এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...

এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে

সোমবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

চুরি



গাড়ি জ্যামে আটকে আছে কতক্ষণ ধরে । এই সময়টায় বাচ্চাদের স্কুল ছুটি হয় , আর ধানমন্ডির এই রাস্তাটাতে ধুন্দুমার জ্যাম লেগে যায় । জ্যামে বসে থেকে বিরক্ত হতে হতে এখন সে অনুভূতিটাও কেমন থিতু হয়ে এসেছে । ভালো স্কুল মানেই কি স্কুলের সামনে জ্যাম থাকতে হবে ?
             
তবু রক্ষা যে আজকের দিনটার আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা । আকাশে কিছু সাদা মেঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে । মেঘ ছাড়া বাকিটা ঝকঝকে নীল আকাশ । জ্যামে বসে আকাশ দেখা ! কী আর করা , তাও ভালো !
জানালাটা খুলে দেয় রেখা । রুনুটা এতক্ষণ মোবাইল নিয়ে খেলছিল , গাড়ির জানালা খুলতে দেখে মোবাইল রেখে বাইরে তাকালো । আর এমন সময়ই কোত্থেকে যেন এলো লোকটা । হাতে কয়েকটা পুতুল । এমন পুতুল সত্যিই আগে কখনো চোখে পড়েনি রেখারও । রুনু চেঁচিয়ে উঠলো, এই আংকেল – একটা পুতুল আমাকে দেবে ?

রুনু ক্লাস ওয়ানে পড়ছে । পুতুল যে খুব একটা ভালোবাসে তা না । এখনকার বাচ্চারা ছোটবেলা থেকেই মোবাইল, টিভি, কম্পিউটার এইসবে আসক্ত হয়ে পড়ছে । ওদেরও বা উপায় কী ? স্কুলের সময়টা ছাড়া সারাটা দিনই তো বাসায় একপ্রকার বন্দী । খেলার মাঠ কোথায় ? খেলার সাথীই বা কোথায় ? সেই জায়গাটা দখল করছে ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতি ।   
রেখা ভেবেছিল লোকটা হয়তো তার নিজের বাচ্চার জন্য কোথাও থেকে কিনেছে পুতুলগুলি । লোকটাকে জিজ্ঞেস করে জানবে, কোথায় পাওয়া যায় । কিন্তু লোকটা এসে জানালো এগুলো বিক্রি করার জন্যই ফেরি করছে সে । লাল আর নীলের কম্বিনেশনে একটা পুতুল পছন্দ করে রুনু ।
সেই থেকে পুতুলটা ছিল রুনুর সর্বক্ষণের সঙ্গী । তুলতুলে নরম শরীর, মাথায় কী সুন্দর চুল । লাল টুকটুকে একটা ফ্রক পড়া । আর নীল রঙের চোখ দুটো কী মায়াবী ! যেন জীবন্ত বাচ্চার চোখ ।
পুতুলটা সুন্দর ছড়া আবৃত্তি করতে পারতো ! টুইংকেল টুইংকেল লিটল স্টার , কানা বগির ছাঁ, টেডি বিয়ার, আয় আয় চাঁদ মামা, ঝুমকো জবা বনের ফুল । রেকর্ড সেট করা ছিল ভেতরে, পুতুলটার কানমলা দিলে এই ছড়াগুলো আবৃত্তি করতো । ওর একটা নামও দিয়েছিল রুনু । নিজের নামের সাথে মিল রেখে পুতুলের নাম রেখেছিল ‘ঝুনু’ । যেখানেই যায় ঝুনুকে কোলে করে নিয়ে যায় । শুধু স্কুলে যাওয়ার সময় বিছানায় শুইয়ে রেখে যায় ঝুনুকে ।

এসবই একমাস আগের কথা । আপার কাছে রুনুর পুতুল কেনার কথা আগেই শুনেছিলাম । একটু আগেই ওদের বাসায় চুরির খবরটা পেলাম । বাসার সব কিছু ঠিক আছে । শুধু আপার গয়নাগুলো নেই ! আর একটা জিনিস নেই , সেটা হলো রুনুর পুতুলটা । অবাক কান্ড !
রুনুর জন্য কষ্ট বেশি হচ্ছে । পুতুলটা রুনুর খুব পছন্দের ছিল । গত মাসেই কিনেছিল । রুনুর কাছে পুতুলটার কথা কত শুনেছি । দুইমিনিট কথা বললে তার এক মিনিট রুনু কথা বলতো ওর পুতুলটাকে নিয়ে । পুতুলটাকে দেখার আমারও খুব ইচ্ছে ছিল ।
আজ রেখা আপা স্কুল থেকে রুনুকে নিয়ে বাসায় ফিরে দেখে রুনুর পুতুল নেই । সবগুলো ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোথাও না পেয়ে কিছুটা অবাকই হয় আমার বড় বোন রেখা । কানের দুল খুলে রাখতে গিয়ে টের পায় আলমারির ড্রয়ারে বাকি গয়নাগুলোও নেই । তারপরই আমাকে ফোন করে ।


আমি হলাম ওর সার্বক্ষণিক উপদেষ্টা । যেকোন সমস্যায় সে আমাকে ফোন করবেই । আর আমি যা সমাধান দেবো সেটাই করবে । আমার ওপর ওর এতটা বিশ্বাস দেখে অবাক হয়ে যাই । মাঝে মাঝে একটু ধমকও দেই, ‘তুমি নিজে একটুও চিন্তা করোনা কেন ? তোমার মাথাটা একটু খাটাতে পারোনা ?’
আবার মনে হয়, হয়তো এটাই ওর ভালোবাসা । এটা সেটার ছলে আমার সাথে কথা বলে । মা বলেন, আমি যখন ছোট ছিলাম, আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝতো না রেখা আপা । ভাইই ছিল ওর সব । বড় হয়ে আমি যখন মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে বাসা ছাড়লাম, সেকি কান্না ওর ।

আজ বেচারির সব গয়না চোরে নিয়ে গেছে । গয়নার প্রতি ওর আকর্ষণটা ছিল অদ্ভুত । সব মেয়েরই নাকি গয়নার প্রতি আকর্ষণ থাকে, কিন্তু ওরটা আমার কাছে কেমন যেন বেশি বেশি মনে হত । কে জানে, নিজের বোন বলেই হয়তোবা ! যাহোক, ওর জন্যে খারাপই লাগছে আমার ।

একটু আগে আমাকে ফোন করেই সেকি ভেউ ভেউ করে কান্না । দুলাভাইও আমাকে ফোন করে বললেন, তুমি তাড়াতাড়ি গিয়ে ওদেরকে সামলাও । কী হয়েছে দেখো । আমি শহরের বাইরে । সন্ধ্যার আগে ফিরতে পারবো না ।

কী আর করা । যাচ্ছি এখন বোনের বাসায় । রুনুও ফোনে অনেক কান্নাকাটি করলো । আহা, ওর প্রিয় পুতুলটা চোরে নিয়ে গেছে । চোরটা কীরকম বেরসিক, একটা বাচ্চার খেলনা পুতুলটাও নিয়ে গেলো !

২।
নাস্তা করছি । আপার স্পেশাল রেসিপি । চুরির ঘটনার পর গতকাল অনেক স্বান্তনা দিয়ে অবশেষে কিছুটা শান্ত করতে পেরেছি । যা হবার হয়ে গেছে, এখন কান্নাকাটি করলে কি গয়না ফেরত পাওয়া যাবে ?
রুনুর আজকে স্কুল ছুটি । আজ রুনু আমার সাথে সাপ লুডু খেলবে ।
খাচ্ছি আপার বানানো বিশেষ রেসিপির নাস্তা । এই খাবারের নাম আমি জানিনা । তবে একটু পরেই জানতে পারবো ।
আপা মনোযোগ দিয়ে টিভিতে রান্নার অনুষ্ঠান দেখে । বাজারে রেসিপির বই পেলেই কিনে নিয়ে আসে । আর ওর সব নতুন নতুন রেসিপি টেস্ট করায় আমাকে দিয়ে । ফুড ক্রিটিক হিসেবে আমি আমার মূল্যবান বক্তব্য পেশ করি । পেশ করি মানে শুধু যে মুখে বলি তাই নয়, আপার একটা ডায়েরি আছে । সেখানে ও লিখে রাখে কোনদিন কী নতুন রেসিপি রান্না করেছে ! আর তার নিচে নীল কালির একটা কলম দিয়ে খাদকদের মন্তব্য লিখতে হয় ! আপা নিজের মন্তব্য লেখে । দুলাভাইর কাছ থেকে মন্তব্য লিখে নেয় । রুনুর মন্তব্যও নেয় । আর স্পেশাল ফুড ক্রিটিক হিসেবে আমার মন্তব্য ।

খাবার যেমনই হোক, আমি সবসময় লিখি ‘অসাধারণ খাবার ! এমন সুস্বাদু খাবার আমি জীবনে খাইনি !’ তারপর নিচে একটানে আমার বিখ্যাত বাঁকা তেড়া সাইন করে দিই ।
গতরাতে সেই ‘খাদ্যবিলাস’ খাতাটা নিয়ে দেখেছি, বিগত বেশকিছু মন্তব্যে আমি এই একই কথা লিখেছি । এবার একটু হলেও নতুন কিছু লিখতে হবে ।

কী লিখবো ভাবছিলাম , এমন সময় আমার কানে এলো রেখা আপার উত্তেজিত কন্ঠ । ‘বলেন কী ভাবি ?’ আপনাকে তো জানানোই হয়নি , কাল আমারও সব গয়না চুরি হয়ে গেছে । আর রুনুর পুতুলটা ।
বলেন কী ? রিমিরও পুতুল নিয়ে গেছে ?
না না , সবকিছুই তো ঠিকই ছিল । চোর দরজা খুলেছে মাস্টার কী দিয়ে । কোনকিছুতে হাত দেয়নি ভাবি, শুধু গয়নাগুলো আর পুতুলটা । হ্যা হ্যা । ...

আরো কীসব কথা বলতে লাগলো ও । আমি চুপচাপ খেয়ে হাত ধুয়ে ফেললাম । ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে । রুনু এখন ওর রুমে একা একা সাপ-লুডু খেলছে । রুনুর কাছে গিয়ে আমি রুনুকে জিজ্ঞেস করলাম- রুনু, রিমি কে রে ? রুনু বললো – রিমি ? রিমি আমার ক্লাসের বন্ধু । মামা জানো রিমি না...’
‘রিমিরও কি তোমার মত পুতুল আছে ?’ আমি রুনুকে থামিয়ে দেই । প্রশ্নটা আমার জন্যে গুরুত্বপুর্ণ ।

আপাকে বললাম- আপা কার বাসায় চুরি হয়েছে ? আপার কাছে সব শুনে আমি  বলে দিলাম রিমি ও রিমির মাকে বাসায় দাওয়াত করতে ।

৩।
রিমি ও রিমির মা এসেছে । রিমি যে শুধু রুনুর ক্লাসমেট বান্ধবী তাই নয়, রিমির মায়ের সাথেও রেখা আপার সম্পর্ক গলায় গলায় । এখন বাচ্চাদের স্কুল গুলো শুধু বাচ্চাদের স্কুল নয়, অভিভাবকদেরও স্কুল ! বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে মায়েরা গার্ডিয়ান টেন্টে অপেক্ষা করে । পরস্পরের সাথে পরিচিত হয় । গল্প গুজব করে । অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে- বাচ্চার স্কুল বন্ধ থাকলে বাচ্চা খুশি হয়, কিন্তু মন খারাপ হয় মায়েদের !
‘আচ্ছা রিমির পুতুলটা কেমন ছিল ?’
খুটিয়ে খুটিয়ে প্রশ্ন করে বর্ণনাটা শুনলাম আমি । হুবহু রুনুর পুতুলটার মতই । আর কেনার ঘটনাটাও একই রকম । একটা হ্যাংলা পাতলা মানুষের কাছে রাস্তায় কিনেছিল । চুরি হবার ঘটনাটাও শুনলাম । আমার সন্দেহটা আরো পাকাপোক্ত হলো ।
‘আচ্ছা এরকম পুতুল কি আর কারো কাছে আছে ? মানে আর কেউ কি কিনেছিল ?’  সবার উদ্দেশ্যে প্রশ্নটা করলাম আমি ।
কিন্তু ঐ মুহূর্তে খেয়াল করতে পারলো না কেউই । 
বিকালে রুনুর সাথে কথা বলতে বলতে রুনুর বন্ধুদের কথা শুনছিলাম । তখনই রুনু জানালো যে ওর আরেক বন্ধু সিমিও একটা পুতুল কিনেছে গতমাসে । আমি রুনুকে দিয়ে ফোন করালাম সিমিদের বাসায় । আমরা আসছি । পুতুলটা যেন হাতের কাছেই রাখে ।

আমার বন্ধু আরিফকে ফোন করে সংক্ষিপ্ত ঘটনা বললাম । আমার সন্দেহের কথাও জানালাম । প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিয়ে ঘন্টাখানেকের মধ্যে হাজির হলো আরিফ । ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতির ব্যাপারে আরিফের অনেক দক্ষতা । রেখা আপা, রুনু, আমি আর আরিফ বিকাল পাঁচটা নাগাদ পৌঁছলাম সিমিদের বাসায় । রুনু আর রেখা আপাকে পুতুলটার কাছ থেকে দূরে থাকতে বললাম । পুতুলটাকে নিয়ে একটা রুমে ঢুকে আমরা ছিটকিনি লাগিয়ে বসলাম । আরিফ ওর যন্ত্রপাতি দিয়ে পুতুলটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখলো । সাবধানে খুলেও দেখলো । এই পুরো সময়টাতে পুতুলটার চোখদুটো একটা কালো কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখা হল ।

হালকা নাস্তা খেয়ে আমরা সিমিদের বাসা থেকে বিদায় নিলাম । আপার বাসায় আর গেলাম না । ‘জরুরী কাজ আছে , পরে আসছি’ বলে আরিফের সাথে চলে এলাম আমি । অন্য সময় হলে আপা চিল্লাচিল্লি করতো, কিন্তু আরিফ সাথে থাকায় শুধু একটু বিরক্তি আর প্রশ্নবোধক চোখে তাকিয়ে বাসায় চলে গেল । আমি আর আরিফ চলে গেলাম র‍্যাবের অফিসে ।
র‍্যাব কমান্ডারকে আমাদের পরিচয় দিয়ে সব কথা খুলে বললাম । অপরাধী চক্রের অবস্থান সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা আরিফ করেছিল , সেটা কনফার্ম করা হলো র‍্যাবের হাতে থাকা উন্নত যন্ত্রপাতি দিয়ে । ঠিক হলো রাত নয়টায় অপারেশন চালানো হবে । আমরা সাথে থাকার আগ্রহ দেখালাম , কিন্তু আমাদেরকে সাথে নিতে চাইলোনা র‍্যাব । কমান্ডার বললেন , ‘এরা কতবড় গ্যাং সে ব্যাপারে যেহেতু আমাদের কোন ধারণা নাই সেজন্য আপনাদের নিতে পারছি না । আর তাছাড়া কী পরিস্থিতি হবে সে ব্যাপারেও নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না’ ।

উপায় না দেখে আরিফকে বিদায় করে আমি আপার বাসায় ফিরে এলাম ।

৪।  
খেয়েদেয়ে ঘুমিয়েই পড়েছিলাম । রেখা আপার চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল । ঘড়িতে দেখি রাত ১২টা বাজে ।
‘এই ওঠ ওঠ । এই দেখ খবরে কী দেখাচ্ছে ।

চোখ ডলতে ডলতে ড্রয়িং রুমে এলাম ।
টিভিতে নিউজ দেখাচ্ছে- ব্রেকিং নিউজ ! চোরচক্রের আস্তানায় র‍্যাবের হামলা , সাতজন আটক । চুরি হওয়া বিপুল পরিমাণ স্বর্নালংকার উদ্ধার । অভিনব কায়দায় চুরি করে যাচ্ছিল এই অপরাধীচক্র । তারা অভিজাত এলাকার স্কুলের আশেপাশে বিশেষ ধরণের পুতুল বিক্রি করতো । ঐ পুতুলগুলোর চোখে সেট করা ছিল বিশেষ ধরণের সিসি ক্যামেরা । সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে ঘরের ভেতরের চিত্রধারণ করে বিশেষ ধরণের মোবাইল প্রযুক্তি ব্যবহার করে দূর থেকেই ভেতরের অবস্থা দেখে চুরির পরিকল্পনা নিত এই অপরাধীরা । গত তিনদিনে এই পদ্ধতিতে তারা দুটি বাসায় বড় ধরণের চুরি করে । গোপন তথ্যের ভিত্তিতে আজ তাদের আস্তানায় অভিযান চালায় র‍্যাব । এসময় র‍্যাবের সাথে সন্ত্রাসীদের বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি বিনিময় হয় । র‍্যাব ঘটনাস্থল থেকে সাত জনকে গ্রেপ্তার করেছে । এছাড়া স্বর্ণালংকার সহ চুরি করা মূল্যবান জিনিসপত্রের সাথে কয়েকটি কম্পিউটার ও বিভিন্ন ধরণের প্রযুক্তিপন্য উদ্ধার করা হয় । অপরাধীচক্রের আস্তানা থেকে জব্দকৃত কম্পিউটারে থাকা সকল ভিডিও নষ্ট করে ফেলা হয়েছে । উদ্ধারকৃত অলংকারসমূহ অতি শীঘ্রই মালিকের কাছে হস্তান্তর করা হবে ।

‘হায় আল্লাহ্‌ ! রুনুর পুতুলের চোখে সিসি ক্যামেরা ছিল ?’ আর্তনাদ করে উঠলো রেখা আপা ।
আপার আর্তনাদকে পাত্তা না দিয়ে আমি বললাম , ‘কাল সকালে তো তোমার গয়না পেয়ে যাচ্ছ । এখন নতুন কী রেসিপি রেঁধে গুণধর ভাইয়ের উদরপূর্তি করবে সেই চিন্তা করো আপা । সকালে ডাক দিও, আমি ঘুমাতে গেলাম’ !

নষ্ট সময়ের কেত্তন !

আজকাল
বুক ভরে শ্বাস নিতে পারিনা । 
বড় কষ্ট হয় । বিষাক্ত চেতনার হাওয়া-
ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে ।
পত্রিকার পাতায়, 
নেতার বক্তৃতায়,  
মধ্যরাতে টিভির পর্দায় 
বুদ্ধিবেশ্যাদের জ্ঞানপাপী বয়ানে,
সাড়ে আটটার রেডিও সংবাদে । অফিস কক্ষে 
কলিগের আলাপচারিতায়, 
চায়ের দোকানের অমীমাংসিত আড্ডায় ।
ইতিহাসে, 
ঐতিহ্যে,  
গল্পে, 
এবং উপন্যাসেও । 
.
এক মুঠো শুদ্ধ বাতাসের সন্ধানে- খুলে বসি কবিতার বই 
অথচ কী অদ্ভুত ! কবিতার বইও আর 
ঝকঝকে সাদা নেই ! জমাট বাধা হিংসা আর পরশ্রীকাতরতা 
প্রতিস্থাপন করেছে কৃষ্ণচূড়াকে ।
কালো অক্ষরগুলো হতে উঠে আসছে 
অসহ্য দুর্গন্ধ ! তবে কি 
আমাদের কবিরাও লিখে চলেছেন- 
নষ্ট সময়ের কেত্তন ?

রবিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

নির্লিপ্তির সুখ !

এটা করতে হবে,
ওটা করতে হবে,
কোটি মানুষের এই শহরে 
এভাবেই পেরিয়ে যায় কর্মব্যস্ত দিন ।
তারপর সূর্যটা ডুবে গিয়ে- রাত এলে পৃথিবীর বুকে
আমি নির্লিপ্ত হয়ে যাই; অন্ধ বধির ধ্যানমগ্ন দরবেশ  
কিংবা   
নিশুতি রাতের মতই ।  

যদি কিছু চেয়ে থাকি, চেয়েছি 
যদি কিছু পেয়ে থাকি, পেয়েছি । দিনশেষে,
নাইবা করলাম চাওয়া আর পাওয়ার হিসাব !

যা পাইনি হয়তো পেয়ে যাবো ; কিংবা পাবোনা-
এর বেশি কিছু তো নয় !
নাইবা করলাম যোগ বিয়োগের অংক 
ভবিষ্যতের খেরোখাতায় ! 

রাত্রির গভীরতা নিয়ে আসে সুমধুর এশার আযান, 
ঝিঁঝিঁ পোকার নিরন্তর ডাক  
জিবরিলের ডানার মত অদৃশ্য পাখায় 
অদ্ভুত এক সুখ বুকে চেপে ধরে- ঘুমোতে যাই আমি- 
নির্লিপ্তির সুখ ।

শনিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

নারীর শত্রু নারীই, পুরুষ নয়

ইদানিং অনেককেই নারীবাদী লেখা লিখতে দেখা যায় । গড়ে উঠেছে নারীবান্ধব ব্লগও । এগুলোতে নারীদের ব্যাপারে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে দেখা যায় লেখিকাদের । এবং অবধারিতভাবে শেষমেষ পুরুষ জাতের ওপর দোষ চাপিয়ে আক্রোশ ঝাড়া হয় । (এটাকে আমি মেয়েলী স্বভাবের স্বাভাবিক প্রকাশ হিসেবে দেখি)
মেয়েরা সচেতন হোক, নিজেরা নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলুক, আদায় করুক এটা আমি ভালোভাবেই চাই। কিন্তু সেই সাথে যে প্রশ্নটির দিকে নজর ফেরাতে বলি সেটা হলো , তীর ছোড়ার আগে নিশ্চিত হতে হবে 'মেয়েদের শত্রু কে?'

চর্মচক্ষে পুরুষকেই শত্রু মনে হতে পারে। সেজন্য হাত পা ছোড়াছুড়ি করা হয় পুরুষদের উদ্দেশ্যেই ।(আমার ছোটবোনকে দেখতাম কান্নাকাটি করার আগে হাত পা ছোড়াছুড়ি করতে)

কিন্তু আমি বলি মেয়েদের শত্রু মেয়েরাই । পুরুষ নয় ।

প্রথম কথায় আসি গায়ের রঙ নিয়ে । এ ব্যাপারে নারীবাদি লেখিকাদের অভিযোগ, পুরুষরা গায়ের রঙ কে বেশি গুরুত্ব দেয় । তারা 'আগে দর্শনধারী পরে গুণবিচারী' নীতিতে বিশ্বাসী ।
বাস্তব কী বলে ? বাস্তবে দেখা যায়, বাড়ির বউয়ের চামড়ার রঙ নিয়ে স্বামী শ্বশুড় কারো বিকার নেই , যত গঞ্জনা খোটা আসে শাশুড়ী-ননদ-জা-প্রতিবেশি মহিলাদের কাছ থেকে । অমুকের বউটা কালো বা শ্যামলা এ নিয়ে পুরুষদের কথা বলতে দেখা যায়না । জটলা পাকাতে দেখা যায় পাড়ার মহিলাদেরকে ।
স্বামীর কোন খেদ নাই, যত খেদ শাশুড়ী ননদ দের মনে ।
অনেক রাজপুত্রের মত সুন্দর ছেলেকে (আমার ভাই বেরাদার কাজিনদের মধ্যে যারা বেশি সুন্দর তাদের বউ কালো/শ্যামলা) কালো বউ নিয়ে সুখে থাকতে দেখছি । অসুখী কে ? অসুখী হলো চাচী খালা নানী দাদীরা ।
কালো মেয়েদের যদি বিয়ে না হত তাহলে তো কালো মেয়েরা সবাই অবিবাহিত থেকে যেত । তেমনটা হয়েছে কি ? তাহলে আর ছেলেদের দোষারোপ কেন ?
ছেলেদের কার কোন্‌ গুণ ভালো লাগে বলা মুশকিল । কিন্তু বাজারে উজ্বল চকচকে কাপড়ের দিকে নজর বেশি দেয় মেয়েরাই । ছেলেরা ফুটপাত থেকে টিশার্ট কিনেই দিনের পর দিন কাটিয়ে দেয় । তারা টেকসই ব্রান্ডের জিনিস কেনে ।

খালার বাসায় দেখেছিলাম সুন্দর হাতের কাজ করে ওয়ালম্যাট বানিয়ে টাঙিয়েছে খালাতো বোন ।
'জাতের মেয়ে কালোও ভালো, নদীর জল ঘোলাও ভালো।'
কালো মেয়েকে নদীর ঘোলা জলের সাথে তুলনা কে করেছে ? এটা তো মেয়েদের নিজস্ব হীনম্মন্যতা । ছেলেরা কেউ তো বলেনি !

কালো মেয়েকে বাবা মায়েরা একটু বেশিই আদর করেন । ভাবেন, পরের বাড়িতে মেয়েটাকে কী গঞ্জনা সইতে হয় কে জানে ? আগেই বলেছি, সেই গঞ্জনা কে দেয় ? 'ও বাড়ির' শাশুড়ী ননদেরা । স্বামী বেচারা নয় । ছেলের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে গেলে যদি কালো বা শ্যামলা হয় , কে আগে ভেটো দেয় ? মা অথবা বোন । বাবা, ভাইয়েরা নয় । (তা যত বড় ইসলামপন্থি নেত্রী বুজুর্গ রাবেয়া বসরীই হোন না কেন এই ব্যাপারে সব শিয়ালের এক রা ।)
ছেলের জন্য একটা লাল টুকটুকে বউ আনার গল্প ছোটবেলা থেকে কে শোনায় ? নিশ্চিত করে বলতে পারি, বাবারা শোনায় না ।

সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ দোষেরও নয় । মেয়েরা কি চায়না তার স্বামীটা সুন্দর স্মার্ট হোক ? মেয়ের  বাপ দেখে ছেলের এস্টাবলিশমেন্ট , টাকা পয়সা । মেয়ে কী দেখে ? মেয়ে তো বাবার সাথে পুরোমাত্রায় একমত , সেই সাথে তাদের চাই সুন্দর স্মার্ট ছেলে । কে অস্বীকার করতে পারবে ?
আর মেয়ে যদি একটু সুন্দর হয় তাহলে তার দাম বেড়ে যায় অথবা বাড়িয়ে দেয়া হয় কয়েকগুণ । মেয়ের মা বলবেন, আমার মেয়ে লাখে একটা । যার তার হাতে দেবো কেন ? মেয়ে কি ভাইসা আসছে ?

ওয়েল । আসি দ্বিতীয় ব্যাপারে । ইসলামে পিতা মাতা ও স্বামীর সম্পত্তিতে নারীর উত্তরাধিকার স্বীকৃত । যথাযথভাবে এই অধিকার দেয়ার ব্যাপারে পুরুষদের গাফলতি আছে । এ ব্যাপারে আমি আগেই লিখেছি (http://goo.gl/iJHWnX) । কিন্তু নারীদের ভূমিকা কী? ননদ যদি তার সম্পত্তির দাবি তোলে তাহলে প্রথমেই গর্জে ওঠে ভাইয়ের বউরা । তারা ননদকে বাঁকা চোখে দেখে । ভাই যদি বোনকে তার অধিকার বুঝিয়ে দিতে চায়, প্রথম বাধা আসে বউয়ের কাছ থেকে । যে ননদ তার প্রাপ্য সম্পত্তি নিয়ে যায়, বাবার বাড়িতে তার কদর কমে যায় । আর এসবের মূলে থাকে ঐ 'মেয়েরাই' । ভাইয়ের সাথে বোনের সম্পর্ক থাকে ভাইয়ের সাথে ভাইয়ের সম্পর্কের চেয়ে বেশি গভীর । ভাই চায় বোনের খুশি । চায়না কে ? চায়না ভাইয়ের বউ ! একই মেয়ে নিজে তার ননদের কাছে যেরকম ব্যবহার আশা করে, নিজের ননদের সাথে তেমন ব্যবহার করেনা । একই নারী তার মেয়ের শ্বশুড় বাড়িতে যেমন আচরণ আশা করে, নিজের ছেলের বউয়ের সাথে তেমন ব্যবহার করেন না । একই মেয়ে তার ভাবি দের কাছে যেমন আচরণ আশা করে, নিজের ননদের সাথে তেমন আচরণ করেনা ।
অনেকটা শর্ট সাইটেড এবং আত্মকেন্দ্রিক, ক্ষুদ্র গন্ডিতে আবদ্ধ চিন্তাভাবনা তাদের । একটা স্বামী, দুটো বাচ্চা আর চার রুমের একটা বাসাকেই তাদের পৃথিবী বানিয়ে ফেলে । সমস্ত চিন্তাভাবনা ঘুরপাক খায় পনেরশ স্কয়ার ফিটের ভেতর । দুজন বান্ধবীর দেখা হলে আলোচনার নব্বই ভাগ জুড়ে থাকে শাড়ী গয়না বাচ্চা শ্বশুড় শ্বাশুড়ী আর পাশের ফ্ল্যাটের ভাবী । এর কথা তাকে লাগানোতে জুড়ি নেই নারীদের । সে তুলনায় ছেলেদের চিন্তাভাবনা অনেক ব্রড ।  উদারতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ছেলেদের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য । এক্সেপশন মে নট বি আন এগজাম্পল ।

তো সেজন্য পুরুষদের উদ্দেশ্যে ক্ষোভের বয়ান না দিয়ে নারীদের উচিত্‍ ঘরের শত্রুকে জানা । আগে নিজেদের ঠিক করা । 

বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

পাঠকের বিশ্লেষণঃ কবিতা কী করে তার পাঠক হারালো ?

সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার মধ্যে কবিতা যে এখন একটা অজনপ্রিয় ধারায় পরিণত হয়েছে সেটা যে কেউ স্বীকার করতে বাধ্য হবেন । জীবনে একটা উপন্যাসও পড়েননি এমন লোক হয়তো সহজে খুঁজে পাওয়া যাবেনা । কিন্তু জীবনে একটাও কবিতার বই পড়েননি এমন মানুষ হাত বাড়ালেই মিলবে । কেন?  অথচ মানুষের সহজাত প্রবণতাই কবিতা । সাহিত্যের পথচলা শুরুই হয়েছে কবিতা দিয়ে । বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে প্রাচীন যে চর্যাপদ খুঁজে পাওয়া গেছে, সেটাতো একটা কবিতার বই ! শিশুকে কোলে নিয়ে মায়েরা প্রথমে কী শোনায় ? উপন্যাস, গল্প নাকি ছড়া-কবিতা ?

বাংলা সাহিত্যের একমাত্র নোবেল পুরস্কারটি এসেছে কিসে ? গীতাঞ্জলী কি কোন উপন্যাসের নাম ? বাংলায় যে সাহিত্য বলে কিছু আছে সেটা বিশ্ববাসী জানে রবিঠাকুরের কল্যাণে । রবিঠাকুরের মত মেধাবী কবি বাংলা সাহিত্যে আর আসবেন কিনা বলা মুশকিল । অথচ রবিঠাকুর একজন স্বার্থক ঔপন্যাসিক ছিলেন কিনা তা নিয়ে বিতর্ক করার সুযোগ রয়ে গেছে ।
প্রশ্ন হলো, কবিতা কী করে ক্রমে ক্রমে অজনপ্রিয় হলো ? এইযে কবিতার পাঠক কমে গেছে, এর দায় কি পাঠকের রুচির নাকি কবিদের ? এই প্রশ্নটা নিয়ে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে ।

আমি এর দায় কবিদের ওপরই বর্তাবো ।

কবিদের প্রথম দায় হচ্ছে, তাঁরা কবিতাকে দিনে দিনে দুর্বোধ্য করে তুলেছেন । সাধারনের ভাষা থেকে তুলে এনে করেছেন পুরোহিতের ভাষা । বেছে বেছে অপ্রচলিত ও কঠিন শব্দ ব্যবহার করার একটা রেওয়াজ চালু করেছেন কেউ কেউ । অবস্থাটা এমন, নিজে কবি না হলে, কবিতা বোঝার সাধ্য কারো নেই । কবিতায় ব্যবহৃত শব্দাবলীর অর্থ জানার জন্য- হয় বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রীধারী হতে হবে, অথবা অভিধান হাতে নিয়ে বসতে হবে । ফলে সাধারন ধারণাটা এমন দাঁড়িয়েছে, কবিতা মানেই অর্থহীন কথামালা । কিন্তু মানুষ তো ভাষাজ্ঞান অর্জনের জন্য কবিতা পড়ে না । অবসর সময়ে কিছু পড়ে যেন ভালো লাগে, যেন জীবনের কথা, আবেগের কথা, সমাজের কথা, পৃথিবীর কথা খুঁজে পাওয়া যায় সেজন্যই মানুষ কবিতা গল্প পড়ে । কবিতা যদি হয় অর্থহীন কিছু কঠিন শব্দের সমাহার, মস্তিষ্ককে সহজ করার চাইতে যদি আরো ব্যস্ত করে দেয় তাহলে মানুষ কবিতা পড়বে কেন ?

দ্বিতীয় কারণ হিসেবে বলা যায়, কবিতায় অশ্লীলতার প্রয়োগ । অনেকেই নারী অঙ্গের বর্ণনাকে কবিতার অবিচ্ছেদ্য অংশ বানিয়ে ফেলেছেন । কবিতা মানেই সেখানে কিছুটা অশ্লীল ইঙ্গিত থাকবে, নারীর শরীরের বর্ণনা থাকবে, কোন কিছুর সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গেলেই তাকে নারীর সাথে তুলনা করতে হবে, এছাড়া যেন কবিতাই হবেনা ! একটা কবিতার বই সবার সামনে বসে নির্ভয়ে পড়তে পারা যায় না । কারণটা ঐ, কারো হাতে পড়লে নিশ্চিত তিনি খারাপ একটা ধারণা পাবেন । ‘বসে বসে এইসব পড়া হয় ?’  ফলাফল- ‘পাঠকের মৃত্যু’ ।

তৃতীয় কারণ বলা চলে, অতিমাত্রায় আমি তুমির ব্যবহার । কবিতার বিষয়বস্তু হিসেবে অতিমাত্রায় প্রেম এবং বিরহের ব্যবহার । এখানে অবস্থাটা এমন, যেন কবিরা এর বাইরে চিন্তা করতে জানেনই না ! জনমনে প্রচলিত হয়েছে যে, ‘ছ্যাকা না খেলে কবি হওয়া যায়না’ ! যদিও এটা একটা সত্য কথা যে, কৈশোরে নারী পুরুষের পারস্পরিক আকর্ষণের সূচনাপর্বেই সাধারণত মানুষ জীবনের প্রথম কবিতা লেখে । আর স্বাভাবিকভাবেই সেই কবিতার বিষয়বস্তু হয় 'তুমি' কিংবা 'তোমাকে চাই' ! সে কারণেই দেশে কাকের চেয়ে কবির সংখ্যা বেশি, কেঁচোর চেয়ে গায়কের । কিন্তু সব কবিতায় সারা জীবন ইনিয়েবিনিয়ে সেই নারী পুরুষের পারস্পরিক আকর্ষণ নিয়ে কথা বলাটাই কবিতার প্রধান বিষয়বস্তু হওয়াতে কবিতার পাঠক কমেছে । আবেগ কিছুটা স্তিমিত হয়ে গেলে আর কবিতা টানেনা প্রেমিককে । একটা জরিপ যদি করা হয়, বিবাহিত মানুষেরা কি কবিতা পড়েন ? এর উত্তরটা মোটামুটি নেতিবাচক হবার সম্ভাবনাই বেশি । 

চতুর্থ কারণ হিসেবে বলা যায়, পাঠ্যপুস্তকে কবিতার অন্তর্ভুক্তি এবং এই কবিতার ব্যাখা বিশ্লেষণের ‘ভার’ কিংবা ‘বোঝা’ কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের ওপর চাপানো । মানুষ কবিতা পড়বে মনের আনন্দে, কিন্তু তা না করে পাঠ্যপুস্তকে এগুলোকে এমনভাবে যুক্ত করা হয়েছে, যেন সেগুলো শিক্ষার্থীদের কাছে অতিরিক্ত ‘বোঝা’ মনে হয় । ‘এই বাক্যাংশ দ্বারা কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন ?’  পরীক্ষায় এরকম প্রশ্নের উত্তর লিখতে লিখতে একজন শিক্ষার্থীর স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়, যেন কবিতা মানেই একটা ক্যামোফ্লেজ ! যেটা বলা হচ্ছে, আসলে সেটা তার মূল অর্থ নয় ! মূল অর্থ অন্য কিছু, যেটা গাইড বই পড়ে মুখস্ত করতে হয় ! কবিতা মানেই তার একটা গূঢ় অর্থ থাকতে হবে !
এটা তার ভেতর কবিতার ব্যাপারে একটা নেতিবাচক প্রেরণা সৃষ্টি করে ।


ওয়েল । এবার আসি আরেকটি কারণ সম্পর্কে । কবি মানেই যেন উদাস ভাবুক কেউ । দুনিয়া সম্পর্কে উদাসীন অথবা লেখালেখি করাই তার কাজ ! হ্যা, ভাবুক হওয়াটা দোষের নয় বরং গভীরভাবে ভাবতে পারাটা খুব ভালো একটা গুণ । কবিদেরকে আমার ভালো লাগে এজন্য যে, আমার মনে হয়- কবিরা মানুষের জীবনকে খুব গভীর থেকে চেনেন । মানুষের জীবনের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে সাধারণত কবিদের ধারণা থাকে বেশ স্পষ্ট । তারা মানুষের আবেগ অনুভূতির গভীরে প্রবেশ করতে পারেন, মানুষের আত্মাকে জাগিয়ে তুলতে পারেন । আর অনুভূতির স্কেলে যদি মানুষকে বিচার করা হয় তবে কবিদের অবস্থান থাকবে একেবারে শীর্ষে । কারণ, কবিদের অনুভূতি হয় খুব প্রখর ! একজন কবি একই সাথে হয়ে থাকেন একজন দার্শনিক । চলমান জীবন ও সময়কে তাঁরা তীক্ষ দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করেন । একটা পাকা ফলের হলদে বোঁটা দেখে কেউ হয়তো ভাবে, ‘ফলটা খাওয়ার উপযুক্ত হয়েছে’ , কিংবা ‘যেকোন সময় এটি ছিঁড়ে পড়বে’ । আর কবি ভাবেন, মানুষের জীবনটাও তো এমনই । যতই বয়স বাড়ে, যতই পাক ধরে চুলে , ততই দুর্বল হয়, শিথিল হয় সম্পর্কের বোঁটা । তারপর একদিন চলে যেতে হয় বোঁটাছেড়া ফলের মত ।(সমস্যা হচ্ছে, কখনো কখনো কবিরা ছোটখাট ব্যাপারে অতিমাত্রায় সেন্সিটিভ হয় এবং সাধারণ কথাকে ঘুরিয়ে পেচিয়ে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে জটিল বানিয়ে তোলে ।)

প্রশ্ন হচ্ছে, ইতিহাসে কোন কবি কি রাজনীতিক ছিলেন ?  একজন কবি কেন রাজনীতিক হবেন না? কেন একজন কবি অন্যকোন গুরুত্বপূর্ণ কিংবা ব্যস্ততম দায়িত্ব পালন করবেন না ? একজন ডাক্তার কেন কবি হবেন না ? একজন ব্যাংকার কেন কবিতা লিখবেন না ? একজন সৈনিক, একজন রাজনৈতিক নেতা, একজন ইঞ্জিনিয়ার কেন কবি হবেন না ? তারমানে কি এটাই যে, কবি হলে তার আর সমাজ রাষ্ট্রের কাজ করা যাবেনা ? কবিরা সমাজ রাষ্ট্রের বড় দায়িত্ব পালন করতে পারেন না?
কবি মানেই উদাসীন কেউ, এই বাস্তবতাটা যে ধারনা সৃষ্টি করে সেটা পরিশেষে কবিতার জন্য খারাপ হয় । এর অর্থ দাঁড়ায়, কবিতা লেখা কিংবা কবিতা পড়াটা অকর্মণ্য অলস উদাসীন লোকদের কাজ । স্বাভাবিক ব্যস্ত মানুষের জন্য কবিতা উপযুক্ত নয় !
অথচ ধারণাটা উল্টো হওয়াটাই উচিত ছিল । কবিতা পড়তে খুব অল্প সময় লাগে, কবিতাকে তাই বলা যেতে পারে ব্যস্ত মানুষের সাহিত্য ।  অন্তত আমি তাই মনে করি । একটা ব্যাপার বোঝানোর জন্য একটা উপন্যাসে হয়তো তিনশ পৃষ্ঠার প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু একটা কবিতায় সেই ব্যাপারটা হয়তো বুঝিয়ে দেয়া যেতে পারে এক পৃষ্ঠাতেই !

তবে হ্যা, এই সবকিছুর পরিবর্তনের জন্য প্রথমে কবিদেরকে নেমে আসতে হবে সাধারণ মানুষের কাতারে । কথা বলতে হবে সাধারণ মানুষের ভাষায়, পুরোহিতের ভাষায় নয় ।
(এইসব কারণের পক্ষে আমি প্রথিতযশা কবিদের জীবন থেকে উদাহরণ দিতে পারতাম । কিন্তু ইচ্ছে করেই কারো নাম নিলাম না।)

মঙ্গলবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

বেশ আছি !

বেশ আছি , কারণ -
বেশি কিছু চাইনি । আশা করিনা তাই হতাশাও নেই 
এক মুঠো পান্তা, এক চিলতে লবণ 
গনগনে আগুনে পোড়া একটা লালচে মরিচ 
ক্ষুধা নিবারণের জন্যে এর চেয়ে বেশি কিছু 
আছে কি প্রয়োজন ? 

আমি তো রাক্ষস নই ! 

সেলাই করবো মুখ !

এত বড় হয়ে গেছিস , এখন আর
এইসব ছেলেমানুষি-
মানায় না তোকে ।
আচ্ছা বল্‌তো, কবে তোর
এতটুকু আক্কেল হবে ?
.
সমালোচনার আগুনে জর্জরিত হই প্রতিনিয়ত
মনে হয়
একটা ভারিক্কি ভাব, খটমটে চোখ
আর সেলাই করা মুখ - এখন আমার
খুব দরকার ! নইলে যে তোমাদের চোখে
যেন আমি
ভিনগ্রহ হতে নেমে আসা এক
অপাঙক্তেয় আগন্তুক !
.
হে অগ্রজ,
এই দুর্মূল্যের বাজারে কে আমায় এনে দেবে
একটা সেলাই মেশিন
স্বল্পমূল্যে ?

কেশ বলি !

কান এবং চোখ পেরিয়ে ওরা নেমে আসে
অবাধ্য ঝর্ণার মত
আর তোমাদের অধৈর্য কন্ঠে উৎপন্ন হয়
একঘেয়ে বাক্যাবলী-
'ঘুঘুর বাসা নাকি?'
.
গাঁটের পয়সা খরচ করে মাসে মাসে
বলি দিয়ে আসি বাড়ন্ত শিশুদের
পাষাণ জল্লাদের মত নিষ্ঠুর নাপিতেরা
মনের আনন্দে হত্যা করে চলে বলির পাঠা
খচ খচ শব্দ কানে আসে বোমারু বিমানের মত
যেন ইজরাইলি নরপশুরা গনহত্যা চালায়
অবরুদ্ধ গাজায় !
.
ফিনিক্স পাখির মত ওরা তবু ফিরে আসে পুরনো পথে
তারপর আবার তোমরা বর্বর হয়ে ওঠো
আওয়ামী সন্ত্রাসীর মত ! হুংকার দিয়ে বলে ওঠো
'ঘুঘুর বাসা নাকি ? আজই কেটে ফেলো ওদের !'
.
অথচ তোমরাই ; বেশ জানি - আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
মাথায় হাত বুলিয়ে অস্ফূটে বলো -
একদিন , হা একদিন - ছিল-
আমারও !

সোমবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

ব্যর্থ জনম !

ঘরে ফিরি ঘর্মাক্ত অবয়বে 
স্যান্ডো গেন্জি-শার্ট লেপ্টে আছে 
বুকে ও পিঠে
সর্বশক্তি নিয়ে ঘুরতে থাকে ফ্যানটা। দারুণ ব্যস্ত হয়ে,      
এতটুকু শীতলতা দিতে আমার- 
ফুটন্ত শরীরে । ঘরকুনো বউয়ের মতোন !
পুবালী হাওয়া তেড়ে আসে পুবের জানালায় 
যেন তারও আছে কিছুটা অধিকার- শীতল চাঁদরে-
আমাকে জড়িয়ে নেয়ার !

হতাশ চোখে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে শুধু 
দখিন জানালাটা । একটা দশতলা ভবন রুদ্ধ করেছে তার 
আলো বাতাসের পায়ে হাটা পথ ।
ইট পাথরের এই শহরে ওর জন্ম যেন একটা ট্রাজেডি  
দখিন হাওয়ার ছোয়া না পেলে 
কীইবা স্বার্থকতা থাকে 
একটা বাতায়নের ?
কিছু না দিয়ে গেলে পৃথিবীকে; কিংবা  
মানুষ এবং মনিবের প্রয়োজনে 
না করতে পারলে কিছুই-  
কীইবা মূল্য থাকে
একটা জীবনের ? 

রবিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

ঘূণপোকার অট্টহাসি !

ঘূণপোকা হওয়া কতটা আনন্দের 
ও তোমরা বুঝবে না । জ্বিন এবং ইনসানরা যখন  
বেগার খেটে যাচ্ছিল দিনের পর দিন  
আমরাই দেখিয়ে দিয়েছিলাম-  
মরে গেছেন নবী সুলাইমান  
শতবছর আগে !
কত রাজা বাদশার খাট পালঙ্ক সিন্দুক 
(ঠিকঠাক রেখে বাইরের চাকচিক্য)  
কুরে কুরে খেয়েছি ক্লান্তিহীন; যুগ যুগ ধরে-   
মনের আনন্দে ! 

আর মানুষ ? 
মানুষের শরীরেও বাসা বেঁধে আছি কতকাল    
ব্যাকটেরিয়া ভাইরাস নামে ! পরাজিত করেছি বারবার-   
আশরাফুল মাখলুকাত । ঠুনকো করেছি 
মানুষের অহংকার !

তারপর নিজেরাই 'অহংকার' হয়ে 
ঢুকে পড়েছি ওদের মনের ভেতর ।  
এ এক আশ্চর্য বিজয় ! অবর্ণনীয় সুখ ! এভাবেই আমরা
ধ্বংস করে চলেছি ক্রমাগত  
মানুষের আত্মাও !  

শনিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

বিএসএফ এর কাছে বিজিবির প্রশিক্ষণ?

জঙ্গলের এই অংশের নাম বঙ্গা। এই অংশের বেশিরভাগ অধিবাসী ছাগল ও মুরগী। ছাগলগুলো বেশিরভাগই বেঙ্গল জাতের। অল্প কিছু বড় ছাগল আছে , এরা রামছাগল। এরা অন্য ছাগল ও মুরগীদের শাসন করে। মাঝে মাঝেই বোকা মুরগীগুলো গ্রামের সীমানায় চলে যায়। আর ইন্ডার হিংস্র কুকুরের হাতে মারা পড়ে। ইন্ডা হলো বঙ্গার পাশের এলাকা। ঐ এলাকায় কুকুরদের বাস। ইন্ডা শাসন করে নেকড়েরা। প্রতি বছর কয়েকশ মুরগী মারা যায় কুকুরদের হাতে। বিশেষ করে ইন্ডা সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর কুকুরদের হাতে।

বঙ্গা এলাকাটা ছোট। কিন্তু এই এলাকাটাকে শান্তিতে থাকতে দিচ্ছেনা ইন্ডা। বঙ্গার ছাগলদের ভেতর আছে ইন্ডার চর। তারা বঙ্গার খবরাখবর ইন্ডাতে পাচার করে। বঙ্গার রামছাগলগুলোর সাথে ইন্ডার নেকড়েগোষ্ঠির নাকি ভালো সম্পর্ক। অবশ্য এই সম্পর্ক পুরোটাই একতরফা। বঙ্গার রামছাগলগুলো শুধু দিয়েই যায়, ইন্ডার নেকড়েদের কাছ থেকে বিনিময়ে কিছুই পায়না। সামান্য পানিও নয়। আর বেঙ্গল জাতের ছাগলগুলো এই ব্যাপারে কোনরকম ম্যা ম্যাও করেনা। মুরগীরাও কুক কুরু কু করেনা।

বঙ্গা এলাকার মুরগিগুলোকে ইন্ডার কুকুরদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যে সীমানার দিকে কিছু প্রশিক্ষিত ছাগলকে বিশেষভাবে পাহারায় রাখা হয়েছে বহুদিন ধরে। যদিও এতে খুব একটা ফল হচ্ছেনা। ছাগলরা ইন্ডা থেকে চোরাচালানি বন্ধ করতে পারছেনা।

সম্প্রতি দৈনিক 'ছাগল সমাচার' পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, সীমান্ত রক্ষী প্রধান ছাগল জানিয়েছে, বঙ্গার সীমান্ত প্রহরী ছাগলগুলোকে ইন্ডার কুকুরদের কাছে প্রশিক্ষণ নিতে পাঠানো হবে, কীভাবে মুরগি পাহারা দিতে হয়!
এই খবর পেয়ে বঙ্গার মুরগিগুলো যারপরনাই খুশি!

খবরঃ বিএসএফ এর কাছে প্রশিক্ষণ নিতে যাবে বিজিবি ! (সূত্রঃ দৈনিক ইত্তেফাক, ২৬ আগস্ট)

পাষাণ !

জানিনা কে ফেলে দিয়েছিল ওকে । অনাদরে
কিংবা আদর শেষে
আমি শুধু জানি, পিষ্ট হয়েছিল আমার পদতলে-  
একটি গোলাপ ।
শব্দেতর তরঙ্গের সে আর্তনাদ 
আজো কানে বাজে  
হোকনা মনের ভুলে, অসতর্ক পায়
তবু তো মথিত হয়েছে- আমারই জুতোর তলায়-  
একটা গোলাপ ! 

এতটা পাষাণ আমি
কী করে হলাম ?   

শুক্রবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

জীবন কি একটা সিটিবাস !

ঐ গুলিস্তান মতিঝিল আরামবাগ !
গুলিস্তান মতিঝিল আরামবাগ !
বিহঙ্গ নামের একটা সিটিবাস
এসে দাঁড়িয়েছে রাস্তার পাশে । উঠে যাই
ঘোরলাগা মানুষের মত । একা নই, অনেকেই আছে 
অচেনা মুখের সারি ।
'পিছনে যানগা সিট খালি আছে । নামায় দিমু জায়গা মতন ।'
হাঁক ছাড়ে চ্যাংড়া হেল্পার 
আমরাও যে যার মত তড়িঘড়ি করে বাগিয়ে নিই 
একটা সিট ।
'মামা ভাড়াডা লন দেহি'। হাত বাড়িয়ে   
তাড়া দেয় কন্ডাক্টর । রংচটা জিন্সের প্যান্ট,
হাওয়াই শার্টটা হয়তো ধোয়া হয়নি কয়েকটা দিন
অলসতা,  কর্মব্যস্ততা কিংবা 
পোষাকের অপ্রতুলতায় ।
ঐ ব্যাটা দুই টেহা বেশি রাখছোচ ক্যান ? তগো হইছেটা কী ,
পেত্যেক দিন ভাড়া বাড়াইতাছোস !
খেকে ওঠে কেউ কেউ । ওস্তাদ ব্রেকে রাখেন, মহিলা নামার আছে ।
হেল্পার চ্যাংড়াটার হাকডাকে ভদ্রবেশী যাত্রীদের চোখ
হঠাৎ ছুটে যায় গাড়ির দরজায় !  পেছনের সিটে মধ্যবয়সী একজন
চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করে চলে
অবৈধ সরকারের ।
'ভাই একটু সাবধান থাইকেন, দিনকাল ভালা না !'  নিচু কন্ঠে 
সতর্ক করে শুভাকাঙ্খি কেউ । আরো চড়ে ওঠে
বক্তার গলা । কাউরে ডরাই নি আমি ?
পাশের সিটের উদ্বিগ্ন যাত্রী
মোবাইল ফোন কানে ধরে ফুঁপিয়ে ওঠে হঠাৎ । ইন্নালিল্লাহে
ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন ।


**
তারপর জিগাতলা সাইন্স ল্যাব কাটাবন পেরোলে 
হন্তদন্ত হয়ে নেমে যাই আমরা
যার যার গন্তব্যে ।
আচ্ছা- 
জীবনটা কি 
ভোর হতে রাত অবধি ছুটে চলা 
একটা সিটিবাস ? এইভাবে ওঠা আর নামা ! 
এইসব দুনিয়াদারী কি তবে অহেতুক 
কন্ডাক্টরের সাথে
দুটাকার ঝগড়া ?  

বৃহস্পতিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

ভয়ে আছি খুব !

ভয় আমাকে তাড়া করে ফেরে নিত্যদিন 
যদি আমিও একদিন হয়ে যাই
ক্ষুধিত পাষাণ ? 
যদি আমিও ভুলে যাই দয়া মায়া স্নেহ
মণি মুক্তোর লোভে বিকিয়ে দেই 
আমার অশ্রুজল ! যদি অট্টালিকার পানে চেয়ে
ভুলে যাই আমার কুড়েঘর,
মরচে ধরা লালচে টিনের চালা ? কিংবা  
ক্লিওপেট্টার সন্ধান পেয়ে যদি কোনদিন ভুলে যাই আমার
শ্যামলা বরণ জননীকে ?
যদি তুলে দেই উঠোনের লালশাক ভিনদেশি বণিকের হাতে 
উচ্চমূল্যের লালসায় ?
যদি কোনদিন, সোজন বাদিয়ার ঘাটে
চাঁদ সদাগরের ময়ুরপঙ্খি নাও দেখে- অবহেলা করি-
বৃষ্টিধারায় ভাসানো আমার 
কাগজের নৌকোকে ? 
.
একেবারে নিঃস্ব হয়ে যাবো আমি।  লুট হয়ে যাবো
নিজেই নিজের ভেতর ।  তোমরা আমাকে
ভীতুর ডিম ভেবে দিতে পারো ধিক্কার  
সত্যিই
নাগরিক যান্ত্রিকতার দোলাচলে এইসময় 
খুব ভয়েই আছি আমি !  

বুধবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

বেঁচে দিচ্ছি সব দারুণ সস্তায় !

পেটের দায়ে প্রায়শই বেঁচে দিচ্ছি এখন
রাতের ঘুম
বিকেলের স্নিগ্ধতা 
নিস্তব্ধ দুপুর 
শরীর জুড়ানো ভোরের হাওয়া 
রক্তরাঙা সূর্যোদয়
গোধূলীর লালাভ আকাশ 
নীল ছুঁয়ে পাঁক খেয়ে ওড়া বিরহী চিলের বন্ধুত্ব 
প্যাঁচার করুণ ডাক
শেয়ালের হুক্কাহুয়া
রিমঝিম বৃষ্টি 
সাতরঙা রংধনু 
কবিতার খাতা 
গল্পের নোটবই 
স্মৃতির ডায়েরি । অনেক অনেক কিছুই
নামমাত্র দামে, দারুণ সস্তায় !


শুধু আঁকড়ে রেখেছি ছোট্ট বুকপকেটে 
শিমুল তুলোয় গড়া পুতুলের মত তুলতুলে নরোম
এত্তটুকুন আমার লাল টুকটুক স্বপ্নকে
সারা দিনমান 
সে আমাকে গেয়ে শোনায় প্রতুলের গান- 
প্রয়োজনে আমি যেন ফেরিওয়ালা হই 
আলু ছোলা বাকরখানি বেঁচি পথে পথে হেঁটে 
যেন অনাহারে থাকি দিনের পর দিন । তবু 
(এতটুকুন লাল টুকটুক স্বপ্ন আমার-
প্রচন্ড ভয়ে কেঁদে কেটে অস্থির )
ওকে যেন 
না বেঁচে দিই কভু 
সময়ের হাটে !    

সোমবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

কর্নেল তাহের ছিলেন জঙ্গি নেতা

বাংলাদেশের মিডিয়া জগতে বামপন্থিদের আধিপত্য থাকায় স্বাভাবিকভাবেই বীরউত্তম কর্ণেল তাহেরের জীবনকে অতিমাত্রায় গ্লোরিফাই করা হয়েছে । কিন্তু আসলে কী ছিলেন তিনি? তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জঙ্গিবাহিনীর নেতা। সেই জঙ্গিবাহিনীর নাম গনবাহিনী। আদর্শগত অমিল ছাড়া বাংলা ভাই জেএমবি হরকাতুল জিহাদের সাথে এর তেমন কোন পার্থক্য নাই। গনবাহিনীর বিভীষিকা আজো বয়ে বেড়াচ্ছে যশোর ঝিনাইদহ কুষ্টিয়ার মানুষ। ইনু সাহেবরা নাকে খত দিয়ে, নিজের ফেলে দেয়া থুতু চেটে খেয়ে জাতে উঠেছেন। গাড়িতে মন্ত্রীর পতাকা লাগিয়েছেন। কিন্তু শ্রেণীশত্রু খতমের নামে যেসব হতভাগাদের তারা সন্ত্রাসের অভিশপ্ত জীবনে ঠেলে দিয়েছিলেন তারা আর ফিরতে পারেনি স্বাভাবিক জীবনে। তারা এখনো ব্যস্ত একে অপরের মাথা কাটতে। কেউ কেউ হয়েছে ভাড়াটে খুনি। বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল রয়ে গেছে এখনো সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে।

কর্নেল তাহেরের জীবনকে সর্বোচ্চ মাত্রায় গ্লোরিফাই করে ডাঃ শাহাদুজ্জামান লিখেছেন তাহেরের জীবনভিত্তিক উপন্যাস- 'ক্রাচের কর্নেল'। সে উপন্যাসেও কর্নেল তাহেরের নাম উঠে এসেছে ষড়যন্ত্রের হোতা হিসেবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে পানি উন্নয়ন বোর্ডে চাকরি দিয়েছিলেন, আর তিনি সেই চাকরির আড়ালে সরকার উৎখাত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। সেনাবাহিনীর ভেতরে গড়েছিলেন গ্রুপ উপগ্রুপ।

রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার নৃশংসতা ছিল অপরিসীম। কিন্তু রক্ষীবাহিনী গঠন করার পক্ষে যদি একটা যুক্তি থেকে থাকে, সেটা হবে এই জাসদ গনবাহিনীর সন্ত্রাস। বিজয় দিবসে হরতাল, জনপ্রতিনিধি হত্যা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবনে হামলার মত অপরিপক্ক ও ভুল রাজনীতির পেছনে ছিলেন এরাই।

জাসদের হাজার হাজার কর্মী হত্যার দায় যদি শেখ মুজিবুর রহমানকে নিতে হয়, সেই দায় থেকে বাঁচতে পারেন না এরাও।
'৭৫ এর পনেরোই আগস্ট ঘটবার মত পরিবেশ তৈরি করেছিলেন কর্নেল তাহেররাই। এইসব ষড়যন্ত্রে অংশ ছিল আজকের মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, এবং কর্নেল তাহেরের ভাই অধ্যাপক আনোয়ারেরও। শেষমেষ এরাই শেখ মুজিবকে হত্যা করতেন, তাদের লক্ষ্যও ছিল সেটাই। কিন্তু এদের সৌভাগ্য যে, জাল গুটিয়ে আনার আগেই মেজর ফারুক রশীদ ডালিমরা ঘটিয়ে দেয় পনেরোই আগস্ট। ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাসে, এদের অবস্থান তাই কোনভাবেই মেজর ডালিমদের চেয়ে কম নয়। স্বাধীন বাংলাদেশে এরাই ছিলেন প্রথম ষড়যন্ত্রকারী।

আগামীতে দেশপ্রেমিক কোন সরকার ক্ষমতায় এলে, রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে ইনু এবং আনোয়ার সাহেবদের বিচার করার সুযোগ রয়ে গেছে। ইতিহাসের দায় মেটানোর জন্য এদেরও বিচার হওয়াটা জরুরি।

রবিবার, ৩১ আগস্ট, ২০১৪

বিষন্ন পেয়ালার দিনরাত্রি !

সারাদিন রাত অনাদরে পড়ে থাকি আমি । চুপচাপ । একেবারে
শব্দহীন । জোহর, আছর পেরিয়ে- এশার আযান হলে পরে
হঠাৎ সমগ্র শরীর জুড়ে ছলকে ওঠে- বৃষ্টির মত-
টলটলে স্বচ্ছ জল । ফোটানো, তীব্র গরম
অসহ্য সে উত্তাপ !
বুকের ভেতরটা আমার- সমস্ত হৃদয় যেন – জ্বলে পুড়ে
খাক হয়ে যায় ; মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশনের মত ! মুহূর্তকাল পরে–
খয়েরি রঙা পেটমোটা টি-ব্যাগ
কে যেন ছুঁড়ে দেয় নিতান্ত অবহেলায়, আনাড়ি হাতে । অবাক বিস্ময়ে
চেয়ে দেখি আমি , ধীরে ধীরে- বদলে যাচ্ছে আমার
ভেতরের রঙ ! ব্যথা- সর্বাঙ্গে এখনো ; মনে হয়
অন্তত একটা প্যারাসিটামল খাওয়া
খুব দরকার !

***

প্রথমে আমাকে স্পর্শ করে তোমার আঙুল । মধ্যমা
অথবা তর্জনি । কখনো কখনো
অনামিকাও । খুব শক্ত করে চেপে রাখে– যেন আমি হাত ফসকে না যাই । তারপর
তোমার ঠোঁট নেমে আসে
আমার উত্তপ্ত ঠোঁটে । সব ব্যথা নিমেষেই ভুলে যাই আমি
মরফিনের মত ! এ এক অবর্ণনীয় সুখ ! মনে হয়
স্বার্থক জনম আমার ! কে জানে, মানব ঠোঁটের চেয়ে উৎকৃষ্ট ব্যথানাশক
হয়তো আবিস্কৃত হয়নি আজো, হবেওনা কোনকালে !

***

তারপর তুমি কাকে যেন ডেকে বলো –
মলি, কাপটা নিয়ে যা । (ততক্ষণে) ফুরিয়ে গেছে আমার রঙিন তরল । কিংবা
হয়তো পড়ে আছে কিছু কালচে অধক্ষেপ , আমিও হয়েছি শীতল
নেই উত্তাপ । ফিরে যাই বিষন্ন মনে উচ্ছিষ্টের মত । তারপর-
তারপর তোমার স্পর্শের সুখস্মৃতিটুকু নিয়ে আমি
কাটিয়ে দেই আরো একটি (একঘেয়ে)
দীর্ঘ দিবস ।

বেশ আছি

বেশ আছি , কারণ -
বেশি কিছু চাইনি । আশা করিনা তাই হতাশাও নেই
এক মুঠো পান্তা, এক চিলতে লবণ
গনগনে আগুনে পোড়া একটা লালচে মরিচ
ক্ষুধা নিবারণের জন্যে এর চেয়ে বেশি কিছু
আছে কি প্রয়োজন ?
আমি তো রাক্ষস নই !

শনিবার, ৩০ আগস্ট, ২০১৪

কালাশনিকভ উদ্যান !

একটা উদ্যান গড়বো আমি, এ আমার
আজন্ম লালিত সাধ । গোলাপের বদলে
আমার বাগানজুড়ে থাকবে সারি সারি
'কালাশনিকভ' গাছ !
.
বৈশাখে আষাঢ়ে ভাদ্রে
ডালে ডালে ঝুলে থাকবে- ডালিমের মত -
তরতাজা গ্রেনেড ! চন্দ্রমল্লিকার বদলে
আমার স্বপ্নের উদ্যানে শোভাবর্ধন করবে
দূরপাল্লা স্নাইপারের ঝোপ !
উদ্যান প্রাঙ্গনে-
লুকোচুরি
ছি বুড়ি
দাড়িয়াবান্ধা নয় , সকাল বিকাল-
'Kill Zionist' খেলবে দুরন্ত শিশুরা !
আর আমি
রোজ রোজ নিয়ম করে তিন বেলা
গাছের গোড়ায় ঢেলে দেবো গ্যালন গ্যালন ডিজেল
পেট্রোল, অকটেন !
.
***
সমস্যা একটাই,
ভূমিহীন নিঃস্ব যাযাবর বেদুইন আমি
কালাশনিকভ ফলানোর মত উর্বর জমিন
কোথায় পাবো ?

শুক্রবার, ২৯ আগস্ট, ২০১৪

আত্রাই নদীর তীরে

ইদানিং খুব একা একা লাগে সজীবের । একা লাগাটাই স্বাভাবিক । এমনিতে এই বয়সে হঠাৎ করেই সবাই বন্ধুহীন হয়ে পড়ে ।
স্কুলের বন্ধুদের সাথে বিচ্ছেদ ঘটে এসএসসির পর , তাদের কথা হয়তো মনে পড়ে, খারাপ লাগাও কাজ করে , কিন্তু সেই শূন্যতা থাকেনা বেশিদিন । কিছুদিনের মধ্যেই কলেজে নতুন বন্ধু জুটে যায় । একই ব্যাপার কলেজ শেষেও । কলেজের বন্ধুরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় , কিন্তু ভার্সিটির ক্লাস শুরু হলেই আবার জোটে নতুন মাত্রার বন্ধুরা । স্কুলের পর ভার্সিটি লেভেলেই বন্ধুত্ব হয় দীর্ঘদিনের । কলেজে তো মাত্র মোটে দুটো বছর , দেখতে দেখতেই পার হয়ে যায় । তার ওপর ক্লাস , কোচিং , প্রাইভেট , পরীক্ষা । সবমিলে কলেজের সময়টা কাটে খুব তাড়াতাড়ি । বন্ধুত্ব গাঢ় হবার সুযোগ পায়না সে সময়টায় ।

মেডিকেল কলেজে ছাত্রদের অফুরন্ত সময় নেই , সেভেন্টি ফাইভ পার্সেন্ট ক্লাস এটেন্ডেন্স । আইটেম , কার্ড , টার্ম , ওয়ার্ড ফাইনাল , ব্লক পোস্টিং , প্রফেশনাল পরীক্ষা নামের বিভীষিকা । তবুও পাঁচ ছয় বছর তো কম সময় নয় ! এতগুলো দিন একসাথে থাকা , খাওয়া , ক্লাস ওয়ার্ড করা , পরীক্ষা দেয়া , এটা সেটা প্রোগ্রাম করা , ক্লাস ফাঁকি দিয়ে , আইটেম পেন্ডিং দিয়ে ঘুরতে যাওয়া । এসব কিছুর মাঝেই বন্ধুত্ব দিন দিন বাড়তেই থাকে ।

তারপর একটা সময় আসে , পাশ করে যাবার পর । সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে । একই হাসপাতালে ডিউটি , কারো হয়তো মেডিসিনে । কারো সার্জারিতে , কারো গাইনি । একজনের মর্নিং তো আরেকজনের নাইট । একই রুমে থেকেও দেখা হয়না । বিকালে কফি খাওয়ার সময় বয়ে যায় , সার্জারির বন্ধুকে ফোন করলে হয়তো রিসিভই করতে পারেনা , অথবা কোনমতে ফোনটা কানে লাগিয়ে বলবে, দোস্ত তোরা যা । আমি ওটিতে দাঁড়িয়েছি ।
মেডিসিনে ডিডটি যার সে হয়তো বলবে, দোস্ত আমি বের হতে পারবো না । একটা পেশেন্ট খারাপ , ডিকে ডেভেলাপ করেছে । গাইনিতে যার পোস্টিং সে হয়তো ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলবে , আমি একটু ঘুমাই রে । তোরা যা । কাল নাইট ডিউটি ছিল , মর্নিং করে এসে শুয়েছি । গাইনির নাইট মানে তো বুঝিস ।

কার্ডিওলজিতে দম ফেলার ফুরসত নেই । এদিকে ইসিজি করো , ট্রিটমেন্ট অর্ডার লেখো , ওষুধ কিনতে পাঠাও । ফলোআপ দাও । সিপিআর দাও । এর মাঝেই হয়তো কেউ ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চলে গেছে পরপারে । মন খারাপ করে ডেথ সার্টিফিকেট লেখো ।

এর মাঝেও তবু এর ওর সাথে শিডিউল এক্সচেন্জ করে বন্ধুরা মিলে কোথাও খেতে বসা যায় । গভীর রাতে হোস্টেলের ছাদে বসে কথা বলা যায় ।
কিন্তু এর পরের সময়টা আরো ভয়ংকর । ইন্টার্নশিপ শেষ মানে ছড়িয়ে পড়ো । কে যে কখন কীভাবে কোনদিক দিয়ে কোথায় চলে যায় , ঠিকমত বিদায় নেয়াও হয়না । এই কথাটাও বলা হয়না- দোস্ত , গেলাম ।
কেউ শহর ছাড়ে , কেউ দেশ ছাড়ে । কেউ বিয়ে করে , কেউ টাকা জমায় , কেউ উচ্চতর ডিগ্রীর জন্যে নাক ডুবিয়ে পড়াশোনা করে , কেউ ট্রেনিং করে । কেউ বিসিএস দিয়ে পোস্টিং নিয়ে গ্রামে চলে যায় । এক অন্যরকম শুন্যতা , বন্ধুহীনতা , একাকীত্ব ঘিরে ধরে এসময় ।
যারা বিয়ে করে ফেলে তারা হয়তো একাকীত্ব থেকে কিছুটা মুক্তি পায় , কিন্তু যারা বিয়েও করেনি তাদের একাকীত্ব জেঁকে বসে । কারণ , গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার জন্য যতটা সময় একজন আরেকজনকে দেয়া দরকার , এসময় কারো হাতেই অতটা সময় নেই । সবাই ব্যস্ত জীবনের ঘোড়দৌড়ে । নতুন পরিচয় হয়তো হয় , কিন্তু বন্ধুত্ব যাকে বলে সেটা আর হয়না ।
এরকমই একটা সময় কাটাচ্ছে সজীব ।
বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকরিতে ঢুকেছে । পোস্টিং হয়েছে যে উপজেলায় , সেটাকে গ্রাম বলাটাই শ্রেয় । মানুষগুলো এত সহজ সরল , ওদের সাথে কথা বলতে ভালো লাগে । দিনের বেলাটা তাই ভালোই কাটে হাসপাতালের ব্যস্ততায় । সময় গড়ায় , পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে একাকীত্ব ।
বিকেল হলেই হাসপাতাল এরিয়াটা খা খা করে । একা একা ঘরে বসে না থেকে মাঝে মাঝে রিক্সা ভাড়া করে বেরিয়ে পড়ে সজীব । আজও বেরিয়েছে । গন্তব্য আত্রাই নদী । দুই কিলো দুরে আত্রাই নদী । বড় নয় , ছোট নদী । পানি থাকে কম , কোথাও কোথাও হাঁটু পানি বলা চলে । সজীব শুনে অবাক হয়ে যায় , বর্ষায় নাকি এই নদীর পানিতেই তলিয়ে যায় আশেপাশের কয়েক গ্রাম । মেডিকেল কলেজে থাকতে প্রায় বিকেলেই যাওয়া হত পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত । এখানে সমুদ্র নেই , একটা নদী যে আছে তাতেই খুশি সজীব । রিক্সাওয়ালা টুংটাং শব্দে বেল বাজাচ্ছে । ফাঁকা কাচা রাস্তার দুধারে বাশঝাড় , বট গাছ গাবগাছ । কারো বাড়ির পেছন দিকটায় নারকেল সুপারির সারি । খারাপ লাগে না । সবকিছু ভালোই লাগে , সমস্যা শুধু একটাই , খুব একা লাগে এখানে । মোবাইল আছে বলে রক্ষা । তবু ফোনে কথা বলা যায় । যদিও মোবাইলে কথা বলাটা সজীবের পছন্দ না খুব একটা । ফোনে কথা বলে কখনো মন ভরেনা । ফোনে এক ঘন্টা কথা বলার চেয়ে সরাসরি দশ মিনিট কথা বলাও অনেক ভালো । মানুষের মুখের কথাই সব নয় । কথার সাথে চাহনি , আন্তরিক ভঙ্গি এসব অনেক গুরুত্বপূর্ণ । ফোনে অবলীলায় মিথ্যা বলা যায় । মন খারাপ থাকলেও বলে দেয়া যায় , ভালো আছি । সামনাসামনি কারো চোখের দিকে তাকিয়ে সহজে মিথ্যা বলা যায়না । কাছের মানুষেরা ঠিকই ধরে ফেলে , সামথিং ইজ রং ।
কিন্তু এখানে আর উপায় কী ?

রাস্তার পাশে একটা ছোট হোটেল । খুব সাধাসিধে একটা নাম , ভাই ভাই চা বিতান । সজীব দেখলো , গরম পরোটা তৈরি হচ্ছে । রিক্সা থামিয়ে দুজনের জন্য চারটা পরোটা আর দুকাপ চা অর্ডার করলো । চায়ে পরাটা চুবিয়ে খাওয়া শুরু করলো সজীব । চট্টগ্রামের মানুষদের এই অভ্যাসটা আছে , চায়ে পরোটা বা রুটি ভিজিয়ে খাওয়া । ব্যাপারটা কেমন বিদঘুটে লাগে সজীবের । কিন্তু মন খারাপ থাকলে বিদঘুটে কাজগুলোই করতে ইচ্ছে করে কেন যেন । ওর দেখাদেখি রিক্সাওয়ালাও ঐভাবে খেতে লাগলো ।

নদীর পুব পাড়ে একটা ঘাসে ঢাকা ঢিবির ওপর এসে বসেছে সজীব । পাশে একটা মসজিদে আসরের নামাজটা সেরে নিয়েছে । বেশ ভালো লাগছে এখানে । ঢিবিটার সামনের ঢালু জায়গাটাতে বেশ বড় বড় ঘাস । কাশফুল ফুটেছে বেশ কয়েকটা । আসলেই অসাধারণ লাগছে জায়গাটা । মোবাইলটা বের করে ফেসবুকে লগইন করে কিছুক্ষণ হোমপেজ স্ক্রল করলো । তারপর বিরক্ত হয়ে আবার লগআউট করলো । ফেসবুকটাও এখন আর ভালো লাগেনা । লাগবে কীভাবে ? বাঙালির রাজনীতি আগে ছিল শুধু চায়ের কাপে , এখন সেটা এসেছে ফেসবুকে । সামান্য রাজনৈতিক মতভেদ নিয়ে কত বিভেদ বিশৃঙ্খলা যে করছে এই বাঙালিরা । একে অপরের বিরুদ্ধে ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানোই যেন কিছু লোকের মূল কাজ । শেখ মুজিবের চেয়ে বড় আওয়ামী লীগার , জিয়ার চেয়ে বড় বিএনপি সেজেছে কেউ কেউ । কেউ আবার হয়ে গেছে স্বঘোষিত আলেম , এরা যখন যাকে ইচ্ছা কাফের ফতোয়া দিয়ে দেয় । এসব দেখে মনটা বিষিয়ে উঠছে দিনদিন । ভালো এতটুকু , এর মাঝেই বন্ধুবান্ধবদের খোঁজখবর পাওয়া যায় , বিভিন্ন সংবাদ পাওয়া যায় । আর তাছাড়া এই চরম একাকীত্বে তবু ভার্চুয়ালি হলেও বন্ধুদের সাথে থাকাটাও বা কম কিসে !

আনমনে মোবাইলের টাচস্কৃনে আঙুল চালাতে লাগলো সজীব । ফেসবুক এপটির নিচেই আরেকটা এপ । আগে থেকেই আছে , এই মুহূর্তে হঠাৎ যেন নতুন করে চোখে পড়লো সজীবের । মিগ ৩৩ ! হাহ । সে একটা সময় ছিল বটে । ফেসবুক জনপ্রিয় হবার আগের সময়টার কথা । মোবাইলে ইন্টারনেট আর মিগ ৩৩ । প্রথমে উদ্দেশ্য ছিল মোবাইলের বিল কমানো । সেসময় একমিনিট কলের দাম পড়তো সাত থেকে দশ টাকা । কোন পালস নেই । দশ সেকেন্ড কথা বললে সাত টাকা ! অথচ মিগে ঘন্টার পর ঘন্টা চ্যাট করতে কয়েক টাকা খরচ হয় । সেজন্য জরুরি কথা ছাড়া বেশিরভাগ কথা হত মিগ চ্যাটেই । চ্যাট রুম বানিয়ে গসিপ করা ছিল ক্লাস চলাকালীন সময়টার উপযুক্ত সদ্ব্যবহার !
একটা আইডি খুলে সজীবও ঢুকে পড়ে একদিন সেই মিগের ভার্চুয়াল জগতে । আর মিগের মাধ্যমেই ‘ড্রিমবয় সজীবে’র ভার্চুয়াল পরিচয় হয় আকাশনীলার সাথে । শব্দটা ঠিক আকাশনীলা নাকি আকাশলীনা তা নিয়ে সজীব আজো কনফিউজড । হায় আকাশলীনা ! কোথায় আছে কে জানে ?

আকাশলীনাই প্রথম নক করেছিল সজীবকে । Hi ! হাই সম্বোধনটা তখন মিগের কল্যাণে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল । ভদ্রতার খাতিরে সজীবও রিপ্লাই দিয়েছিল । হাই ! তারপর হাই থেকে হ্যালো , টুকটাক কথাবার্তা । একটা সময় সজীব বুঝতে পারলো আকাশলীনা ওর প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছে । একদিন দেখা করতে চাইলো আকাশলীনা । বেঁকে বসলো সজীব । না , দেখা করবে কেন ? সজীব কেবল ফার্স্ট ইয়ারে , আকাশলীনা আরো ছোট । দেখা করার উদ্দেশ্য কী ? প্রেম করা ? এভাবে প্রেম করা কি ধর্মে স্বীকৃত ? শুধুমাত্র বিয়ের উদ্দেশ্যে হয়তো দেখা হতে পারে, অথবা খুব জরুরি কোন প্রয়োজনে । এখানে কোনটা আছে ?
আকাশলীনাকে স্পষ্ট করে সেকথা জানিয়ে দিয়েছিল সজীব ।
আকাশলীনাও আর কথা বাড়ায়নি । এতটা বছর , মানে গত পাঁচটা বছর আর কখনো নক করেনি সে । অবশ্য ফেসবুক জনপ্রিয় হবার পর থেকে মিগ কেউ তেমন একটা চালায়ও না বলা যায় । দিনে দিনে আরো কতকিছুই তো এসেছে । ভাইবার, নিমবায, হোয়াটসাপ, স্কাইপে ।

সজীব মিগে লগইন করার চেষ্টা করলো । পাসওয়ার্ড ভুলে গেছে । পাসওয়ার্ড তো দূরের কথা, কবে শেষ মিগে লগইন করেছিল সেটাও তো মনে নেই ! ফরগট পাসওয়ার্ড এ ক্লিক দিয়ে পাসওয়ার্ড উদ্ধার করে লগইন করলো । আকাশলীনার শেষ মেসেজটা এখনো মনে পড়ে সজীবের ।
একদিন সে আসবে । পূর্ণ অধিকার নিয়ে আসবে ! কথাটার অর্থ এখনো পরিষ্কার করে বোঝেনা সজীব ।

পকেটে রাখা দ্বিতীয় মোবাইলে রিংটোন বেজে উঠলো । বড় আপা ফোন করেছে ।
-সালাম আলিকুম আপু । তুই তো হাজার বছর বাঁচবি ।
-ওয়ালাইকুম সালাম । রাখ তোর প্যাচাল । কোথায় তুই এখন ?
-আমি কোথায় তা দিয়ে কার কী আসে যায় ? আছি বনবাসে ।
-কার কী আসে যায় একটু পরেই বুঝবি । একটু সেজেগুজে নে । তোকে দেখতে গেছে মেয়েপক্ষ ।
-কীসব আবোল তাবোল বকছিস ? মেয়েপক্ষ মানে কী ?
-মানে মেয়ে নিজে । সাথে তার বড়ভাই । কাউকে কিছু না জানিয়েই চলে গেছে । এখন তোকে খুঁজে না পেয়ে ফোন করেছে আমাকে ।
-দুষ্টামি ছাড় । আসল খবর কী সেইটা বল ।
-দুষ্টামি না । সব ষড়যন্ত্র পাকা হয়ে গেছে । তোকে কেউ কিছু জানায় নি এতদিন । কিন্তু মেয়ে দেখাদেখি আমরা সেরে ফেলেছি । ওরাই প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল । আমাদেরও পছন্দ হয়েছে । তোর ছবি দেখেই নাকি মেয়েরও পছন্দ হয়েছে । একটু আগে ফোন করে জানালো ওরা এখন আত্রাই গেছে । তোকে দেখার জন্য । কী ডাঙর মেয়েরে বাবা , তোর হাড্ডি চিবিয়ে খাবে । এখন যা , একটু ফ্রেশট্রেশ হয়ে থাক ।
-হা , তুই বললেই হলো ? বানিয়ে বানিয়ে একটা কাহিনী বললি আর আমি পাগল হয়ে গেলাম ? ছোট হতে পারি , কিন্তু অত বোকা না আমি । আর কোন সে রাক্ষসী ? হাড্ডি চিবায় কেন ? বলে দিস, আমার হাড্ডি শক্ত আছে , দাঁত ভেঙে যাবে ।
-ঠিক আছে । থাক তুই তোর চালাকি নিয়ে । দেখবো তোর হাড্ডির জোর । শেষে তো বউয়ের আঁচল ছাড়া নড়বি না !

মোবাইল পকেটে রেখে কিছুটা ভাবনায় পড়ে গেলো সজীব । আচ্ছা, আপা যা বললো সেটা কি সত্য হতে পারে ? হলে কেমন হবে । ও যে এখানে এসেছে এটাতো কেউ জানে না । এসে ফিরে যাবে মেয়েপক্ষ ! যাক । এখানে নিশ্চিন্তে থাকা যায় ।
মোবাইলের স্ক্রিনে মিগ ওপেন আছে । পর্দায় চোখ দিয়েই হতবাক হয়ে গেল সজীব । একি ! আকাশলীনা লিখেছে এক মিনিট আগে । মিঃ ড্রিমবয় , একটু পেছনে তাকানো যায় ?
ঢিবির ওপরেই তড়াক করে দাঁড়িয়ে গেল সজীব । ভয়ে ভয়ে পেছনে ঘুরে তাকালো । একজন , হ্যা একজনই তো ! দাঁড়িয়ে আছে ছায়ামূর্তির মত । হঠাৎ করেই মাথায় এলো , দারোয়ান তো জানে ও মাঝেমাঝে এখানে আসে ! তাহলে ওই ব্যাটার কাছেই জেনেছে । হায় হায় , এ কী হলো ?
ছায়ামূর্তিটা এগিয়ে এলো । বললো , হাই ড্রিমবয় , আমি আকাশলীনা ! এলাম , পূর্ণ অধিকার নিতে !

সজীবের পেছনে গোধূলীর সূর্যটা টকটকে লাল । এতক্ষণে ডুবে যাওয়ার কথা ছিল, হয়তো এই মুহূর্তটা দেখার জন্যই এখনো ডুবে যায়নি ! সজীব নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না । সবকিছু ঝাপসা লাগছে তার । সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে সেকি সূর্য না চন্দ্র, মানবী না অতিমানবী , পরী না পেত্নি, প্রেয়সী না রাক্ষসী তা ঠাহর করা এই মুহূর্তে সজীবের পক্ষে সম্ভব নয় ।

বৃহস্পতিবার, ২৮ আগস্ট, ২০১৪

অধরা অপ্সরা !

ধানক্ষেতের আল ধরে হেঁটে হেঁটে অবিরাম
বহুদিন গিয়েছি আমি দিগন্তের পানে । আশৈশব,
পুরোটা কৈশোর
মাটিরঙা হাতে জড়াতে চেয়েছি একফোঁটা নীল ।
পুবের সূর্য ডুবেছে পশ্চিমে । মধ্যাকাশের চাঁদ
ফিরে গেছে কালপুরুষ পেরিয়ে আরো দক্ষিণে । তবু
দিগন্তের সাথে আমার দূরত্ব রয়ে গেছে
ধ্রুবক সংখ্যায় ।
.
সে যেন এক অধরা অপ্সরা !
দূর হতে অপলক চেয়ে থাকা যায় ,
ছুঁয়ে দেখবার নেশায় ছুটে যাওয়া যায়
বৈরাগী হয়ে কাটিয়ে দেয়া যায় পুরোটা যৌবন
তবু
স্পর্শ করা যায়না !
.
আমি কি বৈরাগী হবো ?
নাহ । ও আমার ধাতে সইবে না ।
তারচেয়ে ভালো মরিচীকার পেছনে ছোটা
কাছে গেলে তবু এটুকু জানা যাবে
এখানে কোনকালে কোন নদী ছিলনা ,
পিপাসার জল আমায় খুঁজে নিতে হবে
অন্য কোথাও ।

বুধবার, ২৭ আগস্ট, ২০১৪

ইসরাইলি পণ্য বর্জন চালিয়ে যাচ্ছেন তো ?

অবশেষে দুই হাজার লাশের বিনিময়ে ইসরাইল স্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে । এতে গাজাবাসীরা যেমন খুশি , খুশি আমরাও । কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবেনা , ইসরাইল নামের বিষফোঁড়াটা কিন্তু পুরোমাত্রায় রয়ে গেছে । এই বিষফোঁড়া আবার যেকোন সময় কষ্ট দিতে পারে । বিষফোঁড়া না বলে ক্যান্সার বলাই বোধহয় ভালো । আপাতত ওষুধের প্রভাবে সে কিছুটা শান্ত হয়েছে । কিন্তু পুরোপুরি বিলুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত স্থায়ী শান্তির আশা করা যাবেনা । এরকম যুদ্ধবিরতি এর আগেও হয়েছে । গাজা এর আগেও অবরোধমুক্ত ছিল । কিন্তু গত ষাট বছরের ইতিহাসে ইসরাইল নামের এই বিষফোঁড়া কিংবা ক্যান্সার বারবারই শান্তিতে বিঘ্ন ঘটিয়েছে । বারবার হামলে পড়েছে ফিলিস্তিনের নিরীহ মানুষের ওপর । চালিয়েছে গনহত্যা , উচ্ছেদ করেছে ভিটেমাটি থেকে । ফিলিস্তিনের মাটি দখল করে ইহুদী বসতি স্থাপন করেছে । এবারের এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি , অবরোধ শিথিল তারা কতদিন বজায় রাখবে বলা মুশকিল । মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মার্কিন সাংবাদিক নোয়াম চমস্কি মনে করেন , ইসরাইল কখনোই মধ্যপ্রাচ্যে পুরোপুরি শান্তি বজায় রাখবে না । অতীতের মত তারা মাঝে মাঝেই হামলা করবে ।
আসলে ইসরাইলের মূলোৎপাটন এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন ছাড়া শান্তি আসবে না । হামাস নেতা খালেদ মিশাল বলেছিলেন , বর্তমান পৃথিবীতে একমাত্র দখলদার রাষ্ট্র অবৈধ ইসরাইল । এই দখলদারিত্বের অবসান হতেই হবে ।
গাজায় হামলার পর সারাবিশ্বে প্রো ইসরাইলি পণ্য বর্জন শুরু করে শান্তিকামী মানুষ । ইসরাইলের বিরুদ্ধে ঘৃণা বাড়ছিল ক্রমাগত । ইহুদিবাদ বিরোধী মানসিকতাও বাড়ছিল ইউরোপসহ সারাবিশ্বে । যুদ্ধবিরতি এবং অবরোধ শিথিলের পেছনে এটারও একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল । জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিশনের প্রধান নাভি পিল্লাই তাঁর বিদায়ের আগে শেষ বৈঠকে নিরাপত্তা পরিষদকে ইসরাইল ইস্যুতে তুলোধুনা করেছেন ।
হামাস এবং গাজাবাসীর অকুতোভয় প্রতিরোধ, বিশ্ববাসীর অকুন্ঠ সমর্থন ও প্রতিবাদ- এসবের সাথে সাথে এগুলোও ছিল ইসরাইলের পিছু হঠার পেছনের প্রভাবক ।
.
এই সাময়িক বিজয়ে আমাদের সন্তুষ্ট থাকলে চলবে না । ইসরাইলবিরোধী প্রচার প্রপাগান্ডা চালিয়ে যেতে হবে । আর প্রো ইসরাইলি পণ্য বর্জন চালিয়ে যেতে হবে । আমরা যদি আবার ইসরাইলি পণ্যে ফিরে যাই , যদি বেখবর হয়ে পড়ি , তাহলে নিশ্চিত করে বলা যায়, তা হবে ফিলিস্তিনি শহীদদের সাথে সুস্পষ্ট বেইমানি।

আগাম ধন্যবাদ !

কেউ আমায় ভুলেও গেলে বেমালুম  
তুলবোনা অভিযোগের আঙুল ।
জড়বস্তু নই বলে
এক ফোঁটা কষ্ট যদিবা আসে হৃদয়ে, ভেবে নেবো
সে শুধু মানবিক তাড়নায় ।
.
জানি এইসব কাব্যগাঁথা খুব বেশিদিন
মনে রাখবেনা ঘূর্ণায়মান পৃথিবী
কত মহাকাব্য হারিয়ে গেছে ফোরাতের মোহনায়
কত ইলিয়াড কত চর্যাপদ পাচিত হয়েছে
মহাকালের পরিপাকতন্ত্রে
সে খবর কে রাখে ? কে রেখেছিল কবে ?
যার রাখবার কথা , সেও তো মিশে গেছে
কোন এক বিরাণ নগরীর শুষ্ক ধুলোয় ।
যেমন করে হারিয়ে যাবো তুমি আমি
আমরাও ।
.
তবু লিখে যাবো কিছু হৃদয়ের কথা
হারিয়ে যাবার আগে পৃথিবীর বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে যাবো
কিছু হাহাকার কিছু সুখ কিছু ভালোবাসা ।
কেউ যদি কোন এক গোধূলী বেলায় রক্তাভ সূর্যের পানে চেয়ে
একবার স্মরণে আনো আমায় ; সেরেব্রাল কর্টেক্সের
কোন একটি মেমোরি সেলে কেউ যদি গেঁথে রাখো
এই অধমের নাম , আমিতো থাকবোনা সেদিন-
এই নাও বন্ধু , আজ তোমায়
আগাম 'ধন্যবাদ' দিলাম !

মঙ্গলবার, ২৬ আগস্ট, ২০১৪

হয়তো একদিন !

পৃথিবীটা দেখতে চাইলে বেরিয়ে পড়তে হবে এখনি । নইলে
কে জানে
হয়তো স্রোতস্বিনী নদীর নীলচে প্রবাহ
একদিন মাথানত করে চলে যাবে দূরে
ঘাড় পেরিয়ে নেমে আসা একগুচ্ছ কেশরাজির কাছে
হার মেনে !
.
কিংবা
হয়তো একদিন থেমে যাবে শুভলং ঝর্ণা
কারো ভেজা চোখে জমে থাকা
এক ফোঁটা টলটলে অশ্রুর তাপদাহে
হয়তো বিঠোফেনের কালজয়ী সুর লজ্জা পেয়ে
বেসুরো হয়ে যাবে একদিন
উচ্চ কম্পাঙ্কের চিকন স্বরগামে অস্ফুটে উচ্চারিত
একটি শব্দের মুর্ছনায় !
.
হয়তো পাহাড়ের অনাদিকালের মৌনতা ভেঙ্গে হবে খানখান
উঠোনে কারো মৃদু পদশব্দে !
হয়তো
এভারেস্ট চূড়ায় সূর্যোদয় দেখার সাধ মিটে যাবে
ফযর নামাজ থেকে ফিরে জানালার গ্রিলের ফাঁকে
অপেক্ষমান এক জোড়া চোখের পানে চেয়ে !

আর এভাবেই , হয়তো
পৃথিবী দেখার আশা ফুরিয়ে যাবে একদিন
সামান্য একটুকরো ভূমির অধিকারে !

সোমবার, ২৫ আগস্ট, ২০১৪

বাঙাল চরিত



১ ।
একজন প্রকৃত সুখী মানুষ , বন্ধু ডাঃ tanzim refat একদা বলিল –
‘আমরা যখন ক্যান্টনমেন্টের বাসায় থাকতাম , আমি চলার সময় রাস্তায় দাঁড়ানো সেন্ট্রি, দারোয়ানরা সালাম দিত । স্যালুট দিত । যে আগে সালাম দেয় তার মর্যাদা ইসলামে বেশি আর সবাইকে সালাম দেয়া দরকার জেনে পরে একসময় আমি সবাইকে আগে সালাম দেয়া শুরু করলাম ।
কয়েকদিন পর দেখি সেন্ট্রি-দারোয়ানরা কেউ আর সালাম স্যালুট দিচ্ছেনা ! কেউ কেউ সালামের উত্তরও দিচ্ছে না । কেমন অবজ্ঞার চোখে তাকায় ! ওদের ভাবটা এমন, আমাকে সালাম দিচ্ছে মানে ব্যাটা নিশ্চয়ই আমার চেয়ে নিচু স্তরের কোন কর্মচারী হবে !!’’ 


২।
অনেকক্ষণ ধরে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছেন আসলাম সাহেব । অফিস শেষে বাসায় ফেরার সময় প্রতিদিনই তাকে এই ঝক্কি পোহাতে হয় ।
এর আগে কয়েকটা বাস চলে গেছে । লোক বেশি, তাকে নিতে চায় নাই । বাসে উঠতে পারলেই হয়, কিছুদূর দাঁড়িয়ে গেলেও সামনে সিট পাওয়া যাবে । কিন্তু ব্যাটা হেল্পার উঠতেই দিলনা !
যাক, অবশেষে ঐযে একটা বাস আসছে । তিনি তড়িঘড়ি করে উঠে পড়লেন । পেছনের দিকে একটা সিটও পেয়ে গেলেন । আরো অনেক লোক উঠল ।  এখনো সবাই উঠতে পারেনি ।
লোক তুলছে হেল্পার ।
আসলাম সাহেব এবার চিৎকার দিলেন- ঐ ব্যাটা হেল্পার, আর কত লোক তুলবি ? তোগো পেট ভরেনা ? গাড়ি ছাড় !!! এত লোক তোলে এরা , অসহ্য !


৩।
যেখানে যে নিয়ম, ডাঃ আব্দুল্লাহ চেষ্টা করেন একজন সাধারণ নাগরিকের মত তার ভেতরে থেকে কাজ করতে । কোন অফিসে গেলেন, হয়তো সেখানে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে অনেকেই । তিনিও লাইনেই দাড়ান । পরিচয় না দিয়েই কাজ করার চেষ্টা করেন । নিজেকে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে ভাবতেই স্বচ্ছন্দবোধ করেন তিনি ।
তিনি গেলেন পাসপোর্ট অফিসে । অনেকেই লাইনে দাঁড়িয়েছে । তিনিও দাঁড়ালেন । বেশিরভাগ লোকই হয়তো শ্রমিক হিসেবে বিদেশে যাবে ।
তিনি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করলেন, বিনা কারণে লোকদের ধমকাধমকি করছে অফিসের লোকজন । ফরমে এটাসেটা ভুল ধরছে । দালালের ছড়াছড়ি । তাঁর ফরমেও একটা ভুল বের করে ফেললো ! সিলটা অর্ধেক পড়ার কথা ছিল ছবিতে, আপনারটাতে একটু কম পড়েছে । যান, আবার নতুন ফরম পুরণ করে ঠিকমত সিল দিয়ে নিয়ে আসেন ! কয়েকজন দালাল এসে বললো- ভাইজান, চিন্তা কইরেন না । আমারে দেন, সব ঠিক করে দিমু ।
অবশেষে সারি থেকে বের হলেন ডাঃ আব্দুল্লাহ । তিনি ভেতরে ঢুকে দায়িত্বরত অফিসারকে নিজের পরিচয় দিলেন । সব ঠিক হয়ে গেল !

যেকোন অপরিচিত মানুষকে সাধারণভাবে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখার কথা । কিন্তু আমাদের দেশে প্রথমেই সবাইকে অসম্মানের দৃষ্টিতে দেখা হয় । তারপর যদি আপনার পরিচয় দেন এবং যদি সেটা তাদের উপরে হয়- তবেই আপনি হয়তো পাবেন কিছুটা সম্মানজনক আচরণ ।
এখন কোথাও গেলে পরিচয় দেন ডাঃ আব্দুল্লাহ । তাতে করে কাজ হয় তাড়াতাড়ি । মাঝে মাঝে মনে হয়- এটা কি অতিরিক্ত সুবিধা নেয়া ?
পরক্ষণেই মনে হয়, নাহ । এটাতো আমার এমনিতেই পাওয়ার কথা ছিল । কিন্তু বাঙাল চরিতের কারণে তা আর হয়না...



৪।
গায়ে গতরে আমি মোটেই হোমরা চোমরা নই । মুরুব্বিরা বলেন , চেহারায় এখনো বাচ্চাভাবটা রয়ে গেছে ।  কিছুটা শিশুসুলভ স্বভাবও নাকি আছে ! এ ব্যাপারে বন্ধু রিয়াদ সবসময়ই অভিযোগ করে এসেছে, আর আমি বরাবরই অস্বীকার করে এসেছি । আর এজন্য বিব্রতকর অবস্থাতেও কম পড়তে হয়নি ! তবে নাক টিপলে দুধ বের হবে কিনা তা অবশ্য জানিনা , কারণ নাক টেপার সাহস এখনো কেউ করেনি !
.
যাহোক আসল কথায় আসি । ভবঘুরে ব্যাচেলর বলে অনেক সময়ই হোটেলে খেতে হয় । যেখানে ক্ষুধা সেখানেই উদরাপ্যায়ন । খাদ্য গ্রহণের নিমিত্তে হোটেলে গিয়ে বসি । ওয়েটারকে নরম স্বরে সুন্দর করে ডাকি , ভাইয়া এখানে খাবার দিয়ে যান । তারপর মোবাইল গুতাতে গুতাতে অপেক্ষা করি । বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায় , ডাক শোনার পরেও ওয়েটার ঢিমেতালে হাঁটাহাটি করছে । খোশগল্প করছে । এ টেবিলে ও টেবিলে যাচ্ছে । একেতো চেহারা সুরতে কম , তার ওপর এমন বিনয়ী ভাব আমার , সেজন্যে সম্ভবত আমাকে পাত্তা দেয়া অতটা জরুরি মনে হয়না ওয়েটারের । কী আর করা ?
বাধ্য হয়ে এবার আমি কন্ঠ পাল্টাই । মোটা গলায় বলি , ঐ কে আছস । এদিকে আয় । কী আছে দে দেখি ।
ওমা ! এইবার দেখি সুড়সুড় করে ভাত পানি নিয়া হাজির । হাত কচলাতে কচলাতে বলে , স্যার কী খাইবেন ?
আমি সেভাবেই মোটা গলায় তুই তোকারি লেভেল বজায় রেখেই বাকি অর্ডার করি । আর মনে মনে বলি , হায়রে বাঙাল জাত ! ভালো ব্যবহারের মূল্য বুঝলি না !
.
একই অবস্থা রিক্সাওয়ালাদের ক্ষেত্রেও । সুন্দর করে জিজ্ঞেস করি , ভাই যাবেন ? রিক্সাওয়ালার ভাব বেড়ে যায় । ভাড়া হাকে দ্বিগুনের কাছাকাছি । হয়তো মনে মনে বলে , পাইছি মক্কেল একটা ! শহরে মনে হয় নতুন আইছে ! 
পরের রিক্সাওয়ালাকে বলি , ওই খালি যাইবা ? হাহ , এবার সব ঠিক । ভাড়া নির্দিষ্ট ভাড়ার কাছাকাছিই বলবে । অথবা কাচুমাচু করে বিনয়ের সাথে বলবে , স্যার আপনেগো কাছে দুই পয়সা চাইয়া নিমুনা তো কার কাছে নিমু ?
.
পেশা হিসেবে কোন পেশাকেই ছোট করে দেখতে ইচ্ছে করেনা । সবাইকে সম্মান দিয়ে কথা বলতেই ভালো লাগে । ইসলামের শিক্ষাও সেটিই । কিন্তু  এ যে বাঙাল জাত , তা করিতে দিলে জাতের মর্তবা রহিবে কীরুপে ? 
৫। 
মানুষকে চেনার জন্য বাঙালি সবসময় তার খারাপ দিকটা নামের সাথে জুড়ে দেয়। যেমনঃ খাঁটো আবুল, কানা বাবুল, ল্যাংড়া মকবুল, কাইল্যা মফিজ, কানকাটা জগলু, মোটা অমুক, চিকনা তমুক ইত্যাদি। এইটা আমাদের কীরকম মানসিকতা? মানুষের ভালো কোনকিছুই কি আমাদের চোখে পড়ে না? 
৬। 
কেউ কোনো ভালো কাজ করে প্রচার করলে অনেকেই বলতে আসেনঃ লোক দেখানোর জন্য এসব করছেন!! আমি বলি- ভাই, যার যে  উদ্দেশ্যই থাকুক না কেন, সবাই ভালো কাজ করুন। আল্লাহর ওয়াস্তে হলেও ভালো কাজ করুন। লোক দেখানোর জন্যে হলেও ভালো কাজ করুন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হলেও ভালো কাজ করুন। সুনাম অর্জনের জন্য হলেও ভালো কাজ করুন। দুর্নাম ঘুচানোর জন্য ভালো কাজ করুন। সওয়াবের জন্যে ভালো কাজ করুন, গুনাহের কাফফারা হিসেবে ভালো কাজ করুন। যার যে উদ্দেশ্যই থাকুক, সকলের সকল ভালো ও কল্যাণকর কাজের প্রতি সর্বদা আমার অকুন্ঠ সমর্থন। একটা ভালো কাজ করে মন চাইলে গোপন রাখুন, মন চাইলে ফেসবুকে বাহারি ঢঙ্গে ছবি দিন। আমি 'লাইক' দিবোই দিবো- কথা দিলাম। 


রবিবার, ২৪ আগস্ট, ২০১৪

এই সময়ের অভিধান !

অদ্ভুত এক সময়ে এসে পড়েছি আমরা
চোখের সামনে সবকিছু খুল্লাম খুল্লা করে 
কদর্য শরীর নিয়ে হেঁটে যাবে বারবণিতার দল -
সে কিছু নয় ! শুধু তুমি আমি আমরা কিছু বললেই
বড্ড অবমাননা হবে তার !
.
এই সময়ে 
চেতনার দগদগে ঘা হতে নেমে আসা পচা রক্তপ্রবাহকে
তুলনা করতে হয় নায়াগ্রা ফলসের সাথে !
দুর্গন্ধে নাক চাপা দিলেও 
প্রশংসায় পঞ্চ ষষ্ঠ অষ্টমুখ হয়ে বলতে হয়
আহ ! এ আমি কী পেলাম !  
মেশক আম্বরের ঘ্রাণ ! 
রাজার শরীরে যদি নাও থাকে এক টুকরো আবরণ 
তবুও বলতে হয়- ব্রাভো ! কী অসাধারণ ! 
এমন জমকালো মোটা জামা আমি 
জীবনেও দেখিনি মাইরি !  
.
অদ্ভুত এক সময়ে এসে পড়েছি আমরা । 
এখন বাকস্বাধীনতা মানে গণিকার রুপকীর্তন 
লাথির অপর নাম 'বিশেষ পদসঞ্চালন' ! 
এখানে এখন 'খুন' হয়না মানুষ । বরং
কেউ কেউ ঢং করে রং মেখে 
শুয়ে থাকে রাস্তায় ! 
এই সময়ের অভিধানে 
ধর্ষণ মানে প্রগতির প্রতিশব্দ । মানবাধিকার হলো 
দানবের নাগপাশে ক্রমাগত পিষ্ট হবার 
অপূর্ব সুযোগ ! 
.
আহ ! কী সৌভাগ্য আমাদের ! 
হবুচন্দ্র রাজার গবুচন্দ্র মন্ত্রীর দেশে 
অদ্ভুত সুন্দর এক সময়ে এসে পড়েছি আমরা !  
.

ছোট বড়

ছেলে যতই বড় হোক , মা বাবার কাছে নাকি সবসময় শিশুই থাকে ! কথাটা আগে বুঝতাম না । কেন , এরকম হবে কেন ? চোখের সামনে একটা ছেলে বড় হচ্ছে তারপরেও ছোট মনে হবে কেন ?
পরে এক সময় ব্যাপারটা আমার বুঝে আসে । শুধু বাবা মা নয় , অন্য সবার ক্ষেত্রেও বিষয়টা একই রকম । আসলে ব্যাপারটা বয়স বৃদ্ধি বা বড় হওয়ার সাথে জড়িত না , ব্যাপারটা হলো বয়সের পার্থক্যের । আমার জন্মের সময় যার বয়স ছিল চল্লিশ , আমার বয়স যতই হোক , তিনি বেঁচে থাকলে বয়সের পার্থক্য সবসময় চল্লিশই থাকবে ! আমার বয়স বাড়বে , তাঁর বয়সও বাড়বে ! ফলে আমাদের বয়সের পার্থক্য থাকবে ধ্রুব ! যখন আমার বয়স হবে পঞ্চাশ , তখন তাঁর হবে নব্বই । ফলাফল - আমি মধ্যবয়স্ক পাকাদাঁড়িওয়ালা একজন লোক হলেও তখনো তাঁর কাছে সেই 'সেদিনের ছেলেটা'ই রয়ে যাবো !

শনিবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৪

কলম বন্ধুকে পত্র !

প্রিয় কার্লোস ,
তুমি যদি দেখতে চাও আইনের শাসন , তবে
তোমাকে আসতেই হবে বাংলাদেশে ।
বাংলাদেশ চেননা? খুঁজে দেখতে পারো গিনেস বুকে
উদ্ভট মানুষের উদ্ভট কীর্তির মাঝে হয়তো তুমি খুঁজে পাবে
একটি রাষ্ট্রের নাম । বাংলাদেশ ! 
একদা এদেশ নাকি চলেছিল উদ্ভট উটের পিঠে । আর এখন 
দেশের পিঠেই সওয়ার হয়েছে
উদ্ভট গন্ডারের দল ! 
.
তুমি যদি দেখতে চাও আইনের শাসন , তবে 
তোমাকে আসতেই হবে বাংলাদেশে । এখানে 
ইচ্ছে হলেই সুস্থ সবল মানুষকে ধরে নিয়ে যায়
পোষাকধারীরা ! তারপর ,
আইনের শাসন তাকে পরদিন বসিয়ে দেয় হুইল চেয়ারে ! 
রাত পোহালে কাউকে খুঁজে নিতে হয় হাসপাতালের আইসিইউতে 
কাউকে পাওয়া যায় শীতলক্ষ্যায় , কাউকে ভিনদেশি কারাগারে 
কাউকে কখনোই নয় !
আইনের শাসন যদি দেখতে চাও ,
তোমাকে আসতেই হবে বাংলাদেশে । তবে তার আগে 
অবশ্যই ভালো করে চিনে নিতে হবে 'পাখি ড্রেস' ,
নইলে তুমিও পড়তে পারো আইনের শাসনের কবলে ! কারণ , 
ওটাই যে এখন এই দেশে আইনের শাসনের 
সবচেয়ে প্রিয় পোশাক !

বৃহস্পতিবার, ২১ আগস্ট, ২০১৪

নির্লিপ্তের বর্ষাকাহন

আকাশ জুড়ে ভিড় করেছে নিকষ কালো মেঘ ,
মাঠে ঘাটে নেমেছে অবিরল বর্ষা 
সব কিছু আজ আমার কাছে অর্থহীন
আমার কী ?
বলতে পারো,
হাহাকার ছাড়া বর্ষার জলধারা
কবে কী এনেছে আমার জন্যে ?


ঝরো ঝরো বর্ষণে
হয়তো বেণুবনে বায়ু নাড়ে এলোকেশ
কাগজের নৌকোর মত যাচ্ছে ভেসে সোনার তরী
কদম গুলো পড়ছে ঝরে মৃদু হাওয়ায়
মহুয়ার বনে ছড়িয়ে আছে 
নাম না জানা ফুলের গন্ধ !  
আমার কী ?
সবকিছু আজ আমার কাছে অর্থহীন
বলতে পারো ,
হাহাকার ছাড়া বর্ষার জলধারা
কবে কী এনেছে আমার জন্যে ? 

বুধবার, ২০ আগস্ট, ২০১৪

এনে দাও একটা লাগাম

চাইনা ১০৮ টা নীলপদ্ম  
বিশ্বসংসার তন্ন তন্ন করে কেউ আমায় খুঁজে এনে দাও
একটা লাগাম
পাগলা ঘোড়ার মত আমার কল্পনা ছুটছে দিগ্বিদিক   
ওকে যেন আটকাতে পারি হাতের মুঠোয় 
সাত সাগর তেরো নদী পেরোবার আগেই ।
আর কতকাল বদমাশটাকে ছুটতে দেয়া চলে নিরুদ্দেশ 
তেপান্তরের মাঠে ?


হীরে মণি মুক্তো নেই আমার সিন্দুকে 
আছে শুধু চার প্রকোষ্ঠের একটা হৃদয়
ওটাই দিয়ে দেবো চাও যদি বিনিময় 
তবু এনে দাও একটা লাগাম ,
পাগলা ঘোড়ার মত দুরন্ত আমার কল্পনা 
সবকিছু ছিন্নভিন্ন করে সাতআকাশ পেরিয়ে 
ছুটছে শুন্যতায়
ওকে আটকাতে হবে হাতের মুঠোয়
সাত সাগর তেরো নদী পেরোবার আগেই ।
আর কতকাল বদমাশটাকে ছুটতে দেয়া চলে নিরুদ্দেশ
তেপান্তরের মাঠে ? 

মঙ্গলবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৪

নাগরিক হতে হবে তাই !

পুরনো দিনের মত বিলিয়ে মোলায়েম আলো
ধীর পায়ে ফিরে যায় চাঁদ 
পুরনো পথে । 
ফুরিয়ে যায় পূর্ণিমা রাত 
ক্রমাগত গভীর থেকে গভীরতর হয়ে । 
এককালের চন্দ্রালু কিশোর
আজ আর জোছনায় খোঁজেনাকো মায়া
নেই তার এতটুকু অবসর, চোখ তুলে তাকাবার-
একবার আকাশের পানে ।
তারা গুনবার নেইতো সময়    
নাগরিক হতে হবে তাই 
যেন সে ভুলেই গেছে ফেলে আসা কৈশোরের ছায়া
নাগরিক ব্যস্ততায় !

ঝুম বৃষ্টি নামে নিঃসঙ্গ পিচঢালা রাস্তায়
টেলিফোনের তারের ওপর ভিজে  নিশ্চুপ দাঁড়কাক 
কাদা ছিটিয়ে চলে যায় নব্য ধনীদের চকচকে গাড়ি 
সবুজ পাতা বেয়ে বৃষ্টি নামে মাটির বুকে
ফোঁটা ফোঁটা অশ্রুর মতন ।
হয়তোবা ডাকে ব্যাঙ দূর গাঁয়ে কোন এক ডোবার ধারে
আদিম তাড়নায় । ঝাপসা হয়ে ওঠে বহুতল ভবনের কাঁচের জানালা
সেকালের বৃষ্টিপাগল কিশোর আজ তবু ভ্রুক্ষেপহীন
নাগরিক হতে হবে তাই 
মগ্ন সে কোন এক ব্যস্ত নগরীর
নাগরিক ব্যস্ততায় ! 

সোমবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৪

ফেসবুকীয় অহংকার !

***
অহংকারের অনেক রুপ । এর মধ্যে সবচেয়ে হাস্যকর রুপটি হলো ফেসবুকীয় অহংকার । প্রায়ই দেখি , ফেসবুক আইডি ধারী ভ্রাতাগনের কেউ কেউ স্ট্যাটাস দেন- 'খামোশ এই করবেন না ! সেই করবেন না ! ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে বের করে দেবো ! আনফ্রেন্ড করে দিতে বাধ্য হবো !' ইত্যাদি ।
তো আসলে এর দ্বারা কী বোঝায় ? এর দ্বারা তাদের কিছুটা অহংকার প্রকাশ পায় । ফেসবুকে কেউ কাউকে আনফ্রেন্ড করলে , ব্লক করলে কারো কিছু আসে যায় না । এটা বাস্তব জীবন না । বাস্তবে পরিচিত নয় এমন যে কেউ এখানে একটা নাম ছাড়া আর কিছু না । যাকে আপনার পছন্দ নয় তাকে আপনি নীরবেই আনফ্রেন্ড করতে পারেন । ডিস্টার্ব করলে ব্লক করতে পারেন । সেজন্য ফেসবুকে হম্বিতম্বি করাটা চরম হাস্যকর একটা ব্যাপার । (এইরকম কিছু দেখলেই আমি হাসি থামাতে পারিনা !)
ফেসবুকীয় বেকুবরাও কম যায়না । আমি অমুক অমুক সেলিব্রেটির ফেসবুক ফ্রেন্ড !! অমুকের সাথে আমার চ্যাটে আলাপ হয়েছে !!
ওরে খাইছে ! কী বিশাল অর্জন !!!
অতিমাত্রায় বেকুব এবং অহংকারী , ইহাদের নিকট হইতে আল্লাহর কাছে পানাহ চাই ।
***
সেলিব্রেটি হিসেবে যাদের কথা পত্রপত্রিকায় আসে, তারা প্রকৃতপক্ষে মানুষের মনোরঞ্জক । কেউ গান গেয়ে, কেউ অভিনয় করে মানুষের মনোরঞ্জন করেন । সেই হিসেবে ফেসবুক সেলিব্রেটি কথাটাও ঠিক আছে । ফেসবুক সেলিব্রেটি = যাহারা ফেসবুকে জনগনের মনোরঞ্জন করেন !
বহুদিন ধরিয়াই তো দেখিতেছি , হালকা ঠাট্টা কৌতুক আর পারস্পরিক ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানোর বাইরে ইহারা ভালো কিছু দিয়াছেন বলিয়া চোখে পড়ে না । তথাকথিত ফেসবুক সেলিব্রেটিগন হইতে আমি সাধারণত শতহস্ত দূরে থাকিতে চেষ্টা করি । ইহাদের নিকট হইতেও আল্লাহ্‌র কাছে পানাহ চাই ।

রবিবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৪

বিশ্বাসের সুতোয় গেঁথেছি হৃদয়মাল্য – ২

মুহাম্মাদ (সাঃ) যে আসলে নবী নন, তাঁর পাঠকৃত কুরআন যে আসলে আল্লাহ্‌র কালাম নয়- এটা প্রমাণ করার একটা মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া করেছিল আবু লাহাব । আর এর ফলে মিথ্যা প্রমাণিত হবার বদলে কুরআন আল্লাহ্‌র কালাম ও মুহাম্মাদ (সাঃ) এর নবী হবার ব্যাপারে আরো একটি প্রমাণ যোগ হয় ।

মক্কী যুগের মাঝামাঝি সময়ে নাযিল হয় কুরআনের 'আল লাহাব' সুরাটি । এতে রাসুলের(সাঃ) চাচা আবু লাহাবের সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয় ।

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহ্‌র নামে শুরু  
১। আবু লাহাবের হস্তদ্বয় ধ্বংস হোক এবং ধ্বংস হোক সে নিজে
২। কোন কাজে আসেনি তার ধন-সম্পদ ও যা সে উপার্জন করেছে 
৩। সত্বরই সে প্রবেশ করবে লেলিহান অগ্নিতে
৪। এবং তার স্ত্রীও-যে ইন্ধন বহন করে 
৫। তার গলদেশে খর্জুরের রশি নিয়ে ।  

 এই সুরা নাযিলের পর আবু লাহাবের সামনে একটা মোক্ষম সুযোগ তৈরি হয় ইসলামকে মিথ্যা প্রমাণ করার । যদি সে লোক দেখানোর জন্যে হলেও ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’  কালেমা পাঠ করে মুসলিম হয়ে যেত, তাহলেই প্রমাণ হয়ে যেত- মুহাম্মাদ (সাঃ) আসলে কোন নবী নন । আর তাঁর তেলাওয়াত করা কুরআন আসলে আল্লাহ্‌র পাঠানো কালাম নয় । মিথ্যা প্রমাণিত হত কুরআনের ভবিষ্যদ্বাণী । তাহলে একথা বলার সুযোগ তৈরি হত যে, যদি কুরআন আল্লাহ্‌র কালামই হত, তাহলে তো এরকম ভুয়া সুরা নাযিল হতনা !

কিন্তু আবু লাহাব আসলে ইসলামের বিরোধিতায় এতটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তার আর কোনভাবেই ইসলামের আলোয় আসা সম্ভব ছিলনা । এই সুরার প্রতিটি অক্ষর আবু লাহাবের জন্য সত্য বলে প্রমাণিত হয় ।

এই সুরা নাযিল হবার পরেও আবু লাহাব সাত-আট বছর বেঁচে ছিল । আবু লাহাব মারা যায় বদর যুদ্ধের পর । সবাই বদর যুদ্ধে গেলেও আবু লাহাব নিজে না গিয়ে তার বদলে অন্য একজনকে পাঠায় । এই সময়ে সে এমন রোগে আক্রান্ত হয় যে, তার সারা শরীরে দুর্গন্ধযুক্ত ঘা হয়ে যায় । এমনকি তার পরিবারের কেউও তার ধাঁরেকাছে ঘেষতো না । বদরে পরাজিত হয়ে সবাই ফিরে দেখে আবু লাহাব মরে গেছে । কিন্তু তার লাশের দুরবস্থা ও দুর্গন্ধের কারণে তাঁকে দাফন করার কোন উদ্যোগ এমনকি তার ছেলেরাও নেয়নি । কয়েকদিন পরে গর্ত খুঁড়ে লম্বা বাঁশের লাঠি দিয়ে কোনমতে তাকে গর্তে ফেলে মাটিচাপা দেয়া হয় ।


ইসলামের বিরোধিতায় সর্বশক্তি নিয়োগ করেও কোন লাভ হলো না আবু লাহাবের । ধ্বংস হয়ে গেল আবু লাহাবের দুই হাত, কোন কাজে আসলো না তার ধন সম্পদ সন্তান সন্ততি , আর আখেরাতে তো সে থাকবেই  জাহান্নামের আগুনের লেলিহান শিখায় ।

আবু লাহাবের এই পরিণতি আর কুরআনের এই ভবিষ্যৎবাণীর সত্যতা রয়ে গেল পৃথিবীর মানুষের জন্য বিশ্বাসের উপাদান ও পথপ্রদর্শক হিসেবে ।