এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...

এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে

শুক্রবার, ৩১ মার্চ, ২০১৭

বিয়ে করতে কত টাকা লাগে?

বিয়ে করতে আসলে কত টাকা লাগে? বিবাহ কথন সিরিজের এই পর্যায়ে এটাই এখন আমাদের সামনে গুরুতর প্রশ্ন।
তবে এই প্রশ্নে নিজের মন্তব্য দেয়ার আগে আমি দুটি কেস হিস্ট্রি তুলে ধরবো। একতরফা না। একজন ছেলের, আর একজন মেয়ের।

কেস হিস্ট্রি-১:
আমাদের দেশে ছাত্রাবস্থায় বিয়ে করতে চাওয়াটাকে এক ধরণের অপরাধ হিসেবেই ধরা হয়। আমার বাসায়ও ভয় পেয়ে গেল। আমাকে অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে বললো, "কোনমতে জাস্ট পাসটা কর, তারপরই বিয়ে দিয়ে দিব; চাকুরিও পাবার দরকার নাই। এখন বিয়ে করলে মানুষ কি বলবে? মান-সম্মান থাকবে?"

আমিও বুঝলাম। পাস করে বের হবার পর বেকার ছিলাম প্রায় ৯ মাস। তখন তো বিয়ের কথা মুখে আনা প্রায় অসম্ভবই। এরপর মোটামাটি আয়-রোজগারের একটা ব্যবস্থা হলো (মাসে ১৮ হাজার টাকার মত)। এর কিছুদিন পর বাসায় আবার বললাম বিয়ে করার কথা। আব্বা বললেন - এই টাকায় ফ্যামিলি চালাতে পারবি? ঢাকা শহরে তো বাড়িভাড়াই হবেনা এই টাকায়। আমি কিন্তু ১ টাকাও দিতে পারব না। You have to be at your own! ভেবে দেখ।
সাত-পাঁচ ভেবে পিছিয়ে আসলাম। ঠিকই তো! এই টাকায় চলব কিভাবে? এভাবে আরও কিছুদিন গেল। আবার বললাম। আবার একই উত্তর। আবার পিছালাম। এভাবেই চললো কিছুদিন।

শেষমেষ ঠিক করলাম। দরকার হলে রিস্কই নিব। আমার পরিচিত অনেকে তো মাসে ৮ হাজার টাকা স্যালারি পেয়েও ২-৩ জন ছেলেমেয়ে নিয়ে সুন্দর সংসার চালাচ্ছে, তাঁরা পারলে আমি পারবোনা কেন? লাইফ-স্ট্যান্ডার্ড নিচে নামিয়ে আনতে হবে? আনবো। দরকার হলে বস্তিতে থাকবো।

এরপর বিয়েটা করেই ফেললাম (জুন, ২০১৩)। আমার ২ ফ্রেন্ডের কাছে ২০ হাজার ও ৩০ হাজার করে মোট ৫০ হাজার টাকা ধার করলাম। হবু বউকে আগেই জানিয়ে দিলাম আমি গরিব মানুষ। পুঁজি বলতে আমার এই ৫০ হাজার টাকাই। এর বেশি মোহরানা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না, আর পুরোটাই নগদ দিতে চাই। সে রাজি হলো।
কিভাবে জানি আরও ১০ হাজার টাকা ম্যানেজ হলো। বিয়ের দিন কি কি সব খরচে দেখি ২ হাজার টাকা শর্ট! দৌড়ায়ে গেলাম ছোট ভাইয়ের কাছে। বিভিন্ন সময়ে সে আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে পাওয়া ১০০, ২০০ টাকা মিলিয়ে যে ২-৩ হাজার টাকা জমিয়েছিল তা থেকে ২ হাজার টাকা ধার দিল। বিয়ে হয়ে গেল।

বিয়ের আগেই একটা বাসা ভাড়া নিয়ে রেখেছিলাম। ভাড়া ৭ হাজার টাকা প্রতি মাসে। বিয়ের ৩-৪ দিন পরই ঢাকায় চলে আসলাম নতুন বাসায়। ফার্নিচার বলতে মেসে থাকার জন্য কেনা ১ হাজার টাকা দামের একটা চৌকি আর ৫০০ টাকা দামের একটা টেবিল আর মেসে মিশুকের ফেলে রেখে যাওয়া একটা প্লাস্টিকের চেয়ার।

সংসার চালানোর জন্য যত খরচ হবে ভেবেছিলাম, দেখলাম বাস্তবে খরচ তার তুলনায় কমই। খরচ বেড়েছে বলতে বাসা ভাড়া ৪ হাজার টাকা (আগে ৩ হাজার লাগত আর তখন ৭ হাজার), খাওয়ার খরচ প্রায় অপরিবর্তিতই আছে (যেহেতু রান্না-বান্না কাজের লোক না রেখে নিজেরাই করি)। তবে আগে যেমন হাতখুলে খরচ করতাম, তখন সেটা মোটামুটি নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসতে হলো। পার্থক্য এটুকুই। সেই খরচেই সুন্দর চলে যেতে লাগলো।

কয়েকমাস পর বউ বললো একটা ফ্রিজ কেনা দরকার। টাকা জমাতে হবে। কয়েকমাস টাকা জমিয়ে ২০ হাজার টাকার মত হলো। ফ্রিজের দোকানে গেলাম। বউ পছন্দ করলো প্রায় ৩০ হাজার টাকা দামের একটা ফ্রিজ। আমি আনইজি ফিল করা শুরু করলাম। আমার কাছে তো এত টাকা নাই। সব মিলিয়ে বাইশ হাজার টাকা হতে পারে। বউ দেখি হাসে। এই কয়দিনে বউও প্রায় ৮ হাজার টাকার মতো জমিয়ে ফেলেছে সংসারের খরচ সেভ করে।

এখনো মাঝে মাঝে অবাক লাগে। আগে টাকার ভয়ে বিয়ে করতে পারিনি আমি। বিয়ের আগে প্রায় এক-দেড় বছর যে আয় ছিল, বিয়ের প্রায় বছরখানেক পর পর্যন্তও আয় ছিল একই। বিয়ের আগের প্রায় এক বছরে সেভিংস ছিল শূন্য টাকা। বিয়ের পরের এক বছরেও সেভিংস শূন্য, কিন্তু ২ জনের একটা সংসার চালিয়েও ফ্রিজসহ আরও অনেক কিছু কেনা হয়ে গেছে!

বিয়ে করলে আসলেই আয়ে বরকত আসে। রিজিকের মালিক আল্লাহ- এটা নতুন করে অনুভব করেছিলাম তখন। যারা টাকার ভয়ে বিয়ে করতে পারছেন না, সাহস করে বিয়েটা করেই ফেলুন। ইনশাল্লাহ, আয়ে বরকত আসবে। রিজিকের মালিক তো আল্লাহই।

ফুটনোটঃ বিয়ের জন্য যে দুই ফ্রেন্ডের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছিলাম, ধার শোধ করে তাঁদের বিয়ের সময়ও সেই একই পরিমান টাকা ধার দিতে পারার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। মাঝে মাঝে এই ৫০ হাজার টাকাকে খুব বরকতময় মনে হয়! কি সুন্দর এই হাত থেকে ঐ হাতে যাবার অছিলায় ৩ জনের বিয়ে সুন্দরভাবে হয়ে গেল! (রনি পারভেজ)

(বিবাহ কথন-১৭)

****

বিয়ে করতে কত টাকা লাগে? এই প্রশ্নে আমি একটা অদ্ভুত উত্তর দেবো, তবে তা আগামী পর্বে। নিজের মন্তব্য দেয়ার আগে যে দুটো কেস হিস্ট্রি উল্লেখ করতে চেয়েছিলাম, আজ থাকছে তার দ্বিতীয়টি।

কেস হিস্ট্রি-২:
আমার বিয়ের শাড়িটির দাম চার হাজার আট'শ টাকা। যেখানে আমারই বোন কিংবা কাজিনদের বিয়ের শাড়ির দাম পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত। আর্থিক সংকটের কারণে যে আমি কম দাম দিয়ে বিয়ের শাড়ি কিনেছি, এমন নয়। আসলে আমার মনে হয়েছে, কী দরকার, একদিনের জন্য এত বেশি টাকা নষ্ট করে! হাতে টাকা পেলে আমি পোশাক কেনার চেয়ে বই কেনায় বেশি মনোযোগ দেই। সে যাক, যার যার রুচির ব্যাপার। তবে এটা বলতে পারি, এক লক্ষ টাকার শাড়ি গায়ে জড়ানো বোনটির চেয়ে আমি মোটেও খারাপ নেই। ভালো থাকা যার যার মানসিকতার ওপর নির্ভর করে। আপনি যদি মনে করেন, আপনি ভালো আছেন, তাহলেই আপনি ভালো থাকবেন।

আমার যখন বিয়ে হয়, আমরা দুজনই স্টুডেন্ট। আমার একুশ, আতিকের তেইশ। আতিক কম বেতনের একটা চাকরি করে, আমার তেমন কোনো আয়-ইনকাম নেই। তবু আমার পরিবার বিয়েতে অমত করেনি। বিয়ের পরে আমরা একরূম সাবলেট নিয়ে উঠেছি। সস্তার আসবাবপত্রের দোকান থেকে কেনা দুই হাজার টাকার একটি খাট, একটি আলনা আর কম্পিউটার ছাড়া আর কিছুই ছিল না আমাদের ঘরে। দীর্ঘদিন আমরা দুইজন কোনো দামী ফোন ব্যবহার করিনি। মনে আছে, দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর আমি কোনো নতুন জামা, জুতো, ব্যাগ কিনিনি। আগের যা ছিল, তাই দিয়েই চালিয়ে নিয়েছি।

এক কেজি গরুর মাংস চার ভাগ করে রান্না করেছি। দিনের পর দিন শুধু সবজি দিয়েই ভাত খেয়েছি। এত যে কষ্ট করেছি, তবু একজনের বিরুদ্ধে আরেকজন কখনো অভিযোগ করিনি। আমাদের পরিবারকেও কখনো বলতে যাইনি, যে আমরা কষ্ট করছি। তারা জানতো, আমরা ভালো আছি। সত্যিই আমরা ভালো আছি। প্রয়োজন ছিল কিছুটা সময় ধৈর্য ধরার। আমরা তা করেছি, তাই দেখতে দেখতে দৃশ্য বদলে গেল, যে জীবন আমরা শুরু করেছিলাম, তার সঙ্গে বর্তমান জীবনের কোনো মিলই নেই! ভাগ্য বদলের জন্য তো প্রচেষ্টা থাকতে হবে, তাই না?

আরেকজনের সাজানো-গোছানো জীবনে প্রবেশ করার চেয়ে দুজন মিলে সাজিয়ে নিলে, সেই জীবনটা আরো বেশি সুন্দর হয়ে উঠতে পারে। (হাবিবা নাসরিন)

(বিবাহ কথন-১৮)

****

এর আগে দুটি কেস স্টাডি দিয়ে আমি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি- বিয়ে করতে খুব বেশি টাকার দরকার নেই। যদি নিয়ত ঠিক থাকে, যদি উভয়ের মেনে নেয়ার মানসিকতা থাকে- তাহলে থাকার জন্য দালানের দরকার হয় না, মাটির ঘরই যথেষ্ট হয়। লাখ লাখ টাকা মোহরানা লাগে না, কোরআনের কয়েকটি সুরাও যথেষ্ট হয়। লাখ টাকার শাড়ি গহনা পাগড়ী শেরোয়ানি লাগে না, লুঙ্গি ফতুয়া আর সাধারণ একটা শাড়ি হলেই চলে। কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করে হাজার মানুষ খাওয়ানো ওয়ালিমা দরকার হয়না, এক প্যাকেট খেজুরের ওয়ালিমাই বরকতপূর্ণ হয়।

এইযে এত জাঁকজমকের আয়োজন, এত আনুষ্ঠানিকতা, এত দর-কষাকষি, এইসব কেন করা হয়? করা হয় শুধুমাত্র তথাকথিত এই সমাজের চোখে, সমাজের মানুষের চোখে বড় সাজার জন্য। মানুষের চোখে প্রশংসা পাওয়ার জন্য। মানুষ কী বলবে- এই তাড়না থেকেই শুরু হয় শো-অফ এর যতসব অসুস্থ প্রতিযোগিতা।

কিন্তু বাস্তবে বিয়ের উদ্দেশ্য যে একটা সুন্দর পরিবার গঠন, সেইখানে এতসব খানাদানা জাঁকজমকের একপয়সার মূল্য নেই। দিনশেষে এই তথাকথিত সমাজ আর সমাজের মানুষেরা শুধু নিন্দাই করে, শুধুই পরশ্রীকাতর হয়, শুধু হিংসাই করে, শুধু সমস্যাই বাড়ায়।

সবকিছু মোকাবেলা করতে হয় শুধু দুজনকেই, পরিবারটাকে টেনে নিতে হয় মাত্র দুজনকেই।
বিয়ে করতে কত টাকা দরকার? আমার উত্তর হলোঃ বিয়ে করতে তত টাকাই দরকার, যতটাকা হলে একটা লুঙ্গি কেনা যায়!! অদ্ভুত শোনাচ্ছে? হাদীস থেকে বাস্তব প্রমাণ দিচ্ছিঃ

সাহল ইবনু সা‘দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক মহিলা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার জীবনকে আপনার হাতে সমর্পণ করতে এসেছি। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাঁকালেন এবং সতর্ক দৃষ্টিতে তার আপাদমস্তক লক্ষ্য করলেন। তারপর তিনি মাথা নিচু করলেন। যখন মহিলাটি দেখল, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সম্পর্কে কোন ফয়সালা দিচ্ছেন না, তখন সে বসে পড়ল। এরপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীদের মধ্যে একজন দাঁড়ালেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! যদি আপনার বিয়ের প্রয়োজন না থাকে, তবে আমার সঙ্গে এর বিয়ে দিয়ে দিন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে কিছু আছে কি? সে উত্তর করলো- না, আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার কাছে কিছুই নেই। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তোমার পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে গিয়ে দেখ, কিছু পাও কিনা। এরপর লোকটি চলে গেল। ফিরে এসে বলল, আল্লাহর কসম! আমি কিছুই পাইনি। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আবার দেখ, লোহার একটি আংটিও যদি পাও। তারপর লোকটি আবার ফিরে গেল। এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! তাও পেলাম না, কিন্তু এই আমার লুঙ্গি (শুধু এটাই আছে)। লোকটি এর অর্ধেক তাকে দিতে চাইল। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে তোমার লুঙ্গি দিয়ে কী করবে? তুমি যদি পরিধান কর, তাহলে তার কোন কাজে আসবে না, আর সে যদি পরিধান করে, তবে তোমার কোন কাজে আসবে না। বেশ কিছুক্ষণ লোকটি নীরবে বসে থাকল। তারপর উঠে দাঁড়াল। সে যেতে উদ্যত হলে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডেকে আনলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কী পরিমাণ কুরআন মাজীদ মুখস্থ আছে? সে বলল, আমার অমুক অমুক সূরা মুখস্থ আছে এবং সে গণনা করল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, এগুলো কি তোমার মুখস্থ আছে? সে বলল, হাঁ। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে পরিমাণ কুরআন তোমার মুখস্থ আছে তার বিনিময়ে এ মেয়েটিকে তোমার অধীনস্থ করে (বিয়ে) দিলাম।
(সহীহ বুখারী)

আপনার যা আছে বিয়ে করার জন্য তা-ই যথেষ্ট। শুধু আপনাকে হতে হবে আরো একটু বেশি কষ্টসহিষ্ণু, টেনে ধরতে হবে আপনার উচ্চাভিলাষের লাগাম, সাময়িকভাবে হয়তো কমিয়ে আনতে হবে জীবনযাত্রার মান। আর হ্যা, খুঁজে বের করতে হবে এমন একজনকে- যিনি আপনার এইটুকু নিয়েই সন্তুষ্টচিত্তে সংসার করতে রাজী আছেন।
(বিবাহ কথন-১৯) 

বুধবার, ২৯ মার্চ, ২০১৭

প্রিয় ভাঁটফুল

ভাঁটফুলেদের কথা তবু মনে পড়ে।
মনে পড়ে, চৈত্রের সেইসব নিঃসঙ্গ দুপুরে
কতটা ভালোবাসা দিয়েছিলো আমাকে-
জাতহীন পাতহীন সেইসব বুনো ভাঁটফুল।
গোলাপ রজনীগন্ধার ভীড়ে কেউ কি ভাবে আজ
ঘাসফুল ভাটফুলেদের কথা? অথচ
গোলাপী গোলাপেরা কখনো দেয় নাই অতটা ভালোবাসা,
যতটা নিখাদ প্রেম ছিল-
ভাটফুলের অজানা সৌরভে।

হা হৃদয়! অকৃতজ্ঞ হয়োনা কভু।
ভুলোনা পুরনো বন্ধুর কথা,
জীবনের রুক্ষ পথে বারবার চিনে নিও তারে।
যে ছিল তোমার আজো সে তোমারি আছে;
খুঁজে নিও
পতিত জমিনে অবহেলা অনাদরে বেড়ে ওঠা
বংশপরিচয়হীন ছিন্নবস্ত্র এক
বুনো ভাটফুল।

শনিবার, ২৫ মার্চ, ২০১৭

'ফ্রি হেলথ ক্যাম্পে'র নামে 'জাতীয় মশকরা'

আগামীকাল মহান স্বাধীনতা দিবস। এই দিনে সারাদেশে 'ফ্রি হেলথ ক্যাম্পে'র নামে জনগনের সাথে 'জাতীয় মশকরা'য় লিপ্ত হবেন শতশত চিকিৎসক।
রাজনৈতিক নেতা-পাতিনেতা আর বিভিন্ন ক্লিনিক-ডায়াগনোস্টিক গুলো তাদের নিজস্ব প্রচার প্রচারণার উদ্দেশ্যে আয়োজন করবে এইসব তথাকথিত 'ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প' নামক তামাশার। আর তাতে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হবেন বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসকবৃন্দ।
আচ্ছা স্বাধীনতা দিবসে আইনজীবিরা কি 'ফ্রি আইন ক্যাম্প' করেন? ইঞ্জিনিয়াররা কি 'ফ্রি নকশা' করে দেন? কৃষিবিদরা কি 'ফ্রি কৃষি পরামর্শ' ক্যাম্প করবেন? শিক্ষকগন কি 'ফ্রি টিউশনি ক্যাম্প' করবেন? ব্যবসায়ীরা কি 'ফ্রি চাল-ডাল বিতরণ' করবেন? ঔষধ ব্যবসায়ী কি 'ফ্রি ঔষধ বিতরন' করবেন?
না। তাহলে আপনি কেন ছুটির দিনটাতে পরিবার পরিজনকে বঞ্চিত করে এইসব ভাওতাবাজি ক্যাম্পিং করবেন? কেন নেতা-পাতিনেতা বা ক্লিনিক-ডায়াগনোস্টিকের প্রচারণার সামগ্রী হবেন? আপনি তো ভালো করেই জানেন, এইসব ক্যাম্প ট্যাম্প দিয়ে জনগনের কোন উপকার হয়না।
যার দরকার সে ঠিকই কমিউনিটি ক্লিনিকে যাবে, উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে যাবে, সদর হাসপাতালে যাবে, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাবে, ক্লিনিকে যাবে। আর সেখানে এই ছুটির দিনেও আপনার ভাইবোনেরা কেউ না কেউ বসে আছেন চিকিৎসা দেয়ার জন্য।
ডাক্তার ভাই বেরাদরগন, যারা ছুটির দিন পেয়েছেন, পরিবারের সাথে, বন্ধু বান্ধবদের সাথে সময় কাটান। তাদের সুখ দুঃখের অংশীদার হোন। কিছুই না করতে চাইলে সারাদিন ঘুমান। তবুও নিজেদেরকে আর নিচে নামাবেন না। অন্যদের খেলার সামগ্রী বানাবেন না। ফেরিওয়ালা সাজবেন না। ফেরি করে চিকিৎসা দেয়া যায় না।
মানবসেবার কথা বলে আবেগ দিয়ে যদি কেউ আপনাকে ব্ল্যাকমেইল করতে আসে, তাকে স্পষ্ট করে বলে দিন- মানবসেবার দায় আপনার একার নয়।

শুক্রবার, ২৪ মার্চ, ২০১৭

হায় কান্ডজ্ঞান!

ভোর পাঁচটা। সরকারী হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে রাত্রীকালীন দায়িত্বে আছেন ডাঃ মুনীর। ভোরের এই সময়ে বহির্বিভাগীয় রোগীর চাপ একটু কমেছে। এখন তিনি ঘুরে ঘুরে ভর্তি রোগীদের অবস্থা দেখছেন। খেয়াল করলেন, একজন ভদ্রলোক দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে এদিক সেদিক তাঁকিয়ে শেষে এসে দাঁড়ালেন ডেস্কের সামনে। বেশ উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে তাকে।

কোন রোগীর এটেন্ড্যান্ট? পোস্ট সিসিইউ বা পোস্ট ক্যাথের কোন রোগীর সমস্যা? নাকি অন্য ওয়ার্ড থেকে রেফারেল? ভাবতে ভাবতে ডেস্কে ফিরে নিজের চেয়ারে বসলেন ডাঃ মুনীর। জিজ্ঞাসু চোখে তাঁকালেন আগত ভদ্রলোকের চোখে। আংকেল, বলুন কী সমস্যা?
ভদ্রলোকের চোখে আরো উদ্বেগ ফুটে উঠলো। তিনি অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন- আচ্ছা, 'তিন তলার ৩২ নম্বর বেডটা কোনদিকে?'

মেজাজটা প্রায় বিগড়েই যেতে বসেছিল ডাঃ মুনীরের। তবু অনেক কষ্টে মেজাজের লাগাম টেনে ধরে সুন্দর ভাবে উত্তর দিলেন। চাচা, এই ওয়ার্ডে তো ৩২ নম্বর বেড নাই। অমুক অমুক ওয়ার্ডে আছে। ওইখানে গিয়ে একটু খোঁজ করুন। পেয়ে যাবেন।

ভদ্রলোক চলে গেলেন। আর পেছন থেকে তার দিকে তাঁকিয়ে রইলেন ডাঃ মুনীর। অদ্ভুত ব্যাপার! নিচতলায় দুজন দারোয়ান, এই ওয়ার্ডের প্রবেশপথে দারোয়ান, নার্সেস ডেস্কে কয়েকজন নার্স, টুলে বসে থাকা ওয়ার্ডবয়, আয়া- বলা চলে চার স্তরের মানুষকে পেরিয়ে ইনি কিনা ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করতে এসেছিলেন- ৩২ নম্বর বেডটা কোনদিকে? হায় কান্ডজ্ঞান!! এঁদের ধারণা, হাসপাতালের সবকিছু সম্পর্কে ডাক্তারকেই জিজ্ঞেস করতে হবে!!

লোকটা চলে যেতেই ডাঃ মুনীরের মনে পড়লো- একটা ভুল হয়ে গেছে। মনে কষ্ট পেতে পারে ভেবে তাকে বলা হয়নি যে এটা জিজ্ঞেস করার জন্য ডাক্তারের কাছে যাওয়ার দরকার নেই। হায়! কে জানে- এতক্ষণে হয়তো ভদ্রলোক অন্য ওয়ার্ডে গিয়ে কর্তব্যরত ডাক্তারকে খুঁজছেন। আর পেলেই জিজ্ঞেস করে বসবেন তার সেই মোক্ষম প্রশ্নটিঃ আচ্ছা, তিনতলার ৩২ নম্বর বেডটা কোনদিকে?

রবিবার, ১৯ মার্চ, ২০১৭

ফিফটি ফিফটি চান্স

বিয়ের আলাপ যদি সফল না হয়, অর্থাৎ আলাপ যখন আত্মীয়তায় পরিণত না হয়, তখন কোন না কোন একটা পক্ষকে মনোক্ষুন্ন হতেই হয়। পাত্রপক্ষ অথবা পাত্রীপক্ষ। কারণ, শেষ পর্যন্ত তো কোন এক পক্ষ অপর পক্ষকে অপছন্দ করেই বসে। প্রস্তাব বাতিল হয়। হতে পারে এক ফ্যামিলি অন্য ফ্যামিলিকে অথবা ছেলে বা মেয়ে একজন আরেকজনকে অপছন্দ করে। হয়তো মেয়ে পাত্রকে পছন্দ করলো, কিন্তু ছেলে কিংবা ছেলের ফ্যামিলি মেয়েকে অপছন্দ করলো। হয়তো ছেলে পাত্রী পছন্দ করলো, কিন্তু ছেলের পরিবার অপছন্দ করলো মেয়ের পরিবারকে।

প্রথম প্রস্তাবেই বিয়ে হয় এমনটা খুব কমই ঘটে। সাধারণত প্রত্যেক ছেলে বা মেয়েকেই বিয়ের আগে গড়ে চার পাঁচবার এই দেখাদেখি পর্বের মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিটা ক্ষেত্রেই ছেলে কিংবা মেয়ে কাউকে না কাউকে হতাশ হতে হয়। কারো না কারো মন ভেঙ্গে যায়। কাউকে না কাউকে কষ্ট পেতে হয়। প্রত্যাখ্যানের কিংবা স্বপ্নভঙ্গের কষ্ট। 

এই অবস্থা বেশি মোকাবেলা করতে হয় মেয়েদেরকে। বিশেষ করে মেয়ে যদি তথাকথিত প্রচলিত মানদন্ডে একটু কালো হয়, শ্যামলা হয়, বেঁটে হয়। তাই বিয়ের আলাপ শুরুর আগেই গার্ডিয়ানদের উচিত ছেলে এবং মেয়ে উভয়কে মানসিকভাবে তৈরি করা। তাদেরকে জানিয়ে দেয়া, বুঝিয়ে দেয়া উচিত যে- প্রতিটা প্রস্তাব ফিফটি ফিফটি চান্স। যেকোনটাই হতে পারে। যাই হোক, বিশেষ করে নেগেটিভ হলে মনে কষ্ট পাওয়া যাবে না। কেউ যদি তোমাকে অপছন্দ করে তো সেটা তার সমস্যা, তোমার নয়। কোন মানুষই সবার কাছে পছন্দের হয় না। সবার চোখে সুন্দর হয় না। সবচেয়ে যে সুন্দর মেয়েটা বা ছেলেটা, তাকেও কেউ না কেউ অপছন্দ করে। সবচেয়ে যে ভদ্র নম্র মানুষটা, তাকেও অনেকেই পছন্দ করেনা। আর খুব কম মানুষই আছে যারা অন্য কারো ইনার পটেনিশিয়ালিটি উপলব্ধি করার ক্ষমতা রাখে।

পাত্র পাত্রীদের বুঝতে হবে, কেউ যদি আপনাকে অপছন্দ করে, তাহলে আপনার মন খারাপ করার কিছু নেই। কারণ, যে আপনাকে পছন্দ করে না সে কোনভাবেই আপনার জন্য নয়। আপনাকে যার পছন্দ নয়, যার চোখে আপনি সুন্দর নন, তার সাথে বিয়ে হলে আপনি কি সুখী হবেন? আপনাকে খুশি করার জন্য সে কি কখনো কিছু করবে? আপনার জন্য কোন স্যাক্রিফাইস করবে? নিশ্চয় না।

তাহলে কেন আপনি কষ্ট পাবেন? বরং এমন কারো জন্য অপেক্ষা করুন, যে আপনাকে আপনার অবস্থানেই পছন্দ করবে, আপনার যা আছে তাতেই সন্তুষ্ট হবে।

(বিবাহ কথন-১৬)  

শনিবার, ১৮ মার্চ, ২০১৭

প্রসঙ্গঃ হিন্দুদের হোলি উৎসব

হিন্দু সম্প্রদায়ের 'হোলি' উৎসবকে উপলক্ষ করে যেসব ঘটনা ঘটেছে, তার বিপরীতে অনেককেই দেখা গেল উগ্র প্রতিক্রিয়া দেখাতে। 'মালাউনদের এত বড় সাহস!! শালাদের ইন্ডিয়া পাঠায় দেয়া উচিত!!! এইরকম আরো অনেক কদর্য মন্তব্য।

কিন্তু ভিডিও ফুটেজ ঘেটে পাওয়া গেলো, এইসব নোংরামির ঘটনায় জড়িত সবগুলা মুসলমানের বাচ্চা!!
আর এর মাধ্যমে একেবারে হাতে নাতে প্রমাণ হলো- এইসব ঘটনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের কোন দোষ নাই।
শত শত বছর ধরে এই ভূখন্ডে হিন্দু মুসলিম পাশাপাশি বাস করছে। সুখে দুঃখে একে অপরের সহযোগী হয়েছে। রমজান, পুজা একসাথে হয়েছে। কোন সমস্যা হয় নাই। হিন্দুরা তাদের উৎসবের সীমা বোঝে। একটা মুসলিমপ্রধান দেশে কীভাবে উৎসব পালন করতে হয় সেটা তারা জানে। তাদের উৎসব সবসময়ই ছিল ঘরোয়া প্রকৃতির। নিজেদের মধ্যে আনন্দ উদযাপন। তাদের উৎসবে মুসলমানদের মধ্যে থেকে শুধু বন্ধু বান্ধবরাই আমন্ত্রিত হত। অপরিচিত কেউ হুট করে যেতে পারতো না।

সেভাবেই তারা চলছিল। কিন্তু ইদানীং কিছু সুযোগসন্ধানী কুলাঙ্গার 'ধর্ম যার যার উৎসব সবার' বলে হিন্দুদের উৎসবে গিয়ে বিশৃঙ্খলা করছে। এদের প্রধান টার্গেটই থাকে মেয়েরা। যেকোনভাবে তারা মেয়েদের গায়ে হাত দেবে। এবারের হোলিতে যেভাবে রাস্তায় মেয়েদের গায়ে হাত দেয়া হয়েছে, কোন ধর্মপ্রাণ হিন্দু একাজ করতে পারেনা। করেওনি।
হিন্দু বন্ধুদের বলবো, আপনাদের উৎসবে একান্ত কাছের বন্ধুবান্ধব ছাড়া অন্যদের অংশ নিতে দেবেন না। এদের হাতে আপনাদের সম্মান নিরাপদ নয়। কোন আশঙ্কা থাকলে স্থানীয় মুসলমান নেতাদের জানান। আমি সাহসের সাথে বলতে পারি, এদেশের মুসলমানরা সবসময়ের মত আগামীতেও হিন্দুদের ধর্মপালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।

মঙ্গলবার, ১৪ মার্চ, ২০১৭

শুধুই কমিশন খাওয়ার ধান্দা?

১.
ডাক্তারের চেম্বারে এসেছেন রহমত সাহেব। দুমাস ধরেই খেয়াল করছেন একটু একটু জ্বর, শরীরটাও দুর্বল হয়ে আসছে। ওজন কমে যাচ্ছে। খাওয়ার রুচিও আগের মত নাই। ইদানিং অফিসের কাজও ঠিকঠাক করতে পারেন না। খুব ক্লান্ত লাগে।
ডাক্তার তার সবকথা শুনে ফুসফুসের ক্যান্সার মনে করলেন। তিনি বললেন FNAC করতে হবে। রোগীকে পরামর্শ দিলেন- পরীক্ষা অমুক ল্যাব থেকে করাবেন।
রহমত সাহেব কিছু বলতে গিয়েও বললেন না। কিন্তু চেম্বার থেকে বেরিয়ে তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। কথাটা বলেই ফেললেন তিনি। ঐ নির্দিষ্ট ল্যাবেই করাতে হবে কেন? আসলে সবই হইলো গিয়া এদের কমিশন খাওয়ার ধান্দা!!

২.
কিছুদিন ধরেই মাথা ঘুরায় খলিল সাহেবের। পেশায় সাংবাদিক তিনি। মাথা খাটিয়েই কাজ করতে হয়। ভেবেছিলেন ডাক্তারের কাছে যাবেন না। না খেয়ে মরুক ডাক্তারগুলা। এদেশের ডাক্তারে কিছু জানে নাকি?
কিন্তু কয়েকদিন হলো মাথাব্যথাটা বাড়ছে। শেষমেষ তিনি বাধ্য হয়েই একজন মেডিসিন স্পেশালিস্টের শরণাপন্ন হলেন। মেডিসিনের স্বনামধন্য প্রফেসর। খলিল সাহেব ভেবেছিলেন, এতবড় প্রফেসর, নিশ্চয় চেহারা দেখেই রোগ ধরে ফেলবেন। কিন্তু না, ডাক্তার ধরিয়ে দিলেন এমআরআই অব ব্রেইন। আর বললেন- অমুক ইমেজিং সেন্টার থেকে করাবেন।
যা বোঝার বুঝে ফেললেন সাংবাদিক খলিল সাহেব। কচি খোকা তো নন! চেম্বার থেকে বেরোতে বেরোতে মনে মনে একটা নিউজও গুছিয়ে ফেললেন তিনি। একেবারে হাতে নাতে প্রমাণ!! এভাবেই তাহলে কমিশন খাওয়ার ধান্দায় নির্দিষ্ট ডায়াগনোস্টিকে পাঠায় ডাক্তাররা!!

৩.
বুকের ব্যথাটা অনেকদিন থেকেই আছে কবির সাহেবের। প্রথমে এলাকার ফার্মেসি থেকে বিভিন্ন সময় ওষুধ কিনে খেয়েছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। শেষমেষ বাধ্য হয়ে গতকাল গিয়েছিলেন একজন এমবিবিএস ডাক্তারের চেম্বারে। সিম্পল এমবিবিএস আরকি। ছোকরা ডাক্তার ইসিজি করিয়ে বললো হার্টে কিছু সমস্যা আছে। এতক্ষণ পর্যন্ত ঠিকই ছিল, কিন্তু এর পরেই বের হলো ছোকরা ডাক্তারের আসল চেহারা!! বলে কিনা- ইকোকার্ডিওগ্রাম করাতে হবে। কোথায় করাতে হবে তাও বলে দিলো!! অমুক সেন্টারে গিয়ে অমুক ডাক্তারের হাতে করাবেন।
কবির সাহেব তখনই সব বুঝেছেন। নিজের বয়স তো আর কম হলো না। ঐ ছোকরা ভেবেছে কি, তিনি কিছুই বোঝেন না? সোনালি ফার্মেসির ছেলেটার কথাই ঠিক। ইকো টিকো কিছুনা, সব ঐ ছোকরা ডাক্তারের কমিশন খাওয়ার ধান্দা আরকি!! ছোকরার অভ্যাস এখনই খারাপ হয়ে গেছে। বড় হলে তো নির্ঘাত কসাই হবে!!

****

আপনি অমুক জায়গা থেকে টেস্ট করাবেন। ডাক্তার এরকম কিছু বললেই অনেকের মনে খচ খচ করে ওঠে, নিশ্চয়ই কমিশন খাওয়ার ধান্দা আছে।
কমিশন কমিশন করে এমন শোরগোল তোলা হয়েছে, রোগীরা এখন সাধারণ পরীক্ষা নিরীক্ষা করতেও সন্দেহ করে- কমিশনের লোভে অপ্রয়োজনীয় টেস্ট দিলো না তো?

কিন্তু বাস্তবতা কী? আমার জানা মতে, কমিশনখোর ডাক্তারের সংখ্যা খুবই নগন্য। আর কমিশনখোররাও সহজে অপ্রয়োজনীয় টেস্ট দেয়না। যেমন পুলিশ বা সরকারি অফিসের কোন কোন কর্মচারী ঘুষ নেয়, সেটা খারাপ। কিন্তু ঘুষ নিয়ে কাজ করবেনা এতটা বেঈমান তারা এখনো হয়নি। কমিশনখোররাও হলো সেরকম। কমিশন খায় সেটা খারাপ। তাই বলে অপ্রয়োজনীয় টেস্ট দিয়ে কমিশন খাবে এতটা বেঈমান বোধহয় তারাও এখনো হয়নি।
নির্দিষ্ট ল্যাবে টেস্ট করাতে বললেই কমিশন খাওয়ার ধান্দা না। কিছু কিছু টেস্ট আছে - যার জন্য এক্সপার্টদের কাছ থেকেই রিপোর্ট নিতে হয়। যেমন FNAC, Histopathology, MRI, Echocardiogram, Endoscopy, Bronchoscopy ইত্যাদি। আর এক্সপার্টরা তো রাস্তাঘাটে ফুটপাতে বসেন না। তারা থাকেন বিশেষ কিছু সেন্টারে।
সুতরাং, কেউ আপনাকে নির্দিষ্ট ল্যাবে পাঠালেই কমিশন খাওয়ার ধান্দা মনে করে বসবেন না।
বিশ্বাস রাখুন, আমাদের সমাজটা সামগ্রিকভাবে পঁচে গেলেও ভালো মানুষের সংখ্যা এখনো অনেক বেশি।

রবিবার, ১২ মার্চ, ২০১৭

তরুণ ডাক্তারদের পেশা বদলের পরামর্শ !!

বিশেষায়িত ডিগ্রীধারীরা ঝুঁকছেন অন্য পেশায়। খবর বণিক বার্তার, (লিংক কমেন্টে)। নিউজে কয়েকজন ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার ও কৃষিবিদের কেস স্টাডি দেয়া হয়েছে যারা সবাই নিজ পেশা ছেড়ে বিসিএস পুলিশে যোগ দিয়েছেন।
খুব স্বাভাবিক। বাংলাদেশের ক্যাডার সার্ভিসের ভেতরে সাধারণ এবং পেশাগত ক্যাডারের যে বৈষম্য তাতে করে পেশাগত ক্যাডারে থাকা মানে নিজেকে অপমান করা। সুযোগ সুবিধা সব কেন্দ্রীভুত করা হয়েছে দুয়েকটি ক্যাডারে। ইঞ্জিনিয়াররা বহু আগে থেকেই পেশা পরিবর্তন অথবা দেশত্যাগ এই দুটির একটি পথ বেছে নিচ্ছেন। ডাক্তাররাই শুধু মানবিকতা, দায়বদ্ধতা, দেশপ্রেম এইসব ফাঁকাবুলিতে আটকে ছিলেন। কিন্তু কিল ঘুষি খেয়ে এখন তাদেরও চোখ খুলছে। তারাও এখন পুলিশ এবং প্রশাসন ক্যাডারে ঢুকছেন। পুলিশ এবং প্রশাসন ক্যাডার আইন প্রয়োগ করে জনগনের ওপর, আর জনগন আইন (!) প্রয়োগ করে ডাক্তারদের ওপর। একই বিসিএস এ নিয়োগ পেয়ে কেউ পায় গাড়ি, বাড়ি, বডিগার্ড। আর কেউ পায় ইউনিয়ন সাবসেন্টারে ভাঙা চেয়ার। গাড়ি তো কল্পনার বাইরে, নৌকা, ঠেলা, ভ্যান, রিক্সায় করে যাওয়া আসার খরচটাও নিজের পকেট থেকে ব্যয় করতে হয়। পেশাগত ক্যাডার মানেই অবহেলিত ক্যাডার। নখদন্তবিহীন ক্যাডার। সবার প্রমোশন হয় বয়স ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে, ডাক্তারের দরকার অতিরিক্ত ডিগ্রী। পুলিশের কনস্টেবল হয় 'স্যার', আর এমবিবিএস এফসিপিএস শেষ করে হতে হয় 'ডাক্তার সাব'। 

স্কুল কলেজ ভার্সিটি সব পরীক্ষায় যারা ছিল সামনের সারিতে, কর্মক্ষেত্রে নেমে তারা এখন নিজেকে দেখছে সবার পেছনের সারিতে। কারও দয়ায় তো বিসিএস পার হচ্ছে না, তাহলে কেন শুধু শুধু নিজেকে খাটো করা? প্রশাসন আর পুলিশ ক্যাডারই যদি হয় রাষ্ট্রের কাছে একমাত্র আদরের 'অফিসার', তাহলে হোক। তাই হোক।

আমার একজন সিনিয়র, ডাঃ রিফায়েত, আসন্ন ৩৮ তম বিসিএস নিয়ে লিখেছেন, "স্বাস্থ্য ক্যাডারে সহকারী সার্জনের পদ ২২০টি, সহকারী ডেন্টাল সার্জনের পদ ৫ টি! প্রশাসন ক্যাডারে সহকারী কমিশনার পদ ৩০০ আর পুলিশে ১০০। লড়াই যেহেতু হবে, শুধু হেলথ ক্যাডার কেন?? পাশাপাশি জেনারেল ক্যাডারেও হোক।"

ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার যারা আগামীতে বিসিএস দিবেন, তাদের সবার জন্য আমারও একই পরামর্শ। প্রশাসন আর পুলিশ ক্যাডারই যদি হয় দেশসেবার একমাত্র উপায়, তবে তাই হোক। রাষ্ট্র যদি তার ক্যাডারদের মধ্যে রাজা প্রজা বিভাজন করে, যোগ্য হয়েও কেন আপনি জেনেশুনে প্রজাই হবেন?

শুক্রবার, ১০ মার্চ, ২০১৭

যদি কিছু মনে না করেন !!

ভাই কিছু মনে না করলে একটা কথা বলি??
ভাই, মাইন্ড কইরেন না, আপনাকে একটা কথা বলি??
অনেকেই কথার আগে পরে এইসব ব্যবহার করেন।

আপনি হয়তো কার্টেসি হিসেবে কোন সেনসিটিভ কথা এভাবে শুরু করেন। কিন্তু বাস্তবে এইটার উদাহরণ হলো পাগলকে সাঁকো নাড়ানোর কথা মনে করিয়ে দেয়ার মত। যাকে বলছেন, হয়তো তিনি খেয়ালই করতেন না, আপনি একটা সিরিয়াস কথা বলে ফেলেছেন। কিন্তু আপনি যখনি বলবেন- ভাই মাইন্ড কইরেন না, ঠিক তখনি উনার মনে হবে- নিশ্চয় এই কথাটা মাইন্ড করার মত!!! নাহলে কেন আমাকে এই কথা বললো?

এবং 'মাইন্ড কইরেন না' বলাতে তিনি আর কোনভাবেই 'মাইন্ড' না করে থাকতে পারলেন না!!!

শুক্রবার, ৩ মার্চ, ২০১৭

নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই নিশ্চিত করতে হবে

বগুড়া মেডিকেলের ঘটনা সহজে ছেড়ে দেবার সুযোগ নাই। রাষ্ট্র যখন আপনাকে নিরাপত্তা দেবে না, তখন নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই নিশ্চিত করতে হবে। ফাতরা লোকজন হাসপাতালে এসে রসিয়ে রসিয়ে মহিলা ডাক্তারকে 'মাল' বলবে, ফ্যান কোনদিকে, টয়লেট কোনদিকে জিজ্ঞেস করবে, আর পোলারা বসে বসে দেখবে? সালাম করবে?
কুলাঙ্গারগুলাকে শুধু কান ধরে উঠবোস করানো মোটেই যথেষ্ট হয় নাই।

এতদিনে ভালো করে বোঝা হয়ে গেছে, ডাক্তারের নিরাপত্তা আমাদের রাষ্ট্র দেবে না। নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদেরকেই দিতে হবে। বগুড়া মেডিকেলে ইন্টার্নরা, দে হ্যাভ শোন দেয়ার গাটস। সকল ডাক্তারকে এই শিক্ষা নিতে হবে। প্রতিদিন একতরফাভাবে 'ডাক্তার লাঞ্চিত' হবার খবর আর শুনতে চাই না। 

রাষ্ট্র তার নাগরিকদের চাহিদা না মিটিয়ে ডাক্তারকে গিনিপিগ বানাতে চায়। হাসপাতালে সিট নাই, আছে ডাক্তার। ঔষধ সরবরাহ নাই- আছে ডাক্তার। পরীক্ষা নিরীক্ষার ব্যবস্থা নাই- আছে ডাক্তার। চুরি করবে থার্ড ক্লাস ফোর্থ ক্লাসরা, দোষ হবে ডাক্তারের।

রাষ্ট্র নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা দেবে না, দোষ হবে ডাক্তারের। রাষ্ট্র এবং মিডিয়া ডাক্তারদেরকে জনগনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। মৌলিক চাহিদা পূরণে রাষ্ট্রের ব্যর্থতার দায়, আর জনগনের ক্ষোভ তারা ডাক্তারদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে পাশ কাটাতে চায়।

কিসের ভিত্তিতে মন্ত্রী ইন্টার্নদের বরখাস্ত করেন? কোন আইন তাকে এই অধিকার দিয়েছে? হাসপাতালের ওয়ার্ডে এইসব লোক ঢুকলো কী করে, কেন? মন্ত্রীকে আগে সেই জবাব দিতে হবে। ঢাকা মেডিকেলে ডাঃ ফারহানাকে যখন আহত করা হয়, কোথায় ছিলেন মন্ত্রী মহোদয়? কোথায় ছিলেন তিনি, যখন বহিরাগত সন্ত্রাসীরা ঢাকা মেডিকেলে এসে ভাঙচুর চালায়? কী ব্যবস্থা নিয়েছেন তিনি?

আর পদলোভী বিএমএ নেতাদেরকে অভিভাবক হিসেবে অস্বীকার করার সময় এসেছে। যে অভিভাবক তার সন্তানের নিরাপত্তা দিতে পারেনা, যে অভিভাবক তার সন্তানকে জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে ঘুমায়, তারা অভিভাবক হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। তাদেরকে অস্বীকার না করলে আগামীতেও কোন অধিকার আদায় হবেনা।

মঙ্গলবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

'স্বামীগিরি'র দিন আর নাই...

আহা কেউ যদি মশারিটা টাঙিয়ে দিত!! আলোচ্য বাক্যাংশটুকু মশার কামড়ে অতিষ্ঠ অলস ছেলেদের স্বগতোক্তি হইতে চয়ন করা হইয়াছে। ইহা ব্যাচেলর ছেলেদের বিবাহের ইচ্ছা প্রকাশের একটি মার্জিত রুপ।

তবে ঠাট্টাচ্ছলে বলা হলেও কথাটা এমনি এমনি আসেনি। এর একটা ঐতিহাসিক পটভূমি আছে। তিরিশ চল্লিশ বছর আগেও বাংলাদেশের গরীব, নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং গ্রামীণ মধ্যবিত্ত পরিবারে স্ত্রীদের একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল স্বামীর পা টিপে দেয়া। স্বামী মানে স্বামীই, সংসারের সত্যিকার রাজা। তাঁর একমাত্র কাজ উপার্জন করা আর সংসারের খরচ জোগানো। আর স্ত্রীর কাজ স্বামীর সেবা করা। মশারি টাঙানো সেখানে স্ত্রীর আরেকটি রুটিন কাজ মাত্র। এমন অনেক পুরুষ তাদের সারাটা জীবন পার করে দিয়েছেন, একদিনও নিজে মশারি টাঙান নি। তাদের সব কাজ করে দিয়েছে ছোটবেলায় মা, বিয়ের পরে বউ। উচ্চবিত্তদের ক্ষেত্রে এই কাজগুলো করার জন্য আলাদা পরিচারিকা থাকতো।
আহা, কেউ যদি মশারিটা টাঙিয়ে দিত! আজও পুরুষের মনে এই ভাবনাটা তাই সেই চিরাচরিত 'স্বামী'সুলভ চেতনা থেকেই উঠে আসে।

এটা হয়তো ক্ষতিকর কিছু নয়। কিন্তু এই চিন্তার অর্থ যদি এই হয় যে পুরুষ তার সংসারে কোন সাংসারিক কাজই করবেন না, সব কাজ সবসময় স্ত্রীকেই করতে হবে, সেটাকে নিশ্চয়ই ঠিক বলা চলে না।

ডিয়ার ব্যাচেলরস টু বি ডেড, দিন বদলাইছে। 'স্বামীগিরি'র দিন আর নাই। বিয়ে করলেই মশারি এখন আর আপনা-আপনি জায়গামত উঠে যাবে না। এই যে আপনি ইচ্ছে করলে মশারি ছাড়াই ঘুমিয়ে পড়েন, দেখার কেউ নাই। সম্ভাবনা প্রবল যে বিয়ের পর এই সুযোগটাও হারাবেন। সময়মতই মশারি টাঙাতে হবে :P :P এবং তা হয়তো আপনাকেই :P ইহার কোনরুপ ব্যতিক্রম হইলে তাহা হইবে আপনার নেহায়েৎ সৌভাগ্য মাত্র :D :D
ডোন্ট বি আপসেট ম্যান। একদিন দুদিন মশারি টাঙালে পুরুষের মান ইজ্জত চলে যায়না!! পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ, মহানবী মুহাম্মাদ(সাঃ) ও নিজের অনেক কাজ নিজেই করতেন। আর তাছাড়া, ইউ নো, মানীর মান জুতা দিয়ে পিটালেও যায় না :D :D
(বিবাহ কথন-১৫)

শনিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

তোমায় নিয়া ঘর বান্ধিবো গহীন বালুর চর....!!

বিয়ের আগে নানান অলীক কল্পনায় ভোগে ব্যাচেলর সমিতির সদস্যরা। তারা মনে করে- বিয়ে করলেই জীবনের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে!! জীবনে আর কোন দুঃখ থাকবে না!! কোনমতে বিয়েটা করলেই কেল্লা ফতেহ!! এরপর শুধু সুখ আর সুখ।

মন্তু মিয়ার গান তাদের জাতীয় সঙ্গীত হয়ে যায়।
"আশা ছিল মনে মনে
প্রেম করিবো তোমার সনে
তোমায় নিয়া ঘর বান্ধিবো গহীন বালুর চর...."


বাস্তবে গহীন বালুর চরে কারোই ঘর বাঁধা হয়না। কিছুদিন এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করে শেষে ঘর বাঁধতে হয় ইট কাঠের শহরে। যেখানে বাসা ভাড়া যোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়। যেখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। অফিসে কাজের চাপ, বসের ঝাড়ি, ব্যবসায় টেনশন, সিটি বাসে বাঁদুড় ঝোলা।
আবার ঘরে ফিরে ব্যাগ হাতে বাজারে যাওয়া। এই দাম কত? দশ টাকা কম নাও। গত সপ্তাহেই তো বিশ টাকায় কিনলাম!!

এই নাই সেই নাই, এই করতে হবে, সেই করতে হবে- শুনে শুনে কান ঝালাপালা হয়ে যায়।

বলা হয়, বিয়ের পর প্রথম ছয় মাস থেকে এক বছর সবাই মহাকাশে উড়তে থাকে :P । মাটিতে তাদের পা পড়ে না। তারপর ধীরে ধীরে মহাকাশযান মহাশুন্য থেকে প্রথমে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে, তারও পরে পৃথিবীর মাটিতে :p অবতরণ করে। এতে নাকি আনুমানিক দেড় থেকে দু'বছর সময় লাগে। :D
 
তারপর জীবন স্বাভাবিক হয়ে আসে, জীবন একঘেয়ে হয়ে আসে। সেই প্রাগৈতিহাসিক সাংসারিক জীবন। আগে থেকে মানসিকভাবে তৈরি না থাকলে ইউফোরিক মুডে ব্যাঘাত ঘটে এমন সবকিছুই তখন বিরক্তিকর লাগে। হঠাৎ মনে হয়- নাহ, আগেই বোধহয় ভালো ছিলাম!! মানসিকভাবে তৈরি না থাকায় নতুন যেকোন সমস্যায় বিগড়ে যায় মন। সংসারে লেগে যায় অশান্তি। ফেসবুকে দেখা যায় নতুন আপডেট- গিবনে কী প্লাম?? :D
 
ব্যাচেলর সমিতির সদস্যদের এইসব অলীক কল্পনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বুঝতে হবে- বিয়ে মানেই সুখের সাগর নয়। বরং বিয়ে করা মানে জীবনের সকল কাঠিন্যের বিপরীতে নিজেকে দায়িত্ববান পুরুষ হিসেবে ঘোষণা করা। বিয়ে মানে সমস্যাসংকুল পৃথিবীর সব বাধা মোকাবেলায় একজন যোগ্য সঙ্গী খুঁজে নেয়া।

বিয়ের পরে একজন পুরুষ কিংবা নারীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলোঃ হাজারটা সমস্যার ভেতরেও একটা হাসিমুখ, আর একটা সবুজ মন বাঁচিয়ে রাখা। সত্যিকার একটা সুখী সংসারের জন্য এইটাই বোধহয় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
(বিবাহ কথন-১৪)


শুক্রবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

ভাই পেটে ব্যথা, কী ঔষধ খাবো?

ভাই পেটে ব্যথা, কী ঔষধ খাবো?????? ভাই মাথা ব্যথা, কী ঔষধ খাবো?????? বুকটা ব্যথা করছে, কী ঔষধ খাবো???? আপনার ভাবীর কেমন কেমন লাগছে। কী ঔষধ খাওয়াবো??????

Every doctors have to answer these questions everyday.... অত্যন্ত নিরীহ প্রশ্ন। প্রশ্নকর্তাদের দোষ দেয়ার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্নগুলো অতীব সাদাসিধা হলেও উত্তর দিতে গিয়ে ডাক্তারদের ঘাম ছুটে যায়।
অনেকেরই ধারণা, ডাক্তারিবিদ্যা মানে রোগের লক্ষণ অনুযায়ী কিছু ওষুধের নাম মুখস্ত করা। তারপর এই সমস্যায় এই ওষুধ, ঐ সমস্যায় ঐ ওষুধ দুই বা তিনবেলা খাওয়ার উপদেশ দেয়া। জ্বর হলে একটা এন্টিবায়োটিক দেয়া। ব্যথা হলে ব্যথার ওষুধ। এই তো, ডাক্তারিতে আর কী এমন আছে??? 

এইরকম ধারণার বশবর্তী হয়ে ঔষধের দোকানদাররাও প্রেসক্রিপশন পড়ে পড়ে ডাক্তার হয়ে যায়। জনগন ভাবেন- রোগীর দুইদিনের জ্বর, একটা এন্টিবায়োটিক দিলেই হয়ে যায়। কিন্তু তা না, যাওয়ামাত্রই দিলো একগাদা পরীক্ষা নিরীক্ষা। বললাম তলপেটে একটু ব্যথা করছে। একটু পেটে চাপ দিয়ে দেখলো। আবার এটা ওটা পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে বললো। কেনরে ভাই, খালি কমিশন খাওয়ার ধান্দা ক্যান। ব্যথার ঔষধ দিলেই তো হয়। এত পরীক্ষা নিরীক্ষার দরকার কী??

সমস্যাটা হলো- পেটে ব্যথার অসংখ্য কারণ আছে। বুকে ব্যথার অসংখ্য কারণ আছে। মাথা ব্যথারও অনেক কারণ আছে। কিছু কারণ খুব ছোটখাটো, কিন্তু কিছু কারণ খুব ভয়াবহ। পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয় সঠিক কারণটা খোঁজার জন্য। খারাপ কিছু নেই এটা কনফার্ম হওয়ার জন্য। থাকলেও যেন ডায়াগনোসিস মিস না হয় সেজন্য। সো, আপনি যদি একজন সচেতন নাগরিক হোন- ডাক্তারকে কম পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য না বলে ডায়াগনোস্টিক সেন্টারগুলোকে বলুন ফি কমাতে। সরকারকে বলুন পরীক্ষা নিরীক্ষার ফি কন্ট্রোল করতে। যাতে আপনি কম টাকায় পরীক্ষাগুলো করাতে পারেন। যতবেশি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাবেন তত ভালো ডায়াগনোসিস হবে। তত ভালো চিকিৎসা পাবেন। বিকজ, ডায়াগনোসিস ইজ দা কী ফর ট্রিটমেন্ট।

শুক্রবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

খারাপের ভেতরেও ভালো কিছু বের করার চেষ্টা?

ইদানীং কিছু কিছু মানুষকে দেখা যাচ্ছে তারা যেকোন খারাপের ভেতরেও ভালো কিছু বের করার চেষ্টা করছেন। খারাপকে বাতিল না করে তাকে একটা ভালো দিকে ডাইভার্ট করার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন। যেমন- ভালোবাসা দিবস বা ভ্যালেন্টাইন দিবস। এই দিবস উদযাপন করাটা নিঃসন্দেহে খারাপ। ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাইরেও এর কোন ভালো দিক কেউ আমাকে দেখাতে পারবেন না। এই দিবসের নামে যা কিছু হয় সবই খারাপ। এখন কেউ কেউ এই দিনকে মায়ের জন্য ভালোবাসা, বাবার জন্য ভালোবাসা, বন্ধুর জন্য ভালোবাসা প্রকাশের দিবস হিসেবে গ্রহণ করতে চাইছেন। কখনো বলা হয়নি মা তোমাকে ভালোবাসি- এমন কিছু কথা বলে আবেগ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছেন। এই দিবসকে সামাজিকভাবে গ্রহনযোগ্যতা দেয়ার চেষ্টা করছেন।

এই সকল প্রচেষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। সব খারাপকেই ভালোয় রুপ দেয়ার সুযোগ নেই। কিছু কিছু খারাপকে সরাসরি বাতিল করে দিতে হবে। ভালোবাসা বা ভ্যালেন্টাইন দিবস এমনই একটা খারাপ উদ্যোগ যাকে কোনোভাবেই এবং কোনো রুপেই প্রশ্রয় দেয়া উচিত হবে না। এটিকে সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য একটি মন্দ উদ্যোগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

বৃহস্পতিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

মৎস্যকথা

আমরা যে একসময় আসলেই 'মাছে ভাতে বাঙালি' ছিলাম এতে কোন সন্দেহ নাই। মাছের সাথে বাঙালির সম্পর্ক কতটা গভীর তা বোঝা যায় বাঙালি সমাজে প্রচলিত প্রবাদ প্রবচনে। বাঙালি মাত্রই 'গভীর জলের মাছ'। তারা 'শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে' ওস্তাদ। 'চুনোপুঁটি' বাঙালিরা 'কই মাছের প্রাণ' হলেও তাদেরকে নানা কারণে প্রায়শই বেঘোরে মারা পড়তে দেখা যায়। 'রুই কাতলা'রা এইসব অঘটনে জড়িত থাকলেও 'রাঘব বোয়াল'দের আশ্রয়ে থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। এদেশের রাজনীতিবিদরা যেন একেকজন 'মাছের মা'। এইসব 'মাছের মায়ের পুত্রশোক' দেখে দেখে আমরা ক্লান্ত। 'ইলশেগুঁড়ি' উপভোগ করার মত সুখ এখন আর আমাদের মনে অবশিষ্ট নাই।

মঙ্গলবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

ডাক্তার ছাড়া সবাই লাটসাহেব!

'আমার রোগীর স্যালাইন চলে না!' হাসপাতালে ডাক্তারদের কানে আসা একটা কমন এবং বলা চলে 'বিরক্তি উদ্রেককারী' সংলাপ।
কারণ, স্যালাইন চলছে কিনা তা দেখার জন্য নার্সরা আছেন। হয়তো নার্স সামনেই আছে, অথবা বেডের পাশ থেকে একটু আগে হেঁটে এসেছে। কিন্তু তবুও এই সমস্যার কথা নার্সকে না বলে ডাক্তারকেই বলতে হবে কেন?

প্রথমত, হাসপাতালে এসে যদি কারো কাছে ভালো করে একটু কথা বলার আশা থাকে তা একমাত্র ডাক্তার। দারোয়ান, ওয়ার্ড বয়, এমনকি নার্সদেরও একটা অংশ নানাভাবে রোগীর স্বজনদের সাথে খবরদারি ও দুর্ব্যবহার করেন। ফলে কথা বলার জায়গাটা থাকে একমাত্র ডাক্তারের কাছেই।

সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার ছাড়া সবাই যেন লাটসাহেব! 


দ্বিতীয় কারণ, কার কী দায়িত্ব সে সম্পর্কে কোন ধারণাই রাখেন না বেশিরভাগ মানুষ। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার জন্য যে অ-ডাক্তার প্রশাসন আছে সে খবর বলতে গেলে কেউই রাখে না।
হাসপাতালের অপরিচ্ছন্নতা কিংবা অব্যবস্থাপনার জন্য যতজন কুমন্তব্য করেছেন, তাদের মধ্যে একজনও কোনদিন হাসপাতালের পরিচালকের দপ্তরে অভিযোগ করেছেন বলে আমি শুনি নাই।

তৃতীয়ত, ডাক্তার বলতে আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষের মনে ভেসে ওঠে তাদের গ্রামের 'মোখলেছ ডাক্তারে'র চেহারা। যিনি আদতে একজন প্যারামেডিক। রাত বিরাতে রোগীর বাড়িতে যান, নিজেই ঔষধ সরবরাহ করেন, নিজেই ইঞ্জেকশান পুশ করেন। সেকারণেই বড় হাসপাতালে এসেও মানুষ আশা করে, ডাক্তারই ঝুলিয়ে দেবে স্যালাইন , ডাক্তারই পুশ করে দেবে ইঞ্জেকশান।

সোমবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

The Ultimate Weapon: গার্জিয়ানরা সবসময় সন্তানের মঙ্গল চান?

বলা হয়- গার্জিয়ানরা সবসময় সন্তানের মঙ্গল চান। কখনো যুক্তিতে টিকতে না পারলে এই বাক্যটা হয়ে ওঠে তাঁদের মোক্ষম যুক্তি, শেষ অস্ত্র!!

কিন্তু কথাটা অন্যক্ষেত্রে ঠিক হলেও বিয়ের ক্ষেত্রে বোধহয় পুরোপুরি ঠিক না। এই জায়গায় এসে গার্জিয়ানরা সন্তানের চেয়ে নিজের স্বার্থটাকেই অনেক বেশি বড় করে দেখেন।

ছেলের বা মেয়ের বিয়ের জন্য কীভাবে চিন্তা করেন বাবা মায়েরা? তারা প্রথমেই চিন্তা করেন- নিজের ভাই বোন বা বন্ধু বান্ধবীর ছেলে/মেয়ের সাথে নিজের ছেলে/মেয়ের বিয়ে দেবেন। প্রথম 'খোঁজ দা সার্চ'টা চলে এদের মধ্যেই। অনেক সময় দেখা যায়- বাচ্চার জন্মের আগেই তার বিয়ের কথাবার্তা পাকা হয়ে আছে!! :D আমার মেয়ের সাথে তোর ছেলের বিয়ে দেবো, পাকা কথা দিলাম কিন্তু!!! :P
 
যদি এটা সম্ভব না হয়- তাহলে কী ঘটে? যখনই কোন প্রস্তাব আসে, অভিভাবকের প্রথম প্রশ্নটা থাকে- ছেলের/মেয়ের বাবা কী করে? অর্থাৎ তারা চিন্তা করেন তাঁদের বেয়াইটা কে হচ্ছে! ছেলেটা বা মেয়েটা কে, কী, তার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় ছেলের/মেয়ের বাপ কে এবং কী!! পাত্র-পাত্রীর নিজের যোগ্যতার চেয়ে কার ছেলে বা কার মেয়ে অভিভাবকদের কাছে সেটাই হয়ে ওঠে 'বড় যোগ্যতা'।

সন্তান দেখে তার নিজের স্বার্থ, তার থাকে নিজস্ব চিন্তাভাবনা, নিজস্ব পছন্দের মাপকাঠি। আর অভিভাবক দেখেন তাঁর নিজের স্বার্থ, তাঁদের থাকে আলাদা মাপকাঠি। দুয়ের মাঝে প্রায়শই দেখা যায় বিস্তর ফারাক।
এই নিয়ে অভিভাবকদের সাথে সন্তানের টানাপোড়েন হয় নাই, এমন পরিবার বোধহয় বাংলাদেশে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। যে পরিবারে কখনোই কোন মতবিরোধ হয় নাই, বিয়ের প্রসঙ্গে সেখানেও 'ঝামেলা' লেগেই যায়। কখনো বাবা মন খারাপ করেন, কখনো মা, কখনো ভাই বোন কিংবা খালা মামা চাচা।

সবার মন রক্ষা করতে গেলে বেশিরভাগ সময় সন্তানদেরকে নিজের মনটাকেই বিসর্জন দিতে হয়। আর এই মন বিসর্জনের 'বধ' পর্বে অভিভাবকরা সবচেয়ে মোক্ষম যে যুক্তি সামনে নিয়ে আসেন তা হলো- "গার্জিয়ানরা কি কখনো ছেলেমেয়ের অমঙ্গল চাইতে পারেন!!" যদিও বাস্তবে তা সবসময় সত্য না।

অনেক সময়ই সিদ্ধান্তের ব্যাকগ্রাউন্ডে সন্তানের মঙ্গল অমঙ্গলের চেয়ে অভিভাবকদের নিজেদের স্বার্থচিন্তাই প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

(বিবাহ কথন-১৩)

শুক্রবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

যদি কেউ বিয়ে করে ঘরজামাই হতে চান..

আমাদের দেশে এক বিচিত্র কারণে 'ঘরজামাই'দেরকে বাঁকা চোখে দেখা হয় । সিনেমা নাটকেও ঘরজামাইকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য মূলক পার্ট দেয়া হয়। ঘরজামাইকে নিয়া সবাই হাসাহাসি করে । মেয়ে, মানে ঘরজামাইয়ের বউ নিজেও হীনম্মন্যতায় ভোগে । 'স্বামীর বাড়ি' যাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে । বাপের বাড়ি থেকে চলে যেতে চায় ।
কিন্তু প্রয়োজন সাপেক্ষে 'ঘরজামাই' বিষয়টাতে আমি খারাপ কিছু দেখিনা। মেয়ে যদি বাপের বাড়ি ছেড়ে ছেলের বাড়িতে গিয়ে সারাজীবন থাকতে পারে- একই কাজ (পরিবারের প্রতি ঠিকঠাকমত দায়িত্ব পালন সাপেক্ষে) ছেলে করলে সমস্যা কী? এতে ছেলের মান যাবে কেন? আপনি কোথায় থাকছেন তাতে কিছু আসে যায় না। আপনার কাজ, আপনার দায়িত্বনিষ্ঠাই আপনাকে সম্মানিত করবে।

ঘরজামাই মানেই এই না যে শ্বশুরবাড়িতে বসে বসে খাবেন। শ্বশুরের অন্ন ধ্বংস করবেন। সেইটা করলে কিন্তু ভাতের পাশাপাশি জুটবে লাঞ্চনা গঞ্জনা। সন্দেহ নাই।

শ্বশুরবাড়িতে থাকা মানেই শ্বশুরের গোলাম হওয়া নয়। যে বাবার কোন ছেলে নেই, তাদের পরিবারে একজন ঘরজামাই যে কতটা জরুরী, সেটা তারা ছাড়া আর কেউ হয়তো বুঝবেন না।

ভাইবেন না যে এইকথা কইছি বইলা আমারে পচাইবেন । মনে রাখবেন, আমাদের মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)ও কিন্তু হযরত খাদিজা (রাঃ)কে বিয়ে করার পর একপ্রকার ঘরজামাইই ছিলেন ।

আর মুসা(আঃ) তাঁর বিয়ের পর মিশরে না ফেরা পর্যন্ত ছিলেন পুরোদস্তুর ঘরজামাই।

ভাইসব, লজ্জা করবেন না। এগিয়ে যান। কবি হেলাল হাফিজের কবিতার ভঙ্গিতে বলি-

যদি কেউ বিয়ে করে ঘরজামাই হতে চান,
তবে তাই হয়ে যান । 
উৎকৃষ্ট সময় কিন্তু আজ বয়ে যায়।

Disclaimer: এই পর্বের বক্তব্য সম্পূর্ণই তত্ত্বীয়। ইহার সহিত লেখকের ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনার কোনরুপ সামঞ্জস্য সন্ধানের অপচেষ্টা পাঠকের বাতুলতা মাত্র হইবে, এবং তাহা অবিধারিতভাবেই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইবে।

(বিবাহ কথন-১২)

বৃহস্পতিবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

মেয়ের অমতে বিয়েঃ জ্যান্ত কবর

বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়ের মতামতকে কতটা গুরুত্ব দেয়া হয়? আমাদের সমাজে একে সাধারণত তেমন ধর্তব্যের মধ্যে গণ্য করা হয় না। প্রথমত, মতামত নেয়াই হয়না। দ্বিতীয়ত, মেয়েরা মতামত দিলেও তা উপেক্ষা করা হয়। অথবা এমন অবস্থায় এনে ফেলা হয়, যখন মেয়ের যতই অপছন্দ হোক, 'হ্যা' বলা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না।

মুসলিমদের মাঝেও এর ব্যতিক্রম দেখা যায় না। যদিও ইসলামী বিধানে মেয়েদের ব্যাপক স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে।

"হযরত সালামা বিনতে আব্দুর রহমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক মেয়ে রাসুল (সাঃ) এর কাছে এসে বললো, হে আল্লাহর রাসুল! আমার পিতা! কতইনা উত্তম পিতা! আমার চাচাত ভাই আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিল আর তিনি তাকে ফিরিয়ে দিলেন। আর এমন এক ছেলের সাথে বিয়ে দিতে চাইছেন যাকে আমি অপছন্দ করি। এ ব্যাপারে রাসুল (সাঃ) তার পিতাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, মেয়েটি সত্যি বলেছে। তখন রাসুল (সাঃ) মেয়েটিকে বললেন, “এ বিয়ে হবে না, তুমি যাও, যাকে ইচ্ছে বিয়ে করে নাও”। (সুনানে সাঈদ বিন মানসূর)
---
ইসহাক ইবনু মানসূর (রহঃ) .... আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অকুমারী মহিলাকে তার সুস্পষ্ট অনুমতি ব্যতিরেকে বিবাহ দেওয়া যাবে না। কুমারী মহিলাকেও তার সম্মতি ব্যতিরেকে বিবাহ দেওয়া যাবে না।( ইবনু মাজাহ, বুখারি, মুসলিম, তিরমিজী)
---
এমনকি মেয়ের অমত থাকলে বিয়ে হয়ে যাবার পরেও রাসুল (সাঃ) তা বাতিল করার অধিকার দিয়েছেন।

"হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। এক কুমারী মেয়ে রাসুল (সাঃ) এর কাছে এসে বলল, আমার পিতা আমার অপছন্দ সত্বেও বিয়ে দিয়েছেন। তখন রাসুল (সাঃ) সে মেয়েকে অধিকার দিলেন, [যাকে ইচ্ছে বিয়ে করতে পারে বা এ বিয়ে রাখতেও পারে]।" (মুসনাদে আহমাদ, সুনানে ইবনে মাজাহ, সুনানে আবু দাউদ)
---
সাবালিকা মেয়ের নিজ বিয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার অভিভাবক অপেক্ষা তার নিজেরই বেশি। (মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী)
এমনকি কোনো মেয়ে যদি প্রাক্তন স্বামীকে আবার বিয়ে করতে চায়, তাতেও বাধা দিতে নিষেধ করা হয়েছে।
"তারা যদি ন্যায়সঙ্গতভাবে পরস্পর সম্মত হয়, তবে স্ত্রীগণ নিজেদের (প্রাক্তন) স্বামীদেরকে বিবাহ করতে চাইলে তোমরা তাদের বাধা দিও না। (সূরা বাকারা : ২৩২)"
---
মেয়েদের এই অধিকার ও স্বাধীনতা সম্পর্কে পুরুষদের স্বচ্ছ ধারণা থাকা দরকার। বিয়ের মত এত গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপারে যদি কারো পছন্দ অপছন্দকে গুরুত্ব না দেয়া হয়, এর অর্থ দাঁড়ায় মানুষ হিসেবে তার স্বাধীন স্বত্ত্বাকে অস্বীকার করা। নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার যোগ্যতা একজন মেয়ের আছে, এই বিশ্বাস সকল পুরুষকেই রাখতে হবে।

সবচেয়ে গুরুতর ব্যাপারটা হলো- কোন মেয়ের অমতে তার বিয়ে দেয়া হলে তা জায়েজ/বৈধই হয় না। আর এই সময়ের মুসলিম স্কলাররা মনে করেন- একজন মেয়েকে জোর করে তার অপছন্দের কারো সাথে বিয়ে দেয়া আসলে ইসলামপূর্ব যুগে মেয়েশিশুকে জ্যান্ত কবর দেয়ার সমতুল্য।

(বিবাহ কথন-১১)

মঙ্গলবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

আকাশচুম্বী মোহরানাঃ বরের 'অর্থদন্ড' ??

শুধু পণ্যই নয়, আমাদের সমাজে মানুষেরও মূল্য নির্ধারিত হয় টাকার অংকে।

আর এর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় বিয়ের আসরে। মোহরানা নিয়ে যেভাবে দরকষাকষি করা হয়- মাছের বাজারেও ততটা করা হয় কিনা সন্দেহ।

অথচ বিয়ে কোন পণ্য কেনাবেচা নয়। বিয়ে মানে মানুষে মানুষে গড়া পবিত্র বন্ধন। প্রাণের সাথে জুড়ে দেয়া প্রাণ।
মোহরানা নির্ধারণ করা উচিৎ নারীর সম্মান, আর কিছুটা আর্থিক নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে। বাস্তবসম্মত ও পরিশোধযোগ্য সাধ্যের ভেতর। সেটাকে এমন অবাস্তব, আকাশচুম্বী, অপরিশোধ্য অংকে নির্ধারণ করা ঠিক না যাতে করে তা বরের কাছে 'আর্থিক দন্ডে'র মত মনে হয়!!

প্রথমেই মাথার ওপর বোঝা চাপিয়ে দিলে নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও তা কাঁটা হয়ে বিধে থাকে।
অতিরিক্ত মোহরানা পারস্পরিক সম্পর্কের কোন রক্ষাকবচ নয়। সম্পর্ক টিকে থাকে শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, ভালোবাসার ওপর। পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতার ওপর। শ্রদ্ধা কিংবা বিশ্বাস হারালে, পারস্পরিক আকর্ষণ হারালে, কাগুজে কাবিন সেখানে মূল্যহীন হয়ে যায়।

টাকার অভাবে কখনো সংসার ভাঙ্গে না। তার প্রমাণ লাখ লাখ ভূমিহীন কৃষক, ভিক্ষুক ভিখারিনীর সংসার। কোন একটা পরিবার শুধুমাত্র তখনই ভাঙতে পারে, কোন সংসারে শুধুমাত্র তখনই বিচ্ছেদ ঘটতে পারে, যখন পরস্পরের প্রতি কোন আবেগ অবশিষ্ট থাকে না। থাকে না একজনের প্রতি আরেকজনের কোন আকর্ষণ, শ্রদ্ধাবোধ।

কাবিনের টাকার অংক যে সংসারে বন্ধনের একমাত্র সুতো, সেখানে কোন সুখ অবশিষ্ট থাকে না। সেখানে সুত্রপাত হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের নানা কাহিনীর। কিছু প্রকাশ্যে আসে, বেশিরভাগই রয়ে যায় চোখের আড়ালে।
আবেগহীন সংসারে স্বামী যেন হয়ে যায় একজন দাস, আর স্ত্রীর সাথে তার আচরণ হয়ে থাকে দাসীর মত।

কাবিনের টাকা অধিক নির্ধারণ নয়, সমাজকে গুরুত্ব দিতে হবে নারীর শিক্ষা ও স্বনির্ভরতার ওপর। যে নারী নিজে নিজেকে, নিজের পরিবারকে চালানোর মত আর্থিক সক্ষমতা রাখেন, তার কাবিন নিরাপত্তার প্রয়োজন নেই।
টাকার গোলামী নয়, পবিত্র সুন্দর বন্ধনগুলো টিকে থাকুক পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার তারকাটায় গাঁথা হয়ে।

(বিবাহ কথন-১০)

সোমবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

সাধ্যাতীত মোহরানাঃ দায়ী কে?

"নিমকহারাম" বলে হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো বুড়ো মকবুল। তারপর অকস্মাৎ এক অবাক কান্ড ঘটিয়ে বসলো সে। ঘরের মাঝখানে, এতগুলো লোকের সামনে হঠাৎ আমেনা আর ফাতেমা দুজনকে একসঙ্গে তালাক দিয়ে দিলো সে। রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললো, তোরা বাইরইয়্যা যা আমার বাড়ি থাইক্যা।
(হাজার বছর ধরে/জহির রায়হান)।

বর্তমান সময়ে অতিরিক্ত/সাধ্যাতীত মোহরানা কাবিনে লেখা হয় মূলত আর্থিক নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে।
অদ্ভুত ব্যাপারটা হলোঃ একটা বিয়ের শুরুতেই মাথায় রাখা হয় 'তালাকের' কথা!!

কীভাবে এই অবস্থার উদ্ভব হলো? আমার বিশ্বাস, এর জন্য নারীসমাজ দায়ী নয়। পুরুষরাই দায়ী। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও প্রতিটি গ্রামে আট দশজন করে তালাকপ্রাপ্তা নারীর দেখা মিলত। হাজার বছর ধরে উপন্যাসের মকবুল বুড়োর মত পুরুষরা বিনাকারণে একাধিক বিয়ে করতো, আর যখন তখন বলে দিত- "তিন তালাক"।

এইসব নারীর বেশিরভাগই পেতেন না তাদের মোহরানা, পেতেন না বাবার সম্পত্তির ভাগ। কারো কারো দ্বিতীয় বিয়ে হত। সতীনের ঘরে জুটতো লাঞ্চনা গঞ্জনা। আর যাদের তাও হতনা, তাদেরকে হাতে নিতে হত ভিক্ষার ঝুলি।
এখনো গ্রামে গঞ্জে যেসব নারী ভিক্ষুক দেখা যায়, তারা আসলে তালাকপ্রাপ্তা নারী, যারা বঞ্চিত হয়েছেন মোহরানা থেকে, বঞ্চিত হয়েছেন বাবার সম্পত্তি থেকে। বঞ্চিত তারা রাষ্ট্রের আইন এবং সমাজের সুরক্ষা থেকে।

তালাকের এই অপব্যবহার রোধের প্রয়োজনেই শুরু হয়েছে অতিরিক্ত এবং সাধ্যাতীত মোহরানা নির্ধারণের চল। যদিও বর্তমান তরুণ প্রজন্ম এর জন্য দায়ী নয়, কিন্তু আগের প্রজন্মের কৃতকর্মের বিষফল ভোগ করতে হচ্ছে তাদেরকেই।
(বিবাহ কথন-৯)

শনিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০১৭

বুড়াটা মরি গ্যালো, মহরানা শোধ করি গ্যালো না...

আমাদের গ্রামের গফুর দাদা মারা যাবার বহুদিন পরে একদিন গফুর দাদীকে বলতে শুনেছিলাম, বুড়াটা মরি গ্যালো, মহরানা শোধ করি গ্যালো না। আরেক দাদী তখন বলেছিলেন- মাফ করি দে গো বু (বু মানে বোন)। মনে কষ্ট রাখিস না। কবরে কষ্ট পাইবে।

ছোট ছিলাম, তখন বুঝিনি। কিন্তু পরে যখন দাদীর কথাগুলোর গুরুত্ব বুঝেছিলাম, I was thundered... স্বামী মারা গেছে সেটাই একটা বড় কষ্ট, কিন্ত সেই কষ্টও তার মোহরানা না পাবার কষ্টকে আড়াল করতে পারেনি।
আমাদের সমাজে অনেক পুরুষই মোহরানা পরিশোধ না করার ধান্দায় থাকেন। ধার্য যা-ই হোক, কোনরকমে অল্প কিছু দিয়ে বাকিটা মাফ চেয়ে নেয়ার একটা গোপন ইচ্ছা পোষণ করেন। অনেকে তা করেনও। 

এরকম চিন্তাভাবনা পুরুষত্বের অপমান। কাপুরুষ ছাড়া কেউ এমন চিন্তা করতে পারে না।

প্রখ্যাত সাহাবী আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রাঃ) খেজুরের আঁটির সমপরিমাণ স্বর্ণ মোহরানা দিয়েছিলেন। আর রাসুল (সাঃ) একজন সাহাবীকে বিয়ে দিয়েছিলেন এতটুকু মোহরানায় যে, ঐ সাহাবী তার নিজের মুখস্থ থাকা কয়েকটি সুরা স্ত্রীকে শেখাবেন।

আপনি যা পারবেন বলে মনে করেন, তাই নির্ধারণ করবেন। ইট ডিপেন্ডস আপন ইওর ক্যাপাবিলিটি।
কিন্তু যা-ই নির্ধারণ করুন, শোধ করার ইচ্ছা রেখেই করুন। বিয়ের কয়েকদিনের মধ্যে মাফ চাবেন, তা হবে না। ঐসময় হয়তো নতুন বউ চক্ষুলজ্জায় কিছু বলতে পারবে না। মৃত্যুশয্যায় শুয়ে মাফ চাবেন, সে সুযোগ কপালে নাও জুটতে পারে। আর এরকম সময়ে কেউ মাফ করলেও তা খুশিমনে বা স্বতস্ফূর্ত হবে না।

পরিস্থিতির চাপে হয়তো কেউ বাধ্য হয়ে তার দাবী ছাড়তে পারেন। কিন্তু আপনার মৃত্যুর পর কখনো অভাবে পড়লে গফুর দাদীর মত হয়তো তিনিও বলবেন- বুড়াটা মরি গ্যালো, মহরানা শোধ করি গ্যালো না।
(বিবাহ কথন-৮)

শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০১৭

মোহরানাঃ কম দেয়ার মানসিকতা ঠিক না

বিয়ের মোহরানা নিয়ে অনেকের খেদ আছে।

মোহরানা নির্ধারণ যেভাবে করা হয় তাতে ক্ষুব্ধ হওয়ার যৌক্তিকতাও আছে। আমিও ক্ষুব্ধ হইনা তা নয়। মোহরানা নির্ধারণের নামে যেভাবে পণ্যের মত দর-কষাকষি করা হয়, এতে নারীর সম্মান বাড়ে নাকি অপমান হয় সেটা নিয়ে মেয়েদেরকেই ভাবতে হবে। মেয়েদের কী করা উচিৎ তা নিয়ে আমি কখনো কথা বলি না। তাদের ব্যাপার নিয়ে তারাই ভাবুক। আমার আজকের বক্তব্য সেইসব পুরুষদের উদ্দেশ্যে যারা অধিক মোহরানা নিয়ে ক্ষুব্ধ, হতাশ।
মোহরানা নিয়ে ক্ষুব্ধ পক্ষের অনেকের বক্তব্য শুনে আমার মনে হয়েছে, তারা মোহরানাটাকে বিয়ের একটা প্রথামাত্র মনে করেন। যেন কোনমতে অল্প কিছু মোহরানা দিয়ে বিয়ে করতে পারলেই তারা খুশি হন। 

মোহরানা না দেয়ার চিন্তা যেমন জঘন্য, আমার মনে হয়, শুধু শুধু কম দেয়ার মানসিকতাও ঠিক না। এমন মেন্টালিটি থেকে সবাইকে সরে আসতে হবে। ছেলেদের মানসিকতা থাকা উচিৎ মোহরানা কম দেয়া নয়, সামর্থের মধ্যে সর্বোচ্চ বেশি দেয়ার।

কম দেয়ার উদ্দেশ্যে মোহরে ফাতেমীর জিগির তুলবেন না।

মোহর পরিশোধ করা শুধু বাধ্যবাধকতাই নয়, এটা সওয়াবেরও কাজ। হাদিসে আছে- তোমরা স্ত্রীর মুখে যা তুলে দাও তাও সদকা হিসেবে গন্য হবে। নিজের বউয়ের সমস্ত চাহিদা মেটানো আপনার বাধ্যবাধকতা, কিন্তু তারপরেও সেটাকে সদকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আপনি কেন এই সুযোগ হেলায় হারাবেন?

আপনার স্ত্রী আপনার কাছে কতটা Precious সেটা যদিও টাকার অংকে নির্ধারণ করার সুযোগ নেই, তবে টাকার অংক একেবারে ফেলনাও নয়। বিশেষত এমন সমাজে, যেখানে টাকাই আপনার সামাজিক অবস্থান নির্ধারণ করে।

(বিবাহ কথন-৭)

বৃহস্পতিবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০১৭

এইবার তাইলে দ্বীনদার পাত্রীই দেখুম!!!

পাত্র পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) এর একটা হাদীসকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়।

হাদীসটি হলোঃ আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ রেখে শাদী করা হয়- তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য ও তার দ্বীনদারী। সুতরাং তুমি দ্বীনদারীকেই প্রাধান্য দেবে। অন্যথায় তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। (বুখারী)

আমি অনেককেই বলতে শুনেছি- তারা এই হাদীসের রেফারেন্স দিয়ে বলেন যে, বিয়ের জন্য অবশ্যই সম্পদ, সৌন্দর্য, বংশমর্যাদা দেখতেই হবে!! 

কিন্তু আসলে কি হাদীসের বক্তব্য তা? বরং এখানে তো সম্পদ, সৌন্দর্য, বংশমর্যাদা সবকিছুর ওপরে পাত্র/পাত্রীর দ্বীনদারীকে স্থান দিতে বলা হয়েছে। ধনী বেদ্বীনের চেয়ে দ্বীনদার গরীব ভালো, উচ্চবংশের অদ্বীনদারের চেয়ে সাধারণ বংশের দ্বীনদার ভালো, অতিসুন্দর অদ্বীনদার/কম দ্বীনদারের চেয়ে কমসুন্দর বেশি দ্বীনদার পাত্র/পাত্রী ভালো।
এইভাবে পাত্র/পাত্রীর দ্বীনদারিতাকে সবকিছুর ওপরে স্থান দিতে বলা হয়েছে।

আর অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে অন্য হাদীসে বলা হয়েছে- তোমাদের নিকট যখন এমন কেউ প্রস্তাব নিয়ে আসে যার দ্বীন (ধর্মপরায়ণতা) ও আখলাক (উত্তম স্বভাব চরিত্র) তোমাদের কাছে সন্তোষজনক হয়, তখন তোমরা বিয়ে দিয়ে দাও। অন্যথায় পৃথিবীতে ফিতনা ছড়িয়ে পড়বে। (তিরমিজী)

হ্যা, আপনি সুন্দর, সম্পদশালী, উচ্চ বংশের পাত্র/পাত্রী বিয়ে করতে পারবেন না তা নয়, কিন্তু হাদিসে এসব ক্রাইটেরিয়াকে আবশ্যক করা হয়নি। হাদীসকে নিজের খায়েশের পক্ষে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই।
***
***
ডিয়ার ব্যাচেলরস, যারা মনে মনে ভাবা শুরু করছেন- এইবার তাইলে দ্বীনদার পাত্রীই দেখুম!!! বেরাদর, আপনার নিজের দ্বীন আখলাক ঠিক আছে তো?? নিজে ভংচং জীবন যাপন করবেন, ধর্মের আশেপাশে হাঁটবেন না, নামাজ কালামের ধার ধারবেন না, আবার নামাজী, পর্দাশীল ভদ্র পাত্রী খুঁজবেন, তা অয় না মিয়া।

দ্বীনদার পাত্রী খোঁজার আগে নিজে দ্বীনদার হন। নিজের চরিত্র ঠিক করেন। নাইলে দ্বীনদার পাত্রীরা ঠিকই আপনাকে ঠেঙ্গানি দিয়া বিদায় করবে :P :P
কোরআন হাদীসের ওপর আমল করার ক্ষেত্রে তারা কিন্তু আপনার চেয়েও অনেক অনেক বেশি সিরিয়াস :)  

(বিবাহ কথন-৬) 

বুধবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০১৭

আর্লি ম্যারেজ নয়, বিয়ে হোক যথাসময়ে

ইদানিং অনেককেই আর্লি ম্যারেজ ক্যাম্পেইন করতে দেখা যায়। আমি এই তথাকথিত আর্লি ম্যারেজের পক্ষে নই। আর্লি ম্যারেজ সত্যিকার কোন সমাধান নয়। অল্প বয়সে বিয়ে দিলেই কারো সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যায় না।
জৈবিক চাহিদা পূরণই বিয়ের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। বিয়ে হলো পরিবার গঠনের উদ্যোগ। বিয়ে হলো সুস্থ সুন্দর সমাজ গঠনের উদ্যোগ। বিয়ে হলো সুনাগরিক তৈরির উদ্যোগ।

ছেলে মেয়ে সবারই বিয়ের জন্য অন্তত এতটা বয়স হওয়া উচিৎ যখন সে তার সঙ্গীর প্রতি কী দায়িত্ব, সমাজের প্রতি কী দায়িত্ব তা বুঝতে পারে। যখন তারা একটা শিশুকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মত মানসিক পরিপক্কতা ও যোগ্যতা অর্জন করে। আর্লি ম্যারেজ নয়, বিয়ে হতে হবে যথাসময়ে। বিয়ের জন্য বয়সই একমাত্র যোগ্যতা নয়।
কেউ কেউ মনে করেন তাড়াতাড়ি অল্প বয়সে বিয়ে দিলেই চারিত্রিক অবক্ষয় থেকে ব্যক্তি ও সমাজ রক্ষা পাবে। নীতি নৈতিকতা রক্ষা পাবে। কিন্তু বিষয়টা আসলে তা নয়। চরিত্র রক্ষার জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ, আইনের যথাযথ প্রয়োগ আর সামাজিক সুরক্ষা।

যে ছেলের মন সুস্থ নয়, তাকে ধরে বিয়ে দিলেই কোনকিছু ঠিক হয়ে যাবে না। অবিবাহিত মাত্রই চরিত্রহীন নয়, আর বিবাহিত হলেই কারো চরিত্র রাতারাতি ফুলের মত পবিত্র হয়ে যায় না। চরিত্রহীনদের তালিকায় বিবাহিতদের সংখ্যা নিতান্তই নগন্য নয়।

আর্লি ম্যারেজের নামে বেকার অবস্থায় কোন ছেলেকে বিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। বিয়ে দিলেই ঠিক হিয়ে যাবে- এটা কোন কাজের কথা হতে পারেনা। বিয়ে এমন কোন দাওয়াই নয়- যাতে নিমেষেই সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। একটা ছেলের বিয়ের আগে অন্তত এতটুকু উপার্জন থাকা উচিত, যাতে অন্তত দু'জন মানুষ ডাল ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে। বিয়ে দিলে ঠিক হয়ে যাবে!!" গেলে ভালো কথা, কিন্তু ঠিক না হলে যে একটা মেয়ের জীবন নষ্ট হয়ে যাবে, সেকথাও তো ভাবতে হবে নাকি?

বাবা মায়ের ওপর কোন দায়িত্ব নেই আপনার বউকে খাওয়ানোর। তারা যদি খাওয়াতে চান, খুব ভালো। নইলে আপনার বউয়ের সব চাহিদা মেটানোর দায়িত্ব সম্পূর্ণই আপনার।

কৃষিনির্ভর সমাজে মানুষ বৃদ্ধি মানেই ছিল আয় বৃদ্ধি। কিন্ত আধুনিক নগরভিত্তিক সমাজে তা নয়। এখানে বেশিরভাগ পিতামাতার নাভিশ্বাস উঠে যায় দু-তিনজন সন্তান মানুষ করতে। বাবার যখন অবসরে যাবার বয়স, তখন বেকার অবস্থায় আপনাকে বিয়ে করিয়ে নতুন একটা অতিরিক্ত সংসার টানার সামর্থ তার থাকবার কথা নয়।

আরে ভাই, ক্যাম্পেইন ট্যাম্পেইন করার আগে বুকে হাত দিয়া বলেন তো- আপনি কি আপনার বোনকে একজন পরিপূর্ণ বেকার ছেলের সাথে বিয়ে দিবেন?
(বিবাহ কথন-৫)

তথাকথিত আর্লি ম্যারেজ চাই না...

ইদানিং অনেককেই আর্লি ম্যারেজ ক্যাম্পেইন করতে দেখা যায়। আমি এই তথাকথিত আর্লি ম্যারেজের পক্ষে নই। আর্লি ম্যারেজ সত্যিকার কোন সমাধান নয়। অল্প বয়সে বিয়ে দিলেই কারো সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যায় না।
জৈবিক চাহিদা পূরণই বিয়ের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। বিয়ে হলো পরিবার গঠনের উদ্যোগ। বিয়ে হলো সুস্থ সুন্দর সমাজ গঠনের উদ্যোগ। বিয়ে হলো সুনাগরিক তৈরির উদ্যোগ।

ছেলে মেয়ে সবারই বিয়ের জন্য অন্তত এতটা বয়স হওয়া উচিৎ যখন সে তার সঙ্গীর প্রতি কী দায়িত্ব, সমাজের প্রতি কী দায়িত্ব তা বুঝতে পারে। যখন তারা একটা শিশুকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মত মানসিক পরিপক্কতা ও যোগ্যতা অর্জন করে। আর্লি ম্যারেজ নয়, বিয়ে হতে হবে যথাসময়ে। বিয়ের জন্য বয়সই একমাত্র যোগ্যতা নয়।
কেউ কেউ মনে করেন তাড়াতাড়ি অল্প বয়সে বিয়ে দিলেই চারিত্রিক অবক্ষয় থেকে ব্যক্তি ও সমাজ রক্ষা পাবে। নীতি নৈতিকতা রক্ষা পাবে। কিন্তু বিষয়টা আসলে তা নয়। চরিত্র রক্ষার জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ, আইনের যথাযথ প্রয়োগ আর সামাজিক সুরক্ষা।

যে ছেলের মন সুস্থ নয়, তাকে ধরে বিয়ে দিলেই কোনকিছু ঠিক হয়ে যাবে না। অবিবাহিত মাত্রই চরিত্রহীন নয়, আর বিবাহিত হলেই কারো চরিত্র রাতারাতি ফুলের মত পবিত্র হয়ে যায় না। চরিত্রহীনদের তালিকায় বিবাহিতদের সংখ্যা নিতান্তই নগন্য নয়।

আর্লি ম্যারেজের নামে বেকার অবস্থায় কোন ছেলেকে বিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। বিয়ে দিলেই ঠিক হিয়ে যাবে- এটা কোন কাজের কথা হতে পারেনা। বিয়ে এমন কোন দাওয়াই নয়- যাতে নিমেষেই সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। একটা ছেলের বিয়ের আগে অন্তত এতটুকু উপার্জন থাকা উচিত, যাতে অন্তত দু'জন মানুষ ডাল ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে। বিয়ে দিলে ঠিক হয়ে যাবে!!" গেলে ভালো কথা, কিন্তু ঠিক না হলে যে একটা মেয়ের জীবন নষ্ট হয়ে যাবে, সেকথাও তো ভাবতে হবে নাকি?

বাবা মায়ের ওপর কোন দায়িত্ব নেই আপনার বউকে খাওয়ানোর। তারা যদি খাওয়াতে চান, খুব ভালো। নইলে আপনার বউয়ের সব চাহিদা মেটানোর দায়িত্ব সম্পূর্ণই আপনার।

কৃষিনির্ভর সমাজে মানুষ বৃদ্ধি মানেই ছিল আয় বৃদ্ধি। কিন্ত আধুনিক নগরভিত্তিক সমাজে তা নয়। এখানে বেশিরভাগ পিতামাতার নাভিশ্বাস উঠে যায় দু-তিনজন সন্তান মানুষ করতে। বাবার যখন অবসরে যাবার বয়স, তখন বেকার অবস্থায় আপনাকে বিয়ে করিয়ে নতুন একটা অতিরিক্ত সংসার টানার সামর্থ তার থাকবার কথা নয়।

আরে ভাই, ক্যাম্পেইন ট্যাম্পেইন করার আগে বুকে হাত দিয়া বলেন তো- আপনি কি আপনার বোনকে একজন পরিপূর্ণ বেকার ছেলের সাথে বিয়ে দিবেন?

(বিবাহ কথন-৫)

মঙ্গলবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০১৭

এক গ্লাস তরল ভালোবাসা...

গার্জিয়ানদের ইচ্ছা- তারা মেয়েকে এমন ঘরে বিয়ে দেবেন, যেখানে গিয়ে মেয়ে সবকিছু রেডিমেড পাবে। সবকিছু পাবে সাজানো গোছানো। যেন সে শুধু একটা সাজানো বাগানে গিয়ে প্রবেশ করবে মাত্র!!!

কিন্তু আমার মনে হয়, একটা নতুন সংসার হওয়া উচিৎ একেবারেই নতুন। এমনকি খাটটাও যদি স্বামী স্ত্রী দু'জনে একসাথে মিলে কিনতে পারে সেটাও ভালো। বিষয়টা হওয়া উচিৎ এমন- নিজেদের জন্য একেকটা প্লেট, গ্লাস, রান্নার চুলা, কড়াই, হাড়ি পাতিল- সবকিছু তারা নিজেরা নিজেরা কিনুক, নিজের মত করে একটা একটা করে কিনে সাজাক নতুন সংসার।

উইমেন সাইকোলজিই বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় সাবজেক্ট :P আর আমার জ্ঞান সেখানে হিমাংকেরও শত ডিগ্রী নিচে। তবুও মা, খালা, বোনদের কর্মকান্ড দেখে যতটুকু বুঝেছি- প্রত্যেক মেয়েই নিজের সংসারটা একান্তই নিজের মনের মত করে সাজাতে চায়। একটা একটা করে আসবাব কিনে তিল তিল করে যে সংসার একজন নারী সাজিয়ে নেন, তার প্রতি মায়া থাকে অন্যরকম। প্রতিটি জিনিসকে মনে হয় তার নিজের সন্তানের মত। একান্তই নিজের। যদি কখনো বাইরের পৃথিবী অসহ্য হয়ে ওঠে, এইসব তৈজসপত্রের মাঝেও তারা খুঁজে পান সুখ।
যতটা চিন্তা গবেষণা করে তারা একটা ডিনার সেট কেনেন, ততটা চিন্তা নিজের বিয়ের সময়ও কেউ করেন কিনা সন্দেহ :P
 
নতুন সংসারে খুনসুটি করে কেনা একেকটা আসবাব হয়ে থাকে জীবনের একেকটা মাইলফলক।

ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিলেই সবকিছু সাজিয়ে গুছিয়ে দেবেন না। তাদের নিজেদের সংসার নিজেদের মত করে সাজাতে বলুন।

নিজেদের কষ্টের টাকায় নিজেরা কিনে আনা একটা টিনের থালায়- পান্তাভাতকেই তাদের মনে হবে যেন বেহেশত থেকে পাওয়া মান্না সালওয়া।

আর গ্লাস কিংবা মগে পানি খাওয়ার সময় মনে হবে- এ যেন পানি নয়, হৃদয় নিঙরানো এক গ্লাস তরল ভালোবাসা  

(বিবাহ কথন-৪)

সোমবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০১৭

বিয়েঃ যুদ্ধটা হোক একসাথে

মেয়েদের গার্জিয়ানরা সবসময় চান- ছেলে যেন পুরোপুরি এস্টাবলিশড হয়! তার যেন অলরেডি বাড়ি গাড়ি থাকে!
তারা হয়তো ভুলে যান, অথবা জানেন না, যে ছেলে সবসময় সবকিছু না চাইতেই পেয়ে এসেছে, কিংবা যে ছেলে সবকিছু নিজে নিজে গুছিয়ে ফেলেছে- তার ঘরে নতুন বউ নতুন একটা আসবাবের মত বাড়তি সংযোজন মাত্রঃ যা তার কিছু শারীরিক ও মানসিক চাহিদা মেটাবে।

আসলে এস্টাবলিশমেন্ট নয়, দেখা উচিৎ পটেনশিয়ালিটি। দেখা উচিত স্বভাব চরিত্র।

আর বিয়েটা দেয়া উচিৎ সবকিছু গুছিয়ে নেয়া বা প্রতিষ্ঠিত হবার পর নয়, ছেলেমেয়েদের জীবনে সংগ্রাম বাকি থাকতেই। যাতে করে জীবনের বাকি যুদ্ধটা তারা দু'জনে একসাথে চালিয়ে নিতে পারে। যুদ্ধ করে করে জীবন এগিয়ে গেলে তবেই সম্পর্কটা হবে ইস্পাতকঠিন। নিঃস্বার্থ ভালোবাসাময়।

মানুষ সবসময় তাকেই বেশি ভালবাসে, বেশি আপন মনে করে, যে ছিল বিপদ মুহূর্তের সাথী। জীবনের বিভিন্ন কঠিন সময়ে যারা আমাদের সঙ্গে থাকে তাদেরকে আমরা ভুলতে পারিনা। তাদের সাথে সম্পর্কটা একসময় সত্যি সত্যিই স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে যায়।

বিয়ের ক্ষেত্রেও অবস্থাটা ভিন্ন কিছু নয়। যে স্বামী স্ত্রী একসাথে সংগ্রাম করে করে জীবনের পথে এগিয়ে যায়- তাদের বন্ধনটাই হয় সবচেয়ে দৃঢ়। তাদের ভালোবাসা হয় সবচেয়ে গাঢ়। সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী। কারণ, কঠিন সময়গুলোই মানুষের অন্তরে দাগ কেটে যায়। জীবনের শেষ দিনেও হয়তো মনে পড়ে - একদিন আমরা এক বেলা উপোস ছিলাম।
খাদিজা (রাঃ) এর মৃত্যুর পর আল্লাহর রাসুল (সাঃ) আরো বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু তিনি কখনো খাদিজা (রাঃ)কে ভুলে যাননি। খাদিজার কথা ভেবে তিনি কাঁদতেন। খাদিজার আত্মীয় ও বান্ধবীদের খোঁজ খবর নিতেন, উপহার পাঠাতেন।
কারণ, খাদিজা (রাঃ) ছিলেন তাঁর দুঃখের দিনের সাথী, কঠিন সময়ের সহযোদ্ধা।

রাসুল(সাঃ) যখন হেরা গুহায় ধ্যান করতেন খাদিজা (রাঃ) তখন রাতের আঁধারে তাঁকে খাবার দিয়ে আসতেন। নবুয়ত পাওয়ার পরের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোয় সবসময় সাহস ও সমর্থন যুগিয়ে গেছেন একজন বয়সী নারী, হযরত খাদিজা(রাঃ)।

এমন প্রাণের বন্ধুকে, এমন আত্মার আত্মীয়কে কখনোই ভোলা যায় না।

(বিবাহ কথন-৩)

রবিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০১৭

বিয়েঃ হোক বন্ধুত্ব

বিয়েতে উভয়পক্ষেরই অনেক কিছুই দেখা হয়। কী কী দেখা হয় তার ফিরিস্তি দিয়ে শেষ করা যাবে না। এমনকি পাত্র/পাত্রীর বাড়ির চায়ের কাপটা কেমন, কী নাস্তা দিয়েছিল, চায়ে কতটুকু চিনি দেয়া হয়েছিল সেটাও অনেকের কাছে ইম্পর্ট্যান্ট হয়ে দাঁড়ায়। বাড়ির কুকুরটা একটু বেশি ঘেউ ঘেউ করলেও অনেক সময় ভেস্তে যায় বিয়ের আলাপ।

বিয়েতে অনেক কিছুই দেখা হয়। চেহারা, চাকরি, ধনসম্পদ, শিক্ষা, এলাকা, পরিবার। শুধু দেখা হয়না পাত্রপাত্রীর মানসিক মিল অমিলের ব্যাপারটা। বিবেচনায় নেয়া হয়না ছেলেমেয়েদের চিন্তাচেতনার মিল অমিল। যেন এটা কোন বিষয়ই নয়!! যেন বিয়ে মানে টাকা ঘরবাড়ি আর বংশের সুনাম দেখে দু'জন মানুষকে এক ঘরে ঢুকিয়ে দেয়া!!
আমাদের সমাজের এইসব বিয়ে কি পাত্রের সাথে পাত্রীর, নাকি পাত্রের চাকরির সাথে পাত্রীর চামড়ার- এ নিয়ে প্রায়শই আমার ঘোরতর সন্দেহ হয়। 


অথচ বাস্তবিক অর্থে বিয়ে হচ্ছে একটা বন্ধুত্ব। স্বামী স্ত্রীর মাঝেই হতে হবে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব।
ভাবুন তো, আপনার খুব ক্লোজ যে বন্ধু, সে কীভাবে আপনার বন্ধু হলো? কেন আপনাদের বন্ধুত্ব দীর্ঘস্থায়ী হলো?
যার সাথে আপনার মনের মিল, যার সাথে আপনি প্রাণখুলে কথা বলতে পারেন, যার সাথে কথা বলে আপনার সময় কেটে যায় অনায়াসে- তারাই কিন্তু আপনার প্রিয় বন্ধু। তাই না! তাদের মধ্যে আছে পাটকাঠির মত হ্যাংলা বন্ধু, আছে মোটা, পাতলা, আছে বেঁটে, আছে লম্বা। আছে গরীব, আছে ধনী। কালো, শ্যামলা, ফর্সা। এইসব কোনকিছুই কিন্তু বন্ধুত্ব নির্মানের পথে বিবেচ্য ছিলনা। বন্ধুত্ব তৈরি হয় মনের মিল, বিশ্বাস আর ভালোলাগা থেকে।

বিয়ের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। মনের মিল না হলে বিয়ে সুখের হয় না। বন্ধুত্ব না হলে দীর্ঘস্থায়ী হয় না সম্পর্ক। চিন্তাভাবনার অমিলের কারণে, অর্থের প্রাচুর্যের মাঝেও প্রতিনিয়ত ভেঙ্গে যাচ্ছে অনেক সংসার। আর অনেক পরিবার টিকে আছে বুকের ভেতর ছাইচাপা কষ্ট নিয়ে।

আপনি বিবাহিত হলে স্ত্রী/স্বামীর বন্ধু হোন, আর বিয়ে না করে থাকলে এমন কাউকে পছন্দ করুন, যার সাথে আছে আপনার চিন্তাচেতনার মিল। যাকে আপনার সত্যিকারের বন্ধু বানাতে ইচ্ছে হয়।
মনের মিল না হওয়ায় তিন বছরে চারবার বিয়ে ভাঙ্গে সুন্দরী কমলার। আর ওদিকে নাক বোঁচা কলিমের বাপ দাঁত উচু কলিমের মার প্রাণের বন্ধু হয়ে পার করে দেন ষাট বছরের এক ম্যারাথন সংসার জীবন।

(বিবাহ কথন-২) 

শনিবার, ২১ জানুয়ারি, ২০১৭

সবকিছু নিখুঁত হওয়া চাই?

একজন মানুষকে আল্লাহ একসাথে সবকিছু দেন না। কোন একদিকে বেশি থাকলে অন্যদিকে কম থাকে। প্রত্যেক মানুষেরই কোন না কোন অভাব থাকবেই। আল্লাহ তায়ালা আমাদের মানুষ বানিয়েছেন, অতিমানব না। প্রত্যেকেরই খুঁত আছে, কেউই নিখুঁত নয়।

গার্জিয়ানরা ছেলেমেয়ের বিয়ের সময় এই চিরসত্যটা ভুলে যান। এবং ছেলেমেয়েরা নিজেরাও। সবাই একজনের মাঝেই সবকিছু পেতে চায়। পাত্রীর বাবা খোঁজেন এমন পাত্র, যে একইসাথে দেখতে হ্যান্ডসাম, অসম্ভব মেধাবী, সেটলড ক্যারিয়ার (আবার বয়সও কম!!), উচ্চ বেতন, কথাবার্তায় স্মার্ট ও বুদ্ধিমান, আচার ব্যবহার ভালো, চরিত্র ভালো, গভীর জীবনবোধের অধিকারী, চিন্তাশীল, উচ্চ বংশীয়, শিক্ষিত ও ধনী পরিবারের এবং একই অঞ্চলের। কিন্তু বাস্তবে এই সবকিছু আল্লাহ তায়ালা কাউকেই একসাথে দেন না।

ছেলে হয়তো খুবই স্মার্ট, হ্যান্ডসাম। ভালো চাকুরি করে। কিন্তু ঘরের ভেতর আসলে তার ব্যবহার ভালো নয়। সে মানুষকে সম্মান দিতে জানে না। হয়তো সে ভেতরে ভেতরে খুবই অহংকারী !! হয়তো সে বদরাগী!! হয়তো সে চরম অসহিষ্ণু একজন মানুষ!!

আবার ছেলের বাপ মায়েরা বোঝেন না যে ধনী, সুন্দরী, উচ্চশিক্ষিত, বুদ্ধিমতি, সংসারী (আরো যেসব চাওয়া থাকে!) সবকিছু একসাথে পাওয়া যায় না। অতিসুন্দরী মেয়ে অহংকারী হতেই পারে!! আপনি ছেলের বউ হিসেবে ধনীর দুলালী চান, তো সেই বউ আপনাকে শ্বাশুড়ীর সম্মান নাও দিতে পারে!! ক্রুড রিয়ালিটি।

অতিরিক্ত ও অবাস্তব প্রত্যাশার কারণে দেখা যায় পাত্র পাত্রী মিলছেই না। নানা ছুতোনাতায় একের পর এক প্রস্তাব বাতিল করছে ছেলে অথবা মেয়ের অভিভাবকরা।

একেবারে নিখুঁত একটা ছেলে কিংবা মেয়ের সন্ধানে কেটে যায় বছরের পর বছর।

একসময় তারা ক্লান্ত হয়ে যান।

হয়তো অনেকদিন পরে হুঁশ হয়। ততদিনে পদ্মা মেঘনায় গড়িয়ে যায় অনেক জল। হয়তো জোয়ারের শেষে ভাটা নামে আবেগ উচ্ছ্বাসে। মাঝখানে নিদারুণ বঞ্চনায় পেরিয়ে যায় ছেলেমেয়েদের জীবনের কিছু সোনালি সময়।
(বিবাহ কথন-১)

শ্মশান

বিগত গ্রীষ্মের মত চলে গেছে পৌষের দিন,
আর
ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে মাঘেরও রাত্রিগুলো।
হৃদয়ের তার ধরে নাড়াচাড়া করে গেছে পুবালি বাতাস
তবু
সুরের লহরী তারা বাঁজাতে পারেনি।
আসছে ফাল্গুনে কি শোনা যাবে কৃষ্ণচূড়ার গান?
নাকি
কালবৈশাখির অপেক্ষায় অনাবাদী থেকে যাবে
হৃদয় #শ্মশান?

বৃহস্পতিবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০১৭

এলোমেলো প্রশ্ন

কোথায় উড়ে যায় কোথাকার মেঘ
কোন পাহাড়ের টানে
কোথায় গিয়ে পরে হয়ে যায় বৃষ্টি!
কোথায় উড়ে যায় ওপাড়ের গাংচিল
আর এপাড়ের সাদা বক
এক পায়ে দাঁড়িয়ে কী ভাবে সারাটা বিকেল? 


কে কার খবর রাখে এইসব দিনে
যখন অদ্ভুত রুক্ষতায় ভরে আছে মানুষের মন!
কে ভাবে আজকাল হৃদয়ের কথা?
যখন সকলেই ভাবছে কেবল অর্থের প্রয়োজন!
কার কাছে আজো
কিছুটা মূল্য আছে মানবিকতার?
কিছুটা মূল্য আছে হৃদয়বৃত্তি আর
মনুষ্য স্বত্ত্বার?
-----
#এলোমেলো_প্রশ্ন

মঙ্গলবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৭

'চিকিৎসা সেবা আইন, ২০১৬' - খসড়া পর্যালোচনা

স্বাস্থ্যখাতে, বিশেষ করে বেসরকারি খাতে চিকিৎসা ব্যবস্থায় শৃংখলা প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার এ সংক্রান্ত নতুন আইন করতে যাচ্ছে । 'চিকিৎসা সেবা আইন, ২০১৬' নামে আইনটির একটি খসড়া প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় । আইনটিতে বেশ কিছু ভালো দিক আছে । তবে কিছু বিষয়ে এখনো রয়ে গেছে অস্পষ্টতা । কিছু বিষয় অগ্রহণযোগ্য।
প্রথমেই নজর দেয়া যাক ধারা ৯ এর ১ (খ) তে । এতে বলা হয়েছে ‘সরকারি বা কোন সংবিধিবদ্ধ সংস্থায় চাকুরিরত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি’ নির্ধারিত অফিস সময়ের বাইরে ও ছুটির দিনে ‘স্ব স্ব কর্মস্থলের জেলার বাহিরে’ ‘নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের লিখিত পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে’ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা চেম্বারে চিকিৎসা সেবা দিতে পারবেন।
সরকারি চাকরিরত ডাক্তার/নার্স গন যারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও সেবা প্রদান করেন তারা মূলত নিজ কর্মস্থলের আশেপাশেই তা করে থাকেন । নিজ কর্মস্থলের জেলার বাহিরে গিয়ে বেসরকারি সেবা প্রদান আদতে অসম্ভব প্রায় । সেক্ষেত্রে এই আইন বলবত হলে বাস্তবে অনেকেই আর বেসরকারিভাবে চিকিৎসা সেবা কার্যক্রমে যুক্ত থাকতে পারবেন না । আবার অনেকেই সরকারি চাকরি ত্যাগ করতে বাধ্য হবেন ।
এই ধারাটি সংশোধন করা দরকার । অন্যথায় বিশৃংখলা সৃষ্টির আশংকা থেকে যায় ।
ধারা ১৮ তে বিদেশী চিকিৎসা সেবা প্রদানকারীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে – ‘সরকারের পূর্বানুমতি গ্রহণ সাপেক্ষে সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানে বিদেশী চিকিৎসা সেবা প্রদানকারী নিয়োগ করা যাইবে ।
এখানে সরকারের অনুমতির পাশাপাশি বিদেশী সেবাদানকারীদের বাংলাদেশে চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য লাইসেন্সিং পরীক্ষা পাশ ও নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা রাখা দরকার ।
ধারা ৬ (১) অনুযায়ী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন, প্রবেশ, তল্লাশি ও জব্দ করার ক্ষমতা সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ ‘সরকার বা সরকার কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ বা তৎকর্তৃক নিযুক্ত কোন কর্মকর্তা বা কমিটি কোন চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানে যেকোন সময়ে প্রবেশ, পরিদর্শন, রেজিস্টার ও চিকিৎসা সেবা সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি বা নমুনা বা কাগজপত্র পরীক্ষা এবং জব্দ করতে পারবে।
এখানে পরিদর্শক টিমে অন্তত একজন সরকারি ডাক্তারের অন্তর্ভুক্তি আবশ্যক করা উচিৎ ।
ধারা ২০ (১) এ বলা হয়েছে- স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক এই আইনের অধীনে পেশাগত দায়িত্ব পালনে বা চিকিৎসা প্রদানে অবহেলা অপরাধ হিসেবে গন্য হইবে ।
২(২) ধারা অনুযায়ী অবহেলাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে- স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সেবা গ্রহীতার প্রাপ্য সেবা প্রদান না করা যাহা তাহার পক্ষে ‘বাস্তব অবস্থায় ও মানবিকভাবে’ পালন করা সম্ভব ছিল ।
আগেকার খসড়া আইনে পেশাগত অবহেলাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল এভাবেঃ 'ভুল চিকিৎসা' যা দ্বারা 'রোগ মুক্তি ঘটে না' বা 'বিলম্বিত হয়'।
সে তুলনায় এবারের সংজ্ঞায়ন ভালো হয়েছে । তবে আরো স্পেসিফিক করা যায় কিনা তা নিয়ে ভাবা যেতে পারে ।
খসড়া এই আইনের কিছু ভালো দিক হলোঃ
ধারা ২১(১) –এ চিকিৎসা সংক্রান্ত অভিযোগ আদালতে আমলে নেয়ার আগে ন্যুনতম দুইজন চিকিৎসক সহ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন আবশ্যক করা হয়েছে । কমিটিতে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অন্তর্ভুক্তি আবশ্যক করা হয়েছে।
২১(৪) ধারায় বলা হয়েছে - আদালতের নির্দেশনা ব্যতিত কোন স্বাস্থ্যসেবা প্রদনকারী ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা যাইবে না ।
ধারা ২০ (২) এ বলা হয়েছেঃ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তির প্রতি হুমকি প্রদান , ভীতি প্রদর্শন, দায়িত্ব পালনে বাধাদান, আঘাত করা সহ যেকোন ধরণের অনিষ্ট সাধন বা স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কোন সম্পত্তির ক্ষতিসাধন, বিনষ্ট, ধ্বংস বা উক্তরুপ সম্পত্তি নিজ দখলে গ্রহণ অপরাধ বলিয়া গন্য হইবে।
ধারা ২১(৫) অনুযায়ী ২০(২) এ উল্লেখিত অপরাধ হবে আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য।
এগুলো এই আইনের ভালো দিক ।
তবে ধারা ২২(২) অনুযায়ী ২০(২) এ উল্লেখিত অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে অনধিক পাঁচ লক্ষ টাকা অর্থদন্ড বা তিন বছর কারাদন্ড বা উভয় দন্ড।
শাস্তির পরিমাণ কম হয়েছে । শাস্তির মাত্রাকে আরো সংজ্ঞায়িত করা দরকার । ক্ষতির পরিমাণ বা আঘাতের প্রকৃতি অনুযায়ী অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ হওয়া উচিৎ। ২০ লক্ষ টাকা ক্ষতিসাধন করলে অনধিক পাঁচ লক্ষ টাকা অর্থদন্ড কি গ্রহণযোগ্য? অথবা শারীরিকভাবে গুরুতর আঘাত করা হলে তিন বছর কারাদন্ড কি যথেষ্ট হবে? বিভিন্ন দেশে এইরুপ অপরাধের শাস্তি আরো বেশি ।
এখানে ‘অনধিক’ এর স্থলে ন্যুনতম শব্দ প্রয়োগ করা উচিৎ হবে ।

বুধবার, ৪ জানুয়ারি, ২০১৭

তরুণ লেখকদের কী করা উচিত?

তরুণ লেখকদের একটা বড় অংশ তাদের গল্প উপন্যাস লেখায় হুমায়ুন আহমেদের স্টাইল ফলো করেন। আপনি নতুন কোন লেখকের একটা গল্প পড়তে শুরু করলেন, কিছুটা পড়ার পরেই দেখবেন- কেমন যেন হুমায়ুন আহমেদের লেখার গন্ধ পাচ্ছেন।

লেখালেখি শুরু করার জন্য এটা ভালো। হুমায়ুন স্টাইলে লেখার সুবিধা হলো- খুব সহজেই ছোট ঘটনাকে টেনে বড় করা যায় আর তা পাঠকের কাছে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের লেখার মত প্যাচালো বা জটিল মনে হয় না। তবে দীর্ঘমেয়াদে হুমায়ুনীয় স্টাইল ফলো করা একজন উদীয়মান লেখকের জন্য আত্নঘাতী হবে। পাঠক আপনার লেখা পড়তে গিয়ে হুমায়ুন আহমেদকে খুঁজে পাবে, আপনাকে নয়।

হুমায়ুন আহমেদ ঠিকই নিজের মত করে তার নিজের সময়কে ধারণ করে গেছেন। আপনার উচিৎ, আপনার নিজস্ব স্টাইলে আপনার সময়কে ধারণ করা।

মঙ্গলবার, ৩ জানুয়ারি, ২০১৭

দূর্নীতি কারা করে?

অনেকের ধারণা, দুর্নীতি শুধু বড় অফিসাররাই করে। পুলিশ অথবা যারা বিভিন্ন অফিসে কাজ করে, দুর্নীতি বোধহয় শুধু তারাই করে। অন্য কেউ না।

কেউ কি মনে করেন যে একজন রিক্সাওয়ালাও দুর্নীতি করে? কিংবা, একজন কামলাও কি দুর্নীতি করে?
উত্তর হচ্ছে- হ্যা। তারাও দুর্নীতি করে। পার্থক্য শুধু টাকার অংকে। যে যতটুকু পারে, সে ততটুকু করে।
যেদিন রাস্তায় একটু জ্যাম থাকে, যেদিন গাড়ি সংকট থাকে, বা হরতাল থাকে সেদিন রিক্সাভাড়া দ্বিগুন হয়ে যায়। সিএনজি ভাড়া দ্বিগুন তিনগুন হয়ে যায়।

একজন কামলা দুর্নীতি করে তার কাজে ফাঁকি দেয়ার মাধ্যমে। যে কাজ সে একদিনে করতে পারে, সেই কাজকেই সে করবে তিনদিন লাগিয়ে।
ব্যবসায়ীরা দুর্নীতি করে মজুদদারীর মাধ্যমে। অতিরিক্ত মুনাফাখোরীর মাধ্যমে। রমজান মাসে আমরা সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাই।

অফিসের লোকেরা দুর্নীতি করে কখনো ফাইল আটকিয়ে, কখনো গ্রাহকের কাছে সরাসরি টাকা আদায় করে, কাজে ফাঁকি দিয়ে, অপ্রয়োজনীয় ওভারটাইম করে।

আসলে যার মনে অসততা বাসা বেঁধে আছে, সে যেই হোক, যে পেশাতেই থাকুক, দুর্নীতি করবেই। দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য বদলাতে হবে ভেতরের মানুষটাকে।

সোমবার, ২ জানুয়ারি, ২০১৭

মোটরবাইকের নেশা

ক্ষুদ্র ডাক্তারি জীবনে রোড এক্সিডেন্টের যতজন রোগী দেখেছি, বেশিরভাগই মোটরসাইকেল এক্সিডেন্ট। কারণ, মোটর সাইকেল জিনিসটাই আসলে একটা নেশা।

যেদিন থেকে মোটর সাইকেলে বসে কোনমতে মাটি ছুঁতে পারি, সেদিন থেকে বাইক চালানো শুরু। এরপর এক যুগ ধরে রংপুরের সমতলভূমি আর চট্টগ্রামের পাহাড়ী রাস্তায় হাজার হাজার মাইল বাইকের ওপর বসে পাড়ি দিয়েছি। ফিলিংসটা হলো- বাইকে উঠলেই নেশা ধরে যায়। স্পিডোমিটারের কাটা ষাটের নিচে থাকা মানে যেন একজন বাইকারের চরম অপমান। আর কেউ যদি ওভারটেক করে, তাহলে যেন মাথায় আগুন ধরে যায়। শুরু হয়ে যায় অঘোষিত রেস। 

ভয়ংকর ব্যাপারটা হচ্ছে- কখনো কখনো সেই রেসের সমাপ্তি ঘটে জীবনের বিনিময়ে।
ডিয়ার বাইকার্স, প্লিজ কন্ট্রোল ইওরসেলফ, কন্ট্রোল স্পিড। বিকজ, একটি দুর্ঘটনা, সারা জীবনের কান্না।

রবিবার, ১ জানুয়ারি, ২০১৭

সময় এত দ্রুত কেনে??

অনেককেই বলতে শুনি "ভাই, কী করি বলেন তো! সময় যে কাটেনা! "
আমি অবাক হয়ে যাই। খুব অদ্ভুত লাগে।

পৃথিবীতে কত কিছু করার আছে, কত কিছু জানার আছে, কত কিছু দেখার আছে!! হাজার বছরেও তো এক জীবনের স্বাদ মিটবে না। অথচ একজন জ্বলজ্যান্ত মানুষ কোন কাজ খুঁজে পাচ্ছে না, তার সময় কাটছে না, এ কীকরে হয়?
অথচ প্রতিটি দিনের শেষে আফসোস আমার নিত্যসঙ্গী। আহা! কিছুই তো করা হলো না। কিছুই তো দেখা হলো না। কিছুই তো শেখা হলো না।


তারাশঙ্কর বলেছিলেন- ভালোবেসে মিটিলো না সাধ, জীবন এত ছোট কেনে?
আমাকে বলতে হয়- দিনের শেষেও ফুরালো না কাজ,
সময় এত দ্রুত কেনে??

বৃহস্পতিবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

অপরাধী

আমাকে অপরাধী করে দেয় তোমাদের ভালোবাসা।
সহসাই মহীরুহ হয়ে ধরা দেয় চোখে-
যত অক্ষমতা,
যত দারিদ্র‍্য আমার।

আমাকে অপরাধী করে দেয় তোমাদের ভালোবাসা।
অপাত্রে ঢেলে ঢেলে
কী নিদারুণ অপচয় হচ্ছে তোমাদের হৃদয় আবেগ !!
অথচ, কে না জানে-
আমি এর মোটেও যোগ্য নই,
কখনোই ছিলামও না।

#অপরাধী

রবিবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

জন্মদিনের আত্মজিজ্ঞাসা

গতকাল ছিল আমার আটাশতম জন্মদিন। অর্থাৎ, সাতাশ বছরের জীবন কাটিয়ে দিয়েছি পৃথিবীর আলো বাতাসে।
সাতাশ বছর মোটেও কম সময় নয়। যদি এভাবে ভাবি- আজ থেকে সাতাশ বছর আগে যারা একইদিনে জন্মেছিলো, তারা সবাই কি আজও বেঁচে আছে? নেই। এমনকি আরো পরে যাদের জন্ম, তারাও অনেকেই বেঁচে নেই।

আল্লাহর ইচ্ছায় আমি বেঁচে আছি। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে ফিরে এসে আজও বেঁচে আছি। তার মানে, আমি অনেক মানুষের তুলনায় অলরেডি এক দীর্ঘ জীবন পেয়েছি।

বয়স হলো সাতাশ। সাত বছর বাদ দিতে হয়, কারণ সাত বছর বয়সের আগে আসলেই কিছু বোঝার মত বয়স ছিলনা। তবু বিশ বছরেই এত এত ভিন্ন মাত্রার অভিজ্ঞতা হয়েছে যে, মাঝে মাঝে নিজেই আশ্চর্য হয়ে যাই। শরীরের বয়স যাই হোক, আপেক্ষিকতার সূত্র অনুযায়ী মনের বয়স যে কত হয়েছে ঠাওর করতে পারিনা।
আমি জন্মদিন উদযাপন করিনা। ছুটির দিন থাকে, ঘুমিয়েই কাটাই। প্রশ্ন হলো- জন্মদিন কি আসলে আনন্দের সাথে উদযাপন করার বিষয়? নাকি এই ভেবে কষ্ট পাওয়া উচিৎ যে- নির্দিষ্ট হায়াতের হিসাব থেকে আরো একটি বছর কমে গেল! মহাকালের মহাশুন্যতায় অন্তর্ধানের দিকে আরো অনেকটা এগিয়ে গেলাম!!

জন্মদিনে অনেকেই আমাকে শুভেচ্ছা জানান। আমিও জানাই। যেকোন শিশুর জন্মই আনন্দের উপলক্ষ্য। হয়তো আমারটাও তাই। কিন্তু সেই শিশু যখন বড় হয়- তখন সে আর সবার জন্য আনন্দের কারণ থাকে না।

জন্মদিনের সবচেয়ে বড় আত্মজিজ্ঞাসা হলোঃ যখন শিশু ছিলাম, তখন হয়তো স্বাভাবিকভাবেই মানুষের জন্য আনন্দের কারণ ছিলাম। এখন এই পরিণত বয়সেও আমি কি সত্যিই মানুষের জন্য আনন্দের উৎস হতে পেরেছি?

মঙ্গলবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১৬

সাজেকঃ মেঘের ওপর বাড়ি

গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙ্গা মাটির পথ... 
 
চট্টগ্রামে যখন পা রাখলাম তখনো সূয্যিমামার মুখ দেখা যায় নি। পৌষের প্রথম সকাল। বাস থেকে নেমেই শীতের আমেজ টের পাওয়া গেলো। চাঁদর জড়াতে হলো গায়ে। বাসায় কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়েই ভ্রমণপিপাসুদের বিশেষ গ্রুপ "ভ্রমরের" কয়েকজন তরতাজা যুবক রওয়ানা হলাম "অক্সিজেনে"র উদ্দেশ্যে। ঘড়ির কাটায় সকাল আটটা পেরিয়ে গেছে। মানুষের পদচারণায় চট্টগ্রামের অক্সিজেন মোড়ের বাতাসে তখন অক্সিজেনের তুলনায় কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। 
আমাদের বাসে উঠতে হলো ঠিক সাড়ে আটটায়। গন্তব্য... রাঙ্গামাটি.... তবে আপাতত রাঙ্গামাটি নয়। যাচ্ছি খাগড়াছড়ির পথ ধরে সাজেকের সবুজ উপত্যকায়। সাজেক পড়েছে রাঙ্গামাটি জেলায়, কিন্তু পুরোটা পথ পড়বে খাগড়াছড়ির মাটিতে।

চান্দি গরম!!
 
ভ্রমর গ্রুপের দু'জন সদস্য আগের দিন বিকেলেই শান্তি পরিবহনের টিকেট কাটতে এসেছিলেন। তাদেরকে বলা হয়েছিলো সামনের দিকে কোন সিট খালি নেই। অতএব বাধ্য হয়ে তারা পেছনের দিকের কয়েকটি সিটের টিকেট কিনে নিয়ে যান। কিন্তু সকালে এসে দেখা গেলো ভিন্ন চিত্র!! হেল্পার চিৎকার করে ডাকছে... আসেন খাগড়াছড়ি... সিট খালি... এবং দেখা গেলো এইমাত্র এসে অনেকেই বাসের সামনের সিট পেয়ে যাচ্ছেন!! শান্তি পরিবহনের চট্টগ্রাম কাউন্টারের এই প্রতারণায় আমরা যারপরনাই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলাম। এই শীতের সকালে আমাদের চান্দি গরম গেল। ব্যাটাদের একহাত দেখে নেয়া দরকার। কাউন্টারে যে দুজন বসা ছিল তাদের সাথে বেশ উচ্চবাচ্য হলো। ওদেরকে বেশ করে শাসিয়ে দিলাম। বাসে উঠলাম ঠিকই, কিন্তু যাত্রার শুরুতেই শান্তি পরিবহনের এই প্রতারণামূলক আচরণ যে অশান্তির সৃষ্টি করলো তার শেষ কোথায় কে জানে!!

জানালায় ভোরের আলো 
 
চারজন অলস বাস মিস করেছে। অতএব চারটা সিট খালি। অলসরা পরের বাসে পারলে আসবে। না পারলে নাই। ব্যাকপ্যাক গুলো খালি সিটে রেখে আয়েশ করে বসলাম আমরা। আর বাস ছুটলো গন্তব্যের টানে। হাটহাজারী, নাজিরহাট, মানিকছড়ি... পথের দুপাশে সবুজ গাছের সারি। কখনো কাটা ধানের ক্ষেত। শহর ছেড়ে আমরা গ্রামের আলোহাওয়ার ভেতর এগিয়ে চলেছি। ততক্ষণে সূর্য তার আলো ছড়াতে শুরু করেছে। জানালার ফাঁক দিয়ে আলো এসে পড়ছে গায়ে। যেন আলতো করে মুখে চোখে বুলিয়ে দিচ্ছে উষ্ণ পরশ।

এই পথ যদি না শেষ হয়? 
 
মানিকছড়ি পার হলে শুরু হলো পাহাড়ি রাস্তা। দু'পাশে পাহাড়, টিলা। টিলার ঢালে সবুজের সমারোহ। মাঝখান দিয়ে রাস্তা। এরকম পথে চলতে আমার এত ভালো লাগে, এজন্যই আমি শত শত মাইল পাড়ি দিয়ে বারবার ফিরে আসি পাহাড়ের কোলে। অদ্ভুত সুন্দর আঁকাবাকা আর উঁচুনিচু এইসব নির্জন রাস্তায় এলেই গলা ছেড়ে গাইতে ইচ্ছে হয়- এই পথ যদি না শেষ হয়!! তবে কেমন হত, তুমি বলতো!! (তবে শেষ পর্যন্ত গলা ছাড়লাম না। নিজেকে কন্ট্রোল করেছি আরকি! বিকজ, আমার গানের গলা এতই মধুর যে, সুরের মূর্ছনায় রাস্তার সবকিছু থেমে যেতে পারে, ইউ নো!!)

টেনশন টেনশন!!
 
খাগড়াছড়ি নেমে নামায আর খাওয়া সেরে আমরা উঠলাম পাহাড়ী পথের জন্য বিশেষ জীপ- চান্দের গাড়িতে। শুরু হলো চান্দের গাড়ির দুরন্ত গতির সাথে আমাদের রোমাঞ্চকর যাত্রা। আমরা জানতাম যে দীঘিনালা থেকে সেনাবাহিনীর এসকর্ট টীম সাজেক যায় বিকেল সাড়ে তিনটায়। কিন্তু খাগড়াছড়িতে নেমে জানা গেল সময়টা এখন এগিয়ে আনা হয়েছে। সেনাবাহিনীর টীম যাবে পৌনে তিনটায়। অর্থাৎ এর মধ্যে দীঘিনালা পৌঁছতে না পারলে আজ আমাদের সাজেক যাওয়া হবে না। বাস মিস করা সেই চারজন অলস পরের বাসে রওনা দিয়েছিল। তারা এসে পৌঁছতে পৌঁছতে আরো কিছুটা দেরি হয়ে গেল। সবাই কিছুটা টেনশন বোধ করতে লাগলাম। তবে কি তীরে এসে ডুবে যাবে তরী?
অবশেষে ঘুমকাতুরে অলসরা এসে পৌঁছলো। আর দেরি নয়। উল্কার বেগে ছুটলো চান্দের গাড়ি। গন্তব্য সাজেক, যেখানে মেঘের ওপর বাড়ি। 

পথে পথে চেকপোস্ট! 
 
আমাদের গাড়ি যখন আর্মি ক্যাম্পের কাছে পৌঁছলো, ততক্ষণে অন্যসব গাড়ি নিয়ে সেনাবাহিনীর টিম রেডি হয়ে গেছে। আর পাঁচ মিনিট দেরি করলেই মিস হয়ে যেত আজকের এসকর্ট। পর্যটকদের নিয়ে ৩৮ টি গাড়ির দীর্ঘ বহর এগিয়ে চললো সাজেকের উদ্দেশ্যে। দীর্ঘ পাহাড়ী পথ। আর পথে পথে চেকপোস্ট। কখনো সেনাবাহিনীর, কখনো বিজিবির, কখনো পুলিশের। মাঝে মাঝে কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছিলো, এ কি নিজের দেশে আছি? এখনো এতটা অনিরাপদ রয়ে গেছে পার্বত্য অঞ্চল! 
কিছুদূর এগিয়েই উঠে পড়লাম গাড়ির ছাদে। হাওয়ার বেগে ছুটছে গাড়ি। আর হাওয়ায় উড়ছে আমাদের মন।



উড়ু উড়ু মন নিয়ে চান্দের গাড়ির ছাদে

দীঘিনালা পেরিয়ে বাঘাইহাট। পথে কাচালং নদী, কাচালং বাজার, মাসালং বাজার। আঁকাবাকা আর উঁচুনিচু রাস্তা, তবে বান্দরবানের মত অতটা ভয়ংকর নয়। বলতে গেলে, সত্যিকারের এডভেঞ্চারারদের কিছুটা খারাপও লাগতে পারে। বিশেষ করে যারা আগেই বান্দরবানের গহীনে ঘুরে এসেছেন তাদের কাছে সাজেকের পথ হয়তো নতুন কোন অনুভূতি জাগাবে না। নতুন যা, রাস্তার পাশে প্রায় প্রতিটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে উপজাতি শিশুরা আমাদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়াচ্ছিলো। ওরা কী বলছিলো শোনা যায় নি। তবে আমরা নিজেরাই ভেবে নিলামঃ নিশ্চয় ওরা বলছে- "ডিয়ার ট্রাভেলার্স, ওয়েলকাম টু সাজেক"!!!



সতর্কবানী


পাহাড়চূড়ায় পূর্ণিমা স্নান
 
সাজেকে যখন পৌঁছলাম তখন সূর্য ডুবি ডুবি করছে। রুইলুই পাড়ায় আমাদের জন্য বুক করা কটেজ "মেঘালয়" তে ব্যাগপত্তর রেখে বেরিয়ে পড়লাম দূর পাহাড়ের দেশে অস্তগামী সূর্যকে বিদায় জানাতে।



সাজেকের প্রবেশমুখ

আরো উত্তরে হেঁটে গেলে পাওয়া গেল মসজিদ। সেখানেই মাগরিব এবং এশার নামাজ পড়লাম। পুবের আকাশে তখন অন্য দৃশ্য। ভোরের সূর্যের মত লাল হয়ে উঠে আসছে পূর্ণিমার চাঁদ। পাহাড়ের চূড়ায় মেঘ, তার ওপরে চাঁদ।

রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে রাত ন'টা পর্যন্ত চললো আমাদের খুনসুটি আড্ডা। ধীরে ধীরে আরো উজ্জ্বল, আরো সুন্দর, আরো মোহিনী রুপ ধারণ করলো চাঁদের আলো। হাজার ফুট উপরে, পৌষের প্রথম রাতে হিম হিম বাতাসে, এ যেন অদ্ভুত পূর্ণিমা স্নান। এ যেন মুগ্ধতার নতুন মাত্রা।

মেঘের ওপর বাড়ি
 
রাতে খেয়েদেয়ে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম। সারাদিনের ভ্রমণের ক্লান্তি আর পাহাড়ের নীরব নিস্তব্ধতায় জম্পেশ ঘুম হলো। ভোরে উঠেই দৌড়। মসজিদে ফযরের নামায পড়ে আমরা উঠে এলাম সাজেকের হেলিপ্যাডে। দু'পাশে পাহাড়ী খাদ মেঘে মেঘে ভরে আছে। প্রথমবার মেঘের ওপরে উঠেছিলাম বিমানে। এবার মেঘের ওপর উঠেছি পায়ে হেঁটে!! ভাবতেই অন্যরকম অনুভূতি হলো।




হেলিপ্যাডের নিচে জমাট বেঁধে আছে সাদা মেঘের দল

সূর্যের তাপ আরেকটু বাড়লে আমরা গাড়ি নিয়ে রওনা হলাম আরো উত্তরে কংলাক পাড়ার উদ্দেশ্যে। আরোহন করলাম কংলাক পাহাড়ে। অনেকেই হাঁপিয়ে উঠলো, কিন্তু কেওক্রাডং বিজয়ী পর্বতারোহী হিসেবে আমার কাছে এ যেন ছিল নিতান্তই ডালভাত!! বিনাক্লেশে উঠে পড়লাম কংলাক চূড়ায়। সেখানে লুসাই উপজাতির দুয়েকটা বাড়ি আছে। বাড়ির আঙিনায় তখনো জমাট মেঘ!! এ যেন সত্যিকারের- মেঘের ওপর বাড়ি।



মেঘের ওপর বাড়ি


ফেলে আসি নীলাকাশ 
 
সকাল দশটায় সাজেক থেকে ফিরতি যাত্রা। আবার সেনাবাহিনীর একটি টিম আমাদের সাথে নিয়ে যাবে দীঘিনালা পর্যন্ত। মূলত আমরাই যাবো ওদের সাথে। সেনাবাহিনীর এসকর্ট ছাড়া যাওয়া আসা করা যায় না। এবার আর ছাদে নয়। বসেছি গাড়ির পেছনের দিকে মুখ করে। সূর্যের তাপ বাড়ছে। আকাশে কোন মেঘ নেই। যতদূর চোখ যায় পাহাড় আর নীল আকাশ। এমন দিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশ বহুদিন দেখা হয়নি।
ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে পাহাড়ী পথ, আমরা এগিয়ে যাচ্ছি শহুরে জীবনে।



পেছনে ফেলে আসি নীল আকাশ

বিকেলে ঘুরলাম আলুটিলার রহস্যময় গুহায়। দিনের শেষ মুহূর্তগুলো কাটিয়ে দিলাম রিসাং ঝর্ণার গান শুনে।



রিসাং ঝর্ণার গান

সূর্য ডুবে গেলে সাঙ্গ হলো এবারের খেলা। অন্ধকারে ডুবে গেল পাহাড়, মেঘ, ঝর্ণা আর দিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশ।

রবিবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

অনারারীর অমানবিকতা

১।
হাসপাতালের ক্যান্টিনে ঢুকতেই আমার চোখ গেল কর্নারের টেবিলে। একা বসে আছেন ডাঃ বকুল। খুবই শান্ত শিষ্ট নিরীহ মানুষ। তবে আজ মনে হচ্ছে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি গম্ভীর। বেশ বিমর্ষ চেহারা।
গিয়ে বসলাম পাশে।

-কী ব্যাপার বকুল ভাই, মন খারাপ?
-জ্বি ভাই। আজকে একজনের সাথে একটু রুড আচরণ করে ফেলেছি। এখন মনটা খারাপ লাগছে। লোকটা ডাক্তারদের ব্যাপারে নিশ্চয় একটা খারাপ ধারণা নিয়ে গেলো। মানুষ কষ্ট নিয়েই হাসপাতালে আসে, কিন্ত ভাই সবসময় মেজাজ ঠিক রাখা যায় না। রাখতে পারি না। আর যারা এক লাইন বেশি বোঝে তাদের আমি কেন যেন সহ্য করতে পারি না।
ডাঃ বকুল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অনারারী মেডিকেল অফিসার। সোজা বাংলায় ইনি একজন ডাক্তার যিনি তার শ্রমের বিনিময়ে কোন পারিশ্রমিক পান না। ডাক্তার হয়েছেন বছর খানেক আগেই। একটা ক্লিনিকে চাকরি করেন। একদিন তাঁর মনে হলো, শুধু ক্লিনিকের চাকরি করে দিনকে দিন মেডিকেল নলেজের ধার কমে আসছে। ট্রেনিং করা দরকার। আবারো পড়ালেখায় নামা দরকার। তাছাড়া ভবিষ্যতের বাজারে টিকে থাকার জন্য একটা পোস্ট গ্রাজুয়েশান ডিগ্রীও করা দরকার।

অতঃপর সিনিয়র ভাইদের পরামর্শে ডাঃ বকুল ঢুকে পড়লেন অনারারী ট্রেনিং এ। হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের অদ্ভুত হেলথ সিস্টেমের এক কিম্ভুত সদস্য, একজন বিনে পয়সার কামলা।

গতকাল রাতে তাকে ক্লিনিকে ডিউটি করতে হয়েছে। রাতটা বেশ 'খারাপ'ই গেছে বলতে গেলে। ক্রিটিকাল পেশেন্ট ছিল, ডেথ ডিক্লেয়ার করতে হয়েছে দু'জনের। ঘুমানোর কোন সুযোগই হয়নি। সকালে উঠে আবার ট্রেনিং-এর নামে বিনেপয়সার কামলাগিরি করতে এসেছেন।

সকালে এমনিতেই কাজের চাপ বেশি থাকে। নতুন ভর্তি রোগীর হিস্ট্রি রিভিউ, ফলো আপ, ইনভেস্টিগেশান প্ল্যান, ট্রিটমেন্ট রিভিউ, পুরনো রোগীদের ফলো আপ, ট্রিটমেন্ট এডজাস্ট করা, ছুটি দেয়া, রাউন্ড, ক্লাস, সেমিনার ইত্যাকার নানা কাজ। দম ফেলা মুশকিল।

এরই মধ্যে যখন এক পেশেন্টের এটেন্ড্যান্ট বিরুপ মন্তব্য করে বসলো তখন আর মেজাজ ঠিক রাখতে পারেন নি। কিছু কড়া কথা শুনিয়ে দিয়েছেন । তারপর থেকে বেচারার নিজেরই মন খারাপ।
আমারও খারাপ লাগলো। ডাঃ বকুল এবং সেই এটেন্ড্যান্ট উভয়ের জন্যই খারাপ লাগলো। কিন্তু আমি কোনভাবেই ডাঃ বকুলকে দোষ দিতে পারলাম না। আমি জানি, ডাঃ বকুল অকারণে মেজাজ খারাপ করার লোক নন। আসলে ডাঃ বকুল এমন এক অমানবিক সিস্টেমের শিকার, যে সিস্টেম তার মত নিরীহ মানুষকেও আজ রুঢ় করেছে। যে সিস্টেম তার যৌবনের সোনালি সময়কে সিস্টেমের মারপ্যাচে ফেলে অপব্যবহার করে যাচ্ছে। এর কিছুটা বিরুপ প্রভাব অন্যদের ওপরও পড়বেই, এখন আর এতে খুব একটা অবাক হই না।

আমি জানি, ডাঃ বকুলকে যদি আলাদাভাবে ক্লিনিক ডিউটি করতে না হত, তাকে যদি পেটের চিন্তায় মগ্ন থাকতে না হত, তার কর্মঘন্টা যদি নির্দিষ্ট থাকতো এবং ওয়েল পেইড হত, তাহলে তিনি কখনোই মেজাজের খেই হারাতেন না।
You haven't given him a sound sleep, how can he give you a good smile??


২।
এই অংশটুকু বিশেষত নন-মেডিকেল পাঠকদের উদ্দেশ্যে। আপনার মনে যে প্রশ্নটি চলে এসেছে তাহলো- ট্রেনিং তো ডাক্তাররা করছেন তার নিজের জন্য, নিজের ডিগ্রীর জন্য। এর জন্য সরকার ভাতা দেবে কেন? এত কথা কেন?

এই প্রশ্ন যদি সত্যিই আপনার মনে এসে থাকে তাহলে সেটা বড়ই আফসোসের কথা। পর্যাপ্ত ডাক্তার নিয়োগ দেয়া এবং ডাক্তারদের ভাতা দিয়ে ভালো করে ট্রেনিং করানোর দাবি আপনাদের পক্ষ থেকেই তোলা উচিত। কারণ, ডাক্তার দক্ষ না হলে এর কুফলটা আপনাকেই ভোগ করতে হবে। সরকারি হাসপাতাল বলেন আর বেসরকারি বলেন, কোথাও পর্যাপ্ত ডাক্তার নিয়োগ দেয়া হয়না। ফলে অল্প ক'জন ডাক্তারকে অতিরিক্ত চাপ নিতে হয়। ডাক্তার নাহয় শায়েস্তা হলো, কিন্তু আপনি কি পূর্ণ মনোযোগ পান? না পেলে আপনি কী করেন? ডাক্তারকে গালিগালাজ করেন? নাকি ডাক্তারের নামে অভিযোগ করেন? কখনো কি কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ করেছেন- এতজন রোগীর জন্য একজন ডাক্তার কেন? কখনো কি দাবি তুলেছেন- এত টাকা বিল দিলাম, ডাক্তারের বেতন এত কম কেন? নাহ। তা করেন নি।
ডাক্তারদের ভালো ট্রেনিং এর ব্যবস্থা আপনাদের নিজেদের স্বার্থেই করতে হবে। বিকজ, দে ডিলস উইথ ইওর লাইফ এন্ড ডেথ। তাদের আপডেটেড নলেজ এন্ড স্কিল না থাকলে দিনশেষে আপনিই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ক্ষতিগ্রস্ত হবে আপনার বাবা মা, আপনার সন্তান। হয়তো ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে ভাংচুর করবেন, হয়তো পত্রিকায় নিউজ হবেন। কিন্তু যদি কোন ক্ষতি হয়েই যায়, তা কি ফিরে পাবেন?

ডাক্তারদের পেটের চিন্তা থেকে মুক্ত রাখতে হবে। বিকজ, দে হ্যাভ টু লিভ দা মোস্ট স্ট্রেসফুল লাইফ। পেট এবং মাথা দুই জায়গায় চাপ নিয়ে ভালো সেবা দেয়া যায় না। আর এ কারণেই উন্নত বিশ্বে ডক্টরস আর অলওয়েজ হাইলি পেইড। আমার দেশে একটা সরকারী হাসপাতালের একটা ওয়ার্ড চালানোর জন্য যতজন ডাক্তার দরকার, আমার সরকার নিয়োগ দিয়েছে তার এক চতুর্থ বা পঞ্চমাংশ। আর সেই জায়গা পুরণের জন্যই জিইয়ে রাখা হচ্ছে এই অমানবিক সিস্টেম। ডিগ্রীর মুলো ঝুলিয়ে বিনেপয়সায় খাটিয়ে শোষণ করা হচ্ছে তরুণ ডাক্তারদের সোনালি সময়। একটা দিনও যদি এই ডাক্তাররা কাজ না করেন, তাহলেই হাসপাতাল অচল হয়ে পড়বে।

আপনি এই সিস্টেমকে সমর্থন করেন? যদি করেন, তাহলে আপনি ভালো ব্যবহার পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন না। আপনি যদি এই সিস্টেম পরিবর্তনের দাবি না তোলেন, তাহলে আপনি আন্তরিক চিকিৎসা পাবার আশা করতে পারেন না।

আপনি ঘোড়াকে ক্রমাগত চাবুক মারবেন, সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপাবেন, আর বিনিময়ে সে আপনাকে মুচকি হাসি দিবে, তা হয় না।

সোমবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০১৬

বাঙালির জীবনে ভাত খাওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আর নাই

১.
- চাচা, বুকে ব্যথাটা কখন থেকে?
- চাচীঃ রাইতের বেলা খাইতে বসছে, গরুর গোশ দিয়া ভাত খাইছে। হের পরে হের বুকত চিলিক মাইরা উঠছে।\

২.
- শ্বাসকষ্টটা কখন শুরু হইছিলো ভাই?
- ভাবীঃ হ্যারে বাজারে পাঠাইছিলাম। বাজার থাইকা আসি দুপুরে খাইতে বসছে। বুঝছেন ভাই! এর ঘন্টা দুই ঘন্টা পরে খানিক শ্বাসকষ্ট শুরু হইছে।


৩.
- চাচাজান, রোগী কখন থেকে অজ্ঞান?
- রুগী পুরাপুরি ভালা আছিলো ছার। কথা কইছে। রাইতে ভাত খাইছে। খাইয়া ঘুমাইছে। তারপরে হঠাৎ দেখি হাত পায়ে খিচ মারতাছে। অজ্ঞান হই গেছে।

 ঘটনা যাহাই হউক, বাঙালির সকল ইতিহাস শুরু হয় 'ভাত খাওয়া'র পর থেকে। যিশুর জন্মের বছর হতে যেমন খ্রিষ্টীয় সাল গণনা শুরু করা হয়, তেমনি রোগীর যেকোন সিম্পটম (রোগ-লক্ষণ) এর বয়স গণনা শুরু হয় 'ভাত খাওয়া'র মুহূর্ত থেকে। বাঙালির জীবনে ভাত খাওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আর নাই!!!!!!

বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

মিথোজীবিতা

১.
জন্মেছিলাম পরিপূর্ণ এক পরজীবি হয়ে।
তারপর শুরু হলো শৈবালের মত
স্বভোজী হবার নিরন্তর লড়াই।
জীবনচক্রে এখন লেগেছে ভাটির হাওয়া
এতোদিনে বুঝে গেছি
স্বভোজী হওয়াই সুখ নয়। স্বনির্ভরতা মানেই নয়
সাফল্যের চূড়া।
২.
এখন আমি দীক্ষা নিচ্ছি প্রতিদিন
মিথোজীবিতার পাঠ।

সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

কয়েদী কথামালা

না বলতে বলতে-
সব কথা জমে যাচ্ছে বুকের ভেতর।
বেরোবার পথ নেই বলে ওখানেই ওরা
গাইছে, খেলছে, হাসছে, কাঁদছে... আর
বংশবৃদ্ধি করছে ক্রমাগত মিয়োসিস প্রক্রিয়ায়!

না বলতে বলতে-
বুকের ভেতর জমে যাচ্ছে কথার পাহাড়।
দিনকে দিন তেতে উঠছে কয়েদী কথামালা,
শীঘ্রই মুক্তি না দিলে
একদিন তারা সব বিদ্রোহী হবে!
একদিন তারা হবে
জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি ! কিশোর তরুণেরা সব 
হয়ে যাবে বোমাবাজ সন্ত্রাসী ।


পাঁজরের সব হাড় চূর্ণ করে
একদিন তারা হবে মুক্ত স্বাধীন;
একদিন তারা সব
পাখা মেলে উড়ে যাবে - শুন্য হাওয়ায়।

রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬

রিফিল

এই শীতে কোনো এক উদাসী বিকেলে
আমি আবার হেঁটে যাবো
সরষে ক্ষেতের আল ধরে দিগন্তের দিকে।
দখিন হাওয়ায় উড়িয়ে দেবো পুরনো রুমাল
যত দুঃখ যত অবসাদ
ছড়িয়ে দেবো আমি সরিষার ক্ষেতে,
হলুদ মাঠের ভেতর।
তারপর-
পড়ন্ত সূর্যের স্বর্ণাভ আভা
আর সরষে ফুলের হলুদাভ রঙ গায়ে মেখে
আবার রাঙ্গিয়ে নেবো-
জীর্ণ হৃদয়।

বৃহস্পতিবার, ১ ডিসেম্বর, ২০১৬

দেয়াল

আজীবন ডুবসাঁতার কাটবো বলে
জন্মলগ্ন হতে হাত পা ছুঁড়ছি অবিরাম।
শিখছি সাঁতারের যতসব অদ্ভুত কৌশল,
আর
ক্রমাগত ভেদ করছি জলের সীমানা।
জলপথের এই দীর্ঘ যাত্রায়
আজো কোন ডুবোচরে আটকেনি হৃদয় আমার।
গহীন জলের হাজারো মরিচীকা
আর জলজ লতার হাতছানি পায়ে ঠেলে
তীরে এসে মুখোমুখি হয়েছি এক
দুর্লঙ্ঘ্য দেয়ালের।
কী করে পেরোব বলো বাধার পাহাড়?
আমি দক্ষ এক সাঁতারু বটে -
পর্বতারোহী তো নই!!