এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...

এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে

শুক্রবার, ৩১ মার্চ, ২০১৭

বিয়ে করতে কত টাকা লাগে?

বিয়ে করতে আসলে কত টাকা লাগে? বিবাহ কথন সিরিজের এই পর্যায়ে এটাই এখন আমাদের সামনে গুরুতর প্রশ্ন।
তবে এই প্রশ্নে নিজের মন্তব্য দেয়ার আগে আমি দুটি কেস হিস্ট্রি তুলে ধরবো। একতরফা না। একজন ছেলের, আর একজন মেয়ের।

কেস হিস্ট্রি-১:
আমাদের দেশে ছাত্রাবস্থায় বিয়ে করতে চাওয়াটাকে এক ধরণের অপরাধ হিসেবেই ধরা হয়। আমার বাসায়ও ভয় পেয়ে গেল। আমাকে অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে বললো, "কোনমতে জাস্ট পাসটা কর, তারপরই বিয়ে দিয়ে দিব; চাকুরিও পাবার দরকার নাই। এখন বিয়ে করলে মানুষ কি বলবে? মান-সম্মান থাকবে?"

আমিও বুঝলাম। পাস করে বের হবার পর বেকার ছিলাম প্রায় ৯ মাস। তখন তো বিয়ের কথা মুখে আনা প্রায় অসম্ভবই। এরপর মোটামাটি আয়-রোজগারের একটা ব্যবস্থা হলো (মাসে ১৮ হাজার টাকার মত)। এর কিছুদিন পর বাসায় আবার বললাম বিয়ে করার কথা। আব্বা বললেন - এই টাকায় ফ্যামিলি চালাতে পারবি? ঢাকা শহরে তো বাড়িভাড়াই হবেনা এই টাকায়। আমি কিন্তু ১ টাকাও দিতে পারব না। You have to be at your own! ভেবে দেখ।
সাত-পাঁচ ভেবে পিছিয়ে আসলাম। ঠিকই তো! এই টাকায় চলব কিভাবে? এভাবে আরও কিছুদিন গেল। আবার বললাম। আবার একই উত্তর। আবার পিছালাম। এভাবেই চললো কিছুদিন।

শেষমেষ ঠিক করলাম। দরকার হলে রিস্কই নিব। আমার পরিচিত অনেকে তো মাসে ৮ হাজার টাকা স্যালারি পেয়েও ২-৩ জন ছেলেমেয়ে নিয়ে সুন্দর সংসার চালাচ্ছে, তাঁরা পারলে আমি পারবোনা কেন? লাইফ-স্ট্যান্ডার্ড নিচে নামিয়ে আনতে হবে? আনবো। দরকার হলে বস্তিতে থাকবো।

এরপর বিয়েটা করেই ফেললাম (জুন, ২০১৩)। আমার ২ ফ্রেন্ডের কাছে ২০ হাজার ও ৩০ হাজার করে মোট ৫০ হাজার টাকা ধার করলাম। হবু বউকে আগেই জানিয়ে দিলাম আমি গরিব মানুষ। পুঁজি বলতে আমার এই ৫০ হাজার টাকাই। এর বেশি মোহরানা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না, আর পুরোটাই নগদ দিতে চাই। সে রাজি হলো।
কিভাবে জানি আরও ১০ হাজার টাকা ম্যানেজ হলো। বিয়ের দিন কি কি সব খরচে দেখি ২ হাজার টাকা শর্ট! দৌড়ায়ে গেলাম ছোট ভাইয়ের কাছে। বিভিন্ন সময়ে সে আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে পাওয়া ১০০, ২০০ টাকা মিলিয়ে যে ২-৩ হাজার টাকা জমিয়েছিল তা থেকে ২ হাজার টাকা ধার দিল। বিয়ে হয়ে গেল।

বিয়ের আগেই একটা বাসা ভাড়া নিয়ে রেখেছিলাম। ভাড়া ৭ হাজার টাকা প্রতি মাসে। বিয়ের ৩-৪ দিন পরই ঢাকায় চলে আসলাম নতুন বাসায়। ফার্নিচার বলতে মেসে থাকার জন্য কেনা ১ হাজার টাকা দামের একটা চৌকি আর ৫০০ টাকা দামের একটা টেবিল আর মেসে মিশুকের ফেলে রেখে যাওয়া একটা প্লাস্টিকের চেয়ার।

সংসার চালানোর জন্য যত খরচ হবে ভেবেছিলাম, দেখলাম বাস্তবে খরচ তার তুলনায় কমই। খরচ বেড়েছে বলতে বাসা ভাড়া ৪ হাজার টাকা (আগে ৩ হাজার লাগত আর তখন ৭ হাজার), খাওয়ার খরচ প্রায় অপরিবর্তিতই আছে (যেহেতু রান্না-বান্না কাজের লোক না রেখে নিজেরাই করি)। তবে আগে যেমন হাতখুলে খরচ করতাম, তখন সেটা মোটামুটি নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসতে হলো। পার্থক্য এটুকুই। সেই খরচেই সুন্দর চলে যেতে লাগলো।

কয়েকমাস পর বউ বললো একটা ফ্রিজ কেনা দরকার। টাকা জমাতে হবে। কয়েকমাস টাকা জমিয়ে ২০ হাজার টাকার মত হলো। ফ্রিজের দোকানে গেলাম। বউ পছন্দ করলো প্রায় ৩০ হাজার টাকা দামের একটা ফ্রিজ। আমি আনইজি ফিল করা শুরু করলাম। আমার কাছে তো এত টাকা নাই। সব মিলিয়ে বাইশ হাজার টাকা হতে পারে। বউ দেখি হাসে। এই কয়দিনে বউও প্রায় ৮ হাজার টাকার মতো জমিয়ে ফেলেছে সংসারের খরচ সেভ করে।

এখনো মাঝে মাঝে অবাক লাগে। আগে টাকার ভয়ে বিয়ে করতে পারিনি আমি। বিয়ের আগে প্রায় এক-দেড় বছর যে আয় ছিল, বিয়ের প্রায় বছরখানেক পর পর্যন্তও আয় ছিল একই। বিয়ের আগের প্রায় এক বছরে সেভিংস ছিল শূন্য টাকা। বিয়ের পরের এক বছরেও সেভিংস শূন্য, কিন্তু ২ জনের একটা সংসার চালিয়েও ফ্রিজসহ আরও অনেক কিছু কেনা হয়ে গেছে!

বিয়ে করলে আসলেই আয়ে বরকত আসে। রিজিকের মালিক আল্লাহ- এটা নতুন করে অনুভব করেছিলাম তখন। যারা টাকার ভয়ে বিয়ে করতে পারছেন না, সাহস করে বিয়েটা করেই ফেলুন। ইনশাল্লাহ, আয়ে বরকত আসবে। রিজিকের মালিক তো আল্লাহই।

ফুটনোটঃ বিয়ের জন্য যে দুই ফ্রেন্ডের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছিলাম, ধার শোধ করে তাঁদের বিয়ের সময়ও সেই একই পরিমান টাকা ধার দিতে পারার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। মাঝে মাঝে এই ৫০ হাজার টাকাকে খুব বরকতময় মনে হয়! কি সুন্দর এই হাত থেকে ঐ হাতে যাবার অছিলায় ৩ জনের বিয়ে সুন্দরভাবে হয়ে গেল! (রনি পারভেজ)

(বিবাহ কথন-১৭)

****

বিয়ে করতে কত টাকা লাগে? এই প্রশ্নে আমি একটা অদ্ভুত উত্তর দেবো, তবে তা আগামী পর্বে। নিজের মন্তব্য দেয়ার আগে যে দুটো কেস হিস্ট্রি উল্লেখ করতে চেয়েছিলাম, আজ থাকছে তার দ্বিতীয়টি।

কেস হিস্ট্রি-২:
আমার বিয়ের শাড়িটির দাম চার হাজার আট'শ টাকা। যেখানে আমারই বোন কিংবা কাজিনদের বিয়ের শাড়ির দাম পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত। আর্থিক সংকটের কারণে যে আমি কম দাম দিয়ে বিয়ের শাড়ি কিনেছি, এমন নয়। আসলে আমার মনে হয়েছে, কী দরকার, একদিনের জন্য এত বেশি টাকা নষ্ট করে! হাতে টাকা পেলে আমি পোশাক কেনার চেয়ে বই কেনায় বেশি মনোযোগ দেই। সে যাক, যার যার রুচির ব্যাপার। তবে এটা বলতে পারি, এক লক্ষ টাকার শাড়ি গায়ে জড়ানো বোনটির চেয়ে আমি মোটেও খারাপ নেই। ভালো থাকা যার যার মানসিকতার ওপর নির্ভর করে। আপনি যদি মনে করেন, আপনি ভালো আছেন, তাহলেই আপনি ভালো থাকবেন।

আমার যখন বিয়ে হয়, আমরা দুজনই স্টুডেন্ট। আমার একুশ, আতিকের তেইশ। আতিক কম বেতনের একটা চাকরি করে, আমার তেমন কোনো আয়-ইনকাম নেই। তবু আমার পরিবার বিয়েতে অমত করেনি। বিয়ের পরে আমরা একরূম সাবলেট নিয়ে উঠেছি। সস্তার আসবাবপত্রের দোকান থেকে কেনা দুই হাজার টাকার একটি খাট, একটি আলনা আর কম্পিউটার ছাড়া আর কিছুই ছিল না আমাদের ঘরে। দীর্ঘদিন আমরা দুইজন কোনো দামী ফোন ব্যবহার করিনি। মনে আছে, দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর আমি কোনো নতুন জামা, জুতো, ব্যাগ কিনিনি। আগের যা ছিল, তাই দিয়েই চালিয়ে নিয়েছি।

এক কেজি গরুর মাংস চার ভাগ করে রান্না করেছি। দিনের পর দিন শুধু সবজি দিয়েই ভাত খেয়েছি। এত যে কষ্ট করেছি, তবু একজনের বিরুদ্ধে আরেকজন কখনো অভিযোগ করিনি। আমাদের পরিবারকেও কখনো বলতে যাইনি, যে আমরা কষ্ট করছি। তারা জানতো, আমরা ভালো আছি। সত্যিই আমরা ভালো আছি। প্রয়োজন ছিল কিছুটা সময় ধৈর্য ধরার। আমরা তা করেছি, তাই দেখতে দেখতে দৃশ্য বদলে গেল, যে জীবন আমরা শুরু করেছিলাম, তার সঙ্গে বর্তমান জীবনের কোনো মিলই নেই! ভাগ্য বদলের জন্য তো প্রচেষ্টা থাকতে হবে, তাই না?

আরেকজনের সাজানো-গোছানো জীবনে প্রবেশ করার চেয়ে দুজন মিলে সাজিয়ে নিলে, সেই জীবনটা আরো বেশি সুন্দর হয়ে উঠতে পারে। (হাবিবা নাসরিন)

(বিবাহ কথন-১৮)

****

এর আগে দুটি কেস স্টাডি দিয়ে আমি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি- বিয়ে করতে খুব বেশি টাকার দরকার নেই। যদি নিয়ত ঠিক থাকে, যদি উভয়ের মেনে নেয়ার মানসিকতা থাকে- তাহলে থাকার জন্য দালানের দরকার হয় না, মাটির ঘরই যথেষ্ট হয়। লাখ লাখ টাকা মোহরানা লাগে না, কোরআনের কয়েকটি সুরাও যথেষ্ট হয়। লাখ টাকার শাড়ি গহনা পাগড়ী শেরোয়ানি লাগে না, লুঙ্গি ফতুয়া আর সাধারণ একটা শাড়ি হলেই চলে। কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করে হাজার মানুষ খাওয়ানো ওয়ালিমা দরকার হয়না, এক প্যাকেট খেজুরের ওয়ালিমাই বরকতপূর্ণ হয়।

এইযে এত জাঁকজমকের আয়োজন, এত আনুষ্ঠানিকতা, এত দর-কষাকষি, এইসব কেন করা হয়? করা হয় শুধুমাত্র তথাকথিত এই সমাজের চোখে, সমাজের মানুষের চোখে বড় সাজার জন্য। মানুষের চোখে প্রশংসা পাওয়ার জন্য। মানুষ কী বলবে- এই তাড়না থেকেই শুরু হয় শো-অফ এর যতসব অসুস্থ প্রতিযোগিতা।

কিন্তু বাস্তবে বিয়ের উদ্দেশ্য যে একটা সুন্দর পরিবার গঠন, সেইখানে এতসব খানাদানা জাঁকজমকের একপয়সার মূল্য নেই। দিনশেষে এই তথাকথিত সমাজ আর সমাজের মানুষেরা শুধু নিন্দাই করে, শুধুই পরশ্রীকাতর হয়, শুধু হিংসাই করে, শুধু সমস্যাই বাড়ায়।

সবকিছু মোকাবেলা করতে হয় শুধু দুজনকেই, পরিবারটাকে টেনে নিতে হয় মাত্র দুজনকেই।
বিয়ে করতে কত টাকা দরকার? আমার উত্তর হলোঃ বিয়ে করতে তত টাকাই দরকার, যতটাকা হলে একটা লুঙ্গি কেনা যায়!! অদ্ভুত শোনাচ্ছে? হাদীস থেকে বাস্তব প্রমাণ দিচ্ছিঃ

সাহল ইবনু সা‘দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক মহিলা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার জীবনকে আপনার হাতে সমর্পণ করতে এসেছি। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাঁকালেন এবং সতর্ক দৃষ্টিতে তার আপাদমস্তক লক্ষ্য করলেন। তারপর তিনি মাথা নিচু করলেন। যখন মহিলাটি দেখল, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সম্পর্কে কোন ফয়সালা দিচ্ছেন না, তখন সে বসে পড়ল। এরপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীদের মধ্যে একজন দাঁড়ালেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! যদি আপনার বিয়ের প্রয়োজন না থাকে, তবে আমার সঙ্গে এর বিয়ে দিয়ে দিন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে কিছু আছে কি? সে উত্তর করলো- না, আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার কাছে কিছুই নেই। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তোমার পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে গিয়ে দেখ, কিছু পাও কিনা। এরপর লোকটি চলে গেল। ফিরে এসে বলল, আল্লাহর কসম! আমি কিছুই পাইনি। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আবার দেখ, লোহার একটি আংটিও যদি পাও। তারপর লোকটি আবার ফিরে গেল। এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! তাও পেলাম না, কিন্তু এই আমার লুঙ্গি (শুধু এটাই আছে)। লোকটি এর অর্ধেক তাকে দিতে চাইল। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে তোমার লুঙ্গি দিয়ে কী করবে? তুমি যদি পরিধান কর, তাহলে তার কোন কাজে আসবে না, আর সে যদি পরিধান করে, তবে তোমার কোন কাজে আসবে না। বেশ কিছুক্ষণ লোকটি নীরবে বসে থাকল। তারপর উঠে দাঁড়াল। সে যেতে উদ্যত হলে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডেকে আনলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কী পরিমাণ কুরআন মাজীদ মুখস্থ আছে? সে বলল, আমার অমুক অমুক সূরা মুখস্থ আছে এবং সে গণনা করল। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, এগুলো কি তোমার মুখস্থ আছে? সে বলল, হাঁ। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে পরিমাণ কুরআন তোমার মুখস্থ আছে তার বিনিময়ে এ মেয়েটিকে তোমার অধীনস্থ করে (বিয়ে) দিলাম।
(সহীহ বুখারী)

আপনার যা আছে বিয়ে করার জন্য তা-ই যথেষ্ট। শুধু আপনাকে হতে হবে আরো একটু বেশি কষ্টসহিষ্ণু, টেনে ধরতে হবে আপনার উচ্চাভিলাষের লাগাম, সাময়িকভাবে হয়তো কমিয়ে আনতে হবে জীবনযাত্রার মান। আর হ্যা, খুঁজে বের করতে হবে এমন একজনকে- যিনি আপনার এইটুকু নিয়েই সন্তুষ্টচিত্তে সংসার করতে রাজী আছেন।
(বিবাহ কথন-১৯) 

বুধবার, ২৯ মার্চ, ২০১৭

প্রিয় ভাঁটফুল

ভাঁটফুলেদের কথা তবু মনে পড়ে।
মনে পড়ে, চৈত্রের সেইসব নিঃসঙ্গ দুপুরে
কতটা ভালোবাসা দিয়েছিলো আমাকে-
জাতহীন পাতহীন সেইসব বুনো ভাঁটফুল।
গোলাপ রজনীগন্ধার ভীড়ে কেউ কি ভাবে আজ
ঘাসফুল ভাটফুলেদের কথা? অথচ
গোলাপী গোলাপেরা কখনো দেয় নাই অতটা ভালোবাসা,
যতটা নিখাদ প্রেম ছিল-
ভাটফুলের অজানা সৌরভে।

হা হৃদয়! অকৃতজ্ঞ হয়োনা কভু।
ভুলোনা পুরনো বন্ধুর কথা,
জীবনের রুক্ষ পথে বারবার চিনে নিও তারে।
যে ছিল তোমার আজো সে তোমারি আছে;
খুঁজে নিও
পতিত জমিনে অবহেলা অনাদরে বেড়ে ওঠা
বংশপরিচয়হীন ছিন্নবস্ত্র এক
বুনো ভাটফুল।

শনিবার, ২৫ মার্চ, ২০১৭

'ফ্রি হেলথ ক্যাম্পে'র নামে 'জাতীয় মশকরা'

আগামীকাল মহান স্বাধীনতা দিবস। এই দিনে সারাদেশে 'ফ্রি হেলথ ক্যাম্পে'র নামে জনগনের সাথে 'জাতীয় মশকরা'য় লিপ্ত হবেন শতশত চিকিৎসক।
রাজনৈতিক নেতা-পাতিনেতা আর বিভিন্ন ক্লিনিক-ডায়াগনোস্টিক গুলো তাদের নিজস্ব প্রচার প্রচারণার উদ্দেশ্যে আয়োজন করবে এইসব তথাকথিত 'ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প' নামক তামাশার। আর তাতে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হবেন বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসকবৃন্দ।
আচ্ছা স্বাধীনতা দিবসে আইনজীবিরা কি 'ফ্রি আইন ক্যাম্প' করেন? ইঞ্জিনিয়াররা কি 'ফ্রি নকশা' করে দেন? কৃষিবিদরা কি 'ফ্রি কৃষি পরামর্শ' ক্যাম্প করবেন? শিক্ষকগন কি 'ফ্রি টিউশনি ক্যাম্প' করবেন? ব্যবসায়ীরা কি 'ফ্রি চাল-ডাল বিতরণ' করবেন? ঔষধ ব্যবসায়ী কি 'ফ্রি ঔষধ বিতরন' করবেন?
না। তাহলে আপনি কেন ছুটির দিনটাতে পরিবার পরিজনকে বঞ্চিত করে এইসব ভাওতাবাজি ক্যাম্পিং করবেন? কেন নেতা-পাতিনেতা বা ক্লিনিক-ডায়াগনোস্টিকের প্রচারণার সামগ্রী হবেন? আপনি তো ভালো করেই জানেন, এইসব ক্যাম্প ট্যাম্প দিয়ে জনগনের কোন উপকার হয়না।
যার দরকার সে ঠিকই কমিউনিটি ক্লিনিকে যাবে, উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে যাবে, সদর হাসপাতালে যাবে, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাবে, ক্লিনিকে যাবে। আর সেখানে এই ছুটির দিনেও আপনার ভাইবোনেরা কেউ না কেউ বসে আছেন চিকিৎসা দেয়ার জন্য।
ডাক্তার ভাই বেরাদরগন, যারা ছুটির দিন পেয়েছেন, পরিবারের সাথে, বন্ধু বান্ধবদের সাথে সময় কাটান। তাদের সুখ দুঃখের অংশীদার হোন। কিছুই না করতে চাইলে সারাদিন ঘুমান। তবুও নিজেদেরকে আর নিচে নামাবেন না। অন্যদের খেলার সামগ্রী বানাবেন না। ফেরিওয়ালা সাজবেন না। ফেরি করে চিকিৎসা দেয়া যায় না।
মানবসেবার কথা বলে আবেগ দিয়ে যদি কেউ আপনাকে ব্ল্যাকমেইল করতে আসে, তাকে স্পষ্ট করে বলে দিন- মানবসেবার দায় আপনার একার নয়।

শুক্রবার, ২৪ মার্চ, ২০১৭

হায় কান্ডজ্ঞান!

ভোর পাঁচটা। সরকারী হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে রাত্রীকালীন দায়িত্বে আছেন ডাঃ মুনীর। ভোরের এই সময়ে বহির্বিভাগীয় রোগীর চাপ একটু কমেছে। এখন তিনি ঘুরে ঘুরে ভর্তি রোগীদের অবস্থা দেখছেন। খেয়াল করলেন, একজন ভদ্রলোক দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে এদিক সেদিক তাঁকিয়ে শেষে এসে দাঁড়ালেন ডেস্কের সামনে। বেশ উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে তাকে।

কোন রোগীর এটেন্ড্যান্ট? পোস্ট সিসিইউ বা পোস্ট ক্যাথের কোন রোগীর সমস্যা? নাকি অন্য ওয়ার্ড থেকে রেফারেল? ভাবতে ভাবতে ডেস্কে ফিরে নিজের চেয়ারে বসলেন ডাঃ মুনীর। জিজ্ঞাসু চোখে তাঁকালেন আগত ভদ্রলোকের চোখে। আংকেল, বলুন কী সমস্যা?
ভদ্রলোকের চোখে আরো উদ্বেগ ফুটে উঠলো। তিনি অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন- আচ্ছা, 'তিন তলার ৩২ নম্বর বেডটা কোনদিকে?'

মেজাজটা প্রায় বিগড়েই যেতে বসেছিল ডাঃ মুনীরের। তবু অনেক কষ্টে মেজাজের লাগাম টেনে ধরে সুন্দর ভাবে উত্তর দিলেন। চাচা, এই ওয়ার্ডে তো ৩২ নম্বর বেড নাই। অমুক অমুক ওয়ার্ডে আছে। ওইখানে গিয়ে একটু খোঁজ করুন। পেয়ে যাবেন।

ভদ্রলোক চলে গেলেন। আর পেছন থেকে তার দিকে তাঁকিয়ে রইলেন ডাঃ মুনীর। অদ্ভুত ব্যাপার! নিচতলায় দুজন দারোয়ান, এই ওয়ার্ডের প্রবেশপথে দারোয়ান, নার্সেস ডেস্কে কয়েকজন নার্স, টুলে বসে থাকা ওয়ার্ডবয়, আয়া- বলা চলে চার স্তরের মানুষকে পেরিয়ে ইনি কিনা ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করতে এসেছিলেন- ৩২ নম্বর বেডটা কোনদিকে? হায় কান্ডজ্ঞান!! এঁদের ধারণা, হাসপাতালের সবকিছু সম্পর্কে ডাক্তারকেই জিজ্ঞেস করতে হবে!!

লোকটা চলে যেতেই ডাঃ মুনীরের মনে পড়লো- একটা ভুল হয়ে গেছে। মনে কষ্ট পেতে পারে ভেবে তাকে বলা হয়নি যে এটা জিজ্ঞেস করার জন্য ডাক্তারের কাছে যাওয়ার দরকার নেই। হায়! কে জানে- এতক্ষণে হয়তো ভদ্রলোক অন্য ওয়ার্ডে গিয়ে কর্তব্যরত ডাক্তারকে খুঁজছেন। আর পেলেই জিজ্ঞেস করে বসবেন তার সেই মোক্ষম প্রশ্নটিঃ আচ্ছা, তিনতলার ৩২ নম্বর বেডটা কোনদিকে?

রবিবার, ১৯ মার্চ, ২০১৭

ফিফটি ফিফটি চান্স

বিয়ের আলাপ যদি সফল না হয়, অর্থাৎ আলাপ যখন আত্মীয়তায় পরিণত না হয়, তখন কোন না কোন একটা পক্ষকে মনোক্ষুন্ন হতেই হয়। পাত্রপক্ষ অথবা পাত্রীপক্ষ। কারণ, শেষ পর্যন্ত তো কোন এক পক্ষ অপর পক্ষকে অপছন্দ করেই বসে। প্রস্তাব বাতিল হয়। হতে পারে এক ফ্যামিলি অন্য ফ্যামিলিকে অথবা ছেলে বা মেয়ে একজন আরেকজনকে অপছন্দ করে। হয়তো মেয়ে পাত্রকে পছন্দ করলো, কিন্তু ছেলে কিংবা ছেলের ফ্যামিলি মেয়েকে অপছন্দ করলো। হয়তো ছেলে পাত্রী পছন্দ করলো, কিন্তু ছেলের পরিবার অপছন্দ করলো মেয়ের পরিবারকে।

প্রথম প্রস্তাবেই বিয়ে হয় এমনটা খুব কমই ঘটে। সাধারণত প্রত্যেক ছেলে বা মেয়েকেই বিয়ের আগে গড়ে চার পাঁচবার এই দেখাদেখি পর্বের মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিটা ক্ষেত্রেই ছেলে কিংবা মেয়ে কাউকে না কাউকে হতাশ হতে হয়। কারো না কারো মন ভেঙ্গে যায়। কাউকে না কাউকে কষ্ট পেতে হয়। প্রত্যাখ্যানের কিংবা স্বপ্নভঙ্গের কষ্ট। 

এই অবস্থা বেশি মোকাবেলা করতে হয় মেয়েদেরকে। বিশেষ করে মেয়ে যদি তথাকথিত প্রচলিত মানদন্ডে একটু কালো হয়, শ্যামলা হয়, বেঁটে হয়। তাই বিয়ের আলাপ শুরুর আগেই গার্ডিয়ানদের উচিত ছেলে এবং মেয়ে উভয়কে মানসিকভাবে তৈরি করা। তাদেরকে জানিয়ে দেয়া, বুঝিয়ে দেয়া উচিত যে- প্রতিটা প্রস্তাব ফিফটি ফিফটি চান্স। যেকোনটাই হতে পারে। যাই হোক, বিশেষ করে নেগেটিভ হলে মনে কষ্ট পাওয়া যাবে না। কেউ যদি তোমাকে অপছন্দ করে তো সেটা তার সমস্যা, তোমার নয়। কোন মানুষই সবার কাছে পছন্দের হয় না। সবার চোখে সুন্দর হয় না। সবচেয়ে যে সুন্দর মেয়েটা বা ছেলেটা, তাকেও কেউ না কেউ অপছন্দ করে। সবচেয়ে যে ভদ্র নম্র মানুষটা, তাকেও অনেকেই পছন্দ করেনা। আর খুব কম মানুষই আছে যারা অন্য কারো ইনার পটেনিশিয়ালিটি উপলব্ধি করার ক্ষমতা রাখে।

পাত্র পাত্রীদের বুঝতে হবে, কেউ যদি আপনাকে অপছন্দ করে, তাহলে আপনার মন খারাপ করার কিছু নেই। কারণ, যে আপনাকে পছন্দ করে না সে কোনভাবেই আপনার জন্য নয়। আপনাকে যার পছন্দ নয়, যার চোখে আপনি সুন্দর নন, তার সাথে বিয়ে হলে আপনি কি সুখী হবেন? আপনাকে খুশি করার জন্য সে কি কখনো কিছু করবে? আপনার জন্য কোন স্যাক্রিফাইস করবে? নিশ্চয় না।

তাহলে কেন আপনি কষ্ট পাবেন? বরং এমন কারো জন্য অপেক্ষা করুন, যে আপনাকে আপনার অবস্থানেই পছন্দ করবে, আপনার যা আছে তাতেই সন্তুষ্ট হবে।

(বিবাহ কথন-১৬)  

শনিবার, ১৮ মার্চ, ২০১৭

প্রসঙ্গঃ হিন্দুদের হোলি উৎসব

হিন্দু সম্প্রদায়ের 'হোলি' উৎসবকে উপলক্ষ করে যেসব ঘটনা ঘটেছে, তার বিপরীতে অনেককেই দেখা গেল উগ্র প্রতিক্রিয়া দেখাতে। 'মালাউনদের এত বড় সাহস!! শালাদের ইন্ডিয়া পাঠায় দেয়া উচিত!!! এইরকম আরো অনেক কদর্য মন্তব্য।

কিন্তু ভিডিও ফুটেজ ঘেটে পাওয়া গেলো, এইসব নোংরামির ঘটনায় জড়িত সবগুলা মুসলমানের বাচ্চা!!
আর এর মাধ্যমে একেবারে হাতে নাতে প্রমাণ হলো- এইসব ঘটনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের কোন দোষ নাই।
শত শত বছর ধরে এই ভূখন্ডে হিন্দু মুসলিম পাশাপাশি বাস করছে। সুখে দুঃখে একে অপরের সহযোগী হয়েছে। রমজান, পুজা একসাথে হয়েছে। কোন সমস্যা হয় নাই। হিন্দুরা তাদের উৎসবের সীমা বোঝে। একটা মুসলিমপ্রধান দেশে কীভাবে উৎসব পালন করতে হয় সেটা তারা জানে। তাদের উৎসব সবসময়ই ছিল ঘরোয়া প্রকৃতির। নিজেদের মধ্যে আনন্দ উদযাপন। তাদের উৎসবে মুসলমানদের মধ্যে থেকে শুধু বন্ধু বান্ধবরাই আমন্ত্রিত হত। অপরিচিত কেউ হুট করে যেতে পারতো না।

সেভাবেই তারা চলছিল। কিন্তু ইদানীং কিছু সুযোগসন্ধানী কুলাঙ্গার 'ধর্ম যার যার উৎসব সবার' বলে হিন্দুদের উৎসবে গিয়ে বিশৃঙ্খলা করছে। এদের প্রধান টার্গেটই থাকে মেয়েরা। যেকোনভাবে তারা মেয়েদের গায়ে হাত দেবে। এবারের হোলিতে যেভাবে রাস্তায় মেয়েদের গায়ে হাত দেয়া হয়েছে, কোন ধর্মপ্রাণ হিন্দু একাজ করতে পারেনা। করেওনি।
হিন্দু বন্ধুদের বলবো, আপনাদের উৎসবে একান্ত কাছের বন্ধুবান্ধব ছাড়া অন্যদের অংশ নিতে দেবেন না। এদের হাতে আপনাদের সম্মান নিরাপদ নয়। কোন আশঙ্কা থাকলে স্থানীয় মুসলমান নেতাদের জানান। আমি সাহসের সাথে বলতে পারি, এদেশের মুসলমানরা সবসময়ের মত আগামীতেও হিন্দুদের ধর্মপালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।

মঙ্গলবার, ১৪ মার্চ, ২০১৭

শুধুই কমিশন খাওয়ার ধান্দা?

১.
ডাক্তারের চেম্বারে এসেছেন রহমত সাহেব। দুমাস ধরেই খেয়াল করছেন একটু একটু জ্বর, শরীরটাও দুর্বল হয়ে আসছে। ওজন কমে যাচ্ছে। খাওয়ার রুচিও আগের মত নাই। ইদানিং অফিসের কাজও ঠিকঠাক করতে পারেন না। খুব ক্লান্ত লাগে।
ডাক্তার তার সবকথা শুনে ফুসফুসের ক্যান্সার মনে করলেন। তিনি বললেন FNAC করতে হবে। রোগীকে পরামর্শ দিলেন- পরীক্ষা অমুক ল্যাব থেকে করাবেন।
রহমত সাহেব কিছু বলতে গিয়েও বললেন না। কিন্তু চেম্বার থেকে বেরিয়ে তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। কথাটা বলেই ফেললেন তিনি। ঐ নির্দিষ্ট ল্যাবেই করাতে হবে কেন? আসলে সবই হইলো গিয়া এদের কমিশন খাওয়ার ধান্দা!!

২.
কিছুদিন ধরেই মাথা ঘুরায় খলিল সাহেবের। পেশায় সাংবাদিক তিনি। মাথা খাটিয়েই কাজ করতে হয়। ভেবেছিলেন ডাক্তারের কাছে যাবেন না। না খেয়ে মরুক ডাক্তারগুলা। এদেশের ডাক্তারে কিছু জানে নাকি?
কিন্তু কয়েকদিন হলো মাথাব্যথাটা বাড়ছে। শেষমেষ তিনি বাধ্য হয়েই একজন মেডিসিন স্পেশালিস্টের শরণাপন্ন হলেন। মেডিসিনের স্বনামধন্য প্রফেসর। খলিল সাহেব ভেবেছিলেন, এতবড় প্রফেসর, নিশ্চয় চেহারা দেখেই রোগ ধরে ফেলবেন। কিন্তু না, ডাক্তার ধরিয়ে দিলেন এমআরআই অব ব্রেইন। আর বললেন- অমুক ইমেজিং সেন্টার থেকে করাবেন।
যা বোঝার বুঝে ফেললেন সাংবাদিক খলিল সাহেব। কচি খোকা তো নন! চেম্বার থেকে বেরোতে বেরোতে মনে মনে একটা নিউজও গুছিয়ে ফেললেন তিনি। একেবারে হাতে নাতে প্রমাণ!! এভাবেই তাহলে কমিশন খাওয়ার ধান্দায় নির্দিষ্ট ডায়াগনোস্টিকে পাঠায় ডাক্তাররা!!

৩.
বুকের ব্যথাটা অনেকদিন থেকেই আছে কবির সাহেবের। প্রথমে এলাকার ফার্মেসি থেকে বিভিন্ন সময় ওষুধ কিনে খেয়েছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। শেষমেষ বাধ্য হয়ে গতকাল গিয়েছিলেন একজন এমবিবিএস ডাক্তারের চেম্বারে। সিম্পল এমবিবিএস আরকি। ছোকরা ডাক্তার ইসিজি করিয়ে বললো হার্টে কিছু সমস্যা আছে। এতক্ষণ পর্যন্ত ঠিকই ছিল, কিন্তু এর পরেই বের হলো ছোকরা ডাক্তারের আসল চেহারা!! বলে কিনা- ইকোকার্ডিওগ্রাম করাতে হবে। কোথায় করাতে হবে তাও বলে দিলো!! অমুক সেন্টারে গিয়ে অমুক ডাক্তারের হাতে করাবেন।
কবির সাহেব তখনই সব বুঝেছেন। নিজের বয়স তো আর কম হলো না। ঐ ছোকরা ভেবেছে কি, তিনি কিছুই বোঝেন না? সোনালি ফার্মেসির ছেলেটার কথাই ঠিক। ইকো টিকো কিছুনা, সব ঐ ছোকরা ডাক্তারের কমিশন খাওয়ার ধান্দা আরকি!! ছোকরার অভ্যাস এখনই খারাপ হয়ে গেছে। বড় হলে তো নির্ঘাত কসাই হবে!!

****

আপনি অমুক জায়গা থেকে টেস্ট করাবেন। ডাক্তার এরকম কিছু বললেই অনেকের মনে খচ খচ করে ওঠে, নিশ্চয়ই কমিশন খাওয়ার ধান্দা আছে।
কমিশন কমিশন করে এমন শোরগোল তোলা হয়েছে, রোগীরা এখন সাধারণ পরীক্ষা নিরীক্ষা করতেও সন্দেহ করে- কমিশনের লোভে অপ্রয়োজনীয় টেস্ট দিলো না তো?

কিন্তু বাস্তবতা কী? আমার জানা মতে, কমিশনখোর ডাক্তারের সংখ্যা খুবই নগন্য। আর কমিশনখোররাও সহজে অপ্রয়োজনীয় টেস্ট দেয়না। যেমন পুলিশ বা সরকারি অফিসের কোন কোন কর্মচারী ঘুষ নেয়, সেটা খারাপ। কিন্তু ঘুষ নিয়ে কাজ করবেনা এতটা বেঈমান তারা এখনো হয়নি। কমিশনখোররাও হলো সেরকম। কমিশন খায় সেটা খারাপ। তাই বলে অপ্রয়োজনীয় টেস্ট দিয়ে কমিশন খাবে এতটা বেঈমান বোধহয় তারাও এখনো হয়নি।
নির্দিষ্ট ল্যাবে টেস্ট করাতে বললেই কমিশন খাওয়ার ধান্দা না। কিছু কিছু টেস্ট আছে - যার জন্য এক্সপার্টদের কাছ থেকেই রিপোর্ট নিতে হয়। যেমন FNAC, Histopathology, MRI, Echocardiogram, Endoscopy, Bronchoscopy ইত্যাদি। আর এক্সপার্টরা তো রাস্তাঘাটে ফুটপাতে বসেন না। তারা থাকেন বিশেষ কিছু সেন্টারে।
সুতরাং, কেউ আপনাকে নির্দিষ্ট ল্যাবে পাঠালেই কমিশন খাওয়ার ধান্দা মনে করে বসবেন না।
বিশ্বাস রাখুন, আমাদের সমাজটা সামগ্রিকভাবে পঁচে গেলেও ভালো মানুষের সংখ্যা এখনো অনেক বেশি।

রবিবার, ১২ মার্চ, ২০১৭

তরুণ ডাক্তারদের পেশা বদলের পরামর্শ !!

বিশেষায়িত ডিগ্রীধারীরা ঝুঁকছেন অন্য পেশায়। খবর বণিক বার্তার, (লিংক কমেন্টে)। নিউজে কয়েকজন ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার ও কৃষিবিদের কেস স্টাডি দেয়া হয়েছে যারা সবাই নিজ পেশা ছেড়ে বিসিএস পুলিশে যোগ দিয়েছেন।
খুব স্বাভাবিক। বাংলাদেশের ক্যাডার সার্ভিসের ভেতরে সাধারণ এবং পেশাগত ক্যাডারের যে বৈষম্য তাতে করে পেশাগত ক্যাডারে থাকা মানে নিজেকে অপমান করা। সুযোগ সুবিধা সব কেন্দ্রীভুত করা হয়েছে দুয়েকটি ক্যাডারে। ইঞ্জিনিয়াররা বহু আগে থেকেই পেশা পরিবর্তন অথবা দেশত্যাগ এই দুটির একটি পথ বেছে নিচ্ছেন। ডাক্তাররাই শুধু মানবিকতা, দায়বদ্ধতা, দেশপ্রেম এইসব ফাঁকাবুলিতে আটকে ছিলেন। কিন্তু কিল ঘুষি খেয়ে এখন তাদেরও চোখ খুলছে। তারাও এখন পুলিশ এবং প্রশাসন ক্যাডারে ঢুকছেন। পুলিশ এবং প্রশাসন ক্যাডার আইন প্রয়োগ করে জনগনের ওপর, আর জনগন আইন (!) প্রয়োগ করে ডাক্তারদের ওপর। একই বিসিএস এ নিয়োগ পেয়ে কেউ পায় গাড়ি, বাড়ি, বডিগার্ড। আর কেউ পায় ইউনিয়ন সাবসেন্টারে ভাঙা চেয়ার। গাড়ি তো কল্পনার বাইরে, নৌকা, ঠেলা, ভ্যান, রিক্সায় করে যাওয়া আসার খরচটাও নিজের পকেট থেকে ব্যয় করতে হয়। পেশাগত ক্যাডার মানেই অবহেলিত ক্যাডার। নখদন্তবিহীন ক্যাডার। সবার প্রমোশন হয় বয়স ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে, ডাক্তারের দরকার অতিরিক্ত ডিগ্রী। পুলিশের কনস্টেবল হয় 'স্যার', আর এমবিবিএস এফসিপিএস শেষ করে হতে হয় 'ডাক্তার সাব'। 

স্কুল কলেজ ভার্সিটি সব পরীক্ষায় যারা ছিল সামনের সারিতে, কর্মক্ষেত্রে নেমে তারা এখন নিজেকে দেখছে সবার পেছনের সারিতে। কারও দয়ায় তো বিসিএস পার হচ্ছে না, তাহলে কেন শুধু শুধু নিজেকে খাটো করা? প্রশাসন আর পুলিশ ক্যাডারই যদি হয় রাষ্ট্রের কাছে একমাত্র আদরের 'অফিসার', তাহলে হোক। তাই হোক।

আমার একজন সিনিয়র, ডাঃ রিফায়েত, আসন্ন ৩৮ তম বিসিএস নিয়ে লিখেছেন, "স্বাস্থ্য ক্যাডারে সহকারী সার্জনের পদ ২২০টি, সহকারী ডেন্টাল সার্জনের পদ ৫ টি! প্রশাসন ক্যাডারে সহকারী কমিশনার পদ ৩০০ আর পুলিশে ১০০। লড়াই যেহেতু হবে, শুধু হেলথ ক্যাডার কেন?? পাশাপাশি জেনারেল ক্যাডারেও হোক।"

ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার যারা আগামীতে বিসিএস দিবেন, তাদের সবার জন্য আমারও একই পরামর্শ। প্রশাসন আর পুলিশ ক্যাডারই যদি হয় দেশসেবার একমাত্র উপায়, তবে তাই হোক। রাষ্ট্র যদি তার ক্যাডারদের মধ্যে রাজা প্রজা বিভাজন করে, যোগ্য হয়েও কেন আপনি জেনেশুনে প্রজাই হবেন?

শুক্রবার, ১০ মার্চ, ২০১৭

যদি কিছু মনে না করেন !!

ভাই কিছু মনে না করলে একটা কথা বলি??
ভাই, মাইন্ড কইরেন না, আপনাকে একটা কথা বলি??
অনেকেই কথার আগে পরে এইসব ব্যবহার করেন।

আপনি হয়তো কার্টেসি হিসেবে কোন সেনসিটিভ কথা এভাবে শুরু করেন। কিন্তু বাস্তবে এইটার উদাহরণ হলো পাগলকে সাঁকো নাড়ানোর কথা মনে করিয়ে দেয়ার মত। যাকে বলছেন, হয়তো তিনি খেয়ালই করতেন না, আপনি একটা সিরিয়াস কথা বলে ফেলেছেন। কিন্তু আপনি যখনি বলবেন- ভাই মাইন্ড কইরেন না, ঠিক তখনি উনার মনে হবে- নিশ্চয় এই কথাটা মাইন্ড করার মত!!! নাহলে কেন আমাকে এই কথা বললো?

এবং 'মাইন্ড কইরেন না' বলাতে তিনি আর কোনভাবেই 'মাইন্ড' না করে থাকতে পারলেন না!!!

শুক্রবার, ৩ মার্চ, ২০১৭

নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই নিশ্চিত করতে হবে

বগুড়া মেডিকেলের ঘটনা সহজে ছেড়ে দেবার সুযোগ নাই। রাষ্ট্র যখন আপনাকে নিরাপত্তা দেবে না, তখন নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই নিশ্চিত করতে হবে। ফাতরা লোকজন হাসপাতালে এসে রসিয়ে রসিয়ে মহিলা ডাক্তারকে 'মাল' বলবে, ফ্যান কোনদিকে, টয়লেট কোনদিকে জিজ্ঞেস করবে, আর পোলারা বসে বসে দেখবে? সালাম করবে?
কুলাঙ্গারগুলাকে শুধু কান ধরে উঠবোস করানো মোটেই যথেষ্ট হয় নাই।

এতদিনে ভালো করে বোঝা হয়ে গেছে, ডাক্তারের নিরাপত্তা আমাদের রাষ্ট্র দেবে না। নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদেরকেই দিতে হবে। বগুড়া মেডিকেলে ইন্টার্নরা, দে হ্যাভ শোন দেয়ার গাটস। সকল ডাক্তারকে এই শিক্ষা নিতে হবে। প্রতিদিন একতরফাভাবে 'ডাক্তার লাঞ্চিত' হবার খবর আর শুনতে চাই না। 

রাষ্ট্র তার নাগরিকদের চাহিদা না মিটিয়ে ডাক্তারকে গিনিপিগ বানাতে চায়। হাসপাতালে সিট নাই, আছে ডাক্তার। ঔষধ সরবরাহ নাই- আছে ডাক্তার। পরীক্ষা নিরীক্ষার ব্যবস্থা নাই- আছে ডাক্তার। চুরি করবে থার্ড ক্লাস ফোর্থ ক্লাসরা, দোষ হবে ডাক্তারের।

রাষ্ট্র নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা দেবে না, দোষ হবে ডাক্তারের। রাষ্ট্র এবং মিডিয়া ডাক্তারদেরকে জনগনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। মৌলিক চাহিদা পূরণে রাষ্ট্রের ব্যর্থতার দায়, আর জনগনের ক্ষোভ তারা ডাক্তারদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে পাশ কাটাতে চায়।

কিসের ভিত্তিতে মন্ত্রী ইন্টার্নদের বরখাস্ত করেন? কোন আইন তাকে এই অধিকার দিয়েছে? হাসপাতালের ওয়ার্ডে এইসব লোক ঢুকলো কী করে, কেন? মন্ত্রীকে আগে সেই জবাব দিতে হবে। ঢাকা মেডিকেলে ডাঃ ফারহানাকে যখন আহত করা হয়, কোথায় ছিলেন মন্ত্রী মহোদয়? কোথায় ছিলেন তিনি, যখন বহিরাগত সন্ত্রাসীরা ঢাকা মেডিকেলে এসে ভাঙচুর চালায়? কী ব্যবস্থা নিয়েছেন তিনি?

আর পদলোভী বিএমএ নেতাদেরকে অভিভাবক হিসেবে অস্বীকার করার সময় এসেছে। যে অভিভাবক তার সন্তানের নিরাপত্তা দিতে পারেনা, যে অভিভাবক তার সন্তানকে জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে ঘুমায়, তারা অভিভাবক হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। তাদেরকে অস্বীকার না করলে আগামীতেও কোন অধিকার আদায় হবেনা।

মঙ্গলবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

'স্বামীগিরি'র দিন আর নাই...

আহা কেউ যদি মশারিটা টাঙিয়ে দিত!! আলোচ্য বাক্যাংশটুকু মশার কামড়ে অতিষ্ঠ অলস ছেলেদের স্বগতোক্তি হইতে চয়ন করা হইয়াছে। ইহা ব্যাচেলর ছেলেদের বিবাহের ইচ্ছা প্রকাশের একটি মার্জিত রুপ।

তবে ঠাট্টাচ্ছলে বলা হলেও কথাটা এমনি এমনি আসেনি। এর একটা ঐতিহাসিক পটভূমি আছে। তিরিশ চল্লিশ বছর আগেও বাংলাদেশের গরীব, নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং গ্রামীণ মধ্যবিত্ত পরিবারে স্ত্রীদের একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল স্বামীর পা টিপে দেয়া। স্বামী মানে স্বামীই, সংসারের সত্যিকার রাজা। তাঁর একমাত্র কাজ উপার্জন করা আর সংসারের খরচ জোগানো। আর স্ত্রীর কাজ স্বামীর সেবা করা। মশারি টাঙানো সেখানে স্ত্রীর আরেকটি রুটিন কাজ মাত্র। এমন অনেক পুরুষ তাদের সারাটা জীবন পার করে দিয়েছেন, একদিনও নিজে মশারি টাঙান নি। তাদের সব কাজ করে দিয়েছে ছোটবেলায় মা, বিয়ের পরে বউ। উচ্চবিত্তদের ক্ষেত্রে এই কাজগুলো করার জন্য আলাদা পরিচারিকা থাকতো।
আহা, কেউ যদি মশারিটা টাঙিয়ে দিত! আজও পুরুষের মনে এই ভাবনাটা তাই সেই চিরাচরিত 'স্বামী'সুলভ চেতনা থেকেই উঠে আসে।

এটা হয়তো ক্ষতিকর কিছু নয়। কিন্তু এই চিন্তার অর্থ যদি এই হয় যে পুরুষ তার সংসারে কোন সাংসারিক কাজই করবেন না, সব কাজ সবসময় স্ত্রীকেই করতে হবে, সেটাকে নিশ্চয়ই ঠিক বলা চলে না।

ডিয়ার ব্যাচেলরস টু বি ডেড, দিন বদলাইছে। 'স্বামীগিরি'র দিন আর নাই। বিয়ে করলেই মশারি এখন আর আপনা-আপনি জায়গামত উঠে যাবে না। এই যে আপনি ইচ্ছে করলে মশারি ছাড়াই ঘুমিয়ে পড়েন, দেখার কেউ নাই। সম্ভাবনা প্রবল যে বিয়ের পর এই সুযোগটাও হারাবেন। সময়মতই মশারি টাঙাতে হবে :P :P এবং তা হয়তো আপনাকেই :P ইহার কোনরুপ ব্যতিক্রম হইলে তাহা হইবে আপনার নেহায়েৎ সৌভাগ্য মাত্র :D :D
ডোন্ট বি আপসেট ম্যান। একদিন দুদিন মশারি টাঙালে পুরুষের মান ইজ্জত চলে যায়না!! পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ, মহানবী মুহাম্মাদ(সাঃ) ও নিজের অনেক কাজ নিজেই করতেন। আর তাছাড়া, ইউ নো, মানীর মান জুতা দিয়ে পিটালেও যায় না :D :D
(বিবাহ কথন-১৫)

শনিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

তোমায় নিয়া ঘর বান্ধিবো গহীন বালুর চর....!!

বিয়ের আগে নানান অলীক কল্পনায় ভোগে ব্যাচেলর সমিতির সদস্যরা। তারা মনে করে- বিয়ে করলেই জীবনের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে!! জীবনে আর কোন দুঃখ থাকবে না!! কোনমতে বিয়েটা করলেই কেল্লা ফতেহ!! এরপর শুধু সুখ আর সুখ।

মন্তু মিয়ার গান তাদের জাতীয় সঙ্গীত হয়ে যায়।
"আশা ছিল মনে মনে
প্রেম করিবো তোমার সনে
তোমায় নিয়া ঘর বান্ধিবো গহীন বালুর চর...."


বাস্তবে গহীন বালুর চরে কারোই ঘর বাঁধা হয়না। কিছুদিন এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করে শেষে ঘর বাঁধতে হয় ইট কাঠের শহরে। যেখানে বাসা ভাড়া যোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়। যেখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। অফিসে কাজের চাপ, বসের ঝাড়ি, ব্যবসায় টেনশন, সিটি বাসে বাঁদুড় ঝোলা।
আবার ঘরে ফিরে ব্যাগ হাতে বাজারে যাওয়া। এই দাম কত? দশ টাকা কম নাও। গত সপ্তাহেই তো বিশ টাকায় কিনলাম!!

এই নাই সেই নাই, এই করতে হবে, সেই করতে হবে- শুনে শুনে কান ঝালাপালা হয়ে যায়।

বলা হয়, বিয়ের পর প্রথম ছয় মাস থেকে এক বছর সবাই মহাকাশে উড়তে থাকে :P । মাটিতে তাদের পা পড়ে না। তারপর ধীরে ধীরে মহাকাশযান মহাশুন্য থেকে প্রথমে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে, তারও পরে পৃথিবীর মাটিতে :p অবতরণ করে। এতে নাকি আনুমানিক দেড় থেকে দু'বছর সময় লাগে। :D
 
তারপর জীবন স্বাভাবিক হয়ে আসে, জীবন একঘেয়ে হয়ে আসে। সেই প্রাগৈতিহাসিক সাংসারিক জীবন। আগে থেকে মানসিকভাবে তৈরি না থাকলে ইউফোরিক মুডে ব্যাঘাত ঘটে এমন সবকিছুই তখন বিরক্তিকর লাগে। হঠাৎ মনে হয়- নাহ, আগেই বোধহয় ভালো ছিলাম!! মানসিকভাবে তৈরি না থাকায় নতুন যেকোন সমস্যায় বিগড়ে যায় মন। সংসারে লেগে যায় অশান্তি। ফেসবুকে দেখা যায় নতুন আপডেট- গিবনে কী প্লাম?? :D
 
ব্যাচেলর সমিতির সদস্যদের এইসব অলীক কল্পনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বুঝতে হবে- বিয়ে মানেই সুখের সাগর নয়। বরং বিয়ে করা মানে জীবনের সকল কাঠিন্যের বিপরীতে নিজেকে দায়িত্ববান পুরুষ হিসেবে ঘোষণা করা। বিয়ে মানে সমস্যাসংকুল পৃথিবীর সব বাধা মোকাবেলায় একজন যোগ্য সঙ্গী খুঁজে নেয়া।

বিয়ের পরে একজন পুরুষ কিংবা নারীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলোঃ হাজারটা সমস্যার ভেতরেও একটা হাসিমুখ, আর একটা সবুজ মন বাঁচিয়ে রাখা। সত্যিকার একটা সুখী সংসারের জন্য এইটাই বোধহয় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
(বিবাহ কথন-১৪)


শুক্রবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

ভাই পেটে ব্যথা, কী ঔষধ খাবো?

ভাই পেটে ব্যথা, কী ঔষধ খাবো?????? ভাই মাথা ব্যথা, কী ঔষধ খাবো?????? বুকটা ব্যথা করছে, কী ঔষধ খাবো???? আপনার ভাবীর কেমন কেমন লাগছে। কী ঔষধ খাওয়াবো??????

Every doctors have to answer these questions everyday.... অত্যন্ত নিরীহ প্রশ্ন। প্রশ্নকর্তাদের দোষ দেয়ার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্নগুলো অতীব সাদাসিধা হলেও উত্তর দিতে গিয়ে ডাক্তারদের ঘাম ছুটে যায়।
অনেকেরই ধারণা, ডাক্তারিবিদ্যা মানে রোগের লক্ষণ অনুযায়ী কিছু ওষুধের নাম মুখস্ত করা। তারপর এই সমস্যায় এই ওষুধ, ঐ সমস্যায় ঐ ওষুধ দুই বা তিনবেলা খাওয়ার উপদেশ দেয়া। জ্বর হলে একটা এন্টিবায়োটিক দেয়া। ব্যথা হলে ব্যথার ওষুধ। এই তো, ডাক্তারিতে আর কী এমন আছে??? 

এইরকম ধারণার বশবর্তী হয়ে ঔষধের দোকানদাররাও প্রেসক্রিপশন পড়ে পড়ে ডাক্তার হয়ে যায়। জনগন ভাবেন- রোগীর দুইদিনের জ্বর, একটা এন্টিবায়োটিক দিলেই হয়ে যায়। কিন্তু তা না, যাওয়ামাত্রই দিলো একগাদা পরীক্ষা নিরীক্ষা। বললাম তলপেটে একটু ব্যথা করছে। একটু পেটে চাপ দিয়ে দেখলো। আবার এটা ওটা পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে বললো। কেনরে ভাই, খালি কমিশন খাওয়ার ধান্দা ক্যান। ব্যথার ঔষধ দিলেই তো হয়। এত পরীক্ষা নিরীক্ষার দরকার কী??

সমস্যাটা হলো- পেটে ব্যথার অসংখ্য কারণ আছে। বুকে ব্যথার অসংখ্য কারণ আছে। মাথা ব্যথারও অনেক কারণ আছে। কিছু কারণ খুব ছোটখাটো, কিন্তু কিছু কারণ খুব ভয়াবহ। পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয় সঠিক কারণটা খোঁজার জন্য। খারাপ কিছু নেই এটা কনফার্ম হওয়ার জন্য। থাকলেও যেন ডায়াগনোসিস মিস না হয় সেজন্য। সো, আপনি যদি একজন সচেতন নাগরিক হোন- ডাক্তারকে কম পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য না বলে ডায়াগনোস্টিক সেন্টারগুলোকে বলুন ফি কমাতে। সরকারকে বলুন পরীক্ষা নিরীক্ষার ফি কন্ট্রোল করতে। যাতে আপনি কম টাকায় পরীক্ষাগুলো করাতে পারেন। যতবেশি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাবেন তত ভালো ডায়াগনোসিস হবে। তত ভালো চিকিৎসা পাবেন। বিকজ, ডায়াগনোসিস ইজ দা কী ফর ট্রিটমেন্ট।

শুক্রবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

খারাপের ভেতরেও ভালো কিছু বের করার চেষ্টা?

ইদানীং কিছু কিছু মানুষকে দেখা যাচ্ছে তারা যেকোন খারাপের ভেতরেও ভালো কিছু বের করার চেষ্টা করছেন। খারাপকে বাতিল না করে তাকে একটা ভালো দিকে ডাইভার্ট করার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন। যেমন- ভালোবাসা দিবস বা ভ্যালেন্টাইন দিবস। এই দিবস উদযাপন করাটা নিঃসন্দেহে খারাপ। ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাইরেও এর কোন ভালো দিক কেউ আমাকে দেখাতে পারবেন না। এই দিবসের নামে যা কিছু হয় সবই খারাপ। এখন কেউ কেউ এই দিনকে মায়ের জন্য ভালোবাসা, বাবার জন্য ভালোবাসা, বন্ধুর জন্য ভালোবাসা প্রকাশের দিবস হিসেবে গ্রহণ করতে চাইছেন। কখনো বলা হয়নি মা তোমাকে ভালোবাসি- এমন কিছু কথা বলে আবেগ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছেন। এই দিবসকে সামাজিকভাবে গ্রহনযোগ্যতা দেয়ার চেষ্টা করছেন।

এই সকল প্রচেষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। সব খারাপকেই ভালোয় রুপ দেয়ার সুযোগ নেই। কিছু কিছু খারাপকে সরাসরি বাতিল করে দিতে হবে। ভালোবাসা বা ভ্যালেন্টাইন দিবস এমনই একটা খারাপ উদ্যোগ যাকে কোনোভাবেই এবং কোনো রুপেই প্রশ্রয় দেয়া উচিত হবে না। এটিকে সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য একটি মন্দ উদ্যোগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

বৃহস্পতিবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

মৎস্যকথা

আমরা যে একসময় আসলেই 'মাছে ভাতে বাঙালি' ছিলাম এতে কোন সন্দেহ নাই। মাছের সাথে বাঙালির সম্পর্ক কতটা গভীর তা বোঝা যায় বাঙালি সমাজে প্রচলিত প্রবাদ প্রবচনে। বাঙালি মাত্রই 'গভীর জলের মাছ'। তারা 'শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে' ওস্তাদ। 'চুনোপুঁটি' বাঙালিরা 'কই মাছের প্রাণ' হলেও তাদেরকে নানা কারণে প্রায়শই বেঘোরে মারা পড়তে দেখা যায়। 'রুই কাতলা'রা এইসব অঘটনে জড়িত থাকলেও 'রাঘব বোয়াল'দের আশ্রয়ে থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। এদেশের রাজনীতিবিদরা যেন একেকজন 'মাছের মা'। এইসব 'মাছের মায়ের পুত্রশোক' দেখে দেখে আমরা ক্লান্ত। 'ইলশেগুঁড়ি' উপভোগ করার মত সুখ এখন আর আমাদের মনে অবশিষ্ট নাই।

মঙ্গলবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

ডাক্তার ছাড়া সবাই লাটসাহেব!

'আমার রোগীর স্যালাইন চলে না!' হাসপাতালে ডাক্তারদের কানে আসা একটা কমন এবং বলা চলে 'বিরক্তি উদ্রেককারী' সংলাপ।
কারণ, স্যালাইন চলছে কিনা তা দেখার জন্য নার্সরা আছেন। হয়তো নার্স সামনেই আছে, অথবা বেডের পাশ থেকে একটু আগে হেঁটে এসেছে। কিন্তু তবুও এই সমস্যার কথা নার্সকে না বলে ডাক্তারকেই বলতে হবে কেন?

প্রথমত, হাসপাতালে এসে যদি কারো কাছে ভালো করে একটু কথা বলার আশা থাকে তা একমাত্র ডাক্তার। দারোয়ান, ওয়ার্ড বয়, এমনকি নার্সদেরও একটা অংশ নানাভাবে রোগীর স্বজনদের সাথে খবরদারি ও দুর্ব্যবহার করেন। ফলে কথা বলার জায়গাটা থাকে একমাত্র ডাক্তারের কাছেই।

সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার ছাড়া সবাই যেন লাটসাহেব! 


দ্বিতীয় কারণ, কার কী দায়িত্ব সে সম্পর্কে কোন ধারণাই রাখেন না বেশিরভাগ মানুষ। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার জন্য যে অ-ডাক্তার প্রশাসন আছে সে খবর বলতে গেলে কেউই রাখে না।
হাসপাতালের অপরিচ্ছন্নতা কিংবা অব্যবস্থাপনার জন্য যতজন কুমন্তব্য করেছেন, তাদের মধ্যে একজনও কোনদিন হাসপাতালের পরিচালকের দপ্তরে অভিযোগ করেছেন বলে আমি শুনি নাই।

তৃতীয়ত, ডাক্তার বলতে আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষের মনে ভেসে ওঠে তাদের গ্রামের 'মোখলেছ ডাক্তারে'র চেহারা। যিনি আদতে একজন প্যারামেডিক। রাত বিরাতে রোগীর বাড়িতে যান, নিজেই ঔষধ সরবরাহ করেন, নিজেই ইঞ্জেকশান পুশ করেন। সেকারণেই বড় হাসপাতালে এসেও মানুষ আশা করে, ডাক্তারই ঝুলিয়ে দেবে স্যালাইন , ডাক্তারই পুশ করে দেবে ইঞ্জেকশান।

সোমবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

The Ultimate Weapon: গার্জিয়ানরা সবসময় সন্তানের মঙ্গল চান?

বলা হয়- গার্জিয়ানরা সবসময় সন্তানের মঙ্গল চান। কখনো যুক্তিতে টিকতে না পারলে এই বাক্যটা হয়ে ওঠে তাঁদের মোক্ষম যুক্তি, শেষ অস্ত্র!!

কিন্তু কথাটা অন্যক্ষেত্রে ঠিক হলেও বিয়ের ক্ষেত্রে বোধহয় পুরোপুরি ঠিক না। এই জায়গায় এসে গার্জিয়ানরা সন্তানের চেয়ে নিজের স্বার্থটাকেই অনেক বেশি বড় করে দেখেন।

ছেলের বা মেয়ের বিয়ের জন্য কীভাবে চিন্তা করেন বাবা মায়েরা? তারা প্রথমেই চিন্তা করেন- নিজের ভাই বোন বা বন্ধু বান্ধবীর ছেলে/মেয়ের সাথে নিজের ছেলে/মেয়ের বিয়ে দেবেন। প্রথম 'খোঁজ দা সার্চ'টা চলে এদের মধ্যেই। অনেক সময় দেখা যায়- বাচ্চার জন্মের আগেই তার বিয়ের কথাবার্তা পাকা হয়ে আছে!! :D আমার মেয়ের সাথে তোর ছেলের বিয়ে দেবো, পাকা কথা দিলাম কিন্তু!!! :P
 
যদি এটা সম্ভব না হয়- তাহলে কী ঘটে? যখনই কোন প্রস্তাব আসে, অভিভাবকের প্রথম প্রশ্নটা থাকে- ছেলের/মেয়ের বাবা কী করে? অর্থাৎ তারা চিন্তা করেন তাঁদের বেয়াইটা কে হচ্ছে! ছেলেটা বা মেয়েটা কে, কী, তার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় ছেলের/মেয়ের বাপ কে এবং কী!! পাত্র-পাত্রীর নিজের যোগ্যতার চেয়ে কার ছেলে বা কার মেয়ে অভিভাবকদের কাছে সেটাই হয়ে ওঠে 'বড় যোগ্যতা'।

সন্তান দেখে তার নিজের স্বার্থ, তার থাকে নিজস্ব চিন্তাভাবনা, নিজস্ব পছন্দের মাপকাঠি। আর অভিভাবক দেখেন তাঁর নিজের স্বার্থ, তাঁদের থাকে আলাদা মাপকাঠি। দুয়ের মাঝে প্রায়শই দেখা যায় বিস্তর ফারাক।
এই নিয়ে অভিভাবকদের সাথে সন্তানের টানাপোড়েন হয় নাই, এমন পরিবার বোধহয় বাংলাদেশে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। যে পরিবারে কখনোই কোন মতবিরোধ হয় নাই, বিয়ের প্রসঙ্গে সেখানেও 'ঝামেলা' লেগেই যায়। কখনো বাবা মন খারাপ করেন, কখনো মা, কখনো ভাই বোন কিংবা খালা মামা চাচা।

সবার মন রক্ষা করতে গেলে বেশিরভাগ সময় সন্তানদেরকে নিজের মনটাকেই বিসর্জন দিতে হয়। আর এই মন বিসর্জনের 'বধ' পর্বে অভিভাবকরা সবচেয়ে মোক্ষম যে যুক্তি সামনে নিয়ে আসেন তা হলো- "গার্জিয়ানরা কি কখনো ছেলেমেয়ের অমঙ্গল চাইতে পারেন!!" যদিও বাস্তবে তা সবসময় সত্য না।

অনেক সময়ই সিদ্ধান্তের ব্যাকগ্রাউন্ডে সন্তানের মঙ্গল অমঙ্গলের চেয়ে অভিভাবকদের নিজেদের স্বার্থচিন্তাই প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

(বিবাহ কথন-১৩)

শুক্রবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

যদি কেউ বিয়ে করে ঘরজামাই হতে চান..

আমাদের দেশে এক বিচিত্র কারণে 'ঘরজামাই'দেরকে বাঁকা চোখে দেখা হয় । সিনেমা নাটকেও ঘরজামাইকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য মূলক পার্ট দেয়া হয়। ঘরজামাইকে নিয়া সবাই হাসাহাসি করে । মেয়ে, মানে ঘরজামাইয়ের বউ নিজেও হীনম্মন্যতায় ভোগে । 'স্বামীর বাড়ি' যাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে । বাপের বাড়ি থেকে চলে যেতে চায় ।
কিন্তু প্রয়োজন সাপেক্ষে 'ঘরজামাই' বিষয়টাতে আমি খারাপ কিছু দেখিনা। মেয়ে যদি বাপের বাড়ি ছেড়ে ছেলের বাড়িতে গিয়ে সারাজীবন থাকতে পারে- একই কাজ (পরিবারের প্রতি ঠিকঠাকমত দায়িত্ব পালন সাপেক্ষে) ছেলে করলে সমস্যা কী? এতে ছেলের মান যাবে কেন? আপনি কোথায় থাকছেন তাতে কিছু আসে যায় না। আপনার কাজ, আপনার দায়িত্বনিষ্ঠাই আপনাকে সম্মানিত করবে।

ঘরজামাই মানেই এই না যে শ্বশুরবাড়িতে বসে বসে খাবেন। শ্বশুরের অন্ন ধ্বংস করবেন। সেইটা করলে কিন্তু ভাতের পাশাপাশি জুটবে লাঞ্চনা গঞ্জনা। সন্দেহ নাই।

শ্বশুরবাড়িতে থাকা মানেই শ্বশুরের গোলাম হওয়া নয়। যে বাবার কোন ছেলে নেই, তাদের পরিবারে একজন ঘরজামাই যে কতটা জরুরী, সেটা তারা ছাড়া আর কেউ হয়তো বুঝবেন না।

ভাইবেন না যে এইকথা কইছি বইলা আমারে পচাইবেন । মনে রাখবেন, আমাদের মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)ও কিন্তু হযরত খাদিজা (রাঃ)কে বিয়ে করার পর একপ্রকার ঘরজামাইই ছিলেন ।

আর মুসা(আঃ) তাঁর বিয়ের পর মিশরে না ফেরা পর্যন্ত ছিলেন পুরোদস্তুর ঘরজামাই।

ভাইসব, লজ্জা করবেন না। এগিয়ে যান। কবি হেলাল হাফিজের কবিতার ভঙ্গিতে বলি-

যদি কেউ বিয়ে করে ঘরজামাই হতে চান,
তবে তাই হয়ে যান । 
উৎকৃষ্ট সময় কিন্তু আজ বয়ে যায়।

Disclaimer: এই পর্বের বক্তব্য সম্পূর্ণই তত্ত্বীয়। ইহার সহিত লেখকের ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনার কোনরুপ সামঞ্জস্য সন্ধানের অপচেষ্টা পাঠকের বাতুলতা মাত্র হইবে, এবং তাহা অবিধারিতভাবেই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইবে।

(বিবাহ কথন-১২)

বৃহস্পতিবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

মেয়ের অমতে বিয়েঃ জ্যান্ত কবর

বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়ের মতামতকে কতটা গুরুত্ব দেয়া হয়? আমাদের সমাজে একে সাধারণত তেমন ধর্তব্যের মধ্যে গণ্য করা হয় না। প্রথমত, মতামত নেয়াই হয়না। দ্বিতীয়ত, মেয়েরা মতামত দিলেও তা উপেক্ষা করা হয়। অথবা এমন অবস্থায় এনে ফেলা হয়, যখন মেয়ের যতই অপছন্দ হোক, 'হ্যা' বলা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না।

মুসলিমদের মাঝেও এর ব্যতিক্রম দেখা যায় না। যদিও ইসলামী বিধানে মেয়েদের ব্যাপক স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে।

"হযরত সালামা বিনতে আব্দুর রহমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক মেয়ে রাসুল (সাঃ) এর কাছে এসে বললো, হে আল্লাহর রাসুল! আমার পিতা! কতইনা উত্তম পিতা! আমার চাচাত ভাই আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিল আর তিনি তাকে ফিরিয়ে দিলেন। আর এমন এক ছেলের সাথে বিয়ে দিতে চাইছেন যাকে আমি অপছন্দ করি। এ ব্যাপারে রাসুল (সাঃ) তার পিতাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, মেয়েটি সত্যি বলেছে। তখন রাসুল (সাঃ) মেয়েটিকে বললেন, “এ বিয়ে হবে না, তুমি যাও, যাকে ইচ্ছে বিয়ে করে নাও”। (সুনানে সাঈদ বিন মানসূর)
---
ইসহাক ইবনু মানসূর (রহঃ) .... আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অকুমারী মহিলাকে তার সুস্পষ্ট অনুমতি ব্যতিরেকে বিবাহ দেওয়া যাবে না। কুমারী মহিলাকেও তার সম্মতি ব্যতিরেকে বিবাহ দেওয়া যাবে না।( ইবনু মাজাহ, বুখারি, মুসলিম, তিরমিজী)
---
এমনকি মেয়ের অমত থাকলে বিয়ে হয়ে যাবার পরেও রাসুল (সাঃ) তা বাতিল করার অধিকার দিয়েছেন।

"হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। এক কুমারী মেয়ে রাসুল (সাঃ) এর কাছে এসে বলল, আমার পিতা আমার অপছন্দ সত্বেও বিয়ে দিয়েছেন। তখন রাসুল (সাঃ) সে মেয়েকে অধিকার দিলেন, [যাকে ইচ্ছে বিয়ে করতে পারে বা এ বিয়ে রাখতেও পারে]।" (মুসনাদে আহমাদ, সুনানে ইবনে মাজাহ, সুনানে আবু দাউদ)
---
সাবালিকা মেয়ের নিজ বিয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার অভিভাবক অপেক্ষা তার নিজেরই বেশি। (মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী)
এমনকি কোনো মেয়ে যদি প্রাক্তন স্বামীকে আবার বিয়ে করতে চায়, তাতেও বাধা দিতে নিষেধ করা হয়েছে।
"তারা যদি ন্যায়সঙ্গতভাবে পরস্পর সম্মত হয়, তবে স্ত্রীগণ নিজেদের (প্রাক্তন) স্বামীদেরকে বিবাহ করতে চাইলে তোমরা তাদের বাধা দিও না। (সূরা বাকারা : ২৩২)"
---
মেয়েদের এই অধিকার ও স্বাধীনতা সম্পর্কে পুরুষদের স্বচ্ছ ধারণা থাকা দরকার। বিয়ের মত এত গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপারে যদি কারো পছন্দ অপছন্দকে গুরুত্ব না দেয়া হয়, এর অর্থ দাঁড়ায় মানুষ হিসেবে তার স্বাধীন স্বত্ত্বাকে অস্বীকার করা। নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার যোগ্যতা একজন মেয়ের আছে, এই বিশ্বাস সকল পুরুষকেই রাখতে হবে।

সবচেয়ে গুরুতর ব্যাপারটা হলো- কোন মেয়ের অমতে তার বিয়ে দেয়া হলে তা জায়েজ/বৈধই হয় না। আর এই সময়ের মুসলিম স্কলাররা মনে করেন- একজন মেয়েকে জোর করে তার অপছন্দের কারো সাথে বিয়ে দেয়া আসলে ইসলামপূর্ব যুগে মেয়েশিশুকে জ্যান্ত কবর দেয়ার সমতুল্য।

(বিবাহ কথন-১১)

মঙ্গলবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

আকাশচুম্বী মোহরানাঃ বরের 'অর্থদন্ড' ??

শুধু পণ্যই নয়, আমাদের সমাজে মানুষেরও মূল্য নির্ধারিত হয় টাকার অংকে।

আর এর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় বিয়ের আসরে। মোহরানা নিয়ে যেভাবে দরকষাকষি করা হয়- মাছের বাজারেও ততটা করা হয় কিনা সন্দেহ।

অথচ বিয়ে কোন পণ্য কেনাবেচা নয়। বিয়ে মানে মানুষে মানুষে গড়া পবিত্র বন্ধন। প্রাণের সাথে জুড়ে দেয়া প্রাণ।
মোহরানা নির্ধারণ করা উচিৎ নারীর সম্মান, আর কিছুটা আর্থিক নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে। বাস্তবসম্মত ও পরিশোধযোগ্য সাধ্যের ভেতর। সেটাকে এমন অবাস্তব, আকাশচুম্বী, অপরিশোধ্য অংকে নির্ধারণ করা ঠিক না যাতে করে তা বরের কাছে 'আর্থিক দন্ডে'র মত মনে হয়!!

প্রথমেই মাথার ওপর বোঝা চাপিয়ে দিলে নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও তা কাঁটা হয়ে বিধে থাকে।
অতিরিক্ত মোহরানা পারস্পরিক সম্পর্কের কোন রক্ষাকবচ নয়। সম্পর্ক টিকে থাকে শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, ভালোবাসার ওপর। পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতার ওপর। শ্রদ্ধা কিংবা বিশ্বাস হারালে, পারস্পরিক আকর্ষণ হারালে, কাগুজে কাবিন সেখানে মূল্যহীন হয়ে যায়।

টাকার অভাবে কখনো সংসার ভাঙ্গে না। তার প্রমাণ লাখ লাখ ভূমিহীন কৃষক, ভিক্ষুক ভিখারিনীর সংসার। কোন একটা পরিবার শুধুমাত্র তখনই ভাঙতে পারে, কোন সংসারে শুধুমাত্র তখনই বিচ্ছেদ ঘটতে পারে, যখন পরস্পরের প্রতি কোন আবেগ অবশিষ্ট থাকে না। থাকে না একজনের প্রতি আরেকজনের কোন আকর্ষণ, শ্রদ্ধাবোধ।

কাবিনের টাকার অংক যে সংসারে বন্ধনের একমাত্র সুতো, সেখানে কোন সুখ অবশিষ্ট থাকে না। সেখানে সুত্রপাত হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের নানা কাহিনীর। কিছু প্রকাশ্যে আসে, বেশিরভাগই রয়ে যায় চোখের আড়ালে।
আবেগহীন সংসারে স্বামী যেন হয়ে যায় একজন দাস, আর স্ত্রীর সাথে তার আচরণ হয়ে থাকে দাসীর মত।

কাবিনের টাকা অধিক নির্ধারণ নয়, সমাজকে গুরুত্ব দিতে হবে নারীর শিক্ষা ও স্বনির্ভরতার ওপর। যে নারী নিজে নিজেকে, নিজের পরিবারকে চালানোর মত আর্থিক সক্ষমতা রাখেন, তার কাবিন নিরাপত্তার প্রয়োজন নেই।
টাকার গোলামী নয়, পবিত্র সুন্দর বন্ধনগুলো টিকে থাকুক পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার তারকাটায় গাঁথা হয়ে।

(বিবাহ কথন-১০)