এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...

এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে

সোমবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৩

আন্তর্জাতিক বেহায়া প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সাফল্য !



১.
কাঁদো কাঁদো মুখে ঘরে ঢুকলেন রওশন এরশাদ । লেজেহুমু এরশাদ তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রুপচর্চা করছিলেন । ঘরে ঢুকেই ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে ফেললেন রওশন । কিছু বুঝতে না পেরে এরশাদ জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই সাত সকালে কী কান্নাকাটি শুরু করলে ? কী হয়েছে বলবে তো !’
কাঁদতে কাঁদতে রওশন এরশাদ বললেন, ‘কুকুরটাকে সকাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে না । দেখোনা একটু খুঁজে প্লিজ, কোথায় গেল আমার ‘ডগি’...হু হু হু...’

২.
প্রতিবছরের মত এবারো আন্তর্জাতিক পশু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে সুন্দরবনে । অনেক দিন আগেই এ সম্মেলনের তারিখ সবাইকে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল । সে অনুযায়ী বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি পশুরা উপস্থিত হয়েছে । রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে লুকিয়ে তারা চলে এসেছে সম্মেলনে যোগ দেয়ার জন্য । নানা দেশের নানা পশু । বিগত বছরগুলোর চেয়ে এবার অনেক বেশি পশু এসেছে । এত পশু দেখে তো ‘ডগি’র চক্ষু চড়কগাছ ! এবারই ডগি প্রথম আন্তর্জাতিক পশু সংঘের সদস্যপদ পেয়েছে ।
সম্মেলনের তারিখ তাকেও আগেই জানানো হয়েছিল । কিন্তু সে তো থাকে ঢাকায় । মেমসাহেব তাকে ছাড়া থাকতেই পারে না ! কীভাবে সম্মেলনে আসবে তা নিয়ে খুব চিন্তিত ছিল সে । কিন্তু শেষমেষ উপায় একটা হয়েই গেল । মেমসাহেব ঢাকার বাইরে- রংপুরে গিয়েছিলেন । এবার কী কারণে যেন ডগিকে নিয়ে যাননি তিনি । এইতো সুযোগ । জানালা খুলে সন্ধ্যাবেলাতেই চম্পট দিয়েছে ডগি । তারপর বিভিন্নভাবে সে ঠিকঠিক পৌঁছে গেছে সম্মেলন শুরুর কিছুক্ষণ আগে ।

এবারের সম্মেলনে এত বেশি পশু আসার কারণটা জানতে পারলো ডগি । এবার বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতার মত এখানে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পদক দেয়া হবে । বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতাও এর মধ্যে আছে । এই সুযোগে অনেক সুন্দরী কুত্তিকেও দেখা যাবে, মন্দ কী !

সম্মেলন শুরু হয়ে গেল । একে একে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতে লাগলো । বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতা, বিশ্ব দৌড়বিদ প্রতিযোগিতা , শ্রেষ্ঠ খাদক প্রতিযোগিতা, সাদা মনের পশু প্রতিযোগিতা । দুঃখের বিষয় এর কোনটাতেই কোন কুকুর পদক পেলনা । কুকুর জাতির জন্য এটা খুবই অপমানজনক মনে হলো ডগির কাছে । তারচেয়েও বড় ব্যাপার হলো- বাংলাদেশের কেউই কোন পদক পেলনা । বাংলাদেশের প্রতিযোগিরা সবাই খুব বিমর্ষ হয়ে আছে । তাদের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠেছে সুন্দরবনের আকাশ বাতাস ।

মাইকে ঘোষিত হলো- এবারের প্রদেয় পদকের নাম ‘বিশ্ব বেহায়া পদক’ । এই পর্বে বিজয়ীকে ‘মিস্টার বিশ্ববেহায়া’ হিসেবে বিশেষ সম্মান দেয়া হবে ।

প্রস্তাবনায় বলা হলো- আমরা পশু । হায়া বা লজ্জা জিনিসটা আমাদের মানায় না । আমাদের ভেতর থাকতে হবে পশুসুলভ মনোবৃত্তি । আমাদের ভেতর পশুসুলভ আচার আচরণ তৈরির জন্য আমাদের হায়া বিসর্জন দিতে হবে । যার হায়া যত কম, তার মাঝে ততবেশি পশুত্ব প্রকাশিত হয় । আর এই বিষয়টিকে উৎসাহিত করার জন্য, নতুন প্রজন্মের কাছে একে মহিমান্বিত করে তোলার জন্য আমাদের এই উদ্যোগ ।
পশুগন, আপনারা জানেন মানুষেরা ‘নোবেল পদক’ দেয় । তাতে তারা নানারকম কারসাজি করে । কিন্তু আমরা কোন দুইনম্বরি করবো না । আমরা ঠিক ঠিক সবচেয়ে যোগ্য পশুকেই এই পুরস্কারে ভূষিত করতে চাই । আপনারা আপনাদের যুক্তি তুলে ধরুন, কাকে এই ‘বিশ্ববেহায়া পদক’ দেয়া উচিৎ হবে ।

ডগি এইবার একটা সম্ভাবনা দেখতে পেল । কিন্তু দেখা গেল শুকরেরা তাদের পক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করছে । বেশিরভাগ পশু তৃণভোজী অথবা মাংসাশী । কিন্তু আমরা শুকরের জাত বিষ্ঠা খাই । যদিও মানুষের বিষ্ঠাই আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রিয়, কিন্তু অন্য প্রাণীর বিষ্ঠাও আমরা খাই । আর সবচেয়ে বড় কথা – এই ‘শুওর’ শব্দটা মানুষ গালি হিসেবে ব্যবহার করছে । যদি আমাদের হায়া থাকতো তাহলে কি মানুষ এই শুওর শব্দটা গালি হিসেবে ব্যবহার করতো ? আর আমরা কি হায়া থাকলে এর প্রতিবাদ করতাম না ?

শুওরদের বক্তব্য শেষ হলে এক তাগড়া জোয়ান কুকুর উঠে দাঁড়ালো । তেজোদ্দীপ্ত কন্ঠে ঘেউ ঘেউ করে সে এর প্রতিবাদ জানালো । তার বক্তব্য হচ্ছে- মানুষের বিষ্ঠা আমরাও খাই । এছাড়া আমরা সারাদিন শত শত মানুষের সামনে পোষাক ছাড়াই ঘুরে বেড়াই । কেউ কি আমাদের পরণে প্যান্ট দেখেছে ? অথচ আমরা চাইলে হাজার হাজার প্যান্ট চুরি করে পরতে পারতাম । শুধু তাই নয়, আমরা জনগনের সামনে প্রকাশ্যে মূত্রত্যাগ করি ।
আর সবচেয়ে বড় কথা ভাদ্র মাসে আমরা প্রকাশ্য রাস্তা ঘাটে কী করি সেটা আপনারা সবাই জানেন । সুতরাং এই পদক আমাদেরই প্রাপ্য ।
পুরো সমাবেশ স্থল ঘেউ ঘেউ শব্দে মুখর হয়ে উঠলো । সবাই সমর্থন দিল । এক বৃদ্ধ সিংহ বললো , এরকম জোরালো বক্তব্য নাকি স্বাধীনতার পর থেকে আর শোনা যায়নি । রাজনীতিতে এই কুকুরের ভবিষ্যত অত্যন্ত উজ্জ্বল ।

মনের আনন্দে ডগিও গলা চড়িয়ে ঘেউ ঘেউ করে চলছিল । জুনিয়র সদস্য হিসেবে  সে বসেছে পেছনের দিকে এক প্রান্তে । এই চিৎকার চেচামেচির মাঝেই হঠাৎ সে কাঁধে কার যেন স্পর্শ অনুভব করলো । মাথা ঘুরিয়ে ডগি দেখলো, তার মেমসাহেব  রওশন এরশাদ । সাথে সাহেব লেজেহুমু এরশাদও আছেন । কীভাবে তাকে খুঁজে বের করলো ভেবে পাচ্ছিলো না ডগি । হঠাৎ করেই তার মনে পড়লো গলার চেনের সাথে কী যেন আটকানো । জিপিএস ডিভাইস । উফ ! কেন যে এইটা খুলে রেখে আসেনি সে ! সাহেব কোথায় কোথায় যায় জানার জন্য মেমসাহেব এইটা ডগির গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছিল । নিজের লোম ছিড়তে ইচ্ছে করলো ডগির । কিন্তু এখন কী আর করা , সাহেব-মেমসাহেবরা তো এসেই পড়েছেন ।

৩.
সম্মেলন স্থলের পেছন দিকে দুজন মানুষকে দেখে আয়োজক কমিটি তো হতবাক ! নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে এরা ঢুকলেন কী করে ? কী তাদের পরিচয় ?
সম্মেলন নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান, নেকড়ে মাইকে এল । বললো, বন্ধুরা আপনারা ভয় পাবেন না । আপনাদের পেছনে যে দু’জন মানুষকে দেখছেন তারা আমাদের জন্য ক্ষতিকর নন । সুদর্শন পুরুষ যাকে দেখছেন চেহারা মানুষের মত হলেও প্রকৃতপক্ষে আচার আচরণে তিনি প্রায় আমাদের সমগোত্রীয় । বিশেষ করে যদি ‘হায়া’ কে বিবেচনায় নেয়া হয় । তার বাসায় থাকে আমাদের আন্তর্জাতিক পশু সংঘের তরুন সদস্য ‘ডগি’ । ‘ডগি’র মনিবকে আপনারা সবাই হয়তো চেনেন । অন্তত নামটা হয়তো আপনারা শুনে থাকবেন । পশু সমাজে তাঁকে নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয় । তিনি বাংলাদেশের সাবেক স্বৈরাচারী রাষ্ট্রপতি, কবি ও প্রেমিক লেজেহুমু এরশাদ । সবাই ক্ষুরতালি দিয়ে তাঁকে স্বাগত জানান । যাদের ক্ষুর নেই তারা যার যার রীতি অনুযায়ী শব্দ করুন । এখন আমাদের এই অতিথি সম্পর্কে আরো বিস্তারিত বলবে তারই বাসায় থাকা আমাদের তরুণ সদস্য – ‘ডগি’ । লেজেহুমু এরশাদের হায়া কতটা কম, সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাতের জন্য আমি ডগিকে অনুরোধ করছি ।

৪.
গাড়ির পেছনের সিটে আরামে বসে আছে ডগি । তারা এখন ঢাকার পথে । ডগির হাতে ‘বিশ্ববেহায়া পদক’ । সে খুব আনন্দে আছে । তার মনিব লেজেহুমু এরশাদের হায়া সম্পর্কে সে খুব ভালো বক্তৃতা দিয়েছে । তিনি কীভাবে সকালে এক কথা, দুপুরে আরেক কথা এবং রাতে ঘুমানোর আগে সম্পুর্ণ ভিন্ন কথা বলে জাতির সাথে খেলছেন সে সম্পর্কে বিস্তারিত বলেছে সে । শুনে তো বিচারকরা খুবই সন্তুষ্ট ! এমনিতেই তারা আগে থেকেই লেজেহুমু এরশাদ সম্পর্কে মোটামুটি জানতো , কিন্তু আজ তারই ঘরের কুকুরের কাছ থেকে বিস্তারিত শুনে আর তাঁকে সরাসরি দেখে সবাই মুগ্ধ হয়েছে । অবশেষে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়েছে- 'পদকটা লেজেহুমু এরশাদকেই দেয়া হোক । মানুষ হয়েও যতটা লজ্জাহীনতা তথা বেহায়ার পরিচয় তিনি দিয়েছেন তা অতুলনীয় । আমরা পশুরা একে অসম্মান করতে পারিনা ।'

ডগি ভাবছিল , যাক অবশেষে দেশের জন্য সে কিছু একটা করতে পারলো । এই সাফল্য শুধু লেজেহুমু এরশাদের নয় , এই সাফল্যের অংশীদার ডগিও । এই সাফল্য সমগ্র বাংলাদেশের !

[আন্তর্জাতিক বেহায়া প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সাফল্য ! / ১৯-১১-২০১৩]  ফেসবুক স্ট্যাটাস লিংক- ( https://www.facebook.com/muhsin.abdullahmu/posts/10200472205121558 )

চোরাবালি



রংপুর এমন কোন বড় যান্ত্রিক শহর নয় যে হাঁপিয়ে উঠতে হবে । তবুও অল্পদিনেই হাঁপিয়ে উঠত মিন্টু । রংপুর এখন বিভাগীয় শহর হয়েছে , তবু খুব একটা পরিবর্তন যে হয়েছে তা নয় । নতুন কিছু উঁচু ভবন উঠেছে এই যা । বাকিসব রয়ে গেছে প্রায় আগের মতই । আমরা যেসময়ের কথা বলছি – তখন রংপুর ছিমছাম শান্ত একটা জেলা শহর । রাস্তাঘাট ফাঁকা ফাঁকা । রিক্সা আর বাইকই প্রধান বাহন । মাঝে মাঝে দুএকটা প্রাইভেট কার সাইরেন দিয়ে যায় ।
সিটি বাস নেই, সিএনজি নেই , রাস্তার মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক জ্যাম নেই । সহজ সরল মানুষগুলো কেমন যেন একমনে হেঁটে যায় ।

প্রায় সাতবছর হয়ে গেছে । আজ রংপুরে এসে পুরনো দিনগুলির নানা কথা মনে পড়ছিলো মিন্টুর । যে মিন্টু এই রংপুরেই হাঁপিয়ে উঠত, সে কেমন করে বিদেশে পড়ে আছে বছরের পর বছর ! জীবন যে কখন কোথায় গিয়ে থামে কেউ বলতে পারে না । নিরন্তর তীরভাঙ্গা নদীর মতন ।

বেশিরভাগ সময় চুপচাপ থাকা ছেলে মিন্টু । প্রথম দেখায় হয়তো কেউ কেউ তাকে  বোকাই মনে করতো । কিন্তু গ্রামের স্কুল থেকে সেরা রেজাল্ট করে সে ভর্তি হয়েছিল উত্তরাঞ্চলের শহর ‘রংপুরের’ নামকরা এক কলেজে । তারপর কলেজে ভালো রেজাল্ট করে চান্স পেয়েছিল রংপুর মেডিকেল কলেজে ।

দু’দিন হলো ইউকে থেকে দেশে এসেছে মিন্টু । এমআরসিপি পাস করে তবেই দেশে এলো । দেশেই থাকবে নাকি ইউকে-তেই কাটিয়ে দেবে বাকি জীবনটা, এখনো সিদ্ধান্তটা চূড়ান্ত করেনি । বিয়েটাও করা দরকার, বয়স তো ত্রিশ পেরিয়ে গেল !
প্রথম দু’দিন গ্রামের বাড়িতে সময় কাটিয়েছে । কিন্তু রংপুর তাঁকে টানছিল । কোথায় যেন একটা মিহি সুতোর টান । পুরনো ক্যাম্পাস, পুরনো রাস্তাঘাট । আর পুরনো কিছু বিশেষ জায়গা । একা একা বসে কবিতা লেখার জায়গা । আকাশ দেখার জায়গা  । শুকনো পাতার ঝরে যাবার দৃশ্য দেখার জায়গাগুলি ।

বেশিরভাগ জায়গাতে ও একাই ঘুরতে যেত । মাঝে মাঝে আরিফ সঙ্গ দিত । আরিফ ছিল ভোজন রসিক । মিন্টুও খেতে ভালোবাসতো । কোথায় কোথায় ভালো খাবার পাওয়া যায়- খুঁজে খুঁজে ঠিকই হাজির হত তারা ।
দেশে আসার আগেই আরিফকে বলে রেখেছিল মিন্টু । হাতে কোন কাজ রাখা যাবেনা । পুরনো দিনের মত একসাথে ঘুরবো, খাবো । আরিফ কি এই আমন্ত্রণ এড়াতে পারে ?

হেঁটে হেঁটে ওরা গেল মিতালী হোটেলে । যখন রংপুরে ভালো কোন নিরিবিলি হোটেল ছিলনা – তখন ছিল মিতালী হোটেল । পায়রা চত্বরের পাশে গলির ভেতর ছোট্ট একটা হোটেল । বেশ নিরিবিলি । বিকেলে ঘুরে ফিরে ওখানে গিয়ে বসতো ওরা । চিকেন ফ্রাই আর সাথে কফি । কত কথা হত ! পড়াশোনা, রাজনীতি, সাহিত্য- সব কিছু নিয়ে কথা বলতো ওরা । কত বিকেল কত সন্ধ্যা এখানেই কেটে গেছে । আজ যেতে যেতে মনে হলো যেন বুকের ভেতরে কোথাও বাজছে-
‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ !  

আজও কফি খাওয়া হবে । আজও অনেক কথা হবে । তবে আজ হয়তো স্মৃতিচারণই হবে বেশি । কতদিন পর দেখা !
‘মিন্টু, নির্ঝর কুঞ্জের কথা তোর মনে ছিল ?’ কফিতে চুমুক দিয়ে আরিফ কথা তোলে । যদিও সে জানে, নির্ঝর কুঞ্জের কথা মিন্টু ভুলতে পারবে না । ওর কত বিকেল তো ওখানেই কেটেছে, কত কবিতা তো ওখানেই লিখেছে !

ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে একটা ছোট পার্ক আছে । নাম নির্ঝর কুঞ্জ । তেমন একটা কেউ যায় না ওখানে । জুটিরা তো নয়ই । একে মিলিটারির এলাকা, তারওপর বেশ খোলামেলা আর ছোট । জুটিদের জন্য উপযুক্ত ছিলনা জায়গাটা । আর তখনকার দিনের জুটিদেরও কিছু লজ্জা-শরম অবশিষ্ট ছিল বৈকি !
হাতে লালরঙ্গা ডায়েরিটা নিয়ে একটা কলম চিবুতে চিবুতে প্রায়ই ভর দুপুরে কিংবা বিকেল বেলায় সেখানে গিয়ে বসতো মিন্টু । মানুষের মনের এই এক অদ্ভুত ব্যাপার – কখনো একাকীত্ব চায়, কখনো একাকীত্ব ঘোচাতে চায় । দুটি বিপরীত ধরণের চাওয়া একসাথে খেলা করে ! মিন্টু অবশ্য একাকীত্বই বেশি উপভোগ করতো । কখনো কখনো উপন্যাস পড়তো ছাউনির নিচে বসে । বেশ কিছু দুর্লভ গাছ ছিল ওখানে । আর ছিল কয়েকটা বানর । বানরগুলোও হয়তো একাকী বোধ করতো । তাই মিন্টুকে দেখলে তাদের ভেতর একটা প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হত যেন ! অথবা মিন্টুর দেয়া বাদামের লোভ ।
‘হ্যারে আরিফ, বানরগুলো কি এখনো আছে নির্ঝরকুঞ্জে ?’ মিন্টু জিজ্ঞেস করে । কিন্তু আরিফ নিজেও তো কতদিন যায়নি । সেও জানেনা এর উত্তর । মিন্টু দীর্ঘশ্বাস ফেলে কফির মগে ।

প্রথম কাপ কফি ফুরিয়ে যায়, হাতে ওঠে দ্বিতীয় কাপ । স্মৃতিকাতর দু’জন – যেন নিজের কথাই বলে চলে নিজেকেই ।
‘ঘাঘটের তীরে যেতে হবে কাল একবার’ ।

শহরের পশ্চিম দিকে রংপুর ক্যান্টনমেন্টের পেছন দিয়েই বয়ে গেছে ঘাঘট নদী । সমস্যা একটাই, নদীর পাড়টা জায়গায় জায়গায় নোংরা । যদি সুন্দর করে নদীর এপাড়টা বাধাই করা থাকতো, মাঝে মাঝে দুয়েকটা গাছ আর গাছের নিচে বেঞ্চি পাতা থাকতো – কতইনা ভালো হত । অবকাশ যাপনের একটা ভালো জায়গা হতে পারতো এই জায়গাটা ।
ঘাঘটের তীরে ওরা সুর্যাস্ত দেখতে যেত । ছোট নদী- শীতকালে পানি কমে আসে । শেওলা দেখা যায় । কে জানে – এককালে হয়তো এই ঘাঘটও খরস্রোতা ছিল কিনা ! গোধুলী বেলায় নদীর ওপর দিয়ে পাখিগুলো উড়ে যায় নীড়ে ফেরার তাগিদে । হয়তো নদীর পানিতে ঝিলমিল করে তাদের ছায়া । হয়তো তখনো দুয়েকটা বক খুঁজে চলেছে পুঁটি মাছ । আর সুর্য নেমে যাচ্ছে পশ্চিমে । জীবনটা হঠাৎ করেই যেন অর্থবহ হয়ে উঠত তখন । এত সুন্দর ! এত সুন্দর !
       
তারপর রংপুর চিড়িয়াখানায় লেকের ধারে ইট-সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসে গল্পের বই পড়া । মাঝে মাঝে শহর থেকে বেরিয়ে তাজহাট জমিদারবাড়ি । জমিদারবাড়ির সিঁড়িতে বসে জীবনের গল্প করা । নানা সন্দেহ সংশয়- ইতিহাস চর্চা করা । আজও যেন মিন্টুর চোখে সেই জিজ্ঞাসা ফুটে উঠছে- আচ্ছা, পেছনদিকের ঐ প্যাঁচানো সিঁড়িটা-যেটা নেমে গেছে একটা কুয়োর ভেতর, কিজন্য বানানো হয়েছিল ? জমিদারবাবুর পালানোর গোপন পথ ? তাহলে সুড়ংগটা কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে ?

শুধু শহরের ভেতরটা কিংবা আশেপাশেই নয়- ওরা ঘুরে বেড়িয়েছে ইচ্ছেমত । ইচ্ছে হলো তো ব্যস, চল যাই । ক্লাস, আইটেম, কার্ড কিছুই বাধা নয় । একবার রাতে ইচ্ছে হলো লালমনিরহাট যাবার – তখন রাত ১১ টা । যেই ভাবা সেই কাজ !  ব্যাগ ঘাড়ে ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লো রাতেই ।
পথে নামলে , সা...থী মিলবে
শুধু কখনো ভুল প্রলোভনে – প্রতারক পায়ে
ফিরে যেও না ...
ট্রেনে চড়ে চলে গেল তিনি বিঘা করিডোর । ঘাড়ে ব্যাকপ্যাক ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়ালো  আঙ্গরপোতা, দহগ্রাম – ভারতের ভেতর বাংলাদশের ভূমি । ছিটমহল ।
ওখানকার মানুষগুলো রাষ্ট্রের সব সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত । নেই স্কুল, নেই বিদ্যুৎ, নেই স্বাস্থ্যসেবা । একটা কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও কোন ডাক্তার ছিলনা । খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল একজন মেডিকেল এসিসটেন্টকে । স্বাস্থ্যসেবা বলতে তিনিই সেখানে সব ।

নীলফামারীর নীলসাগর, দিনাজপুরের রামসাগর , পঞ্চগড়ের তেতুলিয়া । সবখানে গিয়েছিল ওরা । যখন ইচ্ছে তখন । প্রকৃতি যেন চুম্বকের মত আকর্ষণ করতো মিন্টুকে ।

আর খাওয়া দাওয়া । জীবনে এই একটা নির্মল বিনোদন হলো খাওয়া । ওরা সবসময় খোঁজ করতো ভিন্ন স্বাদের । রংপুরের সিঙ্গারা হাউসে বসে একের পর এক সিঙ্গারা গিলেছে ওরা । প্রতিযোগিতা করে । নেহাল নামক একটা দোকানে ভালো পুরি পাওয়া যায়- গরুর গোশতের সাথে পুরি ।
গ্র্যান্ড হোটেলের মোড়ে একটা দোকানে খুব ভালো চা বানায় । আর পৌর বাজারের ফুটপাতে ফুচকা-চটপটি । পায়রা চত্বরের পাশে একটা হোটেলে কবুতরের গোশত পাওয়া যায় ।
মিন্টুর ইচ্ছে হল- ঘুঘুর মাংস খাবে । কোথায় পাওয়া যায় ? এমনিতে এখন ঘুঘুই দেখা যায় না । খবর পাওয়া গেল দিনাজপুরের এক দোকানে পাওয়া যায় ঘুঘুর মাংস । ব্যস, একদিন সকালে ওরা গাড়িতে উঠে বসলো । দিনাজপুরে গিয়ে ঘুঘুর মাংস খেয়ে তবেই শান্তি !

‘চোরাবালির কথাটা কি ভুলে গেছিস নাকিরে ?’ আরিফ প্রসঙ্গ তোলে ।
‘নাহ । সেকি ভোলা যায় ?’
ওদের ঘোরাঘুরির আরেকটা জায়গা ছিল তিস্তা নদী । শহর থেকে ১৫-২০ কিলোমিটার পুর্বে তিস্তা নদী । নদীতে আছে শতবর্ষের পুরনো রেলব্রিজ । আছে নৌকা । এখন অবশ্য ভালো ব্রিজ হয়েছে । নদীর তীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে ওরা অনেক দূর চলে যেত । কথা বলতো , গান গাইত ।
কোনদিন প্রেম না করলেও এরকম পরিবেশে মিন্টু উদাস গলায় গান গাইতো –
আমার... লাইন হয়ে যায় আকাবাকা......
ভালো না হাতের লেখা ...
আসো যদি বাঁশবাগানে, আসো যদি বাঁশবাগানে
আবার হবে দেখা বন্ধু , আবার হবে দেখা...

পরিবেশের সাথে এসব গান যেন মিশে যেত লবণ- পানির মত । মিন্টু পল্লীগীতি ভালোবাসে । পল্লীগীতিগুলো চিন্তাভাবনা করে লেখা কোন গান নয়, গাঁয়ের সহজ-সরল মানুষের মুখে মুখে স্বতস্ফূর্তভাবে উঠে আসা হৃদয়ের কথা । আরিফ মিন্টুকে খোঁচায়- বাশবাগানে দেখা করতে বলছিস কেন ? তোর মতলবটা কী হু ?
আরিফও  গাইতো –
আকাশের ঐ মিটিমিটি তারার সাথে কইবো কথা... নাইবা তুমি এলে ...
অথবা ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই, হাকাও গাড়ি তুই চিলমারীর বন্দরে রে’ ...

এসব গান হয়তো কোন কালে কোন এক বিরহী প্রেমিক গেয়েছিল । মিন্টু , আরিফ প্রেমের ধারেকাছেও নেই । বরং ওদের প্রেম-বিদ্বেষীই বলা চলে । বিয়ের আগে ছেলেমেয়ের প্রেম অবৈধ , ওরা ভালো করেই জানে । কিন্তু গানগুলো কেমন যেন ভালো লাগে । মন্দ কি ! বিয়ের পরে নাহয় বউকেই শোনাবে !

একদিন তিস্তার পাড়ে এক মসজিদে আসরের নামাজ পড়ে ওরা হাঁটতে নেমেছিল । স্যান্ডেল খুলে হাতে নিয়েছে । প্যান্ট গুটিয়ে নিয়েছে হাঁটু অবধি । হাঁটতে হাঁটতে অনেকদূর চলে গিয়েছিল ওরা । সুর্য ডোবে ডোবে অবস্থা । ফিরে গিয়ে মাগরিবের নামাজ পড়তে হবে । মানুষজন আর তেমন একটা নেই । এদিকটায় বাড়িঘরও নেই । হয়তো ছিল কোন কালে, তিস্তাই হয়তো ভাংতে ভাংতে গিলে ফেলেছে সেই সব মানুষের ভিটেমাটি । খেদিয়ে দিয়েছে তাদের সর্বস্বান্ত করে ।

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ এক জায়গায় কাদার ভেতর দেবে গেল মিন্টুর পা । কোনমতে পা উঠিয়ে পরের পদক্ষেপ ফেললে পা আরো বেশি দেবে যেতে লাগলো । উদাসমনে গান গাইতে গাইতে আরিফ একটু পিছিয়ে পড়েছিল । মিন্টু বুঝে ফেললো – এটা চোরাবালি । যতই নড়াচড়া করবে ততই ডুবে যেতে থাকবে । চিৎকার করে আরিফকে বললো মিন্টু- চোরাবালিতে আটকে গেছি । কোন একটা ব্যবস্থা কর ।

কিংকর্তব্যবিমূঢ় আরিফ কিছুক্ষণ ভেবে পায়না কী করবে । পাড়ে উঠে সে পাগলের মত এদিক সেদিক দৌড়াদৌড়ি করতে লাগলো । এদিকে ধীরে ধীরে আরো দেবে যাচ্ছিলো মিন্টুর পা ।
একটা ডিঙ্গি নৌকা এসময় যাচ্ছিল নদীর মাঝ বরাবর । আরিফ ও মিন্টুর চিৎকার শুনে এগিয়ে এলো মাঝি । ওদের সমবয়সী একটা ছেলে । আরিফ আর মাঝি ছেলেটা একটু দূরে দাঁড়িয়ে নৌকার লগি হিসেবে ব্যবহারের লম্বা বাঁশটা মিন্টুর দিকে এগিয়ে দিল । মিন্টু বাঁশের একপ্রান্ত ধরে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লো । আরিফ এবং মাঝি ছেলেটা অপর প্রান্ত ধরে টানতে লাগলো । ধীরে ধীরে মিন্টু বেরিয়ে এলো চোরাবালি থেকে । অবশ্য স্যান্ডেল জোড়ার মায়া ত্যাগ করতে হল তার ! আর শরীরের সামনেটা লেপ্টে গেল কাদায় ।

নৌকার ওপরেই মাগরিবের নামাজ আদায় করলো ওরা । দুজনেই দুই রাকাত করে অতিরিক্ত শুকরানা নামাজ পড়লো । এইমাত্র মৃত্যুর দরোজা থেকে ফিরে এসেছে মিন্টু । মৃত্যু এরকমই, কখন যে কোথায় হঠাৎ সাঙ্গ হবে মানুষের জীবন- কেউ জানেনা ।

দ্বাদশী চাঁদের রাত শুরু হয়েছিল । ওরা নৌকায় করে চাঁদের আলোয় ভাটিতে নৌকা ছেড়ে বসে থাকলো । মাঝি ছেলেটা একটা ভাটিয়ালি গান ধরলো- ও মাঝিরে... ।  ওর কন্ঠে একটা কেমন যেন হৃদয়ছোঁয়া মাধুর্য আছে । নিস্তব্ধ নদীতে অলৌকিক লাগছিল সেই সুর ...

নৌকার পাটাতনে বসে উদাস কৃতজ্ঞ মিন্টু সেদিন আরিফকে বলেছিল – বন্ধু, কাদার চোরাবালি থেকে হয়তো মুক্তি পাওয়া যায়- কিন্তু আরো কত চোরাবালিতেই না আটকে থাকে মানুষের জীবন !  
স্মৃতি । মায়া । মোহ । ভালোবাসা । বন্ধন ।   এইসব চোরাবালি থেকে মানুষের মুক্তি নেই । যতই মুক্ত হতে চায়- ততই তলিয়ে যায় , বাড়তে থাকে গভীরতা ।
আজ এতদিন পরেও যেন সেই কথাটা কানে বাজছে আরিফের । এইযে, এখন ওরা তলিয়ে যাচ্ছে স্মৃতির চোরাবালিতে ।
এইতো জীবন । নানা চোরাবালিতে আটকে থাকা জীবন ।

[চোরাবালি/১৮-১১-২০১৩]  https://www.facebook.com/muhsin.abdullahmu/posts/10200467753970282

রবিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৩

সরে যা মেঘ

সাদা মেঘ কালো মেঘ 
কেন করিস আপ্রাণ চেষ্টা -মানুষের দৃষ্টি থেকে
চাঁদটাকে আড়াল করার ! 

ওরে বোকা মেঘ , তোরা কলংক ঢাকতে চাস ?
উহুঁ ! কালো দাগ মানেই কিন্তু কলংক নয়- 
কল্পনাবিলাসী কবির চোখে সেযেন
প্রেয়সীর ঠোঁটের কিনারায় একচিলতে তিল !

জানিনা কতটা সময় পাবো চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হবার আগে-
জানিনা কতটা সময় পরে মস্তিষ্কের কোষগুলি
হবে জরাজীর্ণ ! হয়তো নয় বেশিক্ষণ ; 

সাদা মেঘ কালো মেঘ
সরে যা যেখানে ইচ্ছে তোর , ঝরে যা বৃষ্টি হয়ে

আমি পিপাসার্ত এক ক্ষুদ্র মনের- 
আবেগী মানুষ । আকন্ঠ পান করবো আজ
চিরযুবা চাঁদের আদিম সৌন্দর্য !!

     --[সরে যা মেঘ/ ১৭-১১-২০১৩]