এই এক সমস্যা আমার। পথে নামলেই পথের প্রেমে পড়ে যাই। মনে হয়ঃ পথে পথে কাটিয়ে দিইনা কেন জীবনের বাকিটা সময়? . এইযে পথ- দুধারে নানান গাছের সারি দেবদারু - অশ্বথ - বাশঝাঁড় - কাশবন, তাকিয়ে থাকলেই চোখে নেশা ধরে আসে; যেন অপরুপ সৌন্দর্যের পানে- মুগ্ধ প্রেমিকের চেয়ে থাকা.... . এই এক সমস্যা আমার।
হয়তো একদিন এ শহর ছেড়ে পথে নেমে গেলে হয়তো হারিয়ে যাবো অচিন পথের বাঁকে- হয়তোবা আর কভু হবে নাকো ফেরা পুরনো কামরায়।
দেখো কীরকম নিশ্চুপ হয়ে গেছি আমি অমাবশ্যার মত ভয়ানক নৈঃশব্দ গ্রাস করে রেখেছে আমাকে। কতদিন আমি কোন কবিতা লিখিনা, মনে পড়ে? কতদিন গলা ছেড়ে গাইনি একটাও ভাটিয়ালি গান! . দেখো, কীরকম নিরাবেগ হয়ে গেছি আমি যেন হিম বরফের মত শীতল হয়ে আছে আমার হৃদয়। কতদিন দেখনি আমার প্রাণখোলা হাসি? মনে পড়ে? . আর কীরকম উদাসীন হয়ে গেছি আজকাল! যেন গৈরিক সন্ন্যাসীর মত ভয়ানক বৈরাগ আচ্ছন্ন করেছে আমাকে। শোনো, মানবিক উষ্ণতা ছাড়া এ বরফ আর গলবে না। তীব্র কোলাহল ছাড়া ঘুঁচবেনা নৈঃশব্দ। আর সম্ভবতঃ ভয়ানক প্রেম ছাড়া ফিরবেনা- পুরনো আবেগ!
ইদানিং অনেক ডাক্তারকে দেখি ফেসবুকে রোগীর ছবি পোস্ট করেন । এটা করা
কোনভাবেই ঠিক নয় । মেডিকেল ইথিক্স অনুযায়ী রোগীর সকল তথ্য গোপন রাখা
ডাক্তারের অবশ্য কর্তব্য, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া । যেমন ইনফেকশাস ডিজিজ বা
পুলিশ কেস সম্পর্কে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানাতে হয় । একাডেমিক আলোচনা ও
গবেষণার প্রয়োজনে রোগীর অনুমতি সাপেক্ষে তাঁর তথ্য ব্যবহার করা যায় । এসব
ক্ষেত্র ছাড়া নিজের খেয়ালখুশিমত কারো ছবি, বা রোগ সম্পর্কিত অন্য কোন তথ্য
সামাজিক মিডিয়া তো দূরের কথা, রোগীর নিকটাত্মীয় নন অথবা রোগী চান না এমন কারো কাছে প্রকাশ করার সুযোগ নেই । এটা মেডিকেল এথিক্সের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ।
ডাক্তারের কাছে রোগীর অবস্থা জানার জন্য অনেকেই আসেন । দেখা যায়-
হাসপাতালে রোগী দেখতে এলে সবাই একবার ডাক্তারের কাছে গিয়ে রোগীর অবস্থা
জানতে চান। কিন্তু রোগীর স্বজনদের বুঝতে হবে- সবকিছু জানার অধিকার আপনার
নেই । অনেক সময়ই ডাক্তাররা আপনাদের সাথে কথা বলতে চান না । অনেক সময় বিরক্ত
হন । কারণ, এখানে ডাক্তারের ওপর অতিরিক্ত অপ্রয়োজনীয় চাপের বাইরে নীতির
প্রশ্নও জড়িত আছে ।
ডাক্তারদেরও সচেতন থাকতে হবে । রোগীর কোন তথ্য
কেউ জানতে চাইলে অবশ্যই রোগীর সাথে তাঁর সম্পর্ক যাচাই করে নিতে হবে ।
সম্ভব হলে রোগীর অনুমতি নিতে হবে । কাকে কতটুকু বলা যাবে তা ভেবে নিয়ে তাকে
ততটুকুই বলতে হবে । তার বেশি কখনোই নয় ।
রোগী হয়তো চিকিৎসায়
শারীরিক সুস্থতা লাভ করবেন, কিন্তু রোগীর অনুমতি ছাড়া কোন কোন তথ্য অন্য
কারো হস্তগত হলে পরবর্তীতে রোগীর সামাজিক জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে ।
মেডিকেল ইথিক্স তা কখনোই হতে দিতে পারে না ।
জঙ্গিবাদ বা ধর্মীয় উগ্রবাদ উত্থানের কারণ কী? মোটাদাগে দুটি কারণকে
তুলে আনা যায়। একটা হচ্ছে- হতাশা । প্রতিশোধস্পৃহা । আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে
সঠিক শিক্ষার অভাব ।
দীর্ঘদিন নির্যাতন নিপীড়ন শোষণ বঞ্চনার শিকার
হলে যেকোন জনগোষ্ঠীই বিদ্রোহী হয়ে ওঠে । যখন বঞ্চনার জায়গা থেকে উত্তরণের
স্বাভাবিক কোন পন্থা থাকে না, নিয়মতান্ত্রিক প্রচেষ্টা কাজে আসে না, তখন
মানুষ সহিংস হয়ে ওঠে । শুধু মানুষ নয়, যেকোন প্রাণীই সহিংস হয়ে ওঠে । মানুষের মধ্যে জেগে ওঠে প্রতিশোধপরায়ণতা । এ উপমহাদেশ থেকে শুরু করে সারা
বিশ্বের সকল উগ্রবাদীদের উত্থানের পেছনে এই কারণটিই প্রধান । এমনকি
ঐতিহাসিক ব্রিটিশ বিরোধী সহিংস আন্দোলনসহ বিশ্বের প্রায় সকল সহিংস
আন্দোলন-সংগ্রাম বা যুদ্ধের পেছনের কারণ এটিই । ইসলামকে পুঁজি করে যে
উগ্রবাদ ছড়িয়ে পড়েছে সারাবিশ্বে, যার ঢেউ এসে পড়েছে আমাদের দেশেও, তারও
প্রধান কারণ এটি । আমরা দেখি, আইএস আল কায়েদা এইসব গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের মানুষের হতাশা থেকে, ক্ষোভ থেকে । প্রতিশোধস্পৃহা থেকে
। ইরাক যুদ্ধ, লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ- এইসব ঘটনার পরেই
ক্ষুদ্র উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো ফুলে ফেপে উঠেছে । আরো বেশি মানুষকে তাদের দলে
ভিড়াতে পেরেছে । আরো বেশি শক্তি সঞ্চার করতে পেরেছে । সিরিয়া, ইরাক,
আফগানিস্তান, লিবিয়া, এইসব যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের তরুন যুবকেরাই আইএস আল
কায়েদার মূল শক্তি । পরবর্তীতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে জীবন সম্পর্কে
হতাশ, রেডিকালি চেঞ্জড কিছু যুবক তাদের সাথে যোগ দিয়েছে ।
আইএস সহ উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো মুসলিম তরুনদের মাঝে একটা ধারণা ছড়িয়ে
দিচ্ছে- দেখো, সারাবিশ্বে মুসলমানরা নির্যাতিত হচ্ছে । আর ইহুদী খ্রিস্টান
অমুসলিমরাই হচ্ছে নির্যাতনকারী । অতএব তাদের ওপর প্রতিশোধ নিতে হবে ।
তাদেরকে খুন করতে হবে ! আর বিশ্বের মুসলিমদের দুরবস্থায় হতাশ তরুনরা আবেগে
জড়িয়ে পড়ছে উগ্রবাদী সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে । যোগ দিচ্ছে নিরীহ নিরপরাধ
মানুষ হত্যার মত জঘন্য কাজে ।
মুসলিমরা অবশ্যই নির্যাতিত হচ্ছে, এই
বাস্তবতা কারো অস্বীকার করার সুযোগ নেই । কিন্তু তাই বলে অন্য কোন নিরীহ
মানুষকে হত্যা তো দূরের কথা, সামান্য ক্ষতি করার অনুমতিও ইসলাম দেয় না ।
কুরআন পাকে আল্লাহ তায়ালা একজন নিরীহ মানুষ হত্যাকে পৃথিবীর সকল মানুষকে
হত্যার সমান বলে ঘোষণা করেছেন । নিরীহ মানুষ হত্যার ব্যাপারে উগ্র
গোষ্ঠীগুলো মুসলিম যুবকদের ধারণা দেয় যে- ইহুদি খ্রিস্টানরাও তো নিরীহ
মুসলিমদের হত্যা করছে ! অতএব তোমরা করলে দোষ কী? সঠিক ইসলামী শিক্ষা না
পাওয়া আবেগি মুসলিম তরুনেরা এইসব কথায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে
ধ্বংসের পথে ।
তাদেরকে isolated ভাবে কুরআনের এমন কিছু কিছু আয়াত
থেকে উদ্ধৃতি দেয়া হয়, যেখানে ‘ক্বিতাল’এর কথা বলা হয়েছে । কিন্তু কখন,
কোন্ প্রেক্ষাপটে, কেন সেইসব আয়াত নাযিল হয়েছিল তা বলা হয়না । তারা
নিজেরাও জানার সুযোগ পায় না, চেষ্টা করে না । আগে থেকে ইসলামের শিক্ষা না
থাকার ফলে তাদের ধারণা হয়ঃ ঠিকই তো ! এগুলো তো কুরআনেরই কথা !
অথচ
Context ছাড়া কুরআনের কোন Text থেকে কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ নেই । যদি
তাই হতো, তাহলে আল্লাহ তায়ালা শুধু বই আকারে কুরআন নাযিল করতেন, রাসুল
পাঠাতেন না । সমগ্র কুরআন একসাথে নাযিল করতেন, ২৩ বছর সময় দিতেন না ।
‘উগ্রবাদের কারণ ও প্রতিকার- ১ (চলবে)
কারা বেশি করে জড়াচ্ছে উগ্রপন্থায়? যারা জীবনের একটা বড় অংশ কাটিয়েছে
ধর্মীয় অনুশাসনের বাইরে । ফলে হঠাৎ করে যখন তারা জীবনে কোন একটা বড় ধাক্কা
খায়, যখন কোনভাবে তার মনে হয়- কী করছি আমি এসব? আমি তো অনেক পাপ করেছি, হায়
হায় আমার কী হবে ! আমার তো দুনিয়া আখেরাত সব বরবাদ হয়ে গেলো ! ঠিক এসময়ই
তারা সন্ধান পায়, অথবা তাদেরকে খুঁজে নেয় উগ্রবাদী গোষ্ঠী । তাদেরকে বলা
হয়- আল্লাহর কাছে মাফ পেতে চাও? তাহলে এই নাও অস্ত্র! খুন করে ফেলো
ওকে-তাকে । ওরা ইসলামের শত্রু ! ওদেরকে মেরে নিজেও মরে যাও , শহীদ হয়ে যাও ।
শহীদ(?) হবার এই সহজ রাস্তা পেয়ে আবেগি তরুন নেমে পড়ে মানুষ হত্যায় ।
এমনিতেই সে ছিল জীবন সম্পর্কে হতাশ, ক্ষুব্ধ । এমনিতেই সে ছিল জীবন
সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ । তারপর যখন উগ্রবাদীরা তার সামনে আত্মাহুতি দেয়ার একটা
'মহান' (?) কারণ দাঁড় করায়, অস্থিরহৃদয় যুবক তাতেই ঝাঁপিয়ে পড়ে । কারণ-
সারাটা জীবন, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান মেনে চলার চেয়ে হঠাৎ
আবেগে জীবন দেয়াটা অনেক সহজ ।
উল্টোদিকে যারা ছোটবেলা থেকেই
ইসলামের শিক্ষা পেয়ে, ধর্মীয় আচার আচরণের মধ্যে বড় হয়- তাদের ভেতর একটা
তৃপ্তি থাকে- আমি ধর্মের পথেই আছি । ফলে তাদেরকে র্যাডিকালাইজড করা সম্ভব
হয় না ।
আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে- ধর্মীয় শিক্ষা নেবার জায়গাটা । এটা
একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । তরুনদের মনে অনেক প্রশ্ন জাগে । ধর্ম নিয়ে, জীবন
নিয়ে । এইসব প্রশ্নের জবাব সে কোথায় পাবে? প্রশ্নের সঠিক জবাব পাওয়ার
জায়গাটা হাতের কাছে থাকতে হবে । ধর্মীয় বই পুস্তক, ধর্মীয় নেতা, আলেম
ওলামাদের গতিবিধি, মাহফিল মজলিশ মক্তব মাদ্রাসা ওয়াজ নসিহত বক্তৃতা সীমিত
হয়ে পড়লে সেই জায়গাটা দখল করে নেয় উগ্রবাদী গোষ্ঠী । ফলে মানুষের বিপথগামী
হবার সুযোগ সম্ভাবনাও বেড়ে যায় ।
বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রপন্থিরা
যতটুকু বিস্তারের সুযোগ পেয়েছে তার পেছনে এইসব কার্যকারণ জড়িত আছে । বিগত
বছরগুলিতে ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগ দিনকে দিন সীমিত হয়েছে । অনেক মক্তব
মাদ্রাসা, ধর্মীয় জলসা মাহফিল মজলিশ টিভি পত্র পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেছে । আর
এর সুযোগটা নিতে পেরেছে উগ্রবাদীরা । ফলে তরুণ- যুবকদের একটা অংশকে
বিপথগামী করার সুযোগ পেয়েছে উগ্রবাদিরা । ধর্মের শিক্ষার পথ বন্ধ করা নয়-
বরং সহজলভ্য করতে হবে । যাতে তরুন মনের প্রশ্নগুলো উত্তর খুঁজে পায়
পিতামাতার কাছে, শুভাকাঙ্খি কারো কাছে । পরিচিত কারো কাছে । আর যারা
ইসলামের যৌক্তিক ব্যাখ্যা জানে, শেখে, বোঝে, তাদেরকে বিপথে নেয়া কারো জন্য
সহজ হয় না । তাদেরকে র্যাডিকালাইজড করা যায় না ।
‘উগ্রবাদের কারণ ও প্রতিকার- ২ (চলবে)
কথা ছিল শ্রীমঙ্গলে নামবার । কিন্তু ট্রেনেই আমাদের প্ল্যান চেঞ্জ হয়ে গেল । স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেল, মাধবপুর এবং লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের সবচেয়ে কাছাকাছি হবে ভানুগাছ স্টেশন । অতএব আমরা এখন ভানুগাছেই নামবো ! সারারাত ঘুমাইনি । গল্পগুজব করেই কেটে গেল কয়েকটা ঘন্টা । শ্রীমঙ্গল আসার আগেই চেয়ার ছেড়ে এসে দাঁড়িয়েছি ট্রেনের দরজায় । হুহু বাতাস এসে লাগছিল শরীরে । দুপাশে গাছ আর গাছ । যেন বনের ভেতর দিয়ে চলছে ট্রেন । একটা অসাধারণ ভ্রমণের রোমাঞ্চ শুরু হলো সেখান থেকেই । তারপর যেই কথা সেই কাজ । রাত তিনটায়, বলা চলে ‘ভররাত্রে’ই আমাদের ভানুগাছ স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে সিলেটের উদ্দেশ্যে চলে গেল উপবন এক্সপ্রেস । আমরা নেমে পড়লাম ‘পথে’ । বাকি দিনগুলো আমরা যেভাবে ঘুরে বেড়িয়েছি তাকে কোন ভ্রমণ না বলে ‘পথে পথে ঘুরে বেড়ানো’ বলাই বেশি যুক্তিযুক্ত । হুম । সিলেটের পথে পথে ।
চা বাগানের ভোর
সিলেট মানে চা বাগান । অতএব শুরুটা অবশ্যই হতে হবে চা বাগান দিয়েই। কাছাকাছি রয়েছে ন্যাশনাল টি এস্টেট এর চা বাগান । চা বাগানের ভেতর লেক । মাধবপুর লেক । কিন্তু এই রাত তিনটায় তো আর সেখানে যাওয়া যায় না! অতএব ভানুগাছ স্টেশনে হাত মুখ ধুয়ে গরম পরোটা ডিম ডাল আর চা খেয়ে পেটকে বশে আনলাম । ফযরের আজান হলে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে একটা সিএনজি ভাড়া করলাম আমরা । তখন ভোর ছয়টা। সিএনজি ছুটছে গ্রামের পথ ধরে । দুপাশে মাঠ, ধানক্ষেত, পুকুর, দীঘি । ভোরের শীতল স্নিগ্ধ হাওয়ায় জুড়িয়ে যাচ্ছিলো শরীর। ছোট একটা নদীও দেখলাম একেবেঁকে চলে গেছে । অনেক অনেক দিন পর এমন দৃশ্য দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল আমাদের । অফিসিয়ালি চা বাগানে ঢোকার সময় সকাল আটটার পর হতে । অতএব এই ভোরবেলায় গার্ডকে অনুরোধ করে আমাদের ঢুকতে হলো ভেতরে । চা বাগান, ভেতরের লেক দুটোই অনেক সুন্দর । লেকটা অনেকটা বান্দরবানের বগা লেকের মত লাগলো ।
মাধবপুর লেকে ফুটে আছে শাপলা শালুক ।
উল্লুকের অভয়ারণ্যে !
ঘন্টাখানেক সেখানে কাটিয়ে গাড়ির মুখ ঘোরাই লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের দিকে । পথে চা নাস্তা খেয়ে নিলাম । স্থানীয়দের সাথে আলাপ করলাম। লাউয়াছড়ায় যখন পৌঁছলাম তখন সকাল সাড়ে আটটা। অফিসিয়ালি টিকেট নিয়ে ঢোকার সময় নয়টার পর হতে। দেখলাম আরো অনেকেই ঢুকে পড়ছে টিকেট ছাড়াই । কারণ, কাউন্টারে কেউ নেই । আমরাও কালবিলম্ব না করে ঢুকে গেলাম লাউয়াছড়ার বনে । পরে টিকেট নেয়া যাবে । অবশ্যই- পায়ে হেঁটে ! পথের দুপাশে গাছ । মাঝখানে ইট বিছানো রাস্তা । ততক্ষণে আকাশে সূর্য তাপ ছড়াচ্ছে । বনের ভেতর যেন আলো আধারির খেলা । হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছলাম গিয়ে রেললাইনে । লাউয়াছড়ার ভেতর দিয়ে চলে গেছে রেললাইন । কথিত আছে, জুলভার্নের বিখ্যাত সিনেমা Round the world in 80 days এর এক অংশের শুটিং হয়েছিল এখানে ।
মাননীয় উল্লুক মহাশয় !
এই বনের সৃষ্টি বৃটিশদের হাতে, সেই ১৯২৫ সালে । পরে এই বনকে জাতীয় উদ্যান ও অভয়ারণ্য ঘোষণা করে সরকার। বানর, আর উল্লুকের দেখা মিললেও অন্য কোন প্রাণির অবশ্য দেখা পাওয়া গেলনা । তবে এখানে নাকি দুএকটি হরিণ, অজগর আর অনেক রকম সাপ আছে । কয়েকদিন আগেই নাকি এক অজগর সাপ একটা সম্পূর্ণ হরিণ গলাধঃকরণ করেছিল ! ভেতরে আছে জরাজীর্ণ কয়েকটি অফিস ঘর । টিলার ওপরে একটি দোকান। একটি বাংলো । একটি মসজিদও আছে । ঘন্টা দুয়েক ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে আরো অনেকক্ষণ কাটিয়ে দিলাম মসজিদের বারান্দায় । লাউয়াছড়ায় একটি ডরমিটরি আছে যেটা নাকি গবেষকদের বা স্টুডেন্টদের থাকার জন্য । কিন্তু সেখানে গিয়ে হতাশ হলাম । বিদ্যুৎ সংযোগ নেই । অতএব, রাতে থাকা সম্ভব নয় ।
গন্তব্য মাধবকুন্ড!
আবার বেরিয়ে পড়লাম পথে । ছোটবেলায় মাত্র দুটো ঝর্ণার কথা জানতাম । চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড আর মৌলভীবাজারের মাধবকুন্ড । সীতাকুন্ড দেখা হয়ে গেছে সাত বছর আগেই । এবার লক্ষ্য মাধবকুন্ড । এতক্ষণে প্রায় দুপুর হয়ে গেছে । বন থেকে বেরিয়ে আবার সিএনজিতে উঠলাম আমরা । এবার ‘লোকাল’ যাত্রী হিসেবে । বিকজ, সিএনজি রিজার্ভ নিতে গেলেই আকাশচুম্বি দাম চেয়ে বসে । সিএনজিওয়ালাদের ধারণা, পর্যটক মানেই একেকটা টাকার গাছ ! চাইলেই কেল্লা ফতেহ ! সিএনজি চললো । আমরা এলাম সমশেরনগর । সেখান থেকে কুলাউড়া । তারপর জুড়ী পার হয়ে কাঠালতলী হয়ে মাধবকুন্ড । বিকেল হয়ে গেছে এতক্ষণে । সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত মাধবকুন্ডের শীতল পানিতে শরীর ডুবিয়ে শুয়ে থাকলাম ।
মাধবকুন্ড জলপ্রপাত ।
মনে হলো মাধবকুণ্ডকে বেশ যত্ন করে ‘পর্যটন কেন্দ্র’ হিসেবে সাজানো হয়েছে । বাংলাদেশের বেশিরভাগ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জায়গাগুলি অবহেলায় পড়ে আছে । সেই তুলনায় মাধবকুন্ড যথেষ্টই সমাদর পেয়েছে বলতে হয়। আফসোস হলো, যেখানটায় ঝর্নার পানি পড়ছে, সেখানে যাওয়া নিষিদ্ধ । পানিতে ডুবে কয়েকজনের মৃত্যুর পর এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে । ওখানে নাকি পানির গভীরতা অনেক । সন্ধ্যা যখন হয় হয় তখন আমরা মাধবকুন্ডের মায়া ত্যাগ করে চলে এলাম কাঠালতলী । মাধবকুন্ড হতে কাঠালতলী বাজার, মাত্র ৭-১০ মিনিটের রাস্তা । সিএনজি ভাড়া লাগলো আড়াইশ টাকা ! মাধবকুন্ডের এই এলাকায় সিএনজিচালকরা একটা বিশেষ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে ।
হাওরে ভাসাই ভেলা
কুলাউড়া পার হয়ে জুড়ী উপজেলায় ঢুকতেই চোখে এসেছিলো দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি । যতদূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি । এ আবার কোন্ সমূদ্র? সিলেটে তো সাগর আছে বলে জানতাম না ! জানা গেলো, এটাই হাকালুকি হাওর । অতএব আমাদের পরিকল্পনায় যোগ হলো হাওর দর্শন । সিলেটে এসে হাওর না দেখে ফিরে যাবো? তা অয় না মিয়া । বড়লেখায় এক হোটেলে রাত কাটিয়ে পরদিন নামলাম হাওরের পথে । বড়লেখা হতে সিএনজি ভাড়া করে যেতে হলো ঘন্টাখানেকের পথ । সেখানে নৌকা ভাড়া করে হাওরের ঘোলাজলে ভাসতে লাগলাম আমরা ।
হাকালুকি হাওর ।
জাফলং কতদূর?
পরবর্তী গন্তব্য জাফলং । দুপুরের পরপর সিএনজি নিয়ে জাফলং এর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম । কিন্তু কোথায় জাফলং? কতদূর ? জানা নেই । এবার আমাদের রাস্তা চেনানোর দায়িত্বভার চাপালাম গুগল ম্যাপের কাঁধে । দাসের হাট হয়ে বিয়ানীবাজার । সেখান থেকে দুবাগ, তারপর শাহবাগ । তারপর সুরমা ব্রীজ পেরিয়ে আমরা পৌঁছলাম কানাইঘাট । ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে গেছে প্রায় । কানাইঘাটে খাওয়া দাওয়া করে শুরু হলো আরেক যাত্রা । পার্বতীপুর, দুর্গাপুর হয়ে গেলাম দরবস্ত বাজার । সেখান থেকে জৈন্তাপুর । জৈন্তাপুরে শুরু হলো সিলেটের চিরাচরিত ভর বর্ষণের রাত । এরইমধ্যে এলো জাফলং এর উদ্দেশ্যে রাতের সবশেষ বাস । উঠে পড়লাম আমরা । বাস চললো জাফলং এর উদ্দেশ্যে । রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ । বাইরে প্রবল বৃষ্টি, জানালা দিয়ে গায়ে লাগছে বৃষ্টির ছাট । গাড়ি দুলছে রোলার কোস্টারের মত । ভেতরে আমরা, যেন এগিয়ে যাচ্ছি অজানার উদ্দেশ্যে । অজান্তেই মনে এলো পুরনো সেই গান - এই পথ যদি না শেষ হয়... তবে কেমন হত... তুমি বলতো !! হঠাৎ মনে হলো- জীবনটা আসলে একেবারে মন্দ নয় !!
জাফলং এ ভোর
এই বৃষ্টির মাঝে একটা হোটেল খুঁজে বের করলাম । মামার বাজার । বিদ্যুৎ নেই । বেশ ঠান্ডাও পড়েছে । এরমধ্যে রাত কাটিয়ে সকালে উঠেই পায়ে হেঁটে চলে গেলাম জাফলং এ । পাথর উত্তোলনের মহাযজ্ঞ চলছে সেখানে । সামনে এগিয়ে একটা নৌকা নিলাম । ওপারে গিয়ে ঘন্টাখানেক পরে ফিরে এলাম এপারে । ফ্রেশ মাছ ভাজা হচ্ছিল তীরের এক ছাপড়া হোটেলে । গরম ভাত, টাটকা মাছ ভাজা আর কাঁচামরিচ । ভোজনটা হলো অমৃত সমান । পরবর্তী গন্তব্য সারিঘাট- লালাখাল ।
জাফলং নদী ।
লালাখালে এক মধ্যাহ্ন !
সারি নদীর ঘাটে নেমে আমরা চললাম লালাখালে । বাহন – অটোরিক্সা । প্রবল বর্ষণে লালাখালের পানির স্বচ্ছতা অনেকাংশে কমে গেছে । লালাখাল আমাদের খুব একটা মুগ্ধ করতে পারলো না । এর আরেকটা কারণ হতে পারে- রাঙামাটি আর কাপ্তাইয়ের লেকে ঘুরে ঘুরে আমাদের নজরটা হয়ে উঠেছে নাকউঁচা । অতএব সময়ের বড় অংশটা কাটলো নাজিমগড় রিসোর্টে । ততক্ষণে দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল । আমাদের যেতে হবে আরো বহুদূর । গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি নেমেছে । আর বসে থাকা যায় না ।
লালাখাল ঘাট ।
গোয়াইন নদীর বুকে
সারিঘাট থেকে গেলাম গোয়াইনঘাটে । গন্তব্য রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট । সড়কপথে যাওয়া যায় । কিন্তু আমরা যাব নদীপথে । ঘাটে গিয়ে সৌভাগ্যক্রমে এক বিরাট ট্রলার ভাড়া পেলাম মাত্র ছয়শ টাকায় । মাত্র বলছি এ কারণে- প্রায় দুইশ জনের ধারণক্ষমতা সম্পন্ন এই ট্রলারের ভাড়া কমপক্ষে এক দেড় হাজার টাকা হবার কথা । কিন্তু মাঝি যাবে বাড়িতে- সোয়াম্প ফরেস্টের পাশেই । আর আমরা হলাম তাঁর ফিরতিপথের যাত্রী । তখন পড়ন্ত বিকেল । গোয়াইন নদীতে এগিয়ে চলেছে ট্রলার । বাইরে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি । কখনো কখনো তা রুপ নিচ্ছে মুষলধারায় । দুধারে বাড়িঘর । কাশবন । সবুজ তীর । কোথাও কোথাও ধানক্ষেত । কৃষকের কাঁধে ধান । খুঁটিতে বাঁধা গরু ভিজছে অবিরাম বর্ষণে । কিছু কিছু পাখি ফিরে যাচ্ছে নীড়ে । কতদিন দেখিনা নদী আর গ্রামের এই চিরায়ত দৃশ্য ! এতবড় নৌকায় মানুষ মাত্র পাঁচজন । দুজন মাঝি, আর আমরা তিন বন্ধু । নৌকার খোলা ছাদে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে দুচোখ ভরে দেখছিলাম তীরের মনোরম দৃশ্য । মনে হলো- কী দরকার ঢাকা চট্টগ্রামের ইট পাথরের মাঝে ফিরে যাওয়ার? এইখানে, কোন এক নদীর তীরে জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারলে কতইনা ভালো হত ! আহা ! জীবন এখানে কত সুন্দর !
গোয়াইন তীরের বসতবাড়ি ।
সোয়াম্প ফরেস্ট !
ঘন্টা দেড়েক লাগলো সোয়াম্প ফরেস্টে পৌঁছতে । বড় নৌকা ছেড়ে এবার নিতে হলো ছোট নৌকা । থই থই করছে পানি । গাছের অর্ধেকটা পানির নিচে । গাছ গাছালির ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ছোট নৌকা । অজান্তেই মুখ হতে বেরিয়ে আসে ! অসসাধারণ ! আলহামদুলিল্লাহ ! গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি তখনো পড়ছেই । এরইমধ্যে পৌঁছে গেলাম ওয়াচ টাওয়ারে । ওয়াচ টাওয়ারেরও অনেকটা ডুবে গেছে পানিতে । মাঝি বললো- এতটা পানি নাকি কখনো থাকে না । পশ্চিম আকাশে লালচে সূর্য, যতদূর চোখ যায় পানি, আর পানিতে কোমর ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছের সারি । মিঠাপানির এমন বন পৃথিবীতে খুব বেশি নেই । শেষবেলায় পাখির কিচিরমিচির । পুরো পরিবেশটা যেন একটা অপার্থিব রুপ ধারণ করেছে ।
রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট ।
ফেরাঃ
বনে তো আর থাকা যায় না ! অতএব ফিরতেই হবে । নৌকা বেরিয়ে এলো বাইরে । গোয়াইন নদীতে । একটা সরু রাস্তার ধারে নামলাম আমরা । তারপর সিএনজি ভাড়া করে সোজা সিলেট শহরের উদ্দেশ্যে । রাতে খেলাম পাঁচভাই রেস্টুরেন্টে । আম্বরখানা থেকে শুরু করে জিন্দাবাজার মুর্দাবাজার – জামতলা তালতলা জল্লার পার কল্লার পার-মেডিকেল কলেজ রিক্সায় করে এক চক্কর দিলাম । হোটেলে রাত কাটিয়ে পরদিন গেলাম শাহজালালের মাজার, শাহপরাণের মাজার, ঐতিহাসিক ক্বীন ব্রিজ। খাওয়া দাওয়া হলো নামকরা দুএকটি রেস্টুরেন্টে ।
ও হ্যা, বিছানাকান্দি আমরা যাই নি । কক্সবাজার সেন্টমার্টিনের প্রবাল দ্বীপ আর রাঙামাটি বান্দরবানের ছড়ায়-ঝর্ণায় ঘুরে বেড়ানো আমাদের কাছে বিছানাকান্দি খুব একটা আকর্ষণীয় কিছু মনে হয় নি । আর হামহাম যাবার মত সময় ছিলনা হাতে । ইচ্ছে ছিল ট্রেনেই ঢাকা ফিরবো । কিন্তু স্টেশনে গিয়ে দেখি সেদিনের কোন ট্রেন ঢাকা যাবে না । কী আর করা ! বাসের আসনে পিঠ এলিয়ে দিলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে । পেছনে পড়ে থাকলো সিলেট, মৌলভীবাজার । সাথে নিয়ে এলাম একরাশ সুখস্মৃতি ।
হাবিবুর রহমান একসময় নানারকম স্ট্যাটাস দিয়া ফেসবুক কাপাইতো। সমাজ
রাষ্ট্র ধর্ম সাহিত্য রাজনীতি সকল বিষয়ে ছিল তাহার একচ্ছত্র পদচারণা(পড়ুন-
আঙুল চালনা)। কেহই তাহার সাঁড়াশি আক্রমণ হইতে রেহাই পাইতো না। সমাজের সকল
অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে সে ছিল সোচ্চার কন্ঠ (পড়ুন- কীবোর্ড)। অতঃপর
কীভাবে যেন কী হয়ে গেল, তাহাকে আর কোথাও খুঁজিয়া পাওয়া যাচ্ছিলো না। কত
বিতর্কিত ইস্যু নিয়ে ফেসবুকে ঝড় বয়ে যায়, কিন্তু কোথাও তাহার জ্ঞানগর্ভ
মতামত পাওয়া যায় না। অবশেষে কৌতূহলী ফেসবুকারগন তাহার প্রোফাইলে ঢু মারিতে
বাধ্য হইলেন। তাহার সর্বশেষ আপডেট পাওয়া গেল কয়েক মাস আগেঃ "Got Married" :P:P #ফেসবুকারের_মহাপ্রয়াণ
কয়েকটা দিন এইখানেতে কাটিয়ে যাবো নিঃস্ব একা পথিক হয়ে- এইতো আমার ভবিষ্যতের মাস্টার প্ল্যান এই হচ্ছে এখন আমার, আকাশছোঁয়ার এম্বি-শান। কী করছি? কী খাচ্ছি? করছি কবে বিয়ে শাদী? হৃদয় জমিন, আর কতদিন, থাকবে এমন অনাবাদী? চাকরি বাকরি? পড়ালেখা? ডিগ্রী কিংবা ব্যবসাপাতি? কবে হবে বাড়ী- গাড়ি? টয়োটা বা ঘোড়া হাতি? রাতদুপুরে বসে বসে ঘরের দাওয়ায় প্রশ্নগুলো উড়িয়ে দিচ্ছি দখিন হাওয়ায় এসব এখন আমার কানে বিরক্তিকর কলের গান; কয়েকটা দিন এইখানেতে কাটিয়ে যাবো নিঃস্ব একা পথিক হয়ে- এটাই আমার ভবিষ্যতের মাস্টার প্ল্যান; এই হয়েছে এখন আমার, আকাশছোঁয়ার এম্বি- শান।
সকালবেলায় ব্যাগ এন্ড ব্যাগেজ নিয়ে বাড়িতে গিয়ে হাজির আশরাফ । হঠাত
আশরাফের এই গৃহ প্রত্যাগমনে তাহার মাতা খুশি হইলেও পিতা খুশি হইতে পারিলেন
না । তিনি গম্ভীর হইয়া শুধাইলেনঃ
-কিরে, এইভাবে হঠাত চইলা আইলি যে? কয়দিন পর না তোর পরীক্ষা?
-বাড়িওয়ালা এক সপ্তাহের মধ্যে বাসা ছাড়ার নোটিশ দিয়েছিল । আর নতুন কোন বাসাও ভাড়া পাই না । এখন কেউ 'ব্যাচেলর' রাখতে চায় না ।
-তাইলে এখন কী করবি?
-আমি আর কী করবো । তোমরাই চিন্তা কইরা দেখ কী করা যায় :):):)
ডাঃ রফিকের হাসপাতাল থেকে বের হবার কথা বেলা আড়াইটায়। এরপর তাঁকে ব্যাংকে যেতে হবে। জরুরী প্রয়োজনে টাকা ট্রান্সফার করতে হবে।
কিন্তু ঠিক বের হবার সময়টাতেই একসাথে তিনজন রোগী হাজির। এরমধ্যে দুজনের
অবস্থা খারাপ। অতএব তাঁর আর বের হওয়া হলো না। যখন বের হলেন তখন বেলা সাড়ে
তিনটা। ব্যাংকে গিয়ে পৌঁছলেন চারটার পর। তাঁকে বলা হলোঃ স্যরি, আজকের লেনদেন চারটায় বন্ধ হয়ে গেছে। এখন আপনার ট্রানজেকশনটি সম্ভব নয়। কাল একবার আসুন। ২। কিছুদিন আগের কথা। ডাঃ রফিক গিয়েছিলেন এক সরকারি অফিসে, তাঁর এক বন্ধুর কাছে।
কথা ছিল দুপুরে একসাথে লাঞ্চ করবেন। যখনই লাঞ্চ টাইম হলো, বন্ধুবর তার
সামনে বসে থাকা ব্যক্তিকে বসে থাকতে বলে সটান উঠে পড়লেন। টেবিলের ওপর ছড়ানো
ছিটানো অবস্থায় পড়ে থাকলো সকল কাগজপত্র।
সরকারি হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগ। খুব মনোযোগ দিয়ে ওয়ার্ডে তার
দায়িত্বভুক্ত রোগী দেখছেন ডাঃ করিম। আজকের দিনটা অনেক ব্যস্ততায় কাটবে।
কারণ, অনেক রোগী ভর্তি হয়েছেন গতকাল।
সবার হিস্ট্রি নেয়া, ফিজিকাল
এগজামিনেশান করা, ইনভেস্টিগাশান ও ট্রিটমেন্ট প্ল্যান করা, রোগীকে বুঝিয়ে
দেয়া- সব মিলে বেশ সময় সাপেক্ষ কাজ। আজকে পা ব্যথা হয়ে যাবে। একঘন্টা আগেই
শুরু করেছেন, কিন্তু এখনো অর্ধেক রোগী দেখা শেষ হয় নাই।
৩৯ নম্বর বেডের রোগীর হিস্ট্রি নেয়া শেষে চেস্ট অস্কালটেট করছিলেন ডাঃ করিম। কান থেকে স্টেথো নামিয়েই দেখলেন, একজন ভদ্রলোক পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। - এক্সকিউজ মি ডক্টর, একটা প্রশ্ন করতে পারি? ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন। -হ্যা, অবশ্যই। বলুন, কী জানতে চান? ডাঃ করিম ভাবলেন, নিশ্চয়ই ইনি এই রোগীর উদ্বিগ্ন স্বজন। হয়তো রোগীর অবস্থা সম্পর্কে জানতে চান। তারপর যে প্রশ্নটা তাঁকে করা হলো এর জন্য তিনি মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলেন। তিনি 'থ' হয়ে গেলেন। -ডক্টর, এখানে টয়লেট টা ঠিক কোন দিকে বলতে পারেন? প্রশ্ন শুনে মাথা ভোঁ করে উঠলো ডাঃ করিমের। অনেক কষ্টে মেজাজ সামলে তিনি উত্তর দিলেনঃ -অহ! টয়লেট! সেতো আপনার মাথায়!!
"আমি মৃত্যুদন্ডের পক্ষে না", এটা কোন যৌক্তিক কথা হতে পারে না। আপনার
মৃত্যুদন্ডের পক্ষে বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার কিছু নেই। আপনাকে ন্যায়বিচারের
পক্ষে অবস্থান নিতে হবে। কেউ যদি অন্য কোন নিরীহ নিরপরাধ মানুষকে হত্যা
করে, এটা যদি নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়, তাহলে আপনি কেন তার মৃত্যুদণ্ডের
পক্ষে থাকবেন না?
আপনি যদি ন্যায়বিচারের মাধ্যমে প্রমাণিত খুনি
অপরাধীর মৃত্যুদন্ড না দেন, তাহলে তো খুন হওয়া ব্যক্তির কোন স্বজন
প্রতিশোধপরায়ন হয়ে নিজেই খুন করতে উৎসাহিত হতে পারে। এভাবে সমাজে খুনোখুনি
একটা মামুলি বিষয়ে পরিণত হতে পারে।
মূল কথা হলো, আপনাকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আইনের আপ্তবাক্য স্মরণ
রাখতে হবে- হাজার অপরাধী ছাড়া পেয়ে যাক, কিন্তু একজনও নিরপরাধ ব্যক্তি যেন
কষ্ট না পায়। বেনেফিট অব ডাউট সবসময় অভিযুক্তের পক্ষে থাকতে হবে। তথ্য
যুক্তি সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে যদি কোন ব্যক্তির খুনী হওয়া নিঃসন্দেহে
প্রমাণিত হয়, তাহলে তার শাস্তি মৃত্যুদন্ড হওয়াই মানবতার দাবী। ন্যায়বিচার
ছাড়া কাউকে যদি এক মিনিটও শাস্তি দেয়া হয় সেটাও গ্রহণযোগ্য নয়। কাউকে যদি
ভুল বিচারে যাবজ্জীবন সাজা দেন, এই বেঁচে থাকায় তার কী লাভ? সাজার পরিমাণ বা রুপ বড় কথা নয়, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই বড় কথা।
এই অস্থির সময়ের কোপানলে হারিয়ে যাচ্ছে সব সুকুমার বৃত্তি। কোমল আবেগ। সাহিত্যে এখন শুধুই দ্রোহের কথা উঠে আসে; মনে হয়- প্রেম নয়, এখন শুধুই যেন দ্রোহের সময়।।
এখন সময় শুধুই প্রতিবাদ প্রতিরোধ আর ট্যাংকের সামনে এসে বুক তুলে দাঁড়াবার।
এই অস্থির সময়ের কোপানলে হারিয়ে যাচ্ছে মানবতা। মানবিক অনুভূতি। মনে হয়- আমিও হচ্ছি অমানুষ! আমারও চোখের তারায় ফুলের বদলে এখন ভেসে ওঠে নিহত শিশুর লাশ পাখির বদলে দেখি বোমারু বিমান আমারও কন্ঠে উঠে আসে কবিতার বদলে সব দৃপ্ত শ্লোগান। মনে হয়ঃ প্রেম নয়; এখন শুধুই যেন দ্রোহের সময়।। #অস্থির_সময়
নীলক্ষেত থেকে কিনেছিলাম নির্মলেন্দু গুণের "না প্রেমিক না বিপ্লবী"।
পুরনো বই। মলাট উল্টাতেই চোখে পড়লো মেয়েলি হাতের লেখা জন্মদিনের শুভেচ্ছা।
জীর্ণ যাহা কিছু, যাহা কিছু ক্ষীণ জীবনের মাঝে হোক তা বিলীন ধুয়ে যাক যত পুরনো মলিন নব আলোকের স্নানে.... (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
মালেকার জন্মদিনে- মিনা ০৪-০৮-৭২
বইটা কেনা হয়েছিল উদয়ন গ্রন্থ নিলয়, রাজশাহী থেকে। কে জানে আজ উদয়ন গ্রন্থ
নিলয় আছে কিনা! মালেকা কিংবা মিনা কেউ বেঁচে আছেন কিনা। কিন্তু বইটা আছে
আমার হাতে। এভাবেই সময় চলে যায়। এভাবেই জীবন চলে যায়।
গেন্ডারিয়ায় মসজিদ থেকে জোরজবরদস্তি করে মুসল্লিদের বের করে দেয়ার ঘটনায়
জড়িত পুলিশ সদস্যদের বরখাস্ত করে শাস্তির আওতায় আনা উচিত। তাদের শেখানো
উচিত, পুলিশিং মানেই বন্দুক দেখানো নয়।
গেন্ডারিয়ার সমস্যা ছিল একটা
সামাজিক সমস্যা, পুলিশি সমস্যা নয়। যদি ঐ জমি নিয়ে সত্যিই কোন বিরোধ বা
প্রশ্ন থেকে থাকে, যদি কেউ মসজিদ নিয়ে অভিযোগ করেও থাকে তার মানে এই নয় যে
বন্দুক দেখিয়ে মুসল্লিদের বের করে দিতে হবে। বরং এ নিয়ে আলাপ আলোচনা হতে
পারত। এলাকাবাসী, জনপ্রতিনিধি, সরকারী প্রতিনিধি সবাইকে নিয়ে বৈঠক করে সংলাপের মাধ্যমে এর সুষ্ঠু সমাধান বের করা যেত।
তা না করে এই সমস্যাকে একটা ফৌজদারি রুপ দেয়া হলো। সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক
সম্প্রীতি নষ্ট করা হলো। এর দায় অবশ্যই পুলিশকেই নিতে হবে। পুলিশের
উগ্রমূর্তি দেখে মনে হয় তারা নিজেদের সকল দন্ডমুন্ডের কর্তা ভেবে বসে আছে।
তারা সমাজের অন্য সকল সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তিকে অস্বীকার করছে। সব কিছুকে
যেন তারা বন্দুকের মাধ্যমে সমাধান করতে চায়।
সরকারের উচিত হবে ঐ ঘটনায় জড়িতদের বরখাস্ত করে শাস্তির আওতায় আনা। এই
উল্লুকদের হাত থেকে বন্দুক কেড়ে নিয়ে তাদের বুঝিয়ে দেয়া উচিত, বন্দুক
জনগনের টাকায় কেনা। আর পুলিশিং মানেই বন্দুক দেখানো নয়।
তোমরা আমায় হতাশাবাদী বলতেই পারো। যাই বলো- আজ আমি তোমাদের আশার বানী শোনাতে পারবো না। এখন আমি আর অপটিমিস্টিক নই। আমার দৃষ্টিশক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারো। যাই বলো, এই জমিনে আমি আর আশার আলো দেখি না। আগে যে স্বপ্নের কথা বলতাম? সে তো পুরনো কথা। এখন কী নিয়ে কাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখবো? প্রতিদিন খালে বিলে পড়ে থাকে তরুণ যুবাদের লাশ, উৎপাটিত স্বপ্নীল চোখ। এখানে এখন গুলির শিকার গর্ভের শিশুরাও। যেখানে শুকনো পাতার মত ঝরে যায় মানুষের প্রাণ- সেই জনপদে কী আশা, কী স্বপ্নের কথা আমি বলতে পারি? #এই_সময়
আরে বলিস কি? এতদিন হয়ে গেছে! মনে হয় এইতো সেদিনের কথা! ও নো! টাইম ইউ ওল্ড জিপসি ম্যান!
এভাবেই সময় চলে যায়। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের মনে হয়- সময়টা কত দীর্ঘ!
কোথাও বসে ঘড়িতে দুঘন্টা পেরোলেই মনে হয়- কতক্ষণ হয়ে গেলো! কষ্টে থাকলে
মনে হয়- আহ! কতকাল ধরে কষ্টে আছি! অথচ কোনকিছুই থেমে থাকেনা। একসময় কষ্টের
দিন ফুরিয়ে যায়, একসময় সুখের দিনও ফুরিয়ে যায়। তারপর সবকিছুকে মনে হয়-
এইতো সেদিনের কথা! ক'বছর আগে যাকে হামাগুড়ি দিতে দেখেছি, হঠাৎ তাকে কলেজের
ব্যাগ হাতে দেখে আমরাই আশ্চর্য হই। একি! তুই এত বড় হয়ে গেছিস!
কিন্তু আমরা নিজেদের পরিবর্তনটা খেয়াল করিনা। আমাদের বয়স বাড়ছে, আর সেইসাথে
কমে যাচ্ছে হায়াত। ফুরিয়ে আসছে এই পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াবার দিন। তারপর যখন
সত্যিই সব ফুরিয়ে যাবে, জীবনের শেষ দিনে কিংবা আখেরাতে যখন আমাদের জিজ্ঞেস
করা হবে দুনিয়ায় কতক্ষণ ছিলাম, আমরা বলবোঃ মাত্র একটা দিন ছিলাম পৃথিবীর
জীবনে... এক দিনের বেশি কোনভাবেই নয়....
পেশা বা সামাজিকতার প্রয়োজনে এখন মাঝে মাঝে হোটেলে ইফতার পার্টি আয়োজন
করতে হয় বা অংশ নিতে হয়। কিন্তু বড় বড় হোটেলে বসে এইসব কর্পোরেট ইফতার
মাহফিলে আদতে কোন তৃপ্তি নেই। এর চেয়ে গ্রামের মসজিদে ছোলা মুড়ির ইফতার
মাহফিল, হুজুরের সুরেলা কন্ঠের ওয়াজ, সমবেত দরুদ পাঠেই যেন আছে অন্তরের
যোগ। হৃদয় শীতলকারী উপাদান।
এইসব খরুচে ইফতার পার্টি না করে বরং এই
রমজান এবং ঈদে সত্যিকার গরীবের জন্য কিছু করা দরকার। পথশিশু, ছিন্নমূল
শিশুদের কাপড় কিনে দেয়া যেতে পারে । তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
সামর্থ
থাকলে কারো শিক্ষার দায়িত্ব নিন। কারো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিন।
নিজের জন্য বরাদ্দ থেকে কিছুটা ব্যয় করুন গরীবের জন্য। ঈদে নিজের জামা
জুতো কেনায় হয়তো অনেক খরচ করার প্ল্যান আছে। দুএকটা জামা কি দুঃস্থ কোন
শিশুকে কিনে দেয়া যায় না? নিজের নতুন জামায় শরীরে আরাম হয়, অন্তরে তৃপ্তি
কতটুকু? অন্যের গায়ে আপনার দেয়া নতুন জামা দেখে যতটা আনন্দ ও তৃপ্তি পাবেন,
তা আর কোথাও পাবেন না।
ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। এইটা একটা খুবই পাওয়ারফুল দোয়া,
খুবই শক্তিশালী রিমাইন্ডার। যখন কেউ মারা যান বা যখন কোন কিছু হারিয়ে
যায় অথবা অন্য কোন ক্ষতি বা বিপদ হয় তখন এই দোয়া পড়তে হয়। এর অর্থ
হচ্ছে- আমরা আল্লাহর কাছ থেকে এসেছি আর তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে।
এইটার
অভ্যন্তুরীণ অর্থটা যদি কেউ বুঝে ফেলে তাহলে কোন কিছু হারিয়ে, কোথাও কিছু
না পেয়ে বা কোথাও ঠকে গিয়ে, কোন বিপদেই সে খুব বেশি হতাশ হবে না। কারণ,
এই বাক্যটা স্মরণ করিয়ে দেয়- প্রকৃতপক্ষে সবকিছুই তো আল্লাহর।
যেখানে আমার নিজেকেই আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে, আমি নিজেই যখন যেকোন
মুহূর্তে নাই হয়ে যেতে পারি, সেখানে এইসব আপাত ক্ষতি কী আর এমন ক্ষতি!
নিশ্চয় এটা আল্লাহর ফয়সালা, আর আল্লাহর ফয়সালাই হলো সর্বোত্তম।
এভাবে এই ছোট্ট দোয়াটি আমাদের ভেতরটাকে চরম হতাশা, দুঃখ আর ক্ষোভ, ক্রোধ
থেকে রক্ষা করতে পারে, যদি আমরা এটার অর্থ বুঝে সময়মত স্মরণ করতে পারি।
-[সুরা বাকারার ১৫৫-৫৭ আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষকে ভয়, ক্ষুধা, প্রাণ ও
সম্পদের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করা হবে। যারা ধৈর্যধারণ করবে এবং এই কথা
(ইন্নালিল্লাহি...) বলবে/স্মরণ করবে, তাদের ওপর আল্লাহর অশেষ রহমত বর্ষিত
হবে।]
ছোট্ট শহরের এই নির্জন পথে অর্ধ চাঁদের আলোয় হাঁটতে হাঁটতে মায়া জন্মে যায় জীবনের প্রতি, পৃথিবীর প্রতি। আর এই দুটি চোখ- বড় অদ্ভুত, অদ্ভুত সুন্দর মনে হয়! মনে হয়, শুধু দুটি চোখেরই কৃতজ্ঞতায় স্রষ্টার পানে- আজীবন সিজদায় পড়ে থাকা যায় । #চোখ
নামাজের খুশু খুজু নিয়া বলার কিছু নাই। এইটা যার যার ব্যাপার। কিন্তু
একটা বেসিক বিষয় না বললে আর চলছে না। নামাজে অনেককেই দেখি ঠিকমত রুকু
সিজদা করেন না। মানে রুকুতে যান ঠিকই, কিন্তু সিজদায় যাবার আগে ঠিক সোজা
হয়ে দাঁড়ান না। আবার সিজদা করেন ঠিকই, কিন্তু দুই সিজদার মাঝে সোজা হয়ে
বসেন না।
নামাজের কিছু ফরয এবং ওয়াজিব আছে। এগুলো মিস করলে নামাজ
হয় না। ওয়াজিব ভুল হলে সিজদায়ে সাহু করতে হয়। রুকুর পর সোজা হয়ে
দাঁড়ানো এবং দুই সিজদার মাঝে সোজা হয়ে বসা, রুকু বা সিজদার সমান সময়
স্থির হওয়া (মিনিমাম তিন তাসবিহ পরিমাণ সময়) ওয়াজিব।
যারা রুকু
সিজদার পর কোমর সোজা করেন না, দয়া করে কোমর সোজা করুন। মাথা উঁচু করে
দাঁড়ান। আপনি মেরুদণ্ড সোজা না করলে কিন্তু আপনার নামাজেরও কোমর সোজা
থাকছে না। অর্থাৎ নামাজ শুদ্ধ হচ্ছে না।
দৃশ্যপট-১ঃ মোবাইলটা ক'দিন ধরেই 'ঝামেলা' করছে হাফিজ সাহেবের। ঠিকমত
কথা শোনা যায় না। কেমন ঘরর ঘরর করে। নাহ! এইভাবে আর চলে না। মোবাইল নিয়ে
তিনি গেলেন মেকানিকের কাছে। মেকানিক মোবাইলটা হাতে নিয়ে বললোঃ কী সমস্যা?
-ঠিকমত শোনা যায় না। ঘড়ঘড় ঘড়ঘড় করে। -পনেরশ টাকা লাগবে। -অত ক্যান? ৫০০ রাখেন। -তাইলে নিয়া যান। -আচ্ছা ঠিকাছে, এক হাজার রাইখেন!
মিনিট দশেক পরে এক হাজার টাকা দিয়ে হাসিমুখে মোবাইল হাতে নিয়ে ফিরছিলেন
হাফিজ সাহেব। পঞ্চাশ হাজার টাকা দামের মোবাইল তার। এক হাজার টাকায় আবার
ঠিকঠাক হয়ে গেল, মন্দ কী?
দৃশ্যপট-২ঃ কী অদ্ভুত সমস্যা হয়ে
গেল, মেজাজটা তিরিক্ষি হয়ে ওঠে হাফিজ সাহেবের। গতকাল থেকে কানের ভেতর ভোঁ
ভোঁ করছে। মাথাটাও মনে হয় সিলিং ফ্যানের মত ঘুরছে। নিজে নিজে ডাক্তারি করে
পাড়ার ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খেয়েছেন। কিন্তু লাভের লাভ কিছু হয়নি।
ডাক্তারের কাছে না গিয়ে বোধহয় আর থাকা যাচ্ছে না।
অবশেষে তিনি গেলেন
নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ ডাঃ শাহরিয়ারের কাছে। ডাক্তার তাকে বেশ কিছুক্ষণ
পরীক্ষা নিরীক্ষা করলেন। তারপর সমস্যাটা বুঝিয়ে দিয়ে ওষুধ ও পরামর্শ
দিলেন। হাফিজ সাহেবকে এ যাত্রায় ডাক্তারের কন্সালটেন্সি ফি হিসেবে পাঁচশ
টাকা গুনতে হলো। একে তো কান ভোঁ ভোঁ আর মাথা শো শো করছে, তার ওপর নগদ
পাঁচশ টাকা খসলো! চেম্বার থেকে বের হয়ে হাফিজ সাহেব বলেই ফেললেনঃ কসাই
একটা। পাঁচ-দশ মিনিট কথা বইলাই পাঁচশ টাকা রাইখা দিল। এরা জনগনকে জিম্মি
কইরা টাকা নিতাছে। আইন কইরা ডাক্তারের ফি দেড়শ টাকা নির্ধারণ করে দেয়া
উচিৎ!
দৃশ্যপট-৩ঃ 'আইন করে ডাক্তারের ফি নির্ধারণ করে দেয়া হবে' -সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
বাংলাদেশে একধরনের উন্নাসিক জনগোষ্ঠী সৃষ্টি হয়েছে, যারা মনে করে
হাসপাতালে এলে তাদের "মান" চলে যাবে। এরা মনে করে বাসায় ডাক্তার ডেকে
চিকিৎসা নেয়া হলো "আভিজাত্য"! অদ্ভুত মানিসকতা! এরা বাংলাদেশে থাকে,
খায়, তাতে মান যায় না। কিন্তু দেশের সরকারী হাসপাতালে গেলে তাদের আর
কিছু থাকে না, সব যেন ধুলায় মিশে যায়!
নিকট অতীতে এরকম অনেক
ঘটনায় সরকারী চিকিৎসকেরা শারীরিকভাবে আক্রান্ত হয়েছেন। কয়েকটি ক্ষেত্রে
ঘটনা ছিল এমনঃ চিকিৎসক যখন সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন
তাদেরকে ডেকে পাঠায় স্থানীয় সরকারদলীয়
নেতা। বউ অসুস্থ!!! অতএব, হাসপাতালের এমার্জেন্সি ছেড়ে, জনগনকে অরক্ষিত
রেখে বাসায় যেতে হবে নেতার বউকে চিকিৎসা দিতে ! অদ্ভুত দাবি! রোগীকে
হাসপাতালে আনতে বলায় ডাক্তারের হয়ে যায় ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ! অত:পর
সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে হাসপাতাল আক্রমণ!
আরেক দিন ঘটলো আরো অদ্ভুত ঘটনা! রোগী নাকি একজন বিচারক। রাতে তার খারাপ
বোধ হলে তিনি হাসপাতালে না গিয়ে বাসায় ডেকে পাঠালেন এমার্জেন্সির
ডাক্তারকে। বেচারা ডাক্তার সিভিল সার্জনের নির্দেশে গেলেনও। তারপর
অবস্থার প্রয়োজনে বিচারক মহোদয়াকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। কিন্তু
উপজেলার সরকারি হাসপাতালে তো এসি কেবিন নাই। অত:পর যা ঘটার তাই ঘটলো।
ডাক্তার ও ব্রাদার-নার্সের ওপর আক্রমণ!
ভাবা যায়? কীরকম অদ্ভুত
অরক্ষিত পরিবেশে কাজ করেন বাংলাদেশের ডাক্তাররা!! রাষ্ট্র কিন্তু এই
অপরাধীদের শাস্তির ব্যবস্থা করে নি। বরং রাষ্ট্র ধান্দায় আছে, আরো কী কী
নতুন উপায়ে ডাক্তারদের নাজেহাল করা যায়।
আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প। ভারতের নতুন মেগা প্রজেক্ট। ভারত ও বাংলাদেশের
যে অভিন্ন নদীগুলো আছে, সেগুলোর উজানে বাঁধ দিয়ে ভারত সেই পানি সরিয়ে
নেবে ভারতেরই অন্য জায়গায়।
বাংলাদেশের জন্য এইটা হলো "মরণ কামড়"।
ফারাক্কা আর গজলডোবা বাঁধের কারণে এমনিতেই পদ্মা এবং তিস্তা এখন ধু ধু
বালুচর। ইতোমধ্যেই মরে গেছে অনেক শাখা নদী। তিস্তা পদ্মাও এখন মৃতপ্রায়।
তার ওপর যদি এই আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একেবারেই পানিশুন্য হয়ে যাবে । নদীগুলো মরে যাবে। পানি থাকবে না, মাছ থাকবে না। নাব্যতার অভাবে ভেঙে পড়বে জলপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা।
আরো নিচে নেমে যাবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। ক্রমান্বয়ে মরুভূমি হয়ে যাবে দেশ।
পলিমাটির অভাবে কমে যাবে আমাদের মাটির উর্বরতা। সেচের পানির অভাবে খাদ্য
উৎপাদনে পিছিয়ে পড়বো আমরা। এভাবে একসময় দুর্ভিক্ষের শিকার হয়ে বেঘোরে
মারা পড়বে বাংলার মানুষ।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ভারত এভাবে
উজানে বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করতে পারে না। ভয়াবহ পরিকল্পনা নিয়ে
এগিয়ে যাচ্ছে তারা, অথচ আমাদের সরকার এখনো নির্বিকার। নির্বিকার আমাদের
জনগনও।
বাঙালি ভাই বেরাদর, সময় থাকতে জেগে ওঠ। নইলে কারবালার কাহিনীর মত পানির অভাবে মরার জন্য প্রস্তুত হও।
বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জে একটা বিশাল টাউট শ্রেণী তৈরি হয়েছে। এরা কোন
প্রোডাকটিভ কাজ না করে নানারকম টাউটগিরি ব্যবসা করে টাকা বানাচ্ছে। ধরুন
আপনার চৌদ্দপুরুষ শিক্ষিত, শিক্ষক-অধ্যাপক বা সৎ চাকরিজীবি ছিলেন। আপনি
নিজেও তাই এবং কোনমতে মোটামুটি স্বচ্ছল জীবনযাপন করছেন। বাবা-দাদার তৈরি
করে যাওয়া একটা পুরনো বাড়িতে থাকেন। অথবা ভাড়া বাড়িতে থাকেন। কিন্তু
এলাকার অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত ভবঘুরে লোকজন দেখবেন হঠাৎ অনেক টাকার মালিক
হয়ে যাচ্ছে। বাড়ি গাড়ি দাবড়ে বেড়াচ্ছে। এবং সবচেয়ে ভয়ংকর হলো, এরা
রাজনীতিতে জড়িয়ে ভদ্রলোকদের নির্বাসনে পাঠাচ্ছে। স্থানীয় সরকারের
মেম্বার চেয়ারম্যান কমিশনার মেয়র পদে নির্বাচন করে টাকা ও পেশির জোরে
ক্ষমতা দখল করছে টাউট নব্যধনীরা। এইভাবে দিনকে দিন সমাজটা টাউটদের
হাতে চলে যাচ্ছে। অলরেডি গেছে বলা যায়। সমাজে দয়ামায়া হীন একটা
ক্ষমতাশালী গোষ্ঠি তৈরি হচ্ছে। রাজনীতি এবং সমাজের পরিচালনা ভার চলে যাচ্ছে
টাউটদের হাতে।
বাসা অফিস রাস্তাঘাট দোকানে প্রচুর মানুষকে দেখি বসে বসে ক্রিকেট খেলা দেখছে।
কেউ নিজে খেললে তাও মেনে নেয়া যায়, কিন্তু ঘন্টার পর ঘন্টা শুয়ে বসে
খেলা দেখা মেনে নেয়া যায় না। এক দেড় ঘন্টার ফুটবল খেলা দেখাও হয়তো
সমর্থন করা যায়, কিন্তু ক্রিকেট? মিনিমাম একটা টি-টোয়েন্টি ম্যাচ দেখতে
বসলেও তো চার পাঁচ ঘন্টার ব্যাপার।
নিজে খেললে তবু শরীরের ব্যায়াম
হয়, যাদের সাথে খেলা হয় তাদের সাথে হৃদ্যতা বাড়ে। সামাজিকতা তৈরি হয়।
কিন্তু বসে বসে খেলা দেখে কী হয়? শরীরের ক্ষতি। সংসারের ক্ষতি। সমাজের ক্ষতি। রাষ্ট্র বা দেশেরও ক্ষতি হয়।
অনেকেই দেখি ঘন্টার পর ঘন্টা খেলা দেখছে। এমনকি কারো কারো তো 'নেশা' হয়ে
গেছে। ছাত্ররা ক্লাস মিস করছে, পড়ালেখায় ফাঁকি দিচ্ছে। কেউ কেউ অফিসের
কাজে ফাকি দিচ্ছে। আবার কাজের মাঝে মাঝে স্কোর দেখে মনোযোগ নষ্ট করছেন।
এভাবে আমাদের হাজার হাজার কর্মঘন্টা স্রেফ নষ্ট হচ্ছে। আপনি বসে বসে খেলা
দেখছেন, কিন্তু এর আর্থিক লাভ তুলছে টেলিভিশিন আর ফ্র্যাঞ্চাইজিরা।
আজ এই ওয়ার্ল্ড কাপ, কাল সেই ওয়ার্ল্ড কাপ, এরপর বিপিএল,তারপর পিসিএল,
তারপর এই লীগ সেই লীগ। সারা বছর খেলা চলছেই । বিরাট ব্যবসা ফেঁদে বসেছে
তারা। আর আপনি আমি হলাম সেই ব্যবসার ঘুটি।
আপনি নিজে অলস সময় কাটাচ্ছেন, টেরও পাচ্ছেন না, আপনার এই অলস সময়কেই কেউ কেউ টাকা বানানোর উপায় হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে।
সারাদিন বা ঘন্টার পর ঘন্টা খেলা দেখাকে কোন যুক্তিতেই ভালো বলার সুযোগ
নাই। ধর্মীয় দৃষ্টিতে এটা স্রেফ বেহুদা সময় নষ্ট। আর যেকোন বেহুদা কাজে
সময় নষ্ট করা চরম নিন্দনীয় ব্যাপার (সুরা মু'মিনুন)।
এটাকে কোন
সুস্থ বিনোদনও বলা যায় না। বিনোদন চাইলে বরং বই পড়ুন, অন্তত ভালো কোন
সিনেমা নাটক বা ডকুমেন্টারি দেখুন। পরিবারকে সময় দিন, বাচ্চাকাচ্চাকে
নিয়ে ঘুরতে যান। সামাজিক কাজ করুন। সবচেয়ে ভালো হয়, নিজেই খেলতে নেমে
যান। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেন, তাও ভালো। কিন্তু এইভাবে দিনের পর দিন,
ঘন্টার পর ঘন্টা খেলা দেখে আপনার প্রাণশক্তি এবং কর্মঘন্টা নষ্ট করবেন না।
শিক্ষক অবশ্যই শ্রদ্ধেয়। কিন্তু শিক্ষক যদি নিজেই তার মর্যাদা নষ্ট করেন
তাহলেও কি তাঁকে শ্রদ্ধা করার বাধ্যবাধকতা থাকে? পরিমল বাবুও একজন শিক্ষক
ছিলেন, তাঁকেও কি শ্রদ্ধা করা জরুরী?
নারায়ণগঞ্জে প্রধান শিক্ষককে
কান ধরে উঠবস করানোর ঘটনায় আমি এমপি সেলিম ওসমানকে সমর্থন করতে বাধ্য
হচ্ছি। বিবিসির রিপোর্ট অনুযায়ী, তিনি ঘটনার শুরুতে না, শেষে এসেছেন। তাকে
ডেকে আনা হয়েছে। তিনি জনগনের ক্ষোভ থেকে রক্ষা করার জন্য, বড় ধরণের সংঘাত
থেকে রক্ষা করার জন্য শিক্ষক শ্যামল কান্তিকে কান ধরাতে বাধ্য হয়েছেন।
একজন শিক্ষকের ক্লাসে শিক্ষার্থীরা হট্টগোল করছিল। সে ক্লাসের পাশ দিয়ে প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত যাচ্ছিলেন।
ছাত্র মৃদুলের বর্ণনায়, “হেড স্যার আইয়া ক্লাসের ভিতরে দাঁড়াইছে। তারপর
বলতাছে তোগো আর শিক্ষা হবে না। তোরা অনেক কথা বলছ। শিক্ষকদের কথা শুনছ না।
শুনবি কিভাবে? তোগো আল্লাহও নাপাক তোরাও নাপাক। ” (বিবিসি)
এটা কী
ধরনের কথা? ছাত্রদের হট্টগোল করার সাথে আল্লাহর সম্পর্ক কি? "তোগো আল্লাহও
নাপাক তোরাও নাপাক।” এইটা কী একজন প্রধান শিক্ষকের মন্তব্য হতে পারে?
ইসলাম, আল্লাহ, রাসুল, দাড়ি টুপি হিজাব নিকাব নিয়ে কটুক্তি করা এখন
অনেকেরই ফ্যাশন হয়ে গেছে। এটা চলতে দেয়ার সুযোগ নেই। এর ফলে দেশে সন্ত্রাস
বাড়ছে, অসহিষ্ণুতা বাড়ছে, অস্থিরতা বাড়ছে, উগ্রবাদীরা সুযোগ পাচ্ছে।
এটা হতে দেয়া যায় না। এটা সমর্থন করা যায় না।
রফিক সাহেব বিরোধী দলের কর্মী। তিনি বহুদিন ধরে বাড়িতে ঘুমান না। মাঝে
মাঝে এসে বাচ্চাদের দেখে যান। সবসময় মনে ভয়, যেকোন সময় গুম করে দেয়া হবে
তাকে। হয়তো কোন এক সকালে লাশ পড়ে থাকবে কোন এক ডোবার ধারে।
২/
নূরুদ্দিন সরকারি দলের যুববাহিনীর পাতিনেতা। নানামহলে যোগাযোগ আছে। নিজস্ব
একটা গ্রুপ মেইনটেইন করেন। তবু সবসময় মনে ভয়, অন্য গ্রুপের কে কখন গুলি করে
দেবে! এমনকি নিজের গ্রুপের কেউও যে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না তারও কোন
নিশ্চয়তা নেই।
৩/ ফজলুর রেহমান একজন নাস্তিক। আল্লাহ-ভগবান-ঈশ্বরে তার বিশ্বাস
নেই। তিনি মাঝে মাঝে ফেসবুক-ব্লগে নিজের মতামত প্রকাশ করেন। এখন তার ভয়ে
ঘুম হয় না। কোথাও হাটতে বের হলে চারিদিকে চোখ রাখেন। কে জানে, কখন যেন ঘাড়ে
চাপাতির কোপ এসে পড়ে! ৪/ মাওলানা শফিকুল ইসলাম মসজিদের ইমাম। তিনি
স্পষ্ট ভাষায় সমাজের অন্যায় অনাচারের বিরুদ্ধে কথা বলেন। জনগনকে নিয়ে
অনৈতিক আয়োজনের বিরোধিতা করেন। কিন্তু এখন তারও ভয় হয়। সবসময় মনে হয়, কখন
যেন সন্ত্রাসীদের গুলি এসে বুকে বিঁধবে। সবচেয়ে বেশি ভয় সাদা পোশাকধারী
সরকারের বাহিনীর লোকদেরকে। ৫/ শ্রী অরুন চন্দ্র মন্দিরের পুরোহিত।
এতটা কাল নিশ্চিন্তে ধর্মকর্ম করেছেন। কিন্তু আজকাল মনে ভয় ঢুকে গেছে। কার
রাজনীতির বলি হতে হয় তার ঠিক নেই। দেশে যেভাবে অসহিষ্ণুতা বাড়ছে, কে যে কখন
মন্দিরে হামলে পড়ে কে জানে!
কেউ ভালো নেই। আস্তিক নাস্তিক মাওলানা পুরোহিত পাদ্রী রাজনৈতিক কর্মী সবাই
ভীত। সবার দিন কাটে উদ্বেগ উৎকন্ঠায়। বাংলার মানুষের জীবনে এখন সবচেয়ে বড়
বাস্তবতা হলো 'ভয়'।
জোরজবরদস্তি, স্বৈরাচারী আর বিভক্তির রাজনীতি দেশকে আজ এক অদ্ভুত শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় নিয়ে এসেছে।
#This defines who we are!! আমরা খুনির লেজ দেখে তারপর বিচার চাওয়া বীর বাঙালি জনতা। আমাদের উৎসাহ পেয়েই নির্বিঘ্নে খুন করে চলে বর্বর খুনিরা। খুনিদের সহযোগী আমরাই।
১। হত্যার শিকার তনুর ফরেনসিক রিপোর্ট নিয়ে নাকি সন্দেহ
আছে। তাতে নাকি ধর্ষণের আলামত মেলেনি। আর এতে আমাদের জনগনের হায় হায় শুরু
হয়ে গেছে। অবস্থা দেখে মনে হয়, এতে করে বোধহয় বিচার দাবি অযৌক্তিক হয়ে
গেছে! যেন তারা হত্যা নয়, শুধু ধর্ষণের বিচার চায়! আরে ভাই, হত্যার আগে কি
"ধর্ষণ" হতেই হবে? এ আপনাদের কী ধরণের চিন্তাভাবনা? ধর্ষন হোক বা না হোক, খুন তো হয়েছে নাকি? খুনেরই বিচার হোক।
২। আমাদের বঙ্গসন্তানেরা হঠাৎ হঠাৎ প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। সবসময় না, ক্ষেত্রবিশেষে। আগুপিছু ভেবে তারপর তারা সিদ্ধান্ত নেয় কোন বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দেখাবে আর কোনটায় দেখাবে না।
তনু হত্যার বিচার দাবি জোরালো হবার কারণগুলি হলোঃ (ক) সে সাংস্কৃতিক সংগঠন
করতো। (খ) সে মাথা ঢাকতো। (গ) সে যথেষ্ট সুন্দরী ছিল। (ঘ) সে কলেজ ছাত্রী
ছিল। (ঙ) ঘটনাটা বিশেষ জায়গায় ঘটেছে। (চ) খুনি অজ্ঞাত। এইসব উপাদান না থাকায় অন্য অনেক ধর্ষিতা/নির্যাতিতাদের বিচার দাবি করে না আমাদের সমাজ। আমাদের জনগন।
ক'দিনের এই ভেজা মেঘ, আর ঝিরিঝিরি বৃষ্টির গান প্রমাণ করে দিয়ে গেছে আমাদের যতসব প্রাগৈতিহাসিক ভ্রান্ত ধারণা। প্রমাণ করে গেছে-চৈত্র মানেই খরার দাবদাহ নয়, চৌচির মাঠ নয়, ধুলিময় পথ নয় । চৈত্র মানেই নয় উতাল হাওয়ার সর্বনাশী ঝড়।
বাপ দাদার ভিটা মানুষ কখনো সহজে ছাড়ে না। ভিটা মানে শুধু জমি নয়, জমিতে
মিশে থাকে পিতার শরীরের ঘাম, মায়ের আঁচল। থাকে পূর্বপুরুষের কবর, শৈশবের
স্মৃতি। ভিটার একেকটা গাছও যেন একেকটা ইতিহাস। এই জমিন কে ছাড়বে? কেন
ছাড়বে? ছেড়ে কোথায় যাবে? ন্যায্যমূল্য (অবশ্যই তা হতে হবে স্বাভাবিকের চেয়ে
কয়েক গুন বেশি) পেলে তবু হয়তো ছেড়ে যেতে পারে। কিন্তু তা কখনো হয় না।
বেনিয়াদের টাকার অভাব নেই, কারখানা-বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করে তারা আরো টাকা
বানাবে, অথচ মানুষের বাপ দাদার ভিটার ন্যায্যমূল্য দেবে না। বিকল্প জমি,
বাড়ি, কর্মসংস্থানের কোন ব্যবস্থা না করেই বেনিয়ারা বুলডোজার নিয়ে হাজির হয়
মানুষের চৌদ্দপুরুষের ভিটায়। জমি অধিগ্রহনের নামে চলে ভিটামাটি হতে উচ্ছেদ
অভিযান। তারপরঃ সিঙুর, কানসাট, আড়িয়াল বিল কিংবা বাঁশখালি; সবখানে দেখা
যায় ঘটনার একই রুপ। বেনিয়াদের টাকার কাছে, লোভের কাছে পরাজিত হয় মানবতা।
রাজপথে প্রবাহিত হয়- গরীব মানুষের লাল রক্ত।
শুভ্র সকাল হতে জানালার পাট খুলে মেঘলা আকাশের পানে চেয়ে আছি । পুবের হাওয়া কতবার বলে গেল গোপন সংবাদঃ -'সে আসছে!' 'সে আসছে!' অথচ কী অদ্ভুত! সূর্য ঢলে গেল পশ্চিম পাটে তবু এখনো বৃষ্টির দেখা নেই। তবে কি এখন আমি আবার ভেজিয়ে দেবো জানালার পাটগুলো?
নির্বাসনে আছি তাই কবিতাকে দিয়েছি বিদায়। যোগী- সন্ন্যাসীর মুখে- সকলেই আশা করে- "ধর্মকথা"; কবিতাকে নয় । বিদায়লগ্নের অশ্রু ছাপিয়ে স্নেহভরে বলেছি তাকে - বৎস ! আবার যখন আমি ফিরে যাবো লোকালয়ে পাহাড় সমূদ্রের পথ হন্টন পরিশেষে চলে এসো তুমি কোন এক গোধূলী দুপুরে হাত রেখো পরিশুদ্ধ হৃদয়ের হাটখোলা দরজায়।
আমি স্তম্ভিত। হতবাক। ভাবতেও ভয় হয়, কীরকম অসভ্য অমানবিক সমাজে বাস করছি আমরা? ....
উত্তরার অগ্নিকান্ডের ঘটনায় দগ্ধ সুমাইয়া জানিয়েছেন, ঘটনার পরে শরীরে আগুন
নিয়ে সাত তলা থেকে নিচে নেমে আসার সময় কেউ তাদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে
নি। সুমাইয়া বলেন, "আমি আর সারলিনের আব্বু নাইমা আসছি। পিচ্চিটা কোলে।
দৌড়ায় নামছি আর চিৎকার করতেছি। আগুন জ্বলতেছে। ওইসময় ঘরে পুরা আগুন। তিন
নাম্বার ফ্লোর, চার নাম্বার ফ্লোর দরজা খুলছে। খুইলা আমাদের দেইখা দরজা
আটকায় দিছে। স্পষ্ট মনে আছে। দরজা খুইলা দেখে আগুন লাগা মানুষ নামতেছে আর দরজা আটকায় দেয়, কতটা অমানবিক চিন্তা করেন। তিনতলার মানুষটাতো একটু তোষক দিয়ে জড়ায় ধরতে পারতো। নাইলে একটা তোষকই যাইতো। আমার বাচ্চাগুলাতো বাঁচতো।”
নিচে নামতে নামতে সুমাইয়ার গায়ের কাপড় সম্পূর্ণ জ্বলে যায়। নিচে নেমে পরে
থাকা ছালার চট গায়ে জড়ান তিনি। সেই সময়টিতেও একটি চাদরও কেউ এগিয়ে দেননি।
সুমাইয়া বলেন, 'কত মানুষ, সবাই তাকায় রইছে। কেউ আগায় না। বলি কি একটা চাদর
দেন আমাদের গায়ে। আমি মহিলা মানুষ। আমার গায়ে একটা চাদর দেন। কেউ দেয় না।
বিল্ডিংয়ের মহিলারা কেউ দেয় না।'
সারলিন এবং জারিফও একা একা সাত তলা থেকে দৌড়ে নিচে নামে । তাদেরও সাহায্য করার জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি। ................... কী অদ্ভুত! অকল্পনীয়। ভাবা যায়? কতটা বর্বর আর অমানবিক হয়ে গেছি আমরা?
বাংলার বীর জনগন, জোরগলায় ফেসবুক ফাটিয়ে আওয়াজ তুলুন, ডাক্তারদের শুধু
গ্রামে গিয়ে থাকলেই হবে না। বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিতসা দিতে হবে। প্রয়োজনে পিঠ
পেতে দিতে হবে। জীবন দিতে হবে। খবরঃ উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতির
বাসায় গিয়ে চিকিৎসা দিতে রাজি না হওয়ায় নেতাকর্মীদের হামলায় তিনটি দাঁত
হারালেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসক। তেরখাদা থানা সূত্র
জানায়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিক্যাল অফিসার ডা. আবদুল্লাহ আল
মামুন রবিবার রাত ৯টার দিকে অফিসে দায়িত্বরত ছিলেন। এ সময় কয়েকজন লোক এসে
জানায়, উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এসএম ওহিদুজ্জামানের স্ত্রী অসুস্থ।এ
জন্য তাকে আওয়ামী লীগ সভাপতির বাসায় গিয়ে রোগীর চিকিৎসা করতে হবে। ডা.
মামুন এমার্জেন্সি বিভাগে ডিউটিরত থাকায় বাসায় যাওয়া সম্ভব নয় জানিয়ে অন্য
এক সহকারীকে আওয়ামী লীগ নেতার বাসায় পাঠান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে নেতা-কর্মীরা
হাসপাতালের ভেতরেই তাকে বেদমভাবে প্রহার করেন। এ সময় তাদের কিল-ঘুষিতে ডা.
মামুনের তিনটি দাঁত পড়ে যায়। ........ এদের সেবার জন্য আপনি ডাক্তারদের গ্রামে যেতে বলেন?
'এরপর কী?' এই এক প্রশ্নের ঘূর্ণিপাকেই কেটে যায় আমাদের ক্ষণিক এই মানব জীবন । সব সুখ, সব প্রেম, সব ঘটনার শেষে একটাই প্রশ্ন যেন তাড়িয়ে বেড়ায়- 'এরপর কী?'
হাঁটতে হাঁটতে যদি ফুরোয় সব পথ ব্ল্যাকহোল হতে যদি ফিরে আসে দূরবীন দৃষ্টি ফুরোয় যখন দিন গোধূলী আলোয় উত্থান পতন আর নাটকীয়তায় তখনও মনের মাঝে প্রশ্নটা ফিরে আসে 'এরপর কী?' #উদ্বেগ
কেউ যদি কখনো আমায় ভুলে যেতে চাও নির্বিঘ্নে নিশ্চিন্তে ভুলে যেও। আমি মহামানব নই, আমি কাজী নজরুল নই, আমি কখনো কবিতা লিখিনি কখনো করিনি গান, করিনি উচ্চারণঃ চিরতরে চলে যাবো দূরে; তবু আমারে দেবোনা ভুলিতে। ..... বলো, কে কারে মনে রাখে, স্বার্থের পৃথিবীতে? মাটিতে মিশে গেলে মাটির শরীর, কার কিবা আসে যায়- এইসব মনে রাখারাখিতে?
পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘপথ। অথচ আমি কিনা কয়েক কদমেই ক্লান্ত হয়ে গেছি! পথের হাওয়ায় উড়ে আসছে ধুলোর প্রবাহ; পাখিদের কাকলিতে শোনা যায় বালুঝড়ের পুর্বাভাস। তবে কি- আমাকে দাঁড়াতে হবে এখানেই? মুলতবি করতে হবে আগামীর পদযাত্রা? ..... গভীর হচ্ছে রাত, রাতের অন্ধকার বয়ে যাচ্ছে অবিরাম জীবনের স্রোত; সমাপ্তির পানে। কতকাল দাঁড়াবো আমি এখানে? কতযুগ কত শতাব্দী দাঁড়ালে তবে থেমে যাবে ঝড় ঝঞ্ঝা? আমি তো দাঁড়াতেই পারি, কিন্তু কে থামাবে সময়ের গতিধারা? কে থামিয়ে রাখবে সমাপ্তির পানে বয়ে চলা জীবনের স্রোত?
এই ভিড়ের মধ্যেও মেয়েটা এক প্রকার জোর করেই বাসে উঠে পড়লো । নারীদের
জন্য নির্ধারিত কোন সিট খালি ছিল না । দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই ।
কিন্তু তার সম্ভবত খুব জরুরি কোন কাজ আছে, যার কাছে এইসব ভিড়ভাট্টা কোন
ব্যাপার না ।
সারাদিন নানান কাজে দৌড়াদৌড়ি করে বেশ কাহিল হয়ে পড়েছিল
মুনির । বাসে উঠে কোনমতে একটা সিট পাওয়ায় আরামে চোখ বুজে আসছিল তার ।
কিন্তু একটা মেয়ে মানুষকে এই ধাক্কাধাক্কির মধ্যে দাঁড় করিয়ে রেখে আর বসে
থাকা সম্ভব নয় । সুতরাং সিটটা ছাড়তেই হলো তাকে । ‘এই যে আপু এখানে বসেন’ বলে উঠে দাঁড়ালো সে । মেয়েটাও কিছু না বলে টুপ করে বসে পড়লো ।
পেছন থেকে অবশ্য কেউ একজন মন্তব্য ছুঁড়তে ছাড়লো না । ‘বইবো ক্যান? মাইয়ারা
না সমানাধিকার চায়? অরাও দাড়ায়া যাইবো, এইডাই সমানাধিকার’!
ভাই
ভিত্রে যান, পেছনে খালি আছে । কন্ডাকটরের ক্রমাগত আহ্বান আর মানুষের
ঠেলাঠেলিতে ধীরে ধীরে বাসের একেবারে পেছনে ঠাঁই হয়েছিল মুনিরের । সারাটা পথ
দাঁড়িয়েই ছিল । তার ছেড়ে দেওয়া সিটটাও আর পুনর্দখল করার সুযোগ হয়নি । কখন
যে ওটা খালি হয়েছিল সে খেয়ালও রাখা হয়নি ।
বাসায় ফিরেই ব্যাগসহ বিছানায় লুটিয়ে পড়লো মুনির ।
মুনিরের মত একজন পুরোদস্তুর ব্যাচেলরের জীবনে এরকম সময়ে ফেসবুক একটা
গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী । পকেট থেকে মোবাইল বের করে ফেসবুকে লগইন করলো সে ।
আনমনে হোমপেজ স্ক্রল করতে করতে একজনের শেয়ার করা একটা পোস্টে চোখ আটকে গেল
তার । নামটা অপরিচিত, আগে কখনো চোখে পড়েছে বলে মনে হয় না । তবুও ক্লিক করে
পড়তে লাগলো।
''নীল নয়না 1 hour ago ‘হঠাৎ খবর পেলাম
দাদুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে । দাদু স্ট্রোক করেছেন । কোনকিছু মাথায়
আসছিল না । রাস্তায় নেমে দুএকটা সিএনজি ডাকলাম, কিন্তু কেউ যাবে না । সব
নবাবের পুত । প্রথম বাসটাতেই উঠে পড়লাম । খুব ভিড় ছিল, কিন্তু এছাড়া
আর উপায় কী? কেউ একজন আমাকে তার সিটটা ছেড়ে দিল । অজানা সেই মানুষটাকে একটা
ধন্যবাদও দেয়া হয়নি । হয়তো কোনদিন হবেও না । লোকটা হয়তো আমাকে অকৃতজ্ঞ
ভাবতে পারে । আমার নিজেরও কেমন অকৃতজ্ঞ বোধ হচ্ছে । ফেসবুকে একটা ধন্যবাদ
লিখে দিলে কি কিছুটা হালকা বোধ হবে? হতে পারে। তখনই কৃতজ্ঞতা না জানানোটা
ভুল হয়ে গেছে । ভালো কাজের অনুপ্রেরণা জোগানোর জন্য মানুষকে কৃতজ্ঞতা
জানাতে হয়’। Odvut prithibi and 11 others like this''
সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেললো হেলাল মিয়া । আজ হাসপাতালে যেতেই হবে । বেশ
কিছুদিন ধরেই শরীরটা কেমন ম্যাজ ম্যাজ করছিলো । আজকাল খুব দুর্বল লাগে তার ।
দু’একটা খেপ দিলেই হাঁপিয়ে উঠতে হয়। তবু কোনমতে চালিয়ে নিচ্ছিল এতদিন ।
কিন্তু আজ আর কোনভাবেই রিকশা নিয়ে বের হওয়া সম্ভব না । এই শরীরে রিকশা নিয়ে
বেরুলে আর ঘরে ফেরা হবে কিনা সন্দেহ । কোথায় মাথা ঘুরে পড়ে থাকবে কে জানে !
-‘কইগো হেনার মা, দেহ দেহি রফিক্যা আছে নি বাড়িত । আমারে এট্টু
ডাহা মেডিকেলত দিয়া আসবার ক-তো । আইজকা যাইতেই অইবো, এইবাভে আর থাহন যায়না’
।
মেঝেতে চট বিছিয়ে মেয়েকে পাশে বসিয়ে সরিষার তেল মাখা গরম ভাত
খায় হেলাল মিয়া । প্লেটের ওপর কাঁচামরিচ ও আলুভর্তা । আলুভর্তাটা ভালোই
বানায় হেনার মা । খেতে খেতে মেয়েকে আদর করে হেলাল । এরইমধ্যে রফিক মিয়ার
কন্ঠ শোনা যায় । -‘হেলাল বাই, রেডি অইছো নি? তাড়াতাড়ি খাইয়া লও । দেরি অইয়া যাইতাছে’।
এই বস্তির অনেকেই রিকশা চালায় । রফিক মিয়াও তাদের একজন । হেলাল মিয়ার পাশের ঘরেই থাকে ।
ঢাকা মেডিকেলের আউটডোর বিভাগের সামনে এসে নামে হেলাল মিয়া । রফিক তার
রিকশা নিয়ে চলে যায় অন্য দিকে । হেলাল মিয়া ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়
‘বহিঃবিভাগ’ গেটের দিকে ।
জীবনে কোনদিন এই হাসপাতালে আসেনি হেলাল
মিয়া । সে বুঝতে পারেনা কী করবে । আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো অনেকেই লাইনে
দাঁড়িয়ে টিকেট কিনছে । ‘এইহানেও টিকিট লাগে?’ ভাবতে ভাবতে লাইনে দাঁড়িয়ে
পড়ে সে । ‘বাই, টিহিট কত?’ সামনের জনকে জিজ্ঞেস করে হেলাল । ‘দশ টেহা’ ।
ঝাঁঝালো জবাব পায় সে । এই প্রশ্নের উত্তরে এত ঝাঁঝ দেখানোর কী আছে ভেবে
পায়না হেলাল ।
দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মাথা ঝিম ঝিম করে হেলালের । যখন
সে কাউন্টারের সামনে এসে পৌঁছে, ততক্ষণে আধা ঘন্টার বেশি পার হয়ে গেছে ।
সময়টা হয়তো আরও বেশিই হবে, কিন্তু হেলাল মিয়ার হাতে যেহেতু কোন ঘড়ি নেই,
তাই আন্দাজ করা আর ছাড়া কোন উপায় নেই তার । -‘টেহা বাইর করো মিয়া । সমুস্যাডা কী?’
বেশ ধমকের স্বরেই জানতে চায় কাউন্টারে বসা লোকটি । মিনমিন করে হেলাল
জানায়- তার ‘শইল্যে ব্যথা’, ‘মাথা গুরে’, ‘বুক দরফর করে’ । একটা ছোট্ট
কাগজে নাম ও নম্বর লিখে হেলালের হাতে দেয় লোকটি । বলে- ‘যাও, মেডিসিন
আউটডোরে চইল্যা যাও’ । -‘ঐ মিয়া, এত সুমায় লাগে ক্যা?’ তাড়া দেয় হেলালের পেছনে দাঁড়ানো মধ্যবয়স্ক লোকটিও ।
হেলাল মিয়া দুএকজনকে জিজ্ঞেস করে মেডিসিন আউটডোর চিনে নেয় । সেখানেও লাইনে
দাঁড়াতে হয় তাকে । প্রায় ঘন্টাখানেক অপেক্ষার পর সে ডাক্তারের সামনে গিয়ে
পৌঁছে । এর মধ্যে গেটে দাঁড়ানো লোকটি তাকে দু’তিনবার ধমকায়। ডাক্তার সাহেব
অবশ্য ভালো করেই দেখেন হেলালকে । তিনি কিছু ঔষধ লিখে দেন । আর বুকের
এক্সরে, রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করাতে বলেন । ডাক্তারের রুম হতে বেরুতে
বেরুতে হেলালের কানে আসে শ্লেষমাখা কন্ঠ- ‘ঐ মিয়া কী হইছে তুমার? এত সুমায়
লাগাইলা ক্যান? আর হেই ডাক্তারে কিছু জানে নি? অতক্ষণ লাগে একজন রুগি
দেইখতে?’
সেই কাগজ নিয়ে হেলালকে যেতে হয় অন্য একটি রুমে । সেখানে
তার নাম এবং স্লিপ নম্বর লিখে নতুন কয়েকটি কাগজ ধরিয়ে দেয় একজন নার্স ।
তারপর ঐসব কাগজ নিয়ে একে ওকে জিজ্ঞেস করে অলিগলি পেরিয়ে ‘নিউ বিল্ডিং’ এ
পৌঁছায় হেলাল । সেখানে আবার লাইনে দাঁড়িয়ে ‘টাকা জমা’ দেয় সে । টাকা জমার
স্লিপ নিয়ে সে একে একে এক্সরে বিভাগে গিয়ে ‘বুকের ছবি’ ওঠায়, রক্তের নমুনা
দেয় অন্য আরেকটি রুমে, সেখান থেকে বেরিয়ে অন্য একটি রুমে গিয়ে প্রস্রাবের
নমুনা দেয় । প্রতিবারই তাকে গড়ে আধাঘন্টা থেকে একঘন্টা পর্যন্ত লাইনে
দাঁড়িয়ে থাকতে হয় । দারোয়ান ও টেকনিশিয়ানদের ধমক শুনতে হয় । সবখান থেকেই
একদিন পরে এসে রিপোর্ট সংগ্রহ করতে বলা হয় হেলালকে ।
হেলাল খেয়াল করে, রিপোর্ট সংগ্রহের লাইনটাও অত ছোট না ।
‘যুহর কি হইয়া আইলো নাকি?’ আকাশের দিকে তাকায় হেলাল । কিন্তু তার চোখ কংক্রিটের ছাদে বাধা পেয়ে ফিরে আসে ।
দুর্বল শরীর নিয়ে গেটে ফিরে আসে হেলাল মিয়া । রফিককে বলা আছে, যোহরের সময় সে গেটে থাকবে । হেলালকে বাড়িতে পৌঁছে দেবে ।
এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে পা ব্যথা হয়ে গেছে হেলালের । ডাক্তারের সামনে কয়েক
মিনিট ছাড়া আর কোথাও বসার সুযোগ হয়নি তার । এখন মনে হয় ‘মাথাটাও ঘুরছে’।
কোনরকমে গেটে পৌঁছে ফুটপাতের ওপর দাঁড়ায় হেলাল । তার চোখ খুঁজে ফেরে রফিক
মিয়াকে । ‘ঐ তো , ঐতো রফিক আইছে’। মনে মনে খুশি হয় হেলাল মিয়া । কিন্তু
রফিকের উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই হঠাৎ চোখ অন্ধকার হয়ে আসে তার। জ্ঞান হারানোর
আগে একবার রফিকের কন্ঠ কানে আসে- হেলাল বাই, কী অইছে হেলাল বাই? এমুন করতাছ
ক্যান? হেলাল বাই, এমুন করতাছ ক্যান?
কাউকে নিরুৎসাহিত করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয় । শীতবস্ত্র বিতরন অবশ্যই ভালো
কাজ, সন্দেহ নেই । কিন্তু প্রতিবছর ঠিক যে প্রক্রিয়ায় ঘটা করে শীতবস্ত্র
বিতরনের মহোৎসব হয়, সেই প্রক্রিয়াটি নিয়েই আমার কিঞ্চিৎ ভিন্নমত ।
প্রশ্নটা হচ্ছে, এইযে প্রতিবছর এত এত শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়, শীতার্ত
মানুষ কি আসলে কমে? যারা শীতবস্ত্র বিতরন করেছেন, তাঁরা কি কেউ নিশ্চিত করে
বলতে পারেন, তাঁর দেয়া কাপড়টা সত্যিই গ্রহীতার কষ্টলাঘব করেছে কিনা? পুরো একটি পরিবারের সবার শীত-কষ্ট দূর হয়েছে কিনা? নাকি ব্যাপারটা আসলে এমন- সবাই শীতের কাপড় বিলায়, কিন্তু কেউ শীতমুক্ত হয় না !
শীতবস্ত্র বিতরন যেমন ভালো কাজ, তেমনি আত্মতৃপ্তির উপায়ও বটে ! বেশকিছু
শীতবস্ত্র বিতরন করলে অন্তত এই আত্মতৃপ্তিটা আসে- গরীব দুঃখী মানুষের জন্য
কিছুটা হলেও ভালো কাজ করলাম ! আর দূর-দূরান্তে গিয়ে শীতবস্ত্র বিতরন করে
আসার মধ্যে একটা এডভেঞ্চারও থাকে ! মনে আছে, মানুষের কষ্ট লাঘবের
নেক-নিয়তেই এক রাতের বেলা রেলস্টেশনে পথশিশু- ভিক্ষুকদের মাঝে শীতবস্ত্র
দিতে বেড়িয়েছিলাম । কাজটা ভালো ছিল, নিয়তও সহি ছিল , রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে
ফুটপাতে-প্লাটফর্মে ঘুমানো মানুষের মাঝে কম্বল তুলে দেয়ার মাঝে একটা
এডভেঞ্চারও ছিল । কিন্তু তা দিয়ে কার কতটুকু শীতলাঘব হয়েছিল তা আমার জানা
হয়নি । সকাল হতে না হতেই কম্বলখানি কে-কে বিক্রি করে দিয়েছিল সে খবরও জানা হয়নি ।
আপনি কি সত্যিই মানুষের কল্যাণ, মানুষের কষ্ট দূর করতে চান? নাকি একটা
শীতবস্ত্র বিতরনের এডভেঞ্চার নিতে চান? নাকি ‘মানুষের জন্য কিছু করলাম’
ভেবে কিছুটা আত্মতৃপ্তি পেতে চান? যদি প্রথমটি হয়, তাহলে আমি অনুরোধ করবো,
এলোপাথারি শীতবস্ত্র ছড়াবেন না । এবছর রাস্তার ছেলেদের, পরেরবছর
রেলস্টেশনে, তারপর এই বস্তিতে,আর তারপর সেই গ্রামে, এরকম বিক্ষিপ্তভাবে
শীতবস্ত্র দিয়ে কোন লাভ নেই । বরং আপনি বা আপনার গ্রুপ টার্গেট করুন একটা
নির্দিষ্ট গ্রামকে । ঐ গ্রামে কার কার আসলেই শীতবস্ত্র প্রয়োজন যথাসম্ভব
হিসাব করে নিন । তারপর লিস্ট ধরে সবাইকে কাপড়-কম্বল দিন । এককভাবে সামর্থে
না কুলালে অন্য কোন গ্রুপকে আপনার সাথে নিন বা আপনিই অন্য কোন গ্রুপের সাথে
যোগ দিন । টার্গেট থাকুক, অন্তত ঐ একটি গ্রামের মানুষকে আপনারা শীতের কষ্ট
থেকে সত্যিকারার্থে মুক্তি দেবেন । এবং পরেরবছরও আগে ঐ গ্রামের মানুষের
খোঁজ নিবেন । তারপর অন্যদিকে নজর দিবেন । আর শুধু শীতবস্ত্র দিয়েই শেষ নয়,
যাদেরকে দেয়া হবে তাদেরকে এই মোটিভেশনও দেয়ার চেষ্টা করুন- তারা যেন এসব
কাপড়-কম্বল বিক্রি না করে ।
ভালো কাজগুলো বিফলে না যাক, আমাদের
কষ্টগুলো সত্যিকাররার্থেই মানুষের কল্যানে কাজে লাগুক । যারা সত্যিই গরীব
মানুষের কষ্টে ব্যথিত হন, তাঁদের জন্য রইলো শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন ।
অনেক তো পেরুলো সময় ! অনেক অনেক দিন, সাদাকালো রাত, দুপুর, বিকেল । অনেক সূর্যাস্ত হলো পশ্চিম আকাশে অসংখ্যবার ফিকে হয়ে এলো গোধূলীর রঙ ।
এখন কি এসেছে সময় নিজেকে শুধাবার? কতদূর হাঁটা হলো? কতযুগ সময়ের পরে, কতটুকু চেনা হলো পৃথিবীর পথ? কতটা জমিন, কতটুকু মন, আর কতজন মানুষের প্রতি- জন্মালো অধিকার?
আমি সরকারি কর্মচারি নই, চিকিৎসক হিসেবে সরকারি চাকরি করা ঠিক হবে কিনা
তা নিয়ে প্রায়শই দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে 'না' এর
পাল্লাটাই ভারী থাকে । কিন্তু সরকারি কর্মচারিদের জন্য ঘোষিত নতুন পে স্কেল
আমাকে আরো বেশি নেতিবাচক ভাবনায় ফেলে দিয়েছে । নতুন পে স্কেল নিয়ে
সিনিয়র চিকিৎসকদের হতাশা উদ্বেগের বিষয় । একজন চিকিৎসক লিখেছেনঃ '১৩ বছর
চাকরি করে আমি এখন ৭ম গ্রেডে, আর প্রশাসন পুলিশ পররাষ্ট্র ক্যাডারে আমার
ব্যাচমেটরা ৪র্থ গ্রেডে । চিকিৎসক হিসেবে এই অপমান সহ্য করা যায়না । হয়তো সরকারি চাকরি ছেড়েই দিতে হবে !'
সত্যিই অদ্ভুত ব্যাপার । একই বিসিএস এ উত্তীর্ণ হয়ে, একই পরিমাণ সময়
সার্ভিস দিয়েও টেকনিকাল ক্যাডাররা তিন গ্রেড পেছনে কেন? কারা এই মূল্যায়ন
করলো ? এর অর্থ কি এটাই যে প্রশাসন ক্যাডার বা পুলিশ ক্যাডার সরকারের জন্য
অপরিহার্য? বাকিরা অপশনাল ? তারা হুকুমের গোলাম মাত্র?
এই
অবমূল্যায়ন যে বার্তা জানান দিলো তা দেশের জন্য খুব খারাপ । এমনিতেই
প্রতিবছর শতশত ডাক্তার সরকারি চাকরি ছেড়ে চলে যান । আগামীতে এই হার
নিশ্চিতভাবেই বাড়বে । দেশের মানুষের জন্য এটা কোন ভালো সংবাদ নয় ।
'ভাইজান, কয়ডা টাহা দ্যান। সকাল থাইকা কিছু খাই নাই। বাচ্চা দুইডারেও কিছু খাওয়াইতে পারি নাই।' আজিজ সুপার মার্কেটের সামনে মোড় ঘুরতেই এক মহিলার কন্ঠ কানে আসে নাবিলের। মহিলার সাথে অল্প বয়সের দুটি বাচ্চা।
নাবিল দাঁড়াতেই মহিলা মুখ কাঁচুমাচু করে এগিয়ে আসে। বয়স ত্রিশের কোঠায় হবে বলে মনে হয়। রোগা নয়, শক্তসমর্থই। -কেন, খাননি কেন? আপনার স্বামী নেই? আপনি কোন কাজ করেন না? প্রশ্ন করে নাবিল।
-ভাইজান, হবিগঞ্জ থাইকা ঢাকা আসছি কাজকামের খোঁজে। কোন কাম জোগাড় করবার
পারি নাই। অহন ফিরা যামু তারও কোন ব্যবস্থা নাই। একটা টেহা নাই হাতে।
নামকরা রেস্টুরেন্টে বন্ধুদের সাথে বুফে ডিনার সেরে বাসায় ফিরছিল নাবিল।
কোন কোন আইটেম অসাম লেগেছে আর কোনটা একটু খারাপ হয়েছে তা নিয়েই ভাবছিল সে।
এমন সময়ে এরকম অনাহারি মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে অপরাধী মনে হলো তার ।
আবেগে আপ্লুত হয়ে গেল সে। আহা! আমি একবেলা খাবারের জন্য হাজার টাকা খরচ
করলাম! কত কিছু খেলাম। অথচ এই মহিলা সকাল থেকে না খেয়ে আছে! আর বাচ্চা
দুটো! আহা! না খেয়ে কী কষ্টই না হয়েছে বাচ্চা দুটির।
'আসেন মা,
আমার সাথে আসেন। আমি আপনাদের খাওয়াবো। তারপর বাস স্ট্যান্ডে নিয়ে যাবো। আমি
নিজে টিকেট কেটে হবিগঞ্জের গাড়িতে উঠিয়ে দেবো'।
মহিলাকে তার পেছন
পেছন আসতে বলে হাঁটতে শুরু করে নাবিল। ভালো রেস্টুরেন্টেই খাওয়াবে সে
ওদেরকে। মহিলা অবশ্য একবার বলেছিল, ভাইজান, কিছু টাকা দেন। আমরা খাইয়া
নিমু। কিন্তু নাবিল আজকে অল্প কিছু টাকা দিয়েই তার দায় সারতে চায় না। সে
নিজে সাথে থেকে তাদেরকে খাওয়াতে চায়, নিরাপদে বাড়ি ফিরে যাবার সুব্যবস্থা
করে দিতে চায়।
আনমনা হয়ে হাঁটতে থাকে নাবিল । শাহবাগ মোড়ে ভালো কোন
খাবার দোকান নেই। কাঁটাবন বা হাতিরপুল এলাকায় দুএকটা ভালো রেস্তোরাঁ আছে।
মিনিট পাঁচেক হাটলে কোন একটায় পৌঁছানো যাবে।
ধীরেই হাটছিল সে।
রাস্তায় ভীড়ও তেমন নেই এখন। হাটতে হাটতে দেশের গরীব দুঃখী মানুষের জন্য কাজ
করার পরিকল্পনা করতে থাকে । এভাবে একজন দুজনকে একবেলা দুবেলা খাইয়ে কিছু
হবে না। দারিদ্র্যের মূলে কুঠারাঘাত করতে হবে। বৈষম্য রোধ করার ব্যবস্থা
করতে হবে। ধনীদের সম্পদ থেকে গরীবের হক আদায় করে নিতে হবে।
ভাবতে
ভাবতে 'চায়না কিচেন' রেস্তোরাঁর সামনে এসে দাঁড়ায় নাবিল । সবাইকে নিয়ে
ভেতরে ঢোকার জন্য পেছন ফিরে তাকায় সে। কিন্তু একী? কোথায় গেল মহিলা? এদিক
ওদিক ভালো করে নজর বুলায় সে । নাহ, কোথাও নেই। ওরা কি পেছনে রয়ে গেল? কাঁটাবন মোড় পর্যন্ত ফিরে এসে ভালো করে খুঁজলো সে। কিন্তু কোথাও তাদের আর কোন হদিস পাওয়া গেলনা।
বাসায় ফিরতে ফিরতে একটা প্রশ্ন চকিতে উদয় হলো নাবিলের মনে- মহিলা কি তাহলে মিথ্যা বলেছিল? আসলে সে একজন পেশাদার ভিক্ষুক?
‘বাবা একটু আসবেন, রোগীর খুব শ্বাসকষ্ট হইতাছে’ ।
চোখ তুলে
তাকালো মুনির । দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ । বেড নাম্বার তেত্রিশ,
মনে পড়লো মুনিরের । ঐ রোগীরই শ্বাসকষ্ট হবার কথা ।
হাসপাতালে নাইট
ডিউটিতে আছে ডাঃ মুনির । কয়েক মিনিট হলো, সবগুলো রোগী দেখা শেষ করে ডক্টরস
রুমে এসে বসেছে । এরই মধ্যে বৃদ্ধ চলে এসেছেন ডক্টরস রুমের দরজায় ।
বৃদ্ধের স্ত্রীই তেত্রিশ নম্বর বেডের রোগী । মায়মুনা বেগম । অনেকক্ষণ
ধরেই শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল তাঁর । মুনির এসে কিছু জরুরি ব্যবস্থা নেয়ায়
শ্বাসকষ্ট কমেছিল কিছুটা । কিন্তু এরই মধ্যে আবার বেড়ে গেছে । রোগীর যা
অবস্থা, শেষমেষ হয়তো তাকে বাঁচানো যাবেনা । বাঁচানোর জন্য আরো কিছু চেষ্টা
করা যায়, কিন্তু সেটা এইখানে, সরকারি হাসপাতালের এই জেনারেল ওয়ার্ডে সম্ভব
নয় ।
বৃদ্ধের সাথে আবারো
রোগীর কাছে গেল মুনির । আরো একবার পরীক্ষা করে দেখে দায়িত্বরত নার্সকে নতুন
কিছু নির্দেশনা দিল । তারপর বৃদ্ধকে একপাশে ডেকে নিলো সে। ‘বাবা,
আপনাকে তো আমি আগেও বলেছি, আপনার রোগীর অবস্থা খুব খারাপ । তাঁর কিডনিতে
সমস্যা আছে, কিডনি ঠিকমত কাজ করছে না । ফুসফুসে জীবাণু সংক্রমণ হয়েছে,
পানি জমে গেছে । সেকারণে ঠিকমত শ্বাস নিতে পারছেন না । শরীরে অক্সিজেনের
ঘাটতি দেখা দিয়েছে । হার্টের ওপর চাপ বাড়ছে । যেকোন সময় হার্ট এটাক হতে
পারে । যেকোন কিছু ঘটে যেতে পারে । আইসিইউ তে নিতে পারলে শেষ চেষ্টা করা
যেতে পারে । কিন্তু এই হাসপাতালের আইসিইউ তে এই মুহূর্তে কোন বেড খালি নাই ।
আপনি কি অন্য কোথাও নিতে পারবেন?’ বৃদ্ধ কোন জবাব দিলেন না।
মুনির খেয়াল করলো, বৃদ্ধের চোখ ছলছল করছে । অদ্ভুত শুন্যতা সেখানে । মুখে
বলার প্রয়োজন নেই, কখনো কখনো চোখের ভাষাই সব বলে দেয় । বুঝে ফেললো মুনির,
এখানেই যা হবার হবে, এর চেয়ে বেশি কিছু করার সামর্থ বৃদ্ধের নেই ।
সুযোগ-সামর্থের মধ্যে যা করার আছে, সবকিছু করে ডিউটি রুমের দিকে পা বাড়ালো
মুনির । একবার পেছন ফিরে দেখলো, বৃদ্ধ গিয়ে বসেছেন স্ত্রীর বিছানায় ।
আবেগের একটা তরঙ্গ যেন ছুঁয়ে গেল মুনিরকেও । 'বৃদ্ধ' ! আমরা কত সহজেই
শব্দটা উচ্চারণ করি! অথচ একদিনে কেউ বৃদ্ধ হয়না, হওয়া যায়না। বৃদ্ধ হতে
হলে পৃথিবীর মাটিতে একটা সম্পূর্ণ জীবন কাটিয়ে দিতে হয়।
তেত্রিশ
নম্বর বেডে বসে থাকা এই দু’জন মানুষ কতবছর একসাথে কাটিয়েছেন কে জানে !
কয়েক যুগ তো হবেই । অথচ কী অদ্ভুত! আজ রাতেই হয়তো চিরবিচ্ছেদ হয়ে যাবে
দু’জনের মধ্যে । একজন চিরতরে হারিয়ে যাবে পৃথিবী থেকে, আরেকজন অপেক্ষা করবে
এমনই কোন দিনের । এমনই কোন রাতের । আর কখনো এই দুজনের দেখা হবে কিনা, কেউ
জানে না । মুনির ভাবলো, এই মুহূর্তে বৃদ্ধের যে অনুভূতি, পৃথিবীর কোন কবি কিংবা কোন ঔপন্যাসিক কি কখনো তা বর্ণনায় তুলে আনতে পারবে?
বুক থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো মুনিরের । এরকম সময়ে নিজেকে খুব অসহায় লাগে তার । নিজেকে পরাজিত মনে হয়, ব্যর্থ মনে হয়।
মানুষের 'ডেথ সার্টিফিকেট' লেখা কোন সহজ কাজ নয়। কিন্তু এটাও সত্য, মানুষ
অমর নয়। মৃত্যুকে ঠেকানো যায় না। প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ
করতে হবে।
ডক্টরস রুমের পুরনো কাঠের চেয়ারটিতে বসে নিজেকে সান্ত্বনা দেয় মুনির- ‘আমরা রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারি; মৃত্যু নয়’।
দিন রাত জোছনা সবকিছু একাকার হয়ে আছে এই শহরের বহুতল ভবনের কার্নিশে। ফলস সিলিং এর ভেতর নিরন্তর জ্বলে আছে নিয়নের সাদা আলো; আর আমি নির্বিকার বসে আছি এইখানে, নির্লিপ্ত হৃদয়ে।
মনে হয় অনন্তকাল পেরিয়ে গেছে! কে জানে, জানালার বাইরে পৃথিবীটা আছে কিনা আগের মত! এ পৃথিবীতে আজও কি ভোর হয় সূর্যের লালচে আলোয়? এখনো কি বিকেল নামে নীড়ে ফেরা পাখিদের কোলাহলে? ... ফুটপাত জুড়ে অগনিত মানুষের সারি। তবু অদ্ভুত নির্জনতা বোধ হয় এঘরের কাঁচের জানালায় দেয়ালের এইপাশে । মাথার ওপর- অবিরাম ঘূর্ণায়মান বৈদ্যুতিক পাখার শো শো আওয়াজ যেন জানিয়ে দিচ্ছে এই সময়ের আন্তরিক আহ্বানঃ বদ্ধ প্রকোষ্ঠ ছেড়ে পথে নামতে হবে, হে পুরনো যোদ্ধা! আরো একবার নামতে হবে ধুলো ওড়া পুরনো মেঠোপথে ।
আসন্ন শীতের ঠান্ডা বাতাস গায়ে মেখে হিমায়িত করে নেবো আমার সমগ্র অস্তিত্ব হৃদয়, শরীর ও মন । আমি এক আজন্ম যোদ্ধা, তবু সবাইকে টপকে যাবার অশুভ যুদ্ধ হতে এবার অবসরে যাবো আমি; কারবালাফেরত বৃদ্ধ সৈনিকের মত। . রণভেরির অদ্ভুত আওয়াজ, ধুলোর কুয়াশার ভেতর- ঢাল তলোয়ার নিয়ে দিনভর অস্থির চলাচল, আর কত? এইসব যুদ্ধের তো শেষ বলে কিছু নেই! এইসব যুদ্ধে তো স্থায়ী বিজয় নেই! এখানে জয় পরাজয় আসে পালাক্রমে; দিনের পরে রাত গ্রীষ্মের পরে বর্ষার মত। . অসংখ্য যুদ্ধের স্মৃতি, বিজয়ের সুখ, আর পরাজয়ের তীব্র বেদনা বুকে নিয়ে অবসরে চলে যাবো আমি এই শীতে।
এইসব হেমন্তের ভোরে প্রতিটি সূর্যোদয় নিয়ে আসে ভিন্ন রঙের নতুন দিগন্ত আর আমিও নিজেকে জড়াই নিত্যনতুন মোহ মরীচিকায়। নির্বোধ পতংগের মত যতটা উজ্জ্বলতা দেখে ছুটে যাই- তার চেয়ে বেশি উত্তাপ গায়ে মেখে পোড়া শরীর নিয়ে ফিরে আসি। . এইভাবে, রূঢ় বাস্তবতার সোনালী আভায় কুয়াশার মত কেটে গেছে অগুণতি মোহের আবরণ। রেখে গেছে ক্ষতচিহ্ন; সংশয়, দ্বিধা, দ্বন্দ্ব। প্রতিটি পদক্ষেপেই এখন 'সন্দেহ' জেগে ওঠে - আমি কি এখনো মোহাবিষ্ট হয়ে আছি? কিংবা যে পথে বাড়িয়েছি পা তারও মঞ্জিল কি কোন এক ঝিলমিল মরীচিকায়?
মহাবিরক্ত হয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন রহমত সাহেব । ব্যাংকের কাজ শেষ
করে বের হতে আজ আটটা পেরিয়ে গেছে । ব্যাংকারদের জীবনের এই দিকটা রহমত
সাহেবের কাছে এখন অসহ্য লাগে । সকাল হতে সন্ধ্যা, বলা চলে রাত পর্যন্ত একটা
জায়গায় প্রতিদিন একই কাজ করে যেতে হয় । দিনের আলো চোখে দেখা হয়না ।
এই যেমন আজ সাড়ে আটটা বেজে গেল অফিস থেকে বের হতে হতে । তারপরও শান্তি নেই ।
বাসায় ফেরা মানে আরেক যুদ্ধ । কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, কোনো বাসে উঠতে
পারছেন না । দুএকবার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু বাসের দরজার হ্যান্ডেল ধরারও সুযোগ হয়নি । মানুষজনের ওপর তিনি ক্ষুব্ধ । একটু চেপেটেপে দাঁড়ানো যায়না? তাহলে তো আরো দু-একজন উঠতে পারে !
বিরক্তির শেষ সীমায় পৌঁছে শেষমেষ একটা বাসে উঠতে পারলেন রহমত সাহেব ।
যথারীতি কন্ডাকটরের চিৎকার কানে আসতে লাগলো। ‘মামা একটু চাইপা খাড়ান, পেছনে
খালি আছে । এ ভাই চাইপা খাড়ান না ক্যান?’
এমনিতেই তিরিক্ষি হয়ে
ছিল, কিন্তু এবার মেজাজটা একেবারে বিগড়ে গেল রহমত সাহেবের । তিনি গলা চড়িয়ে
বললেন- ‘ঐ ব্যাটা, তোগো পেট ভরে না? এত মানুষ তুলছস বাসের ভিত্রে, আর একটা
লোকও তুলবি না কইলাম!’ নানা কথায় আরো কিছুক্ষণ গজরাতে থাকলেন তিনি ।
[পরিশিষ্টঃ ঠিক সেই মুহূর্তে বাসের দরজায় ঠাঁই না পেয়ে ফিরে গেলেন আরো
একজন ক্লান্ত মানুষ । হয়তো তিনিও একজন অফিস ফেরত রহমত আলী...।]
নিরবচ্ছিন্ন খাদ্য সরবরাহ পেয়ে হৃষ্টপুষ্ট হয়ে ওঠা একপাল টাট্টু ঘোড়ার সাথে নেমেছি ঘোড়দৌড়ে; আমি এক অদ্ভুত রেসের ঘোড়া। জীর্ণশীর্ণ দেহ, চার পায়ে জড়ানো নানান শেকল তবুও ছুটছি, অথবা ভান করছি ছুটবার। . এই উদ্দাম রেসকোর্সে, বলা চলে ঝিনুক শামুকের মত গড়িয়ে গড়িয়ে এগিয়ে চলেছি আমি গন্তব্যের পানে। প্রশ্নটা হলো, এইভাবে কি কখনো হর্সরেস জেতা যায়?
অনেকদিন আগে বিটিভিতে একটা নাটক দেখেছিলাম। যতদূর মনে পড়ে নাটকের নাম
ছিল 'সাকিন'। নাটকে একজন জমিদারের তালুকে অন্য একজন উত্তরাধিকারী তার অংশ
দাবি করলে তাকে সুযোগ দেয়া হয়- সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যতদূর
পর্যন্ত দাগ দিতে পারবে, সবটুকু জমি তাকে দিয়ে দেয়া হবে। .
বেচারা পরদিন সূর্যোদয়ের পর থেকে দৌড়ানো শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দৌড়ায়।
সূর্য ডোবার সাথে সাথে তার দৌড়ানো শেষ হয়। কিন্তু সারাদিন দৌড়ের ধকল
সইতে না পেরে সে সেখানেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। সারাদিন দৌড়িয়ে যে
সম্পত্তি সে অর্জন করেছিলো তা তার কোন কাজে আসে না। .
বাস্তবে আমরাও যেন একইভাবে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দৌড়াচ্ছি। জন্মের
পর থেকে দৌড়াচ্ছি। হয়তো একসময় অনেক কিছু অর্জন হবে, কিন্তু ততদিনে আমাদের
অবস্থা হবে আব্দুল করিমের গানের মত- ইঞ্জিনে ময়লা জমেছে পার্টসগুলো ক্ষয় হয়েছে ডায়নামো বিকল হয়েছে হেডলাইট দুইটা জ্বলে না।।
তারপর একসময়, সূর্য ডুবে গেলে, শুন্য হাতে আমাদের চলে যেতে হবে অচিন জগতে। সারাজীবনের অর্জিত সম্পত্তি কোনই কাজে আসবে না। কোন মরীচিকার পেছনে কিসের নেশায় দৌড়াচ্ছি আমরা?
টাকার কাছে মেধার পরাজয় ঘটেছে, কেউ আপনার কাছে এমন একটা ঘটনার উদাহরণ চাইলে
আপনি এখন নির্দ্বিধায় বলে দিতে পারেন মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন
ফাঁসের কথা। অদ্ভুত আমাদের দেশ, অদ্ভুত আমাদের সরকার, অদ্ভুত আমরাও।
প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণ মেলে, জড়িত কালপ্রিটরা গ্রেপ্তার হয়, স্বীকারোক্তিও
পাওয়া যায়, লেকিন পরীক্ষা বাতিল হয় না! বরং তড়িঘড়ি করে ভর্তি প্রক্রিয়া
শুরু করা হয় !! এদিকে আমরা, মানে জনগন চুপচাপ দেখে যাই এইসব চুরিচামারি আর
কেনাবেচা!! . হা, দেশে এখন আর সত্যিকার কোন সরকারি মেডিকেল কলেজ
নেই, যেখানে বিনাখরচে/কমখরচে পড়া যায়। ডিএমসিতে ভর্তি হতে এখন মাথার ঘিলু
লাগেনা, ১২ লাখ টাকা লাগে। এর পজিটিভ দিকটা হলো- আগামীতে আর কেউ
ডাক্তার(!!)দের 'জনগনের টাকায় লেখাপড়া করা'র অপবাদ দিতে পারবে না!! কেউ
ওকথা বললেই ভবিষ্যতের ডাক্তার(!)রা খেঁকিয়ে উঠবে- ব্যাটা মুখ সামলে কথা
বলবি! ১৪ লাখ দিয়ে ডিএমসিতে ভর্তি হয়েছি। ট্যাকা কি তোর বাপে দিছিলো?? আর ভবিষ্যতে এই ইনভেস্টমেন্ট সুদে আসলে তুলবার জন্যে এরা যে ডাক্তার হবার পর কী করবে তা আল্লাহই ভালো জানেন!! . হা বংগদেশ! সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করনি।
সরকারি আমলাদের মধ্যে যাদের খায়েশ জেগেছে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার কৃষিবিদ
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সবার ওপরে ছড়ি ঘুরানোর, তারা কি এটাই চান যে ডাক্তার
ইঞ্জিনিয়াররা প্রফেশনাল ক্যাডারে না গিয়ে জেনারেল ক্যাডারে ঢুকে পড়ুক?
জনাব, তাহলে কিন্তু অবস্থা খুবই খারাপ হবে। এটা আমি নিশ্চিত করেই বলতে
পারি, পেশাজীবীরা পেশার প্রয়োজনে যে পরিমাণ লেখাপড়া করেন তার অর্ধেকও যদি
এইসব বিসিএস টিসিএস এর জন্য পড়েন তাহলেই কিন্তু আপনাদের খেল খতম হয়ে
যাবে। দেখবেন কয়েক বছরের মধ্যে জেনারেল ক্যাডারেও সব পোস্ট এরাই দখল
করে ফেলবে। (আমার পরিচিত যে কয়জন প্রফেশনাল ক্যাডার ছেড়ে জেনারেল
ক্যাডারের জন্য চেষ্টা করেছেন তারা কেউই বিফল হননি ।) বিকজ, এদের ভেতরে
আগুন আছে, তারা সে আগুনকে 'পোড়া'নোর চেয়ে 'গড়া'নোর কাজে ব্যবহার করতে চায়।
সেটা যদি তাদের সম্মানের সাথে করতে দেয়া না হয়, তাহলে আপনাদের গদি পোড়ানো
ছাড়া তাদের আর কীইবা করার থাকে? . সুতরাং সাধু সাবধান। গ্রেড-১,
গ্রেড-২ এবং শীর্ষপদগুলি কারো জন্য সংরক্ষিত না রেখে যার যার সেক্টর তাদের
নিজেদের ওপর ছেড়ে দিন। ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়, প্রতিযোগিতা হোক
সেক্টরভিত্তিক উন্নয়নের, প্রতিযোগিতা হোক দেশসেবার, প্রতিযোগিতা হোক
মানবসেবার।
দিনে দিনে বৃদ্ধ হয়ে উঠছে আমার কাব্যপিয়াসী মন । জীবনানন্দের কবিতা হতে সে আর আগের মত কাব্যরস নিংড়াতে পারেনা । এমন নয় যে তার রসবোধ কমে গেছে । কিংবা পুরনো হয়ে গেছে জীবনবাবুর কবিতা । বরং, আমার মনে হয় এখন সে আর শুধুই কল্পনায় সন্তুষ্ট নয় ! সে চায়- অক্ষরের জিঞ্জির হতে বেরিয়ে এসে একজন 'বনলতা' শ্রাবস্তীর কারুকার্যখচিত মুখ আর পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে জিজ্ঞেস করুক, "এতদিন কোথায় ছিলেন?" - নাটোরের হতে হবে এমন কোন কথা নেই বনলতা 'সেন' হতে হবে এমন কোন কথা নেই হোক শুধু একজন নিপাট 'বনলতা'ই । নইলে, ওর পক্ষে কাব্যের সুধা আহরণ বোধহয় আর সম্ভব নয় !
কত পানকৌড়ি উড়ে গেছে কবে, সে হিসেবে আমার আর কাজ নেই। আমি শুধু চাই আজ মাথার ওপর দিয়ে অন্তত একটা পাতিহাস উড়ে যাক, দিগন্তের দিকে। যেন আমি একদৃষ্টে চেয়ে থাকতে পারি- উড়ালপংখির গমনপথে। . জানো বেহুলা, বহুদিন হয়ে গেছে বহুযুগ- আমি একটিবার বিস্ময়ে অভিভূত হইনি। নিরাবেগ পাষাণের মত বেঁচে থেকে এতকাল পরে এই ভয়ে রাতভর তড়পাচ্ছি এখন, আমি কি হারিয়ে ফেলেছি মনুষ্য হৃদয়? বেহুলা, তুমি কি এতটুকু নিশ্চিত করে একবার বলতে পারো আমার হৃদয়বৃত্তিতে আজও কোন হেরফের হয়নি?
শুধু এবারের ঘটনার প্রতিকার নয়, ভবিষ্যতে প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করতে হলেও
প্রকাশিত ফল বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষা নেয়া জরুরি । যারা ১২-১৪ লাখ টাকা
দিয়ে প্রশ্ন কিনেছিল, পরীক্ষা বাতিল করলেই তাদের আক্কেল হবে । মাথায় হাত
উঠবে । কারা প্রশ্ন ফাঁসে জড়িত ছিল তাদেরকেও খুঁজতে হবেনা । প্রশ্ন
ক্রেতারাই বিক্রেতাদের ধরিয়ে দেবে । পরবর্তী বছরে বিক্রেতারা ক্রেতা
পাবে না । পরীক্ষা বাতিলের আশঙ্কায় ক্রেতারা এত টাকা খরচ করে প্রশ্ন কেনার
সাহস পাবে না । ফলে প্রশ্ন ফাঁস এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে । আর যদি তা না
করা হয়, তাহলে আগামীতে প্রশ্ন ফাঁসটাই ট্রেন্ড হয়ে যাবে । সবাই ভাববে, কই
কোন সমস্যা তো হয় না ! আমি নাহয় কিনছিনা, অন্য কেউ তো কিনছে ! .
মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী, মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের
মাননীয় পরিচালক, প্রশ্ন ফাঁসের যথেষ্ট প্রমাণ তো আপনারা পেয়েছেন । আর কত
প্রমাণ চান? ফল প্রকাশ করা হয়ে গেছে তাতে কিছু যায় আসে না । এখনো সময় আছে,
ভর্তির তারিখ ঘোষণা না করে নতুন করে পরীক্ষা নেয়ার ঘোষণা দিন । প্রকৃত
মেধার মূল্যায়নের ব্যবস্থা করুন । আপনাদের কাছে আমাদের আকুল আবেদন-
একগুঁয়েমি করে জাতির ভবিষ্যত সূর্যসন্তানদেরকে হতাশার আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ
করবেন না ।
অনেকের কথা শুনে মনে হচ্ছে, শিক্ষার পণ্যায়ন বোধহয় টিউশন ফি তে ভ্যাট
আরোপের মাধ্যমে এবারই প্রথম শুরু করা হলো । কিন্তু আসলে তো শিক্ষাকে পণ্য
হিসাবে গণ্য করা সেদিন থেকেই শুরু হয়েছে, যেদিন থেকে বেসরকারি
বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের নামে শিক্ষাকে বিক্রয়যোগ্য করা হয়েছে । .
জনগনের মৌলিক চাহিদা হিসেবে শিক্ষার ব্যবস্থা করা সরকারের দায়িত্ব ।
কিন্তু সরকার তা না করে শিক্ষার ভার তুলে দেয় ব্যবসায়ীদের হাতে । আর
ব্যবসায়ীরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে নতুন উদ্যমে শুরু করে
শিক্ষাব্যবসা । তারা ইচ্ছামত টিউশন ফি
নির্ধারণ করে, এই সেই নানান খাত দেখিয়ে নানাভাবে শিক্ষার্থীদের কাছে টাকা
আদায় শুরু করে । সরকারের নিয়ন্ত্রণের বালাই নেই । কেউ বেসরকারি
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় টাকার গরম দেখাতে, আর কেউবা ভর্তি হয় বাধ্য হয়ে ।
অর্থমন্ত্রীর সাথে যাদের ওঠাবসা তাদের ছেলেমেয়েরা কিন্তু বেসরকারিতে পড়ে
টাকার গরমেই । ভ্যাট আরোপ এবং এ সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী যা বলেছেন সেসব আসলে
তিনি তাদের দিকে তাকিয়েই বলেছেন । . এখন সরকারের তরফে শিক্ষাকে
আরো সহজলভ্য না করে ভ্যাট বসিয়ে কঠিন করার চেষ্টা হচ্ছে । আফটার অল, এটা
সমর্থন করা যায়না । তবে শুধু ভ্যাট প্রত্যাহার নয়, আন্দোলন হওয়া উচিত
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসার লাগাম টেনে ধরার দাবিতে । টিউশন ফি কমানোর
দাবিতে । নামমাত্র খরচে শিক্ষালাভের দাবিতে । এবং এটা আরো আগেই হওয়া উচিত
ছিল । সরকারকে ভ্যাট দেবোনা ঠিকাছে, কিন্তু বিনাপ্রশ্নে ব্যবসায়ীদের পকেট ভরিয়ে দেবো- সেটাও নিশ্চয় হতে দেয়া যায় না ।
নতুন পে স্কেলের মাধ্যমে সরকার তার কর্মচারিদের দুই ভাগে ভাগ করে ফেলেছে ।
আমলা এবং কামলা । এডমিন ক্যাডার হইলো আমলা, আর বাদবাকি সবাই হবে কামলা !
আমলারা নির্দেশ দিবে, আর কামলারা সে নির্দেশ পালন করবে ! আমলারা ফাইলপত্র
নাড়াচাড়া করবে, আর কামলারা তাদের নিজের চাকরির ফাইলখানা ঠিক রাখার জন্যে
কিছুমিছু হাতে নিয়ে হুজুর হুজুর করবে ! তা সে কামলা যতবড় জ্ঞানীই হোক, যতবড়
প্রফেসর হোক, যতবড় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদ বা দার্শনিক হোক । . যতবড় ডিগ্রী থাকুক, চাকরির বয়স যতই হোক, কামলাদের দৌড় হবে
সর্বোচ্চ গ্রেড-৩ পর্যন্ত । বাসে যেরকম নারী শিশু বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীদের
জন্য সিট সংরক্ষিত থাকে, তেমনিভাবে গ্রেড-১ এবং ২ আমলাদের জন্য সংরক্ষিত
থাকবে । প্রফেসর সাব, ডাক্তার সাব, ইঞ্জিনিয়ার সাব- আপনারা গ্রেড -১,
২ চান? তাইলে আপনাদের ওপর 'আমলা'দের ব্রাহ্মণগিরি থাকে? এইটুকু জ্ঞানও
আপনাদের নাই? এই জন্যেই তো আবুল মাল বলেছেন, আসলে 'জ্ঞানের অভাবে'ই আপনারা
এই পে-স্কেলের সমালোচনা করছেন ! ঠিকই কইছে । আরে স্যার, আপনারা হইলেন কামলা
। কামলাদের আবার কিসের গ্রেড-১,২ হা? আবুল মাল সাব তো বলেছেন, এখন থেকে
উনারা মানে আমলারা আপনাদের, মানে কামলাদের কন্ট্রোল করবেন । ঠিকই কইছে !
আসলেই আপনাদেরকে কন্ট্রোল করা খুবই জরুরি হয়া পড়ছে। . প্রফেসর
সাহেব, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-কৃষিবিদ সাহেব, কী ভেবেছেন? এমনিই পার পাবেন?
জেনারেল সাবজেক্টে লেখাপড়া না কইরা আর বিসিএস এ এডমিন ক্যাডার চয়েস না দিয়া
যে মহাপাপ করছিলেন, এখন তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে না?
অদ্ভুত আমাদের দেশ এবং দেশের মানুষ । বিশেষ করে ব্যবসায়ীরা । যদি কোনোভাবে
একটা রব ওঠে যে চাকুরেদের বেতন বাড়ছে বা বাড়ানোর ব্যাপারে আলাপ আলোচনা
হচ্ছে- তো ব্যস ! আর ঠেকায় কে? কালবিলম্ব না করে এরা তত্ক্ষণাত্
জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেয় । অথচ এরা কিন্তু সেগুলো কিনেছিল অনেক আগে,
অনেক অল্প দামে । বাজেটের আগে যখন পত্রিকায় একটা ধারনা দেয়া হয় কোন্
কোন্ জিনিসের দাম বাড়বে, এরা বাজেট পেশ এবং পাশের অপেক্ষা না করে তখনই ঐসব
জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেয় । অথচ এরা ঐসব জিনিস কিনেছিল অনেক আগে, অল্প দামে ।
সারা বিশ্বে উত্সবের আগে বিশেষ ছাড় দেয়া হয় । কিন্তু বাঙালি ব্যবসায়ীরা
মুখে লালা জমিয়ে অপেক্ষা করে থাকে কোন একটা উত্সবের । ঈদ কিংবা পূজার ।
তখন এরা বিশেষ গলাকাটা মূল্যে পণ্য বিক্রি করে থাকে । . বেতন
বাড়ুক কিংবা বোনাস দেয়া হোক, তাতে ছাপোষা চাকুরেদের জীবনযাত্রায় কোন
পরিবর্তন হয় না । যে লাউ সে কদুই থাকে । মাঝখান থেকে ফুলেফেঁপে কলাগাছ থেকে
বটগাছ হয় ব্যবসায়ীরা । কোনোভাবে যদি তারা বুঝতে পারে কোন একটা জিনিস
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম আছে, ব্যস । হয়ে গেল তাদের পোয়াবারো । মুহূর্তেই ঐ
জিনিসের দাম আকাশচুম্বি হয়ে যায় । কখনো কখনো তারাই সিন্ডিকেট বানিয়ে এরকম
কৃত্রিম সংকট তৈরি করে । জানা যায়, চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ নাকি হয়েছিল
ব্যবসায়ীদের মজুতদারির কারণে । ঐ দুর্ভিক্ষে বাংলার লাখ লাখ মানুষ মারা
গিয়েছিল । . যে কৃষক ফসল ফলায় সে ফসলের দাম পায় না, যে কাঁচামাল
উত্পাদন করে সে তার শ্রমের দাম পায় না । যে চাকুরিজীবী সকাল সন্ধ্যা দেশের
কাজ করে সে তার ঘামের মূল্য পায় না । যা পায় তাতে তাদের জীবনযাত্রায় কোন
হেরফের হয় না । লাভের গুড় চেটে খায় ঐ ব্যবসায়ীরাই । গুড় খেয়ে মোটাতাজা হলে
পরে তারা ইলেকশনে নামে । টাকা ছড়ায় । এবং পরিশেষে এই ব্যবসায়ীরা টাকার জোরে
দেশের হর্তাকর্তা বনে যায় । অদ্ভুত । বড়ই অদ্ভুত আমাদের বঙ্গদেশ । বড়ই অদ্ভুত এদেশের ব্যবসায়ীরা ।