে ‘অনধিক’ এর স্থলে ন্যুনতম শব্দ প্রয়োগ করা উচিৎ হবে ।

রবিবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

অনারারীর অমানবিকতা

১।
হাসপাতালের ক্যান্টিনে ঢুকতেই আমার চোখ গেল কর্নারের টেবিলে। একা বসে আছেন ডাঃ বকুল। খুবই শান্ত শিষ্ট নিরীহ মানুষ। তবে আজ মনে হচ্ছে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি গম্ভীর। বেশ বিমর্ষ চেহারা।
গিয়ে বসলাম পাশে।

-কী ব্যাপার বকুল ভাই, মন খারাপ?
-জ্বি ভাই। আজকে একজনের সাথে একটু রুড আচরণ করে ফেলেছি। এখন মনটা খারাপ লাগছে। লোকটা ডাক্তারদের ব্যাপারে নিশ্চয় একটা খারাপ ধারণা নিয়ে গেলো। মানুষ কষ্ট নিয়েই হাসপাতালে আসে, কিন্ত ভাই সবসময় মেজাজ ঠিক রাখা যায় না। রাখতে পারি না। আর যারা এক লাইন বেশি বোঝে তাদের আমি কেন যেন সহ্য করতে পারি না।
ডাঃ বকুল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অনারারী মেডিকেল অফিসার। সোজা বাংলায় ইনি একজন ডাক্তার যিনি তার শ্রমের বিনিময়ে কোন পারিশ্রমিক পান না। ডাক্তার হয়েছেন বছর খানেক আগেই। একটা ক্লিনিকে চাকরি করেন। একদিন তাঁর মনে হলো, শুধু ক্লিনিকের চাকরি করে দিনকে দিন মেডিকেল নলেজের ধার কমে আসছে। ট্রেনিং করা দরকার। আবারো পড়ালেখায় নামা দরকার। তাছাড়া ভবিষ্যতের বাজারে টিকে থাকার জন্য একটা পোস্ট গ্রাজুয়েশান ডিগ্রীও করা দরকার।

অতঃপর সিনিয়র ভাইদের পরামর্শে ডাঃ বকুল ঢুকে পড়লেন অনারারী ট্রেনিং এ। হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের অদ্ভুত হেলথ সিস্টেমের এক কিম্ভুত সদস্য, একজন বিনে পয়সার কামলা।

গতকাল রাতে তাকে ক্লিনিকে ডিউটি করতে হয়েছে। রাতটা বেশ 'খারাপ'ই গেছে বলতে গেলে। ক্রিটিকাল পেশেন্ট ছিল, ডেথ ডিক্লেয়ার করতে হয়েছে দু'জনের। ঘুমানোর কোন সুযোগই হয়নি। সকালে উঠে আবার ট্রেনিং-এর নামে বিনেপয়সার কামলাগিরি করতে এসেছেন।

সকালে এমনিতেই কাজের চাপ বেশি থাকে। নতুন ভর্তি রোগীর হিস্ট্রি রিভিউ, ফলো আপ, ইনভেস্টিগেশান প্ল্যান, ট্রিটমেন্ট রিভিউ, পুরনো রোগীদের ফলো আপ, ট্রিটমেন্ট এডজাস্ট করা, ছুটি দেয়া, রাউন্ড, ক্লাস, সেমিনার ইত্যাকার নানা কাজ। দম ফেলা মুশকিল।

এরই মধ্যে যখন এক পেশেন্টের এটেন্ড্যান্ট বিরুপ মন্তব্য করে বসলো তখন আর মেজাজ ঠিক রাখতে পারেন নি। কিছু কড়া কথা শুনিয়ে দিয়েছেন । তারপর থেকে বেচারার নিজেরই মন খারাপ।
আমারও খারাপ লাগলো। ডাঃ বকুল এবং সেই এটেন্ড্যান্ট উভয়ের জন্যই খারাপ লাগলো। কিন্তু আমি কোনভাবেই ডাঃ বকুলকে দোষ দিতে পারলাম না। আমি জানি, ডাঃ বকুল অকারণে মেজাজ খারাপ করার লোক নন। আসলে ডাঃ বকুল এমন এক অমানবিক সিস্টেমের শিকার, যে সিস্টেম তার মত নিরীহ মানুষকেও আজ রুঢ় করেছে। যে সিস্টেম তার যৌবনের সোনালি সময়কে সিস্টেমের মারপ্যাচে ফেলে অপব্যবহার করে যাচ্ছে। এর কিছুটা বিরুপ প্রভাব অন্যদের ওপরও পড়বেই, এখন আর এতে খুব একটা অবাক হই না।

আমি জানি, ডাঃ বকুলকে যদি আলাদাভাবে ক্লিনিক ডিউটি করতে না হত, তাকে যদি পেটের চিন্তায় মগ্ন থাকতে না হত, তার কর্মঘন্টা যদি নির্দিষ্ট থাকতো এবং ওয়েল পেইড হত, তাহলে তিনি কখনোই মেজাজের খেই হারাতেন না।
You haven't given him a sound sleep, how can he give you a good smile??


২।
এই অংশটুকু বিশেষত নন-মেডিকেল পাঠকদের উদ্দেশ্যে। আপনার মনে যে প্রশ্নটি চলে এসেছে তাহলো- ট্রেনিং তো ডাক্তাররা করছেন তার নিজের জন্য, নিজের ডিগ্রীর জন্য। এর জন্য সরকার ভাতা দেবে কেন? এত কথা কেন?

এই প্রশ্ন যদি সত্যিই আপনার মনে এসে থাকে তাহলে সেটা বড়ই আফসোসের কথা। পর্যাপ্ত ডাক্তার নিয়োগ দেয়া এবং ডাক্তারদের ভাতা দিয়ে ভালো করে ট্রেনিং করানোর দাবি আপনাদের পক্ষ থেকেই তোলা উচিত। কারণ, ডাক্তার দক্ষ না হলে এর কুফলটা আপনাকেই ভোগ করতে হবে। সরকারি হাসপাতাল বলেন আর বেসরকারি বলেন, কোথাও পর্যাপ্ত ডাক্তার নিয়োগ দেয়া হয়না। ফলে অল্প ক'জন ডাক্তারকে অতিরিক্ত চাপ নিতে হয়। ডাক্তার নাহয় শায়েস্তা হলো, কিন্তু আপনি কি পূর্ণ মনোযোগ পান? না পেলে আপনি কী করেন? ডাক্তারকে গালিগালাজ করেন? নাকি ডাক্তারের নামে অভিযোগ করেন? কখনো কি কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ করেছেন- এতজন রোগীর জন্য একজন ডাক্তার কেন? কখনো কি দাবি তুলেছেন- এত টাকা বিল দিলাম, ডাক্তারের বেতন এত কম কেন? নাহ। তা করেন নি।
ডাক্তারদের ভালো ট্রেনিং এর ব্যবস্থা আপনাদের নিজেদের স্বার্থেই করতে হবে। বিকজ, দে ডিলস উইথ ইওর লাইফ এন্ড ডেথ। তাদের আপডেটেড নলেজ এন্ড স্কিল না থাকলে দিনশেষে আপনিই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ক্ষতিগ্রস্ত হবে আপনার বাবা মা, আপনার সন্তান। হয়তো ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে ভাংচুর করবেন, হয়তো পত্রিকায় নিউজ হবেন। কিন্তু যদি কোন ক্ষতি হয়েই যায়, তা কি ফিরে পাবেন?

ডাক্তারদের পেটের চিন্তা থেকে মুক্ত রাখতে হবে। বিকজ, দে হ্যাভ টু লিভ দা মোস্ট স্ট্রেসফুল লাইফ। পেট এবং মাথা দুই জায়গায় চাপ নিয়ে ভালো সেবা দেয়া যায় না। আর এ কারণেই উন্নত বিশ্বে ডক্টরস আর অলওয়েজ হাইলি পেইড। আমার দেশে একটা সরকারী হাসপাতালের একটা ওয়ার্ড চালানোর জন্য যতজন ডাক্তার দরকার, আমার সরকার নিয়োগ দিয়েছে তার এক চতুর্থ বা পঞ্চমাংশ। আর সেই জায়গা পুরণের জন্যই জিইয়ে রাখা হচ্ছে এই অমানবিক সিস্টেম। ডিগ্রীর মুলো ঝুলিয়ে বিনেপয়সায় খাটিয়ে শোষণ করা হচ্ছে তরুণ ডাক্তারদের সোনালি সময়। একটা দিনও যদি এই ডাক্তাররা কাজ না করেন, তাহলেই হাসপাতাল অচল হয়ে পড়বে।

আপনি এই সিস্টেমকে সমর্থন করেন? যদি করেন, তাহলে আপনি ভালো ব্যবহার পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন না। আপনি যদি এই সিস্টেম পরিবর্তনের দাবি না তোলেন, তাহলে আপনি আন্তরিক চিকিৎসা পাবার আশা করতে পারেন না।

আপনি ঘোড়াকে ক্রমাগত চাবুক মারবেন, সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপাবেন, আর বিনিময়ে সে আপনাকে মুচকি হাসি দিবে, তা হয় না।

সোমবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০১৬

বাঙালির জীবনে ভাত খাওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আর নাই

১.
- চাচা, বুকে ব্যথাটা কখন থেকে?
- চাচীঃ রাইতের বেলা খাইতে বসছে, গরুর গোশ দিয়া ভাত খাইছে। হের পরে হের বুকত চিলিক মাইরা উঠছে।\

২.
- শ্বাসকষ্টটা কখন শুরু হইছিলো ভাই?
- ভাবীঃ হ্যারে বাজারে পাঠাইছিলাম। বাজার থাইকা আসি দুপুরে খাইতে বসছে। বুঝছেন ভাই! এর ঘন্টা দুই ঘন্টা পরে খানিক শ্বাসকষ্ট শুরু হইছে।


৩.
- চাচাজান, রোগী কখন থেকে অজ্ঞান?
- রুগী পুরাপুরি ভালা আছিলো ছার। কথা কইছে। রাইতে ভাত খাইছে। খাইয়া ঘুমাইছে। তারপরে হঠাৎ দেখি হাত পায়ে খিচ মারতাছে। অজ্ঞান হই গেছে।

 ঘটনা যাহাই হউক, বাঙালির সকল ইতিহাস শুরু হয় 'ভাত খাওয়া'র পর থেকে। যিশুর জন্মের বছর হতে যেমন খ্রিষ্টীয় সাল গণনা শুরু করা হয়, তেমনি রোগীর যেকোন সিম্পটম (রোগ-লক্ষণ) এর বয়স গণনা শুরু হয় 'ভাত খাওয়া'র মুহূর্ত থেকে। বাঙালির জীবনে ভাত খাওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আর নাই!!!!!!

বুধবার, ৩০ নভেম্বর, ২০১৬

কে খায় গরীবের টাকা?

ডাক্তার সবগুলা কসাই। আমার মতন গরীবের থাইকাও তিন হাজার টেকা নিলো। বকরিটা বেইচ্চা এই টেকা জোগাড় দিলাম।
হাসপাতালের বাইরে চায়ের দোকানে পেছনের টেবিলে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বন্ধুর সাথে গল্প করছিলো ডাঃ মুনীর। এমন সময় এমন একটা মন্তব্য কানে আসে তার। উৎসুক চোখে লোকটাকে ভালো করে খেয়াল করে মুনীর। হ্যা, এই লোকের রোগীকে আজকেই ছুটি দেয়া হয়েছে। তার স্ত্রীই ছিলেন রোগী।
কিন্তু এই মুহূর্তে তার মুখে এই কথা শুনে মুনীরের আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল। কারণ, গরীব বলে এই লোকের সবগুলো ইনভেস্টগেশান ফ্রি করার ব্যবস্থা করে দিয়েছে সে। পুওর ফান্ড থেকে ব্যবস্থা করে দিয়েছে সব ওষুধের। বলা বাহুল্য, এই পুওর ফান্ড কোন সরকারী ফান্ড নয়। ডাক্তাররা নিজেরা চাঁদা দিয়ে, ঔষধ কোম্পানির কাছে ওষুধ অনুদান নিয়ে বানিয়েছে এই পুওর ফান্ড। যাদের আসলেই কিছু নেই, তাদেরকে এখান থেকে সাহায্য করা হয়।
অথচ এখন এই লোক বলে কিনা তার তিন হাজার টাকা ডাক্তাররা নিয়েছে!!
ব্যাপারটা কী?

লোকটা যখন বাইরে বেরুবে তখনই তাকে পেছন থেকে ডাক দিলো মুনীর।
চাচা আছেন কেমন? আচ্ছা ব্যাপারটা কী একটু আমাকে খুলে বলেন তো! শুনলাম ডাক্তাররা নাকি আপনার তিনহাজার টাকা নিয়েছে?
চাচীর চিকিৎসা তো আমি করলাম। কই, আমারে তো কিছু দিলেন না!
মুনীরের কথায় থতমত খেয়ে গেল বেচারা। চেহারায় ফিরে এলো পুরনো কাচুমাচু ভাবটাও।
- না বাবা, আপ্নেই তো সব ব্যবস্থা কইরা দিলেন। তয় আপ্নাগো কথা বইলা তো ওয়ার্ড বয়ে টেকা নিলো। আয়া ২০০ টেকা নিলো ক্যাথেটার করাইয়া । সিট দেয়ার জইন্যে একজনে নিল ৫০০ টেকা, আর আপনেগো ফি বাবদ একজন লোকে নিছে তিনদিনে দেড়হাজার টেকা। কইছে টেকা দিলে আপনেরা ভালা কইরা দেখপেন। না দিলে নাকি সমস্যা হইবো।
আর ট্রলিতে কইরা যে এক্সরে করতে নিছিলাম হেরা নিছে ৫০০ ট্যাকা।
কইছে, এই টেকা ডাক্তারগো দিতে অইবো।
মুনীর হতবাক হয়ে গেল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল। কাকে দোষ দেবে?? গ্রাম থেকে আসা এইসব অবুঝ মানুষকে, নাকি কর্মচারীদেরকে, নাকি হাসপাতাল প্রশাসনকে!
হাসপাতালে রোগী চিকিৎসা ঠিকই ফ্রি পাচ্ছে, কিন্তু নানাভাবে তার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারক গোষ্ঠি- যার একটা বড় অংশের সাথে জড়িত হাসপাতালের তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা।
আর সব প্রতারকই খাচ্ছে ডাক্তারের নাম ভাঙ্গিয়ে।
মুনীর জানে, এরকম হয়। তবু নতুন করে কিছুটা হতাশা বোধ করে সে। বিনামূল্যে খেটে, দরদ নিয়ে রোগীর জন্য কাজ করেও শেষমেষ বদনামটা ডাক্তারকেই কাঁধে নিতে হয়। কারণ, সাধারণ মানুষ হাসপাতাল প্রশাসন চেনে না। তারা জানেনা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনার সব দায়িত্ব হাসপাতাল প্রশাসনের।
তাদের কাছে হাসপাতাল মানেই- "ডাক্তার"।

শনিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৬

মায়া

"সালাম ছার। আপনারে দুইদিন ধইরা দেখি নাই। কুনু অসুবিদা হয় নাই তো ছার?"
"আসি ছার, দোয়া কইরেন। আমরার লাগি অনেক কষ্ট করছেন ছার। ভুল তুরুটি হইলে মাফ কইরা দিয়েন।"
হাসপাতালে রোগীদের মুখে এইসব কথা শুনে বড় মায়া লাগে। একটু আন্তরিকভাবে খোঁজখবর নেয়া, সম্মান দিয়ে কথা বলা, সামান্য সহানুভূতি আর ভালো ব্যবহারের বিনিময়ে এমন নিষ্পাপ ভালোবাসা, সহ্য করা যায় না।

উপদেশগুলো বুঝিয়ে দিয়ে হাসিমুখে বিদায় জানাই। বলি- যান, সাবধানে থাকবেন। ঠিকমত ওষুধ খাবেন। আমাদের জন্যে দোয়া করবেন।

হাসপাতাল প্রস্থানরত মানুষের দিকে চেয়ে থাকি। হায়রে মায়ার পৃথিবী!! ক'দিনের পরিচয়ে, কত অল্পতেই মানুষ কী অদ্ভুত মায়ায় পড়ে যায়!!

সোমবার, ৭ নভেম্বর, ২০১৬

ডাক্তারের কমিশন খাওয়াঃ বাস্তবতা কী?

ডাক্তাররা কমিশন খাওয়া বন্ধ করলে চিকিৎসা ব্যয় ৪০% কমে যাবে। এই ছিল দৈনিক ইত্তেফাকের সাম্প্রতিক একটি খবরের শিরোনাম। প্রফেসর প্রাণ গোপাল স্যারকে উদ্ধৃত করে তারা এই সংবাদটি করেছে। আমি নিশ্চিত এটা প্রাণ গোপাল স্যারের বক্তব্যের একটা খন্ডিত অংশ মাত্র। তিনি নিশ্চয়ই আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। কিন্তু সাংবাদিক মহাশয় সেসব বাদ দিয়ে এই খন্ডিত অংশটিকে হাইলাইট করেছেন।
এবং বলা বাহুল্য, খবরটি বংগ জনতার খুবই "মনে ধরেছে"!! কোন এক অদ্ভুত কারণে এদেশের মানুষের একটা অংশ ডাক্তারের বিরুদ্ধে কথা বলতে পৈশাচিক আনন্দ বোধ করেন।
যাহোক, প্রশ্ন হচ্ছে, সমস্যাটা আসলে কি "ডাক্তারদের কমিশন খাওয়া"?
সম্পূরক প্রশ্নগুলো হচ্ছে, ডাক্তাররা কীভাবে কমিশন খায়? ডাক্তাররা কি কাউকে কমিশন দিতে বাধ্য করতে পারে? আর কীভাবে এটা বন্ধ করা যায়?
প্রথমত, ডাক্তারদের মধ্যে বেশিরভাগই কোনরকম কমিশন খান না। বরং যেখানেই সম্ভব, চেষ্টা করেন রোগীর ল্যাব খরচ কমাতে।
গুটিকয়েক অসাধু ডাক্তার কমিশন খান। তারা এটা খান "ডাক্তার" হিসেবে না, মন্দ মানুষ হিসেবে। প্রত্যেক প্রফেশনে যেমন কিছু মন্দ মানুষ আছে, তেমনই।
দ্বিতীয়ত, কোন ডাক্তারই কমিশন দিতে কাউকে বাধ্য করেন না। বরং, ডায়াগনোস্টিক সেন্টারগুলোই অনেকসময় ডাক্তারকে বাধ্য করে কমিশন নিতে। কারণ, তারা ল্যাব টেস্টের দাম কমায় না। বরং, রেফারেলের জন্য বরাদ্দ টাকাটা ডাক্তার না নিলেও ল্যাবেরই কেউ না কেউ ডাক্তারের নাম করে মেরে দেয়। এজন্য অনেক ডাক্তারই আছেন, রেফারেল ফি নামে যে টাকা ডায়াগনোস্টিকগুলো দেয়, সেটা তারা পুরোপুরি গরীব রোগীদের জন্য ব্যয় করেন।
আর বড় হাসপাতালগুলোতে যারা বসেন, তারা আসলে কোনভাবেই এইসব কমিশন টমিশন পান না। এইসব ঘটে মূলত ছোটখাটো নামকাওয়াস্তে হাসপাতাল ও ডায়াগনোস্টিক গুলোতে।
তৃতীয়ত, মূল প্রশ্ন হচ্ছে, এই কমিশন প্রথার জন্য দায়ী কে? ডাক্তার, নাকি অন্য কেউ? এটা বন্ধ করার উপায়টাই বা কী?
আসলে এই প্রথা কোনভাবেই ডাক্তারদের তৈরি নয়। এটা তৈরি করেছে ব্যবসায়ীরা, যারা মানুষের অসুস্থতাকে ব্যবসার পুঁজি করেছে টাকা বানানোর উপায় হিসেবে। তারা বিভিন্ন ল্যাব টেস্ট এর মূল্য অস্বাভাবিক বেশি রেখে মুনাফা করছে, আরো বেশি মুনাফার লোভে ডাক্তারদের পেছনে টাকা নিয়ে ঘোরাফেরা করে, আর কিছু কিছু ডাক্তারকে খাওয়াতেও পেরেছে।
এটা বন্ধ করার উপায় কী? ডাক্তারদের উদ্দেশ্যে নসিহত কিংবা উষ্মা প্রকাশে কোন সমাধান আসবে কি?
মোটেও না। গোড়ায় হাত দিতে হবে। এইযে ল্যাব টেস্টগুলোর অস্বাভাবিক মূল্য, এটা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ডায়াগনোস্টিক সেন্টারগুলোতে বিভিন্ন টেস্টের মূল্য বেঁধে দিতে হবে। ডায়াগনোস্টিক সেন্টার যদি অতিরিক্ত মূল্য নিতে না পারে, তাহলে তারা কোথা থেকে কমিশন দেবে? ফলে অটোমেটিকালি বন্ধ হয়ে যাবে এই তথাকথিত কমিশন প্রথা ।
একই কথা ঔষধের ক্ষেত্রেও। ঔষধের দাম উৎপাদন খরচের চেয়ে অস্বাভাবিক বেশি। এটা নিয়ন্ত্রণ করলে মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমবে।
কিন্তু এই দায়িত্ব তো ডাক্তারদের না! এটা প্রশাসনের দায়িত্ব, সরকারের দায়িত্ব। সুতরাং, "ডাক্তাররা কমিশন খাওয়া" বন্ধ করলে চিকিৎসা ব্যয় কমবে, এটা একটা অযৌক্তিক কথা। এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তিমূলক এবং বলা যায় পরশ্রীকাতরতানির্ভর বক্তব্য। এটা প্রাণ গোপাল স্যারের বক্তব্য নয়, এটা ঐ সাংবাদিকেরই টুইস্টেড কথা। আসলে বক্তব্যটা হওয়া উচিৎ, ঔষধ ও ডায়াগনোস্টিক টেস্টের মূল্য নির্ধারণ করে দিলে চিকিৎসা ব্যয় কমবে। কিন্তু সেকথা না বলে, সমস্যার মূলে আঘাত না করে, শুধু ডাক্তারদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে বক্তব্য দেয়া আসলে অসুস্থ মানসিকতা ছাড়া আর কিছু নয়।