এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...

এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে
নারী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
নারী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ৩১ আগস্ট, ২০১৭

বোনদের প্রতি অনুরোধ

মেয়েদের কী করা উচিত বা কী করা উচিত না, সে বিষয়ে আমি সাধারণত কিছু বলিনা। সবসময় ভাবি, নিজেদের ভালো তারা নিজেরাই বোঝার কথা। কী করবে আর কী করবে না, সেটা তারা নিজেরাই ঠিক করবে।
কিন্তু আজ কিছু কথা না বলে পারছি না। গত শুক্রবার এক দুর্ভাগা মেয়েকে চলন্ত বাসে রেপ করার পর মাথায় আঘাত করে খুন করেছে বাসের হেল্পাররা। তারপর লাশ ফেলে দিয়েছে টাঙ্গাইলের মধুপুর জঙ্গলের মধ্যে। খবরটা পড়ে শিউরে উঠেছি। পুরুষ হিসেবে লজ্জিত হয়েছি। মানুষ হিসেবে লজ্জিত হয়েছি। সেই সাথে বারবার এইটাও মনে হয়েছে, মেয়েটা এত বোকা কেন? রাতের বেলা একটা বাসে সে একা ছিল কোন সাহসে? একা হয়ে যাবার পর তার নেমে যাওয়া উচিত ছিলনা?
বোনদের প্রতি অনুরোধঃ নিজের বাবা, ভাই, হাজব্যান্ড ছাড়া আর কারো সাথে কোন জায়গায় একা থাকবেন না। কোন পুরুষকে পুরোপুরি বিশ্বাস করবেন না। যতই কাছের বন্ধু হোক, কাজিন হোক, কলিগ হোক, পরিচিত বা অপরিচিত হোক। নেভার। যখনই দেখবেন আপনি একা হয়ে যাচ্ছেন, আপনিও তৎক্ষণাৎ ওই জায়গা ত্যাগ করবেন।
বাসায় একা থাকলে কলিং বেলের আওয়াজ শুনেই দরজা খুলবেন না। একা একা সিএনজি, বা উবারে উঠবেন না। বাসে যদি দেখেন আপনি একা হয়ে যাচ্ছেন, নেমে পড়ুন।
কোন কিছু আশঙ্কা করলেই নিকটাত্মীয় কাউকে জানান।
আর প্লিজ... আত্মরক্ষার জন্য সাথে কিছু না কিছু রাখবেন। নিজের মত করে। মরিচের গুড়া হলেও রাখুন। যেকোন সময় কাজে লাগতে পারে।
এইখানে আপনি নিরাপদ না। এই রাষ্ট্র, এই সমাজ আপনার নিরাপত্তা দিতে পারছে না, পারবে না। সুতরাং যতটুকু সম্ভব নিজেকে রক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে নিজেকেই।
পর্দা করবেন কিনা বা কতটুকু করবেন সেটা আপনার ব্যাপার। তবে করতে পারলে ভালো। এটাও একটা প্রিভেন্টিভ মেজার। আপনার মূল্যবান স্বর্ণের অলংকারগুলো যেমন সিন্দুকে বা ব্যাংকের লকারে সুরক্ষিত করে রাখেন, আবরণ দিয়ে ঢেকে রাখেন- নিজেকে মূল্যবান মনে করলে নিশ্চয়ই নিজেকেও ঢেকে রাখবেন। এখন আপনি নিজে নিজেকে কতটা মূল্যবান মনে করেন সেটা আপনার ব্যাপার।
নিজেকে আপনার নিজের কাছে যেমনই মনে হোক, পুরুষের কাছে আপনি লোভনীয়। আপনি মূল্যবান। মূল্যবান কোনকিছু অরক্ষিত থাকলে এমন কেউ না কেউ থাকবেই, যে লোভ সামলাতে পারবে না।
পুরুষ মানুষরা হলো হরমোন ড্রাইভেন। যাদের বিবেক সজাগ, তারা নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু যারা বিবেকহীন, তারা অনেকেই জন্তুর মত হয়ে যায়।
এখন এত এত পুরুষের ভেতর কে জন্তু আর কে মানুষ এইটা তো আপনার বোঝার উপায় নাই। সেজন্য জন্তুর হাত থেকে বাঁচতে নিজেকেই সতর্ক থাকতে হবে।
রাতের বেলা যথাসম্ভব বাইরে না থাকার চেষ্টা করবেন।
হিংস্র জন্তুর হাত থেকে বাঁচার জন্য রাতে বের না হওয়া কিংবা ঘরে দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে রাখা বোকামী বা বন্দীত্ব নয়, বরং এটাই সত্যিকারের বুদ্ধিমানের কাজ।

শনিবার, ১২ আগস্ট, ২০১৭

টাইমিং টা ইম্পর্ট্যান্ট...

বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেছে ৪০ লাখ সৌদি তরুণী। তারা এখনো রয়ে গেছে অবিবাহিত। খবর সৌদি গেজেটের।
ধারণা করি, তরুণদের সংখ্যাটাও সেখানে বোধহয় কম হবে না। তার মানে, বিয়ে সংক্রান্ত সমস্যাটা আসলে মুসলিম বিশ্বের একটা কমন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সৌদি আরবের মোট জনসংখ্যা মাত্র তিন কোটির কিছু বেশি। তার মধ্যে যদি নারীর সংখ্যা অর্ধেক ধরি, তাহলে দেড় কোটি হয়। এর মধ্যে আছে শিশু, আছেন মধ্যবয়সী থেকে বয়স্কা নারীরা। অর্থাৎ বিয়ের বয়সী তরুণীর সংখ্যা যদি ৬০ লাখ হয়, তার মধ্যে ৪০ লাখেরই বয়স ত্রিশের উপরে হয়ে গেছে। অথচ তাদের বিয়ে হয়নি।
অবস্থাটা কি স্বাভাবিক মনে হয়? নাহ, এটাকে স্বাভাবিক মনে করার কোন সুযোগ নেই।
কেন এই অবস্থা? অতিরিক্ত মোহরানা দাবী, যোগ্য পাত্র পাওয়ার পরও আরো ভালোর জন্য অপেক্ষা, এসবই কারণ বলে আমার মনে হয়।
আজ মনে পড়ে হযরত ওমরের সময়কার কথা। যখন কিছু যুবক হযরত ওমরের কাছে এসে অভিযোগ করেছিলেন যে, নারীরা অত্যধিক মোহরানা দাবি করার কারণে বিয়ে কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ওমর (রাঃ) অবস্থার গুরুত্ব উপলব্ধি করে জুমার খুতবায় বক্তব্য দিয়েছিলেন। তিনি মোহরানার পরিমাণ সর্বোচ্চ চারশ দিরহামে সীমাবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এতে নারীর অধিকার ক্ষুন্ন হয় বলে পরে তিনি তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছিলেন।
মোহরানা নারীর প্রাপ্য অধিকার। কিন্তু ব্যাপারটা হলো- কোন ন্যায্য অধিকারেরও যদি অপব্যবহার করা হয়, তাহলে তা ক্ষতির কারণ হয়। সৌদি আরবে সেটাই হয়েছে।
বাংলাদেশে কী অবস্থা? এনিয়ে কোন জরিপ হয়েছে কিনা আমার জানা নাই। তবে ধারণা করি, বাংলাদেশের অবস্থাও সুবিধাজনক না।
এর জন্য প্রধানত দায়ী অভিভাবকরা। সহজ একটা উদাহরণ দিচ্ছি। সুন্দরী না হওয়াটা বাংলাদেশের অনেক মেয়ের বিয়ের ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা। কিন্তু খেয়াল করবেন, ৩০ বছর বয়সে যে মেয়েকে দেখতে খুব একটা সুন্দর মনে হয় না, ১৫-২০ বছর বয়সে সেই মেয়েকেও দেখে অনেকেরই পছন্দ হবে। তার মানে, টাইমিং টা ইম্পর্ট্যান্ট। এইটা গার্জিয়ানদের খেয়াল রাখতে হবে।
আবার যারা একটু বেশি সুন্দরী, তাদের গার্জিয়ানদের পা মাটিতে থাকে না। তারা সব চান। যোগ্য পাত্র পেলেও তারা নানান ছুতো নাতায় দেরি করেন। 'আরো ভালো' পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন।
বাংলাদেশের অবস্থা সম্ভবত এখনো অতটা খারাপ হয়নি। কিন্তু হচ্ছে। আয়্যাম নট শিওর, তবে কয়েক বছর পরে যদি বাংলাদেশে এই বিষয়ে জরিপ করা হয়, খবরটা হয়তো এরকম বেরোবেঃ 'বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেছে ১ কোটি বাংলাদেশি তরুণীর'।

বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই, ২০১৭

একক নাকি যৌথ পরিবার?

একক পরিবার নাকি যৌথ পরিবার? এই নিয়ে বিতর্ক ইদানিং বেশ জমে উঠেছে সামাজিক পরিমন্ডলে। কেউ কট্টরভাবে যৌথ পরিবারের পক্ষে, কেউ একক পরিবারের। নব্য নারীবাদিরা নতুন করে এই আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়েছেন। তারা বেশিরভাগই যৌথ পরিবারের বিরুদ্ধে প্রান্তিক অবস্থান নিয়েছেন। আবার পুরুষরা অনেকেই কট্টরভাবে যৌথ পরিবারের পক্ষ নিয়েছেন।
আমার অবস্থান মোটাদাগে পৃথক পরিবারের পক্ষে।
যৌথ পরিবারের বউ মানে যদি হয় পরিবারের 'সবার সেবক', তাহলে আমি এর বিরোধী। আবার একক পরিবার মানেই যদি হয় বাবা-মা, ভাই-বোনদের ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন থাকা, সেটাকেও আমি সমর্থন করতে পারি না।
মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হলো, মানুষ দিতে চায় কম, নিতে চায় বেশি। যৌথ পরিবারে এই সমস্যাটা বেশি প্রকট হয়ে দাঁড়ায়। কে ঠিকঠাক কাজ করে না, কে কতটুকু দেয়, কে বেশি নেয়- একটা যৌথ পরিবারে দিনশেষে সম্ভবত প্রত্যেকের ঘরে এগুলোই হয়ে ওঠে কমন আলোচনার বিষয়। গীবত আর চোগলখুরির চর্চাটা শুরু হয় সম্ভবত এখান থেকেই।
একটা পরিবারে টুকটাক অনেক কাজ থাকে। একটা বড় যৌথ পরিবারে সেই কাজের পরিমাণ হয় অনেক অনেক বেশি। কিন্তু সেখানে সত্যিকারার্থে কোন কর্মবন্টণ থাকে না। ফলে, অনেকে মিলে করলেও কাজের 'শেষ' হয় না। দিনশেষে তাই সবার মনে থাকে অতৃপ্তি, অন্যের প্রতি অভিযোগ, আক্ষেপ।
সবচেয়ে বেশি চাপ সহ্য করতে হয় বাড়ির 'বড় বউ'কে। তার নিজের জীবন বলতে কিছু থাকেনা।
সকাল বিকাল চা-নাস্তা বানানো, তিন বেলা ভাত-তরকারি রান্না, কাপড়-চোপড় ধোয়া, ইস্ত্রি করা, ঘরদোর সামলে রাখা- সহজ কাজ নয়। একজন গৃহিনী বউকে সারাদিনে যতবার এঘর ওঘর করতে হয়, হিসাব করলে তাতে তার প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার হাঁটা হয়ে যায়। কাউকে কাউকে সারাদিনে যে পরিমাণ রান্নাবান্না করতে হয়, সেই পরিমাণ রান্না করে হয়তো একটা বড়সড় রেস্টুরেন্ট চালানো যাবে। যে পরিমান কাপড় ধুতে হয় বা ইস্ত্রি করতে হয়, সেই পরিমাণ কাজ করে বোধহয় বাণিজ্যিকভাবে একটা লন্ড্রি দোকানই চালানো সম্ভব।
যৌথ পরিবারে কারো নিজস্ব সময় বলে কিছু থাকেনা। একটু বিশ্রাম, নিজের বাচ্চাটাকে একটু বেশি সময় দেয়া, স্বামীর সাথে একটু অতিরিক্ত গল্পগুজব- কোনোটাই নিশ্চিন্তে করা যায় না। মাথায় অনেক কাজের চাপ, আবার যেকোন সময় যেকেউ ডাক দিতে পারে।
'মা এক কাপ চা দাও না'। 'আমার ঘড়িটা কোথায়?' 'ভাবী এক গ্লাস পানি দাও।' 'বউমা একটু রান্নাঘরে যাও।' যেকোন সময় কানে আসতে পারে যেকোন আদেশ, কিংবা অনুরোধ।
ক্লাস নাইনে থাকতে প্রথম যেদিন আমি নিজে নিজে আমার সব কাপড় ধুয়েছিলাম, আমার কোমর ব্যাথা হয়ে গিয়েছিল। আমার মা এবং বোনেরা কত কষ্ট করে সেটা বুঝতে আর বাকি ছিলনা। এরপর থেকে নিজেই কাপড় ধুই।
গোসল করতে গেলেই আমি দুএকটা কাপড় ভিজিয়ে রাখি। তবুও সপ্তাহ শেষে একগাদা ময়লা কাপড় জমে থাকে। একজনের কাপড় নিয়েই যদি এই হয় অবস্থা, একটা পুরো পরিবারের কাপড় সামলানো কতটা কঠিন, ভাবা যায়?
প্রাপ্তবয়স্ক এবং বিবাহিত ছেলে মেয়েরা তাই পৃথক পরিবার চালানোই ভালো। তবে পৃথক পরিবার মানে বাবা-মা বিহীন পরিবার নয়। বাবা-মা'র দায়িত্ব থেকে মুক্তি নয়। শ্বশুর শ্বাশুড়ির দায়িত্ব থেকে মুক্তি নয়। ভাইবোনদের দায়িত্ব থেকে মুক্তি নয়। ভাই বোনদের মধ্যে যে বেশি স্বচ্ছল, তারই উচিত বাবা-মার দায়িত্ব নেয়া। তারই উচিত বেশি বেশি বাকি সবার খবর নেয়া। সবার বোঝা উচিত, বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেয়াটা বিরাট সুযোগ, এটা কোন বার্ডেন নয়। বাপ-মা কিংবা শ্বশুর-শ্বাশুড়ির সেবা করার জন্য ছেলেমেয়ে বউ-জামাইদের রীতিমত প্রতিযোগিতা করা উচিত।
অনেক ক্ষেত্রে যৌথ পরিবারগুলো শেষ পর্যন্ত ভেঙ্গে যায় ঝগড়াঝাটির মাধ্যমে। এতে করে জীবনের বাকি সময়টাও আর স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকে না। এমন তিক্ততা সৃষ্টি হবার আগেই পরিবার পৃথক হওয়া ভালো। এতে করে বাকি জীবনেও সম্পর্কগুলো ভালো থাকে। তিক্ততা নিয়ে, অসন্তুষ্টি নিয়ে যৌথ পরিবারে থাকার চেয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে পৃথক পরিবারে থাকাই ভালো। খারাপ সম্পর্ক নিয়ে কাছে থাকার চাইতে ভালো সম্পর্ক নিয়ে দূরে থাকা ভালো। 

মঙ্গলবার, ২৭ জুন, ২০১৭

নারীদের মসজিদে যাওয়া কতটা জরুরী?

ঈদের জামাতে মহিলাদের অংশগ্রহণের সুযোগ আছে কোথাও? বাংলাদেশের কোন ঈদগাহে কি মহিলারা অংশ নেন? আমার জানা নাই। আর উত্তরটা সম্ভবত 'না'। কীভাবে মেয়েদেরকে ধর্মের কাজ থেকেও দূরে রাখা হয়েছে এইটা হলো তার একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
আর এর কারণ হলো আমাদের দেশের, বলতে গেলে এই উপমহাদেশের আলেম-ওলামাদের অতিবুযুর্গীপনার নামে নারীদের বঞ্চিত করার বিশেষ প্রবণতা।
অথচ আল্লাহর রাসুল (সাঃ) মহিলাদের ঈদের জামাতে অংশ নিতে জোর তাগিদ দিয়েছেন। এমনকি যেসময় নারীদের জন্য নামাজ পড়াই নিষিদ্ধ, সে অবস্থায়ও তাদের ঈদগাহে যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে। যাদের ওড়না নেই, তাদেরকে অন্য বোনের ওড়না ধার করে নিয়ে যেতে বলা হয়েছিল।
দেশের কতগুলি মসজিদে নারীদের নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা আছে? প্রাত্যহিক নামাজ তো দূরের কথা, জুমার নামাজেও তাদের অংশগ্রহণের কোন সুযোগ কোথাও আছে কি? নেই।
কেন নেই? রাসুলের সময় যেখানে নারীরা ফযর এবং এশার নামাজও মসজিদে গিয়ে পড়তে পারতেন, আজ কে এমন বুজুর্গ হলো যে নারীদের মসজিদে যাওয়াই বন্ধ করে দিলো? খুবই আশ্চর্যের কথা, কোন কোন মসজিদে নাকি এরকমও লেখা থাকে- মহিলাদের প্রবেশ নিষেধ!!
জাতি হিসেবে মুসলিমদের দুরবস্থা বা অধঃপতনের কারণ হিসেবে অনেকেই অনেক কথা বলে থাকেন। আমি এই দুরবস্থার পেছনে দায়ী করি মুসলিম নারীদের মসজিদ বিমুখ করে রাখাকে। মসজিদ থেকে দূরে রাখাকে।
এজন্য কোন গুরুতর তত্ত্বীয় আলোচনার প্রয়োজন নেই। কমনসেন্স এপ্লাই করাই যথেষ্ট।
মুসলিম সমাজের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী। মসজিদে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় এই অর্ধেক সংখ্যক মুসলিম ইসলামের শিক্ষা পাচ্ছেন না। কোন একটা জনগোষ্ঠির অর্ধেক মানুষকে জ্ঞানহীন রেখে কীকরে একটা সুন্দর সমাজ তৈরি করা সম্ভব?
পুরুষেরা মসজিদে গিয়ে কিছু হলেও ধর্মীয় আলোচনা শুনতে পারে, মসজিদের এইসব আলোচনা থেকে তারা ইসলাম সম্বন্ধে কিছুটা হলেও জানার সুযোগ পায়। যদিও কাজের ব্যস্ততায় তারা অনেকেই সে সুযোগ নেয় না। আমাদের দেশের মেয়েরা ধর্মীয় আলোোচনা শোনার কোন সুযোগই পায় না। সাংসারিক কাজ শেষে সারাদিন বাড়ীতে বসে থাকা ছাড়া সময় কাটানোর অন্য কোন সুযোগ তারা পায় না।
যারা মেয়েদের সিরিয়াল দেখা নিয়ে কটাক্ষ করেন, হাসি তামাশা করেন, ক্ষোভ প্রকাশ করেন- আমি তাদের জিজ্ঞেস করি, সিরিয়াল না দেখে তাদের উপায়টা কী? ঘরে বসে তারা করবেটা কী সারাটা দিন?
বাচ্চাদের প্রথম শিক্ষক হলো মা। সেই মায়েরাই যদি থেকে যায় জ্ঞানহীন, তারাই যদি থেকে যায় ধর্ম সম্পর্কে উদাসীন, তাহলে বাচ্চাদের ধর্ম ও চরিত্রের শিক্ষা দেবে কে? দিনকে দিন সমাজে যে ধর্মীয়ভাবে উদাসীন একটা ডিজুস প্রজন্ম বেড়ে উঠছে এর একটা কারণ হলো মায়েদের জ্ঞানশুন্যতা। মায়েরা নিজেরাই যেখানে জ্ঞান রাখে না সেখানে তারা বাচ্চাদের কী শেখাবে?
মায়েরা মসজিদে গেলে ছোট বাচ্চারা মায়ের সাথে মসজিদে যেতে অভ্যস্ত হবে। বাচ্চারা যদি ছোট থেকেই ধর্মীয় অনুশাসন, সততা, ন্যায়, আর উত্তম চরিত্রের শিক্ষা পায়, তবেই একটা সুস্থ সুন্দর প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব। যারা সমাজটাকে সুন্দর করবে, দেশকে সুন্দর করবে।
মুসলিম নারীদেরকে ধর্ম সম্বন্ধে জানার সুযোগ সৃষ্টি করার জন্য বাংলাদেশের সব/বেশিরভাগ মসজিদেই মহিলাদের জন্য স্থান রাখা দরকার। পাশের বাসার ভাবীদের সাথে গীবত পরনিন্দা আর চোগলখুরির আসর বসানোর চাইতে তাদের মসজিদে যাওয়া ভালো না?
যারা বলতে চান যে, এই ফেতনার যুগে মহিলারা মসজিদে গেলে ফেতনা/বিশৃংখলা সৃষ্টি হবে, ফেতনা বৃদ্ধি পাবে, তারা বোকার স্বর্গে আছেন।
ভাইসাব, নারীদের মসজিদ থেকে দূরে রেখে কি ফেতনা বন্ধ করতে পারছেন? নাকি ফেতনা বাড়াচ্ছেন? নারীরা স্কুলে কলেজে ভার্সিটিতে বাজারে সবখানে যেতে পারবে, শুধু মসজিদে গেলেই ফেতনা?
দুনিয়ায় ফেতনা সৃষ্টির জন্য শয়তানের একটা প্রধান মাধ্যম হলো নারী। আর তাদেরকেই যদি ধর্মানুরাগী, ধর্মের বিধিবিধান অনুসারী না বানাতে পারেন, তাহলে তো ফেতনা বাড়তেই থাকবে। মহিলারা মসজিদে যাওয়া আসা করলেই বরং ফেতনা বন্ধ হবে। সমাজে বিশৃংখলা কমবে।
কবি বলেছিলেন, দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভ্রমটারে রুখি, সত্য বলে আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি? আপনারা অন্ধকারের ভয়ে দরজা বন্ধ করতে চান, এদিকে আলো ঢোকার পথটাই যে বন্ধ করে দিয়েছেন সে খেয়াল নেই। মক্কা মদীনায় যে নারীরা মসজিদে নামাজ পড়ছে, সেখানে কি খুব ফেতনা হচ্ছে?
ইবনে উমর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হতে বর্ণনা করেন- “নারীদেরকে তাদের মসজিদে যাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করো না।”
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) এর ছেলে বিলাল একবার বলেছিলেন- 'আল্লাহর কসম আমি তাদেরকে (নারীদেরকে) অবশ্যই নিষেধ করব।'
কথিত আছে যে, ইবনে উমর (রাঃ) নাকি ছেলের এমন কথায় ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে থাপ্পড়ই মেরে বসেছিলেন!!!!

শুক্রবার, ৩১ মার্চ, ২০১৭

বিয়ে করতে কত টাকা লাগে?

বিয়ে করতে আসলে কত টাকা লাগে? বিবাহ কথন সিরিজের এই পর্যায়ে এটাই এখন আমাদের সামনে গুরুতর প্রশ্ন।
তবে এই প্রশ্নে নিজের মন্তব্য দেয়ার আগে আমি দুটি কেস হিস্ট্রি তুলে ধরবো। একতরফা না। একজন ছেলের, আর একজন মেয়ের।

কেস হিস্ট্রি-১:
আমাদের দেশে ছাত্রাবস্থায় বিয়ে করতে চাওয়াটাকে এক ধরণের অপরাধ হিসেবেই ধরা হয়। আমার বাসায়ও ভয় পেয়ে গেল। আমাকে অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে বললো, "কোনমতে জাস্ট পাসটা কর, তারপরই বিয়ে দিয়ে দিব; চাকুরিও পাবার দরকার নাই। এখন বিয়ে করলে মানুষ কি বলবে? মান-সম্মান থাকবে?"

আমিও বুঝলাম। পাস করে বের হবার পর বেকার ছিলাম প্রায় ৯ মাস। তখন তো বিয়ের কথা মুখে আনা প্রায় অসম্ভবই। এরপর মোটামাটি আয়-রোজগারের একটা ব্যবস্থা হলো (মাসে ১৮ হাজার টাকার মত)। এর কিছুদিন পর বাসায় আবার বললাম বিয়ে করার কথা। আব্বা বললেন - এই টাকায় ফ্যামিলি চালাতে পারবি? ঢাকা শহরে তো বাড়িভাড়াই হবেনা এই টাকায়। আমি কিন্তু ১ টাকাও দিতে পারব না। You have to be at your own! ভেবে দেখ।
সাত-পাঁচ ভেবে পিছিয়ে আসলাম। ঠিকই তো! এই টাকায় চলব কিভাবে? এভাবে আরও কিছুদিন গেল। আবার বললাম। আবার একই উত্তর। আবার পিছালাম। এভাবেই চললো কিছুদিন।

শেষমেষ ঠিক করলাম। দরকার হলে রিস্কই নিব। আমার পরিচিত অনেকে তো মাসে ৮ হাজার টাকা স্যালারি পেয়েও ২-৩ জন ছেলেমেয়ে নিয়ে সুন্দর সংসার চালাচ্ছে, তাঁরা পারলে আমি পারবোনা কেন? লাইফ-স্ট্যান্ডার্ড নিচে নামিয়ে আনতে হবে? আনবো। দরকার হলে বস্তিতে থাকবো।

এরপর বিয়েটা করেই ফেললাম (জুন, ২০১৩)। আমার ২ ফ্রেন্ডের কাছে ২০ হাজার ও ৩০ হাজার করে মোট ৫০ হাজার টাকা ধার করলাম। হবু বউকে আগেই জানিয়ে দিলাম আমি গরিব মানুষ। পুঁজি বলতে আমার এই ৫০ হাজার টাকাই। এর বেশি মোহরানা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না, আর পুরোটাই নগদ দিতে চাই। সে রাজি হলো।
কিভাবে জানি আরও ১০ হাজার টাকা ম্যানেজ হলো। বিয়ের দিন কি কি সব খরচে দেখি ২ হাজার টাকা শর্ট! দৌড়ায়ে গেলাম ছোট ভাইয়ের কাছে। বিভিন্ন সময়ে সে আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে পাওয়া ১০০, ২০০ টাকা মিলিয়ে যে ২-৩ হাজার টাকা জমিয়েছিল তা থেকে ২ হাজার টাকা ধার দিল। বিয়ে হয়ে গেল।

বিয়ের আগেই একটা বাসা ভাড়া নিয়ে রেখেছিলাম। ভাড়া ৭ হাজার টাকা প্রতি মাসে। বিয়ের ৩-৪ দিন পরই ঢাকায় চলে আসলাম নতুন বাসায়। ফার্নিচার বলতে মেসে থাকার জন্য কেনা ১ হাজার টাকা দামের একটা চৌকি আর ৫০০ টাকা দামের একটা টেবিল আর মেসে মিশুকের ফেলে রেখে যাওয়া একটা প্লাস্টিকের চেয়ার।

সংসার চালানোর জন্য যত খরচ হবে ভেবেছিলাম, দেখলাম বাস্তবে খরচ তার তুলনায় কমই। খরচ বেড়েছে বলতে বাসা ভাড়া ৪ হাজার টাকা (আগে ৩ হাজার লাগত আর তখন ৭ হাজার), খাওয়ার খরচ প্রায় অপরিবর্তিতই আছে (যেহেতু রান্না-বান্না কাজের লোক না রেখে নিজেরাই করি)। তবে আগে যেমন হাতখুলে খরচ করতাম, তখন সেটা মোটামুটি নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসতে হলো। পার্থক্য এটুকুই। সেই খরচেই সুন্দর চলে যেতে লাগলো।

কয়েকমাস পর বউ বললো একটা ফ্রিজ কেনা দরকার। টাকা জমাতে হবে। কয়েকমাস টাকা জমিয়ে ২০ হাজার টাকার মত হলো। ফ্রিজের দোকানে গেলাম। বউ পছন্দ করলো প্রায় ৩০ হাজার টাকা দামের একটা ফ্রিজ। আমি আনইজি ফিল করা শুরু করলাম। আমার কাছে তো এত টাকা নাই। সব মিলিয়ে বাইশ হাজার টাকা হতে পারে। বউ দেখি হাসে। এই কয়দিনে বউও প্রায় ৮ হাজার টাকার মতো জমিয়ে ফেলেছে সংসারের খরচ সেভ করে।

এখনো মাঝে মাঝে অবাক লাগে। আগে টাকার ভয়ে বিয়ে করতে পারিনি আমি। বিয়ের আগে প্রায় এক-দেড় বছর যে আয় ছিল, বিয়ের প্রায় বছরখানেক পর পর্যন্তও আয় ছিল একই। বিয়ের আগের প্রায় এক বছরে সেভিংস ছিল শূন্য টাকা। বিয়ের পরের এক বছরেও সেভিংস শূন্য, কিন্তু ২ জনের একটা সংসার চালিয়েও ফ্রিজসহ আরও অনেক কিছু কেনা হয়ে গেছে!

বিয়ে করলে আসলেই আয়ে বরকত আসে। রিজিকের মালিক আল্লাহ- এটা নতুন করে অনুভব করেছিলাম তখন। যারা টাকার ভয়ে বিয়ে করতে পারছেন না, সাহস করে বিয়েটা করেই ফেলুন। ইনশাল্লাহ, আয়ে বরকত আসবে। রিজিকের মালিক তো আল্লাহই।

ফুটনোটঃ বিয়ের জন্য যে দুই ফ্রেন্ডের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছিলাম, ধার শোধ করে তাঁদের বিয়ের সময়ও সেই একই পরিমান টাকা ধার দিতে পারার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। মাঝে মাঝে এই ৫০ হাজার টাকাকে খুব বরকতময় মনে হয়! কি সুন্দর এই হাত থেকে ঐ হাতে যাবার অছিলায় ৩ জনের বিয়ে সুন্দরভাবে হয়ে গেল! (রনি পারভেজ)

(বিবাহ কথন-১৭)

****

বিয়ে করতে কত টাকা লাগে? এই প্রশ্নে আমি একটা অদ্ভুত উত্তর দেবো, তবে তা আগামী পর্বে। নিজের মন্তব্য দেয়ার আগে যে দুটো কেস হিস্ট্রি উল্লেখ করতে চেয়েছিলাম, আজ থাকছে তার দ্বিতীয়টি।

কেস হিস্ট্রি-২:
আমার বিয়ের শাড়িটির দাম চার হাজার আট'শ টাকা। যেখানে আমারই বোন কিংবা কাজিনদের বিয়ের শাড়ির দাম পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত। আর্থিক সংকটের কারণে যে আমি কম দাম দিয়ে বিয়ের শাড়ি কিনেছি, এমন নয়। আসলে আমার মনে হয়েছে, কী দরকার, একদিনের জন্য এত বেশি টাকা নষ্ট করে! হাতে টাকা পেলে আমি পোশাক কেনার চেয়ে বই কেনায় বেশি মনোযোগ দেই। সে যাক, যার যার রুচির ব্যাপার। তবে এটা বলতে পারি, এক লক্ষ টাকার শাড়ি গায়ে জড়ানো বোনটির চেয়ে আমি মোটেও খারাপ নেই। ভালো থাকা যার যার মানসিকতার ওপর নির্ভর করে। আপনি যদি মনে করেন, আপনি ভালো আছেন, তাহলেই আপনি ভালো থাকবেন।

আমার যখন বিয়ে হয়, আমরা দুজনই স্টুডেন্ট। আমার একুশ, আতিকের তেইশ। আতিক কম বেতনের একটা চাকরি করে, আমার তেমন কোনো আয়-ইনকাম নেই। তবু আমার পরিবার বিয়েতে অমত করেনি। বিয়ের পরে আমরা একরূম সাবলেট নিয়ে উঠেছি। সস্তার আসবাবপত্রের দোকান থেকে কেনা দুই হাজার টাকার একটি খাট, একটি আলনা আর কম্পিউটার ছাড়া আর কিছুই ছিল না আমাদের ঘরে। দীর্ঘদিন আমরা দুইজন কোনো দামী ফোন ব্যবহার করিনি। মনে আছে, দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর আমি কোনো নতুন জামা, জুতো, ব্যাগ কিনিনি। আগের যা ছিল, তাই দিয়েই চালিয়ে নিয়েছি।

এক কেজি গরুর মাংস চার ভাগ করে রান্না করেছি। দিনের পর দিন শুধু সবজি দিয়েই ভাত খেয়েছি। এত যে কষ্ট করেছি, তবু একজনের বিরুদ্ধে আরেকজন কখনো অভিযোগ করিনি। আমাদের পরিবারকেও কখনো বলতে যাইনি, যে আমরা কষ্ট করছি। তারা জানতো, আমরা ভালো আছি। সত্যিই আমরা ভালো আছি। প্রয়োজন ছিল কিছুটা সময় ধৈর্য ধরার। আমরা তা করেছি, তাই দেখতে দেখতে দৃশ্য বদলে গেল, যে জীবন আমরা শুরু করেছিলাম, তার সঙ্গে বর্তমান জীবনের কোনো মিলই নেই! ভাগ্য বদলের জন্য তো প্রচেষ্টা থাকতে হবে, তাই না?

আরেকজনের সাজানো-গোছানো জীবনে প্রবেশ করার চেয়ে দুজন মিলে সাজিয়ে নিলে, সেই জীবনটা আরো বেশি সুন্দর হয়ে উঠতে পারে। (হাবিবা নাসরিন)

(বিবাহ কথন-১৮)

****

এর আগে দুটি কেস স্টাডি দিয়ে আমি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি- বিয়ে করতে খুব বেশি টাকার দরকার নেই। যদি নিয়ত ঠিক থাকে, যদি উভয়ের মেনে নেয়ার মানসিকতা থাকে- তাহলে থাকার জন্য দালানের দরকার হয় না, মাটির ঘরই যথেষ্ট হয়। লাখ লাখ টাকা মোহরানা লাগে না, কোরআনের কয়েকটি সুরাও যথেষ্ট হয়। লাখ টাকার শাড়ি গহনা পাগড়ী শেরোয়ানি লাগে না, লুঙ্গি ফতুয়া আর সাধারণ একটা শাড়ি হলেই চলে। কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করে হাজার মানুষ খাওয়ানো ওয়ালিমা দরকার হয়না, এক প্যাকেট খেজুরের ওয়ালিমাই বরকতপূর্ণ হয়।

এইযে এত জাঁকজমকের আয়োজন, এত আনুষ্ঠানিকতা, এত দর-কষাকষি, এইসব কেন করা হয়? করা হয় শুধুমাত্র তথাকথিত এই সমাজের চোখে, সমাজের মানুষের চোখে বড় সাজার জন্য। মানুষের চোখে প্রশংসা পাওয়ার জন্য। মানুষ কী বলবে- এই তাড়না থেকেই শুরু হয় শো-অফ এর যতসব অসুস্থ প্রতিযোগিতা।

কিন্তু বাস্তবে বিয়ের উদ্দেশ্য যে একটা সুন্দর পরিবার গঠন, সেইখানে এতসব খানাদানা জাঁকজমকের একপয়সার মূল্য নেই। দিনশেষে এই তথাকথিত সমাজ আর সমাজের মানুষেরা শুধু নিন্দাই করে, শুধুই পরশ্রীকাতর হয়, শুধু হিংসাই করে, শুধু সমস্যাই বাড়ায়।

সবকিছু মোকাবেলা করতে হয় শুধু দুজনকেই, পরিবারটাকে টেনে নিতে হয় মাত্র দুজনকেই।
বিয়ে করতে কত টাকা দরকার? আমার উত্তর হলোঃ বিয়ে করতে তত টাকাই দরকার, যতটাকা হলে একটা লুঙ্গি কেনা যায়!! অদ্ভুত শোনাচ্ছে? হাদীস থেকে বাস্তব প্রমাণ দিচ্ছিঃ

সাহল ইবনু সা‘দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক মহিলা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার জীবনকে আপনার হাতে সমর্পণ করতে এসেছি। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাঁকালেন এবং সতর্ক দৃষ্টিতে তার আপাদমস্তক লক্ষ্য করলেন। তারপর তিনি মাথা নিচু করলেন। যখন মহিলাটি দেখল, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সম্পর্কে কোন ফয়সালা দিচ্ছেন না, তখন সে বসে পড়ল। এরপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীদের মধ্যে একজন দাঁড়ালেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! যদি আপনার বিয়ের প্রয়োজন না থাকে, তবে আমার সঙ্গে এর বিয়ে দিয়ে দিন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে কিছু আছে কি? সে উত্তর করলো- না, আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার কাছে কিছুই নেই। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তোমার পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে গিয়ে দেখ, কিছু পাও কিনা। এরপর লোকটি চলে গেল। ফিরে এসে বলল, আল্লাহর কসম! আমি কিছুই পাইনি। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আবার দেখ, লোহার একটি আংটিও যদি পাও। তারপর লোকটি আবার ফিরে গেল। এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! তাও পেলাম না, কিন্তু এই আমার লুঙ্গি (শুধু এটাই আছে)। লোকটি এর অর্ধেক তাকে দিতে চাইল। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে তোমার লুঙ্গি দিয়ে কী করবে? তুমি যদি পরিধান কর, তাহলে তার কোন কাজে আসবে না, আর সে যদি পরিধান করে, তবে তোমার কোন কাজে আসবে না। বেশ কিছুক্ষণ লোকটি নীরবে বসে থাকল। তারপর উঠে দাঁড়াল। সে যেতে উদ্যত হলে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডেকে আনলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কী পরিমাণ কুরআন মাজীদ মুখস্থ আছে? সে বলল, আমার অমুক অমুক সূরা মুখস্থ আছে এবং সে গণনা করল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, এগুলো কি তোমার মুখস্থ আছে? সে বলল, হাঁ। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে পরিমাণ কুরআন তোমার মুখস্থ আছে তার বিনিময়ে এ মেয়েটিকে তোমার অধীনস্থ করে (বিয়ে) দিলাম।
(সহীহ বুখারী)

আপনার যা আছে বিয়ে করার জন্য তা-ই যথেষ্ট। শুধু আপনাকে হতে হবে আরো একটু বেশি কষ্টসহিষ্ণু, টেনে ধরতে হবে আপনার উচ্চাভিলাষের লাগাম, সাময়িকভাবে হয়তো কমিয়ে আনতে হবে জীবনযাত্রার মান। আর হ্যা, খুঁজে বের করতে হবে এমন একজনকে- যিনি আপনার এইটুকু নিয়েই সন্তুষ্টচিত্তে সংসার করতে রাজী আছেন।
(বিবাহ কথন-১৯) 

মঙ্গলবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

আকাশচুম্বী মোহরানাঃ বরের 'অর্থদন্ড' ??

শুধু পণ্যই নয়, আমাদের সমাজে মানুষেরও মূল্য নির্ধারিত হয় টাকার অংকে।

আর এর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় বিয়ের আসরে। মোহরানা নিয়ে যেভাবে দরকষাকষি করা হয়- মাছের বাজারেও ততটা করা হয় কিনা সন্দেহ।

অথচ বিয়ে কোন পণ্য কেনাবেচা নয়। বিয়ে মানে মানুষে মানুষে গড়া পবিত্র বন্ধন। প্রাণের সাথে জুড়ে দেয়া প্রাণ।
মোহরানা নির্ধারণ করা উচিৎ নারীর সম্মান, আর কিছুটা আর্থিক নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে। বাস্তবসম্মত ও পরিশোধযোগ্য সাধ্যের ভেতর। সেটাকে এমন অবাস্তব, আকাশচুম্বী, অপরিশোধ্য অংকে নির্ধারণ করা ঠিক না যাতে করে তা বরের কাছে 'আর্থিক দন্ডে'র মত মনে হয়!!

প্রথমেই মাথার ওপর বোঝা চাপিয়ে দিলে নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও তা কাঁটা হয়ে বিধে থাকে।
অতিরিক্ত মোহরানা পারস্পরিক সম্পর্কের কোন রক্ষাকবচ নয়। সম্পর্ক টিকে থাকে শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, ভালোবাসার ওপর। পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতার ওপর। শ্রদ্ধা কিংবা বিশ্বাস হারালে, পারস্পরিক আকর্ষণ হারালে, কাগুজে কাবিন সেখানে মূল্যহীন হয়ে যায়।

টাকার অভাবে কখনো সংসার ভাঙ্গে না। তার প্রমাণ লাখ লাখ ভূমিহীন কৃষক, ভিক্ষুক ভিখারিনীর সংসার। কোন একটা পরিবার শুধুমাত্র তখনই ভাঙতে পারে, কোন সংসারে শুধুমাত্র তখনই বিচ্ছেদ ঘটতে পারে, যখন পরস্পরের প্রতি কোন আবেগ অবশিষ্ট থাকে না। থাকে না একজনের প্রতি আরেকজনের কোন আকর্ষণ, শ্রদ্ধাবোধ।

কাবিনের টাকার অংক যে সংসারে বন্ধনের একমাত্র সুতো, সেখানে কোন সুখ অবশিষ্ট থাকে না। সেখানে সুত্রপাত হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের নানা কাহিনীর। কিছু প্রকাশ্যে আসে, বেশিরভাগই রয়ে যায় চোখের আড়ালে।
আবেগহীন সংসারে স্বামী যেন হয়ে যায় একজন দাস, আর স্ত্রীর সাথে তার আচরণ হয়ে থাকে দাসীর মত।

কাবিনের টাকা অধিক নির্ধারণ নয়, সমাজকে গুরুত্ব দিতে হবে নারীর শিক্ষা ও স্বনির্ভরতার ওপর। যে নারী নিজে নিজেকে, নিজের পরিবারকে চালানোর মত আর্থিক সক্ষমতা রাখেন, তার কাবিন নিরাপত্তার প্রয়োজন নেই।
টাকার গোলামী নয়, পবিত্র সুন্দর বন্ধনগুলো টিকে থাকুক পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার তারকাটায় গাঁথা হয়ে।

(বিবাহ কথন-১০)

সোমবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

সাধ্যাতীত মোহরানাঃ দায়ী কে?

"নিমকহারাম" বলে হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো বুড়ো মকবুল। তারপর অকস্মাৎ এক অবাক কান্ড ঘটিয়ে বসলো সে। ঘরের মাঝখানে, এতগুলো লোকের সামনে হঠাৎ আমেনা আর ফাতেমা দুজনকে একসঙ্গে তালাক দিয়ে দিলো সে। রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললো, তোরা বাইরইয়্যা যা আমার বাড়ি থাইক্যা।
(হাজার বছর ধরে/জহির রায়হান)।

বর্তমান সময়ে অতিরিক্ত/সাধ্যাতীত মোহরানা কাবিনে লেখা হয় মূলত আর্থিক নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে।
অদ্ভুত ব্যাপারটা হলোঃ একটা বিয়ের শুরুতেই মাথায় রাখা হয় 'তালাকের' কথা!!

কীভাবে এই অবস্থার উদ্ভব হলো? আমার বিশ্বাস, এর জন্য নারীসমাজ দায়ী নয়। পুরুষরাই দায়ী। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও প্রতিটি গ্রামে আট দশজন করে তালাকপ্রাপ্তা নারীর দেখা মিলত। হাজার বছর ধরে উপন্যাসের মকবুল বুড়োর মত পুরুষরা বিনাকারণে একাধিক বিয়ে করতো, আর যখন তখন বলে দিত- "তিন তালাক"।

এইসব নারীর বেশিরভাগই পেতেন না তাদের মোহরানা, পেতেন না বাবার সম্পত্তির ভাগ। কারো কারো দ্বিতীয় বিয়ে হত। সতীনের ঘরে জুটতো লাঞ্চনা গঞ্জনা। আর যাদের তাও হতনা, তাদেরকে হাতে নিতে হত ভিক্ষার ঝুলি।
এখনো গ্রামে গঞ্জে যেসব নারী ভিক্ষুক দেখা যায়, তারা আসলে তালাকপ্রাপ্তা নারী, যারা বঞ্চিত হয়েছেন মোহরানা থেকে, বঞ্চিত হয়েছেন বাবার সম্পত্তি থেকে। বঞ্চিত তারা রাষ্ট্রের আইন এবং সমাজের সুরক্ষা থেকে।

তালাকের এই অপব্যবহার রোধের প্রয়োজনেই শুরু হয়েছে অতিরিক্ত এবং সাধ্যাতীত মোহরানা নির্ধারণের চল। যদিও বর্তমান তরুণ প্রজন্ম এর জন্য দায়ী নয়, কিন্তু আগের প্রজন্মের কৃতকর্মের বিষফল ভোগ করতে হচ্ছে তাদেরকেই।
(বিবাহ কথন-৯)

শনিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০১৭

বুড়াটা মরি গ্যালো, মহরানা শোধ করি গ্যালো না...

আমাদের গ্রামের গফুর দাদা মারা যাবার বহুদিন পরে একদিন গফুর দাদীকে বলতে শুনেছিলাম, বুড়াটা মরি গ্যালো, মহরানা শোধ করি গ্যালো না। আরেক দাদী তখন বলেছিলেন- মাফ করি দে গো বু (বু মানে বোন)। মনে কষ্ট রাখিস না। কবরে কষ্ট পাইবে।

ছোট ছিলাম, তখন বুঝিনি। কিন্তু পরে যখন দাদীর কথাগুলোর গুরুত্ব বুঝেছিলাম, I was thundered... স্বামী মারা গেছে সেটাই একটা বড় কষ্ট, কিন্ত সেই কষ্টও তার মোহরানা না পাবার কষ্টকে আড়াল করতে পারেনি।
আমাদের সমাজে অনেক পুরুষই মোহরানা পরিশোধ না করার ধান্দায় থাকেন। ধার্য যা-ই হোক, কোনরকমে অল্প কিছু দিয়ে বাকিটা মাফ চেয়ে নেয়ার একটা গোপন ইচ্ছা পোষণ করেন। অনেকে তা করেনও। 

এরকম চিন্তাভাবনা পুরুষত্বের অপমান। কাপুরুষ ছাড়া কেউ এমন চিন্তা করতে পারে না।

প্রখ্যাত সাহাবী আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রাঃ) খেজুরের আঁটির সমপরিমাণ স্বর্ণ মোহরানা দিয়েছিলেন। আর রাসুল (সাঃ) একজন সাহাবীকে বিয়ে দিয়েছিলেন এতটুকু মোহরানায় যে, ঐ সাহাবী তার নিজের মুখস্থ থাকা কয়েকটি সুরা স্ত্রীকে শেখাবেন।

আপনি যা পারবেন বলে মনে করেন, তাই নির্ধারণ করবেন। ইট ডিপেন্ডস আপন ইওর ক্যাপাবিলিটি।
কিন্তু যা-ই নির্ধারণ করুন, শোধ করার ইচ্ছা রেখেই করুন। বিয়ের কয়েকদিনের মধ্যে মাফ চাবেন, তা হবে না। ঐসময় হয়তো নতুন বউ চক্ষুলজ্জায় কিছু বলতে পারবে না। মৃত্যুশয্যায় শুয়ে মাফ চাবেন, সে সুযোগ কপালে নাও জুটতে পারে। আর এরকম সময়ে কেউ মাফ করলেও তা খুশিমনে বা স্বতস্ফূর্ত হবে না।

পরিস্থিতির চাপে হয়তো কেউ বাধ্য হয়ে তার দাবী ছাড়তে পারেন। কিন্তু আপনার মৃত্যুর পর কখনো অভাবে পড়লে গফুর দাদীর মত হয়তো তিনিও বলবেন- বুড়াটা মরি গ্যালো, মহরানা শোধ করি গ্যালো না।
(বিবাহ কথন-৮)

শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০১৭

মোহরানাঃ কম দেয়ার মানসিকতা ঠিক না

বিয়ের মোহরানা নিয়ে অনেকের খেদ আছে।

মোহরানা নির্ধারণ যেভাবে করা হয় তাতে ক্ষুব্ধ হওয়ার যৌক্তিকতাও আছে। আমিও ক্ষুব্ধ হইনা তা নয়। মোহরানা নির্ধারণের নামে যেভাবে পণ্যের মত দর-কষাকষি করা হয়, এতে নারীর সম্মান বাড়ে নাকি অপমান হয় সেটা নিয়ে মেয়েদেরকেই ভাবতে হবে। মেয়েদের কী করা উচিৎ তা নিয়ে আমি কখনো কথা বলি না। তাদের ব্যাপার নিয়ে তারাই ভাবুক। আমার আজকের বক্তব্য সেইসব পুরুষদের উদ্দেশ্যে যারা অধিক মোহরানা নিয়ে ক্ষুব্ধ, হতাশ।
মোহরানা নিয়ে ক্ষুব্ধ পক্ষের অনেকের বক্তব্য শুনে আমার মনে হয়েছে, তারা মোহরানাটাকে বিয়ের একটা প্রথামাত্র মনে করেন। যেন কোনমতে অল্প কিছু মোহরানা দিয়ে বিয়ে করতে পারলেই তারা খুশি হন। 

মোহরানা না দেয়ার চিন্তা যেমন জঘন্য, আমার মনে হয়, শুধু শুধু কম দেয়ার মানসিকতাও ঠিক না। এমন মেন্টালিটি থেকে সবাইকে সরে আসতে হবে। ছেলেদের মানসিকতা থাকা উচিৎ মোহরানা কম দেয়া নয়, সামর্থের মধ্যে সর্বোচ্চ বেশি দেয়ার।

কম দেয়ার উদ্দেশ্যে মোহরে ফাতেমীর জিগির তুলবেন না।

মোহর পরিশোধ করা শুধু বাধ্যবাধকতাই নয়, এটা সওয়াবেরও কাজ। হাদিসে আছে- তোমরা স্ত্রীর মুখে যা তুলে দাও তাও সদকা হিসেবে গন্য হবে। নিজের বউয়ের সমস্ত চাহিদা মেটানো আপনার বাধ্যবাধকতা, কিন্তু তারপরেও সেটাকে সদকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আপনি কেন এই সুযোগ হেলায় হারাবেন?

আপনার স্ত্রী আপনার কাছে কতটা Precious সেটা যদিও টাকার অংকে নির্ধারণ করার সুযোগ নেই, তবে টাকার অংক একেবারে ফেলনাও নয়। বিশেষত এমন সমাজে, যেখানে টাকাই আপনার সামাজিক অবস্থান নির্ধারণ করে।

(বিবাহ কথন-৭)

বুধবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০১৭

তথাকথিত আর্লি ম্যারেজ চাই না...

ইদানিং অনেককেই আর্লি ম্যারেজ ক্যাম্পেইন করতে দেখা যায়। আমি এই তথাকথিত আর্লি ম্যারেজের পক্ষে নই। আর্লি ম্যারেজ সত্যিকার কোন সমাধান নয়। অল্প বয়সে বিয়ে দিলেই কারো সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যায় না।
জৈবিক চাহিদা পূরণই বিয়ের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। বিয়ে হলো পরিবার গঠনের উদ্যোগ। বিয়ে হলো সুস্থ সুন্দর সমাজ গঠনের উদ্যোগ। বিয়ে হলো সুনাগরিক তৈরির উদ্যোগ।

ছেলে মেয়ে সবারই বিয়ের জন্য অন্তত এতটা বয়স হওয়া উচিৎ যখন সে তার সঙ্গীর প্রতি কী দায়িত্ব, সমাজের প্রতি কী দায়িত্ব তা বুঝতে পারে। যখন তারা একটা শিশুকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মত মানসিক পরিপক্কতা ও যোগ্যতা অর্জন করে। আর্লি ম্যারেজ নয়, বিয়ে হতে হবে যথাসময়ে। বিয়ের জন্য বয়সই একমাত্র যোগ্যতা নয়।
কেউ কেউ মনে করেন তাড়াতাড়ি অল্প বয়সে বিয়ে দিলেই চারিত্রিক অবক্ষয় থেকে ব্যক্তি ও সমাজ রক্ষা পাবে। নীতি নৈতিকতা রক্ষা পাবে। কিন্তু বিষয়টা আসলে তা নয়। চরিত্র রক্ষার জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ, আইনের যথাযথ প্রয়োগ আর সামাজিক সুরক্ষা।

যে ছেলের মন সুস্থ নয়, তাকে ধরে বিয়ে দিলেই কোনকিছু ঠিক হয়ে যাবে না। অবিবাহিত মাত্রই চরিত্রহীন নয়, আর বিবাহিত হলেই কারো চরিত্র রাতারাতি ফুলের মত পবিত্র হয়ে যায় না। চরিত্রহীনদের তালিকায় বিবাহিতদের সংখ্যা নিতান্তই নগন্য নয়।

আর্লি ম্যারেজের নামে বেকার অবস্থায় কোন ছেলেকে বিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। বিয়ে দিলেই ঠিক হিয়ে যাবে- এটা কোন কাজের কথা হতে পারেনা। বিয়ে এমন কোন দাওয়াই নয়- যাতে নিমেষেই সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। একটা ছেলের বিয়ের আগে অন্তত এতটুকু উপার্জন থাকা উচিত, যাতে অন্তত দু'জন মানুষ ডাল ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে। বিয়ে দিলে ঠিক হয়ে যাবে!!" গেলে ভালো কথা, কিন্তু ঠিক না হলে যে একটা মেয়ের জীবন নষ্ট হয়ে যাবে, সেকথাও তো ভাবতে হবে নাকি?

বাবা মায়ের ওপর কোন দায়িত্ব নেই আপনার বউকে খাওয়ানোর। তারা যদি খাওয়াতে চান, খুব ভালো। নইলে আপনার বউয়ের সব চাহিদা মেটানোর দায়িত্ব সম্পূর্ণই আপনার।

কৃষিনির্ভর সমাজে মানুষ বৃদ্ধি মানেই ছিল আয় বৃদ্ধি। কিন্ত আধুনিক নগরভিত্তিক সমাজে তা নয়। এখানে বেশিরভাগ পিতামাতার নাভিশ্বাস উঠে যায় দু-তিনজন সন্তান মানুষ করতে। বাবার যখন অবসরে যাবার বয়স, তখন বেকার অবস্থায় আপনাকে বিয়ে করিয়ে নতুন একটা অতিরিক্ত সংসার টানার সামর্থ তার থাকবার কথা নয়।

আরে ভাই, ক্যাম্পেইন ট্যাম্পেইন করার আগে বুকে হাত দিয়া বলেন তো- আপনি কি আপনার বোনকে একজন পরিপূর্ণ বেকার ছেলের সাথে বিয়ে দিবেন?

(বিবাহ কথন-৫)

শনিবার, ২৭ জুন, ২০১৫

এত অবুঝ কেন বাঙালি মেয়েরা?

প্রায়ই পত্রিকায় শিরোনাম দেখি- 'বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণীকে ধর্ষণ !' যদিও এটা আসলে ধর্ষণ নয়, ব্যভিচার । যেখানে দুজনের সম্মতি থাকে তাকে ধর্ষণ বলা যায় না, সেটা স্পষ্টতই ব্যভিচার । শাস্তি হলে দুজনেরই হতে হবে ।
প্রশ্ন হচ্ছে, মেয়েরা এত অবুঝ কেন? বিয়ে কি এতই লোভনীয় বা দুর্লভ কিছু যে, কেউ 'বিয়ে করবে' বললেই তাকে সবকিছু বিলিয়ে দিতে হবে?
ধর্ষণের শিকার তো সুন্দরী মেয়েরাই হয়। তাদের তো বিয়ে নিয়ে চিন্তিত থাকার কথা নয়! আর কেউ যদি সুন্দরী না হয়, সে কীভাবে মনে করতে পারে যে বিয়ে ছাড়াই সব পাওয়ার পরেও কেউ তাকে বিয়ে করবে?
শারিরীক সংস্পর্শের আগে আল্লাহ বিয়েকে বাধ্যতামূলক করেছেন । শুধু তাই না, পুরুষের কাছে নগদ মোহরানা নেয়ার অধিকার দিয়েছেন । সেখানে আপনি আল্লাহর চেয়ে বেশি বুঝে বিয়ে মোহরানা ছাড়াই সবকিছু খোয়াবেন কেন? সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ যেখানে পুরুষদের বিশ্বাস করেন নাই(রুপকার্থে), সেখানে আপনি বিশ্বাস করার কে?
মুসলমানের জন্য বিয়ের আগে নারী পুরুষ একান্তে আলাপ করারও অনুমতি নেই। আপনাদের তথাকথিত এইসব 'রিলেশন'ই অবৈধ । তারপরও ধরলাম না বুঝে তথাকথিত 'রিলেশনে' জড়িয়েছেন । এখন, যে পুরুষ বিয়ের আগে শারিরীক সম্পর্কের কথা বলে সে যে একটা লম্পট এটা তো তখনই স্পষ্ট হয়ে যায় । কোনরকম সম্পর্ক থাকলে তো তখনই ছিন্ন করা উচিত্‍ । তারপরেও তাকে কেউ যদি বিশ্বাস করে এর চেয়ে বড় বেকুব কে হতে পারে?
প্রতারণার কথা বলে পার পাওয়া যাবেনা । বিয়ের 'প্রলোভনে'ই যদি আপনি বিয়ের আগেই সবকিছু সপে দিতে পারেন তাহলে আপনাকে বিশ্বাস না করাটাই তো স্বাভাবিক। বিয়ের পরে অন্য কোন প্রলোভনে অন্য কারো কাছে নিজেকে সপে দিবেন না তার নিশ্চয়তা কী?
কোন লম্পট পুরুষের লাম্পট্যকে সমর্থন করছি না । কিন্তু অন্য কোন দেশের নারীরা এমন 'বিয়ের প্রলোভনে' ভোলে কিনা আমার জানা নেই ।
শুধু বাঙালি মেয়েরা এত অবুঝ কেন?

রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৪

আহা কেউ যদি মশারিটা টাঙিয়ে দিত !!

আহা কেউ যদি মশারিটা টাঙিয়ে দিত !!
আলোচ্য বাক্যাংশটুকু মশার কামড়ে অতিষ্ঠ অলস ছেলেদের স্বগতোক্তি হইতে চয়ন করা হইয়াছে । ইহা ব্যাচেলর ছেলেদিগের বিবাহের ইচ্ছা প্রকাশের একটি মার্জিত রুপ ।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই কথাটার মাধ্যমে কী ধরণের মানসিকতা প্রকাশ পায় ?
ঠাট্টাচ্ছলে বলা হলেও এই কথাটা কিন্তু এমনি এমনি আসেনি । এর একটা ঐতিহাসিক পটভূমি আছে । হাজার বছর ধরে উপন্যাসে চিরায়ত বাংলার একটা চিত্র আছে । তিরিশ চল্লিশ বছর আগেও বাংলাদেশের গরীব, নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং গ্রামীণ মধ্যবিত্ত পরিবারে স্ত্রীদের একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল স্বামীর পা টিপে দেয়া । স্বামী মানে স্বামীই, সংসারের সত্যিকার রাজা । তাঁর একমাত্র কাজ উপার্জন করা আর সংসারের খরচ জোগানো । আর স্ত্রীর কাজ স্বামীর সেবা করা । মশারি টাঙানো সেখানে আরেকটি রুটিন কাজ মাত্র ।
এমন অনেক পুরুষ তাদের জীবন পার করে দিয়েছেন, জীবনে একদিনও মশারি টাঙান নি ।
আহা, কেউ যদি মশারিটা টাঙিয়ে দিত ! পুরুষের মনে এই ভাবনাটা সেই চিরাচরিত স্বামীসুলভ চেতনা থেকে উঠে আসে ।
[এটা হয়তো ক্ষতিকর কিছু নয় । তবে এই চিন্তাটার অর্থ যদি এই হয় যে পুরুষ তার সংসারে কোন সাংসারিক কাজই করবেন না, সব কাজ সবসময় স্ত্রীকেই করতে হবে সেটাকে নিশ্চয়ই ঠিক বলা চলে না । একদিন দুদিন মশারি টাঙালে নিশ্চয়ই পুরুষের মান ইজ্জত চলে যায়না !!]

বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১৪

লেডি হিটলার !

পুরুষেরা তাদের ক্ষমতা বিচার বিবেচনার ভিত্তিতে ব্যবহার করে । এটা আগে থেকেই জানা কথা । কিন্তু বিবাহিত ভ্রাতৃকুলের নিকট হইতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, 'নারী ঝাতি' ক্ষমতা পেলে নাকি ব্যবহার করে একনায়কের মত । এটাই নাকি 'ন্যাচারাল হিস্ট্রি অব দা ফ্যামিলিজ' এরাউন্ড আস ।
এটা স্পষ্ট, শহুরে পরিবেশে দিনকে দিন নারীরা পরিবারগুলোতে আপারহ্যান্ড নিচ্ছে । বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রী দুজনেই সমান সমান, সো কলড পারফেক্ট ম্যাচ।
আগে মেয়েরাই ছিল কম্প্রোমাইজিং, ছেলেরা ডমিনেটিং । কিন্তু আধুনিক পরিবেশে ছেলেরাই বরং মেয়েদের তুলনায় বেশি কম্প্রোমাইজিং মনোভাব পোষণ করছে । আর এর পুরোপুরি সুযোগ নিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই বিষয়টাকে রীতিমত পুরুষ নির্যাতনের পর্যায়ে নিয়ে গেছে কোন কোন 'অবলা নারী' । স্বামীর প্রতিমুহূর্তের কৈফিয়ত তলব, বন্ধুবান্ধবের সাথে মিশতে না দেয়া, মোবাইল থেকে ফোন নাম্বার ডিলিট করা, ফেসবুকের ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে ক্লোজ মানুষদের বাদ দেয়া ইত্যাকার নানান রকম মানসিক অত্যাচার সহ্য করে নাকি দিন কাটাচ্ছেন অভাগা পুরুষরা । কিছুদিন আগে এমন সংবাদও পত্রিকায় দেখেছিলাম, স্ত্রীর লাথিতে স্বামীর মৃত্যু !
হায় সেলুকাস ! এই কি ছিল তোমার কপালে সখিনার পা ?
-
আমরা জীবিত মানুষ । মুক্ত, স্বাধীন । সেজন্যে মৃত ভাইয়েরা যখন দুঃখ করে বলেন- ভাইরে, যতদিন পারিস বেঁচে থাকিস । 'মরেছিস' তো মরেছিস !!
শুনে পৈশাচিক আনন্দ পাই ।
আর মনে হয়, নারী যখন ক্ষমতাচর্চার সুযোগ পায় তখন-
They are not soulmate,
not a friend,
not a helping hand,
not a partner,
They become just a 'lady HITLER'...    

সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

লাক্স চ্যানেল আই সুন্দরী প্রতিযোগিতাঃ উদ্দেশ্য কী ?

লাক্স চ্যানেল আই সুন্দরী প্রতিযোগিতার আসল উদ্দেশ্য কী ? উদ্দেশ্য সহজ, ‘প্রতিযোগিতা’র নাম দিয়ে চামড়াসর্বস্ব মেয়েদের টেনে আনা হবে ঝলমলে মঞ্চে । তারপর তাদের উজ্ব্বল চামড়ার ছবি তোলা হবে বিভিন্ন ঢংয়ে । বিভিন্ন পোজে । আর দিনের পর দিন সেইসব চামড়ার ছবি এবং ভিডিও প্রচার করা হবে পত্রিকা ও টিভির রঙ্গিন বিজ্ঞাপনে । অপলক চোখে সেগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকবে জনতা । মনে করবে, আহা ! লাক্স কিনলে আমিও এরকম উজ্জ্বল চামড়ার অধিকারী হবো ! তারপর দোকানে গিয়ে লাক্স সাবান কিনে আনবে । কোম্পানীর ব্যবসা হবে রমরমা ।
তারা নানানভাবে সারাদিনরাত আপনাকে শুনিয়ে যাবে, মেয়েদের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা গায়ের রঙ । তারা আপনাকে প্রলুব্ধ করবে আপনার গায়ের রঙকে উজ্জ্বল করতে, তারা আপনার মনে হীনম্মন্যতার সৃষ্টি করবে – আপনার চামড়ার রঙ অতটা চকচকে নয় বলে ।
যদিও এটা বাই ডেফিনিশান বর্ণবাদের কাতারে পড়ে ।
ব্যবসার প্রয়োজনে তারা নারীদের ব্যবহার করবে । ব্যবসার প্রয়োজনে তারা বর্ণবাদকে উস্কে দেবে , ব্যবসার প্রয়োজনে তারা অশ্লীলতাকে উস্কে দেবে । প্রচার করবে অশ্লীলতার মহিমা । অন্ধ ছাড়া এ থেকে রক্ষা পাবেনা কারো চোখ ।
আর মেয়েদের একটা অংশ, অংশ নেবে তথাকথিত এই প্রতিযোগিতায় । কিছু লম্পটের কাছ থেকে এই স্বীকৃতি পাবার আশায়- হ্যা, ‘তোমার গায়ের রঙ বেশ উজ্জ্বল !’
যদি সত্যিই ওরা নারীর জন্য কিছু করতে চাইত, তাহলে যে টাকা দিয়ে এই সুন্দরী প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় , সেই টাকা দিয়ে তারা তো সংবর্ধিত করতে পারতো সংগ্রামী নারীদের, যারা নানা প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করে কাজ করে যাচ্ছেন নানান অংগনে । সেই টাকা দিয়ে অসহায় নারীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে পারতো । কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারতো । সেই টাকা দিয়ে তারা অসহায় মেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারতো ।
কিন্তু ওরা তা করবে না । এতে ওদের ব্যবসার সুবিধা হয়না । মা বাবাহীন যে মেয়েটি একা একা সংগ্রাম করে লেখাপড়া করেছে, ওদের কাছে তাঁর কোন মূল্য নেই । প্রতিবন্ধী হয়েও যে মেয়েটি লেখাপড়া করে অনেকদূর এগিয়েছে, ওদের কাছে তাঁর কোন মূল্য নেই । ওদের কাছে নারীর সমাজসচেতনতার মূল্য নেই , সাহিত্যপ্রতিভার মূল্য নেই, গবেষণার মূল্য নেই, মেধার মূল্য নেই, মস্তিষ্কের মূল্য নেই । ওদের কাছে মূল্য আছে- উজ্জ্বল চামড়ার ।
আর কতদিন এভাবে চলতে দেয়া যায় ?
আশার কথা মেয়েরা এদের দূরভিসন্ধির ব্যাপারে সচেতন হচ্ছে । কিন্তু শুধু সচেতনতা সৃষ্টিই যথেষ্ট নয় । যে ব্যবসায় মুনাফার লোভে এরা বর্ণবাদ ও অশ্লীলতাকে বেছে নিয়েছে ওদের সেই ব্যবসাতেই আঘাত করতে হবে । তবেই ওদের থামানো যাবে । আর এর সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে, যে লাক্সের প্রচারের জন্য ওদের এই অশ্লীলতা ও বর্ণবাদের প্রচার- সেই লাক্সকেই বয়কট করতে হবে । এবং এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে মেয়েদেরকেই ।

শনিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

নারীর শত্রু নারীই, পুরুষ নয়

ইদানিং অনেককেই নারীবাদী লেখা লিখতে দেখা যায় । গড়ে উঠেছে নারীবান্ধব ব্লগও । এগুলোতে নারীদের ব্যাপারে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে দেখা যায় লেখিকাদের । এবং অবধারিতভাবে শেষমেষ পুরুষ জাতের ওপর দোষ চাপিয়ে আক্রোশ ঝাড়া হয় । (এটাকে আমি মেয়েলী স্বভাবের স্বাভাবিক প্রকাশ হিসেবে দেখি)
মেয়েরা সচেতন হোক, নিজেরা নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলুক, আদায় করুক এটা আমি ভালোভাবেই চাই। কিন্তু সেই সাথে যে প্রশ্নটির দিকে নজর ফেরাতে বলি সেটা হলো , তীর ছোড়ার আগে নিশ্চিত হতে হবে 'মেয়েদের শত্রু কে?'

চর্মচক্ষে পুরুষকেই শত্রু মনে হতে পারে। সেজন্য হাত পা ছোড়াছুড়ি করা হয় পুরুষদের উদ্দেশ্যেই ।(আমার ছোটবোনকে দেখতাম কান্নাকাটি করার আগে হাত পা ছোড়াছুড়ি করতে)

কিন্তু আমি বলি মেয়েদের শত্রু মেয়েরাই । পুরুষ নয় ।

প্রথম কথায় আসি গায়ের রঙ নিয়ে । এ ব্যাপারে নারীবাদি লেখিকাদের অভিযোগ, পুরুষরা গায়ের রঙ কে বেশি গুরুত্ব দেয় । তারা 'আগে দর্শনধারী পরে গুণবিচারী' নীতিতে বিশ্বাসী ।
বাস্তব কী বলে ? বাস্তবে দেখা যায়, বাড়ির বউয়ের চামড়ার রঙ নিয়ে স্বামী শ্বশুড় কারো বিকার নেই , যত গঞ্জনা খোটা আসে শাশুড়ী-ননদ-জা-প্রতিবেশি মহিলাদের কাছ থেকে । অমুকের বউটা কালো বা শ্যামলা এ নিয়ে পুরুষদের কথা বলতে দেখা যায়না । জটলা পাকাতে দেখা যায় পাড়ার মহিলাদেরকে ।
স্বামীর কোন খেদ নাই, যত খেদ শাশুড়ী ননদ দের মনে ।
অনেক রাজপুত্রের মত সুন্দর ছেলেকে (আমার ভাই বেরাদার কাজিনদের মধ্যে যারা বেশি সুন্দর তাদের বউ কালো/শ্যামলা) কালো বউ নিয়ে সুখে থাকতে দেখছি । অসুখী কে ? অসুখী হলো চাচী খালা নানী দাদীরা ।
কালো মেয়েদের যদি বিয়ে না হত তাহলে তো কালো মেয়েরা সবাই অবিবাহিত থেকে যেত । তেমনটা হয়েছে কি ? তাহলে আর ছেলেদের দোষারোপ কেন ?
ছেলেদের কার কোন্‌ গুণ ভালো লাগে বলা মুশকিল । কিন্তু বাজারে উজ্বল চকচকে কাপড়ের দিকে নজর বেশি দেয় মেয়েরাই । ছেলেরা ফুটপাত থেকে টিশার্ট কিনেই দিনের পর দিন কাটিয়ে দেয় । তারা টেকসই ব্রান্ডের জিনিস কেনে ।

খালার বাসায় দেখেছিলাম সুন্দর হাতের কাজ করে ওয়ালম্যাট বানিয়ে টাঙিয়েছে খালাতো বোন ।
'জাতের মেয়ে কালোও ভালো, নদীর জল ঘোলাও ভালো।'
কালো মেয়েকে নদীর ঘোলা জলের সাথে তুলনা কে করেছে ? এটা তো মেয়েদের নিজস্ব হীনম্মন্যতা । ছেলেরা কেউ তো বলেনি !

কালো মেয়েকে বাবা মায়েরা একটু বেশিই আদর করেন । ভাবেন, পরের বাড়িতে মেয়েটাকে কী গঞ্জনা সইতে হয় কে জানে ? আগেই বলেছি, সেই গঞ্জনা কে দেয় ? 'ও বাড়ির' শাশুড়ী ননদেরা । স্বামী বেচারা নয় । ছেলের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে গেলে যদি কালো বা শ্যামলা হয় , কে আগে ভেটো দেয় ? মা অথবা বোন । বাবা, ভাইয়েরা নয় । (তা যত বড় ইসলামপন্থি নেত্রী বুজুর্গ রাবেয়া বসরীই হোন না কেন এই ব্যাপারে সব শিয়ালের এক রা ।)
ছেলের জন্য একটা লাল টুকটুকে বউ আনার গল্প ছোটবেলা থেকে কে শোনায় ? নিশ্চিত করে বলতে পারি, বাবারা শোনায় না ।

সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ দোষেরও নয় । মেয়েরা কি চায়না তার স্বামীটা সুন্দর স্মার্ট হোক ? মেয়ের  বাপ দেখে ছেলের এস্টাবলিশমেন্ট , টাকা পয়সা । মেয়ে কী দেখে ? মেয়ে তো বাবার সাথে পুরোমাত্রায় একমত , সেই সাথে তাদের চাই সুন্দর স্মার্ট ছেলে । কে অস্বীকার করতে পারবে ?
আর মেয়ে যদি একটু সুন্দর হয় তাহলে তার দাম বেড়ে যায় অথবা বাড়িয়ে দেয়া হয় কয়েকগুণ । মেয়ের মা বলবেন, আমার মেয়ে লাখে একটা । যার তার হাতে দেবো কেন ? মেয়ে কি ভাইসা আসছে ?

ওয়েল । আসি দ্বিতীয় ব্যাপারে । ইসলামে পিতা মাতা ও স্বামীর সম্পত্তিতে নারীর উত্তরাধিকার স্বীকৃত । যথাযথভাবে এই অধিকার দেয়ার ব্যাপারে পুরুষদের গাফলতি আছে । এ ব্যাপারে আমি আগেই লিখেছি (http://goo.gl/iJHWnX) । কিন্তু নারীদের ভূমিকা কী? ননদ যদি তার সম্পত্তির দাবি তোলে তাহলে প্রথমেই গর্জে ওঠে ভাইয়ের বউরা । তারা ননদকে বাঁকা চোখে দেখে । ভাই যদি বোনকে তার অধিকার বুঝিয়ে দিতে চায়, প্রথম বাধা আসে বউয়ের কাছ থেকে । যে ননদ তার প্রাপ্য সম্পত্তি নিয়ে যায়, বাবার বাড়িতে তার কদর কমে যায় । আর এসবের মূলে থাকে ঐ 'মেয়েরাই' । ভাইয়ের সাথে বোনের সম্পর্ক থাকে ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের সম্পর্কের চেয়ে বেশি গভীর । ভাই চায় বোনের খুশি । চায়না কে ? চায়না ভাইয়ের বউ ! একই মেয়ে নিজে তার ননদের কাছে যেরকম ব্যবহার আশা করে, নিজের ননদের সাথে তেমন ব্যবহার করেনা । একই নারী তার মেয়ের শ্বশুড় বাড়িতে যেমন আচরণ আশা করে, নিজের ছেলের বউয়ের সাথে তেমন ব্যবহার করেন না । একই মেয়ে তার ভাবি দের কাছে যেমন আচরণ আশা করে, নিজের ননদের সাথে তেমন আচরণ করেনা ।
অনেকটা শর্ট সাইটেড এবং আত্মকেন্দ্রিক, ক্ষুদ্র গন্ডিতে আবদ্ধ চিন্তাভাবনা তাদের । একটা স্বামী, দুটো বাচ্চা আর চার রুমের একটা বাসাকেই তাদের পৃথিবী বানিয়ে ফেলে । সমস্ত চিন্তাভাবনা ঘুরপাক খায় পনেরশ স্কয়ার ফিটের ভেতর । দুজন বান্ধবীর দেখা হলে আলোচনার নব্বই ভাগ জুড়ে থাকে শাড়ী গয়না বাচ্চা শ্বশুড় শ্বাশুড়ী আর পাশের ফ্ল্যাটের ভাবী । এর কথা তাকে লাগানোতে জুড়ি নেই নারীদের । সে তুলনায় ছেলেদের চিন্তাভাবনা অনেক ব্রড ।  উদারতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ছেলেদের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য । এক্সেপশন মে নট বি আন এগজাম্পল ।

তো সেজন্য পুরুষদের উদ্দেশ্যে ক্ষোভের বয়ান না দিয়ে নারীদের উচিত্‍ ঘরের শত্রুকে জানা । আগে নিজেদের ঠিক করা । 

শুক্রবার, ২৫ জুলাই, ২০১৪

নারী নেতৃত্ব হারাম ? -১৭

সমসাময়িক খ্যাতিমান ইসলামী স্কলার ড. তারিক আল-সোয়াইদান নেতৃত্বের উপর একটি যুগান্তকারী বক্তব্য দিয়েছেন। চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি মালয়েশিয়ায় এক কনফারেন্সে তিনি এ বক্তব্য প্রদান করেন। 



নারী নেতৃত্বের বিষয় আসলে অনেকেই যথাসম্ভব বিরোধিতা করেন। তারা নারী নেতৃত্বের বিরোধিতা করার সময় যে হাদীসটি উল্লেখ করে থাকেন তা হলো –‘যারা নারী নেতৃত্বের অধীনে থাকে তারা সফল হতে পারে না’। কেউ যদি কোনো হাদীসের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে চায় তাহলে তাকে অবশ্যই সে সংক্রান্ত সবগুলো হাদীসের খুঁটিনাটি জানতে হবে। নারী নেতৃত্ব সংক্রান্ত তিনটি বিষয় আলোচনার দাবি রাখে।
প্রথমত, উল্লেখিত হাদীসটির অনেকগুলো সংস্করণ আছে। দুর্বল হাদীস বাদ দিয়েও এই হাদীসটির২০টি সংস্করণ আছে যার প্রত্যেকটি সহীহ।হাদীসশাস্ত্র আনুযায়ী, যদি একই বিষয়ে হাদীসের দুইটি সংস্করণ থাকে, তাহলে দুইটি হাদীসের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদি দুইটি হাদীসই সহীহ হয় তাহলে একটি গ্রহণ করে অন্যটিকে বাদ দেয়া যাবে না। যেমন, কুরআনে আল্লাহ সুবাহানাহু তায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা দাসদের মুক্ত করে দাও’। অন্য আর একটি আয়াতে একই বিষয়ে আল্লাহ সুবাহানাহু তায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা মুসলিম দাস মুক্ত করে দাও’।এখন, এ বিষয়ে আমাদের উচিত হবে একজন মুসলিম দাস মুক্ত করার অর্থকে গ্রহণ করা। যখন কেউ মুসলিম দাস মুক্ত করবেন তখন তার সাধারণ অর্থে দাস মুক্ত করাও হয়ে যাবে। কিন্তু যদি কেউ অমুসলিম দাস মুক্ত করেন তাহলে তিনি অন্য আর একটি আয়াতের নির্দেশনা মানছেন না।
নারী নেতৃত্ব নিয়ে যে হাদীসটির কথা বলা হয়ে থাকে, সেই হাদীসের একটি সহীহ সংস্করণে কতগুলো সুস্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন, ‘মুলক’। আমরা জানি, ‘ওয়ালাও’ শব্দের অর্থ হলো কারো নেতৃত্বের অধীনে থাকা, আর ‘মালাকু’ শব্দের অর্থ হলো কোনো রাণীর অধীনে থাকা।হাদীসের ঐ বর্ণনায়একজন নারীর কোনো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকা নিয়ে বলা হয়েছে। সুতরাং এই হাদীসটির বরাতে কেউ নারীদেরকে সংসদ সদস্য কিম্বা বিচারক ইত্যাদি হতে বারণ করতে পারেন না। কারণ, যদি কেউ তা করার চেষ্টা করেন, তাহলে হাদীসের অন্য একটি সহীহ বর্ণনাকেঅস্বীকার করা হবে।
দ্বিতীয়ত, ইমাম বুখারী বর্ণিত এই হাদীসটির পিছনে একটি ঘটনা আছে। ঘটনাটি হলো, পারস্যকে সাসানাইড সম্রাটরা এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে শাসন করেছেন। যখন প্রথম খসরুর শাসন চলছিল, তখন রাজ্যের ভবিষ্যত কর্ণধর কে হবে তা নিয়ে ব্যাপক ষড়যন্ত্র শুরু হয়। এ নিয়ে প্রথম খসরু খুবই বিরক্ত ছিলেন। তিনি একদিন সবাইকে অবাক করে যুবরাজ এবং নিজেকে বাদ দিয়ে সাসানাইড রাজবংশের সকল পুরুষ সদস্যকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত দিলেন। তবে ভাগ্যক্রমে ইয়াযদেগারদ নামের একজন ছোট ছেলে বেঁচে যায়। পরবর্তীতে যাকে পারস্যের কিসরার রাজা বানানো হয়। মুসলমানরা যখন উমর (রা)-এর নেতৃত্বে কাদেসিয়ার যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়, সে সময় তিনি পারস্য সাম্রাজ্যের রাজা ছিলেন।
যা হোক, ঘটনাক্রমে সম্রাটের মৃত্যুর আগেই যুবরাজ মৃত্যুবরণ করেন। সে সময় তারা পারস্য শাসনের জন্য রাজপরিবারের কোনো পুরুষকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তখন কিসরার মেয়েকে সিংহাসনে বসানো হয়। এই খবর রাসূল (সা)-এর কাছে পৌঁছলে তিনি আলোচ্য মন্তব্যটি করেন। রাসূল (সা) কোনো আদেশ করেননি। তিনি শুধুমাত্র তার অর্ন্তদৃষ্টি থেকে তাদের সম্পর্কে একটি সাধারণ ভবিষ্যৎবাণী করেছেন।
সহীহ বুখারী মনোযোগ দিয়ে পড়লে দেখবেন, ইমাম আবু ইসমাঈল আল-বুখারী হাদীস বিশেষজ্ঞের পাশাপাশি একজন ফকিহও ছিলেন। যদিও তিনি ফিকাহর উপর কোনো বই লিখেননি। তিনি তার মতামত সহীহ বুখারীর বিভিন্ন অধ্যায়ের শিরোনামের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। ‘যারা নারী নেতৃত্বের অধীনে থাকে তারা সফল হতে পারে না’ এই হাদীসটি বুখারী শরীফের কোন অধ্যায়ে আছে?
বুখারী শরীফে ‘কিতাবুল ফিতনা’ একটি অধ্যায় এবং ‘কিতাবুল আহকাম’ আরেকটি অধ্যায়। এই হাদীসটি ‘কিতাবুল ফিতনা’য় সংযোজিত। ‘কিতাবুল আহকাম’ অধ্যায়ে ‘ইমারত’ তথা নেতৃত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা থাকা সত্ত্বেও এ হাদীসটিকে সে অধ্যায়ে রাখা হয়নি। সুতরাং নেতৃত্বের সাথে সর্বপর্যায়েজেন্ডারের সম্পর্ক খোঁজার চেষ্টা করাউচিত নয়। নারীরা যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে যে কোনো বিষয়ে নেতৃত্ব দিতে পারেন, তা হতে পারে রাষ্ট্রপ্রধানের মতো দায়িত্ব।

মঙ্গলবার, ৮ জুলাই, ২০১৪

বাঙালির কূটবুদ্ধি, হিল্লা বিয়ে ও একটি জঘন্য অপরাধ

এক লোক খুব ঘুষ খায় । তাঁকে ঘুষ খাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করা হলো । ভাই, ঘুষ খাওয়া তো ঠিক না । আপনার কি দোযখের ভয় নাই ? বেহেশতের আশা কি আপনি করেন না ?
মুচকি হেসে ঘুষখোরের জবাব- আরে ব্যাপার না ! বেহেশতের দারোয়ানকে ঘুষ দিয়ে ঠিকই ঢুকে যাবো !

***
মজু মেম্বারের ছেলে ফজু মিয়া । ছয় মাস হলো বিয়ে হয়েছে । কিন্তু এরই মধ্যে বউয়ের সাথে প্রায়ই ঝগড়াঝাটি করে । কারণে অকারণে বউটাকে পিটায় । আজ সকালেও তরকারিতে লবণ কম হয়েছে বলে বউটাকে আচ্ছামত মারধোর করলো । শুধু মারধোর করলে তো মজু মেম্বারের টেনশনের কিছু ছিলনা । ঘটনা আরো বড় । সে বউকে একেবারে তিন তালাক বায়েন দিয়ে ফেলেছে । এখন বলছে এই বউ সে ছাড়তে পারবে না । কী মুশকিল !
মুয়াজ্জিন সাহেব বলেছেন - তালাক হইয়া গেছে । হিলা বিয়া ছাড়া এই বউ ফেরত নিবার আর উপায় নাই । টেনশনে মজু মেম্বারের মাথা গরম হয়ে আছে । কী করা যায় ?
অবশেষে বুদ্ধি পাওয়া গেলো । মজু মেম্বারের ছোট ভাই এসে বুদ্ধি দিল - ১০১ টাকা কাবিন লিখা আমার পোলা সাবুদ্দির সাথে বিয়া দেও । বাসর কইরা পরে হেয় তালাক দিয়া দিব ! অসুবিধা কী ?

***

বাঙ্গালির অনেক বুদ্ধি ! আল্লাহকে ঠকাতে চায় ! হিল্লা বিয়ের নামে একটা জঘন্য সিস্টেম তারা চালু করেছিল (এখন কম, আগে এইটার খুব প্রকোপ ছিল) , যেটা নারীর প্রতি অমানবিক জুলুম তো বটেই - আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসুলের অপমান করার শামিল । আল্লাহ্‌র বিধানের সাথে তামাশা । আল্লাহ্‌র বিধানে ফাঁকফোকর বানিয়ে নিজের খায়েশ পুরণের জন্য এরা আল্লাহ্‌র সাথে 'সিস্টেম' করে চলে !

ইসলাম তালাকের সিস্টেমটাকেই কঠিন করেছে , মারাত্মকভাবে নিরুৎসাহিত করেছে । যখন তখন তালাক দিবে আবার ফেরত নিবে এরকম স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ রাখা হয়নি । প্রথমত তালাক দেয়ার জন্য যুক্তিসংগত কারণ লাগবে । সামান্য মতবিরোধ, কথা কাটাকাটিতেই ইচ্ছামত তালাক দিতে পারবে না ।
দ্বিতীয়ত , একবারে তিন তালাক দেয়া যাবেনা । এর জন্য কমপক্ষে তিন মাস সময় নিতে হবে । পবিত্র অবস্থায় এক তালাক দেয়ার পর একমাস সময় দিতে হবে । এরমধ্যে যদি সমস্যার কোন সমাধান না হয় তাহলে দ্বিতীয় তালাক দিতে পারবে । এই সময়ের ভেতর কোনরকম শারীরিক সম্পর্ক থাকতে পারবে না । আরো একমাসেও যদি কোন সমাধান না হয় এবং চিরতরে বিচ্ছিন্ন হবার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয় তবেই তৃতীয় তালাক বা স্থায়ী তালাক দিতে পারবে । আর এই তৃতীয় তালাক দেয়ার আগে তাঁকে অবশ্যই  ভাবতে হবে - এই তালাক মানে হলো এই স্ত্রীকে আর হয়তো এই জীবনে কোনদিন ফিরে পাওয়া যাবে না । চিরতরে বিদায় ।
একটাই উপায় যেটা খুবই অনিশ্চিত, যদি সেই স্ত্রী আবার স্বাভাবিকভাবে কাউকে বিয়ে করে তারপর সেই স্বামীর সাথে কোন কারণে বিচ্ছেদ হয় বা সেই দ্বিতীয় স্বামী মারা যায় তবেই উভয়পক্ষ চাইলে পুনরায় বিয়ে হতে পারবে । এটা স্বাভাবিকভাবে প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার । ( পুরনো স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দেবার প্রকাশ্য/গোপন/মনে মনে ইচ্ছা/চুক্তি থাকলেই সেই বিয়েই অবৈধ হবে । এমনকি এরকম ইচ্ছা নিয়ে বিয়ে করলে যতবছরই সেই বিয়ে টিকে থাকুক, অবৈধই থাকবে । অর্থাৎ ব্যাভিচার হিসেবে গণ্য হবে ।)

এটা নারীর জন্য শাস্তি না, ছিল রক্ষাকবচ । কিন্তু বাঙ্গালির বুদ্ধির তো অভাব নেই । তারা বেহেশতের দারোয়ানকে ঘুষ দিয়ে ঢুকবে ! সুতরাং তারা একটা সিস্টেম দাঁড় করালো 'হিল্লা বিয়ে' ! একজনের সাথে চুক্তি হবে - সে তালাক দেয়া বউকে বিয়ে করবে , তারপর বাসর করার পর তালাক দিয়ে দেবে ! এরপর আগের স্বামী তাঁর পুরনো বউকে আবার বিয়ে করবে ! দুদিনেই কেস ডিসমিস ! দুই পুরুষেরই মনের আশা পূরণ হলো , আবার ধর্মের বিধানও  রক্ষা হলো ! মারাহাবা ! কত্তবড় চালাক ঈমানদার ব্যাক্তি ! আল্লাহকে পুরা বোকা বানিয়ে দিয়েছে (নাউযুবিল্লাহ) !
আগের মোহরানা তো পরিশোধ করে নাই , বন্ধু/ভাই এর সাথে হিল্লা বিয়ে দিয়ে আবার ১০১ টাকা মোহরে নিজে বিয়ে করেছে ! বাহ বাহ !

এই জঘন্য অপরাধটা অনেক জায়গায়ই ঘটেছে । অথচ আলেম ওলামাদের এই ব্যাপারে তেমন একটা জোর গলায় কথা বলতে দেখা যায় নাই । এটাও একটা অবাক করা ব্যাপার । এরকমই একটা ঘটনার বিচারের প্রেক্ষিতে ফতোয়া নিষিদ্ধের আদেশ দিয়েছিল বাংলাদেশের একটি আদালত । সেই আদেশের বিরুদ্ধে আলেম ওলামাদের গর্জে উঠতে দেখা গেছে । কিন্ত যে ফতোয়ার অপব্যবহারের ফলে ফতোয়া নিষিদ্ধের আদেশ এসেছিল- তার ব্যাপারে তাঁদের বেশি উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায়নি ।  হিল্লা বিয়ের নামে এতবড় অপরাধ - চোখের সামনে ব্যাভিচার করার ব্যাপারে ততটা সচেতনতা তৈরিতে আলেম সমাজকে পাওয়া যায়নি ।

হিল্লা বিয়ের নামে এরকম ঘটনা যদি কেউ ঘটাতে চায় তাকে বাধা দিতে হবে । আর যদি কেউ ঘটিয়েই ফেলে তবে হিল্লা বিয়ে প্রদানকারী এবং হিল্লা বিয়েকারী উভয়কে ব্যাভিচারের শাস্তি দেয়া উচিৎ । সহযোগীদেরও শাস্তি হওয়া উচিৎ ।


ইব্‌ন মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিল্লাকারী এবং যার জন্য হিল্লা করা হয় উভয়কে লানত করেছেন।”

কুবাইসা ইব্‌ন জাবের ওমর রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেনঃ “হিল্লাকারী ও যার জন্য হিল্লা করা হয়, তাদেরকে আমার সামনে পেশ করা হলে আমি উভয়কে প্রস্তরাঘাত করব”।

“ইব্‌ন ওমরকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, স্ত্রীকে তার স্বামীর জন্য হালাল করার বিধান কি, তিনি বলেন : এটা যেনা, যদি ওমর তোমাদের দেখতেন, তাহলে অবশ্যই তিনি তোমাদের শাস্তি দিতেন”।

ইব্‌ন ওমর (রাঃ) কে হিল্লাকারী সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি বলেন : “তারা উভয়ে যেনা অবস্থায় থাকবে, যদিও এভাবে তারা বিশ বছর পার করে, যদি আল্লাহ জানেন যে, এদের উভয়ের নিয়ত হচ্ছে স্ত্রীকে প্রথম স্বামীর জন্য হালাল করা”।

আল্লাহ্‌র কাছে হালাল কাজসমূহের মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণিত হলো 'তালাক' ।

একবারে তিন তালাক প্রদানকারীকে হযরত উমর (রাঃ) শারীরিক শাস্তি দিতেন ।

.............................................

টীকাঃ হিল্লা বিয়ের প্রসঙ্গ টেনে ইসলামকেই বিতর্কিত করা হয় । বলা হয় ইসলাম হিল্লা বিয়ের মত অমানবিক সিস্টেম দিয়ে নারীকে অপমানিত করেছে । অথচ এই হিল্লা বিয়ের কোন অবস্থান ইসলামের বিধানে নেই । বরং প্রকৃতপক্ষে ইসলামে এটা একটা শাস্তিযোগ্য জঘন্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত ।

( বিস্তারিত জানতে সুরা বাকারা ২৯-৩০ আয়াত ও সুরা তালাক - তাফসীরসহ পড়ুন ।)

মঙ্গলবার, ১ জুলাই, ২০১৪

শ্বশুর শাশুড়ির সেবা করা কি বউয়ের দায়িত্ব ?

- কিরে মনু, শুনলাম তোর নাকি বিয়া ?
- হ ভাই, কী করুম কন ? বাপ -মা'র বয়স হইছে, দেখভাল করার জন্যে একজন মানুষ তো দরকার । কী কন ?
- হ, তা অবশ্য ঠিকই কইছস । তয় বেবাকরে ঠিকমতন দাওয়াত টাওয়াত দেস কিন্তু কইলাম !

মনু এবং মনুর সমর্থন করার মত লোক বাঙালি সমাজে অহরহই মিলবে । নিজের বাপ - মায়ের 'খেদমতে'র দায় বউয়ের ওপর চাপিয়ে নিশ্চিন্ত হতে কে না চায় ? যৌথ পরিবার থেকে যদি কেউ বিচ্ছিন্ন হতে চায় , সেটাকেও বাঙালি সমাজে ভালো চোখে দেখা হয় না । আর এ ব্যাপারে আড়ালে আবডালেও বউকেই দোষ দেয়া হয় ।
......

কিন্তু ইসলাম একক পরিবারের ধারণাকেই প্রাধান্য দেয় । মাওলানা আশরাফ আলী থানভী তাঁর 'কোরআন হাদিসের আলোকে পারিবারিক জীবন' বইয়ে লিখেছেন, ছেলে মেয়েদের বিয়ের পর তাদেরকে পৃথক করে দিতে হবে । তারা আলাদা পরিবার গড়ে আলাদাভাবে পারিবারিক জীবন শুরু করবে ।
তাঁর মতে- পিতামাতার সেবা, খেদমত ও দেখাশুনা করার দায়িত্ব সন্তানের ; স্ত্রীর নয় । ছেলের বউ যদি শ্বশুর শ্বাশুড়ী নিয়ে এক পরিবারে থাকাকে পছন্দ করে তাহলে সেটা হতে পারে , কিন্তু যখনই বোঝা যাবে যে ছেলের বউ পৃথক হওয়াকে পছন্দ করছে , তখন সে ব্যবস্থাই গ্রহণ করা দরকার ।
মাওলানা আশরাফ আলী থানভীর মতে, স্ত্রীর জন্য আলাদা ঘর ও তাঁর খোরপোষের ব্যবস্থা করা স্বামীর ওপর স্ত্রীর হক এবং এ হকের দাবি পূরণ করা ওয়াজিব । এ ক্ষেত্রে পিতা মাতা স্ত্রীকে আলাদা করে রাখতে আপত্তি করলেও বা মত না দিলেও তা করা উচিৎ, ওয়াজিব আদায়ের জন্য ।

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউসুফ আলী তাঁর 'মু'মিনের পারিবারিক জীবন' বইয়ে এ ব্যাপারে আরো যোগ করেছেন- স্ত্রী গ্রহণের উদ্দেশ্য হলো পারিবারিক শান্তি লাভ । পিতামাতার খেদমত করা, পারিবারিক কাজ-কর্ম করা এসব এর উদ্দেশ্য নয় । স্বামী স্ত্রীর প্রধান সম্পর্ক হবে পবিত্র দাম্পত্য জীবন যাপন , যাতে শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি লাভ করা যায় । অবশ্য স্ত্রী যদি সমঝদার ও বিনয়ী হয় তবে তাঁর শ্বশুর-শ্বাশুড়ীর খেদমত করতে আপত্তি থাকার কথা নয় । তা ছাড়া সাংসারিক কাজকর্ম করা- এটাও অভ্যন্তরীণ দায়িত্ব হিসেবে পালন করতে পারে । এটাও পারিবারিক শান্তির কারণ হতে পারে , কেননা প্রত্যেক স্বামীর পক্ষে কাজের লোক রেখে পাক-শাক করানো ও পারিবারিক অন্যান্য কাজ আঞ্জাম দেয়া সম্ভব নয় । কিন্তু এসব কাজ যদি পারিবারিক শান্তির ব্যাঘাত সৃষ্টি করে তাহলে স্ত্রীকে আলাদাভাবে রাখারই ব্যবস্থা করতে হবে স্বামীকে ।
......
......
বিশেষ কারণে পারিবারিক জীবনে ইসলামের বিধিবিধান নিয়ে পড়তে গিয়ে বেশ আশ্চর্য হচ্ছি ।
ইসলাম নারীকে চরম অবমাননাকর অবস্থা থেকে শুধু উদ্ধারই করেনি, এত বেশি অধিকার দিয়েছে যে, মাঝে মাঝে পুরুষ হিসেবে নিজেকে বেশ অসহায় মনে হয় । ইসলাম নারীকে সন্তানের দেখাশোনা করা ছাড়া প্রায় আর সব কিছু থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে । এমনকি ঘরের কাজকর্ম করতেও বউকে বাধ্য করা যাবে না ! পারলে বেতন দিয়ে অন্য লোক রেখে করান , নাহলে নিজেই করুন । আপনার বাপ-মায়ের সেবা বউ করলে সেটা তাঁর মহানুভবতা, না করলে দোষ দেয়ার সুযোগ নাই ।
নারীরা যদি তাঁদের অধিকার নিয়ে সচেতন হয় , তাহলে তো বেচারা পুরুষ প্রজাতির ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা হবে । এই জন্যেই বোধহয় একসময় পর্দা এবং শিক্ষাকে বিপরীত হিসেবে তুলে ধরে, পর্দার নামে নারীদের শিক্ষাবিমুখ করার চেষ্টা হয়েছিল । সম্ভবত এখনো ছেলেরা মনে করেন , এসব ব্যাপারে মেয়েরা যত কম জানে ততই মঙ্গল !

ফুটনোটঃ এইটা জেনে ভাইয়ারা সচেতন হোন । কিন্তু আপারা (যদি কেউ দেখে থাকেন) আজকেই রান্নাবান্না বন্ধ করে দিয়েন না । অধিকার থাকলেই তা সাথে সাথে আদায় করতে হয়না । আর তাছাড়া যুগ যুগ ধরে যে আচার-বিশ্বাস সমাজের গভীরে প্রোথিত হয়েছে তা একদিনে পরিবর্তন করতে পারবেন না । এতে বিশৃংখলা হবে । শ্বশুর শাশুড়ীর সেবা করা আপনার দায়িত্ব নয়, কিন্তু করতে পারলে নিশ্চয়ই ভালো । পরিবারে শান্তি রক্ষা করে ধীরে ধীরে আপনাদের অধিকার আদায় করবেন । আর শ্বশুর শাশুড়ীর সেবা করার দায়িত্ব না চাপালেও নিজের বাবা মায়ের সেবা করার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি কিন্তু নারী পুরুষ কাউকেই দেয়া হয়নি , সেটাও খেয়াল রাখতে হবে ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করার পর বিভিন্ন জনের প্রশ্নের জবাবে আরো যা বলেছিলাম -
১। মেয়েদেরকে ইসলাম কী অধিকার/সুযোগ দিয়াছেন তাহা না বলিলে তো উহারা মরিচীকার পেছনে ছুটিবে । যেমনটা হইয়াছে পর্দার ক্ষেত্রে । আপনারা যদি আগেই বলিতেন যে পর্দা করিয়া বাহিরের প্রায় সকল কাজই উহারা করিতে পারিবে , তাহা হইলে হয়তো উহারা আর পর্দা 'ছাড়িয়া' বাহির হইতো না । কিন্তু পর্দা করাইয়া ঘরে আটকাইয়া দেওয়ায় উহারা শেষে পর্দাকেই ছুড়িয়া ফেলিয়াছে , শয়তান ইহার সুযোগ লইয়াছে ।
যাহারা ভালো মনের অধিকারী , তাহারা এমনিতেই পিতা-মাতার সেবা করিবে । কিন্তু ইহা যে ফরয ওয়াজিব নহে তাহা জানা থাকা দরকার । না হইলে ছেলে/শ্বশুর/শাশূড়ির পক্ষ হইতে বউয়ের ওপর জুলুম করিবার সম্ভাবনা থাকে । অনেক ক্ষেত্রে ঘটিয়াছেও তাহাই । ফলে বিবাহের উদ্দেশ্যই এক পর্যায়ে ব্যর্থ হইয়া গিয়াছে । 


২।
অনেক সিঙ্গেল ফ্যামিলিকে দেখেছি যাদের প্রতি বাবা-মা খুবই সন্তুষ্ট । আবার অনেক যৌথ ফ্যামিলির বাবা মা ছেলে-বউয়ের ওপর সন্তুষ্ট না । এবং বাস্তবে এই অসন্তুষ্টি থেকেই পরবর্তীতে যৌথ ফ্যামিলি ভেঙ্গে যায় । সম্পর্ক খারাপ হয়ে যৌথ পরিবার ভেঙ্গে গেলে পরে সেটাকে আর আগের জায়গায় নেয়া যায় না । বাবা-মা কে সন্তুষ্ট করার জন্য একসাথে থাকাটা জরুরী না । দেয়ার আর সো মেনি ফ্যাক্টরস টু স্যাটিসফাই প্যারেন্টস । আধুনিক যুগে চাইলেও আর পরিবারগুলো একত্রে থাকতে পারবে না । পাশ্চাত্যের প্রভাবের অভিযোগটা সত্য হবে না , কারণ পাশ্চাত্যের পরিবারগুলোর ভাঙ্গন মহামারী আকার ধারণের আগেই আলেমরা এই ব্যাপারে কথা বলে গেছেন । 

৩।
বউ যদি স্বামীর অধীন হয়, স্বামী যদি তার পিতা-মাতার অধীন হয়, তাহলে ব্যাপারটা কি দাঁড়াল?

মাওলানা আশরাফ আলী থানভীর মতে, স্ত্রীর জন্য আলাদা ঘর ও তাঁর খোরপোষের ব্যবস্থা করা স্বামীর ওপর স্ত্রীর হক এবং এ হকের দাবি পূরণ করা ওয়াজিব । এ ক্ষেত্রে পিতা মাতা স্ত্রীকে আলাদা করে রাখতে আপত্তি করলেও বা মত না দিলেও তা করা উচিৎ, ওয়াজিব আদায়ের জন্য । 


৪। 
দায়িত্ব না / ফরজ-অয়াজিব না মানে কি 'করা যাবে না' ? বউ যদি এতটুকু মানবিক হয়, তাহলে সামান্য অনুরোধেই সব করবে । ব্যাপারটা হচ্ছে আপনি বউকে 'বাধ্য করতে' পারবেন না । বিষয়টা আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে একটু জটিল , কিন্তু অতটা জটিল না । আমি তো দেখি অনেকেই বাবা মাকে শহরে নিয়ে এসে নিজের সাথে রাখছেন । খুব ইজি । কিন্তু সব ভাইবোন একত্রে সংসার চালানোটা (পুরনো যৌথ পরিবার) আসলেই প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার । 

৫।
বাবা মায়ের সেবা করা সন্তানের ওপর ফরয । সন্তানের বউয়ের ওপর তো নয় । আর বউ শ্বশুর-শ্বাশুড়ির সেবা করতে বাধ্য নয় মানে এই না যে সব ধরণের সম্পর্ক ছেদ করবে । বউ তার স্বামীরও সেবা করবে, সন্তানেরও সেবা করবে, নিজের বাবা মায়ের সেবা করবে , আবার স্বামীর বাবা মায়ের সেবা করবে - এতকিছু তার পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে । এই ক্ষেত্রেই অনেক সময় জুলুম করা হয় । সে হয়তো বাধ্য হয়ে শ্বশুর শ্বাশুড়ির সেবা করছে কিন্তু তার মন পড়ে থাকে নিজের বাবা মায়ের কাছে । হয়তো তার নিজের বাবা মা অসুস্থ, তাঁদের সেবা করার সুযোগ তাঁকে দেয়া হচ্ছে না । 

৬।
সবাই মনে প্রানে বিশ্বাস করে বসে আছে - শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা বউয়ের এক নম্বর দায়িত্ব ! একটু কম হলেই বউয়ের নামে গীবত চোগলখুরী শুরু হয়ে যায় । আর নিজের বাপ মা অল্প সেবাতেই অনেক খুশি হয়, কিন্তু শ্বশুর শাশুড়িকে সেবা করে সন্তুষ্ট করা নাইন্টি পার্সেন্ট ক্ষেত্রে সম্ভব না । তারা বউয়ের কোন একটা ভুল বের করবেই । 

মঙ্গলবার, ১০ জুন, ২০১৪

ফেসবুক ভাঁড় !

ফেসবুকে অনেক ধরণের ভাঁড় আছে । তারমধ্যে এক বিশেষ ধরণের গোপাল ভাঁড় আছেন যাদের কাজ হলো সবসময় নারীর পর্দা নিয়ে ভজঘট করা । দুনিয়ার সব নারীকে পর্দা করানোই যেন তাদের এই দুনিয়ায় একমাত্র কাজ । আল্লাহ তাদেরকে এই দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছেন ! এই কাজ করেই যেন তারা জান্নাতে দাখিল হয়ে যাবে । নিজের নামাজ ঠিক আছে কিনা আল্লাহ মালুম , দায়িত্ব নিয়েছে মহিলাদের পর্দা করানোর !
.
মহিলাদের ঈমান আক্বিদা নামাজ রোযা ঠিক থাকুক আর নাই থাকুক , পর্দা করাতে হবে ! এদের দাওয়াতের নমুনা দেখলে গোপাল ভাঁড়ও লজ্জা পেতেন । বেচারার ভাগ্য ভালো , আগেই অক্কা পেয়ে রক্ষা পেয়েছে ।
.
কেউ কেউ আছে নিকাব নিয়া । মহিলারা নিকাব পড়বে কিনা সেটা তাঁদের ব্যাপার । কিন্তু সেই চিন্তায় এদের ঘুম হারাম (ঘুম কেন হারাম সেটা আর নাইবা বললাম !) । কেউ নিকাব করিয়েই ছাড়বে , নাহলে পারলে নিজেই ঠেলে অনিকাবীদের জাহান্নামে পাঠিয়ে দেয় আরকি ! আবার কেউ কেউ নেকাব খুলিয়েই ছাড়বে ! কেউ নেকাব পড়লে যেন তার গায়ে জ্বালা করে ফোস্কা উঠে যায় !
.
অথচ আল্লাহ মহিলাদের পর্দার আগে পুরুষের পর্দার কথা বলেছেন । সেই ব্যাপারে কোন কথা নাই । এরা আছে মহিলাদের পর্দা নিয়া । আগে মিয়া তোমার চোখ সামলাও , মহিলাদের ব্যাপারে এত নাক গলানোর দরকার নাই । তোমারটা তুমি দেখ , তাদেরটা তারা দেখবে । যদি পারো, নিজের মুহরেমাদের বোঝাও । তাতেই চলবে । পৃথিবীর সব নারীকে পর্দা করানোর দায়িত্ব কেউ তোমারে দেয় নাই ।
.
'মুমিনদেরকে বলুন , তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাযত করে । এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে । নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন ।' [সুরা নুরঃ ৩০]

বুধবার, ১৪ মে, ২০১৪

নারী নেতৃত্ব হারাম ?-১৬

আল্লামা ইউসুফ আল কারযাভী তাঁর ‘ফতোয়া’ বইয়ে নারী নেতৃত্ব সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তর দেন । সেখানে তিনি ‘নারী নেতৃত্ব’কে 'ডাইরেক্ট হারাম' বলে ফতোয়া দেননি । আগেই বলেছি- শীর্ষ আলেমগন এই ব্যাপারে সতর্কতার সাথে কথা বলছেন । তবে নারী নেতৃত্ব যে অপছন্দনীয় এবং একটি জাতির চূড়ান্ত কল্যানের ক্ষেত্রে 'সহায়ক নয়' সেটি তো অনস্বীকার্য । আল্লামা কারযাভীও সে বিষয়ে জোরালো ইঙ্গিত করেছেন ।
প্রশ্নঃ
সেই হাদীস কি সহীহ , যে হাদীসে রাসুল(সাঃ) বলেছেন – সেই জাতি কখনো কল্যান লাভ করতে পারেনা , যে জাতি একজন মহিলাকে নিজেদের নেতা নির্বাচন করে ।
যারা নারী নেতৃত্ব সমর্থন করেন তারা এই হাদীস মানেন না । তারা বলেন – এই হাদীস অন্য একটি হাদীসের সাথে সংগতিপূর্ণ নয় – যে হাদিসে রাসুল(সাঃ) বলেছেন- ‘হে লোকসকল, তোমরা দ্বীনের অর্ধেক বিষয় ‘হামিয়া’ অর্থাৎ আয়েশার কাছ থেকে গ্রহণ করো ।
উত্তরঃ
মূর্খতা এক বড় বিপদ । যদি এর সামনে প্রবৃত্তির সামান্য আকাঙ্ক্ষাও যুক্ত হয় তবে করলার সাথে নিমযুক্ত হওয়ার মত ক্ষতিকর অবস্থা দেখা দেয় । আল্লাহ্‌ তায়ালা বলেন- ‘তার চাইতে বেশি গোমরাহ ব্যক্তি আর কে আছে যে আল্লাহ্‌ তায়ালার পক্ষ থেকে কোন হেদায়াত (পাওয়া) ছাড়াই কেবল নিজের খেয়াল খুশির অনুসরন করে । (সুরা আল কাছাছ- আয়াত ৫০)
যাদের মধ্যে মূর্খতা এবং প্রবৃত্তির দাসত্ব দুটোই একত্রিত হয় তাঁদের জন্য এটা অসম্ভব নয় যে , তারা সহীহ হাদীসকে যঈফ আর জঈফ হাদীসকে সহীহ বলে অভিহিত করবে ।
১।
মহানবী (সাঃ) এ কথা কীভাবে বলতে পারেন যে , আমরা অর্ধেক দ্বীন একজন মহিলা সাহাবীর কাছ থেকে গ্রহন করবো । অবশিষ্ট অর্ধেক দ্বীন অন্য সকল সাহাবীর কাছ থেকে গ্রহণ করবো , সাহাবীদের সংখ্যা যেখানে হাজার হাজার ।
সেই সকল সাহাবীর অনেকে মর্যাদার ক্ষেত্রে হযরত আয়েশার চেয়ে শ্রেষ্ঠ । তাছাড়া এটা কেমন যুক্তিবিরুদ্ধ কথা যে আমরা অর্ধেক দ্বীন হযরত আয়েশা(রাঃ) থেকে গ্রহণ করবো , অবশিষ্ট অর্ধেক দ্বীন অন্য সাহাবাদের কাছ থেকে গ্রহণ করবো ?
২। হযরত আয়েশা (রাঃ) সংক্রান্ত হাদীসে ‘হামিয়া’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে । এ শব্দের অর্থ হচ্ছে ছোট লাল মেয়ে । এই শব্দ ব্যবহারে স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা এবং আদর সোহাগ ফুটে উঠেছে । মহানবী সাঃ কি এমন প্রসঙ্গে এই শব্দ ব্যবহার করতে পারেন , যেখানে লোকদেরকে দ্বীন শিক্ষার জন্য গুরুত্বারোপ করেছেন । বিবেক তো এরকম কথায় সায় দেয় না । বাস্তবতা হচ্ছে যে , ইসলামে বিশেষজ্ঞ আলেমরা হযরত আয়েশার(রাঃ) কাছ থেকে দ্বীনের অর্ধেক তো দূরে থাক এক চতুর্থাংশও গ্রহণ করেননি । কারণ, ইসলামের ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে যে , ইসলামী শিক্ষার প্রচার প্রসারে হাজার হাজার সাহাবা অংশগ্রহণ করেছেন । হযরত আয়েশা(রাঃ) সেই হাজার সাহাবার মধ্যে মাত্র একজন ।
ইতিহাসের বাস্তবতা হতে দূরে সরে এসে যদি বিবেকের কষ্টিপাথরে উক্ত হাদীস যাচাই করা হয় , তবে বিবেকের বিরুদ্ধে রায় দেয় । যদি দ্বীনের অর্ধেক হযরত আয়েশা(রাঃ) এর ওপর নির্ভর করে , তাহলে হযরত আবু বকর(রাঃ), হযরত ওমর (রাঃ) , হযরত ওসমান (রাঃ) , হযরত আলী(রাঃ) , ইবনে মাসউদ (রাঃ) , হযরত মুআজ ইবনে জাবাল (রাঃ) এর মত বিশিষ্ট সাহাবীদের কাছ থেকে দ্বীন শিক্ষার কতটুকু অংশ অবশিষ্ট থাকে ? হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা তো হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যার চেয়ে অনেক কম ।
ব্যক্তি স্বাতন্ত্রের এবং ব্যক্তি মর্যাদার যেসব হাদীস আমাদের কাছে এসেছে সেসব হাদীস গ্রহণে আমাদের যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার । কারণ, যারা জাল হাদীস তৈরি করেছে তারা ব্যক্তির মর্যাদার ক্ষেত্রেই সর্বাধিক হাদিস তৈরি করেছে । ব্যক্তি বিশেষের প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা পোষণকারী ব্যক্তিরা ব্যক্তির মর্যাদা প্রমাণের জন্য বহু সংখ্যক জাল হাদীস তৈরি করেছে । হযরত আয়েশা(রা) এর মর্যাদা ও স্বাতন্ত্র প্রমাণের জন্য সেসব কথাই যথেষ্ঠ , যা সুরা নূর-এ এবং অন্যান্য সহীহ হাদীসে বিদ্যমান রয়েছে । তাঁর মর্যাদা প্রমাণের জন্য জাল হাদীস তৈরি করার কোন প্রয়োজন নেই ।