এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...

এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে

বুধবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০১৭

তথাকথিত আর্লি ম্যারেজ চাই না...

ইদানিং অনেককেই আর্লি ম্যারেজ ক্যাম্পেইন করতে দেখা যায়। আমি এই তথাকথিত আর্লি ম্যারেজের পক্ষে নই। আর্লি ম্যারেজ সত্যিকার কোন সমাধান নয়। অল্প বয়সে বিয়ে দিলেই কারো সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যায় না।
জৈবিক চাহিদা পূরণই বিয়ের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। বিয়ে হলো পরিবার গঠনের উদ্যোগ। বিয়ে হলো সুস্থ সুন্দর সমাজ গঠনের উদ্যোগ। বিয়ে হলো সুনাগরিক তৈরির উদ্যোগ।

ছেলে মেয়ে সবারই বিয়ের জন্য অন্তত এতটা বয়স হওয়া উচিৎ যখন সে তার সঙ্গীর প্রতি কী দায়িত্ব, সমাজের প্রতি কী দায়িত্ব তা বুঝতে পারে। যখন তারা একটা শিশুকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মত মানসিক পরিপক্কতা ও যোগ্যতা অর্জন করে। আর্লি ম্যারেজ নয়, বিয়ে হতে হবে যথাসময়ে। বিয়ের জন্য বয়সই একমাত্র যোগ্যতা নয়।
কেউ কেউ মনে করেন তাড়াতাড়ি অল্প বয়সে বিয়ে দিলেই চারিত্রিক অবক্ষয় থেকে ব্যক্তি ও সমাজ রক্ষা পাবে। নীতি নৈতিকতা রক্ষা পাবে। কিন্তু বিষয়টা আসলে তা নয়। চরিত্র রক্ষার জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ, আইনের যথাযথ প্রয়োগ আর সামাজিক সুরক্ষা।

যে ছেলের মন সুস্থ নয়, তাকে ধরে বিয়ে দিলেই কোনকিছু ঠিক হয়ে যাবে না। অবিবাহিত মাত্রই চরিত্রহীন নয়, আর বিবাহিত হলেই কারো চরিত্র রাতারাতি ফুলের মত পবিত্র হয়ে যায় না। চরিত্রহীনদের তালিকায় বিবাহিতদের সংখ্যা নিতান্তই নগন্য নয়।

আর্লি ম্যারেজের নামে বেকার অবস্থায় কোন ছেলেকে বিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। বিয়ে দিলেই ঠিক হিয়ে যাবে- এটা কোন কাজের কথা হতে পারেনা। বিয়ে এমন কোন দাওয়াই নয়- যাতে নিমেষেই সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। একটা ছেলের বিয়ের আগে অন্তত এতটুকু উপার্জন থাকা উচিত, যাতে অন্তত দু'জন মানুষ ডাল ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে। বিয়ে দিলে ঠিক হয়ে যাবে!!" গেলে ভালো কথা, কিন্তু ঠিক না হলে যে একটা মেয়ের জীবন নষ্ট হয়ে যাবে, সেকথাও তো ভাবতে হবে নাকি?

বাবা মায়ের ওপর কোন দায়িত্ব নেই আপনার বউকে খাওয়ানোর। তারা যদি খাওয়াতে চান, খুব ভালো। নইলে আপনার বউয়ের সব চাহিদা মেটানোর দায়িত্ব সম্পূর্ণই আপনার।

কৃষিনির্ভর সমাজে মানুষ বৃদ্ধি মানেই ছিল আয় বৃদ্ধি। কিন্ত আধুনিক নগরভিত্তিক সমাজে তা নয়। এখানে বেশিরভাগ পিতামাতার নাভিশ্বাস উঠে যায় দু-তিনজন সন্তান মানুষ করতে। বাবার যখন অবসরে যাবার বয়স, তখন বেকার অবস্থায় আপনাকে বিয়ে করিয়ে নতুন একটা অতিরিক্ত সংসার টানার সামর্থ তার থাকবার কথা নয়।

আরে ভাই, ক্যাম্পেইন ট্যাম্পেইন করার আগে বুকে হাত দিয়া বলেন তো- আপনি কি আপনার বোনকে একজন পরিপূর্ণ বেকার ছেলের সাথে বিয়ে দিবেন?

(বিবাহ কথন-৫)

মঙ্গলবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০১৭

এক গ্লাস তরল ভালোবাসা...

গার্জিয়ানদের ইচ্ছা- তারা মেয়েকে এমন ঘরে বিয়ে দেবেন, যেখানে গিয়ে মেয়ে সবকিছু রেডিমেড পাবে। সবকিছু পাবে সাজানো গোছানো। যেন সে শুধু একটা সাজানো বাগানে গিয়ে প্রবেশ করবে মাত্র!!!

কিন্তু আমার মনে হয়, একটা নতুন সংসার হওয়া উচিৎ একেবারেই নতুন। এমনকি খাটটাও যদি স্বামী স্ত্রী দু'জনে একসাথে মিলে কিনতে পারে সেটাও ভালো। বিষয়টা হওয়া উচিৎ এমন- নিজেদের জন্য একেকটা প্লেট, গ্লাস, রান্নার চুলা, কড়াই, হাড়ি পাতিল- সবকিছু তারা নিজেরা নিজেরা কিনুক, নিজের মত করে একটা একটা করে কিনে সাজাক নতুন সংসার।

উইমেন সাইকোলজিই বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় সাবজেক্ট :P আর আমার জ্ঞান সেখানে হিমাংকেরও শত ডিগ্রী নিচে। তবুও মা, খালা, বোনদের কর্মকান্ড দেখে যতটুকু বুঝেছি- প্রত্যেক মেয়েই নিজের সংসারটা একান্তই নিজের মনের মত করে সাজাতে চায়। একটা একটা করে আসবাব কিনে তিল তিল করে যে সংসার একজন নারী সাজিয়ে নেন, তার প্রতি মায়া থাকে অন্যরকম। প্রতিটি জিনিসকে মনে হয় তার নিজের সন্তানের মত। একান্তই নিজের। যদি কখনো বাইরের পৃথিবী অসহ্য হয়ে ওঠে, এইসব তৈজসপত্রের মাঝেও তারা খুঁজে পান সুখ।
যতটা চিন্তা গবেষণা করে তারা একটা ডিনার সেট কেনেন, ততটা চিন্তা নিজের বিয়ের সময়ও কেউ করেন কিনা সন্দেহ :P
 
নতুন সংসারে খুনসুটি করে কেনা একেকটা আসবাব হয়ে থাকে জীবনের একেকটা মাইলফলক।

ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিলেই সবকিছু সাজিয়ে গুছিয়ে দেবেন না। তাদের নিজেদের সংসার নিজেদের মত করে সাজাতে বলুন।

নিজেদের কষ্টের টাকায় নিজেরা কিনে আনা একটা টিনের থালায়- পান্তাভাতকেই তাদের মনে হবে যেন বেহেশত থেকে পাওয়া মান্না সালওয়া।

আর গ্লাস কিংবা মগে পানি খাওয়ার সময় মনে হবে- এ যেন পানি নয়, হৃদয় নিঙরানো এক গ্লাস তরল ভালোবাসা  

(বিবাহ কথন-৪)

সোমবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০১৭

বিয়েঃ যুদ্ধটা হোক একসাথে

মেয়েদের গার্জিয়ানরা সবসময় চান- ছেলে যেন পুরোপুরি এস্টাবলিশড হয়! তার যেন অলরেডি বাড়ি গাড়ি থাকে!
তারা হয়তো ভুলে যান, অথবা জানেন না, যে ছেলে সবসময় সবকিছু না চাইতেই পেয়ে এসেছে, কিংবা যে ছেলে সবকিছু নিজে নিজে গুছিয়ে ফেলেছে- তার ঘরে নতুন বউ নতুন একটা আসবাবের মত বাড়তি সংযোজন মাত্রঃ যা তার কিছু শারীরিক ও মানসিক চাহিদা মেটাবে।

আসলে এস্টাবলিশমেন্ট নয়, দেখা উচিৎ পটেনশিয়ালিটি। দেখা উচিত স্বভাব চরিত্র।

আর বিয়েটা দেয়া উচিৎ সবকিছু গুছিয়ে নেয়া বা প্রতিষ্ঠিত হবার পর নয়, ছেলেমেয়েদের জীবনে সংগ্রাম বাকি থাকতেই। যাতে করে জীবনের বাকি যুদ্ধটা তারা দু'জনে একসাথে চালিয়ে নিতে পারে। যুদ্ধ করে করে জীবন এগিয়ে গেলে তবেই সম্পর্কটা হবে ইস্পাতকঠিন। নিঃস্বার্থ ভালোবাসাময়।

মানুষ সবসময় তাকেই বেশি ভালবাসে, বেশি আপন মনে করে, যে ছিল বিপদ মুহূর্তের সাথী। জীবনের বিভিন্ন কঠিন সময়ে যারা আমাদের সঙ্গে থাকে তাদেরকে আমরা ভুলতে পারিনা। তাদের সাথে সম্পর্কটা একসময় সত্যি সত্যিই স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে যায়।

বিয়ের ক্ষেত্রেও অবস্থাটা ভিন্ন কিছু নয়। যে স্বামী স্ত্রী একসাথে সংগ্রাম করে করে জীবনের পথে এগিয়ে যায়- তাদের বন্ধনটাই হয় সবচেয়ে দৃঢ়। তাদের ভালোবাসা হয় সবচেয়ে গাঢ়। সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী। কারণ, কঠিন সময়গুলোই মানুষের অন্তরে দাগ কেটে যায়। জীবনের শেষ দিনেও হয়তো মনে পড়ে - একদিন আমরা এক বেলা উপোস ছিলাম।
খাদিজা (রাঃ) এর মৃত্যুর পর আল্লাহর রাসুল (সাঃ) আরো বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু তিনি কখনো খাদিজা (রাঃ)কে ভুলে যাননি। খাদিজার কথা ভেবে তিনি কাঁদতেন। খাদিজার আত্মীয় ও বান্ধবীদের খোঁজ খবর নিতেন, উপহার পাঠাতেন।
কারণ, খাদিজা (রাঃ) ছিলেন তাঁর দুঃখের দিনের সাথী, কঠিন সময়ের সহযোদ্ধা।

রাসুল(সাঃ) যখন হেরা গুহায় ধ্যান করতেন খাদিজা (রাঃ) তখন রাতের আঁধারে তাঁকে খাবার দিয়ে আসতেন। নবুয়ত পাওয়ার পরের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোয় সবসময় সাহস ও সমর্থন যুগিয়ে গেছেন একজন বয়সী নারী, হযরত খাদিজা(রাঃ)।

এমন প্রাণের বন্ধুকে, এমন আত্মার আত্মীয়কে কখনোই ভোলা যায় না।

(বিবাহ কথন-৩)

রবিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০১৭

বিয়েঃ হোক বন্ধুত্ব

বিয়েতে উভয়পক্ষেরই অনেক কিছুই দেখা হয়। কী কী দেখা হয় তার ফিরিস্তি দিয়ে শেষ করা যাবে না। এমনকি পাত্র/পাত্রীর বাড়ির চায়ের কাপটা কেমন, কী নাস্তা দিয়েছিল, চায়ে কতটুকু চিনি দেয়া হয়েছিল সেটাও অনেকের কাছে ইম্পর্ট্যান্ট হয়ে দাঁড়ায়। বাড়ির কুকুরটা একটু বেশি ঘেউ ঘেউ করলেও অনেক সময় ভেস্তে যায় বিয়ের আলাপ।

বিয়েতে অনেক কিছুই দেখা হয়। চেহারা, চাকরি, ধনসম্পদ, শিক্ষা, এলাকা, পরিবার। শুধু দেখা হয়না পাত্রপাত্রীর মানসিক মিল অমিলের ব্যাপারটা। বিবেচনায় নেয়া হয়না ছেলেমেয়েদের চিন্তাচেতনার মিল অমিল। যেন এটা কোন বিষয়ই নয়!! যেন বিয়ে মানে টাকা ঘরবাড়ি আর বংশের সুনাম দেখে দু'জন মানুষকে এক ঘরে ঢুকিয়ে দেয়া!!
আমাদের সমাজের এইসব বিয়ে কি পাত্রের সাথে পাত্রীর, নাকি পাত্রের চাকরির সাথে পাত্রীর চামড়ার- এ নিয়ে প্রায়শই আমার ঘোরতর সন্দেহ হয়। 


অথচ বাস্তবিক অর্থে বিয়ে হচ্ছে একটা বন্ধুত্ব। স্বামী স্ত্রীর মাঝেই হতে হবে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব।
ভাবুন তো, আপনার খুব ক্লোজ যে বন্ধু, সে কীভাবে আপনার বন্ধু হলো? কেন আপনাদের বন্ধুত্ব দীর্ঘস্থায়ী হলো?
যার সাথে আপনার মনের মিল, যার সাথে আপনি প্রাণখুলে কথা বলতে পারেন, যার সাথে কথা বলে আপনার সময় কেটে যায় অনায়াসে- তারাই কিন্তু আপনার প্রিয় বন্ধু। তাই না! তাদের মধ্যে আছে পাটকাঠির মত হ্যাংলা বন্ধু, আছে মোটা, পাতলা, আছে বেঁটে, আছে লম্বা। আছে গরীব, আছে ধনী। কালো, শ্যামলা, ফর্সা। এইসব কোনকিছুই কিন্তু বন্ধুত্ব নির্মানের পথে বিবেচ্য ছিলনা। বন্ধুত্ব তৈরি হয় মনের মিল, বিশ্বাস আর ভালোলাগা থেকে।

বিয়ের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। মনের মিল না হলে বিয়ে সুখের হয় না। বন্ধুত্ব না হলে দীর্ঘস্থায়ী হয় না সম্পর্ক। চিন্তাভাবনার অমিলের কারণে, অর্থের প্রাচুর্যের মাঝেও প্রতিনিয়ত ভেঙ্গে যাচ্ছে অনেক সংসার। আর অনেক পরিবার টিকে আছে বুকের ভেতর ছাইচাপা কষ্ট নিয়ে।

আপনি বিবাহিত হলে স্ত্রী/স্বামীর বন্ধু হোন, আর বিয়ে না করে থাকলে এমন কাউকে পছন্দ করুন, যার সাথে আছে আপনার চিন্তাচেতনার মিল। যাকে আপনার সত্যিকারের বন্ধু বানাতে ইচ্ছে হয়।
মনের মিল না হওয়ায় তিন বছরে চারবার বিয়ে ভাঙ্গে সুন্দরী কমলার। আর ওদিকে নাক বোঁচা কলিমের বাপ দাঁত উচু কলিমের মার প্রাণের বন্ধু হয়ে পার করে দেন ষাট বছরের এক ম্যারাথন সংসার জীবন।

(বিবাহ কথন-২) 

শনিবার, ২১ জানুয়ারি, ২০১৭

সবকিছু নিখুঁত হওয়া চাই?

একজন মানুষকে আল্লাহ একসাথে সবকিছু দেন না। কোন একদিকে বেশি থাকলে অন্যদিকে কম থাকে। প্রত্যেক মানুষেরই কোন না কোন অভাব থাকবেই। আল্লাহ তায়ালা আমাদের মানুষ বানিয়েছেন, অতিমানব না। প্রত্যেকেরই খুঁত আছে, কেউই নিখুঁত নয়।

গার্জিয়ানরা ছেলেমেয়ের বিয়ের সময় এই চিরসত্যটা ভুলে যান। এবং ছেলেমেয়েরা নিজেরাও। সবাই একজনের মাঝেই সবকিছু পেতে চায়। পাত্রীর বাবা খোঁজেন এমন পাত্র, যে একইসাথে দেখতে হ্যান্ডসাম, অসম্ভব মেধাবী, সেটলড ক্যারিয়ার (আবার বয়সও কম!!), উচ্চ বেতন, কথাবার্তায় স্মার্ট ও বুদ্ধিমান, আচার ব্যবহার ভালো, চরিত্র ভালো, গভীর জীবনবোধের অধিকারী, চিন্তাশীল, উচ্চ বংশীয়, শিক্ষিত ও ধনী পরিবারের এবং একই অঞ্চলের। কিন্তু বাস্তবে এই সবকিছু আল্লাহ তায়ালা কাউকেই একসাথে দেন না।

ছেলে হয়তো খুবই স্মার্ট, হ্যান্ডসাম। ভালো চাকুরি করে। কিন্তু ঘরের ভেতর আসলে তার ব্যবহার ভালো নয়। সে মানুষকে সম্মান দিতে জানে না। হয়তো সে ভেতরে ভেতরে খুবই অহংকারী !! হয়তো সে বদরাগী!! হয়তো সে চরম অসহিষ্ণু একজন মানুষ!!

আবার ছেলের বাপ মায়েরা বোঝেন না যে ধনী, সুন্দরী, উচ্চশিক্ষিত, বুদ্ধিমতি, সংসারী (আরো যেসব চাওয়া থাকে!) সবকিছু একসাথে পাওয়া যায় না। অতিসুন্দরী মেয়ে অহংকারী হতেই পারে!! আপনি ছেলের বউ হিসেবে ধনীর দুলালী চান, তো সেই বউ আপনাকে শ্বাশুড়ীর সম্মান নাও দিতে পারে!! ক্রুড রিয়ালিটি।

অতিরিক্ত ও অবাস্তব প্রত্যাশার কারণে দেখা যায় পাত্র পাত্রী মিলছেই না। নানা ছুতোনাতায় একের পর এক প্রস্তাব বাতিল করছে ছেলে অথবা মেয়ের অভিভাবকরা।

একেবারে নিখুঁত একটা ছেলে কিংবা মেয়ের সন্ধানে কেটে যায় বছরের পর বছর।

একসময় তারা ক্লান্ত হয়ে যান।

হয়তো অনেকদিন পরে হুঁশ হয়। ততদিনে পদ্মা মেঘনায় গড়িয়ে যায় অনেক জল। হয়তো জোয়ারের শেষে ভাটা নামে আবেগ উচ্ছ্বাসে। মাঝখানে নিদারুণ বঞ্চনায় পেরিয়ে যায় ছেলেমেয়েদের জীবনের কিছু সোনালি সময়।
(বিবাহ কথন-১)

শ্মশান

বিগত গ্রীষ্মের মত চলে গেছে পৌষের দিন,
আর
ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে মাঘেরও রাত্রিগুলো।
হৃদয়ের তার ধরে নাড়াচাড়া করে গেছে পুবালি বাতাস
তবু
সুরের লহরী তারা বাঁজাতে পারেনি।
আসছে ফাল্গুনে কি শোনা যাবে কৃষ্ণচূড়ার গান?
নাকি
কালবৈশাখির অপেক্ষায় অনাবাদী থেকে যাবে
হৃদয় #শ্মশান?

বৃহস্পতিবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০১৭

এলোমেলো প্রশ্ন

কোথায় উড়ে যায় কোথাকার মেঘ
কোন পাহাড়ের টানে
কোথায় গিয়ে পরে হয়ে যায় বৃষ্টি!
কোথায় উড়ে যায় ওপাড়ের গাংচিল
আর এপাড়ের সাদা বক
এক পায়ে দাঁড়িয়ে কী ভাবে সারাটা বিকেল? 


কে কার খবর রাখে এইসব দিনে
যখন অদ্ভুত রুক্ষতায় ভরে আছে মানুষের মন!
কে ভাবে আজকাল হৃদয়ের কথা?
যখন সকলেই ভাবছে কেবল অর্থের প্রয়োজন!
কার কাছে আজো
কিছুটা মূল্য আছে মানবিকতার?
কিছুটা মূল্য আছে হৃদয়বৃত্তি আর
মনুষ্য স্বত্ত্বার?
-----
#এলোমেলো_প্রশ্ন

মঙ্গলবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৭

'চিকিৎসা সেবা আইন, ২০১৬' - খসড়া পর্যালোচনা

স্বাস্থ্যখাতে, বিশেষ করে বেসরকারি খাতে চিকিৎসা ব্যবস্থায় শৃংখলা প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার এ সংক্রান্ত নতুন আইন করতে যাচ্ছে । 'চিকিৎসা সেবা আইন, ২০১৬' নামে আইনটির একটি খসড়া প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় । আইনটিতে বেশ কিছু ভালো দিক আছে । তবে কিছু বিষয়ে এখনো রয়ে গেছে অস্পষ্টতা । কিছু বিষয় অগ্রহণযোগ্য।
প্রথমেই নজর দেয়া যাক ধারা ৯ এর ১ (খ) তে । এতে বলা হয়েছে ‘সরকারি বা কোন সংবিধিবদ্ধ সংস্থায় চাকুরিরত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি’ নির্ধারিত অফিস সময়ের বাইরে ও ছুটির দিনে ‘স্ব স্ব কর্মস্থলের জেলার বাহিরে’ ‘নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের লিখিত পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে’ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা চেম্বারে চিকিৎসা সেবা দিতে পারবেন।
সরকারি চাকরিরত ডাক্তার/নার্স গন যারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও সেবা প্রদান করেন তারা মূলত নিজ কর্মস্থলের আশেপাশেই তা করে থাকেন । নিজ কর্মস্থলের জেলার বাহিরে গিয়ে বেসরকারি সেবা প্রদান আদতে অসম্ভব প্রায় । সেক্ষেত্রে এই আইন বলবত হলে বাস্তবে অনেকেই আর বেসরকারিভাবে চিকিৎসা সেবা কার্যক্রমে যুক্ত থাকতে পারবেন না । আবার অনেকেই সরকারি চাকরি ত্যাগ করতে বাধ্য হবেন ।
এই ধারাটি সংশোধন করা দরকার । অন্যথায় বিশৃংখলা সৃষ্টির আশংকা থেকে যায় ।
ধারা ১৮ তে বিদেশী চিকিৎসা সেবা প্রদানকারীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে – ‘সরকারের পূর্বানুমতি গ্রহণ সাপেক্ষে সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানে বিদেশী চিকিৎসা সেবা প্রদানকারী নিয়োগ করা যাইবে ।
এখানে সরকারের অনুমতির পাশাপাশি বিদেশী সেবাদানকারীদের বাংলাদেশে চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য লাইসেন্সিং পরীক্ষা পাশ ও নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা রাখা দরকার ।
ধারা ৬ (১) অনুযায়ী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন, প্রবেশ, তল্লাশি ও জব্দ করার ক্ষমতা সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ ‘সরকার বা সরকার কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ বা তৎকর্তৃক নিযুক্ত কোন কর্মকর্তা বা কমিটি কোন চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানে যেকোন সময়ে প্রবেশ, পরিদর্শন, রেজিস্টার ও চিকিৎসা সেবা সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি বা নমুনা বা কাগজপত্র পরীক্ষা এবং জব্দ করতে পারবে।
এখানে পরিদর্শক টিমে অন্তত একজন সরকারি ডাক্তারের অন্তর্ভুক্তি আবশ্যক করা উচিৎ ।
ধারা ২০ (১) এ বলা হয়েছে- স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক এই আইনের অধীনে পেশাগত দায়িত্ব পালনে বা চিকিৎসা প্রদানে অবহেলা অপরাধ হিসেবে গন্য হইবে ।
২(২) ধারা অনুযায়ী অবহেলাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে- স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সেবা গ্রহীতার প্রাপ্য সেবা প্রদান না করা যাহা তাহার পক্ষে ‘বাস্তব অবস্থায় ও মানবিকভাবে’ পালন করা সম্ভব ছিল ।
আগেকার খসড়া আইনে পেশাগত অবহেলাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল এভাবেঃ 'ভুল চিকিৎসা' যা দ্বারা 'রোগ মুক্তি ঘটে না' বা 'বিলম্বিত হয়'।
সে তুলনায় এবারের সংজ্ঞায়ন ভালো হয়েছে । তবে আরো স্পেসিফিক করা যায় কিনা তা নিয়ে ভাবা যেতে পারে ।
খসড়া এই আইনের কিছু ভালো দিক হলোঃ
ধারা ২১(১) –এ চিকিৎসা সংক্রান্ত অভিযোগ আদালতে আমলে নেয়ার আগে ন্যুনতম দুইজন চিকিৎসক সহ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন আবশ্যক করা হয়েছে । কমিটিতে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অন্তর্ভুক্তি আবশ্যক করা হয়েছে।
২১(৪) ধারায় বলা হয়েছে - আদালতের নির্দেশনা ব্যতিত কোন স্বাস্থ্যসেবা প্রদনকারী ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা যাইবে না ।
ধারা ২০ (২) এ বলা হয়েছেঃ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তির প্রতি হুমকি প্রদান , ভীতি প্রদর্শন, দায়িত্ব পালনে বাধাদান, আঘাত করা সহ যেকোন ধরণের অনিষ্ট সাধন বা স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কোন সম্পত্তির ক্ষতিসাধন, বিনষ্ট, ধ্বংস বা উক্তরুপ সম্পত্তি নিজ দখলে গ্রহণ অপরাধ বলিয়া গন্য হইবে।
ধারা ২১(৫) অনুযায়ী ২০(২) এ উল্লেখিত অপরাধ হবে আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য।
এগুলো এই আইনের ভালো দিক ।
তবে ধারা ২২(২) অনুযায়ী ২০(২) এ উল্লেখিত অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে অনধিক পাঁচ লক্ষ টাকা অর্থদন্ড বা তিন বছর কারাদন্ড বা উভয় দন্ড।
শাস্তির পরিমাণ কম হয়েছে । শাস্তির মাত্রাকে আরো সংজ্ঞায়িত করা দরকার । ক্ষতির পরিমাণ বা আঘাতের প্রকৃতি অনুযায়ী অপরাধের শাস্তি নির্ধারণ হওয়া উচিৎ। ২০ লক্ষ টাকা ক্ষতিসাধন করলে অনধিক পাঁচ লক্ষ টাকা অর্থদন্ড কি গ্রহণযোগ্য? অথবা শারীরিকভাবে গুরুতর আঘাত করা হলে তিন বছর কারাদন্ড কি যথেষ্ট হবে? বিভিন্ন দেশে এইরুপ অপরাধের শাস্তি আরো বেশি ।
এখানে ‘অনধিক’ এর স্থলে ন্যুনতম শব্দ প্রয়োগ করা উচিৎ হবে ।

বুধবার, ৪ জানুয়ারি, ২০১৭

তরুণ লেখকদের কী করা উচিত?

তরুণ লেখকদের একটা বড় অংশ তাদের গল্প উপন্যাস লেখায় হুমায়ুন আহমেদের স্টাইল ফলো করেন। আপনি নতুন কোন লেখকের একটা গল্প পড়তে শুরু করলেন, কিছুটা পড়ার পরেই দেখবেন- কেমন যেন হুমায়ুন আহমেদের লেখার গন্ধ পাচ্ছেন।

লেখালেখি শুরু করার জন্য এটা ভালো। হুমায়ুন স্টাইলে লেখার সুবিধা হলো- খুব সহজেই ছোট ঘটনাকে টেনে বড় করা যায় আর তা পাঠকের কাছে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের লেখার মত প্যাচালো বা জটিল মনে হয় না। তবে দীর্ঘমেয়াদে হুমায়ুনীয় স্টাইল ফলো করা একজন উদীয়মান লেখকের জন্য আত্নঘাতী হবে। পাঠক আপনার লেখা পড়তে গিয়ে হুমায়ুন আহমেদকে খুঁজে পাবে, আপনাকে নয়।

হুমায়ুন আহমেদ ঠিকই নিজের মত করে তার নিজের সময়কে ধারণ করে গেছেন। আপনার উচিৎ, আপনার নিজস্ব স্টাইলে আপনার সময়কে ধারণ করা।

মঙ্গলবার, ৩ জানুয়ারি, ২০১৭

দূর্নীতি কারা করে?

অনেকের ধারণা, দুর্নীতি শুধু বড় অফিসাররাই করে। পুলিশ অথবা যারা বিভিন্ন অফিসে কাজ করে, দুর্নীতি বোধহয় শুধু তারাই করে। অন্য কেউ না।

কেউ কি মনে করেন যে একজন রিক্সাওয়ালাও দুর্নীতি করে? কিংবা, একজন কামলাও কি দুর্নীতি করে?
উত্তর হচ্ছে- হ্যা। তারাও দুর্নীতি করে। পার্থক্য শুধু টাকার অংকে। যে যতটুকু পারে, সে ততটুকু করে।
যেদিন রাস্তায় একটু জ্যাম থাকে, যেদিন গাড়ি সংকট থাকে, বা হরতাল থাকে সেদিন রিক্সাভাড়া দ্বিগুন হয়ে যায়। সিএনজি ভাড়া দ্বিগুন তিনগুন হয়ে যায়।

একজন কামলা দুর্নীতি করে তার কাজে ফাঁকি দেয়ার মাধ্যমে। যে কাজ সে একদিনে করতে পারে, সেই কাজকেই সে করবে তিনদিন লাগিয়ে।
ব্যবসায়ীরা দুর্নীতি করে মজুদদারীর মাধ্যমে। অতিরিক্ত মুনাফাখোরীর মাধ্যমে। রমজান মাসে আমরা সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাই।

অফিসের লোকেরা দুর্নীতি করে কখনো ফাইল আটকিয়ে, কখনো গ্রাহকের কাছে সরাসরি টাকা আদায় করে, কাজে ফাঁকি দিয়ে, অপ্রয়োজনীয় ওভারটাইম করে।

আসলে যার মনে অসততা বাসা বেঁধে আছে, সে যেই হোক, যে পেশাতেই থাকুক, দুর্নীতি করবেই। দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য বদলাতে হবে ভেতরের মানুষটাকে।

সোমবার, ২ জানুয়ারি, ২০১৭

মোটরবাইকের নেশা

ক্ষুদ্র ডাক্তারি জীবনে রোড এক্সিডেন্টের যতজন রোগী দেখেছি, বেশিরভাগই মোটরসাইকেল এক্সিডেন্ট। কারণ, মোটর সাইকেল জিনিসটাই আসলে একটা নেশা।

যেদিন থেকে মোটর সাইকেলে বসে কোনমতে মাটি ছুঁতে পারি, সেদিন থেকে বাইক চালানো শুরু। এরপর এক যুগ ধরে রংপুরের সমতলভূমি আর চট্টগ্রামের পাহাড়ী রাস্তায় হাজার হাজার মাইল বাইকের ওপর বসে পাড়ি দিয়েছি। ফিলিংসটা হলো- বাইকে উঠলেই নেশা ধরে যায়। স্পিডোমিটারের কাটা ষাটের নিচে থাকা মানে যেন একজন বাইকারের চরম অপমান। আর কেউ যদি ওভারটেক করে, তাহলে যেন মাথায় আগুন ধরে যায়। শুরু হয়ে যায় অঘোষিত রেস। 

ভয়ংকর ব্যাপারটা হচ্ছে- কখনো কখনো সেই রেসের সমাপ্তি ঘটে জীবনের বিনিময়ে।
ডিয়ার বাইকার্স, প্লিজ কন্ট্রোল ইওরসেলফ, কন্ট্রোল স্পিড। বিকজ, একটি দুর্ঘটনা, সারা জীবনের কান্না।

রবিবার, ১ জানুয়ারি, ২০১৭

সময় এত দ্রুত কেনে??

অনেককেই বলতে শুনি "ভাই, কী করি বলেন তো! সময় যে কাটেনা! "
আমি অবাক হয়ে যাই। খুব অদ্ভুত লাগে।

পৃথিবীতে কত কিছু করার আছে, কত কিছু জানার আছে, কত কিছু দেখার আছে!! হাজার বছরেও তো এক জীবনের স্বাদ মিটবে না। অথচ একজন জ্বলজ্যান্ত মানুষ কোন কাজ খুঁজে পাচ্ছে না, তার সময় কাটছে না, এ কীকরে হয়?
অথচ প্রতিটি দিনের শেষে আফসোস আমার নিত্যসঙ্গী। আহা! কিছুই তো করা হলো না। কিছুই তো দেখা হলো না। কিছুই তো শেখা হলো না।


তারাশঙ্কর বলেছিলেন- ভালোবেসে মিটিলো না সাধ, জীবন এত ছোট কেনে?
আমাকে বলতে হয়- দিনের শেষেও ফুরালো না কাজ,
সময় এত দ্রুত কেনে??

বৃহস্পতিবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

অপরাধী

আমাকে অপরাধী করে দেয় তোমাদের ভালোবাসা।
সহসাই মহীরুহ হয়ে ধরা দেয় চোখে-
যত অক্ষমতা,
যত দারিদ্র‍্য আমার।

আমাকে অপরাধী করে দেয় তোমাদের ভালোবাসা।
অপাত্রে ঢেলে ঢেলে
কী নিদারুণ অপচয় হচ্ছে তোমাদের হৃদয় আবেগ !!
অথচ, কে না জানে-
আমি এর মোটেও যোগ্য নই,
কখনোই ছিলামও না।

#অপরাধী

রবিবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

জন্মদিনের আত্মজিজ্ঞাসা

গতকাল ছিল আমার আটাশতম জন্মদিন। অর্থাৎ, সাতাশ বছরের জীবন কাটিয়ে দিয়েছি পৃথিবীর আলো বাতাসে।
সাতাশ বছর মোটেও কম সময় নয়। যদি এভাবে ভাবি- আজ থেকে সাতাশ বছর আগে যারা একইদিনে জন্মেছিলো, তারা সবাই কি আজও বেঁচে আছে? নেই। এমনকি আরো পরে যাদের জন্ম, তারাও অনেকেই বেঁচে নেই।

আল্লাহর ইচ্ছায় আমি বেঁচে আছি। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে ফিরে এসে আজও বেঁচে আছি। তার মানে, আমি অনেক মানুষের তুলনায় অলরেডি এক দীর্ঘ জীবন পেয়েছি।

বয়স হলো সাতাশ। সাত বছর বাদ দিতে হয়, কারণ সাত বছর বয়সের আগে আসলেই কিছু বোঝার মত বয়স ছিলনা। তবু বিশ বছরেই এত এত ভিন্ন মাত্রার অভিজ্ঞতা হয়েছে যে, মাঝে মাঝে নিজেই আশ্চর্য হয়ে যাই। শরীরের বয়স যাই হোক, আপেক্ষিকতার সূত্র অনুযায়ী মনের বয়স যে কত হয়েছে ঠাওর করতে পারিনা।
আমি জন্মদিন উদযাপন করিনা। ছুটির দিন থাকে, ঘুমিয়েই কাটাই। প্রশ্ন হলো- জন্মদিন কি আসলে আনন্দের সাথে উদযাপন করার বিষয়? নাকি এই ভেবে কষ্ট পাওয়া উচিৎ যে- নির্দিষ্ট হায়াতের হিসাব থেকে আরো একটি বছর কমে গেল! মহাকালের মহাশুন্যতায় অন্তর্ধানের দিকে আরো অনেকটা এগিয়ে গেলাম!!

জন্মদিনে অনেকেই আমাকে শুভেচ্ছা জানান। আমিও জানাই। যেকোন শিশুর জন্মই আনন্দের উপলক্ষ্য। হয়তো আমারটাও তাই। কিন্তু সেই শিশু যখন বড় হয়- তখন সে আর সবার জন্য আনন্দের কারণ থাকে না।

জন্মদিনের সবচেয়ে বড় আত্মজিজ্ঞাসা হলোঃ যখন শিশু ছিলাম, তখন হয়তো স্বাভাবিকভাবেই মানুষের জন্য আনন্দের কারণ ছিলাম। এখন এই পরিণত বয়সেও আমি কি সত্যিই মানুষের জন্য আনন্দের উৎস হতে পেরেছি?

মঙ্গলবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১৬

সাজেকঃ মেঘের ওপর বাড়ি

গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙ্গা মাটির পথ... 
 
চট্টগ্রামে যখন পা রাখলাম তখনো সূয্যিমামার মুখ দেখা যায় নি। পৌষের প্রথম সকাল। বাস থেকে নেমেই শীতের আমেজ টের পাওয়া গেলো। চাঁদর জড়াতে হলো গায়ে। বাসায় কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়েই ভ্রমণপিপাসুদের বিশেষ গ্রুপ "ভ্রমরের" কয়েকজন তরতাজা যুবক রওয়ানা হলাম "অক্সিজেনে"র উদ্দেশ্যে। ঘড়ির কাটায় সকাল আটটা পেরিয়ে গেছে। মানুষের পদচারণায় চট্টগ্রামের অক্সিজেন মোড়ের বাতাসে তখন অক্সিজেনের তুলনায় কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। 
আমাদের বাসে উঠতে হলো ঠিক সাড়ে আটটায়। গন্তব্য... রাঙ্গামাটি.... তবে আপাতত রাঙ্গামাটি নয়। যাচ্ছি খাগড়াছড়ির পথ ধরে সাজেকের সবুজ উপত্যকায়। সাজেক পড়েছে রাঙ্গামাটি জেলায়, কিন্তু পুরোটা পথ পড়বে খাগড়াছড়ির মাটিতে।

চান্দি গরম!!
 
ভ্রমর গ্রুপের দু'জন সদস্য আগের দিন বিকেলেই শান্তি পরিবহনের টিকেট কাটতে এসেছিলেন। তাদেরকে বলা হয়েছিলো সামনের দিকে কোন সিট খালি নেই। অতএব বাধ্য হয়ে তারা পেছনের দিকের কয়েকটি সিটের টিকেট কিনে নিয়ে যান। কিন্তু সকালে এসে দেখা গেলো ভিন্ন চিত্র!! হেল্পার চিৎকার করে ডাকছে... আসেন খাগড়াছড়ি... সিট খালি... এবং দেখা গেলো এইমাত্র এসে অনেকেই বাসের সামনের সিট পেয়ে যাচ্ছেন!! শান্তি পরিবহনের চট্টগ্রাম কাউন্টারের এই প্রতারণায় আমরা যারপরনাই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলাম। এই শীতের সকালে আমাদের চান্দি গরম গেল। ব্যাটাদের একহাত দেখে নেয়া দরকার। কাউন্টারে যে দুজন বসা ছিল তাদের সাথে বেশ উচ্চবাচ্য হলো। ওদেরকে বেশ করে শাসিয়ে দিলাম। বাসে উঠলাম ঠিকই, কিন্তু যাত্রার শুরুতেই শান্তি পরিবহনের এই প্রতারণামূলক আচরণ যে অশান্তির সৃষ্টি করলো তার শেষ কোথায় কে জানে!!

জানালায় ভোরের আলো 
 
চারজন অলস বাস মিস করেছে। অতএব চারটা সিট খালি। অলসরা পরের বাসে পারলে আসবে। না পারলে নাই। ব্যাকপ্যাক গুলো খালি সিটে রেখে আয়েশ করে বসলাম আমরা। আর বাস ছুটলো গন্তব্যের টানে। হাটহাজারী, নাজিরহাট, মানিকছড়ি... পথের দুপাশে সবুজ গাছের সারি। কখনো কাটা ধানের ক্ষেত। শহর ছেড়ে আমরা গ্রামের আলোহাওয়ার ভেতর এগিয়ে চলেছি। ততক্ষণে সূর্য তার আলো ছড়াতে শুরু করেছে। জানালার ফাঁক দিয়ে আলো এসে পড়ছে গায়ে। যেন আলতো করে মুখে চোখে বুলিয়ে দিচ্ছে উষ্ণ পরশ।

এই পথ যদি না শেষ হয়? 
 
মানিকছড়ি পার হলে শুরু হলো পাহাড়ি রাস্তা। দু'পাশে পাহাড়, টিলা। টিলার ঢালে সবুজের সমারোহ। মাঝখান দিয়ে রাস্তা। এরকম পথে চলতে আমার এত ভালো লাগে, এজন্যই আমি শত শত মাইল পাড়ি দিয়ে বারবার ফিরে আসি পাহাড়ের কোলে। অদ্ভুত সুন্দর আঁকাবাকা আর উঁচুনিচু এইসব নির্জন রাস্তায় এলেই গলা ছেড়ে গাইতে ইচ্ছে হয়- এই পথ যদি না শেষ হয়!! তবে কেমন হত, তুমি বলতো!! (তবে শেষ পর্যন্ত গলা ছাড়লাম না। নিজেকে কন্ট্রোল করেছি আরকি! বিকজ, আমার গানের গলা এতই মধুর যে, সুরের মূর্ছনায় রাস্তার সবকিছু থেমে যেতে পারে, ইউ নো!!)

টেনশন টেনশন!!
 
খাগড়াছড়ি নেমে নামায আর খাওয়া সেরে আমরা উঠলাম পাহাড়ী পথের জন্য বিশেষ জীপ- চান্দের গাড়িতে। শুরু হলো চান্দের গাড়ির দুরন্ত গতির সাথে আমাদের রোমাঞ্চকর যাত্রা। আমরা জানতাম যে দীঘিনালা থেকে সেনাবাহিনীর এসকর্ট টীম সাজেক যায় বিকেল সাড়ে তিনটায়। কিন্তু খাগড়াছড়িতে নেমে জানা গেল সময়টা এখন এগিয়ে আনা হয়েছে। সেনাবাহিনীর টীম যাবে পৌনে তিনটায়। অর্থাৎ এর মধ্যে দীঘিনালা পৌঁছতে না পারলে আজ আমাদের সাজেক যাওয়া হবে না। বাস মিস করা সেই চারজন অলস পরের বাসে রওনা দিয়েছিল। তারা এসে পৌঁছতে পৌঁছতে আরো কিছুটা দেরি হয়ে গেল। সবাই কিছুটা টেনশন বোধ করতে লাগলাম। তবে কি তীরে এসে ডুবে যাবে তরী?
অবশেষে ঘুমকাতুরে অলসরা এসে পৌঁছলো। আর দেরি নয়। উল্কার বেগে ছুটলো চান্দের গাড়ি। গন্তব্য সাজেক, যেখানে মেঘের ওপর বাড়ি। 

পথে পথে চেকপোস্ট! 
 
আমাদের গাড়ি যখন আর্মি ক্যাম্পের কাছে পৌঁছলো, ততক্ষণে অন্যসব গাড়ি নিয়ে সেনাবাহিনীর টিম রেডি হয়ে গেছে। আর পাঁচ মিনিট দেরি করলেই মিস হয়ে যেত আজকের এসকর্ট। পর্যটকদের নিয়ে ৩৮ টি গাড়ির দীর্ঘ বহর এগিয়ে চললো সাজেকের উদ্দেশ্যে। দীর্ঘ পাহাড়ী পথ। আর পথে পথে চেকপোস্ট। কখনো সেনাবাহিনীর, কখনো বিজিবির, কখনো পুলিশের। মাঝে মাঝে কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছিলো, এ কি নিজের দেশে আছি? এখনো এতটা অনিরাপদ রয়ে গেছে পার্বত্য অঞ্চল! 
কিছুদূর এগিয়েই উঠে পড়লাম গাড়ির ছাদে। হাওয়ার বেগে ছুটছে গাড়ি। আর হাওয়ায় উড়ছে আমাদের মন।



উড়ু উড়ু মন নিয়ে চান্দের গাড়ির ছাদে

দীঘিনালা পেরিয়ে বাঘাইহাট। পথে কাচালং নদী, কাচালং বাজার, মাসালং বাজার। আঁকাবাকা আর উঁচুনিচু রাস্তা, তবে বান্দরবানের মত অতটা ভয়ংকর নয়। বলতে গেলে, সত্যিকারের এডভেঞ্চারারদের কিছুটা খারাপও লাগতে পারে। বিশেষ করে যারা আগেই বান্দরবানের গহীনে ঘুরে এসেছেন তাদের কাছে সাজেকের পথ হয়তো নতুন কোন অনুভূতি জাগাবে না। নতুন যা, রাস্তার পাশে প্রায় প্রতিটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে উপজাতি শিশুরা আমাদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়াচ্ছিলো। ওরা কী বলছিলো শোনা যায় নি। তবে আমরা নিজেরাই ভেবে নিলামঃ নিশ্চয় ওরা বলছে- "ডিয়ার ট্রাভেলার্স, ওয়েলকাম টু সাজেক"!!!



সতর্কবানী


পাহাড়চূড়ায় পূর্ণিমা স্নান
 
সাজেকে যখন পৌঁছলাম তখন সূর্য ডুবি ডুবি করছে। রুইলুই পাড়ায় আমাদের জন্য বুক করা কটেজ "মেঘালয়" তে ব্যাগপত্তর রেখে বেরিয়ে পড়লাম দূর পাহাড়ের দেশে অস্তগামী সূর্যকে বিদায় জানাতে।



সাজেকের প্রবেশমুখ

আরো উত্তরে হেঁটে গেলে পাওয়া গেল মসজিদ। সেখানেই মাগরিব এবং এশার নামাজ পড়লাম। পুবের আকাশে তখন অন্য দৃশ্য। ভোরের সূর্যের মত লাল হয়ে উঠে আসছে পূর্ণিমার চাঁদ। পাহাড়ের চূড়ায় মেঘ, তার ওপরে চাঁদ।

রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে রাত ন'টা পর্যন্ত চললো আমাদের খুনসুটি আড্ডা। ধীরে ধীরে আরো উজ্জ্বল, আরো সুন্দর, আরো মোহিনী রুপ ধারণ করলো চাঁদের আলো। হাজার ফুট উপরে, পৌষের প্রথম রাতে হিম হিম বাতাসে, এ যেন অদ্ভুত পূর্ণিমা স্নান। এ যেন মুগ্ধতার নতুন মাত্রা।

মেঘের ওপর বাড়ি
 
রাতে খেয়েদেয়ে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম। সারাদিনের ভ্রমণের ক্লান্তি আর পাহাড়ের নীরব নিস্তব্ধতায় জম্পেশ ঘুম হলো। ভোরে উঠেই দৌড়। মসজিদে ফযরের নামায পড়ে আমরা উঠে এলাম সাজেকের হেলিপ্যাডে। দু'পাশে পাহাড়ী খাদ মেঘে মেঘে ভরে আছে। প্রথমবার মেঘের ওপরে উঠেছিলাম বিমানে। এবার মেঘের ওপর উঠেছি পায়ে হেঁটে!! ভাবতেই অন্যরকম অনুভূতি হলো।




হেলিপ্যাডের নিচে জমাট বেঁধে আছে সাদা মেঘের দল

সূর্যের তাপ আরেকটু বাড়লে আমরা গাড়ি নিয়ে রওনা হলাম আরো উত্তরে কংলাক পাড়ার উদ্দেশ্যে। আরোহন করলাম কংলাক পাহাড়ে। অনেকেই হাঁপিয়ে উঠলো, কিন্তু কেওক্রাডং বিজয়ী পর্বতারোহী হিসেবে আমার কাছে এ যেন ছিল নিতান্তই ডালভাত!! বিনাক্লেশে উঠে পড়লাম কংলাক চূড়ায়। সেখানে লুসাই উপজাতির দুয়েকটা বাড়ি আছে। বাড়ির আঙিনায় তখনো জমাট মেঘ!! এ যেন সত্যিকারের- মেঘের ওপর বাড়ি।



মেঘের ওপর বাড়ি


ফেলে আসি নীলাকাশ 
 
সকাল দশটায় সাজেক থেকে ফিরতি যাত্রা। আবার সেনাবাহিনীর একটি টিম আমাদের সাথে নিয়ে যাবে দীঘিনালা পর্যন্ত। মূলত আমরাই যাবো ওদের সাথে। সেনাবাহিনীর এসকর্ট ছাড়া যাওয়া আসা করা যায় না। এবার আর ছাদে নয়। বসেছি গাড়ির পেছনের দিকে মুখ করে। সূর্যের তাপ বাড়ছে। আকাশে কোন মেঘ নেই। যতদূর চোখ যায় পাহাড় আর নীল আকাশ। এমন দিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশ বহুদিন দেখা হয়নি।
ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে পাহাড়ী পথ, আমরা এগিয়ে যাচ্ছি শহুরে জীবনে।



পেছনে ফেলে আসি নীল আকাশ

বিকেলে ঘুরলাম আলুটিলার রহস্যময় গুহায়। দিনের শেষ মুহূর্তগুলো কাটিয়ে দিলাম রিসাং ঝর্ণার গান শুনে।



রিসাং ঝর্ণার গান

সূর্য ডুবে গেলে সাঙ্গ হলো এবারের খেলা। অন্ধকারে ডুবে গেল পাহাড়, মেঘ, ঝর্ণা আর দিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশ।

রবিবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

অনারারীর অমানবিকতা

১।
হাসপাতালের ক্যান্টিনে ঢুকতেই আমার চোখ গেল কর্নারের টেবিলে। একা বসে আছেন ডাঃ বকুল। খুবই শান্ত শিষ্ট নিরীহ মানুষ। তবে আজ মনে হচ্ছে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি গম্ভীর। বেশ বিমর্ষ চেহারা।
গিয়ে বসলাম পাশে।

-কী ব্যাপার বকুল ভাই, মন খারাপ?
-জ্বি ভাই। আজকে একজনের সাথে একটু রুড আচরণ করে ফেলেছি। এখন মনটা খারাপ লাগছে। লোকটা ডাক্তারদের ব্যাপারে নিশ্চয় একটা খারাপ ধারণা নিয়ে গেলো। মানুষ কষ্ট নিয়েই হাসপাতালে আসে, কিন্ত ভাই সবসময় মেজাজ ঠিক রাখা যায় না। রাখতে পারি না। আর যারা এক লাইন বেশি বোঝে তাদের আমি কেন যেন সহ্য করতে পারি না।
ডাঃ বকুল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অনারারী মেডিকেল অফিসার। সোজা বাংলায় ইনি একজন ডাক্তার যিনি তার শ্রমের বিনিময়ে কোন পারিশ্রমিক পান না। ডাক্তার হয়েছেন বছর খানেক আগেই। একটা ক্লিনিকে চাকরি করেন। একদিন তাঁর মনে হলো, শুধু ক্লিনিকের চাকরি করে দিনকে দিন মেডিকেল নলেজের ধার কমে আসছে। ট্রেনিং করা দরকার। আবারো পড়ালেখায় নামা দরকার। তাছাড়া ভবিষ্যতের বাজারে টিকে থাকার জন্য একটা পোস্ট গ্রাজুয়েশান ডিগ্রীও করা দরকার।

অতঃপর সিনিয়র ভাইদের পরামর্শে ডাঃ বকুল ঢুকে পড়লেন অনারারী ট্রেনিং এ। হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের অদ্ভুত হেলথ সিস্টেমের এক কিম্ভুত সদস্য, একজন বিনে পয়সার কামলা।

গতকাল রাতে তাকে ক্লিনিকে ডিউটি করতে হয়েছে। রাতটা বেশ 'খারাপ'ই গেছে বলতে গেলে। ক্রিটিকাল পেশেন্ট ছিল, ডেথ ডিক্লেয়ার করতে হয়েছে দু'জনের। ঘুমানোর কোন সুযোগই হয়নি। সকালে উঠে আবার ট্রেনিং-এর নামে বিনেপয়সার কামলাগিরি করতে এসেছেন।

সকালে এমনিতেই কাজের চাপ বেশি থাকে। নতুন ভর্তি রোগীর হিস্ট্রি রিভিউ, ফলো আপ, ইনভেস্টিগেশান প্ল্যান, ট্রিটমেন্ট রিভিউ, পুরনো রোগীদের ফলো আপ, ট্রিটমেন্ট এডজাস্ট করা, ছুটি দেয়া, রাউন্ড, ক্লাস, সেমিনার ইত্যাকার নানা কাজ। দম ফেলা মুশকিল।

এরই মধ্যে যখন এক পেশেন্টের এটেন্ড্যান্ট বিরুপ মন্তব্য করে বসলো তখন আর মেজাজ ঠিক রাখতে পারেন নি। কিছু কড়া কথা শুনিয়ে দিয়েছেন । তারপর থেকে বেচারার নিজেরই মন খারাপ।
আমারও খারাপ লাগলো। ডাঃ বকুল এবং সেই এটেন্ড্যান্ট উভয়ের জন্যই খারাপ লাগলো। কিন্তু আমি কোনভাবেই ডাঃ বকুলকে দোষ দিতে পারলাম না। আমি জানি, ডাঃ বকুল অকারণে মেজাজ খারাপ করার লোক নন। আসলে ডাঃ বকুল এমন এক অমানবিক সিস্টেমের শিকার, যে সিস্টেম তার মত নিরীহ মানুষকেও আজ রুঢ় করেছে। যে সিস্টেম তার যৌবনের সোনালি সময়কে সিস্টেমের মারপ্যাচে ফেলে অপব্যবহার করে যাচ্ছে। এর কিছুটা বিরুপ প্রভাব অন্যদের ওপরও পড়বেই, এখন আর এতে খুব একটা অবাক হই না।

আমি জানি, ডাঃ বকুলকে যদি আলাদাভাবে ক্লিনিক ডিউটি করতে না হত, তাকে যদি পেটের চিন্তায় মগ্ন থাকতে না হত, তার কর্মঘন্টা যদি নির্দিষ্ট থাকতো এবং ওয়েল পেইড হত, তাহলে তিনি কখনোই মেজাজের খেই হারাতেন না।
You haven't given him a sound sleep, how can he give you a good smile??


২।
এই অংশটুকু বিশেষত নন-মেডিকেল পাঠকদের উদ্দেশ্যে। আপনার মনে যে প্রশ্নটি চলে এসেছে তাহলো- ট্রেনিং তো ডাক্তাররা করছেন তার নিজের জন্য, নিজের ডিগ্রীর জন্য। এর জন্য সরকার ভাতা দেবে কেন? এত কথা কেন?

এই প্রশ্ন যদি সত্যিই আপনার মনে এসে থাকে তাহলে সেটা বড়ই আফসোসের কথা। পর্যাপ্ত ডাক্তার নিয়োগ দেয়া এবং ডাক্তারদের ভাতা দিয়ে ভালো করে ট্রেনিং করানোর দাবি আপনাদের পক্ষ থেকেই তোলা উচিত। কারণ, ডাক্তার দক্ষ না হলে এর কুফলটা আপনাকেই ভোগ করতে হবে। সরকারি হাসপাতাল বলেন আর বেসরকারি বলেন, কোথাও পর্যাপ্ত ডাক্তার নিয়োগ দেয়া হয়না। ফলে অল্প ক'জন ডাক্তারকে অতিরিক্ত চাপ নিতে হয়। ডাক্তার নাহয় শায়েস্তা হলো, কিন্তু আপনি কি পূর্ণ মনোযোগ পান? না পেলে আপনি কী করেন? ডাক্তারকে গালিগালাজ করেন? নাকি ডাক্তারের নামে অভিযোগ করেন? কখনো কি কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ করেছেন- এতজন রোগীর জন্য একজন ডাক্তার কেন? কখনো কি দাবি তুলেছেন- এত টাকা বিল দিলাম, ডাক্তারের বেতন এত কম কেন? নাহ। তা করেন নি।
ডাক্তারদের ভালো ট্রেনিং এর ব্যবস্থা আপনাদের নিজেদের স্বার্থেই করতে হবে। বিকজ, দে ডিলস উইথ ইওর লাইফ এন্ড ডেথ। তাদের আপডেটেড নলেজ এন্ড স্কিল না থাকলে দিনশেষে আপনিই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ক্ষতিগ্রস্ত হবে আপনার বাবা মা, আপনার সন্তান। হয়তো ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে ভাংচুর করবেন, হয়তো পত্রিকায় নিউজ হবেন। কিন্তু যদি কোন ক্ষতি হয়েই যায়, তা কি ফিরে পাবেন?

ডাক্তারদের পেটের চিন্তা থেকে মুক্ত রাখতে হবে। বিকজ, দে হ্যাভ টু লিভ দা মোস্ট স্ট্রেসফুল লাইফ। পেট এবং মাথা দুই জায়গায় চাপ নিয়ে ভালো সেবা দেয়া যায় না। আর এ কারণেই উন্নত বিশ্বে ডক্টরস আর অলওয়েজ হাইলি পেইড। আমার দেশে একটা সরকারী হাসপাতালের একটা ওয়ার্ড চালানোর জন্য যতজন ডাক্তার দরকার, আমার সরকার নিয়োগ দিয়েছে তার এক চতুর্থ বা পঞ্চমাংশ। আর সেই জায়গা পুরণের জন্যই জিইয়ে রাখা হচ্ছে এই অমানবিক সিস্টেম। ডিগ্রীর মুলো ঝুলিয়ে বিনেপয়সায় খাটিয়ে শোষণ করা হচ্ছে তরুণ ডাক্তারদের সোনালি সময়। একটা দিনও যদি এই ডাক্তাররা কাজ না করেন, তাহলেই হাসপাতাল অচল হয়ে পড়বে।

আপনি এই সিস্টেমকে সমর্থন করেন? যদি করেন, তাহলে আপনি ভালো ব্যবহার পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন না। আপনি যদি এই সিস্টেম পরিবর্তনের দাবি না তোলেন, তাহলে আপনি আন্তরিক চিকিৎসা পাবার আশা করতে পারেন না।

আপনি ঘোড়াকে ক্রমাগত চাবুক মারবেন, সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপাবেন, আর বিনিময়ে সে আপনাকে মুচকি হাসি দিবে, তা হয় না।

সোমবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০১৬

বাঙালির জীবনে ভাত খাওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আর নাই

১.
- চাচা, বুকে ব্যথাটা কখন থেকে?
- চাচীঃ রাইতের বেলা খাইতে বসছে, গরুর গোশ দিয়া ভাত খাইছে। হের পরে হের বুকত চিলিক মাইরা উঠছে।\

২.
- শ্বাসকষ্টটা কখন শুরু হইছিলো ভাই?
- ভাবীঃ হ্যারে বাজারে পাঠাইছিলাম। বাজার থাইকা আসি দুপুরে খাইতে বসছে। বুঝছেন ভাই! এর ঘন্টা দুই ঘন্টা পরে খানিক শ্বাসকষ্ট শুরু হইছে।


৩.
- চাচাজান, রোগী কখন থেকে অজ্ঞান?
- রুগী পুরাপুরি ভালা আছিলো ছার। কথা কইছে। রাইতে ভাত খাইছে। খাইয়া ঘুমাইছে। তারপরে হঠাৎ দেখি হাত পায়ে খিচ মারতাছে। অজ্ঞান হই গেছে।

 ঘটনা যাহাই হউক, বাঙালির সকল ইতিহাস শুরু হয় 'ভাত খাওয়া'র পর থেকে। যিশুর জন্মের বছর হতে যেমন খ্রিষ্টীয় সাল গণনা শুরু করা হয়, তেমনি রোগীর যেকোন সিম্পটম (রোগ-লক্ষণ) এর বয়স গণনা শুরু হয় 'ভাত খাওয়া'র মুহূর্ত থেকে। বাঙালির জীবনে ভাত খাওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আর নাই!!!!!!

বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

মিথোজীবিতা

১.
জন্মেছিলাম পরিপূর্ণ এক পরজীবি হয়ে।
তারপর শুরু হলো শৈবালের মত
স্বভোজী হবার নিরন্তর লড়াই।
জীবনচক্রে এখন লেগেছে ভাটির হাওয়া
এতোদিনে বুঝে গেছি
স্বভোজী হওয়াই সুখ নয়। স্বনির্ভরতা মানেই নয়
সাফল্যের চূড়া।
২.
এখন আমি দীক্ষা নিচ্ছি প্রতিদিন
মিথোজীবিতার পাঠ।

সোমবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৬

কয়েদী কথামালা

না বলতে বলতে-
সব কথা জমে যাচ্ছে বুকের ভেতর।
বেরোবার পথ নেই বলে ওখানেই ওরা
গাইছে, খেলছে, হাসছে, কাঁদছে... আর
বংশবৃদ্ধি করছে ক্রমাগত মিয়োসিস প্রক্রিয়ায়!

না বলতে বলতে-
বুকের ভেতর জমে যাচ্ছে কথার পাহাড়।
দিনকে দিন তেতে উঠছে কয়েদী কথামালা,
শীঘ্রই মুক্তি না দিলে
একদিন তারা সব বিদ্রোহী হবে!
একদিন তারা হবে
জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি ! কিশোর তরুণেরা সব 
হয়ে যাবে বোমাবাজ সন্ত্রাসী ।


পাঁজরের সব হাড় চূর্ণ করে
একদিন তারা হবে মুক্ত স্বাধীন;
একদিন তারা সব
পাখা মেলে উড়ে যাবে - শুন্য হাওয়ায়।

রবিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬

রিফিল

এই শীতে কোনো এক উদাসী বিকেলে
আমি আবার হেঁটে যাবো
সরষে ক্ষেতের আল ধরে দিগন্তের দিকে।
দখিন হাওয়ায় উড়িয়ে দেবো পুরনো রুমাল
যত দুঃখ যত অবসাদ
ছড়িয়ে দেবো আমি সরিষার ক্ষেতে,
হলুদ মাঠের ভেতর।
তারপর-
পড়ন্ত সূর্যের স্বর্ণাভ আভা
আর সরষে ফুলের হলুদাভ রঙ গায়ে মেখে
আবার রাঙ্গিয়ে নেবো-
জীর্ণ হৃদয়।