এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...

এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে

বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০১৬

আউটডোর

সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেললো হেলাল মিয়া । আজ হাসপাতালে যেতেই হবে । বেশ কিছুদিন ধরেই শরীরটা কেমন ম্যাজ ম্যাজ করছিলো । আজকাল খুব দুর্বল লাগে তার । দু’একটা খেপ দিলেই হাঁপিয়ে উঠতে হয়। তবু কোনমতে চালিয়ে নিচ্ছিল এতদিন । কিন্তু আজ আর কোনভাবেই রিকশা নিয়ে বের হওয়া সম্ভব না । এই শরীরে রিকশা নিয়ে বেরুলে আর ঘরে ফেরা হবে কিনা সন্দেহ । কোথায় মাথা ঘুরে পড়ে থাকবে কে জানে !
-‘কইগো হেনার মা, দেহ দেহি রফিক্যা আছে নি বাড়িত । আমারে এট্টু ডাহা মেডিকেলত দিয়া আসবার ক-তো । আইজকা যাইতেই অইবো, এইবাভে আর থাহন যায়না’ ।
মেঝেতে চট বিছিয়ে মেয়েকে পাশে বসিয়ে সরিষার তেল মাখা গরম ভাত খায় হেলাল মিয়া । প্লেটের ওপর কাঁচামরিচ ও আলুভর্তা । আলুভর্তাটা ভালোই বানায় হেনার মা । খেতে খেতে মেয়েকে আদর করে হেলাল । এরইমধ্যে রফিক মিয়ার কন্ঠ শোনা যায় ।
-‘হেলাল বাই, রেডি অইছো নি? তাড়াতাড়ি খাইয়া লও । দেরি অইয়া যাইতাছে’।
এই বস্তির অনেকেই রিকশা চালায় । রফিক মিয়াও তাদের একজন । হেলাল মিয়ার পাশের ঘরেই থাকে ।
ঢাকা মেডিকেলের আউটডোর বিভাগের সামনে এসে নামে হেলাল মিয়া । রফিক তার রিকশা নিয়ে চলে যায় অন্য দিকে । হেলাল মিয়া ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় ‘বহিঃবিভাগ’ গেটের দিকে ।
জীবনে কোনদিন এই হাসপাতালে আসেনি হেলাল মিয়া । সে বুঝতে পারেনা কী করবে । আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো অনেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে টিকেট কিনছে । ‘এইহানেও টিকিট লাগে?’ ভাবতে ভাবতে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ে সে । ‘বাই, টিহিট কত?’ সামনের জনকে জিজ্ঞেস করে হেলাল । ‘দশ টেহা’ । ঝাঁঝালো জবাব পায় সে । এই প্রশ্নের উত্তরে এত ঝাঁঝ দেখানোর কী আছে ভেবে পায়না হেলাল ।
দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মাথা ঝিম ঝিম করে হেলালের । যখন সে কাউন্টারের সামনে এসে পৌঁছে, ততক্ষণে আধা ঘন্টার বেশি পার হয়ে গেছে । সময়টা হয়তো আরও বেশিই হবে, কিন্তু হেলাল মিয়ার হাতে যেহেতু কোন ঘড়ি নেই, তাই আন্দাজ করা আর ছাড়া কোন উপায় নেই তার ।
-‘টেহা বাইর করো মিয়া । সমুস্যাডা কী?’
বেশ ধমকের স্বরেই জানতে চায় কাউন্টারে বসা লোকটি । মিনমিন করে হেলাল জানায়- তার ‘শইল্যে ব্যথা’, ‘মাথা গুরে’, ‘বুক দরফর করে’ । একটা ছোট্ট কাগজে নাম ও নম্বর লিখে হেলালের হাতে দেয় লোকটি । বলে- ‘যাও, মেডিসিন আউটডোরে চইল্যা যাও’ ।
-‘ঐ মিয়া, এত সুমায় লাগে ক্যা?’ তাড়া দেয় হেলালের পেছনে দাঁড়ানো মধ্যবয়স্ক লোকটিও ।
হেলাল মিয়া দুএকজনকে জিজ্ঞেস করে মেডিসিন আউটডোর চিনে নেয় । সেখানেও লাইনে দাঁড়াতে হয় তাকে । প্রায় ঘন্টাখানেক অপেক্ষার পর সে ডাক্তারের সামনে গিয়ে পৌঁছে । এর মধ্যে গেটে দাঁড়ানো লোকটি তাকে দু’তিনবার ধমকায়। ডাক্তার সাহেব অবশ্য ভালো করেই দেখেন হেলালকে । তিনি কিছু ঔষধ লিখে দেন । আর বুকের এক্সরে, রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করাতে বলেন । ডাক্তারের রুম হতে বেরুতে বেরুতে হেলালের কানে আসে শ্লেষমাখা কন্ঠ- ‘ঐ মিয়া কী হইছে তুমার? এত সুমায় লাগাইলা ক্যান? আর হেই ডাক্তারে কিছু জানে নি? অতক্ষণ লাগে একজন রুগি দেইখতে?’
সেই কাগজ নিয়ে হেলালকে যেতে হয় অন্য একটি রুমে । সেখানে তার নাম এবং স্লিপ নম্বর লিখে নতুন কয়েকটি কাগজ ধরিয়ে দেয় একজন নার্স । তারপর ঐসব কাগজ নিয়ে একে ওকে জিজ্ঞেস করে অলিগলি পেরিয়ে ‘নিউ বিল্ডিং’ এ পৌঁছায় হেলাল । সেখানে আবার লাইনে দাঁড়িয়ে ‘টাকা জমা’ দেয় সে । টাকা জমার স্লিপ নিয়ে সে একে একে এক্সরে বিভাগে গিয়ে ‘বুকের ছবি’ ওঠায়, রক্তের নমুনা দেয় অন্য আরেকটি রুমে, সেখান থেকে বেরিয়ে অন্য একটি রুমে গিয়ে প্রস্রাবের নমুনা দেয় । প্রতিবারই তাকে গড়ে আধাঘন্টা থেকে একঘন্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় । দারোয়ান ও টেকনিশিয়ানদের ধমক শুনতে হয় । সবখান থেকেই একদিন পরে এসে রিপোর্ট সংগ্রহ করতে বলা হয় হেলালকে ।
হেলাল খেয়াল করে, রিপোর্ট সংগ্রহের লাইনটাও অত ছোট না ।
‘যুহর কি হইয়া আইলো নাকি?’ আকাশের দিকে তাকায় হেলাল । কিন্তু তার চোখ কংক্রিটের ছাদে বাধা পেয়ে ফিরে আসে ।
দুর্বল শরীর নিয়ে গেটে ফিরে আসে হেলাল মিয়া । রফিককে বলা আছে, যোহরের সময় সে গেটে থাকবে । হেলালকে বাড়িতে পৌঁছে দেবে ।
এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে পা ব্যথা হয়ে গেছে হেলালের । ডাক্তারের সামনে কয়েক মিনিট ছাড়া আর কোথাও বসার সুযোগ হয়নি তার । এখন মনে হয় ‘মাথাটাও ঘুরছে’।
কোনরকমে গেটে পৌঁছে ফুটপাতের ওপর দাঁড়ায় হেলাল । তার চোখ খুঁজে ফেরে রফিক মিয়াকে । ‘ঐ তো , ঐতো রফিক আইছে’। মনে মনে খুশি হয় হেলাল মিয়া । কিন্তু রফিকের উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই হঠাৎ চোখ অন্ধকার হয়ে আসে তার। জ্ঞান হারানোর আগে একবার রফিকের কন্ঠ কানে আসে- হেলাল বাই, কী অইছে হেলাল বাই? এমুন করতাছ ক্যান? হেলাল বাই, এমুন করতাছ ক্যান?

মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০১৬

শীতবস্ত্র বিতরনঃ গরীবের কষ্টলাঘব নাকি আত্মতৃপ্তির এডভেঞ্চার?

কাউকে নিরুৎসাহিত করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয় । শীতবস্ত্র বিতরন অবশ্যই ভালো কাজ, সন্দেহ নেই । কিন্তু প্রতিবছর ঠিক যে প্রক্রিয়ায় ঘটা করে শীতবস্ত্র বিতরনের মহোৎসব হয়, সেই প্রক্রিয়াটি নিয়েই আমার কিঞ্চিৎ ভিন্নমত ।
প্রশ্নটা হচ্ছে, এইযে প্রতিবছর এত এত শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়, শীতার্ত মানুষ কি আসলে কমে? যারা শীতবস্ত্র বিতরন করেছেন, তাঁরা কি কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেন, তাঁর দেয়া কাপড়টা সত্যিই গ্রহীতার কষ্টলাঘব করেছে কিনা? পুরো একটি পরিবারের সবার শীত-কষ্ট দূর হয়েছে কিনা?
নাকি ব্যাপারটা আসলে এমন- সবাই শীতের কাপড় বিলায়, কিন্তু কেউ শীতমুক্ত হয় না !

শীতবস্ত্র বিতরন যেমন ভালো কাজ, তেমনি আত্মতৃপ্তির উপায়ও বটে ! বেশকিছু শীতবস্ত্র বিতরন করলে অন্তত এই আত্মতৃপ্তিটা আসে- গরীব দুঃখী মানুষের জন্য কিছুটা হলেও ভালো কাজ করলাম ! আর দূর-দূরান্তে গিয়ে শীতবস্ত্র বিতরন করে আসার মধ্যে একটা এডভেঞ্চারও থাকে !
মনে আছে, মানুষের কষ্ট লাঘবের নেক-নিয়তেই এক রাতের বেলা রেলস্টেশনে পথশিশু- ভিক্ষুকদের মাঝে শীতবস্ত্র দিতে বেড়িয়েছিলাম । কাজটা ভালো ছিল, নিয়তও সহি ছিল , রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ফুটপাতে-প্লাটফর্মে ঘুমানো মানুষের মাঝে কম্বল তুলে দেয়ার মাঝে একটা এডভেঞ্চারও ছিল । কিন্তু তা দিয়ে কার কতটুকু শীতলাঘব হয়েছিল তা আমার জানা হয়নি ।
সকাল হতে না হতেই কম্বলখানি কে-কে বিক্রি করে দিয়েছিল সে খবরও জানা হয়নি ।
আপনি কি সত্যিই মানুষের কল্যাণ, মানুষের কষ্ট দূর করতে চান? নাকি একটা শীতবস্ত্র বিতরনের এডভেঞ্চার নিতে চান? নাকি ‘মানুষের জন্য কিছু করলাম’ ভেবে কিছুটা আত্মতৃপ্তি পেতে চান? যদি প্রথমটি হয়, তাহলে আমি অনুরোধ করবো, এলোপাথারি শীতবস্ত্র ছড়াবেন না । এবছর রাস্তার ছেলেদের, পরেরবছর রেলস্টেশনে, তারপর এই বস্তিতে,আর তারপর সেই গ্রামে, এরকম বিক্ষিপ্তভাবে শীতবস্ত্র দিয়ে কোন লাভ নেই । বরং আপনি বা আপনার গ্রুপ টার্গেট করুন একটা নির্দিষ্ট গ্রামকে । ঐ গ্রামে কার কার আসলেই শীতবস্ত্র প্রয়োজন যথাসম্ভব হিসাব করে নিন । তারপর লিস্ট ধরে সবাইকে কাপড়-কম্বল দিন । এককভাবে সামর্থে না কুলালে অন্য কোন গ্রুপকে আপনার সাথে নিন বা আপনিই অন্য কোন গ্রুপের সাথে যোগ দিন । টার্গেট থাকুক, অন্তত ঐ একটি গ্রামের মানুষকে আপনারা শীতের কষ্ট থেকে সত্যিকারার্থে মুক্তি দেবেন । এবং পরেরবছরও আগে ঐ গ্রামের মানুষের খোঁজ নিবেন । তারপর অন্যদিকে নজর দিবেন । আর শুধু শীতবস্ত্র দিয়েই শেষ নয়, যাদেরকে দেয়া হবে তাদেরকে এই মোটিভেশনও দেয়ার চেষ্টা করুন- তারা যেন এসব কাপড়-কম্বল বিক্রি না করে ।
ভালো কাজগুলো বিফলে না যাক, আমাদের কষ্টগুলো সত্যিকাররার্থেই মানুষের কল্যানে কাজে লাগুক । যারা সত্যিই গরীব মানুষের কষ্টে ব্যথিত হন, তাঁদের জন্য রইলো শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন ।

শুক্রবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৫

আত্মজিজ্ঞাসা

অনেক তো পেরুলো সময় !
অনেক অনেক দিন, সাদাকালো রাত,
দুপুর, বিকেল ।
অনেক সূর্যাস্ত হলো পশ্চিম আকাশে
অসংখ্যবার ফিকে হয়ে এলো
গোধূলীর রঙ ।

এখন কি এসেছে সময় নিজেকে শুধাবার?
কতদূর হাঁটা হলো? কতযুগ সময়ের পরে,
কতটুকু চেনা হলো পৃথিবীর পথ? কতটা জমিন, কতটুকু মন, আর
কতজন মানুষের প্রতি-
জন্মালো অধিকার?

বুধবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৫

চিঠি

জানিস, মাঝে মাঝে আমার
নিজেকে খুব জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়ঃ এইযে সোনালি বিকেলগুলো
কাটিয়ে দিচ্ছি এইভাবে, কনক্রিট ঘেরা চার দেয়ালের
বদ্ধ ঘরে...
কীসের প্রয়োজনে? কিংবা, কীসের প্রলোভনে?
.
তোকে বলা হয়নি- এইসব বিকেলে
গোধূলীর বদলে এখন আমার চোখে আসে
নিয়নের সাদা আলো ; পাখির ডাক হয়ে কানে বাজে
পুরনো এয়ারকুলারের-
একটানা বিদঘুটে শো শো আওয়াজ ।
আর জানিস, বহুদিন ধরে
নরম ঘাসের ভূমিকায় জব্বর অভিনয় করে চলেছে
একজোড়া কাঠের চেয়ার !
.
এই শহরে বিকেল বেলায়
ইউটিউবে দেখি সূর্যাস্ত ! উড়ে যাওয়া সাদা বক,
দোয়েল শালিকের ঝাঁক !
রাখালিয়া বাঁশির সুর-
নিত্য শুনি মিউজিক প্লেয়ারে। বন্ধ জানালায়
হোঁচট খেয়ে ফিরে এলে উদাস দু'চোখ
পুরনো ডায়েরির বদলে, স্ক্রল করে যাই
পুরনো দিনের
ফেসবুক টাইমলাইন !
....
কিন্তু জানিস, ওতে কোন হৃদয়ছোঁয়া ঘ্রাণ আসে না।
ওতে খুঁজে পাইনা হারিয়ে যাওয়া পুরনো হলুদ খাম, কিংবা
চ্যাপ্টা হয়ে থাকা
গোলাপের পাপড়ি...

বৃহস্পতিবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৫

পে স্কেল নিয়ে চিকিৎসকদের হতাশা

আমি সরকারি কর্মচারি নই, চিকিৎসক হিসেবে সরকারি চাকরি করা ঠিক হবে কিনা তা নিয়ে প্রায়শই দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে 'না' এর পাল্লাটাই ভারী থাকে । কিন্তু সরকারি কর্মচারিদের জন্য ঘোষিত নতুন পে স্কেল আমাকে আরো বেশি নেতিবাচক ভাবনায় ফেলে দিয়েছে ।
নতুন পে স্কেল নিয়ে সিনিয়র চিকিৎসকদের হতাশা উদ্বেগের বিষয় । একজন চিকিৎসক লিখেছেনঃ '১৩ বছর চাকরি করে আমি এখন ৭ম গ্রেডে, আর প্রশাসন পুলিশ পররাষ্ট্র ক্যাডারে আমার ব্যাচমেটরা ৪র্থ গ্রেডে । চিকিৎসক হিসেবে এই অপমান সহ্য করা যায়না । হয়তো সরকারি চাকরি ছেড়েই দিতে হবে !'
সত্যিই অদ্ভুত ব্যাপার । একই বিসিএস এ উত্তীর্ণ হয়ে, একই পরিমাণ সময় সার্ভিস দিয়েও টেকনিকাল ক্যাডাররা তিন গ্রেড পেছনে কেন? কারা এই মূল্যায়ন করলো ? এর অর্থ কি এটাই যে প্রশাসন ক্যাডার বা পুলিশ ক্যাডার সরকারের জন্য অপরিহার্য? বাকিরা অপশনাল ? তারা হুকুমের গোলাম মাত্র?
এই অবমূল্যায়ন যে বার্তা জানান দিলো তা দেশের জন্য খুব খারাপ । এমনিতেই প্রতিবছর শতশত ডাক্তার সরকারি চাকরি ছেড়ে চলে যান । আগামীতে এই হার নিশ্চিতভাবেই বাড়বে । দেশের মানুষের জন্য এটা কোন ভালো সংবাদ নয় ।

মঙ্গলবার, ১ ডিসেম্বর, ২০১৫

ভিক্ষুক

'ভাইজান, কয়ডা টাহা দ্যান। সকাল থাইকা কিছু খাই নাই। বাচ্চা দুইডারেও কিছু খাওয়াইতে পারি নাই।'
আজিজ সুপার মার্কেটের সামনে মোড় ঘুরতেই এক মহিলার কন্ঠ কানে আসে নাবিলের। মহিলার সাথে অল্প বয়সের দুটি বাচ্চা।
নাবিল দাঁড়াতেই মহিলা মুখ কাঁচুমাচু করে এগিয়ে আসে। বয়স ত্রিশের কোঠায় হবে বলে মনে হয়। রোগা নয়, শক্তসমর্থই।
-কেন, খাননি কেন? আপনার স্বামী নেই? আপনি কোন কাজ করেন না? প্রশ্ন করে নাবিল।
-ভাইজান, হবিগঞ্জ থাইকা ঢাকা আসছি কাজকামের খোঁজে। কোন কাম জোগাড় করবার পারি নাই। অহন ফিরা যামু তারও কোন ব্যবস্থা নাই। একটা টেহা নাই হাতে।

নামকরা রেস্টুরেন্টে বন্ধুদের সাথে বুফে ডিনার সেরে বাসায় ফিরছিল নাবিল। কোন কোন আইটেম অসাম লেগেছে আর কোনটা একটু খারাপ হয়েছে তা নিয়েই ভাবছিল সে। এমন সময়ে এরকম অনাহারি মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে অপরাধী মনে হলো তার । আবেগে আপ্লুত হয়ে গেল সে। আহা! আমি একবেলা খাবারের জন্য হাজার টাকা খরচ করলাম! কত কিছু খেলাম। অথচ এই মহিলা সকাল থেকে না খেয়ে আছে! আর বাচ্চা দুটো! আহা! না খেয়ে কী কষ্টই না হয়েছে বাচ্চা দুটির।
'আসেন মা, আমার সাথে আসেন। আমি আপনাদের খাওয়াবো। তারপর বাস স্ট্যান্ডে নিয়ে যাবো। আমি নিজে টিকেট কেটে হবিগঞ্জের গাড়িতে উঠিয়ে দেবো'।
মহিলাকে তার পেছন পেছন আসতে বলে হাঁটতে শুরু করে নাবিল। ভালো রেস্টুরেন্টেই খাওয়াবে সে ওদেরকে। মহিলা অবশ্য একবার বলেছিল, ভাইজান, কিছু টাকা দেন। আমরা খাইয়া নিমু। কিন্তু নাবিল আজকে অল্প কিছু টাকা দিয়েই তার দায় সারতে চায় না। সে নিজে সাথে থেকে তাদেরকে খাওয়াতে চায়, নিরাপদে বাড়ি ফিরে যাবার সুব্যবস্থা করে দিতে চায়।
আনমনা হয়ে হাঁটতে থাকে নাবিল । শাহবাগ মোড়ে ভালো কোন খাবার দোকান নেই। কাঁটাবন বা হাতিরপুল এলাকায় দুএকটা ভালো রেস্তোরাঁ আছে। মিনিট পাঁচেক হাটলে কোন একটায় পৌঁছানো যাবে।
ধীরেই হাটছিল সে। রাস্তায় ভীড়ও তেমন নেই এখন। হাটতে হাটতে দেশের গরীব দুঃখী মানুষের জন্য কাজ করার পরিকল্পনা করতে থাকে । এভাবে একজন দুজনকে একবেলা দুবেলা খাইয়ে কিছু হবে না। দারিদ্র্যের মূলে কুঠারাঘাত করতে হবে। বৈষম্য রোধ করার ব্যবস্থা করতে হবে। ধনীদের সম্পদ থেকে গরীবের হক আদায় করে নিতে হবে।
ভাবতে ভাবতে 'চায়না কিচেন' রেস্তোরাঁর সামনে এসে দাঁড়ায় নাবিল । সবাইকে নিয়ে ভেতরে ঢোকার জন্য পেছন ফিরে তাকায় সে। কিন্তু একী? কোথায় গেল মহিলা? এদিক ওদিক ভালো করে নজর বুলায় সে । নাহ, কোথাও নেই। ওরা কি পেছনে রয়ে গেল?
কাঁটাবন মোড় পর্যন্ত ফিরে এসে ভালো করে খুঁজলো সে। কিন্তু কোথাও তাদের আর কোন হদিস পাওয়া গেলনা।
বাসায় ফিরতে ফিরতে একটা প্রশ্ন চকিতে উদয় হলো নাবিলের মনে- মহিলা কি তাহলে মিথ্যা বলেছিল? আসলে সে একজন পেশাদার ভিক্ষুক?

বুধবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৫

সান্ত্বনা

‘বাবা একটু আসবেন, রোগীর খুব শ্বাসকষ্ট হইতাছে’ ।
চোখ তুলে তাকালো মুনির । দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ । বেড নাম্বার তেত্রিশ, মনে পড়লো মুনিরের । ঐ রোগীরই শ্বাসকষ্ট হবার কথা ।
হাসপাতালে নাইট ডিউটিতে আছে ডাঃ মুনির । কয়েক মিনিট হলো, সবগুলো রোগী দেখা শেষ করে ডক্টরস রুমে এসে বসেছে । এরই মধ্যে বৃদ্ধ চলে এসেছেন ডক্টরস রুমের দরজায় ।
বৃদ্ধের স্ত্রীই তেত্রিশ নম্বর বেডের রোগী । মায়মুনা বেগম । অনেকক্ষণ ধরেই শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল তাঁর । মুনির এসে কিছু জরুরি ব্যবস্থা নেয়ায় শ্বাসকষ্ট কমেছিল কিছুটা । কিন্তু এরই মধ্যে আবার বেড়ে গেছে । রোগীর যা অবস্থা, শেষমেষ হয়তো তাকে বাঁচানো যাবেনা । বাঁচানোর জন্য আরো কিছু চেষ্টা করা যায়, কিন্তু সেটা এইখানে, সরকারি হাসপাতালের এই জেনারেল ওয়ার্ডে সম্ভব নয় ।

বৃদ্ধের সাথে আবারো রোগীর কাছে গেল মুনির । আরো একবার পরীক্ষা করে দেখে দায়িত্বরত নার্সকে নতুন কিছু নির্দেশনা দিল । তারপর বৃদ্ধকে একপাশে ডেকে নিলো সে।
‘বাবা, আপনাকে তো আমি আগেও বলেছি, আপনার রোগীর অবস্থা খুব খারাপ । তাঁর কিডনিতে সমস্যা আছে, কিডনি ঠিকমত কাজ করছে না । ফুসফুসে জীবাণু সংক্রমণ হয়েছে, পানি জমে গেছে । সেকারণে ঠিকমত শ্বাস নিতে পারছেন না । শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে । হার্টের ওপর চাপ বাড়ছে । যেকোন সময় হার্ট এটাক হতে পারে । যেকোন কিছু ঘটে যেতে পারে । আইসিইউ তে নিতে পারলে শেষ চেষ্টা করা যেতে পারে । কিন্তু এই হাসপাতালের আইসিইউ তে এই মুহূর্তে কোন বেড খালি নাই । আপনি কি অন্য কোথাও নিতে পারবেন?’
বৃদ্ধ কোন জবাব দিলেন না।
মুনির খেয়াল করলো, বৃদ্ধের চোখ ছলছল করছে । অদ্ভুত শুন্যতা সেখানে । মুখে বলার প্রয়োজন নেই, কখনো কখনো চোখের ভাষাই সব বলে দেয় । বুঝে ফেললো মুনির, এখানেই যা হবার হবে, এর চেয়ে বেশি কিছু করার সামর্থ বৃদ্ধের নেই ।
সুযোগ-সামর্থের মধ্যে যা করার আছে, সবকিছু করে ডিউটি রুমের দিকে পা বাড়ালো মুনির । একবার পেছন ফিরে দেখলো, বৃদ্ধ গিয়ে বসেছেন স্ত্রীর বিছানায় ।
আবেগের একটা তরঙ্গ যেন ছুঁয়ে গেল মুনিরকেও । 'বৃদ্ধ' ! আমরা কত সহজেই শব্দটা উচ্চারণ করি! অথচ একদিনে কেউ বৃদ্ধ হয়না, হওয়া যায়না। বৃদ্ধ হতে হলে পৃথিবীর মাটিতে একটা সম্পূর্ণ জীবন কাটিয়ে দিতে হয়।
তেত্রিশ নম্বর বেডে বসে থাকা এই দু’জন মানুষ কতবছর একসাথে কাটিয়েছেন কে জানে ! কয়েক যুগ তো হবেই । অথচ কী অদ্ভুত! আজ রাতেই হয়তো চিরবিচ্ছেদ হয়ে যাবে দু’জনের মধ্যে । একজন চিরতরে হারিয়ে যাবে পৃথিবী থেকে, আরেকজন অপেক্ষা করবে এমনই কোন দিনের । এমনই কোন রাতের । আর কখনো এই দুজনের দেখা হবে কিনা, কেউ জানে না ।
মুনির ভাবলো, এই মুহূর্তে বৃদ্ধের যে অনুভূতি, পৃথিবীর কোন কবি কিংবা কোন ঔপন্যাসিক কি কখনো তা বর্ণনায় তুলে আনতে পারবে?
বুক থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো মুনিরের । এরকম সময়ে নিজেকে খুব অসহায় লাগে তার । নিজেকে পরাজিত মনে হয়, ব্যর্থ মনে হয়।
মানুষের 'ডেথ সার্টিফিকেট' লেখা কোন সহজ কাজ নয়। কিন্তু এটাও সত্য, মানুষ অমর নয়। মৃত্যুকে ঠেকানো যায় না। প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।
ডক্টরস রুমের পুরনো কাঠের চেয়ারটিতে বসে নিজেকে সান্ত্বনা দেয় মুনির- ‘আমরা রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারি; মৃত্যু নয়’।

মঙ্গলবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৫

নামতে হবে পুরনো মেঠোপথে ।

দিন রাত জোছনা সবকিছু একাকার হয়ে আছে এই শহরের
বহুতল ভবনের কার্নিশে।
ফলস সিলিং এর ভেতর নিরন্তর জ্বলে আছে নিয়নের সাদা আলো;
আর আমি
নির্বিকার বসে আছি এইখানে, নির্লিপ্ত হৃদয়ে।
মনে হয় অনন্তকাল পেরিয়ে গেছে! কে জানে,
জানালার বাইরে পৃথিবীটা আছে কিনা আগের মত! এ পৃথিবীতে
আজও কি ভোর হয় সূর্যের লালচে আলোয়?
এখনো কি বিকেল নামে নীড়ে ফেরা পাখিদের কোলাহলে?
...
ফুটপাত জুড়ে অগনিত মানুষের সারি। তবু
অদ্ভুত নির্জনতা বোধ হয় এঘরের কাঁচের জানালায়
দেয়ালের এইপাশে ।
মাথার ওপর-
অবিরাম ঘূর্ণায়মান বৈদ্যুতিক পাখার শো শো আওয়াজ
যেন জানিয়ে দিচ্ছে এই সময়ের আন্তরিক আহ্বানঃ বদ্ধ প্রকোষ্ঠ ছেড়ে
পথে নামতে হবে, হে পুরনো যোদ্ধা! আরো একবার
নামতে হবে ধুলো ওড়া পুরনো মেঠোপথে ।

মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০১৫

এবার অবসরে যাবো আমি

আসন্ন শীতের ঠান্ডা বাতাস গায়ে মেখে
হিমায়িত করে নেবো আমার সমগ্র অস্তিত্ব
হৃদয়, শরীর ও মন ।
আমি এক আজন্ম যোদ্ধা, তবু
সবাইকে টপকে যাবার অশুভ যুদ্ধ হতে
এবার অবসরে যাবো আমি; কারবালাফেরত
বৃদ্ধ সৈনিকের মত।
.
রণভেরির অদ্ভুত আওয়াজ, ধুলোর কুয়াশার ভেতর-
ঢাল তলোয়ার নিয়ে দিনভর অস্থির চলাচল,
আর কত?
এইসব যুদ্ধের তো শেষ বলে কিছু নেই!
এইসব যুদ্ধে তো স্থায়ী বিজয় নেই! এখানে
জয় পরাজয় আসে পালাক্রমে; দিনের পরে রাত
গ্রীষ্মের পরে বর্ষার মত।
.
অসংখ্য যুদ্ধের স্মৃতি, বিজয়ের সুখ,
আর পরাজয়ের তীব্র বেদনা বুকে নিয়ে
অবসরে চলে যাবো আমি
এই শীতে।

রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০১৫

সংশয়

এইসব হেমন্তের ভোরে
প্রতিটি সূর্যোদয় নিয়ে আসে ভিন্ন রঙের নতুন দিগন্ত
আর আমিও নিজেকে জড়াই নিত্যনতুন মোহ মরীচিকায়।
নির্বোধ পতংগের মত
যতটা উজ্জ্বলতা দেখে ছুটে যাই-
তার চেয়ে বেশি উত্তাপ গায়ে মেখে
পোড়া শরীর নিয়ে ফিরে আসি।
.
এইভাবে,
রূঢ় বাস্তবতার সোনালী আভায়
কুয়াশার মত কেটে গেছে অগুণতি মোহের আবরণ।
রেখে গেছে ক্ষতচিহ্ন; সংশয়, দ্বিধা, দ্বন্দ্ব।
প্রতিটি পদক্ষেপেই এখন 'সন্দেহ' জেগে ওঠে -
আমি কি এখনো মোহাবিষ্ট হয়ে আছি? কিংবা
যে পথে বাড়িয়েছি পা
তারও মঞ্জিল কি কোন এক
ঝিলমিল মরীচিকায়?

বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৫

ফিনিক্স !

একপাল মাতাল বুলডোজার বহুদিন ধরে
ক্রমাগত গুঁড়িয়ে চলেছে- আমার চলার পথ;
এবং আমাকেও।
তবু আমি-
এক অদ্ভুত ধ্বংসস্তুপ হয়ে আজও বেঁচে আছি।
আমি রুপকথার ফিনিক্স নই; মাথা কাটা গেলে-
আমার শুন্য গর্দানে- একটাও নতুন মস্তক গঁজিয়ে ওঠেনি ।
উন্মত্ত বুলডোজারের অবিরাম আঘাত সয়ে সয়ে
বহুকাল আগেই দেহ-মস্তক বক্ষহীন হয়ে গেছি আমি, তবু
ধ্বংসস্তুপের গভীরে বাঁচিয়ে রেখেছি
হৃদয়ের কোমলতা ।
আর্দ্র হৃদয় ছাড়া
কীইবা অর্থ থাকে মানুষের জীবনে?

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৫

দ্বিমুখ !

মহাবিরক্ত হয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন রহমত সাহেব । ব্যাংকের কাজ শেষ করে বের হতে আজ আটটা পেরিয়ে গেছে । ব্যাংকারদের জীবনের এই দিকটা রহমত সাহেবের কাছে এখন অসহ্য লাগে । সকাল হতে সন্ধ্যা, বলা চলে রাত পর্যন্ত একটা জায়গায় প্রতিদিন একই কাজ করে যেতে হয় । দিনের আলো চোখে দেখা হয়না ।
এই যেমন আজ সাড়ে আটটা বেজে গেল অফিস থেকে বের হতে হতে । তারপরও শান্তি নেই । বাসায় ফেরা মানে আরেক যুদ্ধ । কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, কোনো বাসে উঠতে পারছেন না । দুএকবার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু বাসের দরজার হ্যান্ডেল ধরারও সুযোগ হয়নি । মানুষজনের ওপর তিনি ক্ষুব্ধ । একটু চেপেটেপে দাঁড়ানো যায়না? তাহলে তো আরো দু-একজন উঠতে পারে !
বিরক্তির শেষ সীমায় পৌঁছে শেষমেষ একটা বাসে উঠতে পারলেন রহমত সাহেব । যথারীতি কন্ডাকটরের চিৎকার কানে আসতে লাগলো। ‘মামা একটু চাইপা খাড়ান, পেছনে খালি আছে । এ ভাই চাইপা খাড়ান না ক্যান?’
এমনিতেই তিরিক্ষি হয়ে ছিল, কিন্তু এবার মেজাজটা একেবারে বিগড়ে গেল রহমত সাহেবের । তিনি গলা চড়িয়ে বললেন- ‘ঐ ব্যাটা, তোগো পেট ভরে না? এত মানুষ তুলছস বাসের ভিত্রে, আর একটা লোকও তুলবি না কইলাম!’ নানা কথায় আরো কিছুক্ষণ গজরাতে থাকলেন তিনি ।
[পরিশিষ্টঃ ঠিক সেই মুহূর্তে বাসের দরজায় ঠাঁই না পেয়ে ফিরে গেলেন আরো একজন ক্লান্ত মানুষ । হয়তো তিনিও একজন অফিস ফেরত রহমত আলী...।]
‪

সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৫

একদিন হারিয়ে যাবো

অতীতের দিকে তাঁকালে এখন অনেক কিছুই ঝাঁপসা লাগে, সবকিছু কেমন অস্পষ্ট মনে হয়। কত চেনা মুখ, কত প্রিয় অপ্রিয় মানুষ, কত বন্ধুতা শত্রুতার কাহিনী, কত উজ্জ্বল দিন, স্মরণীয় রাত, কত গান কত কথা, সবকিছু অস্পষ্ট লাগে। সবকিছু যেন আজ ঝাঁপসা মনে হয়।
আজকের দিনগুলোও একদিন ঝাঁপসা হয়ে যাবে, অস্পষ্ট হয়ে যাবে এইসব ছবি । মূল্যহীন হয়ে যাবে এইসব অর্জন কিংবা ব্যর্থতা।
তারপর, একদিন আমিও ঝাঁপসা হয়ে যাবো । একদিন আমার চেহারাও অস্পষ্ট হয়ে যাবে, একদিন আমার কন্ঠটাও অচেনা হয়ে যাবে । আবছায়ায় ঢেকে যাবে আমার মুখ।
তারপর একদিন, পৃথিবীর কেউ- কোথাও আমার কোন চিহ্ন খুঁজে পাবে না ।

বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০১৫

নির্বোধ !

কাঠঠোকরার মত ক্রমাগত ঠোকর মেরে আমার হৃদয়ে
অগণিত ক্ষত বানিয়ে চলেছে অদ্ভুত সময় !
আর আমি কিনা এক সুস্পষ্ট মরীচিকার পিছু নিয়ে
বদ্ধ পাগলের মত হো হো করে হাসতে হাসতে এগিয়ে চলেছি
অজানা গন্তব্যে !
.
অদ্ভুত ছলনায় আটকে পড়েছি আমি; পুরোটা শরীর
চোরাবালির মত ক্রমাগত ডুবে যাচ্ছে বস্তুচেতনায়।
কাল কী হবে- এই ভাবনায় ভুলে যাচ্ছি আজকের গান;
আর
ভবিষ্যতের কথা ভেবে নির্বোধের মত,
লু হাওয়ায় উড়িয়ে দিচ্ছি প্রতিদিন
মূর্ত বর্তমান।

বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০১৫

ঘোড়দৌড় !

নিরবচ্ছিন্ন খাদ্য সরবরাহ পেয়ে
হৃষ্টপুষ্ট হয়ে ওঠা একপাল টাট্টু ঘোড়ার সাথে
নেমেছি ঘোড়দৌড়ে; আমি এক
অদ্ভুত রেসের ঘোড়া।
জীর্ণশীর্ণ দেহ,
চার পায়ে জড়ানো নানান শেকল
তবুও ছুটছি, অথবা ভান করছি ছুটবার।
.
এই উদ্দাম রেসকোর্সে, বলা চলে ঝিনুক শামুকের মত
গড়িয়ে গড়িয়ে এগিয়ে চলেছি আমি
গন্তব্যের পানে। প্রশ্নটা হলো,
এইভাবে কি কখনো হর্সরেস জেতা যায়?

বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০১৫

'সাকিন'

অনেকদিন আগে বিটিভিতে একটা নাটক দেখেছিলাম। যতদূর মনে পড়ে নাটকের নাম ছিল 'সাকিন'। নাটকে একজন জমিদারের তালুকে অন্য একজন উত্তরাধিকারী তার অংশ দাবি করলে তাকে সুযোগ দেয়া হয়- সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যতদূর পর্যন্ত দাগ দিতে পারবে, সবটুকু জমি তাকে দিয়ে দেয়া হবে।
.
বেচারা পরদিন সূর্যোদয়ের পর থেকে দৌড়ানো শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দৌড়ায়। সূর্য ডোবার সাথে সাথে তার দৌড়ানো শেষ হয়। কিন্তু সারাদিন দৌড়ের ধকল সইতে না পেরে সে সেখানেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। সারাদিন দৌড়িয়ে যে সম্পত্তি সে অর্জন করেছিলো তা তার কোন কাজে আসে না।
.
বাস্তবে আমরাও যেন একইভাবে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দৌড়াচ্ছি। জন্মের পর থেকে দৌড়াচ্ছি। হয়তো একসময় অনেক কিছু অর্জন হবে, কিন্তু ততদিনে আমাদের অবস্থা হবে আব্দুল করিমের গানের মত-
ইঞ্জিনে ময়লা জমেছে
পার্টসগুলো ক্ষয় হয়েছে
ডায়নামো বিকল হয়েছে
হেডলাইট দুইটা জ্বলে না।।

তারপর একসময়, সূর্য ডুবে গেলে, শুন্য হাতে আমাদের চলে যেতে হবে অচিন জগতে। সারাজীবনের অর্জিত সম্পত্তি কোনই কাজে আসবে না।
কোন মরীচিকার পেছনে কিসের নেশায় দৌড়াচ্ছি আমরা?

বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

টাকার কাছে মেধার পরাজয় !

টাকার কাছে মেধার পরাজয় ঘটেছে, কেউ আপনার কাছে এমন একটা ঘটনার উদাহরণ চাইলে আপনি এখন নির্দ্বিধায় বলে দিতে পারেন মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের কথা। অদ্ভুত আমাদের দেশ, অদ্ভুত আমাদের সরকার, অদ্ভুত আমরাও। প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণ মেলে, জড়িত কালপ্রিটরা গ্রেপ্তার হয়, স্বীকারোক্তিও পাওয়া যায়, লেকিন পরীক্ষা বাতিল হয় না! বরং তড়িঘড়ি করে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু করা হয় !! এদিকে আমরা, মানে জনগন চুপচাপ দেখে যাই এইসব চুরিচামারি আর কেনাবেচা!!
.
হা, দেশে এখন আর সত্যিকার কোন সরকারি মেডিকেল কলেজ নেই, যেখানে বিনাখরচে/কমখরচে পড়া যায়। ডিএমসিতে ভর্তি হতে এখন মাথার ঘিলু লাগেনা, ১২ লাখ টাকা লাগে। এর পজিটিভ দিকটা হলো- আগামীতে আর কেউ ডাক্তার(!!)দের 'জনগনের টাকায় লেখাপড়া করা'র অপবাদ দিতে পারবে না!! কেউ ওকথা বললেই ভবিষ্যতের ডাক্তার(!)রা খেঁকিয়ে উঠবে- ব্যাটা মুখ সামলে কথা বলবি! ১৪ লাখ দিয়ে ডিএমসিতে ভর্তি হয়েছি। ট্যাকা কি তোর বাপে দিছিলো??
আর ভবিষ্যতে এই ইনভেস্টমেন্ট সুদে আসলে তুলবার জন্যে এরা যে ডাক্তার হবার পর কী করবে তা আল্লাহই ভালো জানেন!!
.
হা বংগদেশ!
সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী,
রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করনি।

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

সাধু সাবধান !

সরকারি আমলাদের মধ্যে যাদের খায়েশ জেগেছে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার কৃষিবিদ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সবার ওপরে ছড়ি ঘুরানোর, তারা কি এটাই চান যে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়াররা প্রফেশনাল ক্যাডারে না গিয়ে জেনারেল ক্যাডারে ঢুকে পড়ুক? জনাব, তাহলে কিন্তু অবস্থা খুবই খারাপ হবে। এটা আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি, পেশাজীবীরা পেশার প্রয়োজনে যে পরিমাণ লেখাপড়া করেন তার অর্ধেকও যদি এইসব বিসিএস টিসিএস এর জন্য পড়েন তাহলেই কিন্তু আপনাদের খেল খতম হয়ে যাবে। দেখবেন কয়েক বছরের মধ্যে জেনারেল ক্যাডারেও সব পোস্ট এরাই দখল করে ফেলবে। (আমার পরিচিত যে কয়জন প্রফেশনাল ক্যাডার ছেড়ে জেনারেল ক্যাডারের জন্য চেষ্টা করেছেন তারা কেউই বিফল হননি ।) বিকজ, এদের ভেতরে আগুন আছে, তারা সে আগুনকে 'পোড়া'নোর চেয়ে 'গড়া'নোর কাজে ব্যবহার করতে চায়। সেটা যদি তাদের সম্মানের সাথে করতে দেয়া না হয়, তাহলে আপনাদের গদি পোড়ানো ছাড়া তাদের আর কীইবা করার থাকে?
.
সুতরাং সাধু সাবধান। গ্রেড-১, গ্রেড-২ এবং শীর্ষপদগুলি কারো জন্য সংরক্ষিত না রেখে যার যার সেক্টর তাদের নিজেদের ওপর ছেড়ে দিন। ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়, প্রতিযোগিতা হোক সেক্টরভিত্তিক উন্নয়নের, প্রতিযোগিতা হোক দেশসেবার, প্রতিযোগিতা হোক মানবসেবার।

সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

"এতদিন কোথায় ছিলেন?"

দিনে দিনে বৃদ্ধ হয়ে উঠছে আমার কাব্যপিয়াসী মন ।
জীবনানন্দের কবিতা হতে সে আর আগের মত
কাব্যরস নিংড়াতে পারেনা ।
এমন নয় যে তার রসবোধ কমে গেছে । কিংবা
পুরনো হয়ে গেছে জীবনবাবুর কবিতা । বরং, আমার মনে হয়
এখন সে আর শুধুই কল্পনায় সন্তুষ্ট নয় ! সে চায়-
অক্ষরের জিঞ্জির হতে বেরিয়ে এসে একজন 'বনলতা'
শ্রাবস্তীর কারুকার্যখচিত মুখ আর পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে জিজ্ঞেস করুক,
"এতদিন কোথায় ছিলেন?"
-
নাটোরের হতে হবে এমন কোন কথা নেই
বনলতা 'সেন' হতে হবে এমন কোন কথা নেই
হোক শুধু একজন নিপাট 'বনলতা'ই ।
নইলে, ওর পক্ষে কাব্যের সুধা আহরণ
বোধহয় আর সম্ভব নয় !

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

বেহুলার প্রতি

কত পানকৌড়ি উড়ে গেছে কবে, সে হিসেবে আমার আর কাজ নেই।
আমি শুধু চাই আজ মাথার ওপর দিয়ে
অন্তত একটা পাতিহাস উড়ে যাক, দিগন্তের দিকে।
যেন আমি একদৃষ্টে চেয়ে থাকতে পারি-
উড়ালপংখির গমনপথে।
.
জানো বেহুলা, বহুদিন হয়ে গেছে বহুযুগ-
আমি একটিবার বিস্ময়ে অভিভূত হইনি।
নিরাবেগ পাষাণের মত বেঁচে থেকে এতকাল পরে
এই ভয়ে রাতভর তড়পাচ্ছি এখন,
আমি কি হারিয়ে ফেলেছি মনুষ্য হৃদয়?
বেহুলা, তুমি কি এতটুকু নিশ্চিত করে একবার বলতে পারো
আমার হৃদয়বৃত্তিতে আজও কোন হেরফের হয়নি?