এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...

এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে
জীবনদর্শন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
জীবনদর্শন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

সাকসেস বনাম হ্যাপিনেস

সাফল্য (Success) এর সাথে সুখের (Happiness) সম্পর্কটা খুব জটিল। মানুষ চায় Happy হতে, কিন্তু সে ছোটে Success এর পেছনে। এটা ঠিক যে Success সুখ আনে, কিন্তু Success কখনো কখনো সুখকে নষ্টও করে।
Success কে সংজ্ঞায়িত করাটা কঠিন। এটা নির্ভর করে কিসের মানদন্ডে বিচার করা হচ্ছে তার ওপর। একটা নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছানোই কি সাফল্য? ধরি ঢাকায় পৌঁছানো টার্গেট। এখন একজন লোক গাজীপুর থেকে রওনা দিয়ে ঢাকায় পৌঁছালো। অন্য একজন মানুষ রংপুর থেকে রওয়ানা দিয়ে সেই সময়ে টাঙ্গাইল পৌঁছালো।
আপনি কাকে সফল বলবেন? দ্বিতীয়জন হয়তো পরের দিন ঢাকায় পৌঁছাবে। অথবা সে সাভারে গাড়ি এক্সিডেন্টে মারা গেলো। আপনি কি তাকে ব্যর্থ বলবেন? শুধুমাত্র এ কারণ যে সে ঢাকায় পৌঁছাতে পারে নাই? অথচ দূরত্বের বিচারে দ্বিতীয় জনই বেশি পথ পাড়ি দিয়েছে!
সাফল্য বিচার করাটা চরম মাত্রার আপেক্ষিক ব্যাপার। স্টার্টিং পয়েন্টটাকে আমলে নিতে হবে, পথের বাধা বিপত্তিকে আমলে নিতে হবে, উপায় উপকরণের সহজলভ্যতা বা প্রাপ্যতাকে আমলে নিতে হবে।
আমরা বেশিরভাগ সময়েই আমাদের উদ্দেশ্য ভুলে যাই। সফল হতে চাই কেন? Happy হবার জন্য। Happy থাকার জন্য। অথচ Success এর পেছেনে ছুটতে ছুটতে আমরা হ্যাপিনেসকেই বিসর্জন দিয়ে ফেলি।
বিষয়টা অনেকটা এরকম, আরামে থাকার জন্য অনেক দামী বাসা ভাড়া করলাম, কিন্তু সেই বাসার ভাড়া যোগাড় করতে এত কাজ করতে হয় যে বাসাতেই থাকা হয় না।
ছেলেমেয়ের ভালোর জন্যই সব করেন, কিন্তু এত কাজ করেন যে ছেলেমেয়েদের সাথেই ঠিকমত কথা বলতে পারেন না।
পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছে, আমাদের চোখে যারা Successful, কিন্ত তাদের জীবনে হ্যাপিনেস নেই। জীবনটা তাদের কাছে দুর্বিষহ। তাদের আনন্দের একমাত্র উৎস হলো ড্রাগ। প্রতিদিন তাদের ঘুমের জন্য ঔষধের প্রয়োজন হয়।
Success এর পেছনে আমাদের দৌঁড়াতে হবে। কারণ, ব্যর্থ জীবনে সুখ নেই। তবে তা হতে হবে- To a certain limit. যতক্ষণ পর্যন্ত তা Happiness কে নষ্ট না করে। চূড়ান্ত লক্ষ্যই যেখানে Happy হওয়া, সেখানে Happiness কে বিসর্জন দিয়ে Success পেয়ে লাভ কী?

মঙ্গলবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

কাউকে কাউকে প্রথম দেখাতেই খুব আপন মনে হয় কেন?

কাউকে কাউকে প্রথম দেখাতেই খুব আপন, খুব পরিচিত মনে হয়। আবার কারো কারো সাথে অনেক বছর কাটিয়ে দিলেও সম্পর্কটা আলগাই থেকে যায়।
তো, এর একটা স্পিরিচুয়াল ব্যাখ্যা আছে। ব্যাখ্যাটা হলোঃ আল্লাহ তায়ালা পৃথিবী সৃষ্টির আগেই আমাদের রুহগুলো সৃষ্টি করেন। তারপর তাদেরকে আলমে আরওয়া বা রুহের জগতে রাখেন। পৃথিবীতে আসার আগ পর্যন্ত আমরা সেখানেই ছিলাম।
ঐসময় যেসব রুহ কাছাকাছি ছিল, পাশাপাশি ছিল, পৃথিবীতে যদি তারা একটা নির্দিষ্ট সময়ে জন্মগ্রহণ করে- তাহলে এখানেও তাদের পরস্পরকে পরিচিত মনে হয়। অনেক বেশি আপন মনে হয়।
আমার পরিচিত মানুষের সংখ্যাটা নেহায়েত কম না। আবার জীবনে অপরিচিত এমন অনেক মানুষকে পেয়েছি, যারা বলেছেন- 'বাবা, তোমারে দেইখ্যা খুব চিনা চিনা লাগতাছে', কিংবা 'ভাই, আপনাকে এত চেনা চেনা লাগছে কেন?'
মাঝে মাঝে মনে হয়,  আলমে আরওয়াতে আমার রুহটা কি সারাক্ষণই শুধু ঘোরাঘুরি করত? 

শনিবার, ২৬ আগস্ট, ২০১৭

গীবত করছি না ভাই...

"বলা উচিত না ভাই, তারপরও বলছি। ঘটনা হইছে কী... "
"গীবত করছি না ভাই, আপনার জানার জন্যে বলছি... অমুক ভাইয়ের সাথে সেইদিন পথে দেখা বুঝলেন, কী আর বলবো.."..
আমাদের আড্ডায় আলোচনায় সাধারণত এভাবেই শুরু হয় পরনিন্দা, গীবত আর চোগলখুরির যত আলাপ। হয় আমরাই শুরু করি, অথবা আমরাই হই একনিষ্ঠ শ্রোতা।
বলা উচিত না ভাই, তারপরও বলছি... এইটুকু শুনেই যদি থামিয়ে দিতে পারতাম.. বলতে পারতাম- ভাই, বলা যেহেতু উচিত না, তো আর বইলেন না। আমারও বোধহয় শোনা উচিত হবে না।
অথবা, গীবত করার জন্য বলছি না... এইটুকু শোনার পর যদি থামিয়ে দিতে পারতাম; তাহলে কতই না ভালো হত।
কিন্তু বেশিরভাগ সময় আমরা তা পারিনা। কখনো এমন হয় যে, সিনিয়র কেউ একজন এইরকম আলাপ শুরু করলেন। এখন তাকে থামিয়ে দিলে হয়তো তিনিই বলে বেড়াবেন- আরে অমুকে তো একটা বেয়াদব!! আবার কখনো কখনো আমরা লোভ সামলাতে পারি না। শুনি না কী হলো!!!
এইভাবে আমরা সবাই মিলে একে অপরের নামে নিন্দা, গীবত আর চোগলখুরির দুষ্টচক্র চালিয়ে যাই। আমি তার, সে আরেকজনের, আর সেই 'আরেকজন' আমাকে নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যায়- আমার অজান্তে। 

বৃহস্পতিবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৭

ভুল মানদন্ডে 'সফল' হবার 'উস্কানি !!

তুমিই পারবে। তুমিও জিতবে। হাল ছেড়ো না, লেগে থাকো। 'দেখিয়ে দাও' যে তুমিও পারো।
এগুলোই হলো বর্তমান সময়ের সব ধরণের সো-কলড মোটিভেশনাল বই-পুস্তক-প্রবন্ধ-লেকচারের মূলকথা। শিব খেরা থেকে শুরু করে নব্য মোটিভেশানিস্ট, যারাই অন্য কাউকে মোটিভেশন দিতে চান, দিনশেষে এইসব কথাই হয়ে দাঁড়ায় তাদের বক্তব্যের সারমর্ম।
এইসব তথাকথিত মোটিভেশন আমাদের তরুণ প্রজন্মের ভেতর সত্যিকার কোন স্পিরিট তো দিচ্ছেই না, বরং হতাশাই বাড়াচ্ছে। কারণ, প্রচলিত মোটিভেশন মূলক কথাবার্তাগুলোতে দুটি মৌলিক ও গুরুতর সমস্যা আছে। একটা হচ্ছে, সাফল্যের সংজ্ঞাটা এখানে কেবলই টাকার অংকে নির্ধারণ করা হয়েছে। আর এই ভুল মানদন্ডে 'সফল' হবার জন্য সবাইকে 'উস্কানি' দেয়া হচ্ছে। অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দেয়া হচ্ছে। অবাস্তব স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে। যার ফলে বেশিরভাগ তরুণই একটা সময় গিয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে।
মোটিভেশনাল বই পড়ে, বক্তব্য শুনে কেউ কোনদিন সফল হয়নি, হয় না। বাস্তবতা হচ্ছে, চাইলেই সবাই 'সফল' হতে পারে না। চাইলেই সবাই জয়ী হতে পারে না। প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস, মন থেকে চাওয়া, লেগে থাকা, কঠোর পরিশ্রম, কেবল এগুলোই সাফল্যের একমাত্র নির্ণায়ক নয়। পরিশ্রম করলেই সবাই ধনী হয় না, লেগে থাকলেই সবাই টপে ওঠে না, পড়ালেখা করলেই সবাই ভালো চাকরি পায় না।
ব্যবসা করলেই সবাই ফুলে ফেপে ওঠে না, রাজনীতি করলেই সবাই প্রেসিডেন্ট হয় না, লিখলেই সবাই জনপ্রিয়তা কিংবা নোবেল প্রাইজ পায় না।
আপনি একটা ক্লাসের সব ছাত্রকে মোটিভেশন দিলেন- তুমিই ফার্স্ট হতে পারবে। তোমাকেই ফার্স্ট হতে হবে। পড়ো পড়ো পড়ো!! You Can Win!!
অথচ বাস্তবতা হলো, মাত্র একজনই ফার্স্ট হবে। আর কেউ ফার্স্ট হতে পারবে না। আপনি যদি শুধু ফার্স্ট হওয়াকেই সাফল্য বলেন, তাহলে কি বাকি সবাই ব্যর্থ!! আপনার এই মোটিভেশন দিনশেষে বেশিরভাগ ছাত্রের মনেই হতাশা ছড়াবে।
ভালো চাকরি করা, ব্যবসা করে অনেক টাকা কামানো, কেবল এগুলোকেই এখন সফলতা হিসেবে তুলে আনা হচ্ছে। আলীবাবা, মার্ক জুকারবার্গ, স্যামসন এইচ, এদেরকেই এখন সাফল্যের আইকন হিসেবে তরুণ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। যেকোনভাবেই হোক, অগুণতি টাকা উপার্জন করতে পারাটাই যেন 'সাফল্য'।
কিন্তু আসলে কি সবারই ধনী হওয়া সম্ভব? ব্যবসায় কি সবাই তরতর করে ওপরে উঠতে পারবে? সবাই কি উচ্চ বেতনের চাকরি পাবে?
তার মানে কি এই যে, ঐ গুটি কয়েকজন মানুষ ছাড়া বাকি সবাই অসফল? ব্যর্থ? ক্লাসের ফার্স্ট বয়টাই শুধু সফল? বাকিরা ব্যর্থ?
এই ধরণের ফালতু মোটিভেশন বন্ধ করা দরকার। এগুলো মোটেই মোটিভেশন না, সত্যিকার অর্থে এগুলো হলো চরম মাত্রার দীর্ঘমেয়াদী ডিমোটিভেশন।
২.
আসলে সফলতা কী?
আমি বলবো, ভালো মানুষ হওয়াটাই সাফল্য। সৎ মানুষ হওয়াটাই সাফল্য। বিনয়ী হওয়াটাই সাফল্য, ভালো ব্যবহার করতে জানাটাই সাফল্য।
নিজের সীমা ও সামর্থের মধ্যে সবচেয়ে ভালোটুকু করার পর, ফলাফল যাই হোক- সেটাই সাফল্য। সেটাকেই মেনে নেয়ার মোটিভেশান চালানো দরকার।
অন্যের দোকানে কাজ করে কেরোসিনের অভাবে পড়তে না পারা ছেলেটা যদি কোনমতে মেট্রিক পাশ করে- সেটাই সাফল্য। অক্ষম বাপ মায়ের একমাত্র অবলম্বন ছেলেটা যখন রিকশা চালিয়ে সংসারের জন্য উপার্জন করে- সেটাই সাফল্য। অনেক কষ্ট করে বিধবা মায়ের যে ছেলেটা গ্রামের ডিগ্রী কলেজে ভর্তি হয়েছে- সেটাই তার সফলতা।
ছয় ডিজিটের স্যালারি, আর ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিসিএস, কর্পোরেট সিইও- এইসব হওয়াকেই যদি সাফল্যের মাপকাঠি ধরেন, তাহলে পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষকেই ব্যর্থ বলতে হয়। যে কৃষক বাবা তার ঘামের টাকায় ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া করিয়েছেন, আপনার কি তাকে ব্যর্থ মনে হয়?
কেন সাফল্যের এই অবাস্তব সংজ্ঞা ফেরি করে বেড়াচ্ছেন? কেন তরুণদের মিথ্যা স্বপ্ন দেখাচ্ছেন?
একজন মানুষের জন্য, ভালো মানুষ হওয়াটাই হলো সফলতা। কেউ যদি সৎ থাকে, মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করে, মানুষের ক্ষতি না করে, পূর্ণ নিষ্ঠার সাথে তার নিজের দায়িত্বটুকু পালন করে, আমার দৃষ্টিতে সে-ই সফল। সে যেই হোক। মুচি, রিকশাওয়ালা, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, অফিসের দারোয়ান, বাদাম বিক্রেতা গরীব ছেলেটা।
মোরওভার, একজন মুসলিমের কাছে সফলতার সংজ্ঞাটা আরো চমৎকার। পৃথিবীর জীবনের কোন লাভ, ক্ষতি, প্রাপ্তি বা অপ্রাপ্তিতে তাদের জীবনের সফলতা বা ব্যর্থতা নির্ধারিত হয় না। তাদের কাছে পৃথিবীর সবকিছুই আপাত। পরকালে পুরস্কৃত হওয়াটাই হলো একজন মুসলিমের জন্য সত্যিকার সফলতা।

মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৭

এভাবেই সময় চলে যায়...

ছোটবেলায় আপনার অনেক বন্ধু ছিল। সবার সাথে নিশ্চয় আজ আর যোগাযোগ নেই! হয়তো সবার নামও মনে নেই। কাউকে কাউকে হয়তো এখন আর প্রথম দেখায় চিনতেও পারবেন না।
যার সাথে আপনার ধুন্দুমার মারামারি হয়েছিলো, স্যারের কাছে মিথ্যা নালিশ করে যে আপনাকে মার খাইয়েছিলো, তার কথা কি মনে আছে? আজ যদি রাস্তায় সেরকম কারো দেখা হয়, কী করবেন আপনি?
আমি জানি। জড়িয়ে ধরবেন। দু'জনে মিলে পাশের কোন একটা কফিশপে ঢুকে যাবেন। হয়তো মনের ভেতর বেজে উঠবে পুরনো গানের সুরঃ বন্ধু, কী খবর বল! কতদিন দেখা হয়নি!!
সেদিনের তিক্ত দিনগুলি আজ হয়ে উঠবে হাসির খোরাক।
কতদিন আগের কথা? দশ বছর? বিশ বছর? ১৫ বছর আগে এই দিনে আপনি ঠিক কী করেছিলেন, মনে আছে? কারো জন্য ভালোলাগা, কারো জন্য কিছু কষ্ট... কোন তিক্ত অভিজ্ঞতা... কিছু মনে পড়ছে না? নট শিওর?
হুম্মম্ম।
সময়। এভাবেই সময় চলে যায়। সময়ের সাথে সাথে আমরা নিজেকে হারিয়ে ফেলি। নিজেকেই ভুলে যাই।
বন্ধুকে ভুলে যাই। শত্রুকে ভুলে যাই। পেছনের একেকটা দিন হয়ে থাকে শুধু স্বপ্নের মত কিছু সাদাকালো স্মৃতি।
"আজকে"র বিষয় নিয়ে আমরা কতই না চিন্তিত থাকি। সামান্য বিষয় নিয়ে মানুষে মানুষে কত শত্রুতা, কত রেষারেষি। অথচ, মৃত্যুর পর হয়তো লক্ষ বছর পরে যখন ঘুম থেকে উঠবো, তখন পৃথিবীর এই পুরো জীবনটাকে মনে হবে একটা ক্ষণিকের স্বপ্ন।
এখন যেমন দশ বছর আগের দিনগুলোকে মনে হয়।

মঙ্গলবার, ৮ আগস্ট, ২০১৭

আমি কিন্তু একটু অন্যরকম'!!

মানুষের ভেতর কিছু অদ্ভুত রকম বৈপরীত্য কাজ করে। সে চেষ্টা করে অন্যদের চেয়ে একটু আলাদা, একটু অন্যরকম হবার। যেমন, অনেকেই বলেন- 'ভাই, আমি কিন্তু একটু অন্যরকম'!!
আবার একই মানুষ যখন আরেকজনকে খুঁজে পায়, যার সাথে তার আচরণে, কথায়, বা চিন্তায় অনেক মিল- তখন সে খুশি হয়। বলেঃ আরে আরে! তুমি তো দেখি একেবারে আমার মতন!!! আর নিজের মত কাউকে পেলে মানুষ যেন তাকে অজান্তেই ভালোবেসে ফেলে।
বেশ অদ্ভুত মানুষের চিন্তাধারা। অদ্ভুত 'মানুষ' নামক এই প্রাণীটার মন।

বৃহস্পতিবার, ৩ আগস্ট, ২০১৭

মানুষ অকৃতজ্ঞ প্রাণী

ধরুন আপনি একজনের খুব উপকার করেন। যখনই সে কোন সমস্যায় পড়ে, আপনি জানতে পারলে সাধ্যমত সহযোগিতা করেন।
তারপর একদিন, কোন একটা সমস্যায় আপনি তাকে কোনভাবে হেল্প করতে পারলেন না।
ব্যস, আপনার এতদিনের সবকিছু এক মুহূর্তেই শুন্য হয়ে গেলো। হয়তো আপনাকে এও শুনতে হবে, 'তুমি তো কখনোই আমার কোন উপকার করনি!!!'
আমরা নিজেরাও কখনো কখনো হয়তো এরকম করে থাকি। মানুষ অকৃতজ্ঞ প্রাণী। একবার আমাদের চাওয়ামত না পেলে আমরা আগের সব উপকার নিমেষেই ভুলে যাই।
উপকারীর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকাটা খুব খুব জরুরি। এতে করে উপকারী মানুষটা আরো বেশি উপকার করার উৎসাহ পায়। পৃথিবীতে এমনিতেই উপকারী মানুষের সংখ্যা বেশি নয়। আর আমাদের অকৃতজ্ঞতা প্রতিদিন তাদের সংখ্যা আরো কমিয়ে দেয়।
২.
পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এরকম হয়ে থাকে। হয়তো আপনার সাথে আমার দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক। তারপর আমার কোন একটা কথায় হয়তো আপনি কষ্ট পেলেন। ব্যস, আমার সাথে আপনার আগেকার সবকিছু মূল্যহীন হয়ে গেলো!!!
পরদিন থেকে আপনি আর আমি সম্পূর্ণ আলাদা!!!
এরকম হওয়াটা মোটেও উচিত নয়। মানুষের প্রতিটা কাজকে আমি আলাদাভাবে বিচার করার পক্ষে। আজ যদি আপনি আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে থাকেন, তার জন্য আজ হয়তো আমি অনেক কষ্ট পেতে পারি। কিন্তু তাই বলে আমার সাথে আপনার অতীতের অসংখ্য ভালো ব্যবহার, অসংখ্য উপকার ভুলে যেতে পারি না।
কোন একটা কাজ একজন মানুষের সমগ্র জীবনকে সংজ্ঞায়িত করতে পারে না। মানুষের জীবন কখনোই এতটা ঠুণকো নয়।

বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই, ২০১৭

একক নাকি যৌথ পরিবার?

একক পরিবার নাকি যৌথ পরিবার? এই নিয়ে বিতর্ক ইদানিং বেশ জমে উঠেছে সামাজিক পরিমন্ডলে। কেউ কট্টরভাবে যৌথ পরিবারের পক্ষে, কেউ একক পরিবারের। নব্য নারীবাদিরা নতুন করে এই আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়েছেন। তারা বেশিরভাগই যৌথ পরিবারের বিরুদ্ধে প্রান্তিক অবস্থান নিয়েছেন। আবার পুরুষরা অনেকেই কট্টরভাবে যৌথ পরিবারের পক্ষ নিয়েছেন।
আমার অবস্থান মোটাদাগে পৃথক পরিবারের পক্ষে।
যৌথ পরিবারের বউ মানে যদি হয় পরিবারের 'সবার সেবক', তাহলে আমি এর বিরোধী। আবার একক পরিবার মানেই যদি হয় বাবা-মা, ভাই-বোনদের ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন থাকা, সেটাকেও আমি সমর্থন করতে পারি না।
মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হলো, মানুষ দিতে চায় কম, নিতে চায় বেশি। যৌথ পরিবারে এই সমস্যাটা বেশি প্রকট হয়ে দাঁড়ায়। কে ঠিকঠাক কাজ করে না, কে কতটুকু দেয়, কে বেশি নেয়- একটা যৌথ পরিবারে দিনশেষে সম্ভবত প্রত্যেকের ঘরে এগুলোই হয়ে ওঠে কমন আলোচনার বিষয়। গীবত আর চোগলখুরির চর্চাটা শুরু হয় সম্ভবত এখান থেকেই।
একটা পরিবারে টুকটাক অনেক কাজ থাকে। একটা বড় যৌথ পরিবারে সেই কাজের পরিমাণ হয় অনেক অনেক বেশি। কিন্তু সেখানে সত্যিকারার্থে কোন কর্মবন্টণ থাকে না। ফলে, অনেকে মিলে করলেও কাজের 'শেষ' হয় না। দিনশেষে তাই সবার মনে থাকে অতৃপ্তি, অন্যের প্রতি অভিযোগ, আক্ষেপ।
সবচেয়ে বেশি চাপ সহ্য করতে হয় বাড়ির 'বড় বউ'কে। তার নিজের জীবন বলতে কিছু থাকেনা।
সকাল বিকাল চা-নাস্তা বানানো, তিন বেলা ভাত-তরকারি রান্না, কাপড়-চোপড় ধোয়া, ইস্ত্রি করা, ঘরদোর সামলে রাখা- সহজ কাজ নয়। একজন গৃহিনী বউকে সারাদিনে যতবার এঘর ওঘর করতে হয়, হিসাব করলে তাতে তার প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার হাঁটা হয়ে যায়। কাউকে কাউকে সারাদিনে যে পরিমাণ রান্নাবান্না করতে হয়, সেই পরিমাণ রান্না করে হয়তো একটা বড়সড় রেস্টুরেন্ট চালানো যাবে। যে পরিমান কাপড় ধুতে হয় বা ইস্ত্রি করতে হয়, সেই পরিমাণ কাজ করে বোধহয় বাণিজ্যিকভাবে একটা লন্ড্রি দোকানই চালানো সম্ভব।
যৌথ পরিবারে কারো নিজস্ব সময় বলে কিছু থাকেনা। একটু বিশ্রাম, নিজের বাচ্চাটাকে একটু বেশি সময় দেয়া, স্বামীর সাথে একটু অতিরিক্ত গল্পগুজব- কোনোটাই নিশ্চিন্তে করা যায় না। মাথায় অনেক কাজের চাপ, আবার যেকোন সময় যেকেউ ডাক দিতে পারে।
'মা এক কাপ চা দাও না'। 'আমার ঘড়িটা কোথায়?' 'ভাবী এক গ্লাস পানি দাও।' 'বউমা একটু রান্নাঘরে যাও।' যেকোন সময় কানে আসতে পারে যেকোন আদেশ, কিংবা অনুরোধ।
ক্লাস নাইনে থাকতে প্রথম যেদিন আমি নিজে নিজে আমার সব কাপড় ধুয়েছিলাম, আমার কোমর ব্যাথা হয়ে গিয়েছিল। আমার মা এবং বোনেরা কত কষ্ট করে সেটা বুঝতে আর বাকি ছিলনা। এরপর থেকে নিজেই কাপড় ধুই।
গোসল করতে গেলেই আমি দুএকটা কাপড় ভিজিয়ে রাখি। তবুও সপ্তাহ শেষে একগাদা ময়লা কাপড় জমে থাকে। একজনের কাপড় নিয়েই যদি এই হয় অবস্থা, একটা পুরো পরিবারের কাপড় সামলানো কতটা কঠিন, ভাবা যায়?
প্রাপ্তবয়স্ক এবং বিবাহিত ছেলে মেয়েরা তাই পৃথক পরিবার চালানোই ভালো। তবে পৃথক পরিবার মানে বাবা-মা বিহীন পরিবার নয়। বাবা-মা'র দায়িত্ব থেকে মুক্তি নয়। শ্বশুর শ্বাশুড়ির দায়িত্ব থেকে মুক্তি নয়। ভাইবোনদের দায়িত্ব থেকে মুক্তি নয়। ভাই বোনদের মধ্যে যে বেশি স্বচ্ছল, তারই উচিত বাবা-মার দায়িত্ব নেয়া। তারই উচিত বেশি বেশি বাকি সবার খবর নেয়া। সবার বোঝা উচিত, বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেয়াটা বিরাট সুযোগ, এটা কোন বার্ডেন নয়। বাপ-মা কিংবা শ্বশুর-শ্বাশুড়ির সেবা করার জন্য ছেলেমেয়ে বউ-জামাইদের রীতিমত প্রতিযোগিতা করা উচিত।
অনেক ক্ষেত্রে যৌথ পরিবারগুলো শেষ পর্যন্ত ভেঙ্গে যায় ঝগড়াঝাটির মাধ্যমে। এতে করে জীবনের বাকি সময়টাও আর স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকে না। এমন তিক্ততা সৃষ্টি হবার আগেই পরিবার পৃথক হওয়া ভালো। এতে করে বাকি জীবনেও সম্পর্কগুলো ভালো থাকে। তিক্ততা নিয়ে, অসন্তুষ্টি নিয়ে যৌথ পরিবারে থাকার চেয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে পৃথক পরিবারে থাকাই ভালো। খারাপ সম্পর্ক নিয়ে কাছে থাকার চাইতে ভালো সম্পর্ক নিয়ে দূরে থাকা ভালো। 

শুক্রবার, ১৪ জুলাই, ২০১৭

ধার্মিকতা কাকে বলে?

সহযোগী অধ্যাপক ফজল সাহেব তার একটা ফাইল নিয়ে বিপদে আছেন। তার কলেজে নতুন জয়েন করা কয়েকজন শিক্ষকের বিল সংক্রান্ত ফাইল শিক্ষা অফিসে আটকে আছে। বহুদিন ধরে চেষ্টা তদবির করেও কুলকিনারা করতে পারছেন না। এর আগে অন্যদের পাঠিয়েছিলেন, কাজ হয়নি। এবার তাই নিজেই এসেছেন।
ভেবেছিলেন ঘুষ ছাড়াই হয়তো কাজটা হয়ে যাবে, কিন্তু এখন আর সেরকম ভাবতে পারছেন না। তাই নতুন শিক্ষকদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে তিনি এসেছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে।
চেয়ারে যিনি বসে আছেন তাকে বেশ পরহেজগার মনে হচ্ছে। নাম স.ম. তরফদার। এই লোক ঘুষ খায়? বিশ্বাস হচ্ছেনা ফজল সাহেবের।
-- ভাই সাহেব, আমার কলেজের ফাইলটা যদি একটু দেখতেন। অনেক মাস হয়ে গেল, ছেলেরা বেতন পাচ্ছে না। পরিবার নিয়ে বেশ কষ্টে আছে আরকি। যদি একটু তাড়াতাড়ি করা যেত।
-- দেখেন ফজল সাহেব, আপনার কাজটা জটিল। আমি কাজ করছি। তবে আরো সময় লাগবে। বুঝলেন ভাই, সময় লাগবে।
বেশ কিছুক্ষণ রিকুয়েস্ট করে ফজল সাহেব বুঝলেন, এ চিড়িয়া খালি হাতে কথা বলবে না। তিনি হাতে রাখা প্যাকেটটা বের করলেন।
-- ভাই, আপনার জন্য সামান্য হাদিয়া ছিল। বোঝেনই তো, ছেলেরা কষ্টে আছে। একটু দেখেন ফাইলটা তাড়াতাড়ি কিছু করা যায় কিনা...
চোখ মুখ কুঁচকে তাকালেন তরফদার সাহেব। যেন তাকে ঘুষ সাধাটা অপরাধ হয়ে গেছে। ফজল সাহেবও একটু বিব্রত হলেন। নাহ, একজন ভালো মানুষকে সন্দেহ করা ঠিক হয় নাই।
তিনি প্যাকেটটা আবার পকেটে পুরে উঠে দাড়ালেন। ঠিক এসময় তরফদার সাহেবের ত্রস্ত কন্ঠ কানে এলোঃ ভাই সাহেব, রমজান মাস না! বোঝেনই তো, রোজা আছি। চিন্তা করবেন না, আমি কাজ করে দেবো! আপনি ঐটা নিয়ে ইফতারের পরে যোগাযোগ করেন কেমন?
২.
আব্দুর রহমান সাহেব সৌদি আরবে থাকেন বিগত ১৫ বছর ধরে। এবার মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে দেশে এসেছেন। ড্রইং রুমে বসে নতুন বেয়াই এর সাথে গল্প করছিলেন।
-- বুঝলেন বেয়াই, ১৫ বছরে ৮ বার হজ্জ্ব করছি। আল্লাহর অশেষ রহমত বেয়াই। এরকম সৌভাগ্য কয়জনের হয়?
-- বলেন কী বেয়াই? নিয়ম অনুযায়ী তো এই সময়ে সর্বোচ্চ তিনবার হজ্জ্ব করতে পারতেন, নাকি!! ৮ বার কেমনে করলেন?
-- আরে বেয়াই, এইডা কোন ব্যাপার? তিনবার নিয়ম অনুযায়ী করছি, আর বাকি ৫ বার চুরি কইরা করছি আরকি বুঝলেন!!
৩.
তাবলিগে এক চিল্লা লাগিয়ে আজই বাসায় ফিরেছেন কবির সাহেব। সমস্যাটা হিলো, তিনি অফিস থেকে ছুটি নিয়েছিলেন মাত্র ৭ দিনের। এখন আরো ত্রিশ দিনের ছুটি দরকার। কী করা যায়?
তিনি গেলেন ডাক্তারের চেম্বারে। অসুস্থতার মিথ্যা সার্টিফিকেট দেয়ার জন্য ডাক্তারকে পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন। সার্টিফিকেট দিতে অস্বীকৃতি জানালে কিছুটা ক্ষুব্ধ কন্ঠে তিনি ডাক্তারকে বললেন- 'ডক্টর, আমি তো ভালো কাজেই সময় দিয়েছি তাই না? আপনি দিয়ে দেন, দিয়ে দেন, কোন অসুবিধা নাই। আপনার কোন পাপ হবে না ডক্টর। আপনিও সওয়াবের ভাগীদার হবেন!!!'
***
সাধারণভাবে অধার্মিকদের তুলনায় ধার্মিকরা ভালো মানুষ। সমস্যাটা হলো- কেউ কেউ ধর্ম পালন করছেন বটে, কিন্তু ধর্মের মূল স্পিরিট ধারণ করতে পারছেন না। ধর্মের মূল কথা তাদের ভেতরে প্রবেশ করছে না। ধর্ম, বিশেষ করে ইসলাম যে কেবল কিছু রীতি প্রথার সমষ্টি নয়, তা তারা উপলব্ধি করেন না।
ধর্ম মানুষের ভেতর যে সততা, মানবিকতা, ভালো ব্যবহার, মানুষকে না ঠকানো, মানুষের ক্ষতি না করা, মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর প্রতি দয়ার যে গুণ সৃষ্টির তাগিদ দেয়- তা অনেক ধার্মিকই ধারণ করতে পারছেন না। 

রবিবার, ৯ জুলাই, ২০১৭

সবকিছুই আল্লাহর, সবাইকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে

ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। এই একটা বাক্যই একজন মানুষের জীবনকে অন্যরকম করে দিতে পারে। মানুষ মারা গেলে, কোন বিপদ হলে অথবা কিছু হারালে আমরা মুসলিমরা পড়ি- ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। যার অর্থ হলোঃ নিশ্চয় সবকিছুই আল্লাহর আর তার কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে। মানুষ মারা গেলে এটা আমাদের সামনে একেবারে চাক্ষুষ এবং অকাট্য প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়, নিশ্চয় তার কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে।
কোরআন শরীফে সুরা বাকারার ১৫৫-৫৬ নম্বর আয়াতে এই অংশটুকু আছে। যেখানে বলা হয়েছে- পৃথিবীতে মানুষকে ভয়, ক্ষুধা, দারিদ্র‍্য, জীবন ও সম্পদের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করা হবে। মানুষের ভেতর তাদেরকে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে- যারা এসময় ধৈর্যধারণ করবে, আর স্মরণ করবে- নিশ্চয়ই সবকিছু আল্লাহর এবং তার কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে।
কোন কিছু হারালে বা কোন ক্ষতি হলে আমাদের খারাপ লাগে। আমাদের কষ্ট হয়। এটা স্বাভাবিক মানবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে হতাশায় ভোগার কোন সুযোগ নেই। সেটা স্বাভাবিক নয়। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন অর্থ কী? নিশ্চয়ই আমাদের আল্লাহর কাছেই ফিরে যেতে হবে। তো, যেখানে আমি নিজেই এই পৃথিবীতে থাকবো না, আমার নিজের জীবনই যেখানে অনিশ্চিত, আমি নিজেই যেখানে যেকোন মুহূর্তে নাই হয়ে যাবো, সেখানে এই দুনিয়ার এইসব ক্ষতি নিয়ে ভেবে কী হবে?
ধরা যাক, আমার ১ কোটি টাকা ক্ষতি হয়ে গেছে। আচ্ছা, আজ যদি আমি মারা যাই, তাহলে এই ক্ষতির কী মূল্য থাকবে আমার কাছে? আমার যদি আরো হাজার কোটি টাকা থাকে তারই বা কী মূল্য থাকবে?
এটাই হলো 'ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন' এর স্পিরিট।
২.
গত জানুয়ারিতে সেন্টমার্টিনে গিয়েছিলাম। সকাল বেলা বাইসাইকেল নিয়ে দ্বীপের পশ্চিম তীর ধরে ছেড়া দ্বীপে গেলাম। সাধারণত ঐ পথে কেউ ছেড়া দ্বীপ যায় না। অনেক এবড়ো থেবড়ো, অনেক প্রবাল, পাথর আর ঝোঁপ ঝাড়। অনেকটা নির্জনও। অনেকটা পথ সাইকেল হাতে নিয়ে হাঁটতে হয়।
এই এডভেঞ্চারে কখন যে আমার মানিব্যাগ কোথায় পড়ে গেছে বুঝতে পারিনি। ফিরে এসে যখন শিপে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছি, তখন বুঝলাম মানিব্যাগ নেই। ৭-৮ হাজার টাকা, কয়েকটা আইডি কার্ড, এটিএম কার্ড, চাবি, কিছু জরুরি কাগজ- অনেক কিছু ছিল। যেপথে হারিয়েছি, ফিরে পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই। তৎক্ষনাৎ স্মরণ করলামঃ ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন। খুব একটা মন খারাপ করলাম না।
জাহাজে ওঠার সময় আমাকে আশ্চর্য করে দিয়ে এক বন্ধু মানিব্যাগটা নিয়ে এলো, ওটা নাকি সে কুডিয়ে পেয়েছে। ওরা কয়েকজন ছেড়াদ্বীপ যায়নি, এমনিই হাওয়া খেতে বেরিয়েছিল, বালুর ওপর মানিব্যাগটা পড়ে থাকতে দেখে নিয়ে এসেছে। আমি খুব খুব খুবই আশ্চর্য হলাম। আল্লাহ আমাকে খুব ছোট একটা পরীক্ষা করলেন!! আলহামদুলিল্লাহ্‌ আমি ধৈর্যের পরীক্ষায় পাশ করলাম, আর তারপর আল্লাহ আমাকে আমার জিনিস পুরোটাই ফিরিয়ে দিলেন!!! সুবহানাল্লাহ।
মার্চ মাসের এক রাতে এক বন্ধুকে সি-অফ করতে কমলাপুর স্টেশনে যাচ্ছিলাম রিকশায়। মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারিরা টান মেরে ব্যাগটা নিয়ে গেলো। ল্যাপটপ ছিলোনা, বই, স্টেথো, চাঁদর, হস্পিটালের ড্রেস, কিছু কাপড় এগুলো ছিল। স্মরণ করলামঃ ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন। যদি আমার রিযিকে থাকে, তাহলে ওটা ঠিকই ফিরে আসবে। আমার তো আরো বেশি ক্ষতি হতে পারতো, রিকশা থেকে পড়ে আহত হতেও পারতাম। আল্লাহর শোকর করলাম, মন খারাপ করলাম না।
ঘন্টা দুয়েক পরের কথা। তখনো কমলাপুর স্টেশনেই আছি। ১১ টার দিকে একটা ফোন পেলাম। মালিবাগ থেকে একজন লোক ফোন করে জানালেন, আমার ব্যাগটা কেউ একজন ফেলে রেখে গেছে। ব্যাগে থাকা আইডি কার্ডে নম্বর পেয়ে উনি ফোন করেছেন। অত রাতে আর গেলাম না। উনার কাছেই রাখতে বললাম।
সপ্তাহখানেক পর উনার বন্ধু মালিবাগের ট্রাফিক সার্জেন্ট এসে সবকিছুসহ ব্যাগটা আমাকে দিয়ে গেলেন।
পরপর দুটো ঘটনায় আমার বিশ্বাস অনেক পোক্ত হলো। আমি অন্তরে তৃপ্তি পেলাম, বিশ্বাসের তৃপ্তি। এরপরে আরো অনেক বড় বড় (আপাত) ক্ষতি হয়েছে। সাময়িক খারাপ লেগেছে, তারপর স্মরণ করেছি- ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আমরা আল্লাহর কাছ থেকে এসেছি, আর তার কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে। যেটা আমার, সেটা যেকোনভাবে আমারই থাকবে। আর না থাকলেও কোন ব্যাপার না। সবকিছুই আল্লাহর, আমাদের সবাইকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে। 

বৃহস্পতিবার, ৬ জুলাই, ২০১৭

Everybody will be paid back by his own Coin.....

গয়াল চন্দ্র এই শহরের একজন দুধবিক্রেতা। তিনি চিকন বুদ্ধির বাঙালি, তাই ১০ লিটার দুধে ৫ লিটার পানি মিশিয়ে ১৫ লিটার করলেন। সামান্য বুদ্ধিতে পাক্কা পাঁ-চ লিটার লাভ!! খুশিতে চোখ চকচক করে ওঠে তার।
দুধ বিক্রির টাকা পকেটে নিয়ে তিনি চাল কিনতে যান সাব মুদির দোকানে। সাবু মুদি তাকে 'অতি উত্তম চাউল', 'এরকম চাউল কোথাও পাইবেন না' ইত্যাদি বলে শেষে পাথর মেশানো চাল বিক্রি করে। ওজনেও আধা কেজি কম দেয়।
'কত লাভ করে ফেললাম' ভেবে বেজায় খুশি সাবু মুদি লাভের টাকা নিয়ে বাজারে যায় মাছ কিনতে। মাছ বিক্রেতা সুরুজ মিয়া তাকে ফরমালিন মেশানো পচা মাছ ধরিয়ে দেয় কেনা দামের দ্বিগুন মূল্যে। তার লাভ করতে হবে না?
কিছুক্ষণ পরে সুরুজ মিয়ার কাছে খবর আসে, তার ছেলেটা এক্সিডেন্ট করেছে। দ্রুত সে তার ছেলেকে হাসপাতালে নেয়। হাসপাতালের একজন ধান্দাবাজ দালাল 'ভালো চিকিৎসা' র ব্যবস্থা করে দেবার কথা বলে ভংচং বুঝিয়ে সুরুজ মিয়ার কাছ থেকে ভালো পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেয়।
সেই ধান্দাবাজ বাড়ি ফেরার পথে পড়ে ছিনতাইকারীর হাতে। ছিনতাইকারী তার পেটে ছুরি মেরে সব টাকাপয়সা ছিনিয়ে নেয়।
পালিয়ে যাবার সময় ছিনতাইকারী ধরা পড়ে পুলিশের হাতে। পেদানি দিয়ে সব টাকা নিয়ে নেয় পুলশ। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা বা ভিক্টিমের কাছে ফেরত দেয়া কোনটাই করেন না পুলিশ অফিসার।
সেই পুলিশের ছেলে আবার হয়ে পড়ে ইয়াবা আসক্ত.. মাদকের পেছনে টাকা ঢেলে প্রতিনিয়ত সে খালি করে দেয় বাবার পকেট...
***
যারাই অবৈধ পথে উপার্জন করে, তারাই মনে করে যে সে 'বিরাট লাভ' করে ফেলেছে। কিন্তু আসলে তা নয়। সে একজনকে ঠকাচ্ছে, আবার তাকে ঠকাচ্ছে অন্যকেউ। যেহেতু সমাজের প্রত্যেকেই একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল, আল্টিমেটলি সবাই চক্রাকারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাইরে থেকে হয়তো মনে হয় অসৎ লোকগুলোই সফল, তারাই সুখে আছে। আসলে তা নয়। তারা নিজেরা হয়তো মনে করে এইভাবে তারা খুব ভালো থাকবে, আসলে তাও হয় না। অসৎ পথে উপার্জন করে শেষ পর্যন্ত কেউ পার পায় না। পরকাল তো পরের কথা, দুনিয়াতেই তারা পেয়ে যায় ফিরতি হিসাব।
প্রকৃতির নিয়ম হলো, এখানে কাউকেই ছেড়ে দেয়া হয় না। আজ কিংবা কাল, Everybody will be paid back by his own Coin.....

শুক্রবার, ৩০ জুন, ২০১৭

'সম্মানজনক পেশা' বলে কিছু আছে?

ডাক্তারি একটা 'সম্মানজনক' পেশা, অতএব ডাক্তার হইতে হইবে। শিক্ষকতা একটি 'সম্মানজনক' পেশা, অতএব শিক্ষক হইতে হইবে। ইঞ্জিনিয়ার, লইয়ার, ব্যাংকার, মিলিটারি কিংবা পুলিশ... যেকোনভাবে হোক, একজন 'অফিসার' হতেই হবে। 'সম্মানজনক' পেশায় নিয়োজিত থাকতে হবে।
এইযে এভাবে পেশার মধ্যে সম্মান অসম্মানের একটা ধারণা ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে, সমাজের মধ্যকার বিভেদ, ঘৃণা, বিদ্বেষ ও শ্রেণী বৈষম্যের মূলে এইটা হলো একটা প্রধান কারণ। কেউ নিজেকে সম্মানজনক পেশার লোক ভেবে অহংকারী হয়, অন্যদের তুচ্ছজ্ঞান করে, আর কেউবা নিজের পেশাকে হীন ভেবে হীনম্মন্যতায় ভোগে। মনে আছে, একবার ক্লাসে একজন শিক্ষিকা 'তোমার বাবা কী করে' জিজ্ঞেস করায় আমার বন্ধু মাথা নিচু করে জবাব দিয়েছিলো- তিনি মুহুরি। উকিলের সহযোগী। তার কাছে বাবার পেশাটা হয়তো 'সম্মানজনক' ছিল না।
আসলে কি 'সম্মানজনক পেশা' বলে কিছু আছে? আমি মনে করি, পেশার সাথে সম্মানের কিছু নাই। পেশার কারণে কেউ সম্মানিত বা অসম্মানিত হতে পারে না। সম্মান আসে জ্ঞান, চরিত্র আর সততা থেকে।
আপনি একজন পুলিশ অফিসার, বা কাস্টমস অফিসার, বা যেকোন অফিসের একজন 'অফিসার'। আপনি দু'হাতে ঘুষ খান। মানুষ আপনাকে সম্মান করবে? নাহ। মানুষ হয়তো আপনাকে সামনাসামনি সমীহ করতে পারে- সেটা ভয় থেকে। ডাকাতের সামনে যদি কেউ হাতজোড় করে দাঁড়ায়, কেউ কি বলবে যে- সে ডাকাতকে সম্মান করছে? ব্যাপারটা সেরকম।
মানুষ আপনাকে ভয় করতে পারে, কিন্তু সম্মান করবে না।
আপনি একজন শিক্ষক। কিন্তু আপনার জ্ঞান জোড়াতালি মার্কা, আপনি ভালো পড়াতে পারেন না, কিংবা পড়ান না-- ছাত্ররা আপনাকে সম্মান করবে? করবে না। তারা হয়তো পরীক্ষায় ফেলের ভয়ে আপনাকে তোয়াজ করবে, কিন্তু মন থেকে সম্মান করবে না। পরিমল বাবু একজন শিক্ষক ছিলেন, তাকে কি আপনারা সম্মান করেন?
আপনার চরিত্র যদি খারাপ হয়, আপনি যেই হোন- কেউ আপনাকে সম্মান করবে না। আপনি প্রেসিডেন্ট হলেও সম্মান পাবেন না, শিক্ষক হলেও না, অফিসার হলেও না।
আপনি ডাক্তার, রোগীর সাথে যদি ভালো ব্যবহার না করেন, শুধুমাত্র ডাক্তার হওয়ার কারণে কেউ আপনাকে সম্মান করবে? না। করবে না।
পেশার কারণে কেউ সম্মানিত বা অসম্মানিত হতে পারে না। পেশা হলো জীবিকা অর্জনের মাধ্যম মাত্র।
বেঁচে থাকার জন্য আমাদের খেতে হয়, ভাত কাপড়ের দরকার হয়, থাকার জায়গা দরকার হয়। অসুস্থ হলে চিকিৎসা দরকার হয়। আমাদের ঘর বাড়ি রাস্তাঘাট পরিস্কার রাখতে হয়, আমাদের পারস্পরিক যোগাযোগ রাখতে হয়। আর এইসব কাজ আমরা মানুষেরা ভাগাভাগি করে করি। আমাদের খরচ নির্বাহ করি। এইটাই পেশা। এইখানে আলাদা করে সম্মান অসম্মানের কিছু নাই।
প্রত্যেকের জন্য রিযিক আছে, এবং সেটা কীভাবে আসবে তারও একটা পদ্ধতি আল্লাহর পক্ষ থেকেই নির্ধারণ করা আছে। সেটারই নাম 'পেশা'। পরিবেশ পরিস্থিতি সময় ও প্রয়োজনের তাগিদে একেকজনকে একেক কাজ করতে হয়, একেকজন একেক কাজে পারদর্শী হয়, একেক জন একেক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে।
সৎ পথে, কাউকে না ঠকিয়ে, কারো সম্পদ লুট না করে, বৈধভাবে অর্জিত যেকোন জীবিকাই সম্মানের, যেকোন পেশাই সম্মানের। সবাইকে সবার প্রয়োজন হয়। কাউকে ছাড়া কারো চলে না।
ধরেন একজন মেথর, তো তার পেশাটাকে কি আপনি খুব অসম্মানজনক মনে করেন? যদি করেন, কেন? আপনার কি টয়লেট বাথরুম পরিষ্কার করতে হয় না? নিজেকে পরিষ্কার করতে হয় না? তখন কি আপনি অসম্মানিত হয়ে পড়েন?
নবী রাসুলগণ অনেকেই 'রাখাল' ছিলেন, সেটা কি কোন 'হীন' পেশা? অনেক মহামানব খুব সাধারণ কাজ করতেন। তারা কি পেশার কারণে মহান হয়েছেন? না, হয়েছেন তাদের জ্ঞান ও চিন্তাচেতনার কারণে। উত্তম ব্যবহারের কারণে। উত্তম শিক্ষার কারণে।
অর্থকরী পেশা মানেই সম্মানজনক পেশা নয়। পেশার কারণে কেউই সম্মানিত হয় না। মানুষ সম্মানিত হয় তার জ্ঞানে, তার সততায়, তার চরিত্রে, তার পরোপকারিতায়, ভালো ব্যবহারে, মহানুভবতায়। আর তাই, অর্থকরী পেশায় নিয়োজিত হতে পারাই জীবনের সফলতা হতে পারে না। সফলতা হলো সৎ, চরিত্রবান, জ্ঞানবান, পরোপকারী ও ভালো মানুষ হওয়া।
পেশা হলো জীবনধারণের প্রয়োজনে ব্যয় নির্বাহের মাধ্যম মাত্র, আর কিছু নয়। মানুষ হিসেবে পৃথিবীর সব মানুষের মানবিক মর্যাদা সমান। পেশা যাই হোক তাতে আপনি খুব বড় কিছু বা খুব ছোট কেউ হয়ে যান না। 

রবিবার, ১৮ জুন, ২০১৭

পাগলের চোখে জল!

পাড়ার সবাই তাকে অনেকটা পাগলই মনে করতো...নাম তার আশেক। ঘর সংসারের কিছু সে বোঝে বলে আমরাও ভাবিনি। বাপের সাথে নদীতে মাছ ধরে, বাপের সাথে বাজারে যায়। বয়স যখন ১৮ কি ২০, হুট করে একদিন তার বিয়ে হয়ে গেল।
মাস ছয়-সাত পরের ঘটনা। বিকেল বেলায় ঘরে বসে একটা গল্পের বই পড়ছি। আঙিনায় আম্মার সাথে চাচীরা গল্প করছেন। সবার ভেতর বেশ চাপা উত্তেজনা। আশেকের বউয়ের নাকি এবরশন হয়ে গেছে। তার চেয়ে আশ্চর্যের কথা শুনলাম, এবং আমি নিজেও গিয়ে দেখলাম মরা বাচ্চাটা কোলে নিয়ে হুহু করে কাঁদছে পাগলাটে আশেক!!!
সবার মত আমিও খুবই অবাক হয়ে গেলাম। এবরটেড একটা বাচ্চার জন্য... পাগলের চোখে জল... ইজ ইট ফাদারস লাভ?
বুঝলাম, টু বি এ ফাদার, মে বি দেয়ার ইজ সামথিং এক্সট্রাওর্ডিনারি ফিলিংস ইনডিড...
২.
মোজাম্মেল সাহেবের সাথে তার ছেলেদের সম্পর্ক ভালো ছিলনা। প্রায়ই দেখা যেত ও বাড়িতে হৈ চৈ লেগে আছে। ছেলেদের সাথে চিৎকার চেঁচামেচি করছেন। গায়ে হাতও তুলতেন। ছেলেরা কান্নাকাটি করতো, ঘর ছেড়ে বেড়িতে যেত... এসব কিছুই ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।
সেদিন মোজাম্মেল সাহেব তার অফিসের কাজে দূরে কোথাও গিয়েছেন। এদিকে তার এক ছেলে রাস্তায় এক্সিডেন্ট করে মাথা ফাটিয়ে ফেলেছে। তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। রাতে মোজাম্মেল সাহেব বাড়িতে ফিরলে তাকে খবরটা জানানো হলো।
তিনি ঘরের দরজা বন্ধ করে হুহু করে কাঁদতে লাগলেন। দরজার বাইরে থেকে অবাক বিস্ময়ে আমরা তার কান্নার চাপা শব্দ শুনতে পেলাম।
৩.
সিনিয়র কলিগ বলছিলেন, বাবা হও তখন বুঝবা, বাচ্চা কী জিনিস!! বাচ্চাটা যখন কাঁদে, তখন আমার বুকের ভেতরটা হুহু করে ওঠে। কি ঘুম, কি কাজ... কোনকিছুই ঠিক থাকে না।
বেকায়দা প্রশ্ন করা আমার বদভ্যাস। আমি প্রশ্ন করে বসলামঃ ভাই, ধরেন আপনি ঘুমাচ্ছেন। পাশের বাসার বাচ্চাটা খুব কাঁদছে। তখন তার জন্যও কি আপনার খুব মায়া হয়?
বড় ভাই বললেন, না। তখন বিরক্ত লাগে। আসলে নিজের বাচ্চার জন্য যে অনুভূতি, অন্যের বাচ্চার ক্ষেত্রে সেরকম না। এটা এমন এক ধরণের ভালোবাসা, যা আল্লাহ বিশেষভাবে বাবাদের অন্তরে সৃষ্টি করে দেন।
৪.
বাবারা সন্তানদের ভালোবাসেন। কিন্তু তারা সেটা বোঝাতে পারেন না। মায়ের চেয়ে বাবার সাথেই কেন যেন দূরত্বটা বেশি থাকে। একটা কারণ হলো, বাবারা বাচ্চাদের সাথে বেশি সময় কাটান না। আর যতক্ষণ থাকেন শুধুই শাসন করেন। একটা সময় তারা হয়ে ওঠেন শুধুই ডিক্টেটর। শুধুই মানি সাপ্লায়ার।
অনেকেই ভালোবাসার বদলে সব সময় একনিষ্ঠ আনুগত্য চান। অনেকেই ছেলেমেয়েদের মনে করেন নিজস্ব 'সম্পত্তি'। তাদের স্বাধীন অস্তিত্ব স্বীকার করতে চান না। তাদের চিন্তাভাবনাকে মোটেও আমলে না নিয়ে, আলোচনার বদলে সবখানেই নিজের সিদ্ধান্তটা চাপিয়ে দিতে চান।
ফলে বাবাদের সাথে সন্তানের তৈরি হয় অদৃশ্য দেয়াল, অনেক দূরত্ব।
এটা ভুল। এটা ক্ষতিকর।
যারা বাবা হয়েছেন, সন্তানদের সাথে মিশুন। তাদেরকে সময় দিন। Be a friend of your child... Let them feel the love you bear for them...
সন্তানদের সৎ, চরিত্রবান ও মানবিক হিসেবে গড়ে তুলুন।
অন্যথায় সে হয়তো বড় অফিসার হবে, কিন্তু আপনাকে রেখে আসবে কোন এক 'ওল্ড হোমে'। এরকম 'বাবা দিবস' গুলোয় হয়তো আপনাকে দিয়ে আসবে কিছু ফুল।
অখন্ড অবসরে তখন আপনার সম্বল হবে কিছু অশ্রুবিন্দু।

রবিবার, ১১ জুন, ২০১৭

কম আর পরিমিত রিযকই সর্বোত্তম

হযরত আলী(রাঃ) একবার মসজিদে নামাজ পড়তে ঢোকার সময় দেখলেন একটা বাচ্চা ছেলে মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি ছেলেটাকে ডেকে বললেন- বাপু তুমি আমার বর্মটা কিছুক্ষণ রাখো, নামাজ শেষে আবার নিয়ে নেবো।
হযরত আলী (রাঃ) নামাজ শেষে ফিরে দেখলেন ছেলেটি তার জায়গায় নেই। আশেপাশে খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পেলেন না। পরে বাজারে গেলে তাঁর চোখে পড়ে, এক দোকানে তাঁরই বর্মটি বিক্রির জন্য রাখা আছে। তিনি দোকানিকে জিজ্ঞেস করলেন- এই বর্ম কোথায় পেলেন? দোকানি বললো- এক বাচ্চা ছেলে বিক্রি করে গেছে। হযরত আলী জানতে চান- এটাতো আমার বর্ম, সে কত টাকায় বিক্রি করেছে? দোকানি জানায়- মাত্র ২ দিরহাম।
হযরত আলী আফসোস করে বললেন, "আহা! আমি তাকে ঠিক দুই দিরহামই বখশিস দেয়ার ইচ্ছা করেছিলাম। সে যদি আর কিছুক্ষণ দাঁড়াতো, তাহলে সে চুরি না করেই দুই দিরহাম পেয়ে যেত।"
রিযিকের জন্য আমরাও এরকম অধৈর্য হয়ে যাই। বৈধতা অবৈধতার তোয়াক্কা করি না। অথচ প্রত্যেকের জন্য আল্লাহ তায়ালা রিযিক নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। যার জন্য যতটুকু রিযিক বরাদ্দ করা হয়েছে, তার একবিন্দু পরিমাণ বাকি থাকতে কেউ মৃত্যুবরণ করবে না।
রিযিক নির্দিষ্টই। তবে একজন মানুষ সেটা বৈধ (হালাল) ভাবে উপার্জন করবে, নাকি অবৈধ (হারাম) ভাবে উপার্জন করবে সেটাই তার জন্য পরীক্ষা। কেউ ঐ ছেলেটির মত চুরি করে ২ দিরহাম আয় করতে পারে, আবার কেউ আরেকটু অপেক্ষা করে ২ দিরহাম বখশিসও পেতে পারে।
২.
সম্পদের পরিমাণের ওপর আমরা একজন মানুষের সাফল্য ব্যর্থতা নির্ণয় করি। আমাদের সমাজের চোখও এভাবেই বিচার করে। আরে অমুকে তো এই সেই করে ফেললো, গাড়ি কিনলো, ফ্ল্যাট কিনলো, এত টাকা তার পার মান্থ ইনকাম-- বলতে বলতে আমাদের চোখ চকচক করে ওঠে। অথবা হতাশায় চোখ বন্ধ হয়ে আসে।
কিন্তু ধন সম্পদ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে দেন। এটা কারো যোগ্যতা অযোগ্যতার ওপর নির্ভর করেনা। আবার ধন সম্পদ কারো সাফল্য ব্যর্থতার মাপকাঠিও নয়। আমরা আমাদের আশেপাশে তাকালেই এটা বুঝতে পারবো। অনেক মানুষকেই দেখি- যার খুব বেশি জ্ঞান বা যোগ্যতা নেই। কোন বিষয়ে মতামত দিতে বললে কিছু বলতে পারেনা, কোন মজলিশে কথা বলতে দিলে থতমত খেয়ে যাবে, কাজেকর্মেও খুব একটা পটু নয়- অথচ তার ধন সম্পদ অনেক। আবার অনেক অনেক জ্ঞানী, যোগ্য, দক্ষ লোকও অভাবে দিন কাটান।
পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক মহামানব না খেয়ে দিন কাটিয়েছেন, ছিন্ন বস্ত্র পরিধান করেছেন, জীর্ণ কুটিরে রাত কাটিয়েছেন। আবার অসংখ্য নরাধম নরপশু জীবন কাটিয়ে গেছে প্রাচুর্যের সমূদ্রে।
কেউ কেউ উত্তরাধিকার সূত্রেই অনেক সম্পদের মালিক হয়, আবার কেউ কেউ অনেক কষ্ট করেও সম্পদশালী হতে পারে না। কেউ সামান্য ব্যবসা থেকেই ফুলে ফেঁপে ওঠে, কেউবা ব্যবসায় নেমেই দেউলিয়া হয়ে যায়।
আল্লাহর একটি নামই হলো- আর রাজ্জাক। তিনিই রিযিকদাতা।
হাদীসে আছে, মায়ের পেটে ভ্রুণের ৪ মাস বয়স হলে আল্লাহর নির্দেশে একজন ফেরেশতা প্রত্যেকের জন্য চারটি বিষয়ে তাকদীর নির্দিষ্ট করে দেন। তার মধ্যে একটি হলো রিযিক।
"আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা করেন রিয্ক প্রশস্ত করে দেন এবং যার জন্য ইচ্ছা সীমিত করে দেন। নিশ্চয় আল্লাহ সকল বিষয়ে সম্যক অবগত।" (সূরা আনকাবুত:৬২)
৩.
আমরা কতটুকু খাই? কতটা কাপড় হলে শরীর ঢাকা যায়? আমাদের থাকার জন্য কতটুকু জায়গা প্রয়োজন? খুব বেশি নিশ্চয়ই নয়!! কারণ, মানুষের পেটের ধারণক্ষমতা যেমন অসীম নয়, শরীরের আয়তনও তেমনি সীমাবদ্ধ।
অথচ তবু আমরা অল্প সম্পদে সন্তুষ্ট হতে পারি না। বেশি সম্পদের জন্য কত প্রতিযোগিতা!! ধন-সম্পদের পেছনে কত ছোটাছুটি!! সম্পদের জন্য কত হানাহানি।
তাছাড়া, অতিরিক্ত সম্পদ মানেই কঠিন পরীক্ষা। আবার অনেক কম সম্পদও একটা পরীক্ষা। এই দুই অবস্থাতেই মানুষ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। খারাপ কাজে জড়িয়ে পড়ে। আল্লাহ তায়ালা কখনো বেশি সম্পদ দিয়ে পরীক্ষা করেন, কখনো অভাব দিয়ে পরীক্ষা করেন।
হযরত ওমর (রাঃ) তাই সবসময় দোয়া করতেন- ইয়া আল্লাহ! আমাকে যেন এত বেশি সম্পদ না দেন যাতে আমি সীমালংঘন করে বসি, আবার এত কম যেন না দেন যাতে কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হতে হয়।
কম আর পর্যাপ্ত রিযকই হলো মানুষের জন্য সর্বোত্তম।

শুক্রবার, ১৪ এপ্রিল, ২০১৭

না না চাইনা, না না চাইনা, কোনো রম্ভা উর্বশী...

এইটুকুই তো দাবি আমার এইটুকু দাবি
বউতো হবে লক্ষ্মীমন্ত লাখ টাকার চাবি..
না না চাইনা, না না চাইনা, কোনো রম্ভা উর্বশী...
শুধু মেয়ের বাবার ব্যাংক ব্যালেন্সটা হতে হবে বেশি..

নচিকেতার গানে উঠে এসেছিলো বিয়েকে কেন্দ্র করে এই উপমহাদেশের একশ্রেণীর মানুষের অর্থলিপ্সা। এইযে সবাই লক্ষ্মী বউ চায়, এইটার পেছনেও সেই অর্থলিপ্সাই প্রধান, কারণ হিন্দু ধর্ম মতে লক্ষ্মী হলো সম্পদের দেবতা। লক্ষ্মী বউ শব্দটাও সেখান থেকেই এসেছে।

এই অর্থলিপ্সাকে আবার কেউ কেউ উৎসাহ ও বৈধতা দিতে চায়। তারা বলে- "If your Father is Poor, it's not your Fault... But if your Father in Law is Poor, it's definitely your Fault...!!!

অর্থলিপ্সা আর কূপমন্ডুকতার কারণে আজও বাংলাদেশের বেশিরভাগ জায়গায় টিকে আছে অভিশপ্ত পণ প্রথা। কেউ কেউ সরাসরি যৌতুক চায়, কেউ চায় আকারে ইঙ্গিতে।

কোথাও কোথাও মেয়ের বাপ মা দাবির মুখে যৌতুক দিতে বাধ্য হয়, কোথাও বাধ্য হয় 'খুশি হয়ে' দিতে। কারণ, মেয়ের বাপে 'খুশি হয়ে' মেয়েজামাইকে কিছু না দিলে সেই মেয়েকে শ্বশুর বাড়িতে নিজের বাপ মা সম্পর্কে প্রতিনিয়ত নানান অপমানজনক কথাবার্তা হজম করতে হয়।

আর তাই, মেয়ের বিয়ে নিয়ে বাবা মাকে চিন্তিত থাকতে হয় মেয়ের জন্মের পর থেকেই! কেউ কেউ মেয়ের জন্মের পরেই ব্যাংকে ডিপিএস একাউন্ট খোলেন, কেউ গাছ লাগান, কেউ স্বর্ণ কিনে রাখেন। কেউ মনে মনে ঠিক করেন, কোন জমিটা বিক্রি করবেন। কারণ মেয়ের বিয়ে দিতে গেলেই লাগবে লক্ষ লক্ষ টাকা। কীভাবে মেয়ের বিয়ে দেবেন সেই চিন্তায় অনেক বাবারই অর্ধেক চুলে পাক ধরে যায় অকালেই।
নিজের মেয়ের বিয়েতে যৌতুক দিচ্ছে, আবার ছেলের বিয়েতে যৌতুক নিচ্ছে। নিজের বিয়েতে নিচ্ছে, আবার বোনের বিয়েতে দিচ্ছে। এ এক ভয়ংকর অভিশপ্ত দুষ্টচক্র। আর এই দুষ্টচক্রের পার্ট শুধু অশিক্ষিতরা নয়, তথাকথিত শিক্ষিত জনগোষ্ঠিও।
এই অবস্থার পরিবর্তন করতেই হবে। সেজন্য এগিয়ে আসতে হবে এই প্রজন্মের ব্যাচেলরদের। এই কুপ্রথাকে যারা চ্যালেঞ্জ করতে চান, বিয়েকে যারা সহজ করতে চান, আমি তাদেরকে সাহসী হবার আহবান জানাই। বিয়েকে কঠিন করা হয়েছে বলে যারা গার্জিয়ানদের ওপর ক্ষুব্ধ, তাদের জন্যেও একই কথা। শুধু গার্জিয়ানদের দোষারোপ করলে হবে না, নিজেকেও বদলাতে হবে। কমিয়ে আনতে হবে চাহিদা ও প্রত্যাশা। ধনীর দুলালী নয়, আপনার নিজের ফ্যামিলির চেয়ে তুলনামূলক দরিদ্র পরিবারে বিয়ে করুন। বিয়েও অনেক সহজ হবে, নিজেও সম্মানিত হবেন।

কোনভাবেই যৌতুক নেবেন না। শ্বশুরের কষ্ট হয়- এমন কোনকিছু 'খুশি হবার' নাম করে দিলেও নেবেন না।
কী হবে কিছু টাকার যৌতুক না নিলে? কেন নিজেকে আজীবনের জন্য ছোট করবেন? নাহয় এখন একটা ফ্রিজ নাই থাকলো আপনার নতুন সংসারে! এক বছর টাকা জমান। নিজেই কিনতে পারবেন। একটা ৪৮ ইঞ্চি ফ্ল্যাট টিভি নাইবা থাকলো! কিছুদিন অপেক্ষা করুন। একদিন নিজেই কিনতে পারবেন। দামী ব্র‍্যান্ডের ড্রেসিং টেবিল নাইবা থাকলো! নিজের ঘাম ঝরানো টাকায় একটা আয়না কিনে আনুন না! সেই আয়নার পেছনেই হয়তো আছে ক্রনিকলস অব নার্নিয়ার মত সুখের সাগর।

নতুন টাইলস লাগানো ঝকমকে ফ্ল্যাট বাসা ভাড়ায় কুলাতে পারছেন না, একটা টিনশেড বাসাই নাহয় খুঁজে বের করুন। কিংবা, দুইহাজার স্কয়ার ফিটের বাসা না হোক, দুটো খুপরি ঘর তো পাবেন!
আর সেই ঘরের বারান্দায় বসে, খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে, বউয়ের হাতে হাত রেখে গলা ছেড়ে গেয়ে উঠুন হেমন্তের পুরনো গান-

নীড় ছোট... ক্ষতি নেই...
আকাশ তো বড়ো...
হে মন বলাকা মোর, অজানার আহবানে..
চঞ্চলও পাখা মেলে ধরো...
দেখবেন, সুখ এসে খেলা করছে আপনাদের চোখের তারায়।
(বিবাহ কথন-২১)

শুক্রবার, ৩১ মার্চ, ২০১৭

বিয়ে করতে কত টাকা লাগে?

বিয়ে করতে আসলে কত টাকা লাগে? বিবাহ কথন সিরিজের এই পর্যায়ে এটাই এখন আমাদের সামনে গুরুতর প্রশ্ন।
তবে এই প্রশ্নে নিজের মন্তব্য দেয়ার আগে আমি দুটি কেস হিস্ট্রি তুলে ধরবো। একতরফা না। একজন ছেলের, আর একজন মেয়ের।

কেস হিস্ট্রি-১:
আমাদের দেশে ছাত্রাবস্থায় বিয়ে করতে চাওয়াটাকে এক ধরণের অপরাধ হিসেবেই ধরা হয়। আমার বাসায়ও ভয় পেয়ে গেল। আমাকে অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে বললো, "কোনমতে জাস্ট পাসটা কর, তারপরই বিয়ে দিয়ে দিব; চাকুরিও পাবার দরকার নাই। এখন বিয়ে করলে মানুষ কি বলবে? মান-সম্মান থাকবে?"

আমিও বুঝলাম। পাস করে বের হবার পর বেকার ছিলাম প্রায় ৯ মাস। তখন তো বিয়ের কথা মুখে আনা প্রায় অসম্ভবই। এরপর মোটামাটি আয়-রোজগারের একটা ব্যবস্থা হলো (মাসে ১৮ হাজার টাকার মত)। এর কিছুদিন পর বাসায় আবার বললাম বিয়ে করার কথা। আব্বা বললেন - এই টাকায় ফ্যামিলি চালাতে পারবি? ঢাকা শহরে তো বাড়িভাড়াই হবেনা এই টাকায়। আমি কিন্তু ১ টাকাও দিতে পারব না। You have to be at your own! ভেবে দেখ।
সাত-পাঁচ ভেবে পিছিয়ে আসলাম। ঠিকই তো! এই টাকায় চলব কিভাবে? এভাবে আরও কিছুদিন গেল। আবার বললাম। আবার একই উত্তর। আবার পিছালাম। এভাবেই চললো কিছুদিন।

শেষমেষ ঠিক করলাম। দরকার হলে রিস্কই নিব। আমার পরিচিত অনেকে তো মাসে ৮ হাজার টাকা স্যালারি পেয়েও ২-৩ জন ছেলেমেয়ে নিয়ে সুন্দর সংসার চালাচ্ছে, তাঁরা পারলে আমি পারবোনা কেন? লাইফ-স্ট্যান্ডার্ড নিচে নামিয়ে আনতে হবে? আনবো। দরকার হলে বস্তিতে থাকবো।

এরপর বিয়েটা করেই ফেললাম (জুন, ২০১৩)। আমার ২ ফ্রেন্ডের কাছে ২০ হাজার ও ৩০ হাজার করে মোট ৫০ হাজার টাকা ধার করলাম। হবু বউকে আগেই জানিয়ে দিলাম আমি গরিব মানুষ। পুঁজি বলতে আমার এই ৫০ হাজার টাকাই। এর বেশি মোহরানা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না, আর পুরোটাই নগদ দিতে চাই। সে রাজি হলো।
কিভাবে জানি আরও ১০ হাজার টাকা ম্যানেজ হলো। বিয়ের দিন কি কি সব খরচে দেখি ২ হাজার টাকা শর্ট! দৌড়ায়ে গেলাম ছোট ভাইয়ের কাছে। বিভিন্ন সময়ে সে আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে পাওয়া ১০০, ২০০ টাকা মিলিয়ে যে ২-৩ হাজার টাকা জমিয়েছিল তা থেকে ২ হাজার টাকা ধার দিল। বিয়ে হয়ে গেল।

বিয়ের আগেই একটা বাসা ভাড়া নিয়ে রেখেছিলাম। ভাড়া ৭ হাজার টাকা প্রতি মাসে। বিয়ের ৩-৪ দিন পরই ঢাকায় চলে আসলাম নতুন বাসায়। ফার্নিচার বলতে মেসে থাকার জন্য কেনা ১ হাজার টাকা দামের একটা চৌকি আর ৫০০ টাকা দামের একটা টেবিল আর মেসে মিশুকের ফেলে রেখে যাওয়া একটা প্লাস্টিকের চেয়ার।

সংসার চালানোর জন্য যত খরচ হবে ভেবেছিলাম, দেখলাম বাস্তবে খরচ তার তুলনায় কমই। খরচ বেড়েছে বলতে বাসা ভাড়া ৪ হাজার টাকা (আগে ৩ হাজার লাগত আর তখন ৭ হাজার), খাওয়ার খরচ প্রায় অপরিবর্তিতই আছে (যেহেতু রান্না-বান্না কাজের লোক না রেখে নিজেরাই করি)। তবে আগে যেমন হাতখুলে খরচ করতাম, তখন সেটা মোটামুটি নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসতে হলো। পার্থক্য এটুকুই। সেই খরচেই সুন্দর চলে যেতে লাগলো।

কয়েকমাস পর বউ বললো একটা ফ্রিজ কেনা দরকার। টাকা জমাতে হবে। কয়েকমাস টাকা জমিয়ে ২০ হাজার টাকার মত হলো। ফ্রিজের দোকানে গেলাম। বউ পছন্দ করলো প্রায় ৩০ হাজার টাকা দামের একটা ফ্রিজ। আমি আনইজি ফিল করা শুরু করলাম। আমার কাছে তো এত টাকা নাই। সব মিলিয়ে বাইশ হাজার টাকা হতে পারে। বউ দেখি হাসে। এই কয়দিনে বউও প্রায় ৮ হাজার টাকার মতো জমিয়ে ফেলেছে সংসারের খরচ সেভ করে।

এখনো মাঝে মাঝে অবাক লাগে। আগে টাকার ভয়ে বিয়ে করতে পারিনি আমি। বিয়ের আগে প্রায় এক-দেড় বছর যে আয় ছিল, বিয়ের প্রায় বছরখানেক পর পর্যন্তও আয় ছিল একই। বিয়ের আগের প্রায় এক বছরে সেভিংস ছিল শূন্য টাকা। বিয়ের পরের এক বছরেও সেভিংস শূন্য, কিন্তু ২ জনের একটা সংসার চালিয়েও ফ্রিজসহ আরও অনেক কিছু কেনা হয়ে গেছে!

বিয়ে করলে আসলেই আয়ে বরকত আসে। রিজিকের মালিক আল্লাহ- এটা নতুন করে অনুভব করেছিলাম তখন। যারা টাকার ভয়ে বিয়ে করতে পারছেন না, সাহস করে বিয়েটা করেই ফেলুন। ইনশাল্লাহ, আয়ে বরকত আসবে। রিজিকের মালিক তো আল্লাহই।

ফুটনোটঃ বিয়ের জন্য যে দুই ফ্রেন্ডের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছিলাম, ধার শোধ করে তাঁদের বিয়ের সময়ও সেই একই পরিমান টাকা ধার দিতে পারার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। মাঝে মাঝে এই ৫০ হাজার টাকাকে খুব বরকতময় মনে হয়! কি সুন্দর এই হাত থেকে ঐ হাতে যাবার অছিলায় ৩ জনের বিয়ে সুন্দরভাবে হয়ে গেল! (রনি পারভেজ)

(বিবাহ কথন-১৭)

****

বিয়ে করতে কত টাকা লাগে? এই প্রশ্নে আমি একটা অদ্ভুত উত্তর দেবো, তবে তা আগামী পর্বে। নিজের মন্তব্য দেয়ার আগে যে দুটো কেস হিস্ট্রি উল্লেখ করতে চেয়েছিলাম, আজ থাকছে তার দ্বিতীয়টি।

কেস হিস্ট্রি-২:
আমার বিয়ের শাড়িটির দাম চার হাজার আট'শ টাকা। যেখানে আমারই বোন কিংবা কাজিনদের বিয়ের শাড়ির দাম পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত। আর্থিক সংকটের কারণে যে আমি কম দাম দিয়ে বিয়ের শাড়ি কিনেছি, এমন নয়। আসলে আমার মনে হয়েছে, কী দরকার, একদিনের জন্য এত বেশি টাকা নষ্ট করে! হাতে টাকা পেলে আমি পোশাক কেনার চেয়ে বই কেনায় বেশি মনোযোগ দেই। সে যাক, যার যার রুচির ব্যাপার। তবে এটা বলতে পারি, এক লক্ষ টাকার শাড়ি গায়ে জড়ানো বোনটির চেয়ে আমি মোটেও খারাপ নেই। ভালো থাকা যার যার মানসিকতার ওপর নির্ভর করে। আপনি যদি মনে করেন, আপনি ভালো আছেন, তাহলেই আপনি ভালো থাকবেন।

আমার যখন বিয়ে হয়, আমরা দুজনই স্টুডেন্ট। আমার একুশ, আতিকের তেইশ। আতিক কম বেতনের একটা চাকরি করে, আমার তেমন কোনো আয়-ইনকাম নেই। তবু আমার পরিবার বিয়েতে অমত করেনি। বিয়ের পরে আমরা একরূম সাবলেট নিয়ে উঠেছি। সস্তার আসবাবপত্রের দোকান থেকে কেনা দুই হাজার টাকার একটি খাট, একটি আলনা আর কম্পিউটার ছাড়া আর কিছুই ছিল না আমাদের ঘরে। দীর্ঘদিন আমরা দুইজন কোনো দামী ফোন ব্যবহার করিনি। মনে আছে, দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর আমি কোনো নতুন জামা, জুতো, ব্যাগ কিনিনি। আগের যা ছিল, তাই দিয়েই চালিয়ে নিয়েছি।

এক কেজি গরুর মাংস চার ভাগ করে রান্না করেছি। দিনের পর দিন শুধু সবজি দিয়েই ভাত খেয়েছি। এত যে কষ্ট করেছি, তবু একজনের বিরুদ্ধে আরেকজন কখনো অভিযোগ করিনি। আমাদের পরিবারকেও কখনো বলতে যাইনি, যে আমরা কষ্ট করছি। তারা জানতো, আমরা ভালো আছি। সত্যিই আমরা ভালো আছি। প্রয়োজন ছিল কিছুটা সময় ধৈর্য ধরার। আমরা তা করেছি, তাই দেখতে দেখতে দৃশ্য বদলে গেল, যে জীবন আমরা শুরু করেছিলাম, তার সঙ্গে বর্তমান জীবনের কোনো মিলই নেই! ভাগ্য বদলের জন্য তো প্রচেষ্টা থাকতে হবে, তাই না?

আরেকজনের সাজানো-গোছানো জীবনে প্রবেশ করার চেয়ে দুজন মিলে সাজিয়ে নিলে, সেই জীবনটা আরো বেশি সুন্দর হয়ে উঠতে পারে। (হাবিবা নাসরিন)

(বিবাহ কথন-১৮)

****

এর আগে দুটি কেস স্টাডি দিয়ে আমি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি- বিয়ে করতে খুব বেশি টাকার দরকার নেই। যদি নিয়ত ঠিক থাকে, যদি উভয়ের মেনে নেয়ার মানসিকতা থাকে- তাহলে থাকার জন্য দালানের দরকার হয় না, মাটির ঘরই যথেষ্ট হয়। লাখ লাখ টাকা মোহরানা লাগে না, কোরআনের কয়েকটি সুরাও যথেষ্ট হয়। লাখ টাকার শাড়ি গহনা পাগড়ী শেরোয়ানি লাগে না, লুঙ্গি ফতুয়া আর সাধারণ একটা শাড়ি হলেই চলে। কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করে হাজার মানুষ খাওয়ানো ওয়ালিমা দরকার হয়না, এক প্যাকেট খেজুরের ওয়ালিমাই বরকতপূর্ণ হয়।

এইযে এত জাঁকজমকের আয়োজন, এত আনুষ্ঠানিকতা, এত দর-কষাকষি, এইসব কেন করা হয়? করা হয় শুধুমাত্র তথাকথিত এই সমাজের চোখে, সমাজের মানুষের চোখে বড় সাজার জন্য। মানুষের চোখে প্রশংসা পাওয়ার জন্য। মানুষ কী বলবে- এই তাড়না থেকেই শুরু হয় শো-অফ এর যতসব অসুস্থ প্রতিযোগিতা।

কিন্তু বাস্তবে বিয়ের উদ্দেশ্য যে একটা সুন্দর পরিবার গঠন, সেইখানে এতসব খানাদানা জাঁকজমকের একপয়সার মূল্য নেই। দিনশেষে এই তথাকথিত সমাজ আর সমাজের মানুষেরা শুধু নিন্দাই করে, শুধুই পরশ্রীকাতর হয়, শুধু হিংসাই করে, শুধু সমস্যাই বাড়ায়।

সবকিছু মোকাবেলা করতে হয় শুধু দুজনকেই, পরিবারটাকে টেনে নিতে হয় মাত্র দুজনকেই।
বিয়ে করতে কত টাকা দরকার? আমার উত্তর হলোঃ বিয়ে করতে তত টাকাই দরকার, যতটাকা হলে একটা লুঙ্গি কেনা যায়!! অদ্ভুত শোনাচ্ছে? হাদীস থেকে বাস্তব প্রমাণ দিচ্ছিঃ

সাহল ইবনু সা‘দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক মহিলা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার জীবনকে আপনার হাতে সমর্পণ করতে এসেছি। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাঁকালেন এবং সতর্ক দৃষ্টিতে তার আপাদমস্তক লক্ষ্য করলেন। তারপর তিনি মাথা নিচু করলেন। যখন মহিলাটি দেখল, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সম্পর্কে কোন ফয়সালা দিচ্ছেন না, তখন সে বসে পড়ল। এরপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীদের মধ্যে একজন দাঁড়ালেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! যদি আপনার বিয়ের প্রয়োজন না থাকে, তবে আমার সঙ্গে এর বিয়ে দিয়ে দিন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে কিছু আছে কি? সে উত্তর করলো- না, আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার কাছে কিছুই নেই। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তোমার পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে গিয়ে দেখ, কিছু পাও কিনা। এরপর লোকটি চলে গেল। ফিরে এসে বলল, আল্লাহর কসম! আমি কিছুই পাইনি। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আবার দেখ, লোহার একটি আংটিও যদি পাও। তারপর লোকটি আবার ফিরে গেল। এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! তাও পেলাম না, কিন্তু এই আমার লুঙ্গি (শুধু এটাই আছে)। লোকটি এর অর্ধেক তাকে দিতে চাইল। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে তোমার লুঙ্গি দিয়ে কী করবে? তুমি যদি পরিধান কর, তাহলে তার কোন কাজে আসবে না, আর সে যদি পরিধান করে, তবে তোমার কোন কাজে আসবে না। বেশ কিছুক্ষণ লোকটি নীরবে বসে থাকল। তারপর উঠে দাঁড়াল। সে যেতে উদ্যত হলে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডেকে আনলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কী পরিমাণ কুরআন মাজীদ মুখস্থ আছে? সে বলল, আমার অমুক অমুক সূরা মুখস্থ আছে এবং সে গণনা করল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, এগুলো কি তোমার মুখস্থ আছে? সে বলল, হাঁ। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে পরিমাণ কুরআন তোমার মুখস্থ আছে তার বিনিময়ে এ মেয়েটিকে তোমার অধীনস্থ করে (বিয়ে) দিলাম।
(সহীহ বুখারী)

আপনার যা আছে বিয়ে করার জন্য তা-ই যথেষ্ট। শুধু আপনাকে হতে হবে আরো একটু বেশি কষ্টসহিষ্ণু, টেনে ধরতে হবে আপনার উচ্চাভিলাষের লাগাম, সাময়িকভাবে হয়তো কমিয়ে আনতে হবে জীবনযাত্রার মান। আর হ্যা, খুঁজে বের করতে হবে এমন একজনকে- যিনি আপনার এইটুকু নিয়েই সন্তুষ্টচিত্তে সংসার করতে রাজী আছেন।
(বিবাহ কথন-১৯) 

রবিবার, ১৯ মার্চ, ২০১৭

ফিফটি ফিফটি চান্স

বিয়ের আলাপ যদি সফল না হয়, অর্থাৎ আলাপ যখন আত্মীয়তায় পরিণত না হয়, তখন কোন না কোন একটা পক্ষকে মনোক্ষুন্ন হতেই হয়। পাত্রপক্ষ অথবা পাত্রীপক্ষ। কারণ, শেষ পর্যন্ত তো কোন এক পক্ষ অপর পক্ষকে অপছন্দ করেই বসে। প্রস্তাব বাতিল হয়। হতে পারে এক ফ্যামিলি অন্য ফ্যামিলিকে অথবা ছেলে বা মেয়ে একজন আরেকজনকে অপছন্দ করে। হয়তো মেয়ে পাত্রকে পছন্দ করলো, কিন্তু ছেলে কিংবা ছেলের ফ্যামিলি মেয়েকে অপছন্দ করলো। হয়তো ছেলে পাত্রী পছন্দ করলো, কিন্তু ছেলের পরিবার অপছন্দ করলো মেয়ের পরিবারকে।

প্রথম প্রস্তাবেই বিয়ে হয় এমনটা খুব কমই ঘটে। সাধারণত প্রত্যেক ছেলে বা মেয়েকেই বিয়ের আগে গড়ে চার পাঁচবার এই দেখাদেখি পর্বের মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিটা ক্ষেত্রেই ছেলে কিংবা মেয়ে কাউকে না কাউকে হতাশ হতে হয়। কারো না কারো মন ভেঙ্গে যায়। কাউকে না কাউকে কষ্ট পেতে হয়। প্রত্যাখ্যানের কিংবা স্বপ্নভঙ্গের কষ্ট। 

এই অবস্থা বেশি মোকাবেলা করতে হয় মেয়েদেরকে। বিশেষ করে মেয়ে যদি তথাকথিত প্রচলিত মানদন্ডে একটু কালো হয়, শ্যামলা হয়, বেঁটে হয়। তাই বিয়ের আলাপ শুরুর আগেই গার্ডিয়ানদের উচিত ছেলে এবং মেয়ে উভয়কে মানসিকভাবে তৈরি করা। তাদেরকে জানিয়ে দেয়া, বুঝিয়ে দেয়া উচিত যে- প্রতিটা প্রস্তাব ফিফটি ফিফটি চান্স। যেকোনটাই হতে পারে। যাই হোক, বিশেষ করে নেগেটিভ হলে মনে কষ্ট পাওয়া যাবে না। কেউ যদি তোমাকে অপছন্দ করে তো সেটা তার সমস্যা, তোমার নয়। কোন মানুষই সবার কাছে পছন্দের হয় না। সবার চোখে সুন্দর হয় না। সবচেয়ে যে সুন্দর মেয়েটা বা ছেলেটা, তাকেও কেউ না কেউ অপছন্দ করে। সবচেয়ে যে ভদ্র নম্র মানুষটা, তাকেও অনেকেই পছন্দ করেনা। আর খুব কম মানুষই আছে যারা অন্য কারো ইনার পটেনিশিয়ালিটি উপলব্ধি করার ক্ষমতা রাখে।

পাত্র পাত্রীদের বুঝতে হবে, কেউ যদি আপনাকে অপছন্দ করে, তাহলে আপনার মন খারাপ করার কিছু নেই। কারণ, যে আপনাকে পছন্দ করে না সে কোনভাবেই আপনার জন্য নয়। আপনাকে যার পছন্দ নয়, যার চোখে আপনি সুন্দর নন, তার সাথে বিয়ে হলে আপনি কি সুখী হবেন? আপনাকে খুশি করার জন্য সে কি কখনো কিছু করবে? আপনার জন্য কোন স্যাক্রিফাইস করবে? নিশ্চয় না।

তাহলে কেন আপনি কষ্ট পাবেন? বরং এমন কারো জন্য অপেক্ষা করুন, যে আপনাকে আপনার অবস্থানেই পছন্দ করবে, আপনার যা আছে তাতেই সন্তুষ্ট হবে।

(বিবাহ কথন-১৬)  

শুক্রবার, ১০ মার্চ, ২০১৭

যদি কিছু মনে না করেন !!

ভাই কিছু মনে না করলে একটা কথা বলি??
ভাই, মাইন্ড কইরেন না, আপনাকে একটা কথা বলি??
অনেকেই কথার আগে পরে এইসব ব্যবহার করেন।

আপনি হয়তো কার্টেসি হিসেবে কোন সেনসিটিভ কথা এভাবে শুরু করেন। কিন্তু বাস্তবে এইটার উদাহরণ হলো পাগলকে সাঁকো নাড়ানোর কথা মনে করিয়ে দেয়ার মত। যাকে বলছেন, হয়তো তিনি খেয়ালই করতেন না, আপনি একটা সিরিয়াস কথা বলে ফেলেছেন। কিন্তু আপনি যখনি বলবেন- ভাই মাইন্ড কইরেন না, ঠিক তখনি উনার মনে হবে- নিশ্চয় এই কথাটা মাইন্ড করার মত!!! নাহলে কেন আমাকে এই কথা বললো?

এবং 'মাইন্ড কইরেন না' বলাতে তিনি আর কোনভাবেই 'মাইন্ড' না করে থাকতে পারলেন না!!!

মঙ্গলবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

'স্বামীগিরি'র দিন আর নাই...

আহা কেউ যদি মশারিটা টাঙিয়ে দিত!! আলোচ্য বাক্যাংশটুকু মশার কামড়ে অতিষ্ঠ অলস ছেলেদের স্বগতোক্তি হইতে চয়ন করা হইয়াছে। ইহা ব্যাচেলর ছেলেদের বিবাহের ইচ্ছা প্রকাশের একটি মার্জিত রুপ।

তবে ঠাট্টাচ্ছলে বলা হলেও কথাটা এমনি এমনি আসেনি। এর একটা ঐতিহাসিক পটভূমি আছে। তিরিশ চল্লিশ বছর আগেও বাংলাদেশের গরীব, নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং গ্রামীণ মধ্যবিত্ত পরিবারে স্ত্রীদের একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল স্বামীর পা টিপে দেয়া। স্বামী মানে স্বামীই, সংসারের সত্যিকার রাজা। তাঁর একমাত্র কাজ উপার্জন করা আর সংসারের খরচ জোগানো। আর স্ত্রীর কাজ স্বামীর সেবা করা। মশারি টাঙানো সেখানে স্ত্রীর আরেকটি রুটিন কাজ মাত্র। এমন অনেক পুরুষ তাদের সারাটা জীবন পার করে দিয়েছেন, একদিনও নিজে মশারি টাঙান নি। তাদের সব কাজ করে দিয়েছে ছোটবেলায় মা, বিয়ের পরে বউ। উচ্চবিত্তদের ক্ষেত্রে এই কাজগুলো করার জন্য আলাদা পরিচারিকা থাকতো।
আহা, কেউ যদি মশারিটা টাঙিয়ে দিত! আজও পুরুষের মনে এই ভাবনাটা তাই সেই চিরাচরিত 'স্বামী'সুলভ চেতনা থেকেই উঠে আসে।

এটা হয়তো ক্ষতিকর কিছু নয়। কিন্তু এই চিন্তার অর্থ যদি এই হয় যে পুরুষ তার সংসারে কোন সাংসারিক কাজই করবেন না, সব কাজ সবসময় স্ত্রীকেই করতে হবে, সেটাকে নিশ্চয়ই ঠিক বলা চলে না।

ডিয়ার ব্যাচেলরস টু বি ডেড, দিন বদলাইছে। 'স্বামীগিরি'র দিন আর নাই। বিয়ে করলেই মশারি এখন আর আপনা-আপনি জায়গামত উঠে যাবে না। এই যে আপনি ইচ্ছে করলে মশারি ছাড়াই ঘুমিয়ে পড়েন, দেখার কেউ নাই। সম্ভাবনা প্রবল যে বিয়ের পর এই সুযোগটাও হারাবেন। সময়মতই মশারি টাঙাতে হবে :P :P এবং তা হয়তো আপনাকেই :P ইহার কোনরুপ ব্যতিক্রম হইলে তাহা হইবে আপনার নেহায়েৎ সৌভাগ্য মাত্র :D :D
ডোন্ট বি আপসেট ম্যান। একদিন দুদিন মশারি টাঙালে পুরুষের মান ইজ্জত চলে যায়না!! পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ, মহানবী মুহাম্মাদ(সাঃ) ও নিজের অনেক কাজ নিজেই করতেন। আর তাছাড়া, ইউ নো, মানীর মান জুতা দিয়ে পিটালেও যায় না :D :D
(বিবাহ কথন-১৫)

শনিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

তোমায় নিয়া ঘর বান্ধিবো গহীন বালুর চর....!!

বিয়ের আগে নানান অলীক কল্পনায় ভোগে ব্যাচেলর সমিতির সদস্যরা। তারা মনে করে- বিয়ে করলেই জীবনের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে!! জীবনে আর কোন দুঃখ থাকবে না!! কোনমতে বিয়েটা করলেই কেল্লা ফতেহ!! এরপর শুধু সুখ আর সুখ।

মন্তু মিয়ার গান তাদের জাতীয় সঙ্গীত হয়ে যায়।
"আশা ছিল মনে মনে
প্রেম করিবো তোমার সনে
তোমায় নিয়া ঘর বান্ধিবো গহীন বালুর চর...."


বাস্তবে গহীন বালুর চরে কারোই ঘর বাঁধা হয়না। কিছুদিন এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করে শেষে ঘর বাঁধতে হয় ইট কাঠের শহরে। যেখানে বাসা ভাড়া যোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়। যেখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। অফিসে কাজের চাপ, বসের ঝাড়ি, ব্যবসায় টেনশন, সিটি বাসে বাঁদুড় ঝোলা।
আবার ঘরে ফিরে ব্যাগ হাতে বাজারে যাওয়া। এই দাম কত? দশ টাকা কম নাও। গত সপ্তাহেই তো বিশ টাকায় কিনলাম!!

এই নাই সেই নাই, এই করতে হবে, সেই করতে হবে- শুনে শুনে কান ঝালাপালা হয়ে যায়।

বলা হয়, বিয়ের পর প্রথম ছয় মাস থেকে এক বছর সবাই মহাকাশে উড়তে থাকে :P । মাটিতে তাদের পা পড়ে না। তারপর ধীরে ধীরে মহাকাশযান মহাশুন্য থেকে প্রথমে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে, তারও পরে পৃথিবীর মাটিতে :p অবতরণ করে। এতে নাকি আনুমানিক দেড় থেকে দু'বছর সময় লাগে। :D
 
তারপর জীবন স্বাভাবিক হয়ে আসে, জীবন একঘেয়ে হয়ে আসে। সেই প্রাগৈতিহাসিক সাংসারিক জীবন। আগে থেকে মানসিকভাবে তৈরি না থাকলে ইউফোরিক মুডে ব্যাঘাত ঘটে এমন সবকিছুই তখন বিরক্তিকর লাগে। হঠাৎ মনে হয়- নাহ, আগেই বোধহয় ভালো ছিলাম!! মানসিকভাবে তৈরি না থাকায় নতুন যেকোন সমস্যায় বিগড়ে যায় মন। সংসারে লেগে যায় অশান্তি। ফেসবুকে দেখা যায় নতুন আপডেট- গিবনে কী প্লাম?? :D
 
ব্যাচেলর সমিতির সদস্যদের এইসব অলীক কল্পনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বুঝতে হবে- বিয়ে মানেই সুখের সাগর নয়। বরং বিয়ে করা মানে জীবনের সকল কাঠিন্যের বিপরীতে নিজেকে দায়িত্ববান পুরুষ হিসেবে ঘোষণা করা। বিয়ে মানে সমস্যাসংকুল পৃথিবীর সব বাধা মোকাবেলায় একজন যোগ্য সঙ্গী খুঁজে নেয়া।

বিয়ের পরে একজন পুরুষ কিংবা নারীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলোঃ হাজারটা সমস্যার ভেতরেও একটা হাসিমুখ, আর একটা সবুজ মন বাঁচিয়ে রাখা। সত্যিকার একটা সুখী সংসারের জন্য এইটাই বোধহয় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
(বিবাহ কথন-১৪)