এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...

এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে
ভ্রমণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ভ্রমণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১৬

সাজেকঃ মেঘের ওপর বাড়ি

গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙ্গা মাটির পথ... 
 
চট্টগ্রামে যখন পা রাখলাম তখনো সূয্যিমামার মুখ দেখা যায় নি। পৌষের প্রথম সকাল। বাস থেকে নেমেই শীতের আমেজ টের পাওয়া গেলো। চাঁদর জড়াতে হলো গায়ে। বাসায় কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়েই ভ্রমণপিপাসুদের বিশেষ গ্রুপ "ভ্রমরের" কয়েকজন তরতাজা যুবক রওয়ানা হলাম "অক্সিজেনে"র উদ্দেশ্যে। ঘড়ির কাটায় সকাল আটটা পেরিয়ে গেছে। মানুষের পদচারণায় চট্টগ্রামের অক্সিজেন মোড়ের বাতাসে তখন অক্সিজেনের তুলনায় কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। 
আমাদের বাসে উঠতে হলো ঠিক সাড়ে আটটায়। গন্তব্য... রাঙ্গামাটি.... তবে আপাতত রাঙ্গামাটি নয়। যাচ্ছি খাগড়াছড়ির পথ ধরে সাজেকের সবুজ উপত্যকায়। সাজেক পড়েছে রাঙ্গামাটি জেলায়, কিন্তু পুরোটা পথ পড়বে খাগড়াছড়ির মাটিতে।

চান্দি গরম!!
 
ভ্রমর গ্রুপের দু'জন সদস্য আগের দিন বিকেলেই শান্তি পরিবহনের টিকেট কাটতে এসেছিলেন। তাদেরকে বলা হয়েছিলো সামনের দিকে কোন সিট খালি নেই। অতএব বাধ্য হয়ে তারা পেছনের দিকের কয়েকটি সিটের টিকেট কিনে নিয়ে যান। কিন্তু সকালে এসে দেখা গেলো ভিন্ন চিত্র!! হেল্পার চিৎকার করে ডাকছে... আসেন খাগড়াছড়ি... সিট খালি... এবং দেখা গেলো এইমাত্র এসে অনেকেই বাসের সামনের সিট পেয়ে যাচ্ছেন!! শান্তি পরিবহনের চট্টগ্রাম কাউন্টারের এই প্রতারণায় আমরা যারপরনাই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলাম। এই শীতের সকালে আমাদের চান্দি গরম গেল। ব্যাটাদের একহাত দেখে নেয়া দরকার। কাউন্টারে যে দুজন বসা ছিল তাদের সাথে বেশ উচ্চবাচ্য হলো। ওদেরকে বেশ করে শাসিয়ে দিলাম। বাসে উঠলাম ঠিকই, কিন্তু যাত্রার শুরুতেই শান্তি পরিবহনের এই প্রতারণামূলক আচরণ যে অশান্তির সৃষ্টি করলো তার শেষ কোথায় কে জানে!!

জানালায় ভোরের আলো 
 
চারজন অলস বাস মিস করেছে। অতএব চারটা সিট খালি। অলসরা পরের বাসে পারলে আসবে। না পারলে নাই। ব্যাকপ্যাক গুলো খালি সিটে রেখে আয়েশ করে বসলাম আমরা। আর বাস ছুটলো গন্তব্যের টানে। হাটহাজারী, নাজিরহাট, মানিকছড়ি... পথের দুপাশে সবুজ গাছের সারি। কখনো কাটা ধানের ক্ষেত। শহর ছেড়ে আমরা গ্রামের আলোহাওয়ার ভেতর এগিয়ে চলেছি। ততক্ষণে সূর্য তার আলো ছড়াতে শুরু করেছে। জানালার ফাঁক দিয়ে আলো এসে পড়ছে গায়ে। যেন আলতো করে মুখে চোখে বুলিয়ে দিচ্ছে উষ্ণ পরশ।

এই পথ যদি না শেষ হয়? 
 
মানিকছড়ি পার হলে শুরু হলো পাহাড়ি রাস্তা। দু'পাশে পাহাড়, টিলা। টিলার ঢালে সবুজের সমারোহ। মাঝখান দিয়ে রাস্তা। এরকম পথে চলতে আমার এত ভালো লাগে, এজন্যই আমি শত শত মাইল পাড়ি দিয়ে বারবার ফিরে আসি পাহাড়ের কোলে। অদ্ভুত সুন্দর আঁকাবাকা আর উঁচুনিচু এইসব নির্জন রাস্তায় এলেই গলা ছেড়ে গাইতে ইচ্ছে হয়- এই পথ যদি না শেষ হয়!! তবে কেমন হত, তুমি বলতো!! (তবে শেষ পর্যন্ত গলা ছাড়লাম না। নিজেকে কন্ট্রোল করেছি আরকি! বিকজ, আমার গানের গলা এতই মধুর যে, সুরের মূর্ছনায় রাস্তার সবকিছু থেমে যেতে পারে, ইউ নো!!)

টেনশন টেনশন!!
 
খাগড়াছড়ি নেমে নামায আর খাওয়া সেরে আমরা উঠলাম পাহাড়ী পথের জন্য বিশেষ জীপ- চান্দের গাড়িতে। শুরু হলো চান্দের গাড়ির দুরন্ত গতির সাথে আমাদের রোমাঞ্চকর যাত্রা। আমরা জানতাম যে দীঘিনালা থেকে সেনাবাহিনীর এসকর্ট টীম সাজেক যায় বিকেল সাড়ে তিনটায়। কিন্তু খাগড়াছড়িতে নেমে জানা গেল সময়টা এখন এগিয়ে আনা হয়েছে। সেনাবাহিনীর টীম যাবে পৌনে তিনটায়। অর্থাৎ এর মধ্যে দীঘিনালা পৌঁছতে না পারলে আজ আমাদের সাজেক যাওয়া হবে না। বাস মিস করা সেই চারজন অলস পরের বাসে রওনা দিয়েছিল। তারা এসে পৌঁছতে পৌঁছতে আরো কিছুটা দেরি হয়ে গেল। সবাই কিছুটা টেনশন বোধ করতে লাগলাম। তবে কি তীরে এসে ডুবে যাবে তরী?
অবশেষে ঘুমকাতুরে অলসরা এসে পৌঁছলো। আর দেরি নয়। উল্কার বেগে ছুটলো চান্দের গাড়ি। গন্তব্য সাজেক, যেখানে মেঘের ওপর বাড়ি। 

পথে পথে চেকপোস্ট! 
 
আমাদের গাড়ি যখন আর্মি ক্যাম্পের কাছে পৌঁছলো, ততক্ষণে অন্যসব গাড়ি নিয়ে সেনাবাহিনীর টিম রেডি হয়ে গেছে। আর পাঁচ মিনিট দেরি করলেই মিস হয়ে যেত আজকের এসকর্ট। পর্যটকদের নিয়ে ৩৮ টি গাড়ির দীর্ঘ বহর এগিয়ে চললো সাজেকের উদ্দেশ্যে। দীর্ঘ পাহাড়ী পথ। আর পথে পথে চেকপোস্ট। কখনো সেনাবাহিনীর, কখনো বিজিবির, কখনো পুলিশের। মাঝে মাঝে কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছিলো, এ কি নিজের দেশে আছি? এখনো এতটা অনিরাপদ রয়ে গেছে পার্বত্য অঞ্চল! 
কিছুদূর এগিয়েই উঠে পড়লাম গাড়ির ছাদে। হাওয়ার বেগে ছুটছে গাড়ি। আর হাওয়ায় উড়ছে আমাদের মন।



উড়ু উড়ু মন নিয়ে চান্দের গাড়ির ছাদে

দীঘিনালা পেরিয়ে বাঘাইহাট। পথে কাচালং নদী, কাচালং বাজার, মাসালং বাজার। আঁকাবাকা আর উঁচুনিচু রাস্তা, তবে বান্দরবানের মত অতটা ভয়ংকর নয়। বলতে গেলে, সত্যিকারের এডভেঞ্চারারদের কিছুটা খারাপও লাগতে পারে। বিশেষ করে যারা আগেই বান্দরবানের গহীনে ঘুরে এসেছেন তাদের কাছে সাজেকের পথ হয়তো নতুন কোন অনুভূতি জাগাবে না। নতুন যা, রাস্তার পাশে প্রায় প্রতিটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে উপজাতি শিশুরা আমাদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়াচ্ছিলো। ওরা কী বলছিলো শোনা যায় নি। তবে আমরা নিজেরাই ভেবে নিলামঃ নিশ্চয় ওরা বলছে- "ডিয়ার ট্রাভেলার্স, ওয়েলকাম টু সাজেক"!!!



সতর্কবানী


পাহাড়চূড়ায় পূর্ণিমা স্নান
 
সাজেকে যখন পৌঁছলাম তখন সূর্য ডুবি ডুবি করছে। রুইলুই পাড়ায় আমাদের জন্য বুক করা কটেজ "মেঘালয়" তে ব্যাগপত্তর রেখে বেরিয়ে পড়লাম দূর পাহাড়ের দেশে অস্তগামী সূর্যকে বিদায় জানাতে।



সাজেকের প্রবেশমুখ

আরো উত্তরে হেঁটে গেলে পাওয়া গেল মসজিদ। সেখানেই মাগরিব এবং এশার নামাজ পড়লাম। পুবের আকাশে তখন অন্য দৃশ্য। ভোরের সূর্যের মত লাল হয়ে উঠে আসছে পূর্ণিমার চাঁদ। পাহাড়ের চূড়ায় মেঘ, তার ওপরে চাঁদ।

রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে রাত ন'টা পর্যন্ত চললো আমাদের খুনসুটি আড্ডা। ধীরে ধীরে আরো উজ্জ্বল, আরো সুন্দর, আরো মোহিনী রুপ ধারণ করলো চাঁদের আলো। হাজার ফুট উপরে, পৌষের প্রথম রাতে হিম হিম বাতাসে, এ যেন অদ্ভুত পূর্ণিমা স্নান। এ যেন মুগ্ধতার নতুন মাত্রা।

মেঘের ওপর বাড়ি
 
রাতে খেয়েদেয়ে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম। সারাদিনের ভ্রমণের ক্লান্তি আর পাহাড়ের নীরব নিস্তব্ধতায় জম্পেশ ঘুম হলো। ভোরে উঠেই দৌড়। মসজিদে ফযরের নামায পড়ে আমরা উঠে এলাম সাজেকের হেলিপ্যাডে। দু'পাশে পাহাড়ী খাদ মেঘে মেঘে ভরে আছে। প্রথমবার মেঘের ওপরে উঠেছিলাম বিমানে। এবার মেঘের ওপর উঠেছি পায়ে হেঁটে!! ভাবতেই অন্যরকম অনুভূতি হলো।




হেলিপ্যাডের নিচে জমাট বেঁধে আছে সাদা মেঘের দল

সূর্যের তাপ আরেকটু বাড়লে আমরা গাড়ি নিয়ে রওনা হলাম আরো উত্তরে কংলাক পাড়ার উদ্দেশ্যে। আরোহন করলাম কংলাক পাহাড়ে। অনেকেই হাঁপিয়ে উঠলো, কিন্তু কেওক্রাডং বিজয়ী পর্বতারোহী হিসেবে আমার কাছে এ যেন ছিল নিতান্তই ডালভাত!! বিনাক্লেশে উঠে পড়লাম কংলাক চূড়ায়। সেখানে লুসাই উপজাতির দুয়েকটা বাড়ি আছে। বাড়ির আঙিনায় তখনো জমাট মেঘ!! এ যেন সত্যিকারের- মেঘের ওপর বাড়ি।



মেঘের ওপর বাড়ি


ফেলে আসি নীলাকাশ 
 
সকাল দশটায় সাজেক থেকে ফিরতি যাত্রা। আবার সেনাবাহিনীর একটি টিম আমাদের সাথে নিয়ে যাবে দীঘিনালা পর্যন্ত। মূলত আমরাই যাবো ওদের সাথে। সেনাবাহিনীর এসকর্ট ছাড়া যাওয়া আসা করা যায় না। এবার আর ছাদে নয়। বসেছি গাড়ির পেছনের দিকে মুখ করে। সূর্যের তাপ বাড়ছে। আকাশে কোন মেঘ নেই। যতদূর চোখ যায় পাহাড় আর নীল আকাশ। এমন দিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশ বহুদিন দেখা হয়নি।
ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে পাহাড়ী পথ, আমরা এগিয়ে যাচ্ছি শহুরে জীবনে।



পেছনে ফেলে আসি নীল আকাশ

বিকেলে ঘুরলাম আলুটিলার রহস্যময় গুহায়। দিনের শেষ মুহূর্তগুলো কাটিয়ে দিলাম রিসাং ঝর্ণার গান শুনে।



রিসাং ঝর্ণার গান

সূর্য ডুবে গেলে সাঙ্গ হলো এবারের খেলা। অন্ধকারে ডুবে গেল পাহাড়, মেঘ, ঝর্ণা আর দিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশ।

শুক্রবার, ১২ আগস্ট, ২০১৬

সিলেটের পথে পথে

ভররাত্রে ভানুগাছে !

কথা ছিল শ্রীমঙ্গলে নামবার । কিন্তু ট্রেনেই আমাদের প্ল্যান চেঞ্জ হয়ে গেল । স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেল, মাধবপুর এবং লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের সবচেয়ে কাছাকাছি হবে ভানুগাছ স্টেশন । অতএব আমরা এখন ভানুগাছেই নামবো ! সারারাত ঘুমাইনি । গল্পগুজব করেই কেটে গেল কয়েকটা ঘন্টা । শ্রীমঙ্গল আসার আগেই চেয়ার ছেড়ে এসে দাঁড়িয়েছি ট্রেনের দরজায় । হুহু বাতাস এসে লাগছিল শরীরে । দুপাশে গাছ আর গাছ । যেন বনের ভেতর দিয়ে চলছে ট্রেন । একটা অসাধারণ ভ্রমণের রোমাঞ্চ শুরু হলো সেখান থেকেই । তারপর যেই কথা সেই কাজ । রাত তিনটায়, বলা চলে ‘ভররাত্রে’ই আমাদের ভানুগাছ স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে সিলেটের উদ্দেশ্যে চলে গেল উপবন এক্সপ্রেস । আমরা নেমে পড়লাম ‘পথে’ । বাকি দিনগুলো আমরা যেভাবে ঘুরে বেড়িয়েছি তাকে কোন ভ্রমণ না বলে ‘পথে পথে ঘুরে বেড়ানো’ বলাই বেশি যুক্তিযুক্ত । হুম । সিলেটের পথে পথে ।

চা বাগানের ভোর

সিলেট মানে চা বাগান । অতএব শুরুটা অবশ্যই হতে হবে চা বাগান দিয়েই। কাছাকাছি রয়েছে ন্যাশনাল টি এস্টেট এর চা বাগান । চা বাগানের ভেতর লেক । মাধবপুর লেক । কিন্তু এই রাত তিনটায় তো আর সেখানে যাওয়া যায় না! অতএব ভানুগাছ স্টেশনে হাত মুখ ধুয়ে গরম পরোটা ডিম ডাল আর চা খেয়ে পেটকে বশে আনলাম । ফযরের আজান হলে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে একটা সিএনজি ভাড়া করলাম আমরা । তখন ভোর ছয়টা। সিএনজি ছুটছে গ্রামের পথ ধরে । দুপাশে মাঠ, ধানক্ষেত, পুকুর, দীঘি । ভোরের শীতল স্নিগ্ধ হাওয়ায় জুড়িয়ে যাচ্ছিলো শরীর। ছোট একটা নদীও দেখলাম একেবেঁকে চলে গেছে । অনেক অনেক দিন পর এমন দৃশ্য দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল আমাদের । অফিসিয়ালি চা বাগানে ঢোকার সময় সকাল আটটার পর হতে । অতএব এই ভোরবেলায় গার্ডকে অনুরোধ করে আমাদের ঢুকতে হলো ভেতরে । চা বাগান, ভেতরের লেক দুটোই অনেক সুন্দর । লেকটা অনেকটা বান্দরবানের বগা লেকের মত লাগলো ।




মাধবপুর লেকে ফুটে আছে শাপলা শালুক ।


উল্লুকের অভয়ারণ্যে !

ঘন্টাখানেক সেখানে কাটিয়ে গাড়ির মুখ ঘোরাই লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের দিকে । পথে চা নাস্তা খেয়ে নিলাম । স্থানীয়দের সাথে আলাপ করলাম। লাউয়াছড়ায় যখন পৌঁছলাম তখন সকাল সাড়ে আটটা। অফিসিয়ালি টিকেট নিয়ে ঢোকার সময় নয়টার পর হতে। দেখলাম আরো অনেকেই ঢুকে পড়ছে টিকেট ছাড়াই । কারণ, কাউন্টারে কেউ নেই । আমরাও কালবিলম্ব না করে ঢুকে গেলাম লাউয়াছড়ার বনে । পরে টিকেট নেয়া যাবে । অবশ্যই- পায়ে হেঁটে ! পথের দুপাশে গাছ । মাঝখানে ইট বিছানো রাস্তা । ততক্ষণে আকাশে সূর্য তাপ ছড়াচ্ছে । বনের ভেতর যেন আলো আধারির খেলা । হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছলাম গিয়ে রেললাইনে । লাউয়াছড়ার ভেতর দিয়ে চলে গেছে রেললাইন । কথিত আছে, জুলভার্নের বিখ্যাত সিনেমা Round the world in 80 days এর এক অংশের শুটিং হয়েছিল এখানে ।



মাননীয় উল্লুক মহাশয় !


এই বনের সৃষ্টি বৃটিশদের হাতে, সেই ১৯২৫ সালে । পরে এই বনকে জাতীয় উদ্যান ও অভয়ারণ্য ঘোষণা করে সরকার। বানর, আর উল্লুকের দেখা মিললেও অন্য কোন প্রাণির অবশ্য দেখা পাওয়া গেলনা । তবে এখানে নাকি দুএকটি হরিণ, অজগর আর অনেক রকম সাপ আছে । কয়েকদিন আগেই নাকি এক অজগর সাপ একটা সম্পূর্ণ হরিণ গলাধঃকরণ করেছিল ! ভেতরে আছে জরাজীর্ণ কয়েকটি অফিস ঘর । টিলার ওপরে একটি দোকান। একটি বাংলো । একটি মসজিদও আছে । ঘন্টা দুয়েক ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে আরো অনেকক্ষণ কাটিয়ে দিলাম মসজিদের বারান্দায় । লাউয়াছড়ায় একটি ডরমিটরি আছে যেটা নাকি গবেষকদের বা স্টুডেন্টদের থাকার জন্য । কিন্তু সেখানে গিয়ে হতাশ হলাম । বিদ্যুৎ সংযোগ নেই । অতএব, রাতে থাকা সম্ভব নয় ।

গন্তব্য মাধবকুন্ড!

আবার বেরিয়ে পড়লাম পথে । ছোটবেলায় মাত্র দুটো ঝর্ণার কথা জানতাম । চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড আর মৌলভীবাজারের মাধবকুন্ড । সীতাকুন্ড দেখা হয়ে গেছে সাত বছর আগেই । এবার লক্ষ্য মাধবকুন্ড । এতক্ষণে প্রায় দুপুর হয়ে গেছে । বন থেকে বেরিয়ে আবার সিএনজিতে উঠলাম আমরা । এবার ‘লোকাল’ যাত্রী হিসেবে । বিকজ, সিএনজি রিজার্ভ নিতে গেলেই আকাশচুম্বি দাম চেয়ে বসে । সিএনজিওয়ালাদের ধারণা, পর্যটক মানেই একেকটা টাকার গাছ ! চাইলেই কেল্লা ফতেহ ! সিএনজি চললো । আমরা এলাম সমশেরনগর । সেখান থেকে কুলাউড়া । তারপর জুড়ী পার হয়ে কাঠালতলী হয়ে মাধবকুন্ড । বিকেল হয়ে গেছে এতক্ষণে । সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত মাধবকুন্ডের শীতল পানিতে শরীর ডুবিয়ে শুয়ে থাকলাম ।




মাধবকুন্ড জলপ্রপাত ।


মনে হলো মাধবকুণ্ডকে বেশ যত্ন করে ‘পর্যটন কেন্দ্র’ হিসেবে সাজানো হয়েছে । বাংলাদেশের বেশিরভাগ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জায়গাগুলি অবহেলায় পড়ে আছে । সেই তুলনায় মাধবকুন্ড যথেষ্টই সমাদর পেয়েছে বলতে হয়। আফসোস হলো, যেখানটায় ঝর্নার পানি পড়ছে, সেখানে যাওয়া নিষিদ্ধ । পানিতে ডুবে কয়েকজনের মৃত্যুর পর এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে । ওখানে নাকি পানির গভীরতা অনেক । সন্ধ্যা যখন হয় হয় তখন আমরা মাধবকুন্ডের মায়া ত্যাগ করে চলে এলাম কাঠালতলী । মাধবকুন্ড হতে কাঠালতলী বাজার, মাত্র ৭-১০ মিনিটের রাস্তা । সিএনজি ভাড়া লাগলো আড়াইশ টাকা ! মাধবকুন্ডের এই এলাকায় সিএনজিচালকরা একটা বিশেষ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে ।

হাওরে ভাসাই ভেলা

কুলাউড়া পার হয়ে জুড়ী উপজেলায় ঢুকতেই চোখে এসেছিলো দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি । যতদূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি । এ আবার কোন্‌ সমূদ্র? সিলেটে তো সাগর আছে বলে জানতাম না ! জানা গেলো, এটাই হাকালুকি হাওর । অতএব আমাদের পরিকল্পনায় যোগ হলো হাওর দর্শন । সিলেটে এসে হাওর না দেখে ফিরে যাবো? তা অয় না মিয়া । বড়লেখায় এক হোটেলে রাত কাটিয়ে পরদিন নামলাম হাওরের পথে । বড়লেখা হতে সিএনজি ভাড়া করে যেতে হলো ঘন্টাখানেকের পথ । সেখানে নৌকা ভাড়া করে হাওরের ঘোলাজলে ভাসতে লাগলাম আমরা ।



হাকালুকি হাওর ।


জাফলং কতদূর?

পরবর্তী গন্তব্য জাফলং । দুপুরের পরপর সিএনজি নিয়ে জাফলং এর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম । কিন্তু কোথায় জাফলং? কতদূর ? জানা নেই । এবার আমাদের রাস্তা চেনানোর দায়িত্বভার চাপালাম গুগল ম্যাপের কাঁধে । দাসের হাট হয়ে বিয়ানীবাজার । সেখান থেকে দুবাগ, তারপর শাহবাগ । তারপর সুরমা ব্রীজ পেরিয়ে আমরা পৌঁছলাম কানাইঘাট । ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে গেছে প্রায় । কানাইঘাটে খাওয়া দাওয়া করে শুরু হলো আরেক যাত্রা । পার্বতীপুর, দুর্গাপুর হয়ে গেলাম দরবস্ত বাজার । সেখান থেকে জৈন্তাপুর । জৈন্তাপুরে শুরু হলো সিলেটের চিরাচরিত ভর বর্ষণের রাত । এরইমধ্যে এলো জাফলং এর উদ্দেশ্যে রাতের সবশেষ বাস । উঠে পড়লাম আমরা । বাস চললো জাফলং এর উদ্দেশ্যে । রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ । বাইরে প্রবল বৃষ্টি, জানালা দিয়ে গায়ে লাগছে বৃষ্টির ছাট । গাড়ি দুলছে রোলার কোস্টারের মত । ভেতরে আমরা, যেন এগিয়ে যাচ্ছি অজানার উদ্দেশ্যে । অজান্তেই মনে এলো পুরনো সেই গান - এই পথ যদি না শেষ হয়... তবে কেমন হত... তুমি বলতো !! হঠাৎ মনে হলো- জীবনটা আসলে একেবারে মন্দ নয় !!

জাফলং এ ভোর

এই বৃষ্টির মাঝে একটা হোটেল খুঁজে বের করলাম । মামার বাজার । বিদ্যুৎ নেই । বেশ ঠান্ডাও পড়েছে । এরমধ্যে রাত কাটিয়ে সকালে উঠেই পায়ে হেঁটে চলে গেলাম জাফলং এ । পাথর উত্তোলনের মহাযজ্ঞ চলছে সেখানে । সামনে এগিয়ে একটা নৌকা নিলাম । ওপারে গিয়ে ঘন্টাখানেক পরে ফিরে এলাম এপারে । ফ্রেশ মাছ ভাজা হচ্ছিল তীরের এক ছাপড়া হোটেলে । গরম ভাত, টাটকা মাছ ভাজা আর কাঁচামরিচ । ভোজনটা হলো অমৃত সমান । পরবর্তী গন্তব্য সারিঘাট- লালাখাল ।




জাফলং নদী ।

লালাখালে এক মধ্যাহ্ন !

সারি নদীর ঘাটে নেমে আমরা চললাম লালাখালে । বাহন – অটোরিক্সা । প্রবল বর্ষণে লালাখালের পানির স্বচ্ছতা অনেকাংশে কমে গেছে । লালাখাল আমাদের খুব একটা মুগ্ধ করতে পারলো না । এর আরেকটা কারণ হতে পারে- রাঙামাটি আর কাপ্তাইয়ের লেকে ঘুরে ঘুরে আমাদের নজরটা হয়ে উঠেছে নাকউঁচা । অতএব সময়ের বড় অংশটা কাটলো নাজিমগড় রিসোর্টে । ততক্ষণে দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল । আমাদের যেতে হবে আরো বহুদূর । গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি নেমেছে । আর বসে থাকা যায় না ।




লালাখাল ঘাট ।


গোয়াইন নদীর বুকে

সারিঘাট থেকে গেলাম গোয়াইনঘাটে । গন্তব্য রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট । সড়কপথে যাওয়া যায় । কিন্তু আমরা যাব নদীপথে । ঘাটে গিয়ে সৌভাগ্যক্রমে এক বিরাট ট্রলার ভাড়া পেলাম মাত্র ছয়শ টাকায় । মাত্র বলছি এ কারণে- প্রায় দুইশ জনের ধারণক্ষমতা সম্পন্ন এই ট্রলারের ভাড়া কমপক্ষে এক দেড় হাজার টাকা হবার কথা । কিন্তু মাঝি যাবে বাড়িতে- সোয়াম্প ফরেস্টের পাশেই । আর আমরা হলাম তাঁর ফিরতিপথের যাত্রী । তখন পড়ন্ত বিকেল । গোয়াইন নদীতে এগিয়ে চলেছে ট্রলার । বাইরে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি । কখনো কখনো তা রুপ নিচ্ছে মুষলধারায় । দুধারে বাড়িঘর । কাশবন । সবুজ তীর । কোথাও কোথাও ধানক্ষেত । কৃষকের কাঁধে ধান । খুঁটিতে বাঁধা গরু ভিজছে অবিরাম বর্ষণে । কিছু কিছু পাখি ফিরে যাচ্ছে নীড়ে । কতদিন দেখিনা নদী আর গ্রামের এই চিরায়ত দৃশ্য ! এতবড় নৌকায় মানুষ মাত্র পাঁচজন । দুজন মাঝি, আর আমরা তিন বন্ধু । নৌকার খোলা ছাদে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে দুচোখ ভরে দেখছিলাম তীরের মনোরম দৃশ্য । মনে হলো- কী দরকার ঢাকা চট্টগ্রামের ইট পাথরের মাঝে ফিরে যাওয়ার? এইখানে, কোন এক নদীর তীরে জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারলে কতইনা ভালো হত ! আহা ! জীবন এখানে কত সুন্দর !




গোয়াইন তীরের বসতবাড়ি ।


সোয়াম্প ফরেস্ট !

ঘন্টা দেড়েক লাগলো সোয়াম্প ফরেস্টে পৌঁছতে । বড় নৌকা ছেড়ে এবার নিতে হলো ছোট নৌকা । থই থই করছে পানি । গাছের অর্ধেকটা পানির নিচে । গাছ গাছালির ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ছোট নৌকা । অজান্তেই মুখ হতে বেরিয়ে আসে ! অসসাধারণ ! আলহামদুলিল্লাহ ! গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি তখনো পড়ছেই । এরইমধ্যে পৌঁছে গেলাম ওয়াচ টাওয়ারে । ওয়াচ টাওয়ারেরও অনেকটা ডুবে গেছে পানিতে । মাঝি বললো- এতটা পানি নাকি কখনো থাকে না । পশ্চিম আকাশে লালচে সূর্য, যতদূর চোখ যায় পানি, আর পানিতে কোমর ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছের সারি । মিঠাপানির এমন বন পৃথিবীতে খুব বেশি নেই । শেষবেলায় পাখির কিচিরমিচির । পুরো পরিবেশটা যেন একটা অপার্থিব রুপ ধারণ করেছে ।



রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট ।


ফেরাঃ

বনে তো আর থাকা যায় না ! অতএব ফিরতেই হবে । নৌকা বেরিয়ে এলো বাইরে । গোয়াইন নদীতে । একটা সরু রাস্তার ধারে নামলাম আমরা । তারপর সিএনজি ভাড়া করে সোজা সিলেট শহরের উদ্দেশ্যে । রাতে খেলাম পাঁচভাই রেস্টুরেন্টে । আম্বরখানা থেকে শুরু করে জিন্দাবাজার মুর্দাবাজার – জামতলা তালতলা জল্লার পার কল্লার পার-মেডিকেল কলেজ রিক্সায় করে এক চক্কর দিলাম । হোটেলে রাত কাটিয়ে পরদিন গেলাম শাহজালালের মাজার, শাহপরাণের মাজার, ঐতিহাসিক ক্বীন ব্রিজ। খাওয়া দাওয়া হলো নামকরা দুএকটি রেস্টুরেন্টে ।
ও হ্যা, বিছানাকান্দি আমরা যাই নি । কক্সবাজার সেন্টমার্টিনের প্রবাল দ্বীপ আর রাঙামাটি বান্দরবানের ছড়ায়-ঝর্ণায় ঘুরে বেড়ানো আমাদের কাছে বিছানাকান্দি খুব একটা আকর্ষণীয় কিছু মনে হয় নি । আর হামহাম যাবার মত সময় ছিলনা হাতে । ইচ্ছে ছিল ট্রেনেই ঢাকা ফিরবো । কিন্তু স্টেশনে গিয়ে দেখি সেদিনের কোন ট্রেন ঢাকা যাবে না । কী আর করা ! বাসের আসনে পিঠ এলিয়ে দিলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে । পেছনে পড়ে থাকলো সিলেট, মৌলভীবাজার । সাথে নিয়ে এলাম একরাশ সুখস্মৃতি ।

শনিবার, ১৬ আগস্ট, ২০১৪

রুমাকে ভালোবেসেছিলাম

ক্ষেত্র ফল শূন্য

চান্দের গাড়ি থেকে রুমা বাজারে নেমেছি , এদিক ওদিক তাকাচ্ছি । এরই মাঝে ছোটখাটো চেহারার লুঙ্গি- শার্ট পরা একজন এসে জিজ্ঞেস করলো- আপনারা কোথায় যাবেন ? বললাম , আমরা বগা লেক যাবো । কেওক্রাডং যাবো । রাইখ্যং লেক যাবো ।
সে বললো- আমি আপনাদের গাইড !
আমরা তো অবাক । বলা নেই কওয়া নেই, আমাদের পছন্দ অপছন্দের বালাই নেই - সে নিজে নিজেকে আমাদের গাইড নিয়োগ দিয়ে ফেললো !
আমরা বললাম , আপনার নাম কী ?
উত্তরে সে বললো, ক্ষেত্র বাবু ।
আমরা বললাম , আমরা তো বেলাল গাইডকে খুঁজছি ।
ক্ষেত্র জানালো, বেলাল নাই । অন্য টুরিস্ট নিয়ে পাহাড়ে গেছে । আমিই আপনাদের গাইড ।

গাইডদের সমিতি আছে , সমিতির অফিসে গেলাম আমরা । ক্ষেত্রবাবুই নিয়ে গেল । ওটাই নিয়ম । কোন গাইড যদি পর্যটক নিয়ে পাহাড়ে যেতে চায়, তাকে প্রথমে গাইড অফিসে রিপোর্ট করতে হবে । গাইড সমিতির সেক্রেটারির সাথে দেখা হলো সেখানে । গাইডদের ফি কেমন সেটা জানলাম । বগালেক পর্যন্ত গেলে দিনপ্রতি পাঁচশ টাকা । আর বগালেক পার হলে প্যাকেজ বিল পাঁচহাজার টাকা । গাইডের থাকা খাওয়ার বিল টুরিস্টের ।
গাইড সমিতির সেক্রেটারি জাকির সাহেব জিজ্ঞেস করলেন , আমরা এই গাইডকে পছন্দ করেছি কিনা ।
আমরা বললাম , আমরা তো গাড়ি থেকে নামার পর উনাকে পেয়েছি । কিন্তু আমরা আসলে বেলাল নামে একজনকে খুজছিলাম । সে আমাদের পরিচিত । আমাদের বন্ধুদের গাইড হিসেবে আগে সে কাজ করেছে ।
ক্ষেত্রবাবু বললেন, আমি এদের প্রথমে ‘ধরেছি’, আমিই গাইড হবো !
আমরা বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়লাম । এরই মাঝে বেলাল চলে এলো । কেউ একজন তাকে খবর দিয়েছে যে আমরা তার খোঁজ করছি । বেলালকে দেখেই আমাদের পছন্দ হলো । প্রায় আমাদের সমবয়সী । ইয়াং, এনার্জেটিক ম্যান । ওকে নিয়ে দীর্ঘ পথ হাঁটা সম্ভব । ওদিকে ক্ষেত্র বাবু মধ্যবয়স্ক , দুর্বল মানুষ । তারওপর এরই মধ্যে আমরা জেনে গেছি- ক্ষেত্রবাবু আসলে একজন মাদকাসক্ত । তার কাজকর্মের ঠিক নাই । এর আগেও পর্যটক নিয়ে গিয়ে সে ভজঘট করেছিল ।

আমরা এরপর গেলাম আর্মি ক্যাম্পে । পাহাড়ে রওয়ানা দেবার আগে অবশ্যই আর্মি ক্যাম্পে গাইডসহ রিপোর্ট করতে হয় । সেখানে সৈনিকদের সাথে বেশ কিছুক্ষণ গল্প করলাম আমরা । আমাদের ডাক্তার পরিচয় দিলাম , আর্মিতে থাকা আমাদের বন্ধুদের পরিচয় দিলাম ।
বেলাল এবং ক্ষেত্রবাবু দুজনেই আমাদের সাথে এসেছে । এখানেই চূড়ান্ত ফায়সালা হবে – কে হবে আমাদের গাইড । আর্মির সিপাহী আমাদের জিজ্ঞেস করলেন – আপনারা কাকে নিতে চান ? আমরা বললাম – বেলালকে ।
ক্ষেত্রবাবু বললে – আমি আগে ধরেছি , আমিই গাইড হবো ।
সিপাহী বললেন – এখানে ধরাধরির তো কিছু নাই । ট্যুরিস্ট যাকে পছন্দ করবে- সেই হবে গাইড ।
আর্মি ক্যাম্পের রেজিস্টার খাতায় আমরা আমাদের পাঁচজনের নাম ঠিকানা লিখলাম । বেচারা ক্ষেত্রবাবুর গাইড হওয়া হলো না ।
ক্ষেত্র হলো ফলশূন্য !  


আমরা হলাম ‘বন্দু’


গাইডের সাথে পরামর্শ করে আমরা পাহাড়ে আগামী চারদিনের খাওয়ার জন্য চাল ডাল তেল মরিচ পেঁয়াজ কিনলাম । পাহাড়ে হাঁটার জন্য কিনলাম বিশেষ ধরণের প্লাস্টিকের স্যান্ডেল । দাম দেড়শ টাকা প্রতি জোড়া । দুপুরের খাওয়া খেয়ে নিলাম একটা হোটেলে । খারাপ না । একটা ল্যান্ড রোভার ভাড়া করলাম বগা লেক পর্যন্ত । আড়াই হাজার টাকা । সব ব্যবস্থা অবশ্য আমাদের সাথে পরামর্শ করে গাইডই করছিলো ।
কিছুক্ষণের মধ্যেই খেয়াল করলাম – আমাদের গাইড বেলাল সবাইকে ‘বন্দু’(উচ্চারণটা ‘বন্ধু’ নয় কিন্তু ! ) বলে সম্বোধন করছে !  বুঝলাম , পাহাড়ে ‘বন্দু’ সম্বোধনটা বেশ চলে । যে কয়দিন পাহাড়ে আছি, আমরা এদের ‘বন্দু’ হয়েই থাকবো !
  
পথের বাপই বাপরে মনা...


মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করে বের হবার পর বন্ধুরা বেশ বিচ্ছিন্নই হয়ে পড়েছিলাম । মান্না দে'র 'কফি হাউজ'  গানের মত । নিখিলেশ প্যারিসে, মইদুল ঢাকাতে । আমরা ছিলাম কেউ ঢাকায় , কেউ চট্টগ্রামে, কেউ ফেনীতে । ছাত্র থাকা অবস্থায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রায় সবখানেই ঘুরেছি । বান্দরবানেও গেছি , কিন্তু চিম্বুক পর্যন্ত । বগা লেকটা যাওয়া হয়নি । কেওক্রাডং বিজয় বাকি ছিল ।  এবার বের হয়েছি সেই অভিযানে । এপ্রিলের আট তারিখ ঢাকা থেকে আমি এবং মাসুম গিয়ে পৌঁছলাম চট্টগ্রামে । সেখানে রাতে থেকে বন্ধু জনি, জুয়েল এবং ইয়াসিনকে সাথে নিয়ে ভোরবেলা বহদ্দারহাট বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে উঠে পড়লাম বান্দরবানের বাসে । তখন সকাল সাড়ে সাতটা প্রায় । সকালের নাস্তা বাসেই করলাম । বাসভাড়া জনপ্রতি ১১০ টাকা ।
এগারোটা নাগাদ আমরা পৌঁছে গেলাম বান্দরবান শহরে । সেখানে আমাদের দুবছরের জুনিয়র সাইফের বাসা । সেসময় সাইফ বাসাতেই ছিল, ওকে ফোন করে ডেকে নিলাম । আরেকদফা নাস্তা করে আমরা সাইফের সাহায্যে একটা চান্দের গাড়ি ভাড়া করলাম রুমা বাজার পর্যন্ত । চান্দের গাড়ি হলো পাহাড়ে চলার উপযোগী খোলা জিপ । ভাড়া ২২০০ টাকা লাগলো । বান্দরবান থেকে আমাদের বিদায় দিল সাইফ ।

বান্দরবান থেকে রুমা বাজারের পথটাও অসাধারণ । আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথ । গাড়ি চলেছে ঝড়ের বেগে । আর আমরা গাইছি – পথের বাপই বাপরে মনা ... পথের মা-ই মা ! পথের মাঝেই খুঁজে পাবি, আপন ঠিকানা !
দুপুর একটা নাগাদ পৌঁছে গেলাম রুমা বাজারে ।

পা পিছলে আলুর দম !


রুমা বাজার পার হয়ে কিছুদূর পরেই পুলিশ চেক পোস্ট । পুলিশ চেক পোস্টেও রিপোর্ট করতে হয় । একটা লেকের ওপর পুলিশ চেক পোস্টটি । আমরা ওখানে নেমে আবার আমাদের নামধাম লিখে দিলাম । গাড়ি আবার ছুটলো আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথে । চরম রিস্কি পথ । গাড়ির চাকা পিছলে গেলেই অক্কা পাবার সমূহ সম্ভাবনা । গাড়ি গিয়ে পড়বে গভীর খাদে । দূরে দেখা যাচ্ছে আঁকাবাঁকা সাঙ্গু নদী । শো শো বাতাস । সে এক অন্যরকম অনুভূতি ।


পাহাড়ের ফাঁকে বয়ে চলেছে সাঙ্গু নদী ।পাহাড়ের ফাঁকে বয়ে চলেছে সাঙ্গু নদী ।

প্রায় দুঘন্টা পর আমরা বগালেকের নিচের পাহাড়ে এসে পৌছলাম । এখান থেকে আরো আধা ঘন্টার পথ ।
বগা লেকের নিচ থেকে ওঠা এই রাস্তাটা আরো বেশি রিস্কি । প্রায় ৬০ ডিগ্রি খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে গাড়ি উঠবে । মনে হবে যেন গাড়ি উল্টেই যাবে ! আমরা সবাই শক্ত করে গাড়ির সিট ধরে রেখেছি । মনে হচ্ছিলো যেন ঝুলে আছি । লা ইলাহা ইল্লা আনতা সোবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাজ জোয়ালেমিন দোয়া পড়ছি । এরই মাঝে একবার একটা বাঁক নেয়ার সময় গাড়ি আটকে গেল ! গাড়ির চাকা শুন্যের ওপর ঘুরতে লাগলো । এখন যদি গাড়ি পেছনের দিকে পড়ে যায় – কমপক্ষে দুই হাজার ফুট নিচে গিয়ে পড়বে ।
আমরা কালেমা পড়া শুরু করলাম ।



কয়েক মিনিট পরে আল্লাহর রহমতে কীভাবে যেন আবার গাড়ি সামনে এগুতে শুরু করলো । অল্পের জন্য আমরা পা পিছলে ‘আলুর দম’ হওয়া থেকে বেঁচে গেলাম ।


অবশেষে বগা লেক  


অবশেষে যখন বগা লেকে পৌছলাম , তখন বিকেল হয়ে গেছে । ওখানে পৌঁছেও আর্মি ক্যাম্পে রিপোর্ট করতে হলো । বগা লেকের পাড়ে আমরা উঠলাম লারামের কটেজে । এখানে আরো দুএকটা কটেজ আছে ।
পাহাড়ের ওপরে ছোট ছোট ঘর বানিয়ে তৈরি করা হয়েছে পর্যটকদের জন্য এইসব কটেজ । ভাড়া যথেষ্ট কমই বলা যায়- প্রতিরাত জনপ্রতি একশ টাকা । আমাদের গাইড জানালো- এদের কাছে একশ টাকাই অনেক কিছু ।
দেখা হয়ে গেলো কটেজের মালিক লারাম দাদার সাথেও । ব্যাগপত্র রেখে আমরা লেকে নেমে গেলাম গোসল করতে ।


বগা লেকে ফুটে আছে শাপলা ফুল ।বগা লেকে ফুটে আছে শাপলা ফুল ।

বগা লেকের প্রকৃত নাম - বগাকাইন হ্রদ । স্থানীয়রা সংক্ষিপ্ত করে বগা লেক বলে থাকে । অবশ্য তাদের বাংলা এক্সেন্টে এটার উচ্চারণ শোনায় 'বুগা লেক' !  পাহাড়ের ওপরে এতবড় একটা লেক, আশ্চর্যই বটে । এটি  বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উচ্চতার স্বাদু পানির একটি  হ্রদ ।  বান্দরবান  শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে বগাকাইন হ্রদের অবস্থান ।  কেওকারাডং পর্বতের গা ঘেষে, রুমা উপজেলায় । সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ১,৫০০ ফুট ।


উপর হতে বগা লেকের চিরসবুজ দৃশ্য ।উপর হতে বগা লেকের চিরসবুজ দৃশ্য ।

বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিকদের মতে বগাকাইন হ্রদ মৃত আগ্নেয়গিরির  জ্বালামুখ অথবা মহাশূন্য থেকে উল্কাপিন্ডের পতনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে আবার ভূমিধ্বসের কারণেও এটি সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করেন । বগা লেকের পানি সুপেয় । লেকের জলে প্রচুর শ্যাওলা, শালুক, শাপলা ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ এবং প্রচুর মাছ রয়েছে।


বগালেকের রুপকথা


বগালেকের স্থানীয়রা বম,  মুরং বা ম্রো, তঞ্চংগ্যা এবং ত্রিপুরাসহ অন্যান্য আদিবাসী। স্থানীয় আদিবাসীদের উপকথা অনুযায়ী, অনেক কাল আগে পাহাড়ের গুহায় একটি ড্রাগন বাস করতো । বম ভাষায় ড্রাগনকে "বগা" বলা হয়। ড্রাগন-দেবতাকে তুষ্ট করতে স্থানীয়রা গবাদী পশু উৎসর্গ করতেন। কিন্তু লোকেরা এই ড্রাগন দেবতাকে হত্যা করলে চূঁড়াটি জলমগ্ন লেকে পরিণত হয় এবং গ্রামগুলোকে ধ্বংস করে ফেলে  ।

এই হ্রদটি তিনদিক থেকে পর্বতশৃঙ্গ দ্বারা বেষ্টিত। এর গভীরতা হচ্ছে ৩৮ মিটার (১২৫ ফুট)। এটি সম্পূর্ণ আবদ্ধ হ্রদ— এ থেকে পানি বের হতে পারে না এবং কোনো পানি ঢুকতেও পারে না। এর আশেপাশে পানির কোনো দৃশ্যমান উৎসও নেই। তবে হ্রদ যে উচ্চতায় অবস্থিত তা থেকে ১৫৩ মিটার নিচে একটি ছোট ঝর্ণার উৎস আছে যা বগা ছড়া নামে পরিচিত। হ্রদের পানি কখনও পরিষ্কার আবার কখনওবা ঘোলাটে হয়ে যায়। কারণ হিসেবে অনেকে মনে করেন এর তলদেশে একটি উষ্ণ প্রস্রবণ রয়েছে। এই প্রস্রবণ থেকে পানি বের হওয়ার সময় হ্রদের পানির রঙ বদলে যায়।

স্থানীয় অধিবাসীদের ধারণা এই হ্রদের আশেপাশে দেবতারা বাস করে। এজন্য তারা এখানে পূজা দেন ।

জীবনটা কত ঠুনকো !


রাতে বগা লেকের পাড়ে বসে আমরা পাঁচ বন্ধু অনেক জমানো গল্প করলাম । এক ফাঁকে হয়ে গেল জম্পেশ ঝালমুড়ি খাওয়া । নয়টার দিকে ভাত খেয়ে আমরা শুয়ে পড়লাম । শরীর ক্লান্ত ছিল সারাদিনের জার্নির শারীরিক ও মানসিক ধকলে । আর তাছাড়া পরদিন সকালেই আমাদের রওনা দিতে হবে কেওক্রাডং এর উদ্দেশ্যে ।

সকালে খুব ভোরে উঠে নাস্তা করেই আমরা আমাদের ব্যাগ কাঁধে নিলাম । কেওক্রাডং যাবার আগে আমরা হারমুন পাড়া নামে একটি পাড়ায় বিরতি দেবো । সেটাই হবে আমাদের পরবর্তী স্টেশন । ওখানে ব্যাগ রেখে কেওক্রাডং যাবো , ফিরে এসে রাতেও সেখানেই থাকবো । পরদিন সেখান থেকেই রওনা হবো রাইখ্যং লেক – স্থানীয় ভাষায় 'পুকুর পাড়ে'র উদ্দেশ্যে ।

বগা লেক থেকে কেওক্রাডং এর দূরত্ব প্রায় ১৫ কিমি । আমরা একটা ট্রাকে উঠলাম । ট্রাক যাবে হারমুন পাড়া পর্যন্ত, ৫-৬ কিলোমিটার পথ । সে আরেক ভয়ংকর জার্নি । ৬০-৭০ ডিগ্রি খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠছে ট্রাক , আবার নামছেও খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে । ভয়ে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হবার জোগাড় ।
দুর্বল চিত্তের কারো পক্ষে এই পথে গাড়িতে যাওয়া অসম্ভব । অজ্ঞান হয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে । এইসময় মনে হচ্ছিলো- জীবনটা কত ঠুনকো । যেকোন সময় এইসব পাহাড়ের কোন এক খাদে আমাদের সলিল সমাধি হয়ে যেতে পারে ।


কেওক্রাডং চূড়ায় আমরা



হারমুন পাড়ায় গিয়ে আবার কটেজ ভাড়া করলাম আমরা । একটা কাঠের ঘরের মেঝেতে থাকার ব্যবস্থা । ওখানে ব্যাগ রেখে আমরা হাঁটা শুরু করলাম কেওক্রাডং এর উদ্দেশ্যে ।

একের পর এক পাহাড় পেরিয়ে হাঁটছি তো হাঁটছি । মাঝে মাঝে জিরিয়ে নিচ্ছি । সবাই হাতে একটা করে লাঠি নিয়েছি । হাঁটার সময় লাঠিটা অনেক মানসিক শক্তি যোগায় ।

চলছি পাহাড় ডিঙ্গিয়ে কেওক্রাডং এর পথে । লেখক কালো পোষাকে ।চলছি পাহাড় ডিঙ্গিয়ে কেওক্রাডং এর পথে । লেখক কালো পোষাকে ।

পথে পড়লো দার্জিলিং পাড়া । দার্জিলিং পাড়ায় বম উপজাতিদের বাস । ধর্মে তারা খ্রিস্টান । বমরা অন্যান্য উপজাতির তুলনায় বেশ অগ্রসর । বমদের নিজস্ব ভাষা আছে । তবে নিজস্ব বর্নমালা নেই । ইংরেজী বর্ণমালাতেই বম ভাষায় লিখতে হয় । খ্রিস্টান মিশনারীরা বম ভাষায় বাইবেল ট্রান্সলেট করে দিয়েছেন ।


দার্জিলিং পাড়ায় বম ভাষায় লিখিত একটি নোটিশ ।দার্জিলিং পাড়ায় বম ভাষায় লিখিত একটি নোটিশ ।

দার্জিলিং পাড়ায় বসে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিলাম । প্রত্যেক পাড়ায় একটা করে দোকান আছে পাহাড়িদের । দোকানে বসে পাহাড়ী কলা খেলাম পেট পুরে । সাথে ঝালমুড়ি । ক্যাসেট প্লেয়ারে একটা গান বাজছিল – ঝিরি ঝিরি লাসাই লাসাই... এই কথাটা কেন যেন মাথায় ঢুকে গেল । বাকি পথটা আমরা বম ভাষার এই গানের কলি আওড়াতে আওড়াতে হাঁটতে লাগলাম ।

দার্জিলিং পাড়া পার হয়ে কেওক্রাডং । দুপুর বারোটা নাগাদ আমরা পৌঁছে গেলাম কেওক্রাডং চূড়ায় । উড়িয়ে দিলাম বাংলাদেশের পতাকা ।


কেওক্রাডং পর্বতের ঢালে এভাবেই লেখা আছে তার নাম ।কেওক্রাডং পর্বতের ঢালে এভাবেই লেখা আছে তার নাম ।

কেওক্রাডং বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। এক সময় এটিই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ ছিল । আমরা ছোটবেলায় বই-পুস্তকে এটার কথাই পড়েছি । তবে বর্তমানে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ তাজিং ডংকে ধরা হয় । যদিও বাংলাদেশের বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক এবং সিআইএ ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুকে এখনও একে সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

বান্দরবান জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী কেওক্রাডং এর উচ্চতা ৪৩৩০ ফুট । কেওক্রাডং চূড়ায় একটি সেনা ক্যাম্প আছে । সেনাবাহিনীর ফলকে কেওক্রাডং এর উচ্চতা লেখা হয়েছে- ৩১৭২ ফুট ।
কেওক্রাডং শব্দটি মারমা ভাষা থেকে এসেছে। মারমা ভাষায় কেও  মানে 'পাথর', ক্রো  মানে 'পাহাড়' আর এবং ডং  মানে 'সবচেয়ে উঁচু'। অর্থাৎ কেওক্রাডং মানে সবচেয়ে উঁচু পাথরের পাহাড়।


কেওক্রাডং পেরিয়ে


কেওক্রাডং বিজয় শেষে আমরা রওনা হলাম কেওক্রাডং পেরিয়ে আরো সামনে । পাসিং পাড়া । পাহাড়ের পাড়া গুলো সাধারন লোকালয়ের মত নয় । এসব পাড়ায় ১০ থেকে সর্বোচ্চ ২০ টি পরিবার থাকে । পাসিং পাড়ায় আছে ১৮ টি পরিবার । পাসিং পাড়ার প্রতিষ্ঠাতা পাসিং দাদার সাথে দেখা হল । কথাও হলো । তার বাসায় বসে আমরা আবার ঝালমুড়ি এবং পাহাড়ি কলা দিয়ে পেটপুজো করলাম । প্রায় ঘন্টাখানেক রেস্ট নিয়ে ফিরতি পথ ধরলাম হারমুন পাড়ার উদ্দেশ্যে ।

হারমুন পাড়ায় এসে গোসল করার জন্য আমাদের নামতে হলো পাহাড়ের নিচে ঝিরিতে । ঝিরি হলো পাহাড়ের নিচ দিয়ে প্রবাহিত ঝরণার পানির গতিপথ । সেগুলোই পাহাড়ে পানির উৎস ।
দুই আড়াই হাজার ফুট নিচে নেমে গোসল করে এলাম ।  গভীর রাত পর্যন্ত কাটালাম বারান্দায় চেয়ার পেতে । চারিদিকে নিস্তব্ধ । মোবাইলে নেটয়ার্ক নেই ।  বারবার শুধু মনে হচ্ছিল- এই পাহাড়ে , এইভাবে বসে বসে আর কি কখনো আকাশের তারা দেখা হবে ?


রাইখ্যং লেকের উদ্দেশ্যে


সকালে উঠেই নাস্তা সেরে আমরা আবার রওনা দিলাম । এবারের লক্ষ্য রাইখ্যং লেক । এবার ব্যাগসহ হাঁটতে হবে আমাদের । কারণ , আমরা আর এই পথে ফিরবো না । রাইখ্যং লেক থেকে ভিন্ন পথে আমরা চলে যাবো রুমা বাজারে ।

ব্যাগ কাঁধে, হাতে লাঠি । সারি বেঁধে গাইডসহ আমরা ছয়জন হাঁটতে লাগলাম । হাঁটছি হাঁটছি আর হাঁটছি । পাহাড় পেরিয়ে পাহাড় ।

হাঁটতে হাঁটতে পথে আরেকটি পাড়া পড়লো । মুরং অধ্যুষিত মেনতক পাড়া । মেনতক পাড়ার উঠোনে দেখলাম বেশ কিছু শূকর ছানা ঘোরাফেরা করছে । মনের আশ মিটিয়ে ওদেরকে ডাক দিলাম- ঐ শুয়োরের বাচ্চা ! এদিকে আয় !


মেনতক পাড়ায় অবাক চোখে আমাদের দেখছে মুরং শিশু ।মেনতক পাড়ায় অবাক চোখে আমাদের দেখছে মুরং শিশু ।


ঝিরিঝিরি লাসাই লাসাই


ঘন্টা তিনেক হাঁটার পর ঝিরিপথের দেখা পেলাম । পাহাড়ের ঝরণা থেকে নেমে আসা পানির গতিপথকেই ঝিরি বলা হয় । ঝিরিপথ তুলনামূলক সহজ । ঝিরির পথে ছড়িয়ে আছে বড় বড় সব প্রকান্ড পাথর । মাঝে মাঝে ছোট ছোট ডোবার মত জলাশয় । এরই একটাতে নেমে ঠান্ডা পানিতে গোসল সেরে নিলাম আমরা । আমাদের গাইড সেখানেই ঝালমুড়ির আয়োজন করলো । কলাও সাথে নিয়েছিলাম আমরা । কলা এবং ঝালমুড়ি ভোজনটা অমৃতের মত লাগলো ।

আধাঘন্টা বিশ্রাম নিয়ে আবার শুরু হলো পথচলা । ঝিরিঝিরি লাসাই লাসাই । লাসাই লাসাই মানে – ধীরে ধীরে ।

ঝিরির পথ ।ঝিরির পথ ।


রাইখ্যং লেকে


আরো ঘন্টা দুয়েক হাঁটার পর শেষ হয়ে এলো ঝিরির পথ । ভাবছেন- রাইখ্যং লেকে চলে এসেছি ? নাহ । এরপর শুরু হলো আবার পাহাড় ডিঙ্গানো । পাহাড়ের ঢাল বেয়ে পায়ে চলার পথ । পথ বললে ভুল হবে- এই পথে শুধু একজনই যেতে পারবে সতর্কতার সাথে । কোথাও কোথাও একসাথে দুইপা রাখারও সুযোগ নেই । পাশেই দুই হাজার ফুট নিচু খাদ । একবার পা পিছলে গেলে আর রক্ষে নেই । অনেক বেশি মানসিক শক্তি আর গুড লাক ছাড়া এই পথ মাড়ানো অসম্ভব ।
কিছুদূর এগিয়ে রেস্ট , আবার পথচলা । এভাবে আরো প্রায় পাঁচ থেকে ছয় ঘন্টা হাঁটতে হলো । রাইখ্যং লেকে যখন পৌঁছলাম, তখন বিকাল প্রায় চারটা বাজে । প্রায় দশ ঘন্টা হেঁটেছি । রাইখ্যং লেকের পাশে পুকুর পাড়ায় সুজন মাস্টারের কটেজে গিয়ে উঠলাম আমরা । আগের মতই, কাঠের ঘরের মেঝেতে থাকার ব্যবস্থা । প্রতিরাত জনপ্রতি একশ টাকা ভাড়া ।


গাইড দুপুরের খাওয়ার ব্যবস্থা করলো । কিছু খেয়ে নিয়েই আমরা রাইখ্যং লেকে চলে গেলাম গোসল করতে । তবে এখানেও আর্মি ক্যাম্প আছে । ওটাই বাংলাদেশের ঐ সীমানায় শেষ ক্যাম্প । নিয়ম অনুযায়ী আর্মি ক্যাম্পে আমাদের রিপোর্ট করতে হলো । সুবেদার সাহেব আমাদের দেখে বিস্মিত হয়ে বললেন – ‘আমাদের আসতেই অবস্থা খারাপ হয়ে যায়, আপনারা এলেন কী করে ?’

দূরে পুকুর পাড়া ও রাইখ্যং লেক । পাহাড়ের ওপর থেকে তোলা ছবি ।দূরে পুকুর পাড়া ও রাইখ্যং লেক । পাহাড়ের ওপর থেকে তোলা ছবি ।

রাইখ্যং লেক বগা লেকের চেয়ে বড় পরিসরের লেক । দিনাজপুরের রামসাগরের মত অনেকটা । খুব দুর্গম হওয়ায় পর্যটকরা তেমন একটা যেতে পারেন না ঐ পর্যন্ত । রাইখ্যং লেকে গোসল করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গেল । আমরা উঠে এলাম আমাদের কটেজে ।

রাইখ্যং লেকের দুরত্ব রুমা বাজার থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটারের মত । তবে পুরোটাই পাহাড়ি রাস্তা ।  পাহাড়িদের ৮-১০  ঘন্টা হাটার রাস্তা । সাধারন মানুষের লাগে ১২ থেকে ১৪ ঘন্টা ।

যারা অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করেন , সেই সাথে উঁচু নিচু পাহাড়ী রাস্তা ও খাল অতিক্রম করার শারীরিক ও মানসিক সামর্থ রাখেন তারাই কেবল রাইখ্যং যাবার জন্য প্রস্তুতি নিতে পারেন । অন্যথায় চরম বিড়ম্বনা ও ভোগান্তির শিকার হতে হবে দলের সবাইকে ।
  
ফিরতি পথেঃ চাঁদের আলোয় কয়েকজন যুবক


পরদিন ভোরে উঠেই ভাত খেয়ে নিলাম । গাইড এবং সুজন মাস্টারের বৌ মিলে রান্না করেছে । গাইডকে দিয়ে আমরা দুটি পাহাড়ি মোরগ কিনেছিলাম । বেশ ভালোই খাওয়া হলো ।
সকালে বের হয়ে এবার ভিন্ন পথে হাঁটতে লাগলাম আমরা । একের পর এক পাহাড় ডিঙ্গিয়ে চলছি, উদ্দেশ্য রুমা বাজার । আকাশে গনগনে সূর্য , পাহাড়ের পথ যখন শেষ হলো তখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে । বগা লেকের নিচে বগামুখ পাড়ায় এসে পৌঁছেছি আমরা । বগামুখপাড়ায় আবার কলা , রুটি খেয়ে নিলাম ।  দুপুরে এক পাহাড়ের ঢালে কিছু কাঠুরের দেখা হয়েছিল । তাদের সাথে ঘন্টাখানেক রেস্ট নিয়েছি । তাদের হাড়ি পাতিলে আমাদের সাথে নেয়া চাল রান্না ও আলুর ভর্তা করে কিছুটা ভাত খেয়েছিলাম । জোহরের নামাজটাও সেখানেই সেরে নিয়েছি । এছাড়া বাকি সময়টা শুধু হেঁটেছি । বিকালে পড়েছিলাম আরেক বিপদে । জুম চাষ করার জন্য পাহাড়িরা পাহাড়ের ঢালে শুকনো গাছপালায় আগুন লাগিয়ে দেয় । আমরা পড়লাম সেই আগুনের ফাঁদে । সামনে পেছনে আগুন । যাবার উপায় নেই । সাহস করে আগুনের ভেতর দিয়েই লাফিয়ে পার হতে হলো । এক ঝলকের জন্য শরীর যেন ঝলসে গেল আমাদের ।


জুম চাষের জন্য পাহাড়ের ঢাল পুড়িয়েছে পাহাড়িরা । ফিরছি আমরা পুকুর পাড়া হতে ।জুম চাষের জন্য পাহাড়ের ঢাল পুড়িয়েছে পাহাড়িরা । ফিরছি আমরা পুকুর পাড়া হতে ।

বগামুখ পাড়া পার হয়ে মাগরিব নাগাদ আমরা একটা ঝিরিপথ পেয়ে গেলাম । ততক্ষণে সূর্য ডুবে গেছে । চারিদিকে সুনশান । আকাশে চাঁদ উঠেছে । কাঁধে ব্যাগ, হাতে লাঠি – সারি বেঁধে পায়ে হাঁটা সমতল রাস্তায় আমরা হেটে হেটে ফিরছি । চারদিনের হাঁটার ধকল , শেষ দিনে টানা চৌদ্দ ঘন্টা হাঁটার ধকলে শরীর অসাড় হয়ে আসছিল । শুধু মনের জোরে হাঁটছিলাম । চাঁদের আলো কিছুটা ভালো লাগার অনুভূতি দিচ্ছিল আমাদের । আরো তিনঘন্টা হেঁটে রাত নটা নাগাদ আমরা রুমা বাজারে এসে পৌঁছলাম ।

রাতে একটা হোটেল ভাড়া করে থাকলাম । পরদিন সকাল আটটায় আবার মিলিটারি ক্যাম্পে গিয়ে রিপোর্ট করলাম- আমরা ফিরে এসেছি । আমাদের গাইড বেলালকে বিদায় দিয়ে সকাল ন’টার বাসে বান্দরবানের উদ্দেশ্যে ফিরতি পথ ধরলাম আমরা । ক্লান্ত শরীর । অনুভব করছিলাম, এ কয়দিনে আমরা ‘রুমা’কে অনেক বেশি ভালোবেসে ফেলেছি । রুমার কথা কোনদিন ভুলতে পারবো না ।