এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...

এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে

রবিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৩

ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে ডাক্তার গ্রেপ্তার



ঢাকার পল্লবী থানার এক এসআই অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তির পর মারা গেছেন । এরপর পুলিশ ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে তৎক্ষণাৎ কর্তব্যরত দুইজন ডাক্তারকে আটক করে নিয়ে গেছে ।
এই হলো বিভিন্ন পত্রপত্রিকার খবর । খবর পড়ে প্রথমেই আমার যেটা মনে হলো- ‘বেকুব কোথাকার’ ! এই কাজের মাধ্যমে বেকুব পুলিশের দল তাদের ‘বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু’কে ত্বরান্বিত করলো ।
ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে কথা বলে তো লাভ নাই, দেশে এটা এখন পুলিশের বানিজ্যের সবচেয়ে বড় খাত – যে কাউকে ধরে নিয়ে গিয়ে মামলা দেয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় । চাহিদামাফিক টাকা না দিতে পারলে মামলা দায়ের । অথচ বিচারের নিয়ম অনুযায়ী আগে মামলা হবে, এরপর আদালতে তথ্য-প্রমাণ দাখিল করার পর আদালত নির্দেশ দিলে তবেই আটক করা যাবে । কিন্তু এটা আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশ, এখানে এসবের বালাই নেই ।
বিনা ওয়ারেন্টে তৎক্ষণাৎ আটকের মাধ্যমে এই মেসেজটা ডাক্তারদের কাছে পৌঁছে গেল, পুলিশ রোগী ‘সাবধানে’ ডিল করতে হবে । আর সাবধানে ডিল করার সবচেয়ে সরল অর্থ হলো – ‘আপন পরান বাঁচা’ । রোগী যদি পুলিশ হয়, তাহলে যেকোন উপায়ে রোগীকে ট্রান্সফার করো । রোগীর অবস্থা  খারাপ, এখানে ব্যবস্থা নাই- উন্নত চিকিৎসার জন্য অমুক হাসপাতালে নিয়ে যান । বলে রেফার টু সামহোয়ার এলস ।
এভাবে পুলিশের রোগী এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরতেই থাকবে । ডাক্তার ব্যস্ত থাকবেন চিকিৎসার চেয়েও প্রটোকল মেইনটেইনের দিকে । ফলাফল- বিনা চিকিৎসায়, হয়তো পথেই মৃত্যু । এবার তো আর অভিযোগ করতে পারবেন না !
কয়েকদিন আগে আমার এক স্যারের (মেডিসিন বিশেষজ্ঞ) কাছে একটা কাগজ এলো । এক পুলিশ কর্মকর্তা উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হন নাই, তিনি চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলেছেন একজন কার্ডিয়াক সার্জনের বিরুদ্ধে । তার তদন্ত করতে হবে । বেঁচে আছে বলে হয়তো মামলাতেই ক্ষান্ত, মারা গেলে নিশ্চয়ই এতদিনে বেচারা কার্ডিয়াক সার্জন থানা হাজতে গান গাইতেন !
সাংবাদিকরা তো আগেই চলে গেছে ঐ খাতায়, এবার পুলিশও যাচ্ছে । ওরা ভাবে- নিজেদের বেশি চালাক । কিন্তু আসলে তারা যে এই অনিয়মের মাধ্যমে নিজেদেরই দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি করছে- বেকুবগুলা এইটা হয়তো কোনদিনই বুঝবে না ।
ব্যক্তিগত জীবনে যত খারাপই হোক- কোন ডাক্তারই চাননা তার দায়িত্বে থাকা রোগী মারা যাক । সেজন্য সব ডাক্তারই রোগীর জীবন রক্ষায় আপ্রাণ চেষ্টা করেন- যতটুকু সামর্থ-সুযোগ থাকে তার ভেতরে থেকে ।
শুনেছিলাম, পুলিশের বুদ্ধি নাকি থাকে হাঁটুতে । এখন তো দেখছি তারও নিচে ! সামান্য ঘিলুও যদি মাথায় থাকে, তাদের উচিৎ হবে মাফ চেয়ে ডাক্তারদের ছেড়ে দেয়া । এরপর চাইলে তারা আইনের স্বাভাবিক পন্থায় যেতে পারেন ।

[‘ভুল চিকিৎসা’ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়ার জন্য আগ্রহী পাঠক বহুদিন আগে লেখা আমার এই পোস্টটিও পড়ে দেখতে পারেন:  status-https://www.facebook.com/muhsin.abdullahmu/posts/3321779337205 অথবা note- http://goo.gl/bG8IP8 ]

শনিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৩

এক জোড়া চোখ

বাসের ভাড়া দেয়ার জন্য মানিব্যাগের ভাজ খুলতেই মুখের ছবিটা চোখে পড়লো । সবসময় তাই হয় । হবেই না কেন ? ছবিটা তো সেখানে রাখা হয়েছে সেজন্যেই ।
চোখ দুটি অসাধারণ । অসাধারণ না হলে কি ডাঃ আব্দুর রহমানকে টানতে পারতো ?


ভাড়া মিটিয়ে দেয়ার পরও কিছুক্ষণ ছবির দিকে তাকিয়ে থাকলেন ।
- ভাই কোথায় যাবেন ? জিজ্ঞেস করলেন পাশে বসা যাত্রী ।
- উম্ম... যাবো হালিশহর । আপনি ?
- আমি যাবো সামনে । ভাইসাহেব কী করেন ?
- আমি একজন ডাক্তার ।
- ও তাই নাকি ? কিসের ডাক্তার ?
- কিসের ডাক্তার মানে ! ও হ্যা, চোখের ডাক্তার ।
- ও । তাহলে তো ভালোই হলো । জানেন আমার এক কলিগের চোখে সমস্যা ছিল । সে অবশ্য চোখে চশমা পরে । ওদের ফ্যামিলির প্রায় সবাই চশমা পরে । আমাদের অফিসের সবার মধ্যে ঐ কলিগ সবচেয়ে ভালো । অবশ্য সবসময় চুপচাপ থাকে । ভাইবোনদের মধ্যে সেই বড় । তার ছোট ভাই চিটাগাং ভার্সিটিতে পড়ে । আজকে এসেছিল অফিসে, অনেকক্ষণ কথা হলো .....

মনে মনে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিলেন ডাঃ আব্দুর রহমান । এই লোক দেখি মহা ঝামেলার । চেনা নেই শোনা নেই অনর্গল কথা বলা শুরু করেছে । নিজের কথা বললে তাও ঠিক ছিল, তার কোন এক কলিগের গল্প শুরু করেছে । ঐ কলিগ কে না কে , তার সম্পর্কে এত কথা আরেকজনকে বলার মানে কী ? কমনসেন্স থাকা দরকার ।

তবুও বিরক্তি প্রকাশ করলেন না । শ্রোতা হিসেবে তিনি ভালো । মানুষের কথা মন দিয়ে শোনেন । কথা বললে মন হালকা হয় । বেশি কথা বলা খারাপ । কিন্তু যদি কেউ কথা বলে আরাম পায়, তাকে সে সুযোগ দিতে চান আব্দুর রহমান । এতে অবশ্য বিপত্তিও কম হয় না । চেম্বারে মাঝে মাঝে কিছু রোগী তার আসল সমস্যা না বলে এমনভাবে কাহিনী বলা শুরু করে, ধৈর্যহারা হতে হয় । ধৈর্য রাখার উপায়ও নেই, অন্য রোগীদের কথাও তো শুনতে হবে ।

বেশি বিরক্ত হতে হলো না । পরের স্টপেজেই নেমে গেল লোকটা ।
ডাক্তার পরিচয় দেয়াটা একটা বিপত্তিকর ব্যাপার । লোকজন ডাক্তার পরিচয় পেলেই নিজের , আত্মীয়-স্বজনের যার যত রোগ আছে সব রোগের চিকিৎসা জানতে চায় । রাস্তাঘাটেই চিকিৎসা নিয়ে নিবে এমন ভাব । বেশিরভাগ কথাবার্তাই ঘুরেফিরে আসে- আমার এই সমস্যা, কী করি বলেন । আমার বউয়ের এই সমস্যা , কী করি বলেন ।

আজ থেকে নতুন একটা চেম্বারে বসা শুরু করবেন ডাঃ আব্দুর রহমান । একটা ছোট ক্লিনিক ও কনসাল্টেশন সেন্টার । ওখানে মোটামুটি সেটআপ আছে চোখের সমস্যা ডায়াগনোসিস করার । চিকিৎসা করার । সার্জারিতে পড়াশোনা করার এই একটা অসুবিধা , শুধু জ্ঞান আর দক্ষতা থাকলেই হবেনা । চিকিৎসার জন্য বিশেষ সেটআপ লাগবে । ওটি লাগবে । মেডিসিন বিভাগের ডাক্তারদের মত একটা স্টেথো, কলম, প্যাড দিয়েই ডাক্তারি করা যায় না । মেডিসিন ডাক্তারের একটা কলম হলেই চলে – কাটাকুটির ঝামেলা নাই । রোগ নির্ণয় করো, কাগজে চিকিৎসা লিখে দাও । ব্যস । বাকিটা রোগীর দায়িত্ব ।

প্রথম প্রথম সবার মত আব্দুর রহমানেরও ইচ্ছা ছিল মেডিসিনে পড়ার । এমবিবিএস ফাইনাল পরীক্ষা দেয়ার পর পর হঠাৎ করেই ইউটার্ণ করে সিদ্ধান্ত নিলেন সার্জারিতে পোস্টগ্রাজুয়েশন করে বিশেষজ্ঞ হবার । আর সেটা চোখের সার্জারি ।

এখনো মাঝে মাঝে মনে পড়ে সেই সময়টার কথা । চোখ নিয়ে পড়ার – বিশেষজ্ঞ হবার ইচ্ছের পেছনে ছিল এক জোড়া অসাধারণ চোখের আকর্ষণ । সে আকর্ষণ এখনো তাঁকে মুগ্ধ করে রেখেছে । মানুষের একজোড়া চোখে কী করে এত আকর্ষণী শক্তি থাকে ?

আগে থেকেই তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল- এমবিবিএস পাস করা মাত্রই বিয়ে করবেন । এ ব্যাপারে তাঁর স্পষ্ট ধারণা ছিল । এস্টাবলিশ হবার পর বিয়ে করার ধারণা- আসলে একটা মরিচীকা । এস্টাবলিশ হওয়া বলতে কী বোঝায় ? একটা সাধারণ বিষয়ে পড়াশোনা করা ছেলের জন্য একটা ভালো চাকুরিতে জয়েন করা মানে এস্টাবলিশ হওয়া । কিন্তু একজন ডাক্তারের জন্য তা নয় । একজন ডাক্তারের এস্টাবলিশ হওয়ার অর্থ এফসিপিএস, এমডি পাস করে বিশেষজ্ঞ হওয়া । আর সেটা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার । সব শেষ করতে বয়স কমপক্ষে ত্রিশ থেকে পয়ত্রিশে চলে যায় । ত্রিশ বছর বয়স মানে অর্ধেক জীবন শেষ হয়ে গেছে যদি গড় আয়ু ষাট বছরও ধরা হয় । নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে ... কিন্তু ততদিনে ...

এই কিছুদিন আগেও সদ্য পাস করা এক জুনিয়র এসেছিল দেখা করতে । কথা বলতে বলতে বিয়ের প্রসঙ্গ এসেছিল । তিনি একটা মোক্ষম যুক্তি তুলে ধরলেন । হয় তুমি ত্রিশের আগেই বিয়ে করো , নাহলে আর বিয়ে করোনা । তুমি ৩৫-৪০ বছর বয়সে বিয়ে করে ছোট বাচ্চা রেখে একদিন টুপ করে মরে যাবে । তোমার কোন অধিকার নেই ইচ্ছাকৃতভাবে কোন শিশুর জীবনটা কষ্টে ফেলে দেবার ।

ফাইনাল পরীক্ষার পরেই খোঁজ শুরু করলেন পাত্রীর । পাত্রী দেখতে গিয়ে তিনি আর কিছু নয় - চোখের প্রেমে পড়ে গেলেন । একজোড়া চোখ যেন তাঁকে চুম্বকের মত টেনে নিতে চাইছিল । নামটাও ‘আঁখি’ । 
অসাধারণ চোখের জন্যেই কি নাম ‘আঁখি’ ! সেই চোখের আকর্ষণ এড়ানো সম্ভব ছিল না তাঁর পক্ষে । চোখে চোখে কথা হয়ে গেল । বিয়েটা করে ফেললেন একদিন । সিদ্ধান্তটাও চুড়ান্ত করলেন, চোখ নিয়েই পড়াশোনা করবেন আরো । হবেন চক্ষু বিশেষজ্ঞ । আজ তাঁর স্বপ্ন পুরণের পথে । এই কষ্টকর অধ্যাবসায়, পরিশ্রমের পথে তাঁকে সবসময় সাহস যুগিয়েছে আঁখি । আঁখির একজোড়া চোখ ।

সেই থেকে চোখে চোখে কথা চলছে । মানিব্যাগের ভেতর সুন্দর একচিলতে হাসিসহ সেই চোখ দুটোর ছবি সেই যে ঢুকিয়েছেন, আজো আছে । সংসারে এসেছে আরো একজোড়া চোখ । ঠিক যেন মায়ের মতই চোখ পেয়েছে মেয়েটাও ।

ভাবতে ভাবতে বাস থেকে নেমে তাঁর নতুন চেম্বারের সামনে চলে এসেছেন ডাঃ আব্দুর রহমান । উপরে একটা চকচকে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে । নামের একপাশে বড় করে একজোড়া সুন্দর চোখের ছবি আঁকা । সাইনবোর্ডের চকচকে চোখের ভেতর থেকেই যেন সেই একজোড়া চোখ উঁকি দিয়ে বলছে- দাঁড়িয়ে দেখছ কি ? ভেতরে যাও ।

ডঃ আব্দুল্লাহর চা- বিদ্বেষ

ডঃ আব্দুল্লাহ মূলত চিকিৎসাবিজ্ঞানী হলেও এবার তিনি ভাবলেন – অর্থনীতি নিয়ে লিখবেন । কারণ অর্থনীতির সাথে অনেক কিছুই জড়িত । দেশের অর্থনীতি উন্নত হলে সবকিছুই উন্নত হবে ।
কী লিখবেন ? এ নিয়ে বেশ কিছুদিন চিন্তা করে অবশেষে তিনি সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হলেন । মোক্ষম শিরোনাম দিলেন ‘চা পান বন্ধ করুন’ ।
তিনি প্রথমেই তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর । কবি নাকি লিখেছিলেন-
ওহে চৈনিক,
চা খাবে দৈনিক ।  
গায়ে বল হলে পরে,  
তবে হবে সৈনিক !!

এইটা কেমন কথা ? চা খেলে গায়ে বল হবে এই কথা কে বললো ? কোন বিজ্ঞানীও যদি বলে থাকে , তবে সে বেকুব বিজ্ঞানী । চৈনিক দের উদ্দেশ্যে লিখলেও চীনা ভাষায় এই লেখার অনুবাদ হয়েছে কিনা সেরকম কোন তথ্য নেই । অনুবাদ হলে কেমন হতো ? চ্যাং চুং প্যাং পুং ছাড়া আর কী হবে !

কিন্তু এইযে চা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মত কবি লিখে গেলেন, তিনি কি ভেবেছিলেন বাঙ্গালিদের ওপর এর প্রতিক্রিয়া কত খারাপ হতে পারে ?
কবি সাহিত্যিকদের এই এক সমস্যা । এরা নিজেরা অলস, আর কীসব হাবিজাবি লেখে- দেশের অর্থনীতির ওপর তার প্রতিক্রিয়া কী হবে সেটা নিয়ে চিন্তা করেনা ।
আজ যদি বাঙালিরা চা না খেত, তাহলে দেশের কত টাকা বেঁচে যেত ! ডঃ আব্দুল্লাহ তাঁর প্রবন্ধে খুব গুরুত্বের সাথে এই তথ্যটা তুলে ধরলেন । চা-খাদক দের তিনি ‘অপচয়কারী’ ও ‘জাতির শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করলেন ।
বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ । এদের মধ্যে কমপক্ষে পাঁচ কোটি মানুষ চা খায় । অনেকে আবার দিনে কয়েক কাপ করে খায় । গড়ে প্রতিদিন ২০ কোটি কাপ চা খায় বাংলাদেশের মানুষ । চায়ের দোকানগুলো আসলে একেকটা অলসের আড্ডাখানা !
প্রতি কাপ চায়ের দাম কত ? ৫ টাকা করে ধরলে প্রতিদিন ১০০ কোটি টাকা চা খেয়ে নষ্ট করছে বোকা বাঙালি । এক বছরে ৩৬৫ দিন । তাহলে বছরে ৩৬৫০০ কোটি টাকা শুধুমাত্র চা খেয়ে নষ্ট করছে বাংলাদেশের মানুষ । উফ ! যা-তা কথা ? ৩৬৫০০ কোটি টাকা ! এটা তো বাংলাদেশের মোট বার্ষিক বাজেটের ৫ ভাগের এক ভাগ !
যদি আজ থেকে বাংলাদেশের মানুষ চা খাওয়া বন্ধ করে তাহলে সাশ্রয় হবে ৩৬৫০০ কোটি টাকা । শুধু কি তাই ? এইযে না খেয়ে চা বিদেশে রপ্তানী করা হবে – তাতে কি কম টাকা আসবে ? দ্বিগুন লাভ । দেশ ও জাতির উন্নতি চাইলে দেশের মানুষকে এটা বুঝতে হবে ।
তিনি প্রবন্ধে জাতির উদ্দেশ্যে আহবান জানালেন, ‘ভাইয়েরা , আসুন চা খাওয়া বন্ধ করি, দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার শপথ নেই’ ।
আর সরকারের প্রতি অনুরোধ করলেন, দাবি জানালেন- যদি জনগন নিজে থেকে চা খাওয়া বন্ধ না করে তাহলে যেন আইন করে দেশের ভেতরে চা বিক্রি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় ।

এরপর তিনি স্বাস্থ্য বিষয়ক ক্ষতি সম্পর্কে লিখলেন । চা-তে যে কেমিক্যাল থাকে সেগুলো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর । চায়ে থাকে ট্যানিন, এটা আয়রন সহ আরো অনেক মিনারেল ও ভিটামিন এবজরপশনে বিঘ্ন ঘটায় । গবেষণায় দেখা গেছে , এক কাপ চা ১১% আয়রন এবজরপশন কমিয়ে দেয় । ফলে আয়রন ডেফিশিয়েন্সি এনিমিয়া সহ আরো নানান অসুখ হতে পারে ।
এছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে – যারা বেশি বেশি চা খায় তাদের প্রস্টেট ক্যান্সার বেশি হয় ।

সবশেষে তিনি এক মোক্ষম যুক্তি তুলে ধরলেন । ডঃ আব্দুল্লাহ ভালো করেই জানেন বাঙ্গালির চরিত্র কী । কী লিখলে বাঙালি হৈ হৈ রৈ রৈ রব তুলবে ।
বাঙালি জাতি সন্দেহপ্রবণ এবং অন্যের ওপর দোষ চাপাতে সিদ্ধহস্ত । চোগলখুরীতে এদের জুড়ি নেই । সবকিছুর পেছনে এরা ষড়যন্ত্র খুঁজে পায় । বিশেষ করে বিদেশী ইন্ধন !
কোন কিছু লিখে যদি মোটামুটি বুঝিয়ে দেয়া যায় যে- এর পেছনে ‘বৈদেশিক’ ইন্ধন আছে তাহলেই কেল্লা ফতেহ । পত্র-পত্রিকা, রাস্তা-ঘাট সবজায়গায় তুলকালাম হয়ে যাবে । চায়ের কাপে ঝড় উঠবে ।
এবার অবশ্য চিন্তার ব্যাপার হলো- চায়ের বিরুদ্ধেই তো লেখা , চায়ের কাপে ঝড় তোলার সুযোগ থাকবে না ।
ডঃ আব্দুল্লাহ তাঁর প্রবন্ধে লিখলেন- ‘অতীব দুঃখের বিষয়, আমরা বাঙালি জাতি বিদেশীদের চক্রান্তের শিকার হয়েছি । এই চা খাওয়ার প্রচলন করেছে চীনারা । এর বৈজ্ঞানিক নাম- ক্যামেলিয়া সিনেনসিস । বহুকাল আগ থেকে চীনারা চা খাওয়া শুরু করে । তারা একে বলতো চি । কালক্রমে সেই চি – আমাদের দেশে চা হিসেবে পরিচিত হয়েছে । ব্রিটিশরা এদেশে চা খাওয়ার প্রচলন করে । চীনারা ষড়যন্ত্র করে ব্রিটিশদের মাধ্যমে আমাদের দেশে চা খাওয়ার চল ঘটায় । আমরা ব্রিটিশদের হটিয়েছি । কিন্তু আফসোস ! চা-কে আজো হটাতে পারিনি । আজ ব্রিটিশ জাতি উন্নত হয়েছে, চীনারা উন্নত হচ্ছে কিন্তু তাদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে আমরা চা খেয়ে খেয়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছি । আসুন এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রুখে দাড়াই’ ।
লিখতে লিখতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছিলেন ডঃ আব্দুল্লাহ । তিনি লিখে চললেন -
‘চা খাওয়ার ফলে শুধু কি অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে ? প্রতি কাপ চা খেতে কমছে কম পাঁচ মিনিট করে সময় ব্যয় হয় । বিশ কোটি কাপ চা খেতে লাগে ১০০ কোটি মিনিট । এর মাধ্যমে আমাদের জনগনের প্রতিদিন ১কোটি ৬৭ লাখ কর্মঘন্টা নষ্ট হচ্ছে । মানুষজন অলস হয়ে পড়ছে । আর এর ফলাফল গিয়ে পড়ছে আমাদের অর্থনীতির ওপর । ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমাদের অর্থনীতি । চিন্তা করুন তো ১ কোটি ৬৭ লাখ ঘন্টা কাজ করলে কত কাজ করা যেত ? তাই অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে, দেশ ও জাতিকে উন্নত করতে হলে অবশ্যই আমাদের চা খাওয়া বন্ধ করতে হবে’ ।

যেহেতু চা খাওয়া বন্ধ হলে চায়ের কাপে ঝড় তোলার সুযোগ থাকবে না , সেজন্য তিনি প্রবন্ধে জনগনকে দুধ খাওয়ার পরামর্শ দিলেন । তিনি দুধের নানা পুষ্টিগুন সম্পর্কে লিখলেন । সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে , চা খাওয়া বন্ধ করলেই তো হবেনা – এর বিকল্প কিছু তো দিতে হবে । ভালো কিছু দিয়ে মন্দকে প্রতিস্থাপিত করতে হবে ।
.................................

লেখা শেষ করে চেয়ারে হেলান দিলেন ডঃ আব্দুল্লাহ । তিনি কল্পনায় দেখতে পাচ্ছেন- কীভাবে কাল এই প্রবন্ধ নিয়ে ‘দুধের কাপে ঝড়’ উঠবে সারাদেশে । আগামী কয়েক দিন আলোচনার বিষয় হবে একটিই । চা কীভাবে আমাদের অর্থনীতিকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে ! গ্রামে গঞ্জে মিছিল-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে চা নিষিদ্ধ করার দাবিতে । হাইকোর্টে রিট হবে । টেলিভিশনের টকশোতে আলোচনা জমে উঠবে । দর্শকরা ফোন করে আলোচকদের বেকায়দায় ফেলে দেবে । পত্রিকার প্রথম পাতায় শিরোনাম হবে । সরকারী দল ও বিরোধী দল সামনের নির্বাচনে তাদের ইশতেহারে চা-নিষিদ্ধের প্রতিশ্রুতি দিবে । কোন কোন স্থানে চায়ের দোকানে ভাংচুর হবে । দোকান মালিক সমিতি ধর্মঘট ডাকবে । রাস্তায় প্যাঁ- পুঁ করে ছুটবে পুলিশের গাড়ি । বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেবে । সব মিলে এক হুলস্থুল পড়ে যাবে সারাদেশে ।
মুচকি হেসে মোবাইলটা হাতে তুলে নিলেন ডঃ আব্দুল্লাহ ।
তিনি এখন তাঁর কয়েকজন বন্ধুকে ফোন করবেন । এরা চেইন চা-খোর । তাদেরকে পরামর্শ দিবেন, জীবনে শেষবারের মত এক কাপ চা খেয়ে নেয়ার জন্য – কারণ কাল থেকেই হয়তো আর কোথাও চা পাওয়া যাবেনা ।

ছাত্রজীবন থেকেই ডঃ আব্দুল্লাহ চা-বিরোধী । তাঁর এখনো মনে পড়ে, হোস্টেলের বাইরে টং দোকানে বন্ধুরা সবাই চা খেতে যেত । দিনে কমপক্ষে পাঁচবার । পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ শেষে পাঁচ কাপ চা । বন্ধু কিবরিয়া, জনি, রাগিব, মাসুম, রিয়াদ, জুয়েল এরাই ছিল মূল চা-খোর । ডঃ আব্দুল্লাহ চা না খেলেও ওদের সাথে যেতেন । ওরা চা খায়, আর তিনি খান ‘বন্ধুত্ব’ , ‘ভালোবাসা’ । তিনি খেয়াল করেছেন, চায়ের কাপে যেসব ঝড় ওঠে সেগুলো বেশিরভাগই বেহুদা । বন্ধুদের সাথে একসাথে থাকাটাই ছিল তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য । সেটাই তো ভালোবাসার দাবি নাকি ?
মাঝে মাঝে ওরা জোর করে চা খাওয়াতো । মানে আগেই অর্ডার দিয়ে দিত । এখন কী আর করা ! অর্ডার যখন দিয়েই ফেলেছে, তখন তো আর বসে থাকা যায় না নাকি ! তাই একটু আধটু মাঝে মাঝে ডঃ আব্দুল্লাহকেও খেতেই হত । বন্ধুদের অবশ্য অনেকবারই তিনি অর্থনীতিতে চায়ের এই মহা-ক্ষতিকারক দিক সম্পর্কে বলেছেন কিন্তু তারা কান দেয়নি । এবার বাছাধন যাবি কোথায় ? এই প্রবন্ধ প্রকাশিত হবার সাথে সাথে দেশ থেকে চা উঠে যাবে । ডঃ আব্দুল্লাহর মত বিজ্ঞানী একটা প্রবন্ধ লিখলে সেটা সরকার আমলে না নিয়ে পারবে না । দেখি তোরা এখন কেমনে চা খাস ! হুহ !  

হঠাৎ ডঃ আব্দুল্লাহর মনে পড়লো, তাঁর ঘরেও কয়েকটা টি-ব্যাগ আছে । তাঁর স্ত্রী মিমু প্রায়ই লুকিয়ে লুকিয়ে চা খায় । এই প্রবন্ধ প্রকাশের পর তো আর খেতে পারবে না ! উম্ম... ডঃ আব্দুল্লাহ ভাবলেন, শেষবারের মত তিনি নিজেও এক কাপ চা খেতেই পারেন !

তিনি স্ত্রী মিমুকে ডাকলেন । ‘দু’কাপ চা বানিয়ে নিয়ে আসো । ব্যালকনিতে চাঁদের আলো এসে পড়েছে । একসাথে বসে চা-খেতে খেতে কথা বলি ।
অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকালেন ডঃ আব্দুল্লাহর স্ত্রী মিমু । আর ডঃ আব্দুল্লাহ মুখ ঘুরিয়ে নিঃশব্দে হাসতে লাগলেন । আর কেউ না দেখলেও দেয়ালের একটা টিকটিকি ঠিকই দেখে ফেললো- ডঃ আব্দুল্লাহ তার দু’পাটি প্রসারিত দাঁত ডানহাত দিয়ে ঢাকার ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছেন !


[ডঃ আব্দুল্লাহর যুগান্তকারী আবিস্কার ও মহানুভবতা সম্পর্কে পড়ুন কমেন্টে দেয়া লিংক থেকে !] 

শনিবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৩

অনাগত সেই দিন

একদিন নেবো অবসর তোমাদের এই কোলাহল থেকে
কিংবা , হয়তো তোমরাই আমাকে ঠেলে দেবে
এক অনিবার্য অপেক্ষার প্রহরে ।

একদিন আমি বলবো – ‘বেশ হয়েছে, আর নয়’ ।
অথবা তোমরাই নাক কুঁচকে তাকাবে
আমার জীর্ণ শরীরে ।

একদিন আমি
জীবনভর দেখে যাওয়া সব দৃশ্য মজুদ করে নেবো
চুপসে যাওয়া মস্তিষ্কের কেন্দ্রীয় গোডাউনে
তোমাদের দিকে আর তাকাবোনা চঞ্চল চাহনিতে...

সম্পুর্ণ গুটিয়ে যাবো নিজের ভেতর
আমার পৃথিবীতে জনসংখ্যা হবে 'মোটে এক'
শুধু - 'আমি'  ।

(অনাগত সেই দিন/ ০৯-১১-২০১৩)

রবিবার, ৩ নভেম্বর, ২০১৩

একাকীত্বের দুঃখগাঁথা

একাকী মানুষের কাছে 
সুখের মুহূর্তগুলোও ফিরে আসে –
দুঃখী দুঃখী স্মৃতি হয়ে , নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ।

দুঃখেরাও বড় একা, ওরাও খুঁজে ফেরে বন্ধু
খুঁজে ফেরে আশ্রয় !  তাই 

দুঃখগুলো জাপটে ধরে একাকী মানুষকে   
অক্টোপাশের মত ! শেকড়ের প্রান্ত হতে   
ওরা খুঁজে পায় বেঁচে থাকার জীবন রস
একাকী মানুষের মনের ভেতর !

দুঃখী মানুষ দেখতে চাও ? খুঁজে নাও একাকী একজন 
পৃথিবীর সব একাকী মানুষই একেকজন 
সত্যিকারের দুঃখী মানুষ !

(একাকীত্বের দুঃখগাথা/ ০৪-১১-২০১৩)

শনিবার, ২ নভেম্বর, ২০১৩

কী চাই জীবনে

ডাক্তাররা খুব ব্যস্ত । তাঁদের সকাল থেকে রাত- কর্মঘন্টার কোন সীমা পরিসীমা নাই । আমি আছি দ্বিধায়... এমন অমানুষিক জীবন তো আমি চাই না ...

আমি খুব বেশি ব্যস্ত হতে চাইনা । এতটা ব্যস্ত হতে চাইনা , টাকার পেছনেও এতটা ছুটতে চাইনা যাতে ফ্যামিলিকে সময় দেয়া যায় না । বন্ধু-বান্ধব-প্রতিবেশিদের খবর রাখা যায়না । যখন অনেক টাকা হবে তখন খরচ করার মানসিকতাই থাকবে না, সময় থাকবেনা -এমন চাইনা । সেজন্যেই চিন্তায় আছি । আমি চাই একটা ফিক্সড টাইম নির্ঝঞ্ঝাট ডিউটি , সম্মানজনক একটা পদবী আর বিলাসবহুল নয়, স্বচ্ছন্দে জীবন চলার মত মোটামুটি টাকা... হাতে থাকবে প্রতিদিন বেশ কিছু ফ্রি টাইম...বই পড়ার জন্য, লেখার জন্য, ঘোরাফেরার জন্য, সামাজিক কার্যক্রমে অংশ নেয়ার জন্য...
 
অসম্ভব কি ? 

ডাক্তার জীবনের সুখ



প্রায় প্রতিদিনই এরকম হয় । হাসপাতালের করিডোরে কিংবা রাস্তা দিয়ে হাঁটছি । হঠাৎ একজন লোক দৌড়ে এল ।
স্যার স্যার, কেমুন আছেন ?
আমি বলি, আছি ভালো ।
চিনতে না পারা চাহনি নিয়ে তাকাই ।
লোকটা বলে – স্যার আপনি আমার বাবা/ভাইয়ের চিকিৎসা করছিলেন স্যার ।
ওয়ার্ডে কতজনকেই তো চিকিৎসা দেয়া হয় । ক’জনের কথাই বা মনে থাকে ! তাই কখনো হয়তো চিনতে পারি, কখনো পারিনা ।
তবু বলি, ও হ্যা হ্যা – কেমন আছেন এখন ?
চোখে মুখে কৃতজ্ঞতার ডালি নিয়ে বলে, ভালো স্যার । আপনার  কথা আমাদের সারাজীবন মনে থাকবে স্যার । আপনার জন্যে আমরা দোয়া করি স্যার ।
আমি বলি- আবার যদি কখনো কোন সমস্যা হয়, হাসপাতালে আসবেন । চলে যাই । অনুভব করি, পেছনে এই লোকটা তাকিয়ে আছে আমার চলার পথের দিকে ।

কী করেছি আমি তার জন্যে ? হাসপাতালে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী আসে । সবাই চিকিৎসা পায় । ক’জন রোগী ডাক্তারের কথা মনে রাখে ? কেন লোকটা আমার প্রতি কৃতজ্ঞ ?
আমি ভেবে দেখি । সবাই যা চিকিৎসা পায়, ঐ রোগীও হয়তো তাই পেয়েছে । আমার কাছ থেকে বেশি যেটুকু পেয়েছে তা হলো- একটু ভালো ব্যবহার, একটু মন খুলে কথা বলার সুযোগ । কোনকিছু না বুঝলে নিঃসংকোচে আমাকে বলার সুযোগ । হয়তো ওয়ার্ড বয়, নার্স বা অন্য সহকর্মী ডাক্তারের কাছে সে এতটা পায়নি । 

আমি সবসময় ভাবি, একজন ভালো মানুষ যখন রোগী হয়ে আসে তখন সে, তার পরিবার সবাই টেনশনে থাকে । এমন অনেকে আছে , হয়তো জীবনে এই প্রথমবার সে এসেছে এই বড় শহরে । বড় হাসপাতালে । সে ঠিকমত পথঘাটই চেনে না এই শহরের । চেনেনা অলিগলি এই হাসপাতালের । জানেনা কী করতে হবে  তাকে ।  যদি একটু বুঝিয়ে বলি, একটু আন্তরিকভাবে কথা বলি, আশ্বস্ত করি- ক্ষতি কী  ? মাঝে মাঝে ক্লান্ত বিধ্বস্ত হয়ে রুমে ফেরার সময় পথে কথা বলতে ছুটে আসে কেউ । বিরক্ত লাগে, তবু হাসিমুখে দাঁড়াতে হয় । কারণ- ‘ভালো ব্যবহারই সওয়াব’ । এইটার অনেক প্রয়োজন ।  আমি জীবনে অসংখ্য রোগী দেখবো , কিন্তু হয়তো এই রোগী আর কখনোই আসবেনা এই হাসপাতালে ।
কিন্তু এই স্মৃতিটুকু সে বহন করবে সারাজীবন ।

সরকারী হাসপাতালে এত রোগী আসে , অনেক সময় মেজাজ গরম হয়ে যায় । এর মাঝে যদি থাকে ‘ডাক্তারকে বাড়ির চাকর মনে করা’ কিংবা ‘ডাক্তারের চেয়ে বেশি বোঝে’ টাইপের রোগী বা এটেন্ড্যান্ট- তাহলে তো মেজাজ সপ্তমে ওঠে । (এদেরকে ডেকে কখনো কখনো বোঝাই, কখনো ভদ্র ভাষায় কিঞ্চিৎ অপমানও যে করা হয়না তাও নয় । এটা তাদের প্রাপ্যই মনে হয় ।) 

এই সবের মাঝেও মেজাজ ঠান্ডা রেখে সবাইকে আন্তরিকতার সাথে চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং করাটাই ডাক্তারের জীবনের চ্যালেঞ্জ । যখন পথের ধারে এমন করে কেউ সালাম দিয়ে দোয়া করে, যখন বহুদিন পরে অন্য ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া রোগী তার পুরনো ওয়ার্ডে এসে খোঁজ নেয়- অমুক স্যার আছে কিনা , তখন অন্তরে যে ভালোলাগা কাজ করে , তার সাথে অন্য কিছুর তুলনা হয়না ।

মায়াবী চৌকাঠ



সকালের সোনালী আলোয় 
আমায় দেয় সে বিদায়, প্রতিদিন । বেরিয়ে যাই- 
কর্মব্যস্ত জীবনের টানে । সারাদিন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে তবু   
আমারই অপেক্ষায় ।  সর্বক্ষণ আগলে রাখে 
আমার নীড় । আর সবটুকু ভালোবাসা ,
অসীম বিশ্বস্ততায় ! করুণ চাহনিতে  তার নিঃশব্দ আহবান-   
ফিরে এসো প্রিয় । ফিরে এসো ।

সুর্যের তাপ কমে আসে ধীরে ধীরে । আঁধার নামে ঘরের ভেতর
আমি ফিরি ছিন্নভিন্ন ক্লান্ত শরীরে । কখনোবা 
হতাশ কিংবা ক্ষুব্ধ হৃদয়ে । দুর্বল দু’হাতে জাপটে ধরি আমার
দু'পাল্লা দরোজার মায়াবী চৌকাঠ । তাকে অবলম্বন করেই ঠেকাই আমার 
অনিবার্য অধঃপতন !

(মায়াবী চৌকাঠ/ ০২-১১-২০১৩)