‘বাংলাদেশ
চোর অধিকার রক্ষা কমিটি’র জরুরী বৈঠক ডেকেছেন কমিটির সভাপতি মজিব্যা চোর । সবাই ডাকে মজিব ভাই ।
মজিব ভাই এখনো বৈঠকে এসে পৌছাননি । সভা শুরু হবে রাত বারোটায় । কমিটির সদস্য
বিশিষ্ট চোরগন একে একে আসা শুরু করেছে । রাত গভীর না হলে বৈঠক শুরু করা যাচ্ছে না
। চোরদের কাজই তো রাতে । এখন অবশ্য দিনেদুপুরে চুরি করার ট্রেন্ডটাও শুরু হয়েছে । কমবয়স্ক চোররাই এই কাজ বেশি করে । তাদের
কথা হচ্ছে- রাতের বেলা চুরি করাটা পুরনো ধাঁচের । এটা অপমানজনক ব্যাপার । আর
তাছাড়া জরিপে দেখা গেছে দিনের চেয়ে রাতের চুরিই বেশি ঝুকিপুর্ণ । কারণ, এখন মানুষ
সচেতন হয়েছে । নাইট গার্ড গুলোও আর আগের মত ঘুমায় না । তবে দিনের বেলা চুরিতে
সমস্যা একটাই, ধরা পড়লে মানুষ ‘গনপিটুনি’ দেয় । গত মাসে ‘গনপিটুনি’তে সারাদেশে
পঙ্গু হয়ে গেছে কয়েকজন, মারা গেছে দুইজন । এছাড়া বিভিন্ন জায়গা থেকে
নন-রেজিস্টার্ড চোরদের চুরির খবর পাওয়া গেছে । এইসব বিষয়ে একটা সমাধান হওয়া দরকার
। মজিব ভাইকে একটা ব্যবস্থা নিতেই হবে । নন-রেজিস্টার্ড চোরদের রেজিস্ট্রেশন নিতে বাধ্য করতে হবে ।
আর কোন চোর যেন গনপিটুনির শিকার না হয়- সেটা নিশ্চিত করতে হবে ।
বিধু
চোর ও রঘু চোর নির্ধারিত সময়ের একটু আগেই চলে এসেছে । একটা সোফায় বসে উত্তেজিত অবস্থায় কথা বলছে তারা
। এটা বাংলাদেশ চোর অধিকার রক্ষা কমিটির হেডকোয়ার্টার । অফিসের ভেতরটা খুব ভালো
করেই সাজানো , বেশ আরামদায়ক । কিন্তু সমস্যা একটাই- ঢোকার জন্য দরজা ব্যবহার করার
নিয়ম নেই । বেশ কয়েকটি সিঁদ কাটা আছে । সেগুলো দিয়ে ঢুকতে হয় । মজিব ভাইয়ের কথা
হচ্ছে- যত আধুনিক পদ্ধতিই তোমরা ব্যবহার করো- আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যকে ভুলে যাওয়া চলবে না । আমাদের পুর্বপুরুষরা যুগ যুগ ধরে
গায়ে শরিষার তেল মেখে সিঁদ কেটে চুরি করেছেন । তাদের দেখানো পথ ধরেই আমাদের আজকের
এই উন্নতি । সিঁদ কাটার প্রয়োজন এখনো ফুরিয়ে যায়নি । গ্রামে গঞ্জে এখনো আমাদের
অনেক ভাই এই পদ্ধতি কাজে লাগান ।
দিন যত
যাচ্ছে চুরির ক্ষেত্রে সুবিধা অসুবিধা দুটোই বাড়ছে । যেমন- আগে ঝোপে ঝাড়ে লুকিয়ে থাকলে মশার কামড় খেতে হত- এখন বিশেষ
ওষুধ গায়ে মাখলে মশা আর কাছে আসে না । কিন্তু অসুবিধা হলো, এখন গ্রামেও বিদ্যুৎ
চলে যাচ্ছে । বাড়ির চারপাশ আলোকিত হয়ে থাকে সবসময় । আর বহুতল ভবন গুলোও সমস্যা ।
উপরের তলাগুলোতে চুরি করাটা একটু অসুবিধা । ধরা পড়ার অবস্থা হলে পালানোর সুযোগ কম
থাকে ।
মজিব
ভাই কিংবদন্তি চোর । তার দুর্ধর্ষ সব চুরির নানান কাহিনী চোরদের মুখে মুখে । চুরির নানান উপায় নিয়ে
একটা বইও লিখেছেন , এটা
শুধুমাত্র রেজিস্টার্ড চোররা পড়ার সুযোগ পায় । বইয়ের নাম ‘চুরি করা ও পালানোর
১০১টি সহজ উপায় !’ মজিব ভাইর কথা হচ্ছে- চুরি করা বড় কথা নয় , চুরির জিনিস নিয়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে আসা এবং পরবর্তীতে ধরা না
পড়াই হলো আসল কথা । এই চোর অধিকার রক্ষা কমিটি গঠনের আগের তুলনায় এখন চুরি করা
অনেক নিরাপদ । যাদের চোর ধরার কথা তাদেরকে মাসে মাসে তোহফা দেয়া হয় । এলাকার
চৌকিদার –মেম্বার থেকে পুলিশ বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও এর বাইরে নেই । সময়মত
বিশেষ চ্যানেলের মাধ্যমে সবাই যার যার প্রাপ্য পেয়ে যান ।
কিন্তু
গত কয়েকদিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কয়েকজন চোর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে । এতে কার গাফিলতি ছিল, কে দায়ী
এটা খুঁজে বের করতে হবে । এই নিয়েই আজকের
জরুরি বৈঠক । কমিটির সব সদস্য চলে
এসেছে । মজিব ভাইও এলেন । তার আগমনে সবাই
নড়েচড়ে বসলো ।
কাল্লু
চোর শ্লোগান ধরলো- ‘দুনিয়ার চোর’ । সবাই বললো ‘এক হও’ ।
মজিব ভাই জ্বালাময়ী বক্তব্য রাখলেন । ভাইসব, পৃথিবীতে অনেক পেশা আছে
। দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশ সরকার
‘পতিতাবৃত্তি’কে পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও আমাদের চুরিপেশাকে স্বীকৃতি দেয় নাই ।
এই বৈষম্য কোনভাবেই মাইনা নেওয়া যায় না ।
পতিতারা যদি ‘যৌনকর্মী’ হইতে পারে , তাইলে আমরা কেন ‘চৌর্যকর্মী’ হিসেবে স্বীকৃতি
ও নিরাপত্তা পামু না ? আমরাও এদেশের নাগরিক । আমরাও এদেশের মাটির আলো হাওয়ায় বাইড়া
উঠছি । আমাদেরও অধিকার আছে ।
আমরা হঠাৎ কইরা বানের জলে ভাইসা আসি নাই । আমাদের মনে আছে,
পুর্ব-পাকিস্তান স্বাধীন হইয়া বাংলাদেশ
হওনের পর বঙ্গবন্ধু কইছিলেন – ‘আমি পাইছি চোরের খনি’ । এর মানে কী ? এর মানে হইলো-
আমরাই বাঙালি জাতির ধারক ও বাহক । প্রকৃত বাঙালি চরিত্র আমরাই ধারণ করি ।
ভাইসব, গত কয়দিনে আমাদের কয়েকজন ‘চৌর্যকর্মী’ ক্ষতিগ্রস্ত হইছে ।
আমরা যাগোরে টাকা দেই, তারা খবর পাইয়াও ঠিক সময়ে আমাদের বীর চৌর্যকর্মীদের উদ্ধার
করে নাই । আমরা কি পয়সা-কড়ি কম দেই ? কম দিলে সেটা আমাদের বলুক । কিন্তু এই ভাবে
অবহেলা করলে আমরা মানুম না ।
ভাইসব, চুরি কি কেবল আমরাই করি ? সবাই তো চুরি করে । মন্ত্রীরা
বাজেটের টাকা চুরি করে । এমপিরা ত্রানের জিনিসও চুরি করে । উন্নয়ন বরাদ্দ থেকে
চুরি করে । প্রত্যেক অফিসের কর্মচারীরা চুরি করে । কই, তাদের তো গনপিটুনি দেয় না
কেউ ! আমরা কত কষ্ট করে চুরি করি – তবু আমাদের কোন নিরাপত্তা নাই । কিন্তু আরো
যারা চুরি করে- নাম বলার দরকার নাই, আপনারা সবাই জানেন , তাদের চুরির কথা যারা
প্রকাশ করেছে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হইছে । এখনো হচ্ছে । অথচ আমাদের ভাইদের গ্রেপ্তার কইরা শাস্তি দিছে,
মানুষে ধইরা পিটুনি দিয়া হাত পা ভাংছে । কেন এই বৈষম্য ? ধরলে সকল চোরকেই ধরতে হবে
। নাহলে অন্যদের মত- যারা আমাদের চুরির কথাও প্রকাশ করবে, পত্রপত্রিকায় লিখবে
তাদেরও তথ্য-প্রযুক্তি আইনে গ্রেপ্তার কইরা শাস্তি দিতে হবে ।
আরো কথা আছে । দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কইছেন- ঈদে যেন মানুষজন নিজের
বাড়িতে ঠিকঠাকমতন তালা লাগাইয়া যায় । উনি এই কথা কইবেন ক্যান ? উনি কি উনার ভাগের
পয়সা পান নাই ? আমরা অদ্যকার এই সভা হইতে মন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাইতেছি ।
এই কথা প্রত্যাহার কইরা লইতে হবে ।
ভাইসব, আমার প্রস্তাব হইলো- আমাদের পেশার স্বীকৃতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত
চৌর্যকর্মীদের ক্ষতিপুরণের ব্যবস্থা না করলে আমরা ধর্মঘট ডাকুম । আগামীকাল হইতে
টানা ৭ দিন আমরা কোন চুরি করুম না । কোথাও কোন ভাগ-বাটোয়ারা দিমু না । এবারের
সংগ্রাম , আমাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম । কী বলেন আপনারা ?
সবাই সম্মতি দিল । হ, ঠিক
ঠিক । কাল্লু আবার স্লোগান ধরলো- ‘দুনিয়ার চোর’ । উত্তরে সবাই বললো ‘এক হও’ ।
....................................
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জরুরী সভা আহবান করেছেন পুলিশ কমিশনার ।
চোরদের ধর্মঘটের আজ তৃতীয় দিন । চোরদের দাবি দাওয়া নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার ।
এভাবে চলতে দেয়া যায়না । স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ।
গুপ্ত সাহেবও সমাধান করার জন্য বলেছেন- তিনি আবার প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা । তার
কথাও শুনতে হয়, দপ্তর নাই তো কি- মন্ত্রী তো !
চোর অধিকার রক্ষা কমিটির পক্ষ থেকে সব ধরণের ‘কিছুমিছু’ দেওয়া বন্ধ
হয়ে গেছে । পরিবারের কাছে মান-সম্মান নিয়ে টানাটানি পড়ে যাচ্ছে । টাকা-পয়সা না
পেলে চলবে কী করে ? আজ সকালেই বউয়ের সাথে একটা ঝামেলা হয়ে গেল পুলিশ কমিশনারের ।
এই সপ্তাহে সিঙ্গাপুরে যাওয়ার কথা । কিন্তু তার আগে চোর অধিকার কমিটির কাছ থেকে
চেক পাবার কথা ছিল । এখন এই অবস্থায় চেকও পাওয়া যাচ্ছে না , যাওয়াটাও হচ্ছে না ।
বউকে তো আর এসব কথা বলা যায় না ! এখন যত দ্রুত সম্ভব এই সমস্যার সমাধান করা দরকার
। চেকটা এই মুহুর্তে খুব খুব দরকার ।
একইরকম অবস্থা পুলিশ বাহিনীর সর্বস্তরে । পুলিশ কর্মকর্তারা বউদের
হাতে নাজেহাল হচ্ছেন । সব জায়গা থেকে ফোন আসছে- এর একটা বিহীত ব্যবস্থা যেন
যথাশীঘ্র করা হয় ।
বিকেলে বৈঠক হলো । নিরুত্তাপ বৈঠক । সমাধান একটাই- ‘চোর অধিকার রক্ষা
কমিটি’র কাছে দুঃখ প্রকাশ করা হবে । দোষী পুলিশ কর্মকর্তাদের সাময়িকভাবে ক্লোজড
করা হবে । পুলিশ বাহিনীতে সচেতনতা বাড়াতে হবে যেন আর কোন চোর নির্যাতন-নিপীড়নের
শিকার না হয় । তারা যেন নির্বিঘ্নে চুরি করতে পারে । আর যদি জনগন ধরেও ফেলে-
তাড়াতাড়ি উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নিতে হবে ।
কমিটিকে অনুরোধ করা হবে ধর্মঘট প্রত্যাহারের জন্য । আর পেশার
স্বীকৃতিটা যেহেতু সংসদের কাজ , সেহেতু তাদের পরামর্শ দেয়া হবে ঐদিকে একটু নজর
দেয়ার জন্য । আশা করা যায় সেটাও হয়ে যাবে, কারণ- সংসদেও হাতেনাতে ধরা খাওয়া চোর
আছেন । আর তাছাড়া গুপ্ত সাহেবের সাথে ‘চোর অধিকার রক্ষা কমিটির’ ভালো যোগাযোগও আছে
। পুলিশের পক্ষ থেকে এতে কোন আপত্তি থাকবে
না ।
....................................
চোর অধিকার রক্ষা কমিটির ধর্মঘট/ ০৪-১০-২০১৩
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন