আমাদের দেশে এক বিচিত্র কারণে 'ঘরজামাই'দেরকে বাঁকা চোখে দেখা হয় ।
সিনেমা নাটকেও ঘরজামাইকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য মূলক পার্ট দেয়া হয়। ঘরজামাইকে
নিয়া সবাই হাসাহাসি করে । মেয়ে, মানে ঘরজামাইয়ের বউ নিজেও হীনম্মন্যতায়
ভোগে । 'স্বামীর বাড়ি' যাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে । বাপের বাড়ি থেকে চলে
যেতে চায় ।
কিন্তু প্রয়োজন সাপেক্ষে 'ঘরজামাই' বিষয়টাতে আমি খারাপ
কিছু দেখিনা। মেয়ে যদি বাপের বাড়ি ছেড়ে ছেলের বাড়িতে গিয়ে সারাজীবন থাকতে
পারে- একই কাজ (পরিবারের প্রতি ঠিকঠাকমত দায়িত্ব পালন সাপেক্ষে) ছেলে করলে
সমস্যা কী? এতে ছেলের মান যাবে কেন? আপনি কোথায় থাকছেন তাতে কিছু আসে যায়
না। আপনার কাজ, আপনার দায়িত্বনিষ্ঠাই আপনাকে সম্মানিত করবে।
ঘরজামাই মানেই এই না যে শ্বশুরবাড়িতে বসে বসে খাবেন। শ্বশুরের অন্ন ধ্বংস
করবেন। সেইটা করলে কিন্তু ভাতের পাশাপাশি জুটবে লাঞ্চনা গঞ্জনা। সন্দেহ
নাই।
শ্বশুরবাড়িতে থাকা মানেই শ্বশুরের গোলাম হওয়া নয়। যে বাবার কোন
ছেলে নেই, তাদের পরিবারে একজন ঘরজামাই যে কতটা জরুরী, সেটা তারা ছাড়া আর
কেউ হয়তো বুঝবেন না।
ভাইবেন না যে এইকথা কইছি বইলা আমারে পচাইবেন ।
মনে রাখবেন, আমাদের মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)ও কিন্তু হযরত খাদিজা
(রাঃ)কে বিয়ে করার পর একপ্রকার ঘরজামাইই ছিলেন ।
আর মুসা(আঃ) তাঁর বিয়ের পর মিশরে না ফেরা পর্যন্ত ছিলেন পুরোদস্তুর ঘরজামাই।
ভাইসব, লজ্জা করবেন না। এগিয়ে যান। কবি হেলাল হাফিজের কবিতার ভঙ্গিতে বলি-
যদি কেউ বিয়ে করে ঘরজামাই হতে চান,
তবে তাই হয়ে যান ।
উৎকৃষ্ট সময় কিন্তু আজ বয়ে যায়।
Disclaimer: এই পর্বের বক্তব্য সম্পূর্ণই তত্ত্বীয়। ইহার সহিত লেখকের
ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনার কোনরুপ সামঞ্জস্য সন্ধানের অপচেষ্টা পাঠকের বাতুলতা
মাত্র হইবে, এবং তাহা অবিধারিতভাবেই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইবে।
বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়ের মতামতকে কতটা গুরুত্ব দেয়া হয়? আমাদের সমাজে একে
সাধারণত তেমন ধর্তব্যের মধ্যে গণ্য করা হয় না। প্রথমত, মতামত নেয়াই হয়না।
দ্বিতীয়ত, মেয়েরা মতামত দিলেও তা উপেক্ষা করা হয়। অথবা এমন অবস্থায় এনে
ফেলা হয়, যখন মেয়ের যতই অপছন্দ হোক, 'হ্যা' বলা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না।
মুসলিমদের মাঝেও এর ব্যতিক্রম দেখা যায় না। যদিও ইসলামী বিধানে মেয়েদের ব্যাপক স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে।
"হযরত সালামা বিনতে আব্দুর রহমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক মেয়ে রাসুল (সাঃ) এর কাছে এসে বললো, হে আল্লাহর
রাসুল! আমার পিতা! কতইনা উত্তম পিতা! আমার চাচাত ভাই আমাকে বিয়ের প্রস্তাব
দিল আর তিনি তাকে ফিরিয়ে দিলেন। আর এমন এক ছেলের সাথে বিয়ে দিতে চাইছেন
যাকে আমি অপছন্দ করি। এ ব্যাপারে রাসুল (সাঃ) তার পিতাকে জিজ্ঞাসা করলে
তিনি বললেন, মেয়েটি সত্যি বলেছে। তখন রাসুল (সাঃ) মেয়েটিকে বললেন, “এ বিয়ে
হবে না, তুমি যাও, যাকে ইচ্ছে বিয়ে করে নাও”। (সুনানে সাঈদ বিন মানসূর) ---
ইসহাক ইবনু মানসূর (রহঃ) .... আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত।
তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
অকুমারী মহিলাকে তার সুস্পষ্ট অনুমতি ব্যতিরেকে বিবাহ দেওয়া যাবে না।
কুমারী মহিলাকেও তার সম্মতি ব্যতিরেকে বিবাহ দেওয়া যাবে না।( ইবনু মাজাহ,
বুখারি, মুসলিম, তিরমিজী) --- এমনকি মেয়ের অমত থাকলে বিয়ে হয়ে যাবার পরেও রাসুল (সাঃ) তা বাতিল করার অধিকার দিয়েছেন।
"হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। এক কুমারী মেয়ে রাসুল (সাঃ) এর কাছে
এসে বলল, আমার পিতা আমার অপছন্দ সত্বেও বিয়ে দিয়েছেন। তখন রাসুল (সাঃ) সে
মেয়েকে অধিকার দিলেন, [যাকে ইচ্ছে বিয়ে করতে পারে বা এ বিয়ে রাখতেও পারে]।"
(মুসনাদে আহমাদ, সুনানে ইবনে মাজাহ, সুনানে আবু দাউদ)
---
সাবালিকা মেয়ের নিজ বিয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার অভিভাবক অপেক্ষা তার নিজেরই বেশি। (মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী)
এমনকি কোনো মেয়ে যদি প্রাক্তন স্বামীকে আবার বিয়ে করতে চায়, তাতেও বাধা দিতে নিষেধ করা হয়েছে।
"তারা যদি ন্যায়সঙ্গতভাবে পরস্পর সম্মত হয়, তবে স্ত্রীগণ নিজেদের
(প্রাক্তন) স্বামীদেরকে বিবাহ করতে চাইলে তোমরা তাদের বাধা দিও না। (সূরা
বাকারা : ২৩২)"
---
মেয়েদের এই অধিকার ও স্বাধীনতা সম্পর্কে
পুরুষদের স্বচ্ছ ধারণা থাকা দরকার। বিয়ের মত এত গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপারে
যদি কারো পছন্দ অপছন্দকে গুরুত্ব না দেয়া হয়, এর অর্থ দাঁড়ায় মানুষ হিসেবে
তার স্বাধীন স্বত্ত্বাকে অস্বীকার করা। নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ
সিদ্ধান্ত নেয়ার যোগ্যতা একজন মেয়ের আছে, এই বিশ্বাস সকল পুরুষকেই রাখতে
হবে।
সবচেয়ে গুরুতর ব্যাপারটা হলো- কোন মেয়ের অমতে তার বিয়ে দেয়া
হলে তা জায়েজ/বৈধই হয় না। আর এই সময়ের মুসলিম স্কলাররা মনে করেন- একজন
মেয়েকে জোর করে তার অপছন্দের কারো সাথে বিয়ে দেয়া আসলে ইসলামপূর্ব যুগে
মেয়েশিশুকে জ্যান্ত কবর দেয়ার সমতুল্য।
শুধু পণ্যই নয়, আমাদের সমাজে মানুষেরও মূল্য নির্ধারিত হয় টাকার অংকে।
আর এর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় বিয়ের আসরে। মোহরানা নিয়ে যেভাবে দরকষাকষি করা হয়- মাছের বাজারেও ততটা করা হয় কিনা সন্দেহ।
অথচ বিয়ে কোন পণ্য কেনাবেচা নয়। বিয়ে মানে মানুষে মানুষে গড়া পবিত্র বন্ধন। প্রাণের সাথে জুড়ে দেয়া প্রাণ।
মোহরানা নির্ধারণ করা উচিৎ নারীর সম্মান, আর কিছুটা আর্থিক নিরাপত্তার কথা
মাথায় রেখে। বাস্তবসম্মত ও পরিশোধযোগ্য সাধ্যের ভেতর। সেটাকে এমন অবাস্তব,
আকাশচুম্বী, অপরিশোধ্য অংকে নির্ধারণ করা ঠিক না যাতে করে তা বরের কাছে
'আর্থিক দন্ডে'র মত মনে হয়!!
প্রথমেই মাথার ওপর বোঝা চাপিয়ে দিলে নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও তা কাঁটা হয়ে বিধে থাকে।
অতিরিক্ত মোহরানা পারস্পরিক সম্পর্কের কোন রক্ষাকবচ নয়। সম্পর্ক টিকে থাকে
শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, ভালোবাসার ওপর। পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতার ওপর।
শ্রদ্ধা কিংবা বিশ্বাস হারালে, পারস্পরিক আকর্ষণ হারালে, কাগুজে কাবিন
সেখানে মূল্যহীন হয়ে যায়।
টাকার অভাবে কখনো সংসার ভাঙ্গে না। তার
প্রমাণ লাখ লাখ ভূমিহীন কৃষক, ভিক্ষুক ভিখারিনীর সংসার। কোন একটা পরিবার
শুধুমাত্র তখনই ভাঙতে পারে, কোন সংসারে শুধুমাত্র তখনই বিচ্ছেদ ঘটতে পারে,
যখন পরস্পরের প্রতি কোন আবেগ অবশিষ্ট থাকে না। থাকে না একজনের প্রতি
আরেকজনের কোন আকর্ষণ, শ্রদ্ধাবোধ।
কাবিনের টাকার অংক যে সংসারে
বন্ধনের একমাত্র সুতো, সেখানে কোন সুখ অবশিষ্ট থাকে না। সেখানে সুত্রপাত হয়
শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের নানা কাহিনীর। কিছু প্রকাশ্যে আসে, বেশিরভাগই
রয়ে যায় চোখের আড়ালে।
আবেগহীন সংসারে স্বামী যেন হয়ে যায় একজন দাস, আর স্ত্রীর সাথে তার আচরণ হয়ে থাকে দাসীর মত।
কাবিনের টাকা অধিক নির্ধারণ নয়, সমাজকে গুরুত্ব দিতে হবে নারীর শিক্ষা ও
স্বনির্ভরতার ওপর। যে নারী নিজে নিজেকে, নিজের পরিবারকে চালানোর মত আর্থিক
সক্ষমতা রাখেন, তার কাবিন নিরাপত্তার প্রয়োজন নেই।
টাকার গোলামী নয়, পবিত্র সুন্দর বন্ধনগুলো টিকে থাকুক পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার তারকাটায় গাঁথা হয়ে।
"নিমকহারাম" বলে হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো বুড়ো মকবুল। তারপর অকস্মাৎ এক
অবাক কান্ড ঘটিয়ে বসলো সে। ঘরের মাঝখানে, এতগুলো লোকের সামনে হঠাৎ আমেনা আর
ফাতেমা দুজনকে একসঙ্গে তালাক দিয়ে দিলো সে। রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললো, তোরা
বাইরইয়্যা যা আমার বাড়ি থাইক্যা।
(হাজার বছর ধরে/জহির রায়হান)।
বর্তমান সময়ে অতিরিক্ত/সাধ্যাতীত মোহরানা কাবিনে লেখা হয় মূলত আর্থিক নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে।
অদ্ভুত ব্যাপারটা হলোঃ একটা বিয়ের শুরুতেই মাথায় রাখা হয় 'তালাকের' কথা!!
কীভাবে এই অবস্থার উদ্ভব হলো? আমার বিশ্বাস, এর জন্য নারীসমাজ দায়ী নয়।
পুরুষরাই দায়ী। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও প্রতিটি গ্রামে আট দশজন করে
তালাকপ্রাপ্তা নারীর দেখা মিলত। হাজার বছর ধরে উপন্যাসের মকবুল বুড়োর মত
পুরুষরা বিনাকারণে একাধিক বিয়ে করতো, আর যখন তখন বলে দিত- "তিন তালাক"।
এইসব নারীর বেশিরভাগই পেতেন না তাদের মোহরানা, পেতেন না বাবার সম্পত্তির
ভাগ। কারো কারো দ্বিতীয় বিয়ে হত। সতীনের ঘরে জুটতো লাঞ্চনা গঞ্জনা। আর
যাদের তাও হতনা, তাদেরকে হাতে নিতে হত ভিক্ষার ঝুলি।
এখনো গ্রামে
গঞ্জে যেসব নারী ভিক্ষুক দেখা যায়, তারা আসলে তালাকপ্রাপ্তা নারী, যারা
বঞ্চিত হয়েছেন মোহরানা থেকে, বঞ্চিত হয়েছেন বাবার সম্পত্তি থেকে। বঞ্চিত
তারা রাষ্ট্রের আইন এবং সমাজের সুরক্ষা থেকে।
তালাকের এই
অপব্যবহার রোধের প্রয়োজনেই শুরু হয়েছে অতিরিক্ত এবং সাধ্যাতীত মোহরানা
নির্ধারণের চল। যদিও বর্তমান তরুণ প্রজন্ম এর জন্য দায়ী নয়, কিন্তু আগের
প্রজন্মের কৃতকর্মের বিষফল ভোগ করতে হচ্ছে তাদেরকেই।
(বিবাহ কথন-৯)
আমাদের গ্রামের গফুর দাদা মারা যাবার বহুদিন পরে একদিন গফুর দাদীকে বলতে
শুনেছিলাম, বুড়াটা মরি গ্যালো, মহরানা শোধ করি গ্যালো না। আরেক দাদী তখন
বলেছিলেন- মাফ করি দে গো বু (বু মানে বোন)। মনে কষ্ট রাখিস না। কবরে কষ্ট
পাইবে।
ছোট ছিলাম, তখন বুঝিনি। কিন্তু পরে যখন দাদীর কথাগুলোর
গুরুত্ব বুঝেছিলাম, I was thundered... স্বামী মারা গেছে সেটাই একটা বড়
কষ্ট, কিন্ত সেই কষ্টও তার মোহরানা না পাবার কষ্টকে আড়াল করতে পারেনি।
আমাদের সমাজে অনেক পুরুষই মোহরানা পরিশোধ না করার ধান্দায় থাকেন। ধার্য যা-ই হোক, কোনরকমে অল্প কিছু দিয়ে বাকিটা মাফ চেয়ে নেয়ার একটা গোপন ইচ্ছা পোষণ করেন। অনেকে তা করেনও।
এরকম চিন্তাভাবনা পুরুষত্বের অপমান। কাপুরুষ ছাড়া কেউ এমন চিন্তা করতে পারে না।
প্রখ্যাত সাহাবী আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রাঃ) খেজুরের আঁটির সমপরিমাণ
স্বর্ণ মোহরানা দিয়েছিলেন। আর রাসুল (সাঃ) একজন সাহাবীকে বিয়ে দিয়েছিলেন
এতটুকু মোহরানায় যে, ঐ সাহাবী তার নিজের মুখস্থ থাকা কয়েকটি সুরা স্ত্রীকে
শেখাবেন।
আপনি যা পারবেন বলে মনে করেন, তাই নির্ধারণ করবেন। ইট ডিপেন্ডস আপন ইওর ক্যাপাবিলিটি।
কিন্তু যা-ই নির্ধারণ করুন, শোধ করার ইচ্ছা রেখেই করুন। বিয়ের কয়েকদিনের
মধ্যে মাফ চাবেন, তা হবে না। ঐসময় হয়তো নতুন বউ চক্ষুলজ্জায় কিছু বলতে
পারবে না। মৃত্যুশয্যায় শুয়ে মাফ চাবেন, সে সুযোগ কপালে নাও জুটতে পারে। আর
এরকম সময়ে কেউ মাফ করলেও তা খুশিমনে বা স্বতস্ফূর্ত হবে না।
পরিস্থিতির চাপে হয়তো কেউ বাধ্য হয়ে তার দাবী ছাড়তে পারেন। কিন্তু আপনার
মৃত্যুর পর কখনো অভাবে পড়লে গফুর দাদীর মত হয়তো তিনিও বলবেন- বুড়াটা মরি
গ্যালো, মহরানা শোধ করি গ্যালো না।
(বিবাহ কথন-৮)
মোহরানা নির্ধারণ যেভাবে করা হয়
তাতে ক্ষুব্ধ হওয়ার যৌক্তিকতাও আছে। আমিও ক্ষুব্ধ হইনা তা নয়। মোহরানা
নির্ধারণের নামে যেভাবে পণ্যের মত দর-কষাকষি করা হয়, এতে নারীর সম্মান বাড়ে
নাকি অপমান হয় সেটা নিয়ে মেয়েদেরকেই ভাবতে হবে। মেয়েদের কী করা উচিৎ তা
নিয়ে আমি কখনো কথা বলি না। তাদের ব্যাপার নিয়ে তারাই ভাবুক। আমার আজকের
বক্তব্য সেইসব পুরুষদের উদ্দেশ্যে যারা অধিক মোহরানা নিয়ে ক্ষুব্ধ, হতাশ।
মোহরানা নিয়ে ক্ষুব্ধ পক্ষের অনেকের বক্তব্য শুনে আমার মনে হয়েছে, তারা মোহরানাটাকে বিয়ের একটা প্রথামাত্র মনে করেন। যেন কোনমতে অল্প কিছু মোহরানা দিয়ে বিয়ে করতে পারলেই তারা খুশি হন।
মোহরানা না দেয়ার চিন্তা যেমন জঘন্য, আমার মনে হয়, শুধু শুধু কম দেয়ার
মানসিকতাও ঠিক না। এমন মেন্টালিটি থেকে সবাইকে সরে আসতে হবে। ছেলেদের
মানসিকতা থাকা উচিৎ মোহরানা কম দেয়া নয়, সামর্থের মধ্যে সর্বোচ্চ বেশি
দেয়ার।
কম দেয়ার উদ্দেশ্যে মোহরে ফাতেমীর জিগির তুলবেন না।
মোহর পরিশোধ করা শুধু বাধ্যবাধকতাই নয়, এটা সওয়াবেরও কাজ। হাদিসে আছে-
তোমরা স্ত্রীর মুখে যা তুলে দাও তাও সদকা হিসেবে গন্য হবে। নিজের বউয়ের
সমস্ত চাহিদা মেটানো আপনার বাধ্যবাধকতা, কিন্তু তারপরেও সেটাকে সদকা হিসেবে
ঘোষণা করা হয়েছে। আপনি কেন এই সুযোগ হেলায় হারাবেন?
আপনার স্ত্রী
আপনার কাছে কতটা Precious সেটা যদিও টাকার অংকে নির্ধারণ করার সুযোগ নেই,
তবে টাকার অংক একেবারে ফেলনাও নয়। বিশেষত এমন সমাজে, যেখানে টাকাই আপনার
সামাজিক অবস্থান নির্ধারণ করে।
পাত্র পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) এর একটা হাদীসকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়।
হাদীসটি হলোঃ আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেন, চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ রেখে শাদী করা হয়- তার সম্পদ,
তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য ও তার দ্বীনদারী। সুতরাং তুমি দ্বীনদারীকেই
প্রাধান্য দেবে। অন্যথায় তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। (বুখারী)
আমি অনেককেই বলতে শুনেছি- তারা এই হাদীসের রেফারেন্স দিয়ে বলেন যে, বিয়ের জন্য অবশ্যই সম্পদ, সৌন্দর্য, বংশমর্যাদা দেখতেই হবে!!
কিন্তু আসলে কি হাদীসের বক্তব্য তা? বরং এখানে তো সম্পদ, সৌন্দর্য,
বংশমর্যাদা সবকিছুর ওপরে পাত্র/পাত্রীর দ্বীনদারীকে স্থান দিতে বলা হয়েছে।
ধনী বেদ্বীনের চেয়ে দ্বীনদার গরীব ভালো, উচ্চবংশের অদ্বীনদারের চেয়ে সাধারণ
বংশের দ্বীনদার ভালো, অতিসুন্দর অদ্বীনদার/কম দ্বীনদারের চেয়ে কমসুন্দর
বেশি দ্বীনদার পাত্র/পাত্রী ভালো।
এইভাবে পাত্র/পাত্রীর দ্বীনদারিতাকে সবকিছুর ওপরে স্থান দিতে বলা হয়েছে।
আর অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে অন্য হাদীসে বলা হয়েছে- তোমাদের নিকট যখন এমন কেউ
প্রস্তাব নিয়ে আসে যার দ্বীন (ধর্মপরায়ণতা) ও আখলাক (উত্তম স্বভাব চরিত্র)
তোমাদের কাছে সন্তোষজনক হয়, তখন তোমরা বিয়ে দিয়ে দাও। অন্যথায় পৃথিবীতে
ফিতনা ছড়িয়ে পড়বে। (তিরমিজী)
হ্যা, আপনি সুন্দর, সম্পদশালী, উচ্চ
বংশের পাত্র/পাত্রী বিয়ে করতে পারবেন না তা নয়, কিন্তু হাদিসে এসব
ক্রাইটেরিয়াকে আবশ্যক করা হয়নি। হাদীসকে নিজের খায়েশের পক্ষে ব্যাখ্যা করার
সুযোগ নেই।
***
***
ডিয়ার ব্যাচেলরস, যারা মনে মনে ভাবা শুরু
করছেন- এইবার তাইলে দ্বীনদার পাত্রীই দেখুম!!! বেরাদর, আপনার নিজের দ্বীন
আখলাক ঠিক আছে তো?? নিজে ভংচং জীবন যাপন করবেন, ধর্মের আশেপাশে হাঁটবেন না,
নামাজ কালামের ধার ধারবেন না, আবার নামাজী, পর্দাশীল ভদ্র পাত্রী খুঁজবেন,
তা অয় না মিয়া।
দ্বীনদার পাত্রী খোঁজার আগে নিজে দ্বীনদার হন।
নিজের চরিত্র ঠিক করেন। নাইলে দ্বীনদার পাত্রীরা ঠিকই আপনাকে ঠেঙ্গানি দিয়া
বিদায় করবে :P:P
কোরআন হাদীসের ওপর আমল করার ক্ষেত্রে তারা কিন্তু আপনার চেয়েও অনেক অনেক বেশি সিরিয়াস :)
ইদানিং অনেককেই আর্লি ম্যারেজ ক্যাম্পেইন করতে
দেখা যায়। আমি এই তথাকথিত আর্লি ম্যারেজের পক্ষে নই। আর্লি ম্যারেজ
সত্যিকার কোন সমাধান নয়। অল্প বয়সে বিয়ে দিলেই কারো সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যায়
না।
জৈবিক চাহিদা পূরণই বিয়ের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। বিয়ে হলো পরিবার
গঠনের উদ্যোগ। বিয়ে হলো সুস্থ সুন্দর সমাজ গঠনের উদ্যোগ। বিয়ে হলো
সুনাগরিক তৈরির উদ্যোগ।
ছেলে মেয়ে সবারই বিয়ের জন্য অন্তত এতটা বয়স
হওয়া উচিৎ যখন সে তার সঙ্গীর প্রতি কী দায়িত্ব, সমাজের প্রতি কী দায়িত্ব তা
বুঝতে পারে। যখন তারা একটা শিশুকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মত মানসিক
পরিপক্কতা ও যোগ্যতা অর্জন করে। আর্লি ম্যারেজ নয়, বিয়ে হতে হবে যথাসময়ে।
বিয়ের জন্য বয়সই একমাত্র যোগ্যতা নয়।
কেউ কেউ মনে করেন তাড়াতাড়ি
অল্প বয়সে বিয়ে দিলেই চারিত্রিক অবক্ষয় থেকে ব্যক্তি ও সমাজ রক্ষা পাবে।
নীতি নৈতিকতা রক্ষা পাবে। কিন্তু বিষয়টা আসলে তা নয়। চরিত্র রক্ষার জন্য
সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ, আইনের যথাযথ প্রয়োগ আর
সামাজিক সুরক্ষা।
যে ছেলের মন সুস্থ নয়, তাকে ধরে বিয়ে দিলেই
কোনকিছু ঠিক হয়ে যাবে না। অবিবাহিত মাত্রই চরিত্রহীন নয়, আর বিবাহিত হলেই
কারো চরিত্র রাতারাতি ফুলের মত পবিত্র হয়ে যায় না। চরিত্রহীনদের তালিকায়
বিবাহিতদের সংখ্যা নিতান্তই নগন্য নয়।
আর্লি ম্যারেজের নামে বেকার
অবস্থায় কোন ছেলেকে বিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। বিয়ে দিলেই ঠিক হিয়ে যাবে- এটা কোন
কাজের কথা হতে পারেনা। বিয়ে এমন কোন দাওয়াই নয়- যাতে নিমেষেই সকল সমস্যার
সমাধান হয়ে যাবে। একটা ছেলের বিয়ের আগে অন্তত এতটুকু উপার্জন থাকা উচিত,
যাতে অন্তত দু'জন মানুষ ডাল ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে। বিয়ে দিলে ঠিক হয়ে
যাবে!!" গেলে ভালো কথা, কিন্তু ঠিক না হলে যে একটা মেয়ের জীবন নষ্ট হয়ে
যাবে, সেকথাও তো ভাবতে হবে নাকি?
বাবা মায়ের ওপর কোন দায়িত্ব নেই
আপনার বউকে খাওয়ানোর। তারা যদি খাওয়াতে চান, খুব ভালো। নইলে আপনার বউয়ের সব
চাহিদা মেটানোর দায়িত্ব সম্পূর্ণই আপনার।
কৃষিনির্ভর সমাজে মানুষ
বৃদ্ধি মানেই ছিল আয় বৃদ্ধি। কিন্ত আধুনিক নগরভিত্তিক সমাজে তা নয়। এখানে
বেশিরভাগ পিতামাতার নাভিশ্বাস উঠে যায় দু-তিনজন সন্তান মানুষ করতে। বাবার
যখন অবসরে যাবার বয়স, তখন বেকার অবস্থায় আপনাকে বিয়ে করিয়ে নতুন একটা
অতিরিক্ত সংসার টানার সামর্থ তার থাকবার কথা নয়।
আরে ভাই, ক্যাম্পেইন ট্যাম্পেইন করার আগে বুকে হাত দিয়া বলেন তো- আপনি কি আপনার বোনকে একজন পরিপূর্ণ বেকার ছেলের সাথে বিয়ে দিবেন?
(বিবাহ কথন-৫)
ইদানিং অনেককেই আর্লি ম্যারেজ ক্যাম্পেইন করতে দেখা যায়। আমি এই
তথাকথিত আর্লি ম্যারেজের পক্ষে নই। আর্লি ম্যারেজ সত্যিকার কোন সমাধান নয়।
অল্প বয়সে বিয়ে দিলেই কারো সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যায় না।
জৈবিক চাহিদা
পূরণই বিয়ের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। বিয়ে হলো পরিবার গঠনের উদ্যোগ। বিয়ে হলো
সুস্থ সুন্দর সমাজ গঠনের উদ্যোগ। বিয়ে হলো সুনাগরিক তৈরির উদ্যোগ।
ছেলে মেয়ে সবারই বিয়ের জন্য অন্তত এতটা বয়স হওয়া উচিৎ যখন সে তার সঙ্গীর
প্রতি কী দায়িত্ব, সমাজের প্রতি কী দায়িত্ব তা বুঝতে পারে। যখন তারা একটা
শিশুকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মত মানসিক
পরিপক্কতা ও যোগ্যতা অর্জন করে। আর্লি ম্যারেজ নয়, বিয়ে হতে হবে যথাসময়ে।
বিয়ের জন্য বয়সই একমাত্র যোগ্যতা নয়।
কেউ কেউ মনে করেন তাড়াতাড়ি অল্প বয়সে বিয়ে দিলেই চারিত্রিক অবক্ষয় থেকে
ব্যক্তি ও সমাজ রক্ষা পাবে। নীতি নৈতিকতা রক্ষা পাবে। কিন্তু বিষয়টা আসলে
তা নয়। চরিত্র রক্ষার জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক
মূল্যবোধ, আইনের যথাযথ প্রয়োগ আর সামাজিক সুরক্ষা।
যে ছেলের মন
সুস্থ নয়, তাকে ধরে বিয়ে দিলেই কোনকিছু ঠিক হয়ে যাবে না। অবিবাহিত মাত্রই
চরিত্রহীন নয়, আর বিবাহিত হলেই কারো চরিত্র রাতারাতি ফুলের মত পবিত্র হয়ে
যায় না। চরিত্রহীনদের তালিকায় বিবাহিতদের সংখ্যা নিতান্তই নগন্য নয়।
আর্লি ম্যারেজের নামে বেকার অবস্থায় কোন ছেলেকে বিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। বিয়ে
দিলেই ঠিক হিয়ে যাবে- এটা কোন কাজের কথা হতে পারেনা। বিয়ে এমন কোন দাওয়াই
নয়- যাতে নিমেষেই সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। একটা ছেলের বিয়ের আগে
অন্তত এতটুকু উপার্জন থাকা উচিত, যাতে অন্তত দু'জন মানুষ ডাল ভাত খেয়ে
বেঁচে থাকতে পারে। বিয়ে দিলে ঠিক হয়ে যাবে!!" গেলে ভালো কথা, কিন্তু ঠিক
না হলে যে একটা মেয়ের জীবন নষ্ট হয়ে যাবে, সেকথাও তো ভাবতে হবে নাকি?
বাবা মায়ের ওপর কোন দায়িত্ব নেই আপনার বউকে খাওয়ানোর। তারা যদি খাওয়াতে
চান, খুব ভালো। নইলে আপনার বউয়ের সব চাহিদা মেটানোর দায়িত্ব সম্পূর্ণই
আপনার।
কৃষিনির্ভর সমাজে মানুষ বৃদ্ধি মানেই ছিল আয় বৃদ্ধি। কিন্ত
আধুনিক নগরভিত্তিক সমাজে তা নয়। এখানে বেশিরভাগ পিতামাতার নাভিশ্বাস উঠে
যায় দু-তিনজন সন্তান মানুষ করতে। বাবার যখন অবসরে যাবার বয়স, তখন বেকার
অবস্থায় আপনাকে বিয়ে করিয়ে নতুন একটা অতিরিক্ত সংসার টানার সামর্থ তার
থাকবার কথা নয়।
আরে ভাই, ক্যাম্পেইন ট্যাম্পেইন করার আগে বুকে হাত দিয়া বলেন তো- আপনি কি আপনার বোনকে একজন পরিপূর্ণ বেকার ছেলের সাথে বিয়ে দিবেন?
গার্জিয়ানদের ইচ্ছা- তারা মেয়েকে এমন ঘরে বিয়ে দেবেন, যেখানে গিয়ে মেয়ে
সবকিছু রেডিমেড পাবে। সবকিছু পাবে সাজানো গোছানো। যেন সে শুধু একটা সাজানো
বাগানে গিয়ে প্রবেশ করবে মাত্র!!!
কিন্তু আমার মনে হয়, একটা নতুন
সংসার হওয়া উচিৎ একেবারেই নতুন। এমনকি খাটটাও যদি স্বামী স্ত্রী দু'জনে
একসাথে মিলে কিনতে পারে সেটাও ভালো। বিষয়টা হওয়া উচিৎ এমন- নিজেদের জন্য
একেকটা প্লেট, গ্লাস, রান্নার চুলা, কড়াই, হাড়ি পাতিল- সবকিছু তারা নিজেরা
নিজেরা কিনুক, নিজের মত করে একটা একটা করে কিনে সাজাক নতুন সংসার।
উইমেন সাইকোলজিই বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় সাবজেক্ট :P
আর আমার জ্ঞান সেখানে হিমাংকেরও শত ডিগ্রী নিচে। তবুও মা, খালা, বোনদের
কর্মকান্ড দেখে যতটুকু বুঝেছি- প্রত্যেক মেয়েই নিজের সংসারটা একান্তই নিজের
মনের মত করে সাজাতে চায়। একটা একটা করে আসবাব কিনে তিল তিল করে যে সংসার
একজন নারী সাজিয়ে নেন, তার প্রতি মায়া থাকে অন্যরকম। প্রতিটি জিনিসকে মনে
হয় তার নিজের সন্তানের মত। একান্তই নিজের। যদি কখনো বাইরের পৃথিবী অসহ্য
হয়ে ওঠে, এইসব তৈজসপত্রের মাঝেও তারা খুঁজে পান সুখ।
যতটা চিন্তা গবেষণা করে তারা একটা ডিনার সেট কেনেন, ততটা চিন্তা নিজের বিয়ের সময়ও কেউ করেন কিনা সন্দেহ :P
নতুন সংসারে খুনসুটি করে কেনা একেকটা আসবাব হয়ে থাকে জীবনের একেকটা মাইলফলক।
ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিলেই সবকিছু সাজিয়ে গুছিয়ে দেবেন না। তাদের নিজেদের সংসার নিজেদের মত করে সাজাতে বলুন।
নিজেদের কষ্টের টাকায় নিজেরা কিনে আনা একটা টিনের থালায়- পান্তাভাতকেই তাদের মনে হবে যেন বেহেশত থেকে পাওয়া মান্না সালওয়া।
আর গ্লাস কিংবা মগে পানি খাওয়ার সময় মনে হবে- এ যেন পানি নয়, হৃদয় নিঙরানো এক গ্লাস তরল ভালোবাসা
মেয়েদের গার্জিয়ানরা সবসময় চান- ছেলে যেন পুরোপুরি এস্টাবলিশড হয়! তার যেন অলরেডি বাড়ি গাড়ি থাকে!
তারা হয়তো ভুলে যান, অথবা জানেন না, যে ছেলে সবসময় সবকিছু না চাইতেই
পেয়ে এসেছে, কিংবা যে ছেলে সবকিছু নিজে নিজে গুছিয়ে ফেলেছে- তার ঘরে নতুন
বউ নতুন একটা আসবাবের মত বাড়তি সংযোজন মাত্রঃ যা তার কিছু শারীরিক ও
মানসিক চাহিদা মেটাবে।
আসলে এস্টাবলিশমেন্ট নয়, দেখা উচিৎ পটেনশিয়ালিটি। দেখা উচিত স্বভাব চরিত্র।
আর বিয়েটা দেয়া উচিৎ সবকিছু গুছিয়ে নেয়া বা প্রতিষ্ঠিত হবার পর নয়,
ছেলেমেয়েদের জীবনে সংগ্রাম বাকি থাকতেই। যাতে করে জীবনের বাকি যুদ্ধটা
তারা দু'জনে একসাথে চালিয়ে নিতে পারে। যুদ্ধ করে করে জীবন এগিয়ে গেলে
তবেই সম্পর্কটা হবে ইস্পাতকঠিন। নিঃস্বার্থ ভালোবাসাময়।
মানুষ
সবসময় তাকেই বেশি ভালবাসে, বেশি আপন মনে করে, যে ছিল বিপদ মুহূর্তের
সাথী। জীবনের বিভিন্ন কঠিন সময়ে যারা আমাদের সঙ্গে থাকে তাদেরকে আমরা
ভুলতে পারিনা। তাদের সাথে সম্পর্কটা একসময় সত্যি সত্যিই স্বার্থের উর্ধ্বে
উঠে যায়।
বিয়ের ক্ষেত্রেও অবস্থাটা ভিন্ন কিছু নয়। যে স্বামী
স্ত্রী একসাথে সংগ্রাম করে করে জীবনের পথে এগিয়ে যায়- তাদের বন্ধনটাই হয়
সবচেয়ে দৃঢ়। তাদের ভালোবাসা হয় সবচেয়ে গাঢ়। সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী।
কারণ, কঠিন সময়গুলোই মানুষের অন্তরে দাগ কেটে যায়। জীবনের শেষ দিনেও
হয়তো মনে পড়ে - একদিন আমরা এক বেলা উপোস ছিলাম।
খাদিজা (রাঃ) এর
মৃত্যুর পর আল্লাহর রাসুল (সাঃ) আরো বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু তিনি কখনো
খাদিজা (রাঃ)কে ভুলে যাননি। খাদিজার কথা ভেবে তিনি কাঁদতেন। খাদিজার
আত্মীয় ও বান্ধবীদের খোঁজ খবর নিতেন, উপহার পাঠাতেন।
কারণ, খাদিজা (রাঃ) ছিলেন তাঁর দুঃখের দিনের সাথী, কঠিন সময়ের সহযোদ্ধা।
রাসুল(সাঃ) যখন হেরা গুহায় ধ্যান করতেন খাদিজা (রাঃ) তখন রাতের আঁধারে
তাঁকে খাবার দিয়ে আসতেন। নবুয়ত পাওয়ার পরের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোয়
সবসময় সাহস ও সমর্থন যুগিয়ে গেছেন একজন বয়সী নারী, হযরত খাদিজা(রাঃ)।
এমন প্রাণের বন্ধুকে, এমন আত্মার আত্মীয়কে কখনোই ভোলা যায় না।
বিয়েতে উভয়পক্ষেরই অনেক কিছুই দেখা হয়। কী কী দেখা হয় তার ফিরিস্তি দিয়ে
শেষ করা যাবে না। এমনকি পাত্র/পাত্রীর বাড়ির চায়ের কাপটা কেমন, কী নাস্তা
দিয়েছিল, চায়ে কতটুকু চিনি দেয়া হয়েছিল সেটাও অনেকের কাছে ইম্পর্ট্যান্ট
হয়ে দাঁড়ায়। বাড়ির কুকুরটা একটু বেশি ঘেউ ঘেউ করলেও অনেক সময় ভেস্তে যায়
বিয়ের আলাপ।
বিয়েতে অনেক কিছুই দেখা হয়। চেহারা, চাকরি, ধনসম্পদ,
শিক্ষা, এলাকা, পরিবার। শুধু দেখা হয়না পাত্রপাত্রীর মানসিক মিল অমিলের
ব্যাপারটা। বিবেচনায় নেয়া হয়না ছেলেমেয়েদের চিন্তাচেতনার মিল অমিল। যেন এটা কোন বিষয়ই নয়!! যেন বিয়ে মানে টাকা ঘরবাড়ি আর বংশের সুনাম দেখে দু'জন মানুষকে এক ঘরে ঢুকিয়ে দেয়া!! আমাদের সমাজের এইসব বিয়ে কি পাত্রের সাথে পাত্রীর, নাকি পাত্রের চাকরির সাথে পাত্রীর চামড়ার- এ নিয়ে প্রায়শই আমার ঘোরতর সন্দেহ হয়।
অথচ বাস্তবিক অর্থে বিয়ে হচ্ছে একটা বন্ধুত্ব। স্বামী স্ত্রীর মাঝেই হতে হবে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব।
ভাবুন তো, আপনার খুব ক্লোজ যে বন্ধু, সে কীভাবে আপনার বন্ধু হলো? কেন আপনাদের বন্ধুত্ব দীর্ঘস্থায়ী হলো?
যার সাথে আপনার মনের মিল, যার সাথে আপনি প্রাণখুলে কথা বলতে পারেন, যার
সাথে কথা বলে আপনার সময় কেটে যায় অনায়াসে- তারাই কিন্তু আপনার প্রিয় বন্ধু।
তাই না! তাদের মধ্যে আছে পাটকাঠির মত হ্যাংলা বন্ধু, আছে মোটা, পাতলা, আছে
বেঁটে, আছে লম্বা। আছে গরীব, আছে ধনী। কালো, শ্যামলা, ফর্সা। এইসব
কোনকিছুই কিন্তু বন্ধুত্ব নির্মানের পথে বিবেচ্য ছিলনা। বন্ধুত্ব তৈরি হয়
মনের মিল, বিশ্বাস আর ভালোলাগা থেকে।
বিয়ের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার।
মনের মিল না হলে বিয়ে সুখের হয় না। বন্ধুত্ব না হলে দীর্ঘস্থায়ী হয় না
সম্পর্ক। চিন্তাভাবনার অমিলের কারণে, অর্থের প্রাচুর্যের মাঝেও প্রতিনিয়ত
ভেঙ্গে যাচ্ছে অনেক সংসার। আর অনেক পরিবার টিকে আছে বুকের ভেতর ছাইচাপা
কষ্ট নিয়ে।
আপনি বিবাহিত হলে স্ত্রী/স্বামীর বন্ধু হোন, আর বিয়ে না
করে থাকলে এমন কাউকে পছন্দ করুন, যার সাথে আছে আপনার চিন্তাচেতনার মিল।
যাকে আপনার সত্যিকারের বন্ধু বানাতে ইচ্ছে হয়।
মনের মিল না হওয়ায়
তিন বছরে চারবার বিয়ে ভাঙ্গে সুন্দরী কমলার। আর ওদিকে নাক বোঁচা কলিমের বাপ
দাঁত উচু কলিমের মার প্রাণের বন্ধু হয়ে পার করে দেন ষাট বছরের এক ম্যারাথন
সংসার জীবন।
একজন মানুষকে আল্লাহ একসাথে সবকিছু দেন না।
কোন একদিকে বেশি থাকলে অন্যদিকে কম থাকে। প্রত্যেক মানুষেরই কোন না কোন
অভাব থাকবেই। আল্লাহ তায়ালা আমাদের মানুষ বানিয়েছেন, অতিমানব না।
প্রত্যেকেরই খুঁত আছে, কেউই নিখুঁত নয়।
গার্জিয়ানরা ছেলেমেয়ের বিয়ের
সময় এই চিরসত্যটা ভুলে যান। এবং ছেলেমেয়েরা নিজেরাও। সবাই একজনের মাঝেই
সবকিছু পেতে চায়। পাত্রীর বাবা খোঁজেন এমন পাত্র, যে একইসাথে দেখতে
হ্যান্ডসাম, অসম্ভব মেধাবী, সেটলড ক্যারিয়ার (আবার বয়সও কম!!), উচ্চ বেতন,
কথাবার্তায় স্মার্ট ও বুদ্ধিমান, আচার ব্যবহার ভালো, চরিত্র ভালো, গভীর
জীবনবোধের অধিকারী, চিন্তাশীল, উচ্চ বংশীয়, শিক্ষিত ও ধনী পরিবারের এবং একই
অঞ্চলের। কিন্তু বাস্তবে এই সবকিছু আল্লাহ তায়ালা কাউকেই একসাথে দেন না।
ছেলে হয়তো খুবই স্মার্ট, হ্যান্ডসাম। ভালো চাকুরি করে। কিন্তু ঘরের ভেতর
আসলে তার ব্যবহার ভালো নয়। সে মানুষকে সম্মান দিতে জানে না। হয়তো সে ভেতরে
ভেতরে খুবই অহংকারী !! হয়তো সে বদরাগী!! হয়তো সে চরম অসহিষ্ণু একজন মানুষ!!
আবার ছেলের বাপ মায়েরা বোঝেন না যে ধনী, সুন্দরী, উচ্চশিক্ষিত,
বুদ্ধিমতি, সংসারী (আরো যেসব চাওয়া থাকে!) সবকিছু একসাথে পাওয়া যায় না।
অতিসুন্দরী মেয়ে অহংকারী হতেই পারে!! আপনি ছেলের বউ হিসেবে ধনীর দুলালী
চান, তো সেই বউ আপনাকে শ্বাশুড়ীর সম্মান নাও দিতে পারে!! ক্রুড রিয়ালিটি।
অতিরিক্ত ও অবাস্তব প্রত্যাশার কারণে দেখা যায় পাত্র পাত্রী মিলছেই না।
নানা ছুতোনাতায় একের পর এক প্রস্তাব বাতিল করছে ছেলে অথবা মেয়ের অভিভাবকরা।
একেবারে নিখুঁত একটা ছেলে কিংবা মেয়ের সন্ধানে কেটে যায় বছরের পর বছর।
একসময় তারা ক্লান্ত হয়ে যান।
হয়তো অনেকদিন পরে হুঁশ হয়। ততদিনে পদ্মা মেঘনায় গড়িয়ে যায় অনেক জল। হয়তো
জোয়ারের শেষে ভাটা নামে আবেগ উচ্ছ্বাসে। মাঝখানে নিদারুণ বঞ্চনায় পেরিয়ে
যায় ছেলেমেয়েদের জীবনের কিছু সোনালি সময়।
(বিবাহ কথন-১)
বিগত গ্রীষ্মের মত চলে গেছে পৌষের দিন, আর ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে মাঘেরও রাত্রিগুলো। হৃদয়ের তার ধরে নাড়াচাড়া করে গেছে পুবালি বাতাস তবু সুরের লহরী তারা বাঁজাতে পারেনি। আসছে ফাল্গুনে কি শোনা যাবে কৃষ্ণচূড়ার গান? নাকি কালবৈশাখির অপেক্ষায় অনাবাদী থেকে যাবে হৃদয় #শ্মশান?
কোথায় উড়ে যায় কোথাকার মেঘ কোন পাহাড়ের টানে কোথায় গিয়ে পরে হয়ে যায় বৃষ্টি! কোথায় উড়ে যায় ওপাড়ের গাংচিল আর এপাড়ের সাদা বক এক পায়ে দাঁড়িয়ে কী ভাবে সারাটা বিকেল?
কে কার খবর রাখে এইসব দিনে যখন অদ্ভুত রুক্ষতায় ভরে আছে মানুষের মন! কে ভাবে আজকাল হৃদয়ের কথা? যখন সকলেই ভাবছে কেবল অর্থের প্রয়োজন! কার কাছে আজো কিছুটা মূল্য আছে মানবিকতার? কিছুটা মূল্য আছে হৃদয়বৃত্তি আর মনুষ্য স্বত্ত্বার? ----- #এলোমেলো_প্রশ্ন
স্বাস্থ্যখাতে,
বিশেষ করে বেসরকারি খাতে চিকিৎসা ব্যবস্থায় শৃংখলা প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার এ
সংক্রান্ত নতুন আইন করতে যাচ্ছে । 'চিকিৎসা সেবা আইন, ২০১৬' নামে আইনটির
একটি খসড়া প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় । আইনটিতে বেশ কিছু ভালো দিক
আছে । তবে কিছু বিষয়ে এখনো রয়ে গেছে অস্পষ্টতা । কিছু বিষয় অগ্রহণযোগ্য।
প্রথমেই নজর দেয়া যাক ধারা ৯ এর ১ (খ) তে । এতে বলা হয়েছে ‘সরকারি বা কোন
সংবিধিবদ্ধ সংস্থায় চাকুরিরত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি’ নির্ধারিত
অফিস সময়ের বাইরে ও ছুটির দিনে ‘স্ব স্ব কর্মস্থলের জেলার বাহিরে’
‘নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের লিখিত পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে’ বেসরকারি
প্রতিষ্ঠান বা চেম্বারে চিকিৎসা সেবা দিতে পারবেন।
সরকারি চাকরিরত
ডাক্তার/নার্স গন যারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও সেবা প্রদান করেন তারা মূলত
নিজ কর্মস্থলের আশেপাশেই তা করে থাকেন । নিজ কর্মস্থলের জেলার বাহিরে গিয়ে
বেসরকারি সেবা প্রদান আদতে অসম্ভব প্রায় । সেক্ষেত্রে এই আইন বলবত হলে
বাস্তবে অনেকেই আর বেসরকারিভাবে চিকিৎসা সেবা কার্যক্রমে যুক্ত থাকতে
পারবেন না । আবার অনেকেই সরকারি চাকরি ত্যাগ করতে বাধ্য হবেন । এই ধারাটি সংশোধন করা দরকার । অন্যথায় বিশৃংখলা সৃষ্টির আশংকা থেকে যায় ।
ধারা ১৮ তে বিদেশী চিকিৎসা সেবা প্রদানকারীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে –
‘সরকারের পূর্বানুমতি গ্রহণ সাপেক্ষে সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসা সেবা
প্রতিষ্ঠানে বিদেশী চিকিৎসা সেবা প্রদানকারী নিয়োগ করা যাইবে । এখানে
সরকারের অনুমতির পাশাপাশি বিদেশী সেবাদানকারীদের বাংলাদেশে চিকিৎসা সেবা
প্রদানের জন্য লাইসেন্সিং পরীক্ষা পাশ ও নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা রাখা দরকার ।
ধারা ৬ (১) অনুযায়ী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন, প্রবেশ,
তল্লাশি ও জব্দ করার ক্ষমতা সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ ‘সরকার বা সরকার কর্তৃক
ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ বা তৎকর্তৃক নিযুক্ত কোন কর্মকর্তা বা কমিটি কোন
চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানে যেকোন সময়ে প্রবেশ, পরিদর্শন, রেজিস্টার ও
চিকিৎসা সেবা সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি বা নমুনা বা কাগজপত্র পরীক্ষা এবং জব্দ
করতে পারবে।
এখানে পরিদর্শক টিমে অন্তত একজন সরকারি ডাক্তারের অন্তর্ভুক্তি আবশ্যক করা উচিৎ ।
ধারা ২০ (১) এ বলা হয়েছে- স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান
কর্তৃক এই আইনের অধীনে পেশাগত দায়িত্ব পালনে বা চিকিৎসা প্রদানে অবহেলা
অপরাধ হিসেবে গন্য হইবে ।
২(২) ধারা অনুযায়ী অবহেলাকে সংজ্ঞায়িত
করা হয়েছে- স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সেবা
গ্রহীতার প্রাপ্য সেবা প্রদান না করা যাহা তাহার পক্ষে ‘বাস্তব অবস্থায় ও
মানবিকভাবে’ পালন করা সম্ভব ছিল ।
আগেকার খসড়া আইনে পেশাগত অবহেলাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল এভাবেঃ 'ভুল চিকিৎসা' যা দ্বারা 'রোগ মুক্তি ঘটে না' বা 'বিলম্বিত হয়'।
সে তুলনায় এবারের সংজ্ঞায়ন ভালো হয়েছে । তবে আরো স্পেসিফিক করা যায় কিনা তা নিয়ে ভাবা যেতে পারে ।
খসড়া এই আইনের কিছু ভালো দিক হলোঃ
ধারা ২১(১) –এ চিকিৎসা সংক্রান্ত অভিযোগ আদালতে আমলে নেয়ার আগে ন্যুনতম
দুইজন চিকিৎসক সহ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন আবশ্যক করা
হয়েছে । কমিটিতে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অন্তর্ভুক্তি আবশ্যক করা হয়েছে।
২১(৪) ধারায় বলা হয়েছে - আদালতের নির্দেশনা ব্যতিত কোন স্বাস্থ্যসেবা প্রদনকারী ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা যাইবে না ।
ধারা ২০ (২) এ বলা হয়েছেঃ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তির প্রতি হুমকি
প্রদান , ভীতি প্রদর্শন, দায়িত্ব পালনে বাধাদান, আঘাত করা সহ যেকোন ধরণের
অনিষ্ট সাধন বা স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কোন সম্পত্তির
ক্ষতিসাধন, বিনষ্ট, ধ্বংস বা উক্তরুপ সম্পত্তি নিজ দখলে গ্রহণ অপরাধ বলিয়া
গন্য হইবে।
ধারা ২১(৫) অনুযায়ী ২০(২) এ উল্লেখিত অপরাধ হবে আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য।
এগুলো এই আইনের ভালো দিক ।
তবে ধারা ২২(২) অনুযায়ী ২০(২) এ উল্লেখিত অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করা
হয়েছে অনধিক পাঁচ লক্ষ টাকা অর্থদন্ড বা তিন বছর কারাদন্ড বা উভয় দন্ড।
শাস্তির পরিমাণ কম হয়েছে । শাস্তির মাত্রাকে আরো সংজ্ঞায়িত করা দরকার ।
ক্ষতির পরিমাণ বা আঘাতের প্রকৃতি অনুযায়ী অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ হওয়া
উচিৎ। ২০ লক্ষ টাকা ক্ষতিসাধন করলে অনধিক পাঁচ লক্ষ টাকা অর্থদন্ড কি
গ্রহণযোগ্য? অথবা শারীরিকভাবে গুরুতর আঘাত করা হলে তিন বছর কারাদন্ড কি
যথেষ্ট হবে? বিভিন্ন দেশে এইরুপ অপরাধের শাস্তি আরো বেশি ।
এখানে ‘অনধিক’ এর স্থলে ন্যুনতম শব্দ প্রয়োগ করা উচিৎ হবে ।
তরুণ
লেখকদের একটা বড় অংশ তাদের গল্প উপন্যাস লেখায় হুমায়ুন আহমেদের স্টাইল ফলো
করেন। আপনি নতুন কোন লেখকের একটা গল্প পড়তে শুরু করলেন, কিছুটা পড়ার পরেই
দেখবেন- কেমন যেন হুমায়ুন আহমেদের লেখার গন্ধ পাচ্ছেন।
লেখালেখি
শুরু করার জন্য এটা ভালো। হুমায়ুন স্টাইলে লেখার সুবিধা হলো- খুব সহজেই ছোট
ঘটনাকে টেনে বড় করা যায় আর তা পাঠকের কাছে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের লেখার মত
প্যাচালো বা জটিল মনে হয় না। তবে দীর্ঘমেয়াদে হুমায়ুনীয় স্টাইল ফলো করা
একজন উদীয়মান লেখকের জন্য আত্নঘাতী হবে। পাঠক আপনার লেখা পড়তে গিয়ে হুমায়ুন
আহমেদকে খুঁজে পাবে, আপনাকে নয়।
হুমায়ুন আহমেদ ঠিকই নিজের মত করে তার নিজের সময়কে ধারণ করে গেছেন। আপনার উচিৎ, আপনার নিজস্ব স্টাইলে আপনার সময়কে ধারণ করা।
অনেকের ধারণা, দুর্নীতি শুধু বড় অফিসাররাই করে। পুলিশ অথবা যারা বিভিন্ন অফিসে কাজ করে, দুর্নীতি বোধহয় শুধু তারাই করে। অন্য কেউ না।
কেউ কি মনে করেন যে একজন রিক্সাওয়ালাও দুর্নীতি করে? কিংবা, একজন কামলাও কি দুর্নীতি করে?
উত্তর হচ্ছে- হ্যা। তারাও দুর্নীতি করে। পার্থক্য শুধু টাকার অংকে। যে যতটুকু পারে, সে ততটুকু করে।
যেদিন রাস্তায় একটু জ্যাম থাকে, যেদিন গাড়ি সংকট থাকে, বা হরতাল থাকে
সেদিন রিক্সাভাড়া দ্বিগুন হয়ে যায়। সিএনজি ভাড়া দ্বিগুন তিনগুন হয়ে যায়।
একজন কামলা দুর্নীতি করে তার কাজে ফাঁকি দেয়ার মাধ্যমে। যে কাজ সে একদিনে করতে পারে, সেই কাজকেই সে করবে তিনদিন লাগিয়ে।
ব্যবসায়ীরা দুর্নীতি করে মজুদদারীর মাধ্যমে। অতিরিক্ত মুনাফাখোরীর মাধ্যমে। রমজান মাসে আমরা সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাই।
অফিসের লোকেরা দুর্নীতি করে কখনো ফাইল আটকিয়ে, কখনো গ্রাহকের কাছে সরাসরি
টাকা আদায় করে, কাজে ফাঁকি দিয়ে, অপ্রয়োজনীয় ওভারটাইম করে।
আসলে
যার মনে অসততা বাসা বেঁধে আছে, সে যেই হোক, যে পেশাতেই থাকুক, দুর্নীতি
করবেই। দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য বদলাতে হবে ভেতরের মানুষটাকে।
ক্ষুদ্র ডাক্তারি জীবনে রোড এক্সিডেন্টের যতজন রোগী দেখেছি, বেশিরভাগই
মোটরসাইকেল এক্সিডেন্ট। কারণ, মোটর সাইকেল জিনিসটাই আসলে একটা নেশা।
যেদিন থেকে মোটর সাইকেলে বসে কোনমতে মাটি ছুঁতে পারি, সেদিন থেকে বাইক
চালানো শুরু। এরপর এক যুগ ধরে রংপুরের সমতলভূমি আর চট্টগ্রামের পাহাড়ী
রাস্তায় হাজার হাজার মাইল বাইকের ওপর বসে পাড়ি দিয়েছি। ফিলিংসটা হলো- বাইকে
উঠলেই নেশা ধরে যায়। স্পিডোমিটারের কাটা ষাটের নিচে থাকা মানে যেন একজন
বাইকারের চরম অপমান। আর কেউ যদি ওভারটেক করে, তাহলে যেন মাথায় আগুন ধরে যায়। শুরু হয়ে যায় অঘোষিত রেস।
ভয়ংকর ব্যাপারটা হচ্ছে- কখনো কখনো সেই রেসের সমাপ্তি ঘটে জীবনের বিনিময়ে।
ডিয়ার বাইকার্স, প্লিজ কন্ট্রোল ইওরসেলফ, কন্ট্রোল স্পিড। বিকজ, একটি দুর্ঘটনা, সারা জীবনের কান্না।
অনেককেই বলতে শুনি "ভাই, কী করি বলেন তো! সময় যে কাটেনা! " আমি অবাক হয়ে যাই। খুব অদ্ভুত লাগে।
পৃথিবীতে কত কিছু করার আছে, কত কিছু জানার আছে, কত কিছু দেখার আছে!!
হাজার বছরেও তো এক জীবনের স্বাদ মিটবে না। অথচ একজন জ্বলজ্যান্ত মানুষ কোন
কাজ খুঁজে পাচ্ছে না, তার সময় কাটছে না, এ কীকরে হয়?
অথচ প্রতিটি দিনের শেষে আফসোস আমার নিত্যসঙ্গী। আহা! কিছুই তো করা হলো না। কিছুই তো দেখা হলো না। কিছুই তো শেখা হলো না।
তারাশঙ্কর বলেছিলেন- ভালোবেসে মিটিলো না সাধ, জীবন এত ছোট কেনে? আমাকে বলতে হয়- দিনের শেষেও ফুরালো না কাজ, সময় এত দ্রুত কেনে??
আমাকে অপরাধী করে দেয় তোমাদের ভালোবাসা। সহসাই মহীরুহ হয়ে ধরা দেয় চোখে- যত অক্ষমতা, যত দারিদ্র্য আমার।
আমাকে অপরাধী করে দেয় তোমাদের ভালোবাসা। অপাত্রে ঢেলে ঢেলে কী নিদারুণ অপচয় হচ্ছে তোমাদের হৃদয় আবেগ !! অথচ, কে না জানে- আমি এর মোটেও যোগ্য নই, কখনোই ছিলামও না।
গতকাল ছিল আমার আটাশতম জন্মদিন। অর্থাৎ, সাতাশ বছরের জীবন কাটিয়ে দিয়েছি পৃথিবীর আলো বাতাসে।
সাতাশ বছর মোটেও কম সময় নয়। যদি এভাবে ভাবি- আজ থেকে সাতাশ বছর আগে যারা
একইদিনে জন্মেছিলো, তারা সবাই কি আজও বেঁচে আছে? নেই। এমনকি আরো পরে যাদের
জন্ম, তারাও অনেকেই বেঁচে নেই।
আল্লাহর ইচ্ছায় আমি বেঁচে আছি।
মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে ফিরে এসে আজও বেঁচে আছি। তার মানে, আমি অনেক মানুষের
তুলনায় অলরেডি এক দীর্ঘ জীবন পেয়েছি।
বয়স হলো সাতাশ। সাত বছর বাদ দিতে হয়, কারণ সাত বছর বয়সের আগে আসলেই কিছু
বোঝার মত বয়স ছিলনা। তবু বিশ বছরেই এত এত ভিন্ন মাত্রার অভিজ্ঞতা হয়েছে যে,
মাঝে মাঝে নিজেই আশ্চর্য হয়ে যাই। শরীরের বয়স যাই হোক, আপেক্ষিকতার সূত্র
অনুযায়ী মনের বয়স যে কত হয়েছে ঠাওর করতে পারিনা।
আমি জন্মদিন
উদযাপন করিনা। ছুটির দিন থাকে, ঘুমিয়েই কাটাই। প্রশ্ন হলো- জন্মদিন কি আসলে
আনন্দের সাথে উদযাপন করার বিষয়? নাকি এই ভেবে কষ্ট পাওয়া উচিৎ যে-
নির্দিষ্ট হায়াতের হিসাব থেকে আরো একটি বছর কমে গেল! মহাকালের মহাশুন্যতায়
অন্তর্ধানের দিকে আরো অনেকটা এগিয়ে গেলাম!!
জন্মদিনে অনেকেই আমাকে
শুভেচ্ছা জানান। আমিও জানাই। যেকোন শিশুর জন্মই আনন্দের উপলক্ষ্য। হয়তো
আমারটাও তাই। কিন্তু সেই শিশু যখন বড় হয়- তখন সে আর সবার জন্য আনন্দের কারণ
থাকে না।
জন্মদিনের সবচেয়ে বড় আত্মজিজ্ঞাসা হলোঃ যখন শিশু ছিলাম,
তখন হয়তো স্বাভাবিকভাবেই মানুষের জন্য আনন্দের কারণ ছিলাম। এখন এই পরিণত
বয়সেও আমি কি সত্যিই মানুষের জন্য আনন্দের উৎস হতে পেরেছি?
চট্টগ্রামে যখন পা রাখলাম তখনো সূয্যিমামার মুখ দেখা যায় নি। পৌষের প্রথম সকাল। বাস থেকে নেমেই শীতের আমেজ টের পাওয়া গেলো। চাঁদর জড়াতে হলো গায়ে।
বাসায় কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়েই ভ্রমণপিপাসুদের বিশেষ গ্রুপ "ভ্রমরের" কয়েকজন তরতাজা যুবক রওয়ানা হলাম "অক্সিজেনে"র উদ্দেশ্যে। ঘড়ির কাটায় সকাল আটটা পেরিয়ে গেছে। মানুষের পদচারণায় চট্টগ্রামের অক্সিজেন মোড়ের বাতাসে তখন অক্সিজেনের তুলনায় কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।
আমাদের বাসে উঠতে হলো ঠিক সাড়ে আটটায়। গন্তব্য... রাঙ্গামাটি.... তবে আপাতত রাঙ্গামাটি নয়। যাচ্ছি খাগড়াছড়ির পথ ধরে সাজেকের সবুজ উপত্যকায়। সাজেক পড়েছে রাঙ্গামাটি জেলায়, কিন্তু পুরোটা পথ পড়বে খাগড়াছড়ির মাটিতে।
চান্দি গরম!!
ভ্রমর গ্রুপের দু'জন সদস্য আগের দিন বিকেলেই শান্তি পরিবহনের টিকেট কাটতে এসেছিলেন। তাদেরকে বলা হয়েছিলো সামনের দিকে কোন সিট খালি নেই। অতএব বাধ্য হয়ে তারা পেছনের দিকের কয়েকটি সিটের টিকেট কিনে নিয়ে যান। কিন্তু সকালে এসে দেখা গেলো ভিন্ন চিত্র!! হেল্পার চিৎকার করে ডাকছে... আসেন খাগড়াছড়ি... সিট খালি...
এবং দেখা গেলো এইমাত্র এসে অনেকেই বাসের সামনের সিট পেয়ে যাচ্ছেন!! শান্তি পরিবহনের চট্টগ্রাম কাউন্টারের এই প্রতারণায় আমরা যারপরনাই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলাম। এই শীতের সকালে আমাদের চান্দি গরম গেল। ব্যাটাদের একহাত দেখে নেয়া দরকার। কাউন্টারে যে দুজন বসা ছিল তাদের সাথে বেশ উচ্চবাচ্য হলো। ওদেরকে বেশ করে শাসিয়ে দিলাম। বাসে উঠলাম ঠিকই, কিন্তু যাত্রার শুরুতেই শান্তি পরিবহনের এই প্রতারণামূলক আচরণ যে অশান্তির সৃষ্টি করলো তার শেষ কোথায় কে জানে!!
জানালায় ভোরের আলো
চারজন অলস বাস মিস করেছে। অতএব চারটা সিট খালি। অলসরা পরের বাসে পারলে আসবে। না পারলে নাই। ব্যাকপ্যাক গুলো খালি সিটে রেখে আয়েশ করে বসলাম আমরা। আর বাস ছুটলো গন্তব্যের টানে। হাটহাজারী, নাজিরহাট, মানিকছড়ি... পথের দুপাশে সবুজ গাছের সারি। কখনো কাটা ধানের ক্ষেত। শহর ছেড়ে আমরা গ্রামের আলোহাওয়ার ভেতর এগিয়ে চলেছি। ততক্ষণে সূর্য তার আলো ছড়াতে শুরু করেছে। জানালার ফাঁক দিয়ে আলো এসে পড়ছে গায়ে। যেন আলতো করে মুখে চোখে বুলিয়ে দিচ্ছে উষ্ণ পরশ।
এই পথ যদি না শেষ হয়?
মানিকছড়ি পার হলে শুরু হলো পাহাড়ি রাস্তা। দু'পাশে পাহাড়, টিলা। টিলার ঢালে সবুজের সমারোহ। মাঝখান দিয়ে রাস্তা। এরকম পথে চলতে আমার এত ভালো লাগে, এজন্যই আমি শত শত মাইল পাড়ি দিয়ে বারবার ফিরে আসি পাহাড়ের কোলে। অদ্ভুত সুন্দর আঁকাবাকা আর উঁচুনিচু এইসব নির্জন রাস্তায় এলেই গলা ছেড়ে গাইতে ইচ্ছে হয়- এই পথ যদি না শেষ হয়!! তবে কেমন হত, তুমি বলতো!! (তবে শেষ পর্যন্ত গলা ছাড়লাম না। নিজেকে কন্ট্রোল করেছি আরকি! বিকজ, আমার গানের গলা এতই মধুর যে, সুরের মূর্ছনায় রাস্তার সবকিছু থেমে যেতে পারে, ইউ নো!!)
টেনশন টেনশন!!
খাগড়াছড়ি নেমে নামায আর খাওয়া সেরে আমরা উঠলাম পাহাড়ী পথের জন্য বিশেষ জীপ- চান্দের গাড়িতে। শুরু হলো চান্দের গাড়ির দুরন্ত গতির সাথে আমাদের রোমাঞ্চকর যাত্রা। আমরা জানতাম যে দীঘিনালা থেকে সেনাবাহিনীর এসকর্ট টীম সাজেক যায় বিকেল সাড়ে তিনটায়। কিন্তু খাগড়াছড়িতে নেমে জানা গেল সময়টা এখন এগিয়ে আনা হয়েছে। সেনাবাহিনীর টীম যাবে পৌনে তিনটায়। অর্থাৎ এর মধ্যে দীঘিনালা পৌঁছতে না পারলে আজ আমাদের সাজেক যাওয়া হবে না।
বাস মিস করা সেই চারজন অলস পরের বাসে রওনা দিয়েছিল। তারা এসে পৌঁছতে পৌঁছতে আরো কিছুটা দেরি হয়ে গেল। সবাই কিছুটা টেনশন বোধ করতে লাগলাম। তবে কি তীরে এসে ডুবে যাবে তরী?
অবশেষে ঘুমকাতুরে অলসরা এসে পৌঁছলো। আর দেরি নয়। উল্কার বেগে ছুটলো চান্দের গাড়ি। গন্তব্য সাজেক, যেখানে মেঘের ওপর বাড়ি।
পথে পথে চেকপোস্ট!
আমাদের গাড়ি যখন আর্মি ক্যাম্পের কাছে পৌঁছলো, ততক্ষণে অন্যসব গাড়ি নিয়ে সেনাবাহিনীর টিম রেডি হয়ে গেছে। আর পাঁচ মিনিট দেরি করলেই মিস হয়ে যেত আজকের এসকর্ট।
পর্যটকদের নিয়ে ৩৮ টি গাড়ির দীর্ঘ বহর এগিয়ে চললো সাজেকের উদ্দেশ্যে।
দীর্ঘ পাহাড়ী পথ। আর পথে পথে চেকপোস্ট। কখনো সেনাবাহিনীর, কখনো বিজিবির, কখনো পুলিশের। মাঝে মাঝে কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছিলো, এ কি নিজের দেশে আছি? এখনো এতটা অনিরাপদ রয়ে গেছে পার্বত্য অঞ্চল!
কিছুদূর এগিয়েই উঠে পড়লাম গাড়ির ছাদে। হাওয়ার বেগে ছুটছে গাড়ি। আর হাওয়ায় উড়ছে আমাদের মন।
উড়ু উড়ু মন নিয়ে চান্দের গাড়ির ছাদে
দীঘিনালা পেরিয়ে বাঘাইহাট। পথে কাচালং নদী, কাচালং বাজার, মাসালং বাজার। আঁকাবাকা আর উঁচুনিচু রাস্তা, তবে বান্দরবানের মত অতটা ভয়ংকর নয়। বলতে গেলে, সত্যিকারের এডভেঞ্চারারদের কিছুটা খারাপও লাগতে পারে। বিশেষ করে যারা আগেই বান্দরবানের গহীনে ঘুরে এসেছেন তাদের কাছে সাজেকের পথ হয়তো নতুন কোন অনুভূতি জাগাবে না। নতুন যা, রাস্তার পাশে প্রায় প্রতিটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে উপজাতি শিশুরা আমাদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়াচ্ছিলো। ওরা কী বলছিলো শোনা যায় নি। তবে আমরা নিজেরাই ভেবে নিলামঃ নিশ্চয় ওরা বলছে- "ডিয়ার ট্রাভেলার্স, ওয়েলকাম টু সাজেক"!!!
সতর্কবানী
পাহাড়চূড়ায় পূর্ণিমা স্নান
সাজেকে যখন পৌঁছলাম তখন সূর্য ডুবি ডুবি করছে। রুইলুই পাড়ায় আমাদের জন্য বুক করা কটেজ "মেঘালয়" তে ব্যাগপত্তর রেখে বেরিয়ে পড়লাম দূর পাহাড়ের দেশে অস্তগামী সূর্যকে বিদায় জানাতে।
সাজেকের প্রবেশমুখ
আরো উত্তরে হেঁটে গেলে পাওয়া গেল মসজিদ। সেখানেই মাগরিব এবং এশার নামাজ পড়লাম। পুবের আকাশে তখন অন্য দৃশ্য। ভোরের সূর্যের মত লাল হয়ে উঠে আসছে পূর্ণিমার চাঁদ। পাহাড়ের চূড়ায় মেঘ, তার ওপরে চাঁদ।
রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে রাত ন'টা পর্যন্ত চললো আমাদের খুনসুটি আড্ডা। ধীরে ধীরে আরো উজ্জ্বল, আরো সুন্দর, আরো মোহিনী রুপ ধারণ করলো চাঁদের আলো। হাজার ফুট উপরে, পৌষের প্রথম রাতে হিম হিম বাতাসে, এ যেন অদ্ভুত পূর্ণিমা স্নান। এ যেন মুগ্ধতার নতুন মাত্রা।
সূর্যের তাপ আরেকটু বাড়লে আমরা গাড়ি নিয়ে রওনা হলাম আরো উত্তরে কংলাক পাড়ার উদ্দেশ্যে। আরোহন করলাম কংলাক পাহাড়ে। অনেকেই হাঁপিয়ে উঠলো, কিন্তু কেওক্রাডং বিজয়ী পর্বতারোহী হিসেবে আমার কাছে এ যেন ছিল নিতান্তই ডালভাত!! বিনাক্লেশে উঠে পড়লাম কংলাক চূড়ায়। সেখানে লুসাই উপজাতির দুয়েকটা বাড়ি আছে। বাড়ির আঙিনায় তখনো জমাট মেঘ!! এ যেন সত্যিকারের- মেঘের ওপর বাড়ি।
মেঘের ওপর বাড়ি
ফেলে আসি নীলাকাশ
সকাল দশটায় সাজেক থেকে ফিরতি যাত্রা। আবার সেনাবাহিনীর একটি টিম আমাদের সাথে নিয়ে যাবে দীঘিনালা পর্যন্ত। মূলত আমরাই যাবো ওদের সাথে। সেনাবাহিনীর এসকর্ট ছাড়া যাওয়া আসা করা যায় না।
এবার আর ছাদে নয়। বসেছি গাড়ির পেছনের দিকে মুখ করে। সূর্যের তাপ বাড়ছে। আকাশে কোন মেঘ নেই। যতদূর চোখ যায় পাহাড় আর নীল আকাশ। এমন দিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশ বহুদিন দেখা হয়নি।
ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে পাহাড়ী পথ, আমরা এগিয়ে যাচ্ছি শহুরে জীবনে।
পেছনে ফেলে আসি নীল আকাশ
বিকেলে ঘুরলাম আলুটিলার রহস্যময় গুহায়। দিনের শেষ মুহূর্তগুলো কাটিয়ে দিলাম রিসাং ঝর্ণার গান শুনে।
রিসাং ঝর্ণার গান
সূর্য ডুবে গেলে সাঙ্গ হলো এবারের খেলা। অন্ধকারে ডুবে গেল পাহাড়, মেঘ, ঝর্ণা আর দিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশ।
১।
হাসপাতালের ক্যান্টিনে ঢুকতেই আমার চোখ গেল কর্নারের টেবিলে। একা বসে আছেন
ডাঃ বকুল। খুবই শান্ত শিষ্ট নিরীহ মানুষ। তবে আজ মনে হচ্ছে স্বাভাবিকের
চেয়ে একটু বেশি গম্ভীর। বেশ বিমর্ষ চেহারা। গিয়ে বসলাম পাশে।
-কী ব্যাপার বকুল ভাই, মন খারাপ?
-জ্বি ভাই। আজকে একজনের সাথে একটু রুড আচরণ করে ফেলেছি। এখন মনটা খারাপ
লাগছে। লোকটা ডাক্তারদের ব্যাপারে নিশ্চয় একটা খারাপ ধারণা নিয়ে গেলো।
মানুষ কষ্ট নিয়েই হাসপাতালে আসে, কিন্ত ভাই সবসময় মেজাজ ঠিক রাখা যায় না।
রাখতে পারি না। আর যারা এক লাইন বেশি বোঝে তাদের আমি কেন যেন সহ্য করতে
পারি না।
ডাঃ বকুল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অনারারী মেডিকেল
অফিসার। সোজা বাংলায় ইনি একজন ডাক্তার যিনি তার শ্রমের বিনিময়ে কোন
পারিশ্রমিক পান না। ডাক্তার হয়েছেন বছর খানেক আগেই। একটা ক্লিনিকে চাকরি
করেন। একদিন তাঁর মনে হলো, শুধু ক্লিনিকের চাকরি করে দিনকে দিন মেডিকেল
নলেজের ধার কমে আসছে। ট্রেনিং করা দরকার। আবারো পড়ালেখায় নামা দরকার।
তাছাড়া ভবিষ্যতের বাজারে টিকে থাকার জন্য একটা পোস্ট গ্রাজুয়েশান ডিগ্রীও
করা দরকার।
অতঃপর সিনিয়র ভাইদের পরামর্শে ডাঃ বকুল ঢুকে পড়লেন
অনারারী ট্রেনিং এ। হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের অদ্ভুত হেলথ সিস্টেমের এক কিম্ভুত
সদস্য, একজন বিনে পয়সার কামলা।
গতকাল রাতে তাকে ক্লিনিকে ডিউটি
করতে হয়েছে। রাতটা বেশ 'খারাপ'ই গেছে বলতে গেলে। ক্রিটিকাল পেশেন্ট ছিল,
ডেথ ডিক্লেয়ার করতে হয়েছে দু'জনের। ঘুমানোর কোন সুযোগই হয়নি। সকালে উঠে
আবার ট্রেনিং-এর নামে বিনেপয়সার কামলাগিরি করতে এসেছেন।
সকালে
এমনিতেই কাজের চাপ বেশি থাকে। নতুন ভর্তি রোগীর হিস্ট্রি রিভিউ, ফলো আপ,
ইনভেস্টিগেশান প্ল্যান, ট্রিটমেন্ট রিভিউ, পুরনো রোগীদের ফলো আপ,
ট্রিটমেন্ট এডজাস্ট করা, ছুটি দেয়া, রাউন্ড, ক্লাস, সেমিনার ইত্যাকার নানা
কাজ। দম ফেলা মুশকিল।
এরই মধ্যে যখন এক পেশেন্টের এটেন্ড্যান্ট
বিরুপ মন্তব্য করে বসলো তখন আর মেজাজ ঠিক রাখতে পারেন নি। কিছু কড়া কথা
শুনিয়ে দিয়েছেন । তারপর থেকে বেচারার নিজেরই মন খারাপ।
আমারও খারাপ
লাগলো। ডাঃ বকুল এবং সেই এটেন্ড্যান্ট উভয়ের জন্যই খারাপ লাগলো। কিন্তু
আমি কোনভাবেই ডাঃ বকুলকে দোষ দিতে পারলাম না। আমি জানি, ডাঃ বকুল অকারণে
মেজাজ খারাপ করার লোক নন। আসলে ডাঃ বকুল এমন এক অমানবিক সিস্টেমের শিকার,
যে সিস্টেম তার মত নিরীহ মানুষকেও আজ রুঢ় করেছে। যে সিস্টেম তার যৌবনের
সোনালি সময়কে সিস্টেমের মারপ্যাচে ফেলে অপব্যবহার করে যাচ্ছে। এর কিছুটা
বিরুপ প্রভাব অন্যদের ওপরও পড়বেই, এখন আর এতে খুব একটা অবাক হই না।
আমি জানি, ডাঃ বকুলকে যদি আলাদাভাবে ক্লিনিক ডিউটি করতে না হত, তাকে যদি
পেটের চিন্তায় মগ্ন থাকতে না হত, তার কর্মঘন্টা যদি নির্দিষ্ট থাকতো এবং
ওয়েল পেইড হত, তাহলে তিনি কখনোই মেজাজের খেই হারাতেন না।
You haven't given him a sound sleep, how can he give you a good smile??
২।
এই অংশটুকু বিশেষত নন-মেডিকেল পাঠকদের উদ্দেশ্যে। আপনার মনে যে প্রশ্নটি
চলে এসেছে তাহলো- ট্রেনিং তো ডাক্তাররা করছেন তার নিজের জন্য, নিজের
ডিগ্রীর জন্য। এর জন্য সরকার ভাতা দেবে কেন? এত কথা কেন?
এই প্রশ্ন
যদি সত্যিই আপনার মনে এসে থাকে তাহলে সেটা বড়ই আফসোসের কথা। পর্যাপ্ত
ডাক্তার নিয়োগ দেয়া এবং ডাক্তারদের ভাতা দিয়ে ভালো করে ট্রেনিং করানোর দাবি
আপনাদের পক্ষ থেকেই তোলা উচিত। কারণ, ডাক্তার দক্ষ না হলে এর কুফলটা
আপনাকেই ভোগ করতে হবে। সরকারি হাসপাতাল বলেন আর বেসরকারি বলেন, কোথাও
পর্যাপ্ত ডাক্তার নিয়োগ দেয়া হয়না। ফলে অল্প ক'জন ডাক্তারকে অতিরিক্ত চাপ
নিতে হয়। ডাক্তার নাহয় শায়েস্তা হলো, কিন্তু আপনি কি পূর্ণ মনোযোগ পান? না
পেলে আপনি কী করেন? ডাক্তারকে গালিগালাজ করেন? নাকি ডাক্তারের নামে অভিযোগ
করেন? কখনো কি কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ করেছেন- এতজন রোগীর জন্য একজন ডাক্তার
কেন? কখনো কি দাবি তুলেছেন- এত টাকা বিল দিলাম, ডাক্তারের বেতন এত কম কেন?
নাহ। তা করেন নি।
ডাক্তারদের ভালো ট্রেনিং এর ব্যবস্থা আপনাদের
নিজেদের স্বার্থেই করতে হবে। বিকজ, দে ডিলস উইথ ইওর লাইফ এন্ড ডেথ। তাদের
আপডেটেড নলেজ এন্ড স্কিল না থাকলে দিনশেষে আপনিই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
ক্ষতিগ্রস্ত হবে আপনার বাবা মা, আপনার সন্তান। হয়তো ভুল চিকিৎসার অভিযোগ
তুলে ভাংচুর করবেন, হয়তো পত্রিকায় নিউজ হবেন। কিন্তু যদি কোন ক্ষতি হয়েই
যায়, তা কি ফিরে পাবেন?
ডাক্তারদের পেটের চিন্তা থেকে মুক্ত রাখতে
হবে। বিকজ, দে হ্যাভ টু লিভ দা মোস্ট স্ট্রেসফুল লাইফ। পেট এবং মাথা দুই
জায়গায় চাপ নিয়ে ভালো সেবা দেয়া যায় না। আর এ কারণেই উন্নত বিশ্বে ডক্টরস
আর অলওয়েজ হাইলি পেইড। আমার দেশে একটা সরকারী হাসপাতালের একটা ওয়ার্ড
চালানোর জন্য যতজন ডাক্তার দরকার, আমার সরকার নিয়োগ দিয়েছে তার এক চতুর্থ
বা পঞ্চমাংশ। আর সেই জায়গা পুরণের জন্যই জিইয়ে রাখা হচ্ছে এই অমানবিক
সিস্টেম। ডিগ্রীর মুলো ঝুলিয়ে বিনেপয়সায় খাটিয়ে শোষণ করা হচ্ছে তরুণ
ডাক্তারদের সোনালি সময়। একটা দিনও যদি এই ডাক্তাররা কাজ না করেন, তাহলেই
হাসপাতাল অচল হয়ে পড়বে।
আপনি এই সিস্টেমকে সমর্থন করেন? যদি করেন,
তাহলে আপনি ভালো ব্যবহার পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন না। আপনি যদি এই সিস্টেম
পরিবর্তনের দাবি না তোলেন, তাহলে আপনি আন্তরিক চিকিৎসা পাবার আশা করতে
পারেন না।
আপনি ঘোড়াকে ক্রমাগত চাবুক মারবেন, সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপাবেন, আর বিনিময়ে সে আপনাকে মুচকি হাসি দিবে, তা হয় না।
২. - শ্বাসকষ্টটা কখন শুরু হইছিলো ভাই?
- ভাবীঃ হ্যারে বাজারে পাঠাইছিলাম। বাজার থাইকা আসি দুপুরে খাইতে বসছে।
বুঝছেন ভাই! এর ঘন্টা দুই ঘন্টা পরে খানিক শ্বাসকষ্ট শুরু হইছে।
৩. - চাচাজান, রোগী কখন থেকে অজ্ঞান?
- রুগী পুরাপুরি ভালা আছিলো ছার। কথা কইছে। রাইতে ভাত খাইছে। খাইয়া
ঘুমাইছে। তারপরে হঠাৎ দেখি হাত পায়ে খিচ মারতাছে। অজ্ঞান হই গেছে।
ঘটনা যাহাই হউক, বাঙালির সকল ইতিহাস শুরু হয় 'ভাত খাওয়া'র পর
থেকে। যিশুর জন্মের বছর হতে যেমন খ্রিষ্টীয় সাল গণনা শুরু করা হয়, তেমনি
রোগীর যেকোন সিম্পটম (রোগ-লক্ষণ) এর বয়স গণনা শুরু হয় 'ভাত খাওয়া'র
মুহূর্ত থেকে। বাঙালির জীবনে ভাত খাওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আর
নাই!!!!!!
না বলতে বলতে-
সব কথা জমে যাচ্ছে বুকের ভেতর।
বেরোবার পথ নেই বলে ওখানেই ওরা
গাইছে, খেলছে, হাসছে, কাঁদছে... আর
বংশবৃদ্ধি করছে ক্রমাগত মিয়োসিস প্রক্রিয়ায়!
না বলতে বলতে-
বুকের ভেতর জমে যাচ্ছে কথার পাহাড়।
দিনকে দিন তেতে উঠছে কয়েদী কথামালা,
শীঘ্রই মুক্তি না দিলে
একদিন তারা সব বিদ্রোহী হবে!
একদিন তারা হবে
জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি ! কিশোর তরুণেরা সব
হয়ে যাবে বোমাবাজ সন্ত্রাসী ।
পাঁজরের সব হাড় চূর্ণ করে
একদিন তারা হবে মুক্ত স্বাধীন;
একদিন তারা সব
পাখা মেলে উড়ে যাবে - শুন্য হাওয়ায়।
আজীবন ডুবসাঁতার কাটবো বলে জন্মলগ্ন হতে হাত পা ছুঁড়ছি অবিরাম। শিখছি সাঁতারের যতসব অদ্ভুত কৌশল, আর ক্রমাগত ভেদ করছি জলের সীমানা।
জলপথের এই দীর্ঘ যাত্রায় আজো কোন ডুবোচরে আটকেনি হৃদয় আমার। গহীন জলের হাজারো মরিচীকা আর জলজ লতার হাতছানি পায়ে ঠেলে তীরে এসে মুখোমুখি হয়েছি এক দুর্লঙ্ঘ্য দেয়ালের। কী করে পেরোব বলো বাধার পাহাড়? আমি দক্ষ এক সাঁতারু বটে - পর্বতারোহী তো নই!!
ডাক্তার সবগুলা কসাই। আমার মতন গরীবের থাইকাও তিন হাজার টেকা নিলো। বকরিটা বেইচ্চা এই টেকা জোগাড় দিলাম।
হাসপাতালের বাইরে চায়ের দোকানে পেছনের টেবিলে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে
দিতে বন্ধুর সাথে গল্প করছিলো ডাঃ মুনীর। এমন সময় এমন একটা মন্তব্য কানে
আসে তার। উৎসুক চোখে লোকটাকে ভালো করে খেয়াল করে মুনীর। হ্যা, এই লোকের
রোগীকে আজকেই ছুটি দেয়া হয়েছে। তার স্ত্রীই ছিলেন রোগী।
কিন্তু এই মুহূর্তে তার মুখে এই কথা শুনে মুনীরের আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল। কারণ, গরীব বলে এই লোকের সবগুলো ইনভেস্টগেশান ফ্রি
করার ব্যবস্থা করে দিয়েছে সে। পুওর ফান্ড থেকে ব্যবস্থা করে দিয়েছে সব
ওষুধের। বলা বাহুল্য, এই পুওর ফান্ড কোন সরকারী ফান্ড নয়। ডাক্তাররা নিজেরা
চাঁদা দিয়ে, ঔষধ কোম্পানির কাছে ওষুধ অনুদান নিয়ে বানিয়েছে এই পুওর ফান্ড।
যাদের আসলেই কিছু নেই, তাদেরকে এখান থেকে সাহায্য করা হয়। অথচ এখন এই লোক বলে কিনা তার তিন হাজার টাকা ডাক্তাররা নিয়েছে!! ব্যাপারটা কী?
লোকটা যখন বাইরে বেরুবে তখনই তাকে পেছন থেকে ডাক দিলো মুনীর।
চাচা আছেন কেমন? আচ্ছা ব্যাপারটা কী একটু আমাকে খুলে বলেন তো! শুনলাম ডাক্তাররা নাকি আপনার তিনহাজার টাকা নিয়েছে?
চাচীর চিকিৎসা তো আমি করলাম। কই, আমারে তো কিছু দিলেন না!
মুনীরের কথায় থতমত খেয়ে গেল বেচারা। চেহারায় ফিরে এলো পুরনো কাচুমাচু ভাবটাও।
- না বাবা, আপ্নেই তো সব ব্যবস্থা কইরা দিলেন। তয় আপ্নাগো কথা বইলা তো
ওয়ার্ড বয়ে টেকা নিলো। আয়া ২০০ টেকা নিলো ক্যাথেটার করাইয়া । সিট দেয়ার
জইন্যে একজনে নিল ৫০০ টেকা, আর আপনেগো ফি বাবদ একজন লোকে নিছে তিনদিনে
দেড়হাজার টেকা। কইছে টেকা দিলে আপনেরা ভালা কইরা দেখপেন। না দিলে নাকি
সমস্যা হইবো।
আর ট্রলিতে কইরা যে এক্সরে করতে নিছিলাম হেরা নিছে ৫০০ ট্যাকা।
কইছে, এই টেকা ডাক্তারগো দিতে অইবো।
মুনীর হতবাক হয়ে গেল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল। কাকে দোষ দেবে?? গ্রাম
থেকে আসা এইসব অবুঝ মানুষকে, নাকি কর্মচারীদেরকে, নাকি হাসপাতাল প্রশাসনকে!
হাসপাতালে রোগী চিকিৎসা ঠিকই ফ্রি পাচ্ছে, কিন্তু নানাভাবে তার
টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারক গোষ্ঠি- যার একটা বড় অংশের সাথে জড়িত
হাসপাতালের তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা।
আর সব প্রতারকই খাচ্ছে ডাক্তারের নাম ভাঙ্গিয়ে।
মুনীর জানে, এরকম হয়। তবু নতুন করে কিছুটা হতাশা বোধ করে সে। বিনামূল্যে
খেটে, দরদ নিয়ে রোগীর জন্য কাজ করেও শেষমেষ বদনামটা ডাক্তারকেই কাঁধে নিতে
হয়। কারণ, সাধারণ মানুষ হাসপাতাল প্রশাসন চেনে না। তারা জানেনা হাসপাতালের
ব্যবস্থাপনার সব দায়িত্ব হাসপাতাল প্রশাসনের।
তাদের কাছে হাসপাতাল মানেই- "ডাক্তার"।
ওয়াবিল ওয়ালিদাইনে ইহসানা। তোমরা পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। এইটুকু
সবাই জানে। কারণ, পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের শিক্ষা সবাইকে দেয়া হয়।
কিন্তু সন্তানের প্রতি পিতামাতার দায়িত্ব কী- এইটা কোথাও শিক্ষা দেয়া হয়
না। সন্তানের ওপর পিতামাতার অধিকার কী তা নিয়া অনেক ওয়াজ নসিহত হয়,
কিন্তু সন্তানের অধিকার কী- সেটা নিয়া কোন নসিহত পাওয়া যায় না। কোন বয়ান
শোনা যায় না।
ফলে বাস্তব অবস্থাটা হতাশাজনকই থাকে। গাছের নিকট সবাই ফল প্রত্যাশা করে, সবাই জানে- আমগাছের উচিৎ ভালো ভালো আম উপহার দেওয়া। কিন্তু
আমগাছকে যে গোড়ায় পানি দিয়ে, যত্ন করে বাড়তে দিলে তবেই ভালো ফল পাওয়া
যাবে এইটা আমাদের সমাজের পিতামাতারা বোঝেন না। আর দিনশেষে সব দোষ ঐ
ছেলেমেয়েদের ঘাড়েই বর্তানোর ধান্দায় থাকেন। ছেলেটা বিগড়ে গেছে, মেয়েটা
বেয়াদব হয়ে গেছে এইসব বলে তাঁরা নিজেদের দায় এড়িয়ে যান।
কোন কোন বাবা-মা সন্তানদেরকে ঘরের অন্যান্য আসবাবপত্রের মত একান্ত
ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করেন, জড়বস্তুর মত মনে করেন। নিজের সিদ্ধান্তই
সর্বেসর্বা, দুইদিনের বাচ্চা- এরা আর কী বুঝবে (!) এইরকম মনোভাব পোষণ করেন।
তারা হয়ে ওঠেন সংসারের স্বৈরাচারী শাসক। নিজের পছন্দ অপছন্দকে সন্তানদের ওপর চাপিয়ে দেন। ওরাও যে একেকজন স্বতন্ত্র মানুষ এই সত্যটা একদম স্বীকার করতে চান না।
সমাজের যতসব বিশৃঙখলা অরাজকতা, তার পেছনে বাবা-মায়েদের এইসব দৃষ্টিভঙ্গিকে
আমি অনেকাংশে দায়ী মনে করি। আসলে, বাচ্চাদের শিক্ষার পাশাপাশি
বাপ-মায়েদেরও শিক্ষার ব্যবস্থা করা জরুরি। কিন্তু প্রশ্ন হলো সেটাই-
বিড়ালের গলায় ঘন্টাটা বাঁধবে কে?
তবু আমরা হেঁটেছিলাম, ক্ষতবিক্ষত পা নিয়ে- ক্রমাগত হেঁটেছিলাম রাত্রির দীর্ঘ পথ।
তারপর ভোর হলে দেখা গেল পৌঁছেছি গিয়ে এক অদ্ভুত ঠিকানায়। যেখানে সূর্যের ঔজ্জ্বল্য ম্লান মনে হয়। যেখানে চাঁদকে মনে হয় ঘরের পিদিম, যেখানে পুরোপুরি বদলে গিয়েছিলো সুখ ও সৌন্দর্যের পুরনো সংজ্ঞা।
ডাক্তাররা
কমিশন খাওয়া বন্ধ করলে চিকিৎসা ব্যয় ৪০% কমে যাবে। এই ছিল দৈনিক
ইত্তেফাকের সাম্প্রতিক একটি খবরের শিরোনাম। প্রফেসর প্রাণ গোপাল স্যারকে
উদ্ধৃত করে তারা এই সংবাদটি করেছে। আমি নিশ্চিত এটা প্রাণ গোপাল স্যারের
বক্তব্যের একটা খন্ডিত অংশ মাত্র। তিনি নিশ্চয়ই আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা
বলেছেন। কিন্তু সাংবাদিক মহাশয় সেসব বাদ দিয়ে এই খন্ডিত অংশটিকে হাইলাইট
করেছেন। এবং বলা বাহুল্য, খবরটি বংগ জনতার খুবই "মনে ধরেছে"!! কোন এক
অদ্ভুত কারণে এদেশের মানুষের একটা অংশ ডাক্তারের বিরুদ্ধে কথা বলতে
পৈশাচিক আনন্দ বোধ করেন।
যাহোক, প্রশ্ন হচ্ছে, সমস্যাটা আসলে কি "ডাক্তারদের কমিশন খাওয়া"?
সম্পূরক প্রশ্নগুলো হচ্ছে, ডাক্তাররা কীভাবে কমিশন খায়? ডাক্তাররা কি
কাউকে কমিশন দিতে বাধ্য করতে পারে? আর কীভাবে এটা বন্ধ করা যায়?
প্রথমত, ডাক্তারদের মধ্যে বেশিরভাগই কোনরকম কমিশন খান না। বরং যেখানেই সম্ভব, চেষ্টা করেন রোগীর ল্যাব খরচ কমাতে।
গুটিকয়েক অসাধু ডাক্তার কমিশন খান। তারা এটা খান "ডাক্তার" হিসেবে না,
মন্দ মানুষ হিসেবে। প্রত্যেক প্রফেশনে যেমন কিছু মন্দ মানুষ আছে, তেমনই।
দ্বিতীয়ত, কোন ডাক্তারই কমিশন দিতে কাউকে বাধ্য করেন না। বরং,
ডায়াগনোস্টিক সেন্টারগুলোই অনেকসময় ডাক্তারকে বাধ্য করে কমিশন নিতে।
কারণ, তারা ল্যাব টেস্টের দাম কমায় না। বরং, রেফারেলের জন্য বরাদ্দ টাকাটা
ডাক্তার না নিলেও ল্যাবেরই কেউ না কেউ ডাক্তারের নাম করে মেরে দেয়। এজন্য
অনেক ডাক্তারই আছেন, রেফারেল ফি নামে যে টাকা ডায়াগনোস্টিকগুলো দেয়,
সেটা তারা পুরোপুরি গরীব রোগীদের জন্য ব্যয় করেন।
আর বড়
হাসপাতালগুলোতে যারা বসেন, তারা আসলে কোনভাবেই এইসব কমিশন টমিশন পান না।
এইসব ঘটে মূলত ছোটখাটো নামকাওয়াস্তে হাসপাতাল ও ডায়াগনোস্টিক গুলোতে।
তৃতীয়ত, মূল প্রশ্ন হচ্ছে, এই কমিশন প্রথার জন্য দায়ী কে? ডাক্তার, নাকি অন্য কেউ? এটা বন্ধ করার উপায়টাই বা কী?
আসলে এই প্রথা কোনভাবেই ডাক্তারদের তৈরি নয়। এটা তৈরি করেছে ব্যবসায়ীরা,
যারা মানুষের অসুস্থতাকে ব্যবসার পুঁজি করেছে টাকা বানানোর উপায় হিসেবে।
তারা বিভিন্ন ল্যাব টেস্ট এর মূল্য অস্বাভাবিক বেশি রেখে মুনাফা করছে, আরো
বেশি মুনাফার লোভে ডাক্তারদের পেছনে টাকা নিয়ে ঘোরাফেরা করে, আর কিছু কিছু
ডাক্তারকে খাওয়াতেও পেরেছে।
এটা বন্ধ করার উপায় কী? ডাক্তারদের উদ্দেশ্যে নসিহত কিংবা উষ্মা প্রকাশে কোন সমাধান আসবে কি?
মোটেও না। গোড়ায় হাত দিতে হবে। এইযে ল্যাব টেস্টগুলোর অস্বাভাবিক মূল্য,
এটা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ডায়াগনোস্টিক সেন্টারগুলোতে বিভিন্ন টেস্টের
মূল্য বেঁধে দিতে হবে। ডায়াগনোস্টিক সেন্টার যদি অতিরিক্ত মূল্য নিতে না
পারে, তাহলে তারা কোথা থেকে কমিশন দেবে? ফলে অটোমেটিকালি বন্ধ হয়ে যাবে এই
তথাকথিত কমিশন প্রথা ।
একই কথা ঔষধের ক্ষেত্রেও। ঔষধের দাম উৎপাদন খরচের চেয়ে অস্বাভাবিক বেশি। এটা নিয়ন্ত্রণ করলে মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমবে।
কিন্তু এই দায়িত্ব তো ডাক্তারদের না! এটা প্রশাসনের দায়িত্ব, সরকারের
দায়িত্ব। সুতরাং, "ডাক্তাররা কমিশন খাওয়া" বন্ধ করলে চিকিৎসা ব্যয় কমবে,
এটা একটা অযৌক্তিক কথা। এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তিমূলক এবং বলা যায়
পরশ্রীকাতরতানির্ভর বক্তব্য। এটা প্রাণ গোপাল স্যারের বক্তব্য নয়, এটা ঐ
সাংবাদিকেরই টুইস্টেড কথা। আসলে বক্তব্যটা হওয়া উচিৎ, ঔষধ ও
ডায়াগনোস্টিক টেস্টের মূল্য নির্ধারণ করে দিলে চিকিৎসা ব্যয় কমবে। কিন্তু
সেকথা না বলে, সমস্যার মূলে আঘাত না করে, শুধু ডাক্তারদের ঘাড়ে দোষ
চাপিয়ে বক্তব্য দেয়া আসলে অসুস্থ মানসিকতা ছাড়া আর কিছু নয়।
স্বাস্থ্যসেবা আইন' ২০১৬ নামে আইনের একটি খসড়া আইন কমিশনের বিবেচনাধীন আছে। এতে বারোটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত ৫২ টি অনুচ্ছেদ রয়েছে।
জনগনের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আইনের প্রয়োজন আছে। তবে আইন
হতে হবে যৌক্তিক, যাতে সব পক্ষের সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকে। এই আইনে অনেক
ভালো দিক রয়েছে, কিন্তু চিকিৎসায় অবহেলাকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে তা
নিয়ে যথেষ্ট বিতর্কের সুযোগ আছে। এখানে পেশাগত অবহেলা বলতে বোঝানো হয়েছে-
'ভুল চিকিৎসা' যা দ্বারা 'রোগ মুক্তি ঘটে না' বা 'বিলম্বিত হয়'।
যেকোন চিকিৎসার অনেক ধাপ আছে। এর যেকোন পর্যায়ে সমস্যা হলে কাংখিত ফল পাওয়া নাও যেতে পারে।
মনে রাখতে হবে, চিকিৎসার শুরুটা কিন্তু রোগীর হাতেই । রোগী সঠিক সময়ে
ডাক্তারের কাছে গেলেন কিনা, রোগের কোন অবস্থায় ডাক্তারের শরণাপন্ন হলেন,
ডাক্তারের কাছে ঠিকঠিক মত তার সমস্যার কথা বললেন কিনা, রোগের ইতিহাস ঠিকমত
দিতে পারলেন কিনা, কোনকিছু গোপন করলেন কিনা তার ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতের
চিকিৎসা । এরপর কিছু অংশ ডাক্তারের হাতে। ডাক্তার কতটা দক্ষ, কতটা অভিজ্ঞ, কতটা জ্ঞানী সেটার ওপর নির্ভর করবে তাঁর রোগ নির্ণয়ের দক্ষতা।
তারপরের কিছু অংশ প্যাথলজি বা অন্যান্য ডায়াগনোস্টিক টেস্টের ওপর। সেগুলো
আবার নির্ভর করে ল্যাবের যন্ত্রপাতির গুণগত মান, টেকনিশিয়ানের দক্ষতার ওপর।
রোগ নির্ণীত হলে পরে চিকিৎসা। একই রোগের চিকিৎসা আবার সকল রোগীর
ক্ষেত্রে একরকম হবে না। পার্থক্য হবে রোগীর শারীরিক অবস্থা, অন্যান্য রিস্ক
ফ্যাক্টরের উপস্থিতির ওপর। একটি রোগের সাথে অন্যান্য রোগের সহাবস্থানও
চিকিৎসার বিরাট অন্তরায়। রোগীর আর্থিক সক্ষমতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
একটি রোগের চিকিৎসার বিভিন্ন পন্থা থাকে। রোগী কোন পন্থা গ্রহণ করতে চান সেটাও একটা ব্যাপার।
সবশেষে ঔষধ প্রয়োগ। ডাক্তার রোগীকে ঔষধ গ্রহণের পরামর্শ দেন। কিন্তু সেই
ঔষধ রোগী সঠিক সময়মত, সঠিক পরিমাণে, সঠিক পন্থায় গ্রহণ করছেন কিনা তার ওপর
নির্ভর করবে ওষুধের রেসপন্স।
শুধু ওষুধ গ্রহণ করলেই চলে না, ঠিকমত
মানতে হবে অন্যান্য পরামর্শও। নিয়মিত ফলো আপ করাও অত্যন্ত জরুরী। ওষুধের
প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুসারে ডোজ এডজাস্ট করা দরকার হয়।
এছাড়াও ডাক্তার যে ওষুধ প্রেসক্রাইব করেন সে ওষুধ কিন্তু তিনি প্রস্তুত
করেন না। ওষুধ কোম্পানি যথাযথভাবে ঔষধ প্রস্তুত করেছে কিনা, ফার্মেসি ঠিকমত
সংরক্ষণ করেছিল কিনা তার ওপর নির্ভর করবে ওষুধের কার্যকারীতা। আবার ওষুধ
একই হলেও বিভিন্ন জনের শরীরে তার কার্যকারীতা বিভিন্নরকম হতে পারে।
এতগুলো ফ্যাক্টর জড়িত একজন মানুষের যেকোন একটি রোগের চিকিৎসায়। এখন রোগীর
রোগ মুক্তি না ঘটলেই বা বিলম্ব হলেই কি তাকে ভুল চিকিৎসা বলা যাবে? তাই যদি
হয়, তাহলে এদেশে চিকিৎসকরা চিকিৎসা দিতেই পারবেন না। আর বিলম্বের
সংজ্ঞাটাই বা কী? এক সপ্তাহে ক্যান্সার থেকে মুক্তি না মিললে সেটাকে কি
রোগ মুক্তিতে বিলম্ব বলা যাবে?
চোখ? নাকি মন? ঝাপসা হয়েছে কোনটা? কেন আবছা লাগে আজ ফেলে আসা সোনালি সময়? কেন অস্পষ্ট হয়ে আসে প্রিয় মানুষের মুখ? কেন অসাধারণ দৃশ্যগুলো আজ শুধু আলো ছায়ার খেলা মনে হয়?
জীবনের শেকড় হতে ক্ষণে ক্ষণে বাষ্পীভূত হতেছে প্রতিদিন শুধু কি সময়? নাকি আরো অনেক অনেক অজানা মূলধন হইতেছে ক্রমাগত ক্ষয়?
ভাইভা বোর্ডের চেয়ারম্যান ডাঃ আব্দুল করিম সাহেব। তিনি এই শহরের একজন
সিনিয়র, নামকরা, প্রথিতযশা ডাক্তার। সম্প্রতি কয়েকজন বন্ধুর সাথে
শেয়ারে একটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেছেন। আজকে সেই ক্লিনিকের ডাক্তার
নিয়োগের জন্য ভাইভা আহবান করা হয়েছে। ইতোমধ্যে শুরুও হয়ে গেছে। প্রফেসর
সাহেবের সামনে এই মুহূর্তে বসে আছে তরুণ ডাক্তার মুনীর।
- স্যার বেতন সম্পর্কে যদি একটু ধারণা দিতেন। - বেতন আমরা ঠিক করেছি মাসিক ২০০০০ টাকা দেব। - স্যার এটাতো খুব কম হয়ে যায়। - বলো কী! তুমি জানো আমি কত টাকা বেতনে চাকরি শুরু করেছিলাম? বলো, আন্দাজ করে বলো দেখি। - জানি না স্যার। - মাত্র ৫০০ টাকা! বুঝলা, মাত্র ৫০০ টাকা।
প্রফেসর সাহেব কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লেন। সেসময় ৫০০ টাকায় কী কী
করেছিলেন তার হিসাব দিতে শুরু করলেন। কীভাবে ৮০ টাকায় একটা মোটাতাজা গরু
কিনেছিলেন তার বর্ণনা দিতে গিয়ে চোখ বুজে এলো প্রফেসর সাহেবের!
তারপর তিনি বললেন- দেখো বাবা, ২০০০০ টাকা অনেক বেশি টাকা। এর বেশি আমরা দিতে পারবো না!
মুনীর বের হয়ে এলো। তার বলতে ইচ্ছে হয়ঃ স্যারগো স্যার, এইটা ২০১৬ সাল।
২০০০০ টাকায় এখন ষাঁড় নয়, বড়জোর একটা বকনা বাছুর কেনা যায়। যেকোন
একটা ব্যাংকের প্রবেশনারি অফিসার যেখানে এট লিস্ট চল্লিশ হাজার টাকা বেতন
পায়, সেখানে কীকরে আপনি একজন পূর্ণকালীন ডাক্তারের বেতন বিশ হাজার টাকা
প্রস্তাব করেন?
কিন্তু মুনীর ভদ্র ছেলে, সে কিছুই বলতে পারে নি। বড়দের সামনে বেশি কথা বলতে নেই, এতে নাকি বেয়াদবি হয়ে যায়!
।।।এভাবেই সিনিয়র ডাক্তারদের ইচ্ছায় অথবা তাদের নির্লিপ্ত চোখের সামনে
নিষ্পেষিত হয় জুনিয়র ডাক্তাররা। কারণ, সিনিয়রদের চোখের সামনে আজও ভাসে
ষাটের দশকের সেই ৫০০ টাকা, যখন ৮০ টাকায় পাওয়া যেত একটা মোটাতাজা
গরু...।।।
ভাইভা বোর্ড। মেডিকেল
কলেজ হাসপাতালে নতুন ট্রেইনি ডাক্তাররা পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেনিং এ যোগ
দিতে এসেছেন। বলা বাহুল্য, সম্পূর্ণ বিনা বেতনে। পেট চালানোর জন্য তাদের
অন্য কোথাও অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। এই মুহূর্তে ভাইভার টেবিলে আছে তরুণ
ডাক্তার মুনীর।
প্রফেসরঃ
দেখো, আমার এখানে প্রতিদিন সকাল ৮ টায় আসতে হবে। এক মিনিট যেন এদিক ওদিক
না হয়! আর তিনটার আগে কোনভাবেই যাওয়া চলবে না। সপ্তাহে দুইদিন এভেনিং ও
নাইট ডিউটি করতে হবে। মুনীরঃ স্যার সপ্তাহে এক দিন যদি অফ দিতেন স্যার... প্রফেসরঃ না, এইখানে কোন অফ টফ চলবে না। ঠিকমত রোগী দেখবা। তুমি ডিগ্রী করতে আসছো না? জ্বি স্যার।
মুনীরের
একবার মনে হলো মুখ ফুটে বলে দেয়, যে তার মত জুনিয়র ডাক্তাররা হাওয়া
খেয়ে বাঁচে না। তারাও রক্তমাংসের মানুষ, তাদেরও ক্ষুধা আছে, তাদেরও পরিবার
পরিজন আছে। এমবিবিএস পাস করে এসে একজন ডাক্তারের পক্ষে বিনা পারিশ্রমিকে
এইভাবে কাজ করা সম্ভব নয়। কিন্তু
মুনীর কিছুই বলতে পারে না। এইসব বলা যায় না। পাছে যদি বেয়াদবি হয়ে
যায়! প্রফেসরের কুনজরে পড়লে যে পরবর্তীতে পরীক্ষার ভাইভায় কোনভাবেই
উতরানো যাবে না।
(এভাবেই দিনের পর দিন টিকে থাকে অবৈতনিক/অনারারী
চিকিৎসা কর্মকর্তা নামের অমানবিক প্রথা.. হাজার কোটি টাকা ঠিকাদাররা
লুটেপুটে খায়, কিন্তু প্রফেসররা তার অধীনে প্রশিক্ষণরত ডাক্তারদের জন্য
মাত্র কয়েক'শ কোটি টাকা বরাদ্দ নিতে পারেন না।)
রাত প্রায় দু'টা বেজে গেছে। ডিউটি আওয়ার শেষ হতে আরো ছয় ঘন্টা বাকি। মুনীর এখন আছে সরকারী হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে।
আজকে এই ওয়ার্ডে এডমিশন নেই, মানে নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে অন্য ওয়ার্ডে। সেজন্য কিছুটা রিলাক্স হয়ে বসার সুযোগ পাওয়া গেল এতক্ষণ পর হলেও। এডমিশন নাইট হলেতো এক মুহূর্ত বসার সুযোগ হত না।
মুনীর কোথায় যেন পড়েছে, কবিরা নাকি খুব সৌন্দর্যপিপাসু হয়। চা-খোর যেমন মজা করে চা খায়, কবিরা নাকি সেরকম একটু একটু করে সবকিছুর সৌন্দর্য চিবিয়ে চিবিয়ে উপভোগ করে। মুনীর কবি নয়, কিন্তু সেও সৌন্দর্য পিয়াসীদের একজন। এই মুহূর্তে মুনীরের মনে পড়ে, হোস্টেলের ছাঁদে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে কত রাত কাটিয়ে দিয়েছে সে। কৃষ্ণচূড়া গাছটার পাতার ফাঁকে দেখেছে চাঁদের লুকোচুরি। পশ্চিমের চাঁদ একসময় ঢলে গেছে পূবের আকাশে, পূবের চাঁদ পশ্চিমে। একেকটা মুহূর্তের একেকরকম সৌন্দর্য। অমাবশ্যার রাতে যখন পেঁচারা উড়ে যায়, তারও একটা অন্যরকম সৌন্দর্য আছে।
"স্যার একটু আইবেন?" চিন্তায় ছেদ পড়ে মুনীরের। দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে এক পিচ্চি মেয়ে। বয়স সাত কি আট হবে হয়তো। "কী হয়েছে বাবু?" নরম কন্ঠে জিজ্ঞেস করে মুনীর। "স্যার আমার মায়ের শ্বাসকষ্ট। মায় আপনারে ডাকতে কইছে।" স্টেথোস্কোপ গলায় ঝুলিয়ে দ্রুত উঠে পড়ে মুনীর। চলো চলো চলো, পিচ্চিটাকে তাগাদা দিয়ে নিয়ে চলে নির্দিষ্ট বেডের দিকে। যাওয়ার সময় নার্সকেও একটা হাঁক দিয়ে যায়। সিস্টার তেইশ নাম্বারে আসেন।
রোগীর ডায়াগনোসিস একিউট সিভিয়ার এজমা। গতকাল ভর্তি হয়েছে প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট নিয়ে। পাক্কা দুই ঘন্টা চেষ্টার পর তার অবস্থা স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়েছিল।
শ্বাসের কষ্ট খুব খারাপ। জীবন সংশয়ের কথা বাদ দিলেও, একজন মানুষ নিঃশ্বাস নিতে পারছেনা, এটা কি যা-তা কথা? মুনীর ভাবে, আল্লাহ তায়ালা আমাদের কত আরামে রেখেছেন। তবু মানুষ কত অকৃতজ্ঞ। মুনীরের মনে হয়, একজন মানুষের যদি কিছুই না থাকে, সে যদি শুধু নিশ্চিন্তে শ্বাস নিতে পারে- তাতেই তার মস্তক অবনত করে স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত। দুনিয়ায় কিছু কিছু মানুষকে শ্বাসকষ্টের রোগ দিয়ে আল্লাহ হয়তো সকল মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেন তাঁর অশেষ নেয়ামতের কথা।
মুনীর রোগীর পাশে বসে অনেকক্ষণ কাটিয়ে দিলো। শুধু ওষুধ দিয়ে ক্ষান্ত নয়, মুনীর সবসময় চেষ্টা করে রোগীকে পাশে দাঁড়িয়ে মানসিক শক্তি যোগানোর। যদিও সবসময় তা সম্ভব হয়ে ওঠে না। মুনীরের অবজার্ভেশান হলো, ওষুধের পাশাপাশি মানসিক শক্তি যোগালে রোগীর উন্নতি ত্বরান্বিত হয়। একবার এমন হলো, বয়স্ক এক রোগী হাত ধরে বলে, বাবা আপনি আমার পাশে থাকেন, আপনি গেলে আমি বাঁচবো না। সত্যিই দেখা গেলো, মুনীর সেই রোগীর কাছে থাকলে তার শ্বাসকষ্ট কমে যায়, আবার দূরে গেলে বাড়ে। সাইকোলজিকাল ব্যাপার স্যাপার।
ঘড়ির কাঁটায় তিনটা অতিক্রম করে গেছে। হেঁটে হেঁটে রোগীদের অবস্থা দেখছে মুনীর। রাতের এই প্রহরে প্রায় সব রোগীই ঘুমিয়ে পড়েছে। হাঁটতে হাঁটতে মুনীর আবার এসে দাঁড়ায় তেইশ নাম্বার বেডের পাশে। এক বেডেই মা মেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। একটু আগে কী কষ্টই না পাচ্ছিলো মা-টা। আর বাচ্চাটার মুখে ফুটে উঠেছিল কী সীমাহীন উৎকন্ঠা!
আজ বাইরের পূর্নিমা চাঁদ দেখা হয়নি মুনীরের। কিন্ত এই মুহূর্তে হাসপাতালের এই ওয়ার্ডে ঘুমন্ত রোগীদের মুখ যেন একেকটা চাঁদ হয়ে ধরা দেয় মুনীরের চোখে। ভরা পূর্ণিমার চাঁদের আলো এই প্রশান্তির কাছে ম্লান হয়ে যায়।
মুসলমানদের মধ্যে এমনিতেই বিভেদের শেষ নাই। এই মাযহাব সেই মাযহাব সালাফী ওহাবী পীর পন্থি মাজার পন্থি এই পন্থি সেই পন্থি আরো কত কী! এর মধ্যে আবার কিছু লোক একটা নতুন টার্ম নিয়ে এসেছে। তারা মুসলমানদের নতুন করে দুই ভাগে ভাগ করেছে- প্রাক্টিসিং মুসলিম এবং নন প্রাক্টিসিং মুসলিম !! মানে হইলো- যার দাড়ি আছে বা যে মহিলা নিকাব পড়ে সে হইলো গিয়া প্রাক্টিসিং মুসলিম আর যার দাড়ি নাই সে হইলো গিয়া নন প্রাক্টিসিং মুসলিম!!!
মুসলিমদের অবশ্যই ইসলামের বিধিবিধান মেনে চলা উচিৎ। যারা মানেন না তাদেরকে মানার ব্যাপারে উৎসাহ দেয়া ও সহযোগিতা করা উচিৎ। কিন্তু এইসব প্রাক্টিসিং নন প্রাক্টিসিং টার্ম ব্যবহার চরম বেকুবি ছাড়া আর কিছু না। যারা এইসব টার্ম ব্যবহার করে, আমার মনে হয় তারা ভেতরে ভেতরে নিজেদের বুজুর্গী নিয়া অহংকার বোধ করেন। অন্যদেরকে নিজেদের তুলনায় খানিকটা ইনিফেরিওর ভাবেন।
ভাইবইনগন, আল্লাহর কাছে কোন বুজুর্গের অবস্থা কী হবে তা আল্লাহই ভালো জানেন। দুনিয়ায় বুজুর্গীর অহংকার দেখাইয়েন না।
সিলেটের ঘটনায় যে মেয়েটা ভিডিও করেছে, তাকে আমি ধন্যবাদ জানাই। এর বেশি কিছু করা ঐসময় তার পক্ষে মোটেও সম্ভব ছিলনা। সুতরাং সে যা করেছে একদম ঠিক কাজটাই করেছে। ভিডিও দেখে আমার মনে হয়েছে, অন্য কেউ এগিয়ে গেলেও সেসময় খুব বেশি কিছু করতে পারতো না। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, বদরুল খুব বেশি সময় নেয় নাই নার্গিসকে কোপানোর জন্য। সে পুরোপুরি উন্মাদ ছিল। মনে হয়, এইরকম প্রকাশ্যে কোপানোর ফলে তার নিজের পরিণতিও যে খারাপ হবে, এটা জেনেবুঝেই সে কোপাতে এসেছিল।
ধারালো অস্ত্রের মুখে নিজের বাপ-মা ভাইবোন ছাড়া অন্য কেউ খালি হাতে এগিয়ে যাবে, এই নষ্ট সময়ের নষ্ট সমাজে আপনি আমি কেউই তা আশা করতে পারিনা। আপনি নিজেও হয়তো কারো সাহায্যের জন্য হুট করে এমন ধারালো অস্ত্রের সামনে গিয়ে দাঁড়াবেন না। পরে কিন্তু ঠিকই বদরুলকে ধরে গনপিটুনি দিয়েছে। এরকম সময়ে এমন একটা অতর্কিত নৃশংস হামলার মোকাবেলায় মানসিক ও শারিরীক প্রস্তুতির জন্য উপস্থিত লোকজনকে ওটুকু সময় দিতেই হবে।
কেউ পানিতে ডুবে যাচ্ছে, অথবা কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েছে এমন সময় ভিডিও করার সুযোগ নেই, কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। কিন্ত অপরাধমূলক কোন ঘটনা সংঘটিত হতে দেখলে সুযোগ থাকলে অবশ্যই ভিডিও করতে হবে। সবাই ভিডিও করবে তা নয়, কিন্তু কাউকে না কাউকে ভিডিও বা অডিও নিতে হবে। নিজে হেল্প করতে গেলেও অন্য কাউকে ভিডিও নিতে বলে যাওয়া দরকার। অতি রাজনৈতিক বিভাজন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে পক্ষপাতদুষ্ট প্রশাসন আর চরম মিথ্যাচারী বায়াসড মিডিয়ার এই যুগে ভিডিওর মত অকাট্য প্রমাণ অত্যন্ত জরুরী। এপর্যন্ত বেশ কিছু ঘটনায় শুধুমাত্র ভিডিও থাকার কারণে অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। ভিডিও না থাকলে তা কতটুকু সম্ভব হত জানিনা।
দীর্ঘদিন পরিকল্পনা নিয়ে যখন কেউ অপরাধ করতে আসে, তখন তাকে প্রতিরোধ করা যায় না। এটা সহজ না। কিন্তু ডকুমেন্ট রাখতে পারলে তাকে খুঁজে বের করা যায়। শাস্তি দেয়া যায়। অপরাধীদের জন্য এটা কম ভয়ের বিষয় নয়।
এইযে শুন্য খাতা পড়ে আছে টেবিলের একপাশে, ল্যাপটপের ভেতর এমএস ওয়ার্ডের নতুন একটা ফাইল বহুদিন ধরে একদম ফাঁকা হয়ে আছে- লিখবার মানুষটা লিখছে না কিছু আর গহন হৃদয়ের কথা, কোন ব্যথা, কোন অনুভূতি তার- আসছেনা অক্ষরের রুপ নিয়ে কাব্যভূক চোখের ভেতর জানেন, কেন হারায় এইভাবে মানুষের পাললিক অন্তর?
তবে কি সকলেই গেয়ে যাবো নষ্ট এ সময়ের গান? ব্যস্ততা মানে কি এইভাবে ভুলে থাকা হৃদয়ের টান?
একটা কবিতা হবে তোমার কাছে? তোমাদের কাছে? না না, রবীন্দ্রনাথ কিংবা আল মাহমুদ নয়, আমার চাই একদম আনকোরা কবিতা। হবে?
নারী ও পুরুষের প্রেম ভালোবাসা- অনেক হয়েছে বিগত শতকে। অনেক হয়েছে পদ্যের জালে গাঁথা পৌরাণিক কাহিনী। অথচ, আজ এই অশান্ত পৃথিবীতে বড্ড প্রয়োজন নতুন কবিতার। না না কাজী নজরুল নয়, আজ আমি বিদ্রোহ চাই না; আজ আমি চাইনা ক্ষোভের বিস্ফোরণ। আমি চাই- কবিতার আবেশে খুনিরাও হয়ে যাক নতুন মানুষ লুটেরার দল ফিরিয়ে দিয়ে যাক যক্ষের ধন আর রক্তপিপাসু পিশাচেরা সব ধ্বংস করে দিক অস্ত্রের ভান্ডার।
এমন একটা কবিতা আছে কি ডায়েরিতে? তোমাদের কারো কাছে? যদি নাই থাকে এসো তুমি আর আমি মিলে মানবিক পৃথিবীর স্বপ্ন আঁকি। এসো আজ একটা নতুন কবিতা লিখে যাই আগামী পৃথিবীর জন্যে।
সাংবাদিকদের মধ্যে একটা অংশ মনে করেন, সাংবাদিকতা মানেই নেগেটিভ নিউজ করা!
এরা এতটুকু জ্ঞানও রাখেন না, কোন নিউজ কীভাবে করলে প্রকৃত অর্থে দেশ ও জনগন
উপকৃত হবে।
রাজশাহী মেডিকেলে ঈদের সময় রোগীদের পাশাপাশি দায়িত্ব
পালনকারী ইন্টার্ন ডাক্তারদেরকেও হাসপাতালের ব্যবস্থাপনায় খাবার সরবরাহ করা
হয়েছে। এটা ছিল অত্যন্ত ভালো উদ্যোগ। প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কারণ, ঈদের সময়
যখন হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ এবং হোস্টেলের ক্যান্টিন বন্ধ থাকে, আশেপাশের
খাবার দোকান বন্ধ থাকে, এসময় পরিবার পরিজন ছেড়ে হাসপাতালে দায়িত্ব
পালনকারী ডাক্তারদের খাবারের ব্যবস্থা করায় তারা নিশ্চিন্তে দায়িত্ব পালন
করতে পারবেন। রোগীরা পাবে আন্তরিক ও ভালো সেবা। নিশ্চয়ই রাজশাহী মেডিকেলে
তা পেয়েছেও। কিন্তু প্রথম আলোর রাজশাহী প্রতিনিধি এতটাই বেকুব যে, তিনি
ভালো খারাপ বোঝার মত এতটুকু জ্ঞান রাখেন না। যেহেতু আলাদা কোন বরাদ্দ নেই,
ডাক্তারদের খাবারও দেয়া হয়েছে রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেট থেকে। বেকুব
সাংবাদিক নিউজ করেছে- "রোগীর টাকায় ডাক্তারের ভোজ"! অথচ নিউজটা এভাবেও করা
যেত - 'বরাদ্দ নেই ডাক্তারদের জন্য!' সেটা হত ডাক্তার রোগী সবার জন্য
উপকারী। কিন্তু এই বেকুব তথাকথিত সাংবাদিক এতটাই নেগেটিভ মেন্টালিটির
লোক, ভালো মন্দ বোঝার সামান্য যোগ্যতাও তার নেই। একচুয়ালি এদের পত্রিকা
অফিস থেকে বের করে দেয়া উচিত। শাস্তির আওতায় আনা উচিত। কারণ, এদের এইসব
আউল ফাউল নিউজ নষ্ট করছে মানুষের বিশ্বাস। সৃষ্টি করছে সন্দেহ সংশয় ও
আস্থাহীনতা। সর্বোপরি নষ্ট করছে সেবাদানকারীদের সেবা দেয়ার মানসিকতা।
দিনরাত কষ্ট করেও বদনাম পেতে কারো নিশ্চয় ভালো লাগার কথা নয়।
এই বিরাণ রাস্তায় আর কতকাল হেঁটে যাবো একা একা? শীর্ণ পায়ে আমি একাকী পথিক কী করে পাড়ি দেবো- এত দীর্ঘ পথ? . বন্ধুর এই পথচলায় যার কথা ছিল সহযাত্রী হবার কথা ছিল সারাপথ সঙ্গ দেবার কথা ছিল যার সাথে দেখা হবে এইখানে পথের বাঁকে, কোন এক মধ্য দুপুর; স্বর্নবিকেল ; কিংবা কোন এক গোধূলী বেলায়- কথা ছিল যার হাত ধরে হেঁটে যাবো অনন্ত পথ- হায়! আজও পাইনি দেখা তার, আজও হয়নি আমাদের সাক্ষাত। . আলমে আরওয়া হতে নেমে এসে এই মহাকালের গর্ভে ক্রমাগত হাঁটছি তো হাটছিই। কে জানে- আর কতটা পথ হেঁটে গেলে তবে কোন খানে কোন ক্ষণে আমাদের দেখা হবে !
পাবলিক সার্ভেন্ট। অর্থটা সহজেই বোধগম্য- 'জনগনের চাকর'। ভদ্রভাষায়
জনতার 'সেবক'ও বলা যেতে পারে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের নিয়োগকৃত কর্মচারীরা দেশের
নাগরিকদের সেবায় নিয়োজিত থাকবেন। নাগরিকদের কষ্টলাঘব করবেন।
কিন্তু
বাস্তবে ঘটছে তার সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা। যারা আসলে জনগনের চাকর, তারাই যেন
হয়ে উঠেছেন জনগনের প্রভু! কথা ছিল নিজে কষ্ট করে জনগনের কষ্ট লাঘব করবেন,
কিন্তু বাস্তবে তারা এখন নিজের আরামের জন্য জনগনকেই কষ্ট দিয়ে থাকেন।
একটা ছোট্ট উদাহরণ দেয়া যাক। যাচ্ছিলাম ব্যস্ত রাস্তায়। হঠাত দেখি রাস্তা
আটকে দেয়া হয়েছে। কারণটা জানা গেল একটু পরেই। একজন উচ্চপদস্থ (!) সরকারি
কর্মচারী তার গাড়ি নিয়ে অফিস থেকে বের হবেন। তাই জনতার গাড়ি আটকিয়ে রাস্তা
ফাঁকা করে রাখা হচ্ছে!!
কথা
ছিল আগে জনগনের চলাচল নির্বিঘ্ন করার, অথচ ঘটছে উল্টো ঘটনা। তাহলে মালিক
কে, আর গোলাম কে? এযেন সেই প্রফেসির বাস্তবরুপ- দাসীর পেটে হচ্ছে এখন
মালিকের জন্ম!!
স্মার্টফোন এখন সবার হাতে হাতে। আর স্মার্টফোনে ইন্সটল করা হচ্ছে
'স্মার্ট' গেমস। অনলাইনে বা অফলাইনে যতগুলো গেমস আছে, এর একটা বিরাট অংশ
তৈরি হয়েছে সহিংসতাকে ভিত্তি করে। গেমস মানেই সংঘাত, সংঘর্ষ। নায়কের হাতে
বন্দুক, গ্রেনেড। শত্রুর হাতে বন্দুক, গ্রেনেড। যুদ্ধ, আক্রমণ, আত্মরক্ষা-
এইসব হয়ে দাঁড়িয়েছে গেমসের মূল বিষয়। নিরীহ স্নেক বা মোটো রেসের গেম এখন
নিতান্তই সেকেলে।
এতে সমস্যা কী? সমস্যাটা হচ্ছে, এইসব সহিংসতা নির্ভর গেম এখন শিশুরাও খেলছে। বাবার মোবাইল কিংবা মামা চাচা ভাইয়া আপুদের মোবাইল হাতে নিয়ে শিশুরাও নিমগ্ন হয়ে যাচ্ছে এইসব গেমসে।
এটা কোন নির্মল আনন্দ নয়। আসলে অর্থহীন খেলাধুলাতেই শুধু আছে নির্মল
আনন্দ। এইসব জটিল গেমস শিশুদেরকে স্মার্ট বানানোর চেয়ে অনেক বেশি জটিল
বানাচ্ছে। যতটা জটিলতা থাকার কথা নয় তার চেয়ে বেশি জটিল হয়ে পড়ছে বাচ্চাদের
চিন্তাভাবনা। তাদের বেড়ে ওঠাটা হচ্ছে না ধারাবাহিক, হচ্ছে না ক্রমান্বয়ী।
এমনকি বাচ্চাদের হাতে এইসব গেমস ভেতরে ভেতরে হয়তো অজান্তেই উগ্র করে তুলছে
তাদেরকে! তাদের কাছে মনে হতে পারে, এইসব গোলাগুলি এটাক পাল্টা এটাক বোধহয়
খুবই স্বাভাবিক! সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটা হচ্ছে- বড় হতে হতে একসময় তারা বাস্তবে
এইসব এডভেঞ্চারের স্বাদ নিতে আগ্রহী হতে পারে। আর তাদেরকে এই এডভেঞ্চারের
স্বাদ দিতে বর্তমান পৃথিবীতে অনেক গোষ্ঠী তো প্রস্তুত আছেই।
সতর্ক না হলে এইসব গেমসের শেষটা হয়তো ভবিষ্যতে আমাদের অনেক খারাপ কিছুর মুখোমুখি করবে।
একটা রোগী? নাকি দুইটা রোগী? কয়টা রোগী আছে? অনেক ডাক্তার নার্সদের মুখে
অনেক সময় এমন কথা শোনা যায়। "একটা" বা "দুইটা", এগুলো বস্তু বা অবোধ
প্রাণীর সংখ্যা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। মানুষের ক্ষেত্রে সংখ্যাবাচক হিসেবে
ব্যবহৃত হওয়া উচিত "কতজন"।
হয়তো এই 'একটা' 'দুটা' 'কয়টা' শব্দগুলি
উদ্দেশ্যমূলক নয়, হয়তো কেউ কেউ সহজে বলার সুবিধার্থে এভাবে বলে থাকেন,
কিন্তু তবু শব্দটা বেশ শ্রুতিকটু। রোগীর জন্য সম্মানজনক নয়। এতে করে কিছুটা
হলেও রোগীর প্রতি সম্মানহীনতা ফুটে ওঠে।
ডাক্তার ও নার্সদের মনে রাখতে হবে,
রোগী কোন 'বস্তু' নন, রোগী একজন মানুষ, আশরাফুল মাখলুকাত। আর সৃষ্টিকর্তার
কাছে প্রত্যেক মানুষই সম্মানিত। মানুষের কাছেও প্রত্যেক মানুষই সম্মান
পাবার অধিকার রাখেন। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে, ধনী গরীব ভেদাভেদের উর্ধ্বে,
সকলেই।
একইভাবে রোগীকে
"তুমি" সম্বোধন প্রসংগও উল্লেখ করা যায়। অনেককেই দেখি গরীব রোগীকে "তুমি"
সম্বোধন করতে। এটা অনাকাঙ্ক্ষিত। ধনী গরীব সকল রোগীকে "আপনি" সম্বোধন করা
উচিত। মনে রাখতে হবে, রোগী প্রথমত একজন 'মানুষ'।
মানুষের প্রতি
সম্মান মানুষকেই করতে হবে। ডাক্তারদের মত উচ্চশিক্ষিত মানুষদের কাছে যদি
একজন মানুষ ধর্ম বর্ণ সম্পত্তি নির্বিশেষে সম্মান না পায়, তাহলে এ সমাজে
আর কার কাছ থেকে সভ্যতা আশা করা যেতে পারে?
মেডিকেল এবং ভার্সিটির ভর্তি এসএসসির পরেই হওয়া উচিত । আমার মনে হয়, উচ্চ
মাধ্যমিকের নামে দুই তিনটি বছর অযথাই নষ্ট করা হচ্ছে। উচ্চ মাধ্যমিকে যা
শেখানো হয় তা আসলে পরবর্তী জীবনে কোন কাজে আসে না। বরং এসএসসি পর্যন্ত যা
শেখানো হয়, ভিত্তি হিসেবে সেটুকুই যথেষ্ট। সেটুকুই সবার মনে থাকে।
পরবর্তীতে কাজে লাগে।
মেডিকেল কলেজে যে ছেলে ভর্তি হয়, তার জন্য উচ্চ
মাধ্যমিকের বায়োলজি বই কতটুকু কাজে লাগে? আরশোলার জীবন কাহিনী আর
ব্যবচ্ছেদবিদ্যা কী কাজে লাগে? মস ফার্নের জীবনকাহিনী কী কাজে লাগে? উচ্চ মাধ্যমিক জ্যামিতি কী কাজে লাগে?
একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে সবাই একেকটা সাবজেক্ট নিয়ে পড়বে- সেখানে উচ্চ
মাধ্যমিকে যা পড়ানো হয়- সেগুলোর কোন দরকার নেই। ভিত্তি হিসেবে ততটুকুই
যথেষ্ট, যতটুকু এসএসসি পর্যন্ত পড়ানো হয়। বরং অতিরিক্ত এই দুইবছর সময়
কার্যকরভাবে কাজে লাগানো উচিত। মেডিকেল ছাত্রদের জন্য ট্রেনিং পিরিয়ড
বাড়ানো যেতে পারে। এমবিবিএস পাসের পরই বিষয়ভিত্তিক স্পেশালাইজড ট্রেনিং এর
ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বাংলা ইংরেজী ইতিহাস গণিত পদার্থ রসায়নের ছাত্রদের
গ্রামের স্কুলে শিক্ষাদানের জন্য পাঠানো যেতে পারে। শিক্ষানবিশ হিসেবে কোন
সরকারী অফিসের কাজে লাগানো যেতে পারে। এভাবে প্রত্যেকটা সাবজেক্টের ছেলেমেয়েদের বিশেষ বিশেষ উৎপাদনমুখি কাজে লাগানো যেতে পারে। অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম আরো কিছুটা বড় করা যেতে পারে। বিহেভিওরাল সায়েন্স, দেশের অর্থনীতি এসব যোগ করা যেতে পারে।
যাকে দিয়ে যে কাজ করাবো, তাকে সেই কাজেই বেশি সময় ব্যয় করার সুযোগ দিতে
হবে। যার যার অর্জিত জ্ঞান নিজস্ব ক্ষেত্রে কাজে লাগানোর সুযোগ না পেলে
দক্ষ মানবশক্তি কখনোই তৈরি হবে না।