এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...

এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে

রবিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৪

যদি ঝিনুক হতাম !

ঝিনুক হয়ে না জন্মাবার কষ্টটা, এখনো মাঝে মাঝে ফিরে আসে মাঝরাতে । 
সেইযে প্রথম সমূদ্র দেখবার ক্ষণে, আমার 'ক্ষুদ্রত্ব'কে নাড়া দিয়ে গেল 
একটি ঝিনুক । 
তারপর আরও কতবার ফিরে গেলাম বিস্তৃত বালুকাবেলায়, 
ঢেউয়ের আঁচলে সপে দিলাম সমগ্র অস্তিত্ব; কন্ঠের বাঁধন খুলে- 
বিরহ সংগীতের মূর্ছনা ছড়িয়ে দিলাম ফেরারী হাওয়ায় 
নাফের মোহনায় কতবার ভাসালাম সিন্দাবাদের নাও 
প্রবাল দ্বীপের আহ্বানে- 
হিমছড়ি-ইনানীর পথে কত পাহাড় কত ঝিনুকের সাথে হলো ক্ষণিকের মিতালী । তারপর 
বেলা পড়ে এলে 
ঠিকই ফিরতে হলো যন্ত্রনগরের পথে । 
- 
ঝিনুক হয়ে না জন্মাবার কষ্টটা , এখনো মাঝে মাঝে ফিরে আসে মাঝরাতে । 
যদি ঝিনুক হতাম, রোজ ভোরে কাঁচা আলোয় সূর্যস্নান 
আর ঢেউয়ের সাথে উন্মাতাল গলাগলি শেষে 
চিরতরে ভুলে যেতাম এইসব কৃষ্ণ রাত্রির- পাশবিক বঞ্চনা ।  

শনিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৪

বিলম্বিত বসন্ত

বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে ।
বেশ । তারপর?
আমি তো বন্য নই,
শিশুও বলা চলেনা নিশ্চয় !
হে কবি, আমার স্থান তবে কোন্ আস্তাকুড়ে ?
-
কতকাল চলে গেল লিলুয়া বাতাসে
কত শৈত্যপ্রবাহ দুমড়ে মুচড়ে গেল আমার ওপর
মানবিক উষ্ণতা ছাড়া
কীকরে চালিয়ে যাবো নিরন্তর প্রতিবাদ?
ক্ষুদ্র এ শীতল শরীরে
কবে জড়াবো জীবন্ত একখানি মায়ার চাঁদর ?
-
তবে কি-
'বিলম্বিত বসন্ত'ই হয়ে রবে আমার কাব্যগ্রন্থের
স্থায়ী উপজীব্য? 

তোমাকেই কাঁপিয়ে দেবো !

শীতের হাত ধরে 
জানালার ফাঁক গলে ক্লিওপেট্টার বেশে  
এক পশলা হিমেল হাওয়া এসেছিল গতকাল  
আমাকে কাঁপিয়ে দিতে । 
ছদ্মবেশী ড্রাকুলার মত ওরা- নিতে এসেছিল আমার  
উষ্ণ রক্তের স্বাদ ! কন্ঠ চড়িয়ে- 
সাফসাফ জানিয়ে দিয়েছি চোখের ভাষায়, 
বেয়াদব, 
'আর একবার কাছে এলে, সবকটি ঠ্যাং ভেঙে  
তোমাকেই কাঁপিয়ে দেবো' ।
-
শীত শীত ধুয়া তুলে কাঁপিয়ে এসেছ আমাকে 
চব্বিশটি বছর । নাবালক ছিলাম বলে করিনি প্রতিবাদ । 
আর অকর্মণ্য নাদান উজবুক কবিরাও 
ভালোবাসি ভালোবাসি বলে হাওয়া দিয়েছিল 'শীতে'র 
ছলনার নৌকায় ।
-
এখন তো নাবালক নই ! 'আত্মরক্ষা' নয়, 
'আক্রমণ' হবে এবারের প্রতিরক্ষার মূলমন্ত্র । প্রস্তুত আমি- 
আর একবার কাছে এলে, সবকটি ঠ্যাং ভেঙে
'তোমাকেই কাঁপিয়ে দেবো' ।
 

বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১৪

লেডি হিটলার !

পুরুষেরা তাদের ক্ষমতা বিচার বিবেচনার ভিত্তিতে ব্যবহার করে । এটা আগে থেকেই জানা কথা । কিন্তু বিবাহিত ভ্রাতৃকুলের নিকট হইতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, 'নারী ঝাতি' ক্ষমতা পেলে নাকি ব্যবহার করে একনায়কের মত । এটাই নাকি 'ন্যাচারাল হিস্ট্রি অব দা ফ্যামিলিজ' এরাউন্ড আস ।
এটা স্পষ্ট, শহুরে পরিবেশে দিনকে দিন নারীরা পরিবারগুলোতে আপারহ্যান্ড নিচ্ছে । বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রী দুজনেই সমান সমান, সো কলড পারফেক্ট ম্যাচ।
আগে মেয়েরাই ছিল কম্প্রোমাইজিং, ছেলেরা ডমিনেটিং । কিন্তু আধুনিক পরিবেশে ছেলেরাই বরং মেয়েদের তুলনায় বেশি কম্প্রোমাইজিং মনোভাব পোষণ করছে । আর এর পুরোপুরি সুযোগ নিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই বিষয়টাকে রীতিমত পুরুষ নির্যাতনের পর্যায়ে নিয়ে গেছে কোন কোন 'অবলা নারী' । স্বামীর প্রতিমুহূর্তের কৈফিয়ত তলব, বন্ধুবান্ধবের সাথে মিশতে না দেয়া, মোবাইল থেকে ফোন নাম্বার ডিলিট করা, ফেসবুকের ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে ক্লোজ মানুষদের বাদ দেয়া ইত্যাকার নানান রকম মানসিক অত্যাচার সহ্য করে নাকি দিন কাটাচ্ছেন অভাগা পুরুষরা । কিছুদিন আগে এমন সংবাদও পত্রিকায় দেখেছিলাম, স্ত্রীর লাথিতে স্বামীর মৃত্যু !
হায় সেলুকাস ! এই কি ছিল তোমার কপালে সখিনার পা ?
-
আমরা জীবিত মানুষ । মুক্ত, স্বাধীন । সেজন্যে মৃত ভাইয়েরা যখন দুঃখ করে বলেন- ভাইরে, যতদিন পারিস বেঁচে থাকিস । 'মরেছিস' তো মরেছিস !!
শুনে পৈশাচিক আনন্দ পাই ।
আর মনে হয়, নারী যখন ক্ষমতাচর্চার সুযোগ পায় তখন-
They are not soulmate,
not a friend,
not a helping hand,
not a partner,
They become just a 'lady HITLER'...    

বৃহস্পতিবার, ৬ নভেম্বর, ২০১৪

বিপ্লব করার আগে বিয়া করতে হবে !

গতবছর একদিন Dr Abdul Awal ভাইয়ের কাছে বিরাট বিরাট বিপ্লবী চিন্তাধারা শেয়ার করছিলাম । এই প্ল্যান সেই প্ল্যান । প্ল্যানের শেষ নাই ! তো মনোযোগী শ্রোতা হিসেবে সব শুনে Awal ভাই বললেন, বিপ্লব করার আগে বিয়া করতে হবে  । যদি বিয়ার পরেও বিপ্লবের চিন্তা ও নেশা বহাল তবিয়তে থাকে তাহলে কিছু হইলেও হইতে পারে । নাইলে সব অশ্বডিম্ব । 
  
ঐটাতে ধরা খাইয়া এবার শুরু করলাম অন্য প্রসঙ্গ, কীভাবে দেশ পরিচালনা করা উচিত্‍। সমাজ পরিবর্তনের জন্য কী কী করা উচিত্‍ । 
Awal ভাই বললেন, দেশ পরিচালনার চিন্তা করার আগে বিয়া করা উচিত্‍  ! সংসার পরিচালনা করতে পারলে পরে তাকে দিয়ে দেশ পরিচালনার আশা করা যায়  । নাইলে সব অশ্বডিম্ব । 
  
এইডা কিছু হইলো?  বিবাহিত লোকগুলা এমুন কেনু?  

শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর, ২০১৪

হয়তো একদিন

কুরবানির ঈদে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো এলাকায় গোশত বিতরন । লিস্ট করে প্যাকেট বানানো হয় । তারপর লিস্ট ধরে ধরে বাড়ি বাড়ি দিয়ে আসা হয় ।
লিস্ট করার কাজটা সবসময় আমিই করি । কিন্তু প্রতিবছরই আমার লিস্টে এমন কিছু মানুষের নাম থেকে যায়, যারা আর দুনিয়ায় নেই । তারপর আমাকে জানানো হয়, অমুক অমুক তো মারা গেছে ! ওদের নাম লিখেছ কেন ?
মসজিদে গিয়ে কাউকে হয়তো জিজ্ঞেস করলাম, আঃ গফুর চাচাকে দেখছি না যে !
শুনতে হয়, তোমারে কেউ বলে নাই ? উনিতো একমাস আগে মারা গেছেন !
কত পরিচিত মুখ প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছে । একদিন হয়তো এভাবেই কোন একজনকে শুনতে হবে, 'আপনি কিছু জানেন না ? মুহসিন ভাই তো এক মাস আগে মারা গেছেন !'

বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর, ২০১৪

বাঙ্গালির পরশ্রীকাতরতা

ছোটবেলায় দুই বন্ধু একসাথে লেখাপড়া করেছে । তারপর নানা পাকচক্রে পড়ে একজন লেখাপড়া বেশিদূর টানতে পারেনি । আরেকজন কোনভাবে হয়তো ভালো একটা অবস্থানে গেছে । ধরা যাক একটা সরকারি অফিসে চাকরি হয়েছে ।
তারপর একদিন সরকারি অফিসার গ্রামে গেলেন । রাস্তায় হাঁটতে বের হলেন , পাশ দিয়ে হয়তো ছোটবেলার ঐ বন্ধু হেঁটে গেছে । অন্যমনস্ক থাকায় বা অন্য দিকে তাকিয়ে থাকায় হয়তো চোখেই পড়েনি বাল্যবন্ধুকে ।
বাড়িতে গিয়ে সেই বন্ধু মন্তব্য করবে- 'টুনির মা , সবই কপাল বুঝলা , সবই কপাল । আরিফুল্লা বড় অফিসার হয়া এখন আর আমাগো দিকে ফিরাও তাকায় না । অহংকারে পা মাটিতে পড়ে না হেই বেডার, বুঝলা ! হেরে পাইলে একদিন কয়া দিও, অহংকার কিন্তু পতনের মূল !'
হয়তো কোন মুরুব্বীকে ঠিকমত চিনতে পারেনাই । মুরুব্বী আরেকজনের কাছে বলবেন, 'অমুকের পোলাডা বেয়াদব হয়া গেছে । বড় অফিসার হইছে বইলা এহন আর সালাম কালামও ঠিকমতন দেয়না । হায়রে কলিকাল ! আল্লা মালুম, আরো কতকিছুযে দেখতে হইবো এই জীবনে !'
ছুটিছাটায় যদি সময়ের অভাবে সব আত্মীয়দের বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ না হয়, তাহলে যাদের বাড়িতে যাওয়া হয় নাই তারা বলবে, 'এখন তো বড় অফিসার হয়া গেছে । এখন কি আর আমাদের কথা মনে আছে? অহংকার বলে একটা কথা আছেনা !'
-
-
আসলেই, অন্য মানুষের সম্পর্কে নেগেটিভ ধারণা করতে আমাদের বাঙালি সমাজের কোন জুড়ি নেই । বাঙালির মত পরশ্রীকাতর জাতি পৃথিবীতে আর আছে কিনা কে জানে ! কিংবা এও হতে পারে- ব্যর্থদের কাছে হয়তো সফল ব্যক্তিমাত্রই অহংকারী মনে হয় !

মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৪

রহস্য

-‘আপনি? আপনি কে?’
-‘আমি নেছার । নেছার উদ্দিন ভুইয়া । বারো ভুঁইয়ার ত্রয়োদশ উত্তরপুরুষ’ ।
-‘ও তাই ? তা আপনি এরকম শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছেন কেন ? ছ’মিলে ঢুকিয়ে কেউ এমন করেছে বুঝি ? আহারে !’
হাসতে শুরু করে মুনির এবং নেছার । নেছার মুনিরের দুই বছরের সিনিয়র । কিন্তু তবু ওদের সম্পর্কটা সিনিয়র জুনিয়রের গন্ডিতে আটকে নেই । যদিও সিনিয়র জুনিয়রের মধ্যেকার স্বাভাবিক স্নেহ ও শ্রদ্ধাবোধেরও ঘাটতি নেই দুজনের মধ্যে । ওদের সম্পর্কটাকে ভাই ভাই সম্পর্ক বললেও পুরোটা স্পষ্ট হয়না । এটাকে বরং ভাই ভাই ও সিনিয়র জুনিয়র সম্পর্কের একটা মিশেল অথবা তার চেয়ে বেশি কিছু বলা যায় ।
সিনিয়র হিসেবে নেছারকে মুনির আপনি করে বলবে এটা স্বাভাবিক, কিন্তু কীভাবে কীভাবে যেন নেছারও মুনিরকে আপনি করে সম্বোধন করাটাকে স্বাভাবিক করে নিয়েছে । চেহারায় দুইজন বলা চলে দুই প্রান্তের । মুনিরকে ঠিক শুকনা বলা চলেনা, তবে স্বাস্থ্যবানও বলা যায় না । মোটামুটি গোলগাল চেহারা । ওদিকে নেছার মেডিকেল কলেজের পুরো ক্যাম্পাসে দৈর্ঘ্যে প্রস্থে অদ্বিতীয় না হলেও ওজনে সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছে দুবছর আগেই । এজন্য অবশ্য বেশ কসরতও করতে হয়েছে তাঁকে । তখন ওর ওজন ছিল পচানব্বই । সেঞ্চুরির এত কাছে এসে ফিরে যাওয়ার কোন মানে হয় ? নেছার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে একশ কেজির মাইলফলক ছোঁবার । সেজন্য তাকে প্রায়ই দেখা যেতে লাগলো মেরিডিয়ানের বুফে ডিনারে । তারপর বছর ঘুরতেই ওজন গিয়ে দাঁড়ালো একশ পাঁচে । নেছারের চোখে তখন অন্যরকম তৃপ্তির আভা ফুটে উঠল । এই বিশেষ সংবাদ সবাইকে জানানোর জন্য একদিন একটা ঘরোয়া পার্টির আয়োজন করে ফেললো নেছার ।

মুনিরের খুব ভালো লাগে নেছারকে । এই ভালো লাগাটাকে মুনির তুলনা করে সমূদ্রভ্রমনের সাথে ।
সমূদ্রের তীরে দাঁড়ালে আমাদের কেন ভালো লাগে ? কেন দুঃখ কষ্টগুলোকে তুচ্ছ মনে হয় ? কেন সঞ্জীব গেয়ে ওঠেন- ‘ও পোড়া চোখ সমূদ্রে যাও !’
কারণ, সমুদ্র বিশাল ।
নেছারের শরীরটাই যে শুধু বিশাল তা নয়, মনটাও বিশাল ।
সেজন্যই, ভালো লাগে । বড় মনের মানুষের সাথে কথা বলতেই ভালো লাগে, নিজেকেও বড় বড় মনে হয় ।

এবার অনেকদিন পর দেখা হলো দুজনের । নেছারের ওজন কমে গেছে । দেখতে অনেক শুকনো লাগছে । কী ব্যাপার ? কোন সমস্যা নয়তো ?
ব্যাপারটা বেশ ভাবিয়ে তুললো মুনিরকে । কোন অসুখের কথাতো কানে আসেনি । কোন ব্যাপারে কি খুব দুশ্চিন্তা করছেন নেছার ভাই ? খাওয়া দাওয়ায় অনিয়ম করছেন ? খাওয়ার ব্যাপারে তো সহজে আপোষ করার কথা না নেছার ভাই !
নেছার ভাই নিজেকে ভোজন বিলাসী নয়, ভোজন রসিক বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন । বেশি খাওয়ার ব্যাপারে তাঁর হাতে আছে মোক্ষম যুক্তি। ‘আমার বডি সারফেস এরিয়া বেশি, মেটাবলিজম বেশি, আমার ক্যালোরি রিকোয়ারমেন্টও বেশি’ । ‘সুতরাং আমাকে বেশি করে খেতে হবে ! আর খাবই যখন, মজাদার এবং ভালো খাবারই খাবো !’
এটা কোনভাবেই বিলাসিতা নয় নেছার ভাইয়ের কাছে, এটা হলো ‘ভোজনরসিকতা’ !
অবশ্য নেছার ভাইয়ের দুশ্চিন্তা করার কারণ আছে । নেছার ভাই পরিবারের একমাত্র ছেলে । কিছুদিন আগে হঠাৎ করেই মারা যান নেছার ভাইয়ের বাবা । এখন পুরো পরিবারের দায় দায়িত্ব বলতে গেলে নেছার ভাইয়ের কাঁধে । বাবা মারা যাওয়ার ব্যাপারটা মুনিরের কাছে মনে হয়, চরম ঝড় জলোচ্ছাসে একটা ছাতা অথবা আশ্রয়কেন্দ্র উড়ে যাওয়ার মত । এরপর থেকে যত ঝড়ো বাতাস, শিলাবৃষ্টি, খড়কুটো বিদ্যুৎ চমক সবকিছু সরাসরি গায়ে এসে লাগে । শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যায়না । যদিও নেছার ভাই শুধু শারিরীকভাবেই নয়, মানসিকভাবেও অনেক শক্ত একটা ছেলে, কিন্তু তবুও হঠাৎ করে এতটা চাপ হয়তো তাকেও কষ্টে ফেলে দিয়েছে ।
নেছারের সাথে একান্তে আলাপ করার প্রয়োজন বোধ করে মুনির ।

-‘ভাই, এতদিন পরে এলাম । চট্টগ্রামবাসীর পক্ষ থেকে কীভাবে আপ্যায়ন করা হবে জানতে পারি কি?’ কৌতুকের স্বরে জিজ্ঞেস করে মুনির ।
-‘আপনি যা বলবেন তাই হবে’ । তাৎক্ষণিক জবাব দেয় নেছার ।
-‘হুম । তাহলে আজকের ডিনারটা আনলিমিটেড হয়ে যাক ! চলেন, কারো লস করে দিয়ে আসি !’

আটটার দিকে জিইসি মোড়ের দিকে চলে যায় মুনির ও নেছার । বাফে ডিনার খাওয়ার ব্যাপারে ওদের স্পেশাল সিস্টেম আছে । সাধারণত সবাই গিয়ে প্রথমে সুপ, ভেজিটেবল খায় । নেছার ও মুনির ওসবের ধারেকাছে ভিড়বে না । নো সুপ, নো রাইস । ডাইরেক্ট এটাক অন চিকেন ফ্রাই, রোস্ট, বিফ, মাটন, প্রন, আইসক্রিম এন্ড ফ্রুটস । এছাড়া অন্য কোন ভালো আইটেম থাকলে চেখে দেখা যেতে পারে ।
হিসেব করলে আল্টিমেটলি অন্তত এই দুজনের ক্ষেত্রে রেস্টুরেন্টের লসই হয়ে যায় ।

খেতে খেতে মুনির প্রশ্ন করে-
-‘নেছার ভাই, এখন কত ?’
-‘নাইন্টি এইট’ ।
-‘এনিথিং রং ?’
-‘নো’ ।
-‘কী করছেন ? খাওয়া কমিয়েছেন নাকি ব্যায়াম করছেন ?’
-‘আরে খাওয়া কমাবো কেন? এই যে এখন খাচ্ছি না ! খাওয়া কমালে কি আর এই পথে পা মাড়াই ?’
-‘তাহলে ?’
-‘প্রতিদিন সকালে প্যারেড মাঠে দৌড়াচ্ছি’ ।
কিছুটা উদাস হয়ে যায় মুনির । একসময় প্যারেড মাঠে মুনিরও দৌড়াতো । নেছার ভাইয়ের সাথে অনেকবার ম্যারাথনে অংশ নিয়েছে । হাউ মাচ স্ট্যামিনা ইউ হ্যাভ । প্যারেড মাঠের কিনার ধরে একটানা দৌড়ে কতবার মাঠ প্রদক্ষিণ করা যায় এই নিয়ে প্রতিযোগিতা হত দুজনের । মুনির হাল্কা পাতলা, দুইবার তো সে অনায়াসেই পারে । কিন্তু নেছার এতটা ওজনদার মানুষ হয়েও কম যায়না । প্যারেড কর্নার দুইবার চক্কর দেয়া মানে প্রায় চার কিলোমিটার । নেছারও দুইবার চক্কর দেয় মুনিরের সাথে । নেছারের স্ট্যামিনা সম্পর্কে আগে ঠাট্টা করলেও এর পরে আর সেটা করার সুযোগ থাকে না মুনিরের ।
-‘নেছার ভাই, মোক্ষম প্রশ্নটা কী জানেন?’
অনেক ক্ষণ পরে নাটকীয় ভাবে আবার কথা শুরু করে মুনির । নাটকীয়তা জিনিসটা ওর ভেতর ভালোমতই আছে । নাটকীয়ভাবে বিভিন্ন প্রসঙ্গে কথা শুরু করতে সে ওস্তাদ । নেছারের সাথে এত ভালো সম্পর্কের এটাও হয়তো একটা কারন । দুজনে একসাথে হলে দেশ বিদেশ আকাশ পাতাল সাহিত্য রাজনীতি ধর্ম ইতিহাস ভূগোল কোনটাই বাদ পড়েনা আলোচনা থেকে । নানারকম থিওরি নিয়ে ওদের আলোচনা চলতেই থাকে । বাংলাদেশ থেকে আমেরিকা, মিশর চীন এন্টার্কটিকা । দোয়েল কোকিল থেকে এমু পেঙ্গুইন । জীবনানন্দ থেকে গুন্টার গ্রাস । এরশাদ থেকে গাদ্দাফি । কোনকিছুই বাদ পড়েনা সে আলোচনায় । জাকির নায়েকের উত্থানের কারণ ও ফলাফল কী, ঈমাম মাহাদী কখন কীভাবে আসবেন, বিশ্বের পরিবর্তন কীভাবে হচ্ছে এসব বিষয়ে নেছারের ইউনিক থিওরি আছে । কতরাত যে ওরা শুধু এইসব আলোচনা করে পার করেছে তার ইয়ত্তা নাই । আজও হয়তো আলোচনা সেদিকেই এগোবে ।

-‘কোন্‌ প্রশ্নটা যে মোক্ষম সেটা আমি কীভাবে বুঝবো ?’ চোখ নাচিয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেয় নেছার ।
-‘প্রশ্নটা হচ্ছে, এইযে প্যারেড মাঠ চক্কর দিচ্ছেন, তা হঠাৎ ওজন স্তরে ফাটল ধরানোর কারণ কী ?’
মুচকি হেসে নেয় নেছার ।
-‘আমি জানতাম এই প্রশ্নটা আজকে আমাকে বিদ্ধ করবেই । সেজন্য মোকাবেলা করার প্রস্তুতি নিয়েই এসেছি !’
পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে নেছার । সুন্দর করে একটা নাম লেখা তাতে । নামটা পড়ে কিছু একটা আন্দাজ করে মুনির । তবুও অবুঝের মত প্রশ্ন করে সে । যদি আন্দাজ সঠিক হয়, তাহলে সে বিষয়ে নাদানের মত প্রশ্ন করাই যায় !

-‘এটা কী? কার নাম? আপনার বোনের?’
-‘আরে নাহ ! আমার বোনেরা যাকে পছন্দ করেছে তাঁর !’
লজ্জার আভা ছড়িয়ে পড়ে নেছারের চোখে মুখে । মুনির তবুও না বোঝার ভান করে । এইসব ব্যাপারে সহজে ছেড়ে দিতে নেই !
-‘কেন কেন? আপনার বোনেরা পছন্দ করেছে কেন? কে ইনি? আর কার জন্যেই বা পছন্দ করলো?’

নেছার এবার পকেট থেকে একটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি বের করে । বলে, ‘ইনিই সেই ব্যক্তি !’
এক পলক দেখে ছবিটা ফিরিয়ে দেয় মুনির । এক বিংশাদশীর ছবি ! দ্বাবিংশও হতে পারে !

নেছার লজ্জামিশ্রিত কন্ঠে বলে- ‘গত মাসে দেখাদেখি হয়েছে । সবকিছু ওকে হয়ে আছে । তবে...’
-‘তবে কী?’
-‘উনি বলেছেন, ওজন কমিয়ে নব্বইয়ের নিচে নামাতে হবে । সময় তিন মাস !’
-‘এই তাহলে ওজোন স্তরে ফাটল ধরার রহস্য?’ ...

হাসতে শুরু করে মুনির এবং নেছার দুজনেই ।
‘বিফ শেষ হয়ে গেছে’ বলে উঠে খাবার আনতে যায় নেছার । এটা যে লজ্জা ঢাকার উছিলা সেটা না বোঝার কোন কারণই আর অবশিষ্ট থাকেনা মুনিরের কাছে । ঐতো, কিঞ্চিৎ আরক্ত মুখটা পেছন থেকেও বেশ দেখা যাচ্ছে !

রবিবার, ২৬ অক্টোবর, ২০১৪

সব নিয়ে যা

সব নিয়ে যা সব নিয়ে যা
কিচ্ছু আমার নেই প্রয়োজন
কিছুই আমি বলবো না আর
লুট ডাকাতির কর্ আয়োজন ।
-
বুক ফেঁড়ে মোর যা নিয়ে তুই
স্বপ্নভুক এ হৃদয়টাকে
সকাল সন্ধ্যা মুঠোয় ভরে
দিস খেতে দিস 'স্বপ্ন' তাকে ।
-
চোখ দুটোকে চোখেই রেখে
নিতে পারিস যা ইচ্ছে তোর
স্বপ্ন দেখার চোখ হারালে
কী থাকে আর বুকের ভেতর?

শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৪

মেডিকেল ছাত্রীর আত্মহত্যাঃ দায় কার?

আদ দ্বীন মেডিকেল কলেজের এক ছাত্রী আত্মহত্যা করেছে । পরীক্ষায় ফেল করায় সে ডিপ্রেশনে ভুগছিল । চিন্তা ছিল টাকারও । কারণ বেসরকারি মেডিকেল কলেজে একবার ফেল করা মানে অনেক টাকা গচ্চা । গতবছর বগুড়া মেডিকেল কলেজের এক ছাত্রী আত্মহত্যা করে একই কারণে । বারবার পরীক্ষা দিয়ে পাস করতে পারছিল না । চিটাগাং মেডিকেলে আমার এক ব্যাচ সিনিয়র ফরিদ ভাই, ফ্রাস্ট্রেশান এবং ডিপ্রেশানে ভুগে মেডিকেল কন্টিনিউ করতে না পেরে বাড়িতে চলে যান । একদিন খবর পাই, তিনি আত্মহত্যা করেছেন ।
এইসব অকাল মৃত্যুর দায় কার ?
দায় খোঁজার আগে একটু বলা ভালো- মেডিকেলে পাস বলতে ৩৩ নম্বরে পাস নয় । এখানে প্রতি সাবজেক্টে পাঁচটা পার্ট- অবজেক্টিভ, রিটেন, ভাইভা(দুই বোর্ড), অস্পি এবং প্রাক্টিকাল । পাস করতে হলে প্রতিটি পার্টে আলাদা আলাদাভাবে ৬০% মার্কস পেতে হবে ।
যে আত্মহত্যা করেছে তার নিজের দায় অবশ্যই সবার আগে । কারণ, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, যত খারাপই হোক, আত্মহত্যা কোন সমাধান নয় । একটু ধৈর্য ধরলেই কোন না কোনভাবে মুক্তি মিলবেই । Time is the best Healer.
এরপরেই দায় নিতে হবে বাবা-মাকে । ছেলে/মেয়ে কে ডাক্তার বানানোর বাবা-মায়ের তথাকথিত ‘স্বপ্ন’ আর জেদের বলি হয়ে কতজনকে যে নিজের স্বপ্ন, ভালোলাগা বিসর্জন দিতে হয়েছে তার ইয়ত্তা নাই । বাবা মা তাঁদের সন্তানকে জোর করে মেডিকেলে ভর্তি করে দিয়েই খালাস। ছেলে আমার ডাক্তারি পড়ছে, তাধিন তাধিন ! এখানে যে একটা ছেলে/মেয়েকে কী পরিমাণ স্ট্রেস সহ্য করতে হয় তার ধারণা অনেকেরই নেই ।
শিক্ষকদের দায়ও কম না । একটা ছেলে আইটেম পরীক্ষা দিতে আসছে না, অথবা ক্লাসে আসছে না । কোন শিক্ষক তার খবর রাখেন ? কেন আসে না ? কেন পরীক্ষা দিচ্ছে না ? বরং কয়েকদিন পর যখন সে ক্লাসে আসে, হয়তো পেছনের দিকে গুটিয়ে বসে আছে । তখনই শিক্ষক মনে মনে বলেন, ‘আইজকা পাইছি তোরে’। সবার সামনে এনে বকাঝকা করে চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করেন । অনেকে টিচারের বকাঝকার ভয়ে আরো পিছিয়ে যায় । ক্লাসে আসেনা । ক্লাসে সবার সামনে জিজ্ঞেস করলে সব সমস্যা বলা যায় না । এইটুকু বোঝার মত জ্ঞানও বেশিরভাগ শিক্ষকের নেই।
সিনিয়র জুনিয়র অনেকের কথা জানি, যারা শুধুমাত্র শিক্ষকদের দুর্ব্যবহারের কারণে ইয়ার লস দিয়েছে । যে ছেলেটা ডিপ্রেশনে ভুগছে তাকে আপনি ক্লাসে পাওয়ামাত্রই সবার সামনে ডেকে বকাঝকা করলে সে কীভাবে এগিয়ে আসবে ? যে পড়াশোনায় মন বসাতে পারছেনা, তাকে আপনি বারবার আইটেম-কার্ড পেন্ডিং দিচ্ছেন, বকাবকি করে ফিরিয়ে দিচ্ছেন- সে আগাবে কীভাবে ?
পরীক্ষার পর যারা ফেল করেছে- কোন শিক্ষক কি খোঁজ নেন, এই ছেলেগুলো কেন ফেল করলো ? না । তাঁরা নিজেদের কোন দোষ দেখেন না, সিস্টেমের কোন দোষ দেখেন না, তাঁরা কোন বাস্তব সমস্যার ধার ধারেন না । তাঁদের কাছে উত্তর রেডি আছে- ‘পড়ালেখা করে না । খালি হোস্টেলে ঘুমায় ! গার্জিয়ানকে চিঠি দিতে হবে ।’
গার্জিয়ানকে চিঠি দেয়ার হয়তো দরকার হতে পারে, কিন্তু তার আগে কি যথাযথ মোটিভেশান দেয়া হয় ? স্টুডেন্টের প্রবলেম সলভ করার চেষ্টা করা হয়, সাহায্য করা হয় ?
Being a teacher not just reading, explaining & questioning from text, it’s something more than that.
একেকটা প্রফেশনাল পরীক্ষাকে আমি তুলনা করি লেবার পেইনের সাথে । লেবার পেইন নাকি অনেক অনেক বেশি । সাধারণভাবে কেউ এতটা পেইন সহ্য করার কথা না । মা ছাড়া অন্য কেউ যেমন সেই কষ্ট বোঝেনা, মেডিকেল স্টুডেন্ট ছাড়া অন্য কেউ প্রফ পরীক্ষার স্ট্রেস বুঝতে পারবেনা । প্রসবের বেদনা খুব তীব্র হলেও যেমন পৃথিবীতে মানুষের জন্ম থেমে নেই, যত কঠিনই হোক- ডাক্তার হওয়াও থেমে থাকবে না । কিন্তু সবারই নরমাল ডেলিভারি হয়না, কারো কারো কমপ্লিকেশান থাকে । সিজারিয়ান সেকশন করতে হয় । কারো কারো এসিস্টেড ডেলিভারি করতে হয় ।
পরীক্ষার পর যারা খারাপ করেছে-কেউ কি তাঁদের ডেকে একটু আদর দিয়ে বলে, একবার ফেল করলে জীবনে বেশি কিছু আসে যায় না ? অথচ যারা খারাপ করে, তাদের নিয়ে আলাদা ভাবে সাইকোলজিক্যাল মটিভেশান দেয়া দরকার । তাদের প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দেয়া দরকার । কিন্তু আমি জানি, কোথাও কেউ এই কাজটা করেনা ।
পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়েও ভাবা দরকার । সবগুলো সাবজেক্টের সবগুলো পরীক্ষা একটানা তিন চার মাস ধরে নিতে হবে কেন ? বিভিন্ন সময়ে ভাগ ভাগ করে বেশি বেশি সময় দিয়ে নেয়া যায় না ? শিক্ষাই আসল, নাকি পরীক্ষা ?
বাবা-মায়ের ইচ্ছামত ধরে বেঁধে মেডিকেলে ভর্তি করাতে থাকলে, আর টিচারদের মানসিকতা পরিবর্তন না হলে এভাবেই প্রতিবছর কাউকে না কাউকে হারাতে হবে। বাস্তবে কেউ দায় নিতে না চাইলেও , বাবামা, শিক্ষক, সমাজ, রাষ্ট্র- আসলে কেউই এর দায় এড়াতে পারেনা ।

বুধবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৪

এক ফোঁটা বৃষ্টি

এক ফোঁটা বৃষ্টির জন্যে- কতকাল ধরে বুভুক্ষু হয়ে বসে আছি-
কত নক্ষত্র নুয়ে এসে চুমে গেল আমার দুহাত
কত জলোচ্ছাস সুনামি বয়ে গেল নর্দমার ভেতর
কত সাদা মেঘ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল প্রচন্ড উত্তাপে
অথচ এক ফোঁটা বৃষ্টি হলোনা আজও ।
কলুষে ভরে আছে আমার মানবিক অন্তর
ঐশী আলোর বর্ষণে পরিশুদ্ধ করবো বলে
হাত পেতে বসে আছি কতকাল
এক ফোঁটা বৃষ্টির অপেক্ষায় ।

চিকিৎসা যখন বণিকের হাতেঃ স্বাস্থ্যসেবা নাকি স্বাস্থ্যব্যবসা ?

চিকিৎসা যখন বণিকের হাতেঃ স্বাস্থ্যসেবা নাকি স্বাস্থ্যব্যবসা ?
তিক্ত অভিজ্ঞতা-১:
কয়েকমাস আগে আমার বড় ভাই বান্দরবান সফরে গিয়েছিলেন । ফেরার পথে তিনি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন । ট্রাভেলারস ডায়রিয়া । কুমিল্লায় নেমে একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন রাতেই। ফোন বন্ধ থাকায় রাতে খবর পাইনি । সকালে খবর পেয়ে ঢাকা থেকে রওনা হলাম । কুমিল্লা পৌঁছতে দশটা পার হয়ে গেলো ।
গিয়ে ভাইয়ের অবস্থা দেখে তো আমি হতবাক । Severe Dehydration এর পেশেন্টকে ওরা ১২ ঘন্টায় দিয়েছে মাত্র দেড় লিটার ফ্লুইড ! ক্যাথেটার দিয়ে রেখেছে । ১৪ ঘন্টা ধরে কোন Urine output নাই ।
মাথা এত গরম হলো যে বলার মত না । নিজ দায়িত্বে ফ্লুইড দেয়ার ব্যবস্থা করে ঢাকায় নিয়ে এলাম । দেখা গেল Serum Creatinine দাঁড়িয়েছে 3.5 এ । আমি যদি ডাক্তার না হতাম, আর সকাল সকাল গিয়ে না পৌঁছতাম তাহলে এরা ভাইয়ের কিডনির অবস্থা কী করতো ভেবে আমার এখনো গায়ে কাটা দেয় ।

তিক্ত অভিজ্ঞতা-২:
ঈদুল আযহার পরে ঢাকা চলে এসেছি । রাতে ফোন পেলাম আব্বা মোটর সাইকেল সহ গর্তে পড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন । নিউরোসার্জন দেখানোর কথা বলে আমি রাতেই রংপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম । সকালে গিয়ে পৌঁছলাম । আব্বাকে নিউরোসার্জন দেখিয়ে একটা বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছে । অবস্থা দেখে আবারো মাথা গরম হয়ে গেল । আব্বার স্পাইনাল ইনজুরি হয়েছে, নিউরোসার্জন Methyl Prednisolone প্রেসক্রাইব করেছেন । এই ড্রাগ স্পাইনাল ইনজুরির পর যত তাড়াতাড়ি দেয়া যায় তত ভালো । অন্তত আট ঘন্টার মধ্যে দিতে পারলে ভালো ফল পাওয়া যায় । পেশেন্ট ভর্তি হবার ১২ ঘন্টা হয়ে গেছে, এরা তখনো এক এম্পুলও দেয়নি । তারচেয়ে বড় ব্যাপার, পেশেন্ট ডায়াবেটিক জেনেও এরা একবারও ব্লাড গ্লুকোজ চেক করেনি । ইনপুট আউটপুটের হিসাব নাই । ইউরিন আউটপুট এডিকোয়েট না । ১৪ ঘন্টায় এরা একটা নরমাল স্যালাইনও দেয়নি ।
.........
৬৪ জেলার বাংলাদেশে এখন সরকারি মেডিকেল কলেজ ২৯ টি । আরো ১১ টির অনুমোদন দিয়েছে সরকার । আগামী জানুয়ারি থেকে সেগুলোর কার্যক্রম শুরু হবে । এছাড়া বেসরকারি মেডিকেল কলেজ আছে ৫৬ টি । আরো ১১ টির অনুমোদন দিয়েছে সরকার । এই নিয়ে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হচ্ছে প্রতিবছর । এর উদ্দেশ্য কী ? স্বাস্থ্যসেবা ? টাকা থাকলেই খুলে বসছে মেডিকেল কলেজ । পনেরো বিশ লাখ টাকা করে নিচ্ছে প্রতি স্টুডেন্টে । টিচার নিয়োগের খবর নাই, অবকাঠামো উন্নয়নের খবর নাই । জায়গামত টুপাইস ঢাললে মিলছে অনুমোদন । একজন রোগীর কাছ থেকে যদি দশহাজার টাকা বিল আসে, ডাক্তার হয়তো পাচ্ছেন পাঁচশ টাকা । বাকিটার অন্তত অর্ধেক লাভ ! স্বাস্থ্য খাত যখন বণিকদের হাতে চলে গেছে, বণিকেরা যখন লাভের গুড় খেতে শিখেছে তখন স্বাস্থ্য- ‘সেবা’ থাকবে তা হতে পারেনা । ব্যবসায়ীর কাছে সবকিছু বিবেচিত হয় টাকার অংকে । ভালোবাসাও । মানবতাও ।

সরকার ৬৮হাজার গ্রামে গ্রামে মেডিকেল কলেজ করার সিদ্ধান্ত নিলেও এখন আর অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না । স্বাস্থ্যখাত এখন রমরমা ব্যবসার ক্ষেত্র । পকেটে টাকা আছে তো একটা মেডিকেল কলেজ দিন । মন্ত্রী হয়েছেন ? এখন কী করবেন ? গ্রামে গ্রামে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করার ঘোষণা দিন । এই দাঁড়িয়েছে অবস্থা । ভর্তি পরীক্ষায় ১০ মার্ক পেয়েও মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছে গেল বছর । অথচ ক্লাস ওয়ানে পড়া একটা বাচ্চাকেও যদি কলম নিয়ে বসিয়ে দেয়া যায়, ইচ্ছেমত গোল্লা ভরাট করেও কমছে কম ২০ মার্ক তুলে ফেলবে । সামনে হয়তো এমন দৃশ্যও দেখতে হবে- কমার্স থেকে মেডিকেলে ভর্তি হচ্ছে । টাকায় কিনা হয় !
বেসরকারি খাতে মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল, ক্লিনিক হতে পারে । কিন্তু সেগুলোর একটা মিনিমাম মান রক্ষা করা দরকার । শত শত ভার্সিটি খোলেন, ইতিহাস পড়ান, ডিগ্রী দেন অসুবিধা নাই । কোন মুঘল সম্রাটের কতটা হেরেম ছিল, হলোকাস্টে কতজন ইহুদি মারা গিয়েছিল সেই সংখ্যার ভিত্তিতে ইচ্ছেমত পিএইচডি দেন- অসুবিধা নাই । কিন্তু মেডিকেল কলেজ আর ক্লিনিক হাসপাতাল দিয়েন না । ডায়রিয়ার রোগী মেরে ফেলে এমন মেডিকেল কলেজ শত শত দিয়েও লাভ হবে না । পাতার পর পাতা পড়ার নাম ডাক্তার হওয়া নয়, এখানে মানুষের জীবন নিয়ে খেলতে হয় । জীবন একবার গেলে আর ফেরানো যায় না ।
দু’দিন আগেও অধ্যক্ষদের বরাতে পত্রিকায় রিপোর্ট হয়েছে, পুরাতন সরকারি মেডিকেল কলেজগুলো ছাড়া বেশিরভাগ মেডিকেলেই প্রয়োজনীয় টিচার নেই । প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই । হাতেকলমে চিকিৎসা শেখার সুযোগ নেই । বাবা মায়েরা হয়তো চাইতেই পারেন তাঁর ছেলে মেয়ে ডাক্তার হোক, টাকারও অভাব নেই । প্রয়োজনে এক বিঘা জমি বিক্রি করলেই তো হয় । বুক ফুলিয়ে বলতে পারবেন-আমার ছেলে/মেয়ে ডাক্তার। প্রতিবছর নামের সামনে ডাঃ লেখা অনেক মানুষ হয়তো বের হবে, কিন্তু চিকিৎসার অবস্থা হবে আমার অভিজ্ঞতার মত ।
এমবিবিএস পাস করে যখন সত্যিকার প্রতিযোগিতায় নামতে হবে, তখন হতাশ ডাক্তারের সংখ্যা গুনে শেষ করা যাবেনা । ডাক্তার মানেই টাকা- বাস্তবে যখন এই হিসেব মিলবেনা তখন অনেকেই জড়িয়ে পড়বে দুর্নীতিতে । এটা তো ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে ।
আর সর্বোপরি যা ঘটবে- প্রকৃত মেধাবী ডাক্তাররা, এরা তো সারাবিশ্বের যেকোন প্রান্তে অবস্থান গড়ে নিতে সক্ষম । এদের একটা বড় অংশ ধীরে ধীরে দেশ ছেড়ে চলে যাবেন । এখনই অনেক ডাক্তারের প্রথম টার্গেট হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশ ছেড়ে যাওয়া । যারা আছেন, বাবামা ভাই বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে, দেশের মানুষের দিকে তাকিয়ে থেকে যাচ্ছেন । এই সংখ্যাটা হয়তো দিন দিন কমে যাবে । প্রকৃত মেধাবীরা দেশ ছেড়ে চলে যাবে, রয়ে যাবে ভর্তি পরীক্ষায় ১০ মার্ক পাওয়া, কমার্স থেকে মেডিকেলে আসা মেধাবীরা । হ্যা, মন্ত্রী এমপি রাষ্ট্রপতি হয়তো সিঙ্গাপুরে ‘শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবেন’ । আমার আপনার বাবা মা-র কী হবে ?

গন্তব্যের দায়

হে গন্তব্য,
আমার সাক্ষাত পেতে চাইলে এগিয়ে আসতে হবে তোমাকেও
আমি তো হাঁটছি, হেঁটে যাবো যতদূর পারি- ক্লান্ত শীর্ণ পায়ে ।
অতটা পাগলপারা নই, অতটা তাড়া নেই আমার পদসঞ্চালনে
পৌঁছতেই হবে গন্তব্যের আঙিনায়- অমন কোন প্রতিজ্ঞাও করিনি কোনদিন ।
কবে গিয়ে দাঁড়াবো তোমার চৌকাঠে, কবে ডাক দেবো প্রেমঘন মদির কন্ঠে-
অনাগত সে ক্ষণের অপেক্ষায় যদি বসে থাকো চুপচাপ,
হয়তো অনন্তকাল পেরিয়ে যাবে, তুমিও বুড়িয়ে যাবে চাঁদের বুড়ির মত
হয়তো পথেই কোথাও রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে দুহাত বাড়িয়ে দেবে যৌবনবতী মৃত্যু
ক্লান্ত কাঙ্গাল আমি হয়তো প্রেমের তৃষ্ণায়- ব্যাকুল প্রেমিকের মত নির্লজ্জ হয়ে
মৃত্যুকেই জড়াবো আমার আলিঙ্গনে ।
হে গন্তব্য, যদি ছুঁয়ে দেখতে চাও আমার আঙ্গুল
যদি চাও একবার হোক প্রথম কিংবা শেষ সাক্ষাত তোমাতে আমাতে
এগিয়ে আসতে হবে তোমাকেও। আমি তো হেঁটেই চলেছি ধুলোময় পৃথিবীর পথের উপর
এখানেই পাবে আমায় সুবহে সাদিক হতে শুকতারা অবধি 
এগিয়ে এসো তুমি, মৃত্যুর সাথে বোঝাপড়া করে আজ রাতে আমাকে জানাও 
কে হবে প্রেয়সী আমার । 

রবিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৪

হাঁটুজলের কৈফিয়ত

ভাবছো, কতটা পাষাণ আমি ! সামান্য হাঁটুজলের নদী হয়ে
উপেক্ষা করি সাগরের ডাক ! কী করে বোঝাই হে অসীম জলধি-
অতটুকু জল যে আমায় ঢেলে দিতে হয় দুধারের জমিনে
তৃষ্ণার্ত ধানক্ষেতে, চৌচির মৃত্তিকায় ।
অতটুকু জলেই ভরিয়ে দিতে হয়, শত গাঁয়ের সবগুলো শুন্য কলস ।
আপামর আবাল বৃদ্ধবণিতার ঘর্মাক্ত দেহ, ধুয়ে দিতে হয় আমাকেই
অতটুকুন টলটল জলে ।
.
অতটুকু মিঠে পানি আছে বলেই
বেলে মাছ ঠোকর দেয় অকস্মাৎ-
কিনারে দাঁড়ানো চঞ্চল কিশোরীর সুবর্ণ পায়
লজ্জাবনত শেওলাগুলি আড়চোখে দৃষ্টি হানে তীরের কোলাহলে
খলসে চিংড়ির ঝাঁক কান পেতে শোনে
জেলেনির কঙ্কনধ্বনি ।
এদের ছেড়ে হে সমূদ্র,
কী করে ছুটে যাই অশান্ত মোহনায়?
তোমার তো আছে অগুণতি নৌকো, জাহাজ
কিছু খড়কুটো নাহয় আমারই থাকুক
তোমার তো আছে ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা-যমুনা
নাইবা পেলে এইটুকুন একহাঁটু জলের ভালোবাসা
কী আসে যায় তাতে
তোমার বিশালতায়?

শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত

বোকারাই শুধু ভয় পায় রাতের গভীরতা । আমি নই ।
গভীর হতে গভীরতর না হলে
রাতের স্বার্থকতা কী থাকে ?
চতুর সৈনিকেরা বরং অপেক্ষায় থাকে গভীর রাতের ।
সুরক্ষিত দুর্গ যখন হয়ে পড়ে কিছুটা তন্দ্রাচ্ছন্ন 
ঐতো মোক্ষম সময় প্রাচীর ভেদ করে কেল্লা বিজয়ের।
রাত্রির গভীরতা যত বাড়ে, একে একে খুলে যায় ক্রমাগত
আকাশের সবকটি  অলৌকিক দরোজার খিল ।
তারপর শেষ মুহূর্তগুলিতে
ঘুঁচে গিয়ে সৃষ্টি ও স্রষ্টার অভেদ্য দেয়াল-
একাকার হয়ে যায় বিশ্বব্রহ্মান্ডের সমগ্র অস্তিত্ব
একত্ববাদের অদ্বিতীয় মহিমায় ।
পৃথিবী ও মহাবিশ্বের জন্ম হতে ধ্বংস অবধি 
আর কিছু কি হতে পারে-
এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত ? 

শুক্রবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৪

নির্যাতিত শব্দগুলো

রাজনীতি ছাড়িয়ে দখলবাজি এখন ঢুকে পড়েছে অভিধানে
শব্দগুলোকে দখলে নিয়ে ইচ্ছেমত খেলছে কবিরা
কেউ আস্ত হাতিকে উড়িয়ে দিচ্ছে আকাশে
কেউ মগে ভরে ঢকঢক করে খাচ্ছে আমাদের ভালোবাসা
কেউ হাড়-পাঁজর জাতীয় শব্দগুলোকে বানিয়ে নিয়েছে
একান্ত নিজস্ব সম্পত্তি !
আর আমরা কিনা ভীরু কাপুরুষ নপুংসকের দল
বসে আছি চুপচাপ !
শব্দদের করুণ আর্তনাদ শুনেও কোন ভ্রুক্ষেপ নেই ! বরং
পৈশাচিক আনন্দ নিচ্ছি !
কবিদের জুলুম হতে নিরীহ শব্দদের বাঁচাতে
এখনো গড়িনি একটাও দুর্গ । একটা কামানও প্রস্তুত করিনি-
জালিম কবিদের দিকে ছুড়ে দিতে-
ঝাঁকে ঝাঁকে জীবন্ত বুলেট !
কবির বুক ঝাঁঝড়া করে দিলে অব্যর্থ বেয়নেটে
একটা টগবগে হৃদপিন্ড ছাড়া
কী এমন বেরিয়ে আসবে, যাকে আমরা-
এতটা ভয় পাই?

বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর, ২০১৪

প্রতিশব্দ

বেশি কিছু চাইনাকো আমি
চাইওনি কখনো ।
বেশি ভাত নয়
বেশি তরকারি নয়
বেশি টাকা নয়
এমনকি, বেশি ভালোবাসাও নয় ।
চেনা এবং অচেনা সুহৃদ,
খুব বেশি ভালোবাসা দিওনা আমাকে
আমার কলসীটা খুব খুব ছোট ,
উথলে পড়ে নষ্ট হয়ে যাবে তোমাদের
অমূল্য সম্প্রদান ।
প্রতিদানে বেশি কিছু দিতেও জানিনা আমি
বেশি কিছুই নেই আমার ভান্ডারে ।
'কেমন আছি তবে' এই জিজ্ঞাসা-
টগবগ করছে তোমার চোখে ? জেনো, ভালো আছি ।
বলতে পারো, বেশিই ভালো আছি । কারণ,
বেশি থাকা আর ভালো থাকা কখনোই
প্রতিশব্দ নয় জীবনের অভিধানে ।

বক্ষভেদী জ্যোৎস্না !

চাঁদের কিরণ, ভেদ করে রাত্রির হৃৎপিণ্ড
ঠিক ঠিক বিঁধছে এসে আমার আঙিনায়
যেন একঝাঁক মোলায়েম বুলেট,
খুঁজে ফিরছে নরোম শিকার !
আর আমাকেও বলছে ডেকে, বুক পেতে দাও
বুক পেতে দাও
পাঁজরের কুঠরি ভরে নাও জোৎস্নায় ।
অলিন্দ নিলয় হতে নিংড়ে নিয়ে রুধির ধারা
বইয়ে দাও সবটুকু পৃথিবীর পথে
আজ রাতে
জোছনা প্রবাহিত হোক হৃদপিন্ড হতে ধমনী শিরায়
আজ রাতে, রুপালী জোছনার স্রোতে-
বিলীন হয়ে যাক ঠুনকো প্রাণ
অস্তিত্বহীনতায়...

শনিবার, ১১ অক্টোবর, ২০১৪

রাজনীতিতে নীতিভ্রষ্টতার দলিল

'রাজনীতিতে শেষকথা বলে কিছু নেই' এই বাক্যটা পৃথিবীর অন্য কোন দেশে এভাবে বলা হয় কিনা আমার জানা নেই । কিন্তু বাংলাদেশে এটাকে বানিয়ে তোলা হয়েছে রাজনীতির মূলমন্ত্র । নীতিভ্রষ্টতার দলিল । নীতিভ্রষ্ট রাজনীতিকদের আপ্তবাক্যে পরিণত হয়েছে এই বাক্যটি । নীতি নৈতিকতার মাথা খেয়ে হালুয়া রুটির লোভে রাজনৈতিক দল এবং রাজনীতিকরা ইচ্ছেমত মেরু পরিবর্তন করবেন আর বলবেন- 'রাজনীতিতে শেষকথা বলে কিছু নেই' ! আর জনগনও সবকিছু মেনে নিয়ে তাদের সুরে সুর মিলিয়ে বলবে, 'কী আর করা ! রাজনীতিতে শেষকথা বলে তো কিছু নেই !'

এ যেন ঐশি বাণী ! অদ্ভুত এই মানসিকতা । অথচ বাস্তবিক অর্থে এটির প্রকৃত অর্থ হয়ে দাঁড়িয়েছে- 'রাজনীতিতে নীতি নৈতিকতা বলে কিছু নেই'।

রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন চাইলে এই বাক্যটিকে গলাধাক্কা দিয়ে ইতিহাসের পাতায় পাঠিয়ে দিতে হবে । যেকেউ এই কথা বলবে, তাকে স্পষ্ট করে বলে দিতে হবে- থামুন মহাশয় । রাজনীতিতেও শেষ কথা থাকতে হবে । আপনি আপনার শেষ কথা বলে যান । নাহলে আমাদের শেষ কথা শুনে যান ।

মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর, ২০১৪

আত্মার টান !

কেউ কেউ ডাক দিলে
অবান্তর হয়ে যায় সময়ের প্রশ্ন ।
কারো কারো জন্যে প্রতিদিন জমা হয়
স্নেহ মায়া মমতা
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা;
পাটিগণিত হার মেনে যায়
বেহিসেব শুভকামনায় ।
আচ্ছা,
এই কি আত্মার টান ?
অদৃশ্য বন্ধন !

সোমবার, ৬ অক্টোবর, ২০১৪

কুরবানীর একটি শিক্ষা

প্রতিবছর কুরবানীর ঈদে যে প্রশ্নটা মনে জাগে, যদি কোরবানীকৃত পশুর গোশত নিজে খাওয়ার সুযোগ না থাকতো, যদি সবটাই বিলিয়ে দিতে হত নিঃস্বার্থভাবে, তাহলে কতজনে কুরবানি দিত ?
কুরআন হাদীসে তো আরো নানাভাবে প্রাণ ও সম্পদ খরচের তাগিদ দেয়া হয়েছে । ক'জনে তা করে ? কুরবানির একটা উদ্দেশ্য হচ্ছে এই ধারণা দেয়া যে, মানুষের যা কিছু আছে সবকিছুই আসলে আল্লাহর । আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী তা যখন প্রয়োজন কুরবানি করতে হবে । এই শিক্ষা কি আদৌ কেউ পায় ? পেলে তো এতদিনে সমাজের অবিচার অনাচারের অবসান ঘটত ।
আল্লাহ সবাইকে কোরবানীর শিক্ষা উপলব্ধি করার তৌফিক দান করুন । আমীন ।

শনিবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৪

ছন্নছাড়া সুখ !

'খাঁটিয়া মরিতে হইবে সুখের লাগিয়া'
এইতো তোমাদের, জীবনের আপ্তবাক্য । অথচ
বেশ জানি আমি
কখনো পাবোনা আর অতটুকু সুখ, যা ছিল
বানের জলে ঝাঁপিয়ে পড়া, মায়ের অবাধ্য এক
ছন্নছাড়া বালকের মনে ।
কখনো হবেনা আর ততটুকু সুখ, যা ছিল আমার
মধ্যদুপুরে,
গাছের ডালেই ঘুমিয়ে পড়ার মাঝে ।
.
সুখ সুখ বলে- ডেকে আনলে আমায়
এ কোন্ সর্বনাশা পথে ?
কোন্ সুখের কথা বলো তোমরা ? ও কি পারবে দিতে-
একটি মুহূর্ত,
শুভ্র কাশবনে- লুকিয়ে থাকার আনন্দ?

শুক্রবার, ৩ অক্টোবর, ২০১৪

গুলি

-স্যার, দশটারে গাড়িতে উঠাইছি ।
-ঠিক আছে, থানায় নিয়া যাও । বিস্ফোরক আইনে একটা মামলা রেডি করো । আর কেউ যোগাযোগ করতে আসলে কী করতে হবে বুঝাইয়া বইলো । আমার যেন  কিছু বলতে না হয় ।
-দুইজনের গুলি লাগছে স্যার, একজনের পেটে আরেকজনের পায়ে । এদের কী করুম স্যার ?
-আচ্ছা আগে থানায় লও । তারপর দেখা যাইবো ।
-স্যার এদের বয়স কম, অবস্থাও ভালো না ।
-আচ্ছা ঠিকাছে, ঐ দুইটারে হাসপাতালে পাঠাও ।
-জ্বি স্যার ।


***
জরি, আরেক কাপ চা দে ।

সকাল আটটা বাজতে বাজতে তিন কাপ চা খেয়ে ফেলেছেন আরিফ সাহেব ।  ইদানিং চা খাওয়া বেশি হয়ে যাচ্ছে । অবশ্য স্ট্রেস কিছুটা বেশি যাচ্ছে এখন । কিন্ত তাই বলে এত চা খাওয়া ঠিক না । ঘন ঘন প্রস্রাব হয় আজকাল, ডায়াবেটিস হয়ে গেল কিনা কে জানে ! চা খাওয়ার কারণেও হতে পারে, কিন্তু তারপরেও একবার সুগারটা চেক করে নেয়া দরকার । বাবা মা দুজনেরই ডায়াবেটিস ছিল, সেজন্যে ভয়টা বেশি ।

আরিফ সাহেব কোতোয়ালী থানার ওসি । পুলিশে যোগ দিয়েছিলেন একরকম  ক্ষোভের বশে । যুবক বয়সে একবার বিনা কারণে পুলিশের হাতে পড়েছিলেন । বাবা  গিয়ে ছাড়িয়ে আনার আগেই বেশ কিছু লাঠির আঘাত সইতে হয়েছিল তাকে । তারপর মাথায় জেদ চেপে গেল । আরো বিভিন্ন জায়গায় দেখেছেন, ডান্ডার ক্ষমতা ভালোই । বাঙালি ডাণ্ডাকেই একমাত্র ভয় করে । সিভিল পোষাকে একজন  ম্যাজিস্ট্রেট আর হাতে লাঠি নিয়ে একজন কন্সটেবল যদি পাশাপাশি হেঁটে যায়,  মানুষ কন্সটেবলকেই সালাম দিবে । ডান্ডা মানেই পাওয়ার । নানা কিছু ভেবে  শেষমেশ পুলিশেই জয়েন করেন তিনি ।

পুলিশে জয়েন করেই বুঝতে পারেন, জায়গাটা অত সোজা না । সবাইকে ডিল  করতে হয় । চোর বাটপার ছিনতাইকারী ডাকাত নেশাখোর চোরাচালান এইসব  নিয়ে কারবার । সারাক্ষণ এইসব নিয়ে থাকতে ভালো লাগে না । নিজের  মেজাজটাও কেমন খিটখিটে হয়ে গেছে আজকাল । বুঝতে পারেন, কিন্তু বেশিক্ষণ  ঠিক রাখতে পারেন না । থানার সবার সাথে সবসময় অর্ডার দিয়ে কথা বলতে হয়, আর উপরের অর্ডার স্যার স্যার করে শুনতে হয় । অর্ডার শোনা আর অর্ডার পালন  করা- এই হয়ে দাঁড়িয়েছে জীবন ।

কেউ অনুরোধ করে, কেউ টাকা সাধে, কেউ উপরের লেভেল থেকে ফোন করায় । প্রথম প্রথম একটা ইচ্ছা ছিল মনে- সমাজ থেকে অন্যায় দূর করবেন । দূর্নীতি  করবেন না । আসল অপরাধীদের চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা করবেন । কিন্তু এখন আর বলতে গেলে এর কোনটাই অবশিষ্ট নেই । ছিঁচকে অপরাধী ধরা যায়, বড়দের ধরা যায় না । দুএকজনকে ধরে খুশি হয়েছিলেন, ভেবেছিলেন সবাই প্রশংসা করবে  । প্রশংসা করেছিলও বটে । কিন্তু মাস না পেরোতেই হাতে এসেছিল বদলির অর্ডার । কখনো কখনো এমপি মন্ত্রীদের গালি শুনতে হয়েছে । থানা থেকেই ছেড়ে দিতে হয়েছে বড় বড় সন্ত্রাসীকে ।

প্রথম প্রথম টাকা নিতে পারতেন না । কিন্তু দিনে দিনে সব সয়ে এলো । একা টাকা না নিলে কী হবে, উপরে নিচে ঠিকই লেনদেন চলছে । ঐসব বন্ধ করার সামর্থ তার  নেই । দেখা গেল- তার নাম ভাঙ্গিয়ে টাকা নিচ্ছে এসআই-রা । তার চেয়ে অনেক ভালো অবস্থায় আছে এসআই দের পরিবার । ব্যাংকে বউয়ের নামে বিরাট অংকের টাকা, ছেলেমেয়েদের নামিদামি স্কুল কলেজে লেখাপড়া । একসময় তিনিও ঢুকে গেলেন সিস্টেমে । কাউকে কিছু বলতে হয় না । কীভাবে কীভাবে যেন এখানে একটা সিস্টেম দাঁড়িয়ে গেছে । দিনশেষে তার ড্রয়ারে কয়েকটা হলুদ খাম জমা হয়ে থাকে । বাসায় যাওয়ার সময় উনি শুধু সেগুলো ব্যাগে ঢুকিয়ে নেন । ব্যাস ।

আগে চোর ডাকাত ধরার একটা আগ্রহ উদ্দীপনা ছিল, ইদানিং সেটাও আর নেই তেমন । সরকারের নির্দেশ হলো- সরকার বিরোধী কোন কার্যক্রম সেটা রাজনৈতিক হোক কি অরাজনৈতিক- হতে দেয়া যাবে না । ফলে সবসময়ই থাকতে হয় সেই কাজে । আর আরিফ সাহেবের থানাটা হলো শহরের মূল থানা । যতসব পলিটিকাল মিটিং মিছিল সমাবেশ ভাংচুর হাঙ্গামা এই থানার এরিয়াতেই হয় । সব সময় খোঁজ রাখতে হয় কোথায় কখন মিটিং হচ্ছে, কোথায় মিছিল হচ্ছে এইসব । বিরোধী দলও এখন বেশ চালাক হয়ে গেছে । এরা অসময়ে মিছিল মিটিং করে । দুপুরে খাওয়ার পর একটু রেস্ট নেয়ারও সুযোগ পাওয়া যায় না । হঠাৎ খবর আসে- অমুক জায়গায় মিছিল শুরু করেছে ! সরকারী দলের লোকেরাই খবর দেয় । সকালে মিছিল করে, রাতে মিছিল করে । যখন তখন ফোর্স নিয়ে যেতে হয় । বেশিরভাগ সময়ই আসল মিছিলকারী কাউকে পাওয়া যায়না । পথচারী হোক আর যাই হোক ঘটনাস্থলের আশপাশ থেকে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয় । আর অসময়ে কষ্ট দেয়ার রাগ ঝাড়া হয় তাঁদের ওপর । এটা অবশ্য খারাপ না । বেশ কাঁচা টাকা পয়সা আসে ।
বিশেষ করে পাজামা পাঞ্জাবী পরা থাকলে বা মুখে দাড়ি থাকলে সুবিধা হয় ।

চা খেতে খেতে টিভিতে খবর দেখছিলেন আরিফ সাহেব ।  একটু পরেই বের হতে হবে । আজকের দিনটাও মনে হয় হাঙ্গামায় যাবে । সরকারের এক মন্ত্রী মুখ ফসকে বেফাঁস কথা বলে ফেলেছে । ইসলাম ধর্মের নামে উল্টাপাল্টা কথা বলেছেন । নবীর নামে উল্টাপাল্টা কথা বলেছেন । তার প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিলের ডাক দিয়েছে ধর্মীয় দলগুলি ।

বিরক্তি লাগছে আরিফ সাহেবের । তিনি নিজেও সরকারের সমর্থক । কিন্তু মন্ত্রী এমপিরা মাঝে মাঝে এমন এমন কথা বলে, মেজাজ খারাপ হয়ে যায় । ক্ষমতায় আছে পুলিশের ঘাড়ে পা দিয়ে, আবার বড় বড় কথা বলে । তাও আবার ধর্ম নিয়া । কোন মানে হয় ? এখন সামলাও ঠেলা । এইদেশের মানুষ এমনিতেই ধর্মকর্ম নিয়ে চিন্তিত না । কিন্তু আল্লাহ–রসুল–কোরআন–হাদীস নিয়া উল্টাপাল্টা কথা বললে মাথা গরম হয়ে যায় । আরিফ সাহেব নিজেও তেমন একটা নামাজ রোযা করেন না, কিন্তু ধর্ম নিয়া উল্টাপাল্টা কিছু বললে তারও আসলে ভালো লাগে না ।

থানা থেকে গাড়ি চলে আসবে কিছুক্ষণের মধ্যেই । ছেলেমেয়ে দুটাকে ওদের কলেজে-স্কুলে নামিয়ে দিয়ে অফিসে যেতে হবে । উপর থেকে অর্ডার এসেছে কোনরকম মিছিল মিটিং হতে দেয়া যাবেনা । প্রয়োজনে গুলি করতে হবে ।

আরিফ সাহেবের এক ছেলে এক মেয়ে । আরমান ও আনিতা । আরমান কলেজে উঠেছে , ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে । যথেষ্ট ভদ্র হয়েছে । মাঝে মাঝে নামাজও পড়তে যায় মসজিদে । ওর মায়ের কিছুটা পেয়েছে বোধহয় । লেখাপড়ায়ও ভালো ।  এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়েছে ।
মেয়েটা ছোট । ক্লাস ফাইভে উঠেছে এবার ।

‘বাবা আটটা বাজে । নয়টায় ক্লাস আছে আমার’ । তাগাদা দিয়ে গেল আরমান ।

সত্যিই আর দেরি করা যায় না । ডাইনিং এ খেতে বসলেন আরিফ সাহেব । ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খবর নিলেন । এই সময়টায় সবার সাথে একসাথে দেখা হয় । রাতে কখন আসতে পারেন তার কোন ঠিক নেই ।

গাড়ি চলে এসেছে । পোষাক পরে নিলেন আরিফ সাহেব । আরমান ও আনিতাকে নামিয়ে দিয়ে অফিসে যাবেন ।


***
-‘স্যার, স্যার । জ্বী স্যার । স্যার । কোন সমস্যা হবেনা স্যার’ ।

কমিশনার সাহেবের ফোন । আরিফ সাহেব শুধু শুনে গেলেন । এটাই নিয়ম । স্পষ্ট নির্দেশ, কোনরকম মিটিং শোভাযাত্রা হতে দেয়া যাবে না ।

ফোর্স রেডি করে বেরিয়ে পড়লেন আরিফ সাহেব । খবর এসেছে, পূর্বঘোষিত স্থানে জড়ো হতে শুরু করেছে মানুষ । কিছুক্ষণের মধ্যেই মিছিল শুরু করবে ।

ফোর্স সহ গিয়ে প্রথমে মাইকে ঘোষণা দিলেন জনতাকে ছত্রভঙ্গ হয়ে চলে যাবার জন্য । কিন্তু দেরি না করে তখনই মিছিল শুরু করে দিলো তারা ।
শুরু হলো লাঠিচার্জ । টিয়ার শেল ছুড়তে হলো । কিন্তু কোনভাবেই নিবৃত করা যাচ্ছেনা জনতাকে । বরং ওরাও ইট পাটকেল মারা শুরু করলো ।

এরপরই গুলি করার নির্দেশ দিলেন আরিফ সাহেব ।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল মানুষ । যে যেদিকে পারলো পালিয়ে গেলো ।

গ্রেপ্তারকৃতদের থানায় পাঠিয়ে নিজেও অফিসে চলে এলেন আরিফ সাহেব । এসেই শুনলেন আহত দুজনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে । বাকিদেরকে হাজতে রাখা হয়েছে ।

অফিসে বসে টিভিটা অন করলেন তিনি । কিছুক্ষণের মধ্যেই সাংবাদিকরা চলে আসবে মতামত নেয়ার জন্য । তার আগে একবার দেখা দরকার স্ক্রলিং এ ওরা কী দিয়েছে ।

রিমোট হাতে একের পর এক চ্যানেল চেঞ্জ করতে লাগলেন আরিফ সাহেব । অনেকগুলো স্যাটেলাইট চ্যানেল এখন । চ্যানেলগুলোতে সারা দেশের বিভিন্ন স্থানের সংঘাতের খবর দেখাচ্ছে । একটা চ্যানেলের পর্দায় চোখ পড়তেই সারা শরীরে একটা শীতল হাওয়া বয়ে গেল আরিফ সাহেবের। লাইভ দেখাচ্ছে, তাঁর এরিয়ায় তাঁর অধীনস্ত ফোর্সের গুলিতে আহত হওয়া দুইজনের একজন তাঁরই ছেলে আরমান । ভুলেই গিয়েছিলেন, ঐ পথ দিয়েই তো কলেজ থেকে ফেরার কথা আরমানের । স্পষ্ট দেখলেন তিনি, স্ট্রেচারের ওপর আরমানের নিথর দেহটা পড়ে আছে হাসপাতাল এমার্জেন্সির ভেতর । এমনও কি হতে পারে, আরমানও প্রতিবাদ মিছিলে গিয়েছিল ?

মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো আরিফ সাহেবের । ঝড়ের বেগে বেড়িয়ে গেলেন তিনি হাসপাতালের উদ্দেশ্যে ।

বৃহস্পতিবার, ২ অক্টোবর, ২০১৪

অলীক অস্তিত্ব !

ধরো একদিন জানতে পারলে তোমরা
সত্যিকার পৃথিবীতে, আমি আর নেই । কিংবা 
ছিলাম না কখনোই ! 
আমার অস্তিত্ব বলে ভেবেছিলে যাকে 
হয়তো দিয়েছিলে তারে কিছুটা ভালোবাসাও
হয়তো দিতে চেয়েছিলে আরও কিছুটা বেশি 
তারপর, 
তারপর- 
ধরো একদিন জানলে তোমরা হঠাৎ, আসলে সবকিছু 
ছিল মরিচীকা;
মনের ভুল, 
হ্যালুসিনেশান, 
অলীক কল্পনা ! 
.
তখনো কি, 
মনে রাখবে কেউ এই অধমেরে? কেউ কি ফেলবে বলো 
একফোঁটা আঁখিজল? 
লিখবে কি কেউ একটা কবিতা আমায় ভেবে? 
নাকি সকলেই ধিক্কার দেবে নিজেকে এই ভেবে- 
অলীক কল্পনায় নষ্ট হয়ে গেল- 
কতটা সময় ! 

মঙ্গলবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

পাঁজরের বাঁকা হাড় !

মাঝে মাঝে পাঁজরে হাত বুলাই । ধারাপাতের মত গুণি
বাঁকা হাড়ের সংখ্যা :v। এক দুই তিন
চার পাঁচ !
হায় হায় ! সবই তো আছে ঠিকঠাক মতই !
তবে কি
তবে কি
তবে কি
হায় ! তবে কি
সৃজিত হয়নি কেউ, আমার পাঁজর হতে ?

ছিন্নমুকুল

এতটুকু একটা বাচ্চা, এতটুকু শরীর । কতটুকুই বা বুকের খাঁচা ? ঠিকমত আঙুল বসানোর উপায় নেই । তবু বৃদ্ধাঙ্গুলি দুটি বুকের মাঝখানে দুইপাশে রেখে চাপ দেয়া শুরু করলো নোমান ।

রাত প্রায় তিনটা । ঘুমঘুম চোখে ডক্টরস রুমে বসে ছিল নোমান । দরজার পর্দাটা উড়ছিল ফ্যানের বাতাসে । মাঝে মাঝে শিশুর কান্না ভেসে আসছিল ।

নোমান একজন ডাক্তার । ফাইনাল প্রফেশনাল পরীক্ষা শেষ করার পরে একবছর ইন্টার্ণশিপ ট্রেনিং নিতে হয় । নোমান এখন ইন্টার্নশিপ করছে । গতকালই জয়েন করেছে হাসপাতালের এই ওয়ার্ডে । পেডিয়াট্রিকস ওয়ার্ড । এই ওয়ার্ডে এসে অনেকটাই মন খারাপ হয়ে গেছে নোমানের । ছোট ছোট বাচ্চাগুলি কতরকম কষ্টে ভুগছে , দেখতে ভালো লাগে না । ফুটফুটে পরীর বাচ্চার মত একটা শিশু, অথচ তার হার্ট ঠিকমত কাজ করছে না । কেউ কেউ ঠিকমত নিঃশ্বাস নিতে পারছে না ।

এতদিন মেডিসিন ওয়ার্ডে কাজ করেছে নোমান । কিন্তু তখন এতটা খারাপ লাগেনি । বড় মানুষেরা তাদের ব্যথার কথা বলতে পারে, শিশুরা পারেনা । তাদের কষ্ট থেকে যায় অব্যক্ত । এক কান্নার আওয়াজে কতটুকু বোঝানো যায় ? আর এই ব্যাপারটাই বেশি করে কষ্ট দেয় নোমানকে । শিশুর মা ছুটে আসে,  কেউ বলে ভাইয়া আমার বাবুটাকে একটু দেখেন – খুব কান্নাকাটি করছে । কেউ বলে, বাবা আমার নাতিডারে একটু দেইখা যাও । আমার ভালা ঠেকতাছে না । বুকটা ধ্বক করে ওঠে নোমানের । ইচ্ছে করে কোন এক জাদুর কাঠি বুলিয়ে সব বাচ্চার সব কষ্ট নিমেষেই দূর করে দেয় । ইচ্ছে হয় ; রুপকথার মত যদি বিপদ আপদে ঘেরা কোন এক অচিন পাহাড়ের চূড়ায়ও এমন কোন ওষুধ পাওয়া যেত, যা দিয়ে এইসব শিশুর কষ্ট দূর করা যায়- সব ছেড়েছুড়ে তার সন্ধানে বেরিয়ে পড়তো নোমান । কিন্তু সেরকম কিছু তো নেই । চিকিৎসাবিজ্ঞান সত্যি অনেকদূর এগিয়েছে । তবুও রয়ে গেছে অনেক সীমাবদ্ধতা । আর আমাদের দেশের মত তৃতীয় বিশ্বের একটি গরীব দেশে সেই সীমাবদ্ধতার কোন সীমা নেই ।

মাঝে মাঝে স্রষ্টার প্রতি অভিযোগ করতে ইচ্ছা হয় । খোদা যত কষ্ট দাও বড়দের । এই শিশুদের কষ্টে না রাখলেই কি নয় ?
কিন্তু তা করা যায়না । কারণ, স্রষ্টার জ্ঞান অসীম, স্রষ্টা নিজেই অসীম । তাঁকে প্রশ্ন করা চলে না । তাঁর ইচ্ছা তিনিই ভালো জানেন । মানুষকে যতটুকু জানানো হয়েছে এর বেশি জানতে পারবে না । বরং যতটুকু সামর্থ আছে তা দিয়ে মানুষকে ভালোর জন্য চেষ্টা করে যেতে হবে ।

একটা অবুঝ শিশুর জন্য বাবা মায়ের কতটা ভালোবাসা থাকে এই দু’দিনেই বুঝতে পেরেছে নোমান । সবাই যখন বারবার এটাসেটা জিজ্ঞেস করতে আসে, হয়তো কিছু কিছু কথা অপ্রাসংগিক – তবু সে বিরক্ত হয়না । বিরক্তি যে আসেনা তা নয় , কিন্তু যখনই ভাবে- ঐ শিশুটি হয়তো সারা পৃথিবীর কয়েকশত কোটি শিশুর একজন, হয়তো ওর কিছু হয়ে গেলে পৃথিবীর কিছু আসে যায়না – কিন্তু ঐ তরুণী মা’টির বুক শূন্য হয়ে যায় । তাঁর তো ঐ একটিই নাড়ী ছেড়া ধন ।

মায়েদের স্বার্থপরতা নিয়েও ভেবেছে নোমান । এখানে ডাক্তারের কাছে সব শিশুই তো রোগী, ডাক্তার রোগের গুরুত্ব ও জটিলতা অনুযায়ী গুরুত্ব দেবেন এটাই স্বাভাবিক । কিন্তু প্রতিটি মায়ের কাছে মনে হয়, তাঁর শিশুটিই সবচেয়ে কষ্টে আছে । তাঁর বাচ্চাটাকেই আগে দেখতে হবে । শুধু ডাক্তারের কাছেই যে দাবি করে তা নয়, এ নিয়ে নিজেরা নিজেদের ভেতর ঝগড়াও বাঁধায় তারা মাঝে মাঝে ।
নোমান এসব দেখে আর ভাবে , আহারে ভালোবাসা ! ভালোবাসা মানুষকে এরকম  স্বার্থপর বানায় !

একটা তরুণী মায়ের প্রথম সন্তানের প্রতি কতটা ভালোবাসা থাকে এখন সেটা বোঝার চেষ্টা করে নোমান । নিজে সে কিছুটা কাঠখোট্টা বলেই মনে করে নিজেকে । বড়বোন যখন ভাগ্নে ভাগ্নিদের জন্য খেটে মরে, প্রায়ই সে বলে – এত আহ্লাদের কী আছে আপা । বাচ্চাগুলাকে নিজের মত করে বড় হতে দাও ।
আপা বলেন, এখন তো বুঝবি না । নিজের হলে বুঝবি ।
নিজের কবে কী হবে সে তো অনেক পরের কথা , তবে এখানে এসে কিছুটা বুঝতে পারছে সে ।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক মেডিসিন বিভাগের সাথেই লাগোয়া  স্পেশালাইজড নিওনেটাল কেয়ার ইউনিট । সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নবজাতক  শিশুদের স্থান হয় এখানে । পুরো হাসপাতালের মধ্যে এইটা একটা ভয়ংকর জায়গা মনে হয় নোমানের । একজন বয়স্ক মানুষ মারা গেলে তবু হয়তো মেনে নেয়া যায়, কিন্তু একটা শিশুর মৃত্যু মেনে নেয়া যেন আরো কঠিন । অথচ প্রতিদিনই কত শিশুর মৃত্যু হচ্ছে ।

কার্ডিওলজির সিসিইউ কে দ্বিতীয় ভয়ংকর জায়গা মনে হয় ওর । মৃত্যু কীভাবে যে আসে যায়, ওখানে সেটা খুব ভালো করে বোঝা যায় । জ্বলজ্যান্ত মানুষ নিজের হাতের ওপর কীভাবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে সেই অভিজ্ঞতা নোমানের হয়েছিল সিসিইউ তে । হার্ট ফেইলুরের একজন রোগীকে সিপিআর (কার্ডিও রেসপিরেটরি রিসাসিটেশন) দিয়েছিল নোমান । বড় বড় চোখে নোমানের চোখের দিকে তাকিয়ে ছিল সে । তারপর সেভাবেই চলে যায় পরপারে । চোখ দুটো বুজে দিয়ে একজন পরাজিত মানুষের মত ফিরে এসে ডেথ সার্টিফিকেট লিখতে হয়েছিল নোমানকে ।

মেডিসিন ওয়ার্ডের একটা কিশোরের কথাও খুব মনে পড়ে । একদিন আগে সে বলেছিল- স্যার আমি বাচুম না, আমারে বাচান ।
কী আশ্চর্য, পরদিন সকালে গিয়ে নোমান দেখে ঐ বেডে অন্য রোগী । রাতেই মারা গিয়েছিল ছেলেটি ।
হাসপাতালে প্রতিদিনই চোখের সামনে দিয়ে কত লাশ পার হয়ে যায়, তবু কারো কারো মৃত্যু ভোলা যায় না ।

নিওনেটাল আইসিইউ তে প্রতি রাতে কয়েকটি শিশু মারা যায় । এখানে আজই প্রথম নাইট ডিউটি পড়েছে নোমানের । আজ যে কী হবে ভেবে হাত জমে যাচ্ছে ওর । কীকরে এই ফুলের মত ফেরেশতাগুলোর ডেথ সার্টিফিকেট লিখবে সে ?

এলোমেলোভাবে এসব কিছুই ভাবছিলো নোমান । এরই মাঝে ওয়ার্ড বয় এসে ডাক দিলো । স্যার, চার নম্বর বেবিটা নিঃশ্বাস নিতেছে না ।
চার নম্বর বেডে একটা মেয়েশিশু ভর্তি । প্রিম্যাচিউর বেবি উইথ ভেরি লো বার্থ ওয়েট । বারবার এপনিক (নিঃশ্বাস আটকে যাওয়া) হয়ে যাচ্ছে । কতক্ষণ টিকবে বলা মুশকিল ।

দৌড়ে গেল নোমান । এতটুকু একটা বাচ্চা, এতটুকু শরীর । কতটুকুই বা বুকের খাঁচা ? ঠিকমত আঙুল বসানোর উপায় নেই । তবু বৃদ্ধাঙ্গুলি দুটি বুকের মাঝখানে দুইপাশে রেখে চাপ দেয়া শুরু করলো নোমান । একজন নার্সকে লাগিয়ে দিল আম্বু ব্যাগ টিপতে । এই মুহূর্তে কেন জানি মনে পড়ে গেল ওর সেই ছোটবোনটির কথা যার কথা এখন আর মনে পড়ে না ।

নোমানের বয়স যখন চার কী পাঁচ তখন ওর একটি বোন হয়েছিল । এক সপ্তাহের মাথায় সেই বোনটি মারা যায় । সেই পিচ্চির মুখটা কেমন ছিল ? মনে পড়ে না নোমানের ।  মনের জানালা ধরে উঁকি দিয়ে গেছে, যার চোখ তাকে আর, মনে পড়ে না । শুধু মনে পড়ে মা খুব কেঁদেছিলেন সেদিন । পিচ্চিটাকে বাড়ির পেছনের গোরস্তানে একটা ছোট্ট কবরে রাখা হয়েছিল । সবার পেছনে পেছনে গুটিগুটি পায়ে নোমানও গিয়েছিল । এখন আর সে কবরটাকেও আলাদা করে চেনা যায় না । ভাইবোনেরাও কেউ ওর কথা স্মরণ করেনা । মা নিশ্চয়ই ওকে ভোলেননি , কিন্তু মা-ও আর কখনো ওর প্রসংগ তোলেননা ।

সে যেন চলে গেছে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘ছিন্নমুকুল’ এর মত-

সব-চেয়ে যে ছোট কাপড়গুলি
সেগুলি কেউ দেয় না মেলে ছাদে,
যে শয্যাটি সবার চেয়ে ছোট
আজকে সেটি শূন্য পড়ে কাঁদে,
সব-চেয়ে যে শেষে এসেছিলো
সে গিয়েছে সবার আগে সরে
ছোট্ট যে জন ছিলো রে সব চেয়ে
সে দিয়েছে সকল শূন্য করে।

নোমানের হঠাৎ মনে হতে লাগলো, আচ্ছা ওর মুখটা কি এই বেবিটার মত ছিল ?
এখানে অন্য সময় সব বাচ্চাকে একই রকম লাগে । সেজন্য কারো চেহারার দিকে ঠিক আলাদা করে খেয়াল করা হয়না । সিপিআর দিতে দিতে নতুন করে বেবিটার মুখের দিকে তাকালো নোমান । নীল হয়ে আছে ছোট্ট মুখটা । একটু দূরেই বেবিটার মা দাঁড়িয়ে আছে মুখে আঁচল দিয়ে । হতভম্ব, কিংকর্তব্যবিমূঢ় । এই মুহূর্তে তাঁর অনুভূতি কেমন, পৃথিবীর কেউ হয়তো তা বুঝতে পারবে না ।

বেবিটার অতটুকু বুকে চাপ দিতে দিতে নোমানের মনে হতে লাগলো, যেন সে ওর সেই নাম না জানা , মুখ না চেনা , হারিয়ে যাওয়া বোনটিকেই বাঁচানোর জন্য  সংগ্রাম করছে ।

[ফুটনোটঃ সত্যিই আমার একটি ছোট বোন জন্মের কয়েকদিনের মাথায় মারা গিয়েছিল । ওর কোন নাম ছিলনা । তখন ছোট ছিলাম । এখন আর সত্যি সত্যি শত চেষ্টা করেও আমি ওর মুখের ছবিটা মনের পটে  আঁকতে পারিনা ।]

সোমবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

জাফর ইকবাল বিরক্তিকর হয়ে উঠছেন

অধ্যাপক জাফর ইকবাল সাধাসিধে কথা নামে কলাম লেখেন । এতে প্রায়ই তিনি রাজনীতির নানা প্রসংগে মন্তব্য করেন । করতেই পারেন, দেশের যেকোন সচেতন নাগরিকের অধিকার আছে তার নিজস্ব চিন্তাধারা বা মতপ্রকাশের । সমস্যাটা হচ্ছে, রাজনীতির কথা বলতে গেলে স্পষ্ট করে বলতে হয় । কিন্তু তিনি কথা বলেন ইনিয়ে বিনিয়ে । রাজনীতি বিষয়ে লেখার আগে লেখেন, আমি রাজনীতি বুঝিনা । আমার কথাকে কেউ গুরুত্ব দিয়ে নেবেনা । এরপর তার রাজনীতি বিষয়ক বক্তব্য পেশ করেন । তিনি ইতিহাস নিয়ে লেখার আগে মাথা চুলকিয়ে বলেন, আমি ইতিহাসবিদ নই । আমি ইতিহাস জানিনা । এরপর তিনি ইতিহাস লেখেন ।
রাজনীতি নিয়ে তিনি যাই লেখেন, ইনিয়ে বিনিয়ে শেষে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রশংসা করেন । গনতন্ত্র মানবাধিকার চুলায় যাক । তিনি ছাত্রদল শিবিরের উদ্দেশ্যে নসিহত করেন কিন্তু ছাত্রলীগের খুন ধর্ষণ রাহাজানি চুরি ডাকাতি অপহরণ চাঁদাবাজি নিয়ে নিরুদ্বেগ । কখনো তার কাছে পাওয়া যায়না, তোমরা যারা ছাত্রলীগ করো ।
তিনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন না । মাহমুদুর রহমানের ক্ষুরধার কলামের মোকাবেলা করতে না পেরে তিনি তাকে গ্রেপ্তারের সমর্থন করেন । সারাবিশ্ব ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনকে হাস্যকর বললেও তিনি এটাকে সমর্থন করেন । একে খন্দকারের বই সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি ইনিয়ে বিনিয়ে প্রকাশককে দোষারোপ করেন । অথচ নাবালকও জানে যে লেখকের ইচ্ছা অনুমতি ছাড়া কেউ লেখা প্রকাশ করতে পারে না ।
সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপারটা হচ্ছে তিনি নিজে মুক্তিযুদ্ধে না যাওয়ার গ্লানি ঢাকার জন্য তেরো দিনের যুদ্ধের গল্প ফেঁদেছেন । ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলাটা শিশুদের জন্য মনোরঞ্জক হতে পারে, কিন্তু শিশুরা রাজনীতি নিয়ে ভাবেনা । বড়দের কাছে একজন বড় মানুষের ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলা যথেষ্টই বিরক্তির উদ্রেক করে ।

রবিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

যদি কানে কানে কিছু বলে বঁধূয়া...

যদি কানে কানে কিছু বলে বঁধূয়া
সবই শুনে শুনে যেতে হবে...
যদি আসি আসি করে দেরি করে সে
দিন গুনে গুনে যেতে হবে...

বিছানায় বসে গুনগুনিয়ে গাইছিলো রতন । সামনেই ‘একজন’ আয়নার সামনে  দাঁড়িয়ে সাজগোজ করছে মনোযোগ দিয়ে । রতন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেদিকে । হঠাৎ করে সাজগোজে মগ্ন ‘একজনের’ খেয়াল হলো ব্যাপারটা । আয়নার দিক থেকে না মুখ ঘুরিয়েই বললো- এইভাবে তাকায় না থেকে এইবার একটু পলক ফেলা যায়না রাজামশায়?
রতন নিচুস্বরে জবাব দিলো-
-'আমার কী দোষ ? কবিই তো বলেছেন- তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি, সেকি মোর অপরাধ ? আর তাছাড়া রাণীর সাজগোজ দেখাটাও তো সৌভাগ্যের ব্যাপার !'
-বসে বসে গান গাওয়া হচ্ছে কেন সেটা তো আমরা বুঝি ! এহ, শখ কত ! মুখে বলার তো সাহস নাই । গান গেয়ে ইঙ্গিত দেয় !
যেভাবে সে সাজাবে , সাজবো যে সেভাবে, সুখ দুঃখ সবই মেনে নিতে হবে !
ওয়ার্ড রোব থেকে নীল শাড়িটা বের করতে করতে বিদ্রুপাত্মক সুরে পরের কয়েকটি কলি গায় অবনী ।

নীল শাড়ি রতনের পছন্দের । বিশেষ বিশেষ দিনে নীল শাড়ি পড়াটা এই দম্পতির নিয়ম । অবনীরও পছন্দ, কিন্তু সেটা সে মুখ ফুটে কখনো বলে না । রতনকে বলে, 'দেখো- আমি কিন্তু শুধু তোমার কথা চিন্তা করেই নীল শাড়ি পড়েছি !' এটা একধরণের ছলনা কিনা কে জানে ! কিন্তু অবনীর মনে হয়, ভালোবাসার প্রয়োজনে কিছুটা ছলনা করাই যায় !

আজকের দিনটায় একটু মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে দুজনের ভেতরেই । কিছুটা আনন্দ । কিছুটা বিষাদ । কালই ঢাকা ছাড়তে হবে অবনীকে । রতন এবং অবনী দুজনেই ডাক্তার । এবার অবনীর বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে নিয়োগ হয়েছে । আগামীকালই জয়েন করতে হবে । পোস্টিং দিয়েছে গ্রামে । অবশ্য নিজেরই গ্রাম । নিজের বাড়িতে থেকেই অফিস করতে পারবে । এদিকে রতন পোস্ট গ্রাজুয়েশন ট্রেনিং করছে ঢাকা মেডিকেলে । ট্রেনিং গ্যাপ দেয়া যাবেনা । সুতরাং বলতে গেলে আপাতত বিচ্ছেদ ।  রতন মাঝে মাঝে ছুটি পেলেই চলে যাবে । কিন্তু... প্রতিদিনতো আর দেখা হবে না । সকাল বিকাল ঝগড়া করা হবেনা । ঝগড়া করতে না পারাটাও যে মন খারাপের কারণ হতে পারে, এর আগে কখনো মনে হয়নি রতনের ।

প্ল্যান করেছে আজ বিকালটা ওরা রিক্সায় করে ঘুরবে । যান্ত্রিক শহর হলেও ঢাকার প্রতি কেমন একটা মায়া জন্মে গেছে অবনীর । অথচ বিয়ের আগে সে একপ্রকার শর্ত দিয়ে বসেছিল, আর যেখানেই হোক, ঢাকায় থাকা চলবে না । ধুলোবালি জ্যাম যান্ত্রিকতার শহরে থাকতে কোনভাবেই ইচ্ছুক ছিলনা অবনী । বিয়ের পর কিছুদিন গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে ছিল । তারপর রতন ঢাকায় নিয়ে আসে । বলেছিল, ‘কিছুদিন থাকো । যদি ভালো না লাগে তখন নাহয় অন্য ব্যবস্থা করবো’ । কিন্তু সেইযে ঢাকায় এলো, এরপর কীভাবে কীভাবে যে কয়েকটা বছর চলে গেল । ঢাকা শহরটা এখন আর খারাপ লাগে না । বরং গ্রামে গেলেই কেমন যেন খালি খালি লাগে । সবখানেই একটা নাই নাই ভাব । কেমন যেন হাহাকার ।

কিন্তু এখন যেতে হচ্ছে । প্রথমে ভেবেছিল জয়েন করবে না । কেমন লাগবে কে জানে ! কিন্তু রতন সাহস দেয়, ‘আপাতত জয়েন করে দেখো । ভালো না লাগলে পরে দেখা যাবে!’
অবনীও ভেবেছে, নিজের উপজেলা , নিজের গ্রাম । হয়তো খারাপ লাগবে না ।  যদিও ভাইবোনেরা কেউ বাড়িতে নেই । লেখাপড়া , চাকরির প্রয়োজনে সবাই বিভিন্ন জায়গায় । বাবা মা তো আছেন । বাবা মায়ের সাথে থাকা হবে এটাই বা কম কিসে ? এখন যদি একটু সেবাযত্ন করতে পারে সেটাতো সৌভাগ্যের ব্যাপার । ক’টা মেয়ের ভাগ্য হয় শেষ বয়সে বাবা মায়ের সেবা করার ? আর তাছাড়া নিজের গ্রামের মানুষদের চিকিৎসা দিতে পারবে । এইসব ভেবে অবশেষে জয়েন করার সিদ্ধান্তই নিয়েছে অবনী ।
আজ বিকেলটা একসাথে ঘুরে ফিরে রাতের বাসে রওনা দেবে গ্রামের উদ্দেশ্যে । সাথে লাগেজপত্র থাকবে না বেশি । কিছু কাপড় চোপড় , এই ।

আধাঘন্টা পরে ওরা  বাসা থেকে বের হলো । একটা রিক্সা ডেকে উঠে পড়লো । রিক্সাওয়ালা বয়স্ক মানুষ । অবশ্য বয়স্ক মানুষ দেখেই তার রিক্সায় উঠেছে ওরা । বয়স্ক একজন মানুষ রিক্সা চালাচ্ছে, নিশ্চয়ই নিরুপায় হয়েই । কেমন চুপচাপ ধরণের লোকটা । হয়তো ছেলেপুলে নেই । অথবা থাকলেও বৃদ্ধ বাবার ভরনপোষণ দেয় না ।

অবনীকে দেখে কয়েকটা চ্যাংড়া রিক্সাওয়ালা জিজ্ঞেস করেছিল- আপা কই যাইবেন ? এইটা এদের একটা বদভ্যাস । অথবা বলা যেতে পারে বাঙ্গাল চরিত্র । যদি দেখে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে বা রিক্সা খুঁজছে, এরা যেচে এসে সাধবে- আপা কই যাইবেন ? অথচ পুরুষ মানুষ যদি জিজ্ঞেস করে, যাইবা ? এরা ঘেট হয়ে বসে থাকবে । যামুনা ।

একদিন তো এক রিক্সাওয়ালাকে হাতে নাতে লজ্জা দিয়েছিল রতন । ব্যাটা ধানমন্ডি যাবেই না । একটু পর অবনী গিয়ে ওকে জিজ্ঞেস করে- যাবেন ? এইবার তো রিক্সাওয়ালা রাজী ! অবনী রিক্সায় উঠে বসলে আড়াল থেকে রতনও এসে সেই রিক্সায় উঠে পড়ে । বলে- মামা চলেন !
সেদিন বেচারা রিক্সাওয়ালার মুখটা হয়েছিল দেখার মত!

বয়স্ক রিক্সাওয়ালা জিজ্ঞেস করলেন, বাবা কই যামু ?
রতন বললো, চাচা চলেন আপনের যেইখানে ইচ্ছা !

এটাও একধরণের খেলা । একসাথে বের হলে মাঝে মাঝেই ওরা এই খেলা খেলে । কোথায় যাবে কিছু মনস্থির না করেই রিক্সায় উঠে পড়ে । তারপর সিদ্ধান্তের ভার ছেড়ে দেয় রিক্সাওয়ালার ওপর । বেচারি রিকশাওয়ালা পড়ে মহা ফ্যাসাদে । ‘কোথায় যাবো ?’ এই সিদ্ধান্ত নেয়াটা আসলে সহজ কাজ না । আসলে কোন সিদ্ধান্ত নেয়াই সহজ কাজ না ।  বেশিরভাগ সময়েই দেখা যায় রিক্সাওয়ালা হার মেনে যায় । আজকের রিক্সাওয়ালাও হার মানলো । অবশ্য এই লোকের হার মানারই কথা । জীবনযুদ্ধে হারতে হারতেই তো এতদূর চলে এসেছেন ।
রিক্সাওয়ালা চাচা বললেন, বাবা কইয়া দেন কই যামু ।
রতন সহজ সমাধান দেয় , যান চাচা। সামনের দিকে যান । যেদিকে দেখবেন রাস্তা খালি, জ্যাম নাই- সেইদিকে যাইবেন ।

রিক্সায় উঠে হঠাৎ কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছে দু’জনই । সাময়িক বিচ্ছেদ, এটুকুও মানতে চায়না মন । মনে তোলপাড়, কত কথার তুফান ছুটছে । অথচ মুখে আসছে না কিছুই ।
রতন পড়েছে সাদার ওপর নীল স্ট্রাইপের শার্ট । রিকশার বাম পাশের সিটে বসেছে সে, ডান পাশে অবনী । অবনীর কোলের ওপর ওর লাল ভ্যানিটি ব্যাগ ।
-‘কী হলো ? কিছু বলছো না যে ?’ অধৈর্য হয়ে কাতর কন্ঠে জিজ্ঞেস করে রতন । এটা রতনের কথা শুরু করার স্টাইল । বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায় রতন নীরবতা ভাঙ্গে এই কথার মাধ্যমে ।
অবনী বলে ,
-কী বলবো ? আমার কিছু বলার নাই ।
-আরে কী তাজ্জব ! কিছু বলার নাই মানে ? কেমন লাগছে অন্তত সেটা বলো ।
-বলার কী আছে ? আমার কেমন লাগছে সেটা তোমার অজানা না ।

এই এক সমস্যা । মেঘপিয়নের ব্যাগের ভেতর মন খারাপের দিস্তা । মন খারাপ হলে কুয়াশা হয়, ব্যাকুল হলে তিস্তা । এখন অবনীর মন খারাপ । আকাশ বাতাস কুয়াশাচ্ছন্ন । বেশি কথা বলা যাবে না । তিস্তা হয়ে যেতে পারে । রাস্তার মাঝখানে রিক্সায় বসে একটা মেয়ে কাঁদছে ব্যাপারটা নিশ্চয়ই ভালো দেখাবে না ।
স্রষ্টা যে এঁদের মনে কেন এত আবেগ দিয়েছেন তিনিই ভালো জানেন । সেই এসএসসির পর থেকেই তো রতন বাড়ির বাইরে । প্রতিবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে ক্যাম্পাসে ফেরার সময় সে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে একমনে হেঁটে চলে যেত । কারণ, ফিরে তাকালেই দেখা যেত, আঁচলে মুখ ঢেকে মা কাঁদছেন । গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছোটবোনটা কাঁদছে । সত্যি বলতে- রতনের বুকটাও যে গুমরে উঠতো না তা নয় । একবার তো ভুলে পেছন ফিরে তাকিয়ে সেও কেঁদে ফেলেছিল । সেবার আর যাওয়া হয়নি । বাসের টিকেট ক্যান্সেল করে পরে আরেকদিন যেতে হয়েছিল ।

এই মুহূর্তে রাস্তাটা বেশ ফাঁকা । মাঝে মাঝে দুএকটা প্রাইভেট কার হুসহাস করে চলে যাচ্ছে । পকেট থেকে মোবাইল বের করে রতন । হেডফোনের একটা এয়ারপিস জুড়ে দেয় অবনীর বাম কানে , নিজের ডান কানে আরেকটা ।
তারপর প্লে করে ওর খুব পছন্দের একটা গান । এই গানটা শুনলে অবনীরও মন ভালো হয়ে যায় ।

'যদি হিমালয় আল্পসের সমস্ত জমাট বরফ, একদিন, গলেও যায় । তবুও তুমি আমার । যদি নায়াগ্রা জলপ্রপাত,  একদিন, সাহারার কাছে চলেও যায়... যদি প্রশান্ত মহাসাগরের, একফোঁটা, জল আর নাও থাকে । যদি গঙ্গা ভলগা হোয়াংহো, নিজেদের শুকিয়েও রাখে...যদি ভিসুভিয়াস ফুজিয়ামা, একদিন, জ্বলতে জ্বলতে জ্বলেও যায়...তবুও তুমি আমার । যদি পৃথিবীকে ধ্বংস করতে একদিন তৃতীয় মহাযুদ্ধ বাঁধে , যদি নিভেও যায় কোনদিন, যতটুকু আলো আছে, ওই সূর্য আর চাঁদে...'

তন্ময় হয়ে গান শুনছিল দুজনেই । হঠাৎ আর্তচিৎকার করে উঠলো অবনী । একটা প্রাইভেট কারের জানালা দিয়ে ওর ভ্যানিটি ব্যাগ ধরে টান দিয়েছে ছিনতাই কারী ।  কিছু বুঝে ওঠার আগেই রতন দেখলো অবনী রিক্সা থেকে পড়ে যাচ্ছে । একটা হাত ধরার চেষ্টা করে রতন, কিন্তু শেষ রক্ষা হলোনা । অবনীর মাথাটা গিয়ে ঠেকলো পিচঢালা রাস্তায় । আর ঠিক তখনি পেছন হতে বেপরোয়া আরেকটি কারের ধাক্কা লাগলো অবনীর শরীরে । কয়েক ফোঁটা রক্ত ছিটকে এসে পড়লো রতনের সাদা শার্টে ।

[উৎসর্গঃ ডাঃ সানজানা জেরিন । চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে আমার দুই ব্যাচ সিনিয়র এই আপু কিছুদিন আগেই এমনি এক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।  এখনো স্বাভাবিক হয়নি তাঁর জীবন । যদিও আমার সাথে কখনো পরিচয় হয়নি, তবুও তাঁর এই দূর্ঘটনার কথা আমি ভুলতে পারিনা ।]

শুক্রবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

একদিন মন চেয়েছিল...

একদিন খুব করে মন চেয়েছিল, যেন হই  
বিজন গাঙের উদাস মাঝি । 
বজরা চাইনি, চাইনি সদাগরি নাও । একটুকরো ডিঙি হলেই 
বেরিয়ে যেতাম, দূর গাঁয়ে - প্রাণভোমরার সন্ধানে ! 
আতিউঁতি করে চষে ফিরলাম সমগ্র মহাশূন্য; 
বিশ্বব্রহ্মান্ড 
কোথাও পাইনি আমি একটুকরো কাঠ, একটা বৈঠা 
সবাই বললে, 
তুই তো সাঁতার জানিস !
.
একদিন 
খুব করে মন চেয়েছিল, যেন হই 
বাউল পথিক । 
চাইনি কায়াসঙ্গীনি, গেরুয়া বসন, জটাধারি কেশ । শুধু
একটা একতারা হলে, একবার 
হৃদয় উজার করে গেয়ে উঠতাম- 
সবহারানোর গান । 
আতিউঁতি করে কত খুঁজলাম সমগ্র মহাশুন্য;  
বিশ্বব্রহ্মান্ড
কোথাও পাইনি আমি একটাও লাউয়ের খোলস 
একটাও একতারা বাজানো হলোনা আজও 
সবাই বললে,  
তুই তো সংসার চিনিস !  

বৃহস্পতিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

অর্ধেক জীবন

কেটেই তো গেল অর্ধেক জীবন । কিংবা 
তারও কিছুটা বেশি । এখন কি একবার
চোখ ফেরানো দরকার পেছনের রাস্তায়? হাঁটা হলো-  
কতটা পথ ? মাত্র দুটিই তো চোখ সম্মুখ কোটরে
কতটুকুই বা দেখা হলো পথের দু'ধার ?
দেবদারু ভাওয়ালের গাছ 
মানুষ, সরিষার ক্ষেত,  
আরো কিছু কি ছিল ?
.
কেটেই তো গেল অর্ধেক জীবন । কিংবা
তারও কিছুটা বেশি । অর্ধেক জীবনের ক্লান্তি 
খুঁজছে আশ্রয় আমার ভেতর । এখন কি দেয়া চলে ওকে 
খানিকটা প্রশ্রয় ? 

ভাঙন

ভরা বর্ষায় পদ্মা নদীর পাড়ের মতন
ভাঙছে যেন ক্রমাগত আমাদেরও অন্তর
মন ও মনন
মধ্যরাতে ঢেউয়ের বুকে হারিয়ে যাওয়া বাড়ির মত
হারিয়ে যাচ্ছে দয়া মায়া
স্নেহ, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ।
মূল্যবোধটাই বাজারদরে এখন সবচেয়ে মূল্যহীন
খড়কুটো বা কচুরিপানা
যান্ত্রিকতার স্রোতে ভাসা ।
.
শহর রক্ষা বাঁধ নিয়ে যে
টেনশনে খুব মরছো
মনুষ্যত্ব যাচ্ছে ধুঁয়ে
তার লাগি কী করছো ?

বুধবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

নিভেই তো যাবো !

মরেই তো যাবো ; তার আগে
জ্বলে উঠতে চাই একবার
দপ করে ।
নিভেই তো যাবো;
ক্ষতি কি এইটুকু জেনে গেলে-
আমি কি ছিলাম দেয়ালের শোভা,
দয়ামায়াহীন নিয়ন বাতি ?
নাকি
কুড়েঘরে জ্বালানো সত্যিকার কোন এক
মমতামাখানো মাটির পিদিম !

মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

মরণোন্মুখ বিবর্তন !

পথের ধারে
আজও তো ঘটে যায় কতকিছু,
অস্বাভাবিক অন্যরকম । ছেলেবেলার মত
এখন কি আর ভিড় ঠেলে যাই ? 
আচ্ছা আংকেল, বলতে পারেন, এইখানটায়,
কী হয়েছে ?
 .
তবে কি
হয়ে গেল এতটা বয়স
হয়ে গেল কি তবে আমার ভেতর 
মৃত্যু প্রক্রিয়ার সূচনা !
.
সবার আগে কি মরে গেল আমার 'কৌতুহল'?  এভাবেই একে একে
ভালোবাসা প্রেম সংসার- 
ভেঙে যাবে, সবগুলো চলকের পাখা?
তারপর একদিন-  
একদিন চশমা উঠবে চোখে  
কানের শোভাবর্ধন করবে হেয়ারিং এইড
আলঝেইমার্সে ভোগা স্মৃতিভ্রষ্ট একজন
খুঁজে ফিরবে কবিতার পংক্তিগুলো 
কুচকানো চামড়ায় !

এবং সবশেষে আত্মার শেষ নির্যাসটুকু
আজরায়েলের অলৌকিক হাতে- ছাড়বে স্বস্তির নিঃশ্বাস-  
মুক্তির আনন্দে !

টাকার মেশিন

সরদার জয়েনউদ্দিনের একটা গল্প ছোটবেলায় পড়েছিলাম । গল্পটা ছিল কিছুটা রম্য ধাঁচের । কিন্তু সেই রম্য ধাঁচের গল্পটাই দিনে দিনে আমার চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করেছে ভয়ংকরভাবে ।
গল্পের নাম ‘টাকার মেশিন’ । এক কৌতুহলী কিশোরের গল্প । ছেলেটা শুনেছিল যে আমেরিকায় নাকি অনেক ধনী লোকেরা থাকে । তাদের অনেক টাকা । এত টাকা যে গুনে শেষ করা যায়না । কিন্তু কোনদিন সেরকম ধনী কাউকে দেখেনি বালক । হঠাত একদিন খবর পেল, বিদেশ থেকে একজন ধনী মানুষ এসেছেন সার্কিট হাউজে । শুনে পরি কি মরি করে দৌড় । তারপর প্রহরীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কোনভাবে সে ঢুকে পড়ে ভেতরে । অনেকগুলো ঘরের কোনটাতে যে সেই ধনী লোকটা আছে তা তো জানা নেই । ভয়ে ভয়ে একটা ঘরের দরজায় উঁকি দেয় সে । ঘরটাতে একজন হাল্কাপাতলা মানুষ বসে ছিলেন । লোকটা দেখতে পেয়ে কিশোর  ছেলেটাকে ডাক দেন ।
-‘বাবু, কাউকে খুঁজছো ?’
-‘হ্যা,আংকেল । শুনলাম আমেরিকা থেকে খুব ধনী একজন মানুষ এসেছেন । তাঁকে খুজছিলাম । বলতে পারেন, তিনি কোথায় আছেন ?’ ভয়ে ভয়ে জবাব দেয় কিশোর।
মুচকি হেসে লোকটা বললেন, ‘এসো ভেতরে এসো । আমিই সেই লোক’ ।
কিশোর তো বিস্ময়ে হতবাক । সে বলে, ‘আপনি সেই লোক ? নাহ । আপনি নিশ্চয়ই মিথ্যা বলছেন । বলুন না তিনি কোথায় আছেন ! আমি শুধু একবার তাঁকে দেখেই চলে যাবো । একদম ডিস্টার্ব করবো না’ ।
লোকটাও অবাক হয়ে বলেন- ‘কেন, তোমার বিশ্বাস হয় না আমিই সেই লোক?’
কিশোর বলে- ‘আপনি সেই লোক হলে দেখিতো আপনার হাত কয়টা ?’
‘আমার হাততো তোমার মতই দুইটি’ । হাত দুটি দেখান ধনী ভদ্রলোক ।
অবিশ্বাস বেড়ে যায় কিশোরের ।
আচ্ছা বলুনতো, আপনি কী খান ? প্রশ্ন করে সে  ।
ধনী বলেন- আসলে বাপু আমার তো ডায়াবেটিস, তেমন কিছু খাইনা । এই ধরো সকালে ও রাতে দুই পিস রুটি, দুপুরে কিছু ফলমূল । এই ।
কিশোর অবিশ্বাস নিয়ে বলে, 'না না । আপনি তাহলে সেইলোক হতেই পারেন না । যার এত টাকা, তার শরীর হবে কয়েকটি হাতির সমান, তার নিশ্চয়ই কমছে কম দশটি হাত থাকবে, সেই দশহাত দিয়ে সারাদিন শুধু খাবে খাবে আর খাবে । কিন্তু আপনি তো কিছুই খান না । আমার চেয়েও কম খান !'
'আচ্ছা আপনি যদি সেই লোক হন, তাহলে সত্যি করে বলুন তো অত টাকা দিয়ে আপনি কী করেন ?'
ধনী লোক বলেন, আর বলোনা বাপু- খুব সংকটে আছি । শুনেছি আফ্রিকায় একটা তেলের খনি আবিস্কৃত হয়েছে । সেটা কিনতে চাইছি । কিন্তু কয়েকশত কোটি টাকা ঘাটতি হয়ে যাচ্ছে ।
-সেই খনি কিনে কী করবেন ?
-বলো কী ? তেল উত্তোলন করে বিক্রি করবো । অনেক লাভ হবে ।
-সেই টাকা দিয়ে কী করবেন ?
-কেন, আরেকটি খনি কিনবো । তোমাদের দেশে নাকি কয়লার খনি আছে । সেগুলোও কিনতে পারি ।
-তাতে কী হবে ?
-কেন, আরো টাকা আসবে !
-আরো টাকা দিয়ে কী করবেন ?
-আরো ফ্যাক্টরি দিব ।
-আরো ফ্যাক্টরি দিয়ে কী হবে ?
-কেন, আরো টাকা আসবে !
-ওটা দিয়ে কী হবে ?
-আরো টাকা আসবে ।
-আরো টাকা দিয়ে কী হবে ?
-আরো টাকা আসবে...
কিছুক্ষণ ভেবে কিশোর বললো, আসলে আংকেল, আপনি তো মানুষ না ! আপনি তো আস্ত একটা ‘টাকার মেশিন !’

২।
সেইসময় গল্পটা আমার কাছে ছিল স্রেফ একটা মজার গল্প । আমাদের মত গ্রামীণ মধ্যবিত্ত পরিবারের একটা কিশোরের পক্ষে টাকার মেশিন চেনাটা সহজ ছিলনা । আমরা চাহিবামাত্র কিছু পেতাম না, অপেক্ষা করতে হত বাবার বেতনের। আমাদের বাবাকে এখান সেখান থেকে টাকা জোগাড় করে বড় প্রয়োজন মেটাতে হত । তারপর বড় হতে হতে ধীরে ধীরে টাকার মেশিনের সাথে পরিচয় ঘটতে লাগলো আমার । তারাও আমাদের মত মানুষ, কিন্তু জীবনটা বন্দী টাকার খাঁচায় । বেশি বেশি টাকা উপার্জনই তাদের একমাত্র লক্ষ্য । ডাক্তারদের মধ্যেও এই সংখ্যাটা কম নয় । এদের কাউকে যদি জীবনের শেষ প্রান্তে জিজ্ঞেস করা হয়, আপনি সারাজীবন কী করেছেন ? হয়তো উত্তর হবে- ভালো উপার্জনের জন্য বেশি লেখাপড়া করেছেন, ভালো চাকরি-ব্যবসা করেছেন, টাকা কামিয়েছেন, সেই টাকা খেয়েছেন, হজম করেছেন, বিয়ে করেছেন, বউ-বাচ্চার জন্যে টাকা খরচ করেছেন । এইতো জীবন !

এই ধরণের মানুষের কথা চিন্তা করি আর সেই অবোধ কিশোরের মত আমিও নিজেকে প্রশ্ন করি- একজন মানুষের খাওয়ার জন্য কতটুকু খাবার প্রয়োজন ? একজন মানুষের থাকার জন্য কতটুকু জায়গা প্রয়োজন ? একজন মানুষের শরীর ঢাকার জন্য কতগুলো কাপড় প্রয়োজন ?

মন চায় টাকার পেছনে অন্ধের মত ছুটে চলা মানুষদের ধরে ধরে নকুলের গান শোনাই ।

কষ্ট করে দিনে রাইতে
কত টাকা করছো কামাই
অত টাকা কেমনে নিবা
কাফনের তো পকেট নাই...
বাড়ি গাড়ি আহামরি সোনাদানা ভরিভরি
টিভি ফ্রিজ চেন ঘড়ি
নেতাগিরি বাহাদুরি উমিদারি জমিদারি পড়ে রইবো
কিচ্ছা খতম হইবো...
কিচ্ছা খত...ম হই...বো ।


খোদার কাছে এই ফরিয়াদ, প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকার পেছনে যেন কখনো না ছুটি । সামান্য রিযিকের ব্যবস্থা হলে বাকি সময়টা যেন কাজ করতে পারি মানুষের কল্যাণে । মানুষকে যেন ডাকতে পারি হকের পথে। কখনো যেন না হই টাকার মেশিন ।

আদম সন্তানের যদি দুটি উপত্যকাপূর্ণ ধনসম্পদ থাকে তবুও সে তৃতীয়টার আকাঙ্ক্ষা করবে। আর মাটি ছাড়া লোভী আদম সন্তানের পেট ভরবে না। অবশ্য যে ব্যক্তি তওবা করবে, আল্লাহ তা'আলা তার তওবা কবুল করবেন। (আল হাদীস)

সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

লাক্স চ্যানেল আই সুন্দরী প্রতিযোগিতাঃ উদ্দেশ্য কী ?

লাক্স চ্যানেল আই সুন্দরী প্রতিযোগিতার আসল উদ্দেশ্য কী ? উদ্দেশ্য সহজ, ‘প্রতিযোগিতা’র নাম দিয়ে চামড়াসর্বস্ব মেয়েদের টেনে আনা হবে ঝলমলে মঞ্চে । তারপর তাদের উজ্ব্বল চামড়ার ছবি তোলা হবে বিভিন্ন ঢংয়ে । বিভিন্ন পোজে । আর দিনের পর দিন সেইসব চামড়ার ছবি এবং ভিডিও প্রচার করা হবে পত্রিকা ও টিভির রঙ্গিন বিজ্ঞাপনে । অপলক চোখে সেগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকবে জনতা । মনে করবে, আহা ! লাক্স কিনলে আমিও এরকম উজ্জ্বল চামড়ার অধিকারী হবো ! তারপর দোকানে গিয়ে লাক্স সাবান কিনে আনবে । কোম্পানীর ব্যবসা হবে রমরমা ।
তারা নানানভাবে সারাদিনরাত আপনাকে শুনিয়ে যাবে, মেয়েদের সবচেয়ে বড় যোগ্যতা গায়ের রঙ । তারা আপনাকে প্রলুব্ধ করবে আপনার গায়ের রঙকে উজ্জ্বল করতে, তারা আপনার মনে হীনম্মন্যতার সৃষ্টি করবে – আপনার চামড়ার রঙ অতটা চকচকে নয় বলে ।
যদিও এটা বাই ডেফিনিশান বর্ণবাদের কাতারে পড়ে ।
ব্যবসার প্রয়োজনে তারা নারীদের ব্যবহার করবে । ব্যবসার প্রয়োজনে তারা বর্ণবাদকে উস্কে দেবে , ব্যবসার প্রয়োজনে তারা অশ্লীলতাকে উস্কে দেবে । প্রচার করবে অশ্লীলতার মহিমা । অন্ধ ছাড়া এ থেকে রক্ষা পাবেনা কারো চোখ ।
আর মেয়েদের একটা অংশ, অংশ নেবে তথাকথিত এই প্রতিযোগিতায় । কিছু লম্পটের কাছ থেকে এই স্বীকৃতি পাবার আশায়- হ্যা, ‘তোমার গায়ের রঙ বেশ উজ্জ্বল !’
যদি সত্যিই ওরা নারীর জন্য কিছু করতে চাইত, তাহলে যে টাকা দিয়ে এই সুন্দরী প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় , সেই টাকা দিয়ে তারা তো সংবর্ধিত করতে পারতো সংগ্রামী নারীদের, যারা নানা প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করে কাজ করে যাচ্ছেন নানান অংগনে । সেই টাকা দিয়ে অসহায় নারীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে পারতো । কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারতো । সেই টাকা দিয়ে তারা অসহায় মেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারতো ।
কিন্তু ওরা তা করবে না । এতে ওদের ব্যবসার সুবিধা হয়না । মা বাবাহীন যে মেয়েটি একা একা সংগ্রাম করে লেখাপড়া করেছে, ওদের কাছে তাঁর কোন মূল্য নেই । প্রতিবন্ধী হয়েও যে মেয়েটি লেখাপড়া করে অনেকদূর এগিয়েছে, ওদের কাছে তাঁর কোন মূল্য নেই । ওদের কাছে নারীর সমাজসচেতনতার মূল্য নেই , সাহিত্যপ্রতিভার মূল্য নেই, গবেষণার মূল্য নেই, মেধার মূল্য নেই, মস্তিষ্কের মূল্য নেই । ওদের কাছে মূল্য আছে- উজ্জ্বল চামড়ার ।
আর কতদিন এভাবে চলতে দেয়া যায় ?
আশার কথা মেয়েরা এদের দূরভিসন্ধির ব্যাপারে সচেতন হচ্ছে । কিন্তু শুধু সচেতনতা সৃষ্টিই যথেষ্ট নয় । যে ব্যবসায় মুনাফার লোভে এরা বর্ণবাদ ও অশ্লীলতাকে বেছে নিয়েছে ওদের সেই ব্যবসাতেই আঘাত করতে হবে । তবেই ওদের থামানো যাবে । আর এর সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে, যে লাক্সের প্রচারের জন্য ওদের এই অশ্লীলতা ও বর্ণবাদের প্রচার- সেই লাক্সকেই বয়কট করতে হবে । এবং এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে মেয়েদেরকেই ।

শিকড়বিহীন কষ্টগুলো !

কষ্টগুলোর জন্মের ইতিহাস নিয়ে, এখন আর-
মাথা ঘামাই না একদম । কী করে ওরা এলো 
আমার বুকের ভেতর ? শিকড়বিহীন কষ্টগুলো !
ওরা কি কোন রাজ-রাজড়ার পুত্র-কন্যা ?
ধনীর দুলাল, ননীর পুতুল ? নাকি
সারাজনম নদীর বুকে নাও ভাসানো
অচিন কোন বেদেনির সন্তান ?  এখন আর-
আছে কি কোন প্রয়োজন 
পূর্বপুরুষের খোঁজে ? 


যেখান থেকেই আসে আসুক,
উড়ে আসুক ভেসে আসুক ; এখন ওরা 
শুধুই 'আমার' ! গোবরে হোক কি পদ্মফুলে 
কী আসে যায় তাতে ? লাল নীল জামা পড়িয়ে
দুধ মাখা ভাত খাইয়ে দাইয়ে ,
ভরদুপুরে শান বাধানো
দিঘীর জলে নিত্য নাইয়ে
আদর দিয়ে পেলে পুষে -
আমিই ওদের করবো মানুষ ! এই তো এখন আমার
একমাত্র কাজ-
অবশিষ্ট জীবনের ! 

শনিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

শকুনির ঢেঁকুর !

নেকড়েরা ময়ুরের ছদ্মবেশ নিয়ে
হেঁটে হেঁটে সমস্ত লোকালয়- ভরিয়ে তুলছে- 
লাল নীল কিংবা জলে ভিজে শোলার মত 
ফেঁপে ওঠা লাশে,
ডোবা খাল বিল নদী
এবং নর্দমা । আর আমরা
বাম হাতে নাক চেপে ধরে, 'ওমাগো' বলে সটকে পড়ছি 
যার যার মত !
.
তারপর, (নিরীহ নিরপেক্ষ ভান ধরে)
আপন প্রাণ বাঁচাবার প্রাণান্তকর চেষ্টায় পলায়নপর আমরাও    
একে একে 
বেঘোরে হারাচ্ছি প্রাণ; উলুখাগড়ার মত ।
.
দিনভর নির্বিঘ্নে মৃতদের লাশ - 
ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে শকুনির দল,  
আর
স্বার্থপরতা চেটেপুটে খাচ্ছে (জীবিত !) মানুষের আত্মা 
পরম তৃপ্তিতে ।

কেউ কি শুনতে পাও-  
ঢেকুরের শব্দ ?

অনুকাব্যঃ বৃষ্টি ও ব্যস্ততা

ফোন করে কে বললো আমায়
বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে খুব
হুম ঠিকাছে বলেই আমি
আবার কাজে দিলাম ডুব !

শুক্রবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

মানুষের কষ্টগুলো

মানুষের কষ্টগুলো একেক জনের একেক রকম । সমস্যাগুলোও কেমন আলাদা আলাদা । একজনের কাছে আরেকজনের সমস্যাটা ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু প্রত্যেকের নিজের কাছে তার সমস্যাটা মারাত্মক । কারণ, সেই সমস্যাটা তার নিজেকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে । আর কাউকে নয় । আরেকজনের কষ্টের সাথে তুলনা করার সুযোগ না থাকলে সবসময় নিজের কষ্টকেই সবচেয়ে বড় কষ্ট মনে হয় । মনে হয়, আমার চেয়ে বড় কষ্টে আর কেউ নেই ।
বাইরে থেকে দেখে যাকে সবচেয়ে সুখী মনে হয়, তার ভেতরেও এমন দুঃখ আছে শুনলে হয়তো কান্নারত একজন মানুষ তার কান্না থামিয়ে দেবে । মানুষের মন এমন এক জলাশয়, যেখানে দুঃখের শত শত মহাসাগর নিশ্চিন্তে লুকিয়ে থাকতে পারে । বাইরে থেকে তার ঢেউয়ের শব্দ শোনা যায়না ।

এমনই হয় !

এমনি হয় । সবকিছু, এমনই হয় । 
যেদিন খুব তাড়া থাকে কোথাও যাবার, সেদিনই  
ট্রাফিক জ্যামে আটকে যাবে গাড়ি  
সময় পেরোবার আগে  
আর ছুটবে না ! 
যেদিন কেউ অপেক্ষা করছে কোথাও, সেদিনই 
ভুল পথে ভুল সময়ে নেমে যাবো 
ভুল জায়গায় । 
যেদিন ভোরবেলা জেগে থাকা খুব প্রয়োজন  
সেদিনই বোবায় ধরার মত চেপে ধরবে 
আধমরা ঘুম ।  
যেদিন করতে হবে একটু বেশি কাজ  
সেইদিন ম্যাজ ম্যাজ করবে সমস্ত শরীর ।
যেদিন মন খারাপ করা মোটেও ঠিক নয়-    
সেদিনই ঘটবে অনাকাঙ্খিত সবকিছু ।
এমনই হয়, হুম । সবকিছু 
এমনই হয় । 

বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

স্বপ্নের মত মনে পড়ে

একহাতে রঙের কৌটা, পকেটে ব্রাশ, রঙতুলি  
মুষ্টিবদ্ধ আরেকটি হাত  
বুকের ভেতর টগবগে রক্ত, 'আল্লাহু আকবার' বলে  
হৃদপিন্ড হতে বেরিয়ে আসে মিনিটে সত্তরবার ।
তারপর  
অদ্ভুত উত্তাপ ছড়িয়ে দেয় সমগ্র শরীরে । 
নিঃশব্দ পায়ে হেঁটে চলে তিনজন মানুষের কাফেলা  
চোখে মুখে মিশে আছে এক- মহান বিপ্লবের নেশা-  
নিপীড়িত মানুষের মুক্তির প্রয়োজনে ।    
.
স্বপ্নের মত মনে পড়ে  
মধ্যরাতের আলো আঁধারিতে  
দেয়াল পেরিয়ে দেয়ালে দেয়ালে  
রক্তের অক্ষরে লিখে আসা দৃপ্ত শ্লোগান । শাসকের  
অন্যায় জুলুম আর শোষণের বিপরীতে 
একজন প্রতিবাদী কিশোরের লিখে আসা সেইসব  
নির্বাক প্রতিবাদলিপি     
.
আজো 
স্বপ্নের মত মনে পড়ে ।  

আপনি মুহসিন ভাই ?

বহুদিন থেকে দেশের রাজনীতি নিয়ে তেমন একটা মন্তব্য করিনা । মনে হয়, এইদেশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলা মানে সময়ের নিদারুণ অপচয় । কিন্তু এখন ক্ষান্ত দিলেও একসময় তো ফেসবুকেই অনেক গুরুগম্ভীর লেখা লিখেছি । বিভিন্ন থিওরি বা মতবাদের পক্ষে বিপক্ষে তাত্ত্বিক আলোচনা সমালোচনা করেছি । সমসাময়িক রাজনীতির ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ লিখেছি । সেকারণে অপরিচিত অনেকেই সম্ভবত আমাকে একজন মোটাসোটা বয়স্ক মানুষ , নিদেনপক্ষে একজন পরিপূর্ণ দাঁড়িগোঁফওয়ালা যুবক মনে করে রাখেন ! ইদানিং সেটা হাঁড়ে হাঁড়ে টের পাচ্ছি । নিভৃতে থাকতে চাইলেও কারো না কারো সাথে তো দেখা হয়ই । বিভিন্ন উপলক্ষে পথেঘাটে অনেকের সাথে দেখা হচ্ছে যারা ফেসবুকে শুধু একটা নাম হিসেবে ছিলেন । কোনদিন না দেখেও কেউ আমাকে ভালোবাসে জেনে আসলেই অনেক ভালো লাগে । হঠাৎ যখন কারো সাথে পরিচয় হয়, আমার এই ফাস্টিয়ার(First Year) মার্কা চেহারা দেখে- 'আপনি মুহসিন ভাই?' বলে কেমন একটা হতাশ চেহারা নিয়ে তাকায় । ভাইদের চোখে হতাশা দেখে আমিও হতাশ হই । মনে হয়, আহা ! মানুষের আশাভঙ্গ করাটা কতবড় পাপ কে জানে ! ক্যান যে একটা মোটাসোটা বয়স্ক মানুষ হইলাম না !

মঙ্গলবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

সিঁড়ির মত জীবন !

আগে যে বাসায় থাকতাম সেটা ছিল ছয়তলায় । লিফট ছিলনা । আমার ঘাড়ে যে ব্যাগটা থাকে , ওটার ওজন সাধারণত দশ কেজির নিচে থাকেনা । বাইরে থেকে এসে এই একটা ওজনদার ব্যাগ নিয়ে ছয়তলায় ওঠাটা খুবই কষ্টকর একটা কাজ । সেজন্য আমি সিঁড়িতে পা দিয়েই পকেট থেকে মোবাইল বের করতাম । মোবাইলে কিছু পড়তাম আর সিঁড়িতে পা রাখতাম একের পর এক । উপরে তাকাতাম না খুব একটা । জানা ছিল , যেখানে সিঁড়ি শেষ হবে ওটাই আমার বাসার দরজা । একটা একটা করে সিঁড়ি বেয়ে গেলেই একসময় সব সিঁড়ি ফুরিয়ে যাবে ।
.
আমাদের জীবনের সাথে এই ব্যাপারটার খুব মিল আছে বলে মনে হয় । মনে হয়, জীবনটাও এরকম সিঁড়ির মত । বারবার বেশি দূরে তাকানোর, কতটা বাকি আছে বারবার সেটা দেখার দরকার নেই । সামনের সিঁড়িটা পেরোনোই এই মুহূর্তের কাজ । যতক্ষণ জীবন , ততক্ষণে যতটা সিঁড়ি পার হওয়া যায় ততটাই লাভ । বারবার উপরে তাকালে শুধু হতাশাই বাড়বে । কিন্তু কাজের ভেতর থাকলে কখন যে সিঁড়ি শেষ হয়ে যাবে, হয়তো টেরই পাবো না !