এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...

এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে

সোমবার, ২৮ মার্চ, ২০১৬

অপেক্ষা

শুভ্র সকাল হতে জানালার পাট খুলে
মেঘলা আকাশের পানে চেয়ে আছি ।
পুবের হাওয়া কতবার বলে গেল গোপন সংবাদঃ
-'সে আসছে!' 'সে আসছে!'
অথচ কী অদ্ভুত!
সূর্য ঢলে গেল পশ্চিম পাটে তবু
এখনো বৃষ্টির দেখা নেই।
তবে কি এখন আমি
আবার ভেজিয়ে দেবো জানালার পাটগুলো?

বুধবার, ২৩ মার্চ, ২০১৬

নির্বাসন

নির্বাসনে আছি তাই
কবিতাকে দিয়েছি বিদায়।
যোগী- সন্ন্যাসীর মুখে-
সকলেই আশা করে- "ধর্মকথা";
কবিতাকে নয় ।
বিদায়লগ্নের অশ্রু ছাপিয়ে স্নেহভরে বলেছি তাকে -
বৎস !
আবার যখন আমি ফিরে যাবো লোকালয়ে
পাহাড় সমূদ্রের পথ হন্টন পরিশেষে
চলে এসো তুমি কোন এক গোধূলী দুপুরে
হাত রেখো
পরিশুদ্ধ হৃদয়ের হাটখোলা দরজায়।

বৃহস্পতিবার, ৩ মার্চ, ২০১৬

কীরকম অসভ্য অমানবিক সমাজে বাস করছি আমরা?

আমি স্তম্ভিত। হতবাক। ভাবতেও ভয় হয়, কীরকম অসভ্য অমানবিক সমাজে বাস করছি আমরা?
....
উত্তরার অগ্নিকান্ডের ঘটনায় দগ্ধ সুমাইয়া জানিয়েছেন, ঘটনার পরে শরীরে আগুন নিয়ে সাত তলা থেকে নিচে নেমে আসার সময় কেউ তাদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে নি। সুমাইয়া বলেন, "আমি আর সারলিনের আব্বু নাইমা আসছি। পিচ্চিটা কোলে। দৌড়ায় নামছি আর চিৎকার করতেছি। আগুন জ্বলতেছে। ওইসময় ঘরে পুরা আগুন। তিন নাম্বার ফ্লোর, চার নাম্বার ফ্লোর দরজা খুলছে। খুইলা আমাদের দেইখা দরজা আটকায় দিছে। স্পষ্ট মনে আছে। দরজা খুইলা দেখে আগুন লাগা মানুষ নামতেছে আর দরজা আটকায় দেয়, কতটা অমানবিক চিন্তা করেন।
তিনতলার মানুষটাতো একটু তোষক দিয়ে জড়ায় ধরতে পারতো। নাইলে একটা তোষকই যাইতো। আমার বাচ্চাগুলাতো বাঁচতো।”

নিচে নামতে নামতে সুমাইয়ার গায়ের কাপড় সম্পূর্ণ জ্বলে যায়। নিচে নেমে পরে থাকা ছালার চট গায়ে জড়ান তিনি। সেই সময়টিতেও একটি চাদরও কেউ এগিয়ে দেননি। সুমাইয়া বলেন, 'কত মানুষ, সবাই তাকায় রইছে। কেউ আগায় না। বলি কি একটা চাদর দেন আমাদের গায়ে। আমি মহিলা মানুষ। আমার গায়ে একটা চাদর দেন। কেউ দেয় না। বিল্ডিংয়ের মহিলারা কেউ দেয় না।'
সারলিন এবং জারিফও একা একা সাত তলা থেকে দৌড়ে নিচে নামে । তাদেরও সাহায্য করার জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি।
...................
কী অদ্ভুত! অকল্পনীয়। ভাবা যায়? কতটা বর্বর আর অমানবিক হয়ে গেছি আমরা?

মঙ্গলবার, ১ মার্চ, ২০১৬

এদের সেবার জন্য আপনি ডাক্তারদের গ্রামে যেতে বলেন?

বাংলার বীর জনগন, জোরগলায় ফেসবুক ফাটিয়ে আওয়াজ তুলুন, ডাক্তারদের শুধু গ্রামে গিয়ে থাকলেই হবে না। বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিতসা দিতে হবে। প্রয়োজনে পিঠ পেতে দিতে হবে। জীবন দিতে হবে।
খবরঃ
উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতির বাসায় গিয়ে চিকিৎসা দিতে রাজি না হওয়ায় নেতাকর্মীদের হামলায় তিনটি দাঁত হারালেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসক।
তেরখাদা থানা সূত্র জানায়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিক্যাল অফিসার ডা. আবদুল্লাহ আল মামুন রবিবার রাত ৯টার দিকে অফিসে দায়িত্বরত ছিলেন। এ সময় কয়েকজন লোক এসে জানায়, উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এসএম ওহিদুজ্জামানের স্ত্রী অসুস্থ।এ জন্য তাকে আওয়ামী লীগ সভাপতির বাসায় গিয়ে রোগীর চিকিৎসা করতে হবে। ডা. মামুন এমার্জেন্সি বিভাগে ডিউটিরত থাকায় বাসায় যাওয়া সম্ভব নয় জানিয়ে অন্য এক সহকারীকে আওয়ামী লীগ নেতার বাসায় পাঠান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে নেতা-কর্মীরা হাসপাতালের ভেতরেই তাকে বেদমভাবে প্রহার করেন। এ সময় তাদের কিল-ঘুষিতে ডা. মামুনের তিনটি দাঁত পড়ে যায়।
........
এদের সেবার জন্য আপনি ডাক্তারদের গ্রামে যেতে বলেন?

শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

উদ্বেগ

'এরপর কী?'
এই এক প্রশ্নের ঘূর্ণিপাকেই
কেটে যায় আমাদের
ক্ষণিক এই মানব জীবন ।
সব সুখ, সব প্রেম, সব ঘটনার শেষে
একটাই প্রশ্ন যেন তাড়িয়ে বেড়ায়-
'এরপর কী?'

হাঁটতে হাঁটতে যদি ফুরোয় সব পথ
ব্ল্যাকহোল হতে যদি ফিরে আসে দূরবীন দৃষ্টি
ফুরোয় যখন দিন গোধূলী আলোয়
উত্থান পতন আর নাটকীয়তায়
তখনও মনের মাঝে
প্রশ্নটা ফিরে আসে
'এরপর কী?'
#উদ্বেগ

সোমবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

রুক্ষ ফাল্গুনে

এই রুক্ষ ফাল্গুনে,
মনে আসে সূক্ষ্ণ আবেগ ! পাতাঝরা গাছে সবুজ পাতার মত,
হৃদয়ে ফিরে আসে- অচিন বেদনা।
প্রশ্নের ভীড় জমে বিক্ষিপ্ত অন্তরে -
কতটা কষ্ট জমা হলো বিগত বছরে? কতটুকু ভালবাসা
পাওনা রয়ে গেল পৃথিবীর কাছে?
কত ফাল্গুনের তাপ সয়ে গেলে পরে
শেষ হবে আগুনের দিন?
কতটুকু মায়া জমালে প্রতিদিন-
কত ফাল্গুনে শোধ হবে হৃদয়ের
সবটুকু ঋণ?

শুক্রবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

কে কারে মনে রাখে ?

কেউ যদি কখনো আমায় ভুলে যেতে চাও
নির্বিঘ্নে নিশ্চিন্তে ভুলে যেও।
আমি মহামানব নই, আমি কাজী নজরুল নই,
আমি কখনো কবিতা লিখিনি
কখনো করিনি গান, করিনি উচ্চারণঃ চিরতরে
চলে যাবো দূরে; তবু
আমারে দেবোনা ভুলিতে।
.....
বলো,
কে কারে মনে রাখে, স্বার্থের পৃথিবীতে?
মাটিতে মিশে গেলে মাটির শরীর,
কার কিবা আসে যায়-
এইসব মনে রাখারাখিতে?

মঙ্গলবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘপথ

পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘপথ। অথচ আমি কিনা
কয়েক কদমেই ক্লান্ত হয়ে গেছি!
পথের হাওয়ায় উড়ে আসছে ধুলোর প্রবাহ; পাখিদের কাকলিতে
শোনা যায় বালুঝড়ের পুর্বাভাস। তবে কি-
আমাকে দাঁড়াতে হবে এখানেই? মুলতবি করতে হবে
আগামীর পদযাত্রা?
.....
গভীর হচ্ছে রাত, রাতের অন্ধকার
বয়ে যাচ্ছে অবিরাম জীবনের স্রোত; সমাপ্তির পানে।
কতকাল দাঁড়াবো আমি এখানে?
কতযুগ কত শতাব্দী দাঁড়ালে তবে
থেমে যাবে ঝড় ঝঞ্ঝা? আমি তো দাঁড়াতেই পারি,
কিন্তু
কে থামাবে সময়ের গতিধারা?
কে থামিয়ে রাখবে সমাপ্তির পানে
বয়ে চলা জীবনের স্রোত?

সোমবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

কৃতজ্ঞতা

এই ভিড়ের মধ্যেও মেয়েটা এক প্রকার জোর করেই বাসে উঠে পড়লো । নারীদের জন্য নির্ধারিত কোন সিট খালি ছিল না । দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই । কিন্তু তার সম্ভবত খুব জরুরি কোন কাজ আছে, যার কাছে এইসব ভিড়ভাট্টা কোন ব্যাপার না ।
সারাদিন নানান কাজে দৌড়াদৌড়ি করে বেশ কাহিল হয়ে পড়েছিল মুনির । বাসে উঠে কোনমতে একটা সিট পাওয়ায় আরামে চোখ বুজে আসছিল তার । কিন্তু একটা মেয়ে মানুষকে এই ধাক্কাধাক্কির মধ্যে দাঁড় করিয়ে রেখে আর বসে থাকা সম্ভব নয় । সুতরাং সিটটা ছাড়তেই হলো তাকে । ‘এই যে আপু এখানে বসেন’ বলে উঠে দাঁড়ালো সে ।
মেয়েটাও কিছু না বলে টুপ করে বসে পড়লো ।

পেছন থেকে অবশ্য কেউ একজন মন্তব্য ছুঁড়তে ছাড়লো না । ‘বইবো ক্যান? মাইয়ারা না সমানাধিকার চায়? অরাও দাড়ায়া যাইবো, এইডাই সমানাধিকার’!
ভাই ভিত্রে যান, পেছনে খালি আছে । কন্ডাকটরের ক্রমাগত আহ্বান আর মানুষের ঠেলাঠেলিতে ধীরে ধীরে বাসের একেবারে পেছনে ঠাঁই হয়েছিল মুনিরের । সারাটা পথ দাঁড়িয়েই ছিল । তার ছেড়ে দেওয়া সিটটাও আর পুনর্দখল করার সুযোগ হয়নি । কখন যে ওটা খালি হয়েছিল সে খেয়ালও রাখা হয়নি ।
বাসায় ফিরেই ব্যাগসহ বিছানায় লুটিয়ে পড়লো মুনির ।
মুনিরের মত একজন পুরোদস্তুর ব্যাচেলরের জীবনে এরকম সময়ে ফেসবুক একটা গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী । পকেট থেকে মোবাইল বের করে ফেসবুকে লগইন করলো সে । আনমনে হোমপেজ স্ক্রল করতে করতে একজনের শেয়ার করা একটা পোস্টে চোখ আটকে গেল তার । নামটা অপরিচিত, আগে কখনো চোখে পড়েছে বলে মনে হয় না । তবুও ক্লিক করে পড়তে লাগলো।
''নীল নয়না
1 hour ago
‘হঠাৎ খবর পেলাম দাদুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে । দাদু স্ট্রোক করেছেন । কোনকিছু মাথায় আসছিল না । রাস্তায় নেমে দুএকটা সিএনজি ডাকলাম, কিন্তু কেউ যাবে না । সব নবাবের পুত ।
প্রথম বাসটাতেই উঠে পড়লাম । খুব ভিড় ছিল, কিন্তু এছাড়া আর উপায় কী? কেউ একজন আমাকে তার সিটটা ছেড়ে দিল । অজানা সেই মানুষটাকে একটা ধন্যবাদও দেয়া হয়নি । হয়তো কোনদিন হবেও না । লোকটা হয়তো আমাকে অকৃতজ্ঞ ভাবতে পারে । আমার নিজেরও কেমন অকৃতজ্ঞ বোধ হচ্ছে । ফেসবুকে একটা ধন্যবাদ লিখে দিলে কি কিছুটা হালকা বোধ হবে? হতে পারে। তখনই কৃতজ্ঞতা না জানানোটা ভুল হয়ে গেছে । ভালো কাজের অনুপ্রেরণা জোগানোর জন্য মানুষকে কৃতজ্ঞতা জানাতে হয়’।
Odvut prithibi and 11 others like this''

বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০১৬

আউটডোর

সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেললো হেলাল মিয়া । আজ হাসপাতালে যেতেই হবে । বেশ কিছুদিন ধরেই শরীরটা কেমন ম্যাজ ম্যাজ করছিলো । আজকাল খুব দুর্বল লাগে তার । দু’একটা খেপ দিলেই হাঁপিয়ে উঠতে হয়। তবু কোনমতে চালিয়ে নিচ্ছিল এতদিন । কিন্তু আজ আর কোনভাবেই রিকশা নিয়ে বের হওয়া সম্ভব না । এই শরীরে রিকশা নিয়ে বেরুলে আর ঘরে ফেরা হবে কিনা সন্দেহ । কোথায় মাথা ঘুরে পড়ে থাকবে কে জানে !
-‘কইগো হেনার মা, দেহ দেহি রফিক্যা আছে নি বাড়িত । আমারে এট্টু ডাহা মেডিকেলত দিয়া আসবার ক-তো । আইজকা যাইতেই অইবো, এইবাভে আর থাহন যায়না’ ।
মেঝেতে চট বিছিয়ে মেয়েকে পাশে বসিয়ে সরিষার তেল মাখা গরম ভাত খায় হেলাল মিয়া । প্লেটের ওপর কাঁচামরিচ ও আলুভর্তা । আলুভর্তাটা ভালোই বানায় হেনার মা । খেতে খেতে মেয়েকে আদর করে হেলাল । এরইমধ্যে রফিক মিয়ার কন্ঠ শোনা যায় ।
-‘হেলাল বাই, রেডি অইছো নি? তাড়াতাড়ি খাইয়া লও । দেরি অইয়া যাইতাছে’।
এই বস্তির অনেকেই রিকশা চালায় । রফিক মিয়াও তাদের একজন । হেলাল মিয়ার পাশের ঘরেই থাকে ।
ঢাকা মেডিকেলের আউটডোর বিভাগের সামনে এসে নামে হেলাল মিয়া । রফিক তার রিকশা নিয়ে চলে যায় অন্য দিকে । হেলাল মিয়া ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় ‘বহিঃবিভাগ’ গেটের দিকে ।
জীবনে কোনদিন এই হাসপাতালে আসেনি হেলাল মিয়া । সে বুঝতে পারেনা কী করবে । আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো অনেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে টিকেট কিনছে । ‘এইহানেও টিকিট লাগে?’ ভাবতে ভাবতে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ে সে । ‘বাই, টিহিট কত?’ সামনের জনকে জিজ্ঞেস করে হেলাল । ‘দশ টেহা’ । ঝাঁঝালো জবাব পায় সে । এই প্রশ্নের উত্তরে এত ঝাঁঝ দেখানোর কী আছে ভেবে পায়না হেলাল ।
দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মাথা ঝিম ঝিম করে হেলালের । যখন সে কাউন্টারের সামনে এসে পৌঁছে, ততক্ষণে আধা ঘন্টার বেশি পার হয়ে গেছে । সময়টা হয়তো আরও বেশিই হবে, কিন্তু হেলাল মিয়ার হাতে যেহেতু কোন ঘড়ি নেই, তাই আন্দাজ করা আর ছাড়া কোন উপায় নেই তার ।
-‘টেহা বাইর করো মিয়া । সমুস্যাডা কী?’
বেশ ধমকের স্বরেই জানতে চায় কাউন্টারে বসা লোকটি । মিনমিন করে হেলাল জানায়- তার ‘শইল্যে ব্যথা’, ‘মাথা গুরে’, ‘বুক দরফর করে’ । একটা ছোট্ট কাগজে নাম ও নম্বর লিখে হেলালের হাতে দেয় লোকটি । বলে- ‘যাও, মেডিসিন আউটডোরে চইল্যা যাও’ ।
-‘ঐ মিয়া, এত সুমায় লাগে ক্যা?’ তাড়া দেয় হেলালের পেছনে দাঁড়ানো মধ্যবয়স্ক লোকটিও ।
হেলাল মিয়া দুএকজনকে জিজ্ঞেস করে মেডিসিন আউটডোর চিনে নেয় । সেখানেও লাইনে দাঁড়াতে হয় তাকে । প্রায় ঘন্টাখানেক অপেক্ষার পর সে ডাক্তারের সামনে গিয়ে পৌঁছে । এর মধ্যে গেটে দাঁড়ানো লোকটি তাকে দু’তিনবার ধমকায়। ডাক্তার সাহেব অবশ্য ভালো করেই দেখেন হেলালকে । তিনি কিছু ঔষধ লিখে দেন । আর বুকের এক্সরে, রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করাতে বলেন । ডাক্তারের রুম হতে বেরুতে বেরুতে হেলালের কানে আসে শ্লেষমাখা কন্ঠ- ‘ঐ মিয়া কী হইছে তুমার? এত সুমায় লাগাইলা ক্যান? আর হেই ডাক্তারে কিছু জানে নি? অতক্ষণ লাগে একজন রুগি দেইখতে?’
সেই কাগজ নিয়ে হেলালকে যেতে হয় অন্য একটি রুমে । সেখানে তার নাম এবং স্লিপ নম্বর লিখে নতুন কয়েকটি কাগজ ধরিয়ে দেয় একজন নার্স । তারপর ঐসব কাগজ নিয়ে একে ওকে জিজ্ঞেস করে অলিগলি পেরিয়ে ‘নিউ বিল্ডিং’ এ পৌঁছায় হেলাল । সেখানে আবার লাইনে দাঁড়িয়ে ‘টাকা জমা’ দেয় সে । টাকা জমার স্লিপ নিয়ে সে একে একে এক্সরে বিভাগে গিয়ে ‘বুকের ছবি’ ওঠায়, রক্তের নমুনা দেয় অন্য আরেকটি রুমে, সেখান থেকে বেরিয়ে অন্য একটি রুমে গিয়ে প্রস্রাবের নমুনা দেয় । প্রতিবারই তাকে গড়ে আধাঘন্টা থেকে একঘন্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় । দারোয়ান ও টেকনিশিয়ানদের ধমক শুনতে হয় । সবখান থেকেই একদিন পরে এসে রিপোর্ট সংগ্রহ করতে বলা হয় হেলালকে ।
হেলাল খেয়াল করে, রিপোর্ট সংগ্রহের লাইনটাও অত ছোট না ।
‘যুহর কি হইয়া আইলো নাকি?’ আকাশের দিকে তাকায় হেলাল । কিন্তু তার চোখ কংক্রিটের ছাদে বাধা পেয়ে ফিরে আসে ।
দুর্বল শরীর নিয়ে গেটে ফিরে আসে হেলাল মিয়া । রফিককে বলা আছে, যোহরের সময় সে গেটে থাকবে । হেলালকে বাড়িতে পৌঁছে দেবে ।
এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে পা ব্যথা হয়ে গেছে হেলালের । ডাক্তারের সামনে কয়েক মিনিট ছাড়া আর কোথাও বসার সুযোগ হয়নি তার । এখন মনে হয় ‘মাথাটাও ঘুরছে’।
কোনরকমে গেটে পৌঁছে ফুটপাতের ওপর দাঁড়ায় হেলাল । তার চোখ খুঁজে ফেরে রফিক মিয়াকে । ‘ঐ তো , ঐতো রফিক আইছে’। মনে মনে খুশি হয় হেলাল মিয়া । কিন্তু রফিকের উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই হঠাৎ চোখ অন্ধকার হয়ে আসে তার। জ্ঞান হারানোর আগে একবার রফিকের কন্ঠ কানে আসে- হেলাল বাই, কী অইছে হেলাল বাই? এমুন করতাছ ক্যান? হেলাল বাই, এমুন করতাছ ক্যান?

মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০১৬

শীতবস্ত্র বিতরনঃ গরীবের কষ্টলাঘব নাকি আত্মতৃপ্তির এডভেঞ্চার?

কাউকে নিরুৎসাহিত করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয় । শীতবস্ত্র বিতরন অবশ্যই ভালো কাজ, সন্দেহ নেই । কিন্তু প্রতিবছর ঠিক যে প্রক্রিয়ায় ঘটা করে শীতবস্ত্র বিতরনের মহোৎসব হয়, সেই প্রক্রিয়াটি নিয়েই আমার কিঞ্চিৎ ভিন্নমত ।
প্রশ্নটা হচ্ছে, এইযে প্রতিবছর এত এত শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়, শীতার্ত মানুষ কি আসলে কমে? যারা শীতবস্ত্র বিতরন করেছেন, তাঁরা কি কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেন, তাঁর দেয়া কাপড়টা সত্যিই গ্রহীতার কষ্টলাঘব করেছে কিনা? পুরো একটি পরিবারের সবার শীত-কষ্ট দূর হয়েছে কিনা?
নাকি ব্যাপারটা আসলে এমন- সবাই শীতের কাপড় বিলায়, কিন্তু কেউ শীতমুক্ত হয় না !

শীতবস্ত্র বিতরন যেমন ভালো কাজ, তেমনি আত্মতৃপ্তির উপায়ও বটে ! বেশকিছু শীতবস্ত্র বিতরন করলে অন্তত এই আত্মতৃপ্তিটা আসে- গরীব দুঃখী মানুষের জন্য কিছুটা হলেও ভালো কাজ করলাম ! আর দূর-দূরান্তে গিয়ে শীতবস্ত্র বিতরন করে আসার মধ্যে একটা এডভেঞ্চারও থাকে !
মনে আছে, মানুষের কষ্ট লাঘবের নেক-নিয়তেই এক রাতের বেলা রেলস্টেশনে পথশিশু- ভিক্ষুকদের মাঝে শীতবস্ত্র দিতে বেড়িয়েছিলাম । কাজটা ভালো ছিল, নিয়তও সহি ছিল , রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ফুটপাতে-প্লাটফর্মে ঘুমানো মানুষের মাঝে কম্বল তুলে দেয়ার মাঝে একটা এডভেঞ্চারও ছিল । কিন্তু তা দিয়ে কার কতটুকু শীতলাঘব হয়েছিল তা আমার জানা হয়নি ।
সকাল হতে না হতেই কম্বলখানি কে-কে বিক্রি করে দিয়েছিল সে খবরও জানা হয়নি ।
আপনি কি সত্যিই মানুষের কল্যাণ, মানুষের কষ্ট দূর করতে চান? নাকি একটা শীতবস্ত্র বিতরনের এডভেঞ্চার নিতে চান? নাকি ‘মানুষের জন্য কিছু করলাম’ ভেবে কিছুটা আত্মতৃপ্তি পেতে চান? যদি প্রথমটি হয়, তাহলে আমি অনুরোধ করবো, এলোপাথারি শীতবস্ত্র ছড়াবেন না । এবছর রাস্তার ছেলেদের, পরেরবছর রেলস্টেশনে, তারপর এই বস্তিতে,আর তারপর সেই গ্রামে, এরকম বিক্ষিপ্তভাবে শীতবস্ত্র দিয়ে কোন লাভ নেই । বরং আপনি বা আপনার গ্রুপ টার্গেট করুন একটা নির্দিষ্ট গ্রামকে । ঐ গ্রামে কার কার আসলেই শীতবস্ত্র প্রয়োজন যথাসম্ভব হিসাব করে নিন । তারপর লিস্ট ধরে সবাইকে কাপড়-কম্বল দিন । এককভাবে সামর্থে না কুলালে অন্য কোন গ্রুপকে আপনার সাথে নিন বা আপনিই অন্য কোন গ্রুপের সাথে যোগ দিন । টার্গেট থাকুক, অন্তত ঐ একটি গ্রামের মানুষকে আপনারা শীতের কষ্ট থেকে সত্যিকারার্থে মুক্তি দেবেন । এবং পরেরবছরও আগে ঐ গ্রামের মানুষের খোঁজ নিবেন । তারপর অন্যদিকে নজর দিবেন । আর শুধু শীতবস্ত্র দিয়েই শেষ নয়, যাদেরকে দেয়া হবে তাদেরকে এই মোটিভেশনও দেয়ার চেষ্টা করুন- তারা যেন এসব কাপড়-কম্বল বিক্রি না করে ।
ভালো কাজগুলো বিফলে না যাক, আমাদের কষ্টগুলো সত্যিকাররার্থেই মানুষের কল্যানে কাজে লাগুক । যারা সত্যিই গরীব মানুষের কষ্টে ব্যথিত হন, তাঁদের জন্য রইলো শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন ।

শুক্রবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৫

আত্মজিজ্ঞাসা

অনেক তো পেরুলো সময় !
অনেক অনেক দিন, সাদাকালো রাত,
দুপুর, বিকেল ।
অনেক সূর্যাস্ত হলো পশ্চিম আকাশে
অসংখ্যবার ফিকে হয়ে এলো
গোধূলীর রঙ ।

এখন কি এসেছে সময় নিজেকে শুধাবার?
কতদূর হাঁটা হলো? কতযুগ সময়ের পরে,
কতটুকু চেনা হলো পৃথিবীর পথ? কতটা জমিন, কতটুকু মন, আর
কতজন মানুষের প্রতি-
জন্মালো অধিকার?

বুধবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৫

চিঠি

জানিস, মাঝে মাঝে আমার
নিজেকে খুব জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়ঃ এইযে সোনালি বিকেলগুলো
কাটিয়ে দিচ্ছি এইভাবে, কনক্রিট ঘেরা চার দেয়ালের
বদ্ধ ঘরে...
কীসের প্রয়োজনে? কিংবা, কীসের প্রলোভনে?
.
তোকে বলা হয়নি- এইসব বিকেলে
গোধূলীর বদলে এখন আমার চোখে আসে
নিয়নের সাদা আলো ; পাখির ডাক হয়ে কানে বাজে
পুরনো এয়ারকুলারের-
একটানা বিদঘুটে শো শো আওয়াজ ।
আর জানিস, বহুদিন ধরে
নরম ঘাসের ভূমিকায় জব্বর অভিনয় করে চলেছে
একজোড়া কাঠের চেয়ার !
.
এই শহরে বিকেল বেলায়
ইউটিউবে দেখি সূর্যাস্ত ! উড়ে যাওয়া সাদা বক,
দোয়েল শালিকের ঝাঁক !
রাখালিয়া বাঁশির সুর-
নিত্য শুনি মিউজিক প্লেয়ারে। বন্ধ জানালায়
হোঁচট খেয়ে ফিরে এলে উদাস দু'চোখ
পুরনো ডায়েরির বদলে, স্ক্রল করে যাই
পুরনো দিনের
ফেসবুক টাইমলাইন !
....
কিন্তু জানিস, ওতে কোন হৃদয়ছোঁয়া ঘ্রাণ আসে না।
ওতে খুঁজে পাইনা হারিয়ে যাওয়া পুরনো হলুদ খাম, কিংবা
চ্যাপ্টা হয়ে থাকা
গোলাপের পাপড়ি...

বৃহস্পতিবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৫

পে স্কেল নিয়ে চিকিৎসকদের হতাশা

আমি সরকারি কর্মচারি নই, চিকিৎসক হিসেবে সরকারি চাকরি করা ঠিক হবে কিনা তা নিয়ে প্রায়শই দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে 'না' এর পাল্লাটাই ভারী থাকে । কিন্তু সরকারি কর্মচারিদের জন্য ঘোষিত নতুন পে স্কেল আমাকে আরো বেশি নেতিবাচক ভাবনায় ফেলে দিয়েছে ।
নতুন পে স্কেল নিয়ে সিনিয়র চিকিৎসকদের হতাশা উদ্বেগের বিষয় । একজন চিকিৎসক লিখেছেনঃ '১৩ বছর চাকরি করে আমি এখন ৭ম গ্রেডে, আর প্রশাসন পুলিশ পররাষ্ট্র ক্যাডারে আমার ব্যাচমেটরা ৪র্থ গ্রেডে । চিকিৎসক হিসেবে এই অপমান সহ্য করা যায়না । হয়তো সরকারি চাকরি ছেড়েই দিতে হবে !'
সত্যিই অদ্ভুত ব্যাপার । একই বিসিএস এ উত্তীর্ণ হয়ে, একই পরিমাণ সময় সার্ভিস দিয়েও টেকনিকাল ক্যাডাররা তিন গ্রেড পেছনে কেন? কারা এই মূল্যায়ন করলো ? এর অর্থ কি এটাই যে প্রশাসন ক্যাডার বা পুলিশ ক্যাডার সরকারের জন্য অপরিহার্য? বাকিরা অপশনাল ? তারা হুকুমের গোলাম মাত্র?
এই অবমূল্যায়ন যে বার্তা জানান দিলো তা দেশের জন্য খুব খারাপ । এমনিতেই প্রতিবছর শতশত ডাক্তার সরকারি চাকরি ছেড়ে চলে যান । আগামীতে এই হার নিশ্চিতভাবেই বাড়বে । দেশের মানুষের জন্য এটা কোন ভালো সংবাদ নয় ।

মঙ্গলবার, ১ ডিসেম্বর, ২০১৫

ভিক্ষুক

'ভাইজান, কয়ডা টাহা দ্যান। সকাল থাইকা কিছু খাই নাই। বাচ্চা দুইডারেও কিছু খাওয়াইতে পারি নাই।'
আজিজ সুপার মার্কেটের সামনে মোড় ঘুরতেই এক মহিলার কন্ঠ কানে আসে নাবিলের। মহিলার সাথে অল্প বয়সের দুটি বাচ্চা।
নাবিল দাঁড়াতেই মহিলা মুখ কাঁচুমাচু করে এগিয়ে আসে। বয়স ত্রিশের কোঠায় হবে বলে মনে হয়। রোগা নয়, শক্তসমর্থই।
-কেন, খাননি কেন? আপনার স্বামী নেই? আপনি কোন কাজ করেন না? প্রশ্ন করে নাবিল।
-ভাইজান, হবিগঞ্জ থাইকা ঢাকা আসছি কাজকামের খোঁজে। কোন কাম জোগাড় করবার পারি নাই। অহন ফিরা যামু তারও কোন ব্যবস্থা নাই। একটা টেহা নাই হাতে।

নামকরা রেস্টুরেন্টে বন্ধুদের সাথে বুফে ডিনার সেরে বাসায় ফিরছিল নাবিল। কোন কোন আইটেম অসাম লেগেছে আর কোনটা একটু খারাপ হয়েছে তা নিয়েই ভাবছিল সে। এমন সময়ে এরকম অনাহারি মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে অপরাধী মনে হলো তার । আবেগে আপ্লুত হয়ে গেল সে। আহা! আমি একবেলা খাবারের জন্য হাজার টাকা খরচ করলাম! কত কিছু খেলাম। অথচ এই মহিলা সকাল থেকে না খেয়ে আছে! আর বাচ্চা দুটো! আহা! না খেয়ে কী কষ্টই না হয়েছে বাচ্চা দুটির।
'আসেন মা, আমার সাথে আসেন। আমি আপনাদের খাওয়াবো। তারপর বাস স্ট্যান্ডে নিয়ে যাবো। আমি নিজে টিকেট কেটে হবিগঞ্জের গাড়িতে উঠিয়ে দেবো'।
মহিলাকে তার পেছন পেছন আসতে বলে হাঁটতে শুরু করে নাবিল। ভালো রেস্টুরেন্টেই খাওয়াবে সে ওদেরকে। মহিলা অবশ্য একবার বলেছিল, ভাইজান, কিছু টাকা দেন। আমরা খাইয়া নিমু। কিন্তু নাবিল আজকে অল্প কিছু টাকা দিয়েই তার দায় সারতে চায় না। সে নিজে সাথে থেকে তাদেরকে খাওয়াতে চায়, নিরাপদে বাড়ি ফিরে যাবার সুব্যবস্থা করে দিতে চায়।
আনমনা হয়ে হাঁটতে থাকে নাবিল । শাহবাগ মোড়ে ভালো কোন খাবার দোকান নেই। কাঁটাবন বা হাতিরপুল এলাকায় দুএকটা ভালো রেস্তোরাঁ আছে। মিনিট পাঁচেক হাটলে কোন একটায় পৌঁছানো যাবে।
ধীরেই হাটছিল সে। রাস্তায় ভীড়ও তেমন নেই এখন। হাটতে হাটতে দেশের গরীব দুঃখী মানুষের জন্য কাজ করার পরিকল্পনা করতে থাকে । এভাবে একজন দুজনকে একবেলা দুবেলা খাইয়ে কিছু হবে না। দারিদ্র্যের মূলে কুঠারাঘাত করতে হবে। বৈষম্য রোধ করার ব্যবস্থা করতে হবে। ধনীদের সম্পদ থেকে গরীবের হক আদায় করে নিতে হবে।
ভাবতে ভাবতে 'চায়না কিচেন' রেস্তোরাঁর সামনে এসে দাঁড়ায় নাবিল । সবাইকে নিয়ে ভেতরে ঢোকার জন্য পেছন ফিরে তাকায় সে। কিন্তু একী? কোথায় গেল মহিলা? এদিক ওদিক ভালো করে নজর বুলায় সে । নাহ, কোথাও নেই। ওরা কি পেছনে রয়ে গেল?
কাঁটাবন মোড় পর্যন্ত ফিরে এসে ভালো করে খুঁজলো সে। কিন্তু কোথাও তাদের আর কোন হদিস পাওয়া গেলনা।
বাসায় ফিরতে ফিরতে একটা প্রশ্ন চকিতে উদয় হলো নাবিলের মনে- মহিলা কি তাহলে মিথ্যা বলেছিল? আসলে সে একজন পেশাদার ভিক্ষুক?

বুধবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৫

সান্ত্বনা

‘বাবা একটু আসবেন, রোগীর খুব শ্বাসকষ্ট হইতাছে’ ।
চোখ তুলে তাকালো মুনির । দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ । বেড নাম্বার তেত্রিশ, মনে পড়লো মুনিরের । ঐ রোগীরই শ্বাসকষ্ট হবার কথা ।
হাসপাতালে নাইট ডিউটিতে আছে ডাঃ মুনির । কয়েক মিনিট হলো, সবগুলো রোগী দেখা শেষ করে ডক্টরস রুমে এসে বসেছে । এরই মধ্যে বৃদ্ধ চলে এসেছেন ডক্টরস রুমের দরজায় ।
বৃদ্ধের স্ত্রীই তেত্রিশ নম্বর বেডের রোগী । মায়মুনা বেগম । অনেকক্ষণ ধরেই শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল তাঁর । মুনির এসে কিছু জরুরি ব্যবস্থা নেয়ায় শ্বাসকষ্ট কমেছিল কিছুটা । কিন্তু এরই মধ্যে আবার বেড়ে গেছে । রোগীর যা অবস্থা, শেষমেষ হয়তো তাকে বাঁচানো যাবেনা । বাঁচানোর জন্য আরো কিছু চেষ্টা করা যায়, কিন্তু সেটা এইখানে, সরকারি হাসপাতালের এই জেনারেল ওয়ার্ডে সম্ভব নয় ।

বৃদ্ধের সাথে আবারো রোগীর কাছে গেল মুনির । আরো একবার পরীক্ষা করে দেখে দায়িত্বরত নার্সকে নতুন কিছু নির্দেশনা দিল । তারপর বৃদ্ধকে একপাশে ডেকে নিলো সে।
‘বাবা, আপনাকে তো আমি আগেও বলেছি, আপনার রোগীর অবস্থা খুব খারাপ । তাঁর কিডনিতে সমস্যা আছে, কিডনি ঠিকমত কাজ করছে না । ফুসফুসে জীবাণু সংক্রমণ হয়েছে, পানি জমে গেছে । সেকারণে ঠিকমত শ্বাস নিতে পারছেন না । শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে । হার্টের ওপর চাপ বাড়ছে । যেকোন সময় হার্ট এটাক হতে পারে । যেকোন কিছু ঘটে যেতে পারে । আইসিইউ তে নিতে পারলে শেষ চেষ্টা করা যেতে পারে । কিন্তু এই হাসপাতালের আইসিইউ তে এই মুহূর্তে কোন বেড খালি নাই । আপনি কি অন্য কোথাও নিতে পারবেন?’
বৃদ্ধ কোন জবাব দিলেন না।
মুনির খেয়াল করলো, বৃদ্ধের চোখ ছলছল করছে । অদ্ভুত শুন্যতা সেখানে । মুখে বলার প্রয়োজন নেই, কখনো কখনো চোখের ভাষাই সব বলে দেয় । বুঝে ফেললো মুনির, এখানেই যা হবার হবে, এর চেয়ে বেশি কিছু করার সামর্থ বৃদ্ধের নেই ।
সুযোগ-সামর্থের মধ্যে যা করার আছে, সবকিছু করে ডিউটি রুমের দিকে পা বাড়ালো মুনির । একবার পেছন ফিরে দেখলো, বৃদ্ধ গিয়ে বসেছেন স্ত্রীর বিছানায় ।
আবেগের একটা তরঙ্গ যেন ছুঁয়ে গেল মুনিরকেও । 'বৃদ্ধ' ! আমরা কত সহজেই শব্দটা উচ্চারণ করি! অথচ একদিনে কেউ বৃদ্ধ হয়না, হওয়া যায়না। বৃদ্ধ হতে হলে পৃথিবীর মাটিতে একটা সম্পূর্ণ জীবন কাটিয়ে দিতে হয়।
তেত্রিশ নম্বর বেডে বসে থাকা এই দু’জন মানুষ কতবছর একসাথে কাটিয়েছেন কে জানে ! কয়েক যুগ তো হবেই । অথচ কী অদ্ভুত! আজ রাতেই হয়তো চিরবিচ্ছেদ হয়ে যাবে দু’জনের মধ্যে । একজন চিরতরে হারিয়ে যাবে পৃথিবী থেকে, আরেকজন অপেক্ষা করবে এমনই কোন দিনের । এমনই কোন রাতের । আর কখনো এই দুজনের দেখা হবে কিনা, কেউ জানে না ।
মুনির ভাবলো, এই মুহূর্তে বৃদ্ধের যে অনুভূতি, পৃথিবীর কোন কবি কিংবা কোন ঔপন্যাসিক কি কখনো তা বর্ণনায় তুলে আনতে পারবে?
বুক থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো মুনিরের । এরকম সময়ে নিজেকে খুব অসহায় লাগে তার । নিজেকে পরাজিত মনে হয়, ব্যর্থ মনে হয়।
মানুষের 'ডেথ সার্টিফিকেট' লেখা কোন সহজ কাজ নয়। কিন্তু এটাও সত্য, মানুষ অমর নয়। মৃত্যুকে ঠেকানো যায় না। প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।
ডক্টরস রুমের পুরনো কাঠের চেয়ারটিতে বসে নিজেকে সান্ত্বনা দেয় মুনির- ‘আমরা রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারি; মৃত্যু নয়’।

মঙ্গলবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৫

নামতে হবে পুরনো মেঠোপথে ।

দিন রাত জোছনা সবকিছু একাকার হয়ে আছে এই শহরের
বহুতল ভবনের কার্নিশে।
ফলস সিলিং এর ভেতর নিরন্তর জ্বলে আছে নিয়নের সাদা আলো;
আর আমি
নির্বিকার বসে আছি এইখানে, নির্লিপ্ত হৃদয়ে।
মনে হয় অনন্তকাল পেরিয়ে গেছে! কে জানে,
জানালার বাইরে পৃথিবীটা আছে কিনা আগের মত! এ পৃথিবীতে
আজও কি ভোর হয় সূর্যের লালচে আলোয়?
এখনো কি বিকেল নামে নীড়ে ফেরা পাখিদের কোলাহলে?
...
ফুটপাত জুড়ে অগনিত মানুষের সারি। তবু
অদ্ভুত নির্জনতা বোধ হয় এঘরের কাঁচের জানালায়
দেয়ালের এইপাশে ।
মাথার ওপর-
অবিরাম ঘূর্ণায়মান বৈদ্যুতিক পাখার শো শো আওয়াজ
যেন জানিয়ে দিচ্ছে এই সময়ের আন্তরিক আহ্বানঃ বদ্ধ প্রকোষ্ঠ ছেড়ে
পথে নামতে হবে, হে পুরনো যোদ্ধা! আরো একবার
নামতে হবে ধুলো ওড়া পুরনো মেঠোপথে ।

মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০১৫

এবার অবসরে যাবো আমি

আসন্ন শীতের ঠান্ডা বাতাস গায়ে মেখে
হিমায়িত করে নেবো আমার সমগ্র অস্তিত্ব
হৃদয়, শরীর ও মন ।
আমি এক আজন্ম যোদ্ধা, তবু
সবাইকে টপকে যাবার অশুভ যুদ্ধ হতে
এবার অবসরে যাবো আমি; কারবালাফেরত
বৃদ্ধ সৈনিকের মত।
.
রণভেরির অদ্ভুত আওয়াজ, ধুলোর কুয়াশার ভেতর-
ঢাল তলোয়ার নিয়ে দিনভর অস্থির চলাচল,
আর কত?
এইসব যুদ্ধের তো শেষ বলে কিছু নেই!
এইসব যুদ্ধে তো স্থায়ী বিজয় নেই! এখানে
জয় পরাজয় আসে পালাক্রমে; দিনের পরে রাত
গ্রীষ্মের পরে বর্ষার মত।
.
অসংখ্য যুদ্ধের স্মৃতি, বিজয়ের সুখ,
আর পরাজয়ের তীব্র বেদনা বুকে নিয়ে
অবসরে চলে যাবো আমি
এই শীতে।

রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০১৫

সংশয়

এইসব হেমন্তের ভোরে
প্রতিটি সূর্যোদয় নিয়ে আসে ভিন্ন রঙের নতুন দিগন্ত
আর আমিও নিজেকে জড়াই নিত্যনতুন মোহ মরীচিকায়।
নির্বোধ পতংগের মত
যতটা উজ্জ্বলতা দেখে ছুটে যাই-
তার চেয়ে বেশি উত্তাপ গায়ে মেখে
পোড়া শরীর নিয়ে ফিরে আসি।
.
এইভাবে,
রূঢ় বাস্তবতার সোনালী আভায়
কুয়াশার মত কেটে গেছে অগুণতি মোহের আবরণ।
রেখে গেছে ক্ষতচিহ্ন; সংশয়, দ্বিধা, দ্বন্দ্ব।
প্রতিটি পদক্ষেপেই এখন 'সন্দেহ' জেগে ওঠে -
আমি কি এখনো মোহাবিষ্ট হয়ে আছি? কিংবা
যে পথে বাড়িয়েছি পা
তারও মঞ্জিল কি কোন এক
ঝিলমিল মরীচিকায়?

বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৫

ফিনিক্স !

একপাল মাতাল বুলডোজার বহুদিন ধরে
ক্রমাগত গুঁড়িয়ে চলেছে- আমার চলার পথ;
এবং আমাকেও।
তবু আমি-
এক অদ্ভুত ধ্বংসস্তুপ হয়ে আজও বেঁচে আছি।
আমি রুপকথার ফিনিক্স নই; মাথা কাটা গেলে-
আমার শুন্য গর্দানে- একটাও নতুন মস্তক গঁজিয়ে ওঠেনি ।
উন্মত্ত বুলডোজারের অবিরাম আঘাত সয়ে সয়ে
বহুকাল আগেই দেহ-মস্তক বক্ষহীন হয়ে গেছি আমি, তবু
ধ্বংসস্তুপের গভীরে বাঁচিয়ে রেখেছি
হৃদয়ের কোমলতা ।
আর্দ্র হৃদয় ছাড়া
কীইবা অর্থ থাকে মানুষের জীবনে?