এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...

এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে

সোমবার, ২৬ আগস্ট, ২০১৩

খ্যাতি ও জীবন

১।
মানুষের একটা ন্যাচারাল ইন্সটিংক্ট হলো – মানুষ সম্মান চায়, খ্যাতি চায় । ছোটবেলায় ক্লাসের বইয়ে পড়েছিলাম – ভালো কাজ করার একটা উদ্দেশ্য হলো, মৃত্যুর পরেও মানুষ আমার কথা মনে রাখবে । আমি মরে যাবো, কিন্তু আমার নাম বেঁচে থাকবে আমার কাজের মাধ্যমে ।

খ্যাতির জন্য মানুষ কতকিছুই না করে ! ‘গিনেস বুক অব রেকর্ডস’ এ নাম ওঠানোর জন্য আজগুবি কত কিছুযে হয় ! কেউ খেয়ে খেয়ে ওজন বাড়ায়, কেউ বছরের পর বছর নখ কাটে না, দাড়িগোঁফ-চুল কাটে না, কেউ লোহা খায় । আরও কতকি ! ফেসবুকেও দেখি সামান্য খ্যাতির জন্য কতজনে মিথ্যা তথ্য ছড়ায় ।

আচ্ছা এই খ্যাতি দিয়ে কী হবে ? পৃথিবীর আদি থেকে আজ পর্যন্ত কত কবি জন্মেছিলেন তাদের কতজনের কথা আমরা জানি ? কত ঔপন্যাসিক, কত দার্শনিক, শিক্ষক , গায়ক জন্মেছিলেন তার ক’জনের কথা আমরা জানি ?যে সাহিত্য সম্পর্কে খুব ভালো জ্ঞান রাখে, তার কাছেও অনেক সাহিত্যিকের নাম শেষ পর্যন্ত অজানাই থেকে যায় । বিজ্ঞান নিয়ে যে পড়াশোনা করে, চিন্তা –গবেষণা করে , তার কাছেও অনেক বিজ্ঞানীর নাম এবং কাজ অজানাই থেকে যায় ।

ধরি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা । তিনি আসলেই একজন জিনিয়াস কবি ছিলেন । সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারও পেয়েছেন । কিন্তু তবুও পৃথিবীর কতজন মানুষ তার নাম জানে ? অন্যান্য দেশের কথা বাদই দিলাম, বাংলাদেশ এবং ভারতেরই কমপক্ষে অর্ধেক মানুষ তার নাম জানে না । কতজন তার সাহিত্য পড়েছে ? অধিকাংশ মানুষই পড়েনি । আরও একশত বছর পরে হয়তো এই সংখ্যা আরও কমে যাবে । একসময় রবীন্দ্রনাথের কবিতা পাঠ্যপুস্তক থেকেও হারিয়ে যাবে ।

ধরে নিলাম , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর অনেক বছর পরেও তার নাম মানুষ স্মরণ করে । আচ্ছা তাতে রবিঠাকুরের লাভটা কী হচ্ছে ? তার মৃত্যুর পরেও তো লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম রাখা হয়েছে ‘রবীন্দ্রনাথ’ ! শুধু এই নামটা থাকাতে কী পার্থক্য হয়েছে ? তিনি জীবিত থাকাতে যতটুকু সম্মান পেয়েছেন , আসলে ততটুকুই তার লাভ । এরপর সবকিছু শুন্য ।

সত্যিকারার্থে মৃত্যুর পরের জীবনে তিনি এখান থেকে আর কিছুই পাচ্ছেন না ।

২।
তাহলে কি কিছু করার দরকার নেই ? খেয়েদেয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারাটাই সফলতা ?
আসলে তাও নয় । আমাদের কাজ করতে হবে , অনেক কাজ । তবে সেসবের শুরুতে প্রয়োজন ঈমান । ঈমানবিহীন সব কাজের মুল্য শুন্য । দ্বিতীয়ত, করতে হবে এমন কাজ যাতে মানুষ সত্যের পথ খুঁজে পায়, সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকতে পারে । মানুষের উপকার হয় এমন কাজ । ঈমানদার ব্যক্তি বিশ্বাস করেন, ভালো কাজের পুরস্কার মৃত্যুর পরের জীবনে পাওয়া যাবে । শুধু ‘নাম’ থাকার মত বায়বীয় কোন অবাস্তব পুরস্কার নয়, সত্যিকার পুরস্কার । অনন্ত কালের জন্য সুখ সাচ্ছন্দ্য । একটু সুখের জন্য পৃথিবীতে মানুষ কী না করে !

সাহিত্য রচনা করতে হবে , যে সাহিত্য মানুষকে শেখায় ন্যায়ের পথে অবিচল থাকতে । অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর হয়ে দাড়াতে । শেখায় মানুষকে ভালোবাসতে, পশুপাখি, গাছপালাকে ভালোবাসতে । শেখায় স্রস্টাকে ভালোবাসতে, তার প্রতি কৃতজ্ঞ হতে ।

বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করতে হবে , যাতে মানুষের জীবন হতে পারে আরো সহজ । মানুষ থাকতে পারে আরো শান্তিতে । মানুষকে কষ্ট দেয়া স্রস্টার উদ্দেশ্য নয় । আল্লাহতায়ালা পৃথিবীতে যাকিছু দিয়েছেন- মানুষের সুখের জন্যই । প্রয়োজনীয় উপকরণ সেখান থেকে মানুষকে খুঁজে নিতে হবে , আর মানতে হবে নির্ধারিত সীমা । কাজ করতে হবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য । কাজ করতে দারিদ্র্য থেকে মানুষকে মুক্ত করার জন্য । দুনিয়ায় ‘নাম’ থাকুক আর না থাকুক, মৃত্যুর পর অনন্ত কালের জীবনে সত্যিকার পুরস্কার পাওয়া যাবে – থাকতে হবে সেই বিশ্বাস ।

৩।
তাই বলে কি আমরা কৃতি ব্যক্তিদের নাম সংরক্ষণ করবো না ? অবশ্যই করতে হবে । কারণ- প্রত্যেককে দিতে হবে তাঁর প্রাপ্য সম্মান । প্রাপ্য মজুরী । শ্রমিককে যেমন মজুরী দিতে হয়, তেমনি কৃতি ব্যক্তিকে দিতে হবে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা । একজন মানুষের কাজ তাঁর নিজস্ব সম্পদ । তিনি যদি সেটা মানুষের জন্য করেন , তবু তা তারই । অস্বীকার করার উপায় নেই । কাউকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান না দেওয়াটা অবিচার, অন্যায় । আল্লাহর প্রেরিত নবীও সেটাই বলে গেছেন ।
আর তাছাড়া, সম্মান চাওয়াটা মানুষের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য । ভালো কাজে আমরা যত বেশি উৎসাহ দেব, সম্মান দেব – মানুষ ভালো কাজে তত বেশি উদ্বুদ্ধ হবে । ক্রমে পৃথিবীটা হয়ে উঠবে আরো শান্তিময় ।

..............................
খ্যাতি ও জীবন/ ২৫-০৮-২০১৩

বুধবার, ১৪ আগস্ট, ২০১৩

আলমে আরওয়ায় দেয়া সাক্ষ্য স্মরণে নেই কেন ?

আল্লাহ তায়ালা সকল মানুষকে রুহের জগতে একত্রিত করেছিলেন । তাদের কাছে সবার সামনে সবার কাছ থেকে স্বীকৃতি নিয়েছিলেন যে তিনিই আমাদের প্রভু । কিয়ামতের দিন এই ঘটনাকে মানুষের বিচারের জন্য সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করা হবে ।
মনে প্রশ্ন জাগে, এই ঘটনাতো আমাদের কারো মনে নাই । তবুও এটাকে আমাদের বিপক্ষে সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করাটা কি যৌক্তিক হবে ?

এ সম্পর্কে কুরআন বলে -
‘আর হে নবী! লোকদের স্মরণ করিয়ে দাও সেই সময়ের কথা যখন তোমাদের রব বনী আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করিয়েছিলেন এবং তাদেরকে তাদের নিজেদের ওপর সাক্ষী বানিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ আমি কি তোমাদের রব নই ? তারা বলেছিলঃ নিশ্চয়ই তুমি আমাদের রব , আমরা এর সাক্ষ্য দিচ্ছি ৷ এটা আমি এ জন্য করেছিলাম যাতে কিয়ামতের দিন তোমরা না বলে বসো, আমরা তো একথা জানতাম না ৷ (সুরা আরাফ-১৭২ )

আমরা সাধারণভাবে চিন্তা করলে কী দেখি ? আমরা কেউ কি বলতে পারবো , ছোটবেলায় ঠিক কখন থেকে আমি বুঝতে শিখেছি ? আমরা কেউ জানিনা । ছোটবেলায়- জ্ঞান হবার আগে কে কী বলেছে, আমরা কে কী করেছি কিছুই আমাদের মনে নেই । কিছুই স্মরণে না থাকলেও এটা চিরসত্য যে, শিশুকালে অনেক কিছুই শুনেছি, বলেছি, দেখেছি । বাবা – মা , ভাইবোন কাউকেই তো চিনতাম না । বাবা মা কাকে বলে এটাও তো জানতাম না । সেজন্যেই মাকে জিজ্ঞেস করি- ‘এলেম আমি কোথা হতে ?’

সুতরাং , পৃথিবীতে আসার আগেই যে কথা বলেছি- সেটা স্মরণে থাকবে এটা আশা করা অবান্তর । কিন্তু আল্লাহ যখন আমাদের স্মৃতিতে সেটা আবার দিয়ে দেবেন , তখন সব মনে পড়বে ।
প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরও মেমোরি লস হবার ঘটনা আছে । মেমোরি রিগেইনের ঘটনাও আছে । এখান থেকেও আমরা সহজেই বুঝতে পারি – রুহের জগতের ঐ ঘটনা খুব খুব সম্ভব । মোটেই অযৌক্তিক নয় ।

তাফহীমুল কুরআন এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছে এভাবে-
‘এর জবাবে বলা যায়, সেই অংগীকারের কথা যদি মানুষের চেতনা ও স্মৃতিপটে জাগরুক রাখা হতো তাহলে, মানুষকে দুনিয়ার বর্তমান পরীক্ষাগারে পাঠানো ব্যাপারটা একেবারে অর্থহীন হয়ে যেতো । কারণ এরপর পরীক্ষার আর কোন অর্থই থাকতো না । তাই এ অংগীকারের কথা চেতনা ও স্মৃতিপটে জাগরুক রাখা হয়নি ঠিকই কিন্তু অবচেতন মনে ও সুপ্ত অনুভূতিতে তাকে অবশ্যি সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। তার অবস্থা আমাদের অবচেতন ও অনুভূতি সঞ্জাত অন্যান্য জ্ঞানের মতই। সভ্যতা, সংস্কৃতি, নৈতিক ও ব্যবহারিক জীবনের সকল বিভাগে মানুষ আজ পর্যন্ত যা কিছুর উদ্ভব ঘটিয়েছিল তা সবই আসলে মানুষের মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে বিরাজিত ছিল। বাইরের কার্যকারণ ও ভিতরের উদ্যোগ আয়োজন ও চেষ্টা সাধনা মিলেমিশে কেবলমাত্র অব্যক্তকে ব্যক্ত করার কাজটুকুই সম্পাদন করেছে। এমন কোন জিনিস যা মানুষের মধ্যে অব্যক্তভাবে বিরাজিত ছিল না, তাকে কোন শিক্ষা , অনুশীলন ,পরিবেশের প্রভাব ও আভ্যন্তরীন চেষ্টা-সাধনার বলে কোনক্রমেই তার মধ্যে সৃষ্টি করা সম্ভব নয় এটি একটি জাজ্বল্যমান সত্য। আর এ প্রভাব -প্রচেষ্টাসমূহ নিজের সর্বশক্তি নিয়োগ করলেও মানুষের মধ্যে যেসব জিনিস অব্যক্তভাবে বিরাজিত রয়েছে তাদের কোনটিকেও পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেবার ক্ষমতা রাখে না। বড় জোর তারা তাকে তার মূল স্বাভাব প্রকৃতি থেকে বিকৃত করতে পারে মাত্র। তবুও সব রকমের বিকৃতি ও বিপথগামীতা সত্ত্বেও সেই জিনিসটি তার মধ্যে বিদ্যমান থাকবে, আত্মপ্রকাশের প্রচেষ্টা চালাতে থাকবে এবং বাইরের আবেদন সাড়া দেয়ার জন্যে সর্বক্ষণ উন্মুখ থাকবে । (তাফহীমুল কুরআন, সুরা আরাফের টীকা)

[[আরো বিস্তারিত জানতে চাইলে পড়ুন তাফহিমুল কুরআন সুরা আরাফের ব্যাখ্যা । তাফসীর ইবনে কাসীর এবং মারেফুল কুরআনে এই বিষয়টি খুব বেশি বিস্তারিত আলোচনা করেনি ।]]


১৪-০৮-২০১৩ 

রবিবার, ১১ আগস্ট, ২০১৩

ডঃ আব্দুল্লাহর যুগান্তকারী আবিস্কার

ডঃ আব্দুল্লাহ এরকম একটি যুগান্তকারী আবিস্কার করে ফেলবেন- নিজেও জানতেন না । খামখেয়ালিপনার ভেতর দিয়ে মানবজাতির জন্য অতি প্রয়োজনীয় এই আবিস্কার হয়ে যাবে কেউ কি কল্পনাও করেছিল ?

অবশ্য পৃথিবীর অনেক বড় বড় আবিস্কার হয়েছে আকস্মিকভাবেই । নিউটন আপেল গাছের নিচে বসে ছিলেন , তাঁর মাথায় আপেল পড়লো । তিনি আবিস্কার করলেন মাধ্যাকর্ষণ শক্তি । বিজ্ঞানী আর্কিমিডিস ন্যাংটা হয়ে চৌবাচ্চায় গোসল করতে করতে আবিস্কার করলেন তাঁর বিখ্যাত সুত্র । বিজ্ঞানী অগাস্ট কেকুল স্বপ্নে লেজ কামড়ানো সাপ দেখে আবিস্কার করে ফেলেছিলেন বেনজিনের গঠন ।

আজ বন্ধু ডালিম কোথায় ? মেডিকেল কলেজে ভর্তি হবার পর প্রথম দিকে হোস্টেলে ডঃ আব্দুল্লাহর রুমমেট ছিলেন বন্ধু ডালিম । ডালিম বিরক্তও হত, অবাকও হত যে আব্দুল্লাহ কোনদিন মশারি টাঙ্গায় না । অবশ্য তখন অলসতাই ছিল মূল কারণ । কিন্তু সে কথা আব্দুল্লাহ স্বীকার করবেন কেন ? তিনি বলতেন- আমরা মানুষ, আশরাফুল মাখলুকাত । আমরা বাঘ, ভাল্লুক, হাতি-ঘোড়া , অজগর সাপ , সব জন্তু জানোয়ারকে বশ করেছি । তাদেরকে খাঁচায় বন্দী করেছি । আর আমরা সেই মানুষ- সামান্য মশার ভয়ে নিজেই খাঁচায় বন্দী হয়ে থাকবো ? মশারি খাঁচা নয়তো কী ? মানব জাতির এত বড় অপমান আমি সইবো না । কামড়াক, যত পারে মশা আমাকে কামড়াক । আমি থাপ্পড় মেরে যে কয়টাকে পারি খতম করবো ।

আসলেই তাই হত । রাতের বেলা ঠাস ঠাস শব্দ শোনা যেত ডঃ আব্দুল্লাহর বেড থেকে । সকাল বেলা দেখা যেত বেডশিটে লাল রঙের আলপনা । আপাতদৃষ্টিতে সেগুলো মশার রক্ত মনে হলেও, আসলে তো ডঃ আব্দুল্লারই রক্ত ! তবু তাঁকে দমানো যায়নি ।

বন্ধু ডালিম ডঃ আব্দুল্লার নাম দিয়েছিল ‘মশা মারা পালোয়ান’ । মাঝে মাঝে সুযোগ বুঝে সে ডঃ আব্দুল্লাহর গা চাপড়ে দিত- ‘ইস , এই খানে একটা মশা বসেছিল’ !

হোস্টেলের নিচতলার রুম । পাশেই পাহাড় – জঙ্গল । চট্টগ্রাম এমনিতেই ম্যালেরিয়ার জন্য এন্ডেমিক রিজিওন । সবার ধারণা ছিল আজ নাহয় কাল আব্দুল্লাহ ম্যালেরিয়ার শিকার হবেই । কিন্তু না , ম্যালেরিয়া-ফাইলেরিয়া-ডেঙ্গু কোনটাই কাবু করতে পারেনি তাঁকে ।
হতে পারে ভাগ্যক্রমে কোন এডিশ বা এনোফিলিস মশা তাঁকে কামড়ায় নি । কিন্তু সেটাই বা কীভাবে বিশ্বাস করা যায় ?

বিয়ের পর ডঃ আব্দুল্লাহর স্ত্রী মিমুও প্রথম প্রথম অবাক হতেন । সবসময় তিনি নিজেই এরোসল স্প্রে করে রাখতেন । একবার স্প্রে ফুরিয়ে যায় । সেসময় তিনি বাবার বাড়িতে । কয়েকদিন পর ফিরে এসে দেখেন , আব্দুল্লাহ স্প্রে কেনেননি , মশারিও যেখানে ছিল সেখানেই বহাল তবিয়তে আছে । ঘটনা কি ?

ডঃ আব্দুল্লাহ স্ত্রীকেও সেই যুক্তি দেখান ।
আশরাফুল মাখলুকাত হয়ে মশার ভয়ে খাচার ভেতর বন্দী থাকা ? অসম্ভব । আর তাছাড়া মশারও তো রিজিক আছে । আল্লাহ যদি মশার রিজিক আমার শরীরেই রেখে থাকেন, তাহলে আমি বাধা দেয়ার কে ?

তবে মিমুর পাল্টা যুক্তিতে ধরা খেয়ে যান বেচারা ডঃ আব্দুল্লাহ ।

‘ও তাই নাকি ?’ ‘তাহলে এক কাজ করো তুমি- সুন্দরবনে চলে যাও । বাঘের সামনে গিয়ে দাঁড়াও । আল্লাহ যদি বাঘের রিজিক রাখেন তোমাকে দিয়ে, তাহলে তুমি বাধা দেয়ার কে ? তোমার উচিৎ নিজেই গিয়ে বাঘের রিজিক হওয়া ! আচ্ছা ধরো আমরা কোন বিপদে পড়লাম, বাসায় ডাকাত আসলো- তুমি কি বাধা দেবে না ? নাকি বলবে যে- যাক সব নিয়ে যাক । ডাকাতেরও তো রিজিক আছে নাকি !’

এবার সত্যিই লা-জবাব হয়ে যান ডঃ আব্দুল্লাহ । আসলেই তো ! এতদিন তিনি সরলমনে চিন্তা করতেন । উল্টোদিকটাতো ভাবেননি !

মাঝে মাঝে জ্ঞানী গুনী লোকেরা অনেক সহজ ব্যাপার বুঝতে পারেন না । যেমন পন্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী । তাঁকে নাকি একদিন কেউ একজন এসে বলেছিল – ‘স্যার, মহা দুঃখের সংবাদ আছে আপনার জন্য । আপনার স্ত্রী তো বিধবা হয়ে গেছেন !’ পন্ডিত মশাই নাকি তখনই কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির দিকে হাঁটা ধরেন । আহারে আমার বউটা ! বেচারি অল্পবয়সে বিধবা হয়ে গেল !

মখা স্কেল আবিস্কারের পর যে ধকলটা গিয়েছিল , সেটা কাটানোর জন্য ডঃ আব্দুল্লাহ প্ল্যান করেন – কিছুদিন পাহাড়ি পরিবেশে একটু নিরিবিলি কাটিয়ে আসার । সেই সাথে মশার ব্যাপারে একটা ফায়সালা করা দরকার । জীবনে এত মশার কামড় খেলেন- একবারও ম্যালেরিয়া বা ডেঙ্গু হলো না , এটা তো ঠিক না ! অভিজ্ঞতা বলে একটা কথা আছে না ? তাঁর মত মহান বিজ্ঞানী ম্যালেরিয়া-ডেঙ্গুর অভিজ্ঞতা ছাড়াই দুনিয়া ত্যাগ করবেন – এটা হতে পারেনা ।

মাইক্রোবায়োলজির সহকারী অধ্যাপক, গবেষক বন্ধু রাগিবও ইচ্ছা পোষণ করলেন । তাঁরও খুব জানার ইচ্ছা- ব্যাপার কী ? এত মশার কামড়েও আব্দুল্লাহ বহাল তবিয়তে থাকে কীভাবে ?

সবাই রেডি হলেন । ডঃ আব্দুল্লাহ, তাঁর স্ত্রী মিমু , মাইক্রোবায়োলজিস্ট ডাঃ রাগিব ও তাঁর পরিবার । ডঃ আব্দুল্লাহ ছাড়া সবাই কুইনাইনের প্রোফাইলেক্টিক (প্রতিরোধমূলক) ডোজ নিলেন । অধ্যাপক রাগিব নিলেন তাঁর গবেষণার যন্ত্রপাতি ।
প্রয়োজনীয় জরুরী ওষুধপত্রও নেয়া হলো । এক বিকালে দুটি গাড়িতে করে তাঁরা বান্দরবানের ম্যালেরিয়া প্রবণ এলাকায় পৌছলেন । সেখানে আগেই বাসা ভাড়া করা ছিল ।

ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে বান্দরবানের মানুষকে বিশেষ ধরণের মশারি সাপ্লাই দিয়েছে জাতিসংঘ ও বিশ্বের অন্যান্য দাতা এনজিওগুলো । সেজন্য এখন ম্যালেরিয়ার প্রকোপ অনেকটাই কমে গেছে । তবে কেউ যদি মশারি ছাড়া ঘুমায়- তাহলে খবর আছে ।

যেই ভাবা সেই কাজ । ১০-১২ দিন ধরে বারান্দায় ঘুমিয়ে মশাদেরকে নির্বিঘ্নে কামড়ানোর সুযোগ দিলেন ডঃ আব্দুল্লাহ । সারাদিন ঘোরাফেরা করেন, সন্ধ্যার পর বাসায় ফেরেন । ১৫ দিনের মাথায় একদিন তাঁর শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গেল । এইবার মনে হয় আর রক্ষা নাই । কুইনাইন (ম্যালেরিয়ার ওষুধ) শুরু করার আগে ব্লাড স্যাম্পল নিলেন মাইক্রোবায়োলজিস্ট ডাঃ রাগিব । শুরু হলো কাজ । ডঃ আব্দুল্লাহও সবসময় বন্ধুর সাথে থেকে কাজ করলেন । দুদিনের মাথায় আবিস্কৃত হল – ডঃ আব্দুল্লাহর রক্তে ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া, ডেঙ্গু – সবধরণের মশাবাহিত রোগের এন্টিবডি রয়েছে । তাঁরা এন্টিসেরাম তৈরি করে ফেললেন । একমাস ধরে দুজনে মিলে লিখে ফেললেন এ সংক্রান্ত গবেষণাপত্র ।

গবেষণাপত্র প্রকাশের পর বিশ্বের বড় বড় ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানি তাঁর সাথে যোগাযোগ করেছে । এ এক যুগান্তকারী আবিস্কার । বাণিজ্যিকভাবে এই এন্টিসেরাম উৎপাদন করার কাজ শুরু হয়েছে । শীঘ্রই সারাবিশ্বের মানুষ এর সুফল পাবে । মশাবাহিত রোগের কবল থেকে বাঁচবে মানবকুল ।

গবেষণাপত্রে তাঁরা উল্লেখ করেছেন যে- বান্দরবানের বানরের দেহ থেকে এই এন্টিসেরাম পাওয়া গেছে । এজন্য অবশ্য তাঁরা এন্টিসেরাম কিছু বানরের শরীরে ইঞ্জেক্ট করে ছেড়ে দিয়েছেন । আসলে যে ডঃ আব্দুল্লাহর রক্ত থেকে পাওয়া গেছে এই কথা কি আর বলা যায় ? দেখা যাবে – এক রাতে ডঃ আব্দুল্লাহকে অপহরণ করে শরীরের সকল রক্ত বের করে নেবে কেউ ! কে জানে- হয়তো ম্যালেরিয়া-ডেঙ্গু-ফাইলেরিয়ার ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোই তাদের ব্যবসার স্বার্থে করতে পারে এই কাজ !

ডঃ আব্দুল্লাহ আজ খুবই আনন্দিত । মশার ভয়ে খাঁচায় বন্দী হয়ে থাকে মানুষ ! আশরাফুল মাখলুকাত মানবজাতিকে এই অপমান থেকে উদ্ধার করতে চলেছেন তিনি !

.............................................
ডঃ আব্দুল্লাহর যুগান্তকারী আবিস্কার / ১১-০৮-২০১৩

শনিবার, ১০ আগস্ট, ২০১৩

ছিনিমিনি খেলার ইশতেহার

১।
জীবনটা ছেলেখেলা নয় । তবু আজ
জীবন নিয়ে খেলতে ইচ্ছে করে
ডাংগুলি খেলা নয়- মল্লযুদ্ধ নয় । রীতিমত
‘ছিনিমিনি’ খেলা !

যে খেলায় জীবনই হাতিয়ার , জীবনই বাজি
কেউ কি আছো আমার সাথে , খেলতে রাজি ?

২।
আমি এমন এক সময়ের কথা বলছি
যখন জীবন স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে
সময় চলে যায় দিন মাস বছর । তবু
জীবন গতিহীন , দিঘীর শান্ত জলের মতন ।

স্থবির জীবনে আজ
কানে আসে শুধু দীর্ঘশ্বাসের আওয়াজ ।

কোটি কোটি মানুষের অব্যক্ত ব্যথা, হা-হুতাশ
দীর্ঘশ্বাসের সাথে নিয়ে আসে যেন উত্তপ্ত বাতাস

নিঃশব্দে গর্জন করে ওঠে মানুষের ক্ষোভ
আমার স্থবির জীবনে জাগে – জীবন নিয়ে
ছিনিমিনি খেলার এক ভয়ংকর নেশা ।

চলো তবে , শুরু করা যাক !

.......................................
ছিনিমিনি খেলার ইশতেহার / ১০-০৮-২০১৩

শুক্রবার, ৯ আগস্ট, ২০১৩

ডাঃ বকুলের ঈদের দিন

বিষন্ন মনে ডক্টরস রুমে বসে আছেন ডাঃ বকুল । আগে থেকেই একটু মন খারাপ ছিল । ঈদের চাঁদ ওঠার পর থেকে মন খারাপের মাত্রাটা বেড়েছে । সারারাত ঘুমাতে পারেননি । রোগীর চাপ তেমন নেই । তবুও ঘুম আসেনি । সারারাত এ পাশ ও পাশ করে কাটিয়েছেন । রাতে নামাজ পড়ে কিছু সময় কাটিয়েছেন । সকাল বেলা শারমিন ফোন করেছিল । বাচ্চাটা ‘বাপু কোথায়’ ‘বাপু কোথায়’ বলে কাঁদছে । তখন থেকে মনটা খুব খুব বিষন্ন ।

বাচ্চার বয়স তিন বছর । নাম রেখেছেন খালিদ । গত বছরও বাচ্চাটাকে সাথে নিয়ে ঈদ করতে পারেননি । বিয়ের আগে মনে মনে কল্পনা করতেন , একটা ফুটফুটে বাচ্চা হবে, বাচ্চাটাকে নতুন ছোট্ট পাঞ্জাবি-পাজামা-টুপি পড়িয়ে , আতর দিয়ে সাথে নিয়ে হেঁটে হেঁটে ঈদগাহে যাবেন । ছোট্ট শিশু , আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে – নিজের একটা শিশু ডান হাতের আঙুল ধরে হাটবে । পাশে বসে ঈদের নামাজ পড়বে । ভাবতে খুব ভালো লাগতো । স্বপ্নের মত যেন । শারমিন বলতো – আমি নিজ হাতে ওর গায়ে পোষাক পরিয়ে দেব, তুমি কিন্তু ভাগ বসাতে আসবে না ।

খালিদের জন্মের প্রথম বছরে বাড়িতে ঈদ করতে পেরেছেন ডাঃ বকুল । তখনো তাঁর পোস্টিং হয়নি কোথাও । কিন্তু এর পরের বছর থেকে –গত দুবছর ঈদ করতে হচ্ছে বাড়ির বাইরে । পোস্টিং যেখানে- বাড়ি থেকে প্রায় সাতশ কিলোমিটার দূরের এক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স । বাচ্চাটাকে নিয়ে ঈদ করা হয়নি গত বছরও । কিন্তু গতবছর সে ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি । এবার সে বুঝতে পারছে যে ‘বাপু’ নেই । সকাল থেকে তাই কাঁদছে । অনেক কষ্টে ডাঃ বকুলের বাবা, খালিদের দাদা তাকে থামিয়েছেন ।

ডাঃ বকুলের আব্বা তাঁকে বাপু বলে ডাকতেন ছোটবেলা থেকে । এখনো বলেন । সেখান থেকেই খালিদ শিখেছে ‘বাপু’ । 

তাকে যতই শেখানো হয়- ‘বাবা’ বলতে , সে ঘুরেফিরে বলে ‘বাপু’ । 
এখন আবার যুক্তি দেওয়া শিখেছে- দাদু যে তোমাকে বাপু বলে ডাকে ? আমিও ডাকবো ।

শুধু বাচ্চাটা কেন ? শারমিনেরও কি মন খারাপ নেই আজকে ? তারও তো অধিকার আছে , আশা আছে ঈদের দিনটা একসাথে কাটানোর । ঈদের পরদিন কোথাও ঘুরতে যাবার । বাবার বাড়ি- বোনদের বাড়িতে যাবার । বিয়ের মাত্র চার বছর হলো । শ্বশুর বাড়ি বলে হয়তো বাইরে হাসিখুশি ভাবটা ধরে রাখবে । কিন্তু ভেতরে ভেতরে ঠিকই ভেঙ্গেচুরে যাচ্ছে তারও ।

একটাই রক্ষা যে শারমিন নিজেও ডাক্তার । তাই সে ডাক্তারের জীবনটা বোঝে । আর তাদের পারস্পরিক বোঝাপড়াটা খুবই ভালো । সকাল বেলা শারমিন যখন ফোন করলো, বকুল ভেবেছিল ওকে সান্তনা দেবে । কিন্তু শারমিন নিজেই আগ বাড়িয়ে বকুলকে সান্তনা দিল । চিন্তা করো না । বাড়িতে আমরা সবাই মিলে ঈদ করছি – আমাদের নিয়ে ভেবো না । আর তাড়াতাড়ি চলে আসার চেষ্টা করো । আগেই টিকেট কেটে রাখবে ।

শারমিন এই ব্যাপারগুলো খুব ভালো বোঝে । বকুল মোটামুটিভাবে ইমোশনাল । শারমিন বুঝেছিল- যদি তাঁর কথায় একটু কষ্ট প্রকাশ পায় – বকুল হয়তো কেঁদেই ফেলবে । আর তাঁর কষ্ট তো বকুলের চেয়ে কম । বকুল কত দূরে একা , কিন্তু বাড়িতে তো বকুল ছাড়া আর সবার সাথে ঈদ করতে পারছে তারা । খালিদকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে সান্তনা দিয়ে রাখতে পারলেই হলো ।

ঈদের তিনদিন পরে বকুলের ছুটি । এবার দূরে কোথাও ঘুরতে যাবে তারা । বিয়ের প্রথম বছর যা একটু ঘোরাঘুরি করেছে । গত দুই বছর ছোট বাচ্চা , তাই দূরে কোথাও যাওয়া হয়নি । হাসপাতালে ডাঃ করিম ভাইকে ম্যানেজ করে ছুটি একটু বেশি নিতে হবে । করিম ভাই এখন বকুলের কিছু ডিউটি করে দেবেন , পরে বকুল করিম ভাইয়ের ডিউটি করে দেবে ।

বিয়েটা হঠাৎ করেই হয়ে গিয়েছিল । বকুল ইন্টার্ণশিপ শেষ করে পোস্ট গ্রাজুয়েশনের জন্য পড়াশোনা করছে । বেকার । মাঝে মাঝে ক্লিনিকে ডিউটি করে পেট চালানোর মত কিছু রোজগার করে । একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে শারমিনের সাথে পরিচয় । শারমিন তখন ফিফথ ইয়ারে । বকুল শারমিনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল । তাঁর পছন্দ হয়ে গিয়েছিল । বিষয়টা খেয়াল করে বন্ধু মাসুদ মাথায় চাট্টি মেরে বলে – কিরে দোস্ত , তুই তো কারো দিকে তাকাস না । আজ কী হলো ? লাগবে নাকি ?

শারমিন মাসুদের আত্মীয় । ওদিকে শারমিনও নাকি লুকিয়ে বকুলকে দেখে নিয়েছিল । মাসুদ যেদিন বকুলের পক্ষ হয়ে শারমিনদের বাসায় হাওয়া বুঝতে গেল- শারমিন নিজেই আগ বাড়িয়ে বকুল সম্পর্কে খোজখবর নেয়া শুরু করলো । ভাইজান- আপনার বন্ধুর খবর কি ?

ওমা ! এ যে দেখি চুম্বকের দুই প্রান্ত । বাহ বাহ । শেষে যা হবার তাই হলো । ছ’মাসের মাথায় বিয়েটা হয়ে গেল ওদের ।

‘আসতে পারি ?’ একটা নারীকন্ঠ দরজাটা একটু ঠেলে জিজ্ঞেস করলো ।
‘হ্যা হ্যা আসুন’ । ‘এখন কী অবস্থা খুকুমনির ?’

স্বামী স্ত্রী দুজনে রুমে প্রবেশ করলেন । শিক্ষক দম্পতি । দুজনেই কলেজের প্রভাষক । বাচ্চার বয়স আড়াই বছর । ঈদের নামাজের পর হঠাৎ করেই শ্বাসকষ্ট শুরু হয় বাচ্চার । এজমা এক্সাজারবেশন । তাড়াতাড়ি তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন তাঁরা । শংকায় ছিলেন , হাসপাতালে আদৌ ডাক্তার আছেন কিনা । কিন্তু হাসপাতালে এসে তাঁরা দুজনেই খুব সন্তুষ্ট । শুধু সন্তুষ্ট বলাটা যথেষ্ট না- বলা উচিৎ ‘বিমোহিত’ । ডাঃ বকুল খুবই আন্তরিকতার সাথে চিকিৎসা দিলেন । ডাক্তারের রুমে আসার আগে ওরা নিজেরা বলাবলি করছিলেন- ডাঃ বকুলের মনটা ঠিক বকুল ফুলের মত স্নিগ্ধ । তবে একটু মলিন লাগছে মুখটা । নামটা তাঁরা জেনে নিয়েছেন নার্সের কাছে ।

মেয়েটা এখন ভালো । মেয়েকে নিয়ে বাসায় চলে যেতে চান তাঁরা । ডাক্তারের সাথে পরামর্শ এবং ডাক্তারকে কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য দেখা করতে এসেছেন ।

‘ভাই, আপনাকে ধন্যবাদ জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই । আপনার মুখটা মলিন দেখাচ্ছে । আপনার বোধহয় মন খারাপ । সকালে সেমাইও বোধহয় খাননি’ । 

বাচ্চাটির বাবা বললেন ।

ডাঃ বকুল কী বলবেন বুঝতে পারছিলেন না । সকাল থেকে আসলেই তিনি কিছু খাননি । ভালো লাগছে না । মনের এই অবস্থায় কি মুখে কিছু রোচে ?

এই দম্পতিকে দেখে খুব ভালো মানুষ মনে হচ্ছে । অনেকেই তো চিকিৎসা নিয়ে চলে যায় । কৃতজ্ঞতাবোধ খুব কম লোকেরই থাকে । এরা তাদেরই একজন । অনেক আন্তরিকতা নিয়েই জিজ্ঞাসা করেছে কথাটা । চোখেমুখে বিনয় ও কৃতজ্ঞভাব স্পষ্ট ।

ডাঃ বকুল কাঁপা গলায় শুধু বললেন , বাড়িতে আমারও একটা বাচ্চা আছে । তিন বছর বয়স ।

বাচ্চাটির মায়ের চোখ কেন যেন ছলছল করে উঠল । এক ফোটা অশ্রু চোখের কোটর ছেড়ে বেরিয়ে এল । মেয়েরা এমনিতেই বেশি ইমোশনাল হয় । বাচ্চাকাচ্চার ব্যাপারে কথা উঠলে তারা আর সহ্য করতে পারে না ।

‘ভাই, ভাবীর মোবাইল নাম্বারটা কি একটু দেবেন । আমি উনার সাথে কথা বলবো’ ।

মোবাইলে শারমিনের সাথে কথা বলছিল বাচ্চাটির মা । এমনভাবে কথা বলতে লাগলো যেন তারা কতদিনের পরিচিত বান্ধবী । বেশ গুছিয়ে কথা বলে মেয়েটা । কলেজে পড়ায় তো । একটা কথা ডাঃ বকুলের কানে আটকে গেল । বাচ্চাটির প্রভাষিকা মা শারমিনকে বলছিলেন- ‘ভাবী, এই ঈদের দিনে যদি কাউকে নিয়ে মানবতার জয়গান গাওয়া যায় – সে আপনার স্বামী । একজন ডাক্তার’ ।

বিষন্ন মনে এই কথাটা খুব ভালো লাগলো ডাঃ বকুলের । কষ্টটা যেন কমে আসতে লাগলো । আসলেই, ঈদের দিনে যাদেরকে নিয়ে মানবতার জয়গান গাওয়া যায়- তাদের একটা লিস্ট যদি করা হয় – সবার উপরে লিখতে হবে ‘ডাক্তার’ ।

নিশ্চয়ই শারমিনেরও খুব ভালো লেগেছে কথাটা ! খালিদ যখন বুঝতে শিখবে, তারও ভালো লাগবে হয়তো ।

..........................................
ডাঃ বকুলের ঈদের দিন / ০৯-০৮-২০১৩

বৃহস্পতিবার, ৮ আগস্ট, ২০১৩

আব্দুল্লাহ সাহেবের ঈদ উদযাপন

এশার নামাজ পড়ে বাসা থেকে বের হলেন আব্দুল্লাহ সাহেব । কয়েকদিন পরেই ঈদ । টুকিটাকি কিছু কাজ সারতে হবে । এছাড়া তিনি একটু মার্কেটেও যাবেন । মার্কেটে যাওয়াটা এখন এক ঝক্কির ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে । কিন্তু তবু তিনি যাবেন । এবার তিনি 'ঈদ উদযাপনে মানসিকতার বিবর্তন' শীর্ষক একটা প্রবন্ধ লিখছেন । একটা বিখ্যাত সাইকিয়াট্রি ম্যাগাজিনে প্রকাশ করার কথা রয়েছে ।

মার্কেটগুলো খুব জমজমাট মানুষের ভিড়ে । সাজুগুজু করা ললনারা ঘুরে বেড়াচ্ছে । মার্কেটের সামনে কিছু বখাটে ছেলে আড্ডা দিচ্ছে । একটা দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি খুবই বিরক্ত হলেন । হাই ভলিউমে গান বাজানো হচ্ছে । কোন ভাষা কে জানে ! কথার কোন ঠিক নেই- শুধু ড্রাম আর গিটারের শব্দই বোঝা যায় । এটা কী ধরণের আধুনিকতা তাঁর বুঝে আসে না ।

তিনি মার্কেটে ঢুকে এক জোড়া মোজা কিনলেন । আসলে মার্কেটের পরিস্থিতি দেখাটাই উদ্দেশ্য । বের হয়ে একটা রিক্সায় উঠলেন । নামলেন গিয়ে একটা সেলুনের সামনে । রিক্সাওয়ালা ৩০ টাকা দাবি করলো । আসলে ভাড়া বিশ টাকা । আব্দুল্লাহ সাহেব বিশ টাকা দিলেন রিক্সাওয়ালাকে । বললেন- তুমি ভাড়া বেশি দাবি করাতে তোমাকে নির্দিষ্ট ভাড়াটাই দিলাম , নাহলে হয়তো কিছু বেশিই দিতাম । যাও । তিনি মনে করেন যারা অতিরিক্ত ভাড়া চায় এদেরকে বেশি দেয়াটা ঠিক নয়- কারণ এতে করে এরা শহরে নতুন কিংবা গরীব লোকদের কাছেও ভাড়া বেশি দাবি করতে পারে । রিক্সাওয়ালার অবস্থান থেকে এটাই জুলুম । জুলুম শব্দটা শুধু ধনী এবং ক্ষমতাবানদের জন্য নির্দিষ্ট নয় , সবাই যার যার অবস্থান থেকে জুলুম করতে পারে ।

রিকশাওয়ালা দের প্রায়ই ভাড়া বেশি দেন তিনি । অনেক রিক্সাওয়ালাকে দেখে মায়া হয় । তাদেরকে বেশি দেন । তবে ব্যাপারটা স্পষ্ট করেই দেন- দেখো, তোমার আসল ভাড়া এত টাকা, আর এইটা দিলাম বখশিস । কেউ কেউ নিজেরাই চেয়ে নেয় । ভাইজান- আপনেরা জ্ঞানী গুণী মুরুব্বি মানুষ , আপনাদের কাছ থেইকা যদি দুই টাকা বেশি না নেই তাইলে আমরার জেবন চলবে কেমনে ? আব্দুল্লাহ সাহেব ওদেরকেও বেশি দেন । যাও, তবে মানুষের কাছে কখনো অতিরিক্ত ভাড়া দাবি কইরা নিবা না । ঠিক আছে ?

তিনি সেলুনে ঢুকলেন ।  মাথাভর্তি  বড় চুল রাখা তাঁর ছোটবেলার অভ্যাস । তবে ঈদের আগে একটু সাইজ করে নিতে হয় । এটাও ঈদের প্রস্তুতির মধ্যে পড়ে । নাপিতদের ব্যাপারে তিনি মহা খ্যাপা । মনমত করে চুল কাটাতে পেরেছে এমন নাপিত জীবনে কদাচিৎ জুটেছে । একটা না একটা ঝামেলা করবেই । হয় একটু বড় রাখবে, অথবা বেশি ছোট করে দেবে । তবে বড় রাখলে তাও কিছুটা রক্ষা , আবার কেটে ছোট করা যায় । কিন্তু ছোট করে ফেললে তো আর তৎক্ষণাৎ বড় করার সুযোগ নাই । খুবই খারাপ লাগে  । মাঝে মাঝে মনে হয় নিজেই চুল কাটার একটা দোকান দেন । কিন্তু সমস্যা হলো- নিজের চুল তো আর নিজে কাটা সম্ভব না ।

সেলুনে ঢুকে তিনি দেখলেন  নাপিত বেশ বয়স্ক । বয়স ৪৫ থেকে ৫০ হবে হয়তো ।  একটা ছেলে সেলুনে ঢুকে আবার বের হয়ে গেল । বয়স্ক নাপিত, হালের ফ্যাশানে চুল কাটাতে পারবে বলে তার বিশ্বাস হয়নি !

আব্দুল্লাহ সাহেব অবশ্য একেই পছন্দ করলেন । যে নাপিতের বয়স চল্লিশের বেশি সে নিশ্চয়ই অনেক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হবে !

সেলুনে চলছিল রাজনৈতিক আলোচনা । সামনে কী হবে, কোন দল মার খাবে , কে জেলে যাবে , কে দেশ থেকে পালিয়ে যাবে ইত্যাদি । দেশের রাজনীতির সুতিকাগার মনে হয় নাপিতের দোকান আর চায়ের দোকান । আব্দুল্লাহ সাহেব খেয়াল করলেন - বেটা নাপিত রাজনীতির বিশ্লেষণ খারাপ করছে না । টকশোতে বসিয়ে দিলে জনগনকে  মাত করে দিবে । বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবি হিসেবে টকশোতে গলাবাজি করে বাকি জীবনটা ভালোই কাটিয়ে দিতে পারবে ।

চুল কাটতে কাটতে নাপিত বললো- ভাইসাহেব , আপনি মনে হয় চুলে তৈল দেন না । আপনি চুলে তৈল দিবেন গৈ বুঝলেন ! চুলের খাইদ্য হইলো গিয়া তৈল বুঝলেন । আমাদের নবিজীও চুলে তৈল দিতেন ।

চুলের খাদ্য তৈল ! কথাটা আব্দুল্লাহ সাহেবের বেশ মনে ধরলো । এইটা নিয়া গবেষণা করা যায় । একটা প্রবন্ধ লিখে ফেলা যাবে । তিনি এই বিষয়টা মনে রাখলেন । লেখার আগে আরেকবার এসে এই নাপিতের সাথে কথা বলে যেতে হবে ।

এখনি বাসায় ফেরার দরকার নেই । ইচ্ছাও নেই । কারণ একটা গুরুত্বপুর্ণ কাজ এখনো বাকি রয়ে গেছে । তিনি কিছুক্ষণ এদিন সেদিক তাকিয়ে একটা সিটি বাসে উঠে পড়লেন । বাসের ড্রাইভার যুবক । কিন্তু কন্ডাকটর এবং হেল্পার দুজনেই অল্পবয়স্ক ।

বাসের পেছনের একটা সিটে গিয়ে বসলেন তিনি । চলছে বাস চলুক । সিটি বাস, শহরের বাইরে তো আর যাবে না ।

বাসের ড্রাইভার , কন্ডাকটর -হেল্পারদের জীবনটা অন্যদের কাছে যেন তুচ্ছ । বাসে উঠলেই সবাই নবাবের পুত হয়ে যায় । একটু বাস থামালেই ড্রাইভারকে গালিগালাজ শুরু । ঐ বেটা বারবার দাড়াস ক্যান ? বাস ছাড়বি না ? আর কত লোক তুলবি ? তোগো পেট ভরে না ? শুয়োরের বাচ্চা কোনহানকার ।

আবার এই লোকই হয়তো অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে বাস না পেলে  কিংবা বাস না থামালে গালি শুরু করেন- কুত্তার বাচ্চারা বাস নিয়া কই যায় ? হেগোরে বাস দিছে কি জইন্যে ?
একই ব্যক্তি হয়তো অন্য কোন বাসে ঠিকই বাদুরঝুলা হয়ে উঠে পড়েন । আবার বলেন- এত লোক যে কইত্থাইকা আসে । দ্যাশটা মাইনষে ভর্তি হইয়া গেছে । বাসে একটা সিট পাওয়া পর্যন্ত যায় না !

কন্ডাকটরের সাথে  এক টাকা নিয়ে ঝগড়া শুরু করে  কেউ কেউ । এই ব্যাটা এক টাকা বেশি নিলি ক্যান  ? দে টাকা দে । দুই মাস আগেই তো ভাড়া আছিল ৩ টাকা, তুই চার টাকা নিলি ক্যান ?

কখনো কখনো কন্ডাকটর হেল্পারকে চড় থাপড়ও মারে কোন কোন 'ভদ্রলোক' । কেউ প্রতিবাদ করে না । সবাই থাকে ঐ 'ভদ্দরলোকের' পক্ষে । শালা ছোটলোকের বাচ্চার উচিৎ শিক্ষা হইছে । অগোরে আরো পিটান দরকার !

বাসে চড়ে এইসব অভিজ্ঞতা আগেই হয়েছে আব্দুল্লাহ সাহেবের । আজও তিনি পেছনে বসে পরিস্থিতি দেখছিলেন । একটা কিশোর ছেলের ঘাড়ে একটা বড় ব্যাগ । সে ব্যাগটা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে । ভিড়ের ভেতর ব্যাগটা কাধে নিয়ে বাসে দাঁড়িয়ে থাকতেও কষ্ট হচ্ছে । হয়তো ঈদের ছুটিতে বাড়িতে যাচ্ছে । এরই মধ্যে একজনের গায়ে একটু হয়তো ধাক্কা লেগেছে- সে ক্ষেপে গিয়ে ছেলেটাকে ধমকাচ্ছে । আরে মিয়া কি শুরু করছ তুমি ? ব্যাগ নিয়া উঠছে গাড়িতে ।

আব্দুল্লাহ সাহেব ওই লোকটাকে ডাকলেন ।

এই যে ভাই , শোনেন । আপনার কী অসুবিধা হয়েছে ?
দেখছেন না ব্যাগটা আমার গায়ে লাগলো ।
আপনার শুধু একটু গায়ে লেগেছে , আর ছেলেটা যে ব্যাগটা কাধে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার কষ্ট হচ্ছে না ?
তাতে আমার কী ? ব্যাগ নিয়া তারে উঠতে কইছে কে ? সে নাইম্যা যাইতে পারে না ?
আপনার কি ঠ্যাং নাই , আপনিও তো নেমে যেতে পারেন ।
আমি নামুম ক্যান, গাড়ি কি অর বাপের ?
আপনাকে দেখেও তো এই বাসের মালিকের ছেলে মনে হচ্ছে না । বাসের মালিকের ছেলে ভিড়ের ভেতর দাঁড়িয়ে যাতায়াত করে এইরকম তো আমি কল্পনাও করতে পারিনা । খোলাফায়ে রাশেদার যুগ এসে পড়লো নাকি ?

আশেপাশের লোকজন কেন যেন বেশ মজা পেয়ে গেল । হো হো করে হেসে উঠলো কয়েকজন ।
এতটুকুতে আনন্দ পেয়ে গেছে । এইজন্যেই বাংলাদেশের মানুষ- এত অন্যায় অবিচার শোষণ নির্যাতনের ভেতরেও সুখী । তারা অল্পতেই সুখ খুজে পায় ।

বাস থেকে একে একে লোকজন নেমে যেতে লাগলো । ফাকা হয়ে যেতে লাগলো বাস । কন্ডাকটর ছেলেটা ভাড়া চাইতে এসেছিল । আব্দুল্লাহ সাহেব তাকে একশ টাকার একটা নোট দিয়েছেন ।

কই নামবেন ?
যেখানে তোমাদের গন্তব্য শেষ সেখানে নামবো ।

ছেলেটা তখন অবাক হয়ে ফিরে গিয়েছিল  । কত টাকা ভাড়া রাখবে বুঝতে না পেরে বলেছিল- নামার সময় বাকি টাকা নিয়েন খেয়াল কইরা ।
বাস থেমে গেলে তিনি কন্ডাক্টর ও হেল্পারকে ডাকলেন ।

তোমাদের বাড়ি কোথায় ?
আমার বাড়ি ভোলা ।
আমার লক্ষীপুর ।
তোমাদের বাড়িতে কেউ নাই ? বাবা মা ভাই বোন ?

একজন বললো তার বাবা মারা গেছে ছোটবেলায় । গ্রামে মা আছে , অন্যের বাড়িতে কামলা খাটে । হেল্পার ছেলেটার কেউ নাই । চাচারা আছে । তারা ওর খোজ রাখে না ।

আব্দুল্লাহ সাহেব তাদের দুজনকে নিয়ে একটা হোটেলে নিয়ে গেলেন । বললেন- তোমাদের যা ইচ্ছা খাও । তারা গরুর গোশত দিয়ে পেটপুরে ভাত খেল । তারপর তিনি তাদের সাথে কথা বলতে বলতে একটু দূরে একটা কাপড়ের দোকানে নিয়ে গেলেন । ওদের শার্ট প্যান্ট ছেড়া ময়লা । দুজনকে পছন্দ মত শার্ট প্যান্ট কিনে দিলেন । ছেলে দুটো হতভম্ব হয়ে গেল । তারা হাসবে না কাদবে বুঝতে পারছিল না । হেল্পার ছেলেটার মুখ হাসিখুশি, কিন্তু কন্ডাক্টর ছেলেটার চোখে পানি । মার কথা মনে পড়েছে । ছোটবেলায় বাবা বেচে থাকতে একবার এরকম শার্ট প্যান্ট কিনে দিয়েছিলেন । সেকথাও মনে পড়েছে তার ।

আব্দুল্লাহ সাহেব  ওদের আদর করে বিদায় করলেন । একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন তিনি । কদিন পরেই ঈদ । কার ঈদ ?

আজ ২৫ রমজানের রাত । শবে কদর হবার সম্ভাবনাও আছে । রমজানের শেষ দশদিনের বিজোড় রাতগুলোতে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম এক রাত্রির সন্ধান করতে বলা হয়েছে । সেই রাত্রিতে আল্লাহর বানী মহাগ্রন্থ আল কুরআন নাযিল হয়েছিল । শুধু নফল নামাজ পড়ে সেই রাত্রি পাওয়া যায় কিনা, আল্লাহকে পাওয়া যায় কিনা তাঁর যথেষ্ট সন্দেহ আছে । তাঁর ধারণা, যায় না । কুরআনের মূল উদ্দেশ্য- মানুষের প্রতি ইনসাফ- ভালোবাসা না করে শুধু নফল নামাজে আল্লাহকে পাওয়া যাবে না । তিনি এই রাত্রিগুলোয় সত্যিকার দুঃখী মানুষের সন্ধানে বের হন ।  ঈদের আনন্দটা তিনি পেয়ে যান ঈদের আগেই । ঈদের দিন তাঁর মনটা প্রশান্তিতে ভরে থাকে । প্রতিবছর তিনি এভাবেই অনাথ শিশুদের মুখে হাসি ফুটিয়ে ঈদ করতে চান  তিনি ।

আকাশে মেঘ জমেছিল । দুএক ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো । ঠান্ডা বাতাসে বুকটা ভরে গেল আব্দুল্লাহ সাহেবের । তিনি ধীরে ধীরে হাটা ধরলেন । বাসায় পৌঁছে নামাজ পড়তে হবে ।

................................................
আব্দুল্লাহ সাহেবের ঈদ / ০৮-০৮-২০১৩

সোমবার, ৫ আগস্ট, ২০১৩

বন্ধু দিবস কি খারাপ ?

কাল নাকি #বন্ধু দিবস ছিল । অনেক #দিবস প্রচলিত হয়েছে । মা দিবস, বাবা দিবস, বন্ধু দিবস , ভালবাসা দিবস এইসব । যেকোন দিবস পালনের ক্ষেত্রে দুটো গ্রুপ দেখা যায় । এক গ্রুপ অনেক উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে প্রচলিত গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিবস উদযাপনে মেতে ওঠে । আরেক গ্রুপ এসব দিবসের বিরোধিতায় নেমে পড়ে ।

যেমন বন্ধু দিবসে একদল তরুণ –তরুণী ‘বন্ধু ছাড়া লাইফ ইম্পসিবল’ ভেবে ছেলে মেয়ে একে অপরের ওপর লাফিয়ে পড়া, দিনভর বেহুদা কথাবার্তার আড্ডা দেয়া , এইসবে এতে উঠেছিল । আবার অপরপক্ষ , বিশেষত ইসলামী ধ্যানধারণা লালনকারী গোষ্ঠি ‘বন্ধু তো সবসময়ের- দিবসের কী দরকার ?’, ‘দিবসের মাধ্যমে বেহায়াপনা-অশ্লীলতার প্রচার হচ্ছে’ এসব কথা বলে এর বিরোধিতা করেন ।

উভয়পক্ষই ভুল কনসেপশনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে বলেই আমার মনে হয় ।

বন্ধুত্ব আসলেই সবসময়ের , কেউ বললেও সবসময়ের- না বললেও সবসময়ের । সেজন্য বিশেষ দিবসের প্রয়োজন হয়না । কিন্তু একটা দিবস যদি পালন করা হয়- সেটা কি ক্ষতিকর কিছু ? আমার মনে হয়না । যেমন ধরুন- গাছ রোপন করা সবার দায়িত্ব, সবসময়ের জন্যই । কিন্তু তবুও ‘বৃক্ষরোপন সপ্তাহ’ পালন করা হয় । শিশুদের অধিকার রক্ষা করা সবসময়ের কাজ , কিন্তু তবুও তো ‘শিশু সপ্তাহ’, ‘শিশু অধিকার দিবস’ পালন করা হয় । মানবাধিকার দিবস , পরিবেশ দিবস এরকম শত শত দিবস পালন করা হয় । আপনি কি এগুলোর বিরোধিতা করেন ? সম্ভবত না ।

আরো আছে । আনন্দ –বেদনা মানুষের জীবনের নিত্যসঙ্গী । কিন্তু তবু আমাদের আছে দুটি ঈদের দিন । আনন্দের দিন । তার মানে কি অন্যান্য দিনে মুসলমানেরা আনন্দ করেনা ? তা তো নয় ।

সুতরাং টুলসের বিরোধিতা করার সস্তা প্রতিক্রিয়াশীলতা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার । টুলসের বিরোধিতা করার প্রয়োজন নেই- প্রয়োজন টুলস ব্যবহারের মানসিকতার পরিবর্তন, উদ্দেশ্যের পরিবর্তন । উদ্দেশ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা । ঈদ উপলক্ষ্যেও সিনেমা হলে অশ্লীল সিনেমার প্রদর্শনী হয় । গানের এ্যালবাম বের হয় । উদ্দাম কনসার্টের আয়োজন হয় । স্টার জলসা, স্টার মুভিজ, এ এক্স এন, আল জাজিরা , ন্যাট জিও, পিস টিভি সবই টিভি চ্যানেল । পার্থক্যটা আপনি নিজেই বোঝেন- উদ্দেশ্য ও বাস্তবায়ন পদ্ধতির ভিন্নতা । সুতরাং গোড়ায় হাত দিতে হবে । সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সংস্কারে হাত দিতে হবে ।

বন্ধুত্ব দিবস উপলক্ষ্যে যদি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া বন্ধুদের খোঁজ নেয়া হয় , যদি কোন বন্ধুর কোন সাহায্যে এগিয়ে আসা যায় সেটা তো ভালোই ।

তবে এটা বুঝতে হবে-
#বন্ধুত্ব মানে শুধু ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দেয়া নয়, বন্ধুত্ব মানে ছেলে মেয়ের অবাধ মেলামেশা নয় , একে অপরের ওপর ঝাপিয়ে পড়া নয় । বন্ধুত্ব মানে একসাথে মিলে দুষ্টুমি করা নয় । খারাপ কাজেও সহযোগিতা করা নয় ।

বন্ধুত্ব মানে বন্ধুর প্রতি দায়িত্ববোধ, বন্ধুর বিপদে আপদে সবার আগে এগিয়ে আসা, সবাই মিলে ভালো উদ্যোগ নেয়া, ভালো কাজ করা । বন্ধু বিপথে গেলে টেনে ফিরিয়ে আনা ।

একজন বন্ধু যখন অসুস্থ হয়- তখন বন্ধুরা রাত জেগে তাঁকে সঙ্গ দেয় । বন্ধুর জন্য রাস্তায় ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে দাঁড়াতেও কখনো লজ্জা হয় না । এমন বন্ধুত্বই প্রয়োজন ।

তবু সবার আগে মা-বাবা, ভাই বোন । তারপর বন্ধু । সেকথাও মনে রাখা দরকার ।

বন্ধুত্ব থাকুক । বন্ধু দিবসও থাকুক । সবকিছু হোক কল্যাণের জন্য । সত্যের পথে । ন্যায়ের পথে ।
বন্ধু হোক জান্নাতের পাথেয় । বন্ধু হোক চিরকালের- দুনিয়া এবং আখেরাতে ।


০৫-০৮-২০১৩ 

শুক্রবার, ২ আগস্ট, ২০১৩

রাসুল প্রেরণের উদ্দেশ্য

আল্লাহ তায়ালা নবী রাসুলদের কেন পাঠালেন ? এই প্রশ্নের উত্তরে ছোটবেলায় ইসলাম শিক্ষা বইয়ে পড়েছি- ‘যুগে যুগে পথভোলা মানুষকে পথ দেখানোর জন্য আল্লাহ তায়ালা নবী রাসুল পাঠিয়েছেন’ । কথাটা ঠিকই আছে । কিন্তু এতে নবী রাসুলদেরকে ধর্মপ্রচারকের বেশি মর্যাদা দেয়া হয় না । বিশেষ করে শেষ নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) এর ব্যাপারে এই কথাটা যথেষ্ট নয় ।

কুরআন শরীফে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

﴿هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَىٰ وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ﴾
৩৩) আল্লাহই তার রসূলকে পথনির্দেশ ও সত্য দীন সহকারে পাঠিয়েছেন যাতে তিনি একে সকল প্রকার দীনের ওপর বিজয়ী করেন, মুশরিকরা একে যতই অপছন্দ করুক না কেন ৷
-সুরা তাওবা ।

এখান থেকে আমরা কী দেখতে পাই ? রাসুল প্রেরণের উদ্দেশ্য হচ্ছে – আল্লাহ্‌র দ্বীনকে পৃথিবীর অন্য সকল প্রকার দ্বীন বা মতবাদের ওপর বিজয়ী করা । নিছক কোন ধর্ম-প্রচার নয় ।

রাসুল (সাঃ) কে এবং তাঁর মাধ্যমে মানবজাতিকে যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে – সেসবের উদ্দেশ্য হচ্ছে আসল লক্ষ্য বাস্তবায়ন । এরকম কোন আয়াত আমার জানা নেই যেখানে বলা হয়েছে যে –আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর নবীকে পাঠিয়েছেন নামাজ পড়ার জন্য , হজ্ব করার জন্য । কিন্তু এখানে স্পষ্ট করে বলা হচ্ছে রাসুল (সাঃ) কে প্রেরণ করা হয়েছে যেন তিনি আল্লাহ্‌র দ্বীনকে অন্য সকল মত-পথের ওপর বিজয়ী, সুপিরিয়র রাখতে পারেন ।

প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে কেন নামাজ-রোযা এসব ফরয করা হয়েছে ?
ধরা যাক একজন বাবা তাঁর ছেলেকে মেডিকেল কলেজে ভর্তি করালেন । উদ্দেশ্য কী ? উদ্দেশ্য অবশ্যই ছেলেকে ডাক্তার বানানো –যেন ছেলে ডাক্তার হয়ে মানুষের চিকিৎসা করতে পারে । মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করতে পারে । বাবা ছেলেকে উপদেশ দেয়ার সময় বলেন- তোকে পাঠাচ্ছি ডাক্তার হবার জন্য । ভালো করে লেখাপড়া করবি ।

ডাক্তার হবার জন্য ছেলেকে সময়-রুটিন মত কলেজে যেতে হয় , ক্লাস করতে হয় , প্র্যাক্টিকাল করতে হয় । একজন ছাত্র কী করে ভালো ডাক্তার হবে ? যদি সে তাঁর আসল উদ্দেশ্য- মানুষের চিকিৎসা করতে হবে এই কথা মনে রাখে ।
আমাদের উদ্দেশ্য আর পাথেয় এই দুয়ের পার্থক্য বুঝতে হবে । ডাক্তার হওয়া উদ্দেশ্য- ক্লাস, পড়া এসব হচ্ছে ট্রেনিং, পাথেয় ।

সুতরাং- নামাজ রোযা এবং অন্যান্য আমল সবকিছু হচ্ছে আল্লাহ্‌র দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য পাথেয় । এই ট্রেনিং ছাড়া যেমন আল্লাহ্‌র দ্বীনকে বিজয়ী করা এবং বিজয়ী রাখা সম্ভব নয়, তেমনি উদ্দেশ্য না বুঝে – লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাজ না করলে সবকিছু অর্থহীন ।

আল্লাহ আমাদের হেদায়াত দান করুন । আল্লাহ্‌র দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য কাজ করার তাওফিক দান করুন । আমীন ।


০২-০৮-২০১৩ 

মঙ্গলবার, ৩০ জুলাই, ২০১৩

১৭ই রমজানের শিক্ষা

১৭ই রমজানের ইতিহাস আমার জীবনে এক বিশাল পরিবর্তন এনে দিয়েছিল ।
আমি বাস্তববাদী মানুষ , তবু কল্পনায় ভেসে ওঠে একটা কাফেলা । এগিয়ে চলেছে দৃপ্ত শপথ নিয়ে – মোকাবেলা করতে হবে একটা পিশাচ বাহিনীর । যারা এগিয়ে আসছে আল্লাহর দেয়া বিধানের অনুসারী কয়েকশ মানুষকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে । ‘মদীনা’ নামক ক্ষুদ্র রাষ্ট্রকে চিরতরে বিলুপ্ত করতে ।

তিনশ জনের কাফেলার সবাই অনাহারে আছেন । এখন রমজান মাস । এইতো এ বছরেই সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে নির্দেশ এসেছে- রমজান মাসে সুবহে সাদিক হতে সুর্যাস্ত পর্যন্ত থাকতে হবে অনাহারে । শুধু খাদ্য নয়- যেকোন রকম ভোগ-আরাম থেকে সংযমী হতে হবে । আল্লাহর মনোনীত দূত যেভাবে বলেন – সেভাবে জীবন পুনর্গঠন করতে হবে ।

কাফেলা এগিয়ে চলেছে সামনে । মাঝে মাঝে শব্দ আসছে- ‘আল্লাহু আকবার’ । কাফেলার নেতা এমন একজন মানুষ- যিনি মানবজাতির আদি হতে অন্ত পর্যন্ত অনন্য একজন । নাম – মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ (সাঃ) ।

বিকেল হয়ে আসছে । সুর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে । আর ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই অনাহারের সমাপ্তি হবে । ইফতার করা যাবে । আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বান্দার এই কষ্টের প্রতিদান নিজে দেবেন । যত ইচ্ছা দেবেন । আলহামদুলিল্লাহ । ১৭ তম সাওম আজ শেষ হয়ে যাবে ।

#বদর নামক স্থানে এসে পৌছেছে কাফেলা । সিদ্ধান্ত হয়েছে এখানেই তাঁবু খাটানো হবে । পানির উৎস পাওয়া গেছে । সেটাকে দখলে রাখতে হবে । মক্কা থেকে কুরাইশ-কাফিরদের উদ্ধত বাহিনী এই স্থান থেকে আর বেশি দূরে নাই । হয়তো কাল এখানেই যুদ্ধ হবে । চূড়ান্ত হবে- পৃথিবীতে আল্লাহর বিধান মানার মত কেউ থাকবে নাকি থাকবে না , মদীনা নামক ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটি থাকবে কি থাকবে না ।

হঠাৎ কানাকানি শুরু হলো । অধিনায়ক, সৃষ্টিকর্তার মনোনীত পুরুষ, রাসুল (সাঃ) বলেছেন রোযা ভেঙ্গে ফেলতে হবে । কেন ? আর তো সময় বেশি নেই । এইসময় #রোযা ভাঙ্গার কী দরকার ? কারো বুঝে আসে না । অনেকেই ইতস্তত করতে লাগলেন ।

অধিনায়ক এবার নিজেই বললেন- আমাকে খেজুর দাও । তিনি খেজুর খেলেন । সঙ্গীরা বাধ্য হয়ে রোযা ভাংলেন । এই ব্যক্তির অনুসরণ করাটাই তো তাঁদের জীবনের পরম পাওয়া ।

আল্লাহু আকবার ।

এমনিভাবে আরো একবার রোযা ভাঙ্গা হয়েছিল ৮ম হিজরিতে । মক্কা অভিযানের সময় ।

আল্লাহ তায়ালা বলেন -

﴿يُرِيدُونَ أَن يُطْفِئُوا نُورَ اللَّهِ بِأَفْوَاهِهِمْ وَيَأْبَى اللَّهُ إِلَّا أَن يُتِمَّ نُورَهُ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ﴾
৩২) তারা চায় তাদের মুখের ফুৎকারে আল্লাহর আলো নিভিয়ে দিতে ৷ কিন্তু আল্লাহ তার আলোকে পূর্ণতা দান না করে ক্ষান্ত হবেন না, তা কাফেরদের কাছে যতই অপ্রীতিকর হোক না কেন ৷ (সুরা- তাওবা)
.

পৃথিবীর সুচনালগ্ন থেকে আজও সারাবিশ্বে তাগুত শক্তি চায় যেকোন মূল্যে আল্লাহ্‌র দ্বীনের বিজয় ঠেকাতে, মানুষকে আল্লাহ্‌র দ্বীনের পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে । এই মুহুর্তে বাংলাদেশ এবং মিশরে নির্বিচারে গুলি করে মানুষ হত্যা করছে তাগুতি শক্তি । তারাই আবার বলে- রমজান মাসে প্রতিবাদ করলে নাকি রমজানের পবিত্রতা নষ্ট হয় ! বলি রমজান মাসে গুলি করে মানুষ হত্যা করছো কেন ? রমজান মাসে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে জেলে আটকে নির্যাতন করছো কেন ? কত পরিবারকে ঈদের দিন কাঁদতে হবে জাননা ?

#রমজান মাস শুধু সেহরী আর ইফতারের জন্য নয় । দীর্ঘ সময়ের নামাজ, উপবাস এই সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিনের জন্য #ট্রেনিং । তাগুতের বিরুদ্ধে লড়াই করার ট্রেনিং । রমজান মাস তাগুত শক্তির পরাজয়ের মাস । রমজানের শিক্ষা বদর যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার #শিক্ষা । রমজানের শিক্ষা মক্কা বিজয়ের শিক্ষা । যদি আমরা রোযার ট্রেনিং ধারণ করে মাঠে নেমে যাই , দ্বিতীয় হিজরীর মত, অষ্টম হিজরীর মত আবু জেহেল ও তার বংশধররা আজও পরাজিত হবেই হবে ইনশাআল্লাহ ।


৩০-০৭-২০১৩ 

বিপ্লবীর রুপান্তর

বিপ্লবের নেশা একবার রক্তে ঢুকে গেলে তা টগবগ করতেই থাকে । বিপ্লবীকে সংগ্রামের মাঠ থেকে দূরে থাকতে দেয় না । সহযোদ্ধার পিছুটান, বিশ্বাসঘাতকতা কিংবা নেতৃত্বের মোনাফেকি কখনো কখনো বিপ্লবীকে হতবিহবল করে দেয় । যে #বিপ্লবী শত্রুর বুলেটের সামনে অটল দাঁড়িয়ে থাকে, সহযোদ্ধার বিশ্বাসঘাতকতা কিংবা নেতৃত্বের চিন্তাধারার দুর্বলতা , আপোষকামিতা ও ভুল সিদ্ধান্ত, তাঁকেও মাঝে মাঝে কুপোকাত করে ফেলে । যে প্রেরণা, যে চেতনা তাঁকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে সংগ্রাম করতে শিখিয়েছিল – সেই চেতনাই তাঁকে আবার বিক্ষুব্ধ করে তোলে বিপদের সময় এগিয়ে না আসা সহযোদ্ধারও বিরুদ্ধে ।

শত্রুর বুলেট হয়তো বুক ভেদ করবে, হৃৎপিণ্ড ভেদ করবে । কিন্তু অন্তর থাকবে অমলিন , নিষ্কলুষ । কিন্তু সহযোদ্ধার অসময়ে পিছুটান , নেতৃত্বের ওয়াদার খেলাপ অন্তরকেই ছিন্নভিন্ন করে দেয় । বিপ্লবীরা দিয়াশলাইয়ের মত । দিয়াশলাইয়ের কাঠি আগুন জ্বালানোর কথা জালিমের মসনদে । শত্রুর তাঁবুতে । কিন্তু অন্তরের আগুন দিয়াশলাইকেই জ্বালিয়ে দেয় ।

হাজারো বিপ্লবী তাই রণাঙ্গনের পাশে বসে জ্বলে যাওয়া অন্তরকে মেরামত করে । আবার যুদ্ধে যাবার জন্য প্রস্তুত করে । নতুন করে বিশ্বাসকে সাজায়- রণাঙ্গনেও বিশ্বাসঘাতকতা আছে, ওয়াদার খেলাপ আছে, নেতৃত্বের #আপোষকামিতা আছে । ষড়যন্ত্র শুধু শত্রু একাই করে না , সহযোদ্ধাও করতে পারে । মীরজাফরও সেনাপতি ছিল । সেনাপতিও হয়তো বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারেন মীরজাফরের মত । সবকিছু পবিত্র নয়, এখানেও আছে অপবিত্রতা । তবুও চলতে হবে পথ- যতটুকু বিশুদ্ধতা আছে ততটুকু নিয়েই । তবুও লড়তে হবে ন্যায়ের পথে- যে ক’জন আছে বিশুদ্ধ সৈনিক- তাঁদেরকে নিয়েই । বিপ্লবী নতুনভাবে অন্তরকে গড়ে কঠিন বাস্তবতায়, সব কিছু মোকাবেলার জন্য । এবার আর কেউ জ্বালাতে পারবে না ।

অন্তরে #শপথ ধীরে ধীরে দীপ্ত হয়- আবার যুদ্ধে যাবো । ঝিমিয়ে পড়া হাতের দিকে তাকিয়ে বিপ্লবীর কন্ঠে আসে কবিতা –

যদি কোনদিন আসে আবার দুর্দিন
যেদিন ফুরাবে প্রেম অথবা হবেনা প্রেম মানুষে মানুষে
ভেঙ্গে সেই কালো কারাগার
আবার প্রণয় হবে মারণাস্ত্র তোমার আমার ।


 ৩০-০৭-২০১৩

সোমবার, ২৯ জুলাই, ২০১৩

বৃষ্টি

শাহবাগের উদ্দেশ্যে মহাখালি থেকে বাসে উঠলো জনি । মহাখালি গিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে একটা কাজে । এমবিবিএস পাস করার পর কিছুদিন বেশ দৌড়াদৌড়ি করতে হয় । সার্টিফিকেট তোলো , বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন নাও, এখানে ওখানে কাগজপত্র দাও এইসব । অবশ্য এইসব কাজ করতে একধরণের আনন্দও আছে ।

কিন্তু আজকে জনি যে কাজে গিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সেটা নিয়ে সে একটু বিরক্ত । এই দেশে কোনকিছুই নিয়মমাফিক হয় না । রাজনৈতিক সুপারিশ আর টাকা ছাড়া কোন কাজ হয় না । কিন্তু জনি এর কোনটাতেই নেই । সে বিরোধী দলের কর্মী, আর টাকা দিয়ে কোন কাজ করার ইচ্ছা তার নেই । কিন্তু এখন একটু দুশ্চিন্তা হচ্ছে । এখানে থাকতে হলে হয় জায়গামত টাকা পয়সা দিয়ে কাজ করাতে হবে, নাহয় আজীবন নিগৃহীত হয়েই থাকতে হবে । বিকল্প নাই ।

জনি ভাবছিল, মেডিকেল কলেজে পোস্টিং পাওয়াটা তার ন্যায্য অধিকার । কেন তাঁকে পোস্টিং দেয়া হচ্ছে না ? তাহলে কি কিছু টাকা খরচ করবে এবার ? এটা কি নীতিবিরুদ্ধ হবে ? কেন হবে ? বিপদে পড়লে শুকরের গোশতও খাওয়া জায়েজ । আল্লাহই ভালো জানেন , কিন্তু এসব আর সহ্য হয় না ।

মাঝে মাঝে ভাবে- বিদেশে চলে যাবে । কিন্তু বাবা- মা, ছোট ভাইটাকে রেখে যেতে হবে- মনে হলেই সে ইচ্ছাটা উবে যায় ।

বিসিএস দেয়ার পর সে বছরেই এফসিপিএস পার্ট ওয়ান পাস করে জনি । চার বছর হয়ে গেল- আজো সে গ্রামে পড়ে আছে । এর মাঝে ট্রান্সফারও হয়েছে কয়েক বার । পটুয়াখালি, কুড়িগ্রাম, খাগড়াছড়ি- প্রত্যন্ত সব এলাকা । নাগরিক সুযোগ সুবিধা বলতে কিছু নেই । তার জুনিয়ররা পোস্টিং নিয়ে আসে, মাস দুমাসের মধ্যেই আবার চলে যায় । মেডিকেল কলেজে পোস্টিং পায় । কেউ কেউ বলেছিল, জনি ভাই- এভাবে আর কতদিন থাকবেন ? কিছু একটা করেন ।

বয়স ত্রিশ হয়ে যাচ্ছে, বিয়েটাও করা হল না । এবার একটা এস্পার কি ওস্পার করতেই হবে । সেই ভেবে আজ গিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে । কিন্তু নাহ- কিছু হলো না ।

জানালার পাশে একটা সিটে বসেছে জনি । চোখে কালো সানগ্লাস । সানগ্লাসটা খুলে হাতের ওপর রাখলো । মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে ।

ডাক্তার হবার ইচ্ছেটা কি ভুল ছিল ? কেন যেন ছোটবেলা থেকেই মনে হত ডাক্তার হতে হবে । মনে আছে – ও যখন ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পেল, বাবা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিলেন । জনি বৃত্তি পেয়েছে । সে ভবিষ্যতে ডাক্তার হতে চায় । সে সবার দোয়াপ্রার্থী । একই কাজ বাবা করেছেন এসএসসির রেজাল্টের পরও । সেই একই কথা- জনি এ প্লাস পেয়েছে । সে ভবিষ্যতে ডাক্তার হতে চায় । সে সবার দোয়াপ্রার্থী ।

পেপার কাটিং গুলো এখনো বাবার ড্রয়ারে সংরক্ষিত আছে । জনিরও তখন ভালোই লেগেছিল । পত্রিকায় ছবি এসেছে- খারাপ কি ? বিজ্ঞাপনের পাতা হাতে নিয়ে বাবার সেকি উচ্ছাস ! চেচিয়ে বাড়ি মাথায় তোলার জোগাড় । আমার ছেলের ছবি পত্রিকায় ! অথচ তিনিই টাকা খরচ করে বিজ্ঞাপন দিয়েছেন । জনির মনে পড়লে একটু হাসিও পায় । বড় মানুষরাও কীরকম ছেলেমানুষি যে করে ! বিশেষ করে বাবারা ।

বিজ্ঞাপন দেয়ার আগে বাবা কিন্তু জনিকে জিজ্ঞেস করেননি সে কী হতে চায় । তিনি নিজেই লিখে দিয়েছেন- জনি ডাক্তার হতে চায় । অবশ্য পত্রিকায় আরো যতজনের ছবিসহ বিজ্ঞাপন সে দেখেছিল- প্রায় শতভাগের কথা ছিল তারা ভবিষ্যতে ডাক্তার হতে চায় । জনির মনে হয়েছিল- ডাক্তার হওয়াটাই বুঝি ভালো ছাত্রদের জন্য দরকার ।

কথাটা ভুল নয় । আসলে এটা একটা মধ্যবিত্ত চেতনা । মধ্যবিত্তরা সম্মানের কাঙ্গাল । তারা সম্মান চায় । অসম্মান করলে তারা খুব কষ্ট পায় । তারা নিজেরা অন্যদের খুব সম্মান করে । ডাক্তাররা সম্মানের পাত্র, সেই ভেবে মধ্যবিত্ত বাবা মা-রা তাঁদের সন্তানকে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন দেখেন ।

কিন্তু বেশিরভাগ ডাক্তারের জীবন হতাশার । অন্তত একটা বয়স পর্যন্ত । ছোটবেলা থেকে কঠিন পরিশ্রম করে পড়াশোনা করে- ভার্সিটিতে উঠে একটু রিল্যাক্স থাকবে , খুব আশা থাকে মনে । কিন্তু না , তা আর হয় না । মেডিকেল কলেজে পরীক্ষার ওপর পরীক্ষা । আইটেম-কার্ড-টার্ম-প্রফ । প্রতিটা সাবজেক্টে পাচ-ছয়টা পার্ট । পাস করার জন্য পেতে হবে প্রতি অংশে সিক্সটি পার্সেন্ট মার্কস । বিশাল মার্কস ভাইভায় । স্যার ম্যাডামদের কোনভাবেই সন্তুষ্ট করা যায় না । গাধার খাটুনি খেটে পড়াশোনা, ওয়ার্ড ডিউটি, স্যার ম্যাডামদের বকাবকি । শীতকালীন-গ্রীষ্মকালীন ছুটি নেই । যেন এক বিভীষিকাময় জীবন । হতাশার শুরু হয় সেখানেই ।

তারপর আবার বিসিএস , এফসিপিএস, এমডি । বিসিএসএর জন্য আবার বাংলা ব্যাকরণ খোল- সমাস কাহাকে বলে পড় । সুদ-কষার অংক কর । বান্দর তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে কতটা উঠতে পারলো হিসাব করো । সংজ্ঞা মুখস্ত কর- নদী কাহাকে বলে । পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের সেনাপতি কে ছিল, সোমালিয়ার প্রেসিডেন্টের নাম কি এইসব হাবিজাবি । ডাক্তারির সাথে এগুলোর কী সম্পর্ক একমাত্র সরকার বাহাদুরই জানে , আর ঐ পিএসসিই জানে । তার ওপর যদি কোটা ভুক্ত না হয় তাহলে তো চান্স কমে যায় একলাফে প্রায় শতকরা ষাট ভাগ । কারণ নানান কোটায় মোট বিসিএস এর পঞ্চান্ন ভাগ খেয়ে ফেলেছে । এর ওপর আছে রাজনৈতিক প্রভাব । জায়গামত মন্ত্রী ফোন না করলে ভাইভায় আউট । সরকারি দল না হলে এই সেই ভেরিফিকেশনের নামে বাতিল করা হয় গেজেট । অন্ততপক্ষে নন-ক্যাডার করে রাখা হয় ।

আবার বিসিএস হলে অজপাড়াগায়ে পোস্টিং । বছরের পর বছর সেখানে পড়ে থাকা । ক্লাসের পেছনের বেঞ্চের বন্ধুটি আজ মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করে , মাস শেষে মোটা অংকের বেতন পায় । বউ বাচ্চা নিয়া মার্কেটে ঘোরাঘুরি করে । অন্য সব ক্যাডারের পোস্টিং মিনিমাম উপজেলা শহরে । আছে গাড়ী, কোয়ার্টার সুবিধা । একমাত্র ডাক্তারদের পোস্টিং আছে ইউনিয়ন-গ্রামে । নেই কোয়ার্টার, নেই গাড়ী , নেই পিয়ন-আর্দালি, নেই বডিগার্ড, নেই প্রটোকল । ডিগ্রি নেয়ার জন্য কোথাও যাবারও উপায় নেই, আবার ডিগ্রি না নিতে পারলে কোনদিন প্রমোশনও হবে না ।

ইন্টার্ণশিপ করার সময় একদিন সার্জারির সহকারী অধ্যাপক স্যার বলেছিলেন, জনি মাঝে মাঝে খুব হতাশ লাগে । আমার কত জুনিয়ররা আজ সহযোগী অধ্যাপক হয়ে গেছে- আর আমি আজও সহকারী অধ্যাপক রয়ে গেলাম । আমার ছাত্ররা আজ আমার সাথে এক কাতারে , সহকারী অধ্যাপক । এই আমাদের দেশ । নেতাদের পিছনে ঘুরঘুর করো, জায়গামত টাকা ঢালো- তোমার প্রমোশন হবে । নাহলে সারাজীবন পঁচে মরো, দেখার কেউ নেই ।

বাস এসে থেমেছে ফার্মগেট খামারবাড়ি মোড়ে । জনি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল । কিছুক্ষণের মধ্যেই জানালার পাশে আরো বাস এসে থামলো । জ্যাম লেগে গেছে । জ্যামের কারণে ঢাকা শহরে চলাফেরা করাটাই দায় । এক ঘন্টার পথ তিন ঘন্টা লাগে । পল্টন থেকে শ্যামলী যেতেই কোন কোন দিন আড়াই ঘন্টা লেগে যায় । উত্তরা থেকে শাহবাগ আসতে লাগে তিন ঘন্টা । মহা মুশকিল । এই জ্যাম যে কতক্ষণে ছুটবে আল্লাহ মালুম ।

জনি বাসের ভেতরে দৃষ্টি ফেরালো । সাথে সাথে চোখটা নামিয়েও নিতে হল । মহিলা সিটে একটা মেয়ে বসে আছে । মেয়েটা বেশ মায়াবী চেহারার । একবার চোখ পড়লে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করবে যে কারো । এবং সেটাই হচ্ছে । বেশ কিছু লোক তাকিয়ে আছে মেয়েটার দিকে । জনি চোখ নামিয়ে নিয়েছে । সে জানে, পুরুষের পর্দা হলো চোখ । আমাদের সমাজে শুধু মহিলাদের পর্দার ব্যাপারে কথা বলা হয়, পুরুষেরটা বলা হয় না ।

কিন্তু অবস্থা যেদিকে যাচ্ছে, চোখ সামলানো অত সহজ না । রাস্তাঘাটে চলাফেরা করাটাই দায় হয়ে পড়েছে । কতক্ষণ চোখ সংরক্ষণ করা যাবে ? সর্বত্র বেপর্দা, সাজুগুজু করে বের হওয়া মেয়েদের কথা যদি বাদও দেয়া হয়- মরার ওপর খড়ার ঘা হয়ে আছে যেখানে সেখানে বড় বড় বিলবোর্ড । সকল বিলবোর্ডেই মেয়েদের ছবি । বিজ্ঞাপনের জন্য বেপর্দ হয়ে ছবি তোলা- এগুলোর নাম দেয়া হয়েছে মডেলিং । গাড়ি, রড, আইসক্রিম, এমনকি প্রকাশ্যে কনডমের বিজ্ঞাপনও দেয়া হচ্ছে বিলবোর্ডে । রাস্তার মোড়ে মোড়ে, রোড ডিভাইডারের ওপর । সব সময় তো আর চোখ নামিয়ে চলা যাবে না , তাহলে তো টেম্পু-সিএনজি মেরে দিয়ে যাবে । ওগুলো একেকটা বদ ।

এই মেয়েটাকে অবশ্য বেপর্দা বলা যায় না , কিন্তু ঠিকমত পর্দা করেছে তাও বলা যায় না । পর্দার উদ্দেশ্য যে ব্যাহত হয়েছে তা তো স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে ।
সমস্যা হলো মেয়েটা জনির দিকে তাকিয়ে ছিল । জনিও এমন জায়গায় বসেছে , চোখ তুললেই মেয়েটার ওপর চোখ পড়ছে । বাস থেকে বের হয়ে যাবে কিনা ভাবছিল জনি । দরজার দিকে তাকাতেই আবারো চোখ পড়ল । এবার তো চোখাচোখিই হয়ে গেল ।

মহা মুশকিল । বাইরে আবার এরই মধ্যে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে । খোলা জানালা দিয়ে মাথাটা বের করে দিল জনি । বৃষ্টির ফোঁটা এসে পড়ছে মাথায় । ভিজে যাচ্ছে ঝাঁকড়া চুল ।
বৃষ্টি দেখলেই জনির বৃষ্টিবিলাসী মন উথাল পাথাল করে । বৃষ্টিতে না ভিজলে ভালো লাগে না । অন্তত দু হাতের পাতা হলেও একবার ভেজাতে হবে ।

জ্যাম ছুটতে কতক্ষণ লাগবে কে জানে ! এখান থেকে হেঁটে ফার্মগেট যেতে পারলেই ওপাশের বাসে উঠে পড়া যাবে । ভিজলে ক্ষতি কী ? ও আচ্ছা , মোবাইল আর মানিব্যাগ সমস্যা । ওগুলো তো ভিজে যাবে । কন্ডাকটারকে ডাকলো জনি- এই একটা পলিথিন দাও ।
বাসে পলিথিন রাখা হয় । বাসে উঠে বাচ্চা কাচ্চারা- কখনো বড়রাও বমি করে । বাস যেন নোংরা না হয় সে জন্য পলিথিনের ব্যবস্থা রাখা হয় ।

সবাই একবার জনির দিকে তাকালো । এই ছেলে বমি করবে নাকি ? জনি মোবাইল ও মানিব্যাগ বের করে পলিথিনে মুড়িয়ে নিলো । তারপর উঠে দরজা দিয়ে নেমে গেল ফুটপাতে । বৃষ্টি পড়ছে । ক্যাটস এন্ড ডগস নয়, টাপুরটুপুর । কিছুক্ষণের মধ্যে বৃষ্টি থেমে যাবে পুরোপুরি । হালকা বৃষ্টির সাথে ঠান্ডা হিমেল হাওয়া আসছে দমকে দমকে । জনির শরীরে একবার শিহরন খেলে গেল ।

একশ গজের মত এগিয়েছে , হঠাৎ পেছন থেকে ডাক শুনতে পেল – ‘জনি ভাই ! আমি বৃষ্টি !’
পেছন ফিরে জনি অবাক । ঐ মেয়েও বাস থেকে নেমে পড়েছে । সে পেছনে এসেছে কেন ?
বৃষ্টি... কোন বৃষ্টি ? সে কীভাবে জনিকে চেনে ? দাঁড়িয়ে থাকা বাসের জানালা দিয়ে লোকজন তাকিয়ে আছে । জনি এখন কী করবে ?

..............................
বৃষ্টি / ২৯-০৭-২০১৩

শুক্রবার, ২৬ জুলাই, ২০১৩

বিদেহী প্রিয়তমার অপেক্ষায়

দিঘীর শান্ত জলে আমার চঞ্চল চোখ স্তব্ধ চেয়ে থাকে
বাতাসের কানাকানিতে ভ্রুক্ষেপ নেই
বিজলির ঝিলিকেও স্থির চোখের তারা
মেঘের গর্জনেও চমক নেই
শান্ত । যেন সে এক- হাজার বছরের ধ্যান ।

জানিনা কতটুকু মুহুর্ত কিংবা কতটা শতাব্দী পেরিয়ে যায়
আমার স্তব্ধ চোখ তবু নিষ্পলক । ক্ষুদ্র কড়ে আঙ্গুলে উঠে আসে
ঘাটের শ্যাওলার ভেতর বেড়ে ওঠা বেগুনী ঘাসফুল
তোমার খোঁপার কথা মনে আসে । আবার হারিয়ে যায়
শান্ত দিঘীর জল ইশারা দেয়- কথা বলো না ।

অনন্ত কাল হয়তো এখানে বসে থাকবো, এই ঘাটে
সম্বিত ফিরে পাবো শুধু তোমার ঘুঙুরের শব্দেই ;
বালিকা বঁধূ । এই চোখে চঞ্চলতা আসবে ফিরে – যদি মনে হয়
চোখ ফেরালেই হয়ে যাবে চোখাচোখি তোমার ,
কাজল গভীর নয়নে ।

………………………..............
বিদেহী প্রিয়তমার অপেক্ষায় / ২৬-০৭-২০১৩

বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই, ২০১৩

মৃত্যর সাথে প্রেম

কোথায় যাবে কী পাবে ?
কখন ?
তুমি নিশ্চিত নও ?

কিন্তু
তুমি মৃত্যুকে অথবা
মৃত্যু তোমাকে পাবে ,
এ তো মহাসত্য সৃষ্টির আদি
কিংবা তারও আগে হতেই !

আমি তাই
মৃত্যুকে সাজাই
নিরন্তর । হৃদয় নিংড়ে পাওয়া –
সবটুকু মাধুরী ঢেলে । প্রিয়তমে ললনার মত ।
একটু পরেই
এক অলৌকিক বিয়ের আসরে
তার হাত ধরে আমি পদার্পণ করবো
অনন্ত যৌবনে ।

মৃত্যুকে তোমরা ভয় পাও ?
হা হা হা ! বড্ড হাসি পাচ্ছে !
তোমরা মৃত্যুকে মনে করো
কুৎসিত ঝগড়াটে বৌ !
মৃত্যুতে তোমরা খুঁজে পাও
অপুরণীয় ক্ষতি !

অথচ
মৃত্যু আমার প্রেমময় সুন্দরীতমা
এক পলকেই যার ওপর ঝাপিয়ে পড়া যায়
অদম্য তাড়নায় ।

মহিমান্বিত মৃত্যু !
সেতো আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন ।
তার সাথেই আমার
আজন্ম সহবাস ।

....................................
মৃত্যুপ্রেম / ২৫-০৭-২০১৩

সোমবার, ২২ জুলাই, ২০১৩

তিন প্রহরের বিল

গল্প কবিতা খুব একটা পছন্দ করে না ইমরান । এগুলোকে সে বেহুদা কাজ মনে করে । সে কঠিন কঠিন প্রবন্ধ পড়ে । পত্রিকার কলাম পড়ে । কিন্তু কীভাবে কীভাবে যেন তাঁর মাথায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতাটা ঢুকে যায় স্কুলে থাকতেই । এরপর হঠাৎ হঠাৎ কবিতা আবৃত্তি করতে শুরু করতো সে । টেনশন করার মত পরিস্থিতি দাঁড়ালে তখনো তাঁর মুখে শোনা যেত কবিতাটা ।

এমনিতে ইমরান খুবই শান্ত শিষ্ট ভদ্র ছেলে । কারো সাথে কোন ঝামেলায় সে কখনোই জড়াত না । চেহারা নাদুস নুদুস । একজন আদর্শ পড়ুয়া ছাত্র ।

স্কুলে অংকের মনির স্যার ছিলেন খুব রাগী । একদিন স্যার ক্লাসে এলেন । স্যারের মেজাজ কোন কারণে আগে থেকেই বিগড়ে ছিল । এদিকে হোমওয়ার্কের খাতা দেখতে চাইলে দেখা গেল অনেকেই হোমওয়ার্ক করে আসেনি । ইমরানও তাদের মধ্যে একজন । আসলে ইমরান হোমওয়ার্ক ঠিকই করেছিল । কিন্তু ঝামেলাটা হয়েছে অন্য জায়গায় । স্কুলে আসার সময় মামাতো বোন রুনার খাতার সাথে খাতা পরিবর্তন হয়ে গেছে । রুনা পড়ে ক্লাস থ্রিতে , ইমরান নাইনে ।

যাদের হোমওয়ার্ক করা হয়নি তাদের দাঁড়াতে বললেন মনির স্যার । হাতের উল্টোপিঠে বেত দিয়ে পেটানো ছিল মনির স্যারের বিশেষ স্টাইল । ইমরানের সামনে এসে স্যার দেখলেন- টেবিলে গণিত খাতা । খাতার ওপরে লেখা ‘রুনা’ ।
স্যার কী মনে করলেন কে জানে- তিনি ইমরানের ওপর ক্ষেপে গেলেন । ইমরানের দুহাতের উল্টোপিঠে পেটাতে লাগলেন । ইমরান এ অবস্থায় সুনীলের কবিতা আবৃত্তি করতে শুরু করলো ।

কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনি
ছেলেবেলায় এক বোষ্টুমী তার আগমনী গান হঠাৎ থামিয়ে বলেছিল
শুক্লা দ্বাদশীর দিন অন্তরাটুকু শুনিয়ে যাবে
তারপর কত চন্দ্রভূক অমাবস্যা চলে গেলো, কিন্তু সেই বোষ্টুমী
আর এলোনা
পঁচিশ বছর প্রতিক্ষায় আছি ।
মামা বাড়ির মাঝি নাদের আলী বলেছিল, বড় হও দাদাঠাকুর
তোমাকে আমি তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাবো
সেখানে পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমর
খেলা করে!
নাদের আলী, আমি আর কত বড় হবো ? আমার মাথা এ ঘরের ছাদ
ফুঁড়ে আকাশ স্পর্শ করলে তারপর তুমি আমায়
তিন প্রহরের বিল দেখাবে?

স্যার থেমে গিয়েছিলেন । স্যার হয়তো নিজেও এরকম আশা করেননি ।

রুনা ইমরানের মামাতো বোন । মামার বাসা পাশেই হওয়ায় রুনাকে স্কুলে নেয়ার দায়িত্ব প্রায়ই পালন করতে হত ইমরানকেই । মামা মামী দুজনেই কর্মজীবি । তাঁদের একমাত্র মেয়ে রুনা । রুনার স্কুল ছিল ইমরানের স্কুলে যাওয়ার পথেই । রুনাকেও এই কবিতাটাই শোনাতো ইমরান । রুনা একবার জিজ্ঞেস করেছিল- ইমরান ভাইয়া, তুমি তিন প্রহরের বিল দেখেছ ? ইমরান বলেছিল সে দেখেনি । তবে শুনেছে দাদাবাড়ির গ্রামে একটা বিল আছে । রুনা বলেছিল- আমাকে নিয়ে যাবে একদিন ? আমিও বিল দেখবো । ইমরান বলেছিল- একদিন নিয়ে যাবে বিল দেখাতে ।

সে অবশ্য অনেকদিন আগের কথা । প্রায় বছর দশেক । এর মধ্যে কত কিছু হয়ে গেছে ।

ইমরান বসে আছে মামার বাসায় , বেডরুমে । মামী কফি বানিয়ে এনেছেন । কফির মগে চুমুক দিচ্ছিলো ইমরান । রুনার ছোট ভাইটা আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছিল । ওর বয়স ছয় । ক্লাস ওয়ানে পড়ে । মোবাইল পাগলা । ইমরানের মোবাইল নেয়ার জন্য ঘোরাফেরা করছে । মামী থাকায় সুবিধা করতে পারছে না ।
মামী বললেন- ‘বাবা, অনেকদিন পর এলি । আমাদের ভুলেই গেছিস । তোর মা-টাও চলে গেল, আর যোগাযোগটাও কমে গেল’ ।

ইমরান কী বলবে ভেবে পাচ্ছিলো না । মায়ের সাথে মামীর সম্পর্ক ছিল প্রাণের বান্ধবীর মত । সাধারণত পরিবারে ননদ-ভাবী একটা দ্বন্দ্ থাকে , কিন্তু ইমরানের মায়ের সাথে মামীর সম্পর্ক ছিল গলায় গলায় । ইমরানের একটাই মামা । মায়ের ছোট ভাই ।

তখন ইমরানদের বাসা এদিকেই ছিল । সময় পেলেই মা ইমরানকে নিয়ে মামার বাসায় আসতেন ।
ঐ বয়সেও তারা লুডু খেলতেন । ইমরান আর ওর মা একপক্ষে, মামী আর রুনা একপক্ষে । দারুণ উত্তেজনাকর খেলা হত । মাঝে মাঝে বিকেল বেলা পার্কে ঘুরতে যেতেন দুজনে । ইমরান আর রুনাও সাথে থাকতো ।
কথায় কথায় মা মামীকে বলতেন , তোর মেয়েটাকে আমি নিয়ে যাবো ।
মামী বলতেন- তা হতে দেবো না । আপনার ছেলেটাকে আমি নিয়ে আসবো ।
আমার ছেলেকে আমি ঘরজামাই হতে দেব ভেবেছিস ? মা বলেন ।

দুজনে হাসতেন খুব । হাসি রোগ ছিল তাঁদের । হাসি শুরু করলে সহজে থামে না । চোখে পানি না আসা পর্যন্ত হাসেন ।

ইমরান স্কুল কলেজ পেরিয়ে মেডিকেল কলেজে চান্স পেল । ঢাকা ছেড়ে যেতে হবে চট্টগ্রামে । সবকিছু গোছগাছ করা হচ্ছে । ছেলেটা হোস্টেলে কীভাবে থাকবে, কী খাবে এসব নিয়ে মায়ের চিন্তার শেষ নেই । কলেজে নাকি মারামারিও হয় । ছেলেটা তো বেশি দৌড়াতেও পারবে না । ও একটু মোটাসোটা । কী যে করবে । ওকে নিয়ে চিন্তার শেষ নেই ।

ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাস শুরু হবার দুদিন আগে সবকিছু গোছগাছ করা হল । মা সারাদিন ধরে ব্যাগ গুছিয়ে দিলেন । কোনকিছু বাদ পড়লো কিনা দেখলেন । চিড়াভাজার বয়াম দিলেন, আচারের বয়াম দিলেন । একটু পরপর ইমরানকে ধরে মুখে কপালে চুমু দিলেন । ঐদিন যে মা কতবার ইমরানকে চুমু দিয়েছিলেন গুনে শেষ করা যাবে না । ইমরানেরও মনটা খুব খারাপ ছিল সারাদিন । বাসা ছেড়ে চলে যেতে হবে । অচেনা শহর, অচেনা মানুষজন । সে কি পারবে মানিয়ে নিতে ?

রাতের বেলা আব্বার সাথে বেরিয়ে পড়লো ব্যাগ নিয়ে । বাস পর্যন্ত মা এগিয়ে দিয়ে গেলেন । মা লং জার্নি করতে পারেন না । তাঁর কোমড়ে ব্যথা হয়, আর মোশন সিকনেস । বমি হয় । নাহলে তিনিও সাথে যেতেন ।

সকালবেলা চট্টগ্রামে নেমে হোস্টেলে গেল ইমরানরা । হোস্টেল অফিসে কথা বলতে গেল । সেখান থেকে রুম বরাদ্দ হবে । হোস্টেলে বিভিন্ন সংগঠনের ছেলেরা এসে তাঁদেরকে অনেককিছু বোঝানোর চেষ্টা করলো । হোস্টেলের রুম নাকি কলেজের নিয়ন্ত্রণে নাই । ছাত্রসংগঠনগুলো নিজেদের শক্তি অনুযায়ী ভাগ করে নিয়েছে । যাদের রুমে উঠবে- তাদের লোক হয়ে যাবে । মহা ফ্যাসাদের ব্যাপার । কেউ কেউ সিগারেট খাচ্ছিল- সিগারেট খেয়ে খেয়ে ঠোঁট কালো করে ফেলেছে । রংচটা জিন্স পড়া , নিচের দিকে ছেড়া । এরা কেউ জাতীয়তাবাদের কথা বলে, কেউ আবার মুক্তিযুদ্ধ চেতনার কথা বলে । তারা বারবার মৌলবাদী গোষ্ঠীর ব্যাপারে সতর্ক করছিল । ওরা আপনার ছেলেকে জঙ্গী বানিয়ে ফেলবে । মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণার বই পড়ে আপনার ছেলেকে মৌলবাদী হয়ে যাবে ।

ইমরানের আব্বা চিন্তা করলেন – এ কেমন চেতনা ? মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কি সারাদিন সিগারেট ফোঁকা ? কেউ কেউ বললো- এরা মদ গাঁজাও খায় । অবশ্য দেখেই বোঝা যায়- নামাজ কালামের ধার ধারে না । নামাজী ছেলের চেহারা এরকম হয় না ।

কিছু ছেলে এসে সুন্দর করে সালাম দিয়ে কথা বলেছিল । তারা কারো বিরুদ্ধে বিষোদগার না করে সমস্ত পরিবেশ পরিস্থিতি স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করেছিল । তাঁদের কথার সাথে পরিবেশের মিল খুঁজে পেয়েছিলেন ইমরানের বাবা । সবকিছু ভেবেচিন্তে তিনি এরকম একজন ভদ্র নামাজী ছেলের রুমে ছেলেকে তুলে দিয়েছিলেন ।

সেদিন বিকেল বেলা ফোন এলো । ইমরানের আম্মা খুব অসুস্থ । অনেক বেশি জ্বর উঠেছে । বমি করেছেন । এখন অজ্ঞান হয়ে গেছেন । মামা মামী তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন ।

ব্যাগে কিছু কাপড় নিয়ে আবার ঢাকা যাওয়ার জন্য বের হলো ইমরান ও তাঁর আব্বা । ইমরানের রুমমেট ছেলেটা কীভাবে কীভাবে ইন্সট্যান্ট একটা বাসের টিকেট করে ফেললো । ভালো সিটের ব্যবস্থা করে দিল । বাসে উঠে ইমরান নীরবে কাঁদতে লাগলো ।
মধ্যরাতে ঢাকায় পৌঁছে হাসপাতালে গিয়েছিল ইমরান ও আব্বা । মায়ের জ্ঞান ছিল । দুর্বল হাতে তিনি ইমরানকে কাছে টেনে মাথায় চুমু দিয়ে বলেছিলেন – আমার বাবা, তুই আমাকে ফেলে কোথাও যাবি না ।

ইমরান কোথাও যায়নি, কিন্তু সকালবেলা মায়ের ঘুম আর ভাঙ্গেনি । তিনি ইমরানকে রেখে চলে গেছেন ।

ইমরান এক সপ্তাহ কোন কথা বলেনি । সারাক্ষণ চুপচাপ । রুমের দরজা বন্ধ করে কেঁদেছে ।
তারপর একসময় বাস্তবতা মেনে নিয়ে চলে গিয়েছিল চট্টগ্রামে । পড়াশোনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল । ঢাকায় ওরা বাসা চেঞ্জ করে । মামার বাসায় আর তেমন একটা যাওয়া হয় না । মামী মাঝে মাঝে ফোন করতেন । কথা হত ।

ইমরান যখন মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয় রুনা তখন ক্লাস সেভেনে । মাঝে মাঝে রুনা চিঠি লিখত । ইমরান খুব একটা উত্তর দেয়না । ধীরে ধীরে রুনাও একসময় চিঠি লেখা বন্ধ করে দেয় । দুবছর আগে রুনা এসএসসি পাস করার পর মামী ইমরানের সাথে পরামর্শ করেছিলেন- রুনাকে কোথায় ভর্তি করানো যায় । রুনা ভালো রেজাল্ট করেছিল । রুনাকে হলিক্রস কলেজে ভর্তি করানো হয়েছিল ।

ইমরান এমবিবিএস পাস করে , ইন্টার্ণশিপ শেষ করে এখন ঢাকায় । থাকে বন্ধুদের সাথে শাহবাগে এক বাসায় । মেডিকেলের উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় একটিই । বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়- বিএসএমএমইউ । শাহবাগে । সারাদেশ থেকে তরুণ ডাক্তাররা পোস্টগ্রাজুয়েশনের নেশায় ঢাকা ছুটে আসে । তারা এসে ভিড় জমান বিএসএমএমইউ- এর আশেপাশে । শাহবাগের গণ্ডিতেই শত শত বাসায় ব্যাচেলর ডাক্তাররা থাকেন । দিনরাত পড়াশোনা করেন । সবার ধারণা- বিএসএমএমইউ-র আশেপাশে থাকলে বুঝি পড়ালেখা ভালো হবে ! অবশ্য আরো একটা কারণ আছে- বিএসএমএমইউ-র লাইব্রেরিতে নির্বিঘ্নে পড়াশোনা করা যায় । এসি আছে ।

কয়েকদিন থেকে মামী ফোন করছেন । বাসায় যেতে বলছেন । ইমরান এফসিপিএস পার্ট- ওয়ান পরীক্ষা নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিল এ কয়দিন । সময় করে উঠতে পারেনি । নাক ডুবিয়ে পড়াশোনা করেছে । তার ফলও পেয়েছে । পার্ট-১ এ পাস করে ফেলেছে সে । একজন ডাক্তারের জন্য এ এক বিশাল রিলিফ ।
সামনে আবার বিসিএস ভাইভা আছে । এখন কিছুদিন রেস্ট নেয়ার চিন্তা করেছে ইমরান । বিসিএস নিয়া এত চিন্তা নাই ।

আজ সকালবেলাটা ঘুমিয়ে বিকেলে বের হয় মামার বাসায় আসার জন্য । পথে হলিক্রস কলেজ পার হবার সময় রুনার কথা মনে পড়েছিল । রুনা এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে । রেজাল্ট এখনো হয়নি । পড়াশোনা করছে মেডিকেল- ভার্সিটি ভর্তি পরীক্ষার জন্য ।
ছোটবেলায় রুনাকে স্কুলে নিয়ে যাবার স্মৃতিগুলোও মনে পড়ে যাচ্ছিল । ছোটবেলায় রুনা দেখতে খুব কিউট ছিল । এখন কেমন হয়েছে কে জানে !

..........................................

মামীর সাথে কিছুক্ষণ আলাপ হলো । স্মৃতিচারণ । মায়ের কথা, ইমরানের ছোটবেলার কথা । কথা বলতে বলতে মামীর চোখ ছলছল করে ওঠে । ইমরানের মনটাও উদাস হয়ে যায় ।
রুনাকে একবার দেখা গেল দরজার সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে । রুনা কি আড়ালে থেকে কথা শুনছে নাকি ? এই বয়সের মেয়েদের এই একটা বদভ্যাস । আড়ালে থেকে বড়দের কথা শোনে ।

কফি শেষ করতে না করতেই মামা চলে এলেন । সাথে ইমরানের আব্বাও । ইমরান অবাক হয়ে গেল । আব্বা এসময় এখানে আসবেন – এমনটা তো কথা নয় ।
মামা বললেন- অবাক হচ্ছিস কেন ? তোর বাবাকে আমিই ডেকেছি ।

চা এলো । চা খেতে খেতে আব্বা বললেন- বাবা ইমরান, একটা জরুরী বিষয়ে কথা বলার জন্য আমি এসেছি । তোর মামীর খুব ইচ্ছে- তোর সাথে রুনার বিয়েটা দিয়ে দেন । তোর মামার এবং আমারও মত আছে । তোর মাও একথা বলতো । আমাদের ইচ্ছা- এ সপ্তাহেই বিয়েটা সেরে ফেলি । তোর মতামত টা জানার জন্যই এখানে এসেছি । তুই কি বলিস ? রুনা মা খুব ভালো । তুই তো জানিস, তোর মা ওকে কতটা পছন্দ করতেন ।

ইমরান সবার দিকে তাকালো । মামীর চোখ ছলছল করছে ।
ইমরান এমনটা আশা করেনি । তাঁর অমত নেই, বরং মনে মনে এমন একটা ইচ্ছা যে তারও জাগেনি তা নয় ।
তবু আমতা আমতা করে বললো- কিন্তু ও তো এখনো ছোট ।

পিচ্চি ভাইটা এসময় ইমরানের চেয়ারের কাছে এসে ইমরানের হাতে একটা নীল কাগজ ধরিয়ে দিল ।
ইমরান খুলে দেখলো তাতে লাল কালিতে লেখা –

নাদের আলী, আমি আর কত বড় হবো ? আমার মাথা এ ঘরের ছাদ
ফুঁড়ে আকাশ স্পর্শ করলে তারপর তুমি আমায়
তিন প্রহরের বিল দেখাবে?
-(রুনা) ।
...............................
তিন প্রহরের বিল / ২২-০৭-২০১৩

রবিবার, ২১ জুলাই, ২০১৩

বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর মহা আবিস্কার

ইন্টারন্যাশনাল সাইকিয়াট্রিস্ট সোসাইটির বার্ষিক সম্মেলন । সম্মেলনে মিলিত হয়েছেন সারা বিশ্বের সেরা সাইকিয়াট্রিস্টগন । বাংলাদেশ থেকে অংশ নিয়েছেন ডঃ আব্দুল্লাহ । সম্মেলনের দুইটি অংশ । প্রথম অংশ জার্মানির ‘বন’ শহরে পরশু শেষ হয়েছে । দ্বিতীয় অধিবেশন বসছে নেদারল্যান্ডের ‘হেগ’ শহরে । এ নিয়ে আজ সকালে বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল ডঃ আব্দুল্লাহর বাসায় । বাংলাদেশের পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে – ‘ বাংলাদেশের মনোবিজ্ঞানী ডঃ আব্দুল্লাহ গতকাল বন থেকে হেগে গেছেন’ ।
ডঃ আব্দুল্লার সাত বছর বয়সী ছেলে খবর দেখে তার মাকে প্রশ্ন করেছে- মাম্মি, বাবা কেন বনে পায়খানা করতে গেছেন ? তুমি না বলো- যেখানে সেখানে পায়খানা করলে ডায়রিয়া হয় ?

সকালে স্ত্রীর সাথে কথা হয়েছে । ডঃ আব্দুল্লার স্ত্রীর নাম মিমু । মিমু তো ঘটনা বলে হাসতে হাসতে কথাই বলতে পারছিল না । এদিকে ডঃ আব্দুল্লার মেজাজ খারাপ । বাচ্চা ছেলেটা বাবার সম্পর্কে কী একটা খারাপ ধারণা পেয়ে গেল । দেশে সাইকিয়াট্রিস্টদের পাগলের ডাক্তার বলা হয় । বিদেশি পাগলের ডাক্তারগুলার ওপর ডঃ আব্দুল্লাহ মহা বিরক্ত হলেন । শালারা সম্মেলন আয়োজনের জন্যে ‘বন’ আর ‘হেগ’ ছাড়া পৃথিবীতে আর জায়গা পেল না ?

প্রথম অধিবেশনে বিশ্বের মানুষের মনস্তাত্বিক অবস্থার ওপর বিস্তর আলোচনা হয়েছিল । নানারকম সমীক্ষা, গবেষণা পত্র উত্থাপন করা হয়েছিল । দিন দিন মানুষের মনস্তত্ব জটিলতর হচ্ছে । মানুষ বেশি মাত্রায় মানসিক চাপে ভুগছে । বিশেষ করে উন্নত বিশ্বের মানুষেরাই বেশি মানসিক চাপে ভুগছেন । পারস্পরিক সম্পর্কের জটিলতাও বাড়ছে । পরিবার , বন্ধন এই শব্দগুলো কেমন যেন সেকেলে হয়ে যাচ্ছে ।
ডঃ আব্দুল্লাহ প্রথম অধিবেশনে শিশুদের মানসিক অবস্থা নিয়ে একটা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন । এতে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে শিশুদের ওপর ছোটবেলা থেকেই নানামুখি চাপ সৃষ্টি করছে পরিবেশ । শিশুরা নিজেদের ভেতর মেলামেশার সুযোগ পাচ্ছে না , খেলাধুলার সুযোগ পাচ্ছে না, চিন্তা করার সুযোগ পাচ্ছে না । স্কুল, টিউটর , পরীক্ষা , প্রতিযোগিতা... শিশুরাও এখন মহাব্যস্ত ......

এইসব কথাবার্তা বলেছিলেন প্রায় ঘন্টাখানেক । তিনি নিতান্ত অনিচ্ছা নিয়েই প্রথম অধিবেশনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছিলেন । মনে মনে কিছুটা অস্থিরতাও বোধ করছিলেন । কখন তাঁর আবিস্কার উপস্থাপন করবেন সে নিয়ে টেনশন বোধ করছিলেন । তিনি আশা করেন – এই আবিস্কার দেখে সবাই টাস্কি খেয়ে যাবে ।

অবশেষে ‘হেগ’ এ শুরু হলো ইন্টারন্যাশনাল সাইকিয়াট্রিস্ট সোসাইটির বার্ষিক সম্মেলনের দ্বিতীয় পর্ব । এই অধিবেশনে মনোবিজ্ঞানের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হবে । পরিকল্পনা হবে । নতুন পদক্ষেপ নেয়ার ব্যাপারে আলোচনা হবে । এছাড়া মনোবিজ্ঞানের উন্নয়নে বিশ্বের সাইকিয়াট্রিস্ট গণ কী করেছেন তা নিয়ে পর্যালোচনা হবে ।

অনেকেই অনেক জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা শুরু করলেন । বেশিরভাগই চিকিৎসা সংক্রান্ত । বেশ কিছু নতুন ড্রাগের কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা হলো । সিজোফ্রেনিয়া, অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার , হিস্টিরিয়া, ম্যানিয়া , ফোবিয়া এইসব নিয়ে কথাবার্তা । কোন ড্রাগ কোন রোগে ভালো কাজ করছে- এইসব আবিস্কার আরকি ।

একসময় এলো ডঃ আব্দুল্লাহর পালা । তিনি তাঁর প্রেজেন্টেশন শুরু করলেন । সবাই উৎসুক হয়ে তাঁকিয়ে রইলো প্রোজেক্টরের দিকে । বাংলাদেশের এই বিজ্ঞানী একটি ‘মানসিক অবস্থা পরিমাপক স্কেল’ আবিস্কার করেছেন ।
ডঃ আব্দুল্লাহ বলছিলেন- দেখুন বিশ্বে অনেক কিছু নিয়ে স্কেল আবিস্কৃত হয়েছে । পদার্থ-রসায়ন বা গণিতের কথা বাদ দিলে চিকিৎসা বিজ্ঞানেও বেশ কিছু স্কেল প্রচলিত আছে । ব্রেইন ফাংশান বোঝার জন্য গ্লাসগো কোমা স্কেল , মেটাবলিক অবস্থার জন্য বডি মাস ইনডেক্স স্কেল............ ইত্যাদি । কিন্তু আমাদের এই সেক্টরে তেমন কোন সহজ স্কেল এখনো চালু হয়নি ।

কারো মানসিক অবস্থা যাচাই করার জন্য আমি একটি স্কেল আবিস্কার করেছি । এই ক্ষুদ্র ডিভাইসটি সহজেই একজন মানুষের মানসিক অবস্থা নির্ণয় করবে এবং এটিকে একটি গ্রেডে প্রকাশ করবে ।

এই স্লাইডে দেখুন – এই ডিভাইসটি যে স্কেলে মানুষের মানসিক অবস্থা প্রকাশ করবে সেটির নাম দিয়েছি ‘মখা স্কেল’ । ‘মখা’ স্কেলে শুন্য থেকে একশ পর্যন্ত গ্রেড আছে । এখানে সর্বনিম্ন অবস্থা জিরো । সর্বোচ্চ একশ । যার গ্রেড যত কম তাঁর মানসিক অবস্থা ততটা ভালো । ‘একশ’ গ্রেডটি যে অবস্থা নির্দেশ করে তা আমাদের দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মানসিক অবস্থা । তিনি বলেছেন- কয়েকজন মানুষ ইচ্ছে করলেই ধাক্কা দিয়ে একটি নয়তলা বিল্ডিং ধ্বসিয়ে দিতে পারে । একজন মানুষকে ইনসেন বা পাগল বলার জন্য তার মখা স্কেল গ্রেড অবশ্যই সত্তরের উপরে হতে হবে ।

এই স্কেলের প্রতি গ্রেডকে বলা হবে মখাটিভিটি বা মখাত্ব । ধরুন আপনার অবস্থা নির্দেশ করছে ষাট । তাহলে আপনার মখাটিভিটি বা মখাত্ব ষাট । আপনার অবস্থা খারাপের দিকে ।

বিপুল হাততালি হতে লাগলো হলরুমে । হাততালির শব্দে ডঃ আব্দুল্লার আওয়াজ আর শোনা গেল না ।

..............................

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বসে একবছর আগের কথা ভাবছিলেন ডঃ আব্দুল্লাহ । ঐ সম্মেলন ডঃ আব্দুল্লার আবিস্কারকে যুগান্তকারী আবিস্কার বলে ঘোষণা করেছিল । সেদিন সারাবিশ্বের মনোবিজ্ঞানীরা তাঁদের মখাটিভিটি জেনেছিলেন । সৌভাগ্যক্রমে সবার অবস্থাই মোটামুটি ভালোই ছিল । কারো মখাটিভিটি বিশ গ্রেড অতিক্রম করেনি ।

বিশ্বের বিখ্যাত পত্রপত্রিকাগুলিতে ডঃ আব্দুল্লাহর যুগান্তকারী আবিস্কারের ভূয়সী প্রশংসা করা হয় । তাঁর ছবিসহ বিশাল বিশাল ফিচার ছাপানো হয়েছিল । তিনি ভেবেছিলেন দেশে ফিরে বিশাল সংবর্ধনা পাবেন । কিন্তু বিধি বাম । বিমানবন্দরে নামার সাথে সাথে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় । তাঁর এই আবিস্কারে বাংলাদেশ সরকারের মখানুভূতিতে আঘাত লাগে । স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে মামলা করেন ।

ইতোমধ্যে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে মখা স্কেল । বাণিজ্যিক ভাবে বিশেষ ডিভাইস বাজারজাত করা হয়েছে । মানুষ সবাই সাথে মখা স্কেল বহন করছে এবং কোন কাজ করার আগে নিজের মখাত্ব নির্ণয় করে নিচ্ছে ।

বাংলাদেশে মখা স্কেল এখনো নিষিদ্ধ । ধারণা করা হচ্ছে মখা স্কেল বাংলাদেশে চালু হলে দেশের প্রধানমন্ত্রীসহ অনেক হোমরা চোমরার মখাটিভিটি বা মখাত্ব গ্রেড সত্তর অতিক্রম করবে । এরকম লোকদেরকে জনগন কোনভাবেই নিজেদের নেতা হিসেবে মানতে চাইবে না ।

জেল সুপারকে দেখা যাচ্ছে হাতে কিছু কাগজ নিয়ে ডঃ আব্দুল্লাহর সেলের দিকে এগিয়ে আসছেন । ওমা একি – তাঁর সাথে তো জাপানের মনোবিজ্ঞানী হাগুতো মুতিয়াটা কে দেখা যাচ্ছে । কাহিনী কি ?

জেল সুপার এসে সালাম দিলেন । ডঃ আব্দুল্লাহ , আপনাকে অভিনন্দন । নোবেল কমিটি আপনাকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দিয়েছে । আপনার আবিস্কারের ফলে সারাবিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে । অপরাধ অনেক কমে গেছে । সবাই তাঁদের মখাত্ব নির্ণয় করে কাজ করায় কাজকর্ম সুচারুরুপে সম্পন্ন হচ্ছে । বিশ্বের অনেক নেতার মখাত্ব গ্রেড সত্তরের ওপরে হওয়ায় তারা অবসর নিতে বাধ্য হয়েছেন । আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আপনার মুক্তির জন্য বাংলাদেশকে চাপ দিয়েছেন । এছাড়া বাংলাদেশেও মখা স্কেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সুপারিশ করেছে । আসুন বেরিয়ে আসুন । বাইরে আপনার জন্য বিশেষ বিমান অপেক্ষা করছে ।

ডঃ আব্দুল্লাহ হতবাক হয়ে গেলেন । বাইরে পা দিয়ে মনের অজান্তে গান গাইতে লাগলেন তিনি-

‘আমরা সবাই মখা আমাদেরই মখার রাজত্বে
নইলে মোদের মখার সনে মিলবে কি সত্বে......’

ভ্রু কুঁচকে গেল জাপানের মনোবিজ্ঞানী হাগুতো মুতিয়াটার । তাঁর কাছে থাকা ‘মখা স্কেল’ লাল বাতি নির্দেশ করছে । গ্রেড সিক্সটি । অবস্থা ভালোনা ।

ব্যাপার দেখে ডঃ আব্দুল্লাহ মুচকি হেঁসে আবার শুরু করলেন-

‘আমরা সবাই মখা আমাদেরই মখার রাজত্বে
নইলে মোদের মখার সনে মিলবে কি সত্বে
আমরা সবাই মখা.........’

...........................
বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর মহা আবিস্কার / ২১-০৭-২০১৩

শুক্রবার, ১৯ জুলাই, ২০১৩

হুমায়ুন কথন

মানিক বন্দোপাধ্যায়ের অন্তত ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পটি যারা পড়েছেন, তারা জানেন তিনি নিম্নবিত্তের জীবনবোধ ও মনস্তত্ব কতটা গভীর ভাবে বুঝতেন । আমি মনে করি শুধুমাত্র ঐ গল্পটিই তাঁকে একজন ‘অসাধারণ’ কথাশিল্পী হিসেবে চিত্রিত করার জন্য যথেষ্ট ।

মানিক বন্দোপাধ্যায় যেভাবে নিম্নবিত্ত শোষিত শ্রেণীর জীবনকে বুঝতেন, হুমায়ুন আহমেদ ঠিক সেভাবেই বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের জীবনধারাকে বুঝতেন । গত কয়েক দশকে তাঁর মত এত সহজ সুন্দরভাবে মধ্যবিত্তের জীবনকে সাহিত্যে তুলে আনতে সম্ভবত কেউ পারেননি ।
তিনি লিখেছেন জীবনের বাস্তবতা নিয়ে, জীবনের রহস্য নিয়ে, জীবনের বৈরাগ্য নিয়ে ।

কেউ ভালোবাসে হিমুকে , কেউ মিসির আলীকে । আর আমি ভালোবাসি ‘মধ্যাহ্ন’ ।
আমি ভালোবাসি ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘নন্দিত নরকে’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘তেঁতুল বনে জোছনা’, ‘নলিনী বাবু বিএসসি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘কবি’ ...... সবকিছুর ওপরে আমি স্থান দেই মধ্যবিত্তের জীবনধারাকে গভীর থেকে সুচারুরুপে তুলে আনার তাঁর অসাধারণ দক্ষতাকে ।

হুমায়ুন আহমেদের লেখাগুলোকে নির্দিষ্ট কোন ক্রাইটেরিয়াতে আবদ্ধ করা সহজ নয় । তাঁর একই লেখায় হাসি কান্না একসাথে খেলা করে । সবকিছু নিয়ে হাসি তামাশা করার এক অসাধারণ বৈশিষ্ট্য তাঁর ভেতর লক্ষ্য করা যায় । আবার হাসির মাঝেই গুরুতর তত্বকথা এবং দর্শনকে তুলে আনতে দেখা যায় । ‘এনায়েত আলীর ছাগল’কে নিয়ে হাস্যরসকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যান, আবার বাকের ভাইকে ফাঁসি দিয়ে মানুষকে বিক্ষুব্ধ করেন ।

হুমায়ুন আহমেদ তাঁর লেখায় সততা বজায় রেখেছেন । তাঁর ভাই জাফর ইকবালের মত অসততা তিনি করেননি । তাঁর কোন লেখায় তিনি কোন ধর্মকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন নি । দাড়ি টুপি ওয়ালা মানেই রাজাকার – তাঁর লেখায় এই মিথ্যাকে তিনি প্রশ্রয় দেননি । বরং ‘জোছনা ও জননীর গল্পে’ একজন ঈমামকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তুলে এনেছেন ।
রাজাকার মানেই যুদ্ধাপরাধী নয়, আবার মুক্তিযোদ্ধা মানেই ফেরেশতা নয়- তাঁর লেখায় এই সত্যটিও স্পষ্টভাবেই উঠে আসে । তাঁর নানা রাজাকার ছিলেন , মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি রাজাকারের আশ্রয়ে ছিলেন - সে কথাও তিনি স্বীকার করেন অকপটে ।

জীবনকে হেসেখেলে কাটিয়ে দিয়েছেন হুমায়ুন । জীবনের শেষবেলায় তাঁর একটা সাক্ষাৎকার নিয়ে বিতর্ক হয়- তিনি আস্তিক নাকি নাস্তিক । আমি এই বিতর্ককে প্রয়োজনীয় মনে করিনা । প্রথম আলো এবং ঐ ধারার মিডিয়া গোষ্ঠীর একটা সাধারণ প্রবণতা হলো- খ্যাতিমান ব্যক্তিদের যেকোনভাবে নাস্তিকতা ও কম্যুনিজমের প্রতি সহানুভূতিশীল প্রমাণ করার চেষ্টা । হুমায়ুন আহমেদের ক্ষেত্রেও তারা সেই প্রচেষ্টা চালিয়েছে ।

ঈমানের ভিত খুব বেশি শক্ত না হলে সাহিত্যিকরা প্রায়শই সংশয়বাদিতায় ভোগেন । তাঁরা মানুষ নিয়ে চিন্তা করেন, মানুষের জীবন নিয়ে ভাবেন, লেখেন । ঈশ্বর নিয়ে কতটা ভাবেন সেটা অজানা । কিন্তু বেশিরভাগ লেখকই দিনশেষে আস্তিক, ঈশ্বরে বিশ্বাসী প্রমাণিত হন ।

সরকারি - বেসরকারি চাকুরে, আইনজীবি, পুলিশ, ডাক্তার, শিক্ষক সবার জীবনকেই তিনি ভালোভাবেই বুঝেছেন । মানুষের চরিত্র বিশ্লেষণের অসাধারণ দক্ষতা ছিল তাঁর ।
‘তেঁতুল বনে জোছনা’র সাইকেল ডাক্তার সবার মন ছুঁয়ে যায় ।
তবে ‘কোথাও কেউ নেই’ এবং ‘আজ রবিবার’ এর ডাক্তার চরিত্রগুলি একটু যেন বেখাপ্পা মনে হয়েছিল ।

‘রুপালি রাত্রি’র নায়িকা ক্যান্সারে মারা গিয়েছিল । ‘চান্নি পসর’ গানটা শুনে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিল । হুমায়ুন কি জানতেন- তাঁকেও একদিন পরাজিত করবে সর্বনাশা ক্যান্সার ?

গুন্টার গ্রাস, অরহান পামুক- আরো অনেক নোবেলবিজয়ীর লেখা পড়েছি । হুমায়ুনের বইগুলি ইংরেজীতে খুব একটা অনুবাদ হয়নি । তাঁর বইগুলি অনুবাদ করা উচিৎ । আমরা বিশ্বাস করতে চাই- একদিন সাহিত্যে নোবেল বিজয়ীদের তালিকায় আমাদের হুমায়ুন আহমেদের নামটাও হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে ।

........................................................
হুমায়ুন কথন / ১৯-০৭-২০১৩

বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৩

দুখু

সুর্য এখনো ওঠেনি । ঠান্ডা বাতাস বইছে । রাস্তায় নামতেই শরীরটা জুড়িয়ে গেল আব্দুল লতিফ বিএসসি সাহেবের ।
সকালবেলা আব্দুল লতিফ সাহেব আধাঘন্টা হাঁটাহাঁটি করেন । মসজিদে ফজরের নামাজ শেষ করে হাঁটতে বের হন । আশেপাশে আধাঘন্টার মত হাঁটেন । কখনো কখনো এক দেড় ঘন্টাও লেগে যায় । এলাকার লোকজনের সাথে দেখা হয় , নানান বিষয়ে কথা হয় । লোকেরা তাঁর সাথে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে পরামর্শ করে । দেশের অতীত ভবিষ্যৎ নিয়েও কথা হয় । রাজনীতি নিয়ে কথা হয় ।

বয়স প্রায় ষাটের কোঠায় । কিন্তু শরীর এখনো শক্তপোক্ত । ছেলেবেলা থেকেই কঠিন পরিশ্রম করে বড় হয়েছেন । এখনো পরিশ্রম করেন । জীবনে কাজ করতে হবে । ভালো কাজের মাধ্যমে জীবন শেষ করাই সার্থকতা । সবাইকে মরতে হবে । কেউ অল্প বয়সে, কেউ বেশি । দুনিয়ায় সবাই সমান পরিবেশ , সমান সুযোগ-সুবিধা পায় না । প্রেসিডেন্ট হওয়াকে কেউ সফলতা মনে করতে পারে । কিন্তু প্রেসিডেন্ট কয়জন হবে ? তাহলে বাকিরা কি ব্যর্থ ?
যতটুকু সময় পাওয়া যাবে, যতটুকু সুযোগ পাওয়া যাবে, ভালো কাজ করে যেতে হবে । ওতেই সফলতা ।

আব্দুল লতিফ সাহেব জেলার সবচেয়ে প্রাচীন স্কুল- পাইলট হাইস্কুলের হেডমাস্টার । তিনি তাঁর মেধা দিয়ে আরো অনেক ওপরে যেতে পারতেন । কিন্তু পরিবারের দিকে তাকিয়ে , ছোট ভাইবোনদের দিকে তাকিয়ে গ্রামেই রয়ে গেছেন ।
হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মাঝে পুরণো দিনগুলির কথা ভাবেন ।

বাবা ছিলেন কৃষক । বাবা বলতেন , আমার ছেলেদের আমি লেখাপড়া শেখাবো । আমার মত কৃষক বানাবো না । সেসময় কাছেপিঠে কোন স্কুল ছিল না । সবচেয়ে কাছের স্কুলটি ছিল বাড়ি থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে । ছোট্ট লতিফকে একদিন বাবা স্কুলে ভর্তি করে দিলেন । স্কুলের কাছে এক গেরস্ত বাড়িতে লজিং এর ব্যবস্থা করে দিলেন । সেখানে তিন বেলা খেতে দেয় । রাতে থাকার জন্য একটা চৌকি । গেরস্ত বাড়ির টুকটাক কাজ করে দিতে হয় । বাবা প্রতি সপ্তাহে এসে দেখে যান । চিড়া মুড়ি দিয়ে যান । মাসে একবার কি দুবার গরুর গাড়িতে করে বাড়ি নিয়ে যান ।

প্রাইমারিতে খুব ভালো রেজাল্ট করেছিলেন আব্দুল লতিফ । সরকারি বৃত্তি পেয়েছিলেন । ছোট্ট আব্দুল লতিফকে নিয়ে বাবা সেদিন এলাকার সবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে দোয়া চেয়েছিলেন , ছেলে যেন অনেক বড় কিছু হয় । সেকথা মনে পড়লে আজও নিজের অজান্তে চোখ ভিজে আসে ।

হাইস্কুলে যেতেন উল্টোদিকে দশ কিলোমিটার দূরে । হেঁটে হেঁটেই যেতে হত , হেঁটেই আসতে হত । ফযরের কিছু পরপরই পান্তাভাত খেয়ে হাটা দিতেন । এলাকার আরো দুএকজন পড়াশোনা করত, কিন্তু বছর খানেক যেতে না যেতেই আর কেউ থাকলো না । তখন একা একাই এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হত ।

আই.এ পাস করার পর পরই বাবা মারা গেলেন । বড় ছেলে হিসেবে সংসারের হাল ধরতে হল । সব পরীক্ষাতে ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছিলেন , বেশ কিছু সাবজেক্টে লেটার মার্কস ছিল । আশা ছিল ভার্সিটিতে ভর্তি হবেন, কিন্তু তা আর হলো না । জেলা শহরের ডিগ্রি কলেজে বিএসসিতে ভর্তি হলেন । অল্প ফি তে স্কুলের ছেলেদের পড়াতে লাগলেন, গণিত , ইংরেজী , পদার্থ, রসায়ন । জমিজমা যা ছিল ধান পাট আবাদ করতে শুরু করলেন ।

বিএসসি পাস করে হাইস্কুলে মাস্টারি শুরু করলেন বিএসসি শিক্ষক হিসেবে । কীভাবে কীভাবে যে জীবনের এতগুলো বছর কেটে গেল – মনে হয় এই সেদিন স্কুল পাস করলেন । সময় এত দ্রুত যায় । এখন তিনিই সেই স্কুলের হেডমাস্টার । ভাবলে মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে ।

ঘেউ ঘেউ শব্দ শুনে পেছন ফিরে তাকালেন হেডমাস্টার সাহেব । দুখু আরেকটা অচেনা কুকুরের সাথে ঝগড়া শুরু করে দিয়েছে । এই এক বদ-স্বভাব তার । অচেনা কুকুরকে তার এরিয়ার ভেতর সে সহ্য করেনা । কুকুরদের একটা স্বভাবই হলো ঝগড়া করা, নিজেদের ভেতর কামড়াকামড়ি করা । এই কাজ না করলে তাদের যেন কিছু হজমই হয় না । এটাকে ডগ হ্যাবিট বা বাংলায় কুত্তা স্বভাব বলা যায় ।

আব্দুল লতিফ সাহেব পাত্তা না দিয়ে সামনে হাঁটতে লাগলেন ।

দুখু আব্দুল লতিফ সাহেবের পোষা কুকুর । সবসময় আশেপাশে থাকে । রাত জেগে বাড়ি পাহারা দেয় । কুকুরটা বেশ বুদ্ধিমান । একবার তো হাতে নাতে চোর ধরিয়ে দিয়েছিল । চোরকে ঘরে ঢুকতে দিয়েছে । কিন্তু পালাতে দেয় নি ।
বাড়িতে পশ্চিম দিকের ঘরটা গোলাঘর । দক্ষিণের ঘরে আব্দুল লতিফ সাহেব ও তাঁর স্ত্রী থাকেন । ঐ ঘরের আলমারিতে গয়না পাতি ছিল । সেদিন তাঁরা সবাই গেছেন এক আত্মীয়ের বিয়েতে । বাড়ি সম্পুর্ণ ফাঁকা । রাতের বেলা চোর এসে সিঁদ কেটে ঢুকেছে । দুখু কোথায় ছিল কে জানে , আশেপাশের কয়েক বাড়ির কুকুর মিলে তারা চোরের ওপর হামলে পড়েছিল । বেচারা চোর পালাতেও পারেনি ।

দুখু নামটা আব্দুল লতিফ সাহেবের দেয়া । বছর সাতেক আগের কথা । তখন পাকা রাস্তা দিয়ে বাস ট্রাক চলাচল করা শুরু হয়েছে । লতিফ সাহেব মোটরসাইকেলে করে স্কুলে যান । একদিন সকালবেলা তিনি স্কুলে যাচ্ছেন । তাঁর চোখের সামনেই ঘটে গেল ঘটনাটা । একটা ট্রাক বেশ স্পিডে চলছিল । হঠাৎ রাস্তার পাশে দিয়ে হেঁটে যাওয়া একটা কুকুর কীভাবে কীভাবে জানি চাপা পড়ে গেল । ঘটনাস্থলেই মারা গেল কুকুরটা । দেখা গেল রাস্তার পাশে একটা কুকুরের বাচ্চা – কালো সাদা ডোরাকাটা শরীর । বাচ্চাটা নিশ্চয়ই ঐ কুকুরটিরই হবে । মা মরা বাচ্চাটাকে দেখে খুব মায়া হলো আব্দুল লতিফ সাহেবের । তিনি একটা ব্যাগে করে বাচ্চাটাকে বাড়িতে নিয়ে এলেন । নাম রেখে দিলেন – দুখু ।

দুখু তখন থেকে সবসময়- যতক্ষণ আব্দুল লতিফ সাহেব বাড়িতে থাকেন আশেপাশে ঘুরঘুর করে । সকালবেলা যখন হেডমাস্টার সাহেব হাঁটতে বের হন , তখনো সে পিছে পিছে হাঁটতে থাকে ।

হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা দূর চলে এসেছেন হেডমাস্টার সাহেব । এর মধ্যে বেশ কয়েকবার মোবাইলে কথা বললেন । উপজেলা শহরে আজ একটা বিক্ষোভ মিছিল হবে । গোটা উপজেলার মানুষজনকে খবর দিতে হবে । সরকার মুসলমানদের ঈমান নিয়ে ছিনিমিনি শুরু করেছে । সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পরিপুর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস – এই কথাটা একজন মুসলমানের ঈমানের মৌলিক কথা । সংবিধানের একটা মূলনীতি হিসাবে এই কথাটি ছিল । কিন্তু সরকার সংবিধান পরিবর্তন করে এই কথাটুকুও তুলে দিয়েছে । এর প্রতিবাদ করা ঈমানদারদের দায়িত্ব । পথে অনেকের দেখা হলো । অনেকের সাথে এই বিষয়ে আলোচনাও করলেন তিনি । বিকালের প্রতিবাদ মিছিলে যাওয়ার জন্য বললেন সবাইকে ।

আব্দুল লতিফ সাহেব পাইলট স্কুলের হেডমাস্টার হিসেবে সবার কাছে শ্রদ্ধার পাত্র । কোন রাজনৈতিক দলের নেতা না হলেও তাঁর প্রভাব অনেক । বিভিন্ন অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে তিনি জনগনকে নিয়ে রুখে দাঁড়ান । একবছর ধরে এই অঞ্চলে টিপাইমুখ বাঁধ বিরোধী আন্দোলন করে যাচ্ছেন তিনি । কোন সমাবেশে তিনি যখন কথা বলেন – জনতা মন্ত্রমুগ্ধের মত শোনে । টিপাইমুখ বাঁধ যে বাংলাদেশের জন্য ফারাক্কার মত আরেকটা মরণফাঁদ , তিনি জনগনকে এটা ভালোভাবেই বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন । হাজার হাজার মানুষের মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্মারকলিপি দিয়ে এসেছেন ।

এবার ঈমান নিয়ে খেলা শুরু হয়েছে । জনগনকে নিয়ে আবার নামতে হবে । সরকারকে বুঝিয়ে দিতে হবে – বাংলাদেশের মানুষ ঈমানদার । ঈমান নিয়ে টানাটানি তারা সহ্য করবে না ।
আব্দুল লতিফ সাহেব ফিরতি পথ ধরলেন । আজ অনেকক্ষণ হাঁটা হয়েছে ।

....................................

বারবার গোঁফে হাত দিচ্ছেন রোস্তম খান । তিনি সরকারি দলের উপজেলা সভাপতি । বোঝা যাচ্ছে, তিনি বেশ টেনশনে আছেন । আগামী সংসদ নির্বাচনে তাঁর এই আসন থেকে প্রার্থী হবার কথা । সেজন্য সব দিকে তাঁকে কড়া নজর রাখতে হচ্ছে । বিশেষ করে সরকার বিরোধী যেকোন ব্যাপার । মৌলবাদীরা অপপ্রচার করে মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলছে । ভারত একটা বড় দেশ । তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের সাহায্য করেছে । তারা তাদের স্বার্থে , চিরশত্রু পাকিস্তান ভাঙ্গার স্বার্থে যুদ্ধে এসেছে সেটা ঠিক । কিন্তু আমাদের সাহায্য তো হয়েছে । এখন তারা কিছু প্রতিদান তো পেতেই পারে । যুদ্ধের পরপর তারা অনেক কিছু লুট করে নিয়ে গেছে । সেটাতো তারা করতেই পারে । এখন তারা উজানে একটা বাঁধ দিচ্ছে- তো দিক না । এই নিয়ে এত চিল্লাফাল্লা করার দরকার টা কি ? বিরোধীদল ষড়যন্ত্র করছে ।

সামনে ট্রানজিট ইস্যু আসছে । ভারত একটু আমাদের দেশের ওপর দিয়ে যাওয়া আসা করতে চায় – এটা এমন খারাপ কি ? বিরোধীদল এসব ইস্যুকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে কাজে লাগাচ্ছে । আর ঐ হেডমাস্টার আব্দুল লতিফ, না বুঝে আন্দোলন করছে । জনগনকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছে । আর জনগন পেয়েছেটা কি তাঁর মধ্যে ? হেডমাস্টার ডাকলেই দেখি সব পিপড়ার মত চলে আসে । শ্লোগান দেয় ।

এবারের ইস্যুটা তো আরো মারাত্মক । সংবিধান পরিবর্তন হয়েছে । আল্লাহর ওপর আস্থা- এই সাম্প্রদায়িক মূলনীতি তুলে দিয়ে সেখানে ধর্মনিরপেক্ষতার মূলনীতি সংযোজন করা হয়েছে । ঠিকই তো আছে । কিন্তু হেডমাস্টার নাকি আবার আজকে মিছিল সমাবেশ করবে । উনি নাকি বলেছেন- এটা মুসলমানের ঈমান নিয়ে খেলা । আরে বাবা- এতে ঈমানের কী হলো ? ঈমান থাকবে মনের ভিতর । সব বিরোধীদলের ষড়যন্ত্র ।

আরো একটা খবর কানে এসেছে রোস্তম খানের । বিরোধীদল নাকি হেডমাস্টারকে দলে নেয়ার চেষ্টা করছে । হেডমাস্টারকে এবার নমিনেশন দিয়ে আসনটা তারা দখল করতে চায় । আর এই হেডমাস্টার দিন দিন বিপদজনক হয়ে উঠছে । উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচনের সময় হেডমাস্টার বিরোধীদলের প্রার্থীকে সমর্থন দিল । অনেক কারচুপি করেও দলীয় প্রার্থীকে জেতানো গেল না ।

রোস্তম খানের অস্থিরতা বাড়তে লাগলো । তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে ঘরের ভেতর পায়চারি করতে লাগলেন । গতকাল রাতেই একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন তিনি । পথের কাঁটা সরিয়ে দিতে হবে । হেডমাস্টারকে আর বাড়তে দেয়া যায় না । এভাবে চলতে থাকলে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী রাজনীতির কবর হয়ে যাবে এখানে । একজনকে খবর দিয়েছেন । জুম্মন গুন্ডা । এতক্ষণে সে চলে আসার কথা । তাকে সবকিছু বুঝিয়ে দিতে হবে । আর বিষয়টা যেন কাকপক্ষীও না জানে । কাজ শেষ করেই সে চলে যাবে । অর্ধেক টাকা এখন পাবে । বাকি অর্ধেক কাজ সমাধা হলে ।

ড্রয়ার খুলে টাকার প্যাকেটটা দেখে নিলেন রোস্তম খান । বেশি কথা বলার দরকার পড়বে না । জুম্মন গুন্ডা পেশাদার । দলের নিজস্ব লোকও বলা যায় । তাকে দিয়ে এর আগেও দলের অনেক নেতাই কাজ করেছে । কাজ সে ভালোই করে ।

দরজায় নক হলো । রোস্তম খান দরজা খুলে জুম্মন গুন্ডাকে ভেতরে নিয়ে এলেন । এই বাসায় কেউ নাই । তাকে বোঝানো শুরু করলেন- আজ বিকেলে ওরা একটা মিছিল করবে । রাতে হেডমাস্টার তাঁর বাড়িতে থাকবে । খোঁজখবর নেয়া আছে । জানালা খোলাই থাকে । জানালা বরাবর তাঁর খাট । খাটে ঘুমন্ত অবস্থায় মাথা বরাবর দুইটা গুলি করতে হবে । বন্দুকের আওয়াজ যেন বেশি না হয় । ঠিক ঐসময় একটা ট্রাক রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবে ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে গেছে বলে । দৌড়ে এসে ট্রাকে উঠলেই শেষ । সোজা ঢাকায় নিয়ে যাবে । ট্রাকের ব্যবস্থা আগেই করা হয়েছে । ওদের কিছু বলতে হবে না । যা বলার আমিই বলে দিয়েছি । বাকি টাকা ট্রাকের ড্রাইভারের কাছে পেয়ে যাবে ।

জুম্মন গুন্ডা টাকার প্যাকেট নিয়ে চলে গেল ।

...........................

গভীর রাত । ডিম লাইটের নীলচে আলোয় হেডমাস্টার আব্দুল লতিফ বিএসসির মুখটা দেখা যাচ্ছে । জানালার দিকে মুখ । পশ্চিম দিকে মাথা দিয়ে ডান কাত করে শুয়েছেন তিনি । রাতের দ্বিতীয় প্রহরের ঘুম খুব গাঢ় হয় । দক্ষিণের জানালা দিয়ে ঝিরিঝিরি বাতাস আসছে । ওই দিকটাতে বাঁশঝাড়, বেশ কিছু আম কাঠাল ও নিম গাছ আছে । সব সময় বেশ ঠান্ডা থাকে । বাতাস পাওয়া যায় ভালোই ।

আজ বেশ ধকল গেছে হেডমাস্টার সাহেবের । বিকেলে গিয়ে দেখেন স্কুল মাঠ লোকে লোকারণ্য । স্কুল মাঠ থেকেই বিক্ষোভ মিছিল শুরু হবে । মাইকের ব্যবস্থাও করেছে লোকজন । তিনি বক্তৃতা করলেন । এই বাংলাদেশ , ঈমানদার মুসলমানদের বাংলাদেশ । তিতুমীর শরীয়তুল্লার বাংলাদেশ । শাহ মখদুম খান জাহানের বাংলাদেশ । এখানে নব্বই ভাগ মানুষ ঈমানদার । এদেশের সংবিধানে ঈমানের কথা থাকতে হবে । দেশের সংবিধান থেকে ঈমানের কথা তুলে দেয়া হয়েছে । এই অন্যায় মানা যায় না । অবিলম্বে সংবিধানে ঈমানের কথা , সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তার প্রতি আমাদের বিশ্বাসের কথা পুনর্বহাল করতে হবে । হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান সবাই আমরা মিলেমিশে থাকব । সবাই যার যার ধর্ম নির্বিঘ্নে পালন করবে । কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিশ্বাসের প্রতিফলন সংবিধানে থাকতে হবে ।

সমবেত মানুষজন গর্জে উঠেছিল । সাগরের ঢেউয়ের মত মিছিল শুরু হয়েছিল । প্রায় ছয় সাত কিলোমিটার মিছিলের সাথে হাঁটতে হয়েছে । পুলিশ এসেছিল বাধা দিতে । এটা একটা বদভ্যাস হয়ে গেছে ওদের । জনগনের আন্দোলনে বাধা দেয় । পুলিশ বাধা দিতে এসেছে শুনে যুবকদের অনেকেই মারমুখি হয়ে উঠেছিল । অনেক কষ্টে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে । হেডমাস্টার সাহেবের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে- বাংলাদেশের মানুষের ঈমানে হাত দিয়ে কেউ টিকে থাকতে পারবে না ।

রাত সোয়া দুইটা । পা টিপে টিপে বাঁশঝাড় থেকে বেরিয়ে এলো জুম্মন গুন্ডা । চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিলো । কেউ কোথাও নেই । পকেট থেকে রিভলবার বের করে চেক করলো । সব ঠিক আছে । ঠিক দুইটা বিশ মিনিটে ট্রাক এসে রাস্তায় দাঁড়ালো । সময় হয়ে গেছে ।

জানালার নিচে দাঁড়িয়ে শিক ধরে মাথাটা উঁচু করলো । হ্যা , হেডমাস্টারের মাথাটা দেখা যাচ্ছে । রিভলবার তাক করে নিশানা ঠিক করে নিল । ট্রিগারে চাপ দিয়ে বসলো জুম্মন ।

সাথে সাথেই মুখ দিয়ে আহ শব্দ বের হয়ে এলো তার । হুড়মুড় করে নিচে পড়ে গেল জুম্মন । ট্রিগারে চাপ দেয়ার সময়ই নিচ থেকে পায়ে কামড় দিয়েছে একটা কুকুর । গায়ে সাদা কালো ডোরাকাটা । গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে গেছে ।

দ্বিতীয় গুলিটা করলো কুকুরটাকে । এটা আর লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো না । গুলি লাগলো কুকুরের পেটে । নাছোড়বান্দা কুকুরটা তবু কামড়ে আছে । গুলি খেয়ে দুর্বল হয়ে গেল কুকুরটা । হাত দিয়ে কোনমতে ছুটিয়ে নিয়ে রাস্তার দিকে দৌড় লাগালো জুম্মন । কিন্তু ট্রাকের কাছে পৌঁছার আগেই আরো পাঁচ ছয়টি কুকুর কোত্থেকে এসে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো । হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল রিভলবার । দুতিনজন লোককেও দেখা গেল লাঠি হাতে বের হয়ে এসেছে । ছুটে আসছে তারা । অবস্থা বেগতিক দেখে ট্রাক ছেড়ে দিল ড্রাইভার । মাটিতে পড়ে গিয়ে কুকুরের কামড় থেকে বাঁচার চেষ্টা করছে জুম্মন ।
....................................

ঝনঝন শব্দে আয়না ভেঙ্গে পড়ায় লাফ দিয়ে উঠলেন হেডমাস্টার সাহেব । বাইরে কুকুরের ঘেউ ঘেউ শোনা যাচ্ছে । আশেপাশের বাড়ি থেকেও লোকজন জেগে উঠেছে । হইচই হচ্ছে । তিনি লাইট জ্বালিয়ে জানালা দিয়ে নিচে তাকালেন । ঐদিক থেকেই এসেছে গুলিটা ।

জানালার নিচে সাদাকালো চেহারাটা দেখেই চিনতে পারলেন তিনি । দুখুর নিথর শরীর পড়ে আছে । রক্তে লাল হয়ে উঠেছে তার দেহ । শিশুর মত ডুকরে কেঁদে উঠলেন আব্দুল লতিফ বিএসসি সাহেব ।

.......................................
দুখু / ১৮-০৭-২০১৩

শনিবার, ১৩ জুলাই, ২০১৩

অমানুষ

শামীমের সামনে কেউ সিগারেট ধরাতে এখন আর সাহস করে না । অথচ দু’মাস আগেও এরকম ছিল না । শামীম বাসায় এলে স্কুলের মাঠে বন্ধুরা বসে আড্ডা দিত । বন্ধুরা একেকজন একেকরকম । স্কুলে সবাই একসাথে পড়েছে, স্কুলের কত কথা কত স্মৃতি । একসাথে কতকিছু করেছে । এখন কেউ ব্যবসা শুরু করেছে , কেউ চাকরি করছে, কেউ কেউ এখনো ভার্সিটিতে পড়াশোনা করছে । একমাত্র শামীমই মেডিকেল কলেজে চান্স পেয়েছিল । ডাক্তার হিসেবে বন্ধুমহলে শামীমের একটা আলাদা অবস্থান আছে । সবাই শামীমকে ভালোবাসে । শামীম একটু চুপচাপ ধরণের ছেলে হওয়ায় সবাই মনে মনে ওকে একটু সমীহ করে ।

শামীম নাকি ডাক্তারি পাশ করে হাসপাতালে ইন্টার্ণশিপ করছিল । কী নাকি ঝামেলা হয়েছে , একমাস থেকে সে বাসায় ।
কাউকে সিগারেট ধরাতে দেখলে শামীমের চোখ কেমন যেন লাল হয়ে ওঠে । রেগে গিয়ে বলে, ওই বেটা, সিগারেট ফেল । নাইলে চান্দি ফাডাই দিমু ।
বন্ধুদের মধ্যে কয়েকজন স্মোকার । তবে রফিক ও আসগর একটু বেশি । চেইন স্মোকার হয়ে গেছে । প্রতি ঘন্টায় একটা করে সিগারেট না ফুঁকলে ওদের চলে না ।
একটু আগে আসগর ভুলে সিগারেট ধরিয়ে ফেলেছিল । শামীম রেগে গেল । ঐ তুই পাইছস কি ? আবার আমার সামনে সিগারেট ধরাইছস । ক্যান, মনে থাকে না ক্যান ?
আসগর মন খারাপ করে উঠে গিয়েছিল । এখন অবশ্য আবার ফিরে এসেছে ।

কদিন আগেও শামীম এরকম ছিল না । শামীমের মত ভদ্র ছেলে ব্যাচে কমই ছিল । চুপচাপ, কথাবার্তা কম বলে । বেশিরভাগ সময় শুধু শোনে । তবে কথা কম বললেও সে সবসময় গ্রুপের বিভিন্ন পরিকল্পনায় অংশ নিত ঠিকই । সেজন্যে তাকে একেবারে আঁতেল ও বলা যেত না ।

শামীমরা বসেছে স্কুলের বারান্দায় । ডেমরার এই স্কুলটি ইদানিং বেশ নাম করছে । রেজাল্ট আগের চেয়ে অনেক ভালো করছে । শামীম, রফিক, আসগর, হেলাল, বকর , রন্টু সবার বাসা স্কুলের এক কিলোর ভেতরেই । ওরা সবাই এই স্কুলের ছাত্র ছিল । একই ব্যাচের ।
শামীম জিজ্ঞেস করলো - রন্টু , জামশেদ স্যারের খবর কিরে ?
আসগর জানালো - জামশেদ স্যার রিটায়ার করেছেন । এখন খুবই অসুস্থ । হাঁটাচলা করতে পারেন না ।

জামশেদ স্যার খুব বদরাগী ছিলেন । ক্লাসে খুব মারধোর করতেন । সপ্তাহে একদিন সবাইকে জামশেদ স্যারের পিটুনি খেতে হত । কিন্তু অবাক করার ব্যাপার ছিল- কেন যেন কেউ স্যারের ক্লাস মিস করত না । ক্লাসের বাইরে স্যার খুব ভালো । একদিন শামীম আর রফিক কী একটা কাজে শাহবাগে গেছে । হঠাৎ দেখে জামশেদ স্যার । তারা চেষ্টা করছিল কীভাবে স্যারের চোখ এড়িয়ে চলে যাওয়া যায় । কিন্তু ততক্ষণে স্যার ওদের দেখে ফেলেছেন । জামশেদ স্যার ওদের ডেকে বললেন, কিরে আমাকে দেখে পালাচ্ছিস কেন ? আমাকে ভয় লাগে তাইনা ? কী খাবি বল । আয় তোদের ফুচকা খাওয়াই ।
স্যার ওদের দুজনকে ফুচকা খাওয়ালেন । তারপর দুটো মাচো আইসক্রিম কিনে দিলেন ।

আরেকদিনের কথা কোনদিন ভোলা যাবে না । রন্টু মাথা ন্যাড়া করেছিল । সেজন্য সে একটা ক্যাপ মাথায় দিয়ে স্কুলে এসেছিল । স্যার দেখে বললেন - কিরে রন্টু , মাথায় ক্যাপ কেন ? ক্যাপ খোল । আমার সামনে ক্যাপ মাথায় দিয়ে বসে আছিস বেয়াদব ।
ক্লাসে কয়েকজন ছেলে মাথায় টুপি পড়ে আসত । ওদের একজনের দিকে আঙ্গুল তুলে রন্টু বলেছিল – স্যার , ওদেরও তো মাথায় টুপি আছে । ওদেরকে তো খুলতে বলেন না । তাহলে আমাকে বলছেন কেন ?
স্যারের কী হল কে জানে, স্যার বেত হাতে এগিয়ে এসে রন্টুকে পেটাতে লাগলেন । রন্টুটাও শক্ত হয়ে থাকলো । তেমন একটা আহা উহু পর্যন্ত করলো না । স্যার কিছুক্ষণ পিটিয়ে চেয়ারে গিয়ে বসলেন । পুরো ক্লাস তো থ ।
খানিক বাদে রন্টু স্যারের কাছে গিয়ে ক্যাপটা খুলে টেবিলে রাখল । হঠাৎ স্যারের পায়ে হাত দিয়ে কেঁদে ফেললো । স্যার আপনাকে অনেক ভালোবাসি স্যার । বেয়াদবি করে থাকলে মাফ করে দিবেন স্যার ।
জামশেদ স্যারও হু হু করে কেঁদে উঠলেন । জামশেদ স্যারের মত মানুষ এভাবে কেঁদে ফেলবে শামীমরা কোনদিন ভাবেনি । জামশেদ স্যারের নতুন নাম হলো ‘নারিকেল স্যার’ । নারিকেলের খোলসটা শক্ত , কিন্তু ভেতরে সুস্বাদু পানি ।

শামীম বললো- স্যারের বাসার ঠিকানা কেউ জানিস ? স্যারকে দেখতে যাবো ।

পরদিন স্যারের বাসায় গিয়ে স্যারকে দেখে আসলো শামীমরা । স্যার ওদের দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন । সবার খোজখবর নিলেন । অতীতের অনেক স্মৃতিচারণ করলেন । স্যার অনেকটা নিঃসঙ্গ মানুষ । শামীমদের পেয়ে যেন ছাড়তেই চাচ্ছিলেন না । ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল ।

রন্টু শামীমকে ছাড়লো না । বললো – দোস্ত চলনা একটু বসি কোথাও । তোর সাথে একটু আলাপ করি ।
বন্ধুদের গ্রুপের ভেতরেও শামীমের সাথে রন্টুর সম্পর্কটা একটু বেশি গভীর । নিজের অনেক কথা তারা দুজনে শেয়ার করে । মনের কথা ।
শামীমের আচরণ নিয়ে রন্টু বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছিল । শামীম একমাসের মত বাসায় বসে আছে । প্রথমে স্বাভাবিক মনে হয়েছিল । কিন্তু এখন মনে হচ্ছে কোন বড় ধরণের কারণ আছে ।
ওরা দুজনে একটা ফাঁকা জায়গায় এসে একটা দেয়ালের ওপর বসলো । এই দিকটাতে অনেকেই প্লট কিনে সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রেখেছে ।
শামীম বুঝতে পারছিল রন্টু কী জানতে চায় । কিছু কিছু সময় কেউ কিছু না বললেও সবকিছু স্পষ্ট টের পাওয়া যায় ।

.................................

শামীম মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে নতুন একটা পরিবেশ পেয়েছিল । অনেক বড় হোস্টেল । একসাথে কত ছেলে থাকে । হোস্টেলের ভেতরেই মসজিদ, ক্যান্টিন , রিডিং রুম , লাইব্রেরি , কমন রুম । হোস্টেলের সামনে ব্যাডমিন্টন খেলার কোর্ট, ভলিবলও খেলা যায় । শর্টপিচ ক্রিকেটও খেলা যায় । ক্রিকেট অবশ্য হোস্টেলের করিডোরেই খেলত ওরা । বল তিনতলা থেকে নিচে পড়লেই আউট । সবসময় একটা আনন্দমুখর পরিবেশ । হোস্টেলের ছাদটা শামীমের খুব প্রিয় জায়গা ছিল । বিকেলে এবং রাতে একবার করে ছাদে ওঠাটা তার রুটিনে পরিণত হয়ে গিয়েছিল । পুর্ণিমা রাতগুলো যেন শামীমের হৃদয়টা শুন্য করে দিয়ে যেত । ঘণ্টার পর ঘন্টা ছাদে শুয়ে কাটিয়ে দিত শামীম আকাশের দিকে তাকিয়ে । হোস্টেলের পাশের কিছু গাছে হুতুমপেঁচা এসে বসতো । হুতুমপেঁচার ডাকে গা ছমছম করে উঠতো । কিন্তু হুতুমপেঁচা না ডাকলে ভালোও লাগত না ।

সবকিছুই ভালো, শুধু একটা বিষয় শামীমের খারাপ লাগত । ছাত্রদের মধ্যে কত বিভেদ । রাজনীতির কারণে হোস্টেলের এত সুন্দর পরিবেশ মাঝে মাঝে বিষাক্ত হয়ে ওঠে । ছাত্ররা মারামারি করে । একদল আরেকদলের ওপর অত্যাচার করে । বই-পুস্তক কাপড়-চোপড় পুড়িয়ে দেয় । সরকারদলীয় সংগঠনের ছেলেরাই বেশি অত্যাচার করে । বিরোধী দলের ছেলেরা মার খায় ।

অনেক সংগঠন আছে । কেউ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে, কেউ ইসলামের আদর্শ বাস্তবায়নের কথা বলে, কেউ সমাজতন্ত্রের কথা বলে, কেউ বলে রাজনীতির দরকার নাই- নামাজ রোজা করবো, সরকারের কথামত চলবো । ব্যস । দুনিয়া আখেরাত উভয় জায়গাতেই সুবিধা ।
শামীম সবাইকে পর্যবেক্ষণ করে । কথা ও কাজে মিল দেখে । সালভাদর আলেন্দে পাঠাগার থেকে বই নিয়ে কম্যুনিস্টদের তত্ব পড়ে । আবার ইসলামপন্থিদের পাঠাগার থেকে বই নিয়ে পড়ে । নিজের মত করে দুইটার ভেতর পার্থক্য করার চেষ্টা করে । কোনটা সঠিক বোঝার চেষ্টা করে । বই নিয়ে সহপাঠি, সিনিয়র দুএকজনের সাথে মাঝে মাঝে আলোচনা হয় ।

শামীম দেখে – যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলছে তাদের কোন সাহিত্য নাই । এরা সুবিধাবাদী । সরকারের পক্ষে কথা বলে সুবিধা নেয়াই উদ্দেশ্য । চাঁদাবাজি, মাদকাসক্তি, লবিং করে পাস করা এসবই তাদের কাজ । আবার সরকার পরিবর্তন হলে এদের চেতনা উলটে যায় ।
সেই তুলনায় কম্যুনিস্ট এবং ইসলামপন্থিদের চিন্তাধারা অনেক উন্নত । তাদের একটা সুনির্দিস্ট আদর্শ আছে । আচার ব্যবহারের দিক থেকেও তারা উন্নত ।

মুসলিম হিসেবে এমনিতেই ইসলামকে পুর্নাংগ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে জানতো শামীম । কিন্তু ইসলামের অর্থনৈতিক সমাধান, রাজনৈতিক কাঠামো , সামাজিক শৃংখলার বিধান এইসব বিষয় নিয়ে খুব একটা ধারণা ছিল না । বই পড়ে পড়ে সেসব বিষয় সম্পর্কে জানার পরিধি বাড়তে লাগলো । কার্ল মার্ক্সের অর্থনৈতিক চিন্তাধারার চেয়ে ইসলামের সমাধান তার কাছে মনে হলো বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ । একজন মুসলিম হিসেবে গর্ব করার মত মানসিকতা তৈরি হল ধীরে ধীরে । স্থায়ী শান্তির জন্য ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে তার কোন সন্দেহ থাকলো না । স্বাভাবিকভাবেই মনে মনে ইসলামপন্থী সংগঠনের প্রতি সমর্থন তৈরি হলো তার ।

রাজনৈতিক ভাবে সে ততটা সক্রিয় হয় নাই । মাঝে মাঝ দুয়েকটা মিছিলে – র্যা লিতে গেছে । পেছনে থেকেছে । এতটুকু সমর্থন না দিলে ঈমান নিয়ে সন্দেহ তৈরি হত তার ।

পাঁচ বছরের ক্যাম্পাস লাইফে কখনো কারো সাথে ঝগড়া ঝাটি তো দূরে থাক, কটু কথাও বলে নি শামীম । সিনিয়র জুনিয়র সবার কাছে সে ছিল একজন শ্রদ্ধার পাত্র । নিরীহ, ভদ্র, শান্তশিষ্ট ছাত্র হিসেবে সবাই তাকে ভালবাসত ।

একসময় পাস করে ইন্টার্ণশিপ শুরু করে শামীম । এদিকে সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন ও সরকারী বাহিনীর ব্যাপক অত্যাচারে কোণঠাসা হয়ে পড়ে ক্যাম্পাসের ইসলামপন্থি সংগঠনটি । তারা ক্যাম্পাস ছাড়া হয় । ডাক্তার হিসেবে শামীম হাসপাতালে দায়িত্ব পালন চালিয়ে যেতে থাকে । হোস্টেলে সে আর থাকে না । তিন-চারজন ডাক্তার মিলে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে । ব্যাচেলর ডাক্তার ।

সেদিন ইভেনিং শিফটে ডিউটি ছিল শামীমের । ডিউটি শেষ করে মোবাইলটা অন করেছে । ডিউটিতে এত চাপ থাকে –রোগীর ভিড় । মোবাইল খোলা রাখলে ঝামেলা হয়ে যায় । মোবাইলটা অন করেছে ফেসবুকে একটু ঢুঁ মারবে । এরই মাঝে এক বন্ধু কল দিল । কথা বলতে বলতে সিঁড়ি দিয়ে নামলো শামীম । লবিতে নেমেছে , এমন সময় সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা , দুইজন শামীমেরই ব্যাচমেট শামীমকে ধরে ফেললো । সোহেল এবং মফিজ । মোবাইলটা কেড়ে নিল । তাকে টেনে নিয়ে গেল ক্যাম্পাসের একটা অন্ধকার কোণে ।

রাজাকার, মৌলবাদী , ছাগল এগুলো সহ অনেক অকথ্য অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করতে লাগলো । লাঠি দিয়ে পেটাতে লাগলো । একজন এসে দাড়ি ধরে বললো – ‘শালা ছাগলের মত দাড়ি রাখছে, পুরাই ছাগু’ ।
ইট দিয়ে মুখেও মারলো তারা, লাঠি দিয়ে গুতা দিল । নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিল- দাড়িওয়ালা ছাগু পিটিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাস্তবায়ন করছিল ওরা ।

শামীম দাতে দাঁত চেপে সহ্য করার চেষ্টা করেছিলো । সারা শরীরে অসহ্য ব্যথা । মাথা ঘুরছে । দুপুরে বাসায় খেয়ে এসেছিল হাসপাতালের ওয়ার্ডে । আট ঘণ্টা কিছু খায় নি । একের পর এক রোগী এসেছিল সেদিন । ভর্তি করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে করতে নাস্তা করারও সুযোগ হয়নি । ক্ষুধায় এমনিতেই শরীর নেতিয়ে আসছিল ।

জুনিয়র ব্যাচের একজন হিন্দু ছাত্র, সেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করতে এলো জ্বলন্ত সিগারেট হাতে । দুজন মিলে জাপ্টে ধরে রাখলো শামীমকে দেয়ালের সাথে । সিগারেটের আগুন এগিয়ে আসতে লাগলো শামীমের চোখের সামনে । শামীম চোখ বন্ধ করলো । ধীরে ধীরে গালের ওপর চেপে বসলো আগুন । শামীমের সারা শরীর ঝাকুনি দিয়ে কেঁপে উঠলো

কথা বলতে বলতে শামীমের গলা ভারী হয়ে আসে । রন্টুর চোখে পানি । এতক্ষণ সে বাকরুদ্ধ হয়ে শুনছিল প্রিয় বন্ধুর ওপর অত্যাচারের কাহিনী । আকাশে চাঁদ উঠেছে । চাঁদের আলো এসে পড়েছে শামীমের মুখে । অস্পষ্ট আলোতেও শামীমের মুখের কালচে দাগটা স্পষ্ট দেখতে পেল রন্টু । আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে দুজনেই চুপচাপ বসে রইলো ।

একটু পরে শামীম নীরবতা ভেঙ্গে ধরা গলায় বলতে লাগলো- দোস্ত, এখন কারো মুখে সিগারেট দেখলে সেই দৃশ্যটা চোখে ভাসে । সহ্য করতে পারিনা । মনে প্রতিশোধের আগুন জ্বলে ওঠে । একদিন আমি ওদের গালেও সিগারেটের ছ্যাকা দেব । বুঝিয়ে দেব, কেমন লাগে ।

........................

একবছর পর ।
শামীম আবার হাসপাতালে কাজে যোগ দিয়েছে । রোগীদের সেবা করে যাচ্ছে পরম মমতায় । সরকার পরিবর্তন হয়েছে । মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সৈনিকরা এখন চেতনা ভুলে গেছে । অনেকেই ক্যাম্পাস ছেড়ে পালিয়েছে ।

শামীম নাইট ডিউটিতে যাওয়ার জন্য হাসপাতাল কম্পাউন্ডে ঢুকেছে , একজন জুনিয়র খবর দিল- ভাইয়া, বিজয় কুমারকে পাওয়া গেছে । ঐযে আপনাকে মেরে সিগারেটের ছ্যাকা দিয়েছিল । সে গোপনে ক্যাম্পাসে ঢুকেছে লিয়াজো করার জন্য । যেখানে আপনাকে মেরেছিল, সেখানেই ওকে নিয়ে গেছে জুনিয়ররা ।
শামীম যন্ত্রচালিতের মত সেদিকে এগিয়ে চললো । তার মাথায় ভোঁতা যন্ত্রণাটা ফিরে এলো । মুখের কালো দাগটা এখনো আছে । নিজের অজান্তে হাতটা চলে গেল সেখানে । ব্যাগের পকেটে হাত দিয়ে দেখে নিল, সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটারটা ঠিকমত আছে কিনা । শামীম তার ব্যাগে সবসময় একটা লাইটার আর এক প্যাকেট সিগারেট রাখে । একদিন এটা কাজে লাগাবে । হয়তো আজই সেই দিন ।

শামীম গিয়ে দেখে সেই সন্ত্রাসীটাকে জুনিয়ররা ঘিরে রেখেছে । চড় থাপ্পড় মারছে । সে সবার পায়ে পড়ে মাফ চাচ্ছে ।
শামীমকে দেখে সে কেঁদে উঠলো । শামীম ভাই, আমারে মাফ কৈরা দেন ।
একজন বললো , তখন মনে আছিলো না ? শামীম ভাইর মত মানুষকে তুই সিগারেটের ছ্যাকা দিছিলি । এই ছিল তোদের মুক্তিযুদ্ধ ? দশজনে মিলে একজনরে ধইরা আইনা খুব মুক্তিযুদ্ধ করছিলি না ? তোরা মুক্তিযুদ্ধকে অপমান করেছিস ।
মুক্তিযুদ্ধ হইছিল অন্যায়-জুলুমের বিরুদ্ধে । আর তোরা মুক্তিযুদ্ধের নাম বেইচ্যা জুলুম অত্যাচার করছিস ।
শামীমের মুখ শক্ত হয়ে ওঠে । চোখ লাল হয়ে উঠছে । লাইটার জ্বালিয়ে সিগারেটে আগুন ধরিয়েছে । এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সন্ত্রাসী বিজয় কুমারের মুখের দিকে । ঠিক যেভাবে সে একদিন সিগারেটের আগুন এগিয়ে এনেছিল শামীমের মুখের দিকে । দৃশ্যটা শামীম এখনো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে ।

জ্বলন্ত সিগারেট বিজয় কুমারের মুখের সামনে নিয়ে থেমে গেল শামীম । এক মুহুর্ত চিন্তা করলো সে । তারপর সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে দিল ।
মুখটা বিকৃত করে উচ্চারণ করলো – কুত্তার বাচ্চা কুত্তা ।

শামীম উঠে দাঁড়ালো । এ কাজ সে করতে পারবে না । তার মনে হলো- এই শয়তানটার উপযুক্ত শাস্তি হওয়া দরকার , এর মুখে সিগারেটের ছ্যাকা দেয়াই দরকার । কিন্তু শামীমের পক্ষে সেটা সম্ভব নয় । এই শয়তানটা সেই কাজটা করেছিল । আসলে এদের মত অমানুষ শয়তান ছাড়া আর কেউ এমন কাজ করতে পারে না ।

....................................
অমানুষ / ১৩-০৭-২০১৩