এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...

এক রৌদ্রোজ্বল বিকেলে...
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে

শুক্রবার, ৪ অক্টোবর, ২০১৩

চোর অধিকার রক্ষা কমিটির ধর্মঘট



‘বাংলাদেশ চোর অধিকার রক্ষা কমিটি’র জরুরী বৈঠক ডেকেছেন কমিটির সভাপতি মজিব্যা চোসবাই ডাকে মজিব ভাই । মজিব ভাই এখনো বৈঠকে এসে পৌছাননি । সভা শুরু হবে রাত বারোটায় । কমিটির সদস্য বিশিষ্ট চোরগন একে একে আসা শুরু করেছে । রাত গভীর না হলে বৈঠক শুরু করা যাচ্ছে না । চোরদের কাজই তো রাতে । এখন অবশ্য দিনেদুপুরে চুরি করার ট্রেন্ডটাও শুরু হয়েছে । কমবয়স্ক চোররাই এই কাজ বেশি করে । তাদের কথা হচ্ছে- রাতের বেলা চুরি করাটা পুরনো ধাঁচের । এটা অপমানজনক ব্যাপার । আর তাছাড়া জরিপে দেখা গেছে দিনের চেয়ে রাতের চুরিই বেশি ঝুকিপুর্ণ । কারণ, এখন মানুষ সচেতন হয়েছে । নাইট গার্ড গুলোও আর আগের মত ঘুমায় না । তবে দিনের বেলা চুরিতে সমস্যা একটাই, ধরা পড়লে মানুষ ‘গনপিটুনি’ দেয় । গত মাসে ‘গনপিটুনি’তে সারাদেশে পঙ্গু হয়ে গেছে কয়েকজন, মারা গেছে দুইজন । এছাড়া বিভিন্ন জায়গা থেকে নন-রেজিস্টার্ড চোরদের চুরির খবর পাওয়া গেছে । এইসব বিষয়ে একটা সমাধান হওয়া দরকার । মজিব ভাইকে একটা ব্যবস্থা নিতেই হবে । নন-রেজিস্টার্ড চোরদের রেজিস্ট্রেশন নিতে বাধ্য করতে হবে । আর কোন চোর যেন গনপিটুনির শিকার না হয়- সেটা নিশ্চিত করতে হবে । 

বিধু চোর ও রঘু চোর নির্ধারিত সময়ের একটু আগেই চলে এসেছে । একটা সোফায় বসে উত্তেজিত অবস্থায় কথা বলছে তারা । এটা বাংলাদেশ চোর অধিকার রক্ষা কমিটির হেডকোয়ার্টার । অফিসের ভেতরটা খুব ভালো করেই সাজানো , বেশ আরামদায়ক । কিন্তু সমস্যা একটাই- ঢোকার জন্য দরজা ব্যবহার করার নিয়ম নেই । বেশ কয়েকটি সিঁদ কাটা আছে । সেগুলো দিয়ে ঢুকতে হয় । মজিব ভাইয়ের কথা হচ্ছে- যত আধুনিক পদ্ধতিই তোমরা ব্যবহার করো- আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যকে ভুলে যাওয়া চলবে না । আমাদের পুর্বপুরুষরা যুগ যুগ ধরে গায়ে শরিষার তেল মেখে সিঁদ কেটে চুরি করেছেন । তাদের দেখানো পথ ধরেই আমাদের আজকের এই উন্নতি । সিঁদ কাটার প্রয়োজন এখনো ফুরিয়ে যায়নি । গ্রামে গঞ্জে এখনো আমাদের অনেক ভাই এই পদ্ধতি কাজে লাগান ।

দিন যত যাচ্ছে চুরির ক্ষেত্রে সুবিধা অসুবিধা দুটোই বাড়ছে । যেমন- আগে ঝোপে ঝাড়ে  লুকিয়ে থাকলে মশার কামড় খেতে হত- এখন বিশেষ ওষুধ গায়ে মাখলে মশা আর কাছে আসে না । কিন্তু অসুবিধা হলো, এখন গ্রামেও বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে । বাড়ির চারপাশ আলোকিত হয়ে থাকে সবসময় । আর বহুতল ভবন গুলোও সমস্যা । উপরের তলাগুলোতে চুরি করাটা একটু অসুবিধা । ধরা পড়ার অবস্থা হলে পালানোর সুযোগ কম থাকে ।

মজিব ভাই কিংবদন্তি চোর । তার দুর্ধর্ষ সব চুরির নানান কাহিনী চোরদের মুখে মুখেচুরির নানান উপায় নিয়ে একটা বইও লিখেছেন , এটা শুধুমাত্র রেজিস্টার্ড চোররা পড়ার সুযোগ পায় । বইয়ের নাম ‘চুরি করা ও পালানোর ১০১টি সহজ উপায় !’ মজিব ভাইর কথা হচ্ছে- চুরি করা বড় কথা নয় , চুরির জিনিস নিয়ে  নির্বিঘ্নে পালিয়ে আসা এবং পরবর্তীতে ধরা না পড়াই হলো আসল কথা । এই চোর অধিকার রক্ষা কমিটি গঠনের আগের তুলনায় এখন চুরি করা অনেক নিরাপদ । যাদের চোর ধরার কথা তাদেরকে মাসে মাসে তোহফা দেয়া হয় । এলাকার চৌকিদার –মেম্বার থেকে পুলিশ বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাও এর বাইরে নেই । সময়মত বিশেষ চ্যানেলের মাধ্যমে সবাই যার যার প্রাপ্য পেয়ে যান ।

কিন্তু গত কয়েকদিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কয়েকজন চোর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে  এতে কার গাফিলতি ছিল, কে দায়ী এটা খুঁজে বের করতে হবে । এই নিয়েই আজকের  জরুরি  বৈঠক । কমিটির সব সদস্য চলে এসেছে ।  মজিব ভাইও এলেন । তার আগমনে সবাই নড়েচড়ে বসলো ।
কাল্লু চোর শ্লোগান ধরলো- ‘দুনিয়ার চোর’ । সবাই বললো ‘এক হও’ ।

মজিব ভাই জ্বালাময়ী বক্তব্য রাখলেন । ভাইসব, পৃথিবীতে অনেক পেশা আছে ।  দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশ সরকার ‘পতিতাবৃত্তি’কে পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও আমাদের চুরিপেশাকে স্বীকৃতি দেয় নাই । এই বৈষম্য কোনভাবেই মাইনা নেওয়া  যায় না । পতিতারা যদি ‘যৌনকর্মী’ হইতে পারে , তাইলে আমরা কেন ‘চৌর্যকর্মী’ হিসেবে স্বীকৃতি ও নিরাপত্তা পামু না ? আমরাও এদেশের নাগরিক । আমরাও এদেশের মাটির আলো হাওয়ায় বাইড়া উঠছি । আমাদেরও অধিকার আছে ।

আমরা হঠাৎ কইরা বানের জলে ভাইসা আসি নাই । আমাদের মনে আছে, পুর্ব-পাকিস্তান স্বাধীন হইয়া  বাংলাদেশ হওনের পর বঙ্গবন্ধু কইছিলেন – ‘আমি পাইছি চোরের খনি’ । এর মানে কী ? এর মানে হইলো- আমরাই বাঙালি জাতির ধারক ও বাহক । প্রকৃত বাঙালি চরিত্র আমরাই ধারণ করি ।

ভাইসব, গত কয়দিনে আমাদের কয়েকজন ‘চৌর্যকর্মী’ ক্ষতিগ্রস্ত হইছে । আমরা যাগোরে টাকা দেই, তারা খবর পাইয়াও ঠিক সময়ে আমাদের বীর চৌর্যকর্মীদের উদ্ধার করে নাই । আমরা কি পয়সা-কড়ি কম দেই ? কম দিলে সেটা আমাদের বলুক । কিন্তু এই ভাবে অবহেলা করলে আমরা মানুম না ।

ভাইসব, চুরি কি কেবল আমরাই করি ? সবাই তো চুরি করে । মন্ত্রীরা বাজেটের টাকা চুরি করে । এমপিরা ত্রানের জিনিসও চুরি করে । উন্নয়ন বরাদ্দ থেকে চুরি করে । প্রত্যেক অফিসের কর্মচারীরা চুরি করে । কই, তাদের তো গনপিটুনি দেয় না কেউ ! আমরা কত কষ্ট করে চুরি করি – তবু আমাদের কোন নিরাপত্তা নাই । কিন্তু আরো যারা চুরি করে- নাম বলার দরকার নাই, আপনারা সবাই জানেন , তাদের চুরির কথা যারা প্রকাশ করেছে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হইছে । এখনো হচ্ছে ।  অথচ আমাদের ভাইদের গ্রেপ্তার কইরা শাস্তি দিছে, মানুষে ধইরা পিটুনি দিয়া হাত পা ভাংছে । কেন এই বৈষম্য ? ধরলে সকল চোরকেই ধরতে হবে । নাহলে অন্যদের মত- যারা আমাদের চুরির কথাও প্রকাশ করবে, পত্রপত্রিকায় লিখবে তাদেরও তথ্য-প্রযুক্তি আইনে গ্রেপ্তার কইরা শাস্তি দিতে হবে ।

আরো কথা আছে । দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কইছেন- ঈদে যেন মানুষজন নিজের বাড়িতে ঠিকঠাকমতন তালা লাগাইয়া যায় । উনি এই কথা কইবেন ক্যান ? উনি কি উনার ভাগের পয়সা পান নাই ? আমরা অদ্যকার এই সভা হইতে মন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাইতেছি । এই কথা প্রত্যাহার কইরা লইতে হবে ।

ভাইসব, আমার প্রস্তাব হইলো- আমাদের পেশার স্বীকৃতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত চৌর্যকর্মীদের ক্ষতিপুরণের ব্যবস্থা না করলে আমরা ধর্মঘট ডাকুম । আগামীকাল হইতে টানা ৭ দিন আমরা কোন চুরি করুম না । কোথাও কোন ভাগ-বাটোয়ারা দিমু না । এবারের সংগ্রাম , আমাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম । কী বলেন আপনারা ?  

সবাই সম্মতি দিল । হ,  ঠিক ঠিক । কাল্লু আবার স্লোগান ধরলো- ‘দুনিয়ার চোর’ । উত্তরে সবাই বললো ‘এক হও’ ।
....................................

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জরুরী সভা আহবান করেছেন পুলিশ কমিশনার । চোরদের ধর্মঘটের আজ তৃতীয় দিন । চোরদের দাবি দাওয়া নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার । এভাবে চলতে দেয়া যায়না । স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন । গুপ্ত সাহেবও সমাধান করার জন্য বলেছেন- তিনি আবার প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা । তার কথাও শুনতে হয়, দপ্তর নাই তো কি- মন্ত্রী তো !

চোর অধিকার রক্ষা কমিটির পক্ষ থেকে সব ধরণের ‘কিছুমিছু’ দেওয়া বন্ধ হয়ে গেছে । পরিবারের কাছে মান-সম্মান নিয়ে টানাটানি পড়ে যাচ্ছে । টাকা-পয়সা না পেলে চলবে কী করে ? আজ সকালেই বউয়ের সাথে একটা ঝামেলা হয়ে গেল পুলিশ কমিশনারের । এই সপ্তাহে সিঙ্গাপুরে যাওয়ার কথা । কিন্তু তার আগে চোর অধিকার কমিটির কাছ থেকে চেক পাবার কথা ছিল । এখন এই অবস্থায় চেকও পাওয়া যাচ্ছে না , যাওয়াটাও হচ্ছে না । বউকে তো আর এসব কথা বলা যায় না ! এখন যত দ্রুত সম্ভব এই সমস্যার সমাধান করা দরকার । চেকটা এই মুহুর্তে খুব খুব দরকার ।

একইরকম অবস্থা পুলিশ বাহিনীর সর্বস্তরে । পুলিশ কর্মকর্তারা বউদের হাতে নাজেহাল হচ্ছেন । সব জায়গা থেকে ফোন আসছে- এর একটা বিহীত ব্যবস্থা যেন যথাশীঘ্র করা হয় ।

বিকেলে বৈঠক হলো । নিরুত্তাপ বৈঠক । সমাধান একটাই- ‘চোর অধিকার রক্ষা কমিটি’র কাছে দুঃখ প্রকাশ করা হবে । দোষী পুলিশ কর্মকর্তাদের সাময়িকভাবে ক্লোজড করা হবে । পুলিশ বাহিনীতে সচেতনতা বাড়াতে হবে যেন আর কোন চোর নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার না হয় । তারা যেন নির্বিঘ্নে চুরি করতে পারে । আর যদি জনগন ধরেও ফেলে- তাড়াতাড়ি উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নিতে হবে ।

কমিটিকে অনুরোধ করা হবে ধর্মঘট প্রত্যাহারের জন্য । আর পেশার স্বীকৃতিটা যেহেতু সংসদের কাজ , সেহেতু তাদের পরামর্শ দেয়া হবে ঐদিকে একটু নজর দেয়ার জন্য । আশা করা যায় সেটাও হয়ে যাবে, কারণ- সংসদেও হাতেনাতে ধরা খাওয়া চোর আছেন । আর তাছাড়া গুপ্ত সাহেবের সাথে ‘চোর অধিকার রক্ষা কমিটির’ ভালো যোগাযোগও আছে ।  পুলিশের পক্ষ থেকে এতে কোন আপত্তি থাকবে না ।

....................................
চোর অধিকার রক্ষা কমিটির ধর্মঘট/ ০৪-১০-২০১৩

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন