এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...

এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে

বুধবার, ১০ জুলাই, ২০১৩

খাটাশ


মাসুম যখন নানাবাড়ির গ্রামে পৌঁছল , তখন সেখানে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে গিয়েছে । নানাবাড়ির উঠানে বিশাল জটলা । এলাকার বাচ্চা-কাচ্চা –কিশোরদের সংখ্যাই বেশি । ছোটমামা আছেন , আর কয়েকজন অপরিচিত লোককে দেখা যাচ্ছে ।

একটা মাদী খাটাশ ধরা পড়েছিল ধানক্ষেত থেকে । ছেলেপেলেরা পিটিয়ে মেরে ফেলেছে । সেটাও সমস্যা ছিল না । মেরে ফেলার ঘণ্টাখানেক পরে ধানক্ষেতে তিনটি খাটাশের বাচ্চা গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে । বাচ্চাগুলিকে কেউ মারেনি, ধরে নিয়ে আসে মৃত খাটাশটার কাছে । বাচ্চাগুলো ক্ষুধার্ত ছিল । মৃত মা খাটাশের দুধ খাওয়ার চেষ্টা করতে থাকে বাচ্চা তিনটি । এতে এক করুণ দৃশ্য সৃষ্টি হয় । যারা খাটাশটাকে পিটিয়ে মেরে এতক্ষণ বাহাদুরি করছিল, তাদেরও খারাপ লাগে । আহা , বাচ্চাগুলোর এখন কী হবে ? বাচ্চাগুলো দেখতে বিড়ালের বাচ্চার কাছাকাছি । দেখে আদর করতে ইচ্ছে করে । লোকেরা ভেবে পায় না, খাটাশের বাচ্চা সুন্দর হবে কেন ?

খবর পেয়ে স্থানীয় পত্রিকার সাংবাদিক এসেছেন দুজন । দৈনিক ঝিনাইদহ বার্তার  আবিদুর রহমান, দৈনিক মেঘনার আব্দুল হক । তারা ক্যামেরা নিয়ে এসেছেন ।  বাচ্চাগুলোকে নিয়ে কী করা যায় ? সাংবাদিকদের সাথে পরামর্শ করে উপজেলা পশুসম্পদ কার্যালয়ে খবর দিয়েছিলেন মামা । উপজেলা পশুসম্পদ কর্মকর্তা দুজন কর্মচারিকে নিয়ে চলে এসেছেন ।   সিদ্ধান্ত হয়েছে, খাটাশের মৃতদেহটাকে মাটিতে পুতে ফেলা হবে , আর বাচ্চাগুলোকে তিনি নিয়ে যাবেন । চিড়িয়াখানায় পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন তিনি ।

গ্রামের মানুষজন খাটাশটার জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল । প্রায়ই এর বাড়ি ওর বাড়ি থেকে হাঁস, মুরগী, কবুতর ধরে নিয়ে যাচ্ছিল খাটাশ । মাঝে মাঝে দিনের বেলাতেও জঙ্গলের আশপাশ থেকে মুরগীর বাচ্চা ধরে নিয়ে যেত । নানাবাড়ির পশ্চিম পাশে একটা জংলা বাশবাগান আছে । সবাই ভেবেছিল ওখানেই হয়তো আছে খাটাশটা । একদিন ছেলেরা লাঠিসোটা নিয়ে অভিযানে নেমেছিল , কিন্তু তন্ন তন্ন করে খুঁজে জংলায় গর্ত পাওয়া গেলেও খাটাশটাকে পাওয়া যায়নি । জংলার পাশেই ধানক্ষেত । এতদিনে রহস্য উদ্ধার হলো । খাটাশটা একজায়গায় থাকতো না । কয়েক জায়গায় থাকতো । বাচ্চাদের জন্য হয়তো ধানক্ষেতের গর্তকেই নিরাপদ ভেবেছিল । কিন্তু দুর্ভাগ্য । সকালবেলা কামলারা ধান কাটতে নামলে গর্তটা একজনের চোখে পড়ে । সবাই মিলে কাস্তে, বস্তা হাতে গর্তটার চারপাশে ঘিরে ফেলে । খাটাশটা বিপদ টের পেয়ে হঠাৎ বের হয়ে দৌড় দেয় । প্রায় বেরিয়েই গিয়েছিল, কিন্তু একজনের ছুড়ে মারা কাস্তে পায়ে লাগায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে । ধরে বস্তায় ঢুকানো হয় তাকে ।

খবর পেয়ে অনেকেই আসে । ‘তুই আমরার মুরগী খাইছিস’ , ‘হাঁস খাইছিস’ বলে পেটাতে থাকে । বস্তার ভেতরেই মৃত্যু হয় খাটাশটার ।

রিক্সা থেকে নেমে মাসুম জটলা ভেঙ্গে ভেতরে যায় । মামার সাথে কথা বলে । মাসুমের সাথে ওর আম্মাও এসেছে । আম্মা বাড়িতে ঢুকে গেছেন । মামা অবশ্য আগে থেকেই জানতেন । মাসুম ডিজিটাল ক্যামেরায় ছবি তুলে নেয় । তারও খারাপ লাগে । যদিও খাটাশ জাতের ওপর ওর রাগও কম নয় ।

উপজেলা পশুসম্পদ কর্মকর্তা  সবার উদ্দেশে বক্তৃতা করা শুরু করলেন । তিনি বললেন, আপনারা যে খাটাশটা মেরে ফেলেছেন, এর নাম গন্ধগোকুল । এরা ছোট খাটাশ । এই প্রজাতির খাটাশ এখন বিলুপ্তির পথে । আগের মত এদেরকে দেখা যায় না । অল্প যে দুয়েকটা কোনমতে বেঁচে আছে সেগুলোও ঝুঁকির মুখে । মাঝে মাঝে মানুষজন এদের মেরে ফেলে । অথচ এরা নিরীহ প্রাণী । খাদ্যের অভাবে তারা মাঝে মাঝে হাঁস মুরগী চুরি করে ।
এরপরে যদি কখনো খাটাশ ধরেন , দয়া করে মেরে ফেলবেন না । আমাদের খবর দিলে আমরা নিয়ে যাব । অথবা আমাদের কার্যালয়ে পৌঁছে দেবেন ।

মাসুম যখন ছোট , ক্লাস ওয়ানে পড়ে তখন মামা তাকে একটা টিয়া পাখি উপহার দিয়েছিলেন ।  মাসুমরা শহরে থাকে । টিয়াপাখিটা ছিল মাসুমের সর্বক্ষণের সঙ্গী । স্কুলে যাবার আগে, স্কুল থেকে ফিরে টিয়াপাখিটাকে খাবার দিত, টিয়ার খাচা পরিষ্কার করতো, টিয়ার সাথে কথা বলতো । টিয়া পাখিটাকে মামা যখন দিয়েছিলেন, তখন সেটা কথা বলতে পারতো না । একবছর পরে দেখা গেল টিয়াটা মাসুমের সাথে কথা বলে । বাসায় কেউ আসলে বলে ওঠে ‘আসসালামু আলাইকুম’ । ছোট ছোট ছড়াও বলতে পারে ।

আতা গাছে তোতা পাখি ,
ডালিম গাছে মৌ ।
এত ডাকি তবু কথা
কয়না কেন বৌ ?

মৌমাছি মৌমাছি
কোথা যাও নাচি নাচি
দাঁড়াওনা একবার ভাই 
ঐ ফুল ফোটে বনে
যাই মধু আহরণে
দাঁড়াবার সময় যে নাই !

বাসায় কোন মেহমান এলে মাসুম টিয়ার ছড়া শোনাত । মাসুম এক লাইন বলে টিয়ার দিকে তাকালে টিয়া শুরু করত । অস্পষ্ট কথাগুলি মাসুম মেহমানকে বুঝিয়ে দিত । মেহমানরা মাসুমের টিয়ার খুব প্রশংসা করতেন ।

ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময় গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে নানাবাড়ি এসেছিল মাসুম । টিয়া ছাড়া কি সে থাকতে পারে ? টিয়ার খাঁচাটাও কোলে করে নিয়ে এসেছিল । টিয়ার কথা শুনে নানাবাড়ির সবাই তো মুগ্ধ । পাড়ার সব ছেলেমেয়ে টিয়ার ছড়া শুনতে এসেছিল । সবার মুখে মুখে মাসুমের টিয়ার প্রশংসা । মাসুম খুশিতে বাগবাগ ।

মাসুমের মনে পড়ে, নানী আঙ্গিনায় বসে গল্প বলা শুরু করেছিলেন । টুনটুনি ও রাজার গল্প । এক দেশে ছিল এক রাজা । রাজার নাম কাক্কাবোক্কা । রাজার অনেক ধন । রাজার কোষাগারে সোনার মোহরের স্তুপ । রাজা তাঁর মন্ত্রীকে নিয়ে প্রায়ই মোহর গুলো গুনতেন । একদিন দেখলেন, মোহরগুলো ময়লা হয়ে গেছে । ধুয়ে শুকোতে দিয়ে হবে ।
রাজার ছাদে উজ্জ্বল আলো দেখে এগিয়ে যায় টুনটুনি । মোহরগুলো বস্তায় ভরে নেয়ার সময় একটা মোহর ছাদ থেকে গড়িয়ে পড়ে । টুনটুনি সেটি নিজের বাসায় নিয়ে যায় ।
টুনটুনি ছড়া কাটে-

রাজার ঘরে যে ধন আছে ,
টুনির ঘরেও সে ধন আছে ।
রাজার ঘরে যে ধন আছে,
টুনির ঘরেও সে ধন আছে ।

রাজার পেয়াদা শুনতে পেয়ে রাজার কাছে নালিশ করে ।
রাজার হুকুমে টুনটুনির বাসা থেকে মোহরটা নিয়ে যায় পেয়াদারা । টুনটুনি তখন নতুন ছড়া বানায়-

রাজা বড় ধনে কাতর,
টুনির ধন নিল ঘরের ভিতর ।
রাজা বড় ধনে কাতর,
টুনির ধন নিলো ঘরের ভিতর...

বাচ্চারা সুলতানা বিবিয়ানা খেলছিল । টুনটুনি তাদেরকে নতুন ছড়াটি শিখিয়ে দেয়......

গুল্প শুনতে শুনতে নানীর কোলে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল মাসুম জানে না । টিয়ার খাঁচাটা কেউ একজন ঘরে ঢুকিয়ে রেখেছিল । সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে টিয়া নেই । টিয়ার পালক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ঘরের ভেতর । খাঁচার দরজাটা রাতে বন্ধ করা হয়নি । খাটাশে নিয়ে গেছে মাসুমের টিয়া । মাসুম সকালে কিছু খায়নি । সারাদিন কেদেছিল । মামা বারবার বলেছিলেন , বাবা এর চেয়ে সুন্দর টিয়া তোকে কিনে দেব । কাঁদিস না । কিন্তু কিছুতেই মাসুমের কান্না থামেনা ।
ঐ টিয়াটির কথা মনে পড়লে আজও মাসুমের কান্না আসে ।

মামা ঠিকই আরেকটি টিয়া কিনে দিয়েছিলেন । সেটিও কথা বলা শিখেছিল , কিন্তু আগেরটার মত হয় নি । মাসুম যখন ক্লাস সেভেনে, তখন টিয়াটি অসুখে মারা গিয়েছিল ।
আজ যে খাটাশটা মারা হয়েছে , হতে পারে এই সেই । কে জানে !
........................

নানী আজ আর বেঁচে নেই । মামাবাড়ির পেছনে পারিবারিক কবরস্থানে শুয়ে আছেন তিনি । অনেকদিন পর এবার মামাবাড়ি এলো মাসুম । আম্মা খুব জোড়াজুড়ি করছিলেন । মাসুমেরও ইচ্ছা হলো আত্মীয়দের বাড়িতে একবার ঘুরে আসতে । বিশেষ করে নানা নানীর কবরটা জিয়ারত করার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল । মাসুম এখন একজন তরুণ ডাক্তার । ডাক্তার হওয়ার পর একবার যদি মামা খালাদের বাড়িতে না যাওয়া হয় – কে কী ভাববে ?

সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে । মাগরিবের নামাজ পড়ে ল্যাপটপ খুলে বসেছে মাসুম । মোবাইলের বদৌলতে এখন গ্রামেও ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায় । মাসুম খাটাশটার ছবি আপ্লোড করেছে । অনেকেই কমেন্ট করছে । কিরে তুই কই ? এইটা তুই মারছোস ? কেউ লিখেছে- তুই এত নিষ্ঠুর ? আহা । কেউ কেউ লিখেছে- খাটাশটা মারছে ভালোই হইছে !
মাসুম কমেন্টগুলোর উত্তর দিচ্ছিলো । আম্মা এসে বললেন , ড্রয়িং রুমে আয় । তোর মামার বন্ধু এসেছে , তোকে দেখতে চায় । চুলটুল একটু ভালো করে আঁচড়িয়ে আসবি ।

মাসুম একটা হাফ শার্ট পড়ে , আয়নায় একটু মুখটা দেখে চুল আঁচড়িয়ে নিলো । ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখে আম্মা, মামা, মামী, মামার বন্ধু এবং একজন তরুণী বসে আছে । সবাই গল্প করছিলেন । মাসুম সালাম দিল । আম্মা এবং মামার মাঝখানে বসলো । সে একটু ইতস্তত করছিল । মামা তাকে টেনে বসালেন ।

মাসুমের হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিলেন মামা । ‘আমার বন্ধুর সাথে যে মেয়েকে দেখছিস, ওর সাথে তোর বিয়ের কথা হচ্ছে । ভালো করে দেখে নে’ ।
মাসুমের বুকটা ধ্বক করে উঠলো । সে এরকম পরিস্থিতিতে পড়বে- কল্পনাও করেনি ।

মামার সাথে মাসুমের সম্পর্ক অনেক খোলামেলা । মামা অনেক দেরিতে বিয়ে করেছিলেন । ওদিকে মামার বন্ধু, যার মেয়ে এখন মাসুমের সামনে বসে আছে- তিনি অল্পবয়সেই বিয়ে করেছিলেন ।

মামা এবার একটু আনুষ্ঠানিকভাবেই বললেন , ‘মা রিয়া, এ হচ্ছে আমার ভাগ্নে মাসুম । ডাক্তারি পাশ করেছে’ ।
আর মাসুম, ও হচ্ছে রিয়া, আমার দোস্তের বড় মেয়ে । কেসি কলেজে অনার্স পড়ছে । কোন সাবজেক্ট যেন মা ?’
মাসুম ও রিয়া দুজনে চোখ তুলে একে অপরের দিকে তাকালো । চোখাচোখি হয়ে গেল দুজনের । কিছুক্ষণ কেউই চোখ নামালো না । রিয়া কী ভাবছিল কে জানে, কিন্তু মাসুমের মনে হলো , হৈমন্তী গল্পের নায়কের মত ‘পাইলাম, আমি ইহাকে পাইলাম’ ।

মাসুম আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল , হারানো টিয়াপাখির স্মরণে সে তার বউকে টিয়া বলে ডাকবে । মাসুমের বুকের ভেতর যেন ঢাকঢোল বাজতে লাগলো - ‘টিয়া, আমার টিয়া !’

আম্মা মামার বন্ধুকে বললেন, ‘আমার মাসুমকে আমি যা বলবো ও তাই করবে । রিয়া মাকে আমার খুব ভালো লেগেছে । ভাইসাহেব, মাসুমকে আপনাদের পছন্দ হয়েছে কিনা, কবে কখন কীভাবে কী করা যায় আমার ভাইয়ের সাথে আলাপ করবেন’ ।
মাসুম তুই এখন যা ।

মাসুম ভেবেছিল , রিয়ার দিকে আর তাকাবে না । কিন্তু উঠতে উঠতে কেন যেন  আরো একবার চোখাচোখি হয়েই গেল !

........................
খাটাশ / ১০-০৭-২০১৩ 

মঙ্গলবার, ৯ জুলাই, ২০১৩

উড়ে যায় হংসপক্ষী


সাইকেলটা নিয়ে বাড়ির দিকে প্যাডেল চালালো  অপু । যতই বাড়ির কাছাকাছি হতে লাগলো, ততই তার চোখ ঝাপসা হতে লাগলো । বাড়ি থেকে আধা কিলো উত্তরে রাস্তার পাশে বিল । চারধারে উঁচু করে বাধানো । একপাশে একটা বাঁশের সাঁকো আছে । পশ্চিমের রাস্তায় উঠতে হলে সাঁকোটা পার হতে হয় ।

চোখ বেয়ে অশ্রুবিন্দু গালের ওপর এসে পড়েছে ।  অপু সাইকেল থেকে নেমে পড়লো । সাইকেলটাকে হাঁটিয়ে নিয়ে গিয়ে বাঁশের সাকোর একপাশে স্ট্যান্ড করিয়ে রাখলো । পা ঝুলিয়ে বসলো সাঁকোর ওপর । এখন সুর্য পাটে নেমে গেছে । পাখিগুলো যার যার নীড়ে ফিরে যাচ্ছে । মা পাখি বাচ্চাদের জন্য খাবার নিয়ে যাচ্ছে ।

শুন্য দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো অপু । এই গ্রাম, এই সাঁকো । কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এখানে ।

অপু তাদের গ্রামের স্কুলে পড়তো । বাড়িতে মা ওকে পড়াতেন । প্রথম থেকেই অপু ভালো রেজাল্ট করতে লাগলো । ক্লাস ফাইভে বৃত্তিও পেল । অপু হাইস্কুলে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হলো ।  যেদিন বৃত্তির রেজাল্ট হলো, সে তখন স্কুলে । বিকালে ফিরে এসে দেখে আঙ্গিনায় একটা লাল টুকটুকে সাইকেল । মা এসে অপুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন , আর বাবা বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাসতে লাগলেন ।
সাইকেলটা হাতে ধরিয়ে মা বলেছিলেন, ‘বাবা সোনা, এই সাইকেলটা তোর জন্য কিনেছি । তোর পছন্দ হয়েছে ?’  অপু সাইকেলটা খুঁটে খুঁটে দেখেছিল । সাইকেলের নাম  ‘হিরো’ ।
একবছর ধরে টাকা জমিয়ে রেখেছিলেন মা । সকালে অপুর বৃত্তির রেজাল্ট শুনেই সাইকেল কেনার ব্যবস্থা করেন ।

সাইকেল পেয়ে অপুর খুশি আর ধরে না । সাইকেল চালানো সে আগেই শিখেছিল ইলিয়াস চাচার কাছে । চাচার একটা ফোনিক্স সাইকেল আছে । ইলিয়াস চাচা অপুকে খুব আদর করেন । অপু যখন ছোট্ট ছিল তখন থেকেই ইলিয়াস চাচা বিকেলে সাইকেলে করে অপুকে নিয়ে ঘুরতে যেতেন । ধানক্ষেত, বিল, নদী , নদীর ওপর বেইলি ব্রিজ এইসব দেখিয়ে আনতেন । অপু কান্নাকাটি করলে তার একমাত্র অষুধ ছিল ইলিয়াস চাচার সাইকেল । সাইকেলে চড়িয়ে ঘুরিয়ে আনলেই অপু শান্ত হয়ে যেত ।

একবছর অপু ইলিয়াস চাচার কান ঝালাপালা করে দিয়েছিল । ‘চাচা আমি সাইকেল চালাবো’ । চাচা বলেন, বাবা আরেকটু বড় হও । অপুর জেদাজেদিতে ইলিয়াস চাচা তাকে সাইকেল চালানো শেখাতে বাধ্য হন । চাচা পেছনে ক্যারিয়ার ধরে রাখেন , অপু ‘হাফ প্যাডেল’ মারে । চাচা মাঝে মাঝে হাত ছেড়ে দেন , অপুর সাইকেল কাত হয়ে গেলে আবার ধরে ফেলেন । ধীরে ধীরে অপু শিখে ফেলে । কিন্তু ইলিয়াস চাচার সাইকেল অনেক বড় । হ্যান্ডেল ধরে ঝুলতে হয় অপুকে ।
 সাইকেলের  ত্রিভুজাকৃতি ফ্রেমের ভেতর প্যাডেল চালাত অপু । হ্যান্ডেলের নিচ দিয়ে সামনে তাকাতে হত ।

মায়ের দেয়া ছোট সাইকেল অপুর হাতে যেন পুরো পৃথিবী । এখন সে সাইকেলের সিটে বসে চালাবে । সাইকেলে চড়ে স্কুলে যাবে । স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলা দেখতে যাবে । ওদের কয়েকটা ধানী জমি ছিল বেশ দূরে । সেগুলোও দেখতে যেতে পারবে ।
বিকেলে সাইকেল চালিয়ে বাড়িতে ঢোকার আগে অপু বাঁশের সাঁকোটার ওপর এসে বসতো । সাঁকোটা খুব সরু । দুজন মানুষ পাশাপাশি হাঁটতেও কষ্ট হয় । অপুর মাথায় খেয়াল চাপে একদিন সাইকেলে চড়েই সাঁকোটা পার হতে হবে ।
স্কুল থেকে ফিরে সাঁকো পার হবার প্র্যাকটিস করতে শুরু করলো অপু । প্রথমে সে মাঠের সরু আইল ধরে চালানো শুরু করলো । বেশ কিছুদিন চালিয়ে যখন মোটামুটি সাহস হয়ে গেল , একদিন বিকেলবেলা সাইকেল নিয়ে এসে দাঁড়ালো সাঁকোর কাছে । আশেপাশে কেউ নেই দেখে দু-তিনশ গজ দূর থেকে সাইকেলে উঠে গতি বাড়িয়ে নিলো । নিঃশ্বাস বন্ধ করে সাইকেল তুলে দিল সাঁকোর ওপর । সাঁকো দুলতে লাগলো ।  সাইকেল লাফিয়ে লাফিয়ে উঠতে লাগলো । তিনভাগের দুইভাগ পার হয়েছে এমন সময় সামনের চাকাটা স্লিপ করে গেল । টাল সামলাতে পারেনি অপু । সাইকেল সহ পড়ে গিয়েছিল খালের পানিতে ।

.......................................

অপু জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল । জ্ঞান ফিরলে দেখে সে হাসপাতালে । তার হাতে পায়ে বেশ কয়েকটা ব্যান্ডেজ । কান্না ভেজা চোখে মা বসে আছেন মাথার কাছে । ওকে চোখ খুলতে দেখেই মা কেঁদে উঠলেন । আমার বাবা, আমার সোনা । বাবা আমার, এখন কেমন লাগছে বাবা ? ব্যথা করছে ? সব দোষ আমার, আমি কেন তোকে সাইকেল কিনে দিলাম ?’
অপু জিজ্ঞেস করলো, ‘মা, আমার সাইকেল কোথায় ? সাইকেলটা ঠিক আছে তো ?’
ইলিয়াস চাচা এসে ঢুকলেন রুমে । বললেন, তোর সাইকেলের রিং বাঁকা হয়ে গেছে । চিন্তা করিস না , আমি ঠিক করে দেবো ।
অপু যখন সাঁকো থেকে পড়ে যায় , ইলিয়াস চাচা তখন মূল রাস্তা ধরে বাজারের দিকে যাচ্ছিলেন । হঠাৎ সাঁকোর দিক থেকে শব্দ শুনে তিনি এগিয়ে এসে দেখেন অপু পড়ে গেছে । তিনি তাড়াতাড়ি খালের পানিতে লাফ দিয়ে অপুকে উদ্ধার করেন ।
সেবার অপুর বাম হাত ভেঙ্গে গিয়েছিল । প্রায় দুইমাস তাকে ঘরে বসে থাকতে হয়েছিল ।

সাঁকোর ওপর বসে মায়ের কথা খুব মনে পড়তে লাগলো অপুর । মা কেন এভাবে চলে গেল ?
অপু ক্লাস এইটেও বৃত্তি পেয়েছিল । প্রাইমারিতে সাধারণ গ্রেডে পেলেও জুনিয়র বৃত্তিতে ট্যালেন্টপুল পেয়েছিল । ভালোয় ভালোয় এসএসসি পরীক্ষাও দিল । এসএসসি পরীক্ষার শেষদিকে মায়ের শরীরটা কেমন শুকনো শুকনো হয়ে যেতে লাগলো । মা প্রতিদিন পরীক্ষা দিতে যাবার আগে নিজ হাতে অপুকে দুধভাত খাইয়ে দিতেন । অপু জিজ্ঞেস করে – তোমাকে এমন শুকনো লাগছে কেন মা ? মা বলেন, ও নিয়ে তুই চিন্তা করিস না বাবা । আমি ভালো আছি । তুই ভালো করে পরীক্ষা দে । এ প্লাস পেতে  হবে কিন্তু ।
অপু বলেছিল, তোমার দোয়া থাকলে এ প্লাস আমি পাবোই মা ।
কে জানতো, জীবনটা এভাবে এলোমেলো হয়ে যাবে ! শুন্য হয়ে যাবে । মায়ের শরীর আরো খারাপ হতে লাগলো । একদিন বাবাসহ মাকে নিয়ে উপজেলা হাসপাতালে গেল অপুরা । ডাক্তার কিছু টেস্ট দিলেন । সেগুলো করানোর পর ডাক্তার পরামর্শ দিলেন বড় হাসপাতালে নেয়ার । এখানে কিছু করার নেই ।

মাকে নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেল অপু ও বাবা । সেখানে আরো কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা হল । ডাক্তারের সাথে কথা বলে বাবা খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন । বাবার মুখ শুকিয়ে গেল । অপু জিজ্ঞেস করে – বাবা, কী হয়েছে মার ?
বাবা বলেন, কিছু হয়নি বাবা । সামান্য অসুখ । কদিন পরেই ঠিক হয়ে যাবে ।
বাবার চোখ ছলছল করে । অপুর কাছে তিনি আড়াল করেন ।

মাকে নিয়ে ঢাকায় গেল ওরা । বাবা তাঁর মুদি দোকান বিক্রি করে দিলেন । ধানী জমি বিক্রি করে দিলেন । চিকিৎসা চলতে লাগলো । কিন্তু মায়ের অবস্থা আরো খারাপের দিকেই যেতে লাগলো । মাথার চুল পড়ে গেল । সুন্দর গোলগাল মুখটা কেমন যেন শুকিয়ে চুপসে গেছে ।

অপু সবসময় মায়ের কাছে বসে থাকে । মায়ের কাপড় চোপড় ধুয়ে দেয় । খাবার খাইয়ে দেয় । কিছু লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করে । মা বলেন, কিচ্ছু লাগবে না বাপ । তুইই আমার সব । তুই কাছে থাকলে আমার আর কিচ্ছু লাগবে না । অপুর মন খারাপ দেখে সবসময় বলেন, বাবা দেখিস, আমি কিছুদিনের মধ্যে ভালো হয়ে যাবো । তোকে ছাড়া কি আমি থাকতে পারি ?
অপুর মন মানে না । মাঝে মাঝে হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে । নামাজ পড়ে দোয়া করে । চোখ মুছে মায়ের কাছে ফিরে আসে ।

মা কথা রাখেন নি । অবস্থা আরো খারাপ হয়ে গিয়েছিল । বাবা আর গোপন করেন নি । অপুকে বলে দিয়েছেন, তোর মায়ের ফুসফুসে ক্যান্সার হয়েছে বাপ । ও বাঁচবে কিনা জানিনা ।

এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট হবার দিন  মায়ের কাছে বসে ছিল অপু । ইলিয়াস চাচা স্কুলে টেলিফোন করে রেজাল্ট জেনে এসেছেন । অপু এ প্লাস পেয়েছে । সেবছর চতুর্থ বিষয়ের পয়েন্ট যোগ হয়নি । রেজাল্ট শুনে মার শুকনো চোখ বেয়ে অশ্রু গড়াতে লাগলো । মা বললেন , বাবা আমি বোধহয় আর থাকতে পারবো নারে । তুই ভালো করে লেখাপড়া করিস । আমি সবসময় তোকে দোয়া করবো । শহরে গিয়ে কলেজে ভর্তি হবি । আশা ছিল তোকে ডাক্তার বানাবো । তুই ডাক্তার হবি । আমার কথা ভেবে রোগীদের চিকিৎসা করবি ।

রানু খালাকে ডেকে নিলেন মা । খালার মেয়ে মিলিকে আদর করলেন । খালাকে বললেন, রানু- মনে আশা ছিল তোর মেয়েটাকে আমার বাড়ির বৌ বানাবো । আমার অপুর জন্য ওকে নিয়ে আসব । আমি বোধহয় থাকবো নারে । তুই ওর সাথে মিলির বিয়ে দিস ।
অপু অঝোরে কাঁদছিল । মা তাকে ডেকে বুকের সাথে জড়িয়ে রাখলেন । বললেন , বাবা , কষ্ট নিস না । আমি তোর সাথেই থাকবো । তোর জন্য আমি মিলিকে পছন্দ করে দিয়ে গেলাম ।
অপুর মুখে কথা ছিল না । ও শুধু মা মা করেছিল । আসরের আজানের সময় মা ওকে একা রেখে চিরবিদায় নিলেন ।

...................................................

অপু শহরে গিয়ে সরকারি কলেজে ভর্তি হল । বই কেনার জন্য সাইকেলটা বিক্রি করে দিল । এইচএসসিতেও ভালো রেজাল্ট করলো । একটা কোচিং এ ফ্রিতে ভর্তি হলো । কোচিং এর বড় ভাইরা তাকে খুব স্নেহ করতেন । সে কোচিং এর পরীক্ষায় ভালো করতে লাগলো ।
মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিল । চান্স পেল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ।
আজ মায়ের স্বপ্ন পুরণ হয়েছে । অপু ডাক্তার হয়েছে । কিন্তু মা নেই । মায়ের দেয়া  সাইকেলটা নেই । খুব বিপদে পড়েই ওটা বিক্রি করেছিল অপু । তাছাড়া মা নেই, সাইকেল রেখে কী লাভ ? এমন ধারণাও করেছিল তখন । কিন্তু সাইকেলটা বিক্রি করার পর সেই রাতে অঝোরে কেঁদেছিল সে ।

কয়েকদিন থেকে বাবা ফোন করছেন বাড়িতে আসার জন্য । খালাও ফোন করেছিলেন । অপু ধারণা করছে, হয়তো তার বিয়ের ব্যাপারে চিন্তা করছেন বাবা ।  খালার বাড়িতে খুব একটা যাওয়া হত না অপুর । গত সাত-আট বছরে দুবার কি তিনবার গিয়েছে । মিলি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে । দেখতে নাকি খুব সুন্দর হয়েছে । অপু খুব একটা খোজখবর নেয়নি কখনো । বাবা মাঝে মাঝে নিজে যেঁচে মিলির কথা বলতেন । অপুর লজ্জা করতো । বাবা সম্ভবত অপুকে মায়ের শেষ ইচ্ছার কথাটা স্মরণ করিয়ে দিতেন । ইলিয়াস চাচা জানিয়েছে, দুই পরিবারের মধ্যে সব কথাবার্তা-প্রস্তুতি সম্পন্ন । এবার অপু বাড়িতে এলেই বিয়েটা ঘরোয়াভাবে সেরে ফেলবে । কোন ধুমধাম হবে না ।

বাড়িতে আসার আগে মায়ের দেয়া সেই সাইকেলটার কথা স্মরণ করে একটা সাইকেল কিনেছে অপু।  সাইকেলটা বাসের ওপর উঠিয়ে নিয়ে এসেছে । বাসস্ট্যান্ড থেকে নেমে সাইকেলে চড়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছিল সে । সাইকেল নিয়ে  রাস্তায় নেমে শুধু মায়ের কথা মনে পড়ছিল । পুরনো দিনের কথা মনে পড়ছিল । চোখটা ভিজে যাচ্ছিল । চিন্তাভাবনাগুলো কেমন বিক্ষিপ্ত হয়ে উঠছিল ।

আকাশে বক উড়ে যাচ্ছে । দূর আকাশে কয়েকটি চিল উড়ছে । জীবনানন্দের কবিতা মাথায় এলো-

‘‘হায়  চিল, সোনালী ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর কেঁদো নাকো উড়ে-উড়ে ধানসিঁড়ি নদীটির পাশে!
তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে!
পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো সে যে চলে গেছে রূপ নিয়ে দূরে; ......’’

সাঁকোর নিচ দিয়ে প্যাক প্যাক করতে করতে কয়েকটি রাজহাঁস সাতার কেটে গেল । অপুর মাথায় এলো- উইড়া যায়রে হংস পক্ষী পইড়া রয়রে মায়া ...

সাঁকোর গোড়ায়, যেখানে সাইকেল রেখেছে অপু,  সেদিক থেকে টুং করে শব্দ হলো । সাঁকোটাও যেন একটু কেঁপে উঠলো । ঝাপসা চোখে সেদিকে তাকালো অপু । অবাক হয়ে দেখলো- সাঁকোর ওপর উঠে হেঁটে হেঁটে তার দিকে এগিয়ে আসছে  মিলি । গোধুলীর লাল আলো তার মুখে এসে পড়েছে ।

...........................
উড়ে যায় হংসপক্ষী / ০৯-০৭-২০১৩

সোমবার, ৮ জুলাই, ২০১৩

দাঁত তুলে ফেলবো


দরজা বন্ধ করে ফারিহা বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো । দরজার বাইরে মা হতভম্ব হয়ে বসে রইলেন । কি জানি কী হলো ? ছেলে কি ওর পছন্দ হয়নি ? পছন্দ না হলে বলুক , কান্নাকাটির কী দরকার ? মেয়েটা বড্ড ছিঁচকাঁদুনে । সেই ছোটবেলা থেকেই । কিছু না পেলেও কাঁদে, কিছু পেলেও কাঁদে । বড্ড আবেগী ।

একটাই মেয়ে রেহানা বেগমের । ছোট্ট পুতুলের মত জন্ম হয়েছিল ওর । সারাক্ষণ বুকে-পিঠে জড়িয়ে রাখতেন । এক মুহুর্ত চোখের আড়াল করতেন না । রান্নার সময়ও পিঠে বেঁধে রাখতেন । ও যেন নিজের দেহেরই একটা অংশ । মেয়েটাও ছিল মায়ের ন্যাওটা । সারাক্ষণ আঁচল ধরে থাকত ।

ধীরে ধীরে বড় হল মেয়ে । শরীরের অংশটা যেন শরীর থেকে আলাদা হতে লাগলো । কলেজ পড়া পর্যন্ত মেয়েকে চোখে চোখে রেখেছিলেন রেহানা । স্কুলে নিয়ে যাওয়া, স্কুল ছুটি না হওয়া পর্যন্ত গার্ডিয়ান টেন্টে বসে থাকা । অন্য বাচ্চাদের মায়ের কাছে ফারিহার গল্প করা । এভাবেই কেটে গিয়েছিল দিনগুলি । সে কম সময় নয় , এক যুগেরও বেশি ।

একটু একটু করে মেয়ে বড় হল, আর শরীরের অংশও যেন একটু একটু করে দূরে সরে গেল । একসময় মেয়ে ইন্টারমিডিয়েট পাস করলো । বিভিন্ন ভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষা দিল । চান্স পেল ঢাকা ডেন্টাল কলেজে । মেয়েকে রেখে আসতে হল ঢাকায় । রেহানার সেদিন মনে হয়েছিল যেন তাঁর নিজের জীবনটাই ঢাকায় রেখে যাচ্ছেন । বিদায়ের আগ মুহুর্তে মা-মেয়ে সেকি কান্না । সেসব কথা কি কোনদিন ভোলা যায় ?

ফারিহার বাবা ব্যাংকার । অনেক চেষ্টা করেও ঢাকায় পোস্টিং নিতে পারেন নি । আর যে বেতন পান- সেই বেতনে জেলা শহরে ভালোভাবে থাকা যায় , কিন্তু ঢাকা শহরে সম্ভব না । বাসা ভাড়াতেই তো সব চলে যাবে । ফারিহাকে ঢাকায় একা রেখে আসতে বুক ফেটে গেলেও তাই ঢাকায় থাকার চিন্তাটা বাদ দিতে হয়েছিল ।

প্রথম প্রথম মেয়ে প্রতি সপ্তাহে বাড়িতে আসত । ধীরে ধীরে সেটাও কমে গেল । মেয়ের পড়াশোনার খুব চাপ । মাসে-দুমাসে একবার করে আসে । রেহানাও তখন আরেকটা ছেলে পুতুল পেয়েছেন । তাঁর একাকীত্বটাও ততটা নেই আর । ফারিহার শুন্যতা পুরণ করেছে জীয়ন । মেয়ের সাথে মোবাইলে কথা হত প্রতিদিন ।

আজ আবার সেই পুরনো অনুভুতিটা বোধ করছেন রেহানা । ফারিহাকে ঢাকায় রেখে আসার সময় যে শুন্যতা বুকে চেপে বসেছিল , আজ হঠাৎ সেই শুন্যতাটা যেন ফিরে আসছে । কীই বা করার আছে ? মেয়ের পড়াশনা শেষ । বাসায় বসে আছে ছয় মাস । বয়স ২৪ হয়ে গেছে । বিয়ে তো দিতেই হবে ।

কাউকে পছন্দ আছে কিনা ফারিহা কখনো বলে নি । মাঝে মাঝে বিয়ের প্রসঙ্গ তুললে সে এড়িয়ে যেত । ‘মা , এই প্রসংগটা বাদ দাওতো । অন্য কথা বল । আমাকে এ বাড়ি থেকে বের করে দিতে ইচ্ছে করছে তোমার ? তাহলে বল, আমি কালকেই কোথাও চলে যাব’ । এরপর আর কথা চলে না ।

গতকাল রাতে রেহানার ছোটভাই মন্টু এসেছে । সে একটা ছেলের ছবি নিয়ে এসেছে । ছেলের চাচার সাথে একই অফিসে কাজ করেন । পুরনো কলিগ । কলিগের ভাতিজাও ঢাকা ডেন্টাল কলেজ থেকে পাস করেছে । ফারিহার এক বছর সিনিয়র । রাতে ভাইয়ের সাথে এসব নিয়ে কথা হয় রেহানার । সকাল বেলা টিভি দেখার ফাঁকে ফারিহাকে ছবিটা দেখায় তাঁর মামা । ছবির নিচে নামও লেখা ছিল, ফারহান । এরপর ফারিহা হঠাৎ উঠে গিয়ে রুমের দরজা বন্ধ করে দিল । এখন ফুঁপিয়ে কাঁদছে । কী হলো কিছুই বুঝতে পারছেন না রেহানা ।

.............................................

‘মা , তুমি যাও । দরজার সামনে বসে থাকার দরকার নেই’ ।
দরজা খুলে কথাটা বলেই আবার দরজা বন্ধ করে দিল ফারিহা । তাঁর নিজস্ব ড্রয়ারটা খুলে একটা জন্মদিনের কার্ড বের করলো । কার্ডের উপরে বড় অক্ষরে লেখা- ফারিহাকে ফারহান । ব্রাকেটে লেখা ‘দাঁত তুলে ফেলবো’ ।

ফারহানের সাথে প্রথম দেখার দিনটা যেন চোখের সামনে ভেসে উঠলো । ওরা ক্যাম্পাসে আসার মাসখানেক পরে নবীণ বরণ অনুষ্ঠান হয় । অনুষ্ঠানে উপস্থাপক ছিল সেকেন্ড ইয়ারের ফারহান । ফারিহার একটা গান গাওয়ার কথা । মাইকে ঘোষণা করলো ফারিহার নাম । ফারিহা স্টেজে ওঠার সময় ফারহান বললো- এই পিচ্চি, গান ভালো না হলে কিন্তু দাঁত তুলে ফেলবো ! ফারিহা তো অবাক । নতুন একজনকে প্রথম বার কথাতেই কেউ এরকম কথা বলে নাকি ? দাঁত তুলে ফেলবো !

পারফর্মেন্স ভালো হয়েছিল । কিন্তু ফারিহা সেই কথাটা ভুলতে পারেনি । একদিন ক্যান্টিনে দেখা হল ফারহানের সাথে । ফারিহা বললো- ভাইয়া , দাঁত তুলে ফেলবেন না ? ফারহান বললো- ‘নাহ ! গান ভালোই গেয়েছ । এখন দাঁত তুলে ফেলার দরকার নেই । তবে আমার সাথে কখনো বেয়াদবি করলে কিন্তু ঠিকই দাঁত তুলে ফেলবো’ ।
হিহি করে হেসে ফেলে ফারিহা । ফারহান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে । হাসিটা তাঁর ভালো লেগেছিল । পরে একদিন ফারহান বলেছিল- ‘ফারিহা, তোমার হাসিটা না খুব সুন্দর । তোমার দাঁত আমি কখনোই তুলতে পারবো না’ ।

এরপর থেকে ঘন ঘন দেখা হয় । কীভাবে কীভাবে যেন একটা কমন রুটিন তৈরি হয়ে যায় । দুজনে একই সময়ে ক্যান্টিনে আসে । টুকটাক কথা হয় । ফার্স্ট প্রফে ফারহান ভালো মার্কস পেয়েছিল । ফারিহা ওর কাছে বিভিন্ন পরামর্শ নেয় । ধীরে ধীরে কথার পরিমাণ বাড়তে থাকে । মোবাইল নাম্বার বিনিময় হয় । কে আগে মোবাইল নাম্বার নিয়েছিল ? মনে পড়ে, প্রথম কলটা ফারিহাই করেছিল ফারহানকে । কী একটা বিষয়ে যেন পরামর্শ নেয়ার জন্য । ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে । ক্যাম্পাসের ভেতরেও দুজনকে একসাথে দেখা যায় । ক্যাম্পাসের গন্ডি পেরিয়ে তা একসময় চাইনিজ রেস্তোরাঁয় গড়ায় ।

ক্যাম্পাসে কানাকানি হয় । বন্ধুরা খাতার ওপর লিখে দেয় – ফারহান + ফারিহা । নামের মিলটাও খুব ভালো লাগে ওদের । কীভাবে এই মিলটা হলো ওরা ভেবে পায় না । কিন্তু মনে করে- তাদের জুটিটা আসলে পারফেক্ট । সারাজীবন ওরা একসাথে থাকবে ।

এক বছর খুব ভালোই ছিল । হাসি ঠাট্টা , মোবাইলে কথা , চিঠি, গিফট বিনিময় । মিরপুরের সব জায়গায় ওদের পা পড়েছে । সারাদিন একজন আরেকজনের কথা ভাবে । ফারিহা তো ফারহানের গল্প করতে করতে বান্ধবীদের কান ঝালাপালা করে দিয়েছিল । ফারহান কথায় কথায় বলে – দাঁত তুলে ফেলবো !

ছোটবেলায় একবার ডাঙ্গুলি খেলতে গিয়ে বন্ধুদের সাথে মারামারি হয়েছিল ফারহানের । তখন বয়স আট কি দশ । দুধদাঁত পড়ে গিয়ে পার্মানেন্ট দাঁত ওঠার বয়স । ফারহান ওর বন্ধু মিন্টুকে একটা ঘুষি মেরেছিল । ঘুষিটা মিন্টুর গালে লাগে । মিন্টুর মুখে রক্ত চলে আসে । থুতু ফেললে দেখা যায় , মিন্টুর একটা দাঁত পড়ে গেছে । সবাই বলতে লাগলো – ফারহান ঘুষি মেরে মিন্টুর দাঁত ফেলে দিয়েছে । আসলে মিন্টুর একটা দাঁত আগে থেকেই নড়বড়ে ছিল । কিন্তু কে শোনে কার কথা । পাড়ায় বাচ্চাদের মাঝে খবর রটে গেল , ফারহান ঘুষি মেরে দাঁত ফেলে দেয় । বাচ্চারা একজন আরেকজনকে ভয় দেখাতে লাগলো – ফারহান ভাইয়াকে ডাকবো ? ঘুষি মেরে তোর দাঁত ফেলে দিবে ! ফারহান হিরো হয়ে গেল । সে তখন এই ডায়লগটা দেয়া শুরু করলো – ‘দাঁত তুলে ফেলবো’ । পরে সে যখন ঢাকা ডেন্টাল কলেজে চান্স পেল – তাঁর মনে হল , এটাই ভাগ্যে ছিল । ভবিষ্যতে আসলেই তাকে দাঁত তুলতে হবে । টুথ এক্সট্রাকশন । বিশেষ করে থার্ড মোলার । যাকে বলে আক্কেল দাঁত । ডায়লগটা সে আর ছাড়েনি । কিছু হলেই বলে – ‘দাঁত তুলে ফেলবো’ !

...........................

ফারিহার ফার্স্ট প্রফ পরীক্ষার রেজাল্ট হয়ে গেছে । ফারিহা প্লেস করেছে । নাইন্থ প্লেস । কিন্তু ফারহানের মাঝে কেমন যেন একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করছিল সে কিছুদিন ধরেই । আগের মত অতটা উচ্ছাস দিয়ে কথা বলে না , সহজে দেখা করতে চায়না । দেখা করতে বললে একা না এসে সাথে আরেকজন বন্ধুকে নিয়ে আসে । আগে রংচঙ্গা টি-শার্ট, ছেড়া জিন্স এসব হাল ফ্যাশনের কাপড় পড়ত । এখন অনেকটা ফরমাল কাপড়চোপড় পড়ে । দেখতে অবশ্য অনেক স্মার্ট দেখায় । মনে হয় – আগের চেয়ে এখনকার পোষাকেই ওকে বেশি ভালো লাগে । আগে জিন্সের প্যান্ট যেন রাস্তায় ঝাড়ু দিত । এখন প্যান্ট একটু উপড়ে থাকে । ছোট ছোট দাড়িও রেখেছে । দেখতে আগের চেয়ে একেবারে প্রায় ভিন্ন, কিন্তু অনেক ভদ্র, আরো বেশি সুন্দর, হ্যান্ডসাম লাগে ।

একদিন ফারহান ফারিহাকে ফোন করে দেখা করতে বললো । একা । মিরপুর-১০ এ । অনেক দিন পরে ফারহান এভাবে দেখা করতে ডাকলো । ফারিহা অনেক খুশি মনে গিয়েছিল । গিয়ে দেখে রেস্টুরেন্টের একটা টেবিলে ফারহান গম্ভীর মুখে বসে আছে । আইসক্রিম আর জুসের অর্ডার দিল ফারহান ।

‘ফারিহা , আজ আমি তোমাকে কিছু খুব গুরুত্বপুর্ণ কথা বলবো । তুমি মনকে শক্ত কর’ ।
ফারিহার বুক কেঁপে ওঠে । কী বলতে চায় ফারহান ? ব্রেক আপ ?
‘ফারিহা, তুমি আমাকে কতটা ভালোবাস ?’
‘তোমাকে কতটা ভালোবাসি আমি বোঝাতে পারবো না’ । কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলেছিল ফারিহা ।
‘ফারিহা, আমিও তোমাকে ভালোবাসি । সেজন্যেই আমি চাইনা তোমার কোন ক্ষতি হোক । তুমি কি চাও আমার কোন ক্ষতি হোক ?’
‘কী বলছ তুমি ? তোমার বিন্দুমাত্র ক্ষতি হবার আগে যেন আমার মরণ হয় !’
‘দেখ ফারিহা , তুমি কি জান- এইযে আমরা দুজনে এভাবে দেখা করি, কথা বলি এতে আমাদের দুজনেরই ক্ষতি হয় ? আমরা মুসলিম । আমাদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ । তিনি আমাদের সৃষ্টি করে দুনিয়াতে এমনিতেই ছেড়ে দেননি । আমাদের জন্য ম্যানুয়াল দিয়েছেন । টিউটর দিয়েছেন । তুমি জান সেটা কি ? ম্যানুয়ালটি হচ্ছে আল কুরআন । আর টিউটর হলেন নবী । তুমি নিশ্চয়ই আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা, রাসুলকে আল্লাহর প্রেরিত বার্তাবাহক, এবং কুরআনকে আল্লাহর বাণী বলে বিশ্বাস কর ?
’‘হু, করি’ ।
‘সমাজের মঙ্গলের জন্য , মানব জাতির মংগলের জন্য এতে বিধান দেয়া হয়েছে । বিয়ের আগে আমাদের এভাবে দেখা করা , যোগাযোগ রাখা, অবাধে মেলামেশা করা ইসলামে নিষেধ আছে । এতে আমাদের পাপ হচ্ছে, গুনাহ হচ্ছে । আল্লাহ অসন্তুষ্ট হচ্ছেন । আল্লাহ ক্ষমা না করলে এর জন্য আমাদের পরকালে শাস্তি পেতে হবে । আমাকে শাস্তি পেতে দেখলে , আগুনে পুড়তে দেখলে তুমি খুশি হবে ?’
‘না । তার আগে আমি আগুনে পুড়বো’ ।
‘কিন্তু আমি চাইনা তুমি আগুনে পোড় । মুসলিমরা চায় সকল মানুষের জন্য মৃত্যুর আগে এবং পরে সবসময়ের জন্য শান্তি’ ।
‘তাহলে চল আমরা বিয়ে করে ফেলি’ ।
‘ফারিহা, সেটা এখনই সম্ভব নয় । আমার এখনো গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট হয়নি । তোমারও হয়নি । তোমার এবং আমার কোন পরিবারের কেউই রাজী হবে না । বাবা-মা’র অমতে বিয়ে করলে জীবনে সুখি হবনা আমরা । আর এখন আমার কী আছে বলো ? তুমি তো আমার অবস্থা জানো’ ।
‘আমি অতকিছু বুঝিনা । তুমি আমার কাছ থেকে সরে যেতে পারবে না’ ।
‘ফারিহা, আমি তোমাকে ভালবাসি, তুমি আমাকে ভালবাস । কিন্তু সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ, আমাদের বাবা মা আমাদেরকে এরচেয়েও বেশি ভালবাসেন । তাঁদেরকে কষ্ট দেয়া ঠিক না । আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করবো । গ্রাজুয়েশন শেষে আমি মোটামুটি গুছিয়ে নিতে পারলেই আমরা বিয়ে করবো । তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করতে পারবে না ?’

ফারিহার চোখ ভিজে গিয়েছিল । সে কী বলবে ? ফারহান আরো বলেছিল – ‘ফারিহা, যদি তুমি আমাকে সত্যিই ভালোবেসে থাক তাহলে অপেক্ষা করো । এটা আমাদের দুজনেরই ভালবাসার পরীক্ষা । সময় হলে , আমি প্রথমে তোমাকেই খুজবো । যদি তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করতে পারো, তাহলে আমরা সারাজীবনের জন্য একসাথে থাকবো’ । ফারিহার রুমাল চোখের পানিতে ভিজে গিয়েছিল । ফারহানের চোখেও জল টলমল করছিল । কিন্তু ও খুব শক্ত ছিল । হয়তো ফারহানও কেঁদেছিল তাঁর রুমে ফিরে । গোপনে, নীরবে ।

তাদের আর কথা হয়নি । যতদিন ক্যাম্পাসে ছিল, মাঝে মাঝে করিডোরে চোখাচোখি হত । ফারিহা জিজ্ঞেস করতো- ‘কেমন আছেন ?’ ফারহান হয়তো মাথা নাড়ত, অথবা ছোট্ট করে উত্তর দিত –আলহামদুলিল্লাহ্‌ । তুমি ভালো আছ ? তারপর প্রায় পাঁচ বছর কেটে গেছে । ফারিহা অপেক্ষা করেছে । জসীমউদ্দিনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ কবিতায় সোনাই যেভাবে অপেক্ষা করেছিল রুপাইর জন্য , ফারিহা সেভাবেই অপেক্ষা করেছে । ফারহান তার কথা রেখেছে । তার চাচার কলিগ, ফারিহার মন্টু মামার মাধ্যমে তার ছবি পাঠিয়েছে । আসলে বিয়ের প্রস্তাবই পাঠিয়েছে ।

...................................................

বিকেলে মামাকে নিয়ে বিলের ধারে বেড়াতে গেল ফারিহা । মামাকে বললো, এই প্রস্তাবে তার কোন অমত নেই । মামার কাছে খোজখবর নিল- মামা ফারহানকে দেখেছে কিনা , তাকে মামার পছন্দ হয়েছে কিনা এইসব । ফারহানের কাছে পৌছানোর জন্য একটা খাম দিল ফারিহা । এনগেজমেন্টের দিন যেন এটা নিয়ে আসে । খামে একটা এক লাইনের চিঠি আছে ।

তিনদিন পর । ফারিহাদের বাড়িতে ছোটখাট আয়োজন করা হয়েছে । ফারিহা জানে , আজ এনগেজমেন্ট হবে । ফারহান তার বাবা-মা ভাই বোন সবাইকে নিয়ে এসেছে । আংটি পড়ানোর সময় ফারহানের আব্বা বললেন – ‘আমরা কিন্তু কাজী সাথে করেই নিয়ে এসেছি । ফারিহা মা রাজি থাকলে আজই কবুল করে ফেলতে চাই’ ।
ফারিহা ফারহানের দিকে তাকিয়ে বললো – ‘আজই’ ?
ফারহান ফারিহার দেয়া খামটা খুলে চোখের দিকে চেয়ে নিচুস্বরে বললো – ‘দাঁত তুলে ফেলবো’ !

..............................
 দাঁত তুলে ফেলবো / ০৮-০৭-২০১৩

শনিবার, ৬ জুলাই, ২০১৩

আজ তোমাকে স্নান করিয়ে দেবো চন্দন জলে

জায়গাটা বেশ নির্জন । রেললাইনের দুপাশে গাছগাছালিতে ভরা । সেজন্য এদিকটা সবসময় ঠান্ডা থাকে ।
হু হু করে বাতাস বইছে । মাথার চুল উড়ছে ইকবালের । সে পড়েছে একটা গেরুয়া রঙের ফতুয়া । উদাস কন্ঠে বললো – ‘রিনা, কেমন লাগছে ?’ ।
কখনো এরকম জায়গায় তো আসোনি তাইনা ?’
রিনা শুধু বলল –‘হু’ ।

রিনা এমনিতে খুব চঞ্চল হাসিখুশি ধরনের মেয়ে । কিন্তু মাঝে মাঝে চুপচাপ হয়ে যায় । আজকের পরিবেশটা যেন রিনাকে বলছে , বেশি কথা নয় । হাতে হাত রেখে চুপচাপ হেঁটে যেতে হবে । ইকবালের বাম হাত ধরে রেখেছে রিনা । দুজনে হাঁটছে পাশাপাশি । মাঝে মাঝে মাথার ওপর খুব কাছে দিয়ে উড়ে যাচ্ছে কিছু পাখি । দোয়েল , শালিক আর টুনটুনি । কিচিরমিচির করছে পাখিগুলো ।

এক সপ্তাহ হল- বিয়ে হয়েছে ইকবাল ও রিনার । একমাসের ছুটি নিয়েছে ইকবাল । ঠিক
করেছে, বিকেল বেলা করে তারা হাঁটতে বের হবে । রিনাকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যাবে, তাঁর প্রিয় জায়গাগুলিতে । অনেক কথা বলবে তারা ।

ইকবাল সরকারি ডাক্তার । তাঁর পোস্টিং হয়েছে ভোলার মনপুরায় । ডাক্তারদের জন্য বিসিএস হলো দিল্লিকা লাড্ডু । খাইলেও পস্তাতে হয়, না খাইলেও পস্তাতে হয় । বিসিএস হয়ে গেলে পোস্টিং দেয়া হয় দূর দুরান্তের গ্রামে । ইউনিয়ন সাবসেন্টারে । দেখা যায় - শুধু একটা ঘর আছে , আর একজন ডাক্তার আছেন । নার্স নাই, হেলথ এসিসটেন্ট নাই , ফার্মাসিস্ট নাই , ওটি এসিসটেন্ট নাই । অষুধপত্র নাই, ছোটখাট অপারেশনের যন্ত্রপাতি নাই । ডাক্তারের থাকার জায়গা নাই । বসার চেয়ারটার হাতল ভাঙ্গা । ফ্যান নাই । শুধু একজন ডাক্তারকে গ্রামে পাঠিয়েই সরকার বাহাদুর খালাস । কিছুদিন পরপর মন্ত্রী এমপিরা বুলি ঝাড়েন- ‘ডাক্তারদের গ্রামে যেতে হবে’ ।

আবার বিসিএস না করলেও বিপদ । কলুর বলদের মত ভূতের বেগার খাটতে হয় । স্পেশালিস্ট হওয়ার জন্য পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিগ্রী নিতেই হবে । করতে হবে দুই থেকে তিন বছর ট্রেনিং । আট থেকে ষোল ঘন্টা ডিউটি । সম্পুর্ণ বিনা পয়সায় । জীবন চলবে কীভাবে ?
উপজেলা শহরে ইকবালের চেম্বার আছে । এলাকায় সবাই তাঁকে চেনে ‘ম্যাজিক ডাক্তার’ হিসেবে । তাঁর দেয়া ভালো চিকিৎসা , সুন্দর ব্যবহার সবকিছুই ম্যাজিকের মত কাজ করে । শুধু তাই নয় – ইকবাল আসলেই ম্যাজিক জানে । কার্ডের ম্যাজিক, পয়সার ম্যাজিক, দড়ির ম্যাজিক , টাকার ম্যাজিক, আংটির ভেতর আংটি ঢুকানো । বাচ্চা রোগী অথবা কিশোরদের মাঝে মাঝেই ম্যাজিক দেখিয়ে চমকে দেয় সে । বাচ্চা ভয়ে অস্থির, ব্যাথায় অস্থির । ইকবাল একটা ম্যাজিক দেখিয়ে দিল । এইযে দেখ একটা টাকা । হাত নাড়াতেই চোখের সামনেই টাকাটা গায়েব ! আবার সেই টাকা আরেকজনের পকেট থেকে বের করে ফেললো । বাচ্চা পুরো হিপনোটাইজড ।

মাঝে মাঝে নতুন রোগী চেম্বারে ঢুকে ভড়কে যায় । রোগী চেম্বারে ঢুকে বসেছে, ডাক্তার সাহেব
একগাদা কার্ড বের করে শাফল করলেন । রোগীকে বললেন শাফল করে দিতে । এরপর যেকোন একটা কার্ড টেনে লুকিয়ে রাখতে বললেন । আবার শাফল করে একটা কার্ড বের করে দেয় ইকবাল । দেখা গেল – দুটি কার্ডই এক ! রোগী অবাক হয় । আবার খুশিও হয় । মুহুর্তেই আপন হয়ে যায় ইকবাল । অষুধ দেয়ার
আগেই রোগী অর্ধেক সুস্থ !

ফাইনাল প্রফ পরীক্ষার পর হঠাৎ ইকবালের খেয়াল চাপে ম্যাজিক শেখার । ম্যাজিশিয়ানরা ম্যাজিকের ট্রিক্স কাউকে শেখাতে চায় না । অনেক খুঁজে একজন ওস্তাদের সন্ধান পেয়েছিল সে । বলা ভালো- ‘ওস্তাদ পটিয়েছিল’ ! তাঁর কাছে ম্যাজিকের তালিম নিয়েছিল ইকবাল । ওস্তাদ বলতেন – ইকবাল, জীবনটাই একটা ম্যাজিক । সব ধান্দা, বুঝলা - সব ধান্দা । চোখের ধান্দা, মনের ধান্দা । ধান্দার জীবন নিয়া কখনো দুঃখ করবা না । চক্ষু খুইললে যেটা সইত্য, চক্ষু বুইজলে সেইটাই মিথ্যা । খোলা চোখের সামনে যা দেখ, তারও সবকিছু সইত্য না ।
ইকবালের মাঝে মাঝে মনে হয়- মানুষের রোগও বোধহয় একধরনের ধান্দা । আসলে ব্যাকটেরিয়া ভাইরাস ক্যান্সার কোষ ব্যাথা বেদনা কিছু নাই । সব ধান্দা ।

ছোটভাইকে নিয়ে ম্যাজিক ডাক্তারের চেম্বারে এসেছিল রিনা । রিনা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক্সের ছাত্রী । ডাক্তারের কথা শুনে আর ম্যাজিক দেখে ছোটভাইয়ের সাথে সেও হিপনোটাইজড । আরেকটা বিষয় তাঁর নজরে এসেছিল- সে যথেষ্ট সুন্দরি হওয়া সত্বেও ম্যাজিক ডাক্তার একবারের বেশি তাঁর দিকে চোখ তুলে তাকায়নি । বাসায় গিয়ে দুভাইবোন ম্যাজিক ডাক্তারের খুব প্রশংসা করেছিল । রিনার বাবাও একবার কথা বলে গিয়েছিলেন , ইকবাল অবশ্য জানতো না যে তিনিই রিনার বাবা । রিনার বাবা ইকবালের বাড়িতে গিয়ে তাঁর বাবা-মা র সাথে কথা বলে এসেছেন । ইকবালের অজান্তেই বাবা মাও রিনাকে দেখে গেছে । পরে একদিন আনুষ্ঠানিকভাবে দেখাদেখি হল । উভয়ের বাবা মার জোড়াজুড়িতে একমাসের মধ্যেই বিয়েটা হয়ে গেল ।

ইকবাল বললো – ‘রিনা, একটা কবিতা শুনবে ?’
‘হু’ ।
ইকবালের কন্ঠ ভালো । আবৃত্তির ভঙ্গিও ভালো । কবিতা আবৃত্তি করতে তাঁর ভালোই লাগে । আবৃত্তি করার সময় কবিতার প্রতিটি অক্ষর যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে । কবিতা লিখেন কবি , কিন্তু আবৃত্তি করার সময় সেটা হয়ে যায় সম্পুর্ণ নিজের ।

‘‘আমার সেই গল্পটা এখনো শেষ হয়নি ।
শোনো ।
পাহাড়টা , আগেই বলেছি
ভালোবেসেছিলো মেঘকে
আর মেঘ কি ভাবে শুকনো খটখটে পাহাড়টাকে
বানিয়ে তুলেছিল ছাব্বিশ বছরের ছোকরা......’’

‘কবিতাটা কার ?’ রিনা জিজ্ঞেস করলো ।
‘পুর্ণেন্দু পত্রী’ ।
তোমার ভালো লাগছে ?
‘হু’ ।

রেললাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে ওরা চলে এসেছে নদীর পাড়ে । নদীটা কেমন নিশ্চুপ । ছোটবেলায় মাঝে মাঝে এদিকে আসত ইকবাল । খুব বেশি আসা হত না । বাড়ি থেকে বেশ দূর । নদীর ওপর রেল ব্রিজ । রেল ব্রিজে যখন রেলগাড়ি যায় তখন একটা কেমন অদ্ভুত ঝম ঝম শব্দ হয় । সেই শব্দটা শোনার জন্যই আসতো ইকবাল । তাঁর খুব ভালো লাগতো ।
‘রিনা, তুমি জানো রিনা শব্দটাকে উল্টালে কী হয় ?
‘বলো’ ।
রিনা জানে, তবুও ইকবালের মুখ থেকেই শুনতে চাচ্ছে । সে যখন বলতে চাচ্ছে, বলুক ।
‘নারী’ হয় । কবিরা কী বলে জান ?’
‘কী বলে ?’
‘বলে, নারীরা নাকি নদীর মত । ও নদীর কূল নাই, কিনার নাইরে । আমি কোন কূল হতে কোন কূলে যাবো কাহারে শুধাইরে......’
‘কাউকে শুধানোর দরকার নেই । চলো, রেলব্রিজটা হেঁটে পার হই । এখন আমরা এই কূল হতে ওই কূলে যাবো’ ।

রেলব্রিজে উঠতে ইকবালের ভয় হয় । ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় একবার এই রেলব্রিজে উঠেছিল ইকবাল । রেলব্রিজটা বেশ লম্বা । পা টিপে টিপে মাঝপথে গিয়েছে এমন সময় রেললাইন কাঁপতে লাগলো । পেছন থেকে একটা ট্রেন আসছিল । পেছনে ফেরারও উপায় নেই , সামনে যাবারও উপায় নেই । এর মধ্যে ট্রেন এসে পড়বে । চট করে মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গিয়েছিল ইকবালের । ব্রিজের মাঝামাঝিতে যে পিলার আছে , তার কিছুটা অংশ দেখা যায় । সে ওখানে নেমে গিয়েছিল । ট্রেন যাবার সময় অবস্থা এমন হয়েছিল –যাকে বলে ‘আত্মারাম খাঁচাছাড়া’ ।

রিনার কথায় কিছুক্ষণ চিন্তা করলো ইকবাল । কী করা যায় ? না বলে দেবে ? নাহ । রিনা কাপুরুষ ভাববে । রিনা যখন সাহস করেছে, তারও করা উচিৎ । নতুন বউয়ের কাছে এভাবে অপমান হওয়া ঠিক হবেনা । হয়তো দেখা গেল রিনা আসলে রেলব্রিজ পার হবে না । তাকে টেস্ট করার জন্যই বলেছে কথাটা । দেখা যাক কী হয় ! আল্লাহ ভরসা ।
‘আমাদেরকে দ্রুত হেঁটে তাড়াতাড়ি পার হতে হবে । এর মধ্যে ট্রেন আসলে কিন্তু মহাবিপদ হয়ে যাবে’ ।
রিনাকে সতর্ক করলো ইকবাল ।

ইকবালের বুক ধুকধুক করতে লাগলো । ইস্টিশনের রেলগাড়িটা, মাইপা চলে ঘড়ির কাঁটা, কখন বাজে বারোটা , কখন বাজে বারোটা । মাথায় ঘুরছিল পুরনো গানের কথা । এখন - কখন আসে ট্রেন , কখন আসে ট্রেন অবস্থা । মনে মনে দোয়া দরুদ পড়তে লাগলো যেন ভালোয় ভালোয় পার হতে পারে রেলব্রিজটা ।

‘আউ’ !
ব্রিজে কেবল উঠতে যাবে - তখনই, ব্রিজের গোড়ায় দুলাইনের মাঝখানের পাটাতনের একটা ভাঙ্গা অংশ দিয়ে রিনার পা টা দেবে গেল । পা টা মচকেও গেছে কিনা কে জানে ! ইকবালের মনের ধুকপুকানি বেড়ে গেল । এখন কী করবে সে । আশেপাশে কোন লোকজনও নেই । হু হু করে বাতাস বইছে । বসে পড়েছে রিনা । পা টা বের করার চেষ্টা করছে ইকবাল । কিন্তু কোনভাবেই বের করা যাচ্ছে না । বেকায়দা ভাবে আটকে গেছে ।
কিছুক্ষণের মধ্যে রেললাইনের ভেতর শো শো আওয়াজ হতে লাগলো । ট্রেন আসছে । এক কিলোমিটারের মত দূরে আছে । তাড়াতাড়ি পাটা বের করতে হবে । চেষ্টা চালাতে লাগলো দুজনেই । কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছেনা । আধা কিলোর মধ্যে চলে এসেছে ট্রেন ।

উস্তাদ রহমত উল্লাহর বয়স এখন ৫৫ ।
বিশ বছর ধরে সিলেট চট্টগ্রাম রুটে ট্রেনের চালক হিসেবে কাজ করছেন তিনি । এই রুটের নাড়ি নক্ষত্র তাঁর মুখস্ত । মাঝে মাঝে মনে হয় – চোখ বন্ধ করেও ট্রেন পৌঁছে দিতে পারবেন সিলেট থেকে চট্টগ্রাম । চট্টগ্রাম থেকে সিলেট । বিশ বছরে অভিজ্ঞতাও কম হলোনা । রেলগাড়ির জগতটা যেন একটা আলাদা জগত । রেলগাড়ি, রেললাইন, যাত্রী , টিটি, গার্ড । সবাইকে নিয়ে একটা বৃহৎ সংসার ।

কতবার রেলে ডাকাতি হলো । এক্সিডেন্ট হলো । বগি লাইনচ্যুত হল । অনেক ইতিহাস । ডাকাতি এখন কমে গেছে । কিন্তু একটা বিষয় তাঁকে খুব কষ্ট দেয় । রেললাইনের ওপর শুয়ে অনেকে আত্মহত্যা করে । বেশিরভাগই কমবয়সী ছেলে মেয়ে । রহমত সাহেব পত্রিকায় দেখেন । যেদিন তাঁর নিজের ট্রেনের নিচে পড়ে কেউ মারা যায় – পরের কয়েকটি দিন তাঁর খুব খারাপ লাগে । নিজেকে খুনি খুনি মনে হয় । মাঝে মাঝে ভাবেন , অবসর নিবেন । কিন্তু ছাড়তে ছাড়তেও ছাড়া হয়না । ট্রেনের ওপর মায়া পড়ে গেছে ।

চালকের আসনে বসে রহমতুল্লাহ সাহেব সিলেট থেকে চট্টগ্রামের পথে যাচ্ছিলেন ট্রেন নিয়ে । অতীতের অনেক কথাই মনে পড়ছিল । বিশেষ করে ছোটবেলার সেই ঘটনাটি ।
বয়স যখন দশ ,রেলের সাথে তাঁর জীবন জড়িয়ে যায় তখনি । তিনি মাঠে গরু চড়াচ্ছিলেন । কোমড়ে লাল গামছা বাঁধা ছিল । হাতে লাঠি । লাঠি হাতে থাকলে গরু রাখালকে ভয় করে । নাহলে দুয়েকটা বদমাশ গরু মাঝে মাঝে তেড়ে আসে । গরুগুলোকে মাঠে ছেড়ে দিয়ে বটগাছের নিচে বসে বাঁশি বাঁজাতেন রহমতুল্লাহ । মাঝে মাঝে রেললাইনের ওপর বসেও বাঁশি বাঁজাতেন । সেদিনও রেললাইনের ওপর বসে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন । গামছাটা ভেজা থাকায় লাঠির মাথায় বেঁধে লাঠিটাকে রেললাইনের পাটাতনের ফাঁকে গুজে খাড়া করে শুকাতে দিয়েছিলেন । একটা গরু অন্যদিকে চলে যাওয়ায় লাঠিটা ওখানে রেখেই গরুর পেছনে ছুটেছিলেন তিনি ।

হঠাৎ রেলের হুইসেল শুনে গামছা নেয়ার জন্য দৌড় দেন । কিন্তু ততক্ষণে ট্রেনটা থেমে গিয়েছিল । তাঁর রেখে যাওয়া গামছার একটু দুরেই রেলের দুতিনটা স্লিপার খোলা ছিল । ট্রেনের চালক এসে জিজ্ঞেস করলেন, লাল গামছা কার । ভয়ে ভয়ে তিনি বলেছিলেন – আমার গামছা । চালক রহমত উল্লাহর মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন- তুই আজ অনেক মানুষের জীবন বাচাইছিস রে বাপ । তোরে আমি ট্রেনের চালক বানামু ।
সেই চালকের নাম ছিল আব্দুল করিম খাঁ । একদিন এসে বাড়ি থেকে রহমতুল্লাকে নিয়ে যান তিনি । তারপর দীর্ঘ সময় কেটে গেছে । রহমতুল্লাহ সাহেবকে তিনি ঠিকই ট্রেনের চালক বানিয়েছেন । রহমতুল্লাহ সাহেব ট্রেনের চালক হবার তিন মাসের মাথায় ইন্তেকাল করেন আব্দুল করিম ।

তিনি ছিলেন রহমতুল্লাহ সাহেবের উস্তাদ । বাবার মত স্নেহ করতেন । তাঁর কথা মনে পড়লে এখনও চোখে জল আসে রহমতুল্লাহ সাহেবের । আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি । ভাবতে ভাবতে তাই চোখটা ভিজে উঠেছিল তাঁর । তিনি চোখ মুছে সামনের দিকে তাকালেন । সামনেই একটা রেলব্রিজ আছে । রেল ব্রিজ পার হবার সময় একটু বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন । ব্রিজের ওপর থেকে বগি লাইনচ্যুত হলে বেশি মানুষ মারা যাবে ।

সামনে চোখ দিতেই নজরে আসলো রেলব্রিজের ওপ্রান্তে লাইনের ওপর যেন একটা লাল পতাকা দুলছে । দুজন মানুষের আবছা অবয়ব চোখে পড়ছে । রহমতুল্লাহ সাহেব ট্রেন থামানোর ব্যবস্থা করলেন । নিশ্চয়ই কোন সমস্যা হয়েছে । ব্রিজের ওপর ওঠার আগেই ট্রেন থামাতে হবে ।
ট্রেনের গতিবেগ কমতে লাগলো । কিন্তু তবুও শেষ রক্ষা হলো না । ট্রেন থামতে থামতে ইঞ্জিন বগিটা ব্রিজের ওপর উঠে গেল । রহমতুল্লাহ সাহেব অবাক হয়ে দেখলেন , একজন যুবক ও লাল শাড়ী পরা একজন মেয়ে রেললাইন থেকে উঠে দাঁড়ালো । ট্রেনের দিকে একবার তাকিয়ে তারা হেঁটে হেঁটে সরু রাস্তা ধরে চলে যেতে লাগলো । মেয়েটির শাড়ির লাল আঁচল তখনো দমকা বাতাসে পতাকার মত উড়ছে ।

ইকবাল যখন রিনার পা বের করতে সক্ষম হয় , ট্রেনটা তখন ব্রিজের ওপর এসে থেমে গেছে । ট্রেনটা কেন কীভাবে থামলো আল্লাহই জানেন । পুরো ঘটনাটা যেন ম্যাজিকের মত ঘটে গেল । মহান প্রভূও হয়তো তাঁর ক্ষুদ্র সৃষ্টি মানুষকে নিয়ে ম্যাজিক করেন ! তারা ওখানে আর দাঁড়ালো না । আল্লাহর শুকরিয়া জানিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলো । রিনার গালে বিকেলের কোমল আলোয় চকচক করছিল একফোঁটা অশ্রুবিন্দু ।
ইকবাল গভীর আবেগে আবৃত্তি করতে লাগলো –

‘‘সেদিন ছিলো পাহাড়টার জন্মদিন ।
পাহাড় মেঘকে বললে
আজ তুমি লাল শাড়ি পরে আসবে ।
মেঘ পাহাড়কে বললে
আজ তোমাকে স্নান করিয়ে দেবো চন্দন জলে’’ ।

..................................
আজ তোমাকে স্নান করিয়ে দেবো চন্দন জলে / ০৬-০৭-২০১৩

শুক্রবার, ৫ জুলাই, ২০১৩

আরিফ মইনুদ্দিন ভাইয়ের অকালে চলে যাওয়াঃ স্মৃতি ভোলার নয়

তাঁর সাথে খুব বেশি কাজ করা হয়নি । তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সেক্রেটারি ছিলেন , আমি মেডিকেলের দায়িত্বশীল । মাঝে মাঝে রেটিনায় স্টুডেন্ট ভর্তি কিংবা হাসপাতালে পরিচিত কোন রোগীর খোঁজখবর নেয়ার জন্য ফোন করতেন । রেটিনার একটা খন্ডকালীন অফিস ইনডেক্স ভবনে থাকায় মাঝে মাঝে দেখা হত রেটিনা কিংবা ইনডেক্স অফিসে । ততদিনে তিনি সংগঠন থেকে বিদায় নিয়েছেন । দেখা হত গুলজার মোড়ে । দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনেক কথা হত । মেডিকেল, বিশ্ববিদ্যালয়, মহানগরী, সার্বিক আন্দোলনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ।

আরিফ মইনুদ্দিন ভাই । হ্যাংলা পাতলা শুকনো লম্বা চেহারাটা এখনো চোখে ভাসছে । মনে হচ্ছে , গুলজার মোড়ে গেলে আজও হয়তো দেখা হয়ে যাবে । কথা হবে । কোথাও দাঁড়িয়ে দু’কাপ চা খাওয়া হবে ।

কিন্তু আসলে তা আর কখনোই হবে না । গতকাল তিনি চিরবিদায় নিয়েছেন নীরবে, কাউকে কিছু না জানিয়েই ।

২০১০ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারির কথা আমার আজীবন মনে থাকবে । চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শহীদের লাশ মেডিকেল কলেজ মর্গে । পুলিশ টালবাহানা করছে লাশ দিতে । কথা ছিল শহীদের লাশ নিয়েই শহীদি মিছিল হবে । শেষমেষ লাশ ছাড়াই মর্গের সামনে থেকে শুরু হলো বিক্ষোভ মিছিল । জামালখান মোড়ে পুলিশ মিছিলে হামলা করলো । মুহুর্মুহু টিয়ারশেল মারা শুরু করলো । লোকজন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো ।
একটা গলিতে ঢুকে পড়েছি । দেখি সাথে আছেন আরিফ ভাই । বিপদের সময় পাশে দায়িত্বশীল থাকলে কত যে ভালো লাগে ! বুকের ছাতি একহাত বেড়ে যায় । ‘ভয় কিরে বোকা ?’ তাঁর সাথে থেকে কিছুক্ষণ পুনরায় সংঘবদ্ধ হবার চেষ্টা করেছিলাম আমরা ।
সেই দৃশ্যটা কোনদিন ভোলা যাবে না ।

আমাদের চোখে ওনার চলে যাওয়াটা বড্ড ‘অসময়ে’ ।
শাহাদাতের তামান্না থাকলে নিজের বিছানায় মৃত্যুও শাহাদাতের মর্যাদা পায় । দয়াময় প্রভুর কাছে সেটাই মুনাজাত, আল্লাহ আমাদের প্রিয় ভাইকে, প্রিয় দায়িত্বশীলকে শহীদ হিসেবে কবুল করে নিন । আমীন । 


০৫-০৭-২০১৩ 

মঙ্গলবার, ২ জুলাই, ২০১৩

জয় বাংলা

গতকাল থেকে শুভর নতুন নাম হয়েছে ‘কয়েদী’ ।
বিচার শেষ হয়ে সাজাপ্রাপ্ত হবার আগ পর্যন্ত বলা হয় ‘হাজতী’ , আর বিচার হয়ে সাজার রায় ঘোষণা হলে তখন বলা হয় ‘কয়েদী’ ।
জেলখানায় কয়েদীদের জন্য আলাদা সেল ।

গতকাল জেলা জজ কোর্টে রায় ঘোষণা হয়েছে – যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড । কোর্টে মা বাবা , বোন দুলাভাই সবাই এসেছিল । রায় ঘোষণার পর কোর্টরুমে কান্নার রোল উঠেছিল । শুভ কারোদিকে তাকায় নি । এখন কোনকিছুই তাকে তেমন একটা স্পর্শ করে না । তবু সেসময় তার ভেতরটা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল । মায়ের মুখের দিকে তাকালে হয়তো নিজেকে সামলাতে পারতো না । পুলিশ হেফাজতে থেকে এভাবে কান্নাকাটি করা শোভা পায় না । একজন খুনির জন্য তো নয়ই ।

শুভকে দেয়া হয়েছে বাগানের মালির কাজ । আজই সে প্রথম বাগানে এসেছে । জেলখানার ভেতরেও যে বাগান আছে সে জানতো না । বাগানে ফুলের গাছও আছে কয়েকটা । ঘাসের ওপর পা ছড়িয়ে বসে বসে অনেক কথাই মনে পড়ছিল শুভর । এতদিনে তার ডাক্তার হয়ে যাবার কথা ছিল । কথা ছিল অন্যদের মত করে একটা সুন্দর স্বাভাবিক জীবন যাপন করার । অথচ সে এখন একজন ‘কয়েদী’ ।
খুনের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত । পত্রিকায় তার ছবিসহ সংবাদ ছাপা হয়েছে – ‘মেধাবী মেডিকেল ছাত্র আবির হত্যা মামলায় ৭ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড’ ।

কোনদিন কাউকে খুন করবে – কস্মিনকালেও ভাবেনি শুভ । কিন্তু কীভাবে কী হয়ে গেল । ২০০৯ সালে যখন সে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয় , তখন নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে । সরকারী দলের ছাত্রসংগঠন ক্যাম্পাসে মিছিল দেয় । প্রথম প্রথম সে মিছিলে যেত না । রাজনীতিতে জড়াবে না , এমনটাই কথা ছিল । কিন্তু বেশিদিন আর ওভাবে থাকতে পারেনি । বড় ভাইরা হোস্টেলে আসে । কারা কারা মিছিলে যায় নাই – লিস্ট করে । সবাইকে ডেকে বসায় । গরম গরম বক্তৃতা দেয় । ‘মৌলবাদীদের রুখতে হবে । স্বাধীনতা বিরোধীদের রুখতে হবে । ক্যাম্পাসে মৌলবাদীদের মিছিলে এত ছাত্র আসে কোত্থেকে ? ওরা এই দেশের শত্রু । আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হতে হবে’ ।

বন্ধুরা অনেকেই এখন ঠোঁটে সিগারেট লাগিয়ে ঘোরে । রাত বিরাতে ক্যাম্পাসে যায় । কেউ কেউ সিগারেটের ধাপ পার করে গাঁজা ধরেছে । বড় ভাইরা ‘শরাব’ খায় । ওগুলো দামি জিনিস, জুনিয়রদের দেয়া হয়না । গাঁজা স্টেজ পার হলে তখন দুইএক চুমুক দিতে দেয়া হয় ।

ধীরে ধীরে একসময় শুভর ঠোঁটেও ‘বেনসন’ ওঠে । শুভও মিছিলে যায় । তার গলা ভালো । বড় ভাইরা তাকে মিছিলে লিড দিতে বলে । শুভর কন্ঠ গর্জন করে ওঠে – ‘জয় বাংলা’ ।
মাঝে মাঝে বিরোধী সংগঠনের ছেলেদের ধরে আনা হয় ‘টেন্টে’ ।
উত্তম মধ্যম দেয়া হয় । প্রথম প্রথম শুভর খারাপ লাগত । ক্লাসফ্রেন্ড, জুনিয়র, সিনিয়র – যাদের সাথে পাশাপাশি রুমে থাকে, দিন রাত দেখা হয় – শুধু মাত্র মতপার্থক্যের জন্য এভাবে পেটানো হবে কেন ?

মিছিলে লিড দিতে দেখে অনেকেই তখন শুভকে তোয়াজ করা শুরু করে দিয়েছিল । শুভর নিজেকে নেতা নেতা লাগে । কমিটিতে তাকে একটা পদও দেয়া হয় । শুভ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ে । এখন মিছিলে শুভর কন্ঠ আরো জোরে শোনা যায় । ‘একটা একটা কৈরা ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর’ ।  ‘সকাল বিকাল নাস্তা কর’ ।
রক্তে আগুন জ্বলে ওঠে । এসময় কাউকে পেলে যেন সত্যি সত্যিই জবাই করে দেয়া যায় ।

শুভ বুঝতে পারে, বিরোধী ছেলেদের গায়ে হাত তোলাটা একটা ক্রেডিট । যে যত নিষ্ঠুরভাবে পেটাতে পারবে ‘জয় বাংলা’র প্রতি তার ভালোবাসা তত বেশি । সংগঠনের প্রতি তার ডেডিকেশন তত বেশি । মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তার ভেতর ততটাই পোক্ত । সামনের কমিটিতে সে আরো ভাল পদ পাবে । কমিটি গঠনের আগের দিনগুলোতে বিরোধী ছাত্রদের ওপর কড়া নজর রাখা হয় । সেই সময়টা নিজের যোগ্যতা দেখানোর সময় । বিরোধী ছাত্রদের ধরে এনে মারতে হবে । হাত পা ভেঙ্গে দিতে হবে । যত বেশি ইনজুরড করা হবে তত বেশি ক্রেডিট ।
পরবর্তী তিন বছরে শুভ একাই ১০ জনকে পিটিয়েছিল । এর মধ্যে হাত ভেঙ্গেছে ৪ জনের । গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ৭ জন । তরতর করে উপরে উঠতে থাকে শুভ ।

মূল দলের স্থানীয় এক নেতার বাসায় তাদের যাতায়াত ছিল । আ.স.ম বছির ভাই । বছির ভাই অভয় দিতেন । ‘যা পারিস করবি, বাকিটা আমি দেখবো । থানা পুলিশ আমার পকেটে । আমি যা বলবো তাই হবে’ ।

কাউকে পেটানোর পর তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতেও দেয়া হত না । পারলে কোন ক্লিনিকে চিকিৎসা নিক । গার্জিয়ানকে শাসিয়ে দেয়া হত । ‘বেশি কথা বললে আপনার ছেলেকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে দেব না’ ।
দুই একজন গার্জিয়ান প্রিন্সিপালের সাথে যোগাযোগ করেছিল । খবর শুনে তো শুভদের আড্ডায় সেদিন ‘চিয়ার্স’ করা হয়েছিল । বেকুবের বেকুব গার্জিয়ান । প্রিন্সিপাল কলিম জাহাঙ্গীর তো বছির ভাইয়ের খাস লোক । বছির ভাইয়ের অনুমতি ছাড়া উনি কিছুই করবেন না । একাডেমিক কাউন্সিলের বৈঠকেও বছির ভাইয়ের ইচ্ছার বাইরে কোন সিদ্ধান্ত হতে দেননা কলিম জাহাঙ্গির স্যার ।

জীবনটা ভালোই চলছিল । সপ্তাহে একদিন ক্যাম্পাসের আশেপাশের দোকানপাট থেকে চাঁদা তোলা হয় । বোতল কেনা হয় । বৃহস্পতিবার রাতে ভালো খাওয়া দাওয়া হয় । ১২ টার পর ‘পানি’ গেলা হয় । ক্যানাবিস ফোঁকা হয় । গাঁজার বৈজ্ঞানিক নাম ক্যানাবিস ইন্ডিকা । গাঁজা বললে কেমন শোনায় । তাই ক্যানাবিস বলা হয় । সাউন্ড বক্সে হাই ভলিউমে গান বাজে । মনে হয় পৃথিবীতে আর কেউ নেই । শুধু আমি আছি । আমি একাই এই পৃথিবীর সম্রাট । আমিই সব ।

ততদিনে হাত পেকে গিয়েছিল শুভর । এখন আর কাউকে পেটানো, চাপাতি দিয়ে কোপানোতে কিছু মনে হয় না । বরং অন্যরকম আনন্দ লাগে । মারের সাথে সাথে যখন চিৎকার করে ,ও মাগো-বাবাগো করে তখন শুভ খিস্তিখেউর করে । বাবাকে ডেকে লাভ কি ? আমিই তোর বাবা । আমিই তোর দুলাভাই । বাকিরা অট্টহাসি দেয় ।

এখন শুভ নিজেই বক্তৃতা দেয় । জুনিয়রদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে । তাদের সংগঠনের বিরোধী সবাইকে চিহ্নিত করে স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে । স্বাধীনতাবিরোধীরা দেশের শত্রু । সরকার বিরোধী সবাই দেশের শত্রু । তারা দেশকে পাকিস্তান বানাতে চায় । বিরোধী সংগঠনের ছাত্ররা একেকজন পাকিস্তানি সৈন্য । মুক্তিযোদ্ধাদের মত প্রয়োজনে হাতে অস্ত্র তুলে নিতে হবে । ওদের খতম করতে হবে । ওরা সবাই রাজাকার । রাজাকার ইস্যুতে, মানবতা মুছে ফেল টয়লেট টিস্যুতে ।

জুনিয়ররাও নিজেকে একেকজন মুক্তিযোদ্ধা ভাবে । ইসলাম, জাতীয়তাবাদ এসব শব্দ শুনলেই লাফিয়ে ওঠে । ‘জয় বাংলা’ বলে চাপাতি হকিস্টিক হাতে ঝাপিয়ে পড়ে ।
সিনিয়রদের মধ্যে মফিজ ভাই, রুমন ভাই নেতৃত্ব দেয় । নির্দেশ দেয় । উপরমহলে যোগাযোগ  তারাই মেইনটেইন করে । রুমন ভাই সভাপতি ।

খুনটা হবার পর মৌলবাদীরা আন্দোলন করেছিল । শুভরা সেদিন বছির ভাইয়ের বাসায় আশ্রয় নিয়েছিল । ছাত্রছাত্রীদের মিছিলে শ্লোগানে ক্যাম্পাস উত্তাল । বছির ভাই প্রিন্সিপালের সাথে বারবার আলোচনা করছেন । প্রিন্সিপাল জানালেন , একাডেমিক কাউন্সিলের মিটিং করতে হবে । খুনের সাথে জড়িত সবাইকে বহিস্কারের দাবি করছে ছাত্রছাত্রীরা । অনেকেই কান্নাকাটি করছে । কী করা যায়, বছির ভাই যেন তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত জানান । বছির ভাই শুভদের সাথে আলোচনা করলেন । প্রিন্সিপালকে জানিয়ে দিলেন , স্টুডেন্টদের কোনভাবে বুঝিয়ে সুঝিয়ে হোস্টেলে পাঠান । তারপর কলেজ বন্ধ করে দেন ।
রাতেই সংবাদ পাওয়া গেল , বছির ভাইয়ের কথামত কাজ হয়েছে ।

অনেকদিন বন্ধ রেখে মন্ত্রী এমপিদের মাধ্যমে থানায় নির্দেশ দিয়ে পুলিশ  প্রহরায় ক্যাম্পাস খোলা হয়েছিল । মামলাটাও অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়েছিল । কিন্তু আবার সরকারের পরিবর্তন হলো । বিচারকাজ শুরু হলো । সবাই পালিয়ে গেল । শুভও পালিয়েছিল । কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি । এখন বছির ভাইও আর কোন খবর নেননা । তার কোন ক্ষমতা নাই ।

শুভ ভাবে- কত ভুলের মধ্যে সে ছিল । তাদের দলের বিরোধী মানেই স্বাধীনতা বিরোধী নয় – এখন সে এটা ভালোভাবেই বুঝতে পারে । মাঝে মাঝে সে জেল লাইব্রেরি থেকে দুয়েকটা বই এনে পড়ে । বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার আসল শত্রু ভুট্টোর হাতে চুমু খেয়েছেন , লাল গালিচা সংবর্ধনা দিয়েছেন । বঙ্গবন্ধু কন্যা রাজাকারের পরিবারের সাথে আত্মীয়তা করেছেন । আরো কত কিছু জানতে পারে । অথচ শুভরা কী না করেছে ! নিজের বয়সী, জুনিয়র ছেলেপেলেদের স্বাধীনতাবিরোধী ভেবে , রাজাকার ভেবে খুন করার জন্য উন্মত্ত হয়ে পড়েছিল । নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা ভেবেছিল । হায় । সেসব দিন যদি আবার ফিরে পেত, তাহলে সে ভুলগুলো আর করতো না । কিন্তু সে সুযোগ আর কোনদিন হবে না । শুভ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে । এছাড়া এখন তার কিছুই করার নেই ।
.............................................

খুনের ঘটনাটা সে স্মরণ করতে চায় না । চেষ্টা করে ভুলে থাকতে । একটা তরতাজা জীবন নিজ হাতে শেষ করে দিয়েছে , একটা পরিবারের স্বপ্ন ধুলিস্যাত করে দিয়েছে- ভাবতেই গা শিউরে ওঠে । মাথাটা চক্কর দেয় । কিন্তু একটু একা হয়ে পড়লেই সেই দিনগুলো যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে ।

কয়েকদিন থেকে লাইব্রেরিতে , হোস্টেলের বিভিন্ন স্থানে জাতীয়তাবাদী সংগঠনের নাম লেখা দেখা যাচ্ছিল । জাতীয়তাবাদী সংগঠন এখন ক্যাম্পাসে নাই । রুমন ভাই , মফিজ ভাই খুব চিন্তিত এ নিয়ে । বৈঠকে বলে দিয়েছেন- কে এই কাজ করছে খুঁজে বের করতে হবে । সম্ভবত ওরা আবার সংগঠিত হবার চেষ্টা করছে ।
এর পেছনে কে আছে খুঁজে দেখতে হবে । ধরা পড়লে তার খবর আছে । সভাপতি  রুমন ভাইয়ের স্পষ্ট নির্দেশ – ধরে এনে হাড্ডি গুড়াগুড়া করে দিবি ।
প্রায় দুই সপ্তাহের খোঁজাখুঁজিতে মোটামুতি নিশ্চিত হওয়া গেল- আবির এই কাজ করছে । সেদিন সকাল বেলা একটা কনফার্ম খবর এল আবিরের ব্যাপারে । সেই চেষ্টা করছে জাতীয়তাবাদীদের সংগঠিত করার । রুমন ভাই নির্দেশ দিলেন- অরে ধইরা আন । শুয়োরের বাচ্চা একটা স্বাধীনতাবিরোধী । রাজাকার ।

জানা গেল আবির পরীক্ষা দিচ্ছে । শুভসহ কয়েকজন গিয়ে পরীক্ষার হলের সামনে দাঁড়িয়ে রইলো । বের হওয়া মাত্রই আবিরকে ধরে হোস্টেলে নিয়ে গেলো তারা । সবাই মিলে পেটাতে লাগলো ইচ্ছেমত । কয়েকদিন পরেই নতুন কমিটি গঠন করা হবে । এখন সময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি ডেডিকেশন দেখানোর । ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিয়ে রড-চাপাতি-রামদা দিয়ে সবাই মিলে পেটালো অনেকক্ষণ । ব্যাটা তোর জাতীয়তাবাদ পুক্টি দিয়া ঢুকাই দিমু । জাতীয়তাবাদ মাড়াইতে আসছে । নে জাতীয়তাবাদ নে । খা ।
চিৎকার করতে করতে একসময় নেতিয়ে পড়লো আবির । সারা শরীর থেতলে গেছে । রুমন ভাই ভয় পেয়ে গেলেন । অই হইছে । আর মারিছ না । মইরা গেলে বিপদে পড়মু । এখন এক কাজ কর । অরে বাড়িতে পাঠায় দে ।
কিন্তু শেষ রক্ষা আর হয়নি । সন্ধ্যার কিছু পরেই খবর পাওয়া গেল , আবির আর নেই ।

শুভ আর ভাবতে পারে না । তার মাথা ঝিম ঝিম করছে ।  মুখে থুথু জমেছে । থুথুগুলো বিষাক্ত লাগছে । সেদিন আবিরের মুখে থুথু দিয়েছিল সে । এখন মনে হচ্ছে সেই থুথুগুলো এসে মুখে জমা হয়েছে ।
মাথাটা টনটন করছে । চোখের সামনে একবার জয় বাংলা , একবার আবিরের মুখ ভেসে উঠছে । অসহ্য বোধ হচ্ছে শুভর । মুক্তিযুদ্ধের ‘জয় বাংলা’ আর এই ‘জয় বাংলা’ এক না ।  জয় বাংলা শ্লোগানকে কীভাবে অপব্যবহার করা হয়েছে সে নিজে তার সাক্ষী । তার ঘৃণা জন্মে গেছে । আর কখনো সে ঐ স্লোগান দেবে না ।
থুঃ ।  থুথু ফেললো শুভ । কয়েক ফুট সামনে গিয়ে পড়লো । নিজের থুথুর দিকে তাকিয়ে শেষবারের মত সে চিৎকার করে উঠল-
‘জয় বাংলা’ ।

-        জয় বাংলা / ০২-০৭-২০১৩

সোমবার, ১ জুলাই, ২০১৩

ক্রাশ

মেয়েরা সুন্দর হলে ‘রুপবতী’ বলা যায় ,কিন্তু ছেলেরা সুন্দর হলে ‘রুপবান’ বলা যায় না । বলতে হয় ‘হ্যান্ডসাম’ ।
সে হিসেবে ভাইয়াকে বেশ ‘হ্যান্ডসাম’ না বলে উপায় নেই । মেয়েরা ফর্সা হলে বলা হয় ‘দুধে আলতা বরণ’ , কিন্তু ভাইয়া পুরুষ মানুষ বলে সেটা বলা যাচ্ছে না । আচ্ছা, ‘দুধে পানি’ বলা যায় কি ?

ভাইয়াকে নিয়ে বেশ আলোচনা চলতো আমাদের ভেতর । ভাইয়াটা কেমন চুপচাপ । খুব একটা কথা বলতে দেখা যায়না তাঁকে । মেয়েরা সালাম দিলে মাথা উপর নিচে দুলিয়ে অস্ফূট স্বরে সালামের উত্তর দিতেন । সরাসরি মুখের দিকে তাকাতেন না । ভাইয়ার কোন রিলেশন আছে কিনা জানার জন্য সবার ভেতরেই একটা গোপন আগ্রহ ছিল । আমি সেটা টের পেতাম । কিন্তু কেউ মুখ ফুটে বলতো না । বলেও লাভ নাই । আমার ঘটনাটা কীভাবে কীভাবে জানি হোস্টেলের সবাই জেনে গিয়েছিল । ভাইয়া যা বলেছিলেন , সেটাও । এরপর থেকে আর কেউ ওপথে পা বাড়ানোর সাহস করেনি । জানে, ওতে লাভ হবে না ।

আমার ইন্টার্ণশিপ শেষ হয়েছে এক সপ্তাহ আগে । বাবা-মা আমার বিয়ের জন্য বিভিন্ন পাত্রের বায়োডাটা সংগ্রহ করছেন । দুটি বায়োডাটা ইতোমধ্যে আমার হস্তগত হয়েছে । একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, আরেকজন বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার । বিকেলটা আমার কাটে ছাদে বসে । ছাদে একটা টেবিল, কয়েকটা চেয়ার রাখা হয়েছে । নতুন কেনা আর এফ এল চেয়ার । নান্টু ঘটকের কথা শুনে কেনা হয়েছে কিনা কে জানে !

বিকেলে এক কাপ কফি নিয়ে আমি ছাদে এসে বসি । চুপচাপ চিন্তা করি । আমার চোখের সামনে সুর্যটা ধীরে ধীরে ডুবে যায় । মনটা হঠাৎ তখন কেন যেন বিষাদে ভরে ওঠে ।

সেই দিনগুলোর কথা আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে । নতুন এসেছি ক্যাম্পাসে । ক্লাসের ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস । একটা ক্লাসও মিস দেই না । বিকেল বেলা দুতিন জনে মিলে ঘুরতে বের হই । ক্যাম্পাসের ভেতরেই হাঁটাহাঁটি করি । পড়াশোনার চাপ নেই তেমন ।

সেদিন ছিল জুলাই মাসের ১০ তারিখ । বর্ষাকাল শুরু হয়ে গেছে । যখন তখন বৃষ্টি শুরু হয়ে যায় । বিকেলে ঘুরতে বের হওয়াটা আমার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে । যুথীও আমার মত উড়নচন্ডি । আমি ডাকলেই ও রাজী । বললেই হলো- ‘চল, বাইরে কোথাও ফুচকা খেয়ে আসি’ ।

সেদিন গোলপাহাড় মোড়ে ফুচকা খেয়ে ফিরছি । হঠাৎ ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল । আমি রিক্সা নিতে চাইলাম, যুথী রাজী হল না । একটু ভিজলে কী হয় ? প্রবর্তক মোড়ে ফুটপাত ধরে হাঁটছি , দেখি রাস্তার পাশে টং দোকানে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে চা খাচ্ছে একজন । আমার চোখ আটকে গেল । উদাসভাবে চা খাচ্ছিলেন তিনি । যুথীকে বললাম- ‘উনার পরিচয় বের করতে হবে’ ।
যুথী মোবাইল বের করে দূর থেকে ছবি তুলে ফেললো । রুমে এসে আমার রুমমেট তানিয়া আপুকে ছবিটা দেখালাম । তানিয়া আপু চোখ বড় বড় করে বললেন- এই ছবি কোথায় পেলি তুই ? এ যে আমাদের আউয়াল ! খবরদার, ওর দিকে হাত বাড়াবি না ।

জানলাম , উনি আমাদের সিনিয়র ব্যাচের ছাত্র । আমার ভেতরটা ওলট পালট হয়ে যেতে লাগলো । আমিও দেখতে কম সুন্দরী নই । স্কুলে- কলেজে কত ছেলে আমার পেছনে ঘুরঘুর করেছে, কাউকে পাত্তা দেইনি । দেয়ার দরকারও মনে করিনি । কিন্তু এবার তো বোধহয় আমাকেই লাইন ধরতে হবে !

কী আর করা । পরদিন থেকে কারণে অকারণে সিনিয়র ব্যাচের রুটিন অনুযায়ী ক্লাসরুমের আশেপাশে ঘোরাফেরা করা শুরু করলাম । ভাইয়া বের হন, আমি করিডোরের এক প্রান্তে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি । সুযোগ পেলে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি ।
মাঝে মাঝে ছাত্রাবাসে যাওয়ার পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকি । কিছু বলার সাহস হয়না । উনি কোনদিনও আমার দিকে তাকাননা । কখনো যদি আমার দিকে চোখ পড়ে, সাথে সাথে চোখ নামিয়ে নেন । আমার বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে । সাহস আরো কমে যায় । আমাকে কি তার পছন্দ না ? সবাই আমার দিকে তাকায়, উনি তাকাননা কেন ?

.............................................

আজ যুথী এসেছে বাসায় । ছাদের ওপর দুজনেই বসেছি কফির মগ হাতে । যুথীর বিয়ে হয়ে গেছে ফাইনাল পরীক্ষার পরপরই । যুথীকে দেখে সেই দিনটির কথা বেশি করে মনে পড়তে লাগলো ।

প্রায় ছয়মাস কেটে গিয়েছিল । আমি তখনো কিছুই বলতে পারিনি । যুথী আমার ওপর বিরক্ত । আমি সারাদিন আউয়াল ভাইয়া আউয়াল ভাইয়া করে ওর কান ঝালাপালা করি ।
যুথী যে সেদিন এইকাজ করবে আমি কস্মিনকালেও ভাবিনি । জানুয়ারি মাস । বিকেল বেলা হাঁটতে বের হয়েছি । যুথী বললো , ‘মুন্নি দ্যাখ দ্যাখ’ ।
তাকিয়ে দেখি পশ্চিম দিক থেকে আউয়াল ভাইয়া আসছেন । আমি যুথীকে বললাম, ‘চল অন্যদিকে যাই’ ।
যুথী আমার হাত শক্ত করে ধরে রাখলো । কাছাকাছি এসে পড়লে আমাকে টেনে ভাইয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো । ওর সাহস দেখে আমি অবাক । এদিকে তো আমার হার্টবিট এক’শ পার হয়ে গেছে ।
‘ভাইয়া , আমার বান্ধবী আপনাকে কিছু বলতে চায়’ ।
‘আমাকে... কেন ? আমি কী করেছি ?’ মাথা নিচু করে উত্তর দিলেন ভাইয়া ।
আমি কী বলবো ? আমি তো এই পরিস্থিতির জন্য রেডি ছিলাম না । আমার মাথা ঘুরছিল । কপাল ঘামতে লাগলো । মাথার ভেতরটা শুন্য হয়ে যেতে লাগলো । শুধু বললাম ‘যুথী , আমাকে ধর । আমি পড়ে যাচ্ছি’ ।
যুথীকে সেদিন ভাইয়া বলেছিলেন- মুসলিম হিসেবে উনি ইসলামের বিধান মেনে চলেন । ‘বিয়ের আগে ছেলেমেয়ের অবাধ মেলামেশা, প্রেম ইসলামে নিষেধ আছে’ ।
আমি আর কখনো তাঁকে বিরক্ত করিনি ।

‘কিরে, এত গম্ভীর হয়ে আছিস কেন তুই ?’ যুথী বিরক্ত হয়ে আমার চুল ধরে টান দিল । উঃ । কেন জানিনা আমার চোখ ছলছল করতে লাগলো । হাত দিয়ে চোখটা কচলে নিলাম । যুথীর চোখের দিকে তাকালাম । দেখি, ও একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে আছে । গলার স্বরটা স্বাভাবিক করে নিলাম ।
‘যুথী, আউয়াল ভাইয়ার কথা কি তোর মনে আছে ? তার কোন খবর জানিস ?’

-ক্রাশ / ০১-০৭-২০১৩

রবিবার, ৩০ জুন, ২০১৩

অর্থোডন্টিক্স

কোন পারফিউম টা ইউজ করবে তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে টিপু । এরকম তার প্রায়ই হয় । মাঝে মাঝে শার্ট প্যান্ট ম্যাচ করা নিয়েও সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে । অনেকেই আছে – যা পরে তাতেই মানায় । টিপুর ধারণা, সে ঐরকম না । তার হাইট কিছুটা কম । কিছুদিন আগেও হ্যাংলা পাতলা ছিল । দুই তিন মাস হলো – একটু ওজন বেড়েছে । তাতেও বিপদ কম না । শরীর কিছুটা হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে বটে, কিন্তু একই সাথে ভুঁড়িটাও উঁকিঝুঁকি দেয়া শুরু করেছে । সময় করে জিমে যাওয়ার কথা প্রায়ই ভাবে , কিন্তু আজ কাল করে আর জিমে যাওয়া হয়নি ।

আজ টিপুর জীবনে একটি বিশেষ দিন । আজকের দিনটি তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে । আজ প্রথম সে নিজের জন্য কনে দেখতে যাচ্ছে । টিপু জানে , এই সিদ্ধান্তটা কত কঠিন । বিয়ে করবে কিনা – এই সিদ্ধান্ত নিতেই যুবকদের কেটে যায় কয়েক বছর । এস্টাবলিশ হতে হবে, তারপর বিয়ের চিন্তা । এই করে করে বেশিরভাগ ছেলের বয়স ত্রিশের কোঠায় চলে যায় । টিপুদের মত টানাটানির পরিবারের ছেলেদের জন্য সেটা আরো কঠিন । নিজেকে এস্টাবলিশ করার চিন্তা, ছোট ভাইবোনের পড়ালেখার চিন্তা , বাড়িঘর গোছগাছ করে একটা মানানসই পর্যায়ে আনা, সব করতে করতে একটু বেশিই দেরি হয়ে যায় ।

টিপু একজন ডেন্টিস্ট । ডেন্টিস্টদের জন্য আরো একটা চিন্তা থাকে – নিজের একটা চেম্বার । ডেন্টাল চেম্বারের খরচ অনেক । একটা ভালো ডেন্টাল চেয়ার কিনতেই লাগে চার-পাঁচ লাখ টাকা । ডেকোরেশন , সহকারী টেকনিশিয়ান নিয়োগ , রিসিপশনিস্ট নিয়োগ – অনেক ঝামেলা । নিজের একটা চেম্বার না হওয়া পর্যন্ত নিজেকে মনে হয় ‘ভাসমান’ , শিকড়বিহীন ।

ছয়মাস হয়েছে টিপুর পোস্টগ্রাজুয়েশন কমপ্লিট হবার । সে পোস্টগ্রাজুয়েশন করেছে ‘অর্থোডন্টিক্স’ বিষয়ে । আঁকাবাঁকা- উঁচুনিচু দাঁত স্বাভাবিক করার সাবজেক্ট হলো অর্থোডন্টিক্স । এই বিষয়টি নেয়ার পেছনে টিপুর নিজের জীবনের কাহিনী আছে । আসলে তার ডেন্টিস্ট হবার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ঐ বিষয়টি । তার বড়বোনের নাম লিলি । লিলি আপা ছোটবেলা থেকেই দেখতে যথেষ্ট সুন্দরী ছিলেন । কিন্তু সমস্যা হলো দুধ-দাত পড়ে যাওয়ার পর । তার স্থায়ী দাতগুলি উঠল উঁচুনিচু হয়ে । বিয়ের সময় খুব ঝামেলা হলো । বরপক্ষ প্রথমে ছবি দেখে পছন্দ করে , কিন্তু কনে দেখতে এসে আর পছন্দ করে না । মেয়ের দাঁত উঁচুনিচু, কথা বলার সময় দেখতে ভালো দেখায় না । আপা গোপনে গোপনে কাঁদে । টিপু তখনো ছোট । ক্লাস নাইনে পড়তো । তার কিছু করার ছিল না । কিন্তু একটা বিষয় তার মনের ভেতর গেঁথে যায় – দাঁত নিয়ে পড়াশোনা করবে । বছর দুয়েক অনেক দেখাদেখির পর আপার বিয়ে হয় ।

বিডিএস পাস করার পর কিছুদিন একজন স্যারের চেম্বারে কাজ করেছিল টিপু । স্যার অর্থোডন্টিক্সের সহকারী অধ্যাপক । স্যারের চেম্বারে অনেক রোগী আসত । বেশিরভাগই ছোট বাচ্চা । বাবা মা- রা এখন অনেক সচেতন । বাচ্চাদের দাঁতের ব্যাপারেও অনেকেই সচেতন । হাসপাতালে বা স্যারের চেম্বারে নিয়ে আসেন । লিলি আপার মত কেস টিপু তখনো পায়নি । পোস্টগ্রাজুয়েশন করার জন্য যখন সে ঢাকা যাওয়ার বন্দোবস্ত করছে, এমন সময় একজন পেশেন্ট এলো । মেয়ে ভার্সিটিতে অনার্স পড়ে । এমনিতে চেহারা সুন্দর- কিন্তু দাঁতের সমস্যার কারণে সৌন্দর্য ঢাকা পড়ে যায় ।

ঐ পেশেন্টের প্রাথমিক কাজগুলো টিপু করেছিল । এসব কাজ দীর্ঘমেয়াদী । দুই তিন বছর লেগে যায় । টিপু পরে আর খোজখবর রাখতে পারেনি । ব্যস্ত জীবন- পেছনের কথা এত মনে রাখার কীইবা দরকার ? পেশেন্টের নামটা অবশ্য আবছা আবছা মনে পড়ে – খুব সম্ভবত ‘নীলা’ নাম ছিল । চার-পাঁচ বছর আগের কথা । কে জানে, ‘নীলা’ না হয়ে ‘লীনা’ও হতে পারে !

‘নেসার তুমি কই ? আমি রেডি হয়ে বসে আছি – তোমার খবর নাই । দেরি করার অভ্যাসটা তোমার গেল না । তুমি বুঝতে পারছ – আমি কী রকম টেনশনে আছি ?’
টিপু তার সবচেয়ে ক্লোজ ফ্রেন্ড নেসারকে ফোন করে নিজের বিরক্তি ঝাড়লো । বিরক্ত না হয়ে উপায় আছে ? নেসারের আসার কথা সাড়ে তিনটায় , এখন চারটা বিশ বাজে- তার দেখা নাই । সে এখনো ঘুমাচ্ছে । কিন্তু যত দেরিই করুক , তাকে ছাড়া তো আর যাওয়া যাবে না । টিপুর কনে দেখা নিয়ে নেসার ভয়াবহ পরিকল্পনা নিয়েছে । কনে দেখতে যাবে এমন সময়- যাতে নাস্তা সেরে আলাপ সালাপ করার পর ডিনারটাও সেরে আসা যায় । বরকে তো আর যেমন তেমন খাওয়াবে না । কনে পছন্দ হোক আর নাহোক , সেটা টিপুর ব্যাপার । কিন্তু খাওয়াটা হতে হবে সেইরকম । টেবিল থেকে খুব বেশি কিছু ফেরত দেয়া হবে না । খাওয়া ভালো হলে ইয়েস ভোট , মোটামুটি হলে ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকবে, আর খাবার পছন্দমত না হলে ‘নো’ ভোট ।

বন্ধুমহলে খাদক হিসেবে নেসার এখনো তার অদ্বিতীয় অবস্থান ধরে রেখেছে । অবশ্য পুরো মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে তার জুড়ি কেউ ছিল না । গত দশ বছরে তার রেকর্ড কেউ ভাংতে পারেনি ।
গাড়ি নিয়ে চলে এসেছে কনে দেখা কমিটির অন্যতম সদস্য – সেলিম । আর দেরি করা যায় না । বের হওয়া যাক । নেসারকে তার বাসা থেকে তুলে নিতে হবে ।

.................................

পকেট থেকে মেয়ের বায়োডাটাটা বের করে আরেকবার দেখে নিল টিপু । তারা এখন বসে আছে মেয়ের বাসার ড্রয়িং রুমে । নামটা দেখে মনে মনে কয়েকবার আওড়ালো । তাহেরা নওশীন । মেয়ের ছোটবোন এসে একটু আগে দুষ্টুমি করে গেছে । বলে গেছে – ‘নীলু আপু কিন্তু আপনাকে চেনে !’ টিপুর বুক ধ্বক ধ্বক করছে । কীভাবে চেনে ?

অবশেষে কনে এসে ঢুকলো । সাথে তার বড় খালাতো বোন । মুখের দিকে তাকিয়েই টিপু বুঝে ফেললো , এই সেই পেশেন্ট । টিপুর প্রথম পেশেন্ট । দাঁত এখন ঠিকঠাক , খুবই সুন্দর লাগছে । হাসিটা তো টিপুর কয়েকটা রিবস (বুকের হাড়) ভেঙ্গে দিয়ে গেল !

বাম হাতে তিনটা চিমটি অনুভব করলো নেসার । মানে তিনটা প্লাস । +++ ।
অর্থাৎ ঘটনা এখানেই শেষ । আর কনে দেখতে যাওয়া হবেনা । সিরিজ প্ল্যান ভেস্তে গেল নেসারের ।

নেসার দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো । এখন প্রস্তুত হবার সময় । টাইম টু গেট রেডি ফর ব্যাটল । টেবিল থেকে কোন ডিশের সামান্য ঝোলও আজ ফেরত দেয়া হবেনা ।

-অর্থোডন্টিক্স / ৩০-০৬-২০১৩

শনিবার, ২৯ জুন, ২০১৩

কিংকর্তব্যবিমূঢ়

‘আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে
জানিনে জানিনে , কিছুতে কেনযে মন ভরে না
ঝরোঝরো মুখর বাদল দিনে ......’
গুনগুন করে গাইতে গাইতে আনমনে হাঁটছিল জুয়েল । ডাঃ জুয়েল । আগে শুধু জুয়েল বললেই হতো । এখন আর তাতে কাজ হয়না । জুয়েল নিজে কখনো নামের সামনে ডাক্তার লেখেনা , তার ভালো লাগেনা । মনে হয় ‘জুয়েল’ নামটা ডাক্তার শব্দের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে । কিন্তু সবাই এখন ডাঃ জুয়েল বলেই চেনে । ফোনে যদি কখনো সে বলে –‘ আমি জুয়েল বলছি’, ওপাশ থেকে জবাব আসে ‘ডাঃ জুয়েল’ ? জুয়েলের বিরক্ত লাগে । কখনো কখনো ভালোও লাগে । অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে বোধহয় ।

আষাঢ় মাস শুরু হয়েছে । আজ কত তারিখ সেটা অবশ্য জানা নেই । মাকে ফোন করলে ঠিকই বলে দেবে । বাংলা মাসের কত তারিখ , চাঁদের কত তারিখ – মা এগুলো ঠিক ঠিক হিসাব রাখেন । জুয়েল প্রতি মাসে ফোন করে জেনে নেয় – পুর্নিমার রাত কবে । ঐদিন কোন ডিউটি সে করেনা । সেই রাতটা যেন ‘শুধুই আমার’ ।
জোছনায় একা একা হাঁটে, কবিতা আবৃত্তি করে । মাঝে মাঝে নিজেও লিখে ফেলে দুয়েকটা কবিতা ।

সকাল বেলা এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে । রাস্তার খানাখন্দে জমে আছে বৃষ্টির পানি । গাড়ি চলাচলের কারণে পুরো রাস্তা কর্দমাক্ত হয়ে আছে । তবু রিক্সা নিতে ভালো লাগছে না । রিক্সায় ঘুরতে ভালো লাগে , কিন্তু মাঝে মাঝে মনটা খচ খচ করে । অমানবিক মনে হয় । আগেকার দিনে কলকাতায় একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে মাথায় করে খাল পার করে দিত । রিক্সাকে জুয়েলের কাছে সেটারই একটা উন্নত ভার্সন মনে হয় । একজন মানুষ রিক্সায় বসে থাকবে , আরেকজন মানুষ সেই রিক্সা টেনে নিয়ে যাবে- এটা কি ঠিক ? আজকাল অবশ্য বেশ কিছু ব্যাটারিচালিত রিক্সা বের হয়েছে । ভালোই ।

জুয়েল আজ পড়েছে ফর্মাল পোষাক । একটা বেসরকারি মেডিকেলে ‘মেডিকেল অফিসার’ হিসেবে যোগ দিয়েছে আজ থেকে । তরুণ ডাক্তারদের জীবনটা যে কতটা চ্যালেঞ্জিং- কেউ বোঝে না । সাধারণ মানুষ সব ডাক্তারকেই এক পাল্লায় মাপে । ডাক্তার মানেই যেন ‘টাকার থলি’ ।
আত্মীয় স্বজনদেরও অনেক প্রত্যাশা । ছেলে ডাক্তার হয়েছে , অনেক টাকা পয়সা কামাবে । সবার জন্য ফ্রি চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে । সবার দেখাশোনা করবে । টাকাপয়সার তো আর অভাব নাই !
পোস্ট গ্রাজুয়েশনের জন্য পড়াশোনা, গাধার মত খাটুনি খেটে বিনেপয়সায় ট্রেনিং, নিজের পেট চালানো , পরিবারের দিকে নজর দেয়া সব মিলে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি । জুয়েল অল্পে সন্তুষ্ট । জীবন চালানোর জন্য মোটামুটি ব্যবস্থা হলেই সে খুশি । হাসপাতালে তাকে সপ্তাহে ৭ টা ডিউটি করতে হবে । হাজার বিশেক টাকা পাওয়া যাবে । টেনেটুনে চলে যাবে হয়তো ।

সামনে রাস্তার মাঝখানটায় পুরোটাই ঢালু । ওখানে পানি জমে আছে । চরমভাবে ঘোলা হয়ে গেছে । একপাশে কয়েকটা ইট একটু উঁচু হয়ে আছে । পা টিপে টিপে সেগুলোর ওপর দিয়েই পার হতে হবে । কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে জুয়েল সুযোগ পেল পার হবার । কয়েকটা ইট তখনো বাকি আছে , এমন সময় একটা কার সাৎ করে চলে গেল । কাঁদা পানি ছিটকে এসে পড়লো জুয়েলের কাপড় চোপড়ে । মহা বিরক্ত হয়ে কারের দিকে তাকালো জুয়েল । পাঁচ ছয় বছরের একটা ফুটফুটে বাচ্চা জানালা দিয়ে মুখ বের করে হিহি করে হাসছে । ড্রাইভারকে গালি দিতে গিয়েও থেমে গেল জুয়েল । নাহ । বাচ্চাটা মজা পেয়েছে, এটাই বা কম কিসে !

....................................

বাসায় পৌঁছুতে আরো এক কিলোর মত হাঁটতে হবে । জুয়েল ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে লাগলো । সামনে রাস্তার একপাশে সেই কারটা দাঁড়িয়ে । ব্যাপার কি ? বাসা মনে হয় এখানেই । কিছুই বলবে না, আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সে । তাই নির্বিকার ভাবে উদাস ভঙ্গিতে হাঁটছিল । কারের পাশে পৌছতেই দরজা খুলে পিচ্চি ছেলেটা এসে জাপ্টে ধরলো ।
‘চাচ্চু’, ‘আমি খুব সরি । আপনি কষ্ট পেয়েছেন তাই না ? আমাকে মাফ করে দিবেন । আমাদের বাসায় যাবেন চলুন’ ।
জানালা খুলে তাকিয়ে আছে একজন মহিলা, মুচকি হাসছেন । পিচ্চিটার মা হবে হয়তো ।
জুয়েল কী করবে বুঝতে না পেরে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো ।

- কিংকর্তব্যবিমূঢ় / ২৯-০৬-২০১৩

শুক্রবার, ২৮ জুন, ২০১৩

ইশারা

চারিদিকে থই থই জলের আধার
ইশারা করেছিল ঝাপিয়ে পড়তে তখনি
বলেছিল, ‘আকন্ঠ ভিজিয়ে শীতল করে দেবো’ ।

পায়ের নিচে কাঁদা ছিল , ছিল চোরাবালি
সেকথা বলেনি কেউ । বেকুব আমি
জলের ইশারা বুঝেছি , কাদার আহ্বান বুঝিনি !

আকাশে কালো মেঘ ইশারা দিয়েছিল
নেমে এসো খোলা প্রান্তরে
‘এখনি গলে যাবো আমি’
‘প্রতিটি লোমকূপে জাগিয়ে দেবো অচেনা শিহরণ’
‘বৃষ্টির কোমল পরশে’ ।

বজ্রের হুংকার ছিল , বিজলির হাতছানি
সেকথা বলেনি কেউ । বেকুব আমি
মেঘের ইশারা দেখেছি , বজ্রের আহ্বান বুঝিনি !

আষাঢ়ের কদম ফুল মিটিমিটি হেসেছিল
‘এসো নিয়ে যাও আমায়’
‘প্রিয়ার হাতে তুলে দিয়ে তাকিয়ে থেকো একটি মুহুর্ত’
‘অবাক চোখে’ ; বেকুব আমি
কদম ফুল এনে রেখেছিলেম টেবিলের ফুলদানিতে ।
দৃষ্টি নিবদ্ধ করে সাদা পাপড়িতে – ভেবেছি আনমনে
কে আমার প্রিয়ে, কোথায় ?

আমার বোকামিতে আমি মুগ্ধ
ন্যাড়া বেলতলায় যাক বা না যাক -
আমি বারবার ঝাপিয়ে পড়বো নীল শান্ত জলে
ভিজে ভিজে জ্বর বাঁধিয়ে ফেলবো
অঝোর বর্ষায় । ছুটে যাব কদমের আহবানে
এতটুকু অব্যক্ত ইশারায় !

- ইশারা / ২৮-০৬-২০১৩

পাগলা কুত্তা

কোনমতে নাস্তা খেয়েই ল্যাপটপটা চার্জারের সাথে লাগিয়ে শুয়ে পড়লো অপু । চট্টগ্রাম থেকে পঞ্চগড় – দীর্ঘ ১৮ ঘন্টার জার্ণি শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগে । এরমধ্যে ফেসবুকে ঢোকা হয়নি অপুর । মনটা খুব আকুপাকু করছিল । প্রতি ঘণ্টায় একবার ফেসবুকে ঢুঁ না দিলে তার ভালো লাগে না । নেশা হয়ে গেছে ।
মোবাইল , ল্যাপটপ দুটোরই চার্জ মাঝপথে শেষ হয়ে গিয়েছিল । মহা বিপদ ।

১০ মিনিট হয়েছে কি হয়নি- বাইরে শোরগোল শোনা গেল । এলাকার ছেলেপেলেরা হইহই করে দৌড়াচ্ছে । বাড়ির কাজের ছেলেটা হাপাতে হাপাতে এসে বলে গেল – ‘ অপু ভাইয়া আসেন, পাগলা কুত্তা বাইর হইছে । আইজ অইটাক মারি ফেলামো’ ।

অপুর রক্তও ছলকে উঠলো । পাগলা কুকুর মারাটা গ্রামের ছেলেপেলেদের কাছে একটা মহা বীরত্বের কাজ । ছোটবেলায় একবার পাগলা কুত্তাকে তাড়া করার স্মৃতিটা এখনো চোখে ভাসে । আম্মার জন্যে খুব একটা সুবিধা করা যেত না ।

বাইরে দৌড়াদৌড়ির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে । কিন্তু এতবড় ঘটনা ফেসবুকে স্ট্যাটাস না দিলে চলবে কীভাবে ? অপু তাড়াতাড়ি স্ট্যাটাস দিল ‘আইজ পাগলা কুত্তাডারে মাইরা ফালা ফালা কৈরা ফালামু’, ধর হালারে, মার !!’’
আঙ্গিনা থেকে একটা কাঠের চেলা নিয়ে অপুও দৌড় লাগালো । বীরত্বের কাজে অংশগ্রহণ করতে না পারলে জীবনটাই বৃথা কিনা !!

.............................................

তিনদিন পর ।
হঠাৎ অপুদের বাড়ির সামনে পুলিশের গাড়ি এসে উপস্থিত । কিছু বুঝে ওঠার আগেই তড়িৎ বেগে বাড়িতে ঢুকে অপুকে গ্রেপ্তার করে ফেললো পুলিশ । অপুর বড় ভাই এগিয়ে এলেন । অভিযানের নেতৃত্ব দানকারী এসআইকে জিজ্ঞেস করলেন , ‘ভাই সমস্যা কি ? ও আমার ছোট ভাই, চট্টগ্রামে থাকে । কয়েকদিনের জন্য বাড়িতে এসেছে । কী করেছে অপু ? ওকে ধরছেন কেন ?’
- আপনার ভাই ছাত্রলীগকে খুন করার হুমকি দিয়েছে ।
- কন কি ? কখন কোথায় ?
- ফেসবুকে , তিনদিন আগে ।
- কী লিখেছিলিরে অপু ? দেখি ।
অপু স্ট্যাটাসটা দেখালো । কেন দিয়েছিল সেটাও বললো । বড়ভাই অবাক হয়ে পুলিশের এসআইকে বললেন – ‘ভাই আপনাদের ভুল হচ্ছে । গ্রামে একটা পাগলা কুত্তা বের হয়েছিল । অপু ঐটার কথা লিখেছিল’ ।
অপুকে গাড়িতে তুলতে তুলতে পুলিশের এসআই বললেন –‘ ভাই কথা বাড়াইয়া লাভ নাই । পাগলা কুত্তা কাদেরকে বলে আর হায়েনা কাকে বলে দেশের সবাই এখন এইটা জানে’ । 

বাকিটা আদালতেই দেখা যাবে ।

- পাগলা কুত্তা/ ২৮-০৬-২০১৩

বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন, ২০১৩

শিকার

‘বদ পোলাডা সারাদিন কোথায় যে থাকে আল্লা মালুম । কোন সময় ডাক দিয়া পাই না’ ।
উঠান ঝাড়ু দিতে দিতে গজগজ করছিলেন আনোয়ারা বেগম । তার একমাত্র ছেলে বাপ্পির উদ্দেশ্যে এই বকবকানি । প্রতিদিন বিকাল বেলা শোনা যায় একই কথা । স্কুল থেকে ফিরে ভাত খেয়েই ছেলে উধাও হয়ে যায় ।
আনোয়ারা বেগমের স্বামী লোকমান হোসেন রিক্সা চালান । সেও সকালেই পেট পুরে পান্তা ভাত খেয়ে রিক্সা নিয়ে বের হয় । তার ইচ্ছা বাপ্পি আরেকটু বড় হলেই গণি সাহেবের কাছ থেকে লোন নিয়ে আরেকটা রিক্সা কিনবে । ছেলেসহ রিক্সা চালাবে । তার একার রোজগারে চলে না । কোনমতে সংসার টানা । ছেলেটা মাঝে মাঝে এটাসেটা আবদার করে, পুরণ করতে পারেনা লোকমান । গণি সাহেব এই এলাকার একজন সজ্জন ব্যক্তি । গরীবদের যেকোন সমস্যায় তিনি হাত বাড়িয়ে দেন । তার কাছে চেয়ে বিমুখ হতে হয় না ।

লোকমান বের হয়ে যাবার কিছুক্ষণ পরেই ঘর থেকে বের হয়ে যায় বাপ্পি । সে এবার চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র । বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের স্কুলে পড়ে । স্কুল থেকে ফিরে দুপুরের খাবার খেয়ে সে আবার বেরিয়ে পড়ে । কখনো খেলাধুলা করে , কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর ঘুরে বেড়ায় । বড় বিল্ডিং গুলোর সামনে দাড়িয়ে উচ্চারণ করে পড়ে – খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ, ইংরেজী বিভাগ, গণিত বিভাগ আরো অনেক কিছু । শিক্ষকদের নাম দেখে ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের দিকে তাকিয়ে থাকে এক দৃষ্টে । খুব ভালো লাগে তার । মাঝে মাঝে কেউ কেউ ছোটখাট কাজ করতে দেয় । সে খুশিমনে করে দেয় । স্যার বলে ডাকে । কেউ কেউ তাকে দিয়ে সিগারেট আনায় । বাপ্পি অবাক হয়- বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সিগারেট খায় কেন ? সিগারেটের প্যাকেটে সে লেখা দেখেছে – ‘ধুমপান হৃদরোগের কারণ’ ।
কোন কোনটাতে লেখা থাকে ‘ধুমপান মৃত্যু ঘটায়’ ।
ছাত্ররা কি এগুলো দেখে না ?

কিছু কিছু স্যার খুব ভালো । রফিক স্যার তাদেরই একজন । আসরের নামাজের পর রফিক স্যারকে মসজিদের সামনে পাওয়া যায় । বাপ্পি খুব খেয়াল করেছে- রফিক স্যার একদিনের জন্যও আসরের নামাজ মিস করে না । রফিক স্যার একদিন বাপ্পিকে বললেন- বাপ্পি, তুমি আমাকে স্যার না বলে ভাই বলবে । আমি তোমার বড় ভাই ।
বাপ্পি তবু রফিক স্যারকে ‘ভাই’ বলতে পারে না । তার লজ্জা লাগে । কিন্তু রফিক ভাই তাকে দেখলেই কাছে ডাকেন । চকোলেট , চিপস খেতে দেন । পরিবারের খোজখবর নেন । বাপ্পির খুব ভালো লাগে ।
যেদিন চকোলেট খেতে ইচ্ছে করে , সেদিন বাপ্পি আসরের নামাজের সময় মসজিদের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে । রফিক ভাই অনেক সুন্দর করে কথা বলেন । কুরআন হাদীস জানেন । বাপ্পি দেখেছে , একদিন রফিক ভাই মসজিদের সামনে বসে আরেকজনের সাথে কথা বলছিলেন । কত সুন্দর করে কত কিছু যে বললেন । বাপ্পি পেছনে বসে সব শুনেছে । রফিক ভাই টের পাননি । রফিক ভাই কুরআনের আয়াত মুখস্ত বলে গেলেন , আবার বাংলা অর্থ বলছিলেন । মাঝে মাঝে ইংরেজীতেও কথা বলছিলেন , সেগুলো অবশ্য বাপ্পি বুঝতে পারে নি ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের একটি পথে আনমনে হাঁটছিল বাপ্পি । অনেক কথা মনে পড়ছিল তার । একদিন মসজিদের সামনে গিয়ে রফিক ভাইয়ের জন্য দাঁড়িয়ে থাকলো । কিন্তু রফিক ভাইকে পেল না । পরপর কয়েকদিন দাড়ানোর পরও রফিক ভাইকে পেল না । একদিন সাহস করে- রফিক ভাইয়ের সাথে অনেকবার দেখেছে এরকম একজন কে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো – স্যার, রফিক স্যার নামাজে আসেন না কেন ?
তার প্রশ্ন শুনে থমকে দাঁড়িয়েছিলেন রফিক ভাইয়ের বন্ধু । বাপ্পিকে একদিকে নিয়ে বলেছিলেন- বাপ্পি, রফিক ভাই কোথায় আছেন কেমন আছেন কেউ জানে না । তিনি আর ফিরে আসবেন কিনা তাও কেউ জানে না । তাঁকে গুম করা হয়েছে । বলতে বলতে রফিক ভাইয়ের বন্ধু কেঁদে ফেলেন । বাপ্পিও সেদিন ডুকরে কেঁদে উঠেছিল । বাপ্পি ভাইর মত মানুষকে কে গুম করবে ? তারা কি মানুষ না ?

বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক আন্দোলন হলো । মিছিল মিটিং হলো । রফিক ভাইকে তবু পাওয়া যায়নি । মসজিদের সামনে গেলে বাপ্পির মনটা আকুপাকু করে রফিক ভাইয়ের জন্য । রফিক ভাই কি আর ফিরে আসবে না ?

- হেই বাপ্পি , কই যাস ? কাল সেমিফাইনাল খেলা , মনে আছে তো ? ঠিক সময় মত আসবি কিন্তু । দেরি করবি না ।
বাপ্পিকে দেখে চিৎকার করে বললো ওর বন্ধু মনির । বাপ্পি কোন উত্তর দিল না । নির্বিকার মনে হাটতেই লাগলো ।

.............................................

‘আনোয়ারা বু , ও আনোয়ারা বু । তোর পোলা গুলি খাইছে গো’ ।
ভার্সিটিত সরকারের দলের ছেলেরা দুই দলে গুলাগুলি করিছে । তোর পোলায় গুলি খাইছে আনোয়ারা বু গো ।
আনোয়ারা বেগমের হাত থেকে ঝাড়ুটা পড়ে গেল । ভার্সিটির দিকে দৌড়াতে লাগলো পাগলের মত । আমার পোলা আমার পোলা বলে চিৎকার করতে করতে রাস্তায় উঠতেই দেখতে পেল তার স্বামীর রিক্সায় বাপ্পির নিথর দেহ । বাপ্পির রক্তমাখা শরীরের দিকে একবার নজর পড়তেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল আনোয়ারা ।

(কোন ঘটনার সাথে মিল খুঁজে পেলে সেজন্য লেখক দায়ী থাকিবেন ।)
শিকার / ২৭-০৬-২০১৩

বুধবার, ২৬ জুন, ২০১৩

ট্রাভেল 2013

টাইম স্টেশন -১২১ এ বসে আছে মুন (Human Identification Number 100020003000400050006000711111 ) । অপেক্ষা করছে ট্রেনের জন্য । রিসেন্টলি কিছু সুন্দর টাইম ট্রাভেলিং ট্রেন ছাড়া হয়েছে । এগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা আগের গুলোর চেয়ে অনেক ভালো । পুরনো টাইম ট্রাভেলিং ট্রেনগুলি অনেক সময় আটকে যেত । দেখা গেল খ্রিষ্টপুর্ব ১০০০০ সালে গিয়ে আটকে আছে । চারিদিকে বিকটদর্শন জন্তু জানোয়ার ঘোরাফেরা করছে । বিরক্তিকর অবস্থা ।
হাতের বিশেষ ডিভাইসটির দিকে নজর দিল মুন । এটা তার বাবা নতুন কিনেছে তার জন্য । সর্বশেষ মডেলের ‘এনালিস-৯৯’ ডিভাইস । এটা একটা এনালাইসিস ডিভাইস । যেকোন কিছুকে এনালাইসিস করে তার সকল তথ্য মুহুর্তেই চোখের সামনে তুলে ধরবে এটা । এছাড়া এর মাধ্যমে আন্ত-সময় যোগাযোগ স্থাপন করা যায় । অতীতে কোথাও গিয়ে কোন সমস্যায় পড়লে এটার মাধ্যমে একজাক্ট লোকেশন ও টাইম জানিয়ে সাহায্য চাওয়া যায় ।
সময় দেখল মুন । এখন 22.50.43.21.06.2506 ।
অর্থাৎ ২৫০৬ সালের ২১শে জুন । এখন বাজে 22.50.43 ।
ট্রেন আসবে 23.00 তে । সে ১০ মিনিট আগেই চলে এসেছে । এই স্টেশনটা তার খুব ভালো লাগে । অনেকে অতীতের অনেক সময়ে ভ্রমণ করে , অনেক নমুনা নিয়ে আসে অতীত থেকে । মুন সেগুলো দেখে আর অবাক হয় । তার খুব ভালো লাগে । এটা পড়েছে প্লানেট আর্থ এর টেরিটরি-২৯১ এলাকায় । পৃথিবীতে এখন আর কোন দেশ নাই । পুরো পৃথিবী একটা একক সমন্বিত সিস্টেমে পরিচালিত হয় । পৃথিবীকে ভাগ করা হয়েছে বিভিন্ন টেরিটরিতে ।

মুন এস্ট্রোনোমিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র হলেও ইতিহাস নিয়ে খুবই আগ্রহী । ‘টেরিটরি-২৯১’ এর ইতিহাস ঘাটতে গিয়ে সে জানতে পেরেছে এই এলাকাটা একসময় ‘বাংলাদেশ’ নামে পরিচিত ছিল । সেটা প্রায় পাঁচশ বছর আগের কথা । সেসময়ের মানুষ ছিল খুব সহজ সরল । আবার কেউ কেউ ছিল খুব নিষ্ঠুর । তারা দুই ভাগে বিভক্ত ছিল – ভালো মানুষ , খারাপ মানুষ । মানুষে মানুষে অনেক দল-উপদল ছিল । তারা মারামারি করত । এমনকি মানুষ নাকি মানুষকেই খুন করতো ! ইতিহাসের এই অংশটা পড়ে তার গা শিউরে ওঠে । মানুষ কিভাবে মানুষ খুন করতে পারে ?
মুন ঠিক করেছে সে ২০১৩ সালের বাংলাদেশে নামবে । ঐ সময় নাকি বাংলাদেশে একদল মানুষ আরেকদল মানুষকে বিনা কারণে খুন করেছিল ! এমনকি রাস্তায় নাকি রক্তের লাল রঙ ছোপ ছোপ হয়ে নক্সা তৈরি করেছিল !

.............................................

- ভাইয়া ভাইয়া , ২০১৩ সালের মানুষগুলো কি বিশাল ছিল তাইনা ! আর কত্ত শক্তি ছিল ওদের গায়ে ! ও মাগো !
- কেন ? ওরা তো আমাদের চেয়েও দুর্বল ছিল । পুষ্টিহীনতায় ভুগতো ।
- উম্ম , আমাকে বোকা পেয়েছ ? ৪-৫ জন লোক মিলে ৯ তলা বিল্ডিং ধাক্কা দিয়ে ভেঙ্গে ফেললো । আমি জানি না ভেবেছ ?
ভ্রমণ শেষে ফিরে এসে ক্লান্ত মুন ঘুমিয়ে পড়েছিল । এই ফাঁকে তার ‘এনাসিস-৯৯’ ডিভাইসটা নিয়ে বসেছে ছোট বোন মণি । ওখানে ২০১৩ সালের বাংলাদেশ সম্পর্কে অনেক তথ্য, ছবি , ভিডিও নিয়ে এসেছে মুন । সেগুলোই দেখছিল মণি । ভাইয়ার সবকিছুই সে গোপনে গোপনে দেখে । মুন চোখ খোলামাত্রই শুরু করে দিয়েছে কথা ।
দেয়ালের চতুর্মাত্রিক স্ক্রিণে চোখ রাখলো মুন । সেখানে ভেসে উঠেছে ২০১৩ সালের বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অগা অহিউদ্দিনের একটা উদ্ধৃতি । ‘হরতাল সমর্থকরা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে কানা প্লাজা’ ।
‘এনাসিস-৯৯’ এই ব্যক্তি সম্পর্কে এনালিসিস দিয়েছে ‘Mentally Retarded’ ।
মণি একের পর এক স্লাইড চালিয়ে যাচ্ছিল । এরপর আসলো একটা টাক মাথার লোক । এই লোক ছিলেন বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী কাল কুহিত । এই ব্যক্তি সম্পর্কে ‘এনাসিস-৯৯’ একটা তথ্যই দিচ্ছে – ‘রাবিশ’ ।
আবার চেষ্টা করলে এনাসিস-৯৯ এর স্ক্রিণে ভেসে উঠে ‘বোগাস’ ।
এর মানে কী মুন বুঝতে পারলোনা ।
একটা স্লাইডে একজন লোকের ছবি ভেসে উঠলো , নাম বাবুল হোসেন । এই ব্যক্তি বাংলাদেশের যোগাযোগমন্ত্রী ছিলেন । দুর্নীতি করে ধরা খাওয়ার পর পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেন- ‘আমি সৎ লোক !’
-ভাইয়া ভাইয়া ! এই দেখো একটা বিড়াল ! কী সুন্দর !
মুন দেখলো পর্দায় একটা বিশালাকার কালো বিড়ালের ছবি । এই বিড়ালটাও নাকি ২০১৩ সালের বাংলাদেশের মন্ত্রী ছিল ! রেলপথ মন্ত্রী ! বিড়ালটার ছিল খুব টাকার লোভ । সেই সময় বাংলাদেশের কারেন্সি ছিল ‘টাকা’ ।
দুর্নীতির ‘টাকা’র বস্তাসহ ধরা পড়েছিল এই বিড়াল । বিড়াল কীভাবে মন্ত্রী হয় মুন বুঝতে পারেনা ।
এরপর স্লাইডগুলো ভয়ংকর হয়ে উঠতে লাগলো ।
চুহারা খাতুন নামের একজন কোন কারণ ছাড়াই বললো- ‘দেশের আইন শৃংখলা পরিস্থিতি যেকোন সময়ের তুলনায় ভালো !’
ভারুক খান নামের একজন এসেই বললো ‘কম খান’ ।
পাজাহান খান নামের একজন পর্দায় এসে বললো –‘চোখ তুলে ফেলবো’ ।
চিমরান সরকার নামের একজন পিঠ বেকিয়ে বললো –‘ফাঁসি চাই’ ।
বাংলাদেশের পার্লামেন্ট কেমন ছিল দেখার জন্য ক্লিক করতেই সাউন্ড হতে লাগলো ‘চুদুরবুদুর চুদুরবুদুর’ ।
আইনশৃংখলায় ক্লিক করতেই একের পর এক লাশের ছবি ভেসে উঠতে লাগলো দেয়ালের চতুর্মাত্রিক পর্দায় । চট্টগ্রামে ২ জন , চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪জন , চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ৩ জন, ঢাকায় ৫০০০, খুলনা, সাতক্ষীরা, নীলফামারি, জয়পুরহাট, বগুড়া, রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জ, কক্সবাজার সংখ্যা সংখ্যা সংখ্যা । গুলি, বোমা আর লাশ ।
খুনির পরিচয় সম্পর্কে এনাসিস-৯৯ জানাচ্ছে- ‘কুত্তালীগুলিশ’ এসব খুন করেছে । সেই সময়ের একদল নৃশংস মানুষকে ‘কুত্তালীগুলিশ’ নাম দেয়া হয়েছে ।

মুনের মাথা ঝিম ঝিম করতে লাগলো । মণিকে বন্ধ করতে বললো ডিভাইস । মণি খুব জেদি মেয়ে । সে শেষ করেই ছাড়বে । একের পর এক স্লাইড আসতেই লাগলো ।
-ভাইয়া দেখো এই ছিল প্রধানমন্ত্রী । নামটা দেখ- ভেক আচিনা ।
-দাড়াও দাড়াও । এই স্লাইডে রাখ ।
মুন বিছানা ছেড়ে উঠে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে এনাসিস-৯৯ কে জিজ্ঞেস করতে লাগলো । প্রধানমন্ত্রীর হিংস্রতা গ্রেড এসেছে ১০০৭ ! তার একটি বক্তব্য এনাসিস-৯৯ হাইলাইট করলো –‘ একটা লাশের বদলে দশটা লাশ চাই’ ।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এবং ৬ মে এই দুই দিনে হাজারের ওপরে মানুষ হত্যা করে ‘কুত্তালিগুলিশ’ বাহিনী । আহত হয় কয়েক হাজার মানুষ । একে একে সেই সব বীভৎস ছবি চতুর্মত্রিক পর্দায় ভেসে উঠতে লাগলো । মুনের মাথার ঝিমভাবটা চিনচিনে ব্যথায় পরিণত হলো । মাথা ঘুরতে লাগলো তার । দুহাতে মাথা চেপে ধরে চিৎকার করে উঠলো সে- ‘স্টপ’ ।
চমকে উঠে ডিভাইসটা হাত থেকে ফেলে দিল মণি ।

- ট্রাভেল 2013 / ২৬-০৬-২০১৩

মঙ্গলবার, ২৫ জুন, ২০১৩

খোয়াড়

সুর্য ডোবার আগে আগে একঝাক পাখি মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল । সেলিমদের দলের পরাগ ফুটবলে একটা উড়ন্ত কিক করলে বলটা আকাশে উঠে গেল । পাখিগুলো কিঁচিরমিচির করে উঠলো । গোলকিপার হাসানের চোখটা কিছুক্ষণের জন্য আটকে গেল সেখানে। বলের দিকে তার আর নজর নেই । সে তাকিয়ে আছে পাখিগুলোর দিকে । পাখির ঝাঁকটা পশ্চিম দিকে ঘুরে গেলে হাসানের চোখে পড়লো, সুর্য ডুবে যাচ্ছে । সে আর এক মুহুর্ত দেরি করলো না । সোজা উত্তর দিকে ছুট লাগালো । মাঝে একটা জংলার ওপাশে বাছুরটাকে খুট গেঁড়ে রেখে এসেছিল হাসান । মনের আনন্দে ঘাস খাচ্ছিল বাছুরটা । বয়স মাত্র তিন মাস । সুর্য ডোবার আগেই বাছুর নিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে । নাহলে মা খুব রাগ করবে ।

হাসান এবার ক্লাস সেভেনে পড়ে । ক্লাসে তার রোল তিন । কালিকাপুর গ্রামের স্কুল থেকে অনেক বছর পরে একজন ছাত্র প্রাথমিক বৃত্তি পেয়েছে । হাসান । ট্যালেন্টপুল পায় নি , সাধারণ বৃত্তি । স্কুলের স্যাররা এতে খুবই খুশি । সেদিন হাসান অসুস্থ ছিল । স্কুলে যেতে পারেনি । স্কুলের স্যাররা সবাই মিলে এসেছিলেন হাসানের বাড়িতে । হাসানের মা আসমা খাতুন খবর শুনে হাসানকে বুকে জড়িয়ে অনেকক্ষন কেঁদেছিলেন সেদিন । হাসান বোঝেনা- এতে কান্নার কী আছে !
তিনটা ঘর নিয়েই তাদের ছোট্ট বাড়ি । মানুষ মাত্র দুজন । হাসান আর তাঁর মা । মা সেলাই মেশিন চালিয়ে সংসার চালান । আরো দুটি প্রাণ এই বাড়িতে থাকে । গরুটা , আর তার বাছুর ।

জংলা পার হয়ে অবাক হয়ে গেল হাসান । বাছুরটা নেই । খুটের গোড়ায় দড়িটা ছেড়া । হাসান বাছুরটা খুজতে শুরু করলো । জংলার আশেপাশে খুজলো বেশ কিছুক্ষণ । দৌড়ে বাড়িতে গেল । মাকে বললো । মা তাকে কিছুক্ষণ বকলেন । হাসান ঘরে ঢুকে মাটির ব্যাংকটা ভেঙ্গে ফেললো । ৬০ টাকা বেরুলো । ওগুলো পকেটে নিয়ে সে আবার বের হলো ।
পাড়ার সব বাড়িতে খোঁজ নিয়ে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না । এশার আজান হয়ে গেছে । সারা বিকেল ফুটবল খেলার পর এই হাটাহাটি আর দুশ্চিন্তায় ক্লান্ত হয়ে গেল হাসান । দোস্ত রিফাতের বাড়িতে গিয়ে তাকে সব কথা বললো । রিফাতের মা তাঁকে জোর করে ভাত খাইয়ে দিলেন ।
- বাবা হাসান, পাড়ার সব বাড়িতে খুজেছ ?
- জ্বি খালা । কোথাও নেই ।
- ভাত খেয়ে রিফাত সহ পাশের গ্রামের জব্বারের খোয়াড়ে একবার যাও । হতে পারে কেউ বাছুরটাকে ওখানে দিয়ে এসেছে ।
- এতটুকু বাছুরকে খোঁয়াড়ে দেবে ?
- দিতেও তো পারে । টাকার লোভেও অনেক বদ ছেলেপেলে গরু-ছাগল খোয়াড়ে দিচ্ছে ।
দারুণ দুশ্চিন্তায় ভাত খেল হাসান । পাশের গ্রামে জব্বার খানের বাড়িতে খোয়াড় আছে । সেখানে গরু ধরে নিয়ে জমা দিলে তারা দশ টাকা দেয় । ছাগলের জন্য পাঁচ টাকা । গরু ছাড়িয়ে আনতে গরুর মালিককে গুনতে হয় ৫০ থেকে ১০০ টাকা । তারা গরুকে খাবার দেয় না । এক সপ্তাহের মধ্যে মালিকের খবর না পেলে সে গরু বিক্রি করে দেয়া হয় ।

খোয়াড়ে গিয়ে দেখলো সত্যি সত্যিই বাছুরটাকে ওখানে বেঁধে রাখা হয়েছে । খুব শক্ত করে বেঁধেছে । বাছুরটার মুখ শুকিয়ে গেছে । কতক্ষণ দুধ খায়নি ! দেখে হাসানের চোখ ভিজে উঠল । বাছুরটার গায়ে হাত বুলিয়ে দিল সে । খোয়াড়ওয়ালারা ৮০ টাকা দাবি করল বাছুরটাকে ছাড়ানোর জন্য । অনেক অনুরোধ করে ৬০ টাকা দিয়ে বাছুরটাকে ছাড়িয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরলো তারা দুজন ।
বল্টুর কাজ এটা । গত সপ্তাহে বল্টুর সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছিল হাসানের । বল্টুই বাছুরটাকে খোয়াড়ে দিয়েছে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য ।
................................................

চট্টগ্রাম কারাগারের হালদা-১৮ সেলের গ্রিল ধরে ছোটবেলার সেই দিনের কথা ভাবছিল হাসান । এসএসসিতে ভালো রেজাল্ট করে হাসান এবার শহরের একটি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছে । থাকে হোস্টেলে । মা এখন বাড়িতে একা । সারাদিন সেলাই মেশিন চালান । বাবা তো মারা গেছেন সেই ছোটবেলায় , হাসান তখন ক্লাস ফাইভে পড়তো ।
দেশের রাজনৈতিক অবস্থা ভালো না । হাসান সেসব নিয়ে খুব বেশি চিন্তাও করেনা । সে খুব গোছালো ছেলে । কলেজে যায়, ক্লাস করে । বিকেলে বিভিন্ন বই-পুস্তক পড়ে । হোস্টেলের ছাদে উঠে মায়ের কথা ভাবে ।
মাগরিবের আযান হলে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে । রুমে ফিরে কুরআন তেলাওয়াত করে । কুরআন শরীফ খানা মায়ের দেয়া । ও যেদিন শহরে আসে , মা তাঁর হাতে দুইশ টাকা আর এই কুরআন শরীফটি তুলে দিয়েছিল । এই কুরআন শরীফে প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা তেলাওয়াত করে চুমু দিতেন মা ।
মঙ্গলবার এশার নামাজ শেষে রুমে ফিরে কুরআন তেলাওয়াত করছিল হাসান । হঠাৎ কয়েকজন পুলিশ এসে ঘরে ঢুকলো । ‘এইযে পাইছি আরেকটা, কোরান পড়তেছে !’ কুরআন তেলাওয়াত রত অবস্থায় ধরে নিয়ে গেল তাঁকে । পুলিশ ভ্যানে হাসান দেখলো আরো কয়েকজনকে ধরে আনা হয়েছে ।
তিনদিন হয়ে গেল সে জেলখানায় । মা এখনো জানে কিনা কে জানে ! জানলে মা কী করবে ? ছোটবেলায় বাছুরটাকে তাঁর মাটির ব্যাংকে জমানো ৬০ টাকা খরচ করে ছাড়িয়ে এনেছিল । মা কোথায় পাবে টাকা ? এই খোয়াড় থেকে মা কি তাঁকে ছাড়াতে পারবেন ?
মায়ের কথা ভেবে হঠাৎ তার চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো ।

খোয়াড়/ ২৫-০৬-২০১৩

বুধবার, ১৯ জুন, ২০১৩

লিলুয়া সময়

কিছু সময় হারায় লিলুয়া বাতাসে
কিছু ক্ষণ উড়ে যায় কালবোশেখি ঝড়ে
কিছু কিছু মুহূর্ত আকড়ে থাকে মন
অক্টোপাশের মত । স্মৃতির বালুকণায় গড়ে ওঠে
ঢিবি থেকে টিলা । টিলা থেকে পাহাড়
বয়স যতই বাড়ে -
মানুষের মন হয় স্মৃতিকাতর ,
অতীতচারী ।

অখন্ড অবসর যেন অতীতের একটুকরো ক্ষেত
যেখানে কর্ষণ করে চলে ক্রমাগত
কলের লাঙ্গল । নরম মাটিতে দাগ রেখে হেঁটে যায়
সময়ের খাঁজকাটা চাকা ।
সময় হারালে হারিয়ে যায় দাঁত , বিবর্ণ হয়ে পড়ে চুল
সবকিছু ফ্যাকাশে হয় তবু -
অতীত যেন আসে আরো কাছে ; আরো উজ্জ্বল
পুর্ণিমায় দ্বাদশী চাঁদের মতন ।

তারপর হঠাৎ একদিন , অতীতও ফুরিয়ে যায়
অচেনা আঁধার সমুদ্রে ।

-লিলুয়া সময় / ১৯-০৬-২০১৩

রবিবার, ১৬ জুন, ২০১৩

অসাধারণ ভ্রাতৃত্ব

ইয়ারমুক যুদ্ধের ময়দান । ক্ষত বিক্ষত আহত অবস্থায় পড়ে আছেন মুসলিম বীর সাহাবী হারিস ইবনে হিশাম  (রাঃ) , ইকরামা ইবনে আবু জাহল (রাঃ) এবং আয়য়াশ ইবনে আবি রবীয়া(রাঃ) । পিপাসায় কাতর হারিস ইবনে হিশাম(রাঃ) পানি চাইলেন । তাঁকে যখন পানির পাত্র দেয়া হল, এমন সময় ইকরামা তাঁর দিকে তাকালেন । হারিস বললেন , ইকরামাকে দাও । পানিটুকু ইকরামার কাছে নিয়ে যাওয়া হলে আয়য়াশ তার দিকে তাকালেন । ইকরামা বললেন , আয়য়াশকে দাও । আয়য়াশের কাছে পানির গ্লাস নিয়ে যাওয়া হলে দেখা গেল তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন । তারপর গ্লাসটি নিয়ে একে একে অপর দুই সাথীর কাছে নিয়ে যাওয়া হলে দেখা গেল তাঁরাও একই পথের পথিক হয়েছেন ।

আল্লাহু আকবার । আল্লাহর রাসুল (সাঃ) এর সাহাবীদের ত্যাগ , ভ্রাতৃত্ব, পারস্পরিক ভালোবাসা ছিল এমনই । জীবনের অন্তিম মুহূর্তেও অন্য ভাইয়ের প্রয়োজনকেই তাঁরা বড় করে দেখেছেন ।
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকেও এমনিভাবে পরস্পরকে ভালোবাসার , পরস্পরকে অগ্রাধিকার দেয়ার তৌফিক দিন । আমীন ।


চিলেকোঠার প্রেম

বহুকাল ধরে চিলেকোঠার সাথে চাঁদের
গোপন প্রেম । বলা চলে সেই –
জন্মলগ্ন থেকেই !
সন্ধ্যাতারা জ্বলে উঠলে
জ্যোৎস্নামাখা চিঠি নিয়ে আসে সাদা ছেড়া মেঘ
অমাবশ্যার ঘুটঘুটে অন্ধকারেও – চিঠি লিখতে ভোলে না চাঁদ ;
সে চিঠি চিলেকোঠায় আসে, সুবহে সাদিকে ।

আষাঢ়ের কালো মেঘ , বজ্রের গর্জন
ভিলেনের মত বাধা হলে পরে
ঘন বরিষায় ভিজে যায় চিলেকোঠার ছাঁদটা ,
আমার শীর্ণ হাতেও লাগে খানিকটা
বিরহের শীতল পরশ । নিঃসঙ্গ কবির মত
আমিও যেন হয়ে যাই- বিরহী প্রেমিক ।

চিলেকোঠার সাথে আমার বন্ধুত্ব শৈশবের মত
পেঁচা ডাকার মত গভীর হলে রাত্রি
নিস্তব্ধ চিলেকোঠায় কান পেতে শুনি
চাঁদের সাথে তাঁর অপার্থিব প্রেমের কাহিনী
হিমেল হাওয়ার ফিসফিসানি কানে আসে
ঐন্দ্রজালিক সুরের নেপথ্য সংগীতের মত ।
তখন হঠাৎ যেন নিঃসঙ্গ কবির মত
আমিও হয়ে যাই- বিরহী প্রেমিক ।


16-06-2013


শনিবার, ১৫ জুন, ২০১৩

প্রহসন !

মাননীয় আদালত, এই ব্যক্তি খুন করেছে । তাঁকে শাস্তি দিতে হবে ।
কোথায় খুন করেছে ?
তা জানিনা , তবে খুন করেছে এটা নিশ্চিত । তার ফাঁসি চাই ।
কী দ্বারা খুন করেছে ?
তা আমি জানিনা , কিন্তু খুন করেছে এটা নিশ্চিত । এটা সবাই জানে ।
কেউ কি তাঁকে খুন করতে দেখেছে ?
না কেউ দেখেনি । তবে সবাই জানে যে খুনটা সেই করেছে ।
কাকে খুন করেছে ? সে সেময় কি এই ব্যক্তি সেখানে ছিল ?
এই লোক সেসময় সেখানে ছিল কিনা জানা নেই । তবে খুন এই লোকই করেছে ।

আদালতঃ এটা প্রমাণিত হলো যে এই লোকই খুনটি করেছে । তাঁকে ১০০ বছরের কারাদন্ড দেয় হলো ।


১৫-০৭-২০১৩ 

বুধবার, ১২ জুন, ২০১৩

ইসলামী রাষ্ট্র নিয়ে ভুল ধারণা ও অহেতুক ভীতি

বাম ঘরাণার এক আপুর একটা স্ট্যাটাস দেখলাম ফেসবুকে । যার শুরুটা এরকম-
‘চোখ বন্ধ করুন । এক মিনিটের জন্য ভাবুন জামাত , জামতের দোসর হেফাজত এবং বিএনপি ক্ষমতায় । তাহলে কি ঘটবে ? সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখবেন ফেসবুক বন্ধ। ইন্টারনেট কানেকশন নাই। মোবাইলে সরকারী বার্তা- ইন্টারনেট একটা ইসলাম পরিপন্থী সেবা, তাই বাংলাদেশের মতো একটি ইসলামিক দেশে এই রকম অনৈতিক সেবা বন্ধ করে ইসলামকে হেফাজত করা হলো। আপনি মন খারাপ করে রাস্তায় বের হবেন’ ।

আমি খুব কষ্ট পেলাম । কথাগুলো যদি তিনি শুধুমাত্র বিদ্বেষ থেকে বলে থাকেন তাহলে কিছু বলার নেই । কিন্তু যদি সত্যিকার বিশ্বাস থেকে বলে থাকেন তাহলে এটা সত্যিই দুঃখজনক । এটা আমাদের একটা ব্যর্থতাকে ইঙ্গিত করে । বাংলাদেশে যারা ইসলামের কথা বলেন- তাঁরা অনেক কিছু করতে পারলেও ইসলামের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিটাকে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারেন নি । যদি তাঁর মত কেউ এরকম মনে করে থাকেন- তাদেরকে বলছি, ভাই-বোনেরা , ইসলাম কোনকিছুকে অহেতুক নিষিদ্ধ করেনা । ইসলাম ছুরিকে ইসলাম পরিপন্থী বলেনা , কিন্তু ছুরি দিয়ে নিরীহ মানুষ হত্যার কঠোর শাস্তি দেয় ।

যদি ইসলামী রাষ্ট্র গঠন হয় তাহলে ইন্টারনেট কানেকশন বন্ধ করা হবে না । প্রশ্নই ওঠে না । তবে ইন্টারনেটে থাকা পর্ণো সাইটগুলো ঠিকই বন্ধ করা হবে । ফেসবুক বন্ধ করা হবে না, ফেসবুকে থাকা চটি পেজ- সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারী পেজ বন্ধ করা হবে । টেলিভিশন সম্প্রচার বন্ধ করা হবে না, টেলিভিশনে অশ্লীল সিনেমা সম্প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হবে । সিনেমা হল বন্ধ করা হবে না , সেখানে কাটপিস প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হবে ।
এখন সিদ্ধান্ত আপনার- আপনি কী চান ।

তিনি লিখেছেন- ‘দেখবেন রাস্তায় কোন কলেজ , ভার্সিটি পড়ুয়া ছেলে কানে হেডফোন লাগিয়ে ঘুরছে না। কোন মেয়ে কপালে লাল টিপ দেয়নি। কোন গৃহিণী সংসারের প্রয়োজনীয় বাজার করছে না’

পুরোটাই ভুল ধারণা । ইসলাম কোন মেয়ের কপালে টিপ দেয়া কিংবা বাজার থেকে জিনিসপত্র কেনায় আপত্তি করেনা । তবে উত্তেজক পোষাক আশাক পড়ে, সাজগোজ করে একা একা ঘোরাফেরা করতে আপত্তি করে । আর এটা নারীর নিরাপত্তার কথা ভেবে ।

আরো যা যা ঘটবে বলে তিনি লিখেছেন-
‘রাস্তায় ঢোলা পাঞ্জাবি আর টুপি পরা কিছু ধর্ম ব্যবসায়ী , হিংস্র দৃষ্টিতে লক্ষ্য রাখছে কোথাও জোরে গান বাজছে কিনা, কোন ছেলেমেয়ে এক সঙ্গে হাঁটছে কিনা। সামনে পহেলা বৈশাখ, অথচ কোন কাপড়ের দোকানে লাল সাদা শাড়ি, ফতুয়া পাঞ্জাবি নেই, সব দোকানে কাল বোরখা আর সাদা পাঞ্জাবি ঝুলছে । পাঠ্য বই থেকে রাবীন্দ্রনাথ নজরুলের এর কবিতা সরিয়ে ফেলা হয়েছে । নারী শিক্ষার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে । কোন ছেলে তার প্রিয়াকে দেখে বলে না, তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সে কি মোর অপরাধ’ ।

কী পরিমাণ ভুল ধারণা তিনি রাখেন – খুবই দুঃখজনক । তিনি একা না, আরো অনেকেই এমন ধারণা রাখে, বিশ্বাস করে । অথচ ইসলামী রাষ্ট্রে এরকম কিছু ঘটবে না । বেপর্দা হয়ে চলাফেরাকে নিরুৎসাহিত করা হবে, তার মানে এইনা যে কাউকে বোরখা ছাড়া দেখলেই মোল্লারা ধরে থাপড়াবে । লাল শাড়ি – ফতুয়াকে অনৈসলামিক ঘোষণা করা হবে কেন ? যেকোন শালীন পোষাকই ইসলামের বিধানে স্বীকৃত । কিন্তু কোন মেয়ে যদি চিপা জিন্স আর ফতুয়া পড়ে, সেটা কি শালীন দেখায় ? রমনার চিপায় চাপায় প্রিয়-প্রিয়ার অবাধ জড়াজড়িকে অবশ্যই ইসলাম সমর্থন করে না । এটা সমাজের জন্য ভালো নয় । বিয়ে করে বাড়িতে যা ইচ্ছা করেন ।

ইসলামী সংস্কৃতি মানেই আরবীয় সংস্কৃতি নয় । স্থানীয় আচার-আচরণ, স্থানীয় সংস্কৃতি , যা কিছু শোভন, যা কিছু সমাজ জীবনে শান্তি-শৃংখলা নষ্ট করে না , যা কিছু ইসলামের মূলনীতিকে চ্যালেঞ্জ করে না – সবকিছুই ইসলামের গন্ডিতে স্বীকৃত । আমাদের দুর্ভাগ্য যে- একপক্ষের লোকজন ইসলামী সংস্কৃতি বলতে আরবীয় সংস্কৃতি হিসেবে তুলে ধরে মানুষকে বিভ্রান্ত করেন । ইসলাম সংস্কৃতি-বিনোদন বিরোধী বলে প্রচার করে মানুষকে ভুল ধারণা দেন । আবার আলেম ওলামাগণ সাংস্কৃতিক দিকটাকে স্পষ্ট করে তুলে ধরেন না । যার ফলে সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ সবকিছুকে আজ ইসলামের বিপক্ষে দাঁড় করানো হচ্ছে ।

আসুন- ইসলাম নিয়ে পড়াশুনা করি । বসে বসে কল্পনা করে ইসলামের ওপর দোষ চাপিয়ে শিউরে ওঠার দরকার নাই । ওটা বোকামী , ওটা মুক্তচিন্তা নয় । ইসলামী সমাজ মানে কোন জংলী সমাজ নয় ; আধুনিক, শান্তিপুর্ণ, সুশৃংখল সমাজ ।
জামায়াত , হেফাজত, বিএনপি নিয়ে চিন্তিত হবার দরকার নেই । জামায়াত বিদ্বেষকে ইসলাম বিদ্বেষে পরিণত করবেন না । শেখ হাসিনা যদি আজকে বলেন তিনি দেশে ইসলামী মুল্যবোধের শাসনতন্ত্র দিবেন, আমি আজই আওয়ামী লীগে যোগ দিতে রাজী আছি । কিন্তু আমি জানি- সেই আশা দুরাশা মাত্র !


12-06-2013

সোমবার, ১০ জুন, ২০১৩

সৌভাগ্যবান আমি

অতীতের দিকে তাকালে আমার নিজেকে একজন সৌভাগ্যবান বলেই মনে হয় । এই ক্ষুদ্র জীবনে অনেক কিছুই দেখা হয়ে গেলো । অভিজ্ঞতার ঝুলি যথেষ্ট ভারী হলো । প্রাইমারী স্কুল পড়েছি গ্রামে । দেড় কিলোমিটার দূরে স্কুল । রাস্তার পাশে নদী । স্কুলের বিশাল মাঠ । মাঠের একপাশে জঙ্গল । একপাশে নদী । একপাশে ঈদগাহ মাঠ । সাথেই লাগোয়া আলিয়া মাদ্রাসা, হাফেজিয়া মাদ্রাসা । শৈশবে যেমন প্রয়োজন, ঠিক তেমনি একটি স্কুল । চিরায়ত গ্রামের স্কুল । স্যার, ম্যাডামদের আদর পেয়েছি সবচেয়ে বেশি । আম গাছের নিচে সবুজ ঘাসের ওপর বসে আম পাতা জোড়া জোড়া পড়েছি । স্যার ঘুমিয়ে গেছেন চেয়ারে । সেই দৃশ্যটাকে যেন স্বর্গীয়, নৈসর্গিক, অপার্থিব যেকোন বিশেষণে বিশেষিত করা যায় ।
হাইস্কুল ছিল মফস্বল থানা শহরে । বাড়ি থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে । সাইকেলে সকালে স্কুলে যেতাম , সন্ধ্যায় ফিরতাম । সকাল সন্ধ্যা স্বাধীনতা । শত বছরের পুরনো স্কুল । স্কুলের সবুজ মাঠ । শতবর্ষী তেতুল গাছের নিচে বাধানো । তেঁতুল তলায় পন্ডিত স্যারের ব্যাকরণ ক্লাসটা এখনো যেন চোখে ভাসছে ।

কলেজ পড়লাম প্রায়-বিভাগীয় শহরে । বিশ্ববিদ্যালয় পড়লাম বিভাগীয় শহরে , বানিজ্যিক রাজধানীতে । সবগুলো স্টেজে সর্বোচ্চ ভালো ফলাফলই পেলাম । এরপর যাব মেগাসিটি রাজধানীতে । তারপর হয়তো বিদেশ । বয়সের সাথে সাথে এগিয়ে চলেছে জীবন । ঠিক যেন –যখন যেমন প্রয়োজন ।

বাবা মধ্যবিত্ত স্কুল-শিক্ষক । আমার মনে হয়- জীবনকে চেনার জন্য , জীবনের সুখ-দুঃখ গুলো কাছে থেকে উপলব্ধি করার জন্য এরকম মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ অনিবার্য প্রয়োজন । একটু অভাব , একটু স্বচ্ছলতা । কখনো না চাইতেই পাওয়া, কখনো কান্নাকাটি করেও না পাওয়া । এভাবেই অনুভূতিগুলো যেন একটা শক্ত কাঠামোর ওপর দিয়ে গড়ে উঠেছে ।

জাহেলিয়াতের খপ্পরে পড়ার আগেই পেয়েছি জান্নাতি সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের দেখা । সংগঠনের সকল স্তরে – সব ধরণের শাখায় কাজ করার সুযোগ হল । মহানগর/সদস্য শাখা, শহর শাখা , জেলা শাখা, থানা শাখা, সাথী শাখা, সাংগঠনিক থানা শাখা , উপশাখা, আবাসিক ওয়ার্ড, স্কুল, কলেজ, সংস্কৃতি বিভাগ......আলহামদুলিল্লাহ্‌ । শত শত ছাত্রকে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার সুযোগ পেলাম । সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে এসএসসির পরের সময়টুকুর কথা । আমার থানা থেকে আমি প্রথম এ প্লাস পেয়েছিলাম । থানার স্কুলে স্কুলে দাওয়াতী টিম নিয়ে ঘুরে ঘুরে দাওয়াতী কাজ করাটা সত্যিই এক অসাধারণ স্বর্গীয় অনুভূতি । আমি কথা বলতাম , সবাই চুপচাপ শুনতো । প্রশ্ন করতো , উত্তর দিতাম । সে একটা নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তখন ।

ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি করতে হলো ছাত্রদল, ছাত্রলীগ, ছাত্রইউনিয়ন সবার সাথে । বেস্ট থেকে অর্স্ট সব পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে । অনেক সম্মান, অনেক নির্যাতন । জেনেছি সবার রুপ, কর্মপদ্ধতি, ইসলাম ও জাহেলিয়াতের পার্থক্য । আলহামদুলিল্লাহ্‌ ।
ছোটবেলায় কিশোর কন্ঠ , ইয়ুথ ওয়েভ এর এজেন্ট ছিলাম । লেখা পাঠাতাম , ছাপাত । নির্মল আনন্দ পেতাম । নিজেকে অনেক বড় কিছু মনে হত । বড় হয়ে বছর দুয়েক জাতীয় পত্রিকায় সাংবাদিকতাও করেছি ।

এখন বয়স ২৪ । 

আলহামদুলিল্লাহ্‌ । এই সময়টুকুর কথা যখন চিন্তা করি, মনে হয় অনেক অনেক বেশি দিয়েছেন মহান রাব্বুল আলামীন । সব ধরণের মানুষের সাথে মিশতে পেরেছি । অসংখ্য বই পড়ে আর নানান অভিজ্ঞতায় ইচড়ে পাকা হয়েছি ।

২৫ থেকে ৪০ আরেকটা পিরিয়ড । এই সময়টা নিজেকে গঠন করতে হবে । কাচামাল যোগাড় হয়েছে, এখন সেগুলোকে পোক্ত করতে হবে । ভুলত্রুটিগুলো খুঁজে বের করতে হবে । চিন্তাচেতনায় ঢালাই করতে হবে । পরিপক্ক করতে হবে মন-মানস । তারপর আল্লাহ বাচিয়ে রাখলে ৪০ থেকে ৬০ এই ২০ বছর এক কঠিন সংগ্রামে নেমে পড়তে হবে । মানুষের জন্য, সত্যের জন্য , আল্লাহর দ্বীনের জন্য । দেখা যাক আমার প্রভু সামনে আমার জন্য কী রেখেছেন । আল্লাহ তুমি তাওফিক দিও ভালো থাকার, ভালো কাজ করার । আমীন ।



10-06-2013

হকপন্থী দল নির্ণয়

ইসলামী দল কিংবা ইসলামপন্থি ব্যক্তিদের মধ্যে হকের পথে কে বা কারা আছেন সেটা নির্ণয় করার জন্য আমি সহজ পন্থা অবলম্বন করি । বৃক্ষ তোমার নাম কী , ফলে পরিচয় । যারা ইসলাম ও ইসলাম প্রতিষ্ঠার পথে আসল প্রতিবন্ধকদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, তারা হকপন্থি । বাকিরা হকের পথে আছেন কিনা তা নিয়ে আমি বাস্তবিক কারণেই অনেক বেশি সন্দিহান ।

বাংলাদেশে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের প্রধান শত্রু কারা ? নিঃসন্দেহে কম্যুনিস্ট ও সেক্যুলাররা । কম্যুনিস্ট ও সেক্যুলারদের উত্থান ও লালনপালন করছে কে ? আওয়ামী লীগ ।
আমি যাদেরকে দেখি ইসলামী দল ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন, কিন্তু কম্যুনিস্ট এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কথা বলেন না – আমি নিশ্চিত, তারা হকের পথে নেই । অমুক শায়খের অনুসারী, তমুক দলের অনুসারী , বুজুর্গের অনুসারী, পীরের অনুসারী, মুখে মুখে খেলাফত কায়েম করেন , বাস্তবে দেখা যায় তাঁর দাওয়াতী কাজের নামে ৯০% সময় খরচ করেন অন্য কোন আলেম অথবা ইসলামী দলের কুৎসা গেয়ে । বিষোদগার করে । আসল শত্রুদের বিরুদ্ধে ১০% সময়-সামর্থ্যও কাজে লাগান না ।

আমার মনে প্রশ্ন জাগে, আপনারা মওদূদীকে যতবার কাফের বলেন , জাকির নায়েককে যতবার কাফের বলেন, হাসান আল বান্নাকে কাফের বলেন – আমরা হিসাব রাখতে হিমশিম খাই । কই, শেখ হাসিনাকে একবারও কাফের বলেন না কেন ? সাজেদা চৌধুরীকে বলেন না কেন ? মেনন-ইনুকে বলেন না কেন ? শফিক আহমেদকে অলেন না কেন ? অথচ এরা আমাদের সংবিধান থেকে ‘আল্লাহর ওপর আস্থা’ টুকু পর্যন্ত বিলুপ্ত করে দিয়েছে । আপনাদের কাছে কি মাওলানা মওদূদী, হাসান আল বান্না, জাকির নায়েকের চেয়ে এরা বেশি বুজুর্গ ? এরা বেশি ঈমানদার ?

নারী নেতৃত্ব নিয়ে সারাদিন তেনা পেচান । জামায়াতে ইসলামী , খেলাফত মজলিস, ইসলামী ঐক্যজোটের পিন্ডি চটকান । শেখ হাসিনা-খালেদা জিয়াকে বলেন না কেন যে, আপনারা নেতৃত্বে থাকলে আপনাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবো ?
সেইটা তো করেন না । তো আপনাদের এইসব কথাবার্তাকে ফাইজলামি ছাড়া আর কী বলা যাবে ?

ভাইয়ে ভাইয়ে মতবিরোধ থাকলে সেটা ইসলামী রাষ্ট্র গঠনের পরেও মিমাংসা করা যাবে । কিন্তু আপনারা ইসলামী দলকে ভাই মনে করেন না । সেক্যুলার-নাস্তিক- ও তাদের লালনকারি আওয়ামী লীগের চেয়ে বড় শত্রু মনে করেন ।

ভাইসব , যারা সারাদিন বিভিন্ন ইসলামী দল ও আলেমদের বিরুদ্ধে লেগে আছেন – সাবধান হোন । আমার দৃঢ় বিশ্বাস- ইসলামের প্রকৃত শত্রুদের বিরুদ্ধে না লড়ে, মুসলিমদের ভেতর ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক নষ্ট করে , ঐক্যের পথে বাধা সৃষ্টি করে , আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠাকে বিলম্বিত করে যে ক্ষতি করছেন- আল্লাহর কাছে জবাব দিতে পারবেন না ।


10=06=2013

শনিবার, ৮ জুন, ২০১৩

অনলাইন ডাকাতের কবলে

২০০৮ সালে ছাত্র নামের ডাকাতরা আমার সবকিছু পুড়িয়ে দিলে আমার সবচেয়ে প্রিয় দশটি ফুলের মত সুন্দর ডায়েরি পোড়া গিয়েছিল । আমার ছোটবেলা থেকে লেখা কচি হাতের কাঁচা লেখাগুলি সেদিন ছাই হয়ে গিয়েছিল । ছড়া, কবিতা,ছোটগল্প । আর আত্মজীবনী ! ভেবেছিলাম, জীবনে আমি অনেক বড় হবো, তাই আমার আত্মজীবনীটা লিখে রাখা দরকার ! সেই ডায়েরিগুলো নষ্ট হওয়ায় খুব খারাপ লেগেছিল ।

আজ অনলাইন ডাকাতরা আমার ফেসবুকের ওয়াল থেকে অসংখ্য স্ট্যাটাস গায়েব করে দিয়েছে । ঠিক সেদিনের মত কষ্ট আজও পেলাম । ডায়েরিতে আর লেখা হয়নি । ২০০৯ সাল থেকে ব্যস্ত জীবনের অনুভূতি আর চিন্তাভাবনা গুলো লিখতাম স্ট্যাটাসে । আজ সেগুলো হারিয়ে গেল । সাম্প্রতিক কিছু স্ট্যাটাসের ব্যাকআপ আছে, কিন্তু পুরনো স্ট্যাটাসগুলোর ব্যাকআপ নেই । সেগুলো আর কোনদিন ফিরে পাওয়া যাবে না ।
পুরনো যেসব স্ট্যাটাস ব্যাকআপে রয়েছে মাঝে মাঝে সেগুলো রিআপলোড করবো । দয়া করে কেউ বিরক্ত হবেন না ।
আসুন এইসব অনলাইন ডাকাতদের প্রতি ধিক্কার জানাই ।




০৮-০৬-২০১৩ 

বুধবার, ৫ জুন, ২০১৩

যুগসন্ধিক্ষণের প্রজন্ম আমরা

এখন যেসব বাচ্চার জন্ম হচ্ছে সম্ভবত তারা একটা নতুন যুগের প্রজন্ম । ডিজিটাল প্রজন্ম । এরা যদি হাজার বছর ধরে উপন্যাসটা পড়ে, খুব বেশি কিছু বুঝতে পারবে না । শত শত বছরের চিরায়ত বাংলার সেইসব ঘটনা তারা উপলব্ধি করতে পারবে না । তাদের মনে খুব বেশি দাগ কাটবে না । তারা কল্পনা করতে পারবে না , আসলে কী ঘটতো সেই সময় ।

আমাদের বয়সী যারা, তারা সৌভাগ্যবান । আমরাই বোধহয় হাজার বছর ধরে –তে চিত্রায়িত সেই বাংলার শেষ প্রজন্ম । আমি ঢেকি দেখেছি , ঢেকিতে ধান ভানা দেখেছি । গরুর গাড়ি দেখেছি- গরুর গাড়িতে চড়ে অনেক পথ পাড়ি দিয়েছি । পুথি পাঠ শুনেছি । গাজী-কালু-চম্পাবতীর কিচ্ছা শুনেছি । শহীদে কারবালার কাওয়ালি শুনেছি । গানে গানে ঝগড়ার পালাগান শুনেছি । বায়োস্কোপ দেখেছি । হা্ডুডু খেলেছি , ছি-বুড়ি-দাড়িয়াবান্ধা খেলেছি । বউ পেটানো মকবুল বুড়োকে দেখেছি-চিরায়ত বাংলায় ।

এই সময়ের বাচ্চারা আর সেইসব দেখতে পাবে না । ঐসব বিলুপ্ত হয়ে গেছে প্রায় সবই ।
ওলা বিবিকে তাড়ানোর জন্য থালাবাটি ঢাক ঢোল বাজিয়ে ইয়া আলী ইয়া আলী করাটাও এখন আর কোথাও পাওয়া যাবে না । ছোটবেলায় আমি দুয়েকবার ওলাবিবি তাড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলাম । অনেক লোক রাস্তায় নেমেছিল । আম্মা বলেছিলেন, এইগুলা কুসংস্কার । তবু আমি একটা বড় থালা হাতে বাড়ির বাইরে গিয়েছিলাম । ইয়া আলী ইয়া আলী বলতে বলতে থালায় হাত দিয়ে শব্দ করেছিলাম ।
এরপর আর কখনো দেখিনি ।

আমাদের বেড়ে ওঠার সময়টাতে- গত দশ-পনেরো বছরে বিজ্ঞানের উন্নতি হয়েছে খুব দ্রুত । রঙ্গিন টেলিভিশন, মোবাইল, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ইন্টারনেট সবকিছু । আমরা এই সময়টাও পাচ্ছি এবং খুব ভালোভাবেই ভোগ করছি । কিন্তু আমাদের দাদারা এই সময়টা পান নি । তারা এই নতুন যুগটাকে পাননি । বাবা-চাচারা দেখছেন, কিন্তু ঠিকমত কাজে লাগাতে পারছেন না ।
আমরা –এখন তরুণ প্রজন্ম সত্যিই অনেক অনেক ভাগ্যবান । মনে হয় দুটি সহস্রাব্দের মাঝখানে আমাদের জন্ম । দুই সহস্রাব্দেরই মানুষ আমরা । ভাবতে ভালোই লাগে ।


05-06-2013