এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...

এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে

মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৭

এভাবেই সময় চলে যায়...

ছোটবেলায় আপনার অনেক বন্ধু ছিল। সবার সাথে নিশ্চয় আজ আর যোগাযোগ নেই! হয়তো সবার নামও মনে নেই। কাউকে কাউকে হয়তো এখন আর প্রথম দেখায় চিনতেও পারবেন না।
যার সাথে আপনার ধুন্দুমার মারামারি হয়েছিলো, স্যারের কাছে মিথ্যা নালিশ করে যে আপনাকে মার খাইয়েছিলো, তার কথা কি মনে আছে? আজ যদি রাস্তায় সেরকম কারো দেখা হয়, কী করবেন আপনি?
আমি জানি। জড়িয়ে ধরবেন। দু'জনে মিলে পাশের কোন একটা কফিশপে ঢুকে যাবেন। হয়তো মনের ভেতর বেজে উঠবে পুরনো গানের সুরঃ বন্ধু, কী খবর বল! কতদিন দেখা হয়নি!!
সেদিনের তিক্ত দিনগুলি আজ হয়ে উঠবে হাসির খোরাক।
কতদিন আগের কথা? দশ বছর? বিশ বছর? ১৫ বছর আগে এই দিনে আপনি ঠিক কী করেছিলেন, মনে আছে? কারো জন্য ভালোলাগা, কারো জন্য কিছু কষ্ট... কোন তিক্ত অভিজ্ঞতা... কিছু মনে পড়ছে না? নট শিওর?
হুম্মম্ম।
সময়। এভাবেই সময় চলে যায়। সময়ের সাথে সাথে আমরা নিজেকে হারিয়ে ফেলি। নিজেকেই ভুলে যাই।
বন্ধুকে ভুলে যাই। শত্রুকে ভুলে যাই। পেছনের একেকটা দিন হয়ে থাকে শুধু স্বপ্নের মত কিছু সাদাকালো স্মৃতি।
"আজকে"র বিষয় নিয়ে আমরা কতই না চিন্তিত থাকি। সামান্য বিষয় নিয়ে মানুষে মানুষে কত শত্রুতা, কত রেষারেষি। অথচ, মৃত্যুর পর হয়তো লক্ষ বছর পরে যখন ঘুম থেকে উঠবো, তখন পৃথিবীর এই পুরো জীবনটাকে মনে হবে একটা ক্ষণিকের স্বপ্ন।
এখন যেমন দশ বছর আগের দিনগুলোকে মনে হয়।

শনিবার, ১২ আগস্ট, ২০১৭

টাইমিং টা ইম্পর্ট্যান্ট...

বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেছে ৪০ লাখ সৌদি তরুণী। তারা এখনো রয়ে গেছে অবিবাহিত। খবর সৌদি গেজেটের।
ধারণা করি, তরুণদের সংখ্যাটাও সেখানে বোধহয় কম হবে না। তার মানে, বিয়ে সংক্রান্ত সমস্যাটা আসলে মুসলিম বিশ্বের একটা কমন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সৌদি আরবের মোট জনসংখ্যা মাত্র তিন কোটির কিছু বেশি। তার মধ্যে যদি নারীর সংখ্যা অর্ধেক ধরি, তাহলে দেড় কোটি হয়। এর মধ্যে আছে শিশু, আছেন মধ্যবয়সী থেকে বয়স্কা নারীরা। অর্থাৎ বিয়ের বয়সী তরুণীর সংখ্যা যদি ৬০ লাখ হয়, তার মধ্যে ৪০ লাখেরই বয়স ত্রিশের উপরে হয়ে গেছে। অথচ তাদের বিয়ে হয়নি।
অবস্থাটা কি স্বাভাবিক মনে হয়? নাহ, এটাকে স্বাভাবিক মনে করার কোন সুযোগ নেই।
কেন এই অবস্থা? অতিরিক্ত মোহরানা দাবী, যোগ্য পাত্র পাওয়ার পরও আরো ভালোর জন্য অপেক্ষা, এসবই কারণ বলে আমার মনে হয়।
আজ মনে পড়ে হযরত ওমরের সময়কার কথা। যখন কিছু যুবক হযরত ওমরের কাছে এসে অভিযোগ করেছিলেন যে, নারীরা অত্যধিক মোহরানা দাবি করার কারণে বিয়ে কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ওমর (রাঃ) অবস্থার গুরুত্ব উপলব্ধি করে জুমার খুতবায় বক্তব্য দিয়েছিলেন। তিনি মোহরানার পরিমাণ সর্বোচ্চ চারশ দিরহামে সীমাবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এতে নারীর অধিকার ক্ষুন্ন হয় বলে পরে তিনি তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছিলেন।
মোহরানা নারীর প্রাপ্য অধিকার। কিন্তু ব্যাপারটা হলো- কোন ন্যায্য অধিকারেরও যদি অপব্যবহার করা হয়, তাহলে তা ক্ষতির কারণ হয়। সৌদি আরবে সেটাই হয়েছে।
বাংলাদেশে কী অবস্থা? এনিয়ে কোন জরিপ হয়েছে কিনা আমার জানা নাই। তবে ধারণা করি, বাংলাদেশের অবস্থাও সুবিধাজনক না।
এর জন্য প্রধানত দায়ী অভিভাবকরা। সহজ একটা উদাহরণ দিচ্ছি। সুন্দরী না হওয়াটা বাংলাদেশের অনেক মেয়ের বিয়ের ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা। কিন্তু খেয়াল করবেন, ৩০ বছর বয়সে যে মেয়েকে দেখতে খুব একটা সুন্দর মনে হয় না, ১৫-২০ বছর বয়সে সেই মেয়েকেও দেখে অনেকেরই পছন্দ হবে। তার মানে, টাইমিং টা ইম্পর্ট্যান্ট। এইটা গার্জিয়ানদের খেয়াল রাখতে হবে।
আবার যারা একটু বেশি সুন্দরী, তাদের গার্জিয়ানদের পা মাটিতে থাকে না। তারা সব চান। যোগ্য পাত্র পেলেও তারা নানান ছুতো নাতায় দেরি করেন। 'আরো ভালো' পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন।
বাংলাদেশের অবস্থা সম্ভবত এখনো অতটা খারাপ হয়নি। কিন্তু হচ্ছে। আয়্যাম নট শিওর, তবে কয়েক বছর পরে যদি বাংলাদেশে এই বিষয়ে জরিপ করা হয়, খবরটা হয়তো এরকম বেরোবেঃ 'বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেছে ১ কোটি বাংলাদেশি তরুণীর'।

বুধবার, ৯ আগস্ট, ২০১৭

ছার, রুগীরে কলা খাওয়ান যাইবো নি?

ছার, রুগীরে কলা খাওয়ান যাইবো নি? আপেল? কমলা?
হাসপাতালে এলেই রোগীদের কেন যেন আপেল কমলা খাওয়ার হিড়িক পড়ে যায়। যারা বছরের কোন একটা দিনও আপেল কমলা খেয়েছে কিনা সন্দেহ, তারাও হঠাৎ করে আপেল কমলার নিয়মিত খাদক হয়ে যায়।
GIT প্যাথলজি পড়ানোর সময় জিল্লুর রহমান স্যার সবার আগে বোর্ডে একটা সিলিন্ডার আঁকতেন। সিলিন্ডারের উপরে এঁকে দিতেন মুখ, আর নিচে দিতেন .... 
বলতেন, এইটাই হলো মানুষ। সিলিন্ডারের একপাশ দিয়ে খায়, আর অন্যপাশ দিয়ে বের করে...
তারপর স্যার সিলিন্ডারের দুইপাশে টান দিয়ে হাত পা বানিয়ে দিতেন। মানুষের খাওয়ার জন্যই নাকি এই হাত পা গুলো দরকার!!
হাসপাতালে ডিউটির সময় স্যারের কথা প্রায়ই জাজ্জ্বল্যমান সত্য হয়ে ধরা দেয়। একজন ডাক্তারকে প্রতিদিন যতবার রোগীর খাদ্য গ্রহণ, বর্জন ও ত্যাগ বিষয়ক বয়ান দিতে হয়, মূল রোগ সম্পর্কে সম্ভবত অতবার কথা বলতে হয়না। রোগ নিয়ে কেউ চিন্তিত নয়, সবাই চিন্তিত থাকে রোগীর খাওয়া আর ত্যাগ নিয়ে।
মণিষীরা বলে গেছেনঃ ভোগে নয়, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ। আসলে কিসে প্রকৃত সুখ? ভোগে, নাকি ত্যাগে? রোগীর এটেন্ড্যান্টদের খাদ্য বিষয়ক উৎকণ্ঠা দেখে এবিষয়ে আমি প্রায়শই ধন্দে পড়ে যাই।

মঙ্গলবার, ৮ আগস্ট, ২০১৭

আমি কিন্তু একটু অন্যরকম'!!

মানুষের ভেতর কিছু অদ্ভুত রকম বৈপরীত্য কাজ করে। সে চেষ্টা করে অন্যদের চেয়ে একটু আলাদা, একটু অন্যরকম হবার। যেমন, অনেকেই বলেন- 'ভাই, আমি কিন্তু একটু অন্যরকম'!!
আবার একই মানুষ যখন আরেকজনকে খুঁজে পায়, যার সাথে তার আচরণে, কথায়, বা চিন্তায় অনেক মিল- তখন সে খুশি হয়। বলেঃ আরে আরে! তুমি তো দেখি একেবারে আমার মতন!!! আর নিজের মত কাউকে পেলে মানুষ যেন তাকে অজান্তেই ভালোবেসে ফেলে।
বেশ অদ্ভুত মানুষের চিন্তাধারা। অদ্ভুত 'মানুষ' নামক এই প্রাণীটার মন।

বৃহস্পতিবার, ৩ আগস্ট, ২০১৭

মানুষ অকৃতজ্ঞ প্রাণী

ধরুন আপনি একজনের খুব উপকার করেন। যখনই সে কোন সমস্যায় পড়ে, আপনি জানতে পারলে সাধ্যমত সহযোগিতা করেন।
তারপর একদিন, কোন একটা সমস্যায় আপনি তাকে কোনভাবে হেল্প করতে পারলেন না।
ব্যস, আপনার এতদিনের সবকিছু এক মুহূর্তেই শুন্য হয়ে গেলো। হয়তো আপনাকে এও শুনতে হবে, 'তুমি তো কখনোই আমার কোন উপকার করনি!!!'
আমরা নিজেরাও কখনো কখনো হয়তো এরকম করে থাকি। মানুষ অকৃতজ্ঞ প্রাণী। একবার আমাদের চাওয়ামত না পেলে আমরা আগের সব উপকার নিমেষেই ভুলে যাই।
উপকারীর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকাটা খুব খুব জরুরি। এতে করে উপকারী মানুষটা আরো বেশি উপকার করার উৎসাহ পায়। পৃথিবীতে এমনিতেই উপকারী মানুষের সংখ্যা বেশি নয়। আর আমাদের অকৃতজ্ঞতা প্রতিদিন তাদের সংখ্যা আরো কমিয়ে দেয়।
২.
পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এরকম হয়ে থাকে। হয়তো আপনার সাথে আমার দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক। তারপর আমার কোন একটা কথায় হয়তো আপনি কষ্ট পেলেন। ব্যস, আমার সাথে আপনার আগেকার সবকিছু মূল্যহীন হয়ে গেলো!!!
পরদিন থেকে আপনি আর আমি সম্পূর্ণ আলাদা!!!
এরকম হওয়াটা মোটেও উচিত নয়। মানুষের প্রতিটা কাজকে আমি আলাদাভাবে বিচার করার পক্ষে। আজ যদি আপনি আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে থাকেন, তার জন্য আজ হয়তো আমি অনেক কষ্ট পেতে পারি। কিন্তু তাই বলে আমার সাথে আপনার অতীতের অসংখ্য ভালো ব্যবহার, অসংখ্য উপকার ভুলে যেতে পারি না।
কোন একটা কাজ একজন মানুষের সমগ্র জীবনকে সংজ্ঞায়িত করতে পারে না। মানুষের জীবন কখনোই এতটা ঠুণকো নয়।

নৈঃশব্দের গান

রাত্রির গভীরতা আমাকে শোনায় নিয়ত
নৈঃশব্দের গান।
কন্ঠের ব্যবহার নেই, বাদ্যযন্ত্র নেই, তবু;
কী এক নীরব সুরের মূর্চ্ছণায় একের পর এক-
বেহুঁশ হতে থাকে পৃথিবীর মানব মানবীরা।
আর
শেষ রাগটুকু শুনবার আশায়,
আমি শুধু একা একা- নিপাট অন্ধকারের ভেতর,
ব-হু কষ্টে চোখ খুলে বসে থাকি।

বুধবার, ২ আগস্ট, ২০১৭

খরা

মনে হয়, পাষাণ হয়ে গ্যাছে আমার হৃদয়!
বোধহয়, নিদারুণ খরা লেগে আছে,
দু'চোখের ল্যাক্রিমাল গ্ল্যান্ডে।
এই ঘোর বর্ষার বর্ষণমূখর আকাশের মত 
আমারও মাঝে মাঝে খুব খুব কাঁদতে ইচ্ছে হয়।
মন চায়-
আমারও ভেতর তিলে তিলে গড়েছে যে নগর
প্লাবিত হোক তার সকল গলিপথ।
অশ্রুর বন্যায়। পিচঢালা রাজপথ হোক সব নদী,
ঢাকা ও চট্টগ্রামের মত নৌকা চলুক-
জলাবদ্ধ হৃদয়ের পথে ঘাটে।
আফসোস!
পাষাণ হয়ে আছে আমার হৃদয়।
কোন বেদনাই এইখানে আজ আর হয়নাকো মেঘ!
জানিনা কাটবে কবে এই খরা,
জাগবে এ হৃদয়ে ফের-
জলোচ্ছাসের মত ভীষণ আবেগ!

মঙ্গলবার, ১ আগস্ট, ২০১৭

কবিতা কোথায় হারালে?

বহুদিন কবিতার দেখা নাই।
একসাথে চলতে চলতেই
হঠাৎ সে যে কোথায় হারিয়ে গেলো,
নিদারুণ ব্যস্ততায়-
খোঁজ রাখতে পারিনি একদম।
এখন কি তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে? এই রাত্রিতে?
এই ঝড়ো হাওয়ায়?
বিজলি ঝলকের ক্ষণিক আলোকে
মিলবে কি দেখা তার?
তোমরা কেউ কি তাকে দেখেছো কোথাও?
কেউ কি জানাবে তাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ আমারঃ
পুরনো দিনের কথা ভেবে- যেন সে ফিরে আসে-
পুরনো আবাসে!
উপেক্ষায় অবহেলায়,
তিলেতিলে জমে ওঠা সকল অভিমান তার
টুকরো টুকরো করে ভাঙবো বলে
আমি আজ-
কালিভরা কলম হাতে বসে আছি।

বৃহস্পতিবার, ২৭ জুলাই, ২০১৭

একক নাকি যৌথ পরিবার?

একক পরিবার নাকি যৌথ পরিবার? এই নিয়ে বিতর্ক ইদানিং বেশ জমে উঠেছে সামাজিক পরিমন্ডলে। কেউ কট্টরভাবে যৌথ পরিবারের পক্ষে, কেউ একক পরিবারের। নব্য নারীবাদিরা নতুন করে এই আলোচনার সূত্রপাত ঘটিয়েছেন। তারা বেশিরভাগই যৌথ পরিবারের বিরুদ্ধে প্রান্তিক অবস্থান নিয়েছেন। আবার পুরুষরা অনেকেই কট্টরভাবে যৌথ পরিবারের পক্ষ নিয়েছেন।
আমার অবস্থান মোটাদাগে পৃথক পরিবারের পক্ষে।
যৌথ পরিবারের বউ মানে যদি হয় পরিবারের 'সবার সেবক', তাহলে আমি এর বিরোধী। আবার একক পরিবার মানেই যদি হয় বাবা-মা, ভাই-বোনদের ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন থাকা, সেটাকেও আমি সমর্থন করতে পারি না।
মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হলো, মানুষ দিতে চায় কম, নিতে চায় বেশি। যৌথ পরিবারে এই সমস্যাটা বেশি প্রকট হয়ে দাঁড়ায়। কে ঠিকঠাক কাজ করে না, কে কতটুকু দেয়, কে বেশি নেয়- একটা যৌথ পরিবারে দিনশেষে সম্ভবত প্রত্যেকের ঘরে এগুলোই হয়ে ওঠে কমন আলোচনার বিষয়। গীবত আর চোগলখুরির চর্চাটা শুরু হয় সম্ভবত এখান থেকেই।
একটা পরিবারে টুকটাক অনেক কাজ থাকে। একটা বড় যৌথ পরিবারে সেই কাজের পরিমাণ হয় অনেক অনেক বেশি। কিন্তু সেখানে সত্যিকারার্থে কোন কর্মবন্টণ থাকে না। ফলে, অনেকে মিলে করলেও কাজের 'শেষ' হয় না। দিনশেষে তাই সবার মনে থাকে অতৃপ্তি, অন্যের প্রতি অভিযোগ, আক্ষেপ।
সবচেয়ে বেশি চাপ সহ্য করতে হয় বাড়ির 'বড় বউ'কে। তার নিজের জীবন বলতে কিছু থাকেনা।
সকাল বিকাল চা-নাস্তা বানানো, তিন বেলা ভাত-তরকারি রান্না, কাপড়-চোপড় ধোয়া, ইস্ত্রি করা, ঘরদোর সামলে রাখা- সহজ কাজ নয়। একজন গৃহিনী বউকে সারাদিনে যতবার এঘর ওঘর করতে হয়, হিসাব করলে তাতে তার প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার হাঁটা হয়ে যায়। কাউকে কাউকে সারাদিনে যে পরিমাণ রান্নাবান্না করতে হয়, সেই পরিমাণ রান্না করে হয়তো একটা বড়সড় রেস্টুরেন্ট চালানো যাবে। যে পরিমান কাপড় ধুতে হয় বা ইস্ত্রি করতে হয়, সেই পরিমাণ কাজ করে বোধহয় বাণিজ্যিকভাবে একটা লন্ড্রি দোকানই চালানো সম্ভব।
যৌথ পরিবারে কারো নিজস্ব সময় বলে কিছু থাকেনা। একটু বিশ্রাম, নিজের বাচ্চাটাকে একটু বেশি সময় দেয়া, স্বামীর সাথে একটু অতিরিক্ত গল্পগুজব- কোনোটাই নিশ্চিন্তে করা যায় না। মাথায় অনেক কাজের চাপ, আবার যেকোন সময় যেকেউ ডাক দিতে পারে।
'মা এক কাপ চা দাও না'। 'আমার ঘড়িটা কোথায়?' 'ভাবী এক গ্লাস পানি দাও।' 'বউমা একটু রান্নাঘরে যাও।' যেকোন সময় কানে আসতে পারে যেকোন আদেশ, কিংবা অনুরোধ।
ক্লাস নাইনে থাকতে প্রথম যেদিন আমি নিজে নিজে আমার সব কাপড় ধুয়েছিলাম, আমার কোমর ব্যাথা হয়ে গিয়েছিল। আমার মা এবং বোনেরা কত কষ্ট করে সেটা বুঝতে আর বাকি ছিলনা। এরপর থেকে নিজেই কাপড় ধুই।
গোসল করতে গেলেই আমি দুএকটা কাপড় ভিজিয়ে রাখি। তবুও সপ্তাহ শেষে একগাদা ময়লা কাপড় জমে থাকে। একজনের কাপড় নিয়েই যদি এই হয় অবস্থা, একটা পুরো পরিবারের কাপড় সামলানো কতটা কঠিন, ভাবা যায়?
প্রাপ্তবয়স্ক এবং বিবাহিত ছেলে মেয়েরা তাই পৃথক পরিবার চালানোই ভালো। তবে পৃথক পরিবার মানে বাবা-মা বিহীন পরিবার নয়। বাবা-মা'র দায়িত্ব থেকে মুক্তি নয়। শ্বশুর শ্বাশুড়ির দায়িত্ব থেকে মুক্তি নয়। ভাইবোনদের দায়িত্ব থেকে মুক্তি নয়। ভাই বোনদের মধ্যে যে বেশি স্বচ্ছল, তারই উচিত বাবা-মার দায়িত্ব নেয়া। তারই উচিত বেশি বেশি বাকি সবার খবর নেয়া। সবার বোঝা উচিত, বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেয়াটা বিরাট সুযোগ, এটা কোন বার্ডেন নয়। বাপ-মা কিংবা শ্বশুর-শ্বাশুড়ির সেবা করার জন্য ছেলেমেয়ে বউ-জামাইদের রীতিমত প্রতিযোগিতা করা উচিত।
অনেক ক্ষেত্রে যৌথ পরিবারগুলো শেষ পর্যন্ত ভেঙ্গে যায় ঝগড়াঝাটির মাধ্যমে। এতে করে জীবনের বাকি সময়টাও আর স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকে না। এমন তিক্ততা সৃষ্টি হবার আগেই পরিবার পৃথক হওয়া ভালো। এতে করে বাকি জীবনেও সম্পর্কগুলো ভালো থাকে। তিক্ততা নিয়ে, অসন্তুষ্টি নিয়ে যৌথ পরিবারে থাকার চেয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে পৃথক পরিবারে থাকাই ভালো। খারাপ সম্পর্ক নিয়ে কাছে থাকার চাইতে ভালো সম্পর্ক নিয়ে দূরে থাকা ভালো। 

শুক্রবার, ১৪ জুলাই, ২০১৭

ধার্মিকতা কাকে বলে?

সহযোগী অধ্যাপক ফজল সাহেব তার একটা ফাইল নিয়ে বিপদে আছেন। তার কলেজে নতুন জয়েন করা কয়েকজন শিক্ষকের বিল সংক্রান্ত ফাইল শিক্ষা অফিসে আটকে আছে। বহুদিন ধরে চেষ্টা তদবির করেও কুলকিনারা করতে পারছেন না। এর আগে অন্যদের পাঠিয়েছিলেন, কাজ হয়নি। এবার তাই নিজেই এসেছেন।
ভেবেছিলেন ঘুষ ছাড়াই হয়তো কাজটা হয়ে যাবে, কিন্তু এখন আর সেরকম ভাবতে পারছেন না। তাই নতুন শিক্ষকদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে তিনি এসেছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে।
চেয়ারে যিনি বসে আছেন তাকে বেশ পরহেজগার মনে হচ্ছে। নাম স.ম. তরফদার। এই লোক ঘুষ খায়? বিশ্বাস হচ্ছেনা ফজল সাহেবের।
-- ভাই সাহেব, আমার কলেজের ফাইলটা যদি একটু দেখতেন। অনেক মাস হয়ে গেল, ছেলেরা বেতন পাচ্ছে না। পরিবার নিয়ে বেশ কষ্টে আছে আরকি। যদি একটু তাড়াতাড়ি করা যেত।
-- দেখেন ফজল সাহেব, আপনার কাজটা জটিল। আমি কাজ করছি। তবে আরো সময় লাগবে। বুঝলেন ভাই, সময় লাগবে।
বেশ কিছুক্ষণ রিকুয়েস্ট করে ফজল সাহেব বুঝলেন, এ চিড়িয়া খালি হাতে কথা বলবে না। তিনি হাতে রাখা প্যাকেটটা বের করলেন।
-- ভাই, আপনার জন্য সামান্য হাদিয়া ছিল। বোঝেনই তো, ছেলেরা কষ্টে আছে। একটু দেখেন ফাইলটা তাড়াতাড়ি কিছু করা যায় কিনা...
চোখ মুখ কুঁচকে তাকালেন তরফদার সাহেব। যেন তাকে ঘুষ সাধাটা অপরাধ হয়ে গেছে। ফজল সাহেবও একটু বিব্রত হলেন। নাহ, একজন ভালো মানুষকে সন্দেহ করা ঠিক হয় নাই।
তিনি প্যাকেটটা আবার পকেটে পুরে উঠে দাড়ালেন। ঠিক এসময় তরফদার সাহেবের ত্রস্ত কন্ঠ কানে এলোঃ ভাই সাহেব, রমজান মাস না! বোঝেনই তো, রোজা আছি। চিন্তা করবেন না, আমি কাজ করে দেবো! আপনি ঐটা নিয়ে ইফতারের পরে যোগাযোগ করেন কেমন?
২.
আব্দুর রহমান সাহেব সৌদি আরবে থাকেন বিগত ১৫ বছর ধরে। এবার মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে দেশে এসেছেন। ড্রইং রুমে বসে নতুন বেয়াই এর সাথে গল্প করছিলেন।
-- বুঝলেন বেয়াই, ১৫ বছরে ৮ বার হজ্জ্ব করছি। আল্লাহর অশেষ রহমত বেয়াই। এরকম সৌভাগ্য কয়জনের হয়?
-- বলেন কী বেয়াই? নিয়ম অনুযায়ী তো এই সময়ে সর্বোচ্চ তিনবার হজ্জ্ব করতে পারতেন, নাকি!! ৮ বার কেমনে করলেন?
-- আরে বেয়াই, এইডা কোন ব্যাপার? তিনবার নিয়ম অনুযায়ী করছি, আর বাকি ৫ বার চুরি কইরা করছি আরকি বুঝলেন!!
৩.
তাবলিগে এক চিল্লা লাগিয়ে আজই বাসায় ফিরেছেন কবির সাহেব। সমস্যাটা হিলো, তিনি অফিস থেকে ছুটি নিয়েছিলেন মাত্র ৭ দিনের। এখন আরো ত্রিশ দিনের ছুটি দরকার। কী করা যায়?
তিনি গেলেন ডাক্তারের চেম্বারে। অসুস্থতার মিথ্যা সার্টিফিকেট দেয়ার জন্য ডাক্তারকে পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন। সার্টিফিকেট দিতে অস্বীকৃতি জানালে কিছুটা ক্ষুব্ধ কন্ঠে তিনি ডাক্তারকে বললেন- 'ডক্টর, আমি তো ভালো কাজেই সময় দিয়েছি তাই না? আপনি দিয়ে দেন, দিয়ে দেন, কোন অসুবিধা নাই। আপনার কোন পাপ হবে না ডক্টর। আপনিও সওয়াবের ভাগীদার হবেন!!!'
***
সাধারণভাবে অধার্মিকদের তুলনায় ধার্মিকরা ভালো মানুষ। সমস্যাটা হলো- কেউ কেউ ধর্ম পালন করছেন বটে, কিন্তু ধর্মের মূল স্পিরিট ধারণ করতে পারছেন না। ধর্মের মূল কথা তাদের ভেতরে প্রবেশ করছে না। ধর্ম, বিশেষ করে ইসলাম যে কেবল কিছু রীতি প্রথার সমষ্টি নয়, তা তারা উপলব্ধি করেন না।
ধর্ম মানুষের ভেতর যে সততা, মানবিকতা, ভালো ব্যবহার, মানুষকে না ঠকানো, মানুষের ক্ষতি না করা, মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর প্রতি দয়ার যে গুণ সৃষ্টির তাগিদ দেয়- তা অনেক ধার্মিকই ধারণ করতে পারছেন না। 

রবিবার, ৯ জুলাই, ২০১৭

সবকিছুই আল্লাহর, সবাইকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে

ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। এই একটা বাক্যই একজন মানুষের জীবনকে অন্যরকম করে দিতে পারে। মানুষ মারা গেলে, কোন বিপদ হলে অথবা কিছু হারালে আমরা মুসলিমরা পড়ি- ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। যার অর্থ হলোঃ নিশ্চয় সবকিছুই আল্লাহর আর তার কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে। মানুষ মারা গেলে এটা আমাদের সামনে একেবারে চাক্ষুষ এবং অকাট্য প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়, নিশ্চয় তার কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে।
কোরআন শরীফে সুরা বাকারার ১৫৫-৫৬ নম্বর আয়াতে এই অংশটুকু আছে। যেখানে বলা হয়েছে- পৃথিবীতে মানুষকে ভয়, ক্ষুধা, দারিদ্র‍্য, জীবন ও সম্পদের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করা হবে। মানুষের ভেতর তাদেরকে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে- যারা এসময় ধৈর্যধারণ করবে, আর স্মরণ করবে- নিশ্চয়ই সবকিছু আল্লাহর এবং তার কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে।
কোন কিছু হারালে বা কোন ক্ষতি হলে আমাদের খারাপ লাগে। আমাদের কষ্ট হয়। এটা স্বাভাবিক মানবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে হতাশায় ভোগার কোন সুযোগ নেই। সেটা স্বাভাবিক নয়। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন অর্থ কী? নিশ্চয়ই আমাদের আল্লাহর কাছেই ফিরে যেতে হবে। তো, যেখানে আমি নিজেই এই পৃথিবীতে থাকবো না, আমার নিজের জীবনই যেখানে অনিশ্চিত, আমি নিজেই যেখানে যেকোন মুহূর্তে নাই হয়ে যাবো, সেখানে এই দুনিয়ার এইসব ক্ষতি নিয়ে ভেবে কী হবে?
ধরা যাক, আমার ১ কোটি টাকা ক্ষতি হয়ে গেছে। আচ্ছা, আজ যদি আমি মারা যাই, তাহলে এই ক্ষতির কী মূল্য থাকবে আমার কাছে? আমার যদি আরো হাজার কোটি টাকা থাকে তারই বা কী মূল্য থাকবে?
এটাই হলো 'ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন' এর স্পিরিট।
২.
গত জানুয়ারিতে সেন্টমার্টিনে গিয়েছিলাম। সকাল বেলা বাইসাইকেল নিয়ে দ্বীপের পশ্চিম তীর ধরে ছেড়া দ্বীপে গেলাম। সাধারণত ঐ পথে কেউ ছেড়া দ্বীপ যায় না। অনেক এবড়ো থেবড়ো, অনেক প্রবাল, পাথর আর ঝোঁপ ঝাড়। অনেকটা নির্জনও। অনেকটা পথ সাইকেল হাতে নিয়ে হাঁটতে হয়।
এই এডভেঞ্চারে কখন যে আমার মানিব্যাগ কোথায় পড়ে গেছে বুঝতে পারিনি। ফিরে এসে যখন শিপে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছি, তখন বুঝলাম মানিব্যাগ নেই। ৭-৮ হাজার টাকা, কয়েকটা আইডি কার্ড, এটিএম কার্ড, চাবি, কিছু জরুরি কাগজ- অনেক কিছু ছিল। যেপথে হারিয়েছি, ফিরে পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই। তৎক্ষনাৎ স্মরণ করলামঃ ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন। খুব একটা মন খারাপ করলাম না।
জাহাজে ওঠার সময় আমাকে আশ্চর্য করে দিয়ে এক বন্ধু মানিব্যাগটা নিয়ে এলো, ওটা নাকি সে কুডিয়ে পেয়েছে। ওরা কয়েকজন ছেড়াদ্বীপ যায়নি, এমনিই হাওয়া খেতে বেরিয়েছিল, বালুর ওপর মানিব্যাগটা পড়ে থাকতে দেখে নিয়ে এসেছে। আমি খুব খুব খুবই আশ্চর্য হলাম। আল্লাহ আমাকে খুব ছোট একটা পরীক্ষা করলেন!! আলহামদুলিল্লাহ্‌ আমি ধৈর্যের পরীক্ষায় পাশ করলাম, আর তারপর আল্লাহ আমাকে আমার জিনিস পুরোটাই ফিরিয়ে দিলেন!!! সুবহানাল্লাহ।
মার্চ মাসের এক রাতে এক বন্ধুকে সি-অফ করতে কমলাপুর স্টেশনে যাচ্ছিলাম রিকশায়। মোটরসাইকেল আরোহী ছিনতাইকারিরা টান মেরে ব্যাগটা নিয়ে গেলো। ল্যাপটপ ছিলোনা, বই, স্টেথো, চাঁদর, হস্পিটালের ড্রেস, কিছু কাপড় এগুলো ছিল। স্মরণ করলামঃ ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন। যদি আমার রিযিকে থাকে, তাহলে ওটা ঠিকই ফিরে আসবে। আমার তো আরো বেশি ক্ষতি হতে পারতো, রিকশা থেকে পড়ে আহত হতেও পারতাম। আল্লাহর শোকর করলাম, মন খারাপ করলাম না।
ঘন্টা দুয়েক পরের কথা। তখনো কমলাপুর স্টেশনেই আছি। ১১ টার দিকে একটা ফোন পেলাম। মালিবাগ থেকে একজন লোক ফোন করে জানালেন, আমার ব্যাগটা কেউ একজন ফেলে রেখে গেছে। ব্যাগে থাকা আইডি কার্ডে নম্বর পেয়ে উনি ফোন করেছেন। অত রাতে আর গেলাম না। উনার কাছেই রাখতে বললাম।
সপ্তাহখানেক পর উনার বন্ধু মালিবাগের ট্রাফিক সার্জেন্ট এসে সবকিছুসহ ব্যাগটা আমাকে দিয়ে গেলেন।
পরপর দুটো ঘটনায় আমার বিশ্বাস অনেক পোক্ত হলো। আমি অন্তরে তৃপ্তি পেলাম, বিশ্বাসের তৃপ্তি। এরপরে আরো অনেক বড় বড় (আপাত) ক্ষতি হয়েছে। সাময়িক খারাপ লেগেছে, তারপর স্মরণ করেছি- ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আমরা আল্লাহর কাছ থেকে এসেছি, আর তার কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে। যেটা আমার, সেটা যেকোনভাবে আমারই থাকবে। আর না থাকলেও কোন ব্যাপার না। সবকিছুই আল্লাহর, আমাদের সবাইকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে। 

বৃহস্পতিবার, ৬ জুলাই, ২০১৭

Everybody will be paid back by his own Coin.....

গয়াল চন্দ্র এই শহরের একজন দুধবিক্রেতা। তিনি চিকন বুদ্ধির বাঙালি, তাই ১০ লিটার দুধে ৫ লিটার পানি মিশিয়ে ১৫ লিটার করলেন। সামান্য বুদ্ধিতে পাক্কা পাঁ-চ লিটার লাভ!! খুশিতে চোখ চকচক করে ওঠে তার।
দুধ বিক্রির টাকা পকেটে নিয়ে তিনি চাল কিনতে যান সাব মুদির দোকানে। সাবু মুদি তাকে 'অতি উত্তম চাউল', 'এরকম চাউল কোথাও পাইবেন না' ইত্যাদি বলে শেষে পাথর মেশানো চাল বিক্রি করে। ওজনেও আধা কেজি কম দেয়।
'কত লাভ করে ফেললাম' ভেবে বেজায় খুশি সাবু মুদি লাভের টাকা নিয়ে বাজারে যায় মাছ কিনতে। মাছ বিক্রেতা সুরুজ মিয়া তাকে ফরমালিন মেশানো পচা মাছ ধরিয়ে দেয় কেনা দামের দ্বিগুন মূল্যে। তার লাভ করতে হবে না?
কিছুক্ষণ পরে সুরুজ মিয়ার কাছে খবর আসে, তার ছেলেটা এক্সিডেন্ট করেছে। দ্রুত সে তার ছেলেকে হাসপাতালে নেয়। হাসপাতালের একজন ধান্দাবাজ দালাল 'ভালো চিকিৎসা' র ব্যবস্থা করে দেবার কথা বলে ভংচং বুঝিয়ে সুরুজ মিয়ার কাছ থেকে ভালো পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেয়।
সেই ধান্দাবাজ বাড়ি ফেরার পথে পড়ে ছিনতাইকারীর হাতে। ছিনতাইকারী তার পেটে ছুরি মেরে সব টাকাপয়সা ছিনিয়ে নেয়।
পালিয়ে যাবার সময় ছিনতাইকারী ধরা পড়ে পুলিশের হাতে। পেদানি দিয়ে সব টাকা নিয়ে নেয় পুলশ। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা বা ভিক্টিমের কাছে ফেরত দেয়া কোনটাই করেন না পুলিশ অফিসার।
সেই পুলিশের ছেলে আবার হয়ে পড়ে ইয়াবা আসক্ত.. মাদকের পেছনে টাকা ঢেলে প্রতিনিয়ত সে খালি করে দেয় বাবার পকেট...
***
যারাই অবৈধ পথে উপার্জন করে, তারাই মনে করে যে সে 'বিরাট লাভ' করে ফেলেছে। কিন্তু আসলে তা নয়। সে একজনকে ঠকাচ্ছে, আবার তাকে ঠকাচ্ছে অন্যকেউ। যেহেতু সমাজের প্রত্যেকেই একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল, আল্টিমেটলি সবাই চক্রাকারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাইরে থেকে হয়তো মনে হয় অসৎ লোকগুলোই সফল, তারাই সুখে আছে। আসলে তা নয়। তারা নিজেরা হয়তো মনে করে এইভাবে তারা খুব ভালো থাকবে, আসলে তাও হয় না। অসৎ পথে উপার্জন করে শেষ পর্যন্ত কেউ পার পায় না। পরকাল তো পরের কথা, দুনিয়াতেই তারা পেয়ে যায় ফিরতি হিসাব।
প্রকৃতির নিয়ম হলো, এখানে কাউকেই ছেড়ে দেয়া হয় না। আজ কিংবা কাল, Everybody will be paid back by his own Coin.....

শুক্রবার, ৩০ জুন, ২০১৭

'সম্মানজনক পেশা' বলে কিছু আছে?

ডাক্তারি একটা 'সম্মানজনক' পেশা, অতএব ডাক্তার হইতে হইবে। শিক্ষকতা একটি 'সম্মানজনক' পেশা, অতএব শিক্ষক হইতে হইবে। ইঞ্জিনিয়ার, লইয়ার, ব্যাংকার, মিলিটারি কিংবা পুলিশ... যেকোনভাবে হোক, একজন 'অফিসার' হতেই হবে। 'সম্মানজনক' পেশায় নিয়োজিত থাকতে হবে।
এইযে এভাবে পেশার মধ্যে সম্মান অসম্মানের একটা ধারণা ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে, সমাজের মধ্যকার বিভেদ, ঘৃণা, বিদ্বেষ ও শ্রেণী বৈষম্যের মূলে এইটা হলো একটা প্রধান কারণ। কেউ নিজেকে সম্মানজনক পেশার লোক ভেবে অহংকারী হয়, অন্যদের তুচ্ছজ্ঞান করে, আর কেউবা নিজের পেশাকে হীন ভেবে হীনম্মন্যতায় ভোগে। মনে আছে, একবার ক্লাসে একজন শিক্ষিকা 'তোমার বাবা কী করে' জিজ্ঞেস করায় আমার বন্ধু মাথা নিচু করে জবাব দিয়েছিলো- তিনি মুহুরি। উকিলের সহযোগী। তার কাছে বাবার পেশাটা হয়তো 'সম্মানজনক' ছিল না।
আসলে কি 'সম্মানজনক পেশা' বলে কিছু আছে? আমি মনে করি, পেশার সাথে সম্মানের কিছু নাই। পেশার কারণে কেউ সম্মানিত বা অসম্মানিত হতে পারে না। সম্মান আসে জ্ঞান, চরিত্র আর সততা থেকে।
আপনি একজন পুলিশ অফিসার, বা কাস্টমস অফিসার, বা যেকোন অফিসের একজন 'অফিসার'। আপনি দু'হাতে ঘুষ খান। মানুষ আপনাকে সম্মান করবে? নাহ। মানুষ হয়তো আপনাকে সামনাসামনি সমীহ করতে পারে- সেটা ভয় থেকে। ডাকাতের সামনে যদি কেউ হাতজোড় করে দাঁড়ায়, কেউ কি বলবে যে- সে ডাকাতকে সম্মান করছে? ব্যাপারটা সেরকম।
মানুষ আপনাকে ভয় করতে পারে, কিন্তু সম্মান করবে না।
আপনি একজন শিক্ষক। কিন্তু আপনার জ্ঞান জোড়াতালি মার্কা, আপনি ভালো পড়াতে পারেন না, কিংবা পড়ান না-- ছাত্ররা আপনাকে সম্মান করবে? করবে না। তারা হয়তো পরীক্ষায় ফেলের ভয়ে আপনাকে তোয়াজ করবে, কিন্তু মন থেকে সম্মান করবে না। পরিমল বাবু একজন শিক্ষক ছিলেন, তাকে কি আপনারা সম্মান করেন?
আপনার চরিত্র যদি খারাপ হয়, আপনি যেই হোন- কেউ আপনাকে সম্মান করবে না। আপনি প্রেসিডেন্ট হলেও সম্মান পাবেন না, শিক্ষক হলেও না, অফিসার হলেও না।
আপনি ডাক্তার, রোগীর সাথে যদি ভালো ব্যবহার না করেন, শুধুমাত্র ডাক্তার হওয়ার কারণে কেউ আপনাকে সম্মান করবে? না। করবে না।
পেশার কারণে কেউ সম্মানিত বা অসম্মানিত হতে পারে না। পেশা হলো জীবিকা অর্জনের মাধ্যম মাত্র।
বেঁচে থাকার জন্য আমাদের খেতে হয়, ভাত কাপড়ের দরকার হয়, থাকার জায়গা দরকার হয়। অসুস্থ হলে চিকিৎসা দরকার হয়। আমাদের ঘর বাড়ি রাস্তাঘাট পরিস্কার রাখতে হয়, আমাদের পারস্পরিক যোগাযোগ রাখতে হয়। আর এইসব কাজ আমরা মানুষেরা ভাগাভাগি করে করি। আমাদের খরচ নির্বাহ করি। এইটাই পেশা। এইখানে আলাদা করে সম্মান অসম্মানের কিছু নাই।
প্রত্যেকের জন্য রিযিক আছে, এবং সেটা কীভাবে আসবে তারও একটা পদ্ধতি আল্লাহর পক্ষ থেকেই নির্ধারণ করা আছে। সেটারই নাম 'পেশা'। পরিবেশ পরিস্থিতি সময় ও প্রয়োজনের তাগিদে একেকজনকে একেক কাজ করতে হয়, একেকজন একেক কাজে পারদর্শী হয়, একেক জন একেক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে।
সৎ পথে, কাউকে না ঠকিয়ে, কারো সম্পদ লুট না করে, বৈধভাবে অর্জিত যেকোন জীবিকাই সম্মানের, যেকোন পেশাই সম্মানের। সবাইকে সবার প্রয়োজন হয়। কাউকে ছাড়া কারো চলে না।
ধরেন একজন মেথর, তো তার পেশাটাকে কি আপনি খুব অসম্মানজনক মনে করেন? যদি করেন, কেন? আপনার কি টয়লেট বাথরুম পরিষ্কার করতে হয় না? নিজেকে পরিষ্কার করতে হয় না? তখন কি আপনি অসম্মানিত হয়ে পড়েন?
নবী রাসুলগণ অনেকেই 'রাখাল' ছিলেন, সেটা কি কোন 'হীন' পেশা? অনেক মহামানব খুব সাধারণ কাজ করতেন। তারা কি পেশার কারণে মহান হয়েছেন? না, হয়েছেন তাদের জ্ঞান ও চিন্তাচেতনার কারণে। উত্তম ব্যবহারের কারণে। উত্তম শিক্ষার কারণে।
অর্থকরী পেশা মানেই সম্মানজনক পেশা নয়। পেশার কারণে কেউই সম্মানিত হয় না। মানুষ সম্মানিত হয় তার জ্ঞানে, তার সততায়, তার চরিত্রে, তার পরোপকারিতায়, ভালো ব্যবহারে, মহানুভবতায়। আর তাই, অর্থকরী পেশায় নিয়োজিত হতে পারাই জীবনের সফলতা হতে পারে না। সফলতা হলো সৎ, চরিত্রবান, জ্ঞানবান, পরোপকারী ও ভালো মানুষ হওয়া।
পেশা হলো জীবনধারণের প্রয়োজনে ব্যয় নির্বাহের মাধ্যম মাত্র, আর কিছু নয়। মানুষ হিসেবে পৃথিবীর সব মানুষের মানবিক মর্যাদা সমান। পেশা যাই হোক তাতে আপনি খুব বড় কিছু বা খুব ছোট কেউ হয়ে যান না। 

মঙ্গলবার, ২৭ জুন, ২০১৭

নারীদের মসজিদে যাওয়া কতটা জরুরী?

ঈদের জামাতে মহিলাদের অংশগ্রহণের সুযোগ আছে কোথাও? বাংলাদেশের কোন ঈদগাহে কি মহিলারা অংশ নেন? আমার জানা নাই। আর উত্তরটা সম্ভবত 'না'। কীভাবে মেয়েদেরকে ধর্মের কাজ থেকেও দূরে রাখা হয়েছে এইটা হলো তার একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
আর এর কারণ হলো আমাদের দেশের, বলতে গেলে এই উপমহাদেশের আলেম-ওলামাদের অতিবুযুর্গীপনার নামে নারীদের বঞ্চিত করার বিশেষ প্রবণতা।
অথচ আল্লাহর রাসুল (সাঃ) মহিলাদের ঈদের জামাতে অংশ নিতে জোর তাগিদ দিয়েছেন। এমনকি যেসময় নারীদের জন্য নামাজ পড়াই নিষিদ্ধ, সে অবস্থায়ও তাদের ঈদগাহে যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে। যাদের ওড়না নেই, তাদেরকে অন্য বোনের ওড়না ধার করে নিয়ে যেতে বলা হয়েছিল।
দেশের কতগুলি মসজিদে নারীদের নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা আছে? প্রাত্যহিক নামাজ তো দূরের কথা, জুমার নামাজেও তাদের অংশগ্রহণের কোন সুযোগ কোথাও আছে কি? নেই।
কেন নেই? রাসুলের সময় যেখানে নারীরা ফযর এবং এশার নামাজও মসজিদে গিয়ে পড়তে পারতেন, আজ কে এমন বুজুর্গ হলো যে নারীদের মসজিদে যাওয়াই বন্ধ করে দিলো? খুবই আশ্চর্যের কথা, কোন কোন মসজিদে নাকি এরকমও লেখা থাকে- মহিলাদের প্রবেশ নিষেধ!!
জাতি হিসেবে মুসলিমদের দুরবস্থা বা অধঃপতনের কারণ হিসেবে অনেকেই অনেক কথা বলে থাকেন। আমি এই দুরবস্থার পেছনে দায়ী করি মুসলিম নারীদের মসজিদ বিমুখ করে রাখাকে। মসজিদ থেকে দূরে রাখাকে।
এজন্য কোন গুরুতর তত্ত্বীয় আলোচনার প্রয়োজন নেই। কমনসেন্স এপ্লাই করাই যথেষ্ট।
মুসলিম সমাজের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী। মসজিদে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় এই অর্ধেক সংখ্যক মুসলিম ইসলামের শিক্ষা পাচ্ছেন না। কোন একটা জনগোষ্ঠির অর্ধেক মানুষকে জ্ঞানহীন রেখে কীকরে একটা সুন্দর সমাজ তৈরি করা সম্ভব?
পুরুষেরা মসজিদে গিয়ে কিছু হলেও ধর্মীয় আলোচনা শুনতে পারে, মসজিদের এইসব আলোচনা থেকে তারা ইসলাম সম্বন্ধে কিছুটা হলেও জানার সুযোগ পায়। যদিও কাজের ব্যস্ততায় তারা অনেকেই সে সুযোগ নেয় না। আমাদের দেশের মেয়েরা ধর্মীয় আলোোচনা শোনার কোন সুযোগই পায় না। সাংসারিক কাজ শেষে সারাদিন বাড়ীতে বসে থাকা ছাড়া সময় কাটানোর অন্য কোন সুযোগ তারা পায় না।
যারা মেয়েদের সিরিয়াল দেখা নিয়ে কটাক্ষ করেন, হাসি তামাশা করেন, ক্ষোভ প্রকাশ করেন- আমি তাদের জিজ্ঞেস করি, সিরিয়াল না দেখে তাদের উপায়টা কী? ঘরে বসে তারা করবেটা কী সারাটা দিন?
বাচ্চাদের প্রথম শিক্ষক হলো মা। সেই মায়েরাই যদি থেকে যায় জ্ঞানহীন, তারাই যদি থেকে যায় ধর্ম সম্পর্কে উদাসীন, তাহলে বাচ্চাদের ধর্ম ও চরিত্রের শিক্ষা দেবে কে? দিনকে দিন সমাজে যে ধর্মীয়ভাবে উদাসীন একটা ডিজুস প্রজন্ম বেড়ে উঠছে এর একটা কারণ হলো মায়েদের জ্ঞানশুন্যতা। মায়েরা নিজেরাই যেখানে জ্ঞান রাখে না সেখানে তারা বাচ্চাদের কী শেখাবে?
মায়েরা মসজিদে গেলে ছোট বাচ্চারা মায়ের সাথে মসজিদে যেতে অভ্যস্ত হবে। বাচ্চারা যদি ছোট থেকেই ধর্মীয় অনুশাসন, সততা, ন্যায়, আর উত্তম চরিত্রের শিক্ষা পায়, তবেই একটা সুস্থ সুন্দর প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব। যারা সমাজটাকে সুন্দর করবে, দেশকে সুন্দর করবে।
মুসলিম নারীদেরকে ধর্ম সম্বন্ধে জানার সুযোগ সৃষ্টি করার জন্য বাংলাদেশের সব/বেশিরভাগ মসজিদেই মহিলাদের জন্য স্থান রাখা দরকার। পাশের বাসার ভাবীদের সাথে গীবত পরনিন্দা আর চোগলখুরির আসর বসানোর চাইতে তাদের মসজিদে যাওয়া ভালো না?
যারা বলতে চান যে, এই ফেতনার যুগে মহিলারা মসজিদে গেলে ফেতনা/বিশৃংখলা সৃষ্টি হবে, ফেতনা বৃদ্ধি পাবে, তারা বোকার স্বর্গে আছেন।
ভাইসাব, নারীদের মসজিদ থেকে দূরে রেখে কি ফেতনা বন্ধ করতে পারছেন? নাকি ফেতনা বাড়াচ্ছেন? নারীরা স্কুলে কলেজে ভার্সিটিতে বাজারে সবখানে যেতে পারবে, শুধু মসজিদে গেলেই ফেতনা?
দুনিয়ায় ফেতনা সৃষ্টির জন্য শয়তানের একটা প্রধান মাধ্যম হলো নারী। আর তাদেরকেই যদি ধর্মানুরাগী, ধর্মের বিধিবিধান অনুসারী না বানাতে পারেন, তাহলে তো ফেতনা বাড়তেই থাকবে। মহিলারা মসজিদে যাওয়া আসা করলেই বরং ফেতনা বন্ধ হবে। সমাজে বিশৃংখলা কমবে।
কবি বলেছিলেন, দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভ্রমটারে রুখি, সত্য বলে আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি? আপনারা অন্ধকারের ভয়ে দরজা বন্ধ করতে চান, এদিকে আলো ঢোকার পথটাই যে বন্ধ করে দিয়েছেন সে খেয়াল নেই। মক্কা মদীনায় যে নারীরা মসজিদে নামাজ পড়ছে, সেখানে কি খুব ফেতনা হচ্ছে?
ইবনে উমর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হতে বর্ণনা করেন- “নারীদেরকে তাদের মসজিদে যাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করো না।”
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) এর ছেলে বিলাল একবার বলেছিলেন- 'আল্লাহর কসম আমি তাদেরকে (নারীদেরকে) অবশ্যই নিষেধ করব।'
কথিত আছে যে, ইবনে উমর (রাঃ) নাকি ছেলের এমন কথায় ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে থাপ্পড়ই মেরে বসেছিলেন!!!!

শুক্রবার, ২৩ জুন, ২০১৭

মেকাপের সং সেজে লাভ কী?

বিয়ের অনুষ্ঠানে গেলে সবাই একবার 'বৌ' দেখার চেষ্টা করে। খাওয়া দাওয়ার পর অনেকেরই মনে হয় 'বউডা দেইখ্যা যাই'!
আমার এ বদভ্যাস নেই, সচেতনভাবেই আমি এরকম কিছু থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করি। পর্দার ব্যাপারে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা আছে। তাছাড়া, একজন মানুষ সেজেগুজে বসে আছে, আর চেনা অচেনা সবাই তাকে দেখতে আসছে, নিচুস্বরে কমেন্ট করছে, বিষয়টা আমার কাছে রুচিকর মনে হয় না। যে 'বৌ' দেখার জন্য লোকজন ভীড় করে, তার মানসিক অবস্থাটাই বা কেমন থাকে? কে চায় প্রদর্শনীর বস্তু হতে? একের পর এক চেনা অচেনা লোকেরা আমার 'চেহারা' দেখতে আসছে, ভাবলেই তো শরীর গুলিয়ে আসে।
যাহোক, বিষয় সেটা না। বিষয় হলো, সেদিন এক বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে কণের সামনে পরে গেলাম। বর-কণে দুজনেই সেজেগুজে বসে আছে, খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থাও সেখানেই। তাছাড়া বর যথেষ্ট নিকটজন, তার সাথে কুশল বিনিময় করতেই হলো। পাশেই যেহেতু 'বৌ' বসা, সুতরাং এইবার চোখ রক্ষা করা গেলো না। তবে, খুশির(!) খবর হলো, মুখোমুখি হলেও এবারও কণের মুখ দেখতে হলো না। কারণ, মুখে এত পরিমাণ ময়দা মেখেছে যে স্কিনের ওপর একটা আলাদা স্তর হয়ে আছে। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিলো। এ যেন মুখ নয়, ময়দার মুখোশ।
এইভাবে মেকাপ দিলে কারোই আসল চেহারা বোঝা সম্ভব না। আমি নিশ্চিত, এই মেয়েকে পরে কখনো দেখলেও চিনতে পারবো না।
আশ্চর্য হলাম এই ভেবেঃ মেয়ে তো যথেষ্টই উচ্চশিক্ষিত; কিন্তু তার মানসিক উন্নতি এখনো ময়দার লেভেল অতিক্রম করে নাই।
(বৌ-দর্শকদের আমি খুব একটা দোষ দিচ্ছি না। কারণ, আপনি যদি সঙ সেজে বসে থাকেন, তাহলে কৌতূহলী দর্শক ও সমালোচকের অভাব কখনোই হবে না। ইহা বাঙালির মজ্জাগত অভ্যাস। সামান্য বানরের নাচও বাঙালি উপেক্ষা করতে পারে না।)
২.
বিয়ের মেকাপের নামে সঙ সাজাটা কীভাবে কীভাবে যে বিয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে, কে জানে!!! পুরুষের কথাই ধরি। তারা সাধারণ পোষাক বাদ দিয়ে এক ধরণের মোটা কাপড় পরে, যার নাম দেয়া হয়েছে 'শেরওয়ানি'। যতদূর জানি, শের মানে বাঘ। তার মানে কি শেরওয়ানি পরে বিয়ের দিনে বাঘ হবার চেষ্টা? শোনেন পুরুষ ভাই, মনে বিড়াল হলে বাঘের চামড়ায়ও কিছু আসে যায় না। শেরওয়ানি কোনছাড়!!!
শেরওয়ানির দামও কম না। দশ হাজার থেকে শুরু করে চল্লিশ পঞ্চাশ হাজার টাকাও আছে। আরো বেশিও থাকতে পারে। (আমি গরীব মানুষ, এতকিছুর খবর জানি না।)
তো, আমার কাছে এগুলো স্রেফ ভড়ং মনে হয়। পুরোটাই অপচয়। এই শেরওয়ানি আর কোনদিন গায়ে দিয়ে কোথাও যেতে পারবেন? শেরওয়ানি পরে বাসায় ঘুমাতে পারবেন? অফিস করতে পারবেন?
নো ইউজ। আসলে তো আপনি বিড়াল, তাহলে কেন এই শের হবার ভড়ং? মনে বাঘ হলে ছুড়ে ফেলে দিন অহেতুক অপচয়ের এই সংস্কৃতি। মেয়ে যেমন ময়দা মেখে সঙ সেজেছে, আপনিও শেরওয়ানি গায়ে একধরণের সঙ সেজেছেন।
বিয়ের অনুষ্ঠানের দিন এইভাবে ময়দার প্রলেপ মেখে আর শেরওয়ানি গায়ে দিয়ে সঙ না সাজলে কি চলে না? কেন, সাধারণ শার্ট প্যান্ট বা পাজামা পাঞ্জাবিতে সমস্যা কী?
বিয়ে তো হয়েই গেল, মেকাপের মেকি রুপ দিয়ে আপনি আর কাকে ভোলাতে চান?
(বিবাহ কথন-২৮) চলবে...

রবিবার, ১৮ জুন, ২০১৭

পাগলের চোখে জল!

পাড়ার সবাই তাকে অনেকটা পাগলই মনে করতো...নাম তার আশেক। ঘর সংসারের কিছু সে বোঝে বলে আমরাও ভাবিনি। বাপের সাথে নদীতে মাছ ধরে, বাপের সাথে বাজারে যায়। বয়স যখন ১৮ কি ২০, হুট করে একদিন তার বিয়ে হয়ে গেল।
মাস ছয়-সাত পরের ঘটনা। বিকেল বেলায় ঘরে বসে একটা গল্পের বই পড়ছি। আঙিনায় আম্মার সাথে চাচীরা গল্প করছেন। সবার ভেতর বেশ চাপা উত্তেজনা। আশেকের বউয়ের নাকি এবরশন হয়ে গেছে। তার চেয়ে আশ্চর্যের কথা শুনলাম, এবং আমি নিজেও গিয়ে দেখলাম মরা বাচ্চাটা কোলে নিয়ে হুহু করে কাঁদছে পাগলাটে আশেক!!!
সবার মত আমিও খুবই অবাক হয়ে গেলাম। এবরটেড একটা বাচ্চার জন্য... পাগলের চোখে জল... ইজ ইট ফাদারস লাভ?
বুঝলাম, টু বি এ ফাদার, মে বি দেয়ার ইজ সামথিং এক্সট্রাওর্ডিনারি ফিলিংস ইনডিড...
২.
মোজাম্মেল সাহেবের সাথে তার ছেলেদের সম্পর্ক ভালো ছিলনা। প্রায়ই দেখা যেত ও বাড়িতে হৈ চৈ লেগে আছে। ছেলেদের সাথে চিৎকার চেঁচামেচি করছেন। গায়ে হাতও তুলতেন। ছেলেরা কান্নাকাটি করতো, ঘর ছেড়ে বেড়িতে যেত... এসব কিছুই ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।
সেদিন মোজাম্মেল সাহেব তার অফিসের কাজে দূরে কোথাও গিয়েছেন। এদিকে তার এক ছেলে রাস্তায় এক্সিডেন্ট করে মাথা ফাটিয়ে ফেলেছে। তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। রাতে মোজাম্মেল সাহেব বাড়িতে ফিরলে তাকে খবরটা জানানো হলো।
তিনি ঘরের দরজা বন্ধ করে হুহু করে কাঁদতে লাগলেন। দরজার বাইরে থেকে অবাক বিস্ময়ে আমরা তার কান্নার চাপা শব্দ শুনতে পেলাম।
৩.
সিনিয়র কলিগ বলছিলেন, বাবা হও তখন বুঝবা, বাচ্চা কী জিনিস!! বাচ্চাটা যখন কাঁদে, তখন আমার বুকের ভেতরটা হুহু করে ওঠে। কি ঘুম, কি কাজ... কোনকিছুই ঠিক থাকে না।
বেকায়দা প্রশ্ন করা আমার বদভ্যাস। আমি প্রশ্ন করে বসলামঃ ভাই, ধরেন আপনি ঘুমাচ্ছেন। পাশের বাসার বাচ্চাটা খুব কাঁদছে। তখন তার জন্যও কি আপনার খুব মায়া হয়?
বড় ভাই বললেন, না। তখন বিরক্ত লাগে। আসলে নিজের বাচ্চার জন্য যে অনুভূতি, অন্যের বাচ্চার ক্ষেত্রে সেরকম না। এটা এমন এক ধরণের ভালোবাসা, যা আল্লাহ বিশেষভাবে বাবাদের অন্তরে সৃষ্টি করে দেন।
৪.
বাবারা সন্তানদের ভালোবাসেন। কিন্তু তারা সেটা বোঝাতে পারেন না। মায়ের চেয়ে বাবার সাথেই কেন যেন দূরত্বটা বেশি থাকে। একটা কারণ হলো, বাবারা বাচ্চাদের সাথে বেশি সময় কাটান না। আর যতক্ষণ থাকেন শুধুই শাসন করেন। একটা সময় তারা হয়ে ওঠেন শুধুই ডিক্টেটর। শুধুই মানি সাপ্লায়ার।
অনেকেই ভালোবাসার বদলে সব সময় একনিষ্ঠ আনুগত্য চান। অনেকেই ছেলেমেয়েদের মনে করেন নিজস্ব 'সম্পত্তি'। তাদের স্বাধীন অস্তিত্ব স্বীকার করতে চান না। তাদের চিন্তাভাবনাকে মোটেও আমলে না নিয়ে, আলোচনার বদলে সবখানেই নিজের সিদ্ধান্তটা চাপিয়ে দিতে চান।
ফলে বাবাদের সাথে সন্তানের তৈরি হয় অদৃশ্য দেয়াল, অনেক দূরত্ব।
এটা ভুল। এটা ক্ষতিকর।
যারা বাবা হয়েছেন, সন্তানদের সাথে মিশুন। তাদেরকে সময় দিন। Be a friend of your child... Let them feel the love you bear for them...
সন্তানদের সৎ, চরিত্রবান ও মানবিক হিসেবে গড়ে তুলুন।
অন্যথায় সে হয়তো বড় অফিসার হবে, কিন্তু আপনাকে রেখে আসবে কোন এক 'ওল্ড হোমে'। এরকম 'বাবা দিবস' গুলোয় হয়তো আপনাকে দিয়ে আসবে কিছু ফুল।
অখন্ড অবসরে তখন আপনার সম্বল হবে কিছু অশ্রুবিন্দু।

শুক্রবার, ১৬ জুন, ২০১৭

ডাক্তারদের বিয়েঃ দিন বদলাচ্ছে দ্রুতই...

একটা সময় ছিল যখন একজন ডাক্তারের পরিবার মানে ধরেই নেয়া হত- স্বামী স্ত্রী দুজনেই ডাক্তার। ডাক্তার বিয়ে করবে ডাক্তারকে... এটা যেন হয়ে উঠেছিল স্বতঃসিদ্ধ ব্যাপার। কিন্তু দিন পাল্টাচ্ছে। এখন ডাক্তাররা-- বিশেষ করে ডাক্তার ছেলেরা অনেকেই অন্য পেশার/সাবজেক্টের মেয়ে বিয়ে করছে। অনেকেই পাত্রীর ক্রাইটেরিয়া থেকে বাদ দিচ্ছে 'ডাক্তার'কে। কখনো ডাক্তার মেয়ে এবং তাদের গার্জিয়ানদের প্রতি বিরক্ত হয়ে, কখনো জীবনকে সহজ করার ইচ্ছায়।
তার মানে, ডাক্তার পাত্রদের মূল্য অনেকটা অপরিবর্তিত থাকলেও পাত্রী হিসেবে ডাক্তার মেয়েদের দাম কমেছে। অন্তত ডাক্তার ছেলেদের কাছে।
আর এই ট্রেন্ডটা এখনো ধরতে না পারায়, নিজেকে 'অমূল্য' ভেবে বসে থেকে থেকে অনেক ডাক্তার মেয়েই শেষ পর্যন্ত এখন আর খুঁজে পাচ্ছেন না তাদের কাঙখিত 'ডাক্তার' পাত্র। বয়স হয়েছে, কিন্তু অবিবাহিত- এমন ডাক্তার মেয়ের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। একজন ভাই জানালেন, সম্প্রতি তার কাছে ৭-৮ টি বিয়ের প্রস্তাব এসেছে যেখানে সবক্ষেত্রেই মেয়েরা তার চেয়ে দুই তিন ব্যাচ সিনিয়র!!
ছেলের বাপ-মায়েরা ছেলেকে মেডিকেলে পড়ায় পেশা বা জীবিকার প্রয়োজনে। আর (দুষ্ট লোকেরা বলে) মেয়েদের নাকি পড়ানো হয় ভালো পাত্র পাবার জন্যে। (চিকিৎসা ক্ষেত্রে প্রচুর মেয়ে দরকার সেটা অস্বীকার করছি না, আমি শুধু প্রচলিত মানসিকতাটা তুলে ধরছি।) তো, একটা মেয়ে যখন মেডিকেল স্টুডেন্ট, তখন গার্জিয়ানরা ভাবেন- এখন আবার বিয়ের কথা কেন? ডাক্তার হোক, তখন আমার মেয়ের 'দাম' আরো বাড়বে!! এরপর যখন মেয়ে সত্যি সত্যি ডাক্তার হয়ে যায়, তখন গার্জিয়ানরা ভাবেন- আরে আমার মেয়ে তো 'ডাক্তার'!! এখন আমার মেয়ের জন্যে কত প্রস্তাব আসবে!! প্রধানমন্ত্রীর ছেলে, প্রেসিডেন্টের নাতি!!
কোটিপতি বাবার একমাত্র ছেলে, সুদর্শন, নামাজী, ভদ্র, ডাক্তার ছাড়া মেয়ের বিয়া দিমু না। মেয়ে কি গাঙ্গের জলে ভাইস্যা আইছে? (এইটা সম্ভবত সর্বাধিক উচ্চারিত সংলাপ) আরে আমার মেয়ে তো 'ডাক্তার'!!!
কোন কোন মেয়ে নিজেও হয়তো একইরকম স্বপ্ন দেখে থাকে।
কিন্তু বাস্তবতা সেরকম হয় না। কারণ, ডাক্তার ছেলেদের শুরুটা হয় মারাত্মক স্ট্রাগলিং। পাশ করা মাত্রই তারা চেম্বারে বসে লাখ লাখ টাকা কামায় না। এমবিবিএস পাশ করে তাকে আবার নাক ডুবিয়ে পড়তে হয়। বিনা পয়সায় ট্রেনিং করতে হয়। আর নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর জন্য একটা চাকরি করতে হয়, যেটার বেতন তার পরিশ্রমের তুলনায় খুবই নগন্য, এবং তার সমপর্যায়ের অন্য যেকোন অফিসের কর্মচারীর তুলনায় কম।
আমার কাছের একজন ভাই, সে ধনী বাবার ছেলে, ডাক্তার, এমডি কোর্সেও ঢুকেছে। মেয়ের গার্জিয়ানরা নাকি তাকে রিজেক্ট করেছে- 'বিসিএস নাই' বলে!!! আবার আরেক বন্ধু, সে ডাক্তার, বিসিএস ক্যাডারও। তাকে নাকি রিজেক্ট করা হয়েছে 'বড় ডিগ্রী নাই' বলে!!! অদ্ভুত বটে। আরেকজন ছোটভাই, সম্প্রতি ইন্টার্নশিপ শেষ করেছে। এখনো বিসিএস বা ডিগ্রী কোনটাই হয়নি। তাকে বিয়ের আলাপের শুরুতেই-- বলা চলে 'স্ক্রিনিং টেস্টেই' আউট করে দেয়া হচ্ছে।
তারা সব চায়, সব। পরে হলে হবে না, এখনি থাকতে হবে। ছেলের বয়স হতে হবে তিরিশ, ডেজিগনেশন হবে 'প্রফেসর', ব্যাংকে থাকবে কোটি টাকার ব্যালেন্স!!! (ওয়াল্ট ডিজনীর এনিমেশন ছাড়া এরকম ক্যারেক্টার বানানো সম্ভব কিনা আমার জানা নাই।)
আমার কাছে এখন ডাক্তার ভাই বন্ধু জুনিয়ররা কেউ পরামর্শ চাইলে বলি- ভাই, গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে আসো। ডাক্তার পাত্রী দেখতে পারো, তবে নিজেকে এই গন্ডিতে আটকে রাখার দরকার নাই। নিজের পরিধি বাড়াও। মেয়ে যে সাবজেক্টেই পড়াশোনা করুক- চরিত্র ও অন্যান্য দিক ঠিক থাকলে এগিয়ে যাও। তোমার ক্যারিয়ারে তো কোন সমস্যা হবেই না, হয়তো সংসারটা হবে আরো অনেক বেশি গোছানো। আমার ভাই বন্ধু পরিচিত যারা নন-ডাক্তার বিয়ে করেছে- As far I know, they are not unhappy...
একজন ডাক্তার মেয়ের জন্য অন্য পেশার হাজব্যান্ডের সাথে খাপ খাওয়ানো যতটা কঠিন, ডাক্তার ছেলের জন্য মোটেও সেরকম না। বউ সপ্তাহে তিনদিন নাইট ডিউটি করবে, নন ডাক্তার কোন হাজব্যান্ড সেটা কখনোই 'খুশিমনে' মেনে নেয়ার কথা না। সেক্ষেত্রে একজন ডাক্তার মেয়ের ক্যারিয়ারটা হয়তোবা আর সেভাবে এগিয়ে নেয়া সম্ভব না।
ডাক্তার ছেলেদের ক্ষেত্রে এরকম কোন সমস্যা নেই।
সো, ডিয়ার ডক্টর ভাই-বেরাদরস, ডাক্তার পাত্রীর গার্জিয়ানদের এত তেলানোর কিছু নাই। তারা অপেক্ষা করতে থাকুক। তোমরা তোমাদের মত এগিয়ে যাও।
আর হ্যা, সিনিয়র ডাক্তার পাত্রী বিয়ে করতে চাইলে- করতে পারো। আমি নিশ্চিত, এতদিনে তাদের চাহিদা আকাশ থেকে মাটির কাছাকাছি নেমে এসেছে।

রবিবার, ১১ জুন, ২০১৭

কম আর পরিমিত রিযকই সর্বোত্তম

হযরত আলী(রাঃ) একবার মসজিদে নামাজ পড়তে ঢোকার সময় দেখলেন একটা বাচ্চা ছেলে মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি ছেলেটাকে ডেকে বললেন- বাপু তুমি আমার বর্মটা কিছুক্ষণ রাখো, নামাজ শেষে আবার নিয়ে নেবো।
হযরত আলী (রাঃ) নামাজ শেষে ফিরে দেখলেন ছেলেটি তার জায়গায় নেই। আশেপাশে খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পেলেন না। পরে বাজারে গেলে তাঁর চোখে পড়ে, এক দোকানে তাঁরই বর্মটি বিক্রির জন্য রাখা আছে। তিনি দোকানিকে জিজ্ঞেস করলেন- এই বর্ম কোথায় পেলেন? দোকানি বললো- এক বাচ্চা ছেলে বিক্রি করে গেছে। হযরত আলী জানতে চান- এটাতো আমার বর্ম, সে কত টাকায় বিক্রি করেছে? দোকানি জানায়- মাত্র ২ দিরহাম।
হযরত আলী আফসোস করে বললেন, "আহা! আমি তাকে ঠিক দুই দিরহামই বখশিস দেয়ার ইচ্ছা করেছিলাম। সে যদি আর কিছুক্ষণ দাঁড়াতো, তাহলে সে চুরি না করেই দুই দিরহাম পেয়ে যেত।"
রিযিকের জন্য আমরাও এরকম অধৈর্য হয়ে যাই। বৈধতা অবৈধতার তোয়াক্কা করি না। অথচ প্রত্যেকের জন্য আল্লাহ তায়ালা রিযিক নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। যার জন্য যতটুকু রিযিক বরাদ্দ করা হয়েছে, তার একবিন্দু পরিমাণ বাকি থাকতে কেউ মৃত্যুবরণ করবে না।
রিযিক নির্দিষ্টই। তবে একজন মানুষ সেটা বৈধ (হালাল) ভাবে উপার্জন করবে, নাকি অবৈধ (হারাম) ভাবে উপার্জন করবে সেটাই তার জন্য পরীক্ষা। কেউ ঐ ছেলেটির মত চুরি করে ২ দিরহাম আয় করতে পারে, আবার কেউ আরেকটু অপেক্ষা করে ২ দিরহাম বখশিসও পেতে পারে।
২.
সম্পদের পরিমাণের ওপর আমরা একজন মানুষের সাফল্য ব্যর্থতা নির্ণয় করি। আমাদের সমাজের চোখও এভাবেই বিচার করে। আরে অমুকে তো এই সেই করে ফেললো, গাড়ি কিনলো, ফ্ল্যাট কিনলো, এত টাকা তার পার মান্থ ইনকাম-- বলতে বলতে আমাদের চোখ চকচক করে ওঠে। অথবা হতাশায় চোখ বন্ধ হয়ে আসে।
কিন্তু ধন সম্পদ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে দেন। এটা কারো যোগ্যতা অযোগ্যতার ওপর নির্ভর করেনা। আবার ধন সম্পদ কারো সাফল্য ব্যর্থতার মাপকাঠিও নয়। আমরা আমাদের আশেপাশে তাকালেই এটা বুঝতে পারবো। অনেক মানুষকেই দেখি- যার খুব বেশি জ্ঞান বা যোগ্যতা নেই। কোন বিষয়ে মতামত দিতে বললে কিছু বলতে পারেনা, কোন মজলিশে কথা বলতে দিলে থতমত খেয়ে যাবে, কাজেকর্মেও খুব একটা পটু নয়- অথচ তার ধন সম্পদ অনেক। আবার অনেক অনেক জ্ঞানী, যোগ্য, দক্ষ লোকও অভাবে দিন কাটান।
পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক মহামানব না খেয়ে দিন কাটিয়েছেন, ছিন্ন বস্ত্র পরিধান করেছেন, জীর্ণ কুটিরে রাত কাটিয়েছেন। আবার অসংখ্য নরাধম নরপশু জীবন কাটিয়ে গেছে প্রাচুর্যের সমূদ্রে।
কেউ কেউ উত্তরাধিকার সূত্রেই অনেক সম্পদের মালিক হয়, আবার কেউ কেউ অনেক কষ্ট করেও সম্পদশালী হতে পারে না। কেউ সামান্য ব্যবসা থেকেই ফুলে ফেঁপে ওঠে, কেউবা ব্যবসায় নেমেই দেউলিয়া হয়ে যায়।
আল্লাহর একটি নামই হলো- আর রাজ্জাক। তিনিই রিযিকদাতা।
হাদীসে আছে, মায়ের পেটে ভ্রুণের ৪ মাস বয়স হলে আল্লাহর নির্দেশে একজন ফেরেশতা প্রত্যেকের জন্য চারটি বিষয়ে তাকদীর নির্দিষ্ট করে দেন। তার মধ্যে একটি হলো রিযিক।
"আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা করেন রিয্ক প্রশস্ত করে দেন এবং যার জন্য ইচ্ছা সীমিত করে দেন। নিশ্চয় আল্লাহ সকল বিষয়ে সম্যক অবগত।" (সূরা আনকাবুত:৬২)
৩.
আমরা কতটুকু খাই? কতটা কাপড় হলে শরীর ঢাকা যায়? আমাদের থাকার জন্য কতটুকু জায়গা প্রয়োজন? খুব বেশি নিশ্চয়ই নয়!! কারণ, মানুষের পেটের ধারণক্ষমতা যেমন অসীম নয়, শরীরের আয়তনও তেমনি সীমাবদ্ধ।
অথচ তবু আমরা অল্প সম্পদে সন্তুষ্ট হতে পারি না। বেশি সম্পদের জন্য কত প্রতিযোগিতা!! ধন-সম্পদের পেছনে কত ছোটাছুটি!! সম্পদের জন্য কত হানাহানি।
তাছাড়া, অতিরিক্ত সম্পদ মানেই কঠিন পরীক্ষা। আবার অনেক কম সম্পদও একটা পরীক্ষা। এই দুই অবস্থাতেই মানুষ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। খারাপ কাজে জড়িয়ে পড়ে। আল্লাহ তায়ালা কখনো বেশি সম্পদ দিয়ে পরীক্ষা করেন, কখনো অভাব দিয়ে পরীক্ষা করেন।
হযরত ওমর (রাঃ) তাই সবসময় দোয়া করতেন- ইয়া আল্লাহ! আমাকে যেন এত বেশি সম্পদ না দেন যাতে আমি সীমালংঘন করে বসি, আবার এত কম যেন না দেন যাতে কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হতে হয়।
কম আর পর্যাপ্ত রিযকই হলো মানুষের জন্য সর্বোত্তম।

বৃহস্পতিবার, ৮ জুন, ২০১৭

স্বাধীন হয়েছি, গোলামী ছাড়ি নাই

প্রতিবার বিসিএস এর গেজেটের পর দেখা যায়, বিসিএস এর প্রিলিমিনারী, লিখিত, ভাইভা সকল ধাপে উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি কর্মকমিশন(পিএসসি) কর্তৃক সুপারিশপ্রাপ্ত হবার পরেও অনেকেই চূড়ান্ত গেজেটে বাদ পড়ছেন। তাদেরকে 'বাদ দেয়া' হচ্ছে। গত তিন বিসিএস থেকে সুপারিশপ্রাপ্ত ২৮১ জনকে চূড়ান্ত গেজেটে বাদ দিয়ে নিয়োগবঞ্চিত করা হয়েছে। সর্বশেষ ৩৫ তম বিসিএস এও বাদ দেয়া হয়েছে পিএসসির সুপারিশকৃত শ'খানেক প্রার্থীকে।
বাদ দেয়া হয় মূলত পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে। এইটা একটা চরম হাস্যকর ব্যাপার যে, দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাঙ্গন থেকে পাস করে, লাখ লাখ পরীক্ষার্থীর ভেতর থেকে ধাপে ধাপে পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ন যারা, তাদের চাকরি দেয়া না দেয়ার সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত নেয় কিনা থানার একজন এসআই অথবা ওসি!! সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এতে পিএসসির অপমান হয় কিনা তা আমার জানা নাই। পিএসসি মানী প্রতিষ্ঠান, জুতা দিয়ে পেটালেও বোধহয় তার মান যায় না।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বিদগ্ধ প্রফেসররা ভাইভা নিয়ে যাদের ক্লিয়ারেন্স দেন, তাদের আটকে দেয় কিনা থানার এসআই!!! কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়, ও ভাইরে!!
এবার যেটা হয়েছে সেটা ভয়ংকর, জঘন্য। প্রার্থীর নিজেরসহ তার বাবা মা ভাই বোন চাচা মামা খালু নানা দাদা সবার রাজনৈতিক পরিচয় নেয়া হয়েছে। বাবা কিংবা চাচা বিরোধী দলের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন- সেই কারণ দেখিয়ে নিয়োগ বঞ্চিত করা হয়েছে প্রার্থীদের। পড়ালেখা কোন যোগ্যতা নয়, বাপের রাজনৈতিক পরিচয়ই সবচেয়ে বড় যোগ্যতা কিংবা অযোগ্যতা!!! সেলুকাস! বড় বিচিত্র সিস্টেম!!!
পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য প্রতিবেশি, স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছে তথ্য নেয়া হয়। এইটা কতটা বাস্তবসম্মত? একই পরিবারেও তো ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের লোক থাকে। থাকে পারিবারিক বিরোধ। থাকে ভিলেজ পলিটিক্স। থাকে জায়গা জমি সম্পত্তি বা ব্যবসা নিয়ে বিরোধ। ঐ স্থানীয় নেতা বা ঐ প্রতিবেশি যে ঠিক তথ্য দিচ্ছে তার নিশ্চয়তা কী?
তাহলে কি প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতার চেয়ে স্থানীয় নেতাদের তৈলমর্দনের যোগ্যতাই বড়?
একজন প্রার্থীর পরিবারের সব সদস্যও যদি সরকারবিরোধী হয়, তাতেই কি এটা নিশ্চিত হয় যে সেও সরকারবিরোধী হবে? কিংবা একজন মানুষ যদি ছাত্রজীবনে অন্য মতাদর্শ পোষণ করে, জীবনের বাকি সময়েও সে যে একই চিন্তায় থাকবে তার কোন নিশ্চয়তা আছে? মানুষের চিন্তাভাবনা পরিবর্তন হয় না? তাও আমাদের মত দেশে, যেখানে বছর বছর দল পাল্টানোই নিয়ম।
পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার যে মাঠ কর্মকর্তা, তিনি যে বায়াসড হন না তার নিশ্চয়তা কী? উপেক্ষা করার মত বিষয়কে তিনি কি বড় করে দেখাতে পারেন না? ঘুরেফিরে সেই প্রশ্নই আবার আসে- তাহলে কি পিএসসির চেয়ে পুলিশের একজন এসআই এর ক্ষমতা বেশি? গোয়েন্দা সংস্থার মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তার ক্ষমতা বেশি? একজন ছাত্রের শিক্ষাগত যোগ্যতা নয়, বরং গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে সন্তুষ্ট করাটাই তার প্রধান যোগ্যতা?
গোয়েন্দা সংস্থার মাঠ কর্মকর্তাকে দম্ভভরে এমন কথা বলতে শুনেছি- আপনার চাকরি তো আমার হাতে। আমি যা লিখবো তার ওপর নির্ধারণ হবে আপনার নিয়োগ!!
আর ভেরিফিকেশনের নামে কার পকেটে কত জমা পড়ে, সে হিসাব নাহয় নাই করলাম।
আসি মামলার কথায়। কয়েকজনের নিয়োগ আটকে দেয়া হয়েছে, কারণ- তাদের নামে নাকি মামলা আছে। কারো নামে মামলা থাকলেই তার নিয়োগ আটকে যাবে- কী অদ্ভুত নিয়ম!!! মামলা তো যেকেউ করতে পারে শত্রুতা বশত। এই অযুহাতে চাকরি আটকানো কি বিচারের আগেই শাস্তি দেয়া নয়? এইটা কে না জানে যে বাংলাদেশের বেশিরভাগ মামলাই হয়রানিমূলক, ষড়যন্ত্রমূলক। এমন ঘটনাও আমার জানা আছে, অমুকের ছেলে বিসিএস পাশ করেছে শুনে পরদিনই তার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিয়েছে তমুক।
মজার ব্যাপার হলোঃ মামলা নিয়ে দেশের মন্ত্রী এমপি হওয়া যাবে, কিন্তু প্রজাতন্ত্রের সামান্য কর্মচারী হওয়া যাবে না। সেলুকাস! কী বিচিত্র নিয়ম!!
বিসিএস উত্তীর্ণরা সবাই দীর্ঘদিন ধরে বিসিএস এর প্রিপারেশন নিয়েছে, ধৈর্য ধরে পরীক্ষা দিয়ে যোগ্যতা প্রমাণ করেছে। প্রজাতন্ত্রের সেবা করার ইচ্ছা ও মানসিকতা না থাকলে কেউ কি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হওয়ার জন্য এত কষ্ট করে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে যারা উত্তীর্ণ হয়েছে, তাদেরকে সংকীর্ণ দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বঞ্চিত করাতে দল বা প্রজাতন্ত্রের কী উপকারটা হবে?
ব্রিটিশ আমলে আইসিএস (ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস) এ নিয়োগের জন্য ব্রিটিশরা পুলিশের মাধ্যমে খবর নিত, প্রার্থী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত কিনা। স্বদেশী আন্দোলনে জড়িত কিনা।
ভারত স্বাধীন হবার পর সত্তুর বছর কেটে গেছে। আমরা দুইবার স্বাধীন হয়েছি, কিন্তু ঔপনিবেশিক গোলামীর সিস্টেম ছাড়তে পারি নাই।

শনিবার, ২৭ মে, ২০১৭

অধ্যাপক স্যারদের প্রতি নিবেদন....

ডাঃ এবিএম আব্দুল্লাহ স্যার ৩০০ টাকা ভিজিটে রোগী দেখেন। আরো অনেক প্রফেসর এরকমভাবে খুবই কম ভিজিট রাখেন। ব্যক্তিগত পর্যায়ে এটাকে তাঁদের মহানুভবতা বলা যায়। কিন্ত সমগ্র চিকিৎসক সমাজের জন্য এইটা কোন ভালো ব্যাপার না। চিকিৎসা পেশার জন্য এটা ক্ষতিকর, অপমানজনক।
আমি সবসময় প্রফেসরদের কম ভিজিটে রোগী দেখার বিপক্ষে। প্রফেসর যখন ৩০০ টাকায় রোগী দেখেন, তখন লোকেরা ভাবে- ডাক্তারের ভিজিট ৩০০ টাকার বেশি হওয়া উচিত না। একবার যখন কেউ প্রফেসরকে ৩০০ টাকায় দেখায়, এরপর অন্যকেউ চারশ বা পাঁচশ টাকা ভিজিট নিতে চাইলেই তাকে অর্থলিপ্সু মনে হয়। কারণ, তার স্ট্যান্ডার্ডটা ঠেকে আছে সেই ৩০০ টাকায়।
এভাবে প্রকারান্তরে নিজেদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। কেউ যখন ৩০০ টাকায় প্রফেসরের কনসালটেন্সি পাচ্ছে, তখন সে কেন একজন এমবিবিএস, একজন রেজিস্ট্রার বা সহকারী অধ্যাপককে দেখাতে যাবে? আর যদি প্রফেসরের সিরিয়াল না পেয়ে এসিস্ট্যান্ট প্রফেসরকেও দেখায়, তবু তার মনে একটা অসন্তুষ্টি থেকে যায় না? আহ, ৩০০ টাকা দিয়া তো অধ্যাপককেই দেখাতে পারতাম!!
গরীবকে ফ্রি চিকিৎসা দিন। কম নিন। কিন্তু যার টাকা আছে, তার কাছে কেন কম নেয়া হবে? তাকে তো দয়া দেখানোর কোন দরকার নেই। যার একবেলার নাস্তার বিল ১০০০ টাকা, সেলুনে গিয়ে যে দুইহাজার টাকা খরচ করে আসে, পার্লারে গিয়ে যে পাঁচহাজার টাকায় ফেসিয়াল করে আসে, তাকে কেন আপনারা ৩০০ টাকায় কনসালটেন্সি দিবেন? বলুন স্যার!
৩০০ টাকা যদি হয় প্রফেসরের ফি, তাহলে অন্যদের ফি কত হওয়া উচিত? পঞ্চাশ টাকা?
২.
শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক স্যার, জুনিয়র ডক্টর রেফার না করলে সে রোগী দেখবেন না প্লিজ। অনুগ্রহ করে ফি বাড়ান। ৩০০ টাকায় ৫০-৬০ জন রোগী না দেখে দুইহাজার টাকা ফি নিয়ে ১০ জন জটিল রোগী দেখুন। দেশের ১৬ কোটি মানুষকে তো একা সেবা দিতে পারবেন না।
কিন্তু আপনারা নির্বিচারে সব রোগী দেখাতে সত্যিকারের জটিল রোগীরাই আপনার কন্সালটেশন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক স্যার, আমি আপনাদেরকে চেম্বারে রোগী না দেখে ছাত্রদের শেখানোয় বেশি সময় দেয়ার অনুরোধ করছি। আপনি হয়তো নিজে ১০০ জন রোগীর ভালো চিকিৎসা দিচ্ছেন, কিন্তু আপনি আমাদের ১০০ জন ছাত্রকে আরো সময় দিলে, আরো ভালো করে শেখালে, আমরা হাজার হাজার মানুষকে ভালো চিকিৎসা দেবো।
শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক স্যার, রাত দুইটা পর্যন্ত রোগী দেখবেন না প্লিজ। রাত ২ টায় রোগী দেখে ঘরে ফিরলে, পরদিন সকাল বেলায় এসে ছাত্রদের শেখানোর ব্যাপারে কতটুকু আগ্রহ অবশিষ্ট থাকে? মাথা কতটুকু ঠান্ডা থাকে? প্রতিষ্ঠানে আপনাদের বেশিরভাগ সময় কাটে রাউন্ড দেয়া আর নানান প্রশাসনিক মিটিং এ। ছাত্ররা একটু ভুল করলেই মাথা গরম হয়ে যাওয়া কি স্বাভাবিক না? প্রিয় স্যার, আপনারা যখন রেগে যান, তখন আমরা শেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলি।
শ্রদ্ধেয় স্যার, ভেবেছেন কি- আপনারা আপনাদের মেধা ও জ্ঞান ছাত্রদের চেয়ে চেম্বারে রোগীদের পেছনে বেশি ব্যয় করছেন!!! তাও আবার ৩০০ টাকায়??? আর তার প্রতিদানে আজ কিনা আদালতের বারান্দায় গিয়ে বসতে হচ্ছে!! পলাতক আসামী হতে হচ্ছে!! আফসোস!! বড় আফসোস!!! কী নিদারুণ প্রতিদান দিচ্ছে আপনাদের রোগীরা!!
শ্রদ্ধেয় প্রফেসর স্যারদের কাছে আমার বিনম্র অনুরোধ, সারাজীবনের অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা যতবেশি সম্ভব আপনার ছাত্রদের দিয়ে যান। যত বেশি সময় সম্ভব ছাত্রদের পড়ান। হাতে কলমে শেখান।
সকালে শেখান। বিকালে শেখান। রাতে শেখান।
আমরা ছাত্ররা শেখার জন্য বুভুক্ষু হয়ে আছি। তৃষ্ণার্ত হয়ে আছি। রাত ১২ টা পর্যন্ত চেম্বারে রোগী না দেখে আমাদেরকে শেখান। নতুন নতুন বই লিখুন। আপনাদের কথাগুলো বইয়ের পাতায় রেখে যান প্লিজ।
প্রিয় স্যার, আপনারা বেঁচে থাকবেন ছাত্রদের মাঝে। রোগীর মাঝে নয়। রোগী আপনাকে ফি দেবে, কিন্তু ছাত্ররা আপনাকে যা দেবে তা আপনারা টাকায় মাপতে পারবেন না।